📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 কেউ কারো ভার বহন করবে না

📄 কেউ কারো ভার বহন করবে না


মহান আল্লাহর একটি ন্যায়পরায়ণতাপূর্ণ বিধান হল, কেউ কারো ভার বহন করবে না। এক জন পাপ করলে অন্যজন তা বহন করবে না। একজন অপরাধ করলে অন্যজনকে তার সাজা দেওয়া হবে না। কি সুন্দর তাঁর বিচার! কি সুন্দর তাঁর কৌশল!
উক্ত নীতির কথা কুরআন কারীমে পাঁচ পাঁচবার উল্লিখিত হয়েছে। যার দ্বারা বুঝা যায় এর অতি গুরুত্ব রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ أَبْغِي رَبًّا وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيْءٍ وَلَا تَكْسِبُ كُلُّ نَفْسٍ إِلَّا عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى ثُمَّ إِلَى رَبِّكُم مَّرْجِعُكُمْ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ} (১৬৪)
"বল, 'আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য প্রতিপালককে অন্বেষণ করব? অথচ তিনিই সব কিছুর প্রতিপালক। প্রত্যেকেই স্বীয় কৃতকর্মের জন্য দায়ী হবে এবং কেউ অন্য কারো ভার বহন করবে না। অতঃপর তোমাদের প্রতিপালকের নিকটেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন হবে, তারপর যে বিষয়ে তোমরা মতান্তর ঘটিয়েছিলে তা তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন।" (আনআমঃ ১৬৪)

{مَنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ وَمَن ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولاً} (১৫) সূরা ইসরা
"যারা সৎপথ অবলম্বন করবে, তারা তো নিজেদেরই মঙ্গলের জন্যই সৎপথ অবলম্বন করবে এবং যারা পথভ্রষ্ট হবে, তারা নিজেদেরই ধ্বংসের জন্যই হবে এবং কেউ অন্য কারো ভার বহন করবে না। আর আমি রসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দিই না।" (বানী ইস্রাঈল: ১৫)

{وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى وَإِن تَدْعُ مُثْقَلَةٌ إِلَى حِمْلِهَا لَا يُحْمَلْ مِنْهُ شَيْءٌ وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى إِنَّمَا تُنذِرُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُم بِالغَيْبِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَمَن تَزَكَّى فَإِنَّمَا يَتَزَكَّى لِنَفْسِهِ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ} (১৮) সূরা ফাতির
"কোন বহনকারী অপরের বোঝা বহন করবে না; কারও পাপের বোঝা গুরুভার হলে সে যদি অন্যকে তা বহন করতে আহবান করে, তবুও কেউ তা বহন করবে না; যদিও সে নিকট আত্মীয় হয়। তুমি কেবল তাদেরকেই সতর্ক করতে পার, যারা তাদের প্রতিপালককে না দেখে ভয় করে এবং যথাযথভাবে নামায পড়ে। যে কেউ পরিশুদ্ধ হয়, সে তো পরিশুদ্ধ হয় নিজেরই কল্যাণের জন্য। আর প্রত্যাবর্তন আল্লাহরই নিকট।" (ফাত্বিরঃ ১৮)

{إِن تَكْفُرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنكُمْ وَلَا يَرْضَى لِعِبَادِهِ الْكُفْرَ وَإِن تَشْكُرُوا يَرْضَهُ لَكُمْ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى ثُمَّ إِلَى رَبِّكُم مَّرْجِعُكُمْ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ}
"তোমরা অকৃতজ্ঞ হলে জেনে রাখ, আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন। তিনি তাঁর দাসদের অকৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন না। যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তাহলে তিনি তোমাদের কৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন। আর একের ভার অন্যে বহন করবে না। অতঃপর তোমাদের প্রতিপালকের নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন হবে এবং তোমরা যা করতে, তিনি তোমাদেরকে তা অবগত করাবেন। নিশ্চয়ই তিনি অন্তরে যা আছে, তা সম্যক অবগত।" (যুমার: ৭)

{أَفَرَأَيْتَ الَّذِي تَوَلَّى (۳۳) وَأَعْطَى قَلِيلاً وَأَكْدَى (٣٤) أَعِنْدَهُ عِلْمُ الْغَيْبِ فَهُوَ يَرَى (٣٥) أَمْ لَمْ يُنَبَّأَ بِمَا فِي صُحُفِ مُوسَى (٣٦) وَإِبْرَاهِيمَ الَّذِي وَفَّى (۳۷) أَلا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى (۳۸) وَأَنْ لَيْسَ لِلإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى (۳۹) وَأَنَّ سَعْيَهُ سَوْفَ يُرَى (٤٠) ثُمَّ يُجْزَاهُ الْجَزَاءَ الأوفى} (٤١) سورة النجم
"তুমি কি দেখেছ সে ব্যক্তিকে যে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং দান করে সামান্যই, পরে বন্ধ ক'রে দেয়? তার কি অদৃশ্যে জ্ঞান আছে যে, সে (সবকিছু) দেখতে পাচ্ছে? তাকে কি অবগত করা হয়নি, যা আছে মুসার কিতাবে এবং ইব্রাহীমের কিতাবে, যে পালন করেছিল তার দায়িত্ব? তা এই যে, কোন বহনকারী অপরের বোঝা বহন করবে না। আর এই যে, মানুষ তাই পায়, যা সে চেষ্টা করে। আর এই যে, তার কর্ম অচিরেই তাকে দেখানো হবে। অতঃপর তাকে দেওয়া হবে পূর্ণ প্রতিদান।" (নাজমঃ ৩৩-৪১)

লক্ষণীয় যে, উক্ত নীতি কেবল উম্মতে মুহাম্মাদীর বৈশিষ্ট্য নয়, বরং তা সকল উম্মতের জন্য সকল শরীয়তের ব্যাপক একটা নির্দেশ।
অবশ্য কেউ কারো পাপের কারণ হয়ে থাকলে অথবা পাপকার্যে সাহায্য করলে অথবা পাপ করতে আদেশ দিলে অথবা পাপ বর্জন করতে বাধা দিয়ে থাকলে সে তার শাস্তি পাবে। ইচ্ছা করলেও সে পাপীর পাপ নিজের ঘাড়ে নিতে পারবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلَّذِينَ آمَنُوا اتَّبِعُوا سَبِيلَنَا وَلْنَحْمِلْ خَطَايَاكُمْ وَمَا هُم بِحَامِلِينَ مِنْ خَطَايَاهُم مِّن شَيْءٍ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ (۱۲) وَلَيَحْمِلُنَّ أَثْقَالَهُمْ وَأَثْقَالًا مَّعَ أَثْقَالِهِمْ وَلَيُسْأَلُنَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَمَّا كَانُوا يَفْتَرُونَ } (۱۳) سورة العنكبوت
"অবিশ্বাসীরা বিশ্বাসীদেরকে বলে, 'তোমরা আমাদের পথ ধর; আমরা তোমাদের পাপভার বহন করব!' কিন্তু ওরা তো তোমাদের পাপভারের কিছুই বহন করবে না। ওরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। ওরা অবশ্যই নিজেদের পাপভার বহন করবে এবং তার সঙ্গে আরও কিছু পাপের বোঝা এবং ওরা যে মিথ্যা উদ্ভাবন করে, সে সম্পর্কে কিয়ামতের দিন অবশ্যই ওদেরকে প্রশ্ন করা হবে।" (আনকাবুতঃ ১২-১৩)

ড্রাইভিং না জেনে গাড়ি চালিয়ে আরোহীদের ক্ষতিগ্রস্ত করলে যেমন সে দায়ী হবে, তেমনি কেউ না জেনে নিজ কথা বা কর্ম দ্বারা অপরকে ভ্রষ্ট করলে তার পাপও সে বহন করবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{لِيَحْمِلُوا أَوْزَارَهُمْ كَامِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمِنْ أَوْزَارِ الَّذِينَ يُضِلُّونَهُم بِغَيْرِ عِلْمٍ أَلَا سَاءَ مَا يَزِرُونَ} (٢٥) سورة النحل
"(মিথ্যাজ্ঞান করার) ফলে কিয়ামত দিবসে তারা বহন করবে তাদের পাপভার পূর্ণমাত্রায় এবং তাদেরও পাপভার যাদেরকে তারা অজ্ঞতা হেতু বিভ্রান্ত করেছে। দেখ, তারা যা বহন করবে, তা কতই না নিকৃষ্ট।" (নাহলঃ ২৫)

মহানবী বলেছেন,
مَنْ أُفْتِي بِغَيْرِ عِلْمٍ كَانَ إِثْمُهُ عَلَى مَنْ أَفْتَاهُ ».
"বিনা ইলমে যাকে ফতোয়া দেওয়া হয় (এবং সেই ভুল ফতোয়া দ্বারা সে ভুলকর্ম করে) তবে তার পাপ ঐ মুফতীর উপর।" (আবু দাউদ ৩৬৫৯, হাকেম ৩৫০, সহীহুল জামে' ৬০৬৮নং)

তদনুরূপ পাপ যে আবিষ্কার করবে অথবা পাপের রীতি সর্বপ্রথম চালু করবে অথবা অপরাধের পথিকৃৎ হবে, সেও তার শাস্তি এবং উক্ত পাপে তার অনুবর্তী পাপীদের শাস্তি ভোগ করবে। মহানবী বলেছেন,
((مَنْ سَنَّ فِي الإسلام سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا ، وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا بَعْدَهُ، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصُ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْءٌ، وَمَنْ سَنَّ فِي الإِسْلامِ سُنَّةً سَيِّئَةً كَانَ عَلَيْهِ وَزْرُهَا ، وَوَزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ بَعْدِهِ ، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصُ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَيْءٌ )). رواه مسلم
"যে ব্যক্তি ইসলামে ভাল রীতি চালু করবে, সে তার নিজের এবং ঐ সমস্ত লোকের সওয়াব পাবে, যারা তার (মৃত্যুর) পর তার উপর আমল করবে। তাদের সওয়াবের কিছু পরিমাণও কম করা হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন মন্দ রীতির প্রচলন করবে, তার উপর তার নিজের এবং ঐ লোকদের গোনাহ বর্তাবে, যারা তার (মৃত্যুর) পর তার উপর আমল করবে। তাদের গোনাহর কিছু পরিমাণও কম করা হবে না।" (মুসলিম ২৩৯৮, নাসাঈ ২৫৫৪, ত্বাবারানী ২২৬২, ইবনে মাজাহ ২০৩, তিরমিযী ২৬৭৫নং)

((مَنْ سَنَّ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا مَا عَمِلَ بِهِ فِي حَيَاتِهِ وَبَعْدَ مَمَاتِهِ حَتَّى يَتْرُكَ، وَمَنْ سَنَّ سُنَّةً سَيِّئَةً فَعَلَيْهِ إِثْمُهَا حَتَّى يَتْرُكَ)).
"যে ব্যক্তি কোন ভালো রীতি প্রবর্তন করে তার জন্য নির্দিষ্ট সওয়াব রয়েছে, যতদিন সেই রীতির উপর আমল হতে থাকবে; তার জীবনকালে এবং তার মৃত্যুর পরেও; যতক্ষণ না তা বর্জন করেছে। আর যে ব্যক্তি কোন মন্দ রীতির প্রচলন করে তার জন্য রয়েছে তার নির্দিষ্ট পাপ, যতক্ষণ না সে রীতি (বা কর্ম) বর্জন করেছে।" (ত্বাবারানীর কাবীর ১৭৬৪৫, সহীহ তারগীব ৬২নং)

এই কারণেই পৃথিবীর প্রত্যেক খুনীর পাপের ভাগী হবে প্রথম খুনী কাবীল। মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ مِنْ نَفْسٍ تُقْتَلُ ظُلْماً إِلَّا كَانَ عَلَى ابْنِ آدَمَ الأَوَّلِ كِفْلٌ مِنْ دَمِهَا ، لأَنَّهُ كَانَ أَوَّلَ مَنْ سَنَّ القَتَلَ )).
"যে কোন প্রাণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হবে, তার পাপের একটা অংশ আদমের প্রথম সন্তান (কাবীল) এর উপর বর্তাবে। কেননা, সে হত্যার রীতি সর্বপ্রথম চালু করেছে।" (বুখারী ৩৩৩৫, মুসলিম ৪৪৭৩, তিরমিযী ২৬৭৩, নাসাঈ ৩৯৮৫, ইবনে মাজাহ ২৬১৬নং)

একই কারণে সুসংবাদ পুণ্যের পথিকৃৎদের জন্য এবং দুঃসংবাদ পাপের পথিকৃৎদের জন্য। মহানবী বলেছেন,
((إِنَّ هَذَا الْخَيْرَ خَزَائِنُ وَلِتِلْكَ الْخَزَائِنِ مَفَاتِيحُ فَطُوبَى لِعَبْدِ جَعَلَهُ اللَّهُ مِفْتَاحاً لِلْخَيْرِ مِغْلاقاً لِلشَّرِّ وَوَيْلٌ لِعَبْدٍ جَعَلَهُ اللَّهُ مِفْتَاحاً لِلشَّرِّ مِغْلاقاً لِلْخَيْرِ).
"এই মঙ্গলসমূহের রয়েছে বহু ভান্ডার। এই ভান্ডারগুলোর জন্য রয়েছে একাধিক চাবি। সুতরাং শুভসংবাদ সেই ব্যক্তির জন্য যাকে আল্লাহ মঙ্গলের (দরজা খোলার) চাবিকাঠি এবং অমঙ্গলের (দরজা বন্ধ করার) খিল করেছেন। আর ধ্বংস সেই বান্দার জন্য যাকে আল্লাহ অমঙ্গলের চাবিকাঠি ও মঙ্গলের (দরজা বন্ধ করার) খিল করেছেন।" (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ২৩৮, হিল্ল্যাহ ৮/৩২৯, সিঃ সহীহাহ ১৩৩২নং)

একজন অপরাধ করলে অন্যজনকে শাস্তি দেওয়া যাবে না, তার উদাহরণ রয়েছে কুরআন কারীমে। বিনয়ামীনকে কাছে রাখার জন্য ইউসুফ কৌশল ক'রে আপাতদৃষ্টিতে তাকে চোর প্রমাণিত করলেন। অতঃপর যখন ভাইয়েরা দেখল যে, বিনয়্যামীন চুরির অপরাধে শাস্তি স্বরূপ দাস হয়ে এখানেই থেকে যাবে, তখন তারা বলল, 'হে আযীয! এর পিতা আছেন অতিশয় বৃদ্ধ, সুতরাং এর স্থলে আপনি আমাদের একজনকে রাখুন! আমরা তো আপনাকে দেখছি মহানুভব ব্যক্তিদের একজন।'
কিন্তু মিসরের 'আযীয' উপাধিপ্রাপ্ত ইউসুফ বললেন,
مَعَادُ اللَّهِ أَن تَأْخُدْ إِلَّا مَن وَجَدْنَا مَتَاعَنَا عِندَهُ إِنَّا إِذًا لَّظَالِمُونَ} (۷۹) سورة يوسف
'যার নিকট আমরা আমাদের মাল পেয়েছি, তাকে ছাড়া অন্যকে রাখার অপরাধ হতে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি! এরূপ করলে আমরা অবশ্যই সীমালংঘনকারী (যালেম) হব।' (সূরা ইউসুফ: ৭৮-৭৯)

মূসা নবী-এর ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَاخْتَارَ مُوسَى قَوْمَهُ سَبْعِينَ رَجُلاً لِّمِيقَاتِنَا فَلَمَّا أَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَةُ قَالَ رَبِّ لَوْ شِئْتَ أَهْلَكْتَهُم مِّن قَبْلُ وَإِيَّايَ أَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ السُّفَهَاء مِنَّا إِنْ هِيَ إِلَّا فِتْنَتُكَ تُضِلُّ بِهَا مَن تَشَاء وَتَهْدِي مَن تَشَاء أَنتَ وَلِيُّنَا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الْغَافِرِينَ} (١٥٥)
"মূসা আপন সম্প্রদায় হতে সত্তর জন লোককে আমার প্রতিশ্রুতির সময়ে সমবেত হওয়ার জন্য মনোনীত করল। তারা যখন ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হল, তখন মুসা বলল, 'হে আমার প্রতিপালক! তুমি ইচ্ছা করলে পূর্বেই তো এদেরকে এবং আমাকেও ধ্বংস করতে পারতে। আমাদের মধ্যে যারা নির্বোধ তাদের কর্মদোষে কি তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করবে? এতো শুধু তোমার পরীক্ষা, যা দিয়ে তুমি যাকে ইচ্ছা বিপথগামী কর এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত কর। তুমিই তো আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা কর ও আমাদের প্রতি দয়া কর এবং তুমিই সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমাশীল।" (আ'রাফঃ ১৫৫)

যালেম ফিরআউনের কান্ড কে না জানে? সে যখন শুনল, বনী ইসরাঈলের একটি শিশু জন্ম নেবে এবং বড় হলে তার হাতে তার রাজত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন সে তাদের প্রত্যেক (ছেলে) শিশুকে হত্যা করতে লাগল। একটা শিশুর জায়গায় শত শত শিশু হত্যা করেছিল যালেম।
আমাদের সংসারেও দেখা যায়, অনেকে অপরাধীর জায়গায় তার কোন আত্মীয় অথবা বন্ধুকে শাস্তি দেয়। অপরাধী বোনকে বুনাই কষ্ট দিলে, তার বোন নিরপরাধ স্ত্রীকে কষ্ট দেয়। অপর দেশের বিজাতি লোকেরা স্বজাতির উপর অত্যাচার করলে, স্বদেশে বিজাতির উপর অত্যাচার ক'রে প্রতিশোধ নেয়।
কিন্তু প্রকৃত মুসলিম মহান স্রষ্টার উক্ত নীতির কথা মনে ও ধ্যানে রাখে। তাই সে কারো সাথে অন্যায়াচরণ করে না এবং একজনের অপরাধের শাস্তি অপরকে প্রদান করে না।
মহানবী বলেছেন,
ه لا يَجْنِي جَانِ إِلَّا عَلَى نَفْسِهِ ، لَا يَجْنِي وَالِدٌ عَلَى وَلَدِهِ ، وَلَا مَوْلُودٌ عَلَى وَالِدِهِ » .
"কোন অপরাধী অপরাধ করলে, তা তার নিজের উপর বর্তাবে। বাপের অপরাধ ছেলের উপর এবং ছেলের অপরাধ বাপের উপর বর্তাবে না।" (আহমাদ ১৬০৬৪, তিরমিযী ২১৫৯, ৩০৮৭, ইবনে মাজাহ ২৬৬৯, ৩০৫৫, সিঃ সহীহাহ ১৯৭৪নং)

মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক, তাহলে মহান আল্লাহ যখন দুনিয়াতে কোন সম্প্রদায়কে শায়েস্তা করেন, তখন তাদের মন্দের সাথে ভালোকেও কেন নিষ্পিষ্ট করেন? ঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প ইত্যাদি দ্বারা অপরাধী-নিরপরাধ সকলকে ধ্বংস করেন?
এর উত্তরে মনে রাখতে হবে যে, মহান আল্লাহ কোনভাবেই বান্দার প্রতি যুলুম করেন না। তিনি যখন কাউকে শাস্তি দেন, তখন নিশ্চয় তার কোন না কোন অপরাধ অবশ্যই থাকে।
অথবা ব্যাপক আযাবে নিরপরাধ ধ্বংস হলেও পরকালে নিরাপত্তা লাভ করে। বিশেষ ক'রে জাতির মধ্যে যখন অশ্লীলতা ব্যাপক হয়ে যায় এবং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নোংরামিতে বাধা দেওয়ার ইচ্ছাটুকুও মানুষের মন থেকে বিলীন হয়ে যায়, তখন ব্যাপক শাস্তি সকলকে গ্রাস করে। এ জন্যই মহান আল্লাহ সতর্ক ক'রে বলেছেন,
وَاتَّقُوا فِتْنَةً لَّا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنكُمْ خَاصَّةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ}
"তোমরা সেই ফিতনাকে ভয় কর, যা বিশেষ ক'রে তোমাদের মধ্যে যারা অত্যাচারী কেবল তাদেরই ক্লিষ্ট করবে না এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।" (আনফালঃ ২৫)

আবু বাক্স সিদ্দীক বলেন, 'হে লোক সকল! তোমরা এই আয়াত পড়ছ,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ} (١٠٥) سورة المائدة
"হে মু'মিনগণ! তোমাদের আত্মরক্ষা করাই কর্তব্য। তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও, তবে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে, সে তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।" (মায়েদাহঃ ১০৫)
কিন্তু আমি রাসূলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি,
((إِنَّ النَّاسَ إِذَا رَأَوُا الظَّالِمَ فَلَمْ يَأْخُذُوا عَلَى يَدَيْهِ أُوشَكَ أَنْ يَعُمَّهُمُ اللَّهُ بِعِقَابِ مِنْهُ)).
"যখন লোকেরা অত্যাচারীকে (অত্যাচার করতে) দেখবে এবং তার হাত ধরে না নেবে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের সকলকে (আমভাবে) তার শাস্তির কবলে নিয়ে নেবেন।" (আবু দাউদ ৪৩৪০, তিরমিযী ২১৬৮, ৩০৫৭, নাসাঈর কুবরা ১১১৫৭, ইবনে মাজাহ ৪০০৫নং)
আল্লাহর রসূল আরো বলেছেন,
((مَا مِنْ قَوْمٍ يَعْمَلُونَ بِالْمَعَاصِي ، وَفِيهِمْ رَجُلٌ أَعَزُّ مِنْهُمْ وَأَمْنَعُ ، لَا يُغَيِّرُونَ إِلَّا عَمَّهُمُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ بِعِقَابٍ)).
"যে সম্প্রদায় যখন বিভিন্ন পাপাচারে লিপ্ত হয়, তখন তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তি থাকে, যার বাধা দেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি তারা তাদেরকে বাধা না দেয় (এবং ঐ পাপাচরণ বন্ধ না করে), তাহলে (তাদের জীবদ্দশাতেই) মহান আল্লাহ তাদেরকে ব্যাপকভাবে তাঁর কোন শাস্তি ভোগ করান।" (আহমাদ ৪/৩৬৪, আবু দাউদ ৪৩৩৯, ইবনে মাজাহ ৪০০৯, ইবনে হিব্বান, সহীহ আবু দাউদ ৩৬৪৬ নং)
অন্য শব্দে, "যে কোন সম্প্রদায়ে যখন পাপাচার চলতে থাকে, তখন তারা প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও যদি বন্ধ করার লক্ষ্যে কোন চেষ্টা-সাধনা না করে, তাহলে আল্লাহ ব্যাপকভাবে তাদের মাঝে আযাব প্রেরণ করে থাকেন।" (সহীহ ইবনে মাজাহ ৩২৩৮নং)

হ্যাঁ, অশ্লীলতা সমাজে ব্যাপকতা লাভ করলে সেই সমাজের নেক লোকেরাও রেহাই পাবে না। উম্মুল মু'মিনীন উম্মুল হাকাম যয়নাব বিনতে জাহশ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, একদা নবী তাঁর নিকট শঙ্কিত অবস্থায় প্রবেশ করলেন। তিনি বলছিলেন, "আল্লাহ ব্যতীত কেউ সত্য উপাস্য নেই, আরবের জন্য ঐ পাপ হেতু সর্বনাশ রয়েছে যা সন্নিকটবর্তী। আজকে ইয়া'জুজ-মা'জুজের দেওয়াল এতটা খুলে দেওয়া হয়েছে।" এবং তিনি (তার পরিমাণ দেখানোর জন্য) নিজ বৃদ্ধা ও তর্জনী দুই আঙ্গুল দ্বারা (গোলাকার) বৃত্ত বানালেন। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের মাঝে সৎলোক মওজুদ থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হব?' তিনি বললেন, “হ্যাঁ, যখন নোংরামি বেশী হবে।” (বুখারী ৩৩৪৬, ৩৫৯৮, মুসলিম ৭৪১৬-৭৪১৮নং)
অপরাধীর সাথে নিরপরাধ মানুষ কখন কীভাবে ধ্বংস হয়, তার একটি সুন্দর উদাহরণ দিয়ে মহানবী বলেছেন, "আল্লাহর নির্ধারিত সীমায় অবস্থানকারী (সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে বাধাদানকারী) এবং ঐ সীমা লংঘনকারী (উক্ত কাজে তোষামোদকারীর) উপমা হল এক সম্প্রদায়ের মত; যারা একটি দ্বিতলবিশিষ্ট পানি-জাহাজে লটারি ক'রে কিছু লোক উপর তলায় এবং কিছু লোক নিচের তলায় স্থান নিল। (নিচের তলা সাধারণতঃ পানির ভিতরে ডুবে থাকে। তাই পানির প্রয়োজন হলে নিচের তলার লোকদেরকে উপর তলায় যেতে হয় এবং সেখান হতে সমুদ্র বা নদীর পানি তুলে আনতে হয়।) সুতরাং পানির প্রয়োজনে নিচের তলার লোকেরা উপর তলায় যেতে লাগল। (উপর তলার লোকদের উপর পানি পড়লে তারা তাদের উপর ভাগে আসা অপছন্দ করল। তারা বলেই দিল, 'তোমরা নিচে থেকে আমাদেরকে কষ্ট দিতে এসো না।') নিচের তলার লোকেরা বলল, 'আমরা যদি আমাদের ভাগে (নিচের তলায় কোন স্থানে) ছিদ্র ক'রে দিই, তাহলে (দিব্যি আমরা পানি ব্যবহার করতে পারব) আর উপর তলার লোকদেরকে কষ্টও দেব না। (এই পরিকল্পনার পর তারা যখন ছিদ্র করতে শুরু করল) তখন যদি উপর তলার লোকেরা তাদেরকে নিজ ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয় (এবং সে কাজে বাধা না দেয়), তাহলে সকলেই (পানিতে ডুবে) ধ্বংস হয়ে যায়। (উপর তলার লোকেরা সে অন্যায় না করলেও রেহাই পেয়ে যাবে না।) পক্ষান্তরে উপর তলার লোকেরা যদি তাদের হাত ধরে (জাহাজে ছিদ্র করতে) বাধা দেয়, তাহলে তারা নিজেরাও বেঁচে যায় এবং সকলকেই বাঁচিয়ে নেয়।" (বুখারী ২৪৯৩, ২৬৮৬, তিরমিযী ২১৭৩নং)

ইসলামের উক্ত নীতির নিরিখে জারজ সন্তানের কোন পাপ নেই। তার জনক-জননীর পাপ তার ভাগ ও ভাগ্যে আসতে পারে না।
কিন্তু সহীহ হাদীসে আছে,
((وَلَدُ الزِّنَا شَرُّ الثَّلَاثَة)).
অর্থাৎ, জারজ সন্তান তিন জনের একজন নিকৃষ্ট। (আহমাদ ২/৩১১, আবু দাউদ ৩৯৬৩নং, ত্বাহাবী, হাকেম ২/২১৪, বাইহাক্বী ১০/৫৭, ৫৯, সিঃ সহীহাহ ৬৭২নং)
অবশ্য সে হাদীসের ব্যাখ্যা রয়েছে। এক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, যখন সে তার জনক-জননীর মতো কর্ম করে।
অন্য এক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, আসলে হাদীসটি এক মুনাফিকের ব্যাপারে বলা হয়েছে, যে মুনাফিক জারজ সন্তান ছিল এবং সে নবী -কে কষ্ট দিত। অথবা তার অর্থ হল, সাধারণতঃ অবৈধ সন্তান তার জনক-জননীর মতোই ব্যভিচারী হয়ে গড়ে ওঠে। সুতরাং তার পরিণামও তাদের মতোই মন্দ হয়।

অনুরূপ আরও একটি হাদীস কুরআনের উক্ত নীতির বিরোধী মনে হতে পারে। মহানবী বলেছেন,
(( المَيِّتُ يُعَذِّبُ فِي قَبْرِهِ بِمَا نِيحَ عَلَيْهِ )) . وَفِي رواية : (( مَا نِيحَ عَلَيْهِ )) .
"মৃত ব্যক্তিকে তার কবরের মধ্যে তার জন্য মাতম ক'রে কান্না করার দরুন শাস্তি দেওয়া হয়।" (বুখারী ১২৯২, মুসলিম ২১৮২নং) অন্য এক বর্ণনায় আছে, যতক্ষণ তার জন্য মাতম ক'রে কান্না করা হয়, (ততক্ষণ মৃতব্যক্তির আযাব হয়।) (আবু য়‍্যা'লা ১৫৬, বায্যার ১৪৬নং)
মৃতের আত্মীয়রা তার জন্য মাতম ক'রে কান্না করলে কবরে বা কিয়ামতে তার আযাব হবে কেন?
এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, আসলে আযাবটা হবে তার নিজের দোষেই। যেহেতু সে জানত যে, সে মারা গেলে তার আত্মীয়রা তার জন্য মাতম ক'রে কাঁদবে অথচ সে তাদেরকে নিষেধ ক'রে যায়নি। অথবা হাদীসটি কোন মৃত কাফেরের ব্যাপারে উক্ত হয়েছে। আর আল্লাহই অধিক জানেন।

কুরআনী উক্ত নীতি থেকে এ কথা ভ্রম ও ভ্রান্ত প্রমাণিত হয় যে, পিতা অথবা মাতার কোন পাপের কারণে সন্তান হতভাগ্য বা বিকলাঙ্গ হয়ে জন্ম নেয়।
মোট কথা, কোন মানুষই অন্যের পাপ বহন করবে না এবং অন্যের কৃত পাপের শাস্তিও কেউ ভোগ করবে না। কুরআনের অন্য আয়াতও সে কথারই সাক্ষ্য বহন করে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ) (۲۱) سورة الطور
"প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়বদ্ধ।" (তুরঃ ২১)
{كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ) (۳۸) سورة المدثر
"প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ।" (মুদ্দাষিরঃ ৩৮)
প্রত্যেক মানুষ নিজ নিজ কৃতকর্ম অনুযায়ী শান্তি অথবা শাস্তি ভোগ করবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَكُلَّ إِنسَانِ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنشُورًا} (۱۳)
"প্রত্যেক মানুষের কৃতকর্ম আমি তার গ্রীবালগ্ন করেছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব এক কিতাব, যা সে উন্মুক্ত পাবে।" (বানী ইস্রাঈলঃ ১৩)
তাছাড়া কিয়ামতের দিন?
{ يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ (٣٤) وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ (٣٥) وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ (٣٦) لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ } (۳۷) عبس
"সেদিন মানুষ পলায়ন করবে আপন ভ্রাতা হতে এবং তার মাতা ও তার পিতা হতে, তার পত্নী ও তার সন্তান হতে। সেদিন তাদের প্রত্যেকের এমন গুরুতর অবস্থা হবে, যা নিজেকে সম্পূর্ণরূপে ব্যস্ত রাখবে।" (আবাসাঃ ৩৪-৩৭)

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 পাপ বর্জন করার নির্দেশ

📄 পাপ বর্জন করার নির্দেশ


পাপ মানব-জীবনের বড় অভিশাপ। পাপ থেকে দূরে থাকতে আদেশ করেছেন সৃষ্টিকর্তা। আদম সৃষ্টির শুরু থেকেই আদম ও তাঁর বংশধরকে অবাধ্যাচরণ ও পাপাচরণ থেকে মুক্ত থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে। মানুষের সামনে অথবা পিছনে, প্রকাশ্যে বা গোপনে কৃত কোন প্রকার পাপকে প্রশ্রয় দেয় না ইসলাম। কুরআন সে কথার ঘোষণা দিতে আদেশ দিয়ে বলেছে,
{قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَن تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَن تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ} (۳۳)
"বল, 'আমার প্রতিপালক নিষিদ্ধ করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতাকে, পাপাচারকে ও অসংগত বিদ্রোহকে এবং কোন কিছুকে আল্লাহর অংশী করাকে, যার কোন দলীল তিনি প্রেরণ করেননি এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কিছু বলাকে (নিষিদ্ধ করেছেন), যে সম্পর্কে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই।" (আ'রাফঃ ৩৩)

মহান প্রতিপালক পাপীকে পাপ বর্জন করার আদেশ দিয়ে বলেছেন,
{ وَدْرُوا ظَاهِرَ الإِثْمِ وَبَاطِنَهُ إِنَّ الَّذِينَ يَكْسِبُونَ الإِثْمَ سَيُجْزَوْنَ بِمَا كَانُوا يَقْتَرِفُونَ}
"তোমরা প্রকাশ্য এবং গোপন পাপ বর্জন কর। যারা পাপ করে, তাদের পাপের সমুচিত শাস্তি তাদেরকে দেওয়া হবে।" (আনআমঃ ১২০)

কখনো তিনি পাপ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالأَزْلامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (৯০) سورة المائدة
"হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা হতে দূরে থাক, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।" (মায়িদাহঃ ৯০)
{فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْتَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ} (৩০) سورة الحج
"সুতরাং তোমরা দূরে থাক মূর্তিরূপ অপবিত্রতা হতে এবং দূরে থাক মিথ্যা কথন হতে।" (হাজ্জ: ৩০)
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ} (১২) الحجرات
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা বহুবিধ ধারণা হতে দূরে থাক; কারণ কোন কোন ধারণা পাপ।" (হুজুরাতঃ ১২)

অনুরূপ মহানবী ﷺ বলেছেন,
اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ ..
"সাতটি সর্বনাশী কর্ম হতে দূরে থাক।" (বুখারী ২৭৬৬, ৬৮৫৭, মুসলিম ২৭২নং, আবু দাউদ, নাসাঈ)

অনেক সময় সতর্ক ও সাবধান ক'রে পাপ থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে,
((إِيَّاكُمْ وَمُحَقَّرَاتِ الذُّنُوبِ)).
"তোমরা ছোট ছোট তুচ্ছ পাপ থেকেও দূরে থেকো। (আহমাদ ২২৩০৮, ত্বাবারানী ৫৭৩৯, বাইহাকীর শুআবুল ইমান, সহীহুল জামে' ২৬৮৬নং)

অনেক ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, তোমরা পাপের নিকটবর্তী হয়ো না। পাপের ভূমিকায় যেয়ো না বা তার প্রথম ধাপেও পা দিয়ো না।
{وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبيلاً) (৩২) سورة الإسراء
"তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।" (বানী ইস্রাঈল: ৩২)
{وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْؤُولاً) (৩৪) سورة الإسراء
"সাবালক না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্যে ছাড়া এতীমের সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না। আর প্রতিশ্রুতি পালন করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।" (বানী ইস্রাঈল: ৩৪)

আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরাসরি পাপে লিপ্ত হতে নিষেধ করা হয়েছে। অনেক সময়ে পাপের শাস্তি ঘোষণা ক'রে পাপ থেকে শঙ্কিত হতে আহবান করা হয়েছে।
অনেক সময় তওবার আহবান জানানো হয়েছে। যারা অবাধ্যাচরণ ক'রে আল্লাহর দরবার থেকে দূরে চলে গেছে, তাদেরকে পুনরায় ফিরে আসার তাকীদ দেওয়া হয়েছে। সেই সাথে ক্ষমা করার অঙ্গীকারও করা হয়েছে।
উদ্দেশ্য হল, হে মানুষ! তুমি পৃথিবী আবাদ কর আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য দিয়ে। পৃথিবীকে পাপমুক্ত কর। পাপের কালিমা থেকে এ পৃথিবীকে পবিত্র ও পরিষ্কার কর। লাভ মানুষেরই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00