📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 পাপের শাস্তি জাহান্নামে

📄 পাপের শাস্তি জাহান্নামে


জাহান্নাম পরকালের এক নিকৃষ্টতম বাসস্থান। যা আল্লাহপাক ধর্মদ্রোহী, সত্য-প্রত্যাখ্যানকারী। অবিশ্বাসী, কাফের, মুশরিক, মুনাফিক এবং পাপীদের জন্য সৃষ্টি করে রেখেছেন। যেখানে তারা স্ব-স্ব কৃতকর্মের শাস্তিমূলক প্রতিফল ভোগ করবে।
পার্থিব জীবনে কাফেররা সাধারণতঃ শীতল বায়ু, ছায়া এবং শীতল পানীয় দ্বারা বিলাসিতায় মগ্ন হয়ে পুনরুত্থান বা পরকালকে অবিশ্বাস করে অনমনীয়ভাবে ঘোরতর পাপে লিপ্ত থাকে। তাই সেদিন তার প্রতিফল স্বরূপ জাহান্নাম হতে সেবন করবে---অত্যুষ্ণ বায়ু, পান করবে উত্তপ্ত পানি এবং অবস্থান করবে (জাহান্নামের) কৃষ্ণবর্ণ ধূমের ছায়ায়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
"বাম হাত-ওয়ালারা, কত হতভাগা বাম হাত-ওয়ালারা! তারা থাকবে অতি গরম বায়ু ও উত্তপ্ত পানিতে।
কালোবর্ণ ধোঁয়ার ছায়ায়। যা শীতলও নয়, আরামদায়কও নয়। ইতিপূর্বে তারা তো মগ্ন ছিল ভোগ-বিলাসে। এবং অবিরাম লিপ্ত ছিল ঘোরতর পাপকর্মে। তারা বলত, 'মরে হাড় ও মাটিতে পরিণত হলেও কি আমরা অবশ্যই পুনরুত্থিত হব? এবং আমাদের পূর্ব-পুরুষগণও?" (ওয়াক্বিআহঃ ৪১-৪৮)

জাহান্নামীদের খাদ্যঃ
১। যন্ত্রণাদায়ক যাক্কুম বৃক্ষ: মহান আল্লাহ বলেছেন, "আপ্যায়নের জন্য কি এটিই উত্তম, না যাক্কুম বৃক্ষ? সীমালংঘনকারীদের জন্য আমি এ সৃষ্টি করেছি পরীক্ষাস্বরূপ; এ বৃক্ষ জাহান্নামের তলদেশ হতে উদ্‌গত হয়, এর মোচা শয়তানের মাথার মত। সীমালংঘনকারীরা তা ভক্ষণ করবে এবং তা দিয়ে উদর পূর্ণ করবে। তার উপর অবশ্যই ওদের জন্য ফুটন্ত পানির মিশ্রণ থাকবে। অতঃপর অবশ্যই ওদের প্রত্যাবর্তন হবে জাহান্নামের দিকে।" (স্বাফফাত ৪৬২-৬৮)
"তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাক্কুম বৃক্ষ হতে। এবং ওটা দ্বারা তোমরা উদর পূর্ণ করবে। তারপর তোমরা পান করবে ফুটন্ত পানি। পান করবে পিপাসার্ত উটের ন্যায়। কিয়ামতের দিন এটাই হবে তাদের আতিথ্য।" (ওয়াক্বিআহঃ ৫২-৫৬)
"নিশ্চয়ই যাক্কুম গাছ হবে পাপিষ্ঠের খাদ্য; গলিত তামার মতো তা পেটের ভিতর ফুটতে থাকবে, গরম পানি ফুটার মতো। (আল্লাহ ফিরিস্তাকে বলবেন,) ওকে ধর এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে। অতঃপর ওর মাথায় ফুটন্ত পানি ঢেলে দিয়ে শাস্তি দাও---(এবং বল,) আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, সম্ভ্রান্ত। এটা তো সেই (শাস্তি) যার সম্পর্কে তোমরা সন্দেহ করতে।" (দুখানঃ ৪৩-৫০)
ঐ যাক্কুমের সামান্য পরিমাণ যদি জাহান্নাম হতে পৃথিবীতে আসে, তবে পৃথিবীর খাদ্য ও পানীয় তার বিষাক্ততায় বিনষ্ট হয়ে যাবে। (তিরমিযী ২৫৮৫নং)
২। যারী': এক প্রকার কন্টকময় বিষাক্ত গুল্ম। যা জাহান্নামীরা ভক্ষণ করবে। যাতে তারা পুষ্টও হবে না এবং তাদের ক্ষুধাও নিবৃত্ত হবে না। (গাশিয়াহ ৬-৭)
৩। গলায় আটকে যায় এমন খাদ্য। (মুয্যাম্মিলঃ ১৩)
৪। গিসলীনঃ জাহান্নামীদের ক্ষতনিঃসৃত স্রাব। (হাক্কাহঃ ৩৬)

জাহান্নামীদের পানীয়ঃ
১। হামীম: অত্যুষ্ণ ফুটন্ত পানি। (ওয়াক্বিআহঃ ৫৪, ৯৩) যা পান করলে জাহান্নামীদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। (মুহাম্মাদঃ ১৫)
২। গাস্সাক: অতিশয় দুর্গন্ধময় তিক্ত অথবা নিরতিশয় শীতল পানীয়। (স্বাদঃ ৫৭, নাবাঃ ২৫)
৩। সাদীদ: জাহান্নামীদের পচনশীল ক্ষত-নির্গত পুঁজ-রক্ত বা ঘাম; যা তাদেরকে পান করতে দেওয়া হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন, "তাদের প্রত্যেকের সম্মুখে রয়েছে জাহান্নাম এবং প্রত্যেককে পান করানো হবে পুঁজমিশ্রিত পানি। যা সে অতি কষ্টে এক ঢোক এক ঢোক করে গিলতে থাকবে এবং তা গিলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে; সর্বদিক হতে তার নিকট আসবে মৃত্যু-যন্ত্রণা, কিন্তু তার মৃত্যু ঘটবে না এবং তার পরে থাকবে কঠোর শাস্তি।" (ইব্রাহীমঃ ১৬-১৭)
৪। গলিত ধাতু অথবা তৈলকিটের ন্যায় কৃষ্ণবর্ণ, গাঢ় ও দুর্গন্ধময় পানীয়ঃ "তারা পানীয় চাইলে তাদেরকে দেওয়া হবে গলিত ধাতুর ন্যায় পানীয়; যা তাদের মুখমন্ডল দগ্ধ করবে; কত নিকৃষ্ট সেই পানীয় এবং কত নিকৃষ্ট সেই (অগ্নির) আশ্রয়স্থল।" (কাহফঃ ২৯)
জাহান্নামীদের পোষাক হবে আলকাতরা, (ইব্রাহীমঃ ৫০) লোহা এবং আগুনের। তাদের মাথার উপর ফুটন্ত পানি ঢালা হবে, যাতে ওদের চামড়া এবং ওদের উদরে যা আছে তা গলে যাবে। আর ওদের জন্য থাকবে লৌহ-মুদগর বা সাঁড়াশি। যখনই ওরা যন্ত্রণাকাতর হয়ে জাহান্নাম হতে বের হতে চাইবে, তখনই তাদেরকে আবার ওখানেই ফিরিয়ে দিয়ে বলা হবে, 'আস্বাদ কর দহন যন্ত্রণা!' (হাজ্জঃ ১৯-২২)

জাহান্নামীদের জন্য প্রস্তুত রয়েছে ৪ শৃঙ্খল। (দাহর: ৪) যার দৈর্ঘ্য সত্তর হাত। (হাক্কাহঃ ৩২) এবং ওদের গলদেশে বেড়ি পরানো হবে। (সাবাঃ ৩৩) আর ওদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে পদবেড়িও। (মুয্যাম্মিলঃ ১২)
অধিক ও চিরস্থায়ী শাস্তি আস্বাদন করাবার জন্য যখনই অগ্নিদাহে তাদের চর্ম দগ্ধ হবে, তখনই ওর স্থলে নূতন চর্ম সৃষ্টি করা হবে। (নিসাঃ ৫৬)
তেমনি তাদের দেহের স্থূলতা অত্যন্ত বৃদ্ধি করা হবে। একজন কাফেরের দুই স্কন্ধের মধ্যবর্তী অংশ দ্রুতগামী আরোহীর তিন দিনের পথ-সম দীর্ঘ হবে! একটি দাঁত উহুদ পর্বতসম এবং তার চর্মের স্থূলতা হবে তিনদিনের পথ! (মুসলিম ২৮৫১-২৮৫২নং) অথবা বিয়াল্লিশ হাত। আর জাহান্নামে তার অবস্থান ক্ষেত্র হবে মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী স্থান বরাবর। (অর্থাৎ ৪২৫ কিমিঃ।) (তিরমিযী ২৫৭৭, মুসনাদ আহমাদ ২/২৬) এসব বিচিত্র হলেও আল্লাহর কাছে অবাস্তবতার কিছু নেই।
অগ্নির বেষ্টনী জাহান্নামীদেরকে পরিবেষ্টন ক'রে রাখবে। (কাহফঃ ২৯) অগ্নিদগ্ধে ওদের মুখমন্ডল বীভৎস হয়ে যাবে। (মু'মিনুনঃ ১০৪)
জাহান্নামে উটের মত বৃহদাকার এমন সর্প আছে, যদি তা একবার কাউকে দংশন করে, তবে চল্লিশ বছর তার বিষাক্ত যন্ত্রণা বিদ্যমান থাকবে। খচ্চরের মত এমন বড় বড় বিছা আছে যার দংশন-জ্বালা চল্লিশ বছর বর্তমান থাকবে। (মুসনাদ আহমাদ ৪/১৯১)
দোযখে কাফেরদেরকে উল্টা ক'রে মুখের উপর ভর দিয়ে টানা হবে। (কামারঃ ৪৮) যারা কোন অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করে, জাহান্নামে সে সেই অস্ত্র নিয়েই চিরদিন নিজেকে আঘাত করতে থাকবে। যে বিষপান ক'রে নিজের জীবননাশ করে, জাহান্নামে সে সেই বিষ চিরদিন পান করতে থাকবে। যে পাহাড়ের উপর থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে, সে জাহান্নামে চিরদিন ঐভাবে পড়তে থাকবে। (বুখারী ৫৭৭৮, মুসলিম ১০৯নং)
কেউ কেউ নিজের নাড়িভুড়ি ছেঁচড়ে টেনে নিয়ে বেড়াবে। কোন কোন কাফেরকে হস্তপদ শৃঙ্খলিত অবস্থায় জাহান্নামের কোন সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে। তখন তারা সেখানে নিজেদের ধ্বংস কামনা করবে। তখন ওদের বলা হবে, 'আজ তোমরা একবারের জন্য ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হওয়ার কামনা করতে থাক।' (ফুরক্বানঃ ১৩-১৪)
জাহান্নামে অনেকের তার পায়ের গাঁট পর্যন্ত, কারো হাঁটু পর্যন্ত, কারো কোমর পর্যন্ত এবং কারো গলা পর্যন্ত অগ্নিদগ্ধ হবে। (মুসলিম ২৮৪৫)

জাহান্নামের সবচেয়ে ছোট আযাবঃ জাহান্নামীকে আগুনের তৈরী একজোড়া জুতা পরানো হবে, যার তাপে মাথার মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকবে। এই আযাব নবী -এর পিতৃব্য আবু তালেবকে দেওয়া হবে। (মুসলিম ২১২, মিশকাত ৫৬৬৭)
আযাবের কঠিনতায় জাহান্নামীরা ভীষণ চীৎকার ও আর্তনাদ করতে থাকবে। (হ্রদঃ ১০৬) কিন্তু ওরা তো স্থায়ীভাবে জাহান্নামে শাস্তি ভোগ করবে। ওদের শাস্তি লাঘব করা হবে না এবং ওরা শাস্তি ভোগ করতে করতে হতাশ হয়ে পড়বে। (যুখরুফ : ৭৪-৭৫) ওদের মৃত্যুরও আদেশ দেওয়া হবে না, যে ওরা মরবে। ওরা আর্তনাদ করে বলবে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে নিষ্কৃতি দাও, আমরা সৎকাজ করব। পূর্বে যা করতাম তা আর করব না।' আল্লাহ বলবেন, 'আমি কি তোমাদেরকে এত দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে, তখন কেউ সতর্ক হতে চাইলে সতর্ক হতে পারত? তোমাদের নিকটে তো সতর্ককারীও এসেছিল। সুতরাং শাস্তি আস্বাদন কর; যালেমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।" (ফাত্বির: ৩৬-৩৭) ওরা আরো বলবে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! দুর্ভাগ্য আমাদেরকে ঘিরে ছিল এবং আমরা পথভ্রষ্ট হয়েছিলাম। হে আমাদের প্রতিপালক! এ অগ্নি হতে আমাদেরকে উদ্ধার কর, অতঃপর আমরা যদি পুনরায় কুফরী (অবিশ্বাস) করি, তবে তো আমরা অবশ্যই সীমা লংঘনকারী (যালেম) হব।' আল্লাহ বলবেন, 'তোরা হীন অবস্থায় এখানেই থাক এবং আমার সঙ্গে কোন কথা বলিস না। আমার বান্দাদের মধ্যে একদল ছিল যারা বলত, হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা ঈমান এনেছি (বিশ্বাস স্থাপন করেছি) তুমি আমাদের ক্ষমা কর ও দয়া কর, তুমি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। কিন্তু তাদেরকে (মুমিন দলকে) নিয়ে তোমরা উপহাস (ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ) করতে এত বিভোর ছিলে যে, তা তোমাদেরকে আমার কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল। তোমরা তো তাদের (ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের) কে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করতে। আমি আজ তাদের ধৈর্যের কারণে তাদেরকে এমনভাবে পুরস্কৃত করলাম যে, তারাই হল সফলকাম।" (মু’মিনুনঃ ১০৬-১১০)
"ওরা অসহ্য যন্ত্রণায় মৃত্যু কামনা করবে এবং চীৎকার করে বলবে, হে মালেক (দোযখের অধিকর্তা)! তোমার প্রতিপালক আমাদেরকে নিঃশেষ করে দিন।' সে বলবে, 'তোমরা তো এভাবেই অবস্থান করবে।' আল্লাহ বলবেন, 'আমি তো তোমাদের নিকট সত্য পৌঁছায়ে ছিলাম, কিন্তু তোমাদের অধিকাংশই তো সত্য বিমুখ ছিল।" (যুখরুফঃ ৭৭-৭৮)
জাহান্নামীরা কেঁদে এত অশ্রু ঝরাবে যে, তাতে নদী প্রবাহিত হবে এবং তার উপর নৌকা চলাও সম্ভব হবে। তারা রক্তের অশ্রুও ঝরাবে। (সঃ জামে' ২০৩২নং) গোনাহগার তাওহীদবাদী মুসলিমগণ নিজ নিজ গোনাহের পরিমাণ অনুযায়ী কিছুকাল জাহান্নামে শাস্তি ভোগ করবে। অতঃপর আল্লাহর রহমতে এবং শাফাআতকারীর শাফাআতে তাওহীদের গুণে জাহান্নাম থেকে অব্যাহতি পেয়ে জান্নাতবাসী হবে। কিন্তু জাহান্নামের দাগ থেকে যাবে তাদের দেহে। দোযখের অধিকাংশ অধিবাসী হবে নারী। (বুখারী ৬৫৪৬, মুসলিম ৭৯নং)
জাহান্নামে অধিকাংশ মানব-দানব নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। তুমি কি পূর্ণ হয়ে গেছ? জাহান্নাম বলবে, 'আরও আছে কি?' (কাফ: ৩০) তখন আল্লাহ পাক নিজের কদম (পা) দোযখে রাখবেন। তখন সংকুচিত হয়ে সে বলবে, 'ব্যস, ব্যস্।' (বুখারী ৭৩৮৪, মুসলিম ২৮৪৮নং)

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 মহাপাপী কি কাফের ও চিরস্থায়ী জাহান্নামী?

📄 মহাপাপী কি কাফের ও চিরস্থায়ী জাহান্নামী?


আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি যে, পাপ সাধারণতঃ ৩ প্রকার: অতি মহাপাপ, মহাপাপ ও উপপাপ।
এও জেনেছি যে, অতি মহাপাপের পাপী কাফের এবং তওবা ক'রে মারা না গেলে চিরস্থায়ী জাহান্নামী। আর উপপাপ বিভিন্ন নেক আমলের কারণে মোচন হয়ে যায়।
বাকী থাকল মহাপাপের পাপী। সে কি কাফের এবং তওবা ক'রে না মরলে পরকালে চিরস্থায়ী জাহান্নামী? কিছু দলীল দ্বারা বোঝা যায় যে, যে কাবীরা গোনাহ করবে, সে কাফের হয়ে যাবে এবং সে চিরস্থায়ী জাহান্নামবাসী হবে। যেমনঃ-
মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا } (۹۳) সূরা নিসা।
"যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন বিশ্বাসীকে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম। সেখানে সে চিরকাল থাকবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে অভিসম্পাত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত ক'রে রাখবেন।" (নিসাঃ ৯৩)

{الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسَّ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا وَأَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا فَمَن جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّهِ فَانتَهَى فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ وَمَنْ عَادَ فَأُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ}
"যারা সূদ খায় তারা (কিয়ামতে) সেই ব্যক্তির মত দন্ডায়মান হবে, যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল ক'রে দিয়েছে। তা এ জন্য যে তারা বলে, 'ব্যবসা তো সূদের মতই।' অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ ও সুদকে অবৈধ করেছেন। অতএব যার কাছে তার প্রতিপালকের উপদেশ এসেছে, তারপর সে (সূদ খাওয়া থেকে) বিরত হয়েছে, সুতরাং (নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বে) যা অতীত হয়েছে, তা তার (জন্য ক্ষমার্হ হবে), আর তার ব্যাপার আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। কিন্তু যারা পুনরায় (সূদ খেতে) আরম্ভ করবে, তারাই দোযখবাসী; সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।" (বাক্বারাহঃ ২৭৫)

{وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ} (৪৪) সূরা মায়িদাহ
"আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই অবিশ্বাসী (কাফের)।" (মায়িদাহঃ ৪৪)

মহানবী বলেছেন,
(( مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السَّلاحَ فَلَيْسَ مِنَّا ، وَمَنْ غَشَنَا فَلَيْسَ مِنَّا )) .
"সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমাদের উপর অস্ত্র তোলে। আর যে আমাদেরকে ধোঁকা দেয়, সেও আমাদের দলভুক্ত নয়।" (মুসলিম ২৯৪-২৯৫, ইবনে মাজাহ ২২২৪, তিরমিযী ১৩১৫, আবু দাউদ ৩৪৫২নং)
উক্ত হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, যে ব্যক্তি নবী বা মুসলিমদের দলভুক্ত নয়, সে কাফের।

لا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَسْرِقُ السَّارِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ ..
"কোন ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে ব্যভিচার করতে পারে না। কোন চোর যখন চুরি করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে চুরি করতে পারে না এবং কোন মদ্যপায়ী যখন মদ্যপান করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে মদ্যপান করতে পারে না।" (বুখারী ২৪৭৫, মুসলিম ২১১নং, আসহাবে সুনান)
উক্ত হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, উক্ত শ্রেণীর অপরাধীরা ঐ সকল অপরাধ করলে মু'মিন থাকে না।

سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ ..
"মুসলিমকে গালাগালি করা ফাসেকী এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা কুফরী।" (বুখারী ৪৮, মুসলিম ২৩০নং)

(( اثْنَتَانِ فِي النَّاسِ هُمَا بِهِمْ كُفْرُ : الطَّعْنُ فِي النَّسَبِ ، وَالنِّيَاحَةُ عَلَى الْمَيِّتِ )).
"মানুষের মধ্যে দুটো আচরণ এমন পাওয়া যায়, যা তাদের ক্ষেত্রে কুফরী; বংশে খোঁটা দেওয়া ও মৃতের জন্য মাতম ক'রে কান্না করা।" (মুসলিম ২৩৬নং)

এ ছাড়া অনুরূপ আরো হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, কাবীরা গোনাহ করলে মুসলিম কাফের হয়ে যায়। অনেক এমন হাদীস রয়েছে, যা পড়লে মনে হয়, কাবীরা গোনাহ করলে জান্নাত প্রবেশ করা যায় না।
(( لَا يَدْخُلُ الجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ ))
"যার অন্তরে অণু পরিমাণও অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (মুসলিম ২৭৫নং)

(( وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ ، وَاللَّهِ لا يُؤْمِنُ ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ ! )) قِيلَ : مَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ ؟ قَالَ : (( الَّذِي لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ ! )). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়।" জিজ্ঞেস করা হল, 'কোন ব্যক্তি? হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকে না।"
মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদে থাকে না। (বুখারী ৬০১৬, মুসলিম ১৮১নং)

(( مَن ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ غَيْرُ أَبِيهِ ، فَالجَنَّةُ عَلَيْهِ حَرَامٌ )). متفق عَلَيْهِ
"যে ব্যক্তি নিজ পিতা ছাড়া অন্যকে পিতা বলে দাবী করে, অথচ সে জানে যে, সে তার পিতা নয়, তার জন্য জান্নাত হারাম।" (বুখারী ৬৭৬৬, মুসলিম ২২৮নং)

কিন্তু সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আসলে সঠিকতা থেকে বহু ক্রোশ দূরে। যেহেতু একই বিষয়ে কিছু আয়াত বা হাদীস সামনে রেখে কিছুকে বর্জন বা দৃষ্টিচ্যুত করা কোন আলেমের কাজ নয়। আলেমের কাজ হল, একই বিষয়ীভূত সকল আয়াত ও হাদীসকে পাশাপাশি রেখে তবেই সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। পরন্তু বিদআতীদের আচরণ হল, নিজেদের বিদআতের সমর্থক আয়াত ও হাদীস উল্লেখ ক'রে নিজেদের মতকে পোক্ত করা।
বলা বাহুল্য এর বিপরীত আয়াত ও হাদীস রয়েছে, যার দ্বারা বোঝা যায় যে, কাবীরা গোনাহ করলে অপরাধী কাফের হয় না এবং কাফের-মুশরিক ছাড়া অন্য কেউ জাহান্নামে চিরস্থায়ী সাজা ভোগ করবে না। যেমন:-
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاء وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا } (٤٨) سورة النساء
"নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী (র্শিক) করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন। আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন (র্শিক) করে, সে এক মহাপাপ করে।" (নিসাঃ ৪৮)

আর মহানবী বলেছেন,
أَخْرِجُوا مِنْ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِنْ الْخَيْرِ مَا يَزْنُ شَعِيرَةً أَخْرِجُوا مِنْ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِنْ الْخَيْرِ مَا يَزِنُ ذَرَّةً أَخْرِجُوا مِنْ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِنْ الْخَيْرِ مَا يَزِنُ بُرَّةً)).
"(পরকালে) আল্লাহ বলবেন, সেই ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে বের কর, যে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে এবং তার হৃদয়ে যবের দানা পরিমাণ মঙ্গল (ঈমান) আছে। সেই ব্যক্তিকেও জাহান্নাম থেকে বের কর, যে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে। এবং তার হৃদয়ে অণু (বা ভুট্টা) পরিমাণ মঙ্গল (ঈমান) আছে। আর সেই ব্যক্তিকেও জাহান্নাম থেকে বের কর, যে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে এবং তার হৃদয়ে গমের দানা পরিমাণ মঙ্গল (ঈমান) আছে।" (আহমাদ ৩/২৭৬, তিরমিযী ২৫৯৩নং, এ হাদীসের মূল রয়েছে সহীহায়নে)

لِكُلِّ نَبِي دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ وَإِنِّى اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِّأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا .
"প্রত্যেক নবীর কবুলযোগ্য দুআ থাকে। সুতরাং প্রত্যেক নবী নিজ দুআকে সত্বর (দুনিয়াতে) প্রয়োগ করেছেন। আর আমি আমার দুআকে কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের জন্য সুপারিশের উদ্দেশ্যে লুকিয়ে জমা রেখেছি। সেই সুপারিশ---ইন শাআল্লাহ---আমার উম্মতের সেই ব্যক্তি লাভ করবে, যে আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শির্ক না ক'রে মারা যাবে।" (মুসলিম ৫১২নং)

মুআয বিন জাবাল বলেন, একদা আমি উফাইর নামক এক গাধার পিঠে নবী-এর পিছনে সওয়ার ছিলাম। তিনি বললেন, "হে মুআয! তুমি কি জান, বান্দার উপর আল্লাহর অধিকার এবং আল্লাহর উপর বান্দার অধিকার কী?" আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রসূল অধিক জানেন। তিনি বললেন,
فَإِنَّ حَقَّ اللَّهِ عَلَى الْعِبَادِ أَنْ يَعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا يُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَحَقُّ الْعِبَادِ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ لَا يُعَذِّبَ مَنْ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا .
"বান্দার উপর আল্লাহর অধিকার হল এই যে, বান্দা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না। আর আল্লাহর উপর বান্দার অধিকার হল এই যে, তাঁর সাথে যে শরীক করে না তাকে আযাব দেবেন না।" (বুখারী ২৮৫৬, মুসলিম ১৫৩নং)

مَنْ مَاتَ لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ».
"যে ব্যক্তি কোন কিছুকে আল্লাহর শরীক (শিক) না করে মারা যাবে, সে ব্যক্তি বেহেশ্তে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি কোন কিছুকে আল্লাহর শরীক (শিক) করে মারা যাবে, সে ব্যক্তি দোযখ প্রবেশ করবে।" (মুসলিম ২৭৯নং)

ذَاكَ جِبْرِيلُ أَتَانِي فَقَالَ : مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِكَ لَا يُشْرِكْ بِاللَّهِ شَيْئاً دَخَلَ الْجَنَّةَ ))
"জিব্রাঈল আমার কাছে এসে বললেন, 'আপনার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না ক'রে মরবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' অতঃপর নবী জিবরীলকে অথবা আবু যার নবী-কে বললেন, 'যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে তবুও কি?' তিনি বললেন, "যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে।" (বুখারী ৬৪৪৪, মুসলিম ২৩৫১নং)

((مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ صَادِقًا مِنْ قَلْبِهِ دَخَلَ الْجَنَّةَ)).
"যে ব্যক্তি সত্য-চিত্তে (ইখলাসের সাথে) "আশহাদু আল লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ, অআন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ" বলবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।" (আহমাদ ২২০০৩, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৭, সিঃ সহীহাহ ২২৭৮নং)

অবশ্য এখানে এ ধারণাও সঠিক নয় যে, ঈমান বা কালেমা নিয়ে কোন আমল ছাড়াই জান্নাতে যাওয়া যাবে। যেহেতু সেটা হবে একপেশে ফায়সালা প্রথমটার বিপরীত। প্রথম মত পোষণকারীরা ধারণা করে, কাবীরা গোনাহ করলে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে। আর তারা হল খাওয়ারেজ সম্প্রদায়। দ্বিতীয় মত পোষণকারীদের ধারণা হল, সৎকর্ম না থাকলেও কেবল কালেমা পড়লেই জান্নাত লাভ করা যাবে এবং ঈমানের সাথে আমল না হলেও চলবে। আর তারা হল মুর্জিয়াহ সম্প্রদায়। উভয় ফির্কাই বিদআতী ও বাতিলপন্থী। সঠিক হল সকল আয়াত ও হাদীস দ্বারা উপলব্ধ মত মাঝামাঝি মত, আহলে সুন্নাহ অল-জামাআহর মত। আর তা হল নিম্নরূপঃ-
১। কাবীরা গোনাহ করলে মুসলিম কাফের হয় না; যদি সে তা হালাল মনে না করে।
২। কিয়ামতে এমন মুসলিম মহান আল্লাহর ইচ্ছাধীন হবে। তিনি চাইলে তাকে পাপ মাফ ক'রে বেহেশতে দেবেন। না চাইলে জাহান্নামে শাস্তি ভুগিয়ে একদিন না একদিন বেহেশতে প্রবেশ করাবেন।
৩। সে জাহান্নামে গেলেও সেখানে চিরস্থায়ী থাকবে না।
৪। মুসলিম সদা সতর্ক থাকবে, যাতে সে কোন কাবীরা গোনাহ না করে। কারণ নিয়ত অনুসারে তা কুফরী হয়ে যেতে পারে। নচেৎ জাহান্নামে তার উপযুক্ত শাস্তি ভোগ করতে হতে পারে।

যে সকল শরয়ী উক্তিতে কাবীরা গোনাহর গোনাহগারকে 'মু'মিন নয়' বলা হয়েছে, তার অর্থ হল, সে পূর্ণ মু'মিন নয়। অপূর্ণ মু'মিন।
যাতে বলা হয়েছে, 'সে আমাদের দলভুক্ত নয়', তার অর্থ হল, আমাদের অনুসারী সে কাজ করতে পারে না। সে আমাদের আদর্শের অনুসারী নয়।
যে কাবীরা গোনাহর কাজকে কুফরী বলা হয়েছে, তার অর্থ হল, ছোট কুফরী। যেটাকে শির্ক বলা হয়েছে, সেটার অর্থ হল, ছোট শির্ক। সেই অপরাধীর কর্ম ও আচরণ আসলে মুসলিমদের নয়, বরং কাফের ও মুশরিকদের। কোন কোন কুফরীর অর্থ অকৃতজ্ঞতার অর্থে ব্যবহার হয়েছে।
যে সকল উক্তিতে কাবীরা গোনাহর অপরাধীর ব্যাপারে জান্নাত প্রবেশ করবে না বলা হয়েছে, তার উদ্দেশ্য হল, প্রাথমিকভাবে জান্নাত প্রবেশ করবে না।
যে সকল উক্তিতে কালেমা পড়লেই জাহান্নাম হারাম বলা হয়েছে, তার উদ্দেশ্য হল, সে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে না। তার উদ্দেশ্য এই নয় যে, সে জাহান্নামেই যাবে না।
যে সকল উক্তিতে কাবীরা গোনাহর অপরাধীর ব্যাপারে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে বলা হয়েছে, তার উদ্দেশ্য হল, অপরাধীকে কঠোরভাবে ধমক দেওয়া ও সতর্ক করা। সে দীর্ঘদিন জাহান্নামে বাস করবে। অথবা যে উক্ত অপরাধকে হালাল জানবে, সে চিরস্থায়ী জাহান্নামবাসী হবে, কারণ সে কাফের।
বলা বাহুল্য, কাবীরা গোনাহর গোনাহগার কাফের হলে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হতো না এবং পূর্ণ মু'মিন হলে তাকে জাহান্নামে দেওয়া হতো না।
এই হল আহলে সুন্নাহর নীতি, সকল উক্তির উপর আমল করা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় জাল-যয়ীফ ব্যতীত কোন উক্তিকে দৃষ্টিচ্যুত না করা। তা না করলে বিদআতীদের মতো হক থেকে বহু দূরে সরে যেতে হবে।
আল্লামা ইবনে উষাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) এ ব্যাপারে উলামাগণের মতভেদ উল্লেখ করার শেষে বলেন, 'কিন্তু বলা যেতে পারে যে, আমরা এরূপ কথা বলা (মতভেদ করা) থেকে নীরব থেকে আল্লাহর নিকট এই আশা রাখব যে, তিনি (সাগীরা-কাবীরা) সকল গোনাহকেই ক্ষমা ক'রে দেবেন। বিশেষ ক'রে যখন হাদীসে বলা হয়েছে, "---তার সমুদ্রের ফেনা বরাবর পাপ হলেও মাফ হয়ে যাবে।" আর আল্লাহর কাছে এই আশা রাখব যে, কাবীরা গোনাহ থেকে বিরত না থাকলেও সে ক্ষমা সাব্যস্ত থাকবে।
বলা বাহুল্য, এ কথা বিচ্যুতি থেকে অধিক দূরে এবং আশার ব্যাপারে বেশি বলিষ্ঠ।' (বুলুগুল মারামের ব্যাখ্যাপুস্তক ৭/৫৪)

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 সারসংক্ষেপ

📄 সারসংক্ষেপ


পাপের প্রভাবে আমরা দেখলাম ইহ-পরকালের প্রতিফল ও শান্তি। পাপের পঙ্কিলতায় পৃথিবী যেন পিচ্ছিল। পাপের কালিমায় আকাশ যেন অন্ধকার। দুষ্কৃতী পাপাচারীদের পাপের ফলে জলে-স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। পাপের কারণে মানুষের অর্থ-সম্পদ, পরিবার-পরিজন ও খাদ্য-পানীয় থেকে বর্কত বিলীন হয়ে গেছে। পাপের প্রভাবে কল্যাণ হ্রাস পেয়েছে। যালেম পাপিষ্ঠদের আচরণে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। দুষ্কর্ম ও কুকর্মের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে যেন দিনের আলো ও রাতের অন্ধকার কান্না করছে। কিরামান কাতেবীন যেন তাঁদের প্রতিপালকের নিকট আদম-সন্তানের অগণিত অশ্লীলতা, নোংরামি, নির্লজ্জতা ও কদর্যতার অভিযোগ তুলছেন। পাপের আধিক্যে হৃদয়সমূহ কঠোর হয়ে গেছে। অত্যাচার ও অনাচার বৃদ্ধিশীল হয়েছে। সৃষ্টিকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছিল, সে উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে গেছে। পাপের পীড়ায় মানুষ পীড়িত আছে। যে পীড়ার নিরাময় দুরূহ। আধি ও ব্যাধি থেকে মুক্তির পথ বড় দুর্গম। আযাবের সতর্ককারী নিজ পাগড়ি বেঁধে প্রস্তুত আছে। বিপর্যয়-ঘোষক ঘোষণা দিচ্ছে আকস্মিক বিপর্যয় এসে পড়ার কথা। (আল-ফাওয়াইদ, ইবনুল কাইয়েম ৮৮-৮৯পৃঃ)

পাপের প্রভাবে আমরা দেখলাম ও বাস্তবে দেখতে পাচ্ছি, কত শত জনপদ জনশূন্য হয়ে গেছে, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে তাদের বাসস্থান। তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে গুপ্ত ও প্রকাশ্য সকল প্রকার নেয়ামত। যে দেশের সবচেয়ে বড় নেয়ামত ছিল নিরাপত্তা, সে দেশের মানুষের আর কোন নিরাপত্তা নেই। জান ও মালের নিরাপত্তা নেই, নিরাপত্তা নেই দ্বীন ও ঈমানের।
এ হল পাপের প্রতিফল ও কুপ্রভাব। যে পাপ মানুষের মনে-মগজে, দেহে ও পরিবারে, সমাজে ও দেশে বড় মন্দ প্রভাব ফেলতে পারে। দুনিয়ার সংসারকে জ্বালিয়ে ছারখার করতে পারে। সুখের বাসাতে দুঃখের আগুন সংযোগ করতে পারে।
পাপ দেহে সঞ্চারিত হলে বিষের মতো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি ক'রে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় অবিলম্বে অথবা বিলম্বে। দ্বীনদারিতে প্রবিষ্ট হলে মানুষকে বেদ্বীন ক'রে ছাড়ে। ভালোবাসায় অনুপ্রবেশ করলে ঐক্যের মহলে ফাটল সৃষ্টি করে।
পাপ সেই ঘুণ, যা সমাজের কাষ্ঠখন্ডকে ঝাঁঝরা ক'রে ছাড়ে। পাপ সেই নেকড়ে বাঘ, যা ছাগপালের সর্বনাশ ক'রে ছাড়ে। পাপ সেই নোনা, যা বিশাল অট্টালিকাকে দুর্বল ও ভঙ্গুর ক'রে ফেলে। পাপ সেই ক্যানসার, যা শরীরের রক্তকে দূষিত ক'রে ছাড়ে এবং বিনাশের দিকে অগ্রসর করে।
এ ছিল পাপের প্রভাব দুনিয়াতে। তাহলে আখেরাতে তার প্রভাব কী, তাও আমরা জেনেছি। কবরে, হাশরে ও জাহান্নামে তার ভয়ানক প্রভাবের কথা আলোচনা করেছি। আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَكَذَلِكَ نَجْزِي مَنْ أَسْرَفَ وَلَمْ يُؤْمِن بِآيَاتِ رَبِّهِ وَلَعَذَابُ الْآخِرَةِ أَشَدُّ وَأَبْقَى}
"এইভাবেই আমি তাকে প্রতিফল দেব, যে সীমালংঘন করেছে ও তার প্রতিপালকের নিদর্শনে বিশ্বাস স্থাপন করেনি। আর পরকালের শাস্তি অবশ্যই কঠোরতর ও চিরস্থায়ী।" (ত্বা-হাঃ ১২৭)
{لَهُمْ عَذَابٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَعَذَابُ الْآخِرَةِ أَشَقُّ وَمَا لَهُم مِّنَ اللَّهِ مِن وَاق}
"তাদের জন্য পার্থিব জীবনে আছে শাস্তি এবং পরকালের শাস্তি তো আরো কঠোর। আর আল্লাহর (শাস্তি) হতে রক্ষাকর্তা তাদের কেউ নেই।" (রা'দঃ ৩৪)
আল্লাহ আমাদেরকে পানাহ দিন। পানাহ দিন পাপ থেকে এবং পাপের শাস্তি থেকে। ইহকালের ও পরকালের সকল দুঃখ-কষ্ট থেকে। আমীন।

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 কেউ কারো ভার বহন করবে না

📄 কেউ কারো ভার বহন করবে না


মহান আল্লাহর একটি ন্যায়পরায়ণতাপূর্ণ বিধান হল, কেউ কারো ভার বহন করবে না। এক জন পাপ করলে অন্যজন তা বহন করবে না। একজন অপরাধ করলে অন্যজনকে তার সাজা দেওয়া হবে না। কি সুন্দর তাঁর বিচার! কি সুন্দর তাঁর কৌশল!
উক্ত নীতির কথা কুরআন কারীমে পাঁচ পাঁচবার উল্লিখিত হয়েছে। যার দ্বারা বুঝা যায় এর অতি গুরুত্ব রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ أَبْغِي رَبًّا وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيْءٍ وَلَا تَكْسِبُ كُلُّ نَفْسٍ إِلَّا عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى ثُمَّ إِلَى رَبِّكُم مَّرْجِعُكُمْ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ} (১৬৪)
"বল, 'আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য প্রতিপালককে অন্বেষণ করব? অথচ তিনিই সব কিছুর প্রতিপালক। প্রত্যেকেই স্বীয় কৃতকর্মের জন্য দায়ী হবে এবং কেউ অন্য কারো ভার বহন করবে না। অতঃপর তোমাদের প্রতিপালকের নিকটেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন হবে, তারপর যে বিষয়ে তোমরা মতান্তর ঘটিয়েছিলে তা তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন।" (আনআমঃ ১৬৪)

{مَنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ وَمَن ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولاً} (১৫) সূরা ইসরা
"যারা সৎপথ অবলম্বন করবে, তারা তো নিজেদেরই মঙ্গলের জন্যই সৎপথ অবলম্বন করবে এবং যারা পথভ্রষ্ট হবে, তারা নিজেদেরই ধ্বংসের জন্যই হবে এবং কেউ অন্য কারো ভার বহন করবে না। আর আমি রসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দিই না।" (বানী ইস্রাঈল: ১৫)

{وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى وَإِن تَدْعُ مُثْقَلَةٌ إِلَى حِمْلِهَا لَا يُحْمَلْ مِنْهُ شَيْءٌ وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى إِنَّمَا تُنذِرُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُم بِالغَيْبِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَمَن تَزَكَّى فَإِنَّمَا يَتَزَكَّى لِنَفْسِهِ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ} (১৮) সূরা ফাতির
"কোন বহনকারী অপরের বোঝা বহন করবে না; কারও পাপের বোঝা গুরুভার হলে সে যদি অন্যকে তা বহন করতে আহবান করে, তবুও কেউ তা বহন করবে না; যদিও সে নিকট আত্মীয় হয়। তুমি কেবল তাদেরকেই সতর্ক করতে পার, যারা তাদের প্রতিপালককে না দেখে ভয় করে এবং যথাযথভাবে নামায পড়ে। যে কেউ পরিশুদ্ধ হয়, সে তো পরিশুদ্ধ হয় নিজেরই কল্যাণের জন্য। আর প্রত্যাবর্তন আল্লাহরই নিকট।" (ফাত্বিরঃ ১৮)

{إِن تَكْفُرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنكُمْ وَلَا يَرْضَى لِعِبَادِهِ الْكُفْرَ وَإِن تَشْكُرُوا يَرْضَهُ لَكُمْ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى ثُمَّ إِلَى رَبِّكُم مَّرْجِعُكُمْ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ}
"তোমরা অকৃতজ্ঞ হলে জেনে রাখ, আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন। তিনি তাঁর দাসদের অকৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন না। যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তাহলে তিনি তোমাদের কৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন। আর একের ভার অন্যে বহন করবে না। অতঃপর তোমাদের প্রতিপালকের নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন হবে এবং তোমরা যা করতে, তিনি তোমাদেরকে তা অবগত করাবেন। নিশ্চয়ই তিনি অন্তরে যা আছে, তা সম্যক অবগত।" (যুমার: ৭)

{أَفَرَأَيْتَ الَّذِي تَوَلَّى (۳۳) وَأَعْطَى قَلِيلاً وَأَكْدَى (٣٤) أَعِنْدَهُ عِلْمُ الْغَيْبِ فَهُوَ يَرَى (٣٥) أَمْ لَمْ يُنَبَّأَ بِمَا فِي صُحُفِ مُوسَى (٣٦) وَإِبْرَاهِيمَ الَّذِي وَفَّى (۳۷) أَلا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى (۳۸) وَأَنْ لَيْسَ لِلإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى (۳۹) وَأَنَّ سَعْيَهُ سَوْفَ يُرَى (٤٠) ثُمَّ يُجْزَاهُ الْجَزَاءَ الأوفى} (٤١) سورة النجم
"তুমি কি দেখেছ সে ব্যক্তিকে যে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং দান করে সামান্যই, পরে বন্ধ ক'রে দেয়? তার কি অদৃশ্যে জ্ঞান আছে যে, সে (সবকিছু) দেখতে পাচ্ছে? তাকে কি অবগত করা হয়নি, যা আছে মুসার কিতাবে এবং ইব্রাহীমের কিতাবে, যে পালন করেছিল তার দায়িত্ব? তা এই যে, কোন বহনকারী অপরের বোঝা বহন করবে না। আর এই যে, মানুষ তাই পায়, যা সে চেষ্টা করে। আর এই যে, তার কর্ম অচিরেই তাকে দেখানো হবে। অতঃপর তাকে দেওয়া হবে পূর্ণ প্রতিদান।" (নাজমঃ ৩৩-৪১)

লক্ষণীয় যে, উক্ত নীতি কেবল উম্মতে মুহাম্মাদীর বৈশিষ্ট্য নয়, বরং তা সকল উম্মতের জন্য সকল শরীয়তের ব্যাপক একটা নির্দেশ।
অবশ্য কেউ কারো পাপের কারণ হয়ে থাকলে অথবা পাপকার্যে সাহায্য করলে অথবা পাপ করতে আদেশ দিলে অথবা পাপ বর্জন করতে বাধা দিয়ে থাকলে সে তার শাস্তি পাবে। ইচ্ছা করলেও সে পাপীর পাপ নিজের ঘাড়ে নিতে পারবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلَّذِينَ آمَنُوا اتَّبِعُوا سَبِيلَنَا وَلْنَحْمِلْ خَطَايَاكُمْ وَمَا هُم بِحَامِلِينَ مِنْ خَطَايَاهُم مِّن شَيْءٍ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ (۱۲) وَلَيَحْمِلُنَّ أَثْقَالَهُمْ وَأَثْقَالًا مَّعَ أَثْقَالِهِمْ وَلَيُسْأَلُنَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَمَّا كَانُوا يَفْتَرُونَ } (۱۳) سورة العنكبوت
"অবিশ্বাসীরা বিশ্বাসীদেরকে বলে, 'তোমরা আমাদের পথ ধর; আমরা তোমাদের পাপভার বহন করব!' কিন্তু ওরা তো তোমাদের পাপভারের কিছুই বহন করবে না। ওরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। ওরা অবশ্যই নিজেদের পাপভার বহন করবে এবং তার সঙ্গে আরও কিছু পাপের বোঝা এবং ওরা যে মিথ্যা উদ্ভাবন করে, সে সম্পর্কে কিয়ামতের দিন অবশ্যই ওদেরকে প্রশ্ন করা হবে।" (আনকাবুতঃ ১২-১৩)

ড্রাইভিং না জেনে গাড়ি চালিয়ে আরোহীদের ক্ষতিগ্রস্ত করলে যেমন সে দায়ী হবে, তেমনি কেউ না জেনে নিজ কথা বা কর্ম দ্বারা অপরকে ভ্রষ্ট করলে তার পাপও সে বহন করবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{لِيَحْمِلُوا أَوْزَارَهُمْ كَامِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمِنْ أَوْزَارِ الَّذِينَ يُضِلُّونَهُم بِغَيْرِ عِلْمٍ أَلَا سَاءَ مَا يَزِرُونَ} (٢٥) سورة النحل
"(মিথ্যাজ্ঞান করার) ফলে কিয়ামত দিবসে তারা বহন করবে তাদের পাপভার পূর্ণমাত্রায় এবং তাদেরও পাপভার যাদেরকে তারা অজ্ঞতা হেতু বিভ্রান্ত করেছে। দেখ, তারা যা বহন করবে, তা কতই না নিকৃষ্ট।" (নাহলঃ ২৫)

মহানবী বলেছেন,
مَنْ أُفْتِي بِغَيْرِ عِلْمٍ كَانَ إِثْمُهُ عَلَى مَنْ أَفْتَاهُ ».
"বিনা ইলমে যাকে ফতোয়া দেওয়া হয় (এবং সেই ভুল ফতোয়া দ্বারা সে ভুলকর্ম করে) তবে তার পাপ ঐ মুফতীর উপর।" (আবু দাউদ ৩৬৫৯, হাকেম ৩৫০, সহীহুল জামে' ৬০৬৮নং)

তদনুরূপ পাপ যে আবিষ্কার করবে অথবা পাপের রীতি সর্বপ্রথম চালু করবে অথবা অপরাধের পথিকৃৎ হবে, সেও তার শাস্তি এবং উক্ত পাপে তার অনুবর্তী পাপীদের শাস্তি ভোগ করবে। মহানবী বলেছেন,
((مَنْ سَنَّ فِي الإسلام سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا ، وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا بَعْدَهُ، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصُ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْءٌ، وَمَنْ سَنَّ فِي الإِسْلامِ سُنَّةً سَيِّئَةً كَانَ عَلَيْهِ وَزْرُهَا ، وَوَزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ بَعْدِهِ ، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصُ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَيْءٌ )). رواه مسلم
"যে ব্যক্তি ইসলামে ভাল রীতি চালু করবে, সে তার নিজের এবং ঐ সমস্ত লোকের সওয়াব পাবে, যারা তার (মৃত্যুর) পর তার উপর আমল করবে। তাদের সওয়াবের কিছু পরিমাণও কম করা হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন মন্দ রীতির প্রচলন করবে, তার উপর তার নিজের এবং ঐ লোকদের গোনাহ বর্তাবে, যারা তার (মৃত্যুর) পর তার উপর আমল করবে। তাদের গোনাহর কিছু পরিমাণও কম করা হবে না।" (মুসলিম ২৩৯৮, নাসাঈ ২৫৫৪, ত্বাবারানী ২২৬২, ইবনে মাজাহ ২০৩, তিরমিযী ২৬৭৫নং)

((مَنْ سَنَّ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا مَا عَمِلَ بِهِ فِي حَيَاتِهِ وَبَعْدَ مَمَاتِهِ حَتَّى يَتْرُكَ، وَمَنْ سَنَّ سُنَّةً سَيِّئَةً فَعَلَيْهِ إِثْمُهَا حَتَّى يَتْرُكَ)).
"যে ব্যক্তি কোন ভালো রীতি প্রবর্তন করে তার জন্য নির্দিষ্ট সওয়াব রয়েছে, যতদিন সেই রীতির উপর আমল হতে থাকবে; তার জীবনকালে এবং তার মৃত্যুর পরেও; যতক্ষণ না তা বর্জন করেছে। আর যে ব্যক্তি কোন মন্দ রীতির প্রচলন করে তার জন্য রয়েছে তার নির্দিষ্ট পাপ, যতক্ষণ না সে রীতি (বা কর্ম) বর্জন করেছে।" (ত্বাবারানীর কাবীর ১৭৬৪৫, সহীহ তারগীব ৬২নং)

এই কারণেই পৃথিবীর প্রত্যেক খুনীর পাপের ভাগী হবে প্রথম খুনী কাবীল। মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ مِنْ نَفْسٍ تُقْتَلُ ظُلْماً إِلَّا كَانَ عَلَى ابْنِ آدَمَ الأَوَّلِ كِفْلٌ مِنْ دَمِهَا ، لأَنَّهُ كَانَ أَوَّلَ مَنْ سَنَّ القَتَلَ )).
"যে কোন প্রাণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হবে, তার পাপের একটা অংশ আদমের প্রথম সন্তান (কাবীল) এর উপর বর্তাবে। কেননা, সে হত্যার রীতি সর্বপ্রথম চালু করেছে।" (বুখারী ৩৩৩৫, মুসলিম ৪৪৭৩, তিরমিযী ২৬৭৩, নাসাঈ ৩৯৮৫, ইবনে মাজাহ ২৬১৬নং)

একই কারণে সুসংবাদ পুণ্যের পথিকৃৎদের জন্য এবং দুঃসংবাদ পাপের পথিকৃৎদের জন্য। মহানবী বলেছেন,
((إِنَّ هَذَا الْخَيْرَ خَزَائِنُ وَلِتِلْكَ الْخَزَائِنِ مَفَاتِيحُ فَطُوبَى لِعَبْدِ جَعَلَهُ اللَّهُ مِفْتَاحاً لِلْخَيْرِ مِغْلاقاً لِلشَّرِّ وَوَيْلٌ لِعَبْدٍ جَعَلَهُ اللَّهُ مِفْتَاحاً لِلشَّرِّ مِغْلاقاً لِلْخَيْرِ).
"এই মঙ্গলসমূহের রয়েছে বহু ভান্ডার। এই ভান্ডারগুলোর জন্য রয়েছে একাধিক চাবি। সুতরাং শুভসংবাদ সেই ব্যক্তির জন্য যাকে আল্লাহ মঙ্গলের (দরজা খোলার) চাবিকাঠি এবং অমঙ্গলের (দরজা বন্ধ করার) খিল করেছেন। আর ধ্বংস সেই বান্দার জন্য যাকে আল্লাহ অমঙ্গলের চাবিকাঠি ও মঙ্গলের (দরজা বন্ধ করার) খিল করেছেন।" (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ২৩৮, হিল্ল্যাহ ৮/৩২৯, সিঃ সহীহাহ ১৩৩২নং)

একজন অপরাধ করলে অন্যজনকে শাস্তি দেওয়া যাবে না, তার উদাহরণ রয়েছে কুরআন কারীমে। বিনয়ামীনকে কাছে রাখার জন্য ইউসুফ কৌশল ক'রে আপাতদৃষ্টিতে তাকে চোর প্রমাণিত করলেন। অতঃপর যখন ভাইয়েরা দেখল যে, বিনয়্যামীন চুরির অপরাধে শাস্তি স্বরূপ দাস হয়ে এখানেই থেকে যাবে, তখন তারা বলল, 'হে আযীয! এর পিতা আছেন অতিশয় বৃদ্ধ, সুতরাং এর স্থলে আপনি আমাদের একজনকে রাখুন! আমরা তো আপনাকে দেখছি মহানুভব ব্যক্তিদের একজন।'
কিন্তু মিসরের 'আযীয' উপাধিপ্রাপ্ত ইউসুফ বললেন,
مَعَادُ اللَّهِ أَن تَأْخُدْ إِلَّا مَن وَجَدْنَا مَتَاعَنَا عِندَهُ إِنَّا إِذًا لَّظَالِمُونَ} (۷۹) سورة يوسف
'যার নিকট আমরা আমাদের মাল পেয়েছি, তাকে ছাড়া অন্যকে রাখার অপরাধ হতে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি! এরূপ করলে আমরা অবশ্যই সীমালংঘনকারী (যালেম) হব।' (সূরা ইউসুফ: ৭৮-৭৯)

মূসা নবী-এর ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَاخْتَارَ مُوسَى قَوْمَهُ سَبْعِينَ رَجُلاً لِّمِيقَاتِنَا فَلَمَّا أَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَةُ قَالَ رَبِّ لَوْ شِئْتَ أَهْلَكْتَهُم مِّن قَبْلُ وَإِيَّايَ أَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ السُّفَهَاء مِنَّا إِنْ هِيَ إِلَّا فِتْنَتُكَ تُضِلُّ بِهَا مَن تَشَاء وَتَهْدِي مَن تَشَاء أَنتَ وَلِيُّنَا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الْغَافِرِينَ} (١٥٥)
"মূসা আপন সম্প্রদায় হতে সত্তর জন লোককে আমার প্রতিশ্রুতির সময়ে সমবেত হওয়ার জন্য মনোনীত করল। তারা যখন ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হল, তখন মুসা বলল, 'হে আমার প্রতিপালক! তুমি ইচ্ছা করলে পূর্বেই তো এদেরকে এবং আমাকেও ধ্বংস করতে পারতে। আমাদের মধ্যে যারা নির্বোধ তাদের কর্মদোষে কি তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করবে? এতো শুধু তোমার পরীক্ষা, যা দিয়ে তুমি যাকে ইচ্ছা বিপথগামী কর এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত কর। তুমিই তো আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা কর ও আমাদের প্রতি দয়া কর এবং তুমিই সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমাশীল।" (আ'রাফঃ ১৫৫)

যালেম ফিরআউনের কান্ড কে না জানে? সে যখন শুনল, বনী ইসরাঈলের একটি শিশু জন্ম নেবে এবং বড় হলে তার হাতে তার রাজত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন সে তাদের প্রত্যেক (ছেলে) শিশুকে হত্যা করতে লাগল। একটা শিশুর জায়গায় শত শত শিশু হত্যা করেছিল যালেম।
আমাদের সংসারেও দেখা যায়, অনেকে অপরাধীর জায়গায় তার কোন আত্মীয় অথবা বন্ধুকে শাস্তি দেয়। অপরাধী বোনকে বুনাই কষ্ট দিলে, তার বোন নিরপরাধ স্ত্রীকে কষ্ট দেয়। অপর দেশের বিজাতি লোকেরা স্বজাতির উপর অত্যাচার করলে, স্বদেশে বিজাতির উপর অত্যাচার ক'রে প্রতিশোধ নেয়।
কিন্তু প্রকৃত মুসলিম মহান স্রষ্টার উক্ত নীতির কথা মনে ও ধ্যানে রাখে। তাই সে কারো সাথে অন্যায়াচরণ করে না এবং একজনের অপরাধের শাস্তি অপরকে প্রদান করে না।
মহানবী বলেছেন,
ه لا يَجْنِي جَانِ إِلَّا عَلَى نَفْسِهِ ، لَا يَجْنِي وَالِدٌ عَلَى وَلَدِهِ ، وَلَا مَوْلُودٌ عَلَى وَالِدِهِ » .
"কোন অপরাধী অপরাধ করলে, তা তার নিজের উপর বর্তাবে। বাপের অপরাধ ছেলের উপর এবং ছেলের অপরাধ বাপের উপর বর্তাবে না।" (আহমাদ ১৬০৬৪, তিরমিযী ২১৫৯, ৩০৮৭, ইবনে মাজাহ ২৬৬৯, ৩০৫৫, সিঃ সহীহাহ ১৯৭৪নং)

মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক, তাহলে মহান আল্লাহ যখন দুনিয়াতে কোন সম্প্রদায়কে শায়েস্তা করেন, তখন তাদের মন্দের সাথে ভালোকেও কেন নিষ্পিষ্ট করেন? ঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প ইত্যাদি দ্বারা অপরাধী-নিরপরাধ সকলকে ধ্বংস করেন?
এর উত্তরে মনে রাখতে হবে যে, মহান আল্লাহ কোনভাবেই বান্দার প্রতি যুলুম করেন না। তিনি যখন কাউকে শাস্তি দেন, তখন নিশ্চয় তার কোন না কোন অপরাধ অবশ্যই থাকে।
অথবা ব্যাপক আযাবে নিরপরাধ ধ্বংস হলেও পরকালে নিরাপত্তা লাভ করে। বিশেষ ক'রে জাতির মধ্যে যখন অশ্লীলতা ব্যাপক হয়ে যায় এবং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নোংরামিতে বাধা দেওয়ার ইচ্ছাটুকুও মানুষের মন থেকে বিলীন হয়ে যায়, তখন ব্যাপক শাস্তি সকলকে গ্রাস করে। এ জন্যই মহান আল্লাহ সতর্ক ক'রে বলেছেন,
وَاتَّقُوا فِتْنَةً لَّا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنكُمْ خَاصَّةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ}
"তোমরা সেই ফিতনাকে ভয় কর, যা বিশেষ ক'রে তোমাদের মধ্যে যারা অত্যাচারী কেবল তাদেরই ক্লিষ্ট করবে না এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।" (আনফালঃ ২৫)

আবু বাক্স সিদ্দীক বলেন, 'হে লোক সকল! তোমরা এই আয়াত পড়ছ,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ} (١٠٥) سورة المائدة
"হে মু'মিনগণ! তোমাদের আত্মরক্ষা করাই কর্তব্য। তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও, তবে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে, সে তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।" (মায়েদাহঃ ১০৫)
কিন্তু আমি রাসূলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি,
((إِنَّ النَّاسَ إِذَا رَأَوُا الظَّالِمَ فَلَمْ يَأْخُذُوا عَلَى يَدَيْهِ أُوشَكَ أَنْ يَعُمَّهُمُ اللَّهُ بِعِقَابِ مِنْهُ)).
"যখন লোকেরা অত্যাচারীকে (অত্যাচার করতে) দেখবে এবং তার হাত ধরে না নেবে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের সকলকে (আমভাবে) তার শাস্তির কবলে নিয়ে নেবেন।" (আবু দাউদ ৪৩৪০, তিরমিযী ২১৬৮, ৩০৫৭, নাসাঈর কুবরা ১১১৫৭, ইবনে মাজাহ ৪০০৫নং)
আল্লাহর রসূল আরো বলেছেন,
((مَا مِنْ قَوْمٍ يَعْمَلُونَ بِالْمَعَاصِي ، وَفِيهِمْ رَجُلٌ أَعَزُّ مِنْهُمْ وَأَمْنَعُ ، لَا يُغَيِّرُونَ إِلَّا عَمَّهُمُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ بِعِقَابٍ)).
"যে সম্প্রদায় যখন বিভিন্ন পাপাচারে লিপ্ত হয়, তখন তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তি থাকে, যার বাধা দেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি তারা তাদেরকে বাধা না দেয় (এবং ঐ পাপাচরণ বন্ধ না করে), তাহলে (তাদের জীবদ্দশাতেই) মহান আল্লাহ তাদেরকে ব্যাপকভাবে তাঁর কোন শাস্তি ভোগ করান।" (আহমাদ ৪/৩৬৪, আবু দাউদ ৪৩৩৯, ইবনে মাজাহ ৪০০৯, ইবনে হিব্বান, সহীহ আবু দাউদ ৩৬৪৬ নং)
অন্য শব্দে, "যে কোন সম্প্রদায়ে যখন পাপাচার চলতে থাকে, তখন তারা প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও যদি বন্ধ করার লক্ষ্যে কোন চেষ্টা-সাধনা না করে, তাহলে আল্লাহ ব্যাপকভাবে তাদের মাঝে আযাব প্রেরণ করে থাকেন।" (সহীহ ইবনে মাজাহ ৩২৩৮নং)

হ্যাঁ, অশ্লীলতা সমাজে ব্যাপকতা লাভ করলে সেই সমাজের নেক লোকেরাও রেহাই পাবে না। উম্মুল মু'মিনীন উম্মুল হাকাম যয়নাব বিনতে জাহশ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, একদা নবী তাঁর নিকট শঙ্কিত অবস্থায় প্রবেশ করলেন। তিনি বলছিলেন, "আল্লাহ ব্যতীত কেউ সত্য উপাস্য নেই, আরবের জন্য ঐ পাপ হেতু সর্বনাশ রয়েছে যা সন্নিকটবর্তী। আজকে ইয়া'জুজ-মা'জুজের দেওয়াল এতটা খুলে দেওয়া হয়েছে।" এবং তিনি (তার পরিমাণ দেখানোর জন্য) নিজ বৃদ্ধা ও তর্জনী দুই আঙ্গুল দ্বারা (গোলাকার) বৃত্ত বানালেন। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের মাঝে সৎলোক মওজুদ থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হব?' তিনি বললেন, “হ্যাঁ, যখন নোংরামি বেশী হবে।” (বুখারী ৩৩৪৬, ৩৫৯৮, মুসলিম ৭৪১৬-৭৪১৮নং)
অপরাধীর সাথে নিরপরাধ মানুষ কখন কীভাবে ধ্বংস হয়, তার একটি সুন্দর উদাহরণ দিয়ে মহানবী বলেছেন, "আল্লাহর নির্ধারিত সীমায় অবস্থানকারী (সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে বাধাদানকারী) এবং ঐ সীমা লংঘনকারী (উক্ত কাজে তোষামোদকারীর) উপমা হল এক সম্প্রদায়ের মত; যারা একটি দ্বিতলবিশিষ্ট পানি-জাহাজে লটারি ক'রে কিছু লোক উপর তলায় এবং কিছু লোক নিচের তলায় স্থান নিল। (নিচের তলা সাধারণতঃ পানির ভিতরে ডুবে থাকে। তাই পানির প্রয়োজন হলে নিচের তলার লোকদেরকে উপর তলায় যেতে হয় এবং সেখান হতে সমুদ্র বা নদীর পানি তুলে আনতে হয়।) সুতরাং পানির প্রয়োজনে নিচের তলার লোকেরা উপর তলায় যেতে লাগল। (উপর তলার লোকদের উপর পানি পড়লে তারা তাদের উপর ভাগে আসা অপছন্দ করল। তারা বলেই দিল, 'তোমরা নিচে থেকে আমাদেরকে কষ্ট দিতে এসো না।') নিচের তলার লোকেরা বলল, 'আমরা যদি আমাদের ভাগে (নিচের তলায় কোন স্থানে) ছিদ্র ক'রে দিই, তাহলে (দিব্যি আমরা পানি ব্যবহার করতে পারব) আর উপর তলার লোকদেরকে কষ্টও দেব না। (এই পরিকল্পনার পর তারা যখন ছিদ্র করতে শুরু করল) তখন যদি উপর তলার লোকেরা তাদেরকে নিজ ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয় (এবং সে কাজে বাধা না দেয়), তাহলে সকলেই (পানিতে ডুবে) ধ্বংস হয়ে যায়। (উপর তলার লোকেরা সে অন্যায় না করলেও রেহাই পেয়ে যাবে না।) পক্ষান্তরে উপর তলার লোকেরা যদি তাদের হাত ধরে (জাহাজে ছিদ্র করতে) বাধা দেয়, তাহলে তারা নিজেরাও বেঁচে যায় এবং সকলকেই বাঁচিয়ে নেয়।" (বুখারী ২৪৯৩, ২৬৮৬, তিরমিযী ২১৭৩নং)

ইসলামের উক্ত নীতির নিরিখে জারজ সন্তানের কোন পাপ নেই। তার জনক-জননীর পাপ তার ভাগ ও ভাগ্যে আসতে পারে না।
কিন্তু সহীহ হাদীসে আছে,
((وَلَدُ الزِّنَا شَرُّ الثَّلَاثَة)).
অর্থাৎ, জারজ সন্তান তিন জনের একজন নিকৃষ্ট। (আহমাদ ২/৩১১, আবু দাউদ ৩৯৬৩নং, ত্বাহাবী, হাকেম ২/২১৪, বাইহাক্বী ১০/৫৭, ৫৯, সিঃ সহীহাহ ৬৭২নং)
অবশ্য সে হাদীসের ব্যাখ্যা রয়েছে। এক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, যখন সে তার জনক-জননীর মতো কর্ম করে।
অন্য এক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, আসলে হাদীসটি এক মুনাফিকের ব্যাপারে বলা হয়েছে, যে মুনাফিক জারজ সন্তান ছিল এবং সে নবী -কে কষ্ট দিত। অথবা তার অর্থ হল, সাধারণতঃ অবৈধ সন্তান তার জনক-জননীর মতোই ব্যভিচারী হয়ে গড়ে ওঠে। সুতরাং তার পরিণামও তাদের মতোই মন্দ হয়।

অনুরূপ আরও একটি হাদীস কুরআনের উক্ত নীতির বিরোধী মনে হতে পারে। মহানবী বলেছেন,
(( المَيِّتُ يُعَذِّبُ فِي قَبْرِهِ بِمَا نِيحَ عَلَيْهِ )) . وَفِي رواية : (( مَا نِيحَ عَلَيْهِ )) .
"মৃত ব্যক্তিকে তার কবরের মধ্যে তার জন্য মাতম ক'রে কান্না করার দরুন শাস্তি দেওয়া হয়।" (বুখারী ১২৯২, মুসলিম ২১৮২নং) অন্য এক বর্ণনায় আছে, যতক্ষণ তার জন্য মাতম ক'রে কান্না করা হয়, (ততক্ষণ মৃতব্যক্তির আযাব হয়।) (আবু য়‍্যা'লা ১৫৬, বায্যার ১৪৬নং)
মৃতের আত্মীয়রা তার জন্য মাতম ক'রে কান্না করলে কবরে বা কিয়ামতে তার আযাব হবে কেন?
এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, আসলে আযাবটা হবে তার নিজের দোষেই। যেহেতু সে জানত যে, সে মারা গেলে তার আত্মীয়রা তার জন্য মাতম ক'রে কাঁদবে অথচ সে তাদেরকে নিষেধ ক'রে যায়নি। অথবা হাদীসটি কোন মৃত কাফেরের ব্যাপারে উক্ত হয়েছে। আর আল্লাহই অধিক জানেন।

কুরআনী উক্ত নীতি থেকে এ কথা ভ্রম ও ভ্রান্ত প্রমাণিত হয় যে, পিতা অথবা মাতার কোন পাপের কারণে সন্তান হতভাগ্য বা বিকলাঙ্গ হয়ে জন্ম নেয়।
মোট কথা, কোন মানুষই অন্যের পাপ বহন করবে না এবং অন্যের কৃত পাপের শাস্তিও কেউ ভোগ করবে না। কুরআনের অন্য আয়াতও সে কথারই সাক্ষ্য বহন করে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ) (۲۱) سورة الطور
"প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়বদ্ধ।" (তুরঃ ২১)
{كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ) (۳۸) سورة المدثر
"প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ।" (মুদ্দাষিরঃ ৩৮)
প্রত্যেক মানুষ নিজ নিজ কৃতকর্ম অনুযায়ী শান্তি অথবা শাস্তি ভোগ করবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَكُلَّ إِنسَانِ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنشُورًا} (۱۳)
"প্রত্যেক মানুষের কৃতকর্ম আমি তার গ্রীবালগ্ন করেছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব এক কিতাব, যা সে উন্মুক্ত পাবে।" (বানী ইস্রাঈলঃ ১৩)
তাছাড়া কিয়ামতের দিন?
{ يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ (٣٤) وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ (٣٥) وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ (٣٦) لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ } (۳۷) عبس
"সেদিন মানুষ পলায়ন করবে আপন ভ্রাতা হতে এবং তার মাতা ও তার পিতা হতে, তার পত্নী ও তার সন্তান হতে। সেদিন তাদের প্রত্যেকের এমন গুরুতর অবস্থা হবে, যা নিজেকে সম্পূর্ণরূপে ব্যস্ত রাখবে।" (আবাসাঃ ৩৪-৩৭)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00