📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 যে পাপ আল্লাহ কিয়ামতে ক্ষমা করবেন না

📄 যে পাপ আল্লাহ কিয়ামতে ক্ষমা করবেন না


দুনিয়াতে যথা নিয়মে ও যথা সময়ে তওবা করলে মহাক্ষমাশীল আল্লাহ সমস্ত গোনাহকে ক্ষমা ক'রে দেন। ছোট গোনাহ নানা নেক আমলের কারণে মাফ হয়ে যায়। কাবীরা গোনাহ ক'রে তওহীদবাদী মুসলিম তওবা না ক'রে মারা গেলে কিয়ামতে আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে। মহান আল্লাহ চাইলে তওহীদের গুণে তাকে ক্ষমা ক'রে বেহেশতে দেবেন। আর না চাইলে দোযখে সাজা ভুগিয়ে এক দিন না এক দিন বেহেশতে দেবেন।
কিন্তু অতি মহাপাপ, যা আল্লাহ কিয়ামতে ক্ষমা করবেন না এবং কোনদিনও ক্ষমা করবেন না। এমন পাপীরা চিরস্থায়ী জাহান্নামবাসী থাকবে। যেহেতু আসলে তারা মহান আল্লাহর শত্রু।

এক: বড় শির্ক
আল্লাহর সাথে শির্ক করা একটি অতি মহাপাপ। তওবা ক'রে মারা না গেলে কিয়ামতে তিনি মুশরিককে ক্ষমা করবেন না। তিনি বলেছেন,
{إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاء وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا } (٤٨) سورة النساء
"নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী (শির্ক) করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন। আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন (শির্ক) করে, সে এক মহাপাপ করে।" (নিসাঃ ৪৮)
{إِنَّ اللهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاء وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضلالاً بَعِيدًا } (১১৬) সূরা আন-নিসা
"নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী (শিক) করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা ক'রে দেন। আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন (শিক) করে, সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়।" (নিসাঃ ১১৬)
মুশরিক ক্ষমা পাবে না মানেই সে চিরকালের জন্য জাহান্নামী থাকবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ}
“অবশ্যই যে কেউ আল্লাহর অংশী করবে, নিশ্চয় আল্লাহ তার জন্য বেহেশত নিষিদ্ধ করবেন ও দোযখ তার বাসস্থান হবে এবং অত্যাচারীদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” (মায়িদাহঃ ৭২)

দুইঃ কুফরী
কুফরী মানে অবিশ্বাস, অস্বীকার, অমান্য, সন্দেহ, মিথ্যায়ন, প্রত্যাখ্যান, ঘৃণা ইত্যাদি। তার সাথে যোগ হতে পারে অত্যাচার, আল্লাহর পথে মানুষকে বাধা ইত্যাদি। এমন 'কাফের' ব্যক্তি তওবা ক'রে ঈমান আনয়ন না ক'রে মারা গেলে কিয়ামতে কস্মিনকালেও ক্ষমা পাবে না। বিধায় তারাও অনন্তকালের জন্য দোযখবাসী থাকবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَصَدُّوا عَن سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ مَاتُوا وَهُمْ كُفَّارٌ فَلَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ}
"যারা অবিশ্বাস করে ও আল্লাহর পথ হতে মানুষকে নিবৃত্ত করে, অতঃপর অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তাদেরকে কিছুতেই ক্ষমা করবেন না।" (মুহাম্মাদঃ ৩৪)
{إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا ثُمَّ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا ثُمَّ ازْدَادُوا كُفْرًا لَّمْ يَكُنِ اللَّهُ لِيَغْفِرَ لَهُمْ وَلَا لِيَهْدِيَهُمْ سَبيلاً} (۱۳۷) سورة النساء
"যারা বিশ্বাস করার পর অবিশ্বাস করে এবং আবার বিশ্বাস করে, অতঃপর আবার অবিশ্বাস করে, অতঃপর তাদের অবিশ্বাস-প্রবৃত্তি বৃদ্ধি পায়, আল্লাহ তাদেরকে কিছুতেই ক্ষমা করবেন না এবং তাদেরকে কোন পথও দেখাবেন না।" (নিসাঃ ১৩৭)
{إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَظَلَمُوا لَمْ يَكُن اللهُ لِيَغْفِرَ لَهُمْ وَلَا لِيَهْدِيَهُمْ طَرِيقاً (١٦٨) إِلَّا طَرِيقَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا وَكَانَ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرًا} (১৬৯) سورة النساء
"নিশ্চয় যারা অবিশ্বাস করেছে ও অত্যাচার করেছে, আল্লাহ তাদেরকে কখনও ক্ষমা করবেন না এবং কোন পথও দেখাবেন না; জাহান্নামের পথ ছাড়া। সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আর এ তো আল্লাহর পক্ষে সহজ।" (নিসাঃ ১৬৮-১৬৯)

তিনঃ মুনাফিকী
মুখে ইসলাম বুকে কুফরী রেখে যারা মুসলিম সমাজে বসবাস করে, তাদেরকেও মহান আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। দুনিয়াতে নবীর ক্ষমাপ্রার্থনাতেও তারা ক্ষমা পায়নি। নিজে তওবা ক'রে না মারা গেলে কিয়ামতেও ক্ষমা পাবে না তারা। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِن تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ} (৮۰) سورة التوبة
"তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা না কর (উভয়ই সমান); যদি তুমি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমা প্রার্থনা কর, তবুও আল্লাহ তাদেরকে কখনই ক্ষমা করবেন না; যেহেতু তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে কুফরী করেছে। আর আল্লাহ অবাধ্য সম্প্রদায়কে পথপ্রদর্শন করেন না।" (তাওবাহঃ ৮০)
{سَوَاء عَلَيْهِمْ أَسْتَغْفَرْتَ لَهُمْ أَمْ لَمْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ لَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ} (৬) سورة المنافقون
"তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা না কর, উভয়ই তাদের জন্য সমান। আল্লাহ তাদেরকে কখনো ক্ষমা করবেন না। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।" (মুনাফিকুন: ৬)

চার: পাপ প্রকাশ করা
অনেকে ধৃষ্টতার সাথে পাপ করে, নির্লজ্জতার সাথে পাপ প্রদর্শন করে, জনসমক্ষে পাপ করে, বুকের পাটা দেখিয়ে পাপ ক'রে দাপিয়ে বেড়ায়। অনেক সময় পাপ গোপনে ক'রে পরে তা প্রকাশ ক'রে বেড়ায়। এমন পাপীকে মহান আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। মহানবী বলেছেন,
كُلُّ أُمَّتِي مُعَافَى إِلَّا الْمُجَاهِرِينَ وَإِنَّ مِنْ الْمُجَاهَرَةِ أَنْ يَعْمَلَ الرَّجُلُ بِاللَّيْلِ عَمَلًا ثُمَّ يُصْبِحَ وَقَدْ سَتَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ فَيَقُولُ يَا فُلَانُ عَمِلْتُ الْبَارِحَةَ كَذَا وَكَذَا وَقَدْ بَاتَ يَسْتُرُهُ رَبُّهُ وَيُصْبِحُ يَكْشِفُ سِتْرَ اللَّهِ عَنْهُ)).
“আমার প্রত্যেক উম্মতের পাপ মাফ করে দেওয়া হবে, তবে যে প্রকাশ্যে পাপ করে (অথবা পাপ করে বলে বেড়ায়) তার পাপ মাফ করা হবে না। আর পাপ প্রকাশ করার এক ধরন এও যে, একজন লোক রাত্রে কোন পাপ করে ফেলে, অতঃপর আল্লাহ তা গোপন করে নেন। (অর্থাৎ, কেউ তা জানতে পারে না।) কিন্তু সকাল বেলায় উঠে সে লোকের কাছে বলে বেড়ায়, 'হে অমুক! গত রাতে আমি এই এই কাজ করেছি।'
রাতের বেলায় আল্লাহ তার পাপকে গোপন রেখে দেন; কিন্তু সে সকাল বেলায় আল্লাহর সে গোপনীয়তাকে নিজে নিজেই ফাঁস করে ফেলে।” (বুখারী ৬০৬৯নং, মুসলিম ৭৬৭৬নং)

পাঁচ: ঋণ পরিশোধ না করা
রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
يُغْفَرُ لِلشَّهِيدِ كُلُّ ذَنْبٍ إِلَّا الدَّيْنَ ».
"ঋণ পরিশোধ না করার পাপ ছাড়া শহীদের সমস্ত পাপকে মাফ ক'রে দেওয়া হবে।" (মুসলিম ৪৯৯১, মিশকাত ২৯১২ নং)

ছয়ঃ নরহত্যা
মহানবী বলেছেন,
كُلُّ ذَنْبٍ عَسَى اللَّهُ أَنْ يَغْفِرَهُ إِلَّا مَنْ مَاتَ مُشْركًا أَوْ مُؤْمِنٌ قَتَلَ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا ..
"যে ব্যক্তি মুশরিক হয়ে মারা যায় অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করে, সে ব্যক্তির পাপ ছাড়া অন্যান্য ব্যক্তির পাপকে আল্লাহ মাফ করে দিতে পারেন।" (আহমাদ ১৬৯০৭, নাসাঈ ৩৯৮৪, হাকেম ৮০৩১-৮০৩২, আবু দাউদ ৪২৭২নং, আবু দারদা হতে, সহীহুল জামে' ৪৫২৪নং)
আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا } (৯৩) سورة النساء
"যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন বিশ্বাসীকে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম। সেখানে সে চিরকাল থাকবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে অভিসম্পাত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত ক'রে রাখবেন।" (নিসাঃ ৯৩)
উক্ত আয়াতে মু'মিনকে হত্যা করার অতি কঠিন শাস্তির কথা বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, তার শাস্তি হল জাহান্নাম, যাতে সে চিরস্থায়ীভাবে থাকবে। অনুরূপ সে আল্লাহর ক্রোধের শিকার হবে এবং তাঁর অভিসম্পাত ও মহা শাস্তিও তার উপর আপতিত হবে। একই সাথে এতগুলো কঠিন শাস্তির কথা অন্য কোন পাপের ব্যাপারে বর্ণিত হয়নি। এ থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, একজন মু'মিনকে হত্যা করা কত বড় অপরাধ। হাদীসসমূহেও এ কাজের কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে এবং এর কঠোর শাস্তি বর্ণিত হয়েছে।
মু'মিনের হত্যাকারীর তওবা কবুল হবে, নাকি হবে না? কোন কোন আলেম উল্লিখিত কঠোর শাস্তিগুলোর ভিত্তিতে তার তওবা কবুল না হওয়ার কথাই ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু কুরআন ও হাদীসে উল্লিখিত উক্তির আলোকে পরিষ্কারভাবে জানা যায় যে, নিষ্ঠার সাথে তওবা করলে প্রত্যেক পাপই মাফ হতে পারে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُوْلَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا ) (۷۰) سورة الفرقان
"তবে যারা তওবা করে, বিশ্বাস ও সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের পাপকর্মগুলিকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন ক'রে দেবেন। আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (ফুরক্বান: ৭০)
অন্যান্য তওবার আয়াতসমূহও ব্যাপক। প্রত্যেক গুনাহ, ছোট হোক, বড় হোক অথবা অতি বড় যা-ই হোক না কেন, নিষ্ঠার সাথে তওবা করলে সবই মাফ হওয়া সম্ভব। এখানে তার শাস্তি জাহান্নামের কথা যে বর্ণিত হয়েছে, তার অর্থ হল, সে যদি তওবা না করে, তাহলে তার শাস্তি এটাই হবে, যা মহান আল্লাহ তার অপরাধের দরুন তাকে দিতে পারেন। অনুরূপ তওবা না করা অবস্থায় চিরস্থায়ী জাহান্নামী হওয়ার অর্থ হল, তাতে সুদীর্ঘ কাল অবস্থান করতে হবে। কারণ, কাফের ও মুশরিকরাই কেবল জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে। তাছাড়া হত্যার সম্পর্ক যদিও বান্দার অধিকারের সাথে, যা থেকে তওবার মাধ্যমেও দায়িত্বমুক্ত হওয়া যায় না, তবুও আল্লাহ তাআলা স্বীয় কৃপা ও অনুগ্রহে তার এমনভাবে নিষ্পত্তি করতে পারেন যে, নিহিত ব্যক্তিও প্রতিদান পেয়ে যাবে এবং হত্যাকারীরও মাফ হয়ে যাবে। (ইবনে কাষীর ও ফাতহুল কাদীর, আহসানুল বায়ান) অনুরূপ বলা যায় প্রকাশ্যে পাপকর্মকারী ও ঋণী ব্যক্তির ব্যাপারে।

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 পাপের শাস্তি জাহান্নামে

📄 পাপের শাস্তি জাহান্নামে


জাহান্নাম পরকালের এক নিকৃষ্টতম বাসস্থান। যা আল্লাহপাক ধর্মদ্রোহী, সত্য-প্রত্যাখ্যানকারী। অবিশ্বাসী, কাফের, মুশরিক, মুনাফিক এবং পাপীদের জন্য সৃষ্টি করে রেখেছেন। যেখানে তারা স্ব-স্ব কৃতকর্মের শাস্তিমূলক প্রতিফল ভোগ করবে।
পার্থিব জীবনে কাফেররা সাধারণতঃ শীতল বায়ু, ছায়া এবং শীতল পানীয় দ্বারা বিলাসিতায় মগ্ন হয়ে পুনরুত্থান বা পরকালকে অবিশ্বাস করে অনমনীয়ভাবে ঘোরতর পাপে লিপ্ত থাকে। তাই সেদিন তার প্রতিফল স্বরূপ জাহান্নাম হতে সেবন করবে---অত্যুষ্ণ বায়ু, পান করবে উত্তপ্ত পানি এবং অবস্থান করবে (জাহান্নামের) কৃষ্ণবর্ণ ধূমের ছায়ায়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
"বাম হাত-ওয়ালারা, কত হতভাগা বাম হাত-ওয়ালারা! তারা থাকবে অতি গরম বায়ু ও উত্তপ্ত পানিতে।
কালোবর্ণ ধোঁয়ার ছায়ায়। যা শীতলও নয়, আরামদায়কও নয়। ইতিপূর্বে তারা তো মগ্ন ছিল ভোগ-বিলাসে। এবং অবিরাম লিপ্ত ছিল ঘোরতর পাপকর্মে। তারা বলত, 'মরে হাড় ও মাটিতে পরিণত হলেও কি আমরা অবশ্যই পুনরুত্থিত হব? এবং আমাদের পূর্ব-পুরুষগণও?" (ওয়াক্বিআহঃ ৪১-৪৮)

জাহান্নামীদের খাদ্যঃ
১। যন্ত্রণাদায়ক যাক্কুম বৃক্ষ: মহান আল্লাহ বলেছেন, "আপ্যায়নের জন্য কি এটিই উত্তম, না যাক্কুম বৃক্ষ? সীমালংঘনকারীদের জন্য আমি এ সৃষ্টি করেছি পরীক্ষাস্বরূপ; এ বৃক্ষ জাহান্নামের তলদেশ হতে উদ্‌গত হয়, এর মোচা শয়তানের মাথার মত। সীমালংঘনকারীরা তা ভক্ষণ করবে এবং তা দিয়ে উদর পূর্ণ করবে। তার উপর অবশ্যই ওদের জন্য ফুটন্ত পানির মিশ্রণ থাকবে। অতঃপর অবশ্যই ওদের প্রত্যাবর্তন হবে জাহান্নামের দিকে।" (স্বাফফাত ৪৬২-৬৮)
"তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাক্কুম বৃক্ষ হতে। এবং ওটা দ্বারা তোমরা উদর পূর্ণ করবে। তারপর তোমরা পান করবে ফুটন্ত পানি। পান করবে পিপাসার্ত উটের ন্যায়। কিয়ামতের দিন এটাই হবে তাদের আতিথ্য।" (ওয়াক্বিআহঃ ৫২-৫৬)
"নিশ্চয়ই যাক্কুম গাছ হবে পাপিষ্ঠের খাদ্য; গলিত তামার মতো তা পেটের ভিতর ফুটতে থাকবে, গরম পানি ফুটার মতো। (আল্লাহ ফিরিস্তাকে বলবেন,) ওকে ধর এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে। অতঃপর ওর মাথায় ফুটন্ত পানি ঢেলে দিয়ে শাস্তি দাও---(এবং বল,) আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, সম্ভ্রান্ত। এটা তো সেই (শাস্তি) যার সম্পর্কে তোমরা সন্দেহ করতে।" (দুখানঃ ৪৩-৫০)
ঐ যাক্কুমের সামান্য পরিমাণ যদি জাহান্নাম হতে পৃথিবীতে আসে, তবে পৃথিবীর খাদ্য ও পানীয় তার বিষাক্ততায় বিনষ্ট হয়ে যাবে। (তিরমিযী ২৫৮৫নং)
২। যারী': এক প্রকার কন্টকময় বিষাক্ত গুল্ম। যা জাহান্নামীরা ভক্ষণ করবে। যাতে তারা পুষ্টও হবে না এবং তাদের ক্ষুধাও নিবৃত্ত হবে না। (গাশিয়াহ ৬-৭)
৩। গলায় আটকে যায় এমন খাদ্য। (মুয্যাম্মিলঃ ১৩)
৪। গিসলীনঃ জাহান্নামীদের ক্ষতনিঃসৃত স্রাব। (হাক্কাহঃ ৩৬)

জাহান্নামীদের পানীয়ঃ
১। হামীম: অত্যুষ্ণ ফুটন্ত পানি। (ওয়াক্বিআহঃ ৫৪, ৯৩) যা পান করলে জাহান্নামীদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। (মুহাম্মাদঃ ১৫)
২। গাস্সাক: অতিশয় দুর্গন্ধময় তিক্ত অথবা নিরতিশয় শীতল পানীয়। (স্বাদঃ ৫৭, নাবাঃ ২৫)
৩। সাদীদ: জাহান্নামীদের পচনশীল ক্ষত-নির্গত পুঁজ-রক্ত বা ঘাম; যা তাদেরকে পান করতে দেওয়া হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন, "তাদের প্রত্যেকের সম্মুখে রয়েছে জাহান্নাম এবং প্রত্যেককে পান করানো হবে পুঁজমিশ্রিত পানি। যা সে অতি কষ্টে এক ঢোক এক ঢোক করে গিলতে থাকবে এবং তা গিলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে; সর্বদিক হতে তার নিকট আসবে মৃত্যু-যন্ত্রণা, কিন্তু তার মৃত্যু ঘটবে না এবং তার পরে থাকবে কঠোর শাস্তি।" (ইব্রাহীমঃ ১৬-১৭)
৪। গলিত ধাতু অথবা তৈলকিটের ন্যায় কৃষ্ণবর্ণ, গাঢ় ও দুর্গন্ধময় পানীয়ঃ "তারা পানীয় চাইলে তাদেরকে দেওয়া হবে গলিত ধাতুর ন্যায় পানীয়; যা তাদের মুখমন্ডল দগ্ধ করবে; কত নিকৃষ্ট সেই পানীয় এবং কত নিকৃষ্ট সেই (অগ্নির) আশ্রয়স্থল।" (কাহফঃ ২৯)
জাহান্নামীদের পোষাক হবে আলকাতরা, (ইব্রাহীমঃ ৫০) লোহা এবং আগুনের। তাদের মাথার উপর ফুটন্ত পানি ঢালা হবে, যাতে ওদের চামড়া এবং ওদের উদরে যা আছে তা গলে যাবে। আর ওদের জন্য থাকবে লৌহ-মুদগর বা সাঁড়াশি। যখনই ওরা যন্ত্রণাকাতর হয়ে জাহান্নাম হতে বের হতে চাইবে, তখনই তাদেরকে আবার ওখানেই ফিরিয়ে দিয়ে বলা হবে, 'আস্বাদ কর দহন যন্ত্রণা!' (হাজ্জঃ ১৯-২২)

জাহান্নামীদের জন্য প্রস্তুত রয়েছে ৪ শৃঙ্খল। (দাহর: ৪) যার দৈর্ঘ্য সত্তর হাত। (হাক্কাহঃ ৩২) এবং ওদের গলদেশে বেড়ি পরানো হবে। (সাবাঃ ৩৩) আর ওদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে পদবেড়িও। (মুয্যাম্মিলঃ ১২)
অধিক ও চিরস্থায়ী শাস্তি আস্বাদন করাবার জন্য যখনই অগ্নিদাহে তাদের চর্ম দগ্ধ হবে, তখনই ওর স্থলে নূতন চর্ম সৃষ্টি করা হবে। (নিসাঃ ৫৬)
তেমনি তাদের দেহের স্থূলতা অত্যন্ত বৃদ্ধি করা হবে। একজন কাফেরের দুই স্কন্ধের মধ্যবর্তী অংশ দ্রুতগামী আরোহীর তিন দিনের পথ-সম দীর্ঘ হবে! একটি দাঁত উহুদ পর্বতসম এবং তার চর্মের স্থূলতা হবে তিনদিনের পথ! (মুসলিম ২৮৫১-২৮৫২নং) অথবা বিয়াল্লিশ হাত। আর জাহান্নামে তার অবস্থান ক্ষেত্র হবে মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী স্থান বরাবর। (অর্থাৎ ৪২৫ কিমিঃ।) (তিরমিযী ২৫৭৭, মুসনাদ আহমাদ ২/২৬) এসব বিচিত্র হলেও আল্লাহর কাছে অবাস্তবতার কিছু নেই।
অগ্নির বেষ্টনী জাহান্নামীদেরকে পরিবেষ্টন ক'রে রাখবে। (কাহফঃ ২৯) অগ্নিদগ্ধে ওদের মুখমন্ডল বীভৎস হয়ে যাবে। (মু'মিনুনঃ ১০৪)
জাহান্নামে উটের মত বৃহদাকার এমন সর্প আছে, যদি তা একবার কাউকে দংশন করে, তবে চল্লিশ বছর তার বিষাক্ত যন্ত্রণা বিদ্যমান থাকবে। খচ্চরের মত এমন বড় বড় বিছা আছে যার দংশন-জ্বালা চল্লিশ বছর বর্তমান থাকবে। (মুসনাদ আহমাদ ৪/১৯১)
দোযখে কাফেরদেরকে উল্টা ক'রে মুখের উপর ভর দিয়ে টানা হবে। (কামারঃ ৪৮) যারা কোন অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করে, জাহান্নামে সে সেই অস্ত্র নিয়েই চিরদিন নিজেকে আঘাত করতে থাকবে। যে বিষপান ক'রে নিজের জীবননাশ করে, জাহান্নামে সে সেই বিষ চিরদিন পান করতে থাকবে। যে পাহাড়ের উপর থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে, সে জাহান্নামে চিরদিন ঐভাবে পড়তে থাকবে। (বুখারী ৫৭৭৮, মুসলিম ১০৯নং)
কেউ কেউ নিজের নাড়িভুড়ি ছেঁচড়ে টেনে নিয়ে বেড়াবে। কোন কোন কাফেরকে হস্তপদ শৃঙ্খলিত অবস্থায় জাহান্নামের কোন সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে। তখন তারা সেখানে নিজেদের ধ্বংস কামনা করবে। তখন ওদের বলা হবে, 'আজ তোমরা একবারের জন্য ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হওয়ার কামনা করতে থাক।' (ফুরক্বানঃ ১৩-১৪)
জাহান্নামে অনেকের তার পায়ের গাঁট পর্যন্ত, কারো হাঁটু পর্যন্ত, কারো কোমর পর্যন্ত এবং কারো গলা পর্যন্ত অগ্নিদগ্ধ হবে। (মুসলিম ২৮৪৫)

জাহান্নামের সবচেয়ে ছোট আযাবঃ জাহান্নামীকে আগুনের তৈরী একজোড়া জুতা পরানো হবে, যার তাপে মাথার মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকবে। এই আযাব নবী -এর পিতৃব্য আবু তালেবকে দেওয়া হবে। (মুসলিম ২১২, মিশকাত ৫৬৬৭)
আযাবের কঠিনতায় জাহান্নামীরা ভীষণ চীৎকার ও আর্তনাদ করতে থাকবে। (হ্রদঃ ১০৬) কিন্তু ওরা তো স্থায়ীভাবে জাহান্নামে শাস্তি ভোগ করবে। ওদের শাস্তি লাঘব করা হবে না এবং ওরা শাস্তি ভোগ করতে করতে হতাশ হয়ে পড়বে। (যুখরুফ : ৭৪-৭৫) ওদের মৃত্যুরও আদেশ দেওয়া হবে না, যে ওরা মরবে। ওরা আর্তনাদ করে বলবে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে নিষ্কৃতি দাও, আমরা সৎকাজ করব। পূর্বে যা করতাম তা আর করব না।' আল্লাহ বলবেন, 'আমি কি তোমাদেরকে এত দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে, তখন কেউ সতর্ক হতে চাইলে সতর্ক হতে পারত? তোমাদের নিকটে তো সতর্ককারীও এসেছিল। সুতরাং শাস্তি আস্বাদন কর; যালেমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।" (ফাত্বির: ৩৬-৩৭) ওরা আরো বলবে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! দুর্ভাগ্য আমাদেরকে ঘিরে ছিল এবং আমরা পথভ্রষ্ট হয়েছিলাম। হে আমাদের প্রতিপালক! এ অগ্নি হতে আমাদেরকে উদ্ধার কর, অতঃপর আমরা যদি পুনরায় কুফরী (অবিশ্বাস) করি, তবে তো আমরা অবশ্যই সীমা লংঘনকারী (যালেম) হব।' আল্লাহ বলবেন, 'তোরা হীন অবস্থায় এখানেই থাক এবং আমার সঙ্গে কোন কথা বলিস না। আমার বান্দাদের মধ্যে একদল ছিল যারা বলত, হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা ঈমান এনেছি (বিশ্বাস স্থাপন করেছি) তুমি আমাদের ক্ষমা কর ও দয়া কর, তুমি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। কিন্তু তাদেরকে (মুমিন দলকে) নিয়ে তোমরা উপহাস (ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ) করতে এত বিভোর ছিলে যে, তা তোমাদেরকে আমার কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল। তোমরা তো তাদের (ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের) কে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করতে। আমি আজ তাদের ধৈর্যের কারণে তাদেরকে এমনভাবে পুরস্কৃত করলাম যে, তারাই হল সফলকাম।" (মু’মিনুনঃ ১০৬-১১০)
"ওরা অসহ্য যন্ত্রণায় মৃত্যু কামনা করবে এবং চীৎকার করে বলবে, হে মালেক (দোযখের অধিকর্তা)! তোমার প্রতিপালক আমাদেরকে নিঃশেষ করে দিন।' সে বলবে, 'তোমরা তো এভাবেই অবস্থান করবে।' আল্লাহ বলবেন, 'আমি তো তোমাদের নিকট সত্য পৌঁছায়ে ছিলাম, কিন্তু তোমাদের অধিকাংশই তো সত্য বিমুখ ছিল।" (যুখরুফঃ ৭৭-৭৮)
জাহান্নামীরা কেঁদে এত অশ্রু ঝরাবে যে, তাতে নদী প্রবাহিত হবে এবং তার উপর নৌকা চলাও সম্ভব হবে। তারা রক্তের অশ্রুও ঝরাবে। (সঃ জামে' ২০৩২নং) গোনাহগার তাওহীদবাদী মুসলিমগণ নিজ নিজ গোনাহের পরিমাণ অনুযায়ী কিছুকাল জাহান্নামে শাস্তি ভোগ করবে। অতঃপর আল্লাহর রহমতে এবং শাফাআতকারীর শাফাআতে তাওহীদের গুণে জাহান্নাম থেকে অব্যাহতি পেয়ে জান্নাতবাসী হবে। কিন্তু জাহান্নামের দাগ থেকে যাবে তাদের দেহে। দোযখের অধিকাংশ অধিবাসী হবে নারী। (বুখারী ৬৫৪৬, মুসলিম ৭৯নং)
জাহান্নামে অধিকাংশ মানব-দানব নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। তুমি কি পূর্ণ হয়ে গেছ? জাহান্নাম বলবে, 'আরও আছে কি?' (কাফ: ৩০) তখন আল্লাহ পাক নিজের কদম (পা) দোযখে রাখবেন। তখন সংকুচিত হয়ে সে বলবে, 'ব্যস, ব্যস্।' (বুখারী ৭৩৮৪, মুসলিম ২৮৪৮নং)

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 মহাপাপী কি কাফের ও চিরস্থায়ী জাহান্নামী?

📄 মহাপাপী কি কাফের ও চিরস্থায়ী জাহান্নামী?


আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি যে, পাপ সাধারণতঃ ৩ প্রকার: অতি মহাপাপ, মহাপাপ ও উপপাপ।
এও জেনেছি যে, অতি মহাপাপের পাপী কাফের এবং তওবা ক'রে মারা না গেলে চিরস্থায়ী জাহান্নামী। আর উপপাপ বিভিন্ন নেক আমলের কারণে মোচন হয়ে যায়।
বাকী থাকল মহাপাপের পাপী। সে কি কাফের এবং তওবা ক'রে না মরলে পরকালে চিরস্থায়ী জাহান্নামী? কিছু দলীল দ্বারা বোঝা যায় যে, যে কাবীরা গোনাহ করবে, সে কাফের হয়ে যাবে এবং সে চিরস্থায়ী জাহান্নামবাসী হবে। যেমনঃ-
মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا } (۹۳) সূরা নিসা।
"যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন বিশ্বাসীকে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম। সেখানে সে চিরকাল থাকবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে অভিসম্পাত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত ক'রে রাখবেন।" (নিসাঃ ৯৩)

{الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسَّ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا وَأَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا فَمَن جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّهِ فَانتَهَى فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ وَمَنْ عَادَ فَأُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ}
"যারা সূদ খায় তারা (কিয়ামতে) সেই ব্যক্তির মত দন্ডায়মান হবে, যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল ক'রে দিয়েছে। তা এ জন্য যে তারা বলে, 'ব্যবসা তো সূদের মতই।' অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ ও সুদকে অবৈধ করেছেন। অতএব যার কাছে তার প্রতিপালকের উপদেশ এসেছে, তারপর সে (সূদ খাওয়া থেকে) বিরত হয়েছে, সুতরাং (নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বে) যা অতীত হয়েছে, তা তার (জন্য ক্ষমার্হ হবে), আর তার ব্যাপার আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। কিন্তু যারা পুনরায় (সূদ খেতে) আরম্ভ করবে, তারাই দোযখবাসী; সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।" (বাক্বারাহঃ ২৭৫)

{وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ} (৪৪) সূরা মায়িদাহ
"আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই অবিশ্বাসী (কাফের)।" (মায়িদাহঃ ৪৪)

মহানবী বলেছেন,
(( مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السَّلاحَ فَلَيْسَ مِنَّا ، وَمَنْ غَشَنَا فَلَيْسَ مِنَّا )) .
"সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমাদের উপর অস্ত্র তোলে। আর যে আমাদেরকে ধোঁকা দেয়, সেও আমাদের দলভুক্ত নয়।" (মুসলিম ২৯৪-২৯৫, ইবনে মাজাহ ২২২৪, তিরমিযী ১৩১৫, আবু দাউদ ৩৪৫২নং)
উক্ত হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, যে ব্যক্তি নবী বা মুসলিমদের দলভুক্ত নয়, সে কাফের।

لا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَسْرِقُ السَّارِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ ..
"কোন ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে ব্যভিচার করতে পারে না। কোন চোর যখন চুরি করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে চুরি করতে পারে না এবং কোন মদ্যপায়ী যখন মদ্যপান করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে মদ্যপান করতে পারে না।" (বুখারী ২৪৭৫, মুসলিম ২১১নং, আসহাবে সুনান)
উক্ত হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, উক্ত শ্রেণীর অপরাধীরা ঐ সকল অপরাধ করলে মু'মিন থাকে না।

سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ ..
"মুসলিমকে গালাগালি করা ফাসেকী এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা কুফরী।" (বুখারী ৪৮, মুসলিম ২৩০নং)

(( اثْنَتَانِ فِي النَّاسِ هُمَا بِهِمْ كُفْرُ : الطَّعْنُ فِي النَّسَبِ ، وَالنِّيَاحَةُ عَلَى الْمَيِّتِ )).
"মানুষের মধ্যে দুটো আচরণ এমন পাওয়া যায়, যা তাদের ক্ষেত্রে কুফরী; বংশে খোঁটা দেওয়া ও মৃতের জন্য মাতম ক'রে কান্না করা।" (মুসলিম ২৩৬নং)

এ ছাড়া অনুরূপ আরো হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, কাবীরা গোনাহ করলে মুসলিম কাফের হয়ে যায়। অনেক এমন হাদীস রয়েছে, যা পড়লে মনে হয়, কাবীরা গোনাহ করলে জান্নাত প্রবেশ করা যায় না।
(( لَا يَدْخُلُ الجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ ))
"যার অন্তরে অণু পরিমাণও অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (মুসলিম ২৭৫নং)

(( وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ ، وَاللَّهِ لا يُؤْمِنُ ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ ! )) قِيلَ : مَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ ؟ قَالَ : (( الَّذِي لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ ! )). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়।" জিজ্ঞেস করা হল, 'কোন ব্যক্তি? হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকে না।"
মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদে থাকে না। (বুখারী ৬০১৬, মুসলিম ১৮১নং)

(( مَن ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ غَيْرُ أَبِيهِ ، فَالجَنَّةُ عَلَيْهِ حَرَامٌ )). متفق عَلَيْهِ
"যে ব্যক্তি নিজ পিতা ছাড়া অন্যকে পিতা বলে দাবী করে, অথচ সে জানে যে, সে তার পিতা নয়, তার জন্য জান্নাত হারাম।" (বুখারী ৬৭৬৬, মুসলিম ২২৮নং)

কিন্তু সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আসলে সঠিকতা থেকে বহু ক্রোশ দূরে। যেহেতু একই বিষয়ে কিছু আয়াত বা হাদীস সামনে রেখে কিছুকে বর্জন বা দৃষ্টিচ্যুত করা কোন আলেমের কাজ নয়। আলেমের কাজ হল, একই বিষয়ীভূত সকল আয়াত ও হাদীসকে পাশাপাশি রেখে তবেই সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। পরন্তু বিদআতীদের আচরণ হল, নিজেদের বিদআতের সমর্থক আয়াত ও হাদীস উল্লেখ ক'রে নিজেদের মতকে পোক্ত করা।
বলা বাহুল্য এর বিপরীত আয়াত ও হাদীস রয়েছে, যার দ্বারা বোঝা যায় যে, কাবীরা গোনাহ করলে অপরাধী কাফের হয় না এবং কাফের-মুশরিক ছাড়া অন্য কেউ জাহান্নামে চিরস্থায়ী সাজা ভোগ করবে না। যেমন:-
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاء وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا } (٤٨) سورة النساء
"নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী (র্শিক) করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন। আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন (র্শিক) করে, সে এক মহাপাপ করে।" (নিসাঃ ৪৮)

আর মহানবী বলেছেন,
أَخْرِجُوا مِنْ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِنْ الْخَيْرِ مَا يَزْنُ شَعِيرَةً أَخْرِجُوا مِنْ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِنْ الْخَيْرِ مَا يَزِنُ ذَرَّةً أَخْرِجُوا مِنْ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِنْ الْخَيْرِ مَا يَزِنُ بُرَّةً)).
"(পরকালে) আল্লাহ বলবেন, সেই ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে বের কর, যে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে এবং তার হৃদয়ে যবের দানা পরিমাণ মঙ্গল (ঈমান) আছে। সেই ব্যক্তিকেও জাহান্নাম থেকে বের কর, যে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে। এবং তার হৃদয়ে অণু (বা ভুট্টা) পরিমাণ মঙ্গল (ঈমান) আছে। আর সেই ব্যক্তিকেও জাহান্নাম থেকে বের কর, যে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে এবং তার হৃদয়ে গমের দানা পরিমাণ মঙ্গল (ঈমান) আছে।" (আহমাদ ৩/২৭৬, তিরমিযী ২৫৯৩নং, এ হাদীসের মূল রয়েছে সহীহায়নে)

لِكُلِّ نَبِي دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ وَإِنِّى اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِّأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا .
"প্রত্যেক নবীর কবুলযোগ্য দুআ থাকে। সুতরাং প্রত্যেক নবী নিজ দুআকে সত্বর (দুনিয়াতে) প্রয়োগ করেছেন। আর আমি আমার দুআকে কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের জন্য সুপারিশের উদ্দেশ্যে লুকিয়ে জমা রেখেছি। সেই সুপারিশ---ইন শাআল্লাহ---আমার উম্মতের সেই ব্যক্তি লাভ করবে, যে আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শির্ক না ক'রে মারা যাবে।" (মুসলিম ৫১২নং)

মুআয বিন জাবাল বলেন, একদা আমি উফাইর নামক এক গাধার পিঠে নবী-এর পিছনে সওয়ার ছিলাম। তিনি বললেন, "হে মুআয! তুমি কি জান, বান্দার উপর আল্লাহর অধিকার এবং আল্লাহর উপর বান্দার অধিকার কী?" আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রসূল অধিক জানেন। তিনি বললেন,
فَإِنَّ حَقَّ اللَّهِ عَلَى الْعِبَادِ أَنْ يَعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا يُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَحَقُّ الْعِبَادِ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ لَا يُعَذِّبَ مَنْ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا .
"বান্দার উপর আল্লাহর অধিকার হল এই যে, বান্দা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না। আর আল্লাহর উপর বান্দার অধিকার হল এই যে, তাঁর সাথে যে শরীক করে না তাকে আযাব দেবেন না।" (বুখারী ২৮৫৬, মুসলিম ১৫৩নং)

مَنْ مَاتَ لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ».
"যে ব্যক্তি কোন কিছুকে আল্লাহর শরীক (শিক) না করে মারা যাবে, সে ব্যক্তি বেহেশ্তে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি কোন কিছুকে আল্লাহর শরীক (শিক) করে মারা যাবে, সে ব্যক্তি দোযখ প্রবেশ করবে।" (মুসলিম ২৭৯নং)

ذَاكَ جِبْرِيلُ أَتَانِي فَقَالَ : مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِكَ لَا يُشْرِكْ بِاللَّهِ شَيْئاً دَخَلَ الْجَنَّةَ ))
"জিব্রাঈল আমার কাছে এসে বললেন, 'আপনার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না ক'রে মরবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' অতঃপর নবী জিবরীলকে অথবা আবু যার নবী-কে বললেন, 'যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে তবুও কি?' তিনি বললেন, "যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে।" (বুখারী ৬৪৪৪, মুসলিম ২৩৫১নং)

((مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ صَادِقًا مِنْ قَلْبِهِ دَخَلَ الْجَنَّةَ)).
"যে ব্যক্তি সত্য-চিত্তে (ইখলাসের সাথে) "আশহাদু আল লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ, অআন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ" বলবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।" (আহমাদ ২২০০৩, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৭, সিঃ সহীহাহ ২২৭৮নং)

অবশ্য এখানে এ ধারণাও সঠিক নয় যে, ঈমান বা কালেমা নিয়ে কোন আমল ছাড়াই জান্নাতে যাওয়া যাবে। যেহেতু সেটা হবে একপেশে ফায়সালা প্রথমটার বিপরীত। প্রথম মত পোষণকারীরা ধারণা করে, কাবীরা গোনাহ করলে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে। আর তারা হল খাওয়ারেজ সম্প্রদায়। দ্বিতীয় মত পোষণকারীদের ধারণা হল, সৎকর্ম না থাকলেও কেবল কালেমা পড়লেই জান্নাত লাভ করা যাবে এবং ঈমানের সাথে আমল না হলেও চলবে। আর তারা হল মুর্জিয়াহ সম্প্রদায়। উভয় ফির্কাই বিদআতী ও বাতিলপন্থী। সঠিক হল সকল আয়াত ও হাদীস দ্বারা উপলব্ধ মত মাঝামাঝি মত, আহলে সুন্নাহ অল-জামাআহর মত। আর তা হল নিম্নরূপঃ-
১। কাবীরা গোনাহ করলে মুসলিম কাফের হয় না; যদি সে তা হালাল মনে না করে।
২। কিয়ামতে এমন মুসলিম মহান আল্লাহর ইচ্ছাধীন হবে। তিনি চাইলে তাকে পাপ মাফ ক'রে বেহেশতে দেবেন। না চাইলে জাহান্নামে শাস্তি ভুগিয়ে একদিন না একদিন বেহেশতে প্রবেশ করাবেন।
৩। সে জাহান্নামে গেলেও সেখানে চিরস্থায়ী থাকবে না।
৪। মুসলিম সদা সতর্ক থাকবে, যাতে সে কোন কাবীরা গোনাহ না করে। কারণ নিয়ত অনুসারে তা কুফরী হয়ে যেতে পারে। নচেৎ জাহান্নামে তার উপযুক্ত শাস্তি ভোগ করতে হতে পারে।

যে সকল শরয়ী উক্তিতে কাবীরা গোনাহর গোনাহগারকে 'মু'মিন নয়' বলা হয়েছে, তার অর্থ হল, সে পূর্ণ মু'মিন নয়। অপূর্ণ মু'মিন।
যাতে বলা হয়েছে, 'সে আমাদের দলভুক্ত নয়', তার অর্থ হল, আমাদের অনুসারী সে কাজ করতে পারে না। সে আমাদের আদর্শের অনুসারী নয়।
যে কাবীরা গোনাহর কাজকে কুফরী বলা হয়েছে, তার অর্থ হল, ছোট কুফরী। যেটাকে শির্ক বলা হয়েছে, সেটার অর্থ হল, ছোট শির্ক। সেই অপরাধীর কর্ম ও আচরণ আসলে মুসলিমদের নয়, বরং কাফের ও মুশরিকদের। কোন কোন কুফরীর অর্থ অকৃতজ্ঞতার অর্থে ব্যবহার হয়েছে।
যে সকল উক্তিতে কাবীরা গোনাহর অপরাধীর ব্যাপারে জান্নাত প্রবেশ করবে না বলা হয়েছে, তার উদ্দেশ্য হল, প্রাথমিকভাবে জান্নাত প্রবেশ করবে না।
যে সকল উক্তিতে কালেমা পড়লেই জাহান্নাম হারাম বলা হয়েছে, তার উদ্দেশ্য হল, সে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে না। তার উদ্দেশ্য এই নয় যে, সে জাহান্নামেই যাবে না।
যে সকল উক্তিতে কাবীরা গোনাহর অপরাধীর ব্যাপারে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে বলা হয়েছে, তার উদ্দেশ্য হল, অপরাধীকে কঠোরভাবে ধমক দেওয়া ও সতর্ক করা। সে দীর্ঘদিন জাহান্নামে বাস করবে। অথবা যে উক্ত অপরাধকে হালাল জানবে, সে চিরস্থায়ী জাহান্নামবাসী হবে, কারণ সে কাফের।
বলা বাহুল্য, কাবীরা গোনাহর গোনাহগার কাফের হলে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হতো না এবং পূর্ণ মু'মিন হলে তাকে জাহান্নামে দেওয়া হতো না।
এই হল আহলে সুন্নাহর নীতি, সকল উক্তির উপর আমল করা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় জাল-যয়ীফ ব্যতীত কোন উক্তিকে দৃষ্টিচ্যুত না করা। তা না করলে বিদআতীদের মতো হক থেকে বহু দূরে সরে যেতে হবে।
আল্লামা ইবনে উষাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) এ ব্যাপারে উলামাগণের মতভেদ উল্লেখ করার শেষে বলেন, 'কিন্তু বলা যেতে পারে যে, আমরা এরূপ কথা বলা (মতভেদ করা) থেকে নীরব থেকে আল্লাহর নিকট এই আশা রাখব যে, তিনি (সাগীরা-কাবীরা) সকল গোনাহকেই ক্ষমা ক'রে দেবেন। বিশেষ ক'রে যখন হাদীসে বলা হয়েছে, "---তার সমুদ্রের ফেনা বরাবর পাপ হলেও মাফ হয়ে যাবে।" আর আল্লাহর কাছে এই আশা রাখব যে, কাবীরা গোনাহ থেকে বিরত না থাকলেও সে ক্ষমা সাব্যস্ত থাকবে।
বলা বাহুল্য, এ কথা বিচ্যুতি থেকে অধিক দূরে এবং আশার ব্যাপারে বেশি বলিষ্ঠ।' (বুলুগুল মারামের ব্যাখ্যাপুস্তক ৭/৫৪)

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 সারসংক্ষেপ

📄 সারসংক্ষেপ


পাপের প্রভাবে আমরা দেখলাম ইহ-পরকালের প্রতিফল ও শান্তি। পাপের পঙ্কিলতায় পৃথিবী যেন পিচ্ছিল। পাপের কালিমায় আকাশ যেন অন্ধকার। দুষ্কৃতী পাপাচারীদের পাপের ফলে জলে-স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। পাপের কারণে মানুষের অর্থ-সম্পদ, পরিবার-পরিজন ও খাদ্য-পানীয় থেকে বর্কত বিলীন হয়ে গেছে। পাপের প্রভাবে কল্যাণ হ্রাস পেয়েছে। যালেম পাপিষ্ঠদের আচরণে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। দুষ্কর্ম ও কুকর্মের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে যেন দিনের আলো ও রাতের অন্ধকার কান্না করছে। কিরামান কাতেবীন যেন তাঁদের প্রতিপালকের নিকট আদম-সন্তানের অগণিত অশ্লীলতা, নোংরামি, নির্লজ্জতা ও কদর্যতার অভিযোগ তুলছেন। পাপের আধিক্যে হৃদয়সমূহ কঠোর হয়ে গেছে। অত্যাচার ও অনাচার বৃদ্ধিশীল হয়েছে। সৃষ্টিকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছিল, সে উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে গেছে। পাপের পীড়ায় মানুষ পীড়িত আছে। যে পীড়ার নিরাময় দুরূহ। আধি ও ব্যাধি থেকে মুক্তির পথ বড় দুর্গম। আযাবের সতর্ককারী নিজ পাগড়ি বেঁধে প্রস্তুত আছে। বিপর্যয়-ঘোষক ঘোষণা দিচ্ছে আকস্মিক বিপর্যয় এসে পড়ার কথা। (আল-ফাওয়াইদ, ইবনুল কাইয়েম ৮৮-৮৯পৃঃ)

পাপের প্রভাবে আমরা দেখলাম ও বাস্তবে দেখতে পাচ্ছি, কত শত জনপদ জনশূন্য হয়ে গেছে, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে তাদের বাসস্থান। তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে গুপ্ত ও প্রকাশ্য সকল প্রকার নেয়ামত। যে দেশের সবচেয়ে বড় নেয়ামত ছিল নিরাপত্তা, সে দেশের মানুষের আর কোন নিরাপত্তা নেই। জান ও মালের নিরাপত্তা নেই, নিরাপত্তা নেই দ্বীন ও ঈমানের।
এ হল পাপের প্রতিফল ও কুপ্রভাব। যে পাপ মানুষের মনে-মগজে, দেহে ও পরিবারে, সমাজে ও দেশে বড় মন্দ প্রভাব ফেলতে পারে। দুনিয়ার সংসারকে জ্বালিয়ে ছারখার করতে পারে। সুখের বাসাতে দুঃখের আগুন সংযোগ করতে পারে।
পাপ দেহে সঞ্চারিত হলে বিষের মতো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি ক'রে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় অবিলম্বে অথবা বিলম্বে। দ্বীনদারিতে প্রবিষ্ট হলে মানুষকে বেদ্বীন ক'রে ছাড়ে। ভালোবাসায় অনুপ্রবেশ করলে ঐক্যের মহলে ফাটল সৃষ্টি করে।
পাপ সেই ঘুণ, যা সমাজের কাষ্ঠখন্ডকে ঝাঁঝরা ক'রে ছাড়ে। পাপ সেই নেকড়ে বাঘ, যা ছাগপালের সর্বনাশ ক'রে ছাড়ে। পাপ সেই নোনা, যা বিশাল অট্টালিকাকে দুর্বল ও ভঙ্গুর ক'রে ফেলে। পাপ সেই ক্যানসার, যা শরীরের রক্তকে দূষিত ক'রে ছাড়ে এবং বিনাশের দিকে অগ্রসর করে।
এ ছিল পাপের প্রভাব দুনিয়াতে। তাহলে আখেরাতে তার প্রভাব কী, তাও আমরা জেনেছি। কবরে, হাশরে ও জাহান্নামে তার ভয়ানক প্রভাবের কথা আলোচনা করেছি। আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَكَذَلِكَ نَجْزِي مَنْ أَسْرَفَ وَلَمْ يُؤْمِن بِآيَاتِ رَبِّهِ وَلَعَذَابُ الْآخِرَةِ أَشَدُّ وَأَبْقَى}
"এইভাবেই আমি তাকে প্রতিফল দেব, যে সীমালংঘন করেছে ও তার প্রতিপালকের নিদর্শনে বিশ্বাস স্থাপন করেনি। আর পরকালের শাস্তি অবশ্যই কঠোরতর ও চিরস্থায়ী।" (ত্বা-হাঃ ১২৭)
{لَهُمْ عَذَابٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَعَذَابُ الْآخِرَةِ أَشَقُّ وَمَا لَهُم مِّنَ اللَّهِ مِن وَاق}
"তাদের জন্য পার্থিব জীবনে আছে শাস্তি এবং পরকালের শাস্তি তো আরো কঠোর। আর আল্লাহর (শাস্তি) হতে রক্ষাকর্তা তাদের কেউ নেই।" (রা'দঃ ৩৪)
আল্লাহ আমাদেরকে পানাহ দিন। পানাহ দিন পাপ থেকে এবং পাপের শাস্তি থেকে। ইহকালের ও পরকালের সকল দুঃখ-কষ্ট থেকে। আমীন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00