📄 মরণের সময় ও কবরে পাপীদের অবস্থা
মরণের সময় পাপীরা পাপের কারণে ভীষণ দুরবস্থার সম্মুখীন হবে। মহান আল্লাহ তাদের এক অবস্থার কথা কুরআনে বলেছেন,
{وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ قَالَ أُوحِيَ إِلَيَّ وَلَمْ يُوحَ إِلَيْهِ شَيْءٌ وَمَن قَالَ سسَأُنزِلُ مِثْلَ مَا أُنزِلَ اللَّهُ وَلَوْ تَرَى إِذِ الظَّالِمُونَ فِي غَمَرَاتِ الْمَوْتِ وَالْمَلَائِكَةُ بَاسِطُوا أَيْدِيهِمْ أَخْرِجُوا أَنفُسَكُمُ الْيَوْمَ تُجْزَوْنَ عَذَابَ الْهُونِ بِمَا كُنتُمْ تَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ غَيْرَ الْحَقِّ وَكُنتُمْ عَنْ آيَاتِهِ تَسْتَكْبِرُونَ} (۹۳) سورة الأنعام
"যে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে কিংবা বলে, 'আমার নিকট প্রত্যাদেশ (অহী) হয়', যদিও তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় না এবং যে বলে, 'আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, আমিও ওর অনুরূপ অবতীর্ণ করব', তার চেয়ে বড় যালেম আর কে? যদি তুমি দেখতে পেতে (তখনকার অবস্থা), যখন (ঐ) যালেমরা মৃত্যু যন্ত্রণায় থাকবে, আর ফিরিস্তাগণ হাত বাড়িয়ে বলবে, 'তোমাদের প্রাণ বের কর। আজ তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি দান করা হবে; কারণ তোমরা আল্লাহ সম্বন্ধে অন্যায় বলতে ও তাঁর আয়াত গ্রহণে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে।" (আনআমঃ ৯৩ আয়াত)
মহানবী এক সুদীর্ঘ হাদীসে বলেছেন, "কাফের বান্দা, যখন সে দুনিয়া ত্যাগ করতে ও আখেরাতের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, তখন তার নিকট আসমান হতে একদল কালো চেহারাবিশিষ্ট ফিরিস্তা অবতীর্ণ হন। যাঁদের সাথে শক্ত চট থাকে। তাঁরা তার নিকট হতে দৃষ্টির সীমার দূরে বসেন। অতঃপর মালাকুল-মাওত আসেন এবং তার মাথার নিকটে বসেন। অতঃপর বলেন, 'হে খবীস রূহ (আত্মা)! বের হয়ে আয় আল্লাহর রোষের দিকে।'
এ সময় রূহ ভয়ে তার শরীরে এদিক-সেদিক পালাতে থাকে। তখন মালাকুল মাওত তাকে এমনভাবে টেনে বের করেন, যেমন লোহার গরম শলাকা ভিজে পশম হতে টেনে বের করা হয়। (আর তাতে পশম লেগে থাকে।) তখন তিনি তা গ্রহণ করেন। কিন্তু যখন গ্রহণ করেন মুহূর্তকালের জন্যও নিজের হাতে রাখেন না। বরং তা অপেক্ষমাণ ফিরিস্তাগণ তাড়াতাড়ি সেই আত্মকে দুর্গন্ধময় চটে জড়িয়ে নেন। তখন তা হতে এমন দুর্গন্ধ বের হতে থাকে, যা পৃথিবীতে প্রাপ্ত সমস্ত গলিত শবদেহের দুর্গন্ধ অপেক্ষা বেশী। তা নিয়ে তাঁরা উঠতে থাকেন। কিন্তু যখনই তাঁরা তা নিয়ে ফিরিশাদের কোন দলের নিকট পৌছেন তাঁরা জিজ্ঞাসা করেন, 'এই খবীস রূহ কার?' তখন তাঁরা তাকে দুনিয়াতে যে সকল মন্দ উপাধি দ্বারা ভূষিত করা হত তার মধ্যে সর্বাপেক্ষা মন্দ নামটি দ্বারা ভূষিত ক'রে বলেন, 'অমুকের পুত্র অমুকের।'
এইভাবে তাকে প্রথম আসমান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। অতঃপর তার জন্য আসমানের দরজা খুলে দিতে চাওয়া হয়; কিন্তু খুলে দেওয়া হয় না। এ সময় নবী এর সমর্থনে কুরআনের আয়াতটি পাঠ করলেন,
{إِنَّ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَاسْتَكْبَرُوا عَنْهَا لَا تُفَتَّحُ لَهُمْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَلَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى يَلِجَ الْجَمَلُ فِي سَمِّ الْخِيَاطِ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُجْرِمِينَ} (٤٠) الأعراف
অর্থাৎ, অবশ্যই যারা আমার নিদর্শনাবলীকে মিথ্যা বলে এবং অহংকারে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের জন্য আকাশের দ্বার উন্মুক্ত করা হবে না এবং তারা বেহেশ্বেও প্রবেশ করতে পারবে না; যতক্ষণ না সূচের ছিদ্রপথে উট প্রবেশ করে। এরূপে আমি অপরাধীদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকি। (আ'রাফঃ ৪০)
তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, "তার ঠিকানা 'সিজ্জীন'-এ লিখ; জমিনের সর্বনিম্ন স্তরে। সুতরাং তার রূহকে জমিনে খুব জোরে নিক্ষেপ করা হয়। এ সময় মহানবী এর সমর্থনে এই আয়াতটি পাঠ করলেন,
{وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَاء فَتَخْطَفُهُ الطَّيْرُ أَوْ تَهْوِي بِهِ الرِّيحُ فِي مَكَانِ سحيق } (۳۱) سورة الحج
অর্থাৎ, যে আল্লাহর সাথে শরীক করেছে সে যেন আকাশ হতে পড়েছে, অতঃপর পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেছে অথবা ঝঞ্চা তাকে বহু দূরে নিক্ষিপ্ত করেছে। (সূরা হাজ্জ ৩১ আয়াত)
সুতরাং তার রূহ তার দেহে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তখন তার নিকট দুইজন ফিরিস্তা আসেন এবং তাকে উঠিয়ে বসান। অতঃপর তাঁরা তাকে জিজ্ঞাসা করেন, 'তোমার পরওয়ারদেগার কে?' সে বলে, 'হায়, হায়, আমি তো জানি না।' অতঃপর জিজ্ঞাসা করেন, 'তোমার দ্বীন কি?' সে বলে, 'হায়, হায়, আমি তো জানি না।' তারপর জিজ্ঞাসা করেন, 'তোমাদের মধ্যে যিনি প্রেরিত হয়েছিলেন, তিনি কে?' সে বলে, 'হায়, হায় আমি তাও তো জানি না।'
এ সময় আকাশের দিক হতে আকাশ বাণী হয় (এক ঘোষণাকারী ঘোষণা করেন), 'সে মিথ্যা বলেছে। সুতরাং তার জন্য দোযখের বিছানা বিছিয়ে দাও এবং দোযখের দিকে একটি দরজা খুলে দাও।
সুতরাং তার দিকে দোযখের উত্তাপ ও লু আসতে থাকে এবং তার কবর তার প্রতি এত সংকুচিত হয়ে যায়; যাতে তার এক দিকের পাঁজরের হাড় অপর দিকে ঢুকে যায়। এ সময় তার নিকট একটা অতি কুৎসিত চেহারাবিশিষ্ট নোংরাবেশী দুর্গন্ধযুক্ত লোক আসে এবং বলে, 'তোমাকে দুঃখিত করবে এমন জিনিসের দুঃসংবাদ গ্রহণ কর! এই দিবস সম্পর্কেই (দুনিয়াতে) তোমাকে ওয়াদা দেওয়া হত।' তখন সে জিজ্ঞাসা করে, 'তুমি কে? কী কুৎসিত তোমার চেহারা; যা মন্দ সংবাদ বহন করে!' সে বলে, 'আমি তোমার সেই বদ আমল; যা তুমি দুনিয়াতে করতে।' তখন সে বলে, 'আল্লাহ! কিয়ামত কায়েম করো না। (নচেৎ তখন আমার উপায় থাকবে না।) (আহমাদ ৪/২৮৭-২৮৮; আবুদাউদ ৪৭৫৩নং)
মধ্যজগতে আযাবের একটি নমুনা মহানবী স্বপ্নের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
তিনি প্রায়ই তাঁর সাহাবীদেরকে বলতেন, "তোমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি?" রাবী বলেন, যার ব্যাপারে আল্লাহর ইচ্ছা সে তাঁর কাছে স্বপ্ন বর্ণনা করত। তিনি একদিন সকালে বললেন, "গতরাত্রে আমার কাছে দুজন আগন্তুক এল। তারা আমাকে উঠাল, আর বলল, 'চলুন।' আমি তাদের সাথে চলতে লাগলাম। অতঃপর আমরা কাত হয়ে শোয়া এক ব্যক্তির নিকট পৌঁছলাম। দেখলাম, অপর এক ব্যক্তি তার নিকট পাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার মাথায় পাথর নিক্ষেপ করছে। ফলে তার মাথা ফাটিয়ে ফেলছে। আর পাথর গড়িয়ে সরে পড়ছে। তারপর আবার সে পাথরটির অনুসরণ ক'রে তা পুনরায় নিয়ে আসছে। ফিরে আসতে না আসতেই লোকটির মাথা আগের মত পুনরায় ভাল হয়ে যাচ্ছে। ফিরে এসে আবার একই আচরণ করছে; যা প্রথমবার করেছিল। (তিনি বলেন,) আমি সাথীদ্বয়কে বললাম, 'সুবহানাল্লাহ! এটা কী?' তারা আমাকে বলল, 'চলুন, চলুন।'
সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম, তারপর চিৎ হয়ে শোয়া এক ব্যক্তির কাছে পৌঁছলাম। এখানেও দেখলাম, তার নিকট এক ব্যক্তি লোহার আঁকড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর সে তার চেহারার একদিকে এসে এর দ্বারা তার কশ থেকে মাথার পিছনের দিক পর্যন্ত এবং একইভাবে নাকের ছিদ্র থেকে মাথার পিছনের দিক পর্যন্ত এবং অনুরূপভাবে চোখ থেকে মাথার পিছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলছে। তারপর ঐ লোকটি শোয়া ব্যক্তির অপরদিকে যাচ্ছে এবং প্রথম দিকের সাথে যেরূপ আচরণ করেছে অনুরূপ আচরণই অপর দিকের সাথেও করছে। ঐ দিক হতে অবসর হতে না হতেই প্রথম দিকটি আগের মত ভাল হয়ে যাচ্ছে। তারপর আবার প্রথম বারের মত আচরণ করছে। (তিনি বলেন,) আমি বললাম, 'সুবহানাল্লাহ! এরা কারা?' তারা আমাকে বলল, 'চলুন, চলুন।'
সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম এবং (তন্দুর) চুলার মত একটি গর্তের কাছে পৌঁছলাম। (বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয়, যেন তিনি বললেন,) আর সেখানে শোরগোল ও নানা শব্দ ছিল। আমরা তাতে উকি মেরে দেখলাম, তাতে বেশ কিছু উলঙ্গ নারী-পুরুষ রয়েছে। আর নীচ থেকে নির্গত আগুনের লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করছে। যখনই লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করছে, তখনই তারা উচ্চরবে চিৎকার ক'রে উঠছে। আমি বললাম, 'এরা কারা?' তারা আমাকে বলল, 'চলুন, চলুন।'
সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম এবং একটি নদীর কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। (বর্ণনাকারী বলেন, আমার যতদূর মনে পড়ে, তিনি বললেন,) নদীটি ছিল রক্তের মত লাল। আর দেখলাম, সেই নদীতে এক ব্যক্তি সাঁতার কাটছে। আর নদীর তীরে অপর এক ব্যক্তি রয়েছে এবং সে তার কাছে অনেকগুলো পাথর একত্রিত ক'রে রেখেছে। আর ঐ সাঁতার-রত ব্যক্তি বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কাটার পর সেই ব্যক্তির কাছে ফিরে আসছে, যে তার নিকট পাথর একত্রিত ক'রে রেখেছে। সেখানে এসে সে তার সামনে মুখ খুলে দিচ্ছে এবং ঐ ব্যক্তি তার মুখে একটি পাথর ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তারপর সে চলে গিয়ে আবার সাঁতার কাটছে এবং আবার তার কাছে ফিরে আসছে। আর যখনই ফিরে আসছে তখনই ঐ ব্যক্তি তার মুখে পাথর ঢুকিয়ে দিচ্ছে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, 'এরা কারা?' তারা বলল, 'চলুন, চলুন।'
সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম এবং এমন একজন কুৎসিত ব্যক্তির কাছে এসে পৌঁছলাম, যা তোমার দৃষ্টিতে সর্বাধিক কুৎসিত বলে মনে হয়। আর দেখলাম, তার নিকট রয়েছে আগুন, যা সে জ্বালাচ্ছে ও তার চারিদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, 'ঐ লোকটি কে?' তারা বলল, 'চলুন, চলুন।'
সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম এবং একটা সবুজ-শ্যামল বাগানে এসে উপস্থিত হলাম। সেখানে বসন্তের সব রকমের ফুল রয়েছে আর বাগানের মাঝে এত বেশী দীর্ঘকায় একজন পুরুষ রয়েছে, আকাশে যার মাথা যেন আমি দেখতেই পাচ্ছিলাম না। আবার দেখলাম, তার চারদিকে এত বেশী পরিমাণ বালক-বালিকা রয়েছে, যত বেশী পরিমাণ আর কখনোও আমি দেখিনি। আমি তাদেরকে বললাম, 'উনি কে? এরা কারা?' তারা আমাকে বলল, 'চলুন, চলুন।'
সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম এবং একটা বিশাল (বাগান বা) গাছের নিকট গিয়ে উপস্থিত হলাম। এমন বড় এবং সুন্দর (বাগান বা) গাছ আমি আর কখনো দেখিনি। তারা আমাকে বলল, 'এর উপরে চড়ুন।' আমরা উপরে চড়লাম। শেষ পর্যন্ত সোনা-রূপার ইটের তৈরী একটি শহরে গিয়ে আমরা উপস্থিত হলাম। আমরা শহরের দরজায় পৌঁছলাম এবং দরজা খুলতে বললাম। আমাদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হল। আমরা তাতে প্রবেশ করলাম। তখন সেখানে কতক লোক আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করল, যাদের অর্ধেক শরীর এত সুন্দর ছিল, যত সুন্দর তুমি দেখেছ, তার থেকেও অধিক। আর অর্ধেক শরীর এত কুৎসিত ছিল যত কুৎসিত তুমি দেখেছ, তার থেকেও অধিক। সাথীদ্বয় ওদেরকে বলল, 'যাও ঐ নদীতে গিয়ে নেমে পড়।' আর সেটা ছিল সুপ্রশস্ত প্রবহমান নদী। তার পানি যেন ধপধপে সাদা। ওরা তাতে গিয়ে নেমে পড়ল। অতঃপর ওরা আমাদের কাছে ফিরে এল। দেখা গেল, তাদের ঐ কুশ্রী রূপ দূর হয়ে গেছে এবং তারা খুবই সুন্দর আকৃতির হয়ে গেছে। (তিনি বলেন,) তারা আমাকে বলল, 'এটা জান্নাতে আদন এবং ওটা আপনার বাসস্থান।' (তিনি বলেন,) উপরের দিকে আমার দৃষ্টি গেলে, দেখলাম ধপধপে সাদা মেঘের মত একটি প্রাসাদ রয়েছে। তারা আমাকে বলল, 'ঐটা আপনার বাসগৃহ।' (তিনি বললেন,) আমি তাদেরকে বললাম, 'আল্লাহ তোমাদের মাঝে বরকত দিন, আমাকে ছেড়ে দাও; আমি এতে প্রবেশ করি।' তারা বলল, 'আপনি অবশ্যই এতে প্রবেশ করবেন। তবে এখন নয়।'
আমি বললাম, 'আমি রাতে অনেক বিস্ময়কর ব্যাপার দেখতে পেলাম, এগুলোর তাৎপর্য কী?' তারা আমাকে বলল, 'আচ্ছা আমরা আপনাকে বলে দিচ্ছি। ঐ যে প্রথম ব্যক্তিকে যার কাছে আপনি পৌঁছলেন, যার মাথা পাথর দিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হচ্ছিল, সে হল ঐ ব্যক্তি যে কুরআন গ্রহণ ক'রে---তা বর্জন করে। আর ফরয নামায ছেড়ে ঘুমিয়ে থাকে।
আর ঐ ব্যক্তি যার কাছে গিয়ে দেখলেন যে, তার কশ থেকে মাথার পিছনের দিক পর্যন্ত এবং একইভাবে নাকের ছিদ্র থেকে মাথার পিছনের দিক পর্যন্ত এবং অনুরূপভাবে চোখ থেকে মাথার পিছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলা হচ্ছিল। সে হল ঐ ব্যক্তি যে সকালে আপন ঘর থেকে বের হয়ে এমন মিথ্যা বলে, যা চতুর্দিক ছড়িয়ে পড়ে।
আর যে সকল উলঙ্গ নারী-পুরুষ যারা (তন্দুর) চুলা সদৃশ গর্তের অভ্যন্তরে রয়েছে, তারা হল ব্যভিচারী-ব্যভিচারিণীর দল।
আর ঐ ব্যক্তি যার কাছে পৌঁছে দেখলেন যে, সে নদীতে সাঁতার কাটছে ও তার মুখে পাথর ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে সে হল সুদখোর।
আর ঐ কুৎসিত ব্যক্তি যে আগুনের কাছে ছিল এবং আগুন জ্বালাচ্ছিল আর তার চারপাশে ছুটে বেড়াচ্ছিল। সে হল মালেক (ফিরিশ্তা); জাহান্নামের দরোগা। আর ঐ দীর্ঘকায় ব্যক্তি যিনি বাগানে ছিলেন। তিনি হলেন ইব্রাহীম। আর তাঁর চারপাশে যে বালক-বালিকারা ছিল, ওরা হল তারা, যারা (ইসলামী) প্রকৃতি নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।"
বারক্বানীর বর্ণনায় আছে, "ওরা তারা, যারা (ইসলামী) প্রকৃতি নিয়ে জন্মগ্রহণ ক'রে (মৃত্যুবরণ করেছে)।" তখন কিছু সংখ্যক মুসলিম জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আল্লাহর রসূল! মুশরিকদের শিশু-সন্তানরাও কি (সেখানে আছে)?' রাসূলুল্লাহ বললেন, "মুশরিকদের শিশু-সন্তানরাও (সেখানে আছে)।
আর ঐ সব লোক যাদের অর্ধেকাংশ অতি সুন্দর ও অর্ধেকাংশ অতি কুৎসিত ছিল, তারা হল ঐ সম্প্রদায় যারা সৎ-অসৎ উভয় প্রকারের কাজ মিশ্রিতভাবে করেছে। আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা ক'রে দিয়েছেন।"
অন্য এক বর্ণনায় আছে, "আজ রাতে আমি দেখলাম, দু'টি লোক এসে আমাকে পবিত্র ভূমির দিকে বের করে নিয়ে গেল।" অতঃপর ঘটনা বর্ণনা করলেন। তিনি বললেন, "সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম এবং (তন্দুর) চুলার মত একটি গর্তের কাছে পৌঁছলাম; যার উপর দিকটা সংকীর্ণ ছিল এবং নিচের দিকটা প্রশস্ত। তার নিচে আগুন জ্বলছিল। তার মধ্যে উলঙ্গ বহু নারী-পুরুষ ছিল। আগুন যখন উপর দিকে উঠছিল, তখন তারাও (আগুনের সাথে) উপরে উঠছিল। এমনকি প্রায় তারা (চুলা) থেকে বের হওয়ার উপক্রম হচ্ছিল। আর যখন আগুন স্তিমিত হয়ে নেমে যাচ্ছিল, তখন (তার সাথে) তারাও নিচে ফিরে যাচ্ছিল।"
এই বর্ণনায় আছে, "একটি রক্তের নদীর কাছে এলাম।" বর্ণনাকারী এতে সন্দেহ করেননি। "সেই নদীর মাঝখানে একটি লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর নদীর তীরে একটি লোক রয়েছে, যার সামনে পাথর রয়েছে। অতঃপর নদীর মাঝের লোকটি যখন উঠে আসতে চাচ্ছে, তখন তীরের লোকটি তাকে পাথর ছুঁড়ে মেরে সেই দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে, যেখানে সে ছিল। এইভাবে যখনই সে নদী থেকে বের হয়ে আসতে চাচ্ছে, তখনই ঐ লোকটি তার মুখে পাথর ছুঁড়ে মারছে। ফলে সে যেখানে ছিল, সেখানে ফিরে যাচ্ছে।"
এই বর্ণনায় আরো আছে, "তারা উভয়ে আমাকে নিয়ে ঐ (বাগান বা) গাছে উঠে গেল। অতঃপর সেখানে এমন একটি গৃহে আমাকে প্রবেশ করাল, যার চেয়ে অধিক সুন্দর গৃহ আমি কখনো দেখিনি। সেখানে বহু বৃদ্ধ ও যুবক লোক ছিল।"
এই বর্ণনায় আরো আছে, "আর যাকে আপনি তার নিজ কশ চিরতে দেখলেন, সে হল বড় মিথ্যুক; যে মিথ্যা কথা বলত, অতঃপর তা তার নিকট থেকে বর্ণনা করা হত। ফলে তা দিকচক্রবালে পৌঁছে যেত। অতএব এই আচরণ তার সাথে কিয়ামত পর্যন্ত করা হবে।"
এই বর্ণনায় আরো আছে, "যার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করতে দেখলেন, সে ছিল এমন ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ কুরআন শিখিয়েছিলেন। কিন্তু সে (তা ভুলে) রাতে ঘুমিয়ে থাকত এবং দিনে তার উপর আমল করত না। অতএব এই আচরণ তার সাথে কিয়ামত পর্যন্ত করা হবে। আর প্রথম যে গৃহটি আপনি দেখলেন, তা হল সাধারণ মু'মিনদের। পক্ষান্তরে এই গৃহটি হল শহীদদের। আমি জিবরীল, আর ইনি মীকাঈল। অতএব আপনি মাথা তুলুন। সুতরাং আমি মাথা তুললাম। তখন দেখলাম, আমার উপর দিকে মেঘের মত কিছু রয়েছে। তাঁরা বললেন, 'ওটি হল আপনার গৃহ।' আমি বললাম, 'আপনারা আমাকে ছেড়ে দিন, আমি আমার গৃহে প্রবেশ করি।' তাঁরা বললেন, '(দুনিয়াতে) আপনার আয়ু অবশিষ্ট আছে; যা আপনি পূর্ণ করেননি। যখন আপনি তা পূর্ণ করবেন, তখন আপনি আপনার গৃহে চলে আসবেন।" (বুখারী ১৩৮৬নং)
📄 কিয়ামতে কাফেরদের অবস্থা
কিয়ামতের দিন, শেষ বিচারের দিন, পঞ্চাশ হাজার বছরের দিন! সেদিন অপরাধ হিসাবে এক-এক অপরাধীর অবস্থা হবে এক-এক রকম।
সেদিন কাফেরদেরকে ওদের মুখে ভর দিয়ে চলা অবস্থায় সমবেত করা হবে।
"কিয়ামতের দিন আমি তাদেরকে সমবেত করব তাদের মুখে ভর দিয়ে চলা অবস্থায়; অন্ধ, বোবা ও কালা ক'রে। তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম; যখনই তা স্তিমিত হবে, তখনই আমি তাদের জন্য অগ্নি বৃদ্ধি ক'রে দেব। এটাই তাদের প্রতিফল। কারণ তারা আমার নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করেছিল ও বলেছিল, 'আমরা অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হলেও কি নতুন সৃষ্টিরূপে পুনরুত্থিত হব?" (বানী ইস্রাঈলঃ ৯৭-৯৮)
"সে দিন তারা কবর হতে বের হবে দ্রুত বেগে; (মনে হবে) যেন তারা কোন একটি লক্ষ্যস্থলের দিকে ধাবিত হচ্ছে। অবনত নেত্রে; হীনতা তাদেরকে আচ্ছন্ন করবে। এটাই সেই দিন, যার বিষয়ে তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।" (মাআ'রিজঃ ৪৩-৪৪)
"অপমানে অবনমিত নেত্রে কবর হতে বের হবে বিক্ষিপ্ত পঙ্গপালের ন্যায়। তারা আহবানকারীর দিকে ছুটে আসবে ভীত-বিহ্বল হয়ে। অবিশ্বাসীরা বলবে, 'এ তো কঠিন দিন।" (ক্বামারঃ ৭-৮)
"তুমি কখনো মনে করো না যে, সীমালংঘনকারীরা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ উদাসীন। আসলে তিনি সেদিন পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দেন, যেদিন সকল চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। ভীত-বিহ্বল চিত্তে আকাশের দিকে চেয়ে তারা ছুটাছুটি করবে নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে না এবং তাদের অন্তর হবে (জ্ঞান) শূন্য।" (ইব্রাহীমঃ ৪২-৪৩)
"ওদেরকে আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দাও, যখন দুঃখে-কষ্টে ওদের হৃদয় কণ্ঠাগত হবে। সীমালংঘনকারীদের জন্য অন্তরঙ্গ কোন বন্ধু নেই এবং এমন কোন সুপারিশকারীও নেই, যার সুপারিশ গ্রাহ্য করা হবে।" (মু'মিনঃ ১৮)
"সেদিন তুমি অপরাধীদেরকে দেখবে শিকল দ্বারা বাঁধা অবস্থায়। তাদের জামা হবে আলকাতরার এবং অগ্নি আচ্ছন্ন করবে তাদের মুখমণ্ডল। (ইব্রাহীমঃ ৪৯-৫০)
সূর্য অতি নিকটবর্তী হওয়ার কারণে মানুষ অত্যন্ত ঘর্মসিক্ত হবে। স্বেদস্রাবে আমল অনুযায়ী কারো পায়ের গ্রন্থি অবধি, কারো হাঁটু অবধি, কারো কটি অবধি, কারো বা নাসিকা (ও কর্ণ) পর্যন্ত ডুবন্ত হবে। (মুসলিম ১৪৭৪, মিশকাত ৫৫৪০নং) মাটির নিচে সেই ঘাম পৌঁছবে ৭০ হাত। (বুখারী, মিশকাত ৫৫৩৯নং)
সূর্য এত কাছে হওয়া সত্ত্বেও কেউ পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাবে না। কারণ, আখেরাতের শরীর পার্থিব শরীর থেকে ভিন্নতর। যেমন ৭০ গুণ তেজ আগুনে ও জাহান্নামে কেউ ভস্ম হয়ে শেষ হয়ে যাবে না।
সেদিন বড় পরিতাপের দিন! সে কঠিন দিনে আল্লাহর ভয়ঙ্কর আযাব এবং নিজের লাঞ্ছনা দেখে কাফের অত্যাধিক আফসোস ও লজ্জায় ফেটে পড়বে।
"সীমালংঘনকারী সেদিন নিজ হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবে, 'হায়! আমি যদি রসূলের সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম। হায় দুর্ভোগ আমার! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম। আমাকে অবশ্যই সে বিভ্রান্ত করেছিল আমার নিকট কুরআন পৌঁছনোর পর। আর শয়তান তো মানুষকে বিপদকালে পরিত্যাগই করে।" (ফুরক্বান: ২৭-২৯)
"যারা অবিশ্বাস করেছে এবং রসূলের অবাধ্য হয়েছে, তারা সেদিন কামনা করবে যে, যদি তারা মাটির সাথে মিশে যেত! এবং তারা (সেদিন) আল্লাহ হতে কোন কথাই গোপন করতে পারবে না।" (নিসাঃ ৪২)
"নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে আসন্ন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করলাম; সেদিন মানুষ তার কৃতকর্ম প্রত্যক্ষ করবে এবং অবিশ্বাসী বলবে, 'হায় আফশোস! যদি আমি মাটি হয়ে যেতাম।" (নাবাঃ ৪০)
সেদিন তাদের সমস্ত আমল বিফল ও ব্যর্থ করা হবে। কারণ, তাদের সব আমলই ছিল ভিত্তিহীন (তাওহীদহীন)।
"যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করে, তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকার ন্যায়; পিপাসার্ত যাকে পানি মনে ক'রে থাকে। কিন্তু সে ওর নিকট উপস্থিত হলে দেখে তা কিছুই নয় এবং সেখানে সে আল্লাহকে পায়। অতঃপর তিনি তার কর্মফল পূর্ণমাত্রায় দান করেন। আর আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর।" (নূর: ৩৯)
"যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের বিবরণ এই যে, তাদের কর্মাবলী ভষ্মের মত যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচন্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। যা তারা উপার্জন করে, তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারে না; এটাই তো ঘোর বিভ্রান্তি।" (ইব্রাহীমঃ ১৮)
"আমি ওদের কৃতকর্মগুলির প্রতি অভিমুখ ক'রে সেগুলিকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণা (স্বরূপ নিষ্ফল) ক'রে দেব।" (ফুরক্বানঃ ২৩)
"বন্ধুরা সেদিন একে অপরের শত্রু হয়ে পড়বে, তবে সাবধানীরা নয়।" (যুখরুফ: ৬৭)
সেদিন বাতিল পূজারী ও পূজিতের মাঝে বিতর্ক ও ঝগড়া হবে।
"পথভ্রষ্টদের জন্য উন্মোচিত করা হবে জাহান্নাম; ওদের বলা হবে, 'তারা কোথায় যাদের তোমরা উপাসনা করতে; আল্লাহর পরিবর্তে? ওরা কি তোমাদের সাহায্য করতে আসবে? না ওরা আত্মরক্ষা করতে সক্ষম?' অতঃপর ওদের এবং পথভ্রষ্টদের অধোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং ইবলীসের বাহিনীর সকলকেও। ওরা সেখানে বিতর্কে লিপ্ত হয়ে বলবে, 'আল্লাহর শপথ! আমরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিলাম, যখন আমরা তোমাদেরকে বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সমকক্ষ গণ্য করতাম। আমাদেরকে দুষ্কৃতকারীরাই বিভ্রান্ত করেছিল। পরিণামে আমাদের কোন সুপারিশকারী নেই এবং কোন সহৃদয় বন্ধুও নেই! হায়! যদি আমাদের একবার প্রত্যাবর্তনের সুযোগ ঘটত, তাহলে আমরা বিশ্বাসী হয়ে যেতাম!" (শুআ'রাঃ ৯১-১০২)
পূজারীরা তাদের দেব-দেবী (মূর্তি, গাছ, পাথর, কবর ইত্যাদি) গুলিকে অস্বীকার করবে।
"যেদিন কিয়ামত হবে, সেদিন অপরাধীরা হতাশ হয়ে পড়বে। ওদের শরীক (উপাস্য) গুলি ওদের জন্য সুপারিশ করবে না এবং ওরা ওদের শরীক (উপাস্য) গুলিকে অস্বীকার করবে।" (রুমঃ ১২-১৩)
"স্মরণ কর, যেদিন আমি তাদের সকলকে একত্রিত করব। অতঃপর অংশীবাদীদেরকে বলব, 'তোমরা ও তোমাদের নিরূপিত অংশীরা স্ব-স্ব স্থানে অবস্থান কর।' অতঃপর আমি তাদের পরস্পরকে পৃথক করে দেব এবং তাদের সেই অংশীরা বলবে, 'তোমরা তো আমাদের উপাসনা করতে না। বস্তুতঃ আমাদের ও তোমাদের মধ্যে আল্লাহই সাক্ষী হিসাবে যথেষ্ট যে, আমরা অবশ্যই তোমাদের উপাসনা সম্বন্ধে উদাসীন ছিলাম।' সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তিই স্বীয় পূর্ব কৃতকর্মগুলো যাচাই ক'রে নেবে এবং তাদেরকে তাদের প্রকৃত অভিভাবক (আল্লাহর) দিকে প্রত্যাবর্তিত করা হবে। আর যেসব মিথ্যা (উপাস্য) তারা বানিয়ে নিয়েছিল, সেসব তাদের নিকট থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে।" (ইউনুসঃ ২৮-৩০)
"অংশীবাদীরা যাদেরকে আল্লাহর অংশী করেছিল, তাদেরকে যখন দেখবে, তখন বলবে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! এরাই আমাদের অংশী, যাদেরকে আমরা তোমার পরিবর্তে আহবান করতাম।' অতঃপর প্রত্যুত্তরে তারা তাদেরকে বলবে, 'তোমরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।' সেদিন তারা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করবে এবং তারা যে মিথ্যা উদ্ভাবন করত, তা তাদের নিকট হতে উধাও হয়ে যাবে।" (নাহল: ৮৬-৮৭)
"যেদিন তিনি এদের সকলকে একত্রিত করবেন এবং ফিরিশাদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন, 'এরা কি তোমাদেরই পূজা করত?' ফিরিস্তারা বলবে, 'তুমি পবিত্র মহান! আমাদের সম্পর্ক তোমারই সাথে; ওদের সাথে নয়। বরং ওরা তো পূজা করত জ্বিনদের এবং ওদের অধিকাংশই ছিল তাদেরই প্রতি বিশ্বাসী।" (সাবা': ৪০-৪১)
সেদিন বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদের নেতাদের সাথে তাদের অনুগামিগণ বিতর্ক ও কলহ করবে এবং এক অপরকে দোষী মনে করবে।
"(ফিরিশাদেরকে বলা হবে,) একত্র কর অত্যাচারীদেরকে, ওদের সহচরদেরকে এবং তাদেরকে যাদের ওরা উপাসনা করত; আল্লাহর পরিবর্তে এবং ওদেরকে জাহান্নামের পথে পরিচালিত কর। আর ওদেরকে থামাও, কারণ ওদেরকে প্রশ্ন করা হবে, 'তোমাদের কী হল যে, তোমরা একে অপরের সাহায্য করছ না?' বস্তুতঃ সেদিন ওরা আত্মসমর্পণ করবে এবং ওরা একে অপরের মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে---ওরা বলবে, 'তোমরা তো ডান দিক হতে আমাদের নিকট আসতে।' এরা বলবে, 'বরং তোমরা তো বিশ্বাসীই ছিলে না এবং তোমাদের ওপর আমাদের কোন কর্তৃত্ব ছিল না; বস্তুতঃ তোমরাই ছিলে সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়। সুতরাং আমাদের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিপালকের কথা সত্য হয়েছে; আমাদেরকে অবশ্যই (শাস্তি) আস্বাদন করতে হবে। আমরা তোমাদেরকে বিভ্রান্ত করেছিলাম; কারণ আমরা নিজেরাই ছিলাম বিভ্রান্ত।' সুতরাং নিশ্চয় ওরা সকলেই সেদিন শাস্তির শরীক হবে। অপরাধীদের প্রতি আমি এরূপই ক'রে থাকি।" (স্বাফ্ফাত: ২২-৩৪)
দুর্বল শ্রেণীর মানুষ তাদের সবল মোড়ল মাতব্বরদের সাথে ঐ একই ধরনের বাদ-প্রতিবাদ করবে। এ দুর্দিনের জন্য তারা তাদের নেতাদেরকে দায়ী মনে করবে।
"সবাই আল্লাহর নিকট উপস্থিত হবে; যারা অহংকার করত দুর্বলেরা তাদেরকে বলবে, 'আমরা তো তোমাদের অনুসারী ছিলাম; এখন তোমরা কি আল্লাহর শাস্তি হতে আমাদেরকে কিছুমাত্র রক্ষা করতে পারবে?' তারা বলবে, 'আল্লাহ আমাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করলে আমরাও তোমাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করতাম; এখন আমাদের ধৈর্যচ্যুত হওয়া অথবা ধৈর্যশীল হওয়া একই কথা; আমাদের কোন নিষ্কৃতি নেই।" (ইব্রাহীমঃ ২১)
"অবিশ্বাসীরা বলে, 'আমরা এ কুরআনে কখনও বিশ্বাস করব না, এর পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহেও নয়।' আর তুমি যদি দেখতে, যখন সীমালংঘনকারীদেরকে তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে দন্ডায়মান করা হবে, তখন ওরা পরস্পরকে দোষারোপ করতে থাকবে, যারা দুর্বল (অনুসারী) ছিল তারা দাম্ভিক (অনুসৃত) দেরকে বলবে, 'তোমরা না থাকলে আমরা অবশ্যই বিশ্বাসী হতাম।' যারা দাম্ভিক (অনুসৃত) ছিল তারা দুর্বল (অনুসারী) দেরকে বলবে, 'আমরা কি তোমাদের কাছে সৎপথের উপদেশ আসার পর তা গ্রহণ করতে তোমাদেরকে বাধা দিয়েছিলাম? বরং তোমরাই তো অপরাধী ছিলে।' আর যারা দুর্বল (অনুসারী) ছিল তারা দম্ভিক (অনুসৃত) দেরকে বলবে, 'প্রকৃতপক্ষে তোমরাই তো দিন-রাত আমাদের বিরুদ্ধে চক্রান্তে লিপ্ত ছিলে, আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলে, যেন আমরা আল্লাহকে অমান্য করি এবং তাঁর অংশী স্থাপন করি।' যখন তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে তখন মনে মনে অনুতপ্ত হবে। আমি অবিশ্বাসীদের গলদেশে বেড়ি পরাব। ওরা যা করত তারই প্রতিফল ওদেরকে দেওয়া হবে।" (সাবা'ঃ ৩১-৩৩)
কাফের ও তার জীবন-সাথী শয়তান কারীনের মাঝেও বাদ-বিসংবাদ ও বাগ্বিতন্ডা চলবে।
"তার সঙ্গী (ফিরিশ্তা) বলবে, 'এই তো আমার নিকট (আমলনামা) প্রস্তুত।' (আদেশ করা হবে,) তোমরা উভয়ে নিক্ষেপ কর জাহান্নামে প্রত্যেক উদ্ধত অবিশ্বাসীকে। কল্যাণকর কাজে প্রবল বাধাদানকারী, সীমালংঘনকারী ও সন্দেহ পোষণকারী। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্য গ্রহণ করত, তাকে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ কর। তার সহচর (শয়তান) বলবে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমি তাকে অবাধ্য হতে প্ররোচিত করিনি। বস্তুতঃ সে নিজেই ছিল ঘোর বিভ্রান্ত।' আল্লাহ বলবেন, 'আমার সামনে বাক-বিতন্ডা করো না; তোমাদেরকে তো আমি পূর্বেই শাস্তির প্রতিশ্রুতি প্রেরণ করেছি। আমার কথার রদ-বদল হয় না এবং আমি আমার বান্দাদের প্রতি কোন অবিচার করি না।" (ক্বাফঃ ২৩-২৯)
মানুষ তার দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সাথেও ঝগড়া করবে।
"(স্মরণ কর,) যেদিন আল্লাহর শত্রুদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার জন্য সমবেত করা হবে এবং ওদেরকে বিভিন্ন দলে বিন্যস্ত করা হবে, পরিশেষে যখন ওরা জাহান্নামের সন্নিকটে পৌঁছবে, তখন ওদের কান, চোখ ও দেহের চামড়া ওদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে সাক্ষ্য দেবে। জাহান্নামীরা ওদের চামড়াকে জিজ্ঞাসা করবে, 'তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে কেন?' উত্তরে চামড়া বলবে, 'আল্লাহ যিনি সমস্ত কিছুকে বাকশক্তি দিয়েছেন তিনি আমাদেরও বাকশক্তি দিয়েছেন।' তিনি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।" (হা-মীম সাজদাহঃ ১৯-২১)
যে আল্লাহর স্মরণে বিমুখ হয় (কুরআন ও দ্বীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়) তাকে সেদিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করা হবে।
"যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, অবশ্যই তার হবে সংকীর্ণতাময় জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।' সে বলবে, 'হে আমার প্রতিপালক! কেন আমাকে অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলে? অথচ আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম!' তিনি বলবেন, 'তুমি এইরূপ ছিলে, আমার নিদর্শনাবলী তোমার নিকট এসেছিল; কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে। সেইভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হবে। আর এইভাবেই আমি তাকে প্রতিফল দেব, যে সীমালংঘন করেছে ও তার প্রতিপালকের নিদর্শনে বিশ্বাস স্থাপন করেনি। আর পরকালের শাস্তি অবশ্যই কঠোরতর ও চিরস্থায়ী।" (ত্বা-হাঃ ১২৪-১২৭)
📄 গোনাহগার মু’মিনদের অবস্থা
সেই ভয়ানক দিনে গোনাহগার মু'মিনদেরও বিভিন্ন আযাব হবে। যারা মালের যাকাত আদায় করেনি, তাদের মালকে বিষধর সর্পের রূপ দিয়ে তাদের কণ্ঠে জড়ান হবে। মহানবী বলেছেন,
((مَنْ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا فَلَمْ يُؤَدِّ زَكَاتَهُ مُثَلَ لَهُ مَالُهُ شُجَاعًا أَقْرَعَ لَهُ زَبِيبَتَانِ يُطَوَّقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَأْخُذُ بِلِهْزِمَتَيْهِ يَعْنِي بِشِدْقَيْهِ يَقُولُ أَنَا مَالُكَ أَنَا كَنْزُكَ)) ثُمَّ تَلَا هَذِهِ الْآيَةَ {وَلَا إِلَى آخِرِ الآيَةِ يَحْسِبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ }
"যে ব্যক্তিকে আল্লাহ ধন-মাল দান করেছেন; কিন্তু সে ব্যক্তি তার সেই ধন-মালের যাকাত আদায় করে না, কিয়ামতের দিন (আযাবের) জন্য তার সমস্ত ধন-মালকে একটি মাথায় টাক পড়া (অতি বিষাক্ত) সাপের আকৃতি দান করা হবে; যার চোখের উপর দু'টি কালো দাগ থাকবে। সেই সাপকে বেড়ির মত তার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। অতঃপর সে তার উভয় কশে ধারণ (দংশন) করে বলবে, 'আমি তোমার মাল, আমি তোমার সেই সঞ্চিত ধনভান্ডার।' এরপর নবী এই আয়াত পাঠ করলেন,
وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَّهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَّهُمْ سَيُطَوَّقُوْنَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ )
অর্থাৎ, আল্লাহর দানকৃত অনুগ্রহে (ধন-মালে) যারা কৃপণতা করে, সে কার্পণ্য তাদের জন্য মঙ্গলকর হবে বলে তারা যেন ধারণা না করে। বরং এটা তাদের পক্ষে ক্ষতিকর প্রতিপন্ন হবে। যাতে তারা কার্পণ্য করে সে সমস্ত ধন-সম্পদকে বেড়ি বানিয়ে কিয়ামতের দিন তাদের গলায় পরানো হবে।" (সূরা আলে ইমরান ১৮০ আয়াত) (বুখারী ১৪০৩নং, নাসাঈ ২৪৪১নং)
যে সমস্ত পশুর যাকাত আদায় করেনি, সেই সমস্ত পশু তাদেরকে পদদলিত ও পিষ্ট করবে। এসব ততক্ষণ পর্যন্ত হতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের পক্ষে জান্নাত অথবা জাহান্নামের ফায়সালা না হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "প্রত্যেক সোনা ও চাঁদির অধিকারী ব্যক্তি যে তার হক (যাকাত) আদায় করে না, যখন কিয়ামতের দিন আসবে, তখন তার জন্য ঐ সমুদয় সোনা-চাঁদিকে আগুনে দিয়ে বহু পাত তৈরী করা হবে। অতঃপর সেগুলোকে জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তার পাঁজর, কপাল ও পিঠে দাগা হবে। যখনই সে পাত ঠান্ডা হয়ে যাবে, তখনই তা পুনরায় গরম ক'রে অনুরূপ দাগার শাস্তি সেই দিনে চলতেই থাকবে, যার পরিমাণ হবে ৫০ হাজার বছরের সমান; যতক্ষণ পর্যন্ত না বান্দাদের মাঝে বিচার-নিষ্পত্তি শেষ করা হয়েছে। অতঃপর সে তার পথ দেখতে পাবে; হয় জান্নাতের দিকে, না হয় জাহান্নামের দিকে।"
জিজ্ঞাসা করা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! আর উটের ব্যাপারে কী হবে?' তিনি বললেন, "প্রত্যেক উটের মালিকও; যে তার হক (যাকাত) আদায় করবে না--- আর তার অন্যতম হক এই যে, পানি পান করাবার দিন তাকে দোহন করা (এবং সে দুধ লোকেদের দান করা)- যখন কিয়ামতের দিন আসবে, তখন তাকে এক সমতল প্রশস্ত প্রান্তরে উপুড় ক'রে ফেলা হবে। আর তার উট সকল পূর্ণ সংখ্যায় উপস্থিত হবে; ওদের মধ্যে একটি বাচ্চাকেও অনুপস্থিত দেখবে না। অতঃপর সেই উটদল তাদের খুর দ্বারা তাকে দলবে এবং মুখ দ্বারা তাকে কামড়াতে থাকবে। এইভাবে যখনই তাদের শেষ দল তাকে দলে অতিক্রম করে যাবে, তখনই পুনরায় প্রথম দলটি উপস্থিত হবে। তার এই শাস্তি সেদিন হবে, যার পরিমাণ হবে ৫০ হাজার বছরের সমান; যতক্ষণ পর্যন্ত না বান্দাদের মাঝে বিচার-নিষ্পত্তি শেষ করা হয়েছে। অতঃপর সে তার শেষ পরিণাম দর্শন করবে; জান্নাতের অথবা জাহান্নামের।"
জিজ্ঞাসা করা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! গরু-ছাগলের ব্যাপারে কী হবে?' তিনি বললেন, "আর প্রত্যেক গরু-ছাগলের মালিককেও; যে তার হক আদায় করবে না, যখন কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে, তখন তাদের সামনে তাকে এক সমতল প্রশস্ত ময়দানে উপুড় ক'রে ফেলা হবে; যাদের একটিকেও সে অনুপস্থিত দেখবে না এবং তাদের কেউই শিং-বাঁকা, শিংবিহীন ও শিং-ভাঙ্গা থাকবে না। প্রত্যেকেই তার শিং দ্বারা তাকে আঘাত করতে থাকবে এবং খুর দ্বারা দলতে থাকবে। তাদের শেষ দলটি যখনই (চুস মেরে ও দলে) পার হয়ে যাবে তখনই প্রথম দলটি পুনরায় এসে উপস্থিত হবে। এই শাস্তি সেদিন হবে যার পরিমাণ ৫০ হাজার বছরের সমান; যতক্ষণ পর্যন্ত না বান্দাদের মাঝে বিচার-নিষ্পত্তি শেষ করা হয়েছে। অতঃপর সে তার রাস্তা ধরবে; জান্নাতের দিকে, নতুবা জাহান্নামের দিকে।" (বুখারী ২৩৭১, মুসলিম ২৩৩৭নং, নাসাঈ, হাদীসের শব্দাবলী সহীহ মুসলিম শরীফের।)
নাসাঈর এক বর্ণনায় আছে যে, “যে ব্যক্তিই তার ধন-মালের যাকাত আদায় করবে না সেই ব্যক্তিরই ধন-মাল সেদিন আগুনের সাপরূপে উপস্থিত হবে এবং তদ্দ্বারা তার কপাল, পাঁজর ও পিঠকে দাগা হবে-যে দিনটি হবে ৫০ হাজার বছরের সমান। এমন আযাব তার ততক্ষণ পর্যন্ত হতে থাকবে; যতক্ষণ পর্যন্ত সকল বান্দার বিচার-নিষ্পত্তি শেষ না হয়েছে।”
অহংকারী ও গর্বিত মানুষ সেদিন পিপিলিকার ন্যায় ক্ষুদ্ররূপে দণ্ডায়মান থাকবে। সর্বদিক থেকে তাকে অপমান ও লাঞ্ছনায় বেষ্টন করবে। মহানবী বলেছেন,
((يُحْشَرُ الْمُتَكَبِّرُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَمْثَالَ الذَّرِّ فِي صُوَرِ النَّاسِ يَعْلُوهُمْ كُلُّ شَيْءٍ مِنَ الصَّغَارِ حَتَّى يَدْخُلُوا سِجْنَا فِي جَهَنَّمَ يُقَالُ لَهُ بُولَسُ فَتَعْلُوهُمْ نَارُ الْأَنْيَارِ يُسْقَوْنَ مِنْ طِيئَةِ الْخَبَالِ عُصَارَةِ أَهْلِ النَّارِ)).
“অহংকারীদেরকে কিয়ামতের দিন মানুষের আকৃতিতেই পিঁপড়ের মত ছোট আকারে জমা করা হবে। তাদেরকে সর্বদিক থেকে লাঞ্ছনা ঘিরে ধরবে। তাদেরকে ‘বুলাস’ নামক দোযখের এক কারাগারে রাখা হবে। আগুন তাদেরকে ঘিরে ফেলবে এবং তাদেরকে জাহান্নামীদের রক্ত-পুঁজ পান করানো হবে।” (আহমাদ ৬৬৭৭, তিরমিযী ২৪৯২নং)
যাদের প্রতি আল্লাহপাক সেদিন ভীষণ রাগান্বিত ও ক্রুদ্ধ হয়ে কথা বলবেন না, তাকিয়ে দেখবেন না এবং ক্ষমাও করবেন না তারা হলঃ
১। শরীয়তের কোন জ্ঞান কোন স্বার্থলোভে গোপনকারী আলেম। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنزَلَ اللَّهُ مِنَ الْكِتَابِ وَيَشْتَرُونَ بِهِ ثَمَنًا قَلِيلاً أُولَئِكَ مَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ إِلَّا النَّارَ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ} (١٧٤)
"আল্লাহ যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যারা তা গোপন করে ও তার বিনিময়ে স্বল্প মূল্য গ্রহণ করে, তারা কেবল আগুন দিয়ে আপন পেট পূর্ণ করে। শেষ বিচারের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদেরকে (পাপ-পঙ্কিলতা থেকে) পবিত্রও করবেন না; আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।" (বাক্বারাহঃ ১৭৪)
২। অঙ্গীকার ও প্রতিজ্ঞা ভঙ্গকারী। স্বার্থবশে মিথ্যা কসমখোর। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلاً أُوْلَئِكَ لَا خَلَاقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ وَلَا يَنظُرُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ} (۷۷)
"যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথকে স্বল্প মূল্যে বিক্রয় করে, পরকালে তাদের কোন অংশ নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, আর তাদের দিকে চেয়ে দেখবেন না এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।" (আলে ইমরানঃ ৭৭)
৩। পায়ের গাঁটের নিচে ঝুলিয়ে কাপড় পরিধানকারী (পুরুষ)।
৪। মিথ্যা কসম খেয়ে মাল বিক্রেতা।
৫। কারো প্রতি উপকার ও অনুগ্রহ ক'রে তা প্রকাশ ক'রে আত্মপ্রশংসাকারী।
আবু যার হতে বর্ণিত, একদা নবী বললেন, (( ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ القِيَامَةِ ، وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ ، وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ )) "কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির সঙ্গে আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না। আর তাদের জন্য হবে মর্মন্তদ শাস্তি।" এরূপ তিনি তিনবার বললেন। তখন আবু যার বললেন, 'ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তারা কারা হে আল্লাহর রসূল?' রাসূলুল্লাহ বললেন, (( الْمُسْبِلُ ، وَالمَنَّانُ ، وَالْمُنْفِقُ سِلْعَتَهُ بِالحَلِفِ الكَاذِبِ )) . "যে (পায়ের) গাঁটের নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরে, দান করে যে প্রচার করে বেড়ায় এবং মিথ্যা কসম খেয়ে নিজের পণ্যদ্রব্য বিক্রি করে।" (মুসলিম ৩০৬নং) এর অন্য বর্ণনায় আছে, "যে গাঁটের নীচে লুঙ্গি ঝুলিয়ে পরে।" এর অর্থ হচ্ছে, যে ব্যক্তি তার লুঙ্গি, কাপড় ইত্যাদি অহংকারের সাথে গাঁটের নীচে ঝুলিয়ে পরে। (৩০৭নং)
৬। উদ্বৃত্ত পানি থাকা সত্ত্বেও যে পথিকের তৃষ্ণা নিবারণ করে না।
৭। স্বার্থের জন্য যে ইমামের হাতে বায়াত করে।
মহানবী বলেছেন, (( ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَومَ القِيَامَةِ ، وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ ، وَلَا يُزَكِّيهِمْ ، وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ : رَجُلٌ عَلَى فَضْلِ مَاءٍ بِالفَلَاةِ يَمْنَعُهُ مِن ابْنِ السَّبِيلِ ، وَرَجُلٌ بَايَعَ رَجُلاً سِلْعَةً بَعْدَ العَصْرِ فَحَلَفَ بِاللَّهِ لأَخَذَهَا بِكَذَا وَكَذَا فَصَدَّقَهُ وَهُوَ عَلَى غَيْرِ ذَلِكَ ، وَرَجُلٌ بَايَعَ إِمَاماً لَا يُبَايِعُهُ إِلَّا لِدُنْيَا فَإِنْ أَعْطَاهُ مِنْهَا وَفَى وَإِنْ لَمْ يُعْطِهِ مِنْهَا لَمْ يَفِ )) . متفق عليه
"তিন শ্রেণীর মানুষের সাথে কিয়ামতের দিনে আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের দিকে (দয়ার দৃষ্টিতে) তাকাবেন না, তাদেরকে পবিত্রও করবেন না এবং তাদের জন্য হবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (১) যে মরু প্রান্তরে অতিরিক্ত পানির মালিক, কিন্তু সে মুসাফিরকে তা থেকে পান করতে দেয় না। (২) যে আসরের পর অন্য লোকের নিকট সামগ্রী বিক্রয় করতে গিয়ে কসম খেয়ে এই বলে যে, আল্লাহর কসম! এটা আমি এত দিয়ে নিয়েছি। ফলে ক্রেতা তাকে বিশ্বাস করে অথচ সে তার বিপরীত (অর্থাৎ, মিথ্যাবাদী)। আর (৩) যে কেবলমাত্র পার্থিব স্বার্থে রাষ্ট্রনেতার হাতে বায়আত করে। সুতরাং সে যদি তাকে পার্থিব সম্পদ প্রদান করে, তাহলে সে (তার বায়আত) পূর্ণ করে। আর যদি প্রদান না করে, তাহলে বায়আত পূর্ণ করে না।" (বুখারী ৭২১২, মুসলিম ৩১০নং)
৮। বৃদ্ধ ব্যভিচারী,
৯। মিথ্যাবাদী রাজা,
১০। অহংকারী গরীব।
মহানবী বলেছেন,
(( ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ القِيَامَةِ ، وَلَا يُزَكِّيهِمْ ، وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ ، وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ : شَيْخٌ زَان ، وَمَلِكُ كَذَّابٌ ، وَعَائِلٌ مُسْتَكْبَرُ )). رواه مسلم
"আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তিন প্রকার লোকের সাথে কথা বলবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের দিকে (অনুগ্রহের দৃষ্টিতে) তাকাবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি, (১) ব্যভিচারী বৃদ্ধ, (২) মিথ্যাবাদী বাদশাহ এবং (৩) অহংকারী গরীব।" (মুসলিম ৩০৯নং)
১১। পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান,
১২। পুরুষবেশিনী নারী,
১৩। মেড়া পুরুষ, যে নিজের স্ত্রী-কন্যা-বোনকে পর-পুরুষের (যাদের সঙ্গে বিবাহ কোন কালেও বৈধ এমন লোকদের) সাথে অবাধ মিলামিশায় বাধা দেয় না। (বা বর্তমানের প্রগতিবাদী ও আলোকপ্রাপ্ত বা তথাকথিত সভ্যশ্রেণীর মানুষ যারা এ ধরনের নগ্নতা ও পর্দাহীনতাকে নারী স্বাধীনতা বলে মনে করে।)
মহানবী বলেছেন,
((ثلاثة لا يَنْظُرُ الله إليهمْ يَوْمَ القِيامَةِ العاق والمَرْأةُ المُتَرَجِّلَةِ الْمُتَشَبِّهَةُ بِالرِّجال والديوث)).
"তিন ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকিয়ে দেখবেন না; পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, পুরুষবেশিনী বা পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বনকারিণী মহিলা এবং মেড়া পুরুষ; (যে তার স্ত্রী, কন্যা ও বোনের চরিত্রহীনতা ও নোংরামিতে চুপ থাকে এবং বাধা দেয় না।) (আহমাদ ৬/১৮০, নাসাঈর কুবরা ২৩৪৩, হাকেম ২৫৬২, সহীহুল জামে' ৩০৭১নং)
১৪। স্ত্রীর পায়খানাদ্বারে সঙ্গমকারী।
মহানবী বলেছেন,
لَا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَى رَجُل أَتَى رَجُلاً أَوِ امْرَأَةً فِي الدُّبُر).
"আল্লাহ আয্যা অজাল্ল (কিয়ামতের দিন) সেই ব্যক্তির দিকে চেয়েও দেখবেন না, যে ব্যক্তি কোন পুরুষের মলদ্বারে অথবা কোন স্ত্রীর পায়খানা-দ্বারে সঙ্গম করে।" (তিরমিযী ১১৬৫, নাসাঈর কুবরা ৯০০১, ইবনে হিব্বান ৪৪১৮, সহীহুল জামে' ৭৮০১নং)
সেদিন বিলাসপ্রিয় সম্পদশালী বড় সংকীর্ণতায় অবস্থান করবে।
ইবনে উমার কর্তৃক বর্ণিত, একদা আল্লাহর রসূল -এর কাছে এক ব্যক্তি ঢেকুর তুললে তিনি তাকে বললেন, (( كُفَّ جُشَاءَكَ عَنَّا فَإِنَّ أَطْوَلَكُمْ جُوعًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَكْثَرُكُمْ شِبَعًا فِي دَارِ الدُّنْيَا)).
"আমাদের নিকট তোমার ঢেকুর তোলা বন্ধ কর। দুনিয়ায় যে অধিক পরিতৃপ্ত হয়, কিয়ামতে সে অধিক ক্ষুধার্ত হবে।" (তিরমিযী ২৪৭৮, ইবনে মাজাহ ৩৩৫০নং)
প্রত্যেক ধোঁকাবাজের কাছে সেদিন ধোঁকার পতাকা হবে। আমানতে খেয়ানতকারীর প্রত্যেক আমানত সেদিন উপস্থিত করা হবে। যার দরুন তারা সেই সুবিশাল জনসমক্ষে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হবে।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَن يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ}
"যে কেউ কিছু আত্মসাৎ করবে, সে তার আত্মসাৎ করা বস্তু নিয়ে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। অতঃপর (সেদিন) প্রত্যেকে যে যা অর্জন করেছে তা পূর্ণ মাত্রায় প্রদত্ত হবে এবং তাদের প্রতি কোন যুলুম করা হবে না।" (আলে ইমরান : ১৬১)
আর মহানবী বলেছেন, (( لِكُلِّ غَادِر لِوَاءٌ يَوْمَ القِيَامَةِ ، يُقَالُ : هَذِهِ غَدْرَةُ فُلان )) . متفق عَلَيْهِ
"কিয়ামতের দিনে প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের জন্য একটি করে (বিশেষ) পতাকা নির্দিষ্ট হবে। বলা হবে যে, এটা অমুক ব্যক্তির (বিশ্বাসঘাতকতার) প্রতীক।" (বুখারী ৬১৭৭, ৬১৭৮, মুসলিম ৪৬২৭, ৪৬৩১)
যারা অপরের নিকট হতে না হক জমি আত্মসাৎ করে (জবর দখল করে বা লিখিয়ে নেয়) তাদের দুর্দশা কী হবে? মহানবী বলেছেন, (( مَنْ ظَلَمَ قِيدَ شِبْرٍ مِنَ الْأَرْضِ ، طُوقَهُ مِنْ سَبْعِ أَرَضِينَ )). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"যে ব্যক্তি কারো জমি এক বিঘত পরিমাণ অন্যায়ভাবে দখল ক'রে নেবে, (কিয়ামতের দিন) সাত তবক (স্তর) যমীনকে (বেড়িস্বরূপ) তার গলায় লটকে দেওয়া হবে।" (বুখারী ২৪৫৩,৩১৯৫, মুসলিম ৪২২২নং)
أَيُّمَا رَجُلٍ ظَلَمَ شِبْرًا مِنَ الْأَرْضِ كَلَّفَهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ يَحْفِرَهُ حَتَّى يَبْلُغَ آخِرَ سَبْعِ أَرَضِينَ ثُمَّ يُطَوَّقَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ)).
"যে ব্যক্তি অর্ধহাত পরিমাণও জমি জবর-দখল (আত্মসাৎ) করবে, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন ঐ জমির সাত তবক পর্যন্ত খুঁড়তে আদেশ করবেন। অতঃপর তা তার গলায় বেড়িস্বরূপ ঝুলিয়ে দেওয়া হবে; যতক্ষণ পর্যন্ত না সমস্ত লোকেদের বিচার-নিষ্পত্তি শেষ হয়েছে (ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ সাত তবক আধ হাত জমি তার গলায় লটকানো থাকবে)!" (আহমাদ ১৭৫৭১, ত্বাবারানীর কাবীর ১৮১৪৬, ইবনে হিব্বান ৫১৪২, সহীহুল জামে' ২৭২২নং)
((مَنْ أَخَذٌ شَيْئًا مِنْ الْأَرْضِ بِغَيْرِ حَقَّهِ خُسِفَ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَى سَبْعِ أَرَضِينَ)).
"যে ব্যক্তি অর্ধহাত পরিমাণও জমি নাহক জবর-দখল (আত্মসাৎ) করবে সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন ঐ জমির সাত তবক পর্যন্ত নিচে ধসিয়ে দেবেন।" (বুখারী ২৪৫৪, ৩১৯৬নং)
যারা যেখানে যেমন সেখানে তেমন দু'মুখে কথা বলে, তাদের আগুনের জিভ হবে। মহানবী বলেছেন,
مَنْ كَانَ لَهُ وَجْهَانِ فِي الدُّنْيَا كَانَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لِسَانَانِ مِنْ نَارٍ ».
"দুনিয়াতে যে ব্যক্তির দু'টি মুখ হবে (দু'মুখে কথা বলবে) কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তির আগুনের দু'টি জিভ হবে।" (আবু দাউদ ৪৮৭৩, ইবনে হিব্বান, সিলসিলাহ সহীহাহ ৮৯২নং)
যারা সামর্থ্যবান অথচ যাজ্ঞা করে, তাদের মুখ সেদিন ক্ষত-বিক্ষত হবে অথবা তাদের মুখমন্ডলে মাংস থাকবে না। মহানবী বলেছেন,
الْمَسْأَلَةُ كُدُوحٌ فِي وَجْهِ صَاحِبِهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ ........
"যাচনা হল কিয়ামতের দিন যাচনাকারীর মুখের ক্ষত-স্বরূপ।" (আহমাদ ৫৬৮০, সহীহ তারগীব ৭৯৩নং)
مَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَسْأَلُ النَّاسَ حَتَّى يَأْتِيَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَيْسَ فِي وَجْهِهِ مُزْعَةً لَحْمٍ)).
"তোমাদের মধ্যে কেউ যাজ্ঞা করতে থাকলে পরিশেষে যখন সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তার মুখমন্ডলে এক টুকরাও মাংস থাকবে না।" (বুখারী ১৪৭৪, মুসলিম ২৪৪৫নং, নাসাঈ, আহমাদ ২/১৫)
যারা মিথ্যা স্বপ্ন বানিয়ে বর্ণনা করে তাদেরকে দু'টি যবের মাঝে সংযোগ সাধন করতে বলা হবে (যা কারো সাধ্য নয়।) গুপ্ত কথায় যারা কানাচি পাতে তাদের কানে গলিত সীসা ঢালা হবে। মহানবী বলেছেন,
(( مَنْ تَحَلَّمَ بِحُلْمٍ لَمْ يَرَهُ ، كُلِّفَ أَنْ يَعْقِدَ بَيْنَ شَعِيرَتَيْنِ وَلَنْ يَفْعَلَ، وَمَنِ اسْتَمَعَ إِلَى حَدِيثِ قَوْمٍ وَهُمْ لَهُ كَارِهُونَ ، صُبَّ فِي أُذُنَيْهِ الأَنَّكُ يَوْمَ القِيَامَةِ ، وَمَنْ صَوَّرَ صُورَةً عُذَّبَ وَكُلِّفَ أَنْ يَنْفُخَ فِيهَا الرُّوحَ وَلَيْسَ بنافخ )). رواه البخاري
"যে ব্যক্তি এমন স্বপ্ন ব্যক্ত করল, যা সে দেখেনি। (কিয়ামতের দিনে) তাকে দু'টি যব দানার মাঝে সংযোগ সাধন করতে আদেশ করা হবে; কিন্তু সে তা কস্মিনকালেও পারবে না। যে ব্যক্তি কোন জনগোষ্ঠীর কথা শুনবার জন্য কান পাতে, যা তারা আদৌ পছন্দ করে না, কিয়ামতের দিনে তার কানে গলিত সীসা ঢেলে দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি কোন (প্রাণীর) ছবি তৈরী করে, কিয়ামতের দিন তাকে শাস্তি দেওয়া হবে এবং তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য আদেশ করা হবে, অথচ সে তা করতে পারবে না।" (বুখারী ৭০৪২নং)
এমন কিছু ব্যক্তি, যাদের প্রতিপক্ষ হবেন খোদ মহান আল্লাহ। মহানবী বলেছেন,
(( قَالَ الله تَعَالَى : ثَلَاثَةٌ أَنَا خَصْمُهُمْ يَوْمَ القِيَامَةِ : رَجُلٌ أَعْطَى بِي ثُمَّ غَدَرَ ، وَرَجُلٌ بَاعَ حُرَّاً فَأَكَلَ ثَمَنَهُ ، وَرَجُلٌ اسْتَأْجَرَ أجيراً ، فَاسْتَوْفَى مِنْهُ ، وَلَمْ يُعْطِهِ أَجْرَهُ )) .
"তিন প্রকার লোক এমন আছে, কিয়ামতের দিন যাদের প্রতিবাদী স্বয়ং আমি; (১) সে ব্যক্তি, যে আমার নামে অঙ্গীকারাবদ্ধ হল, পরে তা ভঙ্গ করল। (২) সে ব্যক্তি, যে স্বাধীন মানুষকে (প্রতারণা দিয়ে) বিক্রি ক'রে তার মূল্য ভক্ষণ করল। (৩) সে ব্যক্তি, যে কোন মজুরকে খাটিয়ে তার নিকট থেকে পুরাপুরি কাজ নিল, কিন্তু তার মজুরী দিল না।" (বুখারী ২২২৭, ২২৭০নং)
য়্যাহয়্য বিন মুআয আর-রাযী বলেছেন, 'আমি অবাক হই এমন লোককে দেখে, যে তার দুআয় বলে, "হে আল্লাহ আমাকে দিয়ে দুশমন হাসায়ো না।" অথচ সে নিজেকে দিয়ে নিজেই প্রত্যেক দুশমনকে হাসাবে।'
তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, 'তা কী ক'রে?'
উত্তরে তিনি বললেন, 'আল্লাহর অবাধ্যাচরণ ক'রে। কিয়ামতের দিন সে তার প্রত্যেক দুশমনকে হাসাবে।' (আল-জাওয়াবুল কাফী ৩৪পৃঃ)
📄 যে পাপ আল্লাহ কিয়ামতে ক্ষমা করবেন না
দুনিয়াতে যথা নিয়মে ও যথা সময়ে তওবা করলে মহাক্ষমাশীল আল্লাহ সমস্ত গোনাহকে ক্ষমা ক'রে দেন। ছোট গোনাহ নানা নেক আমলের কারণে মাফ হয়ে যায়। কাবীরা গোনাহ ক'রে তওহীদবাদী মুসলিম তওবা না ক'রে মারা গেলে কিয়ামতে আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে। মহান আল্লাহ চাইলে তওহীদের গুণে তাকে ক্ষমা ক'রে বেহেশতে দেবেন। আর না চাইলে দোযখে সাজা ভুগিয়ে এক দিন না এক দিন বেহেশতে দেবেন।
কিন্তু অতি মহাপাপ, যা আল্লাহ কিয়ামতে ক্ষমা করবেন না এবং কোনদিনও ক্ষমা করবেন না। এমন পাপীরা চিরস্থায়ী জাহান্নামবাসী থাকবে। যেহেতু আসলে তারা মহান আল্লাহর শত্রু।
এক: বড় শির্ক
আল্লাহর সাথে শির্ক করা একটি অতি মহাপাপ। তওবা ক'রে মারা না গেলে কিয়ামতে তিনি মুশরিককে ক্ষমা করবেন না। তিনি বলেছেন,
{إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاء وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا } (٤٨) سورة النساء
"নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী (শির্ক) করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন। আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন (শির্ক) করে, সে এক মহাপাপ করে।" (নিসাঃ ৪৮)
{إِنَّ اللهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاء وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضلالاً بَعِيدًا } (১১৬) সূরা আন-নিসা
"নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী (শিক) করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা ক'রে দেন। আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন (শিক) করে, সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়।" (নিসাঃ ১১৬)
মুশরিক ক্ষমা পাবে না মানেই সে চিরকালের জন্য জাহান্নামী থাকবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ}
“অবশ্যই যে কেউ আল্লাহর অংশী করবে, নিশ্চয় আল্লাহ তার জন্য বেহেশত নিষিদ্ধ করবেন ও দোযখ তার বাসস্থান হবে এবং অত্যাচারীদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” (মায়িদাহঃ ৭২)
দুইঃ কুফরী
কুফরী মানে অবিশ্বাস, অস্বীকার, অমান্য, সন্দেহ, মিথ্যায়ন, প্রত্যাখ্যান, ঘৃণা ইত্যাদি। তার সাথে যোগ হতে পারে অত্যাচার, আল্লাহর পথে মানুষকে বাধা ইত্যাদি। এমন 'কাফের' ব্যক্তি তওবা ক'রে ঈমান আনয়ন না ক'রে মারা গেলে কিয়ামতে কস্মিনকালেও ক্ষমা পাবে না। বিধায় তারাও অনন্তকালের জন্য দোযখবাসী থাকবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَصَدُّوا عَن سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ مَاتُوا وَهُمْ كُفَّارٌ فَلَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ}
"যারা অবিশ্বাস করে ও আল্লাহর পথ হতে মানুষকে নিবৃত্ত করে, অতঃপর অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তাদেরকে কিছুতেই ক্ষমা করবেন না।" (মুহাম্মাদঃ ৩৪)
{إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا ثُمَّ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا ثُمَّ ازْدَادُوا كُفْرًا لَّمْ يَكُنِ اللَّهُ لِيَغْفِرَ لَهُمْ وَلَا لِيَهْدِيَهُمْ سَبيلاً} (۱۳۷) سورة النساء
"যারা বিশ্বাস করার পর অবিশ্বাস করে এবং আবার বিশ্বাস করে, অতঃপর আবার অবিশ্বাস করে, অতঃপর তাদের অবিশ্বাস-প্রবৃত্তি বৃদ্ধি পায়, আল্লাহ তাদেরকে কিছুতেই ক্ষমা করবেন না এবং তাদেরকে কোন পথও দেখাবেন না।" (নিসাঃ ১৩৭)
{إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَظَلَمُوا لَمْ يَكُن اللهُ لِيَغْفِرَ لَهُمْ وَلَا لِيَهْدِيَهُمْ طَرِيقاً (١٦٨) إِلَّا طَرِيقَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا وَكَانَ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرًا} (১৬৯) سورة النساء
"নিশ্চয় যারা অবিশ্বাস করেছে ও অত্যাচার করেছে, আল্লাহ তাদেরকে কখনও ক্ষমা করবেন না এবং কোন পথও দেখাবেন না; জাহান্নামের পথ ছাড়া। সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আর এ তো আল্লাহর পক্ষে সহজ।" (নিসাঃ ১৬৮-১৬৯)
তিনঃ মুনাফিকী
মুখে ইসলাম বুকে কুফরী রেখে যারা মুসলিম সমাজে বসবাস করে, তাদেরকেও মহান আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। দুনিয়াতে নবীর ক্ষমাপ্রার্থনাতেও তারা ক্ষমা পায়নি। নিজে তওবা ক'রে না মারা গেলে কিয়ামতেও ক্ষমা পাবে না তারা। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِن تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ} (৮۰) سورة التوبة
"তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা না কর (উভয়ই সমান); যদি তুমি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমা প্রার্থনা কর, তবুও আল্লাহ তাদেরকে কখনই ক্ষমা করবেন না; যেহেতু তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে কুফরী করেছে। আর আল্লাহ অবাধ্য সম্প্রদায়কে পথপ্রদর্শন করেন না।" (তাওবাহঃ ৮০)
{سَوَاء عَلَيْهِمْ أَسْتَغْفَرْتَ لَهُمْ أَمْ لَمْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ لَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ} (৬) سورة المنافقون
"তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা না কর, উভয়ই তাদের জন্য সমান। আল্লাহ তাদেরকে কখনো ক্ষমা করবেন না। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।" (মুনাফিকুন: ৬)
চার: পাপ প্রকাশ করা
অনেকে ধৃষ্টতার সাথে পাপ করে, নির্লজ্জতার সাথে পাপ প্রদর্শন করে, জনসমক্ষে পাপ করে, বুকের পাটা দেখিয়ে পাপ ক'রে দাপিয়ে বেড়ায়। অনেক সময় পাপ গোপনে ক'রে পরে তা প্রকাশ ক'রে বেড়ায়। এমন পাপীকে মহান আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। মহানবী বলেছেন,
كُلُّ أُمَّتِي مُعَافَى إِلَّا الْمُجَاهِرِينَ وَإِنَّ مِنْ الْمُجَاهَرَةِ أَنْ يَعْمَلَ الرَّجُلُ بِاللَّيْلِ عَمَلًا ثُمَّ يُصْبِحَ وَقَدْ سَتَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ فَيَقُولُ يَا فُلَانُ عَمِلْتُ الْبَارِحَةَ كَذَا وَكَذَا وَقَدْ بَاتَ يَسْتُرُهُ رَبُّهُ وَيُصْبِحُ يَكْشِفُ سِتْرَ اللَّهِ عَنْهُ)).
“আমার প্রত্যেক উম্মতের পাপ মাফ করে দেওয়া হবে, তবে যে প্রকাশ্যে পাপ করে (অথবা পাপ করে বলে বেড়ায়) তার পাপ মাফ করা হবে না। আর পাপ প্রকাশ করার এক ধরন এও যে, একজন লোক রাত্রে কোন পাপ করে ফেলে, অতঃপর আল্লাহ তা গোপন করে নেন। (অর্থাৎ, কেউ তা জানতে পারে না।) কিন্তু সকাল বেলায় উঠে সে লোকের কাছে বলে বেড়ায়, 'হে অমুক! গত রাতে আমি এই এই কাজ করেছি।'
রাতের বেলায় আল্লাহ তার পাপকে গোপন রেখে দেন; কিন্তু সে সকাল বেলায় আল্লাহর সে গোপনীয়তাকে নিজে নিজেই ফাঁস করে ফেলে।” (বুখারী ৬০৬৯নং, মুসলিম ৭৬৭৬নং)
পাঁচ: ঋণ পরিশোধ না করা
রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
يُغْفَرُ لِلشَّهِيدِ كُلُّ ذَنْبٍ إِلَّا الدَّيْنَ ».
"ঋণ পরিশোধ না করার পাপ ছাড়া শহীদের সমস্ত পাপকে মাফ ক'রে দেওয়া হবে।" (মুসলিম ৪৯৯১, মিশকাত ২৯১২ নং)
ছয়ঃ নরহত্যা
মহানবী বলেছেন,
كُلُّ ذَنْبٍ عَسَى اللَّهُ أَنْ يَغْفِرَهُ إِلَّا مَنْ مَاتَ مُشْركًا أَوْ مُؤْمِنٌ قَتَلَ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا ..
"যে ব্যক্তি মুশরিক হয়ে মারা যায় অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করে, সে ব্যক্তির পাপ ছাড়া অন্যান্য ব্যক্তির পাপকে আল্লাহ মাফ করে দিতে পারেন।" (আহমাদ ১৬৯০৭, নাসাঈ ৩৯৮৪, হাকেম ৮০৩১-৮০৩২, আবু দাউদ ৪২৭২নং, আবু দারদা হতে, সহীহুল জামে' ৪৫২৪নং)
আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا } (৯৩) سورة النساء
"যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন বিশ্বাসীকে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম। সেখানে সে চিরকাল থাকবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে অভিসম্পাত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত ক'রে রাখবেন।" (নিসাঃ ৯৩)
উক্ত আয়াতে মু'মিনকে হত্যা করার অতি কঠিন শাস্তির কথা বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, তার শাস্তি হল জাহান্নাম, যাতে সে চিরস্থায়ীভাবে থাকবে। অনুরূপ সে আল্লাহর ক্রোধের শিকার হবে এবং তাঁর অভিসম্পাত ও মহা শাস্তিও তার উপর আপতিত হবে। একই সাথে এতগুলো কঠিন শাস্তির কথা অন্য কোন পাপের ব্যাপারে বর্ণিত হয়নি। এ থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, একজন মু'মিনকে হত্যা করা কত বড় অপরাধ। হাদীসসমূহেও এ কাজের কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে এবং এর কঠোর শাস্তি বর্ণিত হয়েছে।
মু'মিনের হত্যাকারীর তওবা কবুল হবে, নাকি হবে না? কোন কোন আলেম উল্লিখিত কঠোর শাস্তিগুলোর ভিত্তিতে তার তওবা কবুল না হওয়ার কথাই ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু কুরআন ও হাদীসে উল্লিখিত উক্তির আলোকে পরিষ্কারভাবে জানা যায় যে, নিষ্ঠার সাথে তওবা করলে প্রত্যেক পাপই মাফ হতে পারে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُوْلَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا ) (۷۰) سورة الفرقان
"তবে যারা তওবা করে, বিশ্বাস ও সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের পাপকর্মগুলিকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন ক'রে দেবেন। আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (ফুরক্বান: ৭০)
অন্যান্য তওবার আয়াতসমূহও ব্যাপক। প্রত্যেক গুনাহ, ছোট হোক, বড় হোক অথবা অতি বড় যা-ই হোক না কেন, নিষ্ঠার সাথে তওবা করলে সবই মাফ হওয়া সম্ভব। এখানে তার শাস্তি জাহান্নামের কথা যে বর্ণিত হয়েছে, তার অর্থ হল, সে যদি তওবা না করে, তাহলে তার শাস্তি এটাই হবে, যা মহান আল্লাহ তার অপরাধের দরুন তাকে দিতে পারেন। অনুরূপ তওবা না করা অবস্থায় চিরস্থায়ী জাহান্নামী হওয়ার অর্থ হল, তাতে সুদীর্ঘ কাল অবস্থান করতে হবে। কারণ, কাফের ও মুশরিকরাই কেবল জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে। তাছাড়া হত্যার সম্পর্ক যদিও বান্দার অধিকারের সাথে, যা থেকে তওবার মাধ্যমেও দায়িত্বমুক্ত হওয়া যায় না, তবুও আল্লাহ তাআলা স্বীয় কৃপা ও অনুগ্রহে তার এমনভাবে নিষ্পত্তি করতে পারেন যে, নিহিত ব্যক্তিও প্রতিদান পেয়ে যাবে এবং হত্যাকারীরও মাফ হয়ে যাবে। (ইবনে কাষীর ও ফাতহুল কাদীর, আহসানুল বায়ান) অনুরূপ বলা যায় প্রকাশ্যে পাপকর্মকারী ও ঋণী ব্যক্তির ব্যাপারে।