📄 যে সকল অপরাধীর আমল কবুল হয় না
এমন বহু পাপী আছে, যাদের ফরয-নফল কোন ইবাদতই কবুল করা হয় না; দুনিয়াতে অথবা আখেরাতে। এ পর্বে আমরা তেমনই কিছু পাপী ও পাপিনীর কথা সংক্ষেপে আলোচনা করব ইন শাআল্লাহ।
১। যে ব্যক্তি কোন সাহাবীকে গালি দেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
((مَنْ سَبَّ أَصْحَابِي فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ ، وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ)).
"সে ব্যক্তি আমার সাহাবাগণকে গালি দেবে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতাবর্গ এবং সমগ্র মানবজাতির অভিশাপ হোক।" (ত্বাবারানীর কাবীর ১২৫৪১, সিলসিলাহ সহীহাহ ৩৩৪০নং)
এক বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে, "আল্লাহ তার নিকট থেকে কোন ফরয ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না।"
২। পিতামাতার অবাধ্য সন্তান।
৩। দান করে যে দানের কথায় গর্বভরে প্রচার করে বেড়ায়।
৪। তকদীর অস্বীকারকারী ব্যক্তি। মহানবী বলেছেন,
ثَلَاثَةٌ لَا يَقْبَلُ اللَّهُ لَهُمْ صَرْفًا وَلَا عَدْلًا : عَاقٌ ، وَمَنَّانٌ ، وَمُكَذِّبُ بِالْقَدَر).
“তিন ব্যক্তির নিকট হতে আল্লাহ ফরয-নফল কিছুই গ্রহণ করবেন না; পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, দান করে প্রচারকারী এবং তকদীর অস্বীকারকারী ব্যক্তি।” (ত্বাবারানী ৭৫৪৭, সহীহুল জামে ৩০৬৫নং)
৫। যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে হত্যা করে এবং তাতে সে গর্ববোধ করে ও খুশী হয়। মুসলিম হত্যার পাপ বিশাল পাপ। সে পাপের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا } (۹۳) سورة النساء
“যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন বিশ্বাসীকে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম। সেখানে সে চিরকাল থাকবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে অভিসম্পাত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত ক'রে রাখবেন।” (নিসাঃ ৯৩)
কিন্তু অনেকে খুন ক'রে লজ্জিত-অনুতপ্ত না হয়ে গর্বিত হয়, অন্যের কাছে তা নিয়ে গর্ব ক'রে বেড়ায়। এমন ব্যক্তির আমল পন্ড। মহানবী বলেছেন,
مَنْ قَتَلَ مُؤْمِنًا فَاعْتَبَطَ بِقَتْلِهِ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ مِنْهُ صَرْفًا وَلَا عَدْلاً ...
“যে ব্যক্তি কোন মুমিনকে হত্যা করে তা নিয়ে আনন্দ উপভোগ করবে, সে ব্যক্তির নফল-ফরয কোন ইবাদতই আল্লাহ কবুল করবেন না।” (আবু দাউদ ৪২৭২, সহীহুল জামে' ৬৪৫৪নং)
৬। খুনের বদলে খুনের বদলা নিতে যে ব্যক্তি (শাসককে) বাধা দেয়। অনেক মানুষ আছে, যারা নিজেদের প্রভাবশালিতা ও পদমর্যাদার বলে আল্লাহর দন্ডবিধি কায়েম করতে বাধা সৃষ্টি করে। সে ক্ষেত্রে তার অপরাধ সামান্য নয়। মহানবী বলেছেন,
..... وَمَنْ قُتِلَ عَمْدًا فَقَوْدُ يَدَيْهِ فَمَنْ حَالَ بَيْنَهُ وَبَيْنَهُ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لَا يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَلَا عَدْلٌ ..
“---আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত (খুনী দ্বারা) খুন হবে, সেই খুনীকে খুনের বদলে খুন করা হবে। অতঃপর যে ব্যক্তি খুনী ও দন্ডের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিস্তা ও সকল মানুষের অভিশাপ। তার নফল-ফরয কোন ইবাদতই কবুল করা হবে না।” (আবু দাউদ ৪৫৯৩, সহীহ নাসাঈ ৪৪৫৬, সহীহ ইবনে মাজাহ ২২১১নং)
৭। পরের বাপকে যে নিজের বাপ বলে দাবী করে।
৮। যে ব্যক্তি মদীনায় কোন বিদআত কাজ করে অথবা কোন বিদআতীকে আশ্রয় দেয়। অথবা কোন দুষ্কর্ম করে বা দুষ্কৃতীকে আশ্রয় দেয়।
মহানবী বলেছেন,
(( المَدِينَةُ حَرَمٌ مَا بَيْنَ عَيْرِ إِلَى ثَوْرِ ، فَمَنْ أَحْدَثَ فِيهَا حَدَثاً ، أَوْ آوَى مُحْدِثاً ، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لَا يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْهُ يَومَ القِيَامَةِ صَرْفاً وَلَا عَدْلاً ذِمَّةُ الْمُسْلِمِينَ وَاحِدَةٌ ، يَسْعَى بِهَا أَدْنَاهُمْ ، فَمَنْ أَخْفَرَ مُسْلِماً ، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لَا يَقْبَلُ اللهُ مِنْهُ يَومَ القِيَامَةِ صَرْفاً وَلَا عَدْلاً. وَمَن ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ، أو انْتَمَى إِلَى غَيْر مَوَالِيهِ ، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ وَالمَلائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لَا يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْهُ يَومَ القِيَامَةِ صَرْفاً وَلَا عَدْلاً )) . متفق عَلَيْهِ
"আইর থেকে সওর পর্যন্ত মদীনার হারাম-সীমা। এখানে যে ব্যক্তি (ধর্মীয় বিষয়ে) অভিনব কিছু (বিদআত) রচনা করবে বা বিদআতীকে আশ্রয় দেবে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশাদল এবং সকল মানুষের অভিশাপ। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না। সমস্ত মুসলিমদের প্রতিশ্রুতি ও নিরাপত্তাদানের মর্যাদা এক। তাদের কোন নিম্নশ্রেণীর মুসলিম (কাউকে আশ্রয় প্রদানের) কাজ করতে পারে। সুতরাং যে ব্যক্তি মুসলিমের ঐ কাজকে বানচাল করে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিস্তা ও সকল মানুষের লানত। কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না। আর যে ব্যক্তি প্রকৃত বাপ ছাড়া অন্যকে বাপ বলে দাবী করে বা প্রকৃত মনিব ছাড়া অন্য মনিবের সাথে সম্বন্ধ জুড়ে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিস্তা ও সমস্ত মানুষের অভিশাপ। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত গ্রহণ করবেন না।" (বুখারী ৬৭৫৫, মুসলিম ৩৩৯৩, ৩৮৬৭নং)
৯। মদীনাবাসীকে সন্ত্রস্তকারী
মদীনা নববিয়ার ভিতরে যে ব্যক্তি সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ঘটিয়ে মদীনাবাসীকে ভীত-সন্ত্রস্ত করবে, তার অপরাধ বড় কঠিন। সে ব্যক্তিরও কোন আমল মহান আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না। মহানবী বলেছেন,
(( اللَّهُمَّ مَنْ ظَلَمَ أَهْلَ الْمَدِينَةِ وَأَخَافَهُمْ ، فَأَخِفْهُمْ ، وَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ، وَالْمَلَائِكَةِ، وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لا يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْهُ صَرْفًا وَلَا عَدْلاً )).
"হে আল্লাহ! যে ব্যক্তি মদীনাবাসীদের প্রতি অত্যাচার করে এবং তাদেরকে সন্ত্রস্ত করে, তুমি তাকে সন্ত্রস্ত কর। আর তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতামন্ডলী এবং সমগ্র মানবমন্ডলীর অভিশাপ। তার নিকট থেকে নফল-ফরয কোন ইবাদতই কবুল করা হবে না।" (ত্বাবারানীর কাবীর ৬৪৯৮, সিঃ সহীহাহ ৩৫১নং)
১০। যে ব্যক্তি মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। মহানবী বলেছেন,
ذِمَّةُ الْمُسْلِمِينَ وَاحِدَةٌ ، يَسْعَى بِهَا أَدْنَاهُمْ ، فَمَنْ أَخْفَرَ مُسْلِماً ، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالمَلائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لَا يَقْبَلُ اللهُ مِنْهُ يَومَ القِيَامَةِ صَرْفاً وَلَا عَدْلاً)) . متفق عَلَيْهِ
"সমস্ত মুসলিমদের প্রতিশ্রুতি ও নিরাপত্তাদানের মর্যাদা এক। তাদের কোন নিম্নশ্রেণীর মুসলিম (কাউকে আশ্রয় প্রদানের) কাজ করতে পারে। সুতরাং যে ব্যক্তি মুসলিমের ঐ কাজকে বানচাল করে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিস্তা ও সকল মানুষের লানত। কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না।" (বুখারী ৬৭৫৫, মুসলিম ৩৩৯৩, ৩৮৬৭নং)
উপর্যুক্ত ব্যক্তিবর্গের কোন ফরয-নফল নামায ও ইবাদতই (অথবা তওবা ও মুক্তিপণ কিয়ামতে) কবুল করা হবে না।
১১। এমন লোক, যে কোন গণকের কাছে ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ জানার আশায় গণককে 'ইল্মে গায়বের মালিক' মনে করে হাত দেখায়।
এমন ব্যক্তির---কেবল গণকের কাছে যাওয়ার কারণেই---তার ৪০ দিনের (২০০ অক্তের) নামায কবুল হয় না! তার উপর গণক যা বলে তা বিশ্বাস করলে তো অন্য কথা। বিশ্বাস করলে তো সে মূলেই 'কাফের'-এ পরিণত হয়ে যায়। আর কাফেরের নামায-রোযা অবশ্যই মকবুল নয়। মহানবী বলেছেন,
(( مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ ، لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَة )) . رواه مسلم
'যে ব্যক্তি গণকের নিকট এসে কোন (গায়বী) বিষয়ে প্রশ্ন করে, তার চল্লিশ দিনের নামায কবুল করা হয় না।' (মুসলিম ৫৯৫৭নং)
(( مَنْ أَتَى كَاهِنًا أَوْ عَرَّافًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ )).
"যে ব্যক্তি কোন গণক বা জ্যোতিষীর নিকট উপস্থিত হয়ে সে যা বলে তা সত্য মনে (বিশ্বাস) করল, সে ব্যক্তি মুহাম্মাদ -এর উপর অবতীর্ণ (কুরআনের) প্রতি কুফরী করল।" (আহমাদ ৯৫৩৬, হাকেম ১৫, সহীহুল জামে' ৫৯৩৯নং)
একই অবস্থা হতে পারে সেই ব্যক্তির, যে স্ত্রীর পায়খানাদ্বারে অথবা তার মাসিকাবস্থায় যোনিপথে সহবাস করাকে হালাল জ্ঞান ক'রে সহবাস করে। মহানবী বলেছেন,
((مَنْ أَتَى حَائِضًا أَوْ امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا أَوْ كَاهِنَا فَصَدَّقَهُ فَقَدْ بَرِى مِمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ عَلَى مُحَمَّدٍ عَلَيْهِ الصَّلَاةِ وَالسَّلَامُ)).
"যে ব্যক্তি মাসিকাবস্থায় স্ত্রী-সহবাস করে অথবা স্ত্রীর পায়খানা-দ্বারে সঙ্গম করে অথবা কোন গণকের নিকট আসে এবং সে যা বলে তা বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মাদ -এর উপর যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে, তার সাথে সম্পর্কহীন হয়ে যায়।" (আহমাদ ৯২৯০, আবু দাউদ ৩৯০৬, তিরমিযী ১৩৫, ইবনে মাজাহ ৬৩৯নং) যেহেতু কুরআনে এ সকল কর্মকান্ডকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে, অথচ জেনেশুনে সে তার বিরোধিতা করে।
১২। মদ্যপায়ী, মাতাল
মদ্যপান একটি দুশ্চরিত্রবান লোকের অভ্যাস। এতে যে অভ্যাসী, সে আসলে মূর্তিপূজারীর সমতুল্য। মু'মিন থাকা অবস্থায় কেউ মদ্যপান করতে পারে না। আর কেউ পান করলে তার নামায কবুল করা হয় না। মহানবী বলেছেন,
((مَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً أَرْبَعِينَ صَبَاحًا فَإِنْ تَابَ تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ فَإِنْ عَادَ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً أَرْبَعِينَ صَبَاحًا فَإِنْ تَابَ تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ فَإِنْ عَادَ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً أَرْبَعِينَ صَبَاحًا فَإِنْ تَابَ تَابَ اللهُ عَلَيْهِ فَإِنْ عَادَ الرَّابِعَةَ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً أَرْبَعِينَ صَبَاحًا فَإِنْ تَابَ لَمْ يَتُبِ اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَقَاهُ مِنْ نَهْرِ الْخَبَالِ)).
"যে ব্যক্তি মদ পান করবে, সে ব্যক্তির ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। কিন্তু এরপর যদি সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করে নেবেন। অন্যথা যদি সে পুনরায় পান করে, তাহলে অনুরূপ তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। যদি এর পরেও সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করে নেবেন। অন্যথা যদি সে তৃতীয়বার পান করে, তাহলে অনুরূপ তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। কিন্তু এর পরেও যদি সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করে নেবেন। অন্যথা যদি সে চতুর্থবার তা পান করে, তাহলে অনুরূপ তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। কিন্তু এরপরে সে যদি তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন না, তিনি তার প্রতি ক্রোধান্বিত হন এবং (পরকালে) তাকে 'খাবাল নদী' থেকে পানীয় পান করাবেন।" ইবনে উমার-কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'হে আবু আব্দুর রহমান! 'খাবাল-নদী' কী?' উত্তরে তিনি বললেন, 'তা হল জাহান্নামবাসীদের পুঁজ দ্বারা প্রবাহিত (জাহান্নামের) এক নদী।' (তিরমিযী ১৮৬২, হাকেম ৪/১৪৬, নাসাঈ, সহীহুল জামে' ৬৩১২-৬৩১৩নং)
১৪। এমন স্ত্রী, যার স্বামী তার উপর রাগ করে আছে।
স্ত্রী স্বামীকে সর্বদা খোশ রাখবে, তার (ভালো কথা ও কাজে) আনুগত্য করবে, তার সব কথা মেনে চলবে, যৌনসুখ দিয়ে তাকে সর্বদা তৃপ্ত রাখবে, কোন বিষয়ে রাগ হলে তা সত্বর মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ক'রে সব কিছুতে তাকে সন্তুষ্ট রাখবে, এটাই হল স্ত্রীর ধর্ম। মহানবী বলেন, তোমাদের (সেই) স্ত্রীরাও জান্নাতী হবে, যে স্ত্রী অধিক প্রণয়িণী, সন্তানদাত্রী, বারবার ভুল করে বারবার স্বামীর নিকট আত্মসমর্পণকারিণী, যার স্বামী রাগ করলে সে তার নিকট এসে তার হাতে হাত রেখে বলে, আপনি রাজী (ঠান্ডা) না হওয়া পর্যন্ত আমি ঘুমাব না।" (সিঃ সহীহাহ ২৮৭নং)
কিন্তু এমন বহু মহিলা আছে, যারা তাদের স্বামীর খেয়ে-পরেও এমন রাগ-রোষকে পরোয়া করে না। নারী-স্বাধীনতার পক্ষপাতিনী স্বামীর সংসারেও পরম স্বাধীনতা-সুখ ভোগ করতে গিয়ে স্বামীকে নারাজ রাখে। ফলে বিশ্বস্বামীও নারাজ হন এবং সেই স্ত্রীর শয্যাসঙ্গী স্বামীকে খোশ করার আগে নামায পড়লেও সে নামাযে তিনি খোশ হন না। কারণ, 'হুকুকুল ইবাদ' আদায় না করা পর্যন্ত মহান আল্লাহ বান্দার তাওবাতে সন্তুষ্ট হন না। যার প্রতি অন্যায় করা হয়, তার নিকট আগে ক্ষমা পেলে তবেই মহান আল্লাহ ক্ষমা করেন। নচেৎ না।
১৫। এমন লোক যে কারো বিনা অনুমতি ও আদেশেই কারো জানাযা পড়ায় (ইমামতি করে)।
এমন ইমাম, যার ইমামতি অধিকাংশ মুক্তাদীরা পছন্দ করে না। তার পিছনে নামায পড়তে তাদের রুচি হয় না। ইমামতিতে ভুল আচরণ অথবা চরিত্রগত কোন কারণে অধিকাংশ লোকে তাকে ইমামতি করতে দিতে চায় না। এমন ইমামের নামায তার কান অতিক্রম করে না, মাথার উপরে যায় না, আকাশের দিকে ওঠে না, সাত আসমান পার হয়ে আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়া তো বহু দূরের কথা।
মহানবী বলেন,
((ثَلاثَةٌ لا تُجَاوِزُ صَلَاتُهُمْ رُؤوسَهُم : الْعَبْدُ الآبقُ، وَالْمَرْأَةُ تَبِيتُ وَزَوْجُهَا عَلَيْهَا سَاخِطٌ، وَإِمَامُ أَمَّ قَوْمًا وَهُمْ لَهُ كَارِهُونَ)).
“তিন ব্যক্তির নামায তাদের মাথা অতিক্রম করে না; পলাতক ক্রীতদাস, যতক্ষণ না সে ফিরে এসেছে, এমন স্ত্রী যার স্বামী তার উপর রাগান্বিত অবস্থায় রাত্রিযাপন করেছে, (যতক্ষণ না সে রাজী হয়েছে), (অথবা যে স্ত্রী তার স্বামীর অবাধ্যাচরণ করেছে, সে তার বাধ্য না হওয়া পর্যন্ত) এবং সেই সম্প্রদায়ের ইমাম, যাকে লোকে অপছন্দ করে।” (তিরমিযী ৩৬০, তাবারানী ৮০১৬, হাকেম, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৮৮, ৬৫০নং)
১৬। এমন নামাযী, যে নামায পড়ে কিন্তু নামায চুরি করে।
দায় সারা ক'রে নামায পড়ে। ঠিকমত রুকু-সিজদাহ করে না। রুকুতে স্থির হয় না, সিজদায় স্থির থাকে না। কোমর বাঁকানো মাত্র তুলে নেয়। 'সু-সু-সু' করে দুআ পড়ে চট্টপট উঠে যায়! কারো কোমর ঠিকমত বাঁকে না। মাথা উঁচু করেই রুকু করে। কারো সিজদার সময় নাক মুসাল্লায় স্পর্শ করে না। কারো পা দু'টি উপর দিকে পাল্লায় হাল্কা হওয়ার মত উঠে যায়। কেউ রুকু ও সিজদার মাঝে স্থির হয়ে দাঁড়ায় না। হাফ দাঁড়িয়ে সিজদায় যায়।
মহানবী বলেন, “হে মুসলিম দল! সে ব্যক্তির নামায হয় না, যে ব্যক্তি রুকু ও সিজদাতে নিজ পিঠ সোজা করে না।” (আহমাদ, ইবনে মাজাহ, ইবনে খুযাইমা, ইবনে হিব্বান, সঃ তারগীব ৫২৪নং)
"আল্লাহ সেই বান্দার নামাযের দিকে তাকিয়েও দেখেন না, যে রুকু ও সিজদার মাঝে নিজ পিঠকে সোজা করে (দাঁড়ায়) না।" (আহমদ ৪/২২, ত্বাবারানী, সঃ তারগীব ৫২৫, সিঃ সহীহাহ ২৫৩৬ নং)
"মানুষ ৬০ বছর ধরে নামায পড়ে, অথচ তার একটি নামাযও কবুল হয় না! কারণ, হয়তো বা সে রুকু পূর্ণরূপে করে, কিন্তু সিজদাহ পূর্ণরূপে করে না। অথবা সিজদাহ পূর্ণরূপে করে, কিন্তু রুকু ঠিকমত করে না।" (আসবাহানী, সিঃ সহীহাহ ২৫৩৫নং)
"নামায ৩ ভাগে বিভক্ত; এক তৃতীয়াংশ পবিত্রতা, এক তৃতীয়াংশ রুকু এবং আর এক তৃতীয়াংশ হল সিজদাহ। সুতরাং যে ব্যক্তি তা যথার্থরূপে আদায় করবে, তার নিকট থেকে তা কবুল করা হবে এবং তার অন্যান্য সমস্ত আমলও কবুল করা হবে। আর যার নামায রদ্দ করা হবে, তার অন্য সকল আমলকে রদ্দ করে দেওয়া হবে।" (বাযযার, সিঃ সহীহাহ ২৫৩৭নং)
১৭। আযান শুনেও যে নামাযী বিনা ওজরে মসজিদের জামাআতে নামায পড়ে না।
জামাআতে নামায পড়া ওয়াজেব। এই ওয়াজেব ত্যাগ করলে তার নামায কবুল নাও হতে পারে। মহানবী বলেন,
مَنْ سَمِعَ الْمُنَادِيَ فَلَمْ يَمْنَعْهُ مِنَ اتَّبَاعِهِ عُذْرٌ، لَمْ تُقْبَلْ مِنْهُ الصَّلَاةُ الَّتِي صَلَّى ».
"যে ব্যক্তি আযান শোনা সত্ত্বেও মসজিদে জামাআতে এসে নামায আদায় করে না, (ভয়, রোগ ইত্যাদি) কোন ওজর না থাকলে সে ব্যক্তির পড়া নামায কবুল হয় না।" (আবু দাউদ ৫৫১, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, হাকেম, সঃ জামে' ৬৩০০নং)
১৮। এমন মহিলা, যে আতর বা সেন্ট মেখে মসজিদের জন্য বের হয়।
স্বামী বা অভিভাবকের অনুমতিক্রমে মহিলা মসজিদে গিয়ে জামাআত সহকারে নামায আদায় করতে পারে। তবে শর্ত হল কোন প্রকার সুগন্ধি ব্যবহার করতে পারবে না। এ শর্ত না মানলে মহিলার নামায কবুল হয় না। মহানবী বলেছেন,
أَيُّمَا امْرَأَة تطَيِّبَتْ ثُمَّ خَرَجَتْ إِلى المَسجِدِ لمْ تُقْبَلْ لَهَا صَلاةٌ حَتَّى تَغْتَسِلَ)).
"যে মহিলা সেন্ট ব্যবহার করে মসজিদে যায়, সেই মহিলার গোসল না করা পর্যন্ত কোন নামায কবুল হবে না।" (ইবনে মাজাহ ৪০০২, সজাঃ ২৭০৩নং)