📄 আমল-বিধ্বংসী অপরাধসমূহ
আমল শুধু করলেই হয় না, তার সংরক্ষণ করতে হয়। যেমন ফল-ফসল উৎপাদন করলেই হয় না, বরং তার সংরক্ষণ করতে হয়। উপার্জনের পর অর্থের সংরক্ষণ করতে হয়। এমন কোন কর্ম করা যাবে না, এমন কোন প্রকার শৈথিল্য করা যাবে না, যাতে সে সব নষ্ট ও চুরি হয়ে যায়। মহান আল্লাহ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَلَا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ} (৩৩) محمد
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রসূলের আনুগত্য কর, আর তোমাদের কর্মসমূহ বিনষ্ট করো না।" (মুহাম্মাদঃ ৩৩)
মানুষ ইহকালে যে সকল সৎকর্ম করে, তার বিনিময় পাবে পরকালে। কিছু ফল ফলে যায় ইহকালেও। কিন্তু আমল পরিমাণে যত বেশিই হোক বা মানে যত বেশিই ভালো হোক না কেন, তার হিফাযতের প্রয়োজন আছে, নচেৎ তা নষ্ট হয়ে যায়। বড় সৎকর্ম যেমন ছোট ছোট পাপকে মোচন করে দেয়, তদনুরূপ বড় বড় পাপও অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট সৎকর্মকে ধ্বংস ক'রে দেয়।
আমরা এখন সেই সকল অপরাধ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব, যার ফলে মানুষের সৎকর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। ইহকালে কাজে এলেও পরকালে কোন কাজে আসবে না।
একঃ কুফরী
কুফরী মানে অবিশ্বাস, অস্বীকার, অমান্য, সন্দেহ, মিথ্যায়ন, প্রত্যাখ্যান, ঘৃণা ইত্যাদি। সৃষ্টিকর্তা, তাঁর রসূল বা তাঁর দ্বীন-বিষয়ক কোন ব্যাপারে অবিশ্বাস করা, কোন কিছুকে অস্বীকার করা, কোন কিছুতে সন্দেহ পোষণ করা অথবা কোন কিছুকে মিথ্যাজ্ঞান করা এমন এক বৃহত্তম অপরাধ, যার ফলে মানুষের সৎকর্ম পন্ড হয়ে যায়, তাতে তা যত বড় বা যত বেশিই হোক না কেন। এমনকি কোনও বিশাল আমল মুসলিম অবস্থায় ক'রে মুর্তাদ হলে তাও বরবাদ হয়ে যায়।
আমরা কুরআন কারীমের কিছু আয়াত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَن يَرْتَدِدْ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُوْلَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَأُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} (۲۱۷) سورة البقرة
"তোমাদের মধ্যে যে কেউ নিজ ধর্ম ত্যাগ করে এবং সে সত্যপ্রত্যাখ্যানকারী (কাফের) রূপে মৃত্যুবরণ করে, তাদের ইহকাল ও পরকালের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। তারাই দোযখবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।" (বাক্বারাহঃ ২১৭)
{ إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ حَقٍّ وَيَقْتُلُونَ الَّذِينَ يَأْمُرُونَ بِالْقِسْطِ مِنْ النَّاسِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ (۲۱) أُولَئِكَ الَّذِينَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمَا لَهُم مِّن نَّاصِرِينَ) (۲۲) سورة آل عمران
"যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অবিশ্বাস করে, নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে এবং যে সকল লোক ন্যায়পরায়ণতার নির্দেশ দেয় তাদেরকেও হত্যা করে, তুমি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও। এই সব লোকের সকল আমল ইহকাল ও পরকালে নিষ্ফল হবে এবং তাদের কোন সাহায্যকারী নেই।" (আলে ইমরানঃ ২১-২২)
{وَمَن يَكْفُرْ بِالإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ وَهُوَ فِي الآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ} (۵) المائدة
"যে কেউ ঈমানকে অস্বীকার করবে, তার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।" (মায়িদাহঃ ৫)
{وَالَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَلِقَاء الآخِرَةِ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ هَلْ يُجْزَوْنَ إِلا مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ}
"যারা আমার নিদর্শনসমূহ ও পরকালের সাক্ষাৎকে মিথ্যা বলে, তাদের কার্য নিষ্ফল হবে। তারা যা করবে তদনুযায়ীই তাদেরকে প্রতিফল দেওয়া হবে।" (আ'রাফঃ ১৪৭)
{مَا كَانَ لِلْمُشْرِكِينَ أَن يَعْمُرُوا مَسَاجِدَ اللهُ شَاهِدِينَ عَلَى أَنفُسِهِمْ بِالْكُفْرِ أُوْلَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ وَفِي النَّارِ هُمْ خَالِدُونَ} (۱۷) سورة التوبة
"অংশীবাদীরা যখন নিজেরাই নিজেদের কুফরী (অবিশ্বাস) স্বীকার করে, তখন তারা আল্লাহর মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করবে এমন হতে পারে না। ওরা এমন যাদের সকল কর্ম ব্যর্থ এবং ওরা জাহান্নামেই স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে।" (তাওবাহঃ ১৭)
كَالَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ كَانُوا أَشَدَّ مِنكُمْ قُوَّةً وَأَكْثَرَ أَمْوَالاً وَأَوْلَادًا فَاسْتَمْتَعُوا بِخَلاقِهِمْ فَاسْتَمْتَعْتُم بِخَلاقِكُمْ كَمَا اسْتَمْتَعَ الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ بِخَلاقِهِمْ وَخُضْتُمْ كَالَّذِي خَاضُوا أَوْلَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ} (٦٩) سورة التوبة
"(তোমরাও) তোমাদের পূর্ববর্তীদের মত, যারা শক্তি, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে ছিল তোমাদের চেয়ে অনেক বেশী; ফলতঃ তারা নিজেদের (পার্থিব) অংশ উপভোগ করেছে। অতঃপর তোমরাও তোমাদের (পার্থিব) অংশ উপভোগ করেছ, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীগণ নিজেদের অংশ উপভোগ করেছে। আর তোমরাও সেইরূপ (অন্যায়) আলাপ-আলোচনায় নিমগ্ন হয়েছ, যেরূপ তারা হয়েছিল। দুনিয়াতে ও আখেরাতে ওদের (নেক) কর্মসমূহ বিনষ্ট হয়ে গেছে, আর ওরাই হল ক্ষতিগ্রস্ত।" (তাওবাহঃ ৬৯)
{قُلْ هَلْ تُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالًا (۱۰۳) الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا (١٠٤) أُولَئِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ وَلِقَائِهِ فَحَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فَلَا تُقِيمُ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَزْنًا} (١٠٥) سورة الكهف
তুমি বল, 'আমি কি তোমাদেরকে সংবাদ দেব তাদের, যারা কর্মে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত?' ওরাই তারা, পার্থিব জীবনে যাদের প্রচেষ্টা পন্ড হয়, যদিও তারা মনে ক'রে যে, তারা সৎকর্ম করছে। ওরাই তারা যারা তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী ও তাঁর সাথে তাদের সাক্ষাৎকে অস্বীকার করে; ফলে তাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। সুতরাং কিয়ামতের দিন আমি তাদের জন্য কোন ওজন রাখব না। (কাহফঃ ১০৩-১০৫)
{أَشِحَّةً عَلَيْكُمْ فَإِذَا جَاءَ الْخَوْفُ رَأَيْتَهُمْ يَنظُرُونَ إِلَيْكَ تَدُورُ أَعْيُنُهُمْ كَالَّذِي يُغْشَى عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَإِذَا ذَهَبَ الْخَوْفُ سَلَقُوكُم بِأَلْسِنَةٍ حِدَادٍ أَشِحَّةً عَلَى الْخَيْرِ أُوْلَئِكَ لَمْ يُؤْمِنُوا فَأَحْبَطَ اللَّهُ أَعْمَالَهُمْ وَكَانَ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرًا} (۱۹) سورة الأحزاب
"তোমাদের সহযোগিতায় ওরা কুণ্ঠিত; যখন বিপদ আসে, তখন তুমি দেখবে মৃত্যুভয়ে বেহুঁশ ব্যক্তির মত চোখ উলটিয়ে ওরা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু যখন বিপদ চলে যায়, তখন ওরা যুদ্ধলব্ধ ধনের লালসায় তোমাদের সাথে বাকচাতুরী করে। ওরা বিশ্বাসী নয়; এ জন্য আল্লাহ ওদের কার্যাবলী নিষ্ফল করেছেন। আর আল্লাহর জন্য এ সহজ।" (আহযাবঃ ১৯)
{ذلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ} (৯) سورة محمد
"এটা এ জন্যে যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তারা তা অপছন্দ করে। সুতরাং আল্লাহ তাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল ক'রে দেবেন।" (মুহাম্মাদঃ ৯)
{ذلِكَ بِأَنَّهُمُ اتَّبَعُوا مَا أَسْخَطَ اللَّهَ وَكَرِهُوا رِضْوَانَهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ} (২৮) محمد
"এটা এ জন্য যে, যা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে, তারা তার অনুসরণ করে এবং তাঁর সন্তুষ্টিকে অপছন্দ করে, সুতরাং তিনি তাদের কর্ম নিষ্ফল ক'রে দেন।" (মুহাম্মাদঃ ২৮)
{إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَصَدُّوا عَن سَبِيلِ اللَّهِ وَشَاقُوا الرَّسُولَ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الهُدَى لَن يَضُرُّوا اللَّهَ شَيْئًا وَسَيُحْبِطُ أَعْمَالَهُمْ} (৩২) سورة محمد
"যারা অবিশ্বাস করে এবং মানুষকে আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করে এবং নিজেদের নিকট পথের দিশা ব্যক্ত হবার পর রসূলের বিরোধিতা করে, তারা কখনই আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আর তিনি তাদের কর্ম ব্যর্থ করবেন।" (মুহাম্মাদঃ ৩২)
{ مَّثَلُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِرَبِّهِمْ أَعْمَالُهُمْ كَرَمَادٍ اشْتَدَّتْ بِهِ الرِّيحُ فِي يَوْمٍ عَاصِفٍ لَا يَقْدِرُونَ مِمَّا كَسَبُوا عَلَى شَيْءٍ ذَلِكَ هُوَ الضَّلَالُ الْبَعِيدُ} (১৮) سورة إبراهيم
"যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের বিবরণ এই যে, তাদের কর্মাবলী ভল্মের মত যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচন্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। যা তারা উপার্জন করে, তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারে না; এটাই তো ঘোর বিভ্রান্তি।" (ইব্রাহীমঃ ১৮)
{وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَعْمَالُهُمْ كَسَرَابِ بَقِيعَةٍ يَحْسَبُهُ الظَّمْآنُ مَاء حَتَّى إِذَا جَاءَهُ لَمْ يَجِدْهُ شَيْئًا وَوَجَدَ اللَّهَ عِندَهُ فَوَفَّاهُ حِسَابَهُ وَاللَّهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ} (৩৯) سورة النور
"যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করে, তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকার ন্যায়; পিপাসার্ত যাকে পানি মনে ক'রে থাকে। কিন্তু সে ওর নিকট উপস্থিত হলে দেখে তা কিছুই নয় এবং সেখানে সে আল্লাহকে পায়। অতঃপর তিনি তার কর্মফল পূর্ণমাত্রায় দান করেন। আর আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর।" (নূর: ৩৯)
দুইঃ শির্ক
যদিও শির্ক এক প্রকার কুফরী, তবুও তাতে কিছু বিশ্বাস থাকে। সৃষ্টিকর্তার প্রতি ঈমান রেখে তাঁর কর্মে, ইবাদতে বা নাম ও গুণাবলীতে কোন প্রকার শির্ক করলে আমল পন্ড হয়ে যায়। তখন যথেষ্ট হয় না শুধু এই বিশ্বাস যে, আল্লাহর আমাদের স্রষ্টা ও প্রতিপালক, তিনিই বিশ্ব-জাহান সৃষ্টি করেছেন, তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন ও ফল-ফসল দান করেন ইত্যাদি।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ذَلِكَ هُدَى اللَّهِ يَهْدِي بِهِ مَن يَشَاء مِنْ عِبَادِهِ وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُم مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ} (৮৮) سورة الأنعام
"এ আল্লাহর পথ নিজের দাসদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি এ দ্বারা পরিচালিত করেন, তারা যদি অংশী স্থাপন (শিক) করত, তাহলে তাদের কৃতকর্ম নিষ্ফল হত।" (আনআমঃ ৮৮)
আদম থেকে সর্বশেষ নবীর প্রতি একই প্রত্যাদেশ ছিল, শির্ক করো না। তাঁর ইবাদত ও উপাসনায় কাউকে শরীক করো না। মূর্তি বা অন্য কিছুর পূজা করো না। মৃত নেক লোকেদের ইবাদত করো না। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কেউ সত্য উপাস্য নেই)। সুতরাং প্রত্যেক নবীই সেই প্রত্যাদেশ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
মহান আল্লাহ জানেন, নবীরা শির্ক করেন না, করতে পারেন না। সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ-ও না। তবুও তিনি তাঁর উদ্দেশ্যে বলেছেন,
{وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ} (৬৫) سورة الزمر
"তোমার প্রতি ও তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই অহী (প্রত্যাদেশ) করা হয়েছে যে, যদি তুমি আল্লাহর অংশী স্থির কর, তাহলে অবশ্যই তোমার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্তদের শ্রেণীভুক্ত।" (যুমার: ৬৫)
মহান আল্লাহ মুশরিকদের আমল সম্বন্ধে বলেছেন,
{وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَل فَجَعَلْنَاهُ هَبَاء مَّنثُورًا} (২৩) سورة الفرقان
"আমি ওদের কৃতকর্মগুলির প্রতি অভিমুখ ক'রে সেগুলিকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণা (স্বরূপ নিষ্ফল) ক'রে দেব।" (ফুরক্বান: ২৩)
তিনঃ রিয়া
'রিয়া' বা লোকপ্রদর্শন, আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া লোককে দেখানোর জন্য নেক আমল করা, অর্থোপার্জন বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে সৎকর্ম করা। রিয়ার ফলেও আমলকারীর আমল ধ্বংস হয়ে যায়, তবে তার অন্য সকল আমল নয়। বরং শুধু সেই আমল, যাতে রিয়া অনুপ্রবেশ করে। কারণ তাও এক প্রকার শির্ক। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُمْ بِالمَنَّ وَالأَذِى كَالَّذِي يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ }
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! দানের কথা প্রচার করে এবং কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে নষ্ট ক'রে দিয়ো না; ঐ লোকের মত, যে নিজের ধন লোক দেখানোর জন্য ব্যয় করে। (সূরা বাকারাহ ২৬৪ আয়াত)
মহানবী বলেছেন,
(( قَالَ الله تَعَالَى : أَنَا أَغْنَى الشَّرَكَاءِ عَنِ الشَّرْكِ ، مَنْ عَمِلَ عَمَلاً أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ )) . رواه مسلم
"মহান আল্লাহ বলেন, 'আমি সমস্ত অংশীদারদের চাইতে অংশীদারি (শিক) থেকে অধিক অমুখাপেক্ষী। কেউ যদি এমন কাজ করে, যাতে সে আমার সঙ্গে অন্য কাউকে অংশীদার স্থাপন করে, তাহলে আমি তাকে তার অংশীদারি (শির্ক) সহ বর্জন করি।" (অর্থাৎ তার আমলই নষ্ট ক'রে দিই।) (মুসলিম ৭৬৬৬নং)
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
((قَالَ اللَّهُ ، عَزَّ وَجَلَّ : أَنَا خَيْرُ الشُّرَكَاءِ ، مَنْ عَمِلَ لِي عَمَلاً أَشْرَكَ فِيهِ غَيْرِي ، فَأَنَا بَرِيءٌ مِنْهُ ، وَهُوَ لِلَّذِي أَشْرَكَ)).
"আল্লাহ আযযা অজাল্ল বলেছেন, 'আমি সকল অংশীদার অপেক্ষা অধিক শির্ক (অংশীদারী) হতে বেপরোয়া। অতএব যে ব্যক্তি আমার জন্য কোন এমন আমল করবে, যাতে সে আমি ভিন্ন অন্য কাউকে অংশী করবে, আমি তার থেকে সম্পর্কহীন। আর সে আমল তার জন্য হবে যাকে সে শরীক করেছে।" (ইবনে মাজাহ ৪২০২, আহমাদ ৭৯৯৯নং)
মহানবী আরো বলেছেন,
((إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشَّرْكُ الْأَصْغَرُ)).
"তোমাদের উপর আমার সবচেয়ে অধিক যে জিনিসের ভয় হয় তা হল ছোট শির্ক।"
সাহাবাগণ প্রশ্ন করলেন, 'হে আল্লাহর রসূল! ছোট শির্ক কী জিনিস?' উত্তরে তিনি বললেন,
((الرِّيَاءُ يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِذَا جُزِيَ النَّاسُ بِأَعْمَالِهِمْ اذْهَبُوا إِلَى الَّذِينَ كُنْتُمْ تُرَاءُونَ فِي الدُّنْيَا فَانْظُرُوا هَلْ تَجِدُونَ عِنْدَهُمْ جَزَاءً)).
"রিয়া (লোকপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আমল)। আল্লাহ আয্যা অজাল্ল যখন (কিয়ামতে) লোকেদের আমলসমূহের বদলা দান করবেন তখন সকলের উদ্দেশ্যে বলবেন, 'তোমরা তাদের নিকট যাও, যাদেরকে প্রদর্শন করে দুনিয়াতে তোমরা আমল করেছিলে। অতঃপর দেখ, তাদের নিকট কোন প্রতিদান পাও কি না!" (আহমাদ ২৩৬৩০, ইবনে আবিদ্দুনয়্যা, বাইহাকীর যুহদ, সহীহ তারগীব ২৯ নং)
(( إِنَّ أَوَّلَ النَّاسِ يُقْضَى يَومَ القِيَامَةِ عَلَيْهِ رَجُلٌ اسْتُشْهِدَ ، فَأْتِيَ بِهِ ، فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ ، فَعَرَفَهَا ، قَالَ : فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا ؟ قَالَ : قَاتَلْتُ فِيكَ حَتَّى اسْتُشْهِدْتُ . قَالَ : كَذَبْتَ ، وَلَكِنَّكَ قَاتَلْتَ لأَنْ يُقَالَ : جَرِيءٌ ! فَقَدْ قِيلَ ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ، وَرَجُلٌ تَعَلَّمَ العِلْمَ وَعَلَّمَهُ ، وَقَرَأَ القُرآنَ ، فَأْتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا ، قَالَ : فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا ؟ قَالَ : تَعَلَّمْتُ العِلْمَ وَعَلَّمْتُهُ ، وَقَرَأْتُ فِيكَ القُرْآنَ ، قَالَ : كَذَبْتَ ، وَلَكِنَّكَ تَعَلَّمْتَ لِيُقَالَ : عَالِمٌ : وَقَرَأْتَ القُرْآنَ لِيُقَالَ : هُوَ قَارِي ، فَقَدْ قِيلَ ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ ، وَرَجُلٌ وَسَّعَ اللهُ عَلَيْهِ ، وَأَعْطَاهُ مِنْ أَصْنَافِ المَالِ ، فَأْتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ ، فَعَرَفَهَا ، قَالَ : فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا ؟ قَالَ: مَا تَرَكْتُ مِنْ سبيل تُحِبُّ أَنْ يُنْفَقَ فِيهَا إِلَّا أَنْفَقْتُ فِيهَا لَكَ. قَالَ : كَذَبْتَ ، وَلَكِنَّكَ فَعَلْتَ لِيُقَالَ : جَوَادٌ ! فَقَدْ قِيلَ ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّار )) . رواه مسلم
"কিয়ামতের দিন অন্যান্য লোকেদের পূর্বে যে ব্যক্তির প্রথম বিচার হবে সে হচ্ছে একজন শহীদ। তাকে আল্লাহর দরবারে হাজির করা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর দেওয়া নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সুতরাং সে তা স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ বলবেন, 'ঐ নেয়ামতের বিনিময়ে তুমি কী আমল ক'রে এসেছ?' সে বলবে 'আমি তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য জিহাদ করেছি এবং অবশেষে শহীদ হয়ে গেছি।' আল্লাহ বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে জিহাদ করেছ, যাতে লোকেরা তোমাকে বলে, অমুক একজন বীর পুরুষ। সুতরাং তা-ই বলা হয়েছে।' অতঃপর (ফিরিশাদেরকে) আদেশ করা হবে এবং তাকে উবুড় ক'রে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
দ্বিতীয় হচ্ছে এমন ব্যক্তি, যে ইল্ম শিক্ষা করেছে, অপরকে শিক্ষা দিয়েছে এবং কুরআন পাঠ করেছে। তাকে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তাকে (পৃথিবীতে প্রদত্ত) তাঁর সকল নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও সব কিছু স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ বলবেন, 'এই সকল নেয়ামতের বিনিময়ে তুমি কী আমল ক'রে এসেছ?' সে বলবে, 'আমি ইল্ম শিখেছি, অপরকে শিখিয়েছি এবং তোমার সন্তুষ্টিলাভের জন্য কুরআন পাঠ করেছি।' আল্লাহ বলবেন, 'মিথ্যা বলছ তুমি। বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে ইল্ম শিখেছ, যাতে লোকেরা তোমাকে আলেম বলে এবং এই উদ্দেশ্যে কুরআন পড়েছ, যাতে লোকেরা তোমাকে ক্বারী বলে। আর (দুনিয়াতে) তা বলা হয়েছে।' অতঃপর (ফিরিশাদেরকে) নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উবুড় ক'রে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
তৃতীয় হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যার রুযীকে আল্লাহ প্রশস্ত করেছিলেন এবং সকল প্রকার ধন-দৌলত যাকে প্রদান করেছিলেন। তাকে আল্লাহর দরবারে হাজির করা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর দেওয়া সমস্ত নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও সব কিছু সারণ করবে। অতঃপর আল্লাহ প্রশ্ন করবেন, 'তুমি ঐ সকল নেয়ামতের বিনিময়ে কী আমল ক'রে এসেছ?' সে বলবে, 'যে সকল রাস্তায় দান করলে তুমি খুশী হও সে সকল রাস্তার মধ্যে কোনটিতেও তোমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে খরচ করতে ছাড়িনি।' তখন আল্লাহ বলবেন, 'মিথ্যা বলছ তুমি। বরং তুমি এ জন্যই দান করেছিলে; যাতে লোকে তোমাকে দানবীর বলে। আর তা বলা হয়েছে।' অতঃপর (ফিরিশাবর্গকে) হুকুম করা হবে এবং তাকে উবুড় ক'রে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মুসলিম ১৯০৫ নং)
(بَشِّرْ هَذِهِ الْأُمَّةَ بِالسَّنَاءِ وَالتَّمْكِينِ فِي الْبَلَادِ وَالنَّصْرِ وَالرِّفْعَةِ فِي الدِّينِ وَمَنْ عَمِلَ مِنْهُمْ بِعَمَلِ الْآخِرَةِ لِلدُّنْيَا فَلَيْسَ لَهُ فِي الْآخِرَةِ نَصِيبٌ)).
"এই উম্মতকে স্বাচ্ছন্দ্য, সমুন্নতি, দ্বীন সহ সুউচ্চ মর্যাদা, দেশসমূহে তাদের ক্ষমতা বিস্তার এবং বিজয়ের সুসংবাদ দাও। কিন্তু যে ব্যক্তি পার্থিব কোন স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে পরকালের কর্ম করবে, তার জন্য পরকালে প্রাপ্য কোন অংশ নেই।" (আহমাদ ২১২২৪, ইবনে মাজাহ, হাকেম, বাইহাকীর শুআবুল ঈমান ৬৮৩৩ ইবনে হিব্বান ৪০৫,, সহীহ তারগীব ২১নং)
আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
{مَن كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ (١٥) أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ} (١٦) سورة هود
"যারা শুধু পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা করে, আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মসমূহ (এর ফল) পৃথিবীতেই পরিপূর্ণরূপে প্রদান ক'রে দিই এবং সেখানে তাদের জন্য কিছুই কম করা হয় না। এরা এমন লোক যে, তাদের জন্য পরকালে জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই নেই, আর তারা যা কিছু করেছে, তা সবই পরকালে নিষ্ফল হবে এবং যা কিছু করে থাকে, তাও নিরর্থক হবে।" (হৃদঃ ১৫-১৬)
চারঃ মহানবী -এর উপর আওয়াজ উঁচু করা
সম্মানী মানুষের সামনে উঁচু গলায় কথা বলতে হয় না। এতে তাঁর সম্মানের ক্ষতি হয় এবং বক্তার বেআদবি হয়। কিন্তু সবার চাইতে বেশি সম্মানের অধিকারী মানুষের সামনে উচ্চ স্বরে কথা বললে অথবা তাঁর কথোপকথনের সময় তাঁর চাইতে বেশি উঁচু শব্দে কথা বললে অথবা মুখের উপর মুখ দিলে জীবনের সমস্ত আমলই ধ্বংস হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَن تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ} (۲) سورة الحجرات
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা নবীর কন্ঠস্বরের উপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চ স্বরে কথা বল, তার সাথে সেইভাবে উচ্চ স্বরে কথা বলো না; কারণ এতে অজ্ঞাতসারে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে।" (হুজুরাতঃ ২)
উক্ত আয়াতে সেই আদব, শ্রদ্ধা, ভক্তি ও মর্যাদা-সম্মানের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যা প্রত্যেক মুসলিমকে রাসূলুল্লাহ -এর জন্য নিবেদন করতে হয়। প্রথম আদব হল, তাঁর উপস্থিতিতে যখন তোমরা আপোসে কথোপকথন কর, তখন তোমাদের কণ্ঠস্বর যেন তাঁর কণ্ঠস্বরের উপর উঁচু না হয়ে যায়। দ্বিতীয় আদব হল, যখন নবী করীম -এর সাথে কথোপকথন কর, তখন অতি বিনয়, ভদ্রতা ও ধীরতার সাথে কর। ঐভাবে উচ্চৈঃস্বরে তাঁর সাথে কথা বলো না, যেভাবে তোমরা আপোসে নিঃসংকোচে পরস্পরের সাথে বলে থাক।
কেউ বলেছেন, এর অর্থ হল, 'হে মুহাম্মাদ! হে আহমাদ!' বলে ডেকো না, বরং শ্রদ্ধার সাথে 'হে আল্লাহর রসূল!' বলে সম্বোধন করো। যদি আদব ও শ্রদ্ধা-সম্মানের এই দাবীগুলোর খেয়াল না কর, তবে বেআদবী হওয়ার সম্ভাবনা আছে, যার ফলে তোমাদের সৎকর্মাদি নিষ্ফল হয়ে যেতে পারে, অথচ তোমরা তার কোন টেরও পাবে না। (আহসানুল বায়ান)
বর্তমানেও তাঁর প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা ও আদব রাখা উচিত। তাঁর উক্তির উপর অন্য কারো উক্তির সংঘর্ষ বাধিয়ে অন্যের কথাকে প্রাধান্য দেওয়া অনুচিত। সহীহ হাদীস এলে সেটাই মান্য হওয়া উচিত, যদিও তা অন্যের রায় বা মত-বিরোধী।
পাঁচ: আসরের নামায ত্যাগ করা
নামাযের মধ্যে আসরের নামাযের একটা বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাই এই নামাযের প্রতি বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে কুরআনে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ والصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ) (۲۳۸) سورة البقرة
"তোমরা নামাযসমূহের প্রতি যত্নবান হও; বিশেষ ক'রে মধ্যবর্তী (আসরের) নামাযের প্রতি। আর আল্লাহর সম্মুখে বিনীতভাবে খাড়া হও।" (বাক্বারাহঃ ২৩৮)
আর রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
مَنْ تَرَكَ صَلَاةَ الْعَصْرِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ)).
"যে ব্যক্তি আসরের নামায ত্যাগ করে, সে ব্যক্তির আমল পন্ড হয়ে যায়।" (বুখারী ৫৫৩, নাসাঈ ৪৭৪নং)
শুধু তাই নয়, বরং ব্যাপার আরো গুরুতর। মহানবী বলেছেন,
الَّذِي تَفُوتُهُ صَلَاةُ الْعَصْرِ كَأَنَّمَا وُتِرَ أَهْلَهُ وَمَا لَهُ)).
"যে ব্যক্তির আসরের নামায ছুটে গেল, তার যেন পরিবার ও ধন-মাল লুণ্ঠন হয়ে গেল।" (মালেক, বুখারী ৫৫২, মুসলিম ১৪৪৮নং প্রমুখ)
কেবল আসরের নামায ত্যাগ করলে এই অবস্থা? তাহলে পাঁচ ওয়াক্তের নামায ত্যাগ করলে অবস্থা কী হতে পারে, তা বেনামাযীরা অনুমান করবে কি?
ছয়ঃ গোপনে আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা লংঘন করা
বহু মানুষ আছে, যারা জনসমক্ষে ভালো সাজে, কিন্তু নির্জনে মন্দ কাজ করে। 'দিনের বেলায় মোল্লাগিরি, রাতের বেলায় কলাই চুরি করা'র মতো অভ্যাস আছে অনেকের।
يَسْتَخْفُونَ مِنَ النَّاسِ وَلَا يَسْتَخْفُونَ مِنَ اللَّهِ وَهُوَ مَعَهُمْ إِذْ يُبَيِّتُونَ مَا لَا يَرْضَى مِنَ الْقَوْلِ وَكَانَ اللهُ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطًا ) (۱۰۸) سورة النساء
"তারা মানুষকে লজ্জা করে (মানুষের দৃষ্টি থেকে গোপনীয়তা অবলম্বন করে), কিন্তু আল্লাহকে লজ্জা করে না (তাঁর দৃষ্টি থেকে গোপনীয়তা অবলম্বন করতে পারে না) অথচ তিনি তাদের সঙ্গে থাকেন, যখন রাত্রে তারা তাঁর (আল্লাহর) অপছন্দনীয় কথা নিয়ে পরামর্শ করে। আর তারা যা করে, তা সর্বতোভাবে আল্লাহর জ্ঞানায়ও।" (নিসাঃ ১০৮)
এমন লোকেরা যে এক প্রকার রিয়াকারী তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু পার্থক্য হল, এমন লোকেদের সমস্ত আমল পন্ড হয়ে যাবে। যওবান বলেন, একদা নবী বললেন,
((لَأُلْفِينَ أَقْوَامًا مِنْ أُمَّتِي يَأْتُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِحَسَنَاتٍ أَمْثَالَ جِبَالَ تِهَامَةَ فَيَجْعَلُهَا اللَّهُ هَبَاءً مَنْثُورًا))
"আমি নিঃসন্দেহে আমার উম্মতের কয়েক দল লোককে (চিনি), যাদের কিয়ামতের দিন পাব, তারা কিয়ামতের দিন তিহামা (মক্কা ও ইয়ামানের মধ্যবর্তী এক বিশাল লম্বা শ্রেণীবদ্ধ) পর্বতমালার সমপরিমাণ বিশুদ্ধ নেকী নিয়ে উপস্থিত হবে; কিন্তু আল্লাহ তাদের সে সমস্ত নেকীকে উড়ন্ত ধূলিকণাতে পরিণত করে দেবেন।"
যওবান বলেন, 'হে আল্লাহর রসূল! সে লোকেরা কেমন হবে তা আমাদের জন্য খুলে বলুন ও তাদের হুলিয়া বর্ণনা করুন, যাতে আমরা আমাদের অজান্তে তাদের দলভুক্ত না হয়ে পড়ি।' আল্লাহর রসূল বলেন,
((أَمَا إِنَّهُمْ مِنْ إِخْوَانِكُمْ ، وَلَكِنَّهُمْ أَقْوَامٌ إِذا خَلَوْا بِمَحَارِمِ اللَّهِ انْتَهَكُوهَا)).
"শোন! তারা তোমাদেরই ভাই এবং তোমাদেরই সম্প্রদায়ভুক্ত হবে। তোমরা যেমন রাত্রি জাগরণ করে ইবাদত কর তেমনি তারাও করবে। কিন্তু যখনই তারা আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তু নিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকবে, তখনই তা অমান্য ও লংঘন করবে।" (ইবনে মাজাহ ৪২৪৫, ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৪২৩২, সাগীর ৬৬২ নং)
সাতঃ অপ্রয়োজনে কুকুর পোষা
কুকুর একটি নিষিদ্ধ প্রাণী। যে প্রাণী কোন পাত্রে মুখ দিলে তা সাতবার ধৌত করতে হয়। কামড় দিলে জলাতঙ্ক রোগ হয়। যে প্রাণী ঘরে থাকলে রহমতের ফিরিস্তা প্রবেশ করেন না। সেই কুকুর যে নিজ বাড়িতে পুষবে, তার আমল ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। মহানবী বলেন,
(( مَنِ اقْتَنَى كَلْبَاً إِلَّا كَلْبَ صَيْدٍ أَوْ مَاشِيَةٍ فَإِنَّهُ يَنْقُصُ مِنْ أَجْرِهِ كُلَّ يَوْمٍ قِيرَاطَانِ )).
متفق عليه. وفي رواية : (( قِيرَاطٌ )) .
“যে ব্যক্তি শিকারী অথবা পশুরক্ষক কুকুর ছাড়া অন্য কুকুর পোষে, তার নেকী থেকে প্রত্যেক দিন দুই ক্বীরাত্ব পরিমাণ সওয়াব কমে যায়।” (মালেক, বুখারী ৫৪৮০-৫৪৮২, মুসলিম ৪১০৬-৪১১২নং, তিরমিযী, নাসাঈ) অন্য বর্ণনায় আছে, "এক ক্বীরাত্ব সওয়াব কমে যায়।" এখানে ক্বীরাত ঠিক কত পরিমাণ, তা আল্লাহই জানেন। অবশ্য জানাযার নামায পড়ার সওয়াবে উল্লিখিত 'ক্বীরাত'এর পরিমাণ একটি বিশাল পাহাড় বা উহুদ পাহাড়ের সমান।
আট: অসচ্চরিত্রতা
মহানবী বলেছেন,
أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ ، وَأَحَبُّ الأَعْمَالَ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى سُرُورٌ تُدْخِلُهُ عَلَى مُسْلِمٍ ، أَوْ تَكَشِفُ عَنْهُ كُرْبَةً ، أَوْ تَقْضِي عَنْهُ دَيْنَا ، أَوْ تَطْرُدُ عَنْهُ جُوعًا، وَلَأَنْ أَمْشِيَ مَعَ أَخِ فِي حَاجَةٍ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَعْتَكِفَ فِي هَذَا الْمَسْجِدِ - يَعْنِي مَسْجِدَ الْمَدِينَةِ - شَهْرًا ، وَمَن كَفَّ غَضَبَهُ سَتَرَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ ، وَمَنْ كَظَمَ غَيْظَهُ وَلَوْ شَاءَ أَنْ يُمْضِيَهُ أَمْضَاهُ مَلأَ اللَّهُ قَلْبَهُ رَجَاءً يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، وَمَنْ مَشَى مَعَ أَخِيهِ فِي حَاجَةٍ حَتَّى يُثْبِتَهَا لَهُ أَثْبَتَ اللَّهُ قَدَمَهُ يَوْمَ تَزُولُ الأَقْدَامِ وَإِنَّ سُوءِ الْخُلُقِ لَيُفْسِدُ الْعَمَلَ كَمَا يُفْسِدُ الْخَلُّ الْعَسَلَ].
"আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম লোক হল সেই ব্যক্তি যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশী উপকারী। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম আমল হল, একজন মুসলিমের হৃদয়কে খুশীতে পরিপূর্ণ করা অথবা তার কোন কষ্ট দূর করে দেওয়া অথবা তার তরফ থেকে তার ঋণ আদায় করে দেওয়া অথবা (কাপড় দান করে তার ইজ্জত ঢেকে দেওয়া অথবা) তার নিকট থেকে তার ক্ষুধা দূর করে দেওয়া। মসজিদে একমাস ধরে ই'তিকাফ করার চাইতে আমার মুসলিম ভাইয়ের কোন প্রয়োজন মিটাতে যাওয়া আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়। যে ব্যক্তি নিজ ক্রোধ সংবরণ করে নেবে, আল্লাহ তার দোষ গোপন করে নেবেন। যে ব্যক্তি নিজ রাগ সামলে নেবে; অথচ সে ইচ্ছা করলে তা প্রয়োগ করতে পারত, সে ব্যক্তির হৃদয়কে আল্লাহ কিয়ামতের দিন সন্তুষ্ট করবেন। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য যাবে এবং তা পূরণ করে দেবে, আল্লাহ সেদিন তার পদযুগলকে সুদৃঢ় রাখবেন, যেদিন পদযুগল পিছল কাটবে। আর মন্দ চরিত্র আমলকে নষ্ট করে, যেমন সির্কা মধুকে নষ্ট করে ফেলে।" (ত্বাবারানী ১৩৪৬৮, ইবনে আবিদ দুনয়া, সহীহ তারগীব ২০৯০, সিলসিলাহ সহীহাহ ৯০৬নং, সহীহুল জামে' ১৭৬নং)
লক্ষণীয় যে, হাদীসের শুরুতে সচ্চরিত্রতার বিশেষ কয়েকটি আমল উল্লিখিত হয়েছে এবং সব শেষে বলা হয়েছে, অসচ্চরিত্রতা মানুষের আমলকে নষ্ট করে দেয়।
আমরা সংসার জগতে তার উদাহরণ পেতে পারি। কত নামী-দামী প্রসিদ্ধ লোক একটি চরিত্রহীনতার কাজ করলে তার সুনাম চলে যায় এবং দাম কমে যায়। কোন পদে থাকলে তাকে পদচ্যুত করা হয়। গদিনশীন হলে গদিহীন করা হয়। চরিত্রহীনতার কারণে কত ইমাম সাহেবের ইমামতি যায়। কত মুফতীর ফতোয়া অমান্য হয়। কত বক্তাকে জলসা করতে আর ডাকা হয় না। পূর্বের কত সুনাম, সুখ্যাতি, প্রসিদ্ধি, নেক আমল ইত্যাদি নিমেষে বিলীন হয়ে যায়। নষ্ট হয়ে যায় এক পাত্র দুগ্ধে এক বিন্দু মূত্র পড়ার মতো।
নয়ঃ ছল ক'রে সূদ খাওয়া
ধারে জিনিস বিক্রয় করে সেই জিনিসকেই নগদে তার থেকে কম দামে ক্রয় করা। (যেমন এক ব্যক্তির অর্থের প্রয়োজন হল। ঋণ কোথাও না পেয়ে এক গাড়ির ডিলারের নিকট গেল। ডিলারের নিকট থেকে ধারে ৫০ হাজার টাকায় একটি গাড়ি কিনল। অতঃপর সেই গাড়িকেই ঐ ডিলারের নিকট নগদ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে বিক্রি করল। যার ফলে ১০ হাজার টাকা ডিলারের পকেটে অনায়াসে এসে গেল।) এমন ক্রয়-বিক্রয়কে 'বাইউল ঈনাহ' বলা হয়, যা এক প্রকার সূদী ব্যবসা। সাহাবী যায়দ বিন আরকাম এই ব্যবসায় জড়িত হলে মা আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, তওবা না করলে যায়দ রাসূলুল্লাহ -এর সাথে কৃত জিহাদকে নষ্ট করে ফেলেছে। (বাইহাকী ১১১১৩, দারাকুত্বনী ২১১, মুসান্নাফ আব্দুর রায্যাক ১৪৮১২-১৪৮১৩নং)
দশঃ মানুষের উপর যুলুম করা
মানুষের হক নষ্ট করলে অথবা কারো প্রতি কোন যুলুম ক'রে থাকলে এবং তওবা না ক'রে মারা গেলে শেষ বিচারের দিন সেই হক আদায় করতে হবে অথবা প্রতিশোধ দিতে হবে নেক আমলের নেকী দিয়ে। তার ফলে ঐ আত্মসাৎকারী বা যালেমের সমস্ত আমলের নেকী নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে।
আবু হুরাইরা বলেন, একদা মহানবী বললেন, "তোমরা কি জান, নিঃস্ব কে?" সাহাবাগণ বললেন, 'আমাদের মধ্যে নিঃস্ব সেই ব্যক্তি, যার কোন দিরহাম নেই, যার কোন আসবাব-পত্র নেই।' মহানবী বললেন,
إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ وَصِيَامٍ وَزَكَاةٍ وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا وَقَدْفَ هَذا وَأَكَلَ مَالَ هَذَا وَسَفَكَ دَمَ هَذَا وَضَرَبَ هَذَا فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطْرِحَتْ عَلَيْهِ ثُمَّ طُرِحَ فِي النار ».
"আমার উম্মতের মধ্যে (আসল) নিঃস্ব তো সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতে নামায, রোযা ও যাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে। কিন্তু সেই সঙ্গে সে দেখবে যে, সে একে গালি দিয়েছে, ওর নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, এর মাল আত্মসাৎ করেছে, ওকে খুন করেছে, একে মেরেছে--- ইত্যাদি। সুতরাং প্রতিশোধ স্বরূপ একে তার নেকী প্রদান করা হবে, ওকেও তার নেকী প্রদান করা হবে। পরিশেষে যখন নেকী নিঃশেষ হয়ে যাবে অথচ তার প্রতিশোধ শেষ হবে না, তখন ওদের গোনাহ নিয়ে এর ঘাড়ে চাপানো হবে এবং সবশেষে তাকে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে!" (মুসলিম ৬৭৪৪,, আহমাদ ৮০২৯, তিরমিযী ২৪১৮, ইবনে হিব্বান ৪৪১১, বাইহাকী ১১৮৩৮, সিলসিলাহ সহীহাহ ৮৪৭নং)
তিনি আরো বলেছেন,
((إِنَّ الشَّيْطَانَ قَدْ يَئِسَ أَنْ تُعْبَدَ الْأَصْنَامُ فِي أَرْضِ الْعَرَبِ ، وَلَكِنَّهُ سَيَرْضَى مِنْكُمْ بِدُونِ ذلِكَ ، بِالْمُحَقِّرَاتِ وَهِيَ الْمُوبِقَاتُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، اتَّقُوا الْمَظَالِمَ مَا اسْتَطَعْتُمْ ، فَإِنَّ الْعَبْدَ يجيءُ بِالْحَسَنَاتِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَرَى أَنَّهُ سَتُنَجِيهِ ، فَمَا يَزَالُ عَبْدٌ يَقُومُ فَيَقُولُ : يَا رَبِّ ظَلَمَنِي عَبْدُكَ مَظْلَمَةً ، فَيَقُولُ : امْحُوا مِنْ حَسَنَاتِهِ ، مَا يَزَالُ كَذَلِكَ حَتَّى مَا يَبْقَى لَهُ حَسَنَةٌ مِنَ الذُّنُوبِ ، وَإِنَّ مَثَلَ ذَلِكَ كَسَفْر نَزَلُوا بِفَلاةٍ مِنَ الْأَرْضِ لَيْسَ مَعَهُمْ حَطَبٌ ، فَتَفَرَّقَ الْقَوْمُ لِيَحْتَطِبُوا ، فَلَمْ يَلْبَثُوا أَنْ حَطَبُوا فَأَعْظَمُوا النَّارَ وَطَبَخُوا مَا أَرَادُوا ، وَكَذَلِكَ الذُّنُوبُ)).
"নিশ্চয় শয়তান এ বিষয়ে নিরাশ হয়েছে যে, আরবের মাটিতে প্রতিমা-পূজা হবে। তবে সে এর চাইতে ছোট পাপে তুষ্ট হবে। অথচ তা হবে কিয়ামতে বিধ্বংসী পাপ। তোমরা যথাসাধ্য অত্যাচার থেকে সাবধান থাকো। কারণ বান্দা কিয়ামতের দিন অনেক নেকী নিয়ে উপস্থিত হবে এবং সে ধারণা করবে যে, তা তাকে পরিত্রাণ দেবে। কিন্তু কোন বান্দা খাড়া হয়ে বলবে, 'হে আমার প্রতিপালক! তোমার এই বান্দা (আমার প্রতি অমুক) অন্যায় করেছে।' তখন (ফিরিস্তাকে) বলা হবে, 'ওর নেকীসমূহ হতে (পরিমাণ মতো) মোচন ক'রে দাও।' এইভাবে হতে থাকবে, পরিশেষে পাপের প্রতিশোধ দিতে দিতে তার কোন নেকী অবশিষ্ট থাকবে না। এর উপমা হল একদল মুসাফিরের, যারা কোন মরুভূমিতে অবতরণ করে, যাদের সাথে কোন জ্বালানি থাকে না। অতঃপর তারা জ্বালানি সংগ্রহের জন্য ছড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে তারা অনেক জ্বালানি জমা করে এবং তাতে আগুন ধরিয়ে ইচ্ছামতো রান্না করে। অনুরূপ পাপরাশি।" (হাকেম ২২২১, শুআবুল ঈমান বাইহাক্বী ৭২৬৩, ৭৪৭১, আবু য়্যা'লা ৫১২২, সঃ তারগীব ২২২১নং)
এক ব্যক্তি মহানবী-এর সম্মুখে বসে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার দাস-দাসী আছে। তারা আমাকে মিথ্যা বলে, আমার বিশ্বাসঘাতকতা করে ও অবাধ্য হয়। আর আমি তাদেরকে গালাগালি ও মারধর করি। সুতরাং তাদের ব্যাপারে (আল্লাহর কাছে) আমার অবস্থা কী হবে?' তিনি বললেন, "তারা তোমার যে পরিমাণ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, অবাধ্যতা করেছে ও মিথ্যা বলেছে এবং যে পরিমাণ তুমি তাদেরকে শাস্তি দিয়েছ তা হিসাব করা হবে। অতঃপর তোমার শাস্তির পরিমাণ যদি তাদের অপরাধ বরাবর হয়, তাহলে সমান-সমান হয়ে যাবে, না তোমার সওয়াব হবে, আর না কোন পাপ। কিন্তু যদি তোমার শাস্তির পরিমাণ তাদের অপরাধের তুলনায় কম হয়, তাহলে তা তোমার জন্য অতিরিক্ত মঙ্গল হবে। আর যদি তোমার শাস্তির পরিমাণ তাদের অপরাধের তুলনায় বেশি হয়, তাহলে তা তোমার নিকট থেকে তাদের জন্য অতিরিক্ত মঙ্গল প্রতিশোধ স্বরূপ নেওয়া হবে।"
এ কথা শুনে একটু সরে গিয়ে লোকটি কাঁদতে ও চীৎকার করতে লাগল। আল্লাহর রসূল তাকে বললেন, "তুমি কি আল্লাহর কিতাব পড় না?
{ وَتَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا وَإِن كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَل أَتَيْنَا بِهَا وَكَفَى بِنَا حَاسِبِينَ} (৪৭) سورة الأنبياء
অর্থাৎ, কিয়ামত দিবসে আমি স্থাপন করব ন্যায় বিচারের দাঁড়িপাল্লাসমূহ; সুতরাং কারো প্রতি কোন অবিচার করা হবে না। কর্ম যদি সরিষার দানা পরিমাণ ওজনের হয় তবুও তা আমি উপস্থিত করব। আর হিসাব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট। (আম্বিয়াঃ ৪৭)
লোকটি বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! ওদেরকে মুক্ত করা অপেক্ষা আমি আমার জন্য ও ওদের জন্য কোন অধিক মঙ্গল পাচ্ছি না। আমি আপনাদেরকে সাক্ষী রাখছি যে, ওরা সবাই মুক্ত।' (আহমাদ ২৬৪০১, তিরমিযী ৩১৬৫, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৮৫৮৬নং)
আর এ কথা বিদিত যে, আল্লাহ ও বান্দার মাঝের হক বিষয়ক পাপের চাইতে বান্দা ও বান্দার মাঝের হক বিষয়ক পাপ বেশি গুরুতর। হক ফিরিয়ে না দিলে অথবা ক্ষমা চেয়ে না নিলে বান্দার তওবাও কবুল হয় না। পরিশেষে শেষ বিচারের দিন নেক আমলের ভান্ডার থেকে তার খেসারত দিতে হয়।
এই জন্য সুফিয়ান সওরী বলেছেন, 'তুমি ও বান্দার মাঝের হক বিষয়ক ১টি পাপ নিয়ে আল্লাহ আয্যা অজাল্লার সাথে সাক্ষাৎ করার চাইতে তুমি ও তাঁর মাঝের হক বিষয়ক ৭০টি পাপ নিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করা অধিক সহজ।' (কুরতুবীর তাযকিরাহ ৪০৯পৃঃ)
এগারোঃ মুজাহিদের পরিবারে খিয়ানত করা
পুরুষকে অনেক সময় ঘর ছেড়ে বাইরে যেতে হয় পড়াশোনা বা রুযী-রোযগারের জন্য, যেতে হয় দাওয়াত বা জিহাদের কাজে দূর থেকে বহু দূরে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোন ব্যক্তিকে তার স্ত্রী-পরিজনের দায়িত্ব দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, রক্ষকই ভক্ষক হয়, বেড়াই খেত খায়। বাহিরের মুসাফির যেন বিড়ালকে মাছ বাছতে দিয়ে সফরে যায়। আল্লাহর পরে সে যার উপর ভরসা করেছিল, সেই তার সর্বনাশ করে। অনেক সময় তা প্রকাশ পায়, অধিকাংশ সময় মান-সম্মান বজায় রাখার তাকীদে চাপা রাখা হয়।
এটা এক প্রকার খিয়ানত। আর এ খিয়ানতের খেসারত দিতে হবে কিয়ামতে নেক আমলের নেকী দিয়ে। মহানবী ﷺ বলেছেন,
حُرْمَةُ نِسَاءِ الْمُجَاهِدِينَ عَلَى الْقَاعِدِينَ كَحُرْمَةِ أُمَّهَاتِهِمْ وَمَا مِنْ رَجُلٍ مِنَ الْقَاعِدِينَ يَخْلُفُ رَجُلاً مِنَ الْمُجَاهِدِينَ فى أَهْلِهِ فَيَخُونُهُ فِيهِمْ إِلَّا وُقِفَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيَأْخُذُ مِنْ عَمَلِهِ مَا شَاءَ فَمَا ظَنُّكُمْ ..
"যারা জিহাদে না গিয়ে ঘরে থাকে তাদের পক্ষে মুজাহিদগণের স্ত্রীরা তাদের মায়ের মতো অবৈধ। যারা ঘরে থাকে তাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি যখন কোন মুজাহিদের পরিবারে তার প্রতিনিধিত্ব (তত্ত্বাবধান) করে অতঃপর তাদের ব্যাপারে তার খেয়ানত (বিশ্বাসঘাতকতা) করে, সে ব্যক্তিকে কিয়ামতের দিন ঐ মুজাহিদের সামনে খাড়া করা হবে, অতঃপর সে (মুজাহিদ) নিজের ইচ্ছা ও খুশীমত তার আমল (এর নেকী) সমূহ নিতে পারবে। অতএব কী ধারণা তোমাদের?" (তার কোন নেকী আর অবশিষ্ট থাকবে কি?) (মুসলিম ৫০১৭-৫০১৯, আবু দাউদ ২৪৯৬নং, নাসাঈ)
📄 যে সকল অপরাধীর আমল কবুল হয় না
এমন বহু পাপী আছে, যাদের ফরয-নফল কোন ইবাদতই কবুল করা হয় না; দুনিয়াতে অথবা আখেরাতে। এ পর্বে আমরা তেমনই কিছু পাপী ও পাপিনীর কথা সংক্ষেপে আলোচনা করব ইন শাআল্লাহ।
১। যে ব্যক্তি কোন সাহাবীকে গালি দেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
((مَنْ سَبَّ أَصْحَابِي فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ ، وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ)).
"সে ব্যক্তি আমার সাহাবাগণকে গালি দেবে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতাবর্গ এবং সমগ্র মানবজাতির অভিশাপ হোক।" (ত্বাবারানীর কাবীর ১২৫৪১, সিলসিলাহ সহীহাহ ৩৩৪০নং)
এক বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে, "আল্লাহ তার নিকট থেকে কোন ফরয ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না।"
২। পিতামাতার অবাধ্য সন্তান।
৩। দান করে যে দানের কথায় গর্বভরে প্রচার করে বেড়ায়।
৪। তকদীর অস্বীকারকারী ব্যক্তি। মহানবী বলেছেন,
ثَلَاثَةٌ لَا يَقْبَلُ اللَّهُ لَهُمْ صَرْفًا وَلَا عَدْلًا : عَاقٌ ، وَمَنَّانٌ ، وَمُكَذِّبُ بِالْقَدَر).
“তিন ব্যক্তির নিকট হতে আল্লাহ ফরয-নফল কিছুই গ্রহণ করবেন না; পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, দান করে প্রচারকারী এবং তকদীর অস্বীকারকারী ব্যক্তি।” (ত্বাবারানী ৭৫৪৭, সহীহুল জামে ৩০৬৫নং)
৫। যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে হত্যা করে এবং তাতে সে গর্ববোধ করে ও খুশী হয়। মুসলিম হত্যার পাপ বিশাল পাপ। সে পাপের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا } (۹۳) سورة النساء
“যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন বিশ্বাসীকে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম। সেখানে সে চিরকাল থাকবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে অভিসম্পাত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত ক'রে রাখবেন।” (নিসাঃ ৯৩)
কিন্তু অনেকে খুন ক'রে লজ্জিত-অনুতপ্ত না হয়ে গর্বিত হয়, অন্যের কাছে তা নিয়ে গর্ব ক'রে বেড়ায়। এমন ব্যক্তির আমল পন্ড। মহানবী বলেছেন,
مَنْ قَتَلَ مُؤْمِنًا فَاعْتَبَطَ بِقَتْلِهِ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ مِنْهُ صَرْفًا وَلَا عَدْلاً ...
“যে ব্যক্তি কোন মুমিনকে হত্যা করে তা নিয়ে আনন্দ উপভোগ করবে, সে ব্যক্তির নফল-ফরয কোন ইবাদতই আল্লাহ কবুল করবেন না।” (আবু দাউদ ৪২৭২, সহীহুল জামে' ৬৪৫৪নং)
৬। খুনের বদলে খুনের বদলা নিতে যে ব্যক্তি (শাসককে) বাধা দেয়। অনেক মানুষ আছে, যারা নিজেদের প্রভাবশালিতা ও পদমর্যাদার বলে আল্লাহর দন্ডবিধি কায়েম করতে বাধা সৃষ্টি করে। সে ক্ষেত্রে তার অপরাধ সামান্য নয়। মহানবী বলেছেন,
..... وَمَنْ قُتِلَ عَمْدًا فَقَوْدُ يَدَيْهِ فَمَنْ حَالَ بَيْنَهُ وَبَيْنَهُ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لَا يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَلَا عَدْلٌ ..
“---আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত (খুনী দ্বারা) খুন হবে, সেই খুনীকে খুনের বদলে খুন করা হবে। অতঃপর যে ব্যক্তি খুনী ও দন্ডের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিস্তা ও সকল মানুষের অভিশাপ। তার নফল-ফরয কোন ইবাদতই কবুল করা হবে না।” (আবু দাউদ ৪৫৯৩, সহীহ নাসাঈ ৪৪৫৬, সহীহ ইবনে মাজাহ ২২১১নং)
৭। পরের বাপকে যে নিজের বাপ বলে দাবী করে।
৮। যে ব্যক্তি মদীনায় কোন বিদআত কাজ করে অথবা কোন বিদআতীকে আশ্রয় দেয়। অথবা কোন দুষ্কর্ম করে বা দুষ্কৃতীকে আশ্রয় দেয়।
মহানবী বলেছেন,
(( المَدِينَةُ حَرَمٌ مَا بَيْنَ عَيْرِ إِلَى ثَوْرِ ، فَمَنْ أَحْدَثَ فِيهَا حَدَثاً ، أَوْ آوَى مُحْدِثاً ، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لَا يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْهُ يَومَ القِيَامَةِ صَرْفاً وَلَا عَدْلاً ذِمَّةُ الْمُسْلِمِينَ وَاحِدَةٌ ، يَسْعَى بِهَا أَدْنَاهُمْ ، فَمَنْ أَخْفَرَ مُسْلِماً ، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لَا يَقْبَلُ اللهُ مِنْهُ يَومَ القِيَامَةِ صَرْفاً وَلَا عَدْلاً. وَمَن ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ، أو انْتَمَى إِلَى غَيْر مَوَالِيهِ ، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ وَالمَلائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لَا يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْهُ يَومَ القِيَامَةِ صَرْفاً وَلَا عَدْلاً )) . متفق عَلَيْهِ
"আইর থেকে সওর পর্যন্ত মদীনার হারাম-সীমা। এখানে যে ব্যক্তি (ধর্মীয় বিষয়ে) অভিনব কিছু (বিদআত) রচনা করবে বা বিদআতীকে আশ্রয় দেবে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশাদল এবং সকল মানুষের অভিশাপ। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না। সমস্ত মুসলিমদের প্রতিশ্রুতি ও নিরাপত্তাদানের মর্যাদা এক। তাদের কোন নিম্নশ্রেণীর মুসলিম (কাউকে আশ্রয় প্রদানের) কাজ করতে পারে। সুতরাং যে ব্যক্তি মুসলিমের ঐ কাজকে বানচাল করে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিস্তা ও সকল মানুষের লানত। কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না। আর যে ব্যক্তি প্রকৃত বাপ ছাড়া অন্যকে বাপ বলে দাবী করে বা প্রকৃত মনিব ছাড়া অন্য মনিবের সাথে সম্বন্ধ জুড়ে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিস্তা ও সমস্ত মানুষের অভিশাপ। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত গ্রহণ করবেন না।" (বুখারী ৬৭৫৫, মুসলিম ৩৩৯৩, ৩৮৬৭নং)
৯। মদীনাবাসীকে সন্ত্রস্তকারী
মদীনা নববিয়ার ভিতরে যে ব্যক্তি সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ঘটিয়ে মদীনাবাসীকে ভীত-সন্ত্রস্ত করবে, তার অপরাধ বড় কঠিন। সে ব্যক্তিরও কোন আমল মহান আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না। মহানবী বলেছেন,
(( اللَّهُمَّ مَنْ ظَلَمَ أَهْلَ الْمَدِينَةِ وَأَخَافَهُمْ ، فَأَخِفْهُمْ ، وَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ، وَالْمَلَائِكَةِ، وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لا يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْهُ صَرْفًا وَلَا عَدْلاً )).
"হে আল্লাহ! যে ব্যক্তি মদীনাবাসীদের প্রতি অত্যাচার করে এবং তাদেরকে সন্ত্রস্ত করে, তুমি তাকে সন্ত্রস্ত কর। আর তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতামন্ডলী এবং সমগ্র মানবমন্ডলীর অভিশাপ। তার নিকট থেকে নফল-ফরয কোন ইবাদতই কবুল করা হবে না।" (ত্বাবারানীর কাবীর ৬৪৯৮, সিঃ সহীহাহ ৩৫১নং)
১০। যে ব্যক্তি মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। মহানবী বলেছেন,
ذِمَّةُ الْمُسْلِمِينَ وَاحِدَةٌ ، يَسْعَى بِهَا أَدْنَاهُمْ ، فَمَنْ أَخْفَرَ مُسْلِماً ، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالمَلائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لَا يَقْبَلُ اللهُ مِنْهُ يَومَ القِيَامَةِ صَرْفاً وَلَا عَدْلاً)) . متفق عَلَيْهِ
"সমস্ত মুসলিমদের প্রতিশ্রুতি ও নিরাপত্তাদানের মর্যাদা এক। তাদের কোন নিম্নশ্রেণীর মুসলিম (কাউকে আশ্রয় প্রদানের) কাজ করতে পারে। সুতরাং যে ব্যক্তি মুসলিমের ঐ কাজকে বানচাল করে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিস্তা ও সকল মানুষের লানত। কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না।" (বুখারী ৬৭৫৫, মুসলিম ৩৩৯৩, ৩৮৬৭নং)
উপর্যুক্ত ব্যক্তিবর্গের কোন ফরয-নফল নামায ও ইবাদতই (অথবা তওবা ও মুক্তিপণ কিয়ামতে) কবুল করা হবে না।
১১। এমন লোক, যে কোন গণকের কাছে ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ জানার আশায় গণককে 'ইল্মে গায়বের মালিক' মনে করে হাত দেখায়।
এমন ব্যক্তির---কেবল গণকের কাছে যাওয়ার কারণেই---তার ৪০ দিনের (২০০ অক্তের) নামায কবুল হয় না! তার উপর গণক যা বলে তা বিশ্বাস করলে তো অন্য কথা। বিশ্বাস করলে তো সে মূলেই 'কাফের'-এ পরিণত হয়ে যায়। আর কাফেরের নামায-রোযা অবশ্যই মকবুল নয়। মহানবী বলেছেন,
(( مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ ، لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَة )) . رواه مسلم
'যে ব্যক্তি গণকের নিকট এসে কোন (গায়বী) বিষয়ে প্রশ্ন করে, তার চল্লিশ দিনের নামায কবুল করা হয় না।' (মুসলিম ৫৯৫৭নং)
(( مَنْ أَتَى كَاهِنًا أَوْ عَرَّافًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ )).
"যে ব্যক্তি কোন গণক বা জ্যোতিষীর নিকট উপস্থিত হয়ে সে যা বলে তা সত্য মনে (বিশ্বাস) করল, সে ব্যক্তি মুহাম্মাদ -এর উপর অবতীর্ণ (কুরআনের) প্রতি কুফরী করল।" (আহমাদ ৯৫৩৬, হাকেম ১৫, সহীহুল জামে' ৫৯৩৯নং)
একই অবস্থা হতে পারে সেই ব্যক্তির, যে স্ত্রীর পায়খানাদ্বারে অথবা তার মাসিকাবস্থায় যোনিপথে সহবাস করাকে হালাল জ্ঞান ক'রে সহবাস করে। মহানবী বলেছেন,
((مَنْ أَتَى حَائِضًا أَوْ امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا أَوْ كَاهِنَا فَصَدَّقَهُ فَقَدْ بَرِى مِمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ عَلَى مُحَمَّدٍ عَلَيْهِ الصَّلَاةِ وَالسَّلَامُ)).
"যে ব্যক্তি মাসিকাবস্থায় স্ত্রী-সহবাস করে অথবা স্ত্রীর পায়খানা-দ্বারে সঙ্গম করে অথবা কোন গণকের নিকট আসে এবং সে যা বলে তা বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মাদ -এর উপর যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে, তার সাথে সম্পর্কহীন হয়ে যায়।" (আহমাদ ৯২৯০, আবু দাউদ ৩৯০৬, তিরমিযী ১৩৫, ইবনে মাজাহ ৬৩৯নং) যেহেতু কুরআনে এ সকল কর্মকান্ডকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে, অথচ জেনেশুনে সে তার বিরোধিতা করে।
১২। মদ্যপায়ী, মাতাল
মদ্যপান একটি দুশ্চরিত্রবান লোকের অভ্যাস। এতে যে অভ্যাসী, সে আসলে মূর্তিপূজারীর সমতুল্য। মু'মিন থাকা অবস্থায় কেউ মদ্যপান করতে পারে না। আর কেউ পান করলে তার নামায কবুল করা হয় না। মহানবী বলেছেন,
((مَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً أَرْبَعِينَ صَبَاحًا فَإِنْ تَابَ تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ فَإِنْ عَادَ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً أَرْبَعِينَ صَبَاحًا فَإِنْ تَابَ تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ فَإِنْ عَادَ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً أَرْبَعِينَ صَبَاحًا فَإِنْ تَابَ تَابَ اللهُ عَلَيْهِ فَإِنْ عَادَ الرَّابِعَةَ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً أَرْبَعِينَ صَبَاحًا فَإِنْ تَابَ لَمْ يَتُبِ اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَقَاهُ مِنْ نَهْرِ الْخَبَالِ)).
"যে ব্যক্তি মদ পান করবে, সে ব্যক্তির ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। কিন্তু এরপর যদি সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করে নেবেন। অন্যথা যদি সে পুনরায় পান করে, তাহলে অনুরূপ তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। যদি এর পরেও সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করে নেবেন। অন্যথা যদি সে তৃতীয়বার পান করে, তাহলে অনুরূপ তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। কিন্তু এর পরেও যদি সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করে নেবেন। অন্যথা যদি সে চতুর্থবার তা পান করে, তাহলে অনুরূপ তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। কিন্তু এরপরে সে যদি তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন না, তিনি তার প্রতি ক্রোধান্বিত হন এবং (পরকালে) তাকে 'খাবাল নদী' থেকে পানীয় পান করাবেন।" ইবনে উমার-কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'হে আবু আব্দুর রহমান! 'খাবাল-নদী' কী?' উত্তরে তিনি বললেন, 'তা হল জাহান্নামবাসীদের পুঁজ দ্বারা প্রবাহিত (জাহান্নামের) এক নদী।' (তিরমিযী ১৮৬২, হাকেম ৪/১৪৬, নাসাঈ, সহীহুল জামে' ৬৩১২-৬৩১৩নং)
১৪। এমন স্ত্রী, যার স্বামী তার উপর রাগ করে আছে।
স্ত্রী স্বামীকে সর্বদা খোশ রাখবে, তার (ভালো কথা ও কাজে) আনুগত্য করবে, তার সব কথা মেনে চলবে, যৌনসুখ দিয়ে তাকে সর্বদা তৃপ্ত রাখবে, কোন বিষয়ে রাগ হলে তা সত্বর মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ক'রে সব কিছুতে তাকে সন্তুষ্ট রাখবে, এটাই হল স্ত্রীর ধর্ম। মহানবী বলেন, তোমাদের (সেই) স্ত্রীরাও জান্নাতী হবে, যে স্ত্রী অধিক প্রণয়িণী, সন্তানদাত্রী, বারবার ভুল করে বারবার স্বামীর নিকট আত্মসমর্পণকারিণী, যার স্বামী রাগ করলে সে তার নিকট এসে তার হাতে হাত রেখে বলে, আপনি রাজী (ঠান্ডা) না হওয়া পর্যন্ত আমি ঘুমাব না।" (সিঃ সহীহাহ ২৮৭নং)
কিন্তু এমন বহু মহিলা আছে, যারা তাদের স্বামীর খেয়ে-পরেও এমন রাগ-রোষকে পরোয়া করে না। নারী-স্বাধীনতার পক্ষপাতিনী স্বামীর সংসারেও পরম স্বাধীনতা-সুখ ভোগ করতে গিয়ে স্বামীকে নারাজ রাখে। ফলে বিশ্বস্বামীও নারাজ হন এবং সেই স্ত্রীর শয্যাসঙ্গী স্বামীকে খোশ করার আগে নামায পড়লেও সে নামাযে তিনি খোশ হন না। কারণ, 'হুকুকুল ইবাদ' আদায় না করা পর্যন্ত মহান আল্লাহ বান্দার তাওবাতে সন্তুষ্ট হন না। যার প্রতি অন্যায় করা হয়, তার নিকট আগে ক্ষমা পেলে তবেই মহান আল্লাহ ক্ষমা করেন। নচেৎ না।
১৫। এমন লোক যে কারো বিনা অনুমতি ও আদেশেই কারো জানাযা পড়ায় (ইমামতি করে)।
এমন ইমাম, যার ইমামতি অধিকাংশ মুক্তাদীরা পছন্দ করে না। তার পিছনে নামায পড়তে তাদের রুচি হয় না। ইমামতিতে ভুল আচরণ অথবা চরিত্রগত কোন কারণে অধিকাংশ লোকে তাকে ইমামতি করতে দিতে চায় না। এমন ইমামের নামায তার কান অতিক্রম করে না, মাথার উপরে যায় না, আকাশের দিকে ওঠে না, সাত আসমান পার হয়ে আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়া তো বহু দূরের কথা।
মহানবী বলেন,
((ثَلاثَةٌ لا تُجَاوِزُ صَلَاتُهُمْ رُؤوسَهُم : الْعَبْدُ الآبقُ، وَالْمَرْأَةُ تَبِيتُ وَزَوْجُهَا عَلَيْهَا سَاخِطٌ، وَإِمَامُ أَمَّ قَوْمًا وَهُمْ لَهُ كَارِهُونَ)).
“তিন ব্যক্তির নামায তাদের মাথা অতিক্রম করে না; পলাতক ক্রীতদাস, যতক্ষণ না সে ফিরে এসেছে, এমন স্ত্রী যার স্বামী তার উপর রাগান্বিত অবস্থায় রাত্রিযাপন করেছে, (যতক্ষণ না সে রাজী হয়েছে), (অথবা যে স্ত্রী তার স্বামীর অবাধ্যাচরণ করেছে, সে তার বাধ্য না হওয়া পর্যন্ত) এবং সেই সম্প্রদায়ের ইমাম, যাকে লোকে অপছন্দ করে।” (তিরমিযী ৩৬০, তাবারানী ৮০১৬, হাকেম, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৮৮, ৬৫০নং)
১৬। এমন নামাযী, যে নামায পড়ে কিন্তু নামায চুরি করে।
দায় সারা ক'রে নামায পড়ে। ঠিকমত রুকু-সিজদাহ করে না। রুকুতে স্থির হয় না, সিজদায় স্থির থাকে না। কোমর বাঁকানো মাত্র তুলে নেয়। 'সু-সু-সু' করে দুআ পড়ে চট্টপট উঠে যায়! কারো কোমর ঠিকমত বাঁকে না। মাথা উঁচু করেই রুকু করে। কারো সিজদার সময় নাক মুসাল্লায় স্পর্শ করে না। কারো পা দু'টি উপর দিকে পাল্লায় হাল্কা হওয়ার মত উঠে যায়। কেউ রুকু ও সিজদার মাঝে স্থির হয়ে দাঁড়ায় না। হাফ দাঁড়িয়ে সিজদায় যায়।
মহানবী বলেন, “হে মুসলিম দল! সে ব্যক্তির নামায হয় না, যে ব্যক্তি রুকু ও সিজদাতে নিজ পিঠ সোজা করে না।” (আহমাদ, ইবনে মাজাহ, ইবনে খুযাইমা, ইবনে হিব্বান, সঃ তারগীব ৫২৪নং)
"আল্লাহ সেই বান্দার নামাযের দিকে তাকিয়েও দেখেন না, যে রুকু ও সিজদার মাঝে নিজ পিঠকে সোজা করে (দাঁড়ায়) না।" (আহমদ ৪/২২, ত্বাবারানী, সঃ তারগীব ৫২৫, সিঃ সহীহাহ ২৫৩৬ নং)
"মানুষ ৬০ বছর ধরে নামায পড়ে, অথচ তার একটি নামাযও কবুল হয় না! কারণ, হয়তো বা সে রুকু পূর্ণরূপে করে, কিন্তু সিজদাহ পূর্ণরূপে করে না। অথবা সিজদাহ পূর্ণরূপে করে, কিন্তু রুকু ঠিকমত করে না।" (আসবাহানী, সিঃ সহীহাহ ২৫৩৫নং)
"নামায ৩ ভাগে বিভক্ত; এক তৃতীয়াংশ পবিত্রতা, এক তৃতীয়াংশ রুকু এবং আর এক তৃতীয়াংশ হল সিজদাহ। সুতরাং যে ব্যক্তি তা যথার্থরূপে আদায় করবে, তার নিকট থেকে তা কবুল করা হবে এবং তার অন্যান্য সমস্ত আমলও কবুল করা হবে। আর যার নামায রদ্দ করা হবে, তার অন্য সকল আমলকে রদ্দ করে দেওয়া হবে।" (বাযযার, সিঃ সহীহাহ ২৫৩৭নং)
১৭। আযান শুনেও যে নামাযী বিনা ওজরে মসজিদের জামাআতে নামায পড়ে না।
জামাআতে নামায পড়া ওয়াজেব। এই ওয়াজেব ত্যাগ করলে তার নামায কবুল নাও হতে পারে। মহানবী বলেন,
مَنْ سَمِعَ الْمُنَادِيَ فَلَمْ يَمْنَعْهُ مِنَ اتَّبَاعِهِ عُذْرٌ، لَمْ تُقْبَلْ مِنْهُ الصَّلَاةُ الَّتِي صَلَّى ».
"যে ব্যক্তি আযান শোনা সত্ত্বেও মসজিদে জামাআতে এসে নামায আদায় করে না, (ভয়, রোগ ইত্যাদি) কোন ওজর না থাকলে সে ব্যক্তির পড়া নামায কবুল হয় না।" (আবু দাউদ ৫৫১, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, হাকেম, সঃ জামে' ৬৩০০নং)
১৮। এমন মহিলা, যে আতর বা সেন্ট মেখে মসজিদের জন্য বের হয়।
স্বামী বা অভিভাবকের অনুমতিক্রমে মহিলা মসজিদে গিয়ে জামাআত সহকারে নামায আদায় করতে পারে। তবে শর্ত হল কোন প্রকার সুগন্ধি ব্যবহার করতে পারবে না। এ শর্ত না মানলে মহিলার নামায কবুল হয় না। মহানবী বলেছেন,
أَيُّمَا امْرَأَة تطَيِّبَتْ ثُمَّ خَرَجَتْ إِلى المَسجِدِ لمْ تُقْبَلْ لَهَا صَلاةٌ حَتَّى تَغْتَسِلَ)).
"যে মহিলা সেন্ট ব্যবহার করে মসজিদে যায়, সেই মহিলার গোসল না করা পর্যন্ত কোন নামায কবুল হবে না।" (ইবনে মাজাহ ৪০০২, সজাঃ ২৭০৩নং)