📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 পূর্ববর্তী জাতিসমূহকে ধ্বংসকারী অপরাধসমূহ

📄 পূর্ববর্তী জাতিসমূহকে ধ্বংসকারী অপরাধসমূহ


কুরআন কারীম পাঠ করলে আমরা পূর্ববর্তী বহু জাতির ইতিহাস ও তাদের ধ্বংস হওয়ার কারণ জানতে পারি। কারণ হিসাবে যে জিনিস চিহ্নিত করা যায়, তা হল সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যাচরণ, তাঁকে অবিশ্বাস এবং তাঁর প্রেরিত দূতগণের সাথে শত্রুতা।
পৃথিবীতে যত বিপর্যয় এসেছে এবং যত অঘটন ঘটেছে, তা কি আদম সন্তানের কোন পাপ ছাড়া ঘটেছে?
সুখময় জান্নাত থেকে এ কষ্টময় ধূলির ধরাতে অবতারণ করেছে সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যাচরণই।
নূহ-এর জাতিকে তুফান দিয়ে ধ্বংস করেছে জাতির অবাধ্যাচরণই।
সামূদ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রলয়ঙ্কর গর্জন দ্বারা। (হা-ক্কাহঃ ৫) তাও ছিল তাদের পাপেরই প্রতিফল।
আ'দ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রচন্ড ঝড়ো-হাওয়া দ্বারা। যা তাদের উপর প্রবাহিত করা হয়েছিল সাত রাত আট দিন অবিরামভাবে, তখন (দেখলে) উক্ত সম্প্রদায়কে দেখা যেত, তারা সেখানে লুটিয়ে পড়ে আছে সারশূন্য খেজুর কান্ডের ন্যায়। (হা-কাহঃ ৬-৭) তা ছিল তাদের অবাধ্যাচরণের কুফল।
লুত-এর জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছিল তাদের কুকর্মের প্রতিফল স্বরূপ। সূর্যোদয়ের সময়ে বিকট আওয়াজ তাদেরকে পাকড়াও করেছিল। (তাদের) জনপদকে উল্টিয়ে উপর-নীচ ক'রে দিয়ে তাদের উপর ঝামা পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছিল। (হিজরঃ ৭৩-৭৪)
শুআইব-এর জাতিকে তাদের দুষ্কর্মের জন্য ধ্বংস করা হয়েছিল। তারা বিকট গর্জন-সহ ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল, ফলে তারা নিজগৃহে উপুড় অবস্থায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। (আ'রাফঃ ৯১, হ্রদঃ ৯৪)
ফিরআউন ও তার জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছিল সমুদ্রের পানিতে ডুবিয়ে। তাদের অবাধ্যাচরণই তাদেরকে সলিল-সমাধি দান করেছিল।

তার পরেও কত জাতি ধ্বংস হয়েছে নিজেদের অবাধ্যাচরণের প্রতিফল স্বরূপ। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কত সভ্যতা, সংস্কৃতি, কত বিলাস-ভবন ও বিলাস-উদ্যান। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ ذَلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْقُرَى نَقُصُّهُ عَلَيْكَ مِنْهَا قَائِمٌ وَحَصِيدٌ (١٠٠) وَمَا ظَلَمْنَاهُمْ وَلَكِنْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ فَمَا أَغْنَتْ عَنْهُمْ آلِهَتُهُمْ الَّتِي يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ لَمَّا جَاءَ أَمْرُ رَبِّكَ وَمَا زَادُوهُمْ غَيْرَ تَتْبَيبٍ (١٠١) وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَهِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ} (١٠٢) سورة هود
"এটা ছিল সেই জনপদসমূহের কতিপয় অবস্থা, যা আমি তোমার নিকট বর্ণনা করছি, ওগুলির মধ্যে কোন কোন জনপদ তো বিদ্যমান রয়েছে এবং কোন কোনটি নির্মূল হয়ে গেছে। আমি তাদের প্রতি অত্যাচার করিনি, কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের উপর অত্যাচার করেছে। বস্তুতঃ যখন তোমার প্রতিপালকের হুকুম এসে পৌঁছল, তখন তাদের সেই উপাস্যগুলি, আল্লাহকে ছেড়ে ওরা যাদের উপাসনা করত, তারা ওদের কোন কাজে লাগল না। উল্টো তারা তাদের ধ্বংসই বৃদ্ধি করল। আর এরূপই তোমার প্রতিপালকের পাকড়াও; যখন তিনি কোন অত্যাচারী জনপদের অধিবাসীদেরকে পাকড়াও করেন। নিঃসন্দেহে তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যাতনাদায়ক, কঠিন।" (হৃদঃ ১০০-১০২)
তিনি আরো বলেছেন,
{ وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلاً قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُّطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّن كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بأَنْعُمِ اللَّهِ فَأَذَاقَهَا اللهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ} (١١٢)
"আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসত সর্বদিক হতে প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল; ফলে তারা যা করত, তার জন্য আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ।" (নাহলঃ ১১২)
{فَكُلًّا أَخَذْنَا بِذَنبِهِ فَمِنْهُم مَّنْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِ حَاصِبًا وَمِنْهُم مَّنْ أَخَذَتْهُ الصَّيْحَةُ وَمِنْهُم مَّنْ خَسَفْنَا بِهِ الْأَرْضِ وَمِنْهُم مَّنْ أَغْرَقْنَا وَمَا كَانَ اللهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِن كَانُوا أَنفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ} (৪০) সূরা আল-আনকাবুত
"সুতরাং ওদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ অপরাধের জন্য পাকড়াও করলাম; ওদের কারও প্রতি প্রেরণ করলাম পাথর বর্ষণকারী ঝড়, কাকেও আঘাত করল মহাগর্জন, কাকেও আমি মাটির নিচে ধসিয়ে দিলাম এবং কাকেও মারলাম ডুবিয়ে। আল্লাহ তাদের প্রতি কোন যুলুম করেননি; আসলে তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম করেছিল।" (আনকাবুতঃ ৪০)

পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ধ্বংস হওয়ার মূলে ছিল নবী-রসূলগণের সাথে সংঘাত। অবিশ্বাস ও মিথ্যায়ন তাদেরকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে ধাক্কা দিয়ে নিক্ষেপ করেছিল। এ ছাড়াও আরো কিছু কারণ ও পাপকর্ম ছিল, যার ফলে তারা ধ্বংসের শিকারে পরিণত হয়েছিল। যেমন:-

এক: কার্পণ্য
কৃপণতা মানে অধিকারীর আর্থিক অধিকার যথাযথভাবে আদায় না করা। কৃপণ যেমন অপরকে খেতে দেয় না, তেমনি নিজেও খায় না। আর তার ফলে আত্মীয়রা পর হয়ে যায়। অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে তা আদায়ের জন্য সংগ্রাম করলে রক্তারক্তিতে গিয়ে পৌঁছে তাদের কর্মকান্ড। আর তাই হয় তাদের ধ্বংসের একটি কারণ।
মহানবী বলেছেন, (( اتَّقُوا الظُّلْمَ ، فَإِنَّ الظُّلْمَ ظُلُمَاتٌ يَوْمَ القِيَامَةِ ، وَاتَّقُوا الشُّحَّ ، فَإِنَّ الشُّحَّ أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ ، حَمَلَهُمْ عَلَى أَنْ سَفَكُوا دِمَاءَهُمْ وَاسْتَحَلُّوا مَحَارِمَهُمْ )). رواه مسلم
"অত্যাচার করা থেকে বাঁচ। কেননা, অত্যাচার কিয়ামতের দিনের অন্ধকার। আর কৃপণতা থেকে দূরে থাক। কেননা, কৃপণতা তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস ক'রে দিয়েছে। (এই কৃপণতাই) তাদেরকে প্ররোচিত করেছিল, ফলে তারা নিজেদের রক্তপাত ঘটিয়েছিল এবং তাদের উপর হারামকৃত বস্তুসমূহকে হালাল ক'রে নিয়েছিল।" (আহমদ, মুসলিম ৬৭৪১নং)
إِيَّاكُمْ وَالشُّحَّ فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِالشُّحَّ أَمَرَهُمْ بِالْبُخْلِ فَبَخَلُوا وَأَمَرَهُمْ بِالْقَطِيعَةِ فَقَطَعُوا وَأَمَرَهُمْ بِالْفُجُورِ فَفَجَرُوا ...
"তোমরা কৃপণতা থেকে দূরে থাক। কারণ, কৃপণতাই তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস ক'রে দিয়েছে। কৃপণতা তাদেরকে কার্পণ্য করতে আদেশ দিয়েছিল, সুতরাং তারা কার্পণ্য করেছিল, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করতে আদেশ দিয়েছিল, সুতরাং তারা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করেছিল এবং তাদেরকে পাপাচার করতে আদেশ করেছিল, সুতরাং তারা পাপাচার করেছিল।" (আবু দাউদ ১৭০০, হাকেম ১৫১৬, সঃ জামে' ২৬৭৮নং)

দুইঃ মতভেদ
মতভেদ অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু সেই মতভেদ নিয়ে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়া, একে অন্যকে 'কাফের' ইত্যাদি বলে গালাগালি করা এবং এক পর্যায়ে ঝগড়া-লড়াই করা অবশ্যই জাতির ধ্বংসের অন্যতম কারণ। মহানবী বলেছেন,
(( دَعُونِي مَا تَرَكْتُكُمْ ، إِنَّمَا أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَثْرَةُ سُؤَالِهِمْ وَاخْتِلاَفُهُمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ ، فَإِذَا نَهَيْتُكُمْ عَنْ شَيْءٍ فَاجْتَنِبُوهُ ، وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ )).
"আমি যে ব্যাপারে তোমাদেরকে (বর্ণনা না দিয়ে) ছেড়ে দিয়েছি, সে ব্যাপারে তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও (অর্থাৎ, সে ব্যাপারে আমাকে প্রশ্ন করো না)। কারণ, তোমাদের পূর্ববর্তীরা তাদের অধিক প্রশ্ন করার এবং তাদের নবীদের সঙ্গে মতভেদ করার ফলেই ধ্বংস হয়ে গেছে। সুতরাং আমি যখন তোমাদেরকে কোন জিনিস থেকে নিষেধ করব, তখন তোমরা তা হতে দূরে থাক। আর যখন আমি তোমাদেরকে কোন কাজের আদেশ দেব, তখন তোমরা তা সাধ্যমত পালন কর।" (বুখারী ৭২৮৮, মুসলিম ৩৩২১নং)
আবু হুরাইরা বলেন, রাসূলুল্লাহ আমাদের সামনে ভাষণ দানকালে বললেন, “হে লোক সকল! আল্লাহ তোমাদের উপর (বায়তুল্লাহর) হজ্জ ফরয করেছেন, অতএব তোমরা হজ্জ পালন কর।" একটি লোক বলে উঠল, 'হে আল্লাহর রসূল! প্রতি বছর তা করতে হবে কি?' তিনি নিরুত্তর থাকলেন এবং লোকটি শেষ পর্যন্ত তিনবার জিজ্ঞাসা করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ বললেন, "যদি আমি বলতাম, হ্যাঁ। তাহলে (প্রতি বছরে) হজ্জ ফরয হয়ে যেত। আর তোমরা তা পালন করতে অক্ষম হতে।" অতঃপর তিনি বললেন,
(( دُرُونِي مَا تَرَكْتُكُمْ ، فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِكَثْرَةِ سُؤَالِهِمْ ، وَاخْتِلاَفِهِمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ ، فَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ ، وَإِذَا نَهَيْتُكُمْ عَن شَيْءٍ فَدَعُوهُ)).
"তোমরা আমাকে (আমার অবস্থায়) ছেড়ে দাও, যতক্ষণ আমি তোমাদেরকে (তোমাদের স্ব স্ব অবস্থায়) ছেড়ে রাখব। কেননা, তোমাদের পূর্বেকার জাতিরা অতি মাত্রায় জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের পয়গম্বরদের বিরোধিতা করার দরুনই ধ্বংস হয়েছে। সুতরাং আমি যখন তোমাদেরকে কোন কিছু করার আদেশ দেব, তখন তোমরা তা সাধ্যমত পালন করবে। আর যা করতে নিষেধ করব, তা থেকে বিরত থাকবে।" (মুসলিম ৩৩২১নং)
(اتْرُكُونِي مَا تَرَكْتُكُمْ فَإِذَا حَدَّثْتُكُمْ فَخُذُوا عَنِّي فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِكَثْرَةِ سُؤَالِهِمْ وَاخْتِلَافِهِمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ)).
"তোমরা আমাকে (আমার অবস্থায়) ছেড়ে দাও, যতক্ষণ আমি তোমাদেরকে (তোমাদের স্ব স্ব অবস্থায়) ছেড়ে রাখব। অতঃপর যখন আমি তোমাদেরকে হাদীস বর্ণনা করব, তখন তোমরা তা আমার নিকট থেকে গ্রহণ কর। কেননা, তোমাদের পূর্বেকার জাতিরা অতি মাত্রায় জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের পয়গম্বরদের বিরোধিতা করার দরুনই ধ্বংস হয়েছে।" (তিরমিযী ২৬৭৯, সঃ জামে' ৯১নং)

দ্বীনের বিষয়ে তো বটেই, বিশেষভাবে কুরআন ও তার ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ ও তর্ক-বিতর্ক মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়। এ ব্যাপারে মহানবী সতর্ক ক'রে বলেছেন,
(اقْرَؤُوا كما عُلِّمْتُمْ فَإِنَّمَا أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ اخْتِلافُهُمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ)).
"তোমাদেরকে যেভাবে শিখানো হয়েছে, সেইভাবে পড়। কারণ, তোমাদের পূর্বেকার জাতিরা তাদের পয়গম্বরদের বিরোধিতা করার দরুনই ধ্বংস হয়েছে।" (তাফসীর ইবনে জারীর, সঃ জামে' ১১৭১নং)
আব্দুল্লাহ বিন আম্র বলেন, একদা সকাল-সকাল আমি রাসূলুল্লাহ -এর কাছে গেলাম। তিনি দুটি লোকের আওয়াজ শুনতে পেলেন, যারা একটি আয়াত নিয়ে মতবিরোধ করছিল। রাসূলুল্লাহ আমাদের নিকট বের হয়ে এলেন। তাঁর চেহারায় রাগ বুঝা যাচ্ছিল। তিনি বললেন,
إِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِاخْتِلَافِهِمْ فِي الْكِتَابِ ..
"তোমাদের পূর্বেকার জাতিরা কিতাব নিয়ে মতভেদ করার দরুনই ধ্বংস হয়েছে।" (মুসলিম ৬৯৪৭নং)
অন্য এক বর্ণনায় আছে, আব্দুল্লাহ বিন আম্র বলেন, (একদা কুরআনী কোন বিষয় নিয়ে কিছু সাহাবাকে তর্ক করতে দেখে) নবী বললেন,
((مَهْلًا يَا قَوْمِ بِهَذَا أُهْلِكَتْ الْأُمَمُ مِنْ قَبْلِكُمْ بِاخْتِلَافِهِمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ وَضَرْبِهِمْ الْكُتُبَ بَعْضَهَا بِبَعْضٍ إِنَّ الْقُرْآنَ لَمْ يَنْزِلْ يُكَذِّبُ بَعْضُهُ بَعْضًا بَلْ يُصَدِّقُ بَعْضُهُ بَعْضًا فَمَا عَرَفْتُمْ مِنْهُ فَاعْمَلُوا بِهِ وَمَا جَهَلْتُمْ مِنْهُ فَرُدُّوهُ إِلَى عَالِمِهِ)).
"থামো হে লোক সকল! নবীদের ব্যাপারে মতভেদ এবং কিতাবের একাংশকে অন্য অংশের সাথে সংঘর্ষ সৃষ্টি ক'রে তোমাদের পূর্বের বহু জাতি ধ্বংস হয়েছে। কুরআন এভাবে অবতীর্ণ হয়নি যে, তার একাংশ অন্য অংশকে মিথ্যায়ন করবে। বরং তার একাংশ অন্য অংশকে সত্যায়ন করে। সুতরাং যা তোমরা বুঝতে পার, তার উপর আমল কর এবং যা বুঝতে পার না, তা তার জ্ঞানীর দিকে ফিরিয়ে দাও।" (আহমাদ ৬৭০২নং, শারহুল আক্বীদাতিত ত্বাহাবিয়্যাহ ১/২১৮)

তিনঃ অর্থলোভ ও দুনিয়া-প্রেম
হালাল পথে উপার্জিত অর্থ নিন্দনীয় নয়। কিন্তু নিন্দনীয় হল অর্থের লোভ, অর্থের মোহ, অর্থের দাসত্ব ও অবৈধ অর্থ। আর তখনই অর্থ হয় উম্মতের ফিতনা। (তিরমিযী ২৩৩৬নং)
অর্থ হয় অনর্থের মূল। অর্থ সৃষ্টি করে নানা বিপত্তি, হানাহানি ও যুদ্ধ। নেপোলিয়ন বলেছেন, 'যুদ্ধ হয় তিনটি কারণে; অর্থ, অর্থ ও অর্থ।'
অর্থ ফিতনা হয় তখন, যখন সঞ্চয়কারী এই ধারণা করে যে, 'যত খারাপ পথেই টাকা রোজগার করা হোক, টাকার গায়ে ময়লা লেগে থাকে না। বরং যাদের টাকা নেই, তারাই সমাজের ময়লা।' 'ধনবানরাই বলবান, আর বলবানরাই ভগবান হয়।'
উক্ত সকল কারণে অর্থ হল ধ্বংসের একটি কারণ। মহানবী ﷺ বলেছেন,
(( تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ ، وَالدِّرْهَم ، وَالقَطِيفَةِ ، وَالخَمِيصَةِ ، إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ ، وَإِنْ لَمْ يُعْطَ لَمْ يَرْضَ )). رواه البخاري
"ধ্বংস হোক দীনারের গোলাম, দিরহামের গোলাম (ধনদাস) ও উত্তম পোশাকের গোলাম (দুনিয়াদার)! যদি তাকে দেওয়া হয়, তাহলে সে সন্তুষ্ট হয়। আর না দেওয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়।" (বুখারী ২৮৮৬নং)
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ ؓ লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য দান করতেন। একদা এক ব্যক্তি এলে তাকে এক হাজার দিরহাম দিয়ে বললেন, 'নাও। আমি আল্লাহর রসূল ﷺ-এর নিকট শুনেছি, তিনি বলেছেন,
((إِنَّمَا أهلك من كان قبلكُمُ الدِّينَارِ وَالدِّرْهَم ، وهما مهلكاكم)).
“তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিকে দীনার ও দিরহাম ধ্বংস করেছে। আর সেই দু'টি তোমাদেরকেও ধ্বংস করবে।” (বায্যার, সঃ তারগীব ৩২৫৮নং)
উকুবাহ ইবনে আমের ؓ বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ (একবার) উহুদের শহীদদের (কবরস্থানের) দিকে বের হলেন এবং যেন জীবিত ও মৃত ব্যক্তিদেরকে বিদায় জানাবার উদ্দেশ্যে আট বছর পর তাঁদের উপর জানাযা পড়লেন (অর্থাৎ তাঁদের জন্য দুআ করলেন)। তারপর মিম্বরে চড়ে বললেন, "আমি পূর্বে গমনকারী তোমাদের জন্য সুব্যবস্থাপক এবং সাক্ষীও। তোমাদের প্রতিশ্রুত স্থান হওযে (কাউসার)। আমি অবশ্যই ওটাকে আমার এই স্থান থেকে দেখতে পাচ্ছি। শোনো! তোমাদের ব্যাপারে আমার এ আশংকা নেই যে, তোমরা শির্ক করবে। তবে তোমাদের জন্য আমার আশংকা এই যে, তোমরা দুনিয়ার ব্যাপারে আপোসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।" (বুখারী ৪০৪২, মুসলিম ৬১১৭)
অন্য এক বর্ণনায় আছে যে,
(( وَلَكِنِّي أَخْشَى عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا أَنْ تَنَافَسُوا فِيهَا ، وَتَقْتَتِلُوا فَتَهْلِكُوا كَمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ )) .
"কিন্তু তোমাদের জন্য আমার আশংকা এই যে, তোমরা পার্থিব ধন-সম্পদে আপোসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এবং সে জন্য পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হবে এবং (পরিণামে) তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে; যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীরা ধ্বংস হয়েছে।"
অর্থ-লালসা যেমন মানুষের দুনিয়া ধ্বংস করতে পারে, তেমনি দ্বীনও ধ্বংস করতে পারে। ধর্মব্যবসায়ী সেই ধ্বংসের শামিল হতে পারে। মহানবী বলেছেন,
(( مَا ذِنْبَانِ جَائِعَانِ أُرْسِلَا فِي غَنَم بِأَفْسَدَ لَهَا مِنْ حِرْصِ الْمَرْءِ عَلَى الْمَالِ وَالشَّرَفِ لِدِينِهِ)).
"ছাগলের পালে দু'টি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘকে ছেড়ে দিলে ছাগলের যতটা ক্ষতি করে, তার চেয়ে মানুষের সম্পদ ও সম্মানের প্রতি লোভ-লালসা তার দ্বীনের জন্য বেশী ক্ষতিকারক।" (তিরমিযী ২৩৭৬নং)

চারঃ ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি
পূর্ববর্তী জাতিদেরকে দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছিল। কারণ তা ছিল ভ্রষ্টতার কারণ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ غَيْرَ الْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعُوا أَهْوَاءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّوا مِنْ قَبْلُ وَأَضَلُّوا كَثِيرًا وَضَلُّوا عَنْ سَوَاءِ السَّبِيل } [المائدة : ٧٧]
অর্থাৎ, বল, 'হে ঐশীগ্রন্থধারিগণ! তোমরা তোমাদের ধর্ম সম্বন্ধে বাড়াবাড়ি করো না এবং যে সম্প্রদায় ইতিপূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে ও অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং সরল পথ হতে বিচ্যুত হয়েছে, তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না।' (মাইদাহ ৭৭)
কিন্তু মহান স্রষ্টার সে নির্দেশ তারা মান্য করেনি। তাই তারা ধ্বংস হয়েছে। মহানবী এ উম্মতকে সতর্ক ক'রে বলেছেন,
((لَا تُشَدِّدُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ، فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِتَشْدِيدِهِمْ عَلَى أَنْفُسِهِمْ، وَسَتَجِدُونَ بَقَايَاهُمْ فِي الصَّوَامِعِ وَالدِّيَارَاتِ)).
"তোমরা নিজেদের উপর কঠিনতা করো না। কারণ, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিরা নিজেদের উপর কঠিনতা করার ফলেই ধ্বংস হয়েছে। তোমরা তাদের অবশিষ্ট লোকদেরকে গীর্জা ও উপাসনালয়ে দেখতে পাবে।" (ত্বাবারানীর কাবীর ৫৪১৮, আওসাত্ব ৩০৭৮, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৩৮৮৪, সিঃ সহীহাহ ৩১২৪নং)
তিনি আরো বলেছেন,
((إِيَّاكُمْ وَالْغُلُو فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِالْغُلُو فِي الدِّينِ)).
"হে লোক সকল! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে অতিরঞ্জন করা থেকে দূরে থাকো। কারণ দ্বীনের ব্যাপারে অতিরঞ্জনই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে ধ্বংস করেছে।" (আহমাদ ৩২৪৮, নাসাঈ ৩০৫৭, ইবনে মাজাহ ৩০২৯, হাকেম ১৭১১, সঃ জামে ২৬৮০নং)
রাসূলুল্লাহ তিনবার বলেছেন,
هَلَكَ الْمُتَنَطِّعُونَ ..
"অতিরঞ্জনকারীরা ধ্বংস হয়েছে।" (আহমাদ ৩৬৫৫, মুসলিম ৬৯৫২, আবু দাউদ, সহীহুল জামে' ৭০৩৯ নং)

পাঁচঃ দ্বিমুখী বিচার করা এবং দন্ডবিধি প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করা
দ্বিমুখী বিচার করা, যেমন দরিদ্রের জন্য এক বিচার ও ধনীর জন্য অন্য বিচার। স্বদেশীর জন্য এক বিচার ও বিদেশীর জন্য অন্য বিচার। স্বদলীয় অপরাধীর এক বিচার ও বিরোধী দলের অপরাধীর জন্য অন্য বিচার। সাধারণ মানুষের জন্য এক বিচার ও পদাধিকারীর জন্য অন্য বিচার। এমন দ্বিমুখী বিচার ন্যয়াপরায়ণতার প্রতিকূল।
তদনুরূপ বিচারে দন্ড ঘোষণার পরে তার প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করা, পদ-মর্যাদা বা সুপারিশ বলে তা কার্যকর করার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করাও এমন একটি অপরাধ, যার ফলে ধ্বংস হয়েছে পূর্ববর্তী জাতির লোকেরা।
আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, মহানবী -এর যুগে (এক উচ্চবংশীয়া) মাখযুমী মহিলা লোকের কাছে জিনিস ধার নিত, অতঃপর তা অস্বীকার করত। এই শ্রেণীর চুরি করার ফলে ধরা পড়লে নবী তার হাত কাটার আদেশ দিলেন। তাকে নিয়ে তার আত্মীয়-স্বজন সহ কুরাইশ বংশের লোকেরা বড় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। (তার হাত যাতে কাটা না হয় সেই চেষ্টায়) তারা বলাবলি করল, 'ওর ব্যাপারে আল্লাহর রসূল -এর সঙ্গে কে কথা বলবে?' পরিশেষে তারা বলল, 'আল্লাহর রসূল -এর প্রিয়পাত্র উসামাহ বিন যায়দ ছাড়া আর কে (এ ব্যাপারে) তাঁর সাথে কথা বলার দুঃসাহস করবে?' সুতরাং (তাদের অনুরোধ মতে) উসামাহ তাঁর সাথে কথা বললেন (এবং ঐ মহিলার হাত যাতে কাটা না যায় সে ব্যাপারে সুপারিশ করলেন)। এর ফলে আল্লাহর রসূল বললেন, “হে উসামাহ! তুমি কি আল্লাহর দন্ডবিধিসমূহের এক দন্ডবিধি (কায়েম না হওয়ার) ব্যাপারে সুপারিশ করছ?!" অতঃপর তিনি দন্ডায়মান হয়ে ভাষণে বললেন,
أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ وَايْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يدها ».
"তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতরা এ জন্যই ধ্বংস হয়েছিল যে, তাদের মধ্যে কোন উচ্চবংশীয় (বা ধনী) লোক চুরি করলে তারা তাকে (দন্ড না দিয়ে) ছেড়ে দিত। আর কোন (নিম্নবংশীয়, গরীব বা) দুর্বল লোক চুরি করলে তারা তার উপর দন্ডবিধি প্রয়োগ করত। পক্ষান্তরে আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমা যদি চুরি করত, তাহলে আমি তারও হাত কেটে দিতাম।" (বুখারী ৩৪৭৫, ৬৭৮৮, মুসলিম ৪৫০৫-৪৫০৭নং, আসহাবে সুনান)

ছয়ঃ মহিলাদের কৃত্রিম রূপচর্চা করা
কৃত্রিম রূপ-সৌন্দর্য অবলম্বন ক'রে পরপুরুষকে ধোকা দেওয়া একটি বড় অপরাধ। যেমন কৃত্রিম কিছু ব্যবহার ক'রে স্তনযুগলকে বিশাল প্রদর্শন করা, পরচুলা ব্যবহার ক'রে মাথার খোঁপাকে বিশাল প্রদর্শন করা, হাই-হিল জুতো পরে নিজেকে লম্বা প্রদর্শন করা ইত্যাদি। মহিলাদের মাঝে এমন রূপচর্চার ব্যাপকতা জাতির ধ্বংসের একটি কারণ।
হুমাইদ ইবনে আব্দুর রাহমান থেকে বর্ণিত, তিনি হজ্জ করার বছরে মুআবিয়া-কে মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছেন---ঐ সময়ে তিনি জনৈক দেহরক্ষীর হাত থেকে এক গোছা (কৃত্রিম) চুল নিজ হাতে নিয়ে বললেন, 'হে মদীনাবাসীগণ! তোমাদের আলেমগণ কোথায়? আমি রসুলল্লাহ-কে এরূপ জিনিস (ব্যবহার) নিষেধ করতে শুনেছি। তিনি বলতেন,
(( إِنَّمَا هَلَكَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ حِينَ اتَّخَذَهَا نِسَاؤُهُمْ )) .
"বানী ইস্রাঈল তখনই ধ্বংস হয়েছিল, যখন তাদের মহিলারা এই জিনিস ব্যবহার করতে আরম্ভ করেছিল।" (বুখারী ৩৪৬৮, ৫৯৩২, মুসলিম ৫৭০০নং)

সাতঃ নবীদের স্মৃতিস্থানসমূহকে মসজিদ বানানো
দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা জাতির ধ্বংসের অন্যতম কারণ। অনুরূপ একটি বাড়াবাড়ি হল নবীদের স্মৃতিজড়িত স্থানসমূহকে নামাযের জায়গা বানিয়ে নেওয়া। উমার বিন খাত্তাব এক সফরে ছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, লোকেরা একটি জায়গাতে পালাপালি ক'রে নামায পড়ছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'কী ব্যাপার?' লোকেরা বলল, 'এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে রাসূলুল্লাহ নামায পড়েছেন।' তা শুনে তিনি বললেন,
إِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِهَذَا أَنَّهُمْ اتَّخَذُوا آثَارَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ، مَنْ أَدْرَكَتْهُ الصَّلَاةُ فَلْيُصَلِّ وَإِلَّا فَلْيَمْضِ.
'তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিরা এর কারণেই ধ্বংস হয়েছে; তারা তাদের নবীদের স্মৃতিস্থানসমূহকে নামাযের জায়গায় পরিণত করেছিল। যার নামাযের সময় হয়েছে, সে এখানে নামায পড়ুক, নচেৎ অতিক্রম করুক।' (ইবনে আবী শাইবা ৭৫৫০নং)

আটঃ তকদীর নিয়ে তর্ক করা
দ্বীনের কোন বিষয়েই তর্কাতর্কি পছন্দনীয় নয়। বিশেষ ক'রে ঈমানের একটি রুকন তকদীর নিয়ে। মহান আল্লাহ সব কিছু লিখে রেখেছেন, তাহলে আমল ক'রে লাভ কী? আমল লেখা আছে, তাহলে শাস্তি কেন দেবেন? অধিকাংশ মানুষের নিকট বিষয়টিকে পরস্পরবিরোধী বলে মনে হয়। তাই সংশয় হয়, অবিশ্বাস ও সন্দেহ আসে, তর্ক করে, নানা কূট প্রশ্ন করে এবং পরিশেষে ঈমান হারিয়ে ধ্বংস হয়। পূর্ববর্তী জাতিরা এই কারণেও ধ্বংস হয়েছে।
আবূ হুরাইরা বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ আমাদের নিকট বের হয়ে এলেন, তখন আমরা তকদীর নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করছিলাম। তা দেখে তিনি ক্রোধান্বিত হলেন। এমনকি মনে হল, তাঁর দুই গন্ডে যেন বেদানার দানা নিংড়ে দেওয়া হয়েছে। অতঃপর তিনি বললেন,
((أَبِهَذَا أُمِرْتُمْ أَمْ بِهَذَا أُرْسِلْتُ إِلَيْكُمْ؟ إِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ حِينَ تَنَازَعُوا فِي هَذَا الْأَمْرِ، عَزَمْتُ عَلَيْكُمْ أَلَّا تَتَنَازَعُوا فِيهِ)).
"তোমাদেরকে কি এই করতে আদেশ দেওয়া হয়েছে? নাকি আমি এই জন্য তোমাদের মাঝে প্রেরিত হয়েছি? তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিরা তখনই ধ্বংস হয়েছিল, যখন তারা এই ব্যাপারে তর্কাতর্কি করেছিল। আমি তোমাদেরকে দৃঢ়ভাবে নিষেধ করছি, তোমরা এ নিয়ে তর্কাতর্কি করো না।" (তিরমিযী ২১৩৩নং)
যেন মহানবী উম্মতকে বলছেন, এ সকল অপরাধের কারণে পূর্ববর্তী বহু জাতি ধ্বংস হয়েছে। সুতরাং সাবধান! তোমরা এই শ্রেণীর কোন অপরাধ করলে, তোমরাও ধ্বংসের শিকারে পরিণত হতে পার।

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 এক পাপ অন্য পাপকে আকর্ষণ করে

📄 এক পাপ অন্য পাপকে আকর্ষণ করে


এমন বহু পাপ আছে, যা অন্য আরো অনেক পাপকে আকর্ষণ করে। অনেক সময় এক পাপ দিয়ে অন্য পাপকে ঢাকতে হয়। একটা পাপ করলে অন্য পাপটি অনায়াসে ঘটে বসে। অনেক সময় নিজের ইচ্ছা না থাকলেও মনে হয়, তৃতীয় পক্ষ কেউ যেন তা ঘটিয়ে দিচ্ছে।
তেমনই একটি পাপ বেগানা নারী-পুরুষের একাকিত্ব ও নির্জনতা অবলম্বন। এ পাপের ব্যাপারে গুরুত্ব না দিলে পরবর্তীতে আরো অনেক পাপ ঘটতে থাকে অতি সহজে। মহানবী বলেছেন,
(( أَلَا لا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ ، إِلَّا كَانَ ثَالِثَهَمَا الشَّيْطَانُ)).
"যখনই কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনতা অবলম্বন করে, তখনই শয়তান তাদের তৃতীয় সাথী (কোটনা) হয়।" (সহীহ তিরমিযী ৯৩৪নং, নাসাঈর কুবরা ৯২১৯, বাইহাক্বী ১৩৯০৪, হাকেম ৩৮৭, ৩৯০, ত্বাবারানী ৫৬১নং)

অবৈধ কাম-নজর বা প্রেম-দৃষ্টি একটা ছোট্ট পাপ। কিন্তু কত পাপের দিকে মানুষকে পরিচালিত করে এই পাপটি। আরবী কবি বলেছেন,
نظرة فابتسامة فسلام ... فكلام فموعد فلقاء
অর্থাৎ, প্রথমে দৃষ্টি, তারপর মুচকি হাসি, তারপর সালাম। তারপর বাক্যালাপ, তারপর ওয়াদা, তারপর মিলন (ব্যভিচার)।
কাম-নজর ইবলীসের তীররাশির একটি তীর। নজর হল ব্যভিচারের পোস্ট-অফিস। অবৈধ ভালোবাসার মাধ্যমেই শয়তান একজন মু'মিনকে অতি অনায়াসে 'কাফের' বানাতে পারে এবং প্রেমিক-প্রেমিকাকে আজীবন ব্যভিচারে আলিপ্ত রাখতে সক্ষম হয়।

বলা বাহুল্য, অবৈধ প্রেম সৃষ্টি করে শয়তান। যেহেতু অবৈধ সেই প্রেমিক-প্রেমিকা দ্বারা বহু পাপের বাজার রমরমিয়ে চালাতে পারে সে। যেমন বৈধ প্রেম ধ্বংস ও নষ্ট করে সে। কারণ তার মাধ্যমেও বহু পাপের বেসাতি খুলতে পারে সে। এই জন্যই অন্যান্য পাপ অপেক্ষা বিবাহ-বিচ্ছেদ তার নিকট অতি চমৎকার ও গুরুত্বপূর্ণ একটি মহাসাফল্য। মহানবী বলেন,
إِنَّ إِبْلِيسَ يَضَعُ عَرْشَهُ عَلَى الْمَاءِ ثُمَّ يَبْعَثُ سَرَايَاهُ فَأَدْنَاهُمْ مِنْهُ مَنْزِلَةً أَعْظَمُهُمْ فِتْنَةً يَجِيءُ أَحَدُهُمْ فَيَقُولُ فَعَلْتُ كَذَا وَكَذَا فَيَقُولُ مَا صَنَعْتَ شَيْئًا قَالَ ثُمَّ يَجِيءُ أَحَدُهُمْ فَيَقُولُ مَا تَرَكْتُهُ حَتَّى فَرَّقْتُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ امْرَأَتِهِ - قَالَ - فَيُدْنِيهِ مِنْهُ فَيَلْتَزِمُهُ وَيَقُولُ : نِعْمَ أَنْتَ ..
"সমুদ্রের উপর শয়তান তার সিংহাসন রেখে মানুষকে বিভিন্ন পাপ ও ফিতনায় জড়িত করার উদ্দেশ্যে নিজের শিষ্যদল পাঠিয়ে থাকে। তার কাছে সেই শিষ্য সবচেয়ে বড় মর্যাদা (ও বেশী নৈকট্য) পায়, যে সবচেয়ে বড় পাপ বা ফিতনা সৃষ্টি করতে পারে। কোন শিষ্য এসে বলে, 'আমি এই করেছি।' ইবলীস বলে, 'তুই কিছুই করিসনি।' অন্যজন বলে 'আমি একজনের পিছনে লেগে তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়া করিয়েছি।' তখন শয়তান তাকে নিকটে করে (জড়িয়ে ধরে) বলে, 'হ্যাঁ, তুমিই একটা কাজ করেছ!" (মুসলিম ৭২৮৪নং)

হ্যাঁ, মানুষের মন হল মন্দ-প্রবণ, তার উপর শয়তান তার পিছু ছাড়ে না। তার নিরলস প্রচেষ্টায় মানুষ পাপে লিপ্ত হয়। একটি পাপের মাধ্যমে অন্য একটি বিশাল পাপ সংঘটিত করে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (۹۰) إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنْتَهُونَ} (۹۱) سورة المائدة
"হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাযে বাধা দিতে চায়! অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না?" (মায়িদাহঃ ৯১)

উষমান বিন আফফান বলেছেন, "তোমরা মদ থেকে দূরে থাকো। কারণ তা হল সকল নোংরা কাজের প্রধান। তোমাদের পূর্বযুগে একটি লোক ছিল, যে সর্বদা আল্লাহর ইবাদত করত এবং লোকজন থেকে দূরে থাকত। এক ভ্রষ্ট মেয়ে তাকে ভালোবেসে ফেলল। সে এক সময় তার দাসী দ্বারা কোন ব্যাপারে সাক্ষ্য দেওয়ার নাম ক'রে তাকে ডেকে পাঠাল। সে দাসীর সাথে এসে তার বাড়িতে প্রবেশ করল। এক একটা দরজা পার হতে তা বন্ধ করা হল। অবশেষে এক সুন্দরী মহিলার নিকট পৌঁছল। তার সাথে ছিল একটি কিশোর ও মদের পাত্র।
মেয়েটি বলল, 'আমি আসলে তোমাকে কোন সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডেকে পাঠাইনি। আমি তোমাকে ডেকেছি আমার সাথে মিলন করার জন্য অথবা এই কিশোরকে খুন করার জন্য অথবা এই মদ পান করার জন্য। তাতে যদি তুমি অস্বীকার কর, তাহলে আমি চিৎকার ক'রে তোমার নামে অপবাদ দিয়ে তোমাকে লাঞ্ছিত করব।'
সুতরাং সে যখন নিরুপায় অবস্থা দেখল, তখন মদপানকে হাল্কা মনে করল। বলল, 'ঠিক আছে, আমাকে এক গ্লাস মদ দাও।' সে তা পান করল। কিন্তু সে দ্বিতীয় গ্লাস চাইল। অতঃপর নেশায় চুর হলে সে মেয়েটির সাথে ব্যভিচার করল এবং সবশেষে কিশোরটিকেও খুন ক'রে বসল।
সুতরাং তোমরা মদপান থেকে দূরে থাকো। যেহেতু বান্দার মধ্যে মদ ও ঈমান কখনই একত্র হতে পারে না। আর হলে অদূর ভবিষ্যতে একটি তার সঙ্গীকে বহিষ্কার ক'রে দেয়।" (নাসাঈ ৫৬৬৬, বাইহাক্বী ১৭১১৬নং)

আপাতদৃষ্টিতে ঋণ করা পাপ নয়, কিন্তু পাপের দিকে টেনে নিয়ে যায়। মানুষ প্রয়োজনে ঋণ ক'রে থাকে, কিন্তু তারপর পাপের দরজা খোলা যায়।
আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, রাসূলুল্লাহ নামাযের শেষ বৈঠকে সালাম ফিরার পূর্বে বিভিন্ন প্রার্থনা করার সময় ঋণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনাও করতেন। এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি তো ঋণ থেকে খুব বেশী আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকেন। (তার কারণ কী?) প্রত্যুত্তরে মহানবী বললেন,
((إِنَّ الرَّجُلَ إِذَا غَرِمَ حَدَّثَ فَكَذَبَ وَوَعَدَ فَأَخْلَفَ)).
"কারণ, মানুষ যখন ঋণগ্রস্ত হয়, তখন কথা বললে মিথ্যা বলে এবং অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে (ওয়াদা-খেলাফী করে)।" (বুখারী ৮৩২, মুসলিম ৫৮৯নং)
এইভাবে কত শত পাপ আরো কত শত পাপকে আহবান ও আকর্ষণ করে তার ইয়ত্তা নেই। যাঁরা অপরাধ জগতের খবর রাখেন, তাঁরা অবশ্যই জানেন, পাপ আরো একাধিক পাপের জন্ম দেয়।

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 যে পাপের পাপী উম্মতী নয়

📄 যে পাপের পাপী উম্মতী নয়


এমন কিছু পাপ আছে, যা করলে মুসলিম মুসলিমদের দলভুক্ত থাকে না, মহানবী-এর উম্মতী থাকে না। তাতে অনেক সময় সে সত্যি-সত্যিই ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়। নতুবা ইসলামের তরীকা ও আদর্শ থেকে বের হয়ে যায়, তবে কাফের হয়ে যায় না।

তকদীরের প্রতি বিশ্বাস না রাখা
তকদীরে বিশ্বাস রাখা ঈমানের ষষ্ঠ রুক্স। এ বিশ্বাস ছাড়া কোন মু'মিনের ঈমান পূর্ণ হতে পারে না এবং সে মুসলিম উম্মাহর কাফেলায় শামিল হতে পারে না। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ فَقَالَ لَهُ اكْتُبْ قَالَ رَبِّ وَمَاذَا أَكْتُبُ؟ قَالَ اكْتُبْ مَقَادِيرَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ، مَنْ مَاتَ عَلَى غَيْرِ هَذَا فَلَيْسَ مِنِّي ..
"নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্বপ্রথম যা সৃষ্টি করেন, তা হল কলম। অতঃপর তাকে বলেন, 'লিখো'। কলম বলল, 'হে আমার প্রতিপালক! আমি কী লিখব?' তিনি বললেন, 'কিয়ামত কায়েম হওয়া পর্যন্ত সকল জিনিসের তকদীর লিখো। এ (বিশ্বাস) ছাড়া যে অন্য কিছুর উপর মারা যাবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।" (আবু দাউদ ৪৭০২, সঃ জামে' ২০১৮নং)
প্রকৃত মু'মিন হতে হলে তকদীরের ভালো-মন্দের প্রতি ঈমান রাখতেই হবে। মহানবী বলেছেন,
لِكُلِّ شَيْءٍ حَقِيقَةٌ وَمَا بَلَغَ عَبْدٌ حَقِيقَةَ الْإِيمَانِ حَتَّى يَعْلَمَ أَنَّ مَا أَصَابَهُ لَمْ يَكُنْ لِيُخْطِئَهُ وَمَا أَخْطَأَهُ لَمْ يَكُنْ لِيُصِيبَهُ)).
"প্রত্যেক জিনিসের একটি প্রকৃতত্ব আছে। আর কোন বান্দা ঈমানের প্রকৃতত্বে ততক্ষণ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না, যতক্ষণ না সে এ ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয়ী হয় যে, যে মুসীবতে সে আক্রান্ত হয়েছে তা তার উপর আসারই ছিলো। আর যা তার উপর আসেনি তা আসারই ছিলো না।" (আহমাদ ২৭৪৯০, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ২১৫, সিঃ সহীহাহ ২৪৭১নং)
তকদীরের প্রতি ঈমান রাখা ছাড়া মুসলিম হওয়া সম্ভব নয়। আর তার মানেই তার কোন সৎকর্মই মহান আল্লাহ গ্রহণ করবেন না। মহানবী বলেছেন,
((ثَلَاثَةٌ لَا يَقْبَلُ اللَّهُ لَهُمْ صَرْفًا وَلَا عَدْلًا : عَاقٌ ، وَمَنَّانُ ، وَمُكَذِّبُ بِالْقَدَرِ)).
"তিন ব্যক্তির নিকট হতে আল্লাহ ফরয, নফল কিছুই গ্রহণ করবেন না; পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, দান করে প্রচারকারী এবং তকদীর অস্বীকারকারী ব্যক্তি।" (ত্বাবারানী ৭৫৪৭, সহীহুল জামে ৩০৬৫নং)
..... وَلَوْ أَنْفَقْتَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ مَا قَبْلَهُ اللَّهُ مِنْكَ حَتَّى تُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ وَتَعْلَمَ أَنَّ مَا أَصَابَكَ لَمْ يَكُنْ لِيُخْطِئَكَ وَأَنَّ مَا أَخْطَأَكَ لَمْ يَكُنْ لِيُصِيبَكَ وَلَوْ مُتَّ عَلَى غَيْرِ هَذَا لَدَخَلْتَ النَّارَ).
"---তুমি যদি আল্লাহর পথে উহুদ পাহাড় সমান সোনা ব্যয় কর, তবে তা আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ করবেন না, যতক্ষণ না তুমি ভাগ্যের প্রতি ঈমান আনবে। আর জানবে যে, যা তোমার নিকট পৌঁছবে, তাতে ভুল হবে না এবং যা তোমার ব্যাপারে ভুলে যাওয়া হয়েছে (অর্থাৎ, যে সুখ-দুঃখ তোমার ভাগ্যে নেই) তা তোমার নিকট পৌঁছবে না। এর বিপরীত বিশ্বাসের উপর তোমার মৃত্যু হলে, তুমি অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।" (আহমাদ ২১৫৮৯, ২১৬১১, আবু দাউদ ৪৭০১, বাইহাক্বী ২০৬৬৩, ইবনে হিব্বান ৭২৭নং)
আত্মা বলেন, রাসূলুল্লাহ -এর সাহাবী উবাদাহ বিন স্বামেতের ছেলে অলীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ক'রে জিজ্ঞাসা করলাম, 'মৃত্যুর সময় আপনার আব্বার অসিয়ত কী ছিল?' উত্তরে তিনি বললেন, 'আমাকে আমার আব্বা ডেকে বললেন, বেটা! তুমি আল্লাহকে ভয় কর। আর জেনে রেখো, তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর ভয় রাখতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহর প্রতি এবং তকদীরের ভালো-মন্দ সব কিছুর প্রতি ঈমান এনেছ। এ ঈমান ছাড়া মারা গেলে তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আমি আল্লাহর রসূল -কে বলতে শুনেছি যে, "নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্বপ্রথম যা সৃষ্টি করেন, তা হল কলম। অতঃপর তাকে বলেন, 'লিখো'। কলম বলল, 'হে আমার প্রতিপালক! আমি কী লিখব?' তিনি বললেন, 'তকদীর এবং অনন্তকাল ধরে যা ঘটবে তা লিখো।' (আহমাদ ২৩০৮১, তিরমিযী ২১৫৫, ৩৩১৯নং)
অগ্নিপূজারীদের বিশ্বাস, তকদীর বলে কিছু নেই। সুতরাং যে তকদীরে বিশ্বাস রাখে না, সে তাদের দলভুক্ত। মহানবী বলেছেন,
لِكُلِّ أُمَّةٍ مَجُوسٌ ومَجُوسُ أُمَّتِي الَّذِينَ يَقُولُونَ : لَا قَدَرَ ، إِنْ مَرِضُوا فَلَا تَعُودُوهُمْ وَإِنْ مَاتُوا فَلَا تَشْهَدُوهُمْ)).
"প্রত্যেক উম্মতের মাঝে মজুস (অগ্নিপূজক সম্প্রদায়) আছে। আর আমার উম্মতের মজুস তারা, যারা বলে, তকদীর বলে কিছু নেই।' ওরা যদি রোগাক্রান্ত হয় তাহলে ওদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করো না এবং ওরা মরলে ওদের জানাযায় অংশ গ্রহণ করো না।" (আহমাদ ৫৫৮৪, সহীহুল জামে' ৫০৩৯নং)

কোন কিছুকে অশুভ ধারণা করা, হাত গণনায় বিশ্বাস করা, যাদু করা
কোন প্রাণী বা বস্তুকে অশুভ ধারণা করা বা কুলক্ষণ মনে করা শির্ক। যেমন হাত গণনায় বিশ্বাস করা এবং যাদু করা শির্ক। সুতরাং বলাই বাহুল্য যে, শির্ক করলে কেউ মুসলিম থাকতে পারে না। আর সে জন্যই মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَطَيَّرَ وَلَا تُطْيِّرَ لَهُ ، وَلا تَكَهَّنَ وَلا تُكَذِّنَ لَهُ أَوْ سَحَرَ أَوْ سُحِرَ لَهُ)).
"সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি (কোন বস্তু, ব্যক্তি কর্ম বা কালকে) অশুভ লক্ষণ বলে মানে অথবা যার জন্য অশুভ লক্ষণ দেখা (পরীক্ষা) করা হয়, যে ব্যক্তি (ভাগ্য) গণনা করে অথবা যার জন্য (ভাগ্য) গণনা করা হয়। আর যে ব্যক্তি যাদু করে অথবা যার জন্য (বা আদেশে) যাদু করা হয়।" (ত্বাবারানী ১৪৭৭০, সহীহুল জামে' ৫৪৩৫নং)

আল্লাহর ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা
আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে কসম বা শপথ করা শির্ক। আর মুশরিক মুসলিমদের দলভুক্ত হতে পারে না। তাই মহানবী বলেছেন,
مَنْ حَلَفَ بِالأَمَانَةِ فَلَيْسَ مِنَّا )).
"যে ব্যক্তি আমানতের কসম খাবে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (আবু দাউদ ৩২৫৫, আহমাদ ৫/৩৫২, সিলসিলাহ সহীহাহ ৯৪নং)
তিনি আরো বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ حَلَفَ بِالْأَمَانَةِ ......
"সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমানতের কসম খায়---।" (আহমাদ ২২৯৮০, বায্যার ৪৪২৫, ইবনে হিব্বান ৪৩৬৩, হাকেম ৪/২৮৯, সহীহহুল জামে' ৫৪৩৬নং)
একদা ইবনে উমার একটি লোককে বলতে শুনলেন 'না, কা'বার কসম!' ইবনে উমার বললেন, 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কসম খেয়ো না। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি যে,
(( مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ ، فَقَدْ كَفَرَ أَوْ أَشْرَكَ )) .
“যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর নামে কসম করে, সে কুফরী অথবা শির্ক করে।" (আহমাদ, তিরমিযী ১৫৩৫, ইবনে হিব্বান, হাকেম ১/৫২, সহীহুল জামে' ৬২০৪নং)

মহানবী-এর তরীকা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া
মহানবী মুসলিমের জীবনের আদর্শ। মহান আল্লাহ তাঁকে আমাদের নমুনা বানিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
{لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا} (۲۱) سورة الأحزاب
"তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর (চরিত্রের) মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।" (আহযাবঃ ২১) সুতরাং তাঁর আদর্শ থেকে সরে কেউ কোন ভালো কাজ করলেও সে তাঁর দলভুক্ত নয়।
আনাস বলেন, তিন ব্যক্তি নবী-এর স্ত্রীদের বাসায় এলেন। তাঁরা নবী -এর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। অতঃপর যখন তাঁদেরকে এর সংবাদ দেওয়া হল তখন তাঁরা যেন তা অল্প মনে করলেন এবং বললেন, 'আমাদের সঙ্গে নবী-এর তুলনা কোথায়? তাঁর তো আগের ও পরের সমস্ত গোনাহ মোচন ক'রে দেওয়া হয়েছে। (সেহেতু আমাদের তাঁর চেয়ে বেশী ইবাদত করা প্রয়োজন)।' সুতরাং তাঁদের মধ্যে একজন বললেন, 'আমি সারা জীবন রাতভর নামায পড়ব।' দ্বিতীয়জন বললেন, 'আমি সারা জীবন রোযা রাখব, কখনো রোযা ছাড়ব না।' তৃতীয়জন বললেন, 'আমি নারী থেকে দূরে থাকব, জীবনভর বিয়েই করব না।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাঁদের নিকট এলেন এবং বললেন,
أَنْتُمُ الَّذِينَ قُلْتُمْ كَذَا وَكَذَا ؟ أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لأَخْشَاكُمْ لِلَّهِ ، وَأَتْقَاكُمْ لَهُ ، لَكِنِّي أَصُومُ وَأَفْطِرُ ، وأَصَلِّي وَأَرْقُدُ ، وَأَتَزَوَّجُ النَّسَاءَ ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي )).
"তোমরা এই এই কথা বলেছ? শোনো! আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের চেয়ে বেশী আল্লাহকে ভয় করি, তার ভয় অন্তরে তোমাদের চেয়ে বেশী রাখি। কিন্তু আমি (নফল) রোযা রাখি এবং রোযা ছেড়েও দিই, নামায পড়ি এবং নিদ্রাও যাই। আর নারীদের বিয়েও করি। সুতরাং যে আমার সুন্নত হতে মুখ ফিরিয়ে নিবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।" (বুখারী ৫০৬৩, মুসলিম ৩৪৬৯নং)
ইসলাম কোন ব্যাপারে বাড়াবাড়ি পছন্দ করে না, দ্বীনের ব্যাপারেও না। ইসলাম বৈরাগ্যবাদের অনুমোদন দেয় না। ইসলামের নীতি হল, 'অসংখ্য বন্ধন মাঝে লভিব মুক্তির স্বাদ।' সংসার-বিরাগী হয়ে ইবাদতও ইসলামে কাম্য নয়। বরং সংসার করাও এক প্রকার ইবাদত। সুতরাং সে নীতি থেকে বের হয়ে কেউ সেই নীতি-ওয়ালার দলভুক্ত থাকে কীভাবে? মহানবী বলেছেন,
(( النِّكَاحُ مِنْ سُنَّتِي، فَمَنْ لَمْ يَعْمَلْ بِسُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي ، وَتَزَوَّجُوا فَإِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمْ الْأُمَمَ، وَمَنْ كَانَ ذَا طَوْلِ فَلْيَنْكِحُ ، وَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَعَلَيْهِ بِالصِّيَامِ، فَإِنَّ الصَّوْمَ لَهُ وَجَاءُ)).
"বিবাহ হল আমার সুন্নাহ (তরীকা)। সুতরাং যে আমার সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত নয়। তোমরা বিবাহ কর। কারণ আমি অন্যান্য উম্মতের সামনে (সংখ্যাধিক্য নিয়ে) গর্ব করব। যে ব্যক্তি সমর্থ, যে যেন বিবাহ করে। আর যে অসমর্থ, তার জন্য রোযা রাখা আবশ্যক। কারণ রোযা যৌনেন্দ্রিয় দমনকারী।" (ইবনে মাজাহ ১৮৪৬, সঃ জামে' ৬৮০৭নং)
আবু আইয়ুব বলেন, নবী গাধার পিঠে সওয়ার হতেন, জুতা সিলাই করতেন, কামীসে তালি লাগাতেন, পশমের কাপড় পরতেন এবং বলতেন,
((مَن رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي)).
"যে আমার সুন্নাহ থেকে বৈমুখ হবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।" (ইবনে আসাকির, সঃ জামে' ৪৯৪৬নং)

মুসলিমদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করা
যার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা হয়, সে দলের লোক হতে পারে না। একজন শত্রুই পারে শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে। বলা বাহুল্য, যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে এবং হত্যা করতে উদ্যত হয়, সে কি মুসলিমদের দলভুক্ত হতে পারে? মহানবী বলেছেন,
(( مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السَّلَاحَ فَلَيْسَ مِنَّا ، وَمَنْ غَشَنَا فَلَيْسَ مِنَّا )) .
"সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমাদের উপর অস্ত্র তোলে। আর যে আমাদেরকে ধোঁকা দেয়, সেও আমাদের দলভুক্ত নয়।" (মুসলিম ২৯৪-২৯৫, ইবনে মাজাহ ২২২৪, তিরমিযী ১৩১৫, আবু দাউদ ৩৪৫২নং)
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
((مَنْ رَمَانَا بِاللَّيْلِ فَلَيْسَ مِنَّا )).
"যে ব্যক্তি রাত্রে আমাদের বিরুদ্ধে তীর নিক্ষেপ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (আহমাদ ৮২৭০, সঃ জামে' ৬২৭০নং)
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
مَنْ سَلَّ عَلَيْنَا السَّيْفَ فَلَيْسَ مِنَّا ..
"যে ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে তরবারি উন্মুক্ত করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (আহমাদ ১৬৫০০, ১৬৫৪১, মুসলিম ২৯২নং)
মুসলিম ব্যক্তি বিশেষের বিরুদ্ধে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু গুরুতর হল মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা ক'রে অস্ত্র ধারণ করা। মহানবী বলেছেন,
مَنْ خَرَجَ مِنَ الطَّاعَةِ وَفَارَقَ الْجَمَاعَةَ فَمَاتَ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً وَمَنْ قَاتَلَ تَحْتَ رَايَةٍ عُمِّيَّةٍ يَغْضَبُ لِعَصَبَةٍ أَوْ يَدْعُو إِلَى عَصَبَةٍ أَوْ يَنْصُرُ عَصَبَةً فَقُتِلَ فَقِتْلَةٌ جَاهِلِيَّةٌ وَمَنْ خَرَجَ عَلَى أُمَّتِي يَضْرِبُ بَرَّهَا وَفَاجِرَهَا وَلَا يَتَحَاشَ مِنْ مُؤْمِنِهَا وَلَا يَفِي لِذِي عَهْدٍ عَهْدَهُ فَلَيْسَ مِنِّى وَلَسْتُ مِنْهُ ..
"যে ব্যক্তি শাসকের আনুগত্য থেকে বের হয়ে এবং জামাআত থেকে পৃথক হয়ে মারা যাবে, সে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের মরণ মরবে। যে ব্যক্তি অন্ধ ফিতনার পতাকাতলে (হক-নাহক না জেনেই) যুদ্ধ করবে, অন্ধ পক্ষপাতিত্ব বা গোঁড়ামির ফলে ক্রুদ্ধ হবে অথবা অন্ধ পক্ষপাতিত্বের প্রতি আহবান করবে অথবা অন্ধ পক্ষপাতিত্বকে সাহায্য করবে, অতঃপর সে খুন হলে তার খুন জাহেলিয়াতের খুন। আর যে ব্যক্তি আমার উম্মতের বিরুদ্ধে তরবারি বের করে ভালো-মন্দ সকল মানুষকে হত্যা করবে এবং তার মুমিনকেও হত্যা করতে ছাড়বে না, চুক্তিবদ্ধ মানুষের চুক্তিও পূরণ করবে না, সে ব্যক্তি আমার দলভুক্ত নয় এবং আমিও তার দলভুক্ত নই।" (আহমাদ ৭৯৪৪, মুসলিম ৪৮৯২, নাসাঈ ৪১১৪নং)

যালেম শাসকদের যুলমে সহযোগিতা করা
ক্ষমতাসীন শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না, তার মানে এই নয় যে, ইসলাম-বিরোধী কাজে তার আনুগত্য করা যাবে। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
لا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ)).
“স্রষ্টার অবাধ্যতা করে কোন সৃষ্টির আনুগত্য নেই।” (ত্বাবারানী ১৪৭৯৫, আহমাদ ২০৬৫৩নং)
আর মহান আল্লাহর ব্যাপক নির্দেশ হল,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ} (২) سورة المائدة
"সৎ কাজ ও আত্মসংযমে তোমরা পরস্পর সহযোগিতা কর এবং পাপ ও সীমালংঘনের কাজে একে অন্যের সাহায্য করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে অতি কঠোর।" (মায়িদাহঃ ২)
সুতরাং জেনেশুনে কেউ অত্যাচারী ও দুর্নীতিপরায়ণ শাসকের তোষণ করলে, তার অত্যাচারে কোনও প্রকার সহযোগিতা বা সমর্থন করলে সে মুসলিমদের দলভুক্ত থাকে কীভাবে?
জাবের কর্তৃক বর্ণিত, একদা নবী কা'ব বিন উজরাহকে বললেন, "আল্লাহ তোমাকে নির্বোধ (আমীর) দের শাসনকাল থেকে আশ্রয় দিন।" কা'ব বললেন, 'নির্বোধ (আমীর) দের শাসনকাল কী?' তিনি বললেন,
أَمَرَاءُ يَكُونُونَ بَعْدِي لَا يَقْتَدُونَ بِهَدْيِي وَلَا يَسْتَنُّونَ بِسُنَّتِي فَمَنْ صَدَّقَهُمْ بِكَذِيهِمْ وَأَعَانَهُمْ عَلَى ظُلْمِهِمْ فَأُولَئِكَ لَيْسُوا مِنِّي وَلَسْتُ مِنْهُمْ وَلَا يَرِدُّوا عَلَيَّ حَوْضِي وَمَنْ لَمْ يُصَدِّقْهُمْ بِكَذِبِهِمْ وَلَمْ يُعِنْهُمْ عَلَى ظُلْمِهِمْ فَأُولَئِكَ مِنّي وَأَنَا مِنْهُمْ وَسَيَرِدُوا عَلَيَّ حَوْضِي يَا كَعْبَ بْنَ عُجْرَةَ الصَّوْمُ جُنَّةٌ وَالصَّدَقَةُ تُطْفِئُ الْخَطِيئَةَ وَالصَّلَاةُ قُرْبَانٌ أَوْ قَالَ بُرْهَانٌ يَا كَعْبَ بْنَ عُجْرَةَ إِنَّهُ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ لَحْمُ نَبَتَ مِنْ سُحْتِ النَّارُ أَوْلَى بِهِ يَا كَعْبَ بْنَ عُجْرَةَ النَّاسُ غَادِيَانِ فَمُبْتَاعٌ نَفْسَهُ فَمُعْتِقُهَا وَبَائِعٌ نَفْسَهُ فَمُوبَقُهَا)).
"আমার পরবর্তীকালে এক শ্রেণীর আমীর হবে; যারা আমার আদর্শে আদর্শবান হবে না এবং আমার তরীকাও অবলম্বন করবে না। সুতরাং যারা (তাদের দ্বারে দ্বারস্থ হয়ে) তাদের মিথ্যাবাদিতা সত্ত্বেও তাদেরকে সত্যবাদী মনে করবে এবং অত্যাচারে (ফতোয়া ইত্যাদি দ্বারা) তাদেরকে সহযোগিতা করবে তারা আমার দলভুক্ত নয় এবং আমিও তাদের দলভুক্ত নই। তারা আমার 'হওয' (কওসারের) পানি পান করার জন্য উপস্থিত হতে পারবে না।
আর যারা তাদের মিথ্যাবাদিতায় তাদেরকে সত্যবাদী জানবে না এবং অত্যাচারে তাদেরকে সহযোগিতা করবে না, তারা আমার দলভুক্ত, আমিও তাদের দলভুক্ত এবং আমার 'হওয' (কওসারের) পানি পান করার জন্য উপস্থিত হতে পারবে।
হে কা'ব বিন উজরাহ! রোযা হল ঢাল স্বরূপ, সদকাহ (দান-খয়রাত) পাপ মোচন করে এবং নামায হল (আল্লাহর) নৈকট্যদাতা অথবা তোমার (ঈমানের) দলীল।
হে কা'ব বিন উজরাহ! সে মাংস (দেহ) বেহেস্তে প্রবেশ করবে না; যা হারাম খাদ্যে প্রতিপালিত হয়েছে। তার জন্য তো দোযখই উপযুক্ত।
হে কা'ব বিন উজরাহ! মানুষের প্রাত্যহিক কর্মপ্রচেষ্টা দুই ধরনের হয়ে থাকে; কিছু মানুষ তো নিজেদেরকে (সৎকর্মের মাধ্যমে) ক্রয় করে (দোযখ থেকে) মুক্ত করে নেয়। আর কিছু মানুষ (অসৎকর্মের মাধ্যমে) নিজেদেরকে বিক্রয় করে ধ্বংস করে দেয়।" (আহমাদ ১৪৪৪১, বায্যার ১৬০৯ নং, তাবারানী, ইবনে হিব্বান, সহীহ তিরমিযী ৫০১ নং)

তীরন্দাজি বর্জন করা
যুদ্ধ-বিগ্রহে মহাশক্তি হল ক্ষেপণ। দূর থেকে নিক্ষেপ ক'রে শত্রু-নিধন করা। তীরন্দাজি করা সেই ক্ষেপণ-পদ্ধতির অন্যতম। যে নিজের মধ্যে প্রতিপালিত সেই শক্তিকে নষ্ট করবে এবং শেখার পর তা বর্জন করবে, সে মুসলিমদের দলভুক্ত ও তাদের আদর্শ-পথে থাকতে পারবে না। মহানবী বলেছেন,
مَنْ عُلِّمَ الرَّمْيَ ، ثُمَّ تَرَكَهُ ، فَلَيْسَ مِنَّا ، أَوْ فَقَدْ عَصَى)). رواه مسلم
"যে ব্যক্তিকে তীরন্দাজির বিদ্যা শিক্ষা দেওয়া হল, তারপর সে তা পরিত্যাগ করল, সে আমাদের দলভুক্ত নয় অথবা সে অবাধ্যতা করল।" (মুসলিম ৫০৫৮, ইবনে মাজাহ ২৮১৪নং)

নারী-পুরুষের পরস্পরের বেশ ধারণ করা
ইসলামের রীতি হল নারী-পুরুষ লেবাসে-পোশাকে পৃথক থাকবে। তাদের কেউ কারো লেবাস-পোশাক বা চাল-চলন গ্রহণ করবে না। একে অন্যের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে না। ইসলামের এই রীতি যে অগ্রাহ্য ও উল্লংঘন করবে, সে মুসলিমদের দলভুক্ত থাকবে না। মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِالرِّجَالِ مِنْ النِّسَاءِ وَلَا مَنْ تَشَبَّهَ بِالنِّسَاءِ مِنْ الرِّجَال)).
"মহিলাদের মধ্যে যে কেউ পুরুষদের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে আমাদের দলভুক্ত নয় এবং পুরুষদের মধ্যে যে কেউ মহিলাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (আহমাদ ৬৮৭৫, সঃ জামে' ৫৪৩৩নং)

বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করা
প্রত্যেক জাতির পৃথক বৈশিষ্ট্য আছে, নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য আছে। মুসলিম জাতির উচিত, নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা ক'রে চলা এবং ধর্মে, আচরণে, পরিচ্ছদে ও চরিত্রে বিজাতির অনুকরণ না করা। সে মানুষ কীভাবে স্বজাতির দলভুক্ত থাকতে পারে, যে মানুষ বিজাতির সভ্যতায় মুগ্ধ? সে মানুষ কীরূপে নিজ জাতিভুক্ত থাকতে পারে, যে মানুষ বিজাতির আনুরূপ্য ও সাদৃশ্য গ্রহণ করে? মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِغَيْرِنَا لَا تَشَبَّهُوا بِالْيَهُودِ وَلا بِالنَّصَارَى فَإِنَّ تَسْلِيمَ الْيَهُودِ الإِشَارَةُ بالأصابع وَتَسْلِيمَ النَّصَارَى الإِشَارَةُ بِالأَكُفَّ)).
"সে ব্যক্তি আমার দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি আমাদেরকে ছেড়ে অন্য কারো সাদৃশ্য অবলম্বন করে। তোমরা ইহুদীদের সাদৃশ্য অবলম্বন করো না, আর খ্রিস্টানদেরও সাদৃশ্য অবলম্বন করো না। ইয়াহুদীদের সালাম আঙ্গুলের ইশারায় এবং খ্রিস্টানদের সালাম হাতের ইশারায়।" (তিরমিযী ২৬৯৫নং, ত্বাবারানী, সিলসিলাহ সহীহাহ ২১৯৪নং)
তিনি আরো বলেছেন,
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ ».
"যে ব্যক্তি যে জাতির অনুকরণ করবে, সেই ব্যক্তি সেই জাতির দলভুক্ত।" (আবু দাউদ ৪০৩৩, সঃ জামে' ৬১৪৯নং)
لَيْسَ مِنَّا مَنْ عَمِلَ بِسُنَّةِ غَيْرِنَا)).
"সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমাদের ছাড়া অন্যদের রীতি অনুসারে কর্ম করে।" (দায়লামী, সঃ জামে' ৫৪৩৯নং)

কারো স্ত্রী বা ভৃত্যকে তার বিরুদ্ধে প্ররোচিত করা
অনেক সময় মানুষ পরের পিছনে লাগে, ফলে কিছু না পেলে তার স্ত্রী বা ভৃত্যকে তার বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে। অথবা নিজের কাছে পাওয়ার জন্য তাদের কান ভাঙ্গিয়ে প্রলুব্ধ করে। ভাবতে অবাক লাগে, অনেক সময় সেই পুরুষ কোন ধর্ষিতা যুবতী বা কিশোরীকে বিবাহ করতে চায় না, অথচ বিবাহিতা, রমিতা ও সন্তানবতীকে পছন্দ ক'রে তাকে জীবন-সঙ্গিনী বানাতে চায়। এরই নাম (অবৈধ) প্রেম। আর প্রেম বড় দেওয়ানা, বড় বেয়াড়া। এ জন্যই বহু স্বামী তার স্ত্রীর সাথে বাইরের কোন পুরুষের সাথে যোগাযোগ রাখতে দেয় না; যদিও সে আত্মীয়। যেমন চাচাতো-খালাতো-মামাতো-ফুফাতো ভাই বা স্কুলের সহপাঠীর সাথে যোগাযোগ রাখতে নিষেধ করে। আর উপহাসের পাত্রদের কথাই স্বতন্ত্র। বন্ধু, দেওর, বুনাই, নন্দাই প্রভৃতিরা আলাদা আনন্দ দেয় নারীকে। আর তা অনেক সময় স্বামীর দেওয়া আনন্দ থেকে শ্রেষ্ঠ হতে পারে। ফলে তখনই সৃষ্টি হয় সমস্যা।
---ভাবী কেমন আছো?
---আল্লাহ যেমন রাখে ভাই। সংসারে অভাব যাচ্ছে।
---আমরা তো বাড়ি করলাম, গাড়ি কিনেছি------।
---কেমন আছো? ছুটিতে কোথাও বেড়াতে যাওনি?
---কোথায় আর যাব? বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে চির-বন্দিনী। কোথাও নিয়ে যেতে চায় না। তার সময়ই নেই।
---আমরা তো অমুক জায়গা দেখে এলাম। অমুক সমুদ্র-তীরে মাঝে মধ্যে হাওয়া খেতে যাই।
---কী ব্যাপার? অলংকারশূন্য কেন? ছেঁড়া কাপড় কেন?
----কী করব? যার জন্য সাজগোজ করি, সে পছন্দ করে না।
---আমি তো বউকে ফুটন্ত গোলাপ ক'রে রাখব।
এই শ্রেণীর কথাবার্তায় এক প্রকার প্ররোচনা ও প্রলোভন রয়েছে। আর এ সকল কথা শুনে মহিলার দীর্ঘশ্বাস পড়ে। প্রলুব্ধ হয়, মনে আকাঙ্ক্ষা হয়, আক্ষেপ ও অনুতাপ আসে। ফলে সে স্বামীর কাছে তা দাবী ক'রে বসে, যা পূরণ করার ক্ষমতা তার নেই। বারবার বলার ফলে অশান্তি বাধে। সংসার-সুখ ধীরে ধীরে ক্ষয় পেতে থাকে। শেষমেষ সংসারের শিশমহল ভেঙ্গে চূর্ণ হয়ে যায়। অনেক সময় তালাক হয়, অনেক সময় স্বামীর বন্ধনে থেকেও আর একজনকে মনের স্বামী বানিয়ে নেয়। ২/৩ বা আরো বেশী সন্তানকে মা-হারা ক'রে নতুন নাগরের ইশারায় ঘর থেকে পলায়ন ক'রে প্রেম নগরে গিয়ে নতুন বাসা বাঁধে!
সে ক্ষেত্রে একজন পুরুষের সোনার সংসার পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ছেলেমেয়েরা আশ্রয়হীন হয়ে যায়। হয়তো-বা বড় হয়ে তারা অপরাধের পথ বেছে নেয়।
বংশের কুলমান নষ্ট হয়। থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাছারিও হয়, তাতে কত শত টাকা খরচ হয়ে যায়।
এত ক্ষতি যে পুরুষে করে, সে কি মুসলিমদের দলভুক্ত থাকতে পারে? কোন মুসলিমের চরিত্র কি এমন হতে পারে?
অনুরূপ খাদেম, চাকর বা দাস-দাসীর ক্ষেত্রেও নানা বিপত্তি আনে এক শ্রেণীর মানুষ, যাদের চরিত্র মুসলিমদের চরিত্র নয়। তাই মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ خَبَّبَ امْرَأَةً عَلَى زَوْجِهَا أَوْ عَبْدًا عَلَى سَيِّدِهِ ..
"যে ব্যক্তি কারো স্ত্রী অথবা ক্রীতদাসকে তার (স্বামী বা প্রভুর বিরুদ্ধে) প্ররোচিত করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (আহমাদ ৯১৫৭, আবু দাউদ ২১৭৭, হাকেম ২৭৯৫, ইবনে হিব্বান ৫৫৬০নং)
لَيْسَ مِنَّا مَنْ حَلَفَ بِالْأَمَانَةِ وَمَنْ خَبَّبَ عَلَى امْرِئٍ زَوْجَتَهُ أَوْ مَمْلُوكَهُ فَلَيْسَ مِنَّا)).
"সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমানতের কসম খায়। আর যে ব্যক্তি কোন স্ত্রীকে তার স্বামীর বিরুদ্ধে অথবা কোন দাসকে তার প্রভুর বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে, সে ব্যক্তিও আমাদের দলভুক্ত নয়।" (আহমাদ ২২৯৮০, বায্যার ৪৪২৫, ইবনে হিব্বান ৪৩৬৩, হাকেম ৪/২৮৯, সহীহহুল জামে' ৫৪৩৬নং)

শোকের সময় অস্বাভাবিক আচরণ করা
আত্মীয়-বিয়োগে অনেক মানুষ ধৈর্যধারণ করতে পারে না। ফলে অধৈর্য হয়ে এমন আচরণ করে, যা স্বাভাবিক নয়। যেমন চুল ছেঁড়ে, পরিহিত কাপড় ছেঁড়ে, মাথায় মারে, গালে থাপ্পড় মারে ইত্যাদি। আসলে এমন আচরণ সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাসী কোন মুসলিমের হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। তাই মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ حَلَقَ وَمَنْ سَلَقَ وَمَنْ خَرَقَ ..
"সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে (শোকের সময়) মাথা নেড়া করে, মাতম করে ও কাপড় ছেঁড়ে।" (আবু দাউদ ৩১৩২, নাসাঈ ১৮৬৫নং)
তিনি আরো বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ ضَرَبَ الخُدُودَ ، وَشَقَّ الجُيُوبَ، وَدَعَا بِدَعْوَى الجَاهِلِيَّةِ ))
"সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে (শোকের সময়) গালে আঘাত করে, বুকের কাপড় ছিঁড়ে এবং জাহেলিয়াতের ডাকের ন্যায় ডাক ছাড়ে।" (বুখারী ১২৯৪, ১২৯৭, মুসলিম ২৯৬নং)

ছিন্তাই বা ডাকাতি করা
ঈমান থাকতে মু'মিন চোর হতে পারে না, তেমনি প্রকাশ্যে অপরের মাল ছিনিয়ে নেওয়া মুসলিমের আচরণ হতে পারে না। কারণ মুসলিম জানে,
كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ ، دَمُهُ وَمَالُهُ وَعِرْضُهُ )). رواه مسلم
"প্রত্যেক মুসলিমের রক্ত, মাল এবং তার মর্যাদা অপর মুসলিমের উপর হারাম।" (মুসলিম ৬৭০৬নং)
এতদসত্ত্বেও যে ছিন্তাই করে, সে মুসলিমদের দলভুক্ত নয়। মহানবী বলেছেন,
مَنِ انْتَهَبَ نُهْبَةً مَشْهُورَةً فَلَيْسَ مِنَّا ..
"যে ব্যক্তি (প্রকাশ্যভাবে) ছিন্তাই করবে, সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়।" (আহমাদ ১২৪২২, ১৫২৫৩, আবু দাউদ ৪৩৯৩নং)

পরের জিনিস নিজের বলে দাবী করা
মুসলিম না পরের মাল চুরি করতে পারে, আর না-ই পরের জিনিসকে নিজের বলে দাবী করতে পারে। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ مِنْ رَجُل ادَّعَى لِغَير أَبِيهِ وَهُوَ يَعْلَمُهُ إِلَّا كَفَرَ ، وَمَن ادَّعَى مَا لَيْسَ لَهُ ، فَلَيْسَ مِنَّا ، وَلَيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ ، وَمَنْ دَعَا رَجُلاً بِالْكُفْرِ ، أَوْ قَالَ : عَدُوَّ اللَّهِ ، وَلَيْسَ كَذَلِكَ إِلَّا حَارَ عَلَيْهِ )).
"যে কোন ব্যক্তি জ্ঞাতসারে অন্যকে নিজের বাপ বলে দাবী করে, সে কুফরী করে। যে ব্যক্তি এমন কিছু দাবী করে, যা তার নয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। আর সে যেন নিজস্ব বাসস্থান জাহান্নামে বানিয়ে নেয়। আর যে ব্যক্তি কাউকে 'কাফের' বলে ডাকে বা 'আল্লাহর দুশমন' বলে, অথচ বাস্তবে যদি সে তা না হয়, তাহলে তার (বক্তার) উপর তা বর্তায়।" (বুখারী ৩৫০৮, মুসলিম ২২৬নং)

ধোঁকাবাজি করা
কোন মুসলিম ধোঁকাবাজি ক'রে, ফাঁকি দিয়ে, প্রতারণা ক'রে বা ঠকিয়ে অন্যের সম্পদ হরণ করতে পারে না। ধোঁকাবাজি মুসলিমের আচরণ হতে পারে না। মহানবী বলেছেন,
((مَنْ غَشَنَا فَلَيْسَ مِنَّا ، وَالْمَكْرُ وَالْخِدَاعُ فِي النَّارِ)).
"যে ব্যক্তি আমাদেরকে ধোঁকা দেয় সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। ধোঁকাবাজ ও চালবাজ জাহান্নামে যাবে।" (ত্বাবারানীর কাবীর ১০০৮-৬, ও সাগীর ৭৩৮, ইবনে হিব্বান ৫৬৭, ৫৫৫৯, সহীহুল জামে' ৬৪০৮নং) তিনি আরো বলেছেন,
(( مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السَّلَاحَ فَلَيْسَ مِنَّا ، وَمَنْ غَشَنَا فَلَيْسَ مِنَّا )) .
"সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমাদের উপর অস্ত্র তোলে। আর যে আমাদেরকে ধোঁকা দেয়, সেও আমাদের দলভুক্ত নয়।" অন্য এক বর্ণনায় আছে, একদা রাসূলুল্লাহ (বাজারে) এক খাদ্যরাশির নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাতে নিজ হাত ঢুকালেন। তিনি আঙ্গুলে অনুভব করলেন যে, ভিতরের শস্য ভিজে আছে। বললেন, "ওহে ব্যাপারী! এ কী ব্যাপার?" ব্যাপারী বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! ওতে বৃষ্টি পড়েছে।' তিনি বললেন,
((أَفَلَا جَعَلْتَهُ فَوقَ الطَّعَامِ حَتَّى يَرَاهُ النَّاسُ ! مَنْ عَشَنَا فَلَيْسَ مِنَّا .
"ভিজেগুলোকে শস্যের উপরে রাখলে না কেন, যাতে লোকে দেখতে পেত? (জেনে রেখো!) যে আমাদেরকে ধোঁকা দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (মুসলিম ২৯৪-২৯৫,, ইবনে মাজাহ ২২২৪, তিরমিযী ১৩১৫, আবু দাউদ ৩৪৫২নং)

প্রতিযোগিতায় ধোঁকাবাজি করা
ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার সময় ঘোড়ার পশ্চাতে কিছু দ্বারা দ্রুত চলার সহায়ক বানিয়ে নিয়ে পুরস্কার জেতা বৈধ নয়। যেমন বৈধ নয় প্রতিযোগিতা চলাকালে ঘোড়া বদলে প্রথম স্থান দখল করা। (ত্বাবারানী, সঃ জামে' ৬১৯১নং)

সুর ক'রে কুরআন পাঠ না করা
মুসলিমদের রীতি হল, আল্লাহর কিতাব সুরেলা কণ্ঠে পাঠ করা। কেউ তা সুর ক'রে পড়তে না চাইলে সে তাদের পথ থেকে চ্যুত হয়ে যায়। মহানবী বলেছেন,
((زَيَّنُوا القُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ فَإِنَّ الصَّوْتَ الحَسَنَ يَزِيدُ القُرْآنَ حُسْناً)).
"তোমাদের (সুমিষ্ট) শব্দ দ্বারা কুরআনকে সৌন্দর্যমন্ডিত কর। কারণ, মধুর শব্দ কুরআনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।" (হাকেম ২১২৫, দারেমী ৩৫০১, সঃ জামে' ৩৫৮১নং)
لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَتَغَنَّ بِالْقُرْآنِ ..
"যে ব্যক্তি মিষ্ট স্বরে কুরআন পড়ে না, সে আমাদের মধ্যে নয়।" (অর্থাৎ আমাদের ত্বরীকা ও নীতি-আদর্শ বহির্ভূত।) (বুখারী ৭৫২৭, আবু দাউদ ১৪৭৩নং)
উক্ত হাদীসের বর্ণনাকারী আবু মুলাইকাকে জিজ্ঞাসা করা হল, 'হে আবু মুহাম্মাদ! যদি কারো কণ্ঠ সুন্দর না হয়, তাহলে আপনার রায় কী?' উত্তরে তিনি বললেন, 'যথাসাধ্য সুন্দর (সুরেলা) করার চেষ্টা করবে।'

বড়কে শ্রদ্ধা ও ছোটকে স্নেহ না করা
মুসলিম সমাজ হবে পরস্পরের প্রতি সম্প্রীতি ও সহানুভূতিশীল। তাদের বড়রা ছোটদেরকে স্নেহ করবে এবং ছোটরা বড়দেরকে শ্রদ্ধা করবে। উলামা ও বয়জ্যেষ্ঠদেরকে সম্মান দেবে এবং তাদের সঙ্গে আদবের সাথে কথাবার্তা বলবে। যারা তা করে না, তারা মুসলিমদের দলভুক্ত নয়। মহানবী বলেছেন,
(( لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرنَا ، وَيَعْرِفْ شَرَفَ كبيرنا )).
وفي روَايَةِ : (( حَقَّ كَبيرنَا )).
"সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং আমাদের বড়দের সম্মান জানে না।" (তিরমিযী ১৯২০নং) অন্য এক বর্ণনায় আছেঃ "আমাদের বড়দের অধিকার জানে না।" (আবু দাউদ ৪৯৪৫নং)
আর এক বর্ণনায় আছে,
لَيْسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَمْ يُحِلَّ كَبِيرَنَا وَيَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا حَقَّهُ)).
"সে ব্যক্তি আমার উম্মতের দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি আমাদের বড়দেরকে সম্মান দেয় না, ছোটদেরকে স্নেহ করে না এবং আলেমের অধিকার চেনে না।" (আহমাদ ২২৭৫৫, ত্বাবারানী, হাকেম, সহীহ তারগীব ৯৫ নং)

মানুষের শত্রু সাপ হত্যা না করা
বিষধর সাপ মানুষের শত্রু। এই জন্য তা দেখলে মেরে ফেলতে হয়, যাতে কোন মানুষ তার দংশনে মারা না যায়। কিন্তু অনেকে তা মারে না, এই ধারণা ক'রে যে, সাপ মারলে অন্য সাপে তার বদলা নেয় অথবা মারতে গেলে তেড়ে এসে আক্রমণ করে। অনেকে প্রাণীর অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে মানবাধিকার লংঘন করে। সুতরাং সে মুসলিমদের রীতি-নীতি থেকে দূরে সরে যায়। এই জন্য মহানবী বলেছেন,
اقْتُلُوا الْحَيَّاتِ كُلُّهُنَّ فَمَنْ خَافَ تَأْرَهُنَّ فَلَيْسَ مِنِّي ..
"তোমরা সর্ব প্রকার (বিষধর) সর্প হত্যা কর। যে ব্যক্তি কোন (বিষধর) সাপ দেখে এবং তার হামলার ভয়ে তাকে মেরে না ফেলে, সে আমার দলভুক্ত নয়।" (আবু দাউদ ৫২৫১, নাসাঈ ৩১৯৩, সহীহুল জামে' ৬২৪৭নং)

মোছ বা গোঁফ না ছাঁটা
গোঁফ ছাঁটা প্রকৃতিগত একটি সুন্নত। এই সুন্নতের বিরোধিতা ক'রে যে লম্বা গোঁফ রাখে, সে শেষনবী উম্মতের দলভুক্ত নয়। মহানবী বলেছেন,
((مَنْ لَمْ يَأْخُذُ مِنْ شَارِبِهِ فَلَيْسَ مِنَّا)).
"যে ব্যক্তি তার মোছ ছাঁটে না, সে আমার দলভুক্ত নয়।" (আহমাদ ১৯২৬৩, তিরমিযী ২৭৬১, নাসাঈর কুবরা ১৪, তাবারানী ৪৮৯৩-৪৮৯৬, সহীহুল জামে' ৬৫৩৩নং)
মোছাল ব্যক্তি মুসলিমদের দলভুক্ত নয়। যেহেতু লম্বা বা টাঙ্গি মোছ রাখার অভ্যাস অমুসলিমদের।
মহানবী বলেছেন,
((أَعْفُوا اللَّحَى وَخُذُوا الشَّوَارِبَ وَغَيِّرُوا شَيْبَكُمْ وَلَا تَشَبَّهُوا بِالْيَهُودِ وَالنَّصَارَى)).
"তোমরা দাড়ি বাড়াও, মোছ ছোট কর, পাকা চুলে (কালো ছাড়া অন্য) খেযাব লাগাও এবং ইয়াহুদ ও নাসারার সাদৃশ্য অবলম্বন করো না।" (আহমদ ৮৬৭২, সহীহুল জামে' ১০৬৭নং)
خَالِفُوا الْمُشْرِكِينَ أَحْفُوا الشَّوَارِبَ وَأَوْفُوا اللَّحَى ...
"তোমরা মুশরিকদের অন্যথাচরণ কর। তোমরা মোছ ছেঁটে ফেল এবং দাড়ি ছেড়ে দাও।" (বুখারী ৫৮৯২-৫৮৯৩, মুসলিম ৬২৫নং)
جُزُّوا الشَّوَارِبَ وَأَرْخُوا اللَّحَى خَالِفُوا الْمَجُوسَ ..
"মোছ ছেঁটে ও দাড়ি রেখে অগ্নিপূজকদের বৈপরীত্য কর।" (মুসলিম ৬২৬নং)
মুসলিমের উচিত, 'মুসলিম' নাম নিয়ে মুসলিমদের রীতি-নীতি মেনে চলে সেই নামকে সার্থক করা এবং উক্ত শ্রেণী ও আরো অন্যান্য অবাধ্যাচরণ ও পাপ-পঙ্কিলতায় লিপ্ত হয়ে নবীর উম্মত থেকে খারিজ হয়ে না যাওয়া।

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 আমল-বিধ্বংসী অপরাধসমূহ

📄 আমল-বিধ্বংসী অপরাধসমূহ


আমল শুধু করলেই হয় না, তার সংরক্ষণ করতে হয়। যেমন ফল-ফসল উৎপাদন করলেই হয় না, বরং তার সংরক্ষণ করতে হয়। উপার্জনের পর অর্থের সংরক্ষণ করতে হয়। এমন কোন কর্ম করা যাবে না, এমন কোন প্রকার শৈথিল্য করা যাবে না, যাতে সে সব নষ্ট ও চুরি হয়ে যায়। মহান আল্লাহ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَلَا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ} (৩৩) محمد
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রসূলের আনুগত্য কর, আর তোমাদের কর্মসমূহ বিনষ্ট করো না।" (মুহাম্মাদঃ ৩৩)

মানুষ ইহকালে যে সকল সৎকর্ম করে, তার বিনিময় পাবে পরকালে। কিছু ফল ফলে যায় ইহকালেও। কিন্তু আমল পরিমাণে যত বেশিই হোক বা মানে যত বেশিই ভালো হোক না কেন, তার হিফাযতের প্রয়োজন আছে, নচেৎ তা নষ্ট হয়ে যায়। বড় সৎকর্ম যেমন ছোট ছোট পাপকে মোচন করে দেয়, তদনুরূপ বড় বড় পাপও অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট সৎকর্মকে ধ্বংস ক'রে দেয়।
আমরা এখন সেই সকল অপরাধ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব, যার ফলে মানুষের সৎকর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। ইহকালে কাজে এলেও পরকালে কোন কাজে আসবে না।

একঃ কুফরী
কুফরী মানে অবিশ্বাস, অস্বীকার, অমান্য, সন্দেহ, মিথ্যায়ন, প্রত্যাখ্যান, ঘৃণা ইত্যাদি। সৃষ্টিকর্তা, তাঁর রসূল বা তাঁর দ্বীন-বিষয়ক কোন ব্যাপারে অবিশ্বাস করা, কোন কিছুকে অস্বীকার করা, কোন কিছুতে সন্দেহ পোষণ করা অথবা কোন কিছুকে মিথ্যাজ্ঞান করা এমন এক বৃহত্তম অপরাধ, যার ফলে মানুষের সৎকর্ম পন্ড হয়ে যায়, তাতে তা যত বড় বা যত বেশিই হোক না কেন। এমনকি কোনও বিশাল আমল মুসলিম অবস্থায় ক'রে মুর্তাদ হলে তাও বরবাদ হয়ে যায়।
আমরা কুরআন কারীমের কিছু আয়াত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَن يَرْتَدِدْ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُوْلَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَأُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} (۲۱۷) سورة البقرة
"তোমাদের মধ্যে যে কেউ নিজ ধর্ম ত্যাগ করে এবং সে সত্যপ্রত্যাখ্যানকারী (কাফের) রূপে মৃত্যুবরণ করে, তাদের ইহকাল ও পরকালের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। তারাই দোযখবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।" (বাক্বারাহঃ ২১৭)
{ إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ حَقٍّ وَيَقْتُلُونَ الَّذِينَ يَأْمُرُونَ بِالْقِسْطِ مِنْ النَّاسِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ (۲۱) أُولَئِكَ الَّذِينَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمَا لَهُم مِّن نَّاصِرِينَ) (۲۲) سورة آل عمران
"যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অবিশ্বাস করে, নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে এবং যে সকল লোক ন্যায়পরায়ণতার নির্দেশ দেয় তাদেরকেও হত্যা করে, তুমি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও। এই সব লোকের সকল আমল ইহকাল ও পরকালে নিষ্ফল হবে এবং তাদের কোন সাহায্যকারী নেই।" (আলে ইমরানঃ ২১-২২)
{وَمَن يَكْفُرْ بِالإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ وَهُوَ فِي الآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ} (۵) المائدة
"যে কেউ ঈমানকে অস্বীকার করবে, তার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।" (মায়িদাহঃ ৫)
{وَالَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَلِقَاء الآخِرَةِ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ هَلْ يُجْزَوْنَ إِلا مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ}
"যারা আমার নিদর্শনসমূহ ও পরকালের সাক্ষাৎকে মিথ্যা বলে, তাদের কার্য নিষ্ফল হবে। তারা যা করবে তদনুযায়ীই তাদেরকে প্রতিফল দেওয়া হবে।" (আ'রাফঃ ১৪৭)
{مَا كَانَ لِلْمُشْرِكِينَ أَن يَعْمُرُوا مَسَاجِدَ اللهُ شَاهِدِينَ عَلَى أَنفُسِهِمْ بِالْكُفْرِ أُوْلَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ وَفِي النَّارِ هُمْ خَالِدُونَ} (۱۷) سورة التوبة
"অংশীবাদীরা যখন নিজেরাই নিজেদের কুফরী (অবিশ্বাস) স্বীকার করে, তখন তারা আল্লাহর মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করবে এমন হতে পারে না। ওরা এমন যাদের সকল কর্ম ব্যর্থ এবং ওরা জাহান্নামেই স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে।" (তাওবাহঃ ১৭)
كَالَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ كَانُوا أَشَدَّ مِنكُمْ قُوَّةً وَأَكْثَرَ أَمْوَالاً وَأَوْلَادًا فَاسْتَمْتَعُوا بِخَلاقِهِمْ فَاسْتَمْتَعْتُم بِخَلاقِكُمْ كَمَا اسْتَمْتَعَ الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ بِخَلاقِهِمْ وَخُضْتُمْ كَالَّذِي خَاضُوا أَوْلَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ} (٦٩) سورة التوبة
"(তোমরাও) তোমাদের পূর্ববর্তীদের মত, যারা শক্তি, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে ছিল তোমাদের চেয়ে অনেক বেশী; ফলতঃ তারা নিজেদের (পার্থিব) অংশ উপভোগ করেছে। অতঃপর তোমরাও তোমাদের (পার্থিব) অংশ উপভোগ করেছ, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীগণ নিজেদের অংশ উপভোগ করেছে। আর তোমরাও সেইরূপ (অন্যায়) আলাপ-আলোচনায় নিমগ্ন হয়েছ, যেরূপ তারা হয়েছিল। দুনিয়াতে ও আখেরাতে ওদের (নেক) কর্মসমূহ বিনষ্ট হয়ে গেছে, আর ওরাই হল ক্ষতিগ্রস্ত।" (তাওবাহঃ ৬৯)
{قُلْ هَلْ تُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالًا (۱۰۳) الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا (١٠٤) أُولَئِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ وَلِقَائِهِ فَحَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فَلَا تُقِيمُ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَزْنًا} (١٠٥) سورة الكهف
তুমি বল, 'আমি কি তোমাদেরকে সংবাদ দেব তাদের, যারা কর্মে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত?' ওরাই তারা, পার্থিব জীবনে যাদের প্রচেষ্টা পন্ড হয়, যদিও তারা মনে ক'রে যে, তারা সৎকর্ম করছে। ওরাই তারা যারা তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী ও তাঁর সাথে তাদের সাক্ষাৎকে অস্বীকার করে; ফলে তাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। সুতরাং কিয়ামতের দিন আমি তাদের জন্য কোন ওজন রাখব না। (কাহফঃ ১০৩-১০৫)
{أَشِحَّةً عَلَيْكُمْ فَإِذَا جَاءَ الْخَوْفُ رَأَيْتَهُمْ يَنظُرُونَ إِلَيْكَ تَدُورُ أَعْيُنُهُمْ كَالَّذِي يُغْشَى عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَإِذَا ذَهَبَ الْخَوْفُ سَلَقُوكُم بِأَلْسِنَةٍ حِدَادٍ أَشِحَّةً عَلَى الْخَيْرِ أُوْلَئِكَ لَمْ يُؤْمِنُوا فَأَحْبَطَ اللَّهُ أَعْمَالَهُمْ وَكَانَ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرًا} (۱۹) سورة الأحزاب
"তোমাদের সহযোগিতায় ওরা কুণ্ঠিত; যখন বিপদ আসে, তখন তুমি দেখবে মৃত্যুভয়ে বেহুঁশ ব্যক্তির মত চোখ উলটিয়ে ওরা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু যখন বিপদ চলে যায়, তখন ওরা যুদ্ধলব্ধ ধনের লালসায় তোমাদের সাথে বাকচাতুরী করে। ওরা বিশ্বাসী নয়; এ জন্য আল্লাহ ওদের কার্যাবলী নিষ্ফল করেছেন। আর আল্লাহর জন্য এ সহজ।" (আহযাবঃ ১৯)
{ذلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ} (৯) سورة محمد
"এটা এ জন্যে যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তারা তা অপছন্দ করে। সুতরাং আল্লাহ তাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল ক'রে দেবেন।" (মুহাম্মাদঃ ৯)
{ذلِكَ بِأَنَّهُمُ اتَّبَعُوا مَا أَسْخَطَ اللَّهَ وَكَرِهُوا رِضْوَانَهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ} (২৮) محمد
"এটা এ জন্য যে, যা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে, তারা তার অনুসরণ করে এবং তাঁর সন্তুষ্টিকে অপছন্দ করে, সুতরাং তিনি তাদের কর্ম নিষ্ফল ক'রে দেন।" (মুহাম্মাদঃ ২৮)
{إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَصَدُّوا عَن سَبِيلِ اللَّهِ وَشَاقُوا الرَّسُولَ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الهُدَى لَن يَضُرُّوا اللَّهَ شَيْئًا وَسَيُحْبِطُ أَعْمَالَهُمْ} (৩২) سورة محمد
"যারা অবিশ্বাস করে এবং মানুষকে আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করে এবং নিজেদের নিকট পথের দিশা ব্যক্ত হবার পর রসূলের বিরোধিতা করে, তারা কখনই আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আর তিনি তাদের কর্ম ব্যর্থ করবেন।" (মুহাম্মাদঃ ৩২)
{ مَّثَلُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِرَبِّهِمْ أَعْمَالُهُمْ كَرَمَادٍ اشْتَدَّتْ بِهِ الرِّيحُ فِي يَوْمٍ عَاصِفٍ لَا يَقْدِرُونَ مِمَّا كَسَبُوا عَلَى شَيْءٍ ذَلِكَ هُوَ الضَّلَالُ الْبَعِيدُ} (১৮) سورة إبراهيم
"যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের বিবরণ এই যে, তাদের কর্মাবলী ভল্মের মত যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচন্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। যা তারা উপার্জন করে, তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারে না; এটাই তো ঘোর বিভ্রান্তি।" (ইব্রাহীমঃ ১৮)
{وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَعْمَالُهُمْ كَسَرَابِ بَقِيعَةٍ يَحْسَبُهُ الظَّمْآنُ مَاء حَتَّى إِذَا جَاءَهُ لَمْ يَجِدْهُ شَيْئًا وَوَجَدَ اللَّهَ عِندَهُ فَوَفَّاهُ حِسَابَهُ وَاللَّهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ} (৩৯) سورة النور
"যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করে, তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকার ন্যায়; পিপাসার্ত যাকে পানি মনে ক'রে থাকে। কিন্তু সে ওর নিকট উপস্থিত হলে দেখে তা কিছুই নয় এবং সেখানে সে আল্লাহকে পায়। অতঃপর তিনি তার কর্মফল পূর্ণমাত্রায় দান করেন। আর আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর।" (নূর: ৩৯)

দুইঃ শির্ক
যদিও শির্ক এক প্রকার কুফরী, তবুও তাতে কিছু বিশ্বাস থাকে। সৃষ্টিকর্তার প্রতি ঈমান রেখে তাঁর কর্মে, ইবাদতে বা নাম ও গুণাবলীতে কোন প্রকার শির্ক করলে আমল পন্ড হয়ে যায়। তখন যথেষ্ট হয় না শুধু এই বিশ্বাস যে, আল্লাহর আমাদের স্রষ্টা ও প্রতিপালক, তিনিই বিশ্ব-জাহান সৃষ্টি করেছেন, তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন ও ফল-ফসল দান করেন ইত্যাদি।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ذَلِكَ هُدَى اللَّهِ يَهْدِي بِهِ مَن يَشَاء مِنْ عِبَادِهِ وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُم مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ} (৮৮) سورة الأنعام
"এ আল্লাহর পথ নিজের দাসদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি এ দ্বারা পরিচালিত করেন, তারা যদি অংশী স্থাপন (শিক) করত, তাহলে তাদের কৃতকর্ম নিষ্ফল হত।" (আনআমঃ ৮৮)
আদম থেকে সর্বশেষ নবীর প্রতি একই প্রত্যাদেশ ছিল, শির্ক করো না। তাঁর ইবাদত ও উপাসনায় কাউকে শরীক করো না। মূর্তি বা অন্য কিছুর পূজা করো না। মৃত নেক লোকেদের ইবাদত করো না। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কেউ সত্য উপাস্য নেই)। সুতরাং প্রত্যেক নবীই সেই প্রত্যাদেশ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
মহান আল্লাহ জানেন, নবীরা শির্ক করেন না, করতে পারেন না। সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ-ও না। তবুও তিনি তাঁর উদ্দেশ্যে বলেছেন,
{وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ} (৬৫) سورة الزمر
"তোমার প্রতি ও তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই অহী (প্রত্যাদেশ) করা হয়েছে যে, যদি তুমি আল্লাহর অংশী স্থির কর, তাহলে অবশ্যই তোমার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্তদের শ্রেণীভুক্ত।" (যুমার: ৬৫)
মহান আল্লাহ মুশরিকদের আমল সম্বন্ধে বলেছেন,
{وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَل فَجَعَلْنَاهُ هَبَاء مَّنثُورًا} (২৩) سورة الفرقان
"আমি ওদের কৃতকর্মগুলির প্রতি অভিমুখ ক'রে সেগুলিকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণা (স্বরূপ নিষ্ফল) ক'রে দেব।" (ফুরক্বান: ২৩)

তিনঃ রিয়া
'রিয়া' বা লোকপ্রদর্শন, আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া লোককে দেখানোর জন্য নেক আমল করা, অর্থোপার্জন বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে সৎকর্ম করা। রিয়ার ফলেও আমলকারীর আমল ধ্বংস হয়ে যায়, তবে তার অন্য সকল আমল নয়। বরং শুধু সেই আমল, যাতে রিয়া অনুপ্রবেশ করে। কারণ তাও এক প্রকার শির্ক। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُمْ بِالمَنَّ وَالأَذِى كَالَّذِي يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ }
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! দানের কথা প্রচার করে এবং কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে নষ্ট ক'রে দিয়ো না; ঐ লোকের মত, যে নিজের ধন লোক দেখানোর জন্য ব্যয় করে। (সূরা বাকারাহ ২৬৪ আয়াত)
মহানবী বলেছেন,
(( قَالَ الله تَعَالَى : أَنَا أَغْنَى الشَّرَكَاءِ عَنِ الشَّرْكِ ، مَنْ عَمِلَ عَمَلاً أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ )) . رواه مسلم
"মহান আল্লাহ বলেন, 'আমি সমস্ত অংশীদারদের চাইতে অংশীদারি (শিক) থেকে অধিক অমুখাপেক্ষী। কেউ যদি এমন কাজ করে, যাতে সে আমার সঙ্গে অন্য কাউকে অংশীদার স্থাপন করে, তাহলে আমি তাকে তার অংশীদারি (শির্ক) সহ বর্জন করি।" (অর্থাৎ তার আমলই নষ্ট ক'রে দিই।) (মুসলিম ৭৬৬৬নং)
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
((قَالَ اللَّهُ ، عَزَّ وَجَلَّ : أَنَا خَيْرُ الشُّرَكَاءِ ، مَنْ عَمِلَ لِي عَمَلاً أَشْرَكَ فِيهِ غَيْرِي ، فَأَنَا بَرِيءٌ مِنْهُ ، وَهُوَ لِلَّذِي أَشْرَكَ)).
"আল্লাহ আযযা অজাল্ল বলেছেন, 'আমি সকল অংশীদার অপেক্ষা অধিক শির্ক (অংশীদারী) হতে বেপরোয়া। অতএব যে ব্যক্তি আমার জন্য কোন এমন আমল করবে, যাতে সে আমি ভিন্ন অন্য কাউকে অংশী করবে, আমি তার থেকে সম্পর্কহীন। আর সে আমল তার জন্য হবে যাকে সে শরীক করেছে।" (ইবনে মাজাহ ৪২০২, আহমাদ ৭৯৯৯নং)
মহানবী আরো বলেছেন,
((إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشَّرْكُ الْأَصْغَرُ)).
"তোমাদের উপর আমার সবচেয়ে অধিক যে জিনিসের ভয় হয় তা হল ছোট শির্ক।"
সাহাবাগণ প্রশ্ন করলেন, 'হে আল্লাহর রসূল! ছোট শির্ক কী জিনিস?' উত্তরে তিনি বললেন,
((الرِّيَاءُ يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِذَا جُزِيَ النَّاسُ بِأَعْمَالِهِمْ اذْهَبُوا إِلَى الَّذِينَ كُنْتُمْ تُرَاءُونَ فِي الدُّنْيَا فَانْظُرُوا هَلْ تَجِدُونَ عِنْدَهُمْ جَزَاءً)).
"রিয়া (লোকপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আমল)। আল্লাহ আয্যা অজাল্ল যখন (কিয়ামতে) লোকেদের আমলসমূহের বদলা দান করবেন তখন সকলের উদ্দেশ্যে বলবেন, 'তোমরা তাদের নিকট যাও, যাদেরকে প্রদর্শন করে দুনিয়াতে তোমরা আমল করেছিলে। অতঃপর দেখ, তাদের নিকট কোন প্রতিদান পাও কি না!" (আহমাদ ২৩৬৩০, ইবনে আবিদ্দুনয়্যা, বাইহাকীর যুহদ, সহীহ তারগীব ২৯ নং)
(( إِنَّ أَوَّلَ النَّاسِ يُقْضَى يَومَ القِيَامَةِ عَلَيْهِ رَجُلٌ اسْتُشْهِدَ ، فَأْتِيَ بِهِ ، فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ ، فَعَرَفَهَا ، قَالَ : فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا ؟ قَالَ : قَاتَلْتُ فِيكَ حَتَّى اسْتُشْهِدْتُ . قَالَ : كَذَبْتَ ، وَلَكِنَّكَ قَاتَلْتَ لأَنْ يُقَالَ : جَرِيءٌ ! فَقَدْ قِيلَ ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ، وَرَجُلٌ تَعَلَّمَ العِلْمَ وَعَلَّمَهُ ، وَقَرَأَ القُرآنَ ، فَأْتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا ، قَالَ : فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا ؟ قَالَ : تَعَلَّمْتُ العِلْمَ وَعَلَّمْتُهُ ، وَقَرَأْتُ فِيكَ القُرْآنَ ، قَالَ : كَذَبْتَ ، وَلَكِنَّكَ تَعَلَّمْتَ لِيُقَالَ : عَالِمٌ : وَقَرَأْتَ القُرْآنَ لِيُقَالَ : هُوَ قَارِي ، فَقَدْ قِيلَ ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ ، وَرَجُلٌ وَسَّعَ اللهُ عَلَيْهِ ، وَأَعْطَاهُ مِنْ أَصْنَافِ المَالِ ، فَأْتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ ، فَعَرَفَهَا ، قَالَ : فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا ؟ قَالَ: مَا تَرَكْتُ مِنْ سبيل تُحِبُّ أَنْ يُنْفَقَ فِيهَا إِلَّا أَنْفَقْتُ فِيهَا لَكَ. قَالَ : كَذَبْتَ ، وَلَكِنَّكَ فَعَلْتَ لِيُقَالَ : جَوَادٌ ! فَقَدْ قِيلَ ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّار )) . رواه مسلم
"কিয়ামতের দিন অন্যান্য লোকেদের পূর্বে যে ব্যক্তির প্রথম বিচার হবে সে হচ্ছে একজন শহীদ। তাকে আল্লাহর দরবারে হাজির করা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর দেওয়া নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সুতরাং সে তা স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ বলবেন, 'ঐ নেয়ামতের বিনিময়ে তুমি কী আমল ক'রে এসেছ?' সে বলবে 'আমি তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য জিহাদ করেছি এবং অবশেষে শহীদ হয়ে গেছি।' আল্লাহ বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে জিহাদ করেছ, যাতে লোকেরা তোমাকে বলে, অমুক একজন বীর পুরুষ। সুতরাং তা-ই বলা হয়েছে।' অতঃপর (ফিরিশাদেরকে) আদেশ করা হবে এবং তাকে উবুড় ক'রে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
দ্বিতীয় হচ্ছে এমন ব্যক্তি, যে ইল্ম শিক্ষা করেছে, অপরকে শিক্ষা দিয়েছে এবং কুরআন পাঠ করেছে। তাকে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তাকে (পৃথিবীতে প্রদত্ত) তাঁর সকল নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও সব কিছু স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ বলবেন, 'এই সকল নেয়ামতের বিনিময়ে তুমি কী আমল ক'রে এসেছ?' সে বলবে, 'আমি ইল্ম শিখেছি, অপরকে শিখিয়েছি এবং তোমার সন্তুষ্টিলাভের জন্য কুরআন পাঠ করেছি।' আল্লাহ বলবেন, 'মিথ্যা বলছ তুমি। বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে ইল্ম শিখেছ, যাতে লোকেরা তোমাকে আলেম বলে এবং এই উদ্দেশ্যে কুরআন পড়েছ, যাতে লোকেরা তোমাকে ক্বারী বলে। আর (দুনিয়াতে) তা বলা হয়েছে।' অতঃপর (ফিরিশাদেরকে) নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উবুড় ক'রে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
তৃতীয় হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যার রুযীকে আল্লাহ প্রশস্ত করেছিলেন এবং সকল প্রকার ধন-দৌলত যাকে প্রদান করেছিলেন। তাকে আল্লাহর দরবারে হাজির করা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর দেওয়া সমস্ত নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও সব কিছু সারণ করবে। অতঃপর আল্লাহ প্রশ্ন করবেন, 'তুমি ঐ সকল নেয়ামতের বিনিময়ে কী আমল ক'রে এসেছ?' সে বলবে, 'যে সকল রাস্তায় দান করলে তুমি খুশী হও সে সকল রাস্তার মধ্যে কোনটিতেও তোমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে খরচ করতে ছাড়িনি।' তখন আল্লাহ বলবেন, 'মিথ্যা বলছ তুমি। বরং তুমি এ জন্যই দান করেছিলে; যাতে লোকে তোমাকে দানবীর বলে। আর তা বলা হয়েছে।' অতঃপর (ফিরিশাবর্গকে) হুকুম করা হবে এবং তাকে উবুড় ক'রে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মুসলিম ১৯০৫ নং)
(بَشِّرْ هَذِهِ الْأُمَّةَ بِالسَّنَاءِ وَالتَّمْكِينِ فِي الْبَلَادِ وَالنَّصْرِ وَالرِّفْعَةِ فِي الدِّينِ وَمَنْ عَمِلَ مِنْهُمْ بِعَمَلِ الْآخِرَةِ لِلدُّنْيَا فَلَيْسَ لَهُ فِي الْآخِرَةِ نَصِيبٌ)).
"এই উম্মতকে স্বাচ্ছন্দ্য, সমুন্নতি, দ্বীন সহ সুউচ্চ মর্যাদা, দেশসমূহে তাদের ক্ষমতা বিস্তার এবং বিজয়ের সুসংবাদ দাও। কিন্তু যে ব্যক্তি পার্থিব কোন স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে পরকালের কর্ম করবে, তার জন্য পরকালে প্রাপ্য কোন অংশ নেই।" (আহমাদ ২১২২৪, ইবনে মাজাহ, হাকেম, বাইহাকীর শুআবুল ঈমান ৬৮৩৩ ইবনে হিব্বান ৪০৫,, সহীহ তারগীব ২১নং)
আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
{مَن كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ (١٥) أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ} (١٦) سورة هود
"যারা শুধু পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা করে, আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মসমূহ (এর ফল) পৃথিবীতেই পরিপূর্ণরূপে প্রদান ক'রে দিই এবং সেখানে তাদের জন্য কিছুই কম করা হয় না। এরা এমন লোক যে, তাদের জন্য পরকালে জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই নেই, আর তারা যা কিছু করেছে, তা সবই পরকালে নিষ্ফল হবে এবং যা কিছু করে থাকে, তাও নিরর্থক হবে।" (হৃদঃ ১৫-১৬)

চারঃ মহানবী -এর উপর আওয়াজ উঁচু করা
সম্মানী মানুষের সামনে উঁচু গলায় কথা বলতে হয় না। এতে তাঁর সম্মানের ক্ষতি হয় এবং বক্তার বেআদবি হয়। কিন্তু সবার চাইতে বেশি সম্মানের অধিকারী মানুষের সামনে উচ্চ স্বরে কথা বললে অথবা তাঁর কথোপকথনের সময় তাঁর চাইতে বেশি উঁচু শব্দে কথা বললে অথবা মুখের উপর মুখ দিলে জীবনের সমস্ত আমলই ধ্বংস হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَن تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ} (۲) سورة الحجرات
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা নবীর কন্ঠস্বরের উপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চ স্বরে কথা বল, তার সাথে সেইভাবে উচ্চ স্বরে কথা বলো না; কারণ এতে অজ্ঞাতসারে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে।" (হুজুরাতঃ ২)
উক্ত আয়াতে সেই আদব, শ্রদ্ধা, ভক্তি ও মর্যাদা-সম্মানের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যা প্রত্যেক মুসলিমকে রাসূলুল্লাহ -এর জন্য নিবেদন করতে হয়। প্রথম আদব হল, তাঁর উপস্থিতিতে যখন তোমরা আপোসে কথোপকথন কর, তখন তোমাদের কণ্ঠস্বর যেন তাঁর কণ্ঠস্বরের উপর উঁচু না হয়ে যায়। দ্বিতীয় আদব হল, যখন নবী করীম -এর সাথে কথোপকথন কর, তখন অতি বিনয়, ভদ্রতা ও ধীরতার সাথে কর। ঐভাবে উচ্চৈঃস্বরে তাঁর সাথে কথা বলো না, যেভাবে তোমরা আপোসে নিঃসংকোচে পরস্পরের সাথে বলে থাক।
কেউ বলেছেন, এর অর্থ হল, 'হে মুহাম্মাদ! হে আহমাদ!' বলে ডেকো না, বরং শ্রদ্ধার সাথে 'হে আল্লাহর রসূল!' বলে সম্বোধন করো। যদি আদব ও শ্রদ্ধা-সম্মানের এই দাবীগুলোর খেয়াল না কর, তবে বেআদবী হওয়ার সম্ভাবনা আছে, যার ফলে তোমাদের সৎকর্মাদি নিষ্ফল হয়ে যেতে পারে, অথচ তোমরা তার কোন টেরও পাবে না। (আহসানুল বায়ান)
বর্তমানেও তাঁর প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা ও আদব রাখা উচিত। তাঁর উক্তির উপর অন্য কারো উক্তির সংঘর্ষ বাধিয়ে অন্যের কথাকে প্রাধান্য দেওয়া অনুচিত। সহীহ হাদীস এলে সেটাই মান্য হওয়া উচিত, যদিও তা অন্যের রায় বা মত-বিরোধী।

পাঁচ: আসরের নামায ত্যাগ করা
নামাযের মধ্যে আসরের নামাযের একটা বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাই এই নামাযের প্রতি বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে কুরআনে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ والصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ) (۲۳۸) سورة البقرة
"তোমরা নামাযসমূহের প্রতি যত্নবান হও; বিশেষ ক'রে মধ্যবর্তী (আসরের) নামাযের প্রতি। আর আল্লাহর সম্মুখে বিনীতভাবে খাড়া হও।" (বাক্বারাহঃ ২৩৮)
আর রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
مَنْ تَرَكَ صَلَاةَ الْعَصْرِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ)).
"যে ব্যক্তি আসরের নামায ত্যাগ করে, সে ব্যক্তির আমল পন্ড হয়ে যায়।" (বুখারী ৫৫৩, নাসাঈ ৪৭৪নং)
শুধু তাই নয়, বরং ব্যাপার আরো গুরুতর। মহানবী বলেছেন,
الَّذِي تَفُوتُهُ صَلَاةُ الْعَصْرِ كَأَنَّمَا وُتِرَ أَهْلَهُ وَمَا لَهُ)).
"যে ব্যক্তির আসরের নামায ছুটে গেল, তার যেন পরিবার ও ধন-মাল লুণ্ঠন হয়ে গেল।" (মালেক, বুখারী ৫৫২, মুসলিম ১৪৪৮নং প্রমুখ)
কেবল আসরের নামায ত্যাগ করলে এই অবস্থা? তাহলে পাঁচ ওয়াক্তের নামায ত্যাগ করলে অবস্থা কী হতে পারে, তা বেনামাযীরা অনুমান করবে কি?

ছয়ঃ গোপনে আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা লংঘন করা
বহু মানুষ আছে, যারা জনসমক্ষে ভালো সাজে, কিন্তু নির্জনে মন্দ কাজ করে। 'দিনের বেলায় মোল্লাগিরি, রাতের বেলায় কলাই চুরি করা'র মতো অভ্যাস আছে অনেকের।
يَسْتَخْفُونَ مِنَ النَّاسِ وَلَا يَسْتَخْفُونَ مِنَ اللَّهِ وَهُوَ مَعَهُمْ إِذْ يُبَيِّتُونَ مَا لَا يَرْضَى مِنَ الْقَوْلِ وَكَانَ اللهُ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطًا ) (۱۰۸) سورة النساء
"তারা মানুষকে লজ্জা করে (মানুষের দৃষ্টি থেকে গোপনীয়তা অবলম্বন করে), কিন্তু আল্লাহকে লজ্জা করে না (তাঁর দৃষ্টি থেকে গোপনীয়তা অবলম্বন করতে পারে না) অথচ তিনি তাদের সঙ্গে থাকেন, যখন রাত্রে তারা তাঁর (আল্লাহর) অপছন্দনীয় কথা নিয়ে পরামর্শ করে। আর তারা যা করে, তা সর্বতোভাবে আল্লাহর জ্ঞানায়ও।" (নিসাঃ ১০৮)
এমন লোকেরা যে এক প্রকার রিয়াকারী তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু পার্থক্য হল, এমন লোকেদের সমস্ত আমল পন্ড হয়ে যাবে। যওবান বলেন, একদা নবী বললেন,
((لَأُلْفِينَ أَقْوَامًا مِنْ أُمَّتِي يَأْتُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِحَسَنَاتٍ أَمْثَالَ جِبَالَ تِهَامَةَ فَيَجْعَلُهَا اللَّهُ هَبَاءً مَنْثُورًا))
"আমি নিঃসন্দেহে আমার উম্মতের কয়েক দল লোককে (চিনি), যাদের কিয়ামতের দিন পাব, তারা কিয়ামতের দিন তিহামা (মক্কা ও ইয়ামানের মধ্যবর্তী এক বিশাল লম্বা শ্রেণীবদ্ধ) পর্বতমালার সমপরিমাণ বিশুদ্ধ নেকী নিয়ে উপস্থিত হবে; কিন্তু আল্লাহ তাদের সে সমস্ত নেকীকে উড়ন্ত ধূলিকণাতে পরিণত করে দেবেন।"
যওবান বলেন, 'হে আল্লাহর রসূল! সে লোকেরা কেমন হবে তা আমাদের জন্য খুলে বলুন ও তাদের হুলিয়া বর্ণনা করুন, যাতে আমরা আমাদের অজান্তে তাদের দলভুক্ত না হয়ে পড়ি।' আল্লাহর রসূল বলেন,
((أَمَا إِنَّهُمْ مِنْ إِخْوَانِكُمْ ، وَلَكِنَّهُمْ أَقْوَامٌ إِذا خَلَوْا بِمَحَارِمِ اللَّهِ انْتَهَكُوهَا)).
"শোন! তারা তোমাদেরই ভাই এবং তোমাদেরই সম্প্রদায়ভুক্ত হবে। তোমরা যেমন রাত্রি জাগরণ করে ইবাদত কর তেমনি তারাও করবে। কিন্তু যখনই তারা আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তু নিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকবে, তখনই তা অমান্য ও লংঘন করবে।" (ইবনে মাজাহ ৪২৪৫, ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৪২৩২, সাগীর ৬৬২ নং)

সাতঃ অপ্রয়োজনে কুকুর পোষা
কুকুর একটি নিষিদ্ধ প্রাণী। যে প্রাণী কোন পাত্রে মুখ দিলে তা সাতবার ধৌত করতে হয়। কামড় দিলে জলাতঙ্ক রোগ হয়। যে প্রাণী ঘরে থাকলে রহমতের ফিরিস্তা প্রবেশ করেন না। সেই কুকুর যে নিজ বাড়িতে পুষবে, তার আমল ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। মহানবী বলেন,
(( مَنِ اقْتَنَى كَلْبَاً إِلَّا كَلْبَ صَيْدٍ أَوْ مَاشِيَةٍ فَإِنَّهُ يَنْقُصُ مِنْ أَجْرِهِ كُلَّ يَوْمٍ قِيرَاطَانِ )).
متفق عليه. وفي رواية : (( قِيرَاطٌ )) .
“যে ব্যক্তি শিকারী অথবা পশুরক্ষক কুকুর ছাড়া অন্য কুকুর পোষে, তার নেকী থেকে প্রত্যেক দিন দুই ক্বীরাত্ব পরিমাণ সওয়াব কমে যায়।” (মালেক, বুখারী ৫৪৮০-৫৪৮২, মুসলিম ৪১০৬-৪১১২নং, তিরমিযী, নাসাঈ) অন্য বর্ণনায় আছে, "এক ক্বীরাত্ব সওয়াব কমে যায়।" এখানে ক্বীরাত ঠিক কত পরিমাণ, তা আল্লাহই জানেন। অবশ্য জানাযার নামায পড়ার সওয়াবে উল্লিখিত 'ক্বীরাত'এর পরিমাণ একটি বিশাল পাহাড় বা উহুদ পাহাড়ের সমান।

আট: অসচ্চরিত্রতা
মহানবী বলেছেন,
أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ ، وَأَحَبُّ الأَعْمَالَ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى سُرُورٌ تُدْخِلُهُ عَلَى مُسْلِمٍ ، أَوْ تَكَشِفُ عَنْهُ كُرْبَةً ، أَوْ تَقْضِي عَنْهُ دَيْنَا ، أَوْ تَطْرُدُ عَنْهُ جُوعًا، وَلَأَنْ أَمْشِيَ مَعَ أَخِ فِي حَاجَةٍ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَعْتَكِفَ فِي هَذَا الْمَسْجِدِ - يَعْنِي مَسْجِدَ الْمَدِينَةِ - شَهْرًا ، وَمَن كَفَّ غَضَبَهُ سَتَرَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ ، وَمَنْ كَظَمَ غَيْظَهُ وَلَوْ شَاءَ أَنْ يُمْضِيَهُ أَمْضَاهُ مَلأَ اللَّهُ قَلْبَهُ رَجَاءً يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، وَمَنْ مَشَى مَعَ أَخِيهِ فِي حَاجَةٍ حَتَّى يُثْبِتَهَا لَهُ أَثْبَتَ اللَّهُ قَدَمَهُ يَوْمَ تَزُولُ الأَقْدَامِ وَإِنَّ سُوءِ الْخُلُقِ لَيُفْسِدُ الْعَمَلَ كَمَا يُفْسِدُ الْخَلُّ الْعَسَلَ].
"আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম লোক হল সেই ব্যক্তি যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশী উপকারী। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম আমল হল, একজন মুসলিমের হৃদয়কে খুশীতে পরিপূর্ণ করা অথবা তার কোন কষ্ট দূর করে দেওয়া অথবা তার তরফ থেকে তার ঋণ আদায় করে দেওয়া অথবা (কাপড় দান করে তার ইজ্জত ঢেকে দেওয়া অথবা) তার নিকট থেকে তার ক্ষুধা দূর করে দেওয়া। মসজিদে একমাস ধরে ই'তিকাফ করার চাইতে আমার মুসলিম ভাইয়ের কোন প্রয়োজন মিটাতে যাওয়া আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়। যে ব্যক্তি নিজ ক্রোধ সংবরণ করে নেবে, আল্লাহ তার দোষ গোপন করে নেবেন। যে ব্যক্তি নিজ রাগ সামলে নেবে; অথচ সে ইচ্ছা করলে তা প্রয়োগ করতে পারত, সে ব্যক্তির হৃদয়কে আল্লাহ কিয়ামতের দিন সন্তুষ্ট করবেন। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য যাবে এবং তা পূরণ করে দেবে, আল্লাহ সেদিন তার পদযুগলকে সুদৃঢ় রাখবেন, যেদিন পদযুগল পিছল কাটবে। আর মন্দ চরিত্র আমলকে নষ্ট করে, যেমন সির্কা মধুকে নষ্ট করে ফেলে।" (ত্বাবারানী ১৩৪৬৮, ইবনে আবিদ দুনয়া, সহীহ তারগীব ২০৯০, সিলসিলাহ সহীহাহ ৯০৬নং, সহীহুল জামে' ১৭৬নং)
লক্ষণীয় যে, হাদীসের শুরুতে সচ্চরিত্রতার বিশেষ কয়েকটি আমল উল্লিখিত হয়েছে এবং সব শেষে বলা হয়েছে, অসচ্চরিত্রতা মানুষের আমলকে নষ্ট করে দেয়।
আমরা সংসার জগতে তার উদাহরণ পেতে পারি। কত নামী-দামী প্রসিদ্ধ লোক একটি চরিত্রহীনতার কাজ করলে তার সুনাম চলে যায় এবং দাম কমে যায়। কোন পদে থাকলে তাকে পদচ্যুত করা হয়। গদিনশীন হলে গদিহীন করা হয়। চরিত্রহীনতার কারণে কত ইমাম সাহেবের ইমামতি যায়। কত মুফতীর ফতোয়া অমান্য হয়। কত বক্তাকে জলসা করতে আর ডাকা হয় না। পূর্বের কত সুনাম, সুখ্যাতি, প্রসিদ্ধি, নেক আমল ইত্যাদি নিমেষে বিলীন হয়ে যায়। নষ্ট হয়ে যায় এক পাত্র দুগ্ধে এক বিন্দু মূত্র পড়ার মতো।

নয়ঃ ছল ক'রে সূদ খাওয়া
ধারে জিনিস বিক্রয় করে সেই জিনিসকেই নগদে তার থেকে কম দামে ক্রয় করা। (যেমন এক ব্যক্তির অর্থের প্রয়োজন হল। ঋণ কোথাও না পেয়ে এক গাড়ির ডিলারের নিকট গেল। ডিলারের নিকট থেকে ধারে ৫০ হাজার টাকায় একটি গাড়ি কিনল। অতঃপর সেই গাড়িকেই ঐ ডিলারের নিকট নগদ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে বিক্রি করল। যার ফলে ১০ হাজার টাকা ডিলারের পকেটে অনায়াসে এসে গেল।) এমন ক্রয়-বিক্রয়কে 'বাইউল ঈনাহ' বলা হয়, যা এক প্রকার সূদী ব্যবসা। সাহাবী যায়দ বিন আরকাম এই ব্যবসায় জড়িত হলে মা আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, তওবা না করলে যায়দ রাসূলুল্লাহ -এর সাথে কৃত জিহাদকে নষ্ট করে ফেলেছে। (বাইহাকী ১১১১৩, দারাকুত্বনী ২১১, মুসান্নাফ আব্দুর রায্যাক ১৪৮১২-১৪৮১৩নং)

দশঃ মানুষের উপর যুলুম করা
মানুষের হক নষ্ট করলে অথবা কারো প্রতি কোন যুলুম ক'রে থাকলে এবং তওবা না ক'রে মারা গেলে শেষ বিচারের দিন সেই হক আদায় করতে হবে অথবা প্রতিশোধ দিতে হবে নেক আমলের নেকী দিয়ে। তার ফলে ঐ আত্মসাৎকারী বা যালেমের সমস্ত আমলের নেকী নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে।
আবু হুরাইরা বলেন, একদা মহানবী বললেন, "তোমরা কি জান, নিঃস্ব কে?" সাহাবাগণ বললেন, 'আমাদের মধ্যে নিঃস্ব সেই ব্যক্তি, যার কোন দিরহাম নেই, যার কোন আসবাব-পত্র নেই।' মহানবী বললেন,
إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ وَصِيَامٍ وَزَكَاةٍ وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا وَقَدْفَ هَذا وَأَكَلَ مَالَ هَذَا وَسَفَكَ دَمَ هَذَا وَضَرَبَ هَذَا فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطْرِحَتْ عَلَيْهِ ثُمَّ طُرِحَ فِي النار ».
"আমার উম্মতের মধ্যে (আসল) নিঃস্ব তো সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতে নামায, রোযা ও যাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে। কিন্তু সেই সঙ্গে সে দেখবে যে, সে একে গালি দিয়েছে, ওর নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, এর মাল আত্মসাৎ করেছে, ওকে খুন করেছে, একে মেরেছে--- ইত্যাদি। সুতরাং প্রতিশোধ স্বরূপ একে তার নেকী প্রদান করা হবে, ওকেও তার নেকী প্রদান করা হবে। পরিশেষে যখন নেকী নিঃশেষ হয়ে যাবে অথচ তার প্রতিশোধ শেষ হবে না, তখন ওদের গোনাহ নিয়ে এর ঘাড়ে চাপানো হবে এবং সবশেষে তাকে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে!" (মুসলিম ৬৭৪৪,, আহমাদ ৮০২৯, তিরমিযী ২৪১৮, ইবনে হিব্বান ৪৪১১, বাইহাকী ১১৮৩৮, সিলসিলাহ সহীহাহ ৮৪৭নং)
তিনি আরো বলেছেন,
((إِنَّ الشَّيْطَانَ قَدْ يَئِسَ أَنْ تُعْبَدَ الْأَصْنَامُ فِي أَرْضِ الْعَرَبِ ، وَلَكِنَّهُ سَيَرْضَى مِنْكُمْ بِدُونِ ذلِكَ ، بِالْمُحَقِّرَاتِ وَهِيَ الْمُوبِقَاتُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، اتَّقُوا الْمَظَالِمَ مَا اسْتَطَعْتُمْ ، فَإِنَّ الْعَبْدَ يجيءُ بِالْحَسَنَاتِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَرَى أَنَّهُ سَتُنَجِيهِ ، فَمَا يَزَالُ عَبْدٌ يَقُومُ فَيَقُولُ : يَا رَبِّ ظَلَمَنِي عَبْدُكَ مَظْلَمَةً ، فَيَقُولُ : امْحُوا مِنْ حَسَنَاتِهِ ، مَا يَزَالُ كَذَلِكَ حَتَّى مَا يَبْقَى لَهُ حَسَنَةٌ مِنَ الذُّنُوبِ ، وَإِنَّ مَثَلَ ذَلِكَ كَسَفْر نَزَلُوا بِفَلاةٍ مِنَ الْأَرْضِ لَيْسَ مَعَهُمْ حَطَبٌ ، فَتَفَرَّقَ الْقَوْمُ لِيَحْتَطِبُوا ، فَلَمْ يَلْبَثُوا أَنْ حَطَبُوا فَأَعْظَمُوا النَّارَ وَطَبَخُوا مَا أَرَادُوا ، وَكَذَلِكَ الذُّنُوبُ)).
"নিশ্চয় শয়তান এ বিষয়ে নিরাশ হয়েছে যে, আরবের মাটিতে প্রতিমা-পূজা হবে। তবে সে এর চাইতে ছোট পাপে তুষ্ট হবে। অথচ তা হবে কিয়ামতে বিধ্বংসী পাপ। তোমরা যথাসাধ্য অত্যাচার থেকে সাবধান থাকো। কারণ বান্দা কিয়ামতের দিন অনেক নেকী নিয়ে উপস্থিত হবে এবং সে ধারণা করবে যে, তা তাকে পরিত্রাণ দেবে। কিন্তু কোন বান্দা খাড়া হয়ে বলবে, 'হে আমার প্রতিপালক! তোমার এই বান্দা (আমার প্রতি অমুক) অন্যায় করেছে।' তখন (ফিরিস্তাকে) বলা হবে, 'ওর নেকীসমূহ হতে (পরিমাণ মতো) মোচন ক'রে দাও।' এইভাবে হতে থাকবে, পরিশেষে পাপের প্রতিশোধ দিতে দিতে তার কোন নেকী অবশিষ্ট থাকবে না। এর উপমা হল একদল মুসাফিরের, যারা কোন মরুভূমিতে অবতরণ করে, যাদের সাথে কোন জ্বালানি থাকে না। অতঃপর তারা জ্বালানি সংগ্রহের জন্য ছড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে তারা অনেক জ্বালানি জমা করে এবং তাতে আগুন ধরিয়ে ইচ্ছামতো রান্না করে। অনুরূপ পাপরাশি।" (হাকেম ২২২১, শুআবুল ঈমান বাইহাক্বী ৭২৬৩, ৭৪৭১, আবু য়‍্যা'লা ৫১২২, সঃ তারগীব ২২২১নং)
এক ব্যক্তি মহানবী-এর সম্মুখে বসে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার দাস-দাসী আছে। তারা আমাকে মিথ্যা বলে, আমার বিশ্বাসঘাতকতা করে ও অবাধ্য হয়। আর আমি তাদেরকে গালাগালি ও মারধর করি। সুতরাং তাদের ব্যাপারে (আল্লাহর কাছে) আমার অবস্থা কী হবে?' তিনি বললেন, "তারা তোমার যে পরিমাণ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, অবাধ্যতা করেছে ও মিথ্যা বলেছে এবং যে পরিমাণ তুমি তাদেরকে শাস্তি দিয়েছ তা হিসাব করা হবে। অতঃপর তোমার শাস্তির পরিমাণ যদি তাদের অপরাধ বরাবর হয়, তাহলে সমান-সমান হয়ে যাবে, না তোমার সওয়াব হবে, আর না কোন পাপ। কিন্তু যদি তোমার শাস্তির পরিমাণ তাদের অপরাধের তুলনায় কম হয়, তাহলে তা তোমার জন্য অতিরিক্ত মঙ্গল হবে। আর যদি তোমার শাস্তির পরিমাণ তাদের অপরাধের তুলনায় বেশি হয়, তাহলে তা তোমার নিকট থেকে তাদের জন্য অতিরিক্ত মঙ্গল প্রতিশোধ স্বরূপ নেওয়া হবে।"
এ কথা শুনে একটু সরে গিয়ে লোকটি কাঁদতে ও চীৎকার করতে লাগল। আল্লাহর রসূল তাকে বললেন, "তুমি কি আল্লাহর কিতাব পড় না?
{ وَتَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا وَإِن كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَل أَتَيْنَا بِهَا وَكَفَى بِنَا حَاسِبِينَ} (৪৭) سورة الأنبياء
অর্থাৎ, কিয়ামত দিবসে আমি স্থাপন করব ন্যায় বিচারের দাঁড়িপাল্লাসমূহ; সুতরাং কারো প্রতি কোন অবিচার করা হবে না। কর্ম যদি সরিষার দানা পরিমাণ ওজনের হয় তবুও তা আমি উপস্থিত করব। আর হিসাব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট। (আম্বিয়াঃ ৪৭)
লোকটি বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! ওদেরকে মুক্ত করা অপেক্ষা আমি আমার জন্য ও ওদের জন্য কোন অধিক মঙ্গল পাচ্ছি না। আমি আপনাদেরকে সাক্ষী রাখছি যে, ওরা সবাই মুক্ত।' (আহমাদ ২৬৪০১, তিরমিযী ৩১৬৫, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৮৫৮৬নং)
আর এ কথা বিদিত যে, আল্লাহ ও বান্দার মাঝের হক বিষয়ক পাপের চাইতে বান্দা ও বান্দার মাঝের হক বিষয়ক পাপ বেশি গুরুতর। হক ফিরিয়ে না দিলে অথবা ক্ষমা চেয়ে না নিলে বান্দার তওবাও কবুল হয় না। পরিশেষে শেষ বিচারের দিন নেক আমলের ভান্ডার থেকে তার খেসারত দিতে হয়।
এই জন্য সুফিয়ান সওরী বলেছেন, 'তুমি ও বান্দার মাঝের হক বিষয়ক ১টি পাপ নিয়ে আল্লাহ আয্যা অজাল্লার সাথে সাক্ষাৎ করার চাইতে তুমি ও তাঁর মাঝের হক বিষয়ক ৭০টি পাপ নিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করা অধিক সহজ।' (কুরতুবীর তাযকিরাহ ৪০৯পৃঃ)

এগারোঃ মুজাহিদের পরিবারে খিয়ানত করা
পুরুষকে অনেক সময় ঘর ছেড়ে বাইরে যেতে হয় পড়াশোনা বা রুযী-রোযগারের জন্য, যেতে হয় দাওয়াত বা জিহাদের কাজে দূর থেকে বহু দূরে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোন ব্যক্তিকে তার স্ত্রী-পরিজনের দায়িত্ব দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, রক্ষকই ভক্ষক হয়, বেড়াই খেত খায়। বাহিরের মুসাফির যেন বিড়ালকে মাছ বাছতে দিয়ে সফরে যায়। আল্লাহর পরে সে যার উপর ভরসা করেছিল, সেই তার সর্বনাশ করে। অনেক সময় তা প্রকাশ পায়, অধিকাংশ সময় মান-সম্মান বজায় রাখার তাকীদে চাপা রাখা হয়।
এটা এক প্রকার খিয়ানত। আর এ খিয়ানতের খেসারত দিতে হবে কিয়ামতে নেক আমলের নেকী দিয়ে। মহানবী ﷺ বলেছেন,
حُرْمَةُ نِسَاءِ الْمُجَاهِدِينَ عَلَى الْقَاعِدِينَ كَحُرْمَةِ أُمَّهَاتِهِمْ وَمَا مِنْ رَجُلٍ مِنَ الْقَاعِدِينَ يَخْلُفُ رَجُلاً مِنَ الْمُجَاهِدِينَ فى أَهْلِهِ فَيَخُونُهُ فِيهِمْ إِلَّا وُقِفَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيَأْخُذُ مِنْ عَمَلِهِ مَا شَاءَ فَمَا ظَنُّكُمْ ..
"যারা জিহাদে না গিয়ে ঘরে থাকে তাদের পক্ষে মুজাহিদগণের স্ত্রীরা তাদের মায়ের মতো অবৈধ। যারা ঘরে থাকে তাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি যখন কোন মুজাহিদের পরিবারে তার প্রতিনিধিত্ব (তত্ত্বাবধান) করে অতঃপর তাদের ব্যাপারে তার খেয়ানত (বিশ্বাসঘাতকতা) করে, সে ব্যক্তিকে কিয়ামতের দিন ঐ মুজাহিদের সামনে খাড়া করা হবে, অতঃপর সে (মুজাহিদ) নিজের ইচ্ছা ও খুশীমত তার আমল (এর নেকী) সমূহ নিতে পারবে। অতএব কী ধারণা তোমাদের?" (তার কোন নেকী আর অবশিষ্ট থাকবে কি?) (মুসলিম ৫০১৭-৫০১৯, আবু দাউদ ২৪৯৬নং, নাসাঈ)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00