📄 যে অপরাধে অপরাধী আল্লাহ, তদীয় রসূল, ফিরিশতা অথবা মানুষ কর্তৃক অভিশপ্ত
১। অহংকারী শয়তান আল্লাহর কাছে অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ শয়তানকে বলেছিলেন,
{فَاخْرُجْ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَجِيمٌ (٣٤) وَإِنَّ عَلَيْكَ اللَّعْنَةَ إِلَى يَوْمِ الدِّينِ} (٣٥) الحجر
'তাহলে তুমি এখান হতে বের হয়ে যাও। কারণ, নিশ্চয়ই তুমি অভিশপ্ত। কর্মফল দিবস পর্যন্ত তোমার প্রতি রইল অভিশাপ।' (হিঃ ৩৪-৩৫)
{فَاخْرُجْ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَجِيمٌ (۷۷) وَإِنَّ عَلَيْكَ لَعْنَتِي إِلَى يَوْمِ الدِّينِ} (۷۸) ص
"তুমি এখান (জান্নাত) হতে বের হয়ে যাও নিশ্চয়ই তুমি বিতাড়িত এবং তোমার উপর আমার চিরস্থায়ীভাবে লানত কিয়ামত পর্যন্ত।" (সূরা সোয়াদ ৭৭-৭৮)
{لَعَنَهُ اللَّهُ وَقَالَ لَأَتَّخِذَنَّ مِنْ عِبَادِكَ نَصِيبًا مَفْرُوضًا} (۱۱۸) سورة النساء
"আল্লাহ তাকে (শয়তানকে) অভিসম্পাত করেছেন এবং সে (শয়তান) বলেছে, 'আমি তোমার দাসদের এক নির্দিষ্ট অংশকে (নিজের দলে) গ্রহণ করবই।" (নিসাঃ ১১৮)
২। যারা কাফের, তারা অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ বলেন,
{إِنَّ اللَّهَ لَعَنَ الْكَافِرِينَ وَأَعَدَّ لَهُمْ سَعِيرًا} (٦٤) سورة الأحزاب
"নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদের উপর অভিশাপ করেছেন। আর তাদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছেন।" (সূরা আহযাব ৬৪ আয়াত)
{إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَمَاتُوا وَهُمْ كُفَّارٌ أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ لَعْنَةُ اللهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ}
"যারা অবিশ্বাস করেছে ও অবিশ্বাসী অবস্থায় মরেছে, নিশ্চয় তাদের উপর আল্লাহর, ফিরিস্তাগণের ও মানবমন্ডলীর অভিসম্পাত।" (বাক্বারাহঃ ১৬১)
{ وَقَالُوا قُلُوبُنَا غُلْفٌ بَل لَّعَنَهُمُ اللهُ بِكُفْرِهِمْ فَقَلِيلاً مَّا يُؤْمِنُونَ} (۸۸) سورة البقرة
"তারা বলেছিল, আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত। বরং (কুফরী) সত্য প্রত্যাখ্যানের জন্য আল্লাহ তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন। সুতরাং তাদের অল্প সংখ্যকই বিশ্বাস করে (ঈমান আনে)।" (বাক্বারাহঃ ৮৮)
مِّنَ الَّذِينَ هَادُوا يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَن مَّوَاضِعِهِ وَيَقُولُونَ سَمِعْنَا وَعَصَيْنَا وَاسْمَعْ غَيْرَ مُسْمَعٍ وَرَاعِنَا لَيًّا بِأَلْسِنَتِهِمْ وَطَعْنَا فِي الدِّينِ وَلَوْ أَنَّهُمْ قَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَاسْمَعْ وَانظُرْنَا لَكَانَ خَيْرًا لَّهُمْ وَأَقْوَمَ وَلَكِن لَّعَنَهُمُ اللهُ بِكُفْرِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُونَ إِلَّا قَلِيلًا} (٤٦)
"ইয়াহুদীদের কিছু লোক (তাওরাতের) বাক্যাবলী বিকৃত করে এবং (মুহাম্মাদকে) বলে, 'আমরা (তোমার কথা) শুনলাম ও অমান্য করলাম' এবং 'শোন! তোমার কথা যেন শোনা না হয়।' আর নিজেদের জিহ্বা কুঞ্চিত করে এবং ধর্মের প্রতি তাচ্ছিল্য করে বলে, 'রায়িনা'। কিন্তু তারা যদি বলত, 'শুনলাম ও মান্য করলাম' এবং 'শোন ও উনযুরনা (আমাদের খেয়াল কর)' তবে তা তাদের জন্য উত্তম ও সুসঙ্গত হত। কিন্তু তাদের অবিশ্বাসের জন্য আল্লাহ তাদেরকে অভিসম্পাত করেছেন। অতএব, তাদের অল্পসংখক লোকই বিশ্বাস করবে।" (নিসাঃ ৪৬)
{قُلْ هَلْ أُنَبِّئُكُم بِشَرٌ مِّن ذَلِكَ مَثُوبَةً عِندَ اللهِ مَن لَّعَنَهُ اللَّهُ وَغَضِبَ عَلَيْهِ وَجَعَلَ مِنْهُمُ الْقِرَدَةَ وَالْخَنَازِيرَ وَعَبَدَ الطَّاغُوتَ أُوْلَئِكَ شَرٌّ مَّكَاناً وَأَضَلُّ عَن سَوَاءِ السَّبِيلِ}
"বল, 'আমি কি তোমাদেরকে এ অপেক্ষা নিকৃষ্ট পরিণামের সংবাদ দেব, যা আল্লাহর নিকট আছে? যাকে আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন, যার উপর তিনি ক্রোধান্বিত, যাদের কতককে তিনি বানর ও কতককে শূকর বানিয়েছেন এবং যারা তাগূত (গায়রুল্লাহ)র উপাসনা করে, মর্যাদায় তারাই নিকৃষ্ট এবং সরল পথ হতে সর্বাধিক বিচ্যুত।" (মায়িদাহঃ ৬০)
{وَلَمَّا جَاءَهُمْ كِتَابٌ مِّنْ عِندِ اللهِ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا مِن قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَهُم مَّا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ فَلَعْنَةُ اللَّه عَلَى الْكَافِرِينَ} (৮৯) البقرة
“তাদের নিকট যা আছে আল্লাহর নিকট হতে তার সমর্থক কিতাব এল; যদিও পূর্বে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে তারা এর (এই কিতাব সহ নবীর) সাহায্যে বিজয় কামনা করত, তবুও তারা যা জ্ঞাত ছিল তা (সেই কিতাব নিয়ে নবী) যখন তাদের নিকট এল, তখন তারা তা অস্বীকার করে বসল। সুতরাং অবিশ্বাসীদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ হোক।” (বাক্বারাহঃ ৮৯)
{ وَقَالَتِ الْيَهُودُ يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ غُلَّتْ أَيْدِيهِمْ وَلُعِنُوا بِمَا قَالُوا بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ يُنفِقُ كَيْفَ يَشَاء) (৬৪) سورة المائدة
"ইয়াহুদীরা বলে, 'আল্লাহর হাত সংকুচিত।' তাদের হাত সংকুচিত হোক এবং তারা যা বলে, তার জন্য তারা অভিশপ্ত হোক। বরং আল্লাহর উভয় হস্তই মুক্ত, যেভাবে ইচ্ছা তিনি দান ক'রে থাকেন।" (মায়িদাহঃ ৬৪)
৩। যারা মুনাফিক (কপট) মুসলমান, তারা অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ বলেন,
{كَيْفَ يَهْدِي اللَّهُ قَوْماً كَفَرُوا بَعْدَ إِيمَانِهِمْ وَشَهِدُوا أَنَّ الرَّسُولَ حَقٌّ وَجَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ (৮৬) أُوْلَئِكَ جَزَاؤُهُمْ أَنَّ عَلَيْهِمْ لَعْنَةَ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ (۸۷) خَالِدِينَ فِيهَا لَا يُخَفَّفُ عَنْهُمُ الْعَذَابُ وَلَا هُمْ يُنْظَرُونَ} (৮৮)
"বিশ্বাসের পর ও রসূলকে সত্য বলে সাক্ষ্যদান করার পর এবং তাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শন আসার পর যে সম্প্রদায় সত্য প্রত্যাখ্যান করে, (সে সম্প্রদায়কে) আল্লাহ কীরূপে সৎপথ প্রদর্শন করবেন? আল্লাহ সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না। এ সকল লোকের প্রতিফল এই যে, এদের উপর আল্লাহ, ফিরিস্তাগণ এবং সকল মানুষের অভিশাপ! তারা (নরকে) স্থায়ী হবে, তাদের শাস্তি লঘু করা হবে না এবং তাদের বিরামও দেওয়া হবে না।" (আলে ইমরান: ৮৬-৮৮)
{لَئِن لَّمْ يَنتَهِ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ وَالْمُرْجِفُونَ فِي الْمَدِينَةِ لَتُغْرِيَنَّكَ بِهِمْ ثُمَّ لَا يُجَاوِرُونَكَ فِيهَا إِلَّا قَلِيلًا (৬০) مَلْعُونِينَ أَيْنَمَا ثُقِفُوا أُخِذُوا وَقُتِلُوا تَقْتِيلًا} (৬১)
"মুনাফিক (কপটাচারি) গণ এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে এবং যারা নগরে গুজব রটনা করে তারা বিরত না হলে আমি নিশ্চয়ই তাদের বিরুদ্ধে তোমাকে প্রবল করব, এরপর তারা এ নগরীতে অল্প দিনই তোমার প্রতিবেশীরূপে থাকবে---অভিশপ্ত হয়ে; ওদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই ধরা হবে এবং নির্দয়ভাবে হত্যা করা হবে।" (আহযাবঃ ৬০-৬১)
{وَعَدَ اللَّهُ الْمُنَافِقِينَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْكُفَّارَ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا هِيَ حَسْبُهُمْ وَلَعَنَهُمُ اللَّهُ وَلَهُمْ عَذَابٌ مُّقِيمٌ} (٦٨) سورة التوبة
"আল্লাহ মুনাফিক নর-নারী ও কাফেরদেরকে জাহান্নামের আগুনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেখানে ওরা চিরকাল থাকবে। এটিই ওদের জন্য যথেষ্ট, আল্লাহ ওদেরকে অভিসম্পাত করেছেন এবং ওদের জন্য আছে চিরস্থায়ী শাস্তি।" (সূরা তাওবাহ ৬৮ আয়াত)
{وَيُعَذِّبَ الْمُنَافِقِينَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْمُشْرِكِينَ وَالْمُشْرِكَاتِ الظَّانِّينَ بِاللَّهِ ظَنَّ السَّوْءِ عَلَيْهِمْ دَائِرَةُ السَّوْءِ وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَلَعَنَهُمْ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا } (٦)
"কপট (মুনাফেক) পুরুষ ও কপট নারী, অংশীবাদী (মুশরিক) পুরুষ ও অংশীবাদী নারী, যারা আল্লাহ সম্বন্ধে মন্দ ধারণা পোষণ করে, তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন। অমঙ্গল চক্র রয়েছে তাদের জন্য, আল্লাহ তাদের প্রতি রুষ্ট হয়েছেন, তাদেরকে অভিশপ্ত করেছেন এবং তাদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছেন; আর ওটা নিকৃষ্ট আবাস!" (ফাতহঃ ৬)
৪। যারা আল্লাহর আয়াত (নিদর্শন) অস্বীকার করে, রাসূলকে অমান্য করে এবং প্রত্যেক উদ্ধত স্বৈরাচারীর নির্দেশ অনুসরণ করে তারা ইহ-পরকালে অভিশপ্ত। মহান আল্লাহ বলেন,
وَتِلْكَ عَادٌ جَحَدُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ وَعَصَوْا رُسُلَهُ وَاتَّبَعُوا أَمْرَ كُلِّ جَبَّارٍ عَنِيدٍ (٥٩) وَأَتْبَعُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا لَعْنَةً وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ أَلا إِنَّ عَاداً كَفَرُوا رَبَّهُمْ أَلَا بُعْداً لِعَادٍ قَوْمٍ هُودٍ} (٦٠)
"এই আ'দ সম্প্রদায় নিজেদের প্রতিপালকের নিদর্শনগুলিকে অস্বীকার করল এবং তাঁর রসূলদেরকে অমান্য করল, পক্ষান্তরে তারা প্রবল প্রতাপশালী হঠকারীদের নির্দেশ অনুসরণ করল। আর এই দুনিয়াতে অভিসম্পাত তাদের সঙ্গে সঙ্গে রইল এবং কিয়ামতের দিনও। জেনে রেখো! আ'দ (সম্প্রদায়) নিজ প্রতিপালককে অমান্য করল। আরো জেনে রেখো, দূর হয়ে গেল আ'দ (আল্লাহর করুণা হতে); যারা হৃদের সম্প্রদায় ছিল।" (হৃদঃ ৫৯-৬০)
৫। ফিরআউন ও তার সাঙ্গপাঙ্গ অভিশপ্তঃ
{وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِآيَاتِنَا وَسُلْطَانٍ مُبِينٍ (٩٦) إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَئِهِ فَاتَّبَعُوا أَمْرَ فِرْعَوْنَ وَمَا أَمْرُ فِرْعَوْنَ بِرَشِيدٍ (۹۷) يَقْدُمُ قَوْمَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَأَوْرَدَهُمْ النَّارَ وَبِئْسَ الْوِرْدُ الْمَوْرُودُ (۹۸) وَأَتْبَعُوا فِي هَذِهِ لَعْنَةً وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ بِئْسَ الرِّفْدُ الْمَرْفُودُ} (۹۹) هود
"আমি মূসাকে প্রেরণ করলাম আমার নিদর্শনাবলী ও সুস্পষ্ট প্রমাণ সহকারে। ফিরআউন ও তার প্রধানবর্গের নিকট, তারা ফিরআউনের নির্দেশ মেনে চলতে লাগল অথচ ফিরাউনের নির্দেশ মোটেই সঠিক ছিল না। কিয়ামতের দিন সে নিজ সম্প্রদায়ের অগ্রভাগে থাকবে, অতঃপর তাদেরকে উপনীত করবে দোযখে। আর তা অতি নিকৃষ্ট স্থান যাতে তারা উপনীত হবে। আর অভিশাপ তাদের সাথে সাথে রইল এই দুনিয়াতে এবং কিয়ামত দিবসেও। তা হল নিকৃষ্ট পুরস্কার, যা তাদেরকে দেওয়া হবে।" (হৃদঃ ৯৬-৯৯)
৬। প্রত্যেক সীমালংঘনকারী ও অত্যাচারী ব্যক্তি অভিশপ্ত। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَنَادَى أَصْحَابُ الْجَنَّةِ أَصْحَابَ النَّارِ أَن قَدْ وَجَدْنَا مَا وَعَدَنَا رَبُّنَا حَقًّا فَهَلْ وَجَدتُّم مَّا وَعَدَ رَبُّكُمْ حَقًّا قَالُواْ نَعَمْ فَأَذَنَ مُؤَذِّنٌ بَيْنَهُمْ أَن لَّعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ}
"বেহেস্তবাসীরা দোযখবাসীদেরকে আহবান ক'রে বলবে, 'আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমরা তা সত্য পেয়েছি, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তোমরা তা সত্য পেয়েছ কি?' ওরা বলবে, 'হ্যাঁ।' অতঃপর জনৈক ঘোষণাকারী তাদের নিকট ঘোষণা করবে, 'অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত।" (আ'রাফঃ ৪৪)
{وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أُوْلَئِكَ يُعْرَضُونَ عَلَى رَبِّهِمْ وَيَقُولُ الْأَشْهَادُ هَؤُلاء الَّذِينَ كَذَّبُوا عَلَى رَبِّهِمْ أَلَا لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الظَّالِمِينَ} (۱۸) سورة هود
"ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক অত্যাচারী কে হবে, যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে? ঐ লোকদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে পেশ করা হবে এবং সাক্ষী (ফিরিশতা)গণ বলবে, 'এরা ঐ লোক যারা নিজেদের প্রতিপালক সম্বন্ধে মিথ্যা বলেছিল। জেনে রেখো, এমন অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর অভিশাপ।" (হ্রদঃ ১৮)
{يَوْمَ لَا يَنفَعُ الظَّالِمِينَ مَعْذِرَتُهُمْ وَلَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ} (٥٢) سورة غافر
"যেদিন সীমালংঘনকারীদের ওজর-আপত্তি কোন কাজে আসবে না, ওদের জন্য রয়েছে অভিশাপ এবং ওদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট আবাস।" (মু'মিনঃ ৫২)
৭। যারা হিলা-বাহানা ক'রে আল্লাহর বিধান লংঘন করে, চালাকি ক'রে তাঁর নির্দেশ অমান্য করে তারা অভিশপ্ত। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ آمِنُوا بِمَا نَزَّلْنَا مُصَدِّقًا لِّمَا مَعَكُم مِّن قَبْلِ أَن نَّطْمِسَ وُجُوهَا فَتَرُدَّهَا عَلَى أَدْبَارِهَا أَوْ تَلْعَنَهُمْ كَمَا لَعَنَّا أَصْحَابَ السَّبْتِ وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولاً }
"হে গ্রন্থধারিগণ! তোমরা তোমাদের নিকট যা আছে তার সমর্থনরূপে আমি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে বিশ্বাস স্থাপন কর, এর পূর্বে যে, আমি বহু লোকের মুখমন্ডল বিকৃত করে পিছনের দিকে ফিরিয়ে দেব অথবা শনিবার অমান্যকারীদেরকে যেরূপ অভিসম্পাত করেছিলাম, সেরূপ তাদেরকে অভিসম্পাত করব। বস্তুতঃ আল্লাহর আদেশ কার্যকর হয়েই থাকে।" (নিসাঃ ৪৭)
৮। খুনী লোক অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا } (৯৩) সূরা নিসা
"আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করবে তার শাস্তি হল জাহান্নাম। তন্মধ্যে সে চিরকাল থাকবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রাগান্বিত হবেন ও তাকে অভিসম্পাত করবেন। আর তার জন্য ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত করে রাখবেন।" (সূরা নিসা ৯৩ আয়াত)
৯। আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকার করার তা ভঙ্গকারীঃ
১০। আত্মীয়তার বন্ধন ছেদনকারী:
১১। সন্ত্রাসী ও শান্ত পরিবেশে ফাসাদ সৃষ্টিকারী অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَبِمَا نَقْضِهِم مِّيثَاقَهُمْ لَعَنَّاهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قَاسِيَةً} (১৩) সূরা মায়িদাহ
"তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের দরুন আমি তাদেরকে অভিসম্পাত করেছি ও তাদের হৃদয় কঠোর ক'রে দিয়েছি।" (মায়িদাহঃ ১৩)
وَالَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللهِ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ في الأَرْضِ أُوْلَئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ} (২৫) سورة الرعد
"যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকার করার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখার আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের জন্য রয়েছে (আল্লাহর) অভিসম্পাত। আর তাদের জন্য আছে মন্দ আবাস।" (সূরা রা'দ ২৫ আয়াত)
{فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ (۲۲) أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَأَعْمَى أَبْصَارَهُمْ} (۲۳) سورة محمد
"ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবতঃ তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। আল্লাহ এদেরকেই করেন অভিশাপ, আর করেন বধির ও অন্ধ।" (সূরা মুহাম্মাদ ২২-২৩ আয়াত)
১২। যারা কথায় বা কাজে আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে কষ্ট দেয়, তারা অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُّهِينًا }
"যারা আল্লাহ ও তদীয় রসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত করেন এবং তাদের জন্য লাঞ্ছনাকর শাস্তি রয়েছে।" (সূরা আহযাব ৫৭ আয়াত)
১৩। ইল্ম ও শরীয়তের জ্ঞান গোপনকারী অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَى مِن بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ أُولَئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ } (١٥٩) سورة البقرة
"আমি যেসব উজ্জ্বল নিদর্শন ও পথ-নির্দেশ অবতীর্ণ করেছি, আমি ঐসবগুলোকে সর্বসাধারণের নিকট প্রকাশ করার পরও যারা ঐসব বিষয়কে গোপন করে আল্লাহ তাদেরকে অভিসম্পাত করেন এবং অভিসম্পাতকারীরাও তাদেরকে অভিসম্পাত ক'রে থাকে।" (সূরা বাক্বারাহ ১৫৯ আয়াত)
১৪। যারা অপরের চরিত্রে মিথ্যা কলঙ্ক ও অপবাদ দেয়, তারা অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ} (۲۳) سورة النور
"যারা সাধুী, সরলমনা ও বিশ্বাসী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে তারা দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।" (নূর ২৩)
১৫। যারা রসূলের পথ অপেক্ষা অন্য পথকে উত্তম মনে করে, তারা অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{لُعِنَ الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِنْ الْكِتَابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ وَيَقُولُونَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا هَؤُلَاءِ أَهْدَى مِنْ الَّذِينَ آمَنُوا سَبِيلاً (٥١) أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ وَمَن يَلْعَنِ اللَّهُ فَلَن تَجِدَ لَهُ نَصِيرًا } (٥٢) سورة النساء
“তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যাদেরকে কিতাবের এক অংশ দেওয়া হয়েছিল? তারা জিব্ত (শয়তান, শির্ক, যাদু প্রভৃতি) ও তাগূত (বাতিল উপাস্যে) বিশ্বাস করে এবং অবিশ্বাসী (কাফের)দের সম্বন্ধে বলে যে, এদের পথ বিশ্বাসী (মুমিন)দের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর। এরাই তো তারা, যাদেরকে আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন। আর আল্লাহ যাকে অভিসম্পাত করেন, তুমি কখনো তার জন্য কোন সাহায্যকারী পাবে না।” (নিসাঃ ৫১-৫২)
১৬। যারা অবাধ্য ও সীমালংঘনকারী। যারা গর্হিত কাজ করা দেখেও একে অন্যকে বারণ করে না, তারা অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُدَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنْكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ، كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنْكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ } [ المائدة : ۷۸-۷۹]
অর্থাৎ, বনী ইস্রাঈলের মধ্যে যারা অবিশ্বাস করেছিল তারা দাউদ ও মারয়্যাম-তনয় কর্তৃক অভিশপ্ত হয়েছিল। কেননা, তারা ছিল অবাধ্য ও সীমালংঘনকারী। তারা যেসব গর্হিত কাজ করত তা থেকে তারা একে অন্যকে বারণ করত না। তারা যা করত নিশ্চয় তা নিকৃষ্ট। (সূরা মায়েদাহ ৭৮-৭৯ আয়াত)
১৭। সুদখোর, সূদদাতা ও তার যে কোন প্রকারে সহায়ক ব্যক্তি অভিশপ্তঃ
১৮। যাকাত আদায়ে অনিচ্ছুক ও টাল-বাহানাকারী ব্যক্তি অভিশপ্তঃ আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেছেন,
آكِلُ الرِّبَا وَمُؤْكِلُهُ وَشَاهِدَاهُ إِذَا عَلِمَاهُ وَالْوَاشِمَةُ وَالْمُؤْتَشِمَةُ وَلَاوَى الصَّدَقَةِ وَالْمُرْتَدُّ أَعْرَابِيًّا بَعْدَ الْهَجْرَةِ مَلْعُوثُونَ عَلَى لِسَانٍ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم.
“সুদখোর, সুদদাতা, সুদের কারবার জেনেও তার দুই সাক্ষ্যদাতা, কোন অঙ্গ দেগে নকশা করে দেয় এবং করায় এমন মহিলা, যাকাত আদায়ে অনিচ্ছুক ও টালবাহানাকারী ব্যক্তি এবং হিজরতের পর মরুবাসী হয়ে ধর্মত্যাগী ব্যক্তি কিয়ামতের দিন মুহাম্মাদ এর মুখে অভিশপ্ত।” (আহমদ ৩৮৮১, নাসাঈ ৫১০২, ইবনে খুযাইমা ২২৫০, আবু য়্যা'লা ৫২৪১, ইবনে হিব্বান ৩২৫২, বাইহাক্বী ১৮২৪৭, সহীহ তারগীব ৭৫৭নং)
আল্লাহর রসূল সুদখোর, সুদদাতা, সূদের লেখক এবং তার উভয় সাক্ষীদ্বয়কে অভিশাপ করেছেন এবং বলেছেন, "ওরা সকলেই সমান।" (মুসলিম ১৫৯৭ নং)
১৯। পরের মাল চুরি করে যে, সে চোর অভিশপ্তঃ রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
لَعَنَ اللَّهُ السَّارِقَ يَسْرِقُ الْبَيْضَةَ فَتُقْطَعُ يَدُهُ وَيَسْرِقُ الْحَبْلَ فَتُقْطَعُ يَدُهُ ..
"আল্লাহ চোরকে অভিশপ্ত করুন; সে ডিম (অথবা হেলমেট) চুরি করে, ফলে তার হাত কাটা যায় এবং রশি চুরি করে, ফলে তার হাত কাটা যায়।" (বুখারী ৬৭৮৩, ৬৭৯৯, মুসলিম ৪৫০৩নং)
২০। যে ব্যক্তি কবরের লাশ বা কাফন চুরি করে, সে অভিশপ্তঃ মহানবী বলেছেন,
((لَعَنَ اللَّهُ الْمُخْتَفِيَ وَالْمُخْتَفِيَةَ)).
"আল্লাহ কবর-চোর ও চোরনীকে অভিশাপ করুন।" (বাইহাক্বী, সঃ জামে' ৫১০২নং)
২১। মাতাল ও মদ প্রস্তুতকারক তথা তার যে কোন প্রকারে সহায়ক ব্যক্তি অভিশপ্তঃ মহানবী বলেছেন,
لَعَنَ اللَّهُ الْخَمْرَ وَشَارِبَهَا وَسَاقِيَهَا وَبَائِعَهَا وَمُبْتَاعَهَا وَعَاصِرَهَا وَمُعْتَصِرَهَا وَحَامِلَهَا وَالْمَحْمُولَةَ إِلَيْهِ ..
"মদ পানকারীকে, মদ পরিবেশনকারীকে, তার ক্রেতা ও বিক্রেতাকে, তার প্রস্তুতকারককে, যার জন্য প্রস্তুত করা হয় তাকে, তার বাহককে ও যার জন্য বহন করা হয় তাকে আল্লাহ অভিশাপ করেছেন।" (আবু দাউদ ৩৬৭৪, ইবনে মাজাহ ৩৩৮০নং) ইবনে মাজার বর্ণনায় আছে, "তার মূল্য ভক্ষণকারীও (অভিশপ্ত)।" (সহীহুল জামে' ৫০৯১নং)
আনাস বিন মালেক বলেন, "মদের সাথে সম্পৃক্ত দশ প্রকার মানুষের উপর রাসূলুল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন। তার প্রস্তুতকারীর উপর, যে প্রস্তুত করায় তার উপর, তার পানকারীর উপর, যে তা বয়ে নিয়ে যায় তার উপর, যার জন্য বয়ে নিয়ে যায় তার উপর, যে পান করায় তার উপর, যে তা বিক্রি করে তার উপর, যে (বিক্রি ক’রে) তার অর্থ খায় তার উপর এবং যে ক্রয় করে ও যার জন্য ক্রয় করা হয় তাদের উপর।" (সুনানে তিরমিযী ১২৯৫, ইবনে মাজাহ ৩৩৮১, ত্বাবারানীর আওসাত্ব ১৩৫৫নং)
২২। যে ব্যক্তি জমি-জায়গার চিহ্ন সরিয়ে নিজের অংশ বেশী করেঃ
২৩। যে ব্যক্তি নিজের মা-বাপকে অভিশাপ দেয়ঃ
২৪। যে ব্যক্তি কোন মূর্তি বা মাজারের উদ্দেশ্যে মুরগী-খাঁসী বা অন্য কিছু যবাই করেঃ
২৫। যে ব্যক্তি কোন ফাসাদ সৃষ্টিকারী বা বিদআতীকে আশ্রয় দেয়, এরা সকলে অভিশপ্তঃ
আবুত তুফাইল বলেন, আলী -কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'আল্লাহর রসূল কি আপনাদেরকে কোন বিশেষ জ্ঞান দান ক'রে গেছেন?' উত্তরে তিনি বললেন, 'তিনি আমাদেরকে বিশেষ কোন জ্ঞান দিয়ে যাননি, যা সাধারণ লোকে জানে না। তবে আমার এই তরবারির খাপে যা আছে, (তা হতে পারে।)' অতঃপর তিনি খাপ থেকে একটি লিখিত কাগজ বের করলেন। তাতে লিখা ছিল,
لَعَنَ اللَّهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللَّهِ وَلَعَنَ اللَّهُ مَنْ سَرَقَ مَنَارَ الأَرْضِ وَلَعَنَ اللَّهُ مَنْ لَعَنَ وَالِدَهُ وَلَعَنَ اللَّهُ مَنْ آوَى مُحْدِثًا ..
"আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে অভিশাপ করুন, যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে যবেহ করে। আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে অভিশাপ করুন, যে ব্যক্তি জমি-জায়গার চিহ্ন সরিয়ে ফেলে। আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে অভিশাপ করুন, যে ব্যক্তি বিদআতীকে আশ্রয় দেয়।" (মুসলিম ৫২৪১নং)
২৬। যে ব্যক্তি মদীনায় অশান্তি বা বিদআত সৃষ্টি করে এবং তার বাসিন্দাকে সন্ত্রস্ত করে, সে অভিশপ্তঃ
ইয়াযীদ ইবনে শারীক ইবনে তারেক হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আলী -কে মিম্বরের উপর খুতবা দিতে দেখেছি এবং তাকে এ কথা বলতে শুনেছি যে, 'আল্লাহর কসম! আল্লাহর কিতাব ব্যতীত আমাদের কাছে আর কোন কিতাব নেই। যা আমরা পাঠ করতে পারি। তবে এ লিপিখানা আছে।' এরপর তা তিনি খুলে দিলেন। দেখা গেল তাতে (রক্তপণে প্রদেয়) উটের বয়স ও বিভিন্ন যখমের দণ্ডবিধি লিপিবদ্ধ আছে। তাতে আরো লিপিবদ্ধ আছে যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
(( الْمَدِينَةُ حَرَمُ مَا بَيْنَ غَيْرِ إِلَى ثَوْرِ ، فَمَنْ أَحْدَثَ فِيهَا حَدَثاً ، أَوْ آوَى مُحْدِثاً ، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لَا يَقْبَلُ اللهُ مِنْهُ يَومَ القِيَامَةِ صَرْفاً وَلَا عَدْلاً ذِمَّةُ الْمُسْلِمِينَ وَاحِدَةٌ ، يَسْعَى بِهَا أَدْنَاهُمْ ، فَمَنْ أَخْفَرَ مُسْلِماً ، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لَا يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْهُ يَومَ القِيَامَةِ صَرْفاً وَلَا عَدْلاً . وَمَن ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ ، أو انْتَمَى إِلَى غَيْرِ مَوَالِيهِ ، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ وَالمَلائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لَا يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْهُ يَومَ القِيَامَةِ صَرْفاً وَلَا عَدْلاً )) . متفق عَلَيْهِ
"আইর থেকে সওর পর্যন্ত মদীনার হারাম-সীমা। এখানে যে ব্যক্তি (ধর্মীয় বিষয়ে) অভিনব কিছু (বিদআত) রচনা করবে বা বিদআতীকে আশ্রয় দেবে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশাদল এবং সকল মানুষের অভিশাপ। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না। সমস্ত মুসলিমদের প্রতিশ্রুতি ও নিরাপত্তাদানের মর্যাদা এক। তাদের কোন নিম্নশ্রেণীর মুসলিম (কাউকে আশ্রয় প্রদানের) কাজ করতে পারে। সুতরাং যে ব্যক্তি মুসলিমের ঐ কাজকে বানচাল করে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিস্তা ও সকল মানুষের লানত। কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না। আর যে ব্যক্তি প্রকৃত বাপ ছাড়া অন্যকে বাপ বলে দাবী করে বা প্রকৃত মনিব ছাড়া অন্য মনিবের সাথে সম্বন্ধ জুড়ে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিস্তা ও সমস্ত মানুষের অভিশাপ। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত গ্রহণ করবেন না।" (বুখারী ৬৭৫৫, মুসলিম ৩৩৯৩, ৩৮৬৭নং)
তিনি আরো বলেছেন,
((اللَّهُمَّ مَنْ ظَلَمَ أَهْلَ الْمَدِينَةِ وَأَخَافَهُمْ ، فَأَخِفْهُمْ ، وَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ، وَالْمَلَائِكَةِ، وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ، لَا يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْهُ صَرْفًا وَلَا عَدْلًا)).
"হে আল্লাহ! যে ব্যক্তি মদীনাবাসীদের প্রতি অত্যাচার করে এবং তাদেরকে সন্ত্রস্ত করে, তুমি তাকে সন্ত্রস্ত কর। আর তার উপর আল্লাহ, ফিরিশামন্ডলী এবং সমগ্র মানবমন্ডলীর অভিশাপ। তার নিকট থেকে নফল-ফরয কোন ইবাদতই কবুল করা হবে না।" (ত্বাবারানীর কাবীর ৬৪৯৮, সিঃ সহীহাহ ৩৫১নং)
২৭। যে ব্যক্তি কোন দন্ডবিধি কায়েম করতে বাধা সৃষ্টি করে, সে অভিশপ্তঃ
মহানবী বলেছেন,
..... وَمَنْ قُتِلَ عَمْدًا فَقَوْدُ يَدَيْهِ فَمَنْ حَالَ بَيْنَهُ وَبَيْنَهُ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ..
"---আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত (খুনী দ্বারা) খুন হবে, সেই খুনীকে খুনের বদলে খুন করা হবে। অতঃপর যে ব্যক্তি খুনী ও দন্ডের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিস্তা ও সকল মানুষের অভিশাপ।" (আবু দাউদ ৪৫৯৩, সহীহ নাসাঈ ৪৪৫৬, সহীহ ইবনে মাজাহ ২২১১নং)
২৮। যে শাসক শাসনে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখে না, সে অভিশপ্তঃ মহানবী বলেছেন,
((إِنَّ هَذَا الْأَمْرَ فِي قُرَيْشٍ مَا دَامُوا إِذَا اسْتُرْحِمُوا رَحِمُوا وَإِذَا حَكَمُوا عَدَلُوا وَإِذَا قَسَمُوا أَقْسَطُوا فَمَنْ لَمْ يَفْعَلْ ذَلِكَ مِنْهُمْ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ لَا يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَلَا عَدْلٌ).
"এই নেতৃত্ব থাকবে কুরাইশদের মাঝে। যতক্ষণ তাদের কাছে দয়া ভিক্ষা করা হলে তারা দয়া করবে, বিচার করলে ইনসাফ করবে, বিতরণ করলে ন্যায়ভাবে করবে। তাদের মধ্যে যে তা করবে না, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশামন্ডলী এবং সমগ্র মানবমন্ডলীর অভিশাপ। তার নিকট থেকে নফল-ফরয কোন ইবাদতই কবুল করা হবে না।" (আহমাদ ১২৯০০, ১৯৫৪১, আবু য়্যা'লা ৪০৩২-৪০৩৩, ত্বাবারানী ৭২৪, সিঃ সহীহাহ ২৮৫৮নং)
২৯। যে ব্যক্তি কোন জ্যান্ত প্রাণীকে নিশানা বানিয়ে তীর বা বন্দুক চালানো শেখে, সে অভিশপ্তঃ ইবনে উমার হতে বর্ণিত, তিনি একবার কুরাইশ বংশের কতিপয় নবযুবকের নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময় লক্ষ্য করলেন যে, তারা একটি পাখীকে বেঁধে (হাতের নিশানা ঠিক করার মানসে তার উপর নির্দয়ভাবে) তীর মারছে। তারা পাখীর মালিকের সাথে এই চুক্তি করেছিল যে, প্রতিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট তীর তার হয়ে যাবে। সুতরাং যখন তারা ইবনে উমার-কে দেখতে পেল, তখন ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে গেল। ইবনে উমার বললেন,
مَنْ فَعَلَ هَذَا ؟ لَعَنَ اللَّهُ مَنْ فَعَلَ هَذَا ، إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ لَعَنَ مَنِ اتَّخَذَ شَيْئاً فِيهِ الرُّوحُ غرَضاً . متفق عَلَيْهِ
'এ কাজ কে করেছে? যে এ কাজ করেছে তার উপর আল্লাহর অভিশাপ। নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ সেই ব্যক্তির উপর অভিশাপ করেছেন, যে কোন এমন জিনিসকে (তার তীর-খেলার) লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে, যার মধ্যে প্রাণ আছে।' (বুখারী ৫৫১৫, মুসলিম ৫১৭৪নং)
৩০। পুরুষের বেশধারিণী নারী এবং নারীর বেশধারী পুরুষ উভয়েই অভিশপ্তঃ ইবনে আব্বাস বলেছেন,
لَعَنَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُخَنَّثِينَ مِنْ الرِّجَالِ وَالْمُتَرَجِّلَاتِ مِنْ النِّسَاءِ وَقَالَ: أَخْرِجُوهُمْ مِنْ بُيُوتِكُمْ))، قَالَ فَأَخْرَجَ النَّبِيُّ ﷺ فُلَانَا وَأَخْرَجَ عُمَرُ فُلَانَةَ.
'নবী খোজা পুরুষ এবং পুরুষসুলভ আচরণ-কারিণী নারীর উপর অভিসম্পাত করেছেন এবং বলেছেন, "তোমাদের গৃহ হতে ওদেরকে বের করে দাও।" সুতরাং নবী স্বয়ং এক খোজাকে বহিষ্কার করেছেন এবং উমার এক হিজড়ে নারীকে গৃহ হতে বহিষ্কার করেছেন।' (আহমদ ২০০৬, ২১২৩, বুখারী ৫৮৮৬নং)
ইবনে আব্বাস বলেন, আল্লাহর রসূল নারীদের বেশধারী পুরুষদেরকে এবং পুরুষ বেশধারিণী নারীদেরকে অভিশাপ করেছেন। (বুখারী ৫৮৮৫নং, আসহাবে সুনান) আল্লাহর নবী সেই পুরুষকে অভিশাপ করেছেন, যে নারীর পোশাক পরিধান করে এবং সেই নারীকে অভিশাপ করেছেন, যে পুরুষের পোশাক পরিধান করে। (আহমাদ ৮৩০৯, আবু দাউদ ৪১০০, হাকেম ৭৪১৫, সহীহুল জামে' ৫০৯৫নং)
৩১। যে মহিলা মাথায় পরচুলা (টেসেল) বাঁধে, সে অভিশপ্তাঃ আসমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, এক মহিলা নবী-এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার মেয়ে এক প্রকার চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছে। ফলে তার মাথার চুল ঝরে গেছে। আর আমি তার বিয়েও দিয়েছি। এখন কি আমি তার মাথায় পরচুলা লাগিয়ে দেব?' তিনি বললেন,
(( لَعَنَ اللَّهُ الوَاصِلَةَ وَالْمَوْصُولَةَ )) . وفي رواية : (( الوَاصِلَةَ ، والمُسْتَوْصِلَةَ )) .
"যে পরচুলা লাগিয়ে দেয় এবং যার লাগানো হয় উভয় মহিলাকে আল্লাহ অভিসম্পাত করুন বা করেছেন।" অন্য বর্ণনায় আছে, “যে মহিলা পরচুলা লাগিয়ে দেয় এবং যে লাগাতে বলে (তাদের উভয়কে আল্লাহ অভিসম্পাত করুন বা করেছেন।)” (বুখারী ৫৯৪১, মুসলিম ৫৬৮৯, ইবনে মাজাহ ১৯৮৮নং)
৩২। যে মহিলা বেপর্দা ও মাথার খোঁপা উঁচু ক'রে বাঁধে, সে অভিশপ্তাঃ
রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
((سَيَكُونُ فِي آخِرِ أُمَّتِي رِجَالٌ يَرْكَبُونَ عَلَى السُّرُوحِ كَأَشْبَاهِ الرِّجَالِ يَنْزِلُونَ عَلَى أَبْوَابِ الْمَسْجِدِ نِسَاؤُهُمْ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ عَلَى رُءُوسِهِمْ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْعِجَافِ الْعَنُوهُنَّ فَإِنَّهُنَّ مَلْعُونَاتٌ ......
"আমার শেষ যামানার উম্মতের মধ্যে কিছু এমন লোক হবে যারা ঘরের মত জিন্ (মোটর গাড়ি) তে সওয়ার হয়ে মসজিদের দরজায় দরজায় নামবে। (গাড়ি করে নামায পড়তে আসবে।) আর তাদের মহিলারা হবে অর্ধনগ্না; যাদের মাথা কৃশ উটের কুঁজের মত (খোঁপা) হবে। তোমরা তাদেরকে অভিশাপ করো। কারণ, তারা অভিশপ্তা!" (আহমাদ ৭০৮৩, ইবনে হিব্বান, ত্বাবারানী, সিঃ সহীহাহ ২৬৮নং)
৩৩। যে সকল মহিলা (হাত বা চেহারায়) দেগে নকশা করে দেয় অথবা করায়, চেহারা থেকে যারা লোম তুলে ফেলে, সৌন্দর্য আনার জন্য যারা দাঁতের মাঝে ঘসে (ফাঁক ফাঁক করে) এবং আল্লাহর সৃষ্টি-প্রকৃতিতে পরিবর্তন ঘটায় (যাতে তাঁর অনুমতি নেই), এমন সকল মহিলা অভিশপ্তা। (বুখারী ৪৮৮৬নং, মুসলিম ২১২৫নং, আসহাবে সুনান)
আবূ জুহাইফা বলেন,
إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ ثَمَن الدَّم وَثَمَنِ الْكَلْبِ وَكَسْبِ الْأَمَةِ وَلَعَنَ الْوَاشِمَةَ وَالْمُسْتَوْشِمَةَ وَآكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَلَعَنَ الْمُصَوَّرَ.
রাসূলুল্লাহ রক্ত ও কুকুরের মূল্য এবং বেশ্যা (দাসী)র উপার্জন গ্রহণ করা থেকে নিষেধ করেছেন। আর সুদখোর, সুদদাতা, চেহারা (নকশা করার জন্য) দাগে বা দাগায় এমন নারী এবং মূর্তি (বা ছবি) নির্মাতাকে অভিসম্পাত করেছেন। (বুখারী ২২৩৮নং)
একদা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বললেন,
لَعَنَ اللَّهُ الوَاشِمَاتِ وَالْمُسْتَوْشِمَاتِ وَالْمُتَنَمِّصَاتِ ، وَالْمُتَفَلَّجَاتِ لِلْحُسْنِ الْمُغَيِّرَاتِ خَلْقَ اللَّهِ.
'আল্লাহর অভিশাপ হোক সেই সব নারীদের উপর, যারা দেহাঙ্গে উলকি উৎকীর্ণ করে এবং যারা উৎকীর্ণ করায় এবং সে সব নারীদের উপর, যারা ভ্রূ চেঁছে সরু করে, যারা সৌন্দর্যের মানসে দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে পরিবর্তন আনে।' জনৈক মহিলা এ ব্যাপারে তাঁর (ইবনে মাসউদের) প্রতিবাদ করলে তিনি বললেন, 'আমি কি তাকে অভিসম্পাত করব না, যাকে আল্লাহর রসূল অভিসম্পাত করেছেন এবং তা আল্লাহর কিতাবে আছে? আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا } .
"রসূল যে বিধান তোমাদেরকে দিয়েছেন তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাক।" (সূরা হাশর ৭ আয়াত, বুখারী ৪৮৮৬নং, মুসলিম ৫৬৯৫নং, আসহাবে সুনান)
৩৪। বিপদের সময় অধৈর্য প্রকাশ ক'রে যে মহিলা অস্বাভাবিক আচরণ করে, সে অভিশপ্তাঃ আবু উমামা বলেন,
إن رسول الله ﷺ لَعَنَ الْخَامِشَةَ وَجْهَهَا وَالشَّاقَةَ جَيْبَهَا وَالدَّاعِيَةَ بِالْوَيْلِ وَالنُّبُور.
'যে নারী (কান্নার সময়) মুখমন্ডল খামচায়, বুকের কাপড় ফাড়ে এবং ধ্বংস ও সর্বনাশ ডাকে, সে নারীকে রাসূলুল্লাহ অভিশাপ করেছেন।" (ইবনে মাজাহ ১৫৮৫, ইবনে হিব্বান ৩১৫৬, সহীহুল জামে' ৫০৯২নং)
৩৫। বিপদের সময় যে উচ্চ স্বরে কান্না করে, কাপড় ছেঁড়ে বা মাথা নেড়া করে, সে অভিশপ্তঃ আবু মুসা বলেছেন,
إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَعَنَ مَنْ حَلَقَ أَوْ خَرَقَ أَوْ سَلَقَ.
'(শোকের সময়) যে ব্যক্তি মাথা নেড়া করে, কাপড় ছেঁড়ে অথবা চিৎকার ক'রে কান্না করে, তাকে রাসূলুল্লাহ অভিশাপ করেছেন।' (আহমাদ ১৯৬২৬, নাসাঈ ১৮৬৭, তাবারানী ২০৯৩৬, ইবনে হিব্বান ৩১৫৪নং)
৩৬। অধিক কবর যিয়ারতকারিণী মহিলা অভিশপ্তাঃ আবু হুরাইরা বলেন,
إن رسول الله صلى الله عليه و سلم لعن زوارات القبور.
"অধিক কবর যিয়ারতকারিণী মহিলাদেরকে আল্লাহর রসূল অভিসম্পাত করেছেন।" (তিরমিযী ১০৫৬, ইবনে মাজাহ ১৫৭৬নং, ইবনে হিব্বান, আহমাদ ২/৩৩৭, ৩৫৬)
৩৭। যারা সমকাম (পুরুষে-পুরুষে বা মহিলায়-মহিলায় যৌন-মিলন) করে, তারা অভিশপ্তঃ
((لَعَنَ اللَّهُ مَنْ عَمِلَ عَمَلَ قَوْمٍ لُوطٍ لَعَنَ اللَّهُ مَنْ عَمِلَ عَمَلَ قَوْمٍ لُوطٍ ثَلَاثًا.
"আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে অভিসম্পাত করুন, যে লুত জাতির কর্ম (সমকামিতা) করে।" এ কথা তিনি তিনবার বলেছেন। (আহমাদ ২৯১৩, নাসাঈর কুবরা ৭৩৩৭নং)
৩৮। যে পশু-সঙ্গম করে, সে অভিশপ্তঃ
রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
((مَلْعُونٌ مَنْ سَبَّ أَبَاهُ مَلْعُونٌ مَنْ سَبَّ أُمَّهُ مَلْعُونٌ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللَّهِ مَلْعُونٌ مَنْ غَيَّرَ تُخُومَ الْأَرْضِ مَلْعُونٌ مَنْ كَمَّهَ أَعْمَى عَنْ الطَّرِيقِ مَلْعُونٌ مَنْ وَقَعَ عَلَى بَهِيمَةٍ)).
"সে অভিশপ্ত, যে নিজ পিতাকে গালি দেয়, সে অভিশপ্ত, যে নিজ মাতাকে গালি দেয়, সে অভিশপ্ত, যে আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে যবেহ করে, সে অভিশপ্ত, যে জমির সীমা-চিহ্ন পরিবর্তন করে, সে অভিশপ্ত, যে অন্ধকে পথচ্যুত করে, সে অভিশপ্ত, যে পশুগমন করে।" (আহমাদ ২৯১৪, সঃ জামে' ৫৮৯১নং)
৩৯। যে ব্যক্তি স্ত্রীর পায়খানাদ্বারে সঙ্গম করে, সে অভিশপ্তঃ মহানবী বলেছেন,
مَلْعُونَ مَنْ أَتَى امْرَأَتَهُ فِي دُبُرِهَا ..
"সে ব্যক্তি অভিশপ্ত, যে তার স্ত্রীর পায়খানাদ্বারে সঙ্গম করে।" (আহমাদ ৯৭৩৩, আবু দাউদ ২১৬৪নং)
৪০। যে স্ত্রী স্বামীর যৌন আহবানে সাড়া না দিয়ে স্বামীকে রাগান্বিত ক'রে রাত্রিযাপন করে, সে অভিশপ্তঃ মহানবী বলেছেন,
(( إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فَرَاشِهِ فَلَمْ تَأْتِهِ ، فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا، لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ )). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"যদি কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে নিজ বিছানায় ডাকে এবং সে না আসে, অতঃপর সে (স্বামী) তার প্রতি রাগান্বিত অবস্থায় রাত কাটায়, তাহলে ফিরিস্তাগণ তাকে সকাল অবধি অভিসম্পাত করতে থাকেন।" অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, "যখন স্ত্রী নিজ স্বামীর বিছানা ত্যাগ করে (অন্যত্র) রাত্রিযাপন করে, তখন ফিরিশাবর্গ সকাল পর্যন্ত তাকে অভিশাপ দিতে থাকেন।" আর এক বর্ণনায় আছে যে, "সেই আল্লাহর কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! কোন স্বামী তার স্ত্রীকে নিজ বিছানার দিকে আহবান করার পর সে আসতে অস্বীকার করলে যিনি আকাশে আছেন তিনি (আল্লাহ) তার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন, যে পর্যন্ত না স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যায়।" (বুখারী ৫১৯৩, মুসলিম ১৪৩৬, আবু দাউদ ২১৪১নং, নাসাঈ)
৪১। যে অন্ধকে ভুল পথ নির্দেশ করে, সে অভিশপ্ত ঃ (৩৮নং দ্রঃ)
৪২। মূর্তি (বা ছবি) নির্মাণকারী অভিশপ্ত। আবু জুহাইফা বলেন,
إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ ثَمَنِ الدَّمِ وَثَمَنِ الْكَلْبِ وَكَسْبِ الْأَمَةِ وَلَعَنَ الْوَاشِمَةَ وَالْمُسْتَوْشِمَةَ وَآكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَلَعَنَ الْمُصَوِّرَ.
রাসূলুল্লাহ ﷺ রক্ত ও কুকুরের মূল্য এবং বেশ্যা (দাসী)র উপার্জন গ্রহণ করা থেকে নিষেধ করেছেন। আর সুদখোর, সুদদাতা, চেহারা (নকশা করার জন্য) দাগে বা দাগায় এমন নারী এবং মূর্তি (বা ছবি) নির্মাতাকে অভিসম্পাত করেছেন। (বুখারী ২২৩৮, আবু দাউদ ৩৪৮৩নং সংক্ষিপ্তভাবে)
৪৩। যে ব্যক্তি পশুর চেহারা দাগে, সে অভিশপ্তঃ একদা নবী ﷺ একটি গাধার পাশ বেয়ে পার হলেন। গাধাটির মুখে দাগার দাগ দেখে তিনি বললেন,
لَعَنَ اللَّهُ الَّذِي وَسَمَهُ ..
"আল্লাহ তাকে অভিশাপ করুন যে একে দেগেছে।" (মুসলিম ৫৬৭৪নং)
৪৪। যে ব্যক্তি কবরকে সিজদাগাহে পরিণত করে, সে অভিশপ্তঃ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لَعَنَ اللَّهُ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ ..
"আল্লাহ ইয়াহুদ ও খ্রিস্টানকে অভিসম্পাত করুন (অথবা করেছেন), তারা তাদের পয়গম্বরদের সমাধিসমূহকে উপাসনালয়ে পরিণত করেছে।" (বুখারী ১৩৩০, ১৩৯০, মুসলিম ১২১২নং)
৪৫। যে পরের বাপকে নিজের বাপ বলে দাবী করে এবং নিজের বংশ অস্বীকার করে, সে অভিশপ্তঃ মহানবী ﷺ বলেছেন,
مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ أَوِ انْتَمَى إِلَى غَيْرِ مَوَالِيهِ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ الْمُتَتَابِعَةُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ..
"যে ব্যক্তি পরের বাপকে নিজের বাপ বলে দাবী করে অথবা তার (স্বাধীনকারী) প্রভু ছাড়া অন্য প্রভুর প্রতি সম্বন্ধ জুড়ে, সে ব্যক্তির উপর কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর অবিরাম অভিশাপ।" (আবু দাউদ ৫১১৭, সহীহুল জামে' ৫৯৮৭নং)
মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় আছে যে, "এমন ব্যক্তির উপর আল্লাহ, ফিরিশতামন্ডলী এবং সমগ্র মানবমন্ডলীর অভিশাপ। আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার নিকট থেকে কোন নফল অথবা ফরয ইবাদতই গ্রহণ করবেন না।" (মুসলিম ১৩৭০নং)
৪৬। যে কোন সাহাবীকে গালি দেয়, সে অভিশপ্তঃ রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
لا تسبوا أصحابي، لعن الله من سب أصحابي)).
"তোমরা আমার সাহাবাকে গালি দিয়ো না। যে ব্যক্তি আমার সাহাবাকে গালি দেয়, আল্লাহ তাকে অভিশাপ করেন।" (ত্বাবারানীর আউসাত্ব ৪৭৭১,, সঃ জামে' ৫১১১নং)
((مَنْ سَبَّ أَصْحَابِي فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ ، وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ)).
"সে ব্যক্তি আমার সাহাবাগণকে গালি দেবে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশাবর্গ এবং সমগ্র মানবজাতির অভিশাপ হোক।" (ত্বাবারানীর কাবীর ১২৫৪১, সিলসিলাহ সহীহাহ ৩৩৪০নং)
৪৭। যে ঘুষ দেয় ও ঘুষ নেয়, সে অভিশপ্তঃ আব্দুল্লাহ বিন আম্র বলেন,
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - الرَّاشِيَ وَالْمُرْتَشِيَ.
'আল্লাহর রসূল ঘুষখোর, ঘুষদাতা (উভয়কেই) অভিশাপ করেছেন।' (আবু দাউদ ৩৫৮২, তিরমিযী ১৩৩৭, ইবনে মাজাহ ২৩১৩, ইবনে হিব্বান, হাকেম ৪/১০২-১০৩, সহী আবু দাউদ ৩০৫৫নং)
৪৮। যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়, সে অভিশপ্তঃ আবূ জুহাইফা বলেন, এক ব্যক্তি মহানবী -এর কাছে এসে নিজ প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করল। তিনি তাকে বললেন, 'তুমি তোমার আসবাব-পত্র রাস্তায় বের ক'রে ফেলো।' সে ফিরে গিয়ে তাই করল। তা দেখে পথচারী লোকেরা কারণ জিজ্ঞাসা করলে প্রতিবেশীর কষ্ট দেওয়ার কথা জানানো হল। সুতরাং সকলে ঐ প্রতিবেশীকে অভিশাপ দিতে লাগল। সে তা শুনে মহানবী -এর কাছে এসে লোকেদের অভিশাপ দেওয়ার কথা জানালে তিনি তাকে বললেন,
قَدْ لَعَنَكَ اللَّهُ قَبْلَ النَّاسِ)).
'তাদের আগে আল্লাহ তোমাকে অভিশাপ দিয়েছেন।' প্রতিবেশীটি বলল, 'আমি ওকে আর কষ্ট দেব না।' অতঃপর অভিযোগকারী মহানবী -এর কাছে এলে তাকে তার আসবাবপত্র তুলে নিতে আদেশ করলেন এবং তাকে আশ্বস্ত করলেন। (আবু দাউদ ৫১৫৫নং আবু হুরাইরা কর্তৃক, ত্বাবারানী, বায্যার, সঃ তারগীব ২৫৫৮-২৫৫৯নং)
৪৯। যে ব্যক্তি আল্লাহর দোহাই দিয়ে পার্থিব কিছু চায় এবং যে ব্যক্তির কাছে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বৈধ কিছু চাওয়া হয় অথচ সে তা দেয় না, সে অভিশপ্তঃ আল্লাহর রসূল বলেছেন,
(ملعون من سأل بوجه الله وملعون من سئل بوجه الله ثم منع سائله ما لم يسأل هجرا)).
"সে ব্যক্তি অভিশপ্ত, যে আল্লাহর নামে কিছু যাজ্ঞা করে। আর সে ব্যক্তিও অভিশপ্ত, যার নিকট হতে আল্লাহর নামে কিছু যাজ্ঞা করা হয় অথচ সে যাাজ্ঞাকারীকে দান করে না; যদি সে অবৈধ (বা অবৈধভাবে) কিছু না চেয়ে থাকে তবে।" (ত্বাবারানী, সহীহ তারগীব ৮৫১নং)
৫০। যে ব্যক্তি নিজের ৩ তালাক দেওয়া বিবিকে হালাল করবার উদ্দেশ্যে এক রাতের জন্য অপরের সাথে তার বিয়ে দেয় এবং যে বিয়ে করে (হালালাহ বা হিল্লে করে), সে অভিশপ্তঃ মহানবী বলেছেন,
لَعَنَ اللَّهُ الْمُحَلَّلَ وَالْمُحَلَّلَ لَهُ ...
"আল্লাহ হালালকারী ও যার জন্য হালাল করা হয় উভয়কে অভিশাপ করেছেন বা করুন।" (আহমাদ ৪৩০৮, আবু দাউদ ২০৭৮, তিরমিযী ১১১৯-১১২০, নাসাঈ, সহীহুল জামে ৫১০১নং)
৫১। যে ব্যক্তি জনসাধারণের ঘাটে, মাঝ রাস্তায় বা ছায়ায় পায়খানা করে, সে অভিশপ্তঃ আল্লাহর রসূল বলেন,
اتَّقُوا الْمَلاعِنَ الثَّلَاثَ الْبَرَازَ فِي الْمَوَارِدِ وَقَارِعَةِ الطَّرِيقِ وَالظَّلَّ ..
"তোমরা তিনটি অভিশাপ আনয়নকারী কর্ম থেকে বাঁচ; আর তা হল, ঘাটে, মাঝ-রাস্তায় এবং ছায়ায় পায়খানা করা।" (আবু দাউদ ২৬, ইবনে মাজাহ ৩২৮, সহীহ তারগীব ১৪১ নং)
৫২। যে রাস্তার ব্যাপারে মুসলিমদেরকে কষ্ট দেয়, সে অভিশপ্তঃ মহানবী বলেন,
((مَنْ آذِى الْمُسْلِمِينَ فِي طُرُقِهِمْ وَجَبَتْ عَلَيْهِ لَعْنَتُهُمْ)).
"যে ব্যক্তি রাস্তার ব্যাপারে মুসলিমদেরকে কষ্ট দেয়, সে ব্যক্তির উপরে তাদের অভিশাপ অনিবার্য হয়ে যায়।" (ত্বাবারানী কাবীর ২৯৭৮, সহীহ তারগীব ১৪৩নং)
৫৩। যে ব্যক্তি অস্ত্র উঠিয়ে মুসলিম ভাইকে সন্ত্রস্ত করে, সে অভিশপ্তঃ আবুল কাসেম বলেন,
مَنْ أَشَارَ إِلَى أَخِيهِ بِحَدِيدَةٍ فَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ تَلْعَنُهُ حَتَّى وَإِنْ كَانَ أَخَاهُ لِأَبِيهِ وَأُمِّهِ ..
"যে ব্যক্তি তার (মুসলিম) ভায়ের প্রতি কোন লৌহদন্ড (লোহার অস্ত্র) দ্বারা ইঙ্গিত করে, সে ব্যক্তিকে ফিরিশাবর্গ অভিশাপ করেন; যদিও সে তার নিজের সহোদর ভাই হোক না কেন।" (অর্থাৎ, তাকে মারার ইচ্ছা না থাকলেও ইঙ্গিত করে ভয় দেখানো গোনাহর কাজ।) (মুসলিম ২৬১৬নং)
৫৪। মহানবী বলেন,
( الدُّنْيَا مَلْعُونَةٌ ، مَلْعُونٌ مَا فِيهَا ، إِلَّا ذِكْرَ اللهِ تَعَالَى ، وَمَا وَالاهُ ، وَعَالِماً ، أَوْ مُتَعَلِّماً ))
"পৃথিবী অভিশপ্ত এবং অভিশপ্ত তার সকল বস্তু। তবে আল্লাহর যিক্র ও তার আনুষঙ্গিক বিষয়, এবং আলেম (দ্বীন শিক্ষক) ও তালেবে ইলম (দ্বীন শিক্ষার্থী অভিশপ্ত) নয়।" (তিরমিযী ২৩২২, ইবনে মাজাহ ৪১১২, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৭০৮, সহীহ তারগীব ৭০নং)
📄 পূর্ববর্তী জাতিসমূহকে ধ্বংসকারী অপরাধসমূহ
কুরআন কারীম পাঠ করলে আমরা পূর্ববর্তী বহু জাতির ইতিহাস ও তাদের ধ্বংস হওয়ার কারণ জানতে পারি। কারণ হিসাবে যে জিনিস চিহ্নিত করা যায়, তা হল সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যাচরণ, তাঁকে অবিশ্বাস এবং তাঁর প্রেরিত দূতগণের সাথে শত্রুতা।
পৃথিবীতে যত বিপর্যয় এসেছে এবং যত অঘটন ঘটেছে, তা কি আদম সন্তানের কোন পাপ ছাড়া ঘটেছে?
সুখময় জান্নাত থেকে এ কষ্টময় ধূলির ধরাতে অবতারণ করেছে সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যাচরণই।
নূহ-এর জাতিকে তুফান দিয়ে ধ্বংস করেছে জাতির অবাধ্যাচরণই।
সামূদ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রলয়ঙ্কর গর্জন দ্বারা। (হা-ক্কাহঃ ৫) তাও ছিল তাদের পাপেরই প্রতিফল।
আ'দ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রচন্ড ঝড়ো-হাওয়া দ্বারা। যা তাদের উপর প্রবাহিত করা হয়েছিল সাত রাত আট দিন অবিরামভাবে, তখন (দেখলে) উক্ত সম্প্রদায়কে দেখা যেত, তারা সেখানে লুটিয়ে পড়ে আছে সারশূন্য খেজুর কান্ডের ন্যায়। (হা-কাহঃ ৬-৭) তা ছিল তাদের অবাধ্যাচরণের কুফল।
লুত-এর জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছিল তাদের কুকর্মের প্রতিফল স্বরূপ। সূর্যোদয়ের সময়ে বিকট আওয়াজ তাদেরকে পাকড়াও করেছিল। (তাদের) জনপদকে উল্টিয়ে উপর-নীচ ক'রে দিয়ে তাদের উপর ঝামা পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছিল। (হিজরঃ ৭৩-৭৪)
শুআইব-এর জাতিকে তাদের দুষ্কর্মের জন্য ধ্বংস করা হয়েছিল। তারা বিকট গর্জন-সহ ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল, ফলে তারা নিজগৃহে উপুড় অবস্থায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। (আ'রাফঃ ৯১, হ্রদঃ ৯৪)
ফিরআউন ও তার জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছিল সমুদ্রের পানিতে ডুবিয়ে। তাদের অবাধ্যাচরণই তাদেরকে সলিল-সমাধি দান করেছিল।
তার পরেও কত জাতি ধ্বংস হয়েছে নিজেদের অবাধ্যাচরণের প্রতিফল স্বরূপ। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কত সভ্যতা, সংস্কৃতি, কত বিলাস-ভবন ও বিলাস-উদ্যান। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ ذَلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْقُرَى نَقُصُّهُ عَلَيْكَ مِنْهَا قَائِمٌ وَحَصِيدٌ (١٠٠) وَمَا ظَلَمْنَاهُمْ وَلَكِنْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ فَمَا أَغْنَتْ عَنْهُمْ آلِهَتُهُمْ الَّتِي يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ لَمَّا جَاءَ أَمْرُ رَبِّكَ وَمَا زَادُوهُمْ غَيْرَ تَتْبَيبٍ (١٠١) وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَهِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ} (١٠٢) سورة هود
"এটা ছিল সেই জনপদসমূহের কতিপয় অবস্থা, যা আমি তোমার নিকট বর্ণনা করছি, ওগুলির মধ্যে কোন কোন জনপদ তো বিদ্যমান রয়েছে এবং কোন কোনটি নির্মূল হয়ে গেছে। আমি তাদের প্রতি অত্যাচার করিনি, কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের উপর অত্যাচার করেছে। বস্তুতঃ যখন তোমার প্রতিপালকের হুকুম এসে পৌঁছল, তখন তাদের সেই উপাস্যগুলি, আল্লাহকে ছেড়ে ওরা যাদের উপাসনা করত, তারা ওদের কোন কাজে লাগল না। উল্টো তারা তাদের ধ্বংসই বৃদ্ধি করল। আর এরূপই তোমার প্রতিপালকের পাকড়াও; যখন তিনি কোন অত্যাচারী জনপদের অধিবাসীদেরকে পাকড়াও করেন। নিঃসন্দেহে তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যাতনাদায়ক, কঠিন।" (হৃদঃ ১০০-১০২)
তিনি আরো বলেছেন,
{ وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلاً قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُّطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّن كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بأَنْعُمِ اللَّهِ فَأَذَاقَهَا اللهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ} (١١٢)
"আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসত সর্বদিক হতে প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল; ফলে তারা যা করত, তার জন্য আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ।" (নাহলঃ ১১২)
{فَكُلًّا أَخَذْنَا بِذَنبِهِ فَمِنْهُم مَّنْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِ حَاصِبًا وَمِنْهُم مَّنْ أَخَذَتْهُ الصَّيْحَةُ وَمِنْهُم مَّنْ خَسَفْنَا بِهِ الْأَرْضِ وَمِنْهُم مَّنْ أَغْرَقْنَا وَمَا كَانَ اللهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِن كَانُوا أَنفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ} (৪০) সূরা আল-আনকাবুত
"সুতরাং ওদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ অপরাধের জন্য পাকড়াও করলাম; ওদের কারও প্রতি প্রেরণ করলাম পাথর বর্ষণকারী ঝড়, কাকেও আঘাত করল মহাগর্জন, কাকেও আমি মাটির নিচে ধসিয়ে দিলাম এবং কাকেও মারলাম ডুবিয়ে। আল্লাহ তাদের প্রতি কোন যুলুম করেননি; আসলে তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম করেছিল।" (আনকাবুতঃ ৪০)
পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ধ্বংস হওয়ার মূলে ছিল নবী-রসূলগণের সাথে সংঘাত। অবিশ্বাস ও মিথ্যায়ন তাদেরকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে ধাক্কা দিয়ে নিক্ষেপ করেছিল। এ ছাড়াও আরো কিছু কারণ ও পাপকর্ম ছিল, যার ফলে তারা ধ্বংসের শিকারে পরিণত হয়েছিল। যেমন:-
এক: কার্পণ্য
কৃপণতা মানে অধিকারীর আর্থিক অধিকার যথাযথভাবে আদায় না করা। কৃপণ যেমন অপরকে খেতে দেয় না, তেমনি নিজেও খায় না। আর তার ফলে আত্মীয়রা পর হয়ে যায়। অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে তা আদায়ের জন্য সংগ্রাম করলে রক্তারক্তিতে গিয়ে পৌঁছে তাদের কর্মকান্ড। আর তাই হয় তাদের ধ্বংসের একটি কারণ।
মহানবী বলেছেন, (( اتَّقُوا الظُّلْمَ ، فَإِنَّ الظُّلْمَ ظُلُمَاتٌ يَوْمَ القِيَامَةِ ، وَاتَّقُوا الشُّحَّ ، فَإِنَّ الشُّحَّ أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ ، حَمَلَهُمْ عَلَى أَنْ سَفَكُوا دِمَاءَهُمْ وَاسْتَحَلُّوا مَحَارِمَهُمْ )). رواه مسلم
"অত্যাচার করা থেকে বাঁচ। কেননা, অত্যাচার কিয়ামতের দিনের অন্ধকার। আর কৃপণতা থেকে দূরে থাক। কেননা, কৃপণতা তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস ক'রে দিয়েছে। (এই কৃপণতাই) তাদেরকে প্ররোচিত করেছিল, ফলে তারা নিজেদের রক্তপাত ঘটিয়েছিল এবং তাদের উপর হারামকৃত বস্তুসমূহকে হালাল ক'রে নিয়েছিল।" (আহমদ, মুসলিম ৬৭৪১নং)
إِيَّاكُمْ وَالشُّحَّ فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِالشُّحَّ أَمَرَهُمْ بِالْبُخْلِ فَبَخَلُوا وَأَمَرَهُمْ بِالْقَطِيعَةِ فَقَطَعُوا وَأَمَرَهُمْ بِالْفُجُورِ فَفَجَرُوا ...
"তোমরা কৃপণতা থেকে দূরে থাক। কারণ, কৃপণতাই তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস ক'রে দিয়েছে। কৃপণতা তাদেরকে কার্পণ্য করতে আদেশ দিয়েছিল, সুতরাং তারা কার্পণ্য করেছিল, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করতে আদেশ দিয়েছিল, সুতরাং তারা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করেছিল এবং তাদেরকে পাপাচার করতে আদেশ করেছিল, সুতরাং তারা পাপাচার করেছিল।" (আবু দাউদ ১৭০০, হাকেম ১৫১৬, সঃ জামে' ২৬৭৮নং)
দুইঃ মতভেদ
মতভেদ অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু সেই মতভেদ নিয়ে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়া, একে অন্যকে 'কাফের' ইত্যাদি বলে গালাগালি করা এবং এক পর্যায়ে ঝগড়া-লড়াই করা অবশ্যই জাতির ধ্বংসের অন্যতম কারণ। মহানবী বলেছেন,
(( دَعُونِي مَا تَرَكْتُكُمْ ، إِنَّمَا أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَثْرَةُ سُؤَالِهِمْ وَاخْتِلاَفُهُمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ ، فَإِذَا نَهَيْتُكُمْ عَنْ شَيْءٍ فَاجْتَنِبُوهُ ، وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ )).
"আমি যে ব্যাপারে তোমাদেরকে (বর্ণনা না দিয়ে) ছেড়ে দিয়েছি, সে ব্যাপারে তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও (অর্থাৎ, সে ব্যাপারে আমাকে প্রশ্ন করো না)। কারণ, তোমাদের পূর্ববর্তীরা তাদের অধিক প্রশ্ন করার এবং তাদের নবীদের সঙ্গে মতভেদ করার ফলেই ধ্বংস হয়ে গেছে। সুতরাং আমি যখন তোমাদেরকে কোন জিনিস থেকে নিষেধ করব, তখন তোমরা তা হতে দূরে থাক। আর যখন আমি তোমাদেরকে কোন কাজের আদেশ দেব, তখন তোমরা তা সাধ্যমত পালন কর।" (বুখারী ৭২৮৮, মুসলিম ৩৩২১নং)
আবু হুরাইরা বলেন, রাসূলুল্লাহ আমাদের সামনে ভাষণ দানকালে বললেন, “হে লোক সকল! আল্লাহ তোমাদের উপর (বায়তুল্লাহর) হজ্জ ফরয করেছেন, অতএব তোমরা হজ্জ পালন কর।" একটি লোক বলে উঠল, 'হে আল্লাহর রসূল! প্রতি বছর তা করতে হবে কি?' তিনি নিরুত্তর থাকলেন এবং লোকটি শেষ পর্যন্ত তিনবার জিজ্ঞাসা করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ বললেন, "যদি আমি বলতাম, হ্যাঁ। তাহলে (প্রতি বছরে) হজ্জ ফরয হয়ে যেত। আর তোমরা তা পালন করতে অক্ষম হতে।" অতঃপর তিনি বললেন,
(( دُرُونِي مَا تَرَكْتُكُمْ ، فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِكَثْرَةِ سُؤَالِهِمْ ، وَاخْتِلاَفِهِمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ ، فَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ ، وَإِذَا نَهَيْتُكُمْ عَن شَيْءٍ فَدَعُوهُ)).
"তোমরা আমাকে (আমার অবস্থায়) ছেড়ে দাও, যতক্ষণ আমি তোমাদেরকে (তোমাদের স্ব স্ব অবস্থায়) ছেড়ে রাখব। কেননা, তোমাদের পূর্বেকার জাতিরা অতি মাত্রায় জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের পয়গম্বরদের বিরোধিতা করার দরুনই ধ্বংস হয়েছে। সুতরাং আমি যখন তোমাদেরকে কোন কিছু করার আদেশ দেব, তখন তোমরা তা সাধ্যমত পালন করবে। আর যা করতে নিষেধ করব, তা থেকে বিরত থাকবে।" (মুসলিম ৩৩২১নং)
(اتْرُكُونِي مَا تَرَكْتُكُمْ فَإِذَا حَدَّثْتُكُمْ فَخُذُوا عَنِّي فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِكَثْرَةِ سُؤَالِهِمْ وَاخْتِلَافِهِمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ)).
"তোমরা আমাকে (আমার অবস্থায়) ছেড়ে দাও, যতক্ষণ আমি তোমাদেরকে (তোমাদের স্ব স্ব অবস্থায়) ছেড়ে রাখব। অতঃপর যখন আমি তোমাদেরকে হাদীস বর্ণনা করব, তখন তোমরা তা আমার নিকট থেকে গ্রহণ কর। কেননা, তোমাদের পূর্বেকার জাতিরা অতি মাত্রায় জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের পয়গম্বরদের বিরোধিতা করার দরুনই ধ্বংস হয়েছে।" (তিরমিযী ২৬৭৯, সঃ জামে' ৯১নং)
দ্বীনের বিষয়ে তো বটেই, বিশেষভাবে কুরআন ও তার ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ ও তর্ক-বিতর্ক মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়। এ ব্যাপারে মহানবী সতর্ক ক'রে বলেছেন,
(اقْرَؤُوا كما عُلِّمْتُمْ فَإِنَّمَا أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ اخْتِلافُهُمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ)).
"তোমাদেরকে যেভাবে শিখানো হয়েছে, সেইভাবে পড়। কারণ, তোমাদের পূর্বেকার জাতিরা তাদের পয়গম্বরদের বিরোধিতা করার দরুনই ধ্বংস হয়েছে।" (তাফসীর ইবনে জারীর, সঃ জামে' ১১৭১নং)
আব্দুল্লাহ বিন আম্র বলেন, একদা সকাল-সকাল আমি রাসূলুল্লাহ -এর কাছে গেলাম। তিনি দুটি লোকের আওয়াজ শুনতে পেলেন, যারা একটি আয়াত নিয়ে মতবিরোধ করছিল। রাসূলুল্লাহ আমাদের নিকট বের হয়ে এলেন। তাঁর চেহারায় রাগ বুঝা যাচ্ছিল। তিনি বললেন,
إِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِاخْتِلَافِهِمْ فِي الْكِتَابِ ..
"তোমাদের পূর্বেকার জাতিরা কিতাব নিয়ে মতভেদ করার দরুনই ধ্বংস হয়েছে।" (মুসলিম ৬৯৪৭নং)
অন্য এক বর্ণনায় আছে, আব্দুল্লাহ বিন আম্র বলেন, (একদা কুরআনী কোন বিষয় নিয়ে কিছু সাহাবাকে তর্ক করতে দেখে) নবী বললেন,
((مَهْلًا يَا قَوْمِ بِهَذَا أُهْلِكَتْ الْأُمَمُ مِنْ قَبْلِكُمْ بِاخْتِلَافِهِمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ وَضَرْبِهِمْ الْكُتُبَ بَعْضَهَا بِبَعْضٍ إِنَّ الْقُرْآنَ لَمْ يَنْزِلْ يُكَذِّبُ بَعْضُهُ بَعْضًا بَلْ يُصَدِّقُ بَعْضُهُ بَعْضًا فَمَا عَرَفْتُمْ مِنْهُ فَاعْمَلُوا بِهِ وَمَا جَهَلْتُمْ مِنْهُ فَرُدُّوهُ إِلَى عَالِمِهِ)).
"থামো হে লোক সকল! নবীদের ব্যাপারে মতভেদ এবং কিতাবের একাংশকে অন্য অংশের সাথে সংঘর্ষ সৃষ্টি ক'রে তোমাদের পূর্বের বহু জাতি ধ্বংস হয়েছে। কুরআন এভাবে অবতীর্ণ হয়নি যে, তার একাংশ অন্য অংশকে মিথ্যায়ন করবে। বরং তার একাংশ অন্য অংশকে সত্যায়ন করে। সুতরাং যা তোমরা বুঝতে পার, তার উপর আমল কর এবং যা বুঝতে পার না, তা তার জ্ঞানীর দিকে ফিরিয়ে দাও।" (আহমাদ ৬৭০২নং, শারহুল আক্বীদাতিত ত্বাহাবিয়্যাহ ১/২১৮)
তিনঃ অর্থলোভ ও দুনিয়া-প্রেম
হালাল পথে উপার্জিত অর্থ নিন্দনীয় নয়। কিন্তু নিন্দনীয় হল অর্থের লোভ, অর্থের মোহ, অর্থের দাসত্ব ও অবৈধ অর্থ। আর তখনই অর্থ হয় উম্মতের ফিতনা। (তিরমিযী ২৩৩৬নং)
অর্থ হয় অনর্থের মূল। অর্থ সৃষ্টি করে নানা বিপত্তি, হানাহানি ও যুদ্ধ। নেপোলিয়ন বলেছেন, 'যুদ্ধ হয় তিনটি কারণে; অর্থ, অর্থ ও অর্থ।'
অর্থ ফিতনা হয় তখন, যখন সঞ্চয়কারী এই ধারণা করে যে, 'যত খারাপ পথেই টাকা রোজগার করা হোক, টাকার গায়ে ময়লা লেগে থাকে না। বরং যাদের টাকা নেই, তারাই সমাজের ময়লা।' 'ধনবানরাই বলবান, আর বলবানরাই ভগবান হয়।'
উক্ত সকল কারণে অর্থ হল ধ্বংসের একটি কারণ। মহানবী ﷺ বলেছেন,
(( تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ ، وَالدِّرْهَم ، وَالقَطِيفَةِ ، وَالخَمِيصَةِ ، إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ ، وَإِنْ لَمْ يُعْطَ لَمْ يَرْضَ )). رواه البخاري
"ধ্বংস হোক দীনারের গোলাম, দিরহামের গোলাম (ধনদাস) ও উত্তম পোশাকের গোলাম (দুনিয়াদার)! যদি তাকে দেওয়া হয়, তাহলে সে সন্তুষ্ট হয়। আর না দেওয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়।" (বুখারী ২৮৮৬নং)
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ ؓ লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য দান করতেন। একদা এক ব্যক্তি এলে তাকে এক হাজার দিরহাম দিয়ে বললেন, 'নাও। আমি আল্লাহর রসূল ﷺ-এর নিকট শুনেছি, তিনি বলেছেন,
((إِنَّمَا أهلك من كان قبلكُمُ الدِّينَارِ وَالدِّرْهَم ، وهما مهلكاكم)).
“তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিকে দীনার ও দিরহাম ধ্বংস করেছে। আর সেই দু'টি তোমাদেরকেও ধ্বংস করবে।” (বায্যার, সঃ তারগীব ৩২৫৮নং)
উকুবাহ ইবনে আমের ؓ বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ (একবার) উহুদের শহীদদের (কবরস্থানের) দিকে বের হলেন এবং যেন জীবিত ও মৃত ব্যক্তিদেরকে বিদায় জানাবার উদ্দেশ্যে আট বছর পর তাঁদের উপর জানাযা পড়লেন (অর্থাৎ তাঁদের জন্য দুআ করলেন)। তারপর মিম্বরে চড়ে বললেন, "আমি পূর্বে গমনকারী তোমাদের জন্য সুব্যবস্থাপক এবং সাক্ষীও। তোমাদের প্রতিশ্রুত স্থান হওযে (কাউসার)। আমি অবশ্যই ওটাকে আমার এই স্থান থেকে দেখতে পাচ্ছি। শোনো! তোমাদের ব্যাপারে আমার এ আশংকা নেই যে, তোমরা শির্ক করবে। তবে তোমাদের জন্য আমার আশংকা এই যে, তোমরা দুনিয়ার ব্যাপারে আপোসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।" (বুখারী ৪০৪২, মুসলিম ৬১১৭)
অন্য এক বর্ণনায় আছে যে,
(( وَلَكِنِّي أَخْشَى عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا أَنْ تَنَافَسُوا فِيهَا ، وَتَقْتَتِلُوا فَتَهْلِكُوا كَمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ )) .
"কিন্তু তোমাদের জন্য আমার আশংকা এই যে, তোমরা পার্থিব ধন-সম্পদে আপোসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এবং সে জন্য পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হবে এবং (পরিণামে) তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে; যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীরা ধ্বংস হয়েছে।"
অর্থ-লালসা যেমন মানুষের দুনিয়া ধ্বংস করতে পারে, তেমনি দ্বীনও ধ্বংস করতে পারে। ধর্মব্যবসায়ী সেই ধ্বংসের শামিল হতে পারে। মহানবী বলেছেন,
(( مَا ذِنْبَانِ جَائِعَانِ أُرْسِلَا فِي غَنَم بِأَفْسَدَ لَهَا مِنْ حِرْصِ الْمَرْءِ عَلَى الْمَالِ وَالشَّرَفِ لِدِينِهِ)).
"ছাগলের পালে দু'টি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘকে ছেড়ে দিলে ছাগলের যতটা ক্ষতি করে, তার চেয়ে মানুষের সম্পদ ও সম্মানের প্রতি লোভ-লালসা তার দ্বীনের জন্য বেশী ক্ষতিকারক।" (তিরমিযী ২৩৭৬নং)
চারঃ ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি
পূর্ববর্তী জাতিদেরকে দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছিল। কারণ তা ছিল ভ্রষ্টতার কারণ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ غَيْرَ الْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعُوا أَهْوَاءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّوا مِنْ قَبْلُ وَأَضَلُّوا كَثِيرًا وَضَلُّوا عَنْ سَوَاءِ السَّبِيل } [المائدة : ٧٧]
অর্থাৎ, বল, 'হে ঐশীগ্রন্থধারিগণ! তোমরা তোমাদের ধর্ম সম্বন্ধে বাড়াবাড়ি করো না এবং যে সম্প্রদায় ইতিপূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে ও অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং সরল পথ হতে বিচ্যুত হয়েছে, তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না।' (মাইদাহ ৭৭)
কিন্তু মহান স্রষ্টার সে নির্দেশ তারা মান্য করেনি। তাই তারা ধ্বংস হয়েছে। মহানবী এ উম্মতকে সতর্ক ক'রে বলেছেন,
((لَا تُشَدِّدُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ، فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِتَشْدِيدِهِمْ عَلَى أَنْفُسِهِمْ، وَسَتَجِدُونَ بَقَايَاهُمْ فِي الصَّوَامِعِ وَالدِّيَارَاتِ)).
"তোমরা নিজেদের উপর কঠিনতা করো না। কারণ, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিরা নিজেদের উপর কঠিনতা করার ফলেই ধ্বংস হয়েছে। তোমরা তাদের অবশিষ্ট লোকদেরকে গীর্জা ও উপাসনালয়ে দেখতে পাবে।" (ত্বাবারানীর কাবীর ৫৪১৮, আওসাত্ব ৩০৭৮, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৩৮৮৪, সিঃ সহীহাহ ৩১২৪নং)
তিনি আরো বলেছেন,
((إِيَّاكُمْ وَالْغُلُو فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِالْغُلُو فِي الدِّينِ)).
"হে লোক সকল! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে অতিরঞ্জন করা থেকে দূরে থাকো। কারণ দ্বীনের ব্যাপারে অতিরঞ্জনই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে ধ্বংস করেছে।" (আহমাদ ৩২৪৮, নাসাঈ ৩০৫৭, ইবনে মাজাহ ৩০২৯, হাকেম ১৭১১, সঃ জামে ২৬৮০নং)
রাসূলুল্লাহ তিনবার বলেছেন,
هَلَكَ الْمُتَنَطِّعُونَ ..
"অতিরঞ্জনকারীরা ধ্বংস হয়েছে।" (আহমাদ ৩৬৫৫, মুসলিম ৬৯৫২, আবু দাউদ, সহীহুল জামে' ৭০৩৯ নং)
পাঁচঃ দ্বিমুখী বিচার করা এবং দন্ডবিধি প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করা
দ্বিমুখী বিচার করা, যেমন দরিদ্রের জন্য এক বিচার ও ধনীর জন্য অন্য বিচার। স্বদেশীর জন্য এক বিচার ও বিদেশীর জন্য অন্য বিচার। স্বদলীয় অপরাধীর এক বিচার ও বিরোধী দলের অপরাধীর জন্য অন্য বিচার। সাধারণ মানুষের জন্য এক বিচার ও পদাধিকারীর জন্য অন্য বিচার। এমন দ্বিমুখী বিচার ন্যয়াপরায়ণতার প্রতিকূল।
তদনুরূপ বিচারে দন্ড ঘোষণার পরে তার প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করা, পদ-মর্যাদা বা সুপারিশ বলে তা কার্যকর করার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করাও এমন একটি অপরাধ, যার ফলে ধ্বংস হয়েছে পূর্ববর্তী জাতির লোকেরা।
আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, মহানবী -এর যুগে (এক উচ্চবংশীয়া) মাখযুমী মহিলা লোকের কাছে জিনিস ধার নিত, অতঃপর তা অস্বীকার করত। এই শ্রেণীর চুরি করার ফলে ধরা পড়লে নবী তার হাত কাটার আদেশ দিলেন। তাকে নিয়ে তার আত্মীয়-স্বজন সহ কুরাইশ বংশের লোকেরা বড় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। (তার হাত যাতে কাটা না হয় সেই চেষ্টায়) তারা বলাবলি করল, 'ওর ব্যাপারে আল্লাহর রসূল -এর সঙ্গে কে কথা বলবে?' পরিশেষে তারা বলল, 'আল্লাহর রসূল -এর প্রিয়পাত্র উসামাহ বিন যায়দ ছাড়া আর কে (এ ব্যাপারে) তাঁর সাথে কথা বলার দুঃসাহস করবে?' সুতরাং (তাদের অনুরোধ মতে) উসামাহ তাঁর সাথে কথা বললেন (এবং ঐ মহিলার হাত যাতে কাটা না যায় সে ব্যাপারে সুপারিশ করলেন)। এর ফলে আল্লাহর রসূল বললেন, “হে উসামাহ! তুমি কি আল্লাহর দন্ডবিধিসমূহের এক দন্ডবিধি (কায়েম না হওয়ার) ব্যাপারে সুপারিশ করছ?!" অতঃপর তিনি দন্ডায়মান হয়ে ভাষণে বললেন,
أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ وَايْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يدها ».
"তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতরা এ জন্যই ধ্বংস হয়েছিল যে, তাদের মধ্যে কোন উচ্চবংশীয় (বা ধনী) লোক চুরি করলে তারা তাকে (দন্ড না দিয়ে) ছেড়ে দিত। আর কোন (নিম্নবংশীয়, গরীব বা) দুর্বল লোক চুরি করলে তারা তার উপর দন্ডবিধি প্রয়োগ করত। পক্ষান্তরে আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমা যদি চুরি করত, তাহলে আমি তারও হাত কেটে দিতাম।" (বুখারী ৩৪৭৫, ৬৭৮৮, মুসলিম ৪৫০৫-৪৫০৭নং, আসহাবে সুনান)
ছয়ঃ মহিলাদের কৃত্রিম রূপচর্চা করা
কৃত্রিম রূপ-সৌন্দর্য অবলম্বন ক'রে পরপুরুষকে ধোকা দেওয়া একটি বড় অপরাধ। যেমন কৃত্রিম কিছু ব্যবহার ক'রে স্তনযুগলকে বিশাল প্রদর্শন করা, পরচুলা ব্যবহার ক'রে মাথার খোঁপাকে বিশাল প্রদর্শন করা, হাই-হিল জুতো পরে নিজেকে লম্বা প্রদর্শন করা ইত্যাদি। মহিলাদের মাঝে এমন রূপচর্চার ব্যাপকতা জাতির ধ্বংসের একটি কারণ।
হুমাইদ ইবনে আব্দুর রাহমান থেকে বর্ণিত, তিনি হজ্জ করার বছরে মুআবিয়া-কে মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছেন---ঐ সময়ে তিনি জনৈক দেহরক্ষীর হাত থেকে এক গোছা (কৃত্রিম) চুল নিজ হাতে নিয়ে বললেন, 'হে মদীনাবাসীগণ! তোমাদের আলেমগণ কোথায়? আমি রসুলল্লাহ-কে এরূপ জিনিস (ব্যবহার) নিষেধ করতে শুনেছি। তিনি বলতেন,
(( إِنَّمَا هَلَكَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ حِينَ اتَّخَذَهَا نِسَاؤُهُمْ )) .
"বানী ইস্রাঈল তখনই ধ্বংস হয়েছিল, যখন তাদের মহিলারা এই জিনিস ব্যবহার করতে আরম্ভ করেছিল।" (বুখারী ৩৪৬৮, ৫৯৩২, মুসলিম ৫৭০০নং)
সাতঃ নবীদের স্মৃতিস্থানসমূহকে মসজিদ বানানো
দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা জাতির ধ্বংসের অন্যতম কারণ। অনুরূপ একটি বাড়াবাড়ি হল নবীদের স্মৃতিজড়িত স্থানসমূহকে নামাযের জায়গা বানিয়ে নেওয়া। উমার বিন খাত্তাব এক সফরে ছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, লোকেরা একটি জায়গাতে পালাপালি ক'রে নামায পড়ছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'কী ব্যাপার?' লোকেরা বলল, 'এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে রাসূলুল্লাহ নামায পড়েছেন।' তা শুনে তিনি বললেন,
إِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِهَذَا أَنَّهُمْ اتَّخَذُوا آثَارَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ، مَنْ أَدْرَكَتْهُ الصَّلَاةُ فَلْيُصَلِّ وَإِلَّا فَلْيَمْضِ.
'তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিরা এর কারণেই ধ্বংস হয়েছে; তারা তাদের নবীদের স্মৃতিস্থানসমূহকে নামাযের জায়গায় পরিণত করেছিল। যার নামাযের সময় হয়েছে, সে এখানে নামায পড়ুক, নচেৎ অতিক্রম করুক।' (ইবনে আবী শাইবা ৭৫৫০নং)
আটঃ তকদীর নিয়ে তর্ক করা
দ্বীনের কোন বিষয়েই তর্কাতর্কি পছন্দনীয় নয়। বিশেষ ক'রে ঈমানের একটি রুকন তকদীর নিয়ে। মহান আল্লাহ সব কিছু লিখে রেখেছেন, তাহলে আমল ক'রে লাভ কী? আমল লেখা আছে, তাহলে শাস্তি কেন দেবেন? অধিকাংশ মানুষের নিকট বিষয়টিকে পরস্পরবিরোধী বলে মনে হয়। তাই সংশয় হয়, অবিশ্বাস ও সন্দেহ আসে, তর্ক করে, নানা কূট প্রশ্ন করে এবং পরিশেষে ঈমান হারিয়ে ধ্বংস হয়। পূর্ববর্তী জাতিরা এই কারণেও ধ্বংস হয়েছে।
আবূ হুরাইরা বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ আমাদের নিকট বের হয়ে এলেন, তখন আমরা তকদীর নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করছিলাম। তা দেখে তিনি ক্রোধান্বিত হলেন। এমনকি মনে হল, তাঁর দুই গন্ডে যেন বেদানার দানা নিংড়ে দেওয়া হয়েছে। অতঃপর তিনি বললেন,
((أَبِهَذَا أُمِرْتُمْ أَمْ بِهَذَا أُرْسِلْتُ إِلَيْكُمْ؟ إِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ حِينَ تَنَازَعُوا فِي هَذَا الْأَمْرِ، عَزَمْتُ عَلَيْكُمْ أَلَّا تَتَنَازَعُوا فِيهِ)).
"তোমাদেরকে কি এই করতে আদেশ দেওয়া হয়েছে? নাকি আমি এই জন্য তোমাদের মাঝে প্রেরিত হয়েছি? তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিরা তখনই ধ্বংস হয়েছিল, যখন তারা এই ব্যাপারে তর্কাতর্কি করেছিল। আমি তোমাদেরকে দৃঢ়ভাবে নিষেধ করছি, তোমরা এ নিয়ে তর্কাতর্কি করো না।" (তিরমিযী ২১৩৩নং)
যেন মহানবী উম্মতকে বলছেন, এ সকল অপরাধের কারণে পূর্ববর্তী বহু জাতি ধ্বংস হয়েছে। সুতরাং সাবধান! তোমরা এই শ্রেণীর কোন অপরাধ করলে, তোমরাও ধ্বংসের শিকারে পরিণত হতে পার।
📄 এক পাপ অন্য পাপকে আকর্ষণ করে
এমন বহু পাপ আছে, যা অন্য আরো অনেক পাপকে আকর্ষণ করে। অনেক সময় এক পাপ দিয়ে অন্য পাপকে ঢাকতে হয়। একটা পাপ করলে অন্য পাপটি অনায়াসে ঘটে বসে। অনেক সময় নিজের ইচ্ছা না থাকলেও মনে হয়, তৃতীয় পক্ষ কেউ যেন তা ঘটিয়ে দিচ্ছে।
তেমনই একটি পাপ বেগানা নারী-পুরুষের একাকিত্ব ও নির্জনতা অবলম্বন। এ পাপের ব্যাপারে গুরুত্ব না দিলে পরবর্তীতে আরো অনেক পাপ ঘটতে থাকে অতি সহজে। মহানবী বলেছেন,
(( أَلَا لا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ ، إِلَّا كَانَ ثَالِثَهَمَا الشَّيْطَانُ)).
"যখনই কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনতা অবলম্বন করে, তখনই শয়তান তাদের তৃতীয় সাথী (কোটনা) হয়।" (সহীহ তিরমিযী ৯৩৪নং, নাসাঈর কুবরা ৯২১৯, বাইহাক্বী ১৩৯০৪, হাকেম ৩৮৭, ৩৯০, ত্বাবারানী ৫৬১নং)
অবৈধ কাম-নজর বা প্রেম-দৃষ্টি একটা ছোট্ট পাপ। কিন্তু কত পাপের দিকে মানুষকে পরিচালিত করে এই পাপটি। আরবী কবি বলেছেন,
نظرة فابتسامة فسلام ... فكلام فموعد فلقاء
অর্থাৎ, প্রথমে দৃষ্টি, তারপর মুচকি হাসি, তারপর সালাম। তারপর বাক্যালাপ, তারপর ওয়াদা, তারপর মিলন (ব্যভিচার)।
কাম-নজর ইবলীসের তীররাশির একটি তীর। নজর হল ব্যভিচারের পোস্ট-অফিস। অবৈধ ভালোবাসার মাধ্যমেই শয়তান একজন মু'মিনকে অতি অনায়াসে 'কাফের' বানাতে পারে এবং প্রেমিক-প্রেমিকাকে আজীবন ব্যভিচারে আলিপ্ত রাখতে সক্ষম হয়।
বলা বাহুল্য, অবৈধ প্রেম সৃষ্টি করে শয়তান। যেহেতু অবৈধ সেই প্রেমিক-প্রেমিকা দ্বারা বহু পাপের বাজার রমরমিয়ে চালাতে পারে সে। যেমন বৈধ প্রেম ধ্বংস ও নষ্ট করে সে। কারণ তার মাধ্যমেও বহু পাপের বেসাতি খুলতে পারে সে। এই জন্যই অন্যান্য পাপ অপেক্ষা বিবাহ-বিচ্ছেদ তার নিকট অতি চমৎকার ও গুরুত্বপূর্ণ একটি মহাসাফল্য। মহানবী বলেন,
إِنَّ إِبْلِيسَ يَضَعُ عَرْشَهُ عَلَى الْمَاءِ ثُمَّ يَبْعَثُ سَرَايَاهُ فَأَدْنَاهُمْ مِنْهُ مَنْزِلَةً أَعْظَمُهُمْ فِتْنَةً يَجِيءُ أَحَدُهُمْ فَيَقُولُ فَعَلْتُ كَذَا وَكَذَا فَيَقُولُ مَا صَنَعْتَ شَيْئًا قَالَ ثُمَّ يَجِيءُ أَحَدُهُمْ فَيَقُولُ مَا تَرَكْتُهُ حَتَّى فَرَّقْتُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ امْرَأَتِهِ - قَالَ - فَيُدْنِيهِ مِنْهُ فَيَلْتَزِمُهُ وَيَقُولُ : نِعْمَ أَنْتَ ..
"সমুদ্রের উপর শয়তান তার সিংহাসন রেখে মানুষকে বিভিন্ন পাপ ও ফিতনায় জড়িত করার উদ্দেশ্যে নিজের শিষ্যদল পাঠিয়ে থাকে। তার কাছে সেই শিষ্য সবচেয়ে বড় মর্যাদা (ও বেশী নৈকট্য) পায়, যে সবচেয়ে বড় পাপ বা ফিতনা সৃষ্টি করতে পারে। কোন শিষ্য এসে বলে, 'আমি এই করেছি।' ইবলীস বলে, 'তুই কিছুই করিসনি।' অন্যজন বলে 'আমি একজনের পিছনে লেগে তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়া করিয়েছি।' তখন শয়তান তাকে নিকটে করে (জড়িয়ে ধরে) বলে, 'হ্যাঁ, তুমিই একটা কাজ করেছ!" (মুসলিম ৭২৮৪নং)
হ্যাঁ, মানুষের মন হল মন্দ-প্রবণ, তার উপর শয়তান তার পিছু ছাড়ে না। তার নিরলস প্রচেষ্টায় মানুষ পাপে লিপ্ত হয়। একটি পাপের মাধ্যমে অন্য একটি বিশাল পাপ সংঘটিত করে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (۹۰) إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنْتَهُونَ} (۹۱) سورة المائدة
"হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাযে বাধা দিতে চায়! অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না?" (মায়িদাহঃ ৯১)
উষমান বিন আফফান বলেছেন, "তোমরা মদ থেকে দূরে থাকো। কারণ তা হল সকল নোংরা কাজের প্রধান। তোমাদের পূর্বযুগে একটি লোক ছিল, যে সর্বদা আল্লাহর ইবাদত করত এবং লোকজন থেকে দূরে থাকত। এক ভ্রষ্ট মেয়ে তাকে ভালোবেসে ফেলল। সে এক সময় তার দাসী দ্বারা কোন ব্যাপারে সাক্ষ্য দেওয়ার নাম ক'রে তাকে ডেকে পাঠাল। সে দাসীর সাথে এসে তার বাড়িতে প্রবেশ করল। এক একটা দরজা পার হতে তা বন্ধ করা হল। অবশেষে এক সুন্দরী মহিলার নিকট পৌঁছল। তার সাথে ছিল একটি কিশোর ও মদের পাত্র।
মেয়েটি বলল, 'আমি আসলে তোমাকে কোন সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডেকে পাঠাইনি। আমি তোমাকে ডেকেছি আমার সাথে মিলন করার জন্য অথবা এই কিশোরকে খুন করার জন্য অথবা এই মদ পান করার জন্য। তাতে যদি তুমি অস্বীকার কর, তাহলে আমি চিৎকার ক'রে তোমার নামে অপবাদ দিয়ে তোমাকে লাঞ্ছিত করব।'
সুতরাং সে যখন নিরুপায় অবস্থা দেখল, তখন মদপানকে হাল্কা মনে করল। বলল, 'ঠিক আছে, আমাকে এক গ্লাস মদ দাও।' সে তা পান করল। কিন্তু সে দ্বিতীয় গ্লাস চাইল। অতঃপর নেশায় চুর হলে সে মেয়েটির সাথে ব্যভিচার করল এবং সবশেষে কিশোরটিকেও খুন ক'রে বসল।
সুতরাং তোমরা মদপান থেকে দূরে থাকো। যেহেতু বান্দার মধ্যে মদ ও ঈমান কখনই একত্র হতে পারে না। আর হলে অদূর ভবিষ্যতে একটি তার সঙ্গীকে বহিষ্কার ক'রে দেয়।" (নাসাঈ ৫৬৬৬, বাইহাক্বী ১৭১১৬নং)
আপাতদৃষ্টিতে ঋণ করা পাপ নয়, কিন্তু পাপের দিকে টেনে নিয়ে যায়। মানুষ প্রয়োজনে ঋণ ক'রে থাকে, কিন্তু তারপর পাপের দরজা খোলা যায়।
আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, রাসূলুল্লাহ নামাযের শেষ বৈঠকে সালাম ফিরার পূর্বে বিভিন্ন প্রার্থনা করার সময় ঋণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনাও করতেন। এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি তো ঋণ থেকে খুব বেশী আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকেন। (তার কারণ কী?) প্রত্যুত্তরে মহানবী বললেন,
((إِنَّ الرَّجُلَ إِذَا غَرِمَ حَدَّثَ فَكَذَبَ وَوَعَدَ فَأَخْلَفَ)).
"কারণ, মানুষ যখন ঋণগ্রস্ত হয়, তখন কথা বললে মিথ্যা বলে এবং অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে (ওয়াদা-খেলাফী করে)।" (বুখারী ৮৩২, মুসলিম ৫৮৯নং)
এইভাবে কত শত পাপ আরো কত শত পাপকে আহবান ও আকর্ষণ করে তার ইয়ত্তা নেই। যাঁরা অপরাধ জগতের খবর রাখেন, তাঁরা অবশ্যই জানেন, পাপ আরো একাধিক পাপের জন্ম দেয়।
📄 যে পাপের পাপী উম্মতী নয়
এমন কিছু পাপ আছে, যা করলে মুসলিম মুসলিমদের দলভুক্ত থাকে না, মহানবী-এর উম্মতী থাকে না। তাতে অনেক সময় সে সত্যি-সত্যিই ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়। নতুবা ইসলামের তরীকা ও আদর্শ থেকে বের হয়ে যায়, তবে কাফের হয়ে যায় না।
তকদীরের প্রতি বিশ্বাস না রাখা
তকদীরে বিশ্বাস রাখা ঈমানের ষষ্ঠ রুক্স। এ বিশ্বাস ছাড়া কোন মু'মিনের ঈমান পূর্ণ হতে পারে না এবং সে মুসলিম উম্মাহর কাফেলায় শামিল হতে পারে না। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ فَقَالَ لَهُ اكْتُبْ قَالَ رَبِّ وَمَاذَا أَكْتُبُ؟ قَالَ اكْتُبْ مَقَادِيرَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ، مَنْ مَاتَ عَلَى غَيْرِ هَذَا فَلَيْسَ مِنِّي ..
"নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্বপ্রথম যা সৃষ্টি করেন, তা হল কলম। অতঃপর তাকে বলেন, 'লিখো'। কলম বলল, 'হে আমার প্রতিপালক! আমি কী লিখব?' তিনি বললেন, 'কিয়ামত কায়েম হওয়া পর্যন্ত সকল জিনিসের তকদীর লিখো। এ (বিশ্বাস) ছাড়া যে অন্য কিছুর উপর মারা যাবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।" (আবু দাউদ ৪৭০২, সঃ জামে' ২০১৮নং)
প্রকৃত মু'মিন হতে হলে তকদীরের ভালো-মন্দের প্রতি ঈমান রাখতেই হবে। মহানবী বলেছেন,
لِكُلِّ شَيْءٍ حَقِيقَةٌ وَمَا بَلَغَ عَبْدٌ حَقِيقَةَ الْإِيمَانِ حَتَّى يَعْلَمَ أَنَّ مَا أَصَابَهُ لَمْ يَكُنْ لِيُخْطِئَهُ وَمَا أَخْطَأَهُ لَمْ يَكُنْ لِيُصِيبَهُ)).
"প্রত্যেক জিনিসের একটি প্রকৃতত্ব আছে। আর কোন বান্দা ঈমানের প্রকৃতত্বে ততক্ষণ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না, যতক্ষণ না সে এ ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয়ী হয় যে, যে মুসীবতে সে আক্রান্ত হয়েছে তা তার উপর আসারই ছিলো। আর যা তার উপর আসেনি তা আসারই ছিলো না।" (আহমাদ ২৭৪৯০, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ২১৫, সিঃ সহীহাহ ২৪৭১নং)
তকদীরের প্রতি ঈমান রাখা ছাড়া মুসলিম হওয়া সম্ভব নয়। আর তার মানেই তার কোন সৎকর্মই মহান আল্লাহ গ্রহণ করবেন না। মহানবী বলেছেন,
((ثَلَاثَةٌ لَا يَقْبَلُ اللَّهُ لَهُمْ صَرْفًا وَلَا عَدْلًا : عَاقٌ ، وَمَنَّانُ ، وَمُكَذِّبُ بِالْقَدَرِ)).
"তিন ব্যক্তির নিকট হতে আল্লাহ ফরয, নফল কিছুই গ্রহণ করবেন না; পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, দান করে প্রচারকারী এবং তকদীর অস্বীকারকারী ব্যক্তি।" (ত্বাবারানী ৭৫৪৭, সহীহুল জামে ৩০৬৫নং)
..... وَلَوْ أَنْفَقْتَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ مَا قَبْلَهُ اللَّهُ مِنْكَ حَتَّى تُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ وَتَعْلَمَ أَنَّ مَا أَصَابَكَ لَمْ يَكُنْ لِيُخْطِئَكَ وَأَنَّ مَا أَخْطَأَكَ لَمْ يَكُنْ لِيُصِيبَكَ وَلَوْ مُتَّ عَلَى غَيْرِ هَذَا لَدَخَلْتَ النَّارَ).
"---তুমি যদি আল্লাহর পথে উহুদ পাহাড় সমান সোনা ব্যয় কর, তবে তা আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ করবেন না, যতক্ষণ না তুমি ভাগ্যের প্রতি ঈমান আনবে। আর জানবে যে, যা তোমার নিকট পৌঁছবে, তাতে ভুল হবে না এবং যা তোমার ব্যাপারে ভুলে যাওয়া হয়েছে (অর্থাৎ, যে সুখ-দুঃখ তোমার ভাগ্যে নেই) তা তোমার নিকট পৌঁছবে না। এর বিপরীত বিশ্বাসের উপর তোমার মৃত্যু হলে, তুমি অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।" (আহমাদ ২১৫৮৯, ২১৬১১, আবু দাউদ ৪৭০১, বাইহাক্বী ২০৬৬৩, ইবনে হিব্বান ৭২৭নং)
আত্মা বলেন, রাসূলুল্লাহ -এর সাহাবী উবাদাহ বিন স্বামেতের ছেলে অলীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ক'রে জিজ্ঞাসা করলাম, 'মৃত্যুর সময় আপনার আব্বার অসিয়ত কী ছিল?' উত্তরে তিনি বললেন, 'আমাকে আমার আব্বা ডেকে বললেন, বেটা! তুমি আল্লাহকে ভয় কর। আর জেনে রেখো, তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর ভয় রাখতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহর প্রতি এবং তকদীরের ভালো-মন্দ সব কিছুর প্রতি ঈমান এনেছ। এ ঈমান ছাড়া মারা গেলে তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আমি আল্লাহর রসূল -কে বলতে শুনেছি যে, "নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্বপ্রথম যা সৃষ্টি করেন, তা হল কলম। অতঃপর তাকে বলেন, 'লিখো'। কলম বলল, 'হে আমার প্রতিপালক! আমি কী লিখব?' তিনি বললেন, 'তকদীর এবং অনন্তকাল ধরে যা ঘটবে তা লিখো।' (আহমাদ ২৩০৮১, তিরমিযী ২১৫৫, ৩৩১৯নং)
অগ্নিপূজারীদের বিশ্বাস, তকদীর বলে কিছু নেই। সুতরাং যে তকদীরে বিশ্বাস রাখে না, সে তাদের দলভুক্ত। মহানবী বলেছেন,
لِكُلِّ أُمَّةٍ مَجُوسٌ ومَجُوسُ أُمَّتِي الَّذِينَ يَقُولُونَ : لَا قَدَرَ ، إِنْ مَرِضُوا فَلَا تَعُودُوهُمْ وَإِنْ مَاتُوا فَلَا تَشْهَدُوهُمْ)).
"প্রত্যেক উম্মতের মাঝে মজুস (অগ্নিপূজক সম্প্রদায়) আছে। আর আমার উম্মতের মজুস তারা, যারা বলে, তকদীর বলে কিছু নেই।' ওরা যদি রোগাক্রান্ত হয় তাহলে ওদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করো না এবং ওরা মরলে ওদের জানাযায় অংশ গ্রহণ করো না।" (আহমাদ ৫৫৮৪, সহীহুল জামে' ৫০৩৯নং)
কোন কিছুকে অশুভ ধারণা করা, হাত গণনায় বিশ্বাস করা, যাদু করা
কোন প্রাণী বা বস্তুকে অশুভ ধারণা করা বা কুলক্ষণ মনে করা শির্ক। যেমন হাত গণনায় বিশ্বাস করা এবং যাদু করা শির্ক। সুতরাং বলাই বাহুল্য যে, শির্ক করলে কেউ মুসলিম থাকতে পারে না। আর সে জন্যই মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَطَيَّرَ وَلَا تُطْيِّرَ لَهُ ، وَلا تَكَهَّنَ وَلا تُكَذِّنَ لَهُ أَوْ سَحَرَ أَوْ سُحِرَ لَهُ)).
"সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি (কোন বস্তু, ব্যক্তি কর্ম বা কালকে) অশুভ লক্ষণ বলে মানে অথবা যার জন্য অশুভ লক্ষণ দেখা (পরীক্ষা) করা হয়, যে ব্যক্তি (ভাগ্য) গণনা করে অথবা যার জন্য (ভাগ্য) গণনা করা হয়। আর যে ব্যক্তি যাদু করে অথবা যার জন্য (বা আদেশে) যাদু করা হয়।" (ত্বাবারানী ১৪৭৭০, সহীহুল জামে' ৫৪৩৫নং)
আল্লাহর ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা
আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে কসম বা শপথ করা শির্ক। আর মুশরিক মুসলিমদের দলভুক্ত হতে পারে না। তাই মহানবী বলেছেন,
مَنْ حَلَفَ بِالأَمَانَةِ فَلَيْسَ مِنَّا )).
"যে ব্যক্তি আমানতের কসম খাবে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (আবু দাউদ ৩২৫৫, আহমাদ ৫/৩৫২, সিলসিলাহ সহীহাহ ৯৪নং)
তিনি আরো বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ حَلَفَ بِالْأَمَانَةِ ......
"সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমানতের কসম খায়---।" (আহমাদ ২২৯৮০, বায্যার ৪৪২৫, ইবনে হিব্বান ৪৩৬৩, হাকেম ৪/২৮৯, সহীহহুল জামে' ৫৪৩৬নং)
একদা ইবনে উমার একটি লোককে বলতে শুনলেন 'না, কা'বার কসম!' ইবনে উমার বললেন, 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কসম খেয়ো না। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি যে,
(( مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ ، فَقَدْ كَفَرَ أَوْ أَشْرَكَ )) .
“যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর নামে কসম করে, সে কুফরী অথবা শির্ক করে।" (আহমাদ, তিরমিযী ১৫৩৫, ইবনে হিব্বান, হাকেম ১/৫২, সহীহুল জামে' ৬২০৪নং)
মহানবী-এর তরীকা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া
মহানবী মুসলিমের জীবনের আদর্শ। মহান আল্লাহ তাঁকে আমাদের নমুনা বানিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
{لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا} (۲۱) سورة الأحزاب
"তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর (চরিত্রের) মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।" (আহযাবঃ ২১) সুতরাং তাঁর আদর্শ থেকে সরে কেউ কোন ভালো কাজ করলেও সে তাঁর দলভুক্ত নয়।
আনাস বলেন, তিন ব্যক্তি নবী-এর স্ত্রীদের বাসায় এলেন। তাঁরা নবী -এর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। অতঃপর যখন তাঁদেরকে এর সংবাদ দেওয়া হল তখন তাঁরা যেন তা অল্প মনে করলেন এবং বললেন, 'আমাদের সঙ্গে নবী-এর তুলনা কোথায়? তাঁর তো আগের ও পরের সমস্ত গোনাহ মোচন ক'রে দেওয়া হয়েছে। (সেহেতু আমাদের তাঁর চেয়ে বেশী ইবাদত করা প্রয়োজন)।' সুতরাং তাঁদের মধ্যে একজন বললেন, 'আমি সারা জীবন রাতভর নামায পড়ব।' দ্বিতীয়জন বললেন, 'আমি সারা জীবন রোযা রাখব, কখনো রোযা ছাড়ব না।' তৃতীয়জন বললেন, 'আমি নারী থেকে দূরে থাকব, জীবনভর বিয়েই করব না।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাঁদের নিকট এলেন এবং বললেন,
أَنْتُمُ الَّذِينَ قُلْتُمْ كَذَا وَكَذَا ؟ أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لأَخْشَاكُمْ لِلَّهِ ، وَأَتْقَاكُمْ لَهُ ، لَكِنِّي أَصُومُ وَأَفْطِرُ ، وأَصَلِّي وَأَرْقُدُ ، وَأَتَزَوَّجُ النَّسَاءَ ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي )).
"তোমরা এই এই কথা বলেছ? শোনো! আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের চেয়ে বেশী আল্লাহকে ভয় করি, তার ভয় অন্তরে তোমাদের চেয়ে বেশী রাখি। কিন্তু আমি (নফল) রোযা রাখি এবং রোযা ছেড়েও দিই, নামায পড়ি এবং নিদ্রাও যাই। আর নারীদের বিয়েও করি। সুতরাং যে আমার সুন্নত হতে মুখ ফিরিয়ে নিবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।" (বুখারী ৫০৬৩, মুসলিম ৩৪৬৯নং)
ইসলাম কোন ব্যাপারে বাড়াবাড়ি পছন্দ করে না, দ্বীনের ব্যাপারেও না। ইসলাম বৈরাগ্যবাদের অনুমোদন দেয় না। ইসলামের নীতি হল, 'অসংখ্য বন্ধন মাঝে লভিব মুক্তির স্বাদ।' সংসার-বিরাগী হয়ে ইবাদতও ইসলামে কাম্য নয়। বরং সংসার করাও এক প্রকার ইবাদত। সুতরাং সে নীতি থেকে বের হয়ে কেউ সেই নীতি-ওয়ালার দলভুক্ত থাকে কীভাবে? মহানবী বলেছেন,
(( النِّكَاحُ مِنْ سُنَّتِي، فَمَنْ لَمْ يَعْمَلْ بِسُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي ، وَتَزَوَّجُوا فَإِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمْ الْأُمَمَ، وَمَنْ كَانَ ذَا طَوْلِ فَلْيَنْكِحُ ، وَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَعَلَيْهِ بِالصِّيَامِ، فَإِنَّ الصَّوْمَ لَهُ وَجَاءُ)).
"বিবাহ হল আমার সুন্নাহ (তরীকা)। সুতরাং যে আমার সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত নয়। তোমরা বিবাহ কর। কারণ আমি অন্যান্য উম্মতের সামনে (সংখ্যাধিক্য নিয়ে) গর্ব করব। যে ব্যক্তি সমর্থ, যে যেন বিবাহ করে। আর যে অসমর্থ, তার জন্য রোযা রাখা আবশ্যক। কারণ রোযা যৌনেন্দ্রিয় দমনকারী।" (ইবনে মাজাহ ১৮৪৬, সঃ জামে' ৬৮০৭নং)
আবু আইয়ুব বলেন, নবী গাধার পিঠে সওয়ার হতেন, জুতা সিলাই করতেন, কামীসে তালি লাগাতেন, পশমের কাপড় পরতেন এবং বলতেন,
((مَن رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي)).
"যে আমার সুন্নাহ থেকে বৈমুখ হবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।" (ইবনে আসাকির, সঃ জামে' ৪৯৪৬নং)
মুসলিমদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করা
যার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা হয়, সে দলের লোক হতে পারে না। একজন শত্রুই পারে শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে। বলা বাহুল্য, যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে এবং হত্যা করতে উদ্যত হয়, সে কি মুসলিমদের দলভুক্ত হতে পারে? মহানবী বলেছেন,
(( مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السَّلَاحَ فَلَيْسَ مِنَّا ، وَمَنْ غَشَنَا فَلَيْسَ مِنَّا )) .
"সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমাদের উপর অস্ত্র তোলে। আর যে আমাদেরকে ধোঁকা দেয়, সেও আমাদের দলভুক্ত নয়।" (মুসলিম ২৯৪-২৯৫, ইবনে মাজাহ ২২২৪, তিরমিযী ১৩১৫, আবু দাউদ ৩৪৫২নং)
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
((مَنْ رَمَانَا بِاللَّيْلِ فَلَيْسَ مِنَّا )).
"যে ব্যক্তি রাত্রে আমাদের বিরুদ্ধে তীর নিক্ষেপ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (আহমাদ ৮২৭০, সঃ জামে' ৬২৭০নং)
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
مَنْ سَلَّ عَلَيْنَا السَّيْفَ فَلَيْسَ مِنَّا ..
"যে ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে তরবারি উন্মুক্ত করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (আহমাদ ১৬৫০০, ১৬৫৪১, মুসলিম ২৯২নং)
মুসলিম ব্যক্তি বিশেষের বিরুদ্ধে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু গুরুতর হল মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা ক'রে অস্ত্র ধারণ করা। মহানবী বলেছেন,
مَنْ خَرَجَ مِنَ الطَّاعَةِ وَفَارَقَ الْجَمَاعَةَ فَمَاتَ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً وَمَنْ قَاتَلَ تَحْتَ رَايَةٍ عُمِّيَّةٍ يَغْضَبُ لِعَصَبَةٍ أَوْ يَدْعُو إِلَى عَصَبَةٍ أَوْ يَنْصُرُ عَصَبَةً فَقُتِلَ فَقِتْلَةٌ جَاهِلِيَّةٌ وَمَنْ خَرَجَ عَلَى أُمَّتِي يَضْرِبُ بَرَّهَا وَفَاجِرَهَا وَلَا يَتَحَاشَ مِنْ مُؤْمِنِهَا وَلَا يَفِي لِذِي عَهْدٍ عَهْدَهُ فَلَيْسَ مِنِّى وَلَسْتُ مِنْهُ ..
"যে ব্যক্তি শাসকের আনুগত্য থেকে বের হয়ে এবং জামাআত থেকে পৃথক হয়ে মারা যাবে, সে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের মরণ মরবে। যে ব্যক্তি অন্ধ ফিতনার পতাকাতলে (হক-নাহক না জেনেই) যুদ্ধ করবে, অন্ধ পক্ষপাতিত্ব বা গোঁড়ামির ফলে ক্রুদ্ধ হবে অথবা অন্ধ পক্ষপাতিত্বের প্রতি আহবান করবে অথবা অন্ধ পক্ষপাতিত্বকে সাহায্য করবে, অতঃপর সে খুন হলে তার খুন জাহেলিয়াতের খুন। আর যে ব্যক্তি আমার উম্মতের বিরুদ্ধে তরবারি বের করে ভালো-মন্দ সকল মানুষকে হত্যা করবে এবং তার মুমিনকেও হত্যা করতে ছাড়বে না, চুক্তিবদ্ধ মানুষের চুক্তিও পূরণ করবে না, সে ব্যক্তি আমার দলভুক্ত নয় এবং আমিও তার দলভুক্ত নই।" (আহমাদ ৭৯৪৪, মুসলিম ৪৮৯২, নাসাঈ ৪১১৪নং)
যালেম শাসকদের যুলমে সহযোগিতা করা
ক্ষমতাসীন শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না, তার মানে এই নয় যে, ইসলাম-বিরোধী কাজে তার আনুগত্য করা যাবে। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
لا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ)).
“স্রষ্টার অবাধ্যতা করে কোন সৃষ্টির আনুগত্য নেই।” (ত্বাবারানী ১৪৭৯৫, আহমাদ ২০৬৫৩নং)
আর মহান আল্লাহর ব্যাপক নির্দেশ হল,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ} (২) سورة المائدة
"সৎ কাজ ও আত্মসংযমে তোমরা পরস্পর সহযোগিতা কর এবং পাপ ও সীমালংঘনের কাজে একে অন্যের সাহায্য করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে অতি কঠোর।" (মায়িদাহঃ ২)
সুতরাং জেনেশুনে কেউ অত্যাচারী ও দুর্নীতিপরায়ণ শাসকের তোষণ করলে, তার অত্যাচারে কোনও প্রকার সহযোগিতা বা সমর্থন করলে সে মুসলিমদের দলভুক্ত থাকে কীভাবে?
জাবের কর্তৃক বর্ণিত, একদা নবী কা'ব বিন উজরাহকে বললেন, "আল্লাহ তোমাকে নির্বোধ (আমীর) দের শাসনকাল থেকে আশ্রয় দিন।" কা'ব বললেন, 'নির্বোধ (আমীর) দের শাসনকাল কী?' তিনি বললেন,
أَمَرَاءُ يَكُونُونَ بَعْدِي لَا يَقْتَدُونَ بِهَدْيِي وَلَا يَسْتَنُّونَ بِسُنَّتِي فَمَنْ صَدَّقَهُمْ بِكَذِيهِمْ وَأَعَانَهُمْ عَلَى ظُلْمِهِمْ فَأُولَئِكَ لَيْسُوا مِنِّي وَلَسْتُ مِنْهُمْ وَلَا يَرِدُّوا عَلَيَّ حَوْضِي وَمَنْ لَمْ يُصَدِّقْهُمْ بِكَذِبِهِمْ وَلَمْ يُعِنْهُمْ عَلَى ظُلْمِهِمْ فَأُولَئِكَ مِنّي وَأَنَا مِنْهُمْ وَسَيَرِدُوا عَلَيَّ حَوْضِي يَا كَعْبَ بْنَ عُجْرَةَ الصَّوْمُ جُنَّةٌ وَالصَّدَقَةُ تُطْفِئُ الْخَطِيئَةَ وَالصَّلَاةُ قُرْبَانٌ أَوْ قَالَ بُرْهَانٌ يَا كَعْبَ بْنَ عُجْرَةَ إِنَّهُ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ لَحْمُ نَبَتَ مِنْ سُحْتِ النَّارُ أَوْلَى بِهِ يَا كَعْبَ بْنَ عُجْرَةَ النَّاسُ غَادِيَانِ فَمُبْتَاعٌ نَفْسَهُ فَمُعْتِقُهَا وَبَائِعٌ نَفْسَهُ فَمُوبَقُهَا)).
"আমার পরবর্তীকালে এক শ্রেণীর আমীর হবে; যারা আমার আদর্শে আদর্শবান হবে না এবং আমার তরীকাও অবলম্বন করবে না। সুতরাং যারা (তাদের দ্বারে দ্বারস্থ হয়ে) তাদের মিথ্যাবাদিতা সত্ত্বেও তাদেরকে সত্যবাদী মনে করবে এবং অত্যাচারে (ফতোয়া ইত্যাদি দ্বারা) তাদেরকে সহযোগিতা করবে তারা আমার দলভুক্ত নয় এবং আমিও তাদের দলভুক্ত নই। তারা আমার 'হওয' (কওসারের) পানি পান করার জন্য উপস্থিত হতে পারবে না।
আর যারা তাদের মিথ্যাবাদিতায় তাদেরকে সত্যবাদী জানবে না এবং অত্যাচারে তাদেরকে সহযোগিতা করবে না, তারা আমার দলভুক্ত, আমিও তাদের দলভুক্ত এবং আমার 'হওয' (কওসারের) পানি পান করার জন্য উপস্থিত হতে পারবে।
হে কা'ব বিন উজরাহ! রোযা হল ঢাল স্বরূপ, সদকাহ (দান-খয়রাত) পাপ মোচন করে এবং নামায হল (আল্লাহর) নৈকট্যদাতা অথবা তোমার (ঈমানের) দলীল।
হে কা'ব বিন উজরাহ! সে মাংস (দেহ) বেহেস্তে প্রবেশ করবে না; যা হারাম খাদ্যে প্রতিপালিত হয়েছে। তার জন্য তো দোযখই উপযুক্ত।
হে কা'ব বিন উজরাহ! মানুষের প্রাত্যহিক কর্মপ্রচেষ্টা দুই ধরনের হয়ে থাকে; কিছু মানুষ তো নিজেদেরকে (সৎকর্মের মাধ্যমে) ক্রয় করে (দোযখ থেকে) মুক্ত করে নেয়। আর কিছু মানুষ (অসৎকর্মের মাধ্যমে) নিজেদেরকে বিক্রয় করে ধ্বংস করে দেয়।" (আহমাদ ১৪৪৪১, বায্যার ১৬০৯ নং, তাবারানী, ইবনে হিব্বান, সহীহ তিরমিযী ৫০১ নং)
তীরন্দাজি বর্জন করা
যুদ্ধ-বিগ্রহে মহাশক্তি হল ক্ষেপণ। দূর থেকে নিক্ষেপ ক'রে শত্রু-নিধন করা। তীরন্দাজি করা সেই ক্ষেপণ-পদ্ধতির অন্যতম। যে নিজের মধ্যে প্রতিপালিত সেই শক্তিকে নষ্ট করবে এবং শেখার পর তা বর্জন করবে, সে মুসলিমদের দলভুক্ত ও তাদের আদর্শ-পথে থাকতে পারবে না। মহানবী বলেছেন,
مَنْ عُلِّمَ الرَّمْيَ ، ثُمَّ تَرَكَهُ ، فَلَيْسَ مِنَّا ، أَوْ فَقَدْ عَصَى)). رواه مسلم
"যে ব্যক্তিকে তীরন্দাজির বিদ্যা শিক্ষা দেওয়া হল, তারপর সে তা পরিত্যাগ করল, সে আমাদের দলভুক্ত নয় অথবা সে অবাধ্যতা করল।" (মুসলিম ৫০৫৮, ইবনে মাজাহ ২৮১৪নং)
নারী-পুরুষের পরস্পরের বেশ ধারণ করা
ইসলামের রীতি হল নারী-পুরুষ লেবাসে-পোশাকে পৃথক থাকবে। তাদের কেউ কারো লেবাস-পোশাক বা চাল-চলন গ্রহণ করবে না। একে অন্যের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে না। ইসলামের এই রীতি যে অগ্রাহ্য ও উল্লংঘন করবে, সে মুসলিমদের দলভুক্ত থাকবে না। মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِالرِّجَالِ مِنْ النِّسَاءِ وَلَا مَنْ تَشَبَّهَ بِالنِّسَاءِ مِنْ الرِّجَال)).
"মহিলাদের মধ্যে যে কেউ পুরুষদের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে আমাদের দলভুক্ত নয় এবং পুরুষদের মধ্যে যে কেউ মহিলাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (আহমাদ ৬৮৭৫, সঃ জামে' ৫৪৩৩নং)
বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করা
প্রত্যেক জাতির পৃথক বৈশিষ্ট্য আছে, নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য আছে। মুসলিম জাতির উচিত, নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা ক'রে চলা এবং ধর্মে, আচরণে, পরিচ্ছদে ও চরিত্রে বিজাতির অনুকরণ না করা। সে মানুষ কীভাবে স্বজাতির দলভুক্ত থাকতে পারে, যে মানুষ বিজাতির সভ্যতায় মুগ্ধ? সে মানুষ কীরূপে নিজ জাতিভুক্ত থাকতে পারে, যে মানুষ বিজাতির আনুরূপ্য ও সাদৃশ্য গ্রহণ করে? মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِغَيْرِنَا لَا تَشَبَّهُوا بِالْيَهُودِ وَلا بِالنَّصَارَى فَإِنَّ تَسْلِيمَ الْيَهُودِ الإِشَارَةُ بالأصابع وَتَسْلِيمَ النَّصَارَى الإِشَارَةُ بِالأَكُفَّ)).
"সে ব্যক্তি আমার দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি আমাদেরকে ছেড়ে অন্য কারো সাদৃশ্য অবলম্বন করে। তোমরা ইহুদীদের সাদৃশ্য অবলম্বন করো না, আর খ্রিস্টানদেরও সাদৃশ্য অবলম্বন করো না। ইয়াহুদীদের সালাম আঙ্গুলের ইশারায় এবং খ্রিস্টানদের সালাম হাতের ইশারায়।" (তিরমিযী ২৬৯৫নং, ত্বাবারানী, সিলসিলাহ সহীহাহ ২১৯৪নং)
তিনি আরো বলেছেন,
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ ».
"যে ব্যক্তি যে জাতির অনুকরণ করবে, সেই ব্যক্তি সেই জাতির দলভুক্ত।" (আবু দাউদ ৪০৩৩, সঃ জামে' ৬১৪৯নং)
لَيْسَ مِنَّا مَنْ عَمِلَ بِسُنَّةِ غَيْرِنَا)).
"সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমাদের ছাড়া অন্যদের রীতি অনুসারে কর্ম করে।" (দায়লামী, সঃ জামে' ৫৪৩৯নং)
কারো স্ত্রী বা ভৃত্যকে তার বিরুদ্ধে প্ররোচিত করা
অনেক সময় মানুষ পরের পিছনে লাগে, ফলে কিছু না পেলে তার স্ত্রী বা ভৃত্যকে তার বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে। অথবা নিজের কাছে পাওয়ার জন্য তাদের কান ভাঙ্গিয়ে প্রলুব্ধ করে। ভাবতে অবাক লাগে, অনেক সময় সেই পুরুষ কোন ধর্ষিতা যুবতী বা কিশোরীকে বিবাহ করতে চায় না, অথচ বিবাহিতা, রমিতা ও সন্তানবতীকে পছন্দ ক'রে তাকে জীবন-সঙ্গিনী বানাতে চায়। এরই নাম (অবৈধ) প্রেম। আর প্রেম বড় দেওয়ানা, বড় বেয়াড়া। এ জন্যই বহু স্বামী তার স্ত্রীর সাথে বাইরের কোন পুরুষের সাথে যোগাযোগ রাখতে দেয় না; যদিও সে আত্মীয়। যেমন চাচাতো-খালাতো-মামাতো-ফুফাতো ভাই বা স্কুলের সহপাঠীর সাথে যোগাযোগ রাখতে নিষেধ করে। আর উপহাসের পাত্রদের কথাই স্বতন্ত্র। বন্ধু, দেওর, বুনাই, নন্দাই প্রভৃতিরা আলাদা আনন্দ দেয় নারীকে। আর তা অনেক সময় স্বামীর দেওয়া আনন্দ থেকে শ্রেষ্ঠ হতে পারে। ফলে তখনই সৃষ্টি হয় সমস্যা।
---ভাবী কেমন আছো?
---আল্লাহ যেমন রাখে ভাই। সংসারে অভাব যাচ্ছে।
---আমরা তো বাড়ি করলাম, গাড়ি কিনেছি------।
---কেমন আছো? ছুটিতে কোথাও বেড়াতে যাওনি?
---কোথায় আর যাব? বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে চির-বন্দিনী। কোথাও নিয়ে যেতে চায় না। তার সময়ই নেই।
---আমরা তো অমুক জায়গা দেখে এলাম। অমুক সমুদ্র-তীরে মাঝে মধ্যে হাওয়া খেতে যাই।
---কী ব্যাপার? অলংকারশূন্য কেন? ছেঁড়া কাপড় কেন?
----কী করব? যার জন্য সাজগোজ করি, সে পছন্দ করে না।
---আমি তো বউকে ফুটন্ত গোলাপ ক'রে রাখব।
এই শ্রেণীর কথাবার্তায় এক প্রকার প্ররোচনা ও প্রলোভন রয়েছে। আর এ সকল কথা শুনে মহিলার দীর্ঘশ্বাস পড়ে। প্রলুব্ধ হয়, মনে আকাঙ্ক্ষা হয়, আক্ষেপ ও অনুতাপ আসে। ফলে সে স্বামীর কাছে তা দাবী ক'রে বসে, যা পূরণ করার ক্ষমতা তার নেই। বারবার বলার ফলে অশান্তি বাধে। সংসার-সুখ ধীরে ধীরে ক্ষয় পেতে থাকে। শেষমেষ সংসারের শিশমহল ভেঙ্গে চূর্ণ হয়ে যায়। অনেক সময় তালাক হয়, অনেক সময় স্বামীর বন্ধনে থেকেও আর একজনকে মনের স্বামী বানিয়ে নেয়। ২/৩ বা আরো বেশী সন্তানকে মা-হারা ক'রে নতুন নাগরের ইশারায় ঘর থেকে পলায়ন ক'রে প্রেম নগরে গিয়ে নতুন বাসা বাঁধে!
সে ক্ষেত্রে একজন পুরুষের সোনার সংসার পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ছেলেমেয়েরা আশ্রয়হীন হয়ে যায়। হয়তো-বা বড় হয়ে তারা অপরাধের পথ বেছে নেয়।
বংশের কুলমান নষ্ট হয়। থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাছারিও হয়, তাতে কত শত টাকা খরচ হয়ে যায়।
এত ক্ষতি যে পুরুষে করে, সে কি মুসলিমদের দলভুক্ত থাকতে পারে? কোন মুসলিমের চরিত্র কি এমন হতে পারে?
অনুরূপ খাদেম, চাকর বা দাস-দাসীর ক্ষেত্রেও নানা বিপত্তি আনে এক শ্রেণীর মানুষ, যাদের চরিত্র মুসলিমদের চরিত্র নয়। তাই মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ خَبَّبَ امْرَأَةً عَلَى زَوْجِهَا أَوْ عَبْدًا عَلَى سَيِّدِهِ ..
"যে ব্যক্তি কারো স্ত্রী অথবা ক্রীতদাসকে তার (স্বামী বা প্রভুর বিরুদ্ধে) প্ররোচিত করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (আহমাদ ৯১৫৭, আবু দাউদ ২১৭৭, হাকেম ২৭৯৫, ইবনে হিব্বান ৫৫৬০নং)
لَيْسَ مِنَّا مَنْ حَلَفَ بِالْأَمَانَةِ وَمَنْ خَبَّبَ عَلَى امْرِئٍ زَوْجَتَهُ أَوْ مَمْلُوكَهُ فَلَيْسَ مِنَّا)).
"সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমানতের কসম খায়। আর যে ব্যক্তি কোন স্ত্রীকে তার স্বামীর বিরুদ্ধে অথবা কোন দাসকে তার প্রভুর বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে, সে ব্যক্তিও আমাদের দলভুক্ত নয়।" (আহমাদ ২২৯৮০, বায্যার ৪৪২৫, ইবনে হিব্বান ৪৩৬৩, হাকেম ৪/২৮৯, সহীহহুল জামে' ৫৪৩৬নং)
শোকের সময় অস্বাভাবিক আচরণ করা
আত্মীয়-বিয়োগে অনেক মানুষ ধৈর্যধারণ করতে পারে না। ফলে অধৈর্য হয়ে এমন আচরণ করে, যা স্বাভাবিক নয়। যেমন চুল ছেঁড়ে, পরিহিত কাপড় ছেঁড়ে, মাথায় মারে, গালে থাপ্পড় মারে ইত্যাদি। আসলে এমন আচরণ সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাসী কোন মুসলিমের হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। তাই মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ حَلَقَ وَمَنْ سَلَقَ وَمَنْ خَرَقَ ..
"সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে (শোকের সময়) মাথা নেড়া করে, মাতম করে ও কাপড় ছেঁড়ে।" (আবু দাউদ ৩১৩২, নাসাঈ ১৮৬৫নং)
তিনি আরো বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ ضَرَبَ الخُدُودَ ، وَشَقَّ الجُيُوبَ، وَدَعَا بِدَعْوَى الجَاهِلِيَّةِ ))
"সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে (শোকের সময়) গালে আঘাত করে, বুকের কাপড় ছিঁড়ে এবং জাহেলিয়াতের ডাকের ন্যায় ডাক ছাড়ে।" (বুখারী ১২৯৪, ১২৯৭, মুসলিম ২৯৬নং)
ছিন্তাই বা ডাকাতি করা
ঈমান থাকতে মু'মিন চোর হতে পারে না, তেমনি প্রকাশ্যে অপরের মাল ছিনিয়ে নেওয়া মুসলিমের আচরণ হতে পারে না। কারণ মুসলিম জানে,
كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ ، دَمُهُ وَمَالُهُ وَعِرْضُهُ )). رواه مسلم
"প্রত্যেক মুসলিমের রক্ত, মাল এবং তার মর্যাদা অপর মুসলিমের উপর হারাম।" (মুসলিম ৬৭০৬নং)
এতদসত্ত্বেও যে ছিন্তাই করে, সে মুসলিমদের দলভুক্ত নয়। মহানবী বলেছেন,
مَنِ انْتَهَبَ نُهْبَةً مَشْهُورَةً فَلَيْسَ مِنَّا ..
"যে ব্যক্তি (প্রকাশ্যভাবে) ছিন্তাই করবে, সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়।" (আহমাদ ১২৪২২, ১৫২৫৩, আবু দাউদ ৪৩৯৩নং)
পরের জিনিস নিজের বলে দাবী করা
মুসলিম না পরের মাল চুরি করতে পারে, আর না-ই পরের জিনিসকে নিজের বলে দাবী করতে পারে। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
لَيْسَ مِنْ رَجُل ادَّعَى لِغَير أَبِيهِ وَهُوَ يَعْلَمُهُ إِلَّا كَفَرَ ، وَمَن ادَّعَى مَا لَيْسَ لَهُ ، فَلَيْسَ مِنَّا ، وَلَيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ ، وَمَنْ دَعَا رَجُلاً بِالْكُفْرِ ، أَوْ قَالَ : عَدُوَّ اللَّهِ ، وَلَيْسَ كَذَلِكَ إِلَّا حَارَ عَلَيْهِ )).
"যে কোন ব্যক্তি জ্ঞাতসারে অন্যকে নিজের বাপ বলে দাবী করে, সে কুফরী করে। যে ব্যক্তি এমন কিছু দাবী করে, যা তার নয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। আর সে যেন নিজস্ব বাসস্থান জাহান্নামে বানিয়ে নেয়। আর যে ব্যক্তি কাউকে 'কাফের' বলে ডাকে বা 'আল্লাহর দুশমন' বলে, অথচ বাস্তবে যদি সে তা না হয়, তাহলে তার (বক্তার) উপর তা বর্তায়।" (বুখারী ৩৫০৮, মুসলিম ২২৬নং)
ধোঁকাবাজি করা
কোন মুসলিম ধোঁকাবাজি ক'রে, ফাঁকি দিয়ে, প্রতারণা ক'রে বা ঠকিয়ে অন্যের সম্পদ হরণ করতে পারে না। ধোঁকাবাজি মুসলিমের আচরণ হতে পারে না। মহানবী বলেছেন,
((مَنْ غَشَنَا فَلَيْسَ مِنَّا ، وَالْمَكْرُ وَالْخِدَاعُ فِي النَّارِ)).
"যে ব্যক্তি আমাদেরকে ধোঁকা দেয় সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। ধোঁকাবাজ ও চালবাজ জাহান্নামে যাবে।" (ত্বাবারানীর কাবীর ১০০৮-৬, ও সাগীর ৭৩৮, ইবনে হিব্বান ৫৬৭, ৫৫৫৯, সহীহুল জামে' ৬৪০৮নং) তিনি আরো বলেছেন,
(( مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السَّلَاحَ فَلَيْسَ مِنَّا ، وَمَنْ غَشَنَا فَلَيْسَ مِنَّا )) .
"সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমাদের উপর অস্ত্র তোলে। আর যে আমাদেরকে ধোঁকা দেয়, সেও আমাদের দলভুক্ত নয়।" অন্য এক বর্ণনায় আছে, একদা রাসূলুল্লাহ (বাজারে) এক খাদ্যরাশির নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাতে নিজ হাত ঢুকালেন। তিনি আঙ্গুলে অনুভব করলেন যে, ভিতরের শস্য ভিজে আছে। বললেন, "ওহে ব্যাপারী! এ কী ব্যাপার?" ব্যাপারী বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! ওতে বৃষ্টি পড়েছে।' তিনি বললেন,
((أَفَلَا جَعَلْتَهُ فَوقَ الطَّعَامِ حَتَّى يَرَاهُ النَّاسُ ! مَنْ عَشَنَا فَلَيْسَ مِنَّا .
"ভিজেগুলোকে শস্যের উপরে রাখলে না কেন, যাতে লোকে দেখতে পেত? (জেনে রেখো!) যে আমাদেরকে ধোঁকা দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (মুসলিম ২৯৪-২৯৫,, ইবনে মাজাহ ২২২৪, তিরমিযী ১৩১৫, আবু দাউদ ৩৪৫২নং)
প্রতিযোগিতায় ধোঁকাবাজি করা
ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার সময় ঘোড়ার পশ্চাতে কিছু দ্বারা দ্রুত চলার সহায়ক বানিয়ে নিয়ে পুরস্কার জেতা বৈধ নয়। যেমন বৈধ নয় প্রতিযোগিতা চলাকালে ঘোড়া বদলে প্রথম স্থান দখল করা। (ত্বাবারানী, সঃ জামে' ৬১৯১নং)
সুর ক'রে কুরআন পাঠ না করা
মুসলিমদের রীতি হল, আল্লাহর কিতাব সুরেলা কণ্ঠে পাঠ করা। কেউ তা সুর ক'রে পড়তে না চাইলে সে তাদের পথ থেকে চ্যুত হয়ে যায়। মহানবী বলেছেন,
((زَيَّنُوا القُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ فَإِنَّ الصَّوْتَ الحَسَنَ يَزِيدُ القُرْآنَ حُسْناً)).
"তোমাদের (সুমিষ্ট) শব্দ দ্বারা কুরআনকে সৌন্দর্যমন্ডিত কর। কারণ, মধুর শব্দ কুরআনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।" (হাকেম ২১২৫, দারেমী ৩৫০১, সঃ জামে' ৩৫৮১নং)
لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَتَغَنَّ بِالْقُرْآنِ ..
"যে ব্যক্তি মিষ্ট স্বরে কুরআন পড়ে না, সে আমাদের মধ্যে নয়।" (অর্থাৎ আমাদের ত্বরীকা ও নীতি-আদর্শ বহির্ভূত।) (বুখারী ৭৫২৭, আবু দাউদ ১৪৭৩নং)
উক্ত হাদীসের বর্ণনাকারী আবু মুলাইকাকে জিজ্ঞাসা করা হল, 'হে আবু মুহাম্মাদ! যদি কারো কণ্ঠ সুন্দর না হয়, তাহলে আপনার রায় কী?' উত্তরে তিনি বললেন, 'যথাসাধ্য সুন্দর (সুরেলা) করার চেষ্টা করবে।'
বড়কে শ্রদ্ধা ও ছোটকে স্নেহ না করা
মুসলিম সমাজ হবে পরস্পরের প্রতি সম্প্রীতি ও সহানুভূতিশীল। তাদের বড়রা ছোটদেরকে স্নেহ করবে এবং ছোটরা বড়দেরকে শ্রদ্ধা করবে। উলামা ও বয়জ্যেষ্ঠদেরকে সম্মান দেবে এবং তাদের সঙ্গে আদবের সাথে কথাবার্তা বলবে। যারা তা করে না, তারা মুসলিমদের দলভুক্ত নয়। মহানবী বলেছেন,
(( لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرنَا ، وَيَعْرِفْ شَرَفَ كبيرنا )).
وفي روَايَةِ : (( حَقَّ كَبيرنَا )).
"সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং আমাদের বড়দের সম্মান জানে না।" (তিরমিযী ১৯২০নং) অন্য এক বর্ণনায় আছেঃ "আমাদের বড়দের অধিকার জানে না।" (আবু দাউদ ৪৯৪৫নং)
আর এক বর্ণনায় আছে,
لَيْسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَمْ يُحِلَّ كَبِيرَنَا وَيَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا حَقَّهُ)).
"সে ব্যক্তি আমার উম্মতের দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি আমাদের বড়দেরকে সম্মান দেয় না, ছোটদেরকে স্নেহ করে না এবং আলেমের অধিকার চেনে না।" (আহমাদ ২২৭৫৫, ত্বাবারানী, হাকেম, সহীহ তারগীব ৯৫ নং)
মানুষের শত্রু সাপ হত্যা না করা
বিষধর সাপ মানুষের শত্রু। এই জন্য তা দেখলে মেরে ফেলতে হয়, যাতে কোন মানুষ তার দংশনে মারা না যায়। কিন্তু অনেকে তা মারে না, এই ধারণা ক'রে যে, সাপ মারলে অন্য সাপে তার বদলা নেয় অথবা মারতে গেলে তেড়ে এসে আক্রমণ করে। অনেকে প্রাণীর অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে মানবাধিকার লংঘন করে। সুতরাং সে মুসলিমদের রীতি-নীতি থেকে দূরে সরে যায়। এই জন্য মহানবী বলেছেন,
اقْتُلُوا الْحَيَّاتِ كُلُّهُنَّ فَمَنْ خَافَ تَأْرَهُنَّ فَلَيْسَ مِنِّي ..
"তোমরা সর্ব প্রকার (বিষধর) সর্প হত্যা কর। যে ব্যক্তি কোন (বিষধর) সাপ দেখে এবং তার হামলার ভয়ে তাকে মেরে না ফেলে, সে আমার দলভুক্ত নয়।" (আবু দাউদ ৫২৫১, নাসাঈ ৩১৯৩, সহীহুল জামে' ৬২৪৭নং)
মোছ বা গোঁফ না ছাঁটা
গোঁফ ছাঁটা প্রকৃতিগত একটি সুন্নত। এই সুন্নতের বিরোধিতা ক'রে যে লম্বা গোঁফ রাখে, সে শেষনবী উম্মতের দলভুক্ত নয়। মহানবী বলেছেন,
((مَنْ لَمْ يَأْخُذُ مِنْ شَارِبِهِ فَلَيْسَ مِنَّا)).
"যে ব্যক্তি তার মোছ ছাঁটে না, সে আমার দলভুক্ত নয়।" (আহমাদ ১৯২৬৩, তিরমিযী ২৭৬১, নাসাঈর কুবরা ১৪, তাবারানী ৪৮৯৩-৪৮৯৬, সহীহুল জামে' ৬৫৩৩নং)
মোছাল ব্যক্তি মুসলিমদের দলভুক্ত নয়। যেহেতু লম্বা বা টাঙ্গি মোছ রাখার অভ্যাস অমুসলিমদের।
মহানবী বলেছেন,
((أَعْفُوا اللَّحَى وَخُذُوا الشَّوَارِبَ وَغَيِّرُوا شَيْبَكُمْ وَلَا تَشَبَّهُوا بِالْيَهُودِ وَالنَّصَارَى)).
"তোমরা দাড়ি বাড়াও, মোছ ছোট কর, পাকা চুলে (কালো ছাড়া অন্য) খেযাব লাগাও এবং ইয়াহুদ ও নাসারার সাদৃশ্য অবলম্বন করো না।" (আহমদ ৮৬৭২, সহীহুল জামে' ১০৬৭নং)
خَالِفُوا الْمُشْرِكِينَ أَحْفُوا الشَّوَارِبَ وَأَوْفُوا اللَّحَى ...
"তোমরা মুশরিকদের অন্যথাচরণ কর। তোমরা মোছ ছেঁটে ফেল এবং দাড়ি ছেড়ে দাও।" (বুখারী ৫৮৯২-৫৮৯৩, মুসলিম ৬২৫নং)
جُزُّوا الشَّوَارِبَ وَأَرْخُوا اللَّحَى خَالِفُوا الْمَجُوسَ ..
"মোছ ছেঁটে ও দাড়ি রেখে অগ্নিপূজকদের বৈপরীত্য কর।" (মুসলিম ৬২৬নং)
মুসলিমের উচিত, 'মুসলিম' নাম নিয়ে মুসলিমদের রীতি-নীতি মেনে চলে সেই নামকে সার্থক করা এবং উক্ত শ্রেণী ও আরো অন্যান্য অবাধ্যাচরণ ও পাপ-পঙ্কিলতায় লিপ্ত হয়ে নবীর উম্মত থেকে খারিজ হয়ে না যাওয়া।