📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 যে সকল অপরাধে কাফফারা আবশ্যক

📄 যে সকল অপরাধে কাফফারা আবশ্যক


'কাফ্ফারা' হল সেই জিনিস, যার মাধ্যমে অপরাধী অপরাধ থেকে মুক্ত ও ক্ষমাপ্রাপ্ত হতে পারে। কিছু পাপের প্রায়শ্চিত্তবিধান বর্ণিত হয়েছে ইসলামে। তার সাথে তওবাও করতে হয় মহান প্রতিপালকের নিকটে, যেহেতু তা পাপ।

প্রথমতঃ কসমের কাফ্ফারা
ভবিষ্যতে কোন কর্ম করা বা না করার উপরে তাকীদ আরোপ করার উদ্দেশ্যে অথবা শ্রোতার মনে কোন কথার সন্দেহ দূরীকরণের উদ্দেশ্যে কসম খাওয়া এক প্রকার ইবাদত এবং তাতে যার নামে কসম খাওয়া হয়, তার তাযীম উদ্দিষ্ট হয়। তাই আল্লাহ ও তাঁর নাম ও গুণাবলী ব্যতীত অন্য কিছুর কসম খাওয়া শির্ক। মহানবী বলেছেন,
(( إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَنْهَاكُمْ أَنْ تَحْلِفُوا بِآبَائِكُمْ، فَمَنْ كَانَ حَالِفًا ، فَلْيَحْلِفْ بِاللَّهِ ، أَوْ لِيَصْمُتْ )) . متفق عَلَيْهِ
"নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের বাপ-দাদার নামে শপথ করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং যে শপথ করতে চায়, সে যেন আল্লাহর নামে শপথ করে; নচেৎ চুপ থাকে।" (বুখারী ৬১০৮, ৬৬৪৬, মুসলিম ৪৩৪৬নং)
ইবনে উমার হতে বর্ণিত, তিনি একটি লোককে বলতে শুনলেন, 'না, কা'বার কসম!' ইবনে উমার বললেন, 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কসম খেয়ো না। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি যে,
(( مَنْ حَلَفَ بِغَيرِ اللهِ ، فَقَدْ كَفَرَ أَوْ أَشْرَكَ )) .
"যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর নামে কসম করে, সে কুফরী অথবা শির্ক করে।" (আহমাদ, তিরমিযী ১৫৩৫, ইবনে হিব্বান, হাকেম ১/৫২, সহীহুল জামে' ৬২০৪নং)
বলা বাহুল্য, বৈধ নয় গায়রুল্লাহর কসম খাওয়া, যেমন বৈধ নয় আল্লাহর নামেও মিথ্যা কসম খাওয়া।
কিন্তু যে বৈধ কসম খাওয়া হয়, তা রক্ষা করা আবশ্যক। ভঙ্গ করলে কাফফারা জরুরী হয়। অবশ্য কথার ভিতরে মুদ্রাদোষে যে সকল অনিচ্ছাকৃত নিরর্থক শপথ করা হয়, তা দয়াময় আল্লাহ ধরেন না। আর কসম ভাঙ্গার কাফফারা হলঃ-
(এক) দশজন মিসকীনকে মধ্যম ধরনের খাদ্যদান। পাকিয়ে এক বেলা খাওয়ানো অথবা প্রত্যেককে সওয়া এক কিলো ক'রে চাল দান করা। অথবা দশজন দরিদ্রকে বস্ত্র (লুঙ্গি-গেঞ্জি) দান করা। অথবা একটি ক্রীতদাস স্বাধীন করা।
(দুই) এ সবে অসমর্থ হলে তিনটি রোযা পালন করা।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا عَقَدتُمُ الْأَيْمَانَ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ ذَلِكَ كَفَّارَةُ أَيْمَانِكُمْ إِذَا حَلَفْتُمْ وَاحْفَظُوا أَيْمَانَكُمْ كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ) (۸۹) سورة المائدة
"আল্লাহ তোমাদেরকে দায়ী করবেন না তোমাদের নিরর্থক শপথের জন্য, কিন্তু যে সব শপথ তোমরা ইচ্ছাকৃতভাবে কর, সেই সকলের জন্য তিনি তোমাদেরকে দায়ী করবেন। অতঃপর এর কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) হল, দশজন দরিদ্রকে মধ্যম ধরনের খাদ্য দান করা; যা তোমরা তোমাদের পরিজনদেরকে খেতে দাও, অথবা তাদেরকে বস্ত্র দান করা, কিংবা একটি দাস মুক্ত করা। কিন্তু যার (এ সবে) সামর্থ্য নেই, তার জন্য তিন দিন রোযা পালন করা। তোমরা শপথ করলে এটিই হল তোমাদের শপথের প্রায়শ্চিত্ত। তোমরা তোমাদের শপথ রক্ষা কর। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করেন, যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।" (মায়িদাহঃ ৮৯)

মিথ্যা কসম খাওয়া ও তার কাফফারা
অতীতের কোন কর্ম করা বা না করার উপর মিথ্যা কসম খাওয়া বিশাল গোনাহ। তবে তাতে কোন কাফফারা নেই।
(( الكَبَائِرُ : الإِشْرَاكُ بِاللهِ ، وَعُقُوقُ الوَالِدَيْنِ ، وَقَتْلُ النَّفْسِ ، وَاليَمِينُ الغَمُوسُ )) .
"কাবীরাহ গোনাহ হচ্ছে আল্লাহর সাথে শির্ক করা। মাতা-পিতার অবাধ্যাচরণ করা, (অন্যায় ভাবে) কোন প্রাণ হত্যা করা, মিথ্যা কসম খাওয়া।" (বুখারী ৬৬৭৫, ৬৮৭০নং)
এর অন্য বর্ণনায় আছে, জনৈক মরুবাসী নবী-এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করল, 'মহাপাপ কী কী? হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "আল্লাহর সাথে শির্ক (অংশীদার স্থাপন) করা।" সে বলল, 'তারপর কী?' তিনি বললেন, "মিথ্যা কসম।" (সে বলল,) আমি বললাম, 'মিথ্যা কসম কী?' তিনি বললেন, "যার দ্বারা মুসলিমের মাল আত্মসাৎ করা হয়।" অর্থাৎ এমন কসম দ্বারা, যাতে সে মিথ্যাবাদী থাকে। (৬৯২০নং)
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلاً أُوْلَئِكَ لَا خَلَاقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ وَلَا يَنظُرُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ} (۷۷)
"যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথকে স্বল্প মূল্যে বিক্রয় করে, পরকালে তাদের কোন অংশ নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, আর তাদের দিকে চেয়ে দেখবেন না এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।" (আলে ইমরানঃ ৭৭)

গায়রুল্লাহর নামে কসমের কাফফারা সম্বন্ধে মহানবী বলেছেন,
((مَنْ حَلَفَ فَقَالَ فِي حَلِفِهِ : وَاللَّاتِ وَالْعُزَّى، فَلْيَقُلْ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ.
"যে ব্যক্তি হলফ করে তাতে বলে 'লাত ও উয্যার (কোন গায়রুল্লাহর) কসম' সে যেন 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে।" (বুখারী ৪৮৬০, মুসলিম ৪৩৪৯নং)

নযর পালন না করা ও তার কাফ্ফারা
সাধারণতঃ নযর মানা মকরূহ। এতে লাভ কিছু হয় না। বিশেষ ক'রে সেই নযর, যাতে মহান আল্লাহর সাথে শর্তারোপ করা হয়, 'আল্লাহ যদি তুমি এই কর, তাহলে আমি এই করব।' আর ধারণা করা হয় যে, এই বিনিময় শর্তে আল্লাহ অবশ্যই তাকে অভীষ্ট জিনিস দান করবেন! মহানবী বিশেষ ক'রে এই বাজি ধরার মানত মানতে নিষেধ ক'রে বলেছেন,
النَّدْرُ لَا يُقَدِّمُ شَيْئًا وَلَا يُؤَخِّرُهُ وَإِنَّمَا يُسْتَخْرَجُ بِهِ مِنَ الْبَخِيلِ ..
"নযর (তকদীর থেকে) কোন কিছুকে আগা-পিছা করতে পারে না। আসলে এর মাধ্যমে কেবল কূপণের মাল বের করা হয়।" (মুসলিম ৪৩২৫-৪৩৩১, আবু দাউদ ৩২৮৯, তিরমিযী ১৫৩৮, নাসাঈ ৩৮০১-৩৮০২, ইবনে মাজাহ ২১২নং)
অবশ্য নযর মানলে তা পালন করা ওয়াজেব। তা এক প্রকার ইবাদত, যা গায়রুল্লাহর নামে মানা শির্ক। মহানবী বলেছেন,
((مَنْ نَدْرَ أَنْ يُطِيعَ اللَّهَ فَلْيُطِعْهُ وَمَنْ نَدْرَ أَنْ يَعْصِيَهُ فَلَا يَعْصِهِ)).
"যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করার নযর মানে, সে যেন (তা পুরা করে) তার আনুগত্য করে এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতা করার নযর মানে, সে যেন (তা পুরণ না করে এবং) তাঁর অবাধ্যতা না করে।" (বুখারী ৬৬৯৬, ৬৭০০, সহীহুল জামে' ৬৪৪১)
কোন অবাধ্যতা বা পাপ কাজ করার মানত মানলে, তা পালন করা যাবে না, পরন্তু তাতে কাফফারা লাগবে। মহানবী বলেছেন,
لا نَدْرَ فِي مَعْصِيَةٍ وَكَفَّارَتُهُ كَفَّارَةٌ يَمِين ..
"(আল্লাহর) অবাধ্যতায় কোন নযর নেই। আর তার কাফ্ফারা হল কসমের কাফফারা।" (আবু দাউদ ৩২৯২, ৩২৯৪, তিরমিযী ১৫২৪, নাসাঈ ৩৮৩৪, ইবনে মাজাহ ২১২৫নং)
কোন এমন আনুগত্য করার নযর মানলে, যা করার ক্ষমতা সে রাখে না, তাতে কাফফারা লাগবে। কোন এমন আনুগত্য করার নযর মানলে, যা করার ক্ষমতা ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে অক্ষম হয়ে পড়ে, তাতে কাফফারা লাগবে।
অনির্দিষ্ট কোন নযর মানলে, যেমন এই বলা যে, 'আল্লাহর নামে নযর মানলাম', তা কাফফারা দিয়ে পালন করতে হবে।
আর কাফফারা হল কসমের কাফফারা। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
كَفَّارَةُ النَّدْرِ كَفَّارَةُ الْيَمِينِ ..
"নযরের কাফফারা হল কসমের কাফ্ফারা।" (মুসলিম ৪৩৪২, নাসাঈ ৩৮৩২নং)

যিহার করা ও তার কাফফারা
স্ত্রীর পিঠকে কোন মাহরাম মহিলা (মা-বোন ইত্যাদি)র পিঠের সাথে তুলনা করাকে 'যিহার' বলা হয়। অর্থাৎ, তার পিঠ যেমন আমার পক্ষে হারাম, তেমনি তোমার পিঠও আমার পক্ষে হারাম। এমন কথা বলে স্ত্রীকে নিজের জন্য হারাম করা অবশ্যই মহা অপরাধ। এমন অপরাধে স্ত্রী মা হয়ে যায় না এবং তালাকও হয় না, তবে কাফফারা লাগে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
الَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِنكُم مِّن نِّسَائِهِم مَّا هُنَّ أُمَّهَاتِهِمْ إِنْ أُمَّهَاتُهُمْ إِلَّا اللَّائِي وَلَدْتَهُمْ وَإِنَّهُمْ لَيَقُولُونَ مُنكَرًا مِّنَ الْقَوْلِ وَزُورًا وَإِنَّ اللَّهَ لَعَفُوٌّ غَفُورٌ} (۲) سورة المجادلة
"তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে 'যিহার' করে, (তারা জেনে রাখুক যে,) তাদের স্ত্রীরা তাদের মাতা নয়; যারা তাদেরকে জন্মদান করে, শুধু তারাই তাদের মাতা, তারা তো অসঙ্গত ও ভিত্তিহীন কথাই বলে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পাপমোচনকারী, পরম ক্ষমাশীল।" (মুজাদালাহঃ ২)

যিহারের কাফফারা
এমন গর্হিত ও অবাস্তব কথা বলার জন্য শাস্তিভোগ ও কাফফারা আদায় করতে হয়। যিহারের কাফফারার বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,
{وَالَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِن نَّسَائِهِمْ ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا قَالُوا فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مِّن قَبْلِ أَن يَتَمَاسًا ذَلِكُمْ تُوعَظُونَ بِهِ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ (۳) فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ مِن قَبْل أَن يَتَمَاسًا فَمَن لَّمْ يَسْتَطِعْ فَإِطْعَامُ سِتِّينَ مِسْكِينًا ذَلِكَ لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَلِلْكَافِرِينَ عَذَابٌ أَلِيمٌ} (٤) سورة المجادلة
"যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে 'যিহার' করে এবং পরে তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে, তাহলে (এর প্রায়শ্চিত্ত) একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাসের মুক্তিদান। এর দ্বারা তোমাদেরকে সদুপদেশ দেওয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন। কিন্তু যার এ সামর্থ্য থাকবে না, (তার প্রায়শ্চিত্ত) একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একাদিক্রমে দুই মাস রোযা পালন। যে তাতেও অসমর্থ হবে, সে ষাটজন অভাবগ্রস্তকে খাওয়াবে। এটা এই জন্য যে, তোমরা যেন আল্লাহ ও তাঁর রসূলে বিশ্বাস স্থাপন কর। এ হল আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি-বিধান। আর অবিশ্বাসীদের জন্য বেদনাদায়ক শাস্তি রয়েছে।" (মুজাদালাহঃ ৩-৪)
লক্ষণীয় যে, স্ত্রী হালাল করতে হলে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে কাফফারা আদায় করতে হবে।
(এক) একটি দাসমুক্ত করতে হবে।
(দুই) দাসমুক্তির সামর্থ্য বা ব্যবস্থা না থাকলে একটানা ২ মাস (৬০ দিন) রোযা রাখতে হবে। শরয়ী ওযর ছাড়া গ্যাপ দেওয়া যাবে না।
(তিন) তাতে অসমর্থ হলে ৬০ জন মিসকীন খাওয়াতে হবে। মোটামুটি ৭৫ কিলো চাল মিসকীনদেরকে দান করলেও চলবে।
পক্ষান্তরে যদি কোন স্ত্রী তার স্বামীকে বলে, 'তুমি আমার উপর আমার বাপের পিঠের মতো', তবে যিহার হবে না। কারণ যিহার একমাত্র স্বামীর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। এমতাবস্থায় সেই নারীর উপর কসমের কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে।

ঈলা ও তার কাফ্ফারা
সহবাসে সমর্থ স্বামীর চিরদিনকার জন্য বা চার মাসের অধিক দিনের জন্য স্ত্রী-সহবাস না করার কসম খাওয়াকে 'ঈলা' বলা হয়।
ঈলা করা হারাম। কারণ এতে স্ত্রীকে তার সহবাসের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, অথচ তার উক্ত অধিকার আদায় করা স্বামীর পক্ষে ওয়াজিব।
তবে হ্যাঁ, যদি কেউ ঈলা করতে চায়, তবে তা শর্ত-সাপেক্ষে করতে পারে এবং তার কাফফারা আদায় করতে হবে। ঈলা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,
{لِلَّذِينَ يُؤْلُونَ مِنْ نِسَائِهِمْ تَرَبُّصُ أَرْبَعَةِ أَشْهُرٍ فَإِنْ فَاءُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ (٢٢٦) وَإِنْ عَزَمُوا الطَّلَاقَ فَإِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ} (۲۲۷)
"যারা নিজেদের স্ত্রীর কাছে না যাওয়ার শপথ (কসম) করে, তারা চার মাস অপেক্ষা করবে। অতঃপর তারা যদি (মিলনে) ফিরে আসে, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। আর যদি তারা তালাকই দিতে (বিবাহ বিচ্ছেদ করতে) সংকল্পবদ্ধ হয়, তবে আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" (বাক্বারাহঃ ২২৬-২২৭)
আয়াতদ্বয়ের অর্থ হল যারা এরূপ কসম করবে তাদের জন্য চার মাসের অবকাশ থাকবে। অতএব স্বামী যদি চার মাসের মধ্যে কসম ভেঙ্গে স্ত্রীর কাছে আসে এবং কসমের কাফফারা আদায় ক'রে দেয়, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা ক'রে দেবেন। পক্ষান্তরে যদি চার মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও কসম না ভাঙ্গে, তাহলে তাকে তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করার ও কসমের কাফফারা আদায় করার আদেশ দেওয়া হবে। এতেও সম্মত না হলে তাকে স্ত্রীর দাবী অনুযায়ী তালাক দিতে বাধ্য করা হবে। সে নিজে তালাক না দিলে কাযী তালাক দিয়ে তাদেরকে আলাদা ক'রে দেবে।
আর যদি চার মাসের কম সময়ের শর্ত রেখে ঈলা করে, তাহলে তার নির্দেশ হচ্ছে এই যে, যদি কসম ভঙ্গ করে, তাহলে কাফফারা ওয়াজিব হবে। পক্ষান্তরে কসম পূর্ণ করলে স্ত্রীকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। উক্ত সময়ের মধ্যে সহবাসের দাবী করতে পারবে না এবং তাকে তালাকের আদেশ দেওয়া যাবে না। যেমন বুখারী-মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে "রাসূলুল্লাহে তাঁর স্ত্রীগণ থেকে এক মাসের ঈলা করেছিলেন, অতঃপর তিনি উনত্রিশ দিন পর অবতরণ করেন এবং বলেন, "মাস কখন কখন উনত্রিশ দিনেরও হয়।" (তফসীর ইবনে কাসীর)

ঈলার শর্তাবলীঃ
১। ঈলাকারীকে স্ত্রী সঙ্গমের ক্ষমতাবান হতে হবে, যদি সে স্ত্রী সঙ্গম করতে অক্ষম হয়, তবে ঈলা হবে না।
২। ঈলাকারীকে আল্লাহ শব্দ দ্বারা বা তাঁর গুণবাচক নাম দ্বারা কসম করতে হবে, তালাক বা নযর ইত্যাদির দ্বারা নয়।
৩। স্ত্রীর যোনিপথে সঙ্গম না করার কসম হতে হবে।
৪। সঙ্গম থেকে চার মাসের অধিক বিরত থাকার কসম হতে হবে।
৫। এমন স্ত্রী হতে হবে, যার সাথে সঙ্গম করা সম্ভব। (ইশা'রাত ফী আহকামিল কাফফারাত ৮০ পৃঃ)

ঈলার কাফফারা ৪-
ঈলা হল কসমের অন্তর্ভুক্ত, অতএব কসমের কাফফারাই হল তার কাফফারা। আর তা হল দশজন মিসকীনকে খাবার দেবে অথবা পোষাক দান করবে অথবা একজন দাস বা দাসী মুক্ত করবে, উক্ত সকল কাফফারা আদায়ে অসমর্থ হলে তিন দিন রোযা রাখবে।

মাসিকাবস্থায় স্ত্রী-সহবাস ও তার কাফফারা
মাসিকাবস্থায় সহবাস করা সর্বসম্মতভাবে হারাম। মহান আল্লাহ বলেন,
{وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذَى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاء فِي الْمَحِيضِ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّى يَطْهُرْنَ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللهُ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ} البقرة ٢٢٢
"লোকে তোমাকে রজঃস্রাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তুমি বল, তা অশুচি। সুতরাং তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রীসঙ্গ বর্জন কর এবং যতদিন না তারা পবিত্র হয়, (সহবাসের জন্য) তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হয়, তখন তাদের নিকট ঠিক সেইভাবে গমন কর, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাপ্রার্থিগণকে এবং যারা পবিত্র থাকে, তাদেরকে পছন্দ করেন।" (বাক্বারাহঃ ২২২)

মাসিকাবস্থায় সঙ্গম করা এক প্রকার কুফরী। মহানবী বলেছেন,
مَنْ أَتَى حَائِضًا أَوْ امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا أَوْ كَاهِنَا فَصَدَّقَهُ فَقَدْ بَرِئْ مِمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ عَلَى مُحَمَّدٍ عَلَيْهِ الصَّلَاةِ وَالسَّلَامُ».
"যে ব্যক্তি কোন ঋতুমতী স্ত্রী (মাসিক অবস্থায়) সঙ্গম করে অথবা কোন স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাস করে, অথবা কোন গণকের নিকট উপস্থিত হয়ে (সে যা বলে তা) বিশ্বাস করে, সে ব্যক্তি মুহাম্মাদ-এর অবতীর্ণ কুরআনের সাথে কুফরী করে।" (অর্থাৎ কুরআনকেই সে অবিশ্বাস ও অমান্য করে। কারণ, কুরআনে এ সব কুকর্মকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।) (আহমাদ ৯২৯০, আবু দাউদ ৩৯০৬, তিরমিযী ১৩৫, ইবনে মাজাহ ৬৩৯, বাইহাক্বী ১৪৫০৪নং)
কেউ মাসিকাবস্থায় সহবাস করে ফেললে সে গোনাহগার হবে এবং তার জন্য কাফফারা আদায় করতে হবে। আর তা হল কিছু ওলামার মতে মাসিক আসার প্রথম দিকে হলে এক দীনার (সওয়া চার গ্রাম পরিমাণ সোনা অথবা তার মূল্য), আর শেষের দিকে হলে এর অর্ধেক পরিমাণ সাদকা করা। (আবু দাউদ ২৬৫নং)
ইবনে আব্বাস নবী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যে ব্যক্তি মাসিকাবস্থায় স্ত্রী সহবাস করে, তার সম্পকে নবী বলেছেন, "সে এক দীনার বা অর্ধ দীনার সাদকা করবে।" (আবু দাউদ ২৬৪, নাসাঈ ২৮৯, ইবনে মাজাহ ৬৪০, হাকেম ৬১২নং)
সুতরাং এক দীনার বা অর্ধ দীনার সাদকা করার ব্যাপারে এখতিয়ার থাকবে। যে কোন একটা আদায় ক'রে দিলে কাফফারা আদায় হয়ে যাবে। (আল-মুগনী ১/৪১৮)
আর যদি কেউ হায়েয বন্ধ হওয়ার পর গোসল করার পূর্বেই সহবাস করে ফেলে, তবে সহীহ মত অনুযায়ী তার জন্য কাফফারা আদায় করতে হবে না। কেননা যে অশুচিতার কারণে সহবাস নিষিদ্ধ ছিল, তা ঋতু বন্ধ হওয়ার কারণে দূর হয়ে গেছে। আর কাফফারা তখনই দিতে হবে, যখন মাসিকাবস্থায় সহবাস হবে, অন্য সময় নয়। (আল-মুগনী ১/৪১৮)
মাসিকাবস্থায় সহবাস হওয়াতে যদি স্ত্রী সম্মত থাকে, তবে স্ত্রীর উপরও কাফফারা ওয়াজিব হবে। আর যদি স্ত্রীর ইচ্ছার বিপরীত জোরপূর্বক সহবাস হয়, তবে তার উপর কাফফারা ওয়াজিব নয়। (আল-মুগনী ১/৪১৯)
জ্ঞাতব্য যে, মাসিক ও প্রসবোত্তর স্রাবে স্ত্রী-সহবাসের বিধান একই। (আল-মুগনী ১/৪১৯)

রমযানের রোযা অবস্থায় স্ত্রীসঙ্গম ও তার কাফ্ফারা
সঙ্গম বলতে স্ত্রী-যোনীতে স্বামীর (সুপারির মত) লিঙ্গাগ্র প্রবেশ হলেই রোযা নষ্ট হয়ে যায়; তাতে বীর্যপাত হোক, আর নাই হোক। তদনুরূপ অবৈধভাবে পায়খানা-দ্বারে লিঙ্গাগ্র প্রবেশ করালেও রোযা বাতিল গণ্য হয়।
জ্ঞাতব্য যে, স্ত্রীর পায়খানাদ্বারে সঙ্গম করা মহাপাপ এবং এক প্রকার কুফরী।
বলা বাহুল্য রোযা অবস্থায় যখনই রোযাদার স্ত্রী-মিলন করবে, তখনই তার রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। সুতরাং এ মিলন যদি রমযানের দিনে সংঘটিত হয় এবং রোযা রোযাদারের জন্য ফরয হয়, (অর্থাৎ রোযা কাযা করা তার জন্য বৈধ না হয়) তাহলে ঐ মিলনের ফলে যথাক্রমে ৫টি জিনিস সংঘটিত হবে:-
(ক) কাবীরা গোনাহ; আর তার ফলে তাকে তওবা করতে হবে।
(খ) তার রোযা বাতিল হয়ে যাবে।
(গ) তাকে ঐ দিনের অবশিষ্ট অংশ পানাহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে।
(ঘ) ঐ দিনের রোযা (রমযান পর) কাযা করতে হবে।
(ঙ) বৃহৎ কাফফারা আদায় করতে হবে। আর তা হল, একটি ক্রীতদাসকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতে হবে। তাতে সক্ষম না হলে, লাগাতার (একটানা) দুই মাস রোযা রাখতে হবে। আর তাতে সক্ষম না হলে, ৬০ জন মিসকীনকে খাদ্যদান করতে হবে।
এ ব্যাপারে মূল ভিত্তি হল, মহান আল্লাহর এই বাণী, أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَى نِسَائِكُمْ ...) الآية অর্থাৎ, রোযার রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রী-সম্ভোগ হালাল করা হয়েছে। (বাক্বারাহঃ ১৮৭)
আর আবু হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা নবী-এর কাছে বসে ছিলাম। এমন সময় তাঁর নিকট এক ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমি ধ্বংসগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।' তিনি বললেন, "কোন জিনিস তোমাকে ধ্বংসগ্রস্ত করে ফেলল?" লোকটি বলল, 'আমি রোযা অবস্থায় আমার স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে ফেলেছি।' এ কথা শুনে আল্লাহর রসূল তাকে বললেন, "তুমি কি একটি ক্রীতদাস মুক্ত করতে পারবে?" লোকটি বলল, 'জী না।' তিনি বললেন, "তাহলে কি তুমি একটানা দুই মাস রোযা রাখতে পারবে?” সে বলল, 'জী না।' তিনি বললেন, "তাহলে কি তুমি ৬০ জন মিসকীনকে খাদ্যদান করতে পারবে?” লোকটি বলল, 'জী না।' --- (বুখারী ১৯৩৭, মুসলিম ১১১১নং)

যে মহিলার উপর রোযা ফরয, সেই মহিলা সম্মত হয়ে রমযানের দিনে স্বামী-সঙ্গম করলে তারও উপর কাফফারা ওয়াজেব। অবশ্য তার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও স্বামী যদি তার সাথে জোরপূর্বক সহবাস করতে চায়, তাহলে তার জন্য যথাসাধ্য তা প্রতিহত করা জরুরী। রুখতে না পারলে তার উপর কাফফারা ওয়াজেব নয়।
এই জন্যই যে মহিলা জানে যে, তার স্বামীর কামশক্তি বেশী; সে তার কাছে প্রেম-হৃদয়ে কাছাকাছি হলে নিজের যৌন-পিপাসা দমন রাখতে পারে না, সেই মহিলার জন্য উচিত, রমযানের দিনে তার কাছ থেকে দূরে-দূরে থাকা এবং প্রসাধন ও সাজ-সজ্জা না করা। তদনুরূপ স্বামীর জন্যও উচিত, পদস্থলনের জায়গা থেকে দূরে থাকা এবং রোযা থাকা অবস্থায় স্ত্রীর কাছ না ঘেঁষা; যদি আশঙ্কা হয় যে, উগ্র যৌন-কামনায় সে তার মনকে কাবু রাখতে পারবে না। কারণ, এ কথা বিদিত যে, প্রত্যেক নিষিদ্ধ জিনিসই ঈপ্সিত। (দ্রঃ আশ্-শারহুল মুমতে' ৬/৪১৫, সাবউনা সুয়াল ৭০নং, ফাইযুর রাহীমির রাহমান, ফী আহকামি অমাওয়াইযি রামাযান ৬১পৃঃ)

পক্ষান্তরে যদি রমযানের রোযা কাযা রাখতে গিয়ে স্ত্রী-সঙ্গম ক'রে ফেলে, তাহলে তার ফলে কাফফারা নেই। আর তার জন্য ঐ দিনের বাকী অংশ পানাহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকাও জরুরী নয়। অবশ্য তার গোনাহ হবে। কারণ, সে ইচ্ছাকৃত একটি ওয়াজেব রোযা নষ্ট করে তাই। (আশ-শারহুল মুমতে' ৬/৪১৩, আহকামুন মিনাস সিয়াম, ক্যাসেট, ইবনে উষাইমীন)
মুসাফির যদি সফরে থাকা অবস্থায় রোযা রেখে স্ত্রী-সহবাস ক'রে ফেলে, তাহলে তার জন্য কেবল কাযা ওয়াজেব, কাফ্ফারা ওয়াজেব নয়। যেমন, ঐ দিনের বাকী অংশ পানাহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকাও তার জন্য জরুরী নয়। কেননা, সে মুসাফির। আর মুসাফিরের জন্য সফরে রোযা ভাঙ্গা (এবং পরে কাযা করা) বৈধ।
অনুরূপভাবে এমন রোগী, যার রোগের জন্য রোযা ভাঙ্গা বৈধ ছিল; কিন্তু কষ্ট ক'রে সে রোযা রেখেছিল। সে যদি তার স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে, যে সেই দিনেই মাসিক থেকে পবিত্রা হয়েছে, তাহলে তারও গোনাহ হবে না; অবশ্য কাযা ওয়াজেব। (আশ্-শারহুল মুমতে' ৬/৪১৩)
যে ব্যক্তি যে বৈধ ওযরের ফলে রোযা বন্ধ রেখেছিল, দিনের মধ্যে তার সেই ওযর দূর হয়ে যাওয়ার পর যদি স্ত্রী-সহবাস করে, তাহলে তার জন্য কাফফারা ওয়াজেব নয়। যেমন, কোন মুসাফির যদি দিন থাকতে রোযা না রেখে ঘরে ফিরে দেখে যে, তার স্ত্রী সেই দিনেই (ফজরের পর) মাসিক থেকে পবিত্রা হয়েছে, তাহলে সঠিক মতে তাদের জন্য সঙ্গম বৈধ। এতে স্বামী-স্ত্রীর কোন প্রকার পাপ হবে না। যেহেতু ঐ দিন শরীয়তের অনুমতিক্রমে তাদের জন্য মান্য নয় এবং ঐ দিনে রোযা না রাখাও তাদের পক্ষে অনুমোদিত। (ঐ ৬/৪২১)
যদি কোন ব্যক্তি সুস্থ অবস্থায় রোযা রেখে স্ত্রী-সহবাস করার পর দিন থাকতেই এমন অসুস্থ হয়ে পড়ে, যাতে তার জন্য রোযা ভাঙ্গা বৈধ, তাহলেও তার জন্য কাফফারা ওয়াজেব; যদিও তার জন্য দিনের শেষভাগে (অসুস্থ হওয়ার পর) রোযা ভাঙ্গা বৈধ। কারণ, সহবাসের সময় সে তাতে অনুমতিপ্রাপ্ত ছিল না।
তদনুরূপ যে ব্যক্তি দিনের প্রথমাংশে সহবাস করার পর সফর করে তাহলে তার জন্যও কাফফারা ওয়াজেব; যদিও সফর করার পরে ঐ দিনেই তার জন্য রোযা ভাঙ্গা বৈধ। কেননা, রোযা ভাঙ্গা বৈধ হওয়ার পূর্বেই সে (রমযান) মাসের মর্যাদা ক্ষুন্ন করেছে। (ঐ ৬/৪২২)
যদি কোন ব্যক্তি (কাফফারা থেকে রেহাই পাওয়ার বাহানায়) প্রথমে কিছু খেয়ে অথবা পান করে তারপর স্ত্রী-সঙ্গম করে, তাহলে তার পাপ অধিক। যেহেতু সে রমযানের মর্যাদাকে পানাহার ও সঙ্গমের মাধ্যমে ডবল ক'রে নষ্ট করেছে। বৃহৎ কাফফারা তার হক্কে অধিক কার্যকর। আর তার ঐ বাহানা ও ছলনা নিজের ঘাড়ে বোঝা স্বরূপ। তার জন্য খাঁটি তওবা ওয়াজেব। (সাবউনা সুয়াল ৪৭নং)
জ্ঞাতব্য যে, যার জন্য রোযা রাখা ফরয, তার রমযান মাসে দিনে রোযা অবস্থায় সঙ্গম ছাড়া অন্য কোন কারণে বা অন্য কোন রোযায় কাফফারা ওয়াজেব হয় না, বলা বাহুল্য, নফল রোযা রেখে, কসমের কাফফারার রোযা রেখে, কোন অসুবিধার ফলে ইহরাম অবস্থায় কোন নিষিদ্ধ কাজ ক'রে ফেললে তার জরিমানার রোযা রেখে, তামাত্তু হজ্জ করতে গিয়ে কুরবানী দিতে না পেরে তার বিনিময়ে রোযা রেখে অথবা নযরের রোযা রেখে স্ত্রী-সহবাস ক'রে ফেললে কাফফারা ওয়াজেব নয়। যেমন সঙ্গম না করে (স্ত্রী-যোনীর বাইরে) বীর্যপাত করে ফেললেও কাফফারা ওয়াজেব নয়। (আশ্-শারহুল মুমতে' ৬/৪২২-৪২৩) অবশ্য কাযা তো ওয়াজেবই।
জ্ঞাতব্য যে, ব্যভিচার করে ফেললেও সহবাসের মতই কাফফারা ওয়াজেব। (আল-ফাওয়াইদুল জালিয়্যাহ, ইবনে বায ১১৯পৃঃ) তাছাড়া ব্যভিচারের সাজা ও তওবা তো আছেই। (আমার 'রমযানের ফাযায়েল ও মাসায়েল' বই থেকে)

ইহরাম অবস্থায় শিকার করার কাফফারা
ইহরাম অবস্থায় বা হারাম সীমানার শিকার করা ও তার কাফফারা
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَأَنتُمْ حُرُمٌ وَمَن قَتَلَهُ مِنكُم مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاء مِّثْلُ مَا قَتَلَ مِنَ النَّعَمِ يَحْكُمُ بِهِ ذَوَا عَدْلٍ مِّنكُمْ هَدْيًا بَالِغَ الْكَعْبَةِ أَوْ كَفَّارَةٌ طَعَامُ مَسَاكِينَ أَو عَدْلُ ذلك صِيَامًا لِّيَذُوقَ وَبَالَ أَمْرِهِ عَفَا اللَّهُ عَمَّا سَلَفَ وَمَنْ عَادَ فَيَنتَقِمُ اللَّهُ مِنْهُ وَاللَّهُ عَزِيزٌ ذُو انتقام} (৯৫) সূরা আল-মায়েদা
"হে বিশ্বাসিগণ! ইহরামে থাকা অবস্থায় তোমরা শিকার জন্তু বধ করো না, তোমাদের মধ্যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে তা বধ করলে, যা বধ করল তার বিনিময় হচ্ছে অনুরূপ গৃহপালিত জন্তু, যার মীমাংসা করবে তোমাদের মধ্যে দু'জন ন্যায়বান লোক কা'বাতে প্রেরিতব্য কুরবানীরূপে। অথবা ওর বিনিময় হবে দরিদ্রকে অন্ন দান করা কিংবা সমপরিমাণ রোযা পালন করা, যাতে সে আপন কৃতকর্মের ফল ভোগ করে। যা গত হয়েছে আল্লাহ তা ক্ষমা করেছেন। কিন্তু কেউ তা পুনরায় করলে, আল্লাহ তার নিকট হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন এবং আল্লাহ পরাক্রমাশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী।" (মায়িদাহঃ ৯৫)

ফিয়াহ দেওয়ার দুটি নিয়মঃ
প্রথমত: যে পশু শিকার করেছে, যদি তার মতো জন্তু পাওয়া যায়, তবে তিন রকমভাবে কাফফারা আদায় করতে পারবে:-
১। যে শিকার হত্যা করেছে, তার অনুরূপ জন্তু যবেহ ক'রে সমস্ত গোশত মক্কার দরিদ্রদের মাঝে বন্টন ক'রে দিতে হবে।
২। তার বা তার মতো জন্তুর দাম ধরে খাবার ক্রয় ক'রে মিসকীনদের মাঝে বন্টন করতে হবে, প্রত্যেক মিসকীনকে অর্ধ সা' (সওয়া এক কিলো) দিতে হবে।
৩। অথবা সেই খাবার যত জন মিসকীনকে দেওয়া যাবে, তার সংখ্যা পরিমাণ রোযা রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত: যে পশু শিকার করেছে যদি তার মতো না পাওয়া যায়, তাহলে উপরে বর্ণিত দুই ও তিন নম্বর নিয়মে কাফফারা আদায় করতে হবে।

অনিচ্ছাকৃত নরহত্যা ও তার কাফফারা
এ ব্যাপারে ইতিপূর্বে খুনের বদলে খুনের বর্ণনায় উল্লিখিত হয়েছে যে, যে হত্যাকান্ডে মারার কোন ইচ্ছাই থাকে না। কিন্তু ভুল ক'রে তার হাতে হত্যাকান্ড ঘটে যায় অথবা কোনভাবে সে হত্যার কারণ প্রতিপন্ন হয়, তাহলে তাতে ক্বিস্বাস নেই; আছে রক্তপণ। আদায় করতে হবে তার (আস্বাবা) ওয়ারেসদেরকে। আছে কাফফারা। এতে পাপ হয় না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَا كَانَ لِمُؤْمِن أَن يَقْتُلَ مُؤْمِنًا إِلَّا خَطَئًا وَمَن قَتَلَ مُؤْمِنًا خَطَئًا فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ وَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ إِلَّا أَن يَصَّدَّقُوا فَإِن كَانَ مِن قَوْمٍ عَدُوٌّ لَّكُمْ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ وَإِن كَانَ مِن قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ مِّيثَانٌ فَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ وَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةً فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ تَوْبَةً مِّنَ اللَّهِ وَكَانَ اللهُ عَلِيمًا حَكِيمًا} (۹۲) النساء
"কোন বিশ্বাসীকে হত্যা করা কোন বিশ্বাসীর জন্য সংগত নয়, তবে ভুলবশতঃ হত্যা ক'রে ফেললে সে কথা স্বতন্ত্র। কেউ কোন বিশ্বাসীকে ভুলবশতঃ হত্যা করলে এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা এবং তার (নিহতের) পরিজনবর্গকে রক্তপণ অর্পণ করা বিধেয়। তবে যদি তারা ক্ষমা ক'রে দেয়, তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু যদি সে তোমাদের শত্রু পক্ষের লোক হয় এবং বিশ্বাসী হয়, তবে এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা বিধেয়। আর যদি সে এমন এক সম্প্রদায়ভুক্ত হয়, যার সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ, তবে তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ অর্পণ এবং এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা বিধেয়। কেউ যদি (উক্ত দাস) না পায় (বা মুক্ত করার সামর্থ্য না রাখে), তাহলে সে একাদিক্রমে দু'মাস রোযা রাখবে। তওবার (সংশোধনের) জন্য এ আল্লাহর বিধান। বস্তুতঃ আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।" (নিসাঃ ৯২)

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 যে পাপ পূর্ববর্তী জাতির ব্যাধি

📄 যে পাপ পূর্ববর্তী জাতির ব্যাধি


কিছু পাপ এই উম্মত করে, প্রকৃত প্রস্তাবে তা পূর্ববর্তী বহু জাতির পাপ, প্রাচীন কালের পাপ। তার মধ্যে একটি পাপ হল হিংসা। হিংসা পৃথিবীর মানুষের ইতিহাসে সর্বপ্রথম করে ইবলীস আদমের প্রতি। তারপর আদম সন্তানের মধ্যে করে কাবীল হাবীলের প্রতি। পরিণামে ইবলীস বিতাড়িত শয়তান ও আদম সন্তানের চিরশত্রু হয়েছে। আর কাবীল হাবীলকে হত্যা ক'রে চিরলাঞ্ছিত ও চিরপাপী হয়েছে। মহানবী বলেছেন,
(( لَيْسَ مِنْ نَفْسٍ تُقْتَلُ ظُلْماً إِلَّا كَانَ عَلَى ابْنِ آدَمَ الأَوَّلِ كِفْلٌ مِنْ دَمِهَا ، لأَنَّهُ كَانَ أَوَّلَ مَنْ سَنَّ القَتَلَ )). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"যে কোন প্রাণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হবে, তার পাপের একটা অংশ আদমের প্রথম সন্তান (কাবীল) এর উপর বর্তাবে। কেননা, সে হত্যার রীতি সর্বপ্রথম চালু করেছে।" (বুখারী ৩৩৩৫, মুসলিম ৪৪৭৩, তিরমিযী ২৬৭৩, নাসাঈ ৩৯৮৫, ইবনে মাজাহ ২৬১৬নং)
হিংসা একটি কদর্য আচরণ। হিংসা থেকেই আসে অহংকার, হিংসা থেকেই আসে বিদ্বেষ ও ঘৃণা। হিংসা থেকেই আসে অসম্মান, অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ। আর তা হল পূর্ববর্তী জাতিসমূহের উল্লেখযোগ্য একটি ব্যাধি। মহানবী নিজ উম্মতের মাঝে সে ব্যাধি লক্ষ্য ক'রে বলেছেন,
((دَبَّ إِلَيْكُمْ دَاءُ الأُمَمِ قَبْلَكُمْ : الْحَسَدُ وَالْبَغْضَاءُ ، هِيَ الْحَالِقَةُ ، لَا أَقُولُ تَحْلِقُ الشَّعَرَ، وَلَكِنْ تَحْلِقُ الدِّينَ ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ ، لَا تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا ، وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا ، أَفَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِمَا يُثْبِتُ ذَاكُمْ لَكُمْ ؟ أَفْشُوا السَّلَامِ بَيْنَكُمْ)).
"তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের রোগ হিংসা ও বিদ্বেষ তোমাদের মাঝে অনুপ্রবেশ করেছে। আর বিদ্বেষ হল মুন্ডনকারী। আমি বলছি না যে, তা কেশ মুন্ডন করে; বরং দ্বীন মুন্ডন (ধ্বংস) করে ফেলে। সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার জান আছে! তোমরা বেহেস্তে ততক্ষণ প্রবেশ করতে পারবে না; যতক্ষণ পর্যন্ত না ঈমান এনেছ। আর (পূর্ণ) ঈমানও ততক্ষণ পর্যন্ত আনতে পারবে না; যতক্ষণ না আপোসে সম্প্রীতি কায়েম করেছ। আমি কি তোমাদেরকে এমন কর্মের কথা বাতলে দেব না; যা তোমাদের ঐ সম্প্রীতিকে দৃঢ় করবে? তোমাদের আপোসে সালাম প্রচার কর।" (তিরমিযী ২৫১০, বাযযার বাইহাকীর শুআবুল ঈমান সহীহ তিরমিযী ২০৩৮নং)
হিংসা এক পর্যায়ে মানুষকে নিষ্ঠুর ক'রে তোলে। অনেক সময় অত্যাচার, অনাচার ও বিদ্রোহের শিকার হয়ে নিজ দ্বীনকে নষ্ট ক'রে ফেলে, যেমন ক্ষুর বা ব্লেড চুলকে চেঁছে পরিষ্কার ক'রে ফেলে। আর যেহেতু সালাম (পরস্পরের শান্তির দোয়া বিনিময়) সম্প্রীতি বয়ে আনে এবং পরস্পরের হৃদয় থেকে বিদ্বেষ দূরীভূত করে, সেহেতু উক্ত হাদীসের শেষে বিশেষভাবে রোগের একটি চিকিৎসা স্বরূপ তা বর্ণিত হয়েছে।

পূর্ববর্তী জাতিসমূহের আরো কিছু ব্যাধির প্রতি ইঙ্গিত ক'রে একদা মহানবী বলেন, "অদূর ভবিষ্যতে আমার উম্মতের মাঝে বিজাতির ব্যাধি পৌঁছবে।" সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহর রসূল! বিজাতির ব্যাধি কী?' উত্তরে তিনি বললেন, الأَشَرُ وَالبَطَرُ، وَالتَّكَاثُرُ وَالتَّنَاجُسُ فِي الدُّنْيَا، وَالتَّبَاغُضُ وَالتَّحَاسُدُ، حَتَّى يَكُونَ البَغْي.
"অকৃতজ্ঞতা, সগর্ব আনন্দ, প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা, পার্থিব প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পরস্পর বিদ্বেষ ও হিংসা ও পরিশেষে সীমা লংঘন বা অত্যাচার।" (হাকেম ৭৩১১, সিঃ সহীহাহ ৬৮০নং)

বিজাতির অর্থশালী হওয়ার প্রধানতঃ তিনটি কারণ, যা কোন মুসলিম করতে পারে না। সূদী কারবার, নারীদেহ বা রূপ-ব্যবসা ও মাদকদ্রব্যের ব্যবসা। এরই মাধ্যমে তাদের আপোসে আর্থিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুঙ্গে থাকে। তার ফলে তারা সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে যায়, কারুনের মতো মনের ভিতরে সগর্ব আনন্দ (দন্ত) ও অহংকার সৃষ্টি হয়। আর্থিক আতিশয্যের ফলে তারা নানা আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে ওঠে। পার্থিব প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তাদেরকে উদাস ও মত্ত-মাতাল ক'রে তোলে। অর্থোপার্জনের পথে এমন নেশাখোর মাতালের মতো অগ্রসর হয় যে, সামনের সকল বাধাকে যেভাবেই হোক উল্লংঘন করে। দ্বীনের বাধা তো মানেই না, দুনিয়ার আইনের বাধাকেও তারা সহজে অতিক্রম করতে পারে।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অনুকরণ করেছে মুসলিমরাও। বিজাতির সেই সংক্রামক ব্যাধি সংক্রমণ করেছে মুসলিম সমাজে। যার ফলে রাঘববোয়াল তো বটেই, চুনো-পুঁটি দুনিয়াদাররাও উক্তরূপ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে নয়। তাদের অনুকরণে এরাও অর্থের পিছনে অন্ধের মতো ছুটে চলেছে। অর্থের লোভে তাদের অনুভূতি এতটাই ভোঁতা হয়ে গেছে যে, তারা হালাল-হারামের কোন তমীয করে না, মান-সম্মানের খেয়াল রাখে না, লোকনিন্দার কোন পরোয়া করে না। সমাজের নজরে সে তুচ্ছ হচ্ছে, সে কথার কোন তোয়াক্কা করে না। কারণ টাকার প্রলেপ দিয়ে তা ঢেকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি লাভ ক'রে থাকে ধন-উপাস্যের কাছে।
তখন লোকে তাকে 'দুনিয়াদার', 'ধনদাস' বা 'লোভী' যাই বলুক না কেন, তাতে তার কোন লজ্জা হয় না। বরং মানসিকতার বিকৃতির ফলে 'গাধা' ডাককেও তার কানে 'দাদা' মনে হয়। কুনামে ডাকলেও তার রাগ হয় না, বরং তা শুনে 'হা-হা' ক'রে হাসে!

একদা এক কুকুর এসে এক সিংহকে বলল, 'হে পশুরাজ! আমি আমার নাম পরিবর্তন করতে চাই। দয়া ক'রে আমার নামটা বদলে দিন। কারণ আমার নামটা বড় বিশ্রী ও অসভ্য।'
সিংহ বলল, 'তুমি তো বিশ্বাসঘাতক ও নির্লজ্জ। তোমার আচরণ বড় হীন। অতএব এ নামই তোমার জন্য যথার্থ ও সার্থক।'
কুকুর বলল, 'তাহলে আমাকে পরীক্ষা ক'রে দেখুন, আমি সুন্দর নামের কাজ করতে পারি কি না।'
সিংহ কুকুরকে এক টুকরা গোশ্ত দিয়ে বলল, 'ঠিক আছে। এটা আমার জন্য কাল পর্যন্ত তোমার কাছে যত্ন ক'রে আমানত রেখে দাও। কাল আমি তোমার কাছ থেকে এটা নেব, আর তোমার নাম পাল্টে দিয়ে এক সুন্দর মতো নাম রেখে আসব।'
গোশ্ত টুকরাটি নিয়ে কুকুর বাসায় ফিরল। ক্ষিদে লাগলে সে গোশ্তের দিকে তাকিয়ে জিভের লাল ফেলতে শুরু করল। খাওয়ার ইচ্ছে হলেও নাম পাল্টাবার কথা মনে পড়লে ধৈর্যের সাথে সিংহের অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু যখনই তার প্রবৃত্তিতে লালসার উদ্রেক হল, তখনই আর ধৈর্যের বালির বাঁধ আটকে রাখতে পারল না। অবশেষে 'ভালো নাম নিয়েই বা আর কী হবে? 'কুকুর'ও তো ভালো নাম।'---এই বলেই সে গোশ্ত টুকরাটি খেয়েই ফেলল।
পার্থিব প্রতিযোগিতা ও আর্থিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সকল বিপদের মূল, সকল দুষ্কর্মের মাথা, সকল ফিতনার গোড়া। অর্থই হল সব কিছু, আবার অর্থই অনর্থের মূল। অর্থ-লালসা ও পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রাচীন রোগ হল পূর্ববর্তী জাতিসমূহের। কিন্তু স্বজাতির মাঝেও সে রোগের জীবাণু সংক্রমিত। সুতরাং জ্ঞানবান সাবধান।

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 যে অপরাধের কারণে জাতি পদদলিত

📄 যে অপরাধের কারণে জাতি পদদলিত


উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে, তবুও যেন শক্তিহীন। উম্মাহর অর্থ আছে, তবুও যেন মিসকীন। যে সাপের বিষ নেই ফণাও নেই, সে সাপকে সবাই ঢিল মারে। যে জাতি মরতে অপছন্দ করে, মরণ তাকে ঘিরে ধরে। যে জাতি মরতে জানে, আসলে বাঁচতে তারাই জানে। পার্থিব ভালোবাসা ও মৃত্যুর ভয় এমন এক অপরাধ, যার ফলে জাতি দুর্বল হয়ে যায়, বিজাতির কাছে ওজনহীন হয়ে যায়। সংখ্যাধিক্য থাকলে কী হবে? সে সংখ্যার মাঝে ঐক্য নেই। নামে এক ও অনেক। হলে কী হবে? অন্তরে ও কর্মক্ষেত্রে ছিন্ন-ভিন্ন। তাই জাতির অবস্থা বড় শোচনীয়। মহানবী ﷺ সত্যই বলেছেন,
«يُوشِكُ الأُمَمُ أَنْ تَدَاعَى عَلَيْكُمْ كَمَا تَدَاعَى الْأَكَلَةُ إِلَى قَصْعَتِهَا».
"অনতিদূরে সকল বিজাতি তোমাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে, যেমন ভোজনকারীরা ভোজপাত্রের উপর একত্রিত হয়। (এবং চারদিক থেকে ভোজন করে থাকে।)" একজন বলল, 'আমরা কি তখন সংখ্যায় কম থাকব, হে আল্লাহর রসূল?' তিনি বললেন,
«بَلْ أَنْتُمْ يَوْمَئِذٍ كَثِيرٌ وَلَكِنَّكُمْ غُثَاءٌ كَغْتَاءِ السَّيْلِ وَلَيَنْزِعَنَّ اللَّهُ مِنْ صُدُورِ عَدُوِّكُمُ الْمَهَابَةَ مِنْكُمْ وَلَيَقْذِفَنَّ اللَّهُ فِي قُلُوبِكُمُ الْوَهَنَ».
"বরং তখন তোমরা সংখ্যায় অনেক থাকবে। কিন্তু তোমরা হবে তরঙ্গতাড়িত আবর্জনার ন্যায় (শক্তিহীন, মূল্যহীন)। আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের বক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি ভীতি তুলে নেবেন এবং তোমাদের হৃদয়ে দুর্বলতা সঞ্চার করবেন।" একজন বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! দুর্বলতা কী?' তিনি বললেন,
«حُبُّ الدُّنْيَا وَكَرَاهِيَةُ الْمَوْتِ».
"দুনিয়াকে ভালোবাসা এবং মরতে না চাওয়া।" (আবু দাউদ ৪২৯৯, মুসনাদে আহমাদ ২২৩৯৭নং)
বড় দুঃখের কথা এই যে, আজ মুসলিম নামধারী স্বজাতিও জাতিকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। আর বিজাতি তো আছেই। জাতির যেন আজ জলে কুমীর, ডাঙায় বাঘ।

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 যে অপরাধে অপরাধী আল্লাহ, তদীয় রসূল, ফিরিশতা অথবা মানুষ কর্তৃক অভিশপ্ত

📄 যে অপরাধে অপরাধী আল্লাহ, তদীয় রসূল, ফিরিশতা অথবা মানুষ কর্তৃক অভিশপ্ত


১। অহংকারী শয়তান আল্লাহর কাছে অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ শয়তানকে বলেছিলেন,
{فَاخْرُجْ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَجِيمٌ (٣٤) وَإِنَّ عَلَيْكَ اللَّعْنَةَ إِلَى يَوْمِ الدِّينِ} (٣٥) الحجر
'তাহলে তুমি এখান হতে বের হয়ে যাও। কারণ, নিশ্চয়ই তুমি অভিশপ্ত। কর্মফল দিবস পর্যন্ত তোমার প্রতি রইল অভিশাপ।' (হিঃ ৩৪-৩৫)
{فَاخْرُجْ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَجِيمٌ (۷۷) وَإِنَّ عَلَيْكَ لَعْنَتِي إِلَى يَوْمِ الدِّينِ} (۷۸) ص
"তুমি এখান (জান্নাত) হতে বের হয়ে যাও নিশ্চয়ই তুমি বিতাড়িত এবং তোমার উপর আমার চিরস্থায়ীভাবে লানত কিয়ামত পর্যন্ত।" (সূরা সোয়াদ ৭৭-৭৮)
{لَعَنَهُ اللَّهُ وَقَالَ لَأَتَّخِذَنَّ مِنْ عِبَادِكَ نَصِيبًا مَفْرُوضًا} (۱۱۸) سورة النساء
"আল্লাহ তাকে (শয়তানকে) অভিসম্পাত করেছেন এবং সে (শয়তান) বলেছে, 'আমি তোমার দাসদের এক নির্দিষ্ট অংশকে (নিজের দলে) গ্রহণ করবই।" (নিসাঃ ১১৮)

২। যারা কাফের, তারা অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ বলেন,
{إِنَّ اللَّهَ لَعَنَ الْكَافِرِينَ وَأَعَدَّ لَهُمْ سَعِيرًا} (٦٤) سورة الأحزاب
"নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদের উপর অভিশাপ করেছেন। আর তাদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছেন।" (সূরা আহযাব ৬৪ আয়াত)
{إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَمَاتُوا وَهُمْ كُفَّارٌ أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ لَعْنَةُ اللهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ}
"যারা অবিশ্বাস করেছে ও অবিশ্বাসী অবস্থায় মরেছে, নিশ্চয় তাদের উপর আল্লাহর, ফিরিস্তাগণের ও মানবমন্ডলীর অভিসম্পাত।" (বাক্বারাহঃ ১৬১)
{ وَقَالُوا قُلُوبُنَا غُلْفٌ بَل لَّعَنَهُمُ اللهُ بِكُفْرِهِمْ فَقَلِيلاً مَّا يُؤْمِنُونَ} (۸۸) سورة البقرة
"তারা বলেছিল, আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত। বরং (কুফরী) সত্য প্রত্যাখ্যানের জন্য আল্লাহ তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন। সুতরাং তাদের অল্প সংখ্যকই বিশ্বাস করে (ঈমান আনে)।" (বাক্বারাহঃ ৮৮)
مِّنَ الَّذِينَ هَادُوا يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَن مَّوَاضِعِهِ وَيَقُولُونَ سَمِعْنَا وَعَصَيْنَا وَاسْمَعْ غَيْرَ مُسْمَعٍ وَرَاعِنَا لَيًّا بِأَلْسِنَتِهِمْ وَطَعْنَا فِي الدِّينِ وَلَوْ أَنَّهُمْ قَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَاسْمَعْ وَانظُرْنَا لَكَانَ خَيْرًا لَّهُمْ وَأَقْوَمَ وَلَكِن لَّعَنَهُمُ اللهُ بِكُفْرِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُونَ إِلَّا قَلِيلًا} (٤٦)
"ইয়াহুদীদের কিছু লোক (তাওরাতের) বাক্যাবলী বিকৃত করে এবং (মুহাম্মাদকে) বলে, 'আমরা (তোমার কথা) শুনলাম ও অমান্য করলাম' এবং 'শোন! তোমার কথা যেন শোনা না হয়।' আর নিজেদের জিহ্বা কুঞ্চিত করে এবং ধর্মের প্রতি তাচ্ছিল্য করে বলে, 'রায়িনা'। কিন্তু তারা যদি বলত, 'শুনলাম ও মান্য করলাম' এবং 'শোন ও উনযুরনা (আমাদের খেয়াল কর)' তবে তা তাদের জন্য উত্তম ও সুসঙ্গত হত। কিন্তু তাদের অবিশ্বাসের জন্য আল্লাহ তাদেরকে অভিসম্পাত করেছেন। অতএব, তাদের অল্পসংখক লোকই বিশ্বাস করবে।" (নিসাঃ ৪৬)
{قُلْ هَلْ أُنَبِّئُكُم بِشَرٌ مِّن ذَلِكَ مَثُوبَةً عِندَ اللهِ مَن لَّعَنَهُ اللَّهُ وَغَضِبَ عَلَيْهِ وَجَعَلَ مِنْهُمُ الْقِرَدَةَ وَالْخَنَازِيرَ وَعَبَدَ الطَّاغُوتَ أُوْلَئِكَ شَرٌّ مَّكَاناً وَأَضَلُّ عَن سَوَاءِ السَّبِيلِ}
"বল, 'আমি কি তোমাদেরকে এ অপেক্ষা নিকৃষ্ট পরিণামের সংবাদ দেব, যা আল্লাহর নিকট আছে? যাকে আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন, যার উপর তিনি ক্রোধান্বিত, যাদের কতককে তিনি বানর ও কতককে শূকর বানিয়েছেন এবং যারা তাগূত (গায়রুল্লাহ)র উপাসনা করে, মর্যাদায় তারাই নিকৃষ্ট এবং সরল পথ হতে সর্বাধিক বিচ্যুত।" (মায়িদাহঃ ৬০)
{وَلَمَّا جَاءَهُمْ كِتَابٌ مِّنْ عِندِ اللهِ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا مِن قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَهُم مَّا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ فَلَعْنَةُ اللَّه عَلَى الْكَافِرِينَ} (৮৯) البقرة
“তাদের নিকট যা আছে আল্লাহর নিকট হতে তার সমর্থক কিতাব এল; যদিও পূর্বে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে তারা এর (এই কিতাব সহ নবীর) সাহায্যে বিজয় কামনা করত, তবুও তারা যা জ্ঞাত ছিল তা (সেই কিতাব নিয়ে নবী) যখন তাদের নিকট এল, তখন তারা তা অস্বীকার করে বসল। সুতরাং অবিশ্বাসীদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ হোক।” (বাক্বারাহঃ ৮৯)
{ وَقَالَتِ الْيَهُودُ يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ غُلَّتْ أَيْدِيهِمْ وَلُعِنُوا بِمَا قَالُوا بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ يُنفِقُ كَيْفَ يَشَاء) (৬৪) سورة المائدة
"ইয়াহুদীরা বলে, 'আল্লাহর হাত সংকুচিত।' তাদের হাত সংকুচিত হোক এবং তারা যা বলে, তার জন্য তারা অভিশপ্ত হোক। বরং আল্লাহর উভয় হস্তই মুক্ত, যেভাবে ইচ্ছা তিনি দান ক'রে থাকেন।" (মায়িদাহঃ ৬৪)

৩। যারা মুনাফিক (কপট) মুসলমান, তারা অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ বলেন,
{كَيْفَ يَهْدِي اللَّهُ قَوْماً كَفَرُوا بَعْدَ إِيمَانِهِمْ وَشَهِدُوا أَنَّ الرَّسُولَ حَقٌّ وَجَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ (৮৬) أُوْلَئِكَ جَزَاؤُهُمْ أَنَّ عَلَيْهِمْ لَعْنَةَ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ (۸۷) خَالِدِينَ فِيهَا لَا يُخَفَّفُ عَنْهُمُ الْعَذَابُ وَلَا هُمْ يُنْظَرُونَ} (৮৮)
"বিশ্বাসের পর ও রসূলকে সত্য বলে সাক্ষ্যদান করার পর এবং তাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শন আসার পর যে সম্প্রদায় সত্য প্রত্যাখ্যান করে, (সে সম্প্রদায়কে) আল্লাহ কীরূপে সৎপথ প্রদর্শন করবেন? আল্লাহ সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না। এ সকল লোকের প্রতিফল এই যে, এদের উপর আল্লাহ, ফিরিস্তাগণ এবং সকল মানুষের অভিশাপ! তারা (নরকে) স্থায়ী হবে, তাদের শাস্তি লঘু করা হবে না এবং তাদের বিরামও দেওয়া হবে না।" (আলে ইমরান: ৮৬-৮৮)
{لَئِن لَّمْ يَنتَهِ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ وَالْمُرْجِفُونَ فِي الْمَدِينَةِ لَتُغْرِيَنَّكَ بِهِمْ ثُمَّ لَا يُجَاوِرُونَكَ فِيهَا إِلَّا قَلِيلًا (৬০) مَلْعُونِينَ أَيْنَمَا ثُقِفُوا أُخِذُوا وَقُتِلُوا تَقْتِيلًا} (৬১)
"মুনাফিক (কপটাচারি) গণ এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে এবং যারা নগরে গুজব রটনা করে তারা বিরত না হলে আমি নিশ্চয়ই তাদের বিরুদ্ধে তোমাকে প্রবল করব, এরপর তারা এ নগরীতে অল্প দিনই তোমার প্রতিবেশীরূপে থাকবে---অভিশপ্ত হয়ে; ওদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই ধরা হবে এবং নির্দয়ভাবে হত্যা করা হবে।" (আহযাবঃ ৬০-৬১)
{وَعَدَ اللَّهُ الْمُنَافِقِينَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْكُفَّارَ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا هِيَ حَسْبُهُمْ وَلَعَنَهُمُ اللَّهُ وَلَهُمْ عَذَابٌ مُّقِيمٌ} (٦٨) سورة التوبة
"আল্লাহ মুনাফিক নর-নারী ও কাফেরদেরকে জাহান্নামের আগুনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেখানে ওরা চিরকাল থাকবে। এটিই ওদের জন্য যথেষ্ট, আল্লাহ ওদেরকে অভিসম্পাত করেছেন এবং ওদের জন্য আছে চিরস্থায়ী শাস্তি।" (সূরা তাওবাহ ৬৮ আয়াত)
{وَيُعَذِّبَ الْمُنَافِقِينَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْمُشْرِكِينَ وَالْمُشْرِكَاتِ الظَّانِّينَ بِاللَّهِ ظَنَّ السَّوْءِ عَلَيْهِمْ دَائِرَةُ السَّوْءِ وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَلَعَنَهُمْ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا } (٦)
"কপট (মুনাফেক) পুরুষ ও কপট নারী, অংশীবাদী (মুশরিক) পুরুষ ও অংশীবাদী নারী, যারা আল্লাহ সম্বন্ধে মন্দ ধারণা পোষণ করে, তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন। অমঙ্গল চক্র রয়েছে তাদের জন্য, আল্লাহ তাদের প্রতি রুষ্ট হয়েছেন, তাদেরকে অভিশপ্ত করেছেন এবং তাদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছেন; আর ওটা নিকৃষ্ট আবাস!" (ফাতহঃ ৬)

৪। যারা আল্লাহর আয়াত (নিদর্শন) অস্বীকার করে, রাসূলকে অমান্য করে এবং প্রত্যেক উদ্ধত স্বৈরাচারীর নির্দেশ অনুসরণ করে তারা ইহ-পরকালে অভিশপ্ত। মহান আল্লাহ বলেন,
وَتِلْكَ عَادٌ جَحَدُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ وَعَصَوْا رُسُلَهُ وَاتَّبَعُوا أَمْرَ كُلِّ جَبَّارٍ عَنِيدٍ (٥٩) وَأَتْبَعُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا لَعْنَةً وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ أَلا إِنَّ عَاداً كَفَرُوا رَبَّهُمْ أَلَا بُعْداً لِعَادٍ قَوْمٍ هُودٍ} (٦٠)
"এই আ'দ সম্প্রদায় নিজেদের প্রতিপালকের নিদর্শনগুলিকে অস্বীকার করল এবং তাঁর রসূলদেরকে অমান্য করল, পক্ষান্তরে তারা প্রবল প্রতাপশালী হঠকারীদের নির্দেশ অনুসরণ করল। আর এই দুনিয়াতে অভিসম্পাত তাদের সঙ্গে সঙ্গে রইল এবং কিয়ামতের দিনও। জেনে রেখো! আ'দ (সম্প্রদায়) নিজ প্রতিপালককে অমান্য করল। আরো জেনে রেখো, দূর হয়ে গেল আ'দ (আল্লাহর করুণা হতে); যারা হৃদের সম্প্রদায় ছিল।" (হৃদঃ ৫৯-৬০)

৫। ফিরআউন ও তার সাঙ্গপাঙ্গ অভিশপ্তঃ
{وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِآيَاتِنَا وَسُلْطَانٍ مُبِينٍ (٩٦) إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَئِهِ فَاتَّبَعُوا أَمْرَ فِرْعَوْنَ وَمَا أَمْرُ فِرْعَوْنَ بِرَشِيدٍ (۹۷) يَقْدُمُ قَوْمَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَأَوْرَدَهُمْ النَّارَ وَبِئْسَ الْوِرْدُ الْمَوْرُودُ (۹۸) وَأَتْبَعُوا فِي هَذِهِ لَعْنَةً وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ بِئْسَ الرِّفْدُ الْمَرْفُودُ} (۹۹) هود
"আমি মূসাকে প্রেরণ করলাম আমার নিদর্শনাবলী ও সুস্পষ্ট প্রমাণ সহকারে। ফিরআউন ও তার প্রধানবর্গের নিকট, তারা ফিরআউনের নির্দেশ মেনে চলতে লাগল অথচ ফিরাউনের নির্দেশ মোটেই সঠিক ছিল না। কিয়ামতের দিন সে নিজ সম্প্রদায়ের অগ্রভাগে থাকবে, অতঃপর তাদেরকে উপনীত করবে দোযখে। আর তা অতি নিকৃষ্ট স্থান যাতে তারা উপনীত হবে। আর অভিশাপ তাদের সাথে সাথে রইল এই দুনিয়াতে এবং কিয়ামত দিবসেও। তা হল নিকৃষ্ট পুরস্কার, যা তাদেরকে দেওয়া হবে।" (হৃদঃ ৯৬-৯৯)

৬। প্রত্যেক সীমালংঘনকারী ও অত্যাচারী ব্যক্তি অভিশপ্ত। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَنَادَى أَصْحَابُ الْجَنَّةِ أَصْحَابَ النَّارِ أَن قَدْ وَجَدْنَا مَا وَعَدَنَا رَبُّنَا حَقًّا فَهَلْ وَجَدتُّم مَّا وَعَدَ رَبُّكُمْ حَقًّا قَالُواْ نَعَمْ فَأَذَنَ مُؤَذِّنٌ بَيْنَهُمْ أَن لَّعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ}
"বেহেস্তবাসীরা দোযখবাসীদেরকে আহবান ক'রে বলবে, 'আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমরা তা সত্য পেয়েছি, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তোমরা তা সত্য পেয়েছ কি?' ওরা বলবে, 'হ্যাঁ।' অতঃপর জনৈক ঘোষণাকারী তাদের নিকট ঘোষণা করবে, 'অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত।" (আ'রাফঃ ৪৪)
{وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أُوْلَئِكَ يُعْرَضُونَ عَلَى رَبِّهِمْ وَيَقُولُ الْأَشْهَادُ هَؤُلاء الَّذِينَ كَذَّبُوا عَلَى رَبِّهِمْ أَلَا لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الظَّالِمِينَ} (۱۸) سورة هود
"ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক অত্যাচারী কে হবে, যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে? ঐ লোকদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে পেশ করা হবে এবং সাক্ষী (ফিরিশতা)গণ বলবে, 'এরা ঐ লোক যারা নিজেদের প্রতিপালক সম্বন্ধে মিথ্যা বলেছিল। জেনে রেখো, এমন অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর অভিশাপ।" (হ্রদঃ ১৮)
{يَوْمَ لَا يَنفَعُ الظَّالِمِينَ مَعْذِرَتُهُمْ وَلَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ} (٥٢) سورة غافر
"যেদিন সীমালংঘনকারীদের ওজর-আপত্তি কোন কাজে আসবে না, ওদের জন্য রয়েছে অভিশাপ এবং ওদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট আবাস।" (মু'মিনঃ ৫২)

৭। যারা হিলা-বাহানা ক'রে আল্লাহর বিধান লংঘন করে, চালাকি ক'রে তাঁর নির্দেশ অমান্য করে তারা অভিশপ্ত। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ آمِنُوا بِمَا نَزَّلْنَا مُصَدِّقًا لِّمَا مَعَكُم مِّن قَبْلِ أَن نَّطْمِسَ وُجُوهَا فَتَرُدَّهَا عَلَى أَدْبَارِهَا أَوْ تَلْعَنَهُمْ كَمَا لَعَنَّا أَصْحَابَ السَّبْتِ وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولاً }
"হে গ্রন্থধারিগণ! তোমরা তোমাদের নিকট যা আছে তার সমর্থনরূপে আমি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে বিশ্বাস স্থাপন কর, এর পূর্বে যে, আমি বহু লোকের মুখমন্ডল বিকৃত করে পিছনের দিকে ফিরিয়ে দেব অথবা শনিবার অমান্যকারীদেরকে যেরূপ অভিসম্পাত করেছিলাম, সেরূপ তাদেরকে অভিসম্পাত করব। বস্তুতঃ আল্লাহর আদেশ কার্যকর হয়েই থাকে।" (নিসাঃ ৪৭)

৮। খুনী লোক অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا } (৯৩) সূরা নিসা
"আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করবে তার শাস্তি হল জাহান্নাম। তন্মধ্যে সে চিরকাল থাকবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রাগান্বিত হবেন ও তাকে অভিসম্পাত করবেন। আর তার জন্য ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত করে রাখবেন।" (সূরা নিসা ৯৩ আয়াত)

৯। আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকার করার তা ভঙ্গকারীঃ
১০। আত্মীয়তার বন্ধন ছেদনকারী:
১১। সন্ত্রাসী ও শান্ত পরিবেশে ফাসাদ সৃষ্টিকারী অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَبِمَا نَقْضِهِم مِّيثَاقَهُمْ لَعَنَّاهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قَاسِيَةً} (১৩) সূরা মায়িদাহ
"তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের দরুন আমি তাদেরকে অভিসম্পাত করেছি ও তাদের হৃদয় কঠোর ক'রে দিয়েছি।" (মায়িদাহঃ ১৩)
وَالَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللهِ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ في الأَرْضِ أُوْلَئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ} (২৫) سورة الرعد
"যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকার করার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখার আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের জন্য রয়েছে (আল্লাহর) অভিসম্পাত। আর তাদের জন্য আছে মন্দ আবাস।" (সূরা রা'দ ২৫ আয়াত)
{فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ (۲۲) أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَأَعْمَى أَبْصَارَهُمْ} (۲۳) سورة محمد
"ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবতঃ তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। আল্লাহ এদেরকেই করেন অভিশাপ, আর করেন বধির ও অন্ধ।" (সূরা মুহাম্মাদ ২২-২৩ আয়াত)

১২। যারা কথায় বা কাজে আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে কষ্ট দেয়, তারা অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُّهِينًا }
"যারা আল্লাহ ও তদীয় রসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত করেন এবং তাদের জন্য লাঞ্ছনাকর শাস্তি রয়েছে।" (সূরা আহযাব ৫৭ আয়াত)

১৩। ইল্ম ও শরীয়তের জ্ঞান গোপনকারী অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَى مِن بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ أُولَئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ } (١٥٩) سورة البقرة
"আমি যেসব উজ্জ্বল নিদর্শন ও পথ-নির্দেশ অবতীর্ণ করেছি, আমি ঐসবগুলোকে সর্বসাধারণের নিকট প্রকাশ করার পরও যারা ঐসব বিষয়কে গোপন করে আল্লাহ তাদেরকে অভিসম্পাত করেন এবং অভিসম্পাতকারীরাও তাদেরকে অভিসম্পাত ক'রে থাকে।" (সূরা বাক্বারাহ ১৫৯ আয়াত)

১৪। যারা অপরের চরিত্রে মিথ্যা কলঙ্ক ও অপবাদ দেয়, তারা অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ} (۲۳) سورة النور
"যারা সাধুী, সরলমনা ও বিশ্বাসী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে তারা দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।" (নূর ২৩)

১৫। যারা রসূলের পথ অপেক্ষা অন্য পথকে উত্তম মনে করে, তারা অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{لُعِنَ الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِنْ الْكِتَابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ وَيَقُولُونَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا هَؤُلَاءِ أَهْدَى مِنْ الَّذِينَ آمَنُوا سَبِيلاً (٥١) أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ وَمَن يَلْعَنِ اللَّهُ فَلَن تَجِدَ لَهُ نَصِيرًا } (٥٢) سورة النساء
“তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যাদেরকে কিতাবের এক অংশ দেওয়া হয়েছিল? তারা জিব্‌ত (শয়তান, শির্ক, যাদু প্রভৃতি) ও তাগূত (বাতিল উপাস্যে) বিশ্বাস করে এবং অবিশ্বাসী (কাফের)দের সম্বন্ধে বলে যে, এদের পথ বিশ্বাসী (মুমিন)দের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর। এরাই তো তারা, যাদেরকে আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন। আর আল্লাহ যাকে অভিসম্পাত করেন, তুমি কখনো তার জন্য কোন সাহায্যকারী পাবে না।” (নিসাঃ ৫১-৫২)

১৬। যারা অবাধ্য ও সীমালংঘনকারী। যারা গর্হিত কাজ করা দেখেও একে অন্যকে বারণ করে না, তারা অভিশপ্তঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُدَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنْكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ، كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنْكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ } [ المائدة : ۷۸-۷۹]
অর্থাৎ, বনী ইস্রাঈলের মধ্যে যারা অবিশ্বাস করেছিল তারা দাউদ ও মারয়‍্যাম-তনয় কর্তৃক অভিশপ্ত হয়েছিল। কেননা, তারা ছিল অবাধ্য ও সীমালংঘনকারী। তারা যেসব গর্হিত কাজ করত তা থেকে তারা একে অন্যকে বারণ করত না। তারা যা করত নিশ্চয় তা নিকৃষ্ট। (সূরা মায়েদাহ ৭৮-৭৯ আয়াত)

১৭। সুদখোর, সূদদাতা ও তার যে কোন প্রকারে সহায়ক ব্যক্তি অভিশপ্তঃ
১৮। যাকাত আদায়ে অনিচ্ছুক ও টাল-বাহানাকারী ব্যক্তি অভিশপ্তঃ আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেছেন,
آكِلُ الرِّبَا وَمُؤْكِلُهُ وَشَاهِدَاهُ إِذَا عَلِمَاهُ وَالْوَاشِمَةُ وَالْمُؤْتَشِمَةُ وَلَاوَى الصَّدَقَةِ وَالْمُرْتَدُّ أَعْرَابِيًّا بَعْدَ الْهَجْرَةِ مَلْعُوثُونَ عَلَى لِسَانٍ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم.
“সুদখোর, সুদদাতা, সুদের কারবার জেনেও তার দুই সাক্ষ্যদাতা, কোন অঙ্গ দেগে নকশা করে দেয় এবং করায় এমন মহিলা, যাকাত আদায়ে অনিচ্ছুক ও টালবাহানাকারী ব্যক্তি এবং হিজরতের পর মরুবাসী হয়ে ধর্মত্যাগী ব্যক্তি কিয়ামতের দিন মুহাম্মাদ এর মুখে অভিশপ্ত।” (আহমদ ৩৮৮১, নাসাঈ ৫১০২, ইবনে খুযাইমা ২২৫০, আবু য়্যা'লা ৫২৪১, ইবনে হিব্বান ৩২৫২, বাইহাক্বী ১৮২৪৭, সহীহ তারগীব ৭৫৭নং)
আল্লাহর রসূল সুদখোর, সুদদাতা, সূদের লেখক এবং তার উভয় সাক্ষীদ্বয়কে অভিশাপ করেছেন এবং বলেছেন, "ওরা সকলেই সমান।" (মুসলিম ১৫৯৭ নং)

১৯। পরের মাল চুরি করে যে, সে চোর অভিশপ্তঃ রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
لَعَنَ اللَّهُ السَّارِقَ يَسْرِقُ الْبَيْضَةَ فَتُقْطَعُ يَدُهُ وَيَسْرِقُ الْحَبْلَ فَتُقْطَعُ يَدُهُ ..
"আল্লাহ চোরকে অভিশপ্ত করুন; সে ডিম (অথবা হেলমেট) চুরি করে, ফলে তার হাত কাটা যায় এবং রশি চুরি করে, ফলে তার হাত কাটা যায়।" (বুখারী ৬৭৮৩, ৬৭৯৯, মুসলিম ৪৫০৩নং)

২০। যে ব্যক্তি কবরের লাশ বা কাফন চুরি করে, সে অভিশপ্তঃ মহানবী বলেছেন,
((لَعَنَ اللَّهُ الْمُخْتَفِيَ وَالْمُخْتَفِيَةَ)).
"আল্লাহ কবর-চোর ও চোরনীকে অভিশাপ করুন।" (বাইহাক্বী, সঃ জামে' ৫১০২নং)

২১। মাতাল ও মদ প্রস্তুতকারক তথা তার যে কোন প্রকারে সহায়ক ব্যক্তি অভিশপ্তঃ মহানবী বলেছেন,
لَعَنَ اللَّهُ الْخَمْرَ وَشَارِبَهَا وَسَاقِيَهَا وَبَائِعَهَا وَمُبْتَاعَهَا وَعَاصِرَهَا وَمُعْتَصِرَهَا وَحَامِلَهَا وَالْمَحْمُولَةَ إِلَيْهِ ..
"মদ পানকারীকে, মদ পরিবেশনকারীকে, তার ক্রেতা ও বিক্রেতাকে, তার প্রস্তুতকারককে, যার জন্য প্রস্তুত করা হয় তাকে, তার বাহককে ও যার জন্য বহন করা হয় তাকে আল্লাহ অভিশাপ করেছেন।" (আবু দাউদ ৩৬৭৪, ইবনে মাজাহ ৩৩৮০নং) ইবনে মাজার বর্ণনায় আছে, "তার মূল্য ভক্ষণকারীও (অভিশপ্ত)।" (সহীহুল জামে' ৫০৯১নং)
আনাস বিন মালেক বলেন, "মদের সাথে সম্পৃক্ত দশ প্রকার মানুষের উপর রাসূলুল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন। তার প্রস্তুতকারীর উপর, যে প্রস্তুত করায় তার উপর, তার পানকারীর উপর, যে তা বয়ে নিয়ে যায় তার উপর, যার জন্য বয়ে নিয়ে যায় তার উপর, যে পান করায় তার উপর, যে তা বিক্রি করে তার উপর, যে (বিক্রি ক’রে) তার অর্থ খায় তার উপর এবং যে ক্রয় করে ও যার জন্য ক্রয় করা হয় তাদের উপর।" (সুনানে তিরমিযী ১২৯৫, ইবনে মাজাহ ৩৩৮১, ত্বাবারানীর আওসাত্ব ১৩৫৫নং)

২২। যে ব্যক্তি জমি-জায়গার চিহ্ন সরিয়ে নিজের অংশ বেশী করেঃ
২৩। যে ব্যক্তি নিজের মা-বাপকে অভিশাপ দেয়ঃ
২৪। যে ব্যক্তি কোন মূর্তি বা মাজারের উদ্দেশ্যে মুরগী-খাঁসী বা অন্য কিছু যবাই করেঃ
২৫। যে ব্যক্তি কোন ফাসাদ সৃষ্টিকারী বা বিদআতীকে আশ্রয় দেয়, এরা সকলে অভিশপ্তঃ
আবুত তুফাইল বলেন, আলী -কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'আল্লাহর রসূল কি আপনাদেরকে কোন বিশেষ জ্ঞান দান ক'রে গেছেন?' উত্তরে তিনি বললেন, 'তিনি আমাদেরকে বিশেষ কোন জ্ঞান দিয়ে যাননি, যা সাধারণ লোকে জানে না। তবে আমার এই তরবারির খাপে যা আছে, (তা হতে পারে।)' অতঃপর তিনি খাপ থেকে একটি লিখিত কাগজ বের করলেন। তাতে লিখা ছিল,
لَعَنَ اللَّهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللَّهِ وَلَعَنَ اللَّهُ مَنْ سَرَقَ مَنَارَ الأَرْضِ وَلَعَنَ اللَّهُ مَنْ لَعَنَ وَالِدَهُ وَلَعَنَ اللَّهُ مَنْ آوَى مُحْدِثًا ..
"আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে অভিশাপ করুন, যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে যবেহ করে। আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে অভিশাপ করুন, যে ব্যক্তি জমি-জায়গার চিহ্ন সরিয়ে ফেলে। আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে অভিশাপ করুন, যে ব্যক্তি বিদআতীকে আশ্রয় দেয়।" (মুসলিম ৫২৪১নং)

২৬। যে ব্যক্তি মদীনায় অশান্তি বা বিদআত সৃষ্টি করে এবং তার বাসিন্দাকে সন্ত্রস্ত করে, সে অভিশপ্তঃ
ইয়াযীদ ইবনে শারীক ইবনে তারেক হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আলী -কে মিম্বরের উপর খুতবা দিতে দেখেছি এবং তাকে এ কথা বলতে শুনেছি যে, 'আল্লাহর কসম! আল্লাহর কিতাব ব্যতীত আমাদের কাছে আর কোন কিতাব নেই। যা আমরা পাঠ করতে পারি। তবে এ লিপিখানা আছে।' এরপর তা তিনি খুলে দিলেন। দেখা গেল তাতে (রক্তপণে প্রদেয়) উটের বয়স ও বিভিন্ন যখমের দণ্ডবিধি লিপিবদ্ধ আছে। তাতে আরো লিপিবদ্ধ আছে যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
(( الْمَدِينَةُ حَرَمُ مَا بَيْنَ غَيْرِ إِلَى ثَوْرِ ، فَمَنْ أَحْدَثَ فِيهَا حَدَثاً ، أَوْ آوَى مُحْدِثاً ، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لَا يَقْبَلُ اللهُ مِنْهُ يَومَ القِيَامَةِ صَرْفاً وَلَا عَدْلاً ذِمَّةُ الْمُسْلِمِينَ وَاحِدَةٌ ، يَسْعَى بِهَا أَدْنَاهُمْ ، فَمَنْ أَخْفَرَ مُسْلِماً ، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لَا يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْهُ يَومَ القِيَامَةِ صَرْفاً وَلَا عَدْلاً . وَمَن ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ ، أو انْتَمَى إِلَى غَيْرِ مَوَالِيهِ ، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ وَالمَلائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لَا يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْهُ يَومَ القِيَامَةِ صَرْفاً وَلَا عَدْلاً )) . متفق عَلَيْهِ
"আইর থেকে সওর পর্যন্ত মদীনার হারাম-সীমা। এখানে যে ব্যক্তি (ধর্মীয় বিষয়ে) অভিনব কিছু (বিদআত) রচনা করবে বা বিদআতীকে আশ্রয় দেবে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশাদল এবং সকল মানুষের অভিশাপ। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না। সমস্ত মুসলিমদের প্রতিশ্রুতি ও নিরাপত্তাদানের মর্যাদা এক। তাদের কোন নিম্নশ্রেণীর মুসলিম (কাউকে আশ্রয় প্রদানের) কাজ করতে পারে। সুতরাং যে ব্যক্তি মুসলিমের ঐ কাজকে বানচাল করে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিস্তা ও সকল মানুষের লানত। কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না। আর যে ব্যক্তি প্রকৃত বাপ ছাড়া অন্যকে বাপ বলে দাবী করে বা প্রকৃত মনিব ছাড়া অন্য মনিবের সাথে সম্বন্ধ জুড়ে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিস্তা ও সমস্ত মানুষের অভিশাপ। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত গ্রহণ করবেন না।" (বুখারী ৬৭৫৫, মুসলিম ৩৩৯৩, ৩৮৬৭নং)
তিনি আরো বলেছেন,
((اللَّهُمَّ مَنْ ظَلَمَ أَهْلَ الْمَدِينَةِ وَأَخَافَهُمْ ، فَأَخِفْهُمْ ، وَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ، وَالْمَلَائِكَةِ، وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ، لَا يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْهُ صَرْفًا وَلَا عَدْلًا)).
"হে আল্লাহ! যে ব্যক্তি মদীনাবাসীদের প্রতি অত্যাচার করে এবং তাদেরকে সন্ত্রস্ত করে, তুমি তাকে সন্ত্রস্ত কর। আর তার উপর আল্লাহ, ফিরিশামন্ডলী এবং সমগ্র মানবমন্ডলীর অভিশাপ। তার নিকট থেকে নফল-ফরয কোন ইবাদতই কবুল করা হবে না।" (ত্বাবারানীর কাবীর ৬৪৯৮, সিঃ সহীহাহ ৩৫১নং)

২৭। যে ব্যক্তি কোন দন্ডবিধি কায়েম করতে বাধা সৃষ্টি করে, সে অভিশপ্তঃ
মহানবী বলেছেন,
..... وَمَنْ قُتِلَ عَمْدًا فَقَوْدُ يَدَيْهِ فَمَنْ حَالَ بَيْنَهُ وَبَيْنَهُ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ..
"---আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত (খুনী দ্বারা) খুন হবে, সেই খুনীকে খুনের বদলে খুন করা হবে। অতঃপর যে ব্যক্তি খুনী ও দন্ডের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিস্তা ও সকল মানুষের অভিশাপ।" (আবু দাউদ ৪৫৯৩, সহীহ নাসাঈ ৪৪৫৬, সহীহ ইবনে মাজাহ ২২১১নং)

২৮। যে শাসক শাসনে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখে না, সে অভিশপ্তঃ মহানবী বলেছেন,
((إِنَّ هَذَا الْأَمْرَ فِي قُرَيْشٍ مَا دَامُوا إِذَا اسْتُرْحِمُوا رَحِمُوا وَإِذَا حَكَمُوا عَدَلُوا وَإِذَا قَسَمُوا أَقْسَطُوا فَمَنْ لَمْ يَفْعَلْ ذَلِكَ مِنْهُمْ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ لَا يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَلَا عَدْلٌ).
"এই নেতৃত্ব থাকবে কুরাইশদের মাঝে। যতক্ষণ তাদের কাছে দয়া ভিক্ষা করা হলে তারা দয়া করবে, বিচার করলে ইনসাফ করবে, বিতরণ করলে ন্যায়ভাবে করবে। তাদের মধ্যে যে তা করবে না, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশামন্ডলী এবং সমগ্র মানবমন্ডলীর অভিশাপ। তার নিকট থেকে নফল-ফরয কোন ইবাদতই কবুল করা হবে না।" (আহমাদ ১২৯০০, ১৯৫৪১, আবু য়‍্যা'লা ৪০৩২-৪০৩৩, ত্বাবারানী ৭২৪, সিঃ সহীহাহ ২৮৫৮নং)

২৯। যে ব্যক্তি কোন জ্যান্ত প্রাণীকে নিশানা বানিয়ে তীর বা বন্দুক চালানো শেখে, সে অভিশপ্তঃ ইবনে উমার হতে বর্ণিত, তিনি একবার কুরাইশ বংশের কতিপয় নবযুবকের নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময় লক্ষ্য করলেন যে, তারা একটি পাখীকে বেঁধে (হাতের নিশানা ঠিক করার মানসে তার উপর নির্দয়ভাবে) তীর মারছে। তারা পাখীর মালিকের সাথে এই চুক্তি করেছিল যে, প্রতিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট তীর তার হয়ে যাবে। সুতরাং যখন তারা ইবনে উমার-কে দেখতে পেল, তখন ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে গেল। ইবনে উমার বললেন,
مَنْ فَعَلَ هَذَا ؟ لَعَنَ اللَّهُ مَنْ فَعَلَ هَذَا ، إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ لَعَنَ مَنِ اتَّخَذَ شَيْئاً فِيهِ الرُّوحُ غرَضاً . متفق عَلَيْهِ
'এ কাজ কে করেছে? যে এ কাজ করেছে তার উপর আল্লাহর অভিশাপ। নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ সেই ব্যক্তির উপর অভিশাপ করেছেন, যে কোন এমন জিনিসকে (তার তীর-খেলার) লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে, যার মধ্যে প্রাণ আছে।' (বুখারী ৫৫১৫, মুসলিম ৫১৭৪নং)

৩০। পুরুষের বেশধারিণী নারী এবং নারীর বেশধারী পুরুষ উভয়েই অভিশপ্তঃ ইবনে আব্বাস বলেছেন,
لَعَنَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُخَنَّثِينَ مِنْ الرِّجَالِ وَالْمُتَرَجِّلَاتِ مِنْ النِّسَاءِ وَقَالَ: أَخْرِجُوهُمْ مِنْ بُيُوتِكُمْ))، قَالَ فَأَخْرَجَ النَّبِيُّ ﷺ فُلَانَا وَأَخْرَجَ عُمَرُ فُلَانَةَ.
'নবী খোজা পুরুষ এবং পুরুষসুলভ আচরণ-কারিণী নারীর উপর অভিসম্পাত করেছেন এবং বলেছেন, "তোমাদের গৃহ হতে ওদেরকে বের করে দাও।" সুতরাং নবী স্বয়ং এক খোজাকে বহিষ্কার করেছেন এবং উমার এক হিজড়ে নারীকে গৃহ হতে বহিষ্কার করেছেন।' (আহমদ ২০০৬, ২১২৩, বুখারী ৫৮৮৬নং)
ইবনে আব্বাস বলেন, আল্লাহর রসূল নারীদের বেশধারী পুরুষদেরকে এবং পুরুষ বেশধারিণী নারীদেরকে অভিশাপ করেছেন। (বুখারী ৫৮৮৫নং, আসহাবে সুনান) আল্লাহর নবী সেই পুরুষকে অভিশাপ করেছেন, যে নারীর পোশাক পরিধান করে এবং সেই নারীকে অভিশাপ করেছেন, যে পুরুষের পোশাক পরিধান করে। (আহমাদ ৮৩০৯, আবু দাউদ ৪১০০, হাকেম ৭৪১৫, সহীহুল জামে' ৫০৯৫নং)

৩১। যে মহিলা মাথায় পরচুলা (টেসেল) বাঁধে, সে অভিশপ্তাঃ আসমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, এক মহিলা নবী-এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার মেয়ে এক প্রকার চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছে। ফলে তার মাথার চুল ঝরে গেছে। আর আমি তার বিয়েও দিয়েছি। এখন কি আমি তার মাথায় পরচুলা লাগিয়ে দেব?' তিনি বললেন,
(( لَعَنَ اللَّهُ الوَاصِلَةَ وَالْمَوْصُولَةَ )) . وفي رواية : (( الوَاصِلَةَ ، والمُسْتَوْصِلَةَ )) .
"যে পরচুলা লাগিয়ে দেয় এবং যার লাগানো হয় উভয় মহিলাকে আল্লাহ অভিসম্পাত করুন বা করেছেন।" অন্য বর্ণনায় আছে, “যে মহিলা পরচুলা লাগিয়ে দেয় এবং যে লাগাতে বলে (তাদের উভয়কে আল্লাহ অভিসম্পাত করুন বা করেছেন।)” (বুখারী ৫৯৪১, মুসলিম ৫৬৮৯, ইবনে মাজাহ ১৯৮৮নং)

৩২। যে মহিলা বেপর্দা ও মাথার খোঁপা উঁচু ক'রে বাঁধে, সে অভিশপ্তাঃ
রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
((سَيَكُونُ فِي آخِرِ أُمَّتِي رِجَالٌ يَرْكَبُونَ عَلَى السُّرُوحِ كَأَشْبَاهِ الرِّجَالِ يَنْزِلُونَ عَلَى أَبْوَابِ الْمَسْجِدِ نِسَاؤُهُمْ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ عَلَى رُءُوسِهِمْ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْعِجَافِ الْعَنُوهُنَّ فَإِنَّهُنَّ مَلْعُونَاتٌ ......
"আমার শেষ যামানার উম্মতের মধ্যে কিছু এমন লোক হবে যারা ঘরের মত জিন্ (মোটর গাড়ি) তে সওয়ার হয়ে মসজিদের দরজায় দরজায় নামবে। (গাড়ি করে নামায পড়তে আসবে।) আর তাদের মহিলারা হবে অর্ধনগ্না; যাদের মাথা কৃশ উটের কুঁজের মত (খোঁপা) হবে। তোমরা তাদেরকে অভিশাপ করো। কারণ, তারা অভিশপ্তা!" (আহমাদ ৭০৮৩, ইবনে হিব্বান, ত্বাবারানী, সিঃ সহীহাহ ২৬৮নং)

৩৩। যে সকল মহিলা (হাত বা চেহারায়) দেগে নকশা করে দেয় অথবা করায়, চেহারা থেকে যারা লোম তুলে ফেলে, সৌন্দর্য আনার জন্য যারা দাঁতের মাঝে ঘসে (ফাঁক ফাঁক করে) এবং আল্লাহর সৃষ্টি-প্রকৃতিতে পরিবর্তন ঘটায় (যাতে তাঁর অনুমতি নেই), এমন সকল মহিলা অভিশপ্তা। (বুখারী ৪৮৮৬নং, মুসলিম ২১২৫নং, আসহাবে সুনান)
আবূ জুহাইফা বলেন,
إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ ثَمَن الدَّم وَثَمَنِ الْكَلْبِ وَكَسْبِ الْأَمَةِ وَلَعَنَ الْوَاشِمَةَ وَالْمُسْتَوْشِمَةَ وَآكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَلَعَنَ الْمُصَوَّرَ.
রাসূলুল্লাহ রক্ত ও কুকুরের মূল্য এবং বেশ্যা (দাসী)র উপার্জন গ্রহণ করা থেকে নিষেধ করেছেন। আর সুদখোর, সুদদাতা, চেহারা (নকশা করার জন্য) দাগে বা দাগায় এমন নারী এবং মূর্তি (বা ছবি) নির্মাতাকে অভিসম্পাত করেছেন। (বুখারী ২২৩৮নং)
একদা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বললেন,
لَعَنَ اللَّهُ الوَاشِمَاتِ وَالْمُسْتَوْشِمَاتِ وَالْمُتَنَمِّصَاتِ ، وَالْمُتَفَلَّجَاتِ لِلْحُسْنِ الْمُغَيِّرَاتِ خَلْقَ اللَّهِ.
'আল্লাহর অভিশাপ হোক সেই সব নারীদের উপর, যারা দেহাঙ্গে উলকি উৎকীর্ণ করে এবং যারা উৎকীর্ণ করায় এবং সে সব নারীদের উপর, যারা ভ্রূ চেঁছে সরু করে, যারা সৌন্দর্যের মানসে দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে পরিবর্তন আনে।' জনৈক মহিলা এ ব্যাপারে তাঁর (ইবনে মাসউদের) প্রতিবাদ করলে তিনি বললেন, 'আমি কি তাকে অভিসম্পাত করব না, যাকে আল্লাহর রসূল অভিসম্পাত করেছেন এবং তা আল্লাহর কিতাবে আছে? আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا } .
"রসূল যে বিধান তোমাদেরকে দিয়েছেন তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাক।" (সূরা হাশর ৭ আয়াত, বুখারী ৪৮৮৬নং, মুসলিম ৫৬৯৫নং, আসহাবে সুনান)

৩৪। বিপদের সময় অধৈর্য প্রকাশ ক'রে যে মহিলা অস্বাভাবিক আচরণ করে, সে অভিশপ্তাঃ আবু উমামা বলেন,
إن رسول الله ﷺ لَعَنَ الْخَامِشَةَ وَجْهَهَا وَالشَّاقَةَ جَيْبَهَا وَالدَّاعِيَةَ بِالْوَيْلِ وَالنُّبُور.
'যে নারী (কান্নার সময়) মুখমন্ডল খামচায়, বুকের কাপড় ফাড়ে এবং ধ্বংস ও সর্বনাশ ডাকে, সে নারীকে রাসূলুল্লাহ অভিশাপ করেছেন।" (ইবনে মাজাহ ১৫৮৫, ইবনে হিব্বান ৩১৫৬, সহীহুল জামে' ৫০৯২নং)

৩৫। বিপদের সময় যে উচ্চ স্বরে কান্না করে, কাপড় ছেঁড়ে বা মাথা নেড়া করে, সে অভিশপ্তঃ আবু মুসা বলেছেন,
إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَعَنَ مَنْ حَلَقَ أَوْ خَرَقَ أَوْ سَلَقَ.
'(শোকের সময়) যে ব্যক্তি মাথা নেড়া করে, কাপড় ছেঁড়ে অথবা চিৎকার ক'রে কান্না করে, তাকে রাসূলুল্লাহ অভিশাপ করেছেন।' (আহমাদ ১৯৬২৬, নাসাঈ ১৮৬৭, তাবারানী ২০৯৩৬, ইবনে হিব্বান ৩১৫৪নং)

৩৬। অধিক কবর যিয়ারতকারিণী মহিলা অভিশপ্তাঃ আবু হুরাইরা বলেন,
إن رسول الله صلى الله عليه و سلم لعن زوارات القبور.
"অধিক কবর যিয়ারতকারিণী মহিলাদেরকে আল্লাহর রসূল অভিসম্পাত করেছেন।" (তিরমিযী ১০৫৬, ইবনে মাজাহ ১৫৭৬নং, ইবনে হিব্বান, আহমাদ ২/৩৩৭, ৩৫৬)

৩৭। যারা সমকাম (পুরুষে-পুরুষে বা মহিলায়-মহিলায় যৌন-মিলন) করে, তারা অভিশপ্তঃ
((لَعَنَ اللَّهُ مَنْ عَمِلَ عَمَلَ قَوْمٍ لُوطٍ لَعَنَ اللَّهُ مَنْ عَمِلَ عَمَلَ قَوْمٍ لُوطٍ ثَلَاثًا.
"আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে অভিসম্পাত করুন, যে লুত জাতির কর্ম (সমকামিতা) করে।" এ কথা তিনি তিনবার বলেছেন। (আহমাদ ২৯১৩, নাসাঈর কুবরা ৭৩৩৭নং)

৩৮। যে পশু-সঙ্গম করে, সে অভিশপ্তঃ
রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
((مَلْعُونٌ مَنْ سَبَّ أَبَاهُ مَلْعُونٌ مَنْ سَبَّ أُمَّهُ مَلْعُونٌ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللَّهِ مَلْعُونٌ مَنْ غَيَّرَ تُخُومَ الْأَرْضِ مَلْعُونٌ مَنْ كَمَّهَ أَعْمَى عَنْ الطَّرِيقِ مَلْعُونٌ مَنْ وَقَعَ عَلَى بَهِيمَةٍ)).
"সে অভিশপ্ত, যে নিজ পিতাকে গালি দেয়, সে অভিশপ্ত, যে নিজ মাতাকে গালি দেয়, সে অভিশপ্ত, যে আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে যবেহ করে, সে অভিশপ্ত, যে জমির সীমা-চিহ্ন পরিবর্তন করে, সে অভিশপ্ত, যে অন্ধকে পথচ্যুত করে, সে অভিশপ্ত, যে পশুগমন করে।" (আহমাদ ২৯১৪, সঃ জামে' ৫৮৯১নং)

৩৯। যে ব্যক্তি স্ত্রীর পায়খানাদ্বারে সঙ্গম করে, সে অভিশপ্তঃ মহানবী বলেছেন,
مَلْعُونَ مَنْ أَتَى امْرَأَتَهُ فِي دُبُرِهَا ..
"সে ব্যক্তি অভিশপ্ত, যে তার স্ত্রীর পায়খানাদ্বারে সঙ্গম করে।" (আহমাদ ৯৭৩৩, আবু দাউদ ২১৬৪নং)

৪০। যে স্ত্রী স্বামীর যৌন আহবানে সাড়া না দিয়ে স্বামীকে রাগান্বিত ক'রে রাত্রিযাপন করে, সে অভিশপ্তঃ মহানবী বলেছেন,
(( إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فَرَاشِهِ فَلَمْ تَأْتِهِ ، فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا، لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ )). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"যদি কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে নিজ বিছানায় ডাকে এবং সে না আসে, অতঃপর সে (স্বামী) তার প্রতি রাগান্বিত অবস্থায় রাত কাটায়, তাহলে ফিরিস্তাগণ তাকে সকাল অবধি অভিসম্পাত করতে থাকেন।" অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, "যখন স্ত্রী নিজ স্বামীর বিছানা ত্যাগ করে (অন্যত্র) রাত্রিযাপন করে, তখন ফিরিশাবর্গ সকাল পর্যন্ত তাকে অভিশাপ দিতে থাকেন।" আর এক বর্ণনায় আছে যে, "সেই আল্লাহর কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! কোন স্বামী তার স্ত্রীকে নিজ বিছানার দিকে আহবান করার পর সে আসতে অস্বীকার করলে যিনি আকাশে আছেন তিনি (আল্লাহ) তার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন, যে পর্যন্ত না স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যায়।" (বুখারী ৫১৯৩, মুসলিম ১৪৩৬, আবু দাউদ ২১৪১নং, নাসাঈ)

৪১। যে অন্ধকে ভুল পথ নির্দেশ করে, সে অভিশপ্ত ঃ (৩৮নং দ্রঃ)

৪২। মূর্তি (বা ছবি) নির্মাণকারী অভিশপ্ত। আবু জুহাইফা বলেন,
إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ ثَمَنِ الدَّمِ وَثَمَنِ الْكَلْبِ وَكَسْبِ الْأَمَةِ وَلَعَنَ الْوَاشِمَةَ وَالْمُسْتَوْشِمَةَ وَآكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَلَعَنَ الْمُصَوِّرَ.
রাসূলুল্লাহ ﷺ রক্ত ও কুকুরের মূল্য এবং বেশ্যা (দাসী)র উপার্জন গ্রহণ করা থেকে নিষেধ করেছেন। আর সুদখোর, সুদদাতা, চেহারা (নকশা করার জন্য) দাগে বা দাগায় এমন নারী এবং মূর্তি (বা ছবি) নির্মাতাকে অভিসম্পাত করেছেন। (বুখারী ২২৩৮, আবু দাউদ ৩৪৮৩নং সংক্ষিপ্তভাবে)

৪৩। যে ব্যক্তি পশুর চেহারা দাগে, সে অভিশপ্তঃ একদা নবী ﷺ একটি গাধার পাশ বেয়ে পার হলেন। গাধাটির মুখে দাগার দাগ দেখে তিনি বললেন,
لَعَنَ اللَّهُ الَّذِي وَسَمَهُ ..
"আল্লাহ তাকে অভিশাপ করুন যে একে দেগেছে।" (মুসলিম ৫৬৭৪নং)

৪৪। যে ব্যক্তি কবরকে সিজদাগাহে পরিণত করে, সে অভিশপ্তঃ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لَعَنَ اللَّهُ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ ..
"আল্লাহ ইয়াহুদ ও খ্রিস্টানকে অভিসম্পাত করুন (অথবা করেছেন), তারা তাদের পয়গম্বরদের সমাধিসমূহকে উপাসনালয়ে পরিণত করেছে।" (বুখারী ১৩৩০, ১৩৯০, মুসলিম ১২১২নং)

৪৫। যে পরের বাপকে নিজের বাপ বলে দাবী করে এবং নিজের বংশ অস্বীকার করে, সে অভিশপ্তঃ মহানবী ﷺ বলেছেন,
مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ أَوِ انْتَمَى إِلَى غَيْرِ مَوَالِيهِ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ الْمُتَتَابِعَةُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ..
"যে ব্যক্তি পরের বাপকে নিজের বাপ বলে দাবী করে অথবা তার (স্বাধীনকারী) প্রভু ছাড়া অন্য প্রভুর প্রতি সম্বন্ধ জুড়ে, সে ব্যক্তির উপর কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর অবিরাম অভিশাপ।" (আবু দাউদ ৫১১৭, সহীহুল জামে' ৫৯৮৭নং)
মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় আছে যে, "এমন ব্যক্তির উপর আল্লাহ, ফিরিশতামন্ডলী এবং সমগ্র মানবমন্ডলীর অভিশাপ। আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার নিকট থেকে কোন নফল অথবা ফরয ইবাদতই গ্রহণ করবেন না।" (মুসলিম ১৩৭০নং)

৪৬। যে কোন সাহাবীকে গালি দেয়, সে অভিশপ্তঃ রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
لا تسبوا أصحابي، لعن الله من سب أصحابي)).
"তোমরা আমার সাহাবাকে গালি দিয়ো না। যে ব্যক্তি আমার সাহাবাকে গালি দেয়, আল্লাহ তাকে অভিশাপ করেন।" (ত্বাবারানীর আউসাত্ব ৪৭৭১,, সঃ জামে' ৫১১১নং)
((مَنْ سَبَّ أَصْحَابِي فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ ، وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ)).
"সে ব্যক্তি আমার সাহাবাগণকে গালি দেবে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশাবর্গ এবং সমগ্র মানবজাতির অভিশাপ হোক।" (ত্বাবারানীর কাবীর ১২৫৪১, সিলসিলাহ সহীহাহ ৩৩৪০নং)

৪৭। যে ঘুষ দেয় ও ঘুষ নেয়, সে অভিশপ্তঃ আব্দুল্লাহ বিন আম্র বলেন,
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - الرَّاشِيَ وَالْمُرْتَشِيَ.
'আল্লাহর রসূল ঘুষখোর, ঘুষদাতা (উভয়কেই) অভিশাপ করেছেন।' (আবু দাউদ ৩৫৮২, তিরমিযী ১৩৩৭, ইবনে মাজাহ ২৩১৩, ইবনে হিব্বান, হাকেম ৪/১০২-১০৩, সহী আবু দাউদ ৩০৫৫নং)

৪৮। যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়, সে অভিশপ্তঃ আবূ জুহাইফা বলেন, এক ব্যক্তি মহানবী -এর কাছে এসে নিজ প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করল। তিনি তাকে বললেন, 'তুমি তোমার আসবাব-পত্র রাস্তায় বের ক'রে ফেলো।' সে ফিরে গিয়ে তাই করল। তা দেখে পথচারী লোকেরা কারণ জিজ্ঞাসা করলে প্রতিবেশীর কষ্ট দেওয়ার কথা জানানো হল। সুতরাং সকলে ঐ প্রতিবেশীকে অভিশাপ দিতে লাগল। সে তা শুনে মহানবী -এর কাছে এসে লোকেদের অভিশাপ দেওয়ার কথা জানালে তিনি তাকে বললেন,
قَدْ لَعَنَكَ اللَّهُ قَبْلَ النَّاسِ)).
'তাদের আগে আল্লাহ তোমাকে অভিশাপ দিয়েছেন।' প্রতিবেশীটি বলল, 'আমি ওকে আর কষ্ট দেব না।' অতঃপর অভিযোগকারী মহানবী -এর কাছে এলে তাকে তার আসবাবপত্র তুলে নিতে আদেশ করলেন এবং তাকে আশ্বস্ত করলেন। (আবু দাউদ ৫১৫৫নং আবু হুরাইরা কর্তৃক, ত্বাবারানী, বায্যার, সঃ তারগীব ২৫৫৮-২৫৫৯নং)

৪৯। যে ব্যক্তি আল্লাহর দোহাই দিয়ে পার্থিব কিছু চায় এবং যে ব্যক্তির কাছে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বৈধ কিছু চাওয়া হয় অথচ সে তা দেয় না, সে অভিশপ্তঃ আল্লাহর রসূল বলেছেন,
(ملعون من سأل بوجه الله وملعون من سئل بوجه الله ثم منع سائله ما لم يسأل هجرا)).
"সে ব্যক্তি অভিশপ্ত, যে আল্লাহর নামে কিছু যাজ্ঞা করে। আর সে ব্যক্তিও অভিশপ্ত, যার নিকট হতে আল্লাহর নামে কিছু যাজ্ঞা করা হয় অথচ সে যাাজ্ঞাকারীকে দান করে না; যদি সে অবৈধ (বা অবৈধভাবে) কিছু না চেয়ে থাকে তবে।" (ত্বাবারানী, সহীহ তারগীব ৮৫১নং)

৫০। যে ব্যক্তি নিজের ৩ তালাক দেওয়া বিবিকে হালাল করবার উদ্দেশ্যে এক রাতের জন্য অপরের সাথে তার বিয়ে দেয় এবং যে বিয়ে করে (হালালাহ বা হিল্লে করে), সে অভিশপ্তঃ মহানবী বলেছেন,
لَعَنَ اللَّهُ الْمُحَلَّلَ وَالْمُحَلَّلَ لَهُ ...
"আল্লাহ হালালকারী ও যার জন্য হালাল করা হয় উভয়কে অভিশাপ করেছেন বা করুন।" (আহমাদ ৪৩০৮, আবু দাউদ ২০৭৮, তিরমিযী ১১১৯-১১২০, নাসাঈ, সহীহুল জামে ৫১০১নং)

৫১। যে ব্যক্তি জনসাধারণের ঘাটে, মাঝ রাস্তায় বা ছায়ায় পায়খানা করে, সে অভিশপ্তঃ আল্লাহর রসূল বলেন,
اتَّقُوا الْمَلاعِنَ الثَّلَاثَ الْبَرَازَ فِي الْمَوَارِدِ وَقَارِعَةِ الطَّرِيقِ وَالظَّلَّ ..
"তোমরা তিনটি অভিশাপ আনয়নকারী কর্ম থেকে বাঁচ; আর তা হল, ঘাটে, মাঝ-রাস্তায় এবং ছায়ায় পায়খানা করা।" (আবু দাউদ ২৬, ইবনে মাজাহ ৩২৮, সহীহ তারগীব ১৪১ নং)

৫২। যে রাস্তার ব্যাপারে মুসলিমদেরকে কষ্ট দেয়, সে অভিশপ্তঃ মহানবী বলেন,
((مَنْ آذِى الْمُسْلِمِينَ فِي طُرُقِهِمْ وَجَبَتْ عَلَيْهِ لَعْنَتُهُمْ)).
"যে ব্যক্তি রাস্তার ব্যাপারে মুসলিমদেরকে কষ্ট দেয়, সে ব্যক্তির উপরে তাদের অভিশাপ অনিবার্য হয়ে যায়।" (ত্বাবারানী কাবীর ২৯৭৮, সহীহ তারগীব ১৪৩নং)

৫৩। যে ব্যক্তি অস্ত্র উঠিয়ে মুসলিম ভাইকে সন্ত্রস্ত করে, সে অভিশপ্তঃ আবুল কাসেম বলেন,
مَنْ أَشَارَ إِلَى أَخِيهِ بِحَدِيدَةٍ فَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ تَلْعَنُهُ حَتَّى وَإِنْ كَانَ أَخَاهُ لِأَبِيهِ وَأُمِّهِ ..
"যে ব্যক্তি তার (মুসলিম) ভায়ের প্রতি কোন লৌহদন্ড (লোহার অস্ত্র) দ্বারা ইঙ্গিত করে, সে ব্যক্তিকে ফিরিশাবর্গ অভিশাপ করেন; যদিও সে তার নিজের সহোদর ভাই হোক না কেন।" (অর্থাৎ, তাকে মারার ইচ্ছা না থাকলেও ইঙ্গিত করে ভয় দেখানো গোনাহর কাজ।) (মুসলিম ২৬১৬নং)

৫৪। মহানবী বলেন,
( الدُّنْيَا مَلْعُونَةٌ ، مَلْعُونٌ مَا فِيهَا ، إِلَّا ذِكْرَ اللهِ تَعَالَى ، وَمَا وَالاهُ ، وَعَالِماً ، أَوْ مُتَعَلِّماً ))
"পৃথিবী অভিশপ্ত এবং অভিশপ্ত তার সকল বস্তু। তবে আল্লাহর যিক্র ও তার আনুষঙ্গিক বিষয়, এবং আলেম (দ্বীন শিক্ষক) ও তালেবে ইলম (দ্বীন শিক্ষার্থী অভিশপ্ত) নয়।" (তিরমিযী ২৩২২, ইবনে মাজাহ ৪১১২, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৭০৮, সহীহ তারগীব ৭০নং)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00