📄 যে অপরাধের শাস্তি অপরাধের মতোই : খুনের বদলে খুন
ইসলাম মানুষকে পৃথিবীতে বাঁচার অধিকার দিয়েছে। মহান আল্লাহ তাকে ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাই তিনি পরস্পরকে হত্যা বা আত্মহত্যা করতে নিষেধ করেছেন। মানুষের প্রাণের প্রতি গুরুত্বারোপ ক'রে তিনি বলেছেন,
{مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعاً وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعاً} [المائدة : ٣٢]
অর্থাৎ, এ কারণেই বনী ইস্রাঈলের প্রতি এ বিধান দিলাম যে, যে ব্যক্তি নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করার দন্ডদান উদ্দেশ্য ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষকেই হত্যা করল। আর কেউ কারো প্রাণরক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করল। (মায়েদাহঃ ৩২)
মানুষ খুন করা একটা সর্বনাশী কর্ম। খুন করাকে মহা অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে ইসলামে। নানাভাবে সে কথা বলা হয়েছে হাদীসে। মহানবী বলেছেন,
((لَزَوَالُ الدُّنْيَا ، أَهْوَنُ عِنْدَ اللَّهِ ، مِنْ قَتْلِ رَجُلٍ مُسْلِمٍ)).
"একজন মুসলিমকে খুন করার চাইতে জগৎ ধ্বংস হয়ে যাওয়া আল্লাহর নিকট অধিক সহজ।" (তিরমিযী ১৩৯৫, নাসাঈ ৩৯৮৭নং)
((كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ : دَمُهُ وَعِرْضُهُ وَمَالُهُ )) . رواه مسلم
"প্রত্যেক মুসলিমের রক্ত, সম্ভ্রম ও ধন-সম্পদ অন্য মুসলিমের উপর হারাম।" (মুসলিম ৬৭০৬নং)
((سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ ، وَقِتَالُهُ كُفْرٌ)). متفق عَلَيْهِ
"মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেকী (আল্লাহর অবাধ্যাচরণ) এবং তার সাথে লড়াই করা কুফরী।" (বুখারী ৪৮, ৬০৪৪, মুসলিম ২৩০নং, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)
((لَنْ يَزَالَ الْمُؤْمِنُ فِي فُسْحَةٍ مِنْ دِينِهِ مَا لَمْ يُصِبْ دَمًا حَرَامًا.
"মু'মিন ব্যক্তি তার দ্বীনের প্রশস্ততায় থাকে; যতক্ষণ না সে অবৈধ রক্তপাতে লিপ্ত হয়।" (আহমাদ ৫৬৮১, বুখারী ৬৮৬২নং)
(( أَوَّلُ مَا يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ يَوْمَ القِيَامَةِ فِي الدِّمَاء )) . متفق عليه
"কিয়ামতের দিন (মানবিক অধিকারের বিষয়) সর্বপ্রথমে লোকেদের মধ্যে যে বিচার করা হবে তা রক্ত সম্পর্কিত হবে।" (বুখারী ৬৮৬৪, মুসলিম ৪৪৭৫নং)
يَجِيءُ الْمَقْتُولُ بِالْقَاتِلِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ نَاصِيَتُهُ وَرَأْسُهُ بِيَدِهِ وَأَوْدَاجُهُ تَشْخُبُ دَمًا يَقُولُ يَا رَبِّ هَذَا قَتَلَنِي حَتَّى يُدْنِيَهُ مِنَ الْعَرْشِ)).
"কিয়ামতের দিন খুন হয়ে নিহত ব্যক্তি তার খুনীকে তার মাথা ও কপালের চুল ধরে উপস্থিত করবে। আর সে সময় তার শিরাগুলো থেকে রক্তের ফিনকি ছুটবে। সে বলবে, 'হে আমার প্রতিপালক! আপনি একে জিজ্ঞাসা করুন, ও কেন আমাকে খুন করেছে?' পরিশেষে সে তাকে আরশের নিকটবর্তী করবে।" (তিরমিযী ৩০২৯, নাসাঈ ৪০০৫, ইবনে মাজাহ ২৬২১, সহীহুল জামে' ৮০৩১নং)
( إِذا التَّقَى المُسلِمَانِ بِسَيْفَيهِمَا فَالقَاتِلُ وَالمَقْتُولُ فِي النَّار (( قُلْتُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ! هذا القَاتِلُ فَمَا بَالُ المَقْتُول ؟ قَالَ : (( إِنَّهُ كَانَ حَريصاً عَلَى قتل صَاحِبِهِ )). مُتَّفَقٌ عليه.
"যখন দু'জন মুসলমান তরবারি নিয়ে আপোসে লড়াই করে, তখন হত্যাকারী ও নিহত দু'জনই দোযখে যাবে।" আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! হত্যাকারীর দোযখে যাওয়া তো স্পষ্ট; কিন্তু নিহত ব্যক্তির ব্যাপার কী?' তিনি বললেন, "সেও তার সঙ্গীকে হত্যা করার জন্য লালায়িত ছিল।" (বুখারী ৩১, ৬৮৭৫, মুসলিম ৭৪৩৪নং)
كُلُّ ذَنْبٍ عَسَى اللَّهُ أَنْ يَغْفِرَهُ إِلَّا مَنْ مَاتَ مُشْركًا أَوْ مُؤْمِنٌ قَتَلَ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا ..
"যে ব্যক্তি মুশরিক হয়ে মারা যায় অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করে, সে ব্যক্তির পাপ ছাড়া অন্যান্য ব্যক্তির পাপকে আল্লাহ মাফ ক'রে দিতে পারেন।" (আহমাদ ১৬৯০৭, নাসাঈ ৩৯৮৪, হাকেম ৮০৩১-৮০৩২, আবু দাউদ ৪২৭২নং আবু দারদা হতে, সহীহুল জামে' ৪৫২৪নং)
আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا } (۹۳) سورة النساء
"যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন বিশ্বাসীকে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম। সেখানে সে চিরকাল থাকবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে অভিসম্পাত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত ক'রে রাখবেন।" (নিসাঃ ৯৩)
কেবল মুসলিমই নয়, অমুসলিমকেও হত্যা করলে পরিত্রাণ পাবে না হত্যাকারী। মহানবী বলেছেন,
((مَنْ قَتَلَ نَفْسًا مُعَاهَدًا لَمْ يَرِحْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ أَرْبَعِينَ عاما)).
"যে ব্যক্তি কোন (মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসকারী) যিম্মী (অথবা সন্ধিচুক্তির পর বিপক্ষের কাউকে) হত্যা করবে, সে ব্যক্তি বেহেশ্বের সুবাসও পাবে না। অথচ তার সুবাস ৪০ বছরে অতিক্রম্য দূরবর্তী স্থান হতে পাওয়া যাবে।" (বুখারী ৩১৬৬, ৬৯১৪, ইবনে মাজাহ ২৬৮৬নং)
হত্যার প্রকারভেদঃ
সাধারণতঃ হত্যা ৩ প্রকার হয়ে থাকে।
এক: ইচ্ছাকৃত হত্যা।
ইচ্ছা করেই এমন জিনিসের মাধ্যমে মেরে ফেলা, যার মাধ্যমে সাধারণতঃ হত্যা করা যায়। আর এ হত্যায় অপরাধী হয় ৩টি শর্তেঃ-
(ক) জ্ঞানসম্পন্ন সাবালক স্বেচ্ছায় হত্যায় করবে।
(খ) যার রক্তপাত বৈধ নয়, এমন কোন মানুষকে হত্যা করবে।
(গ) এমন জিনিস বা মাধ্যম প্রয়োগ ক’রে হত্যা করবে, যা দিয়ে সাধারণতঃ হত্যা করা যায়।
এতে আছে মহাপাপ। এতে আছে ক্বিস্বাস (খুনের বদলে খুন)। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ والأُنثَى بالأُنثَى فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتَّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءِ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ ذَلِكَ تَخْفِيفٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ فَمَنِ اعْتَدَى بَعْدَ ذَلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ} (۱۷۸) سورة البقرة
“হে বিশ্বাসিগণ! নরহত্যার ব্যাপারে তোমাদের জন্য ক্বিস্বাসের (প্রতিশোধ গ্রহণের বিধান) বিধিবদ্ধ করা হল; স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস ও নারীর বদলে নারী। কিন্তু তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কিছুটা ক্ষমা প্রদর্শন করা হলে, প্রচলিত প্রথার অনুসরণ করা ও সদয়ভাবে তার দেয় পরিশোধ করা উচিত। এ তো তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ভার লাঘব ও অনুগ্রহ। এর পরও যে সীমালংঘন করে, তার জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে।” (বাক্বারাহঃ ১৭৮)
জাহেলিয়াতের যুগে কোন আইন-কানুন ছিল না, তাই সবল গোত্রগুলো দুর্বল গোত্রগুলোর উপর যেভাবে চাইতো যুলুম-অত্যাচার করত। তাদের যুলুমের একটি প্রকার এ রকম ছিল যে, যদি সবল গোত্রের কোন পুরুষ হত্যা হয়ে যেত, তাহলে তারা কেবল হত্যাকারীকে হত্যা করার পরিবর্তে তার (হত্যাকারীর) পরিবারের কয়েকজনকে এমন কি কখনো কখনো পুরো গোত্রকে বিনাশ করার প্রচেষ্টা করত এবং মহিলার পরিবর্তে পুরুষকে ও ক্রীতদাসের পরিবর্তে স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করত। মহান আল্লাহ এই ভেদাভেদ উচ্ছেদ ক’রে বললেন, যে হত্যা করবে, ক্বিসাসে (প্রতিশোধ গ্রহণে) কেবল তাকেই হত্যা করা হবে। হত্যাকারী স্বাধীন ব্যক্তি হলে, বদলায় ঐ স্বাধীন ব্যক্তিকেই, ক্রীতদাস হলে, ঐ ক্রীতদাসকেই এবং মহিলা হলে, ঐ মহিলাকেই হত্যা করা হবে। ক্রীতদাসের পরিবর্তে স্বাধীন ব্যক্তিকে, মহিলার পরিবর্তে পুরুষকে অথবা একজন পুরুষের পরিবর্তে কয়েকজন পুরুষকে হত্যা করা যাবে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, পুরুষ যদি মহিলাকে হত্যা করে, তাহলে ক্বিস্বাসে কোন মহিলাকে হত্যা করা হবে অথবা মহিলা যদি পুরুষকে হত্যা করে, তবে ক্বিস্বাসে কোন পুরুষকে হত্যা করা হবে (যেমন শব্দের বাহ্যিক ভাবার্থ থেকে এটাই ফুটে উঠছে)। বরং শব্দগুলো আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ অনুপাতে সন্নিবিষ্ট হয়েছে; যার পরিষ্কার অর্থ (লক্ষ্যার্থ) হল, ক্বিস্বাসে হত্যাকারীকেই হত্যা করা হবে। তাতে সে পুরুষ হোক অথবা মহিলা, সবল হোক কিংবা দুর্বল। হাদীসে এসেছে, "সমস্ত মুসলিমের রক্ত (পুরুষ হোক বা মহিলা) সমান।" (আবু দাউদ ২৭৫১)
সুতরাং, আয়াতের অর্থ হল তা-ই, যা অন্য আয়াতে এসেছে,
{وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالأنف بالأنف والأذن بالأذن وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصِ فَمَن تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَّهُ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ} (٤٥) سورة المائدة
"তাদের জন্য ওতে (তওরাতে) বিধান দিয়েছিলাম যে, প্রাণের বদল প্রাণ, চোখের বদল চোখ, নাকের বদল নাক, কানের বদল কান, দাঁতের বদল দাঁত এবং জখমের বদল অনুরূপ জখম। অতঃপর কেউ তা ক্ষমা করলে ওতে তারই পাপ মোচন হবে। আর আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই অত্যাচারী।" (মায়িদাহঃ ৪৫)
উক্ত আয়াতটিতে আহলে কিতাবের কিতাবে উল্লিখিত বিধানের কথা বলা হয়েছে। তা কি মুসলিমদের জন্য মান্য? উসূল (ফিক্বহী মৌলনীতির) উলামাগণ লিখেছেন যে, বিগত শরীয়তের বিধান যদি আল্লাহ অব্যাহত রাখেন, তাহলে তার উপর আমল করা আমাদের জন্যও জরুরী। আর উক্ত আয়াতের বিধান রহিত হয়নি। সুতরাং এটাই ইসলামী শরীয়তের একটা বিধান, যা হাদীস থেকেও প্রমাণিত।
হানাফী উলামাগণ উক্ত আয়াত থেকে সাব্যস্ত করেছেন যে, মুসলিমকে কাফেরের ক্বিস্বাসে হত্যা করা যাবে। কিন্তু অধিকাংশ আলেমগণ এ কথার সমর্থন করেননি। কেননা, হাদীস দ্বারা أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ জানের বদলে জানের ব্যাপক বিধান থেকে দুটি অবস্থা বহির্ভূত:-
(ক) যদি কোন মুসলিম কোন কাফেরকে হত্যা ক'রে ফেলে, তাহলে কাফেরের পরিবর্তে মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না। কারণ, হাদীসে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, "মুসলিমকে কাফেরের ক্বিস্বাসে হত্যা করা যাবে না।" (বুখারী ১১১নং, ফাতহুল ক্বাদীর)
(খ) অনুরূপভাবে কোন স্বাধীন ব্যক্তি যদি কোন ক্রীতদাসকে হত্যা ক'রে ফেলে, তাহলে তাকে তার পরিবর্তে হত্যা করা যাবে না। (বিস্তারিত দেখুনঃ ফাতহুল বারী, নায়নুল আওতার ইত্যাদি)
এ আইনে ইতর-ভদ্রের সমানাধিকার নেই। রয়েছে প্রত্যেক মানুষের তার যথার্থ মর্যাদা। আর এটাই প্রকৃত ন্যায়পরায়ণতা।
কোন কারণবশতঃ একটি প্রাণ নষ্ট হয়েছে, তাহলে তার বদলে আরও একটি প্রাণ নষ্ট করায় কি মানবাধিকার লংঘন হয় না? এর উত্তরে মহান আল্লাহ জ্ঞানীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন,
{وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ يَا أُولِي الأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ} (۱۷۹) سورة البقرة
"হে বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! তোমাদের জন্য ক্বিস্বাসে (প্রতিশোধ গ্রহণের বিধানে) জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা সাবধান হতে পার।" (বাক্বারাহঃ ১৭৯)
জীবন নষ্ট করাতে কীভাবে জীবন রয়েছে?
যখন হত্যাকারীর এই ভয় হবে যে, আমাকেও ক্বিস্বাসে হত্যা করা হবে, তখন সে কাউকে হত্যা করতে সাহস পাবে না। আর তার ফলে মানুষ জীবন লাভ করবে এবং মানবের প্রকৃত অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে।
তদনুরূপ ক্বিস্বাসে খুনীকে খুন করা হলে নিহত ব্যক্তির পরিবারের লোকেরা মানসিক শান্তি পাবে এবং প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবল ইচ্ছা তাদের শোকাহত মন থেকে দূর হয়ে যাবে। নচেৎ এমন হতে পারে যে, প্রতিশোধ নিতে গিয়ে একটার জায়গায় দুটো অথবা খুনীর জায়গায় তার কোন নিরপরাধ আত্মীয়কে খুন করা হতে পারে। ফলে তারাও পাল্টা প্রতিশোধ নিতে আবারও খুন করতে বদ্ধপরিকর হতে পারে। আর এইভাবে খুনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকতে পারে। কিন্তু 'ক্বিস্বাস'-এর আইন সেই ধারাবাহিকতা প্রতিহত করে এবং মানুষকে একটার জায়গায় বহু খুন থেকে জীবন দান করে।
যে সমাজে ক্বিস্বাসের আইন বলবৎ থাকে, সে সমাজে এ (কিস্বাসে হত্যা হওয়ার) ভয় সমাজকে হত্যা ও খুনোখুনি থেকে সুরক্ষিত রাখে এবং এরই ফলে সমাজে নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আর এর (বাস্তব) দৃশ্য আজও সৌদী আরবে লক্ষ্য করা যেতে পারে, যেখানে---আলহামদু লিল্লাহ---ইসলামী দন্ড-বিধির কার্যকারিতার বরকতসমূহ বিদ্যমান রয়েছে। যদি অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলিও ইসলামী দন্ড-বিধি কার্যকরী ক'রে জনসাধারণের জন্য শান্তিময় জীবন-যাপনের সুব্যবস্থা করতে পারত, তাহলে কতই না ভাল হত! (আহসানুল বায়ান)
নিহত ব্যক্তির ওয়ারেসগণ খুনীকে ক্ষমা ক'রে রক্তপণ নিতে পারে। তা আদায় করতে হবে অপরাধীর মাল থেকে। আর এ ক্ষেত্রে তাকে কাফফারাও আদায় করতে হবে।
ক্ষমা ক'রে দেওয়ার দু'টি পদ্ধতি। যথাঃ-
(ক) মালের কোন বিনিময় গ্রহণ ছাড়াই কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ক্ষমা ক'রে দেওয়া।
(খ) ক্বিসাসের পরিবর্তে মুক্তিপণ গ্রহণ করা।
দ্বিতীয় পদ্ধতি অবলম্বন করলে মুক্তিপণের দাবীদারকে বলা হয়েছে যে, সে যেন প্রচলিত নিয়মের অনুসরণ করে। আর وَادَاءُ إِلَيْهِ بِإِحْسَان[ এ হত্যাকারীকে বলা হচ্ছে যে, সে যেন কোন সংকীর্ণতা সৃষ্টি না ক'রে বিনিময় ভালভাবে আদায় ক'রে দেয়। হতের আত্মীয়রা তার প্রাণ না নিয়ে তার উপর যে অনুগ্রহ করল, তার বদলাও অনুগ্রহের সাথে হওয়া দরকার। هَلْ جَزَاءُ الْإِحْسَانِ إِلَّا الْإِحْسَانُ] (الرحمن : ٦٠)
"উত্তম কাজের জন্য উত্তম বিনিময় ব্যতীত আর কী হতে পারে?" (রাহমানঃ ৬০)
মহান আল্লাহ বলেছেন, এই লাঘব এবং অনুগ্রহ (অর্থাৎ, ক্বিস্বাস, ক্ষমা অথবা মুক্তিপণ গ্রহণ এই তিনটি পদ্ধতিই) আল্লাহর পক্ষ থেকে খাস তোমাদের জন্যই। ইতিপূর্বে তাওরাতধারীদের জন্য কেবল ক্বিস্বাস ও ক্ষমা ছিল। মুক্তিপণ ছিল না। আর ইঞ্জীলধারীদের মাঝে কেবল ক্ষমা ছিল; ক্বিস্বাস ছিল না এবং মুক্তিপণও না। (ইবনে কাষীর)
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, "এর পরও যে সীমালংঘন করে, তার জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে।" অর্থাৎ, মুক্তিপণ গ্রহণ করার পর যদি আবার হত্যাকারীকে হত্যা করা হয়, তাহলে তা সীমালংঘন ও বাড়াবাড়ি হবে এবং এর শাস্তি তাকে দুনিয়াতেও ভোগ করতে হবে এবং আখেরাতেও।
ইচ্ছাকৃত খুনের বিধানে আরো একটি ধারা হল, যাকে খুন করা হয়, খুনী যদি তার ওয়ারেস হয়, তাহলে সে মীরাস থেকে বঞ্চিত হবে।
দুইঃ প্রায় ইচ্ছাকৃত হত্যা।
এতে মেরে ফেলার ইচ্ছা থাকে না এবং এমন কিছু দিয়ে ইচ্ছাকৃত আঘাত করা, যার দ্বারা সাধারণতঃ হত্যা করা যায় না। এতে ক্বিস্বাস নেই। রক্তপণ আছে। তা আদায় করতে হবে অপরাধীর (আস্বাবা) ওয়ারেসদেরকে। এতে পাপ আছে। তওবা করতে হবে।
তিনঃ অনিচ্ছাকৃত হত্যা।
তাতে মারার কোন ইচ্ছাই থাকে না। কিন্তু ভুল ক'রে তার হাতে হত্যাকান্ড ঘটে যায় অথবা কোনভাবে সে হত্যার কারণ প্রতিপন্ন হয়। এতে ক্বিস্বাস নেই; আছে রক্তপণ। আদায় করতে হবে তার (আস্বাবা) ওয়ারেসদেরকে। আছে কাফফারা। এতে পাপ হয় না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَا كَانَ لِمُؤْمِن أَن يَقْتُلَ مُؤْمِنًا إِلَّا خَطَئًا وَمَن قَتَلَ مُؤْمِنًا خَطَنًا فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ وَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ إِلَّا أَن يَصَّدَّقُوا فَإِن كَانَ مِن قَوْمٍ عَدُوٌّ لَّكُمْ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ وَإِن كَانَ مِن قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ مِّيثَاقٌ فَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ وَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةً فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ تَوْبَةً مِّنَ اللَّهِ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا }
"কোন বিশ্বাসীকে হত্যা করা কোন বিশ্বাসীর জন্য সংগত নয়, তবে ভুলবশতঃ হত্যা ক'রে ফেললে সে কথা স্বতন্ত্র। কেউ কোন বিশ্বাসীকে ভুলবশতঃ হত্যা করলে এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা এবং তার (নিহতের) পরিজনবর্গকে রক্তপণ অর্পণ করা বিধেয়। তবে যদি তারা ক্ষমা ক'রে দেয়, তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু যদি সে তোমাদের শত্রু পক্ষের লোক হয় এবং বিশ্বাসী হয়, তবে এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা বিধেয়। আর যদি সে এমন এক সম্প্রদায়ভুক্ত হয়, যার সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ, তবে তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ অর্পণ এবং এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা বিধেয়। কেউ যদি (উক্ত দাস) না পায় (বা মুক্ত করার সামর্থ্য না রাখে), তাহলে সে একাদিক্রমে দু'মাস রোযা রাখবে। তওবার (সংশোধনের) জন্য এ আল্লাহর বিধান। বস্তুতঃ আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।" (নিসাঃ ৯২)
দন্ডবিধি প্রয়োগ করবে কেবল সরকার
ইসলামে যে সকল অপরাধের 'ক্বিস্বাস ও হুদুদ' (দন্ডবিধি) আছে, তা প্রয়োগ করবে একমাত্র ক্ষমতাসীন শাসক। খুনের বদলে খুন, বিবাহিত ব্যভিচারীকে হত্যা, মুর্তাদকে হত্যা, চোরের হাত কাটা ইত্যাদি শাস্তি কোন আম জনসাধারণ দিতে পারে না। যেহেতু সকলেই নিজের নিজের ইচ্ছানুযায়ী বিচার ক'রে দন্ড দিতে থাকলে পরিবেশে বিশাল বিশৃঙ্খলা ও अराजকতা দেখা দেবে। সবল দুর্বলকে ধ্বংস ও বিনাশ ক'রে ছাড়বে।
সুতরাং ইসলামী সরকার এমন সকল অপরাধীকে পাকড়াও ক'রে ইসলামী আদালতের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণ ক'রে সে শাস্তি প্রয়োগ করবে। আর সরকার না করলে বা ইসলামী না হলেও কোন সাধারণ নাগরিক তা করতে পারবে না। ('নবী নিয়ে ব্যঙ্গ' দ্রঃ)
📄 যে সকল অপরাধে কাফফারা আবশ্যক
'কাফ্ফারা' হল সেই জিনিস, যার মাধ্যমে অপরাধী অপরাধ থেকে মুক্ত ও ক্ষমাপ্রাপ্ত হতে পারে। কিছু পাপের প্রায়শ্চিত্তবিধান বর্ণিত হয়েছে ইসলামে। তার সাথে তওবাও করতে হয় মহান প্রতিপালকের নিকটে, যেহেতু তা পাপ।
প্রথমতঃ কসমের কাফ্ফারা
ভবিষ্যতে কোন কর্ম করা বা না করার উপরে তাকীদ আরোপ করার উদ্দেশ্যে অথবা শ্রোতার মনে কোন কথার সন্দেহ দূরীকরণের উদ্দেশ্যে কসম খাওয়া এক প্রকার ইবাদত এবং তাতে যার নামে কসম খাওয়া হয়, তার তাযীম উদ্দিষ্ট হয়। তাই আল্লাহ ও তাঁর নাম ও গুণাবলী ব্যতীত অন্য কিছুর কসম খাওয়া শির্ক। মহানবী বলেছেন,
(( إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَنْهَاكُمْ أَنْ تَحْلِفُوا بِآبَائِكُمْ، فَمَنْ كَانَ حَالِفًا ، فَلْيَحْلِفْ بِاللَّهِ ، أَوْ لِيَصْمُتْ )) . متفق عَلَيْهِ
"নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের বাপ-দাদার নামে শপথ করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং যে শপথ করতে চায়, সে যেন আল্লাহর নামে শপথ করে; নচেৎ চুপ থাকে।" (বুখারী ৬১০৮, ৬৬৪৬, মুসলিম ৪৩৪৬নং)
ইবনে উমার হতে বর্ণিত, তিনি একটি লোককে বলতে শুনলেন, 'না, কা'বার কসম!' ইবনে উমার বললেন, 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কসম খেয়ো না। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি যে,
(( مَنْ حَلَفَ بِغَيرِ اللهِ ، فَقَدْ كَفَرَ أَوْ أَشْرَكَ )) .
"যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর নামে কসম করে, সে কুফরী অথবা শির্ক করে।" (আহমাদ, তিরমিযী ১৫৩৫, ইবনে হিব্বান, হাকেম ১/৫২, সহীহুল জামে' ৬২০৪নং)
বলা বাহুল্য, বৈধ নয় গায়রুল্লাহর কসম খাওয়া, যেমন বৈধ নয় আল্লাহর নামেও মিথ্যা কসম খাওয়া।
কিন্তু যে বৈধ কসম খাওয়া হয়, তা রক্ষা করা আবশ্যক। ভঙ্গ করলে কাফফারা জরুরী হয়। অবশ্য কথার ভিতরে মুদ্রাদোষে যে সকল অনিচ্ছাকৃত নিরর্থক শপথ করা হয়, তা দয়াময় আল্লাহ ধরেন না। আর কসম ভাঙ্গার কাফফারা হলঃ-
(এক) দশজন মিসকীনকে মধ্যম ধরনের খাদ্যদান। পাকিয়ে এক বেলা খাওয়ানো অথবা প্রত্যেককে সওয়া এক কিলো ক'রে চাল দান করা। অথবা দশজন দরিদ্রকে বস্ত্র (লুঙ্গি-গেঞ্জি) দান করা। অথবা একটি ক্রীতদাস স্বাধীন করা।
(দুই) এ সবে অসমর্থ হলে তিনটি রোযা পালন করা।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا عَقَدتُمُ الْأَيْمَانَ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ ذَلِكَ كَفَّارَةُ أَيْمَانِكُمْ إِذَا حَلَفْتُمْ وَاحْفَظُوا أَيْمَانَكُمْ كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ) (۸۹) سورة المائدة
"আল্লাহ তোমাদেরকে দায়ী করবেন না তোমাদের নিরর্থক শপথের জন্য, কিন্তু যে সব শপথ তোমরা ইচ্ছাকৃতভাবে কর, সেই সকলের জন্য তিনি তোমাদেরকে দায়ী করবেন। অতঃপর এর কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) হল, দশজন দরিদ্রকে মধ্যম ধরনের খাদ্য দান করা; যা তোমরা তোমাদের পরিজনদেরকে খেতে দাও, অথবা তাদেরকে বস্ত্র দান করা, কিংবা একটি দাস মুক্ত করা। কিন্তু যার (এ সবে) সামর্থ্য নেই, তার জন্য তিন দিন রোযা পালন করা। তোমরা শপথ করলে এটিই হল তোমাদের শপথের প্রায়শ্চিত্ত। তোমরা তোমাদের শপথ রক্ষা কর। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করেন, যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।" (মায়িদাহঃ ৮৯)
মিথ্যা কসম খাওয়া ও তার কাফফারা
অতীতের কোন কর্ম করা বা না করার উপর মিথ্যা কসম খাওয়া বিশাল গোনাহ। তবে তাতে কোন কাফফারা নেই।
(( الكَبَائِرُ : الإِشْرَاكُ بِاللهِ ، وَعُقُوقُ الوَالِدَيْنِ ، وَقَتْلُ النَّفْسِ ، وَاليَمِينُ الغَمُوسُ )) .
"কাবীরাহ গোনাহ হচ্ছে আল্লাহর সাথে শির্ক করা। মাতা-পিতার অবাধ্যাচরণ করা, (অন্যায় ভাবে) কোন প্রাণ হত্যা করা, মিথ্যা কসম খাওয়া।" (বুখারী ৬৬৭৫, ৬৮৭০নং)
এর অন্য বর্ণনায় আছে, জনৈক মরুবাসী নবী-এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করল, 'মহাপাপ কী কী? হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "আল্লাহর সাথে শির্ক (অংশীদার স্থাপন) করা।" সে বলল, 'তারপর কী?' তিনি বললেন, "মিথ্যা কসম।" (সে বলল,) আমি বললাম, 'মিথ্যা কসম কী?' তিনি বললেন, "যার দ্বারা মুসলিমের মাল আত্মসাৎ করা হয়।" অর্থাৎ এমন কসম দ্বারা, যাতে সে মিথ্যাবাদী থাকে। (৬৯২০নং)
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلاً أُوْلَئِكَ لَا خَلَاقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ وَلَا يَنظُرُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ} (۷۷)
"যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথকে স্বল্প মূল্যে বিক্রয় করে, পরকালে তাদের কোন অংশ নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, আর তাদের দিকে চেয়ে দেখবেন না এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।" (আলে ইমরানঃ ৭৭)
গায়রুল্লাহর নামে কসমের কাফফারা সম্বন্ধে মহানবী বলেছেন,
((مَنْ حَلَفَ فَقَالَ فِي حَلِفِهِ : وَاللَّاتِ وَالْعُزَّى، فَلْيَقُلْ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ.
"যে ব্যক্তি হলফ করে তাতে বলে 'লাত ও উয্যার (কোন গায়রুল্লাহর) কসম' সে যেন 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে।" (বুখারী ৪৮৬০, মুসলিম ৪৩৪৯নং)
নযর পালন না করা ও তার কাফ্ফারা
সাধারণতঃ নযর মানা মকরূহ। এতে লাভ কিছু হয় না। বিশেষ ক'রে সেই নযর, যাতে মহান আল্লাহর সাথে শর্তারোপ করা হয়, 'আল্লাহ যদি তুমি এই কর, তাহলে আমি এই করব।' আর ধারণা করা হয় যে, এই বিনিময় শর্তে আল্লাহ অবশ্যই তাকে অভীষ্ট জিনিস দান করবেন! মহানবী বিশেষ ক'রে এই বাজি ধরার মানত মানতে নিষেধ ক'রে বলেছেন,
النَّدْرُ لَا يُقَدِّمُ شَيْئًا وَلَا يُؤَخِّرُهُ وَإِنَّمَا يُسْتَخْرَجُ بِهِ مِنَ الْبَخِيلِ ..
"নযর (তকদীর থেকে) কোন কিছুকে আগা-পিছা করতে পারে না। আসলে এর মাধ্যমে কেবল কূপণের মাল বের করা হয়।" (মুসলিম ৪৩২৫-৪৩৩১, আবু দাউদ ৩২৮৯, তিরমিযী ১৫৩৮, নাসাঈ ৩৮০১-৩৮০২, ইবনে মাজাহ ২১২নং)
অবশ্য নযর মানলে তা পালন করা ওয়াজেব। তা এক প্রকার ইবাদত, যা গায়রুল্লাহর নামে মানা শির্ক। মহানবী বলেছেন,
((مَنْ نَدْرَ أَنْ يُطِيعَ اللَّهَ فَلْيُطِعْهُ وَمَنْ نَدْرَ أَنْ يَعْصِيَهُ فَلَا يَعْصِهِ)).
"যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করার নযর মানে, সে যেন (তা পুরা করে) তার আনুগত্য করে এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতা করার নযর মানে, সে যেন (তা পুরণ না করে এবং) তাঁর অবাধ্যতা না করে।" (বুখারী ৬৬৯৬, ৬৭০০, সহীহুল জামে' ৬৪৪১)
কোন অবাধ্যতা বা পাপ কাজ করার মানত মানলে, তা পালন করা যাবে না, পরন্তু তাতে কাফফারা লাগবে। মহানবী বলেছেন,
لا نَدْرَ فِي مَعْصِيَةٍ وَكَفَّارَتُهُ كَفَّارَةٌ يَمِين ..
"(আল্লাহর) অবাধ্যতায় কোন নযর নেই। আর তার কাফ্ফারা হল কসমের কাফফারা।" (আবু দাউদ ৩২৯২, ৩২৯৪, তিরমিযী ১৫২৪, নাসাঈ ৩৮৩৪, ইবনে মাজাহ ২১২৫নং)
কোন এমন আনুগত্য করার নযর মানলে, যা করার ক্ষমতা সে রাখে না, তাতে কাফফারা লাগবে। কোন এমন আনুগত্য করার নযর মানলে, যা করার ক্ষমতা ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে অক্ষম হয়ে পড়ে, তাতে কাফফারা লাগবে।
অনির্দিষ্ট কোন নযর মানলে, যেমন এই বলা যে, 'আল্লাহর নামে নযর মানলাম', তা কাফফারা দিয়ে পালন করতে হবে।
আর কাফফারা হল কসমের কাফফারা। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
كَفَّارَةُ النَّدْرِ كَفَّارَةُ الْيَمِينِ ..
"নযরের কাফফারা হল কসমের কাফ্ফারা।" (মুসলিম ৪৩৪২, নাসাঈ ৩৮৩২নং)
যিহার করা ও তার কাফফারা
স্ত্রীর পিঠকে কোন মাহরাম মহিলা (মা-বোন ইত্যাদি)র পিঠের সাথে তুলনা করাকে 'যিহার' বলা হয়। অর্থাৎ, তার পিঠ যেমন আমার পক্ষে হারাম, তেমনি তোমার পিঠও আমার পক্ষে হারাম। এমন কথা বলে স্ত্রীকে নিজের জন্য হারাম করা অবশ্যই মহা অপরাধ। এমন অপরাধে স্ত্রী মা হয়ে যায় না এবং তালাকও হয় না, তবে কাফফারা লাগে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
الَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِنكُم مِّن نِّسَائِهِم مَّا هُنَّ أُمَّهَاتِهِمْ إِنْ أُمَّهَاتُهُمْ إِلَّا اللَّائِي وَلَدْتَهُمْ وَإِنَّهُمْ لَيَقُولُونَ مُنكَرًا مِّنَ الْقَوْلِ وَزُورًا وَإِنَّ اللَّهَ لَعَفُوٌّ غَفُورٌ} (۲) سورة المجادلة
"তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে 'যিহার' করে, (তারা জেনে রাখুক যে,) তাদের স্ত্রীরা তাদের মাতা নয়; যারা তাদেরকে জন্মদান করে, শুধু তারাই তাদের মাতা, তারা তো অসঙ্গত ও ভিত্তিহীন কথাই বলে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পাপমোচনকারী, পরম ক্ষমাশীল।" (মুজাদালাহঃ ২)
যিহারের কাফফারা
এমন গর্হিত ও অবাস্তব কথা বলার জন্য শাস্তিভোগ ও কাফফারা আদায় করতে হয়। যিহারের কাফফারার বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,
{وَالَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِن نَّسَائِهِمْ ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا قَالُوا فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مِّن قَبْلِ أَن يَتَمَاسًا ذَلِكُمْ تُوعَظُونَ بِهِ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ (۳) فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ مِن قَبْل أَن يَتَمَاسًا فَمَن لَّمْ يَسْتَطِعْ فَإِطْعَامُ سِتِّينَ مِسْكِينًا ذَلِكَ لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَلِلْكَافِرِينَ عَذَابٌ أَلِيمٌ} (٤) سورة المجادلة
"যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে 'যিহার' করে এবং পরে তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে, তাহলে (এর প্রায়শ্চিত্ত) একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাসের মুক্তিদান। এর দ্বারা তোমাদেরকে সদুপদেশ দেওয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন। কিন্তু যার এ সামর্থ্য থাকবে না, (তার প্রায়শ্চিত্ত) একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একাদিক্রমে দুই মাস রোযা পালন। যে তাতেও অসমর্থ হবে, সে ষাটজন অভাবগ্রস্তকে খাওয়াবে। এটা এই জন্য যে, তোমরা যেন আল্লাহ ও তাঁর রসূলে বিশ্বাস স্থাপন কর। এ হল আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি-বিধান। আর অবিশ্বাসীদের জন্য বেদনাদায়ক শাস্তি রয়েছে।" (মুজাদালাহঃ ৩-৪)
লক্ষণীয় যে, স্ত্রী হালাল করতে হলে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে কাফফারা আদায় করতে হবে।
(এক) একটি দাসমুক্ত করতে হবে।
(দুই) দাসমুক্তির সামর্থ্য বা ব্যবস্থা না থাকলে একটানা ২ মাস (৬০ দিন) রোযা রাখতে হবে। শরয়ী ওযর ছাড়া গ্যাপ দেওয়া যাবে না।
(তিন) তাতে অসমর্থ হলে ৬০ জন মিসকীন খাওয়াতে হবে। মোটামুটি ৭৫ কিলো চাল মিসকীনদেরকে দান করলেও চলবে।
পক্ষান্তরে যদি কোন স্ত্রী তার স্বামীকে বলে, 'তুমি আমার উপর আমার বাপের পিঠের মতো', তবে যিহার হবে না। কারণ যিহার একমাত্র স্বামীর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। এমতাবস্থায় সেই নারীর উপর কসমের কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে।
ঈলা ও তার কাফ্ফারা
সহবাসে সমর্থ স্বামীর চিরদিনকার জন্য বা চার মাসের অধিক দিনের জন্য স্ত্রী-সহবাস না করার কসম খাওয়াকে 'ঈলা' বলা হয়।
ঈলা করা হারাম। কারণ এতে স্ত্রীকে তার সহবাসের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, অথচ তার উক্ত অধিকার আদায় করা স্বামীর পক্ষে ওয়াজিব।
তবে হ্যাঁ, যদি কেউ ঈলা করতে চায়, তবে তা শর্ত-সাপেক্ষে করতে পারে এবং তার কাফফারা আদায় করতে হবে। ঈলা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,
{لِلَّذِينَ يُؤْلُونَ مِنْ نِسَائِهِمْ تَرَبُّصُ أَرْبَعَةِ أَشْهُرٍ فَإِنْ فَاءُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ (٢٢٦) وَإِنْ عَزَمُوا الطَّلَاقَ فَإِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ} (۲۲۷)
"যারা নিজেদের স্ত্রীর কাছে না যাওয়ার শপথ (কসম) করে, তারা চার মাস অপেক্ষা করবে। অতঃপর তারা যদি (মিলনে) ফিরে আসে, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। আর যদি তারা তালাকই দিতে (বিবাহ বিচ্ছেদ করতে) সংকল্পবদ্ধ হয়, তবে আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" (বাক্বারাহঃ ২২৬-২২৭)
আয়াতদ্বয়ের অর্থ হল যারা এরূপ কসম করবে তাদের জন্য চার মাসের অবকাশ থাকবে। অতএব স্বামী যদি চার মাসের মধ্যে কসম ভেঙ্গে স্ত্রীর কাছে আসে এবং কসমের কাফফারা আদায় ক'রে দেয়, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা ক'রে দেবেন। পক্ষান্তরে যদি চার মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও কসম না ভাঙ্গে, তাহলে তাকে তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করার ও কসমের কাফফারা আদায় করার আদেশ দেওয়া হবে। এতেও সম্মত না হলে তাকে স্ত্রীর দাবী অনুযায়ী তালাক দিতে বাধ্য করা হবে। সে নিজে তালাক না দিলে কাযী তালাক দিয়ে তাদেরকে আলাদা ক'রে দেবে।
আর যদি চার মাসের কম সময়ের শর্ত রেখে ঈলা করে, তাহলে তার নির্দেশ হচ্ছে এই যে, যদি কসম ভঙ্গ করে, তাহলে কাফফারা ওয়াজিব হবে। পক্ষান্তরে কসম পূর্ণ করলে স্ত্রীকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। উক্ত সময়ের মধ্যে সহবাসের দাবী করতে পারবে না এবং তাকে তালাকের আদেশ দেওয়া যাবে না। যেমন বুখারী-মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে "রাসূলুল্লাহে তাঁর স্ত্রীগণ থেকে এক মাসের ঈলা করেছিলেন, অতঃপর তিনি উনত্রিশ দিন পর অবতরণ করেন এবং বলেন, "মাস কখন কখন উনত্রিশ দিনেরও হয়।" (তফসীর ইবনে কাসীর)
ঈলার শর্তাবলীঃ
১। ঈলাকারীকে স্ত্রী সঙ্গমের ক্ষমতাবান হতে হবে, যদি সে স্ত্রী সঙ্গম করতে অক্ষম হয়, তবে ঈলা হবে না।
২। ঈলাকারীকে আল্লাহ শব্দ দ্বারা বা তাঁর গুণবাচক নাম দ্বারা কসম করতে হবে, তালাক বা নযর ইত্যাদির দ্বারা নয়।
৩। স্ত্রীর যোনিপথে সঙ্গম না করার কসম হতে হবে।
৪। সঙ্গম থেকে চার মাসের অধিক বিরত থাকার কসম হতে হবে।
৫। এমন স্ত্রী হতে হবে, যার সাথে সঙ্গম করা সম্ভব। (ইশা'রাত ফী আহকামিল কাফফারাত ৮০ পৃঃ)
ঈলার কাফফারা ৪-
ঈলা হল কসমের অন্তর্ভুক্ত, অতএব কসমের কাফফারাই হল তার কাফফারা। আর তা হল দশজন মিসকীনকে খাবার দেবে অথবা পোষাক দান করবে অথবা একজন দাস বা দাসী মুক্ত করবে, উক্ত সকল কাফফারা আদায়ে অসমর্থ হলে তিন দিন রোযা রাখবে।
মাসিকাবস্থায় স্ত্রী-সহবাস ও তার কাফফারা
মাসিকাবস্থায় সহবাস করা সর্বসম্মতভাবে হারাম। মহান আল্লাহ বলেন,
{وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذَى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاء فِي الْمَحِيضِ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّى يَطْهُرْنَ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللهُ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ} البقرة ٢٢٢
"লোকে তোমাকে রজঃস্রাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তুমি বল, তা অশুচি। সুতরাং তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রীসঙ্গ বর্জন কর এবং যতদিন না তারা পবিত্র হয়, (সহবাসের জন্য) তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হয়, তখন তাদের নিকট ঠিক সেইভাবে গমন কর, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাপ্রার্থিগণকে এবং যারা পবিত্র থাকে, তাদেরকে পছন্দ করেন।" (বাক্বারাহঃ ২২২)
মাসিকাবস্থায় সঙ্গম করা এক প্রকার কুফরী। মহানবী বলেছেন,
مَنْ أَتَى حَائِضًا أَوْ امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا أَوْ كَاهِنَا فَصَدَّقَهُ فَقَدْ بَرِئْ مِمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ عَلَى مُحَمَّدٍ عَلَيْهِ الصَّلَاةِ وَالسَّلَامُ».
"যে ব্যক্তি কোন ঋতুমতী স্ত্রী (মাসিক অবস্থায়) সঙ্গম করে অথবা কোন স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাস করে, অথবা কোন গণকের নিকট উপস্থিত হয়ে (সে যা বলে তা) বিশ্বাস করে, সে ব্যক্তি মুহাম্মাদ-এর অবতীর্ণ কুরআনের সাথে কুফরী করে।" (অর্থাৎ কুরআনকেই সে অবিশ্বাস ও অমান্য করে। কারণ, কুরআনে এ সব কুকর্মকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।) (আহমাদ ৯২৯০, আবু দাউদ ৩৯০৬, তিরমিযী ১৩৫, ইবনে মাজাহ ৬৩৯, বাইহাক্বী ১৪৫০৪নং)
কেউ মাসিকাবস্থায় সহবাস করে ফেললে সে গোনাহগার হবে এবং তার জন্য কাফফারা আদায় করতে হবে। আর তা হল কিছু ওলামার মতে মাসিক আসার প্রথম দিকে হলে এক দীনার (সওয়া চার গ্রাম পরিমাণ সোনা অথবা তার মূল্য), আর শেষের দিকে হলে এর অর্ধেক পরিমাণ সাদকা করা। (আবু দাউদ ২৬৫নং)
ইবনে আব্বাস নবী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যে ব্যক্তি মাসিকাবস্থায় স্ত্রী সহবাস করে, তার সম্পকে নবী বলেছেন, "সে এক দীনার বা অর্ধ দীনার সাদকা করবে।" (আবু দাউদ ২৬৪, নাসাঈ ২৮৯, ইবনে মাজাহ ৬৪০, হাকেম ৬১২নং)
সুতরাং এক দীনার বা অর্ধ দীনার সাদকা করার ব্যাপারে এখতিয়ার থাকবে। যে কোন একটা আদায় ক'রে দিলে কাফফারা আদায় হয়ে যাবে। (আল-মুগনী ১/৪১৮)
আর যদি কেউ হায়েয বন্ধ হওয়ার পর গোসল করার পূর্বেই সহবাস করে ফেলে, তবে সহীহ মত অনুযায়ী তার জন্য কাফফারা আদায় করতে হবে না। কেননা যে অশুচিতার কারণে সহবাস নিষিদ্ধ ছিল, তা ঋতু বন্ধ হওয়ার কারণে দূর হয়ে গেছে। আর কাফফারা তখনই দিতে হবে, যখন মাসিকাবস্থায় সহবাস হবে, অন্য সময় নয়। (আল-মুগনী ১/৪১৮)
মাসিকাবস্থায় সহবাস হওয়াতে যদি স্ত্রী সম্মত থাকে, তবে স্ত্রীর উপরও কাফফারা ওয়াজিব হবে। আর যদি স্ত্রীর ইচ্ছার বিপরীত জোরপূর্বক সহবাস হয়, তবে তার উপর কাফফারা ওয়াজিব নয়। (আল-মুগনী ১/৪১৯)
জ্ঞাতব্য যে, মাসিক ও প্রসবোত্তর স্রাবে স্ত্রী-সহবাসের বিধান একই। (আল-মুগনী ১/৪১৯)
রমযানের রোযা অবস্থায় স্ত্রীসঙ্গম ও তার কাফ্ফারা
সঙ্গম বলতে স্ত্রী-যোনীতে স্বামীর (সুপারির মত) লিঙ্গাগ্র প্রবেশ হলেই রোযা নষ্ট হয়ে যায়; তাতে বীর্যপাত হোক, আর নাই হোক। তদনুরূপ অবৈধভাবে পায়খানা-দ্বারে লিঙ্গাগ্র প্রবেশ করালেও রোযা বাতিল গণ্য হয়।
জ্ঞাতব্য যে, স্ত্রীর পায়খানাদ্বারে সঙ্গম করা মহাপাপ এবং এক প্রকার কুফরী।
বলা বাহুল্য রোযা অবস্থায় যখনই রোযাদার স্ত্রী-মিলন করবে, তখনই তার রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। সুতরাং এ মিলন যদি রমযানের দিনে সংঘটিত হয় এবং রোযা রোযাদারের জন্য ফরয হয়, (অর্থাৎ রোযা কাযা করা তার জন্য বৈধ না হয়) তাহলে ঐ মিলনের ফলে যথাক্রমে ৫টি জিনিস সংঘটিত হবে:-
(ক) কাবীরা গোনাহ; আর তার ফলে তাকে তওবা করতে হবে।
(খ) তার রোযা বাতিল হয়ে যাবে।
(গ) তাকে ঐ দিনের অবশিষ্ট অংশ পানাহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে।
(ঘ) ঐ দিনের রোযা (রমযান পর) কাযা করতে হবে।
(ঙ) বৃহৎ কাফফারা আদায় করতে হবে। আর তা হল, একটি ক্রীতদাসকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতে হবে। তাতে সক্ষম না হলে, লাগাতার (একটানা) দুই মাস রোযা রাখতে হবে। আর তাতে সক্ষম না হলে, ৬০ জন মিসকীনকে খাদ্যদান করতে হবে।
এ ব্যাপারে মূল ভিত্তি হল, মহান আল্লাহর এই বাণী, أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَى نِسَائِكُمْ ...) الآية অর্থাৎ, রোযার রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রী-সম্ভোগ হালাল করা হয়েছে। (বাক্বারাহঃ ১৮৭)
আর আবু হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা নবী-এর কাছে বসে ছিলাম। এমন সময় তাঁর নিকট এক ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমি ধ্বংসগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।' তিনি বললেন, "কোন জিনিস তোমাকে ধ্বংসগ্রস্ত করে ফেলল?" লোকটি বলল, 'আমি রোযা অবস্থায় আমার স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে ফেলেছি।' এ কথা শুনে আল্লাহর রসূল তাকে বললেন, "তুমি কি একটি ক্রীতদাস মুক্ত করতে পারবে?" লোকটি বলল, 'জী না।' তিনি বললেন, "তাহলে কি তুমি একটানা দুই মাস রোযা রাখতে পারবে?” সে বলল, 'জী না।' তিনি বললেন, "তাহলে কি তুমি ৬০ জন মিসকীনকে খাদ্যদান করতে পারবে?” লোকটি বলল, 'জী না।' --- (বুখারী ১৯৩৭, মুসলিম ১১১১নং)
যে মহিলার উপর রোযা ফরয, সেই মহিলা সম্মত হয়ে রমযানের দিনে স্বামী-সঙ্গম করলে তারও উপর কাফফারা ওয়াজেব। অবশ্য তার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও স্বামী যদি তার সাথে জোরপূর্বক সহবাস করতে চায়, তাহলে তার জন্য যথাসাধ্য তা প্রতিহত করা জরুরী। রুখতে না পারলে তার উপর কাফফারা ওয়াজেব নয়।
এই জন্যই যে মহিলা জানে যে, তার স্বামীর কামশক্তি বেশী; সে তার কাছে প্রেম-হৃদয়ে কাছাকাছি হলে নিজের যৌন-পিপাসা দমন রাখতে পারে না, সেই মহিলার জন্য উচিত, রমযানের দিনে তার কাছ থেকে দূরে-দূরে থাকা এবং প্রসাধন ও সাজ-সজ্জা না করা। তদনুরূপ স্বামীর জন্যও উচিত, পদস্থলনের জায়গা থেকে দূরে থাকা এবং রোযা থাকা অবস্থায় স্ত্রীর কাছ না ঘেঁষা; যদি আশঙ্কা হয় যে, উগ্র যৌন-কামনায় সে তার মনকে কাবু রাখতে পারবে না। কারণ, এ কথা বিদিত যে, প্রত্যেক নিষিদ্ধ জিনিসই ঈপ্সিত। (দ্রঃ আশ্-শারহুল মুমতে' ৬/৪১৫, সাবউনা সুয়াল ৭০নং, ফাইযুর রাহীমির রাহমান, ফী আহকামি অমাওয়াইযি রামাযান ৬১পৃঃ)
পক্ষান্তরে যদি রমযানের রোযা কাযা রাখতে গিয়ে স্ত্রী-সঙ্গম ক'রে ফেলে, তাহলে তার ফলে কাফফারা নেই। আর তার জন্য ঐ দিনের বাকী অংশ পানাহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকাও জরুরী নয়। অবশ্য তার গোনাহ হবে। কারণ, সে ইচ্ছাকৃত একটি ওয়াজেব রোযা নষ্ট করে তাই। (আশ-শারহুল মুমতে' ৬/৪১৩, আহকামুন মিনাস সিয়াম, ক্যাসেট, ইবনে উষাইমীন)
মুসাফির যদি সফরে থাকা অবস্থায় রোযা রেখে স্ত্রী-সহবাস ক'রে ফেলে, তাহলে তার জন্য কেবল কাযা ওয়াজেব, কাফ্ফারা ওয়াজেব নয়। যেমন, ঐ দিনের বাকী অংশ পানাহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকাও তার জন্য জরুরী নয়। কেননা, সে মুসাফির। আর মুসাফিরের জন্য সফরে রোযা ভাঙ্গা (এবং পরে কাযা করা) বৈধ।
অনুরূপভাবে এমন রোগী, যার রোগের জন্য রোযা ভাঙ্গা বৈধ ছিল; কিন্তু কষ্ট ক'রে সে রোযা রেখেছিল। সে যদি তার স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে, যে সেই দিনেই মাসিক থেকে পবিত্রা হয়েছে, তাহলে তারও গোনাহ হবে না; অবশ্য কাযা ওয়াজেব। (আশ্-শারহুল মুমতে' ৬/৪১৩)
যে ব্যক্তি যে বৈধ ওযরের ফলে রোযা বন্ধ রেখেছিল, দিনের মধ্যে তার সেই ওযর দূর হয়ে যাওয়ার পর যদি স্ত্রী-সহবাস করে, তাহলে তার জন্য কাফফারা ওয়াজেব নয়। যেমন, কোন মুসাফির যদি দিন থাকতে রোযা না রেখে ঘরে ফিরে দেখে যে, তার স্ত্রী সেই দিনেই (ফজরের পর) মাসিক থেকে পবিত্রা হয়েছে, তাহলে সঠিক মতে তাদের জন্য সঙ্গম বৈধ। এতে স্বামী-স্ত্রীর কোন প্রকার পাপ হবে না। যেহেতু ঐ দিন শরীয়তের অনুমতিক্রমে তাদের জন্য মান্য নয় এবং ঐ দিনে রোযা না রাখাও তাদের পক্ষে অনুমোদিত। (ঐ ৬/৪২১)
যদি কোন ব্যক্তি সুস্থ অবস্থায় রোযা রেখে স্ত্রী-সহবাস করার পর দিন থাকতেই এমন অসুস্থ হয়ে পড়ে, যাতে তার জন্য রোযা ভাঙ্গা বৈধ, তাহলেও তার জন্য কাফফারা ওয়াজেব; যদিও তার জন্য দিনের শেষভাগে (অসুস্থ হওয়ার পর) রোযা ভাঙ্গা বৈধ। কারণ, সহবাসের সময় সে তাতে অনুমতিপ্রাপ্ত ছিল না।
তদনুরূপ যে ব্যক্তি দিনের প্রথমাংশে সহবাস করার পর সফর করে তাহলে তার জন্যও কাফফারা ওয়াজেব; যদিও সফর করার পরে ঐ দিনেই তার জন্য রোযা ভাঙ্গা বৈধ। কেননা, রোযা ভাঙ্গা বৈধ হওয়ার পূর্বেই সে (রমযান) মাসের মর্যাদা ক্ষুন্ন করেছে। (ঐ ৬/৪২২)
যদি কোন ব্যক্তি (কাফফারা থেকে রেহাই পাওয়ার বাহানায়) প্রথমে কিছু খেয়ে অথবা পান করে তারপর স্ত্রী-সঙ্গম করে, তাহলে তার পাপ অধিক। যেহেতু সে রমযানের মর্যাদাকে পানাহার ও সঙ্গমের মাধ্যমে ডবল ক'রে নষ্ট করেছে। বৃহৎ কাফফারা তার হক্কে অধিক কার্যকর। আর তার ঐ বাহানা ও ছলনা নিজের ঘাড়ে বোঝা স্বরূপ। তার জন্য খাঁটি তওবা ওয়াজেব। (সাবউনা সুয়াল ৪৭নং)
জ্ঞাতব্য যে, যার জন্য রোযা রাখা ফরয, তার রমযান মাসে দিনে রোযা অবস্থায় সঙ্গম ছাড়া অন্য কোন কারণে বা অন্য কোন রোযায় কাফফারা ওয়াজেব হয় না, বলা বাহুল্য, নফল রোযা রেখে, কসমের কাফফারার রোযা রেখে, কোন অসুবিধার ফলে ইহরাম অবস্থায় কোন নিষিদ্ধ কাজ ক'রে ফেললে তার জরিমানার রোযা রেখে, তামাত্তু হজ্জ করতে গিয়ে কুরবানী দিতে না পেরে তার বিনিময়ে রোযা রেখে অথবা নযরের রোযা রেখে স্ত্রী-সহবাস ক'রে ফেললে কাফফারা ওয়াজেব নয়। যেমন সঙ্গম না করে (স্ত্রী-যোনীর বাইরে) বীর্যপাত করে ফেললেও কাফফারা ওয়াজেব নয়। (আশ্-শারহুল মুমতে' ৬/৪২২-৪২৩) অবশ্য কাযা তো ওয়াজেবই।
জ্ঞাতব্য যে, ব্যভিচার করে ফেললেও সহবাসের মতই কাফফারা ওয়াজেব। (আল-ফাওয়াইদুল জালিয়্যাহ, ইবনে বায ১১৯পৃঃ) তাছাড়া ব্যভিচারের সাজা ও তওবা তো আছেই। (আমার 'রমযানের ফাযায়েল ও মাসায়েল' বই থেকে)
ইহরাম অবস্থায় শিকার করার কাফফারা
ইহরাম অবস্থায় বা হারাম সীমানার শিকার করা ও তার কাফফারা
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَأَنتُمْ حُرُمٌ وَمَن قَتَلَهُ مِنكُم مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاء مِّثْلُ مَا قَتَلَ مِنَ النَّعَمِ يَحْكُمُ بِهِ ذَوَا عَدْلٍ مِّنكُمْ هَدْيًا بَالِغَ الْكَعْبَةِ أَوْ كَفَّارَةٌ طَعَامُ مَسَاكِينَ أَو عَدْلُ ذلك صِيَامًا لِّيَذُوقَ وَبَالَ أَمْرِهِ عَفَا اللَّهُ عَمَّا سَلَفَ وَمَنْ عَادَ فَيَنتَقِمُ اللَّهُ مِنْهُ وَاللَّهُ عَزِيزٌ ذُو انتقام} (৯৫) সূরা আল-মায়েদা
"হে বিশ্বাসিগণ! ইহরামে থাকা অবস্থায় তোমরা শিকার জন্তু বধ করো না, তোমাদের মধ্যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে তা বধ করলে, যা বধ করল তার বিনিময় হচ্ছে অনুরূপ গৃহপালিত জন্তু, যার মীমাংসা করবে তোমাদের মধ্যে দু'জন ন্যায়বান লোক কা'বাতে প্রেরিতব্য কুরবানীরূপে। অথবা ওর বিনিময় হবে দরিদ্রকে অন্ন দান করা কিংবা সমপরিমাণ রোযা পালন করা, যাতে সে আপন কৃতকর্মের ফল ভোগ করে। যা গত হয়েছে আল্লাহ তা ক্ষমা করেছেন। কিন্তু কেউ তা পুনরায় করলে, আল্লাহ তার নিকট হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন এবং আল্লাহ পরাক্রমাশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী।" (মায়িদাহঃ ৯৫)
ফিয়াহ দেওয়ার দুটি নিয়মঃ
প্রথমত: যে পশু শিকার করেছে, যদি তার মতো জন্তু পাওয়া যায়, তবে তিন রকমভাবে কাফফারা আদায় করতে পারবে:-
১। যে শিকার হত্যা করেছে, তার অনুরূপ জন্তু যবেহ ক'রে সমস্ত গোশত মক্কার দরিদ্রদের মাঝে বন্টন ক'রে দিতে হবে।
২। তার বা তার মতো জন্তুর দাম ধরে খাবার ক্রয় ক'রে মিসকীনদের মাঝে বন্টন করতে হবে, প্রত্যেক মিসকীনকে অর্ধ সা' (সওয়া এক কিলো) দিতে হবে।
৩। অথবা সেই খাবার যত জন মিসকীনকে দেওয়া যাবে, তার সংখ্যা পরিমাণ রোযা রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত: যে পশু শিকার করেছে যদি তার মতো না পাওয়া যায়, তাহলে উপরে বর্ণিত দুই ও তিন নম্বর নিয়মে কাফফারা আদায় করতে হবে।
অনিচ্ছাকৃত নরহত্যা ও তার কাফফারা
এ ব্যাপারে ইতিপূর্বে খুনের বদলে খুনের বর্ণনায় উল্লিখিত হয়েছে যে, যে হত্যাকান্ডে মারার কোন ইচ্ছাই থাকে না। কিন্তু ভুল ক'রে তার হাতে হত্যাকান্ড ঘটে যায় অথবা কোনভাবে সে হত্যার কারণ প্রতিপন্ন হয়, তাহলে তাতে ক্বিস্বাস নেই; আছে রক্তপণ। আদায় করতে হবে তার (আস্বাবা) ওয়ারেসদেরকে। আছে কাফফারা। এতে পাপ হয় না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَا كَانَ لِمُؤْمِن أَن يَقْتُلَ مُؤْمِنًا إِلَّا خَطَئًا وَمَن قَتَلَ مُؤْمِنًا خَطَئًا فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ وَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ إِلَّا أَن يَصَّدَّقُوا فَإِن كَانَ مِن قَوْمٍ عَدُوٌّ لَّكُمْ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ وَإِن كَانَ مِن قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ مِّيثَانٌ فَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ وَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةً فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ تَوْبَةً مِّنَ اللَّهِ وَكَانَ اللهُ عَلِيمًا حَكِيمًا} (۹۲) النساء
"কোন বিশ্বাসীকে হত্যা করা কোন বিশ্বাসীর জন্য সংগত নয়, তবে ভুলবশতঃ হত্যা ক'রে ফেললে সে কথা স্বতন্ত্র। কেউ কোন বিশ্বাসীকে ভুলবশতঃ হত্যা করলে এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা এবং তার (নিহতের) পরিজনবর্গকে রক্তপণ অর্পণ করা বিধেয়। তবে যদি তারা ক্ষমা ক'রে দেয়, তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু যদি সে তোমাদের শত্রু পক্ষের লোক হয় এবং বিশ্বাসী হয়, তবে এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা বিধেয়। আর যদি সে এমন এক সম্প্রদায়ভুক্ত হয়, যার সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ, তবে তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ অর্পণ এবং এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা বিধেয়। কেউ যদি (উক্ত দাস) না পায় (বা মুক্ত করার সামর্থ্য না রাখে), তাহলে সে একাদিক্রমে দু'মাস রোযা রাখবে। তওবার (সংশোধনের) জন্য এ আল্লাহর বিধান। বস্তুতঃ আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।" (নিসাঃ ৯২)
📄 যে পাপ পূর্ববর্তী জাতির ব্যাধি
কিছু পাপ এই উম্মত করে, প্রকৃত প্রস্তাবে তা পূর্ববর্তী বহু জাতির পাপ, প্রাচীন কালের পাপ। তার মধ্যে একটি পাপ হল হিংসা। হিংসা পৃথিবীর মানুষের ইতিহাসে সর্বপ্রথম করে ইবলীস আদমের প্রতি। তারপর আদম সন্তানের মধ্যে করে কাবীল হাবীলের প্রতি। পরিণামে ইবলীস বিতাড়িত শয়তান ও আদম সন্তানের চিরশত্রু হয়েছে। আর কাবীল হাবীলকে হত্যা ক'রে চিরলাঞ্ছিত ও চিরপাপী হয়েছে। মহানবী বলেছেন,
(( لَيْسَ مِنْ نَفْسٍ تُقْتَلُ ظُلْماً إِلَّا كَانَ عَلَى ابْنِ آدَمَ الأَوَّلِ كِفْلٌ مِنْ دَمِهَا ، لأَنَّهُ كَانَ أَوَّلَ مَنْ سَنَّ القَتَلَ )). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"যে কোন প্রাণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হবে, তার পাপের একটা অংশ আদমের প্রথম সন্তান (কাবীল) এর উপর বর্তাবে। কেননা, সে হত্যার রীতি সর্বপ্রথম চালু করেছে।" (বুখারী ৩৩৩৫, মুসলিম ৪৪৭৩, তিরমিযী ২৬৭৩, নাসাঈ ৩৯৮৫, ইবনে মাজাহ ২৬১৬নং)
হিংসা একটি কদর্য আচরণ। হিংসা থেকেই আসে অহংকার, হিংসা থেকেই আসে বিদ্বেষ ও ঘৃণা। হিংসা থেকেই আসে অসম্মান, অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ। আর তা হল পূর্ববর্তী জাতিসমূহের উল্লেখযোগ্য একটি ব্যাধি। মহানবী নিজ উম্মতের মাঝে সে ব্যাধি লক্ষ্য ক'রে বলেছেন,
((دَبَّ إِلَيْكُمْ دَاءُ الأُمَمِ قَبْلَكُمْ : الْحَسَدُ وَالْبَغْضَاءُ ، هِيَ الْحَالِقَةُ ، لَا أَقُولُ تَحْلِقُ الشَّعَرَ، وَلَكِنْ تَحْلِقُ الدِّينَ ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ ، لَا تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا ، وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا ، أَفَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِمَا يُثْبِتُ ذَاكُمْ لَكُمْ ؟ أَفْشُوا السَّلَامِ بَيْنَكُمْ)).
"তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের রোগ হিংসা ও বিদ্বেষ তোমাদের মাঝে অনুপ্রবেশ করেছে। আর বিদ্বেষ হল মুন্ডনকারী। আমি বলছি না যে, তা কেশ মুন্ডন করে; বরং দ্বীন মুন্ডন (ধ্বংস) করে ফেলে। সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার জান আছে! তোমরা বেহেস্তে ততক্ষণ প্রবেশ করতে পারবে না; যতক্ষণ পর্যন্ত না ঈমান এনেছ। আর (পূর্ণ) ঈমানও ততক্ষণ পর্যন্ত আনতে পারবে না; যতক্ষণ না আপোসে সম্প্রীতি কায়েম করেছ। আমি কি তোমাদেরকে এমন কর্মের কথা বাতলে দেব না; যা তোমাদের ঐ সম্প্রীতিকে দৃঢ় করবে? তোমাদের আপোসে সালাম প্রচার কর।" (তিরমিযী ২৫১০, বাযযার বাইহাকীর শুআবুল ঈমান সহীহ তিরমিযী ২০৩৮নং)
হিংসা এক পর্যায়ে মানুষকে নিষ্ঠুর ক'রে তোলে। অনেক সময় অত্যাচার, অনাচার ও বিদ্রোহের শিকার হয়ে নিজ দ্বীনকে নষ্ট ক'রে ফেলে, যেমন ক্ষুর বা ব্লেড চুলকে চেঁছে পরিষ্কার ক'রে ফেলে। আর যেহেতু সালাম (পরস্পরের শান্তির দোয়া বিনিময়) সম্প্রীতি বয়ে আনে এবং পরস্পরের হৃদয় থেকে বিদ্বেষ দূরীভূত করে, সেহেতু উক্ত হাদীসের শেষে বিশেষভাবে রোগের একটি চিকিৎসা স্বরূপ তা বর্ণিত হয়েছে।
পূর্ববর্তী জাতিসমূহের আরো কিছু ব্যাধির প্রতি ইঙ্গিত ক'রে একদা মহানবী বলেন, "অদূর ভবিষ্যতে আমার উম্মতের মাঝে বিজাতির ব্যাধি পৌঁছবে।" সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহর রসূল! বিজাতির ব্যাধি কী?' উত্তরে তিনি বললেন, الأَشَرُ وَالبَطَرُ، وَالتَّكَاثُرُ وَالتَّنَاجُسُ فِي الدُّنْيَا، وَالتَّبَاغُضُ وَالتَّحَاسُدُ، حَتَّى يَكُونَ البَغْي.
"অকৃতজ্ঞতা, সগর্ব আনন্দ, প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা, পার্থিব প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পরস্পর বিদ্বেষ ও হিংসা ও পরিশেষে সীমা লংঘন বা অত্যাচার।" (হাকেম ৭৩১১, সিঃ সহীহাহ ৬৮০নং)
বিজাতির অর্থশালী হওয়ার প্রধানতঃ তিনটি কারণ, যা কোন মুসলিম করতে পারে না। সূদী কারবার, নারীদেহ বা রূপ-ব্যবসা ও মাদকদ্রব্যের ব্যবসা। এরই মাধ্যমে তাদের আপোসে আর্থিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুঙ্গে থাকে। তার ফলে তারা সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে যায়, কারুনের মতো মনের ভিতরে সগর্ব আনন্দ (দন্ত) ও অহংকার সৃষ্টি হয়। আর্থিক আতিশয্যের ফলে তারা নানা আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে ওঠে। পার্থিব প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তাদেরকে উদাস ও মত্ত-মাতাল ক'রে তোলে। অর্থোপার্জনের পথে এমন নেশাখোর মাতালের মতো অগ্রসর হয় যে, সামনের সকল বাধাকে যেভাবেই হোক উল্লংঘন করে। দ্বীনের বাধা তো মানেই না, দুনিয়ার আইনের বাধাকেও তারা সহজে অতিক্রম করতে পারে।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অনুকরণ করেছে মুসলিমরাও। বিজাতির সেই সংক্রামক ব্যাধি সংক্রমণ করেছে মুসলিম সমাজে। যার ফলে রাঘববোয়াল তো বটেই, চুনো-পুঁটি দুনিয়াদাররাও উক্তরূপ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে নয়। তাদের অনুকরণে এরাও অর্থের পিছনে অন্ধের মতো ছুটে চলেছে। অর্থের লোভে তাদের অনুভূতি এতটাই ভোঁতা হয়ে গেছে যে, তারা হালাল-হারামের কোন তমীয করে না, মান-সম্মানের খেয়াল রাখে না, লোকনিন্দার কোন পরোয়া করে না। সমাজের নজরে সে তুচ্ছ হচ্ছে, সে কথার কোন তোয়াক্কা করে না। কারণ টাকার প্রলেপ দিয়ে তা ঢেকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি লাভ ক'রে থাকে ধন-উপাস্যের কাছে।
তখন লোকে তাকে 'দুনিয়াদার', 'ধনদাস' বা 'লোভী' যাই বলুক না কেন, তাতে তার কোন লজ্জা হয় না। বরং মানসিকতার বিকৃতির ফলে 'গাধা' ডাককেও তার কানে 'দাদা' মনে হয়। কুনামে ডাকলেও তার রাগ হয় না, বরং তা শুনে 'হা-হা' ক'রে হাসে!
একদা এক কুকুর এসে এক সিংহকে বলল, 'হে পশুরাজ! আমি আমার নাম পরিবর্তন করতে চাই। দয়া ক'রে আমার নামটা বদলে দিন। কারণ আমার নামটা বড় বিশ্রী ও অসভ্য।'
সিংহ বলল, 'তুমি তো বিশ্বাসঘাতক ও নির্লজ্জ। তোমার আচরণ বড় হীন। অতএব এ নামই তোমার জন্য যথার্থ ও সার্থক।'
কুকুর বলল, 'তাহলে আমাকে পরীক্ষা ক'রে দেখুন, আমি সুন্দর নামের কাজ করতে পারি কি না।'
সিংহ কুকুরকে এক টুকরা গোশ্ত দিয়ে বলল, 'ঠিক আছে। এটা আমার জন্য কাল পর্যন্ত তোমার কাছে যত্ন ক'রে আমানত রেখে দাও। কাল আমি তোমার কাছ থেকে এটা নেব, আর তোমার নাম পাল্টে দিয়ে এক সুন্দর মতো নাম রেখে আসব।'
গোশ্ত টুকরাটি নিয়ে কুকুর বাসায় ফিরল। ক্ষিদে লাগলে সে গোশ্তের দিকে তাকিয়ে জিভের লাল ফেলতে শুরু করল। খাওয়ার ইচ্ছে হলেও নাম পাল্টাবার কথা মনে পড়লে ধৈর্যের সাথে সিংহের অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু যখনই তার প্রবৃত্তিতে লালসার উদ্রেক হল, তখনই আর ধৈর্যের বালির বাঁধ আটকে রাখতে পারল না। অবশেষে 'ভালো নাম নিয়েই বা আর কী হবে? 'কুকুর'ও তো ভালো নাম।'---এই বলেই সে গোশ্ত টুকরাটি খেয়েই ফেলল।
পার্থিব প্রতিযোগিতা ও আর্থিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সকল বিপদের মূল, সকল দুষ্কর্মের মাথা, সকল ফিতনার গোড়া। অর্থই হল সব কিছু, আবার অর্থই অনর্থের মূল। অর্থ-লালসা ও পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রাচীন রোগ হল পূর্ববর্তী জাতিসমূহের। কিন্তু স্বজাতির মাঝেও সে রোগের জীবাণু সংক্রমিত। সুতরাং জ্ঞানবান সাবধান।
📄 যে অপরাধের কারণে জাতি পদদলিত
উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে, তবুও যেন শক্তিহীন। উম্মাহর অর্থ আছে, তবুও যেন মিসকীন। যে সাপের বিষ নেই ফণাও নেই, সে সাপকে সবাই ঢিল মারে। যে জাতি মরতে অপছন্দ করে, মরণ তাকে ঘিরে ধরে। যে জাতি মরতে জানে, আসলে বাঁচতে তারাই জানে। পার্থিব ভালোবাসা ও মৃত্যুর ভয় এমন এক অপরাধ, যার ফলে জাতি দুর্বল হয়ে যায়, বিজাতির কাছে ওজনহীন হয়ে যায়। সংখ্যাধিক্য থাকলে কী হবে? সে সংখ্যার মাঝে ঐক্য নেই। নামে এক ও অনেক। হলে কী হবে? অন্তরে ও কর্মক্ষেত্রে ছিন্ন-ভিন্ন। তাই জাতির অবস্থা বড় শোচনীয়। মহানবী ﷺ সত্যই বলেছেন,
«يُوشِكُ الأُمَمُ أَنْ تَدَاعَى عَلَيْكُمْ كَمَا تَدَاعَى الْأَكَلَةُ إِلَى قَصْعَتِهَا».
"অনতিদূরে সকল বিজাতি তোমাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে, যেমন ভোজনকারীরা ভোজপাত্রের উপর একত্রিত হয়। (এবং চারদিক থেকে ভোজন করে থাকে।)" একজন বলল, 'আমরা কি তখন সংখ্যায় কম থাকব, হে আল্লাহর রসূল?' তিনি বললেন,
«بَلْ أَنْتُمْ يَوْمَئِذٍ كَثِيرٌ وَلَكِنَّكُمْ غُثَاءٌ كَغْتَاءِ السَّيْلِ وَلَيَنْزِعَنَّ اللَّهُ مِنْ صُدُورِ عَدُوِّكُمُ الْمَهَابَةَ مِنْكُمْ وَلَيَقْذِفَنَّ اللَّهُ فِي قُلُوبِكُمُ الْوَهَنَ».
"বরং তখন তোমরা সংখ্যায় অনেক থাকবে। কিন্তু তোমরা হবে তরঙ্গতাড়িত আবর্জনার ন্যায় (শক্তিহীন, মূল্যহীন)। আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের বক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি ভীতি তুলে নেবেন এবং তোমাদের হৃদয়ে দুর্বলতা সঞ্চার করবেন।" একজন বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! দুর্বলতা কী?' তিনি বললেন,
«حُبُّ الدُّنْيَا وَكَرَاهِيَةُ الْمَوْتِ».
"দুনিয়াকে ভালোবাসা এবং মরতে না চাওয়া।" (আবু দাউদ ৪২৯৯, মুসনাদে আহমাদ ২২৩৯৭নং)
বড় দুঃখের কথা এই যে, আজ মুসলিম নামধারী স্বজাতিও জাতিকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। আর বিজাতি তো আছেই। জাতির যেন আজ জলে কুমীর, ডাঙায় বাঘ।