📄 যে সকল অপরাধের নির্দিষ্ট দন্ডবিধি আছে
ইসলামে বড় বড় কিছু পাপ আছে, যার নির্ধারিত দন্ডবিধি আছে, যাকে 'হদ্দ' বলা হয়। হদ্দ মানে সীমা, বিরত হওয়া।
শরয়ী পরিভাষায় হদ্দ হল, আল্লাহর অধিকারে নির্ধারিত অনিবার্য শাস্তি। নির্ধারিত দন্ডকে 'হদ্দ' এই জন্য বলা হয় যে, মহান সৃষ্টিকর্তা তা সীমাবদ্ধ ও নির্ধারণ করেছেন। আর যেহেতু তা অপরাধীকে পুনর্বার অপরাধ করা হতে বিরত রাখে।
'আল্লাহর অধিকারে' বলতে বুঝানো হয়েছে, তা মানুষের অধিকারভুক্ত নয়। মানুষের অধিকারভুক্ত শাস্তি হল 'কিস্বাস' (খুনের বদলে খুন)।
হদ্দ ও ক্বিস্বাসের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে, আর তা নিম্নরূপঃ-
এক: হদ্দের শাস্তি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত হয়েছে। যেমন চোরের হাত কাটা হবে। কিন্তু ক্বিস্বাসে এখতিয়ার আছে। খুনীকে হত্যা করা হবে অথবা তার নিকট থেকে রক্তপণ নেওয়া হবে অথবা তাকে ক্ষমা করাও যেতে পারে।
দুইঃ ক্বিস্বাসে সুপারিশ বৈধ। কিন্তু হদ্দে সুপারিশ বৈধ নয়। এ ব্যাপারে উসামার হাদীস প্রসিদ্ধ, "হে উসামাহ! তুমি কি আল্লাহর দন্ডবিধিসমূহের এক দন্ডবিধি (কায়েম না হওয়ার) ব্যাপারে সুপারিশ করছ?!" (বুখারী ৩৪৭৫, ৬৭৮৮, মুসলিম ৪৫০৫-৪৫০৭নং, আসহাবে সুনান)
বলা বাহুল্য, ক্বিস্বাসে ত্যাগ স্বীকার ও ক্ষমা করা বৈধ। কিন্তু হদ্দে ত্যাগ স্বীকার বা অভিযোগ প্রত্যাহার করা বৈধ নয়; যখন তা সরকারের কাছে পৌছে যায়।
হদ্দ বা দন্ডবিধির বৈশিষ্ট্যঃ
১। তা হল আল্লাহর অধিকার, মানুষের নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَقْرَبُوهَا} (۱۸۷) سورة البقرة
"এগুলি আল্লাহর সীমারেখা; সুতরাং এর ধারে-পাশে যেয়ো না।" (বাক্বারাহঃ ১৮৭)
{تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ} (۲۲۹)
"এ সব আল্লাহর সীমারেখা। অতএব তা তোমরা লংঘন করো না। আর যারা আল্লাহর (নির্দিষ্ট) সীমারেখা লংঘন করে, তারাই অত্যাচারী।" (বাক্বারাহঃ ২২৯)
২। উক্ত দন্ডবিধির অপরাধ ও তার দন্ড সুনির্ধারিত।
৩। দন্ড দুইভাবে সাব্যস্ত হবে: স্বীকার করার মাধ্যমে অথবা সাক্ষীর ভিত্তিতে।
৪। দন্ডবিধি প্রয়োগ করবে রাষ্ট্রপ্রধান অথবা তার প্রতিনিধি (প্রশাসন)। সাধারণ মানুষের জন্য তা প্রয়োগ করা বৈধ নয়।
৫। দন্ডবিধিতে সুপারিশ বা ক্ষমা বৈধ নয়। যেমন পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। মহানবী বলেছেন,
مَنْ حَالَتْ شَفَاعَتُهُ دُونَ حَدٍ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ فَقَدْ ضَادَّ اللَّهَ ..
"যে ব্যক্তির সুপারিশ আল্লাহর 'হদ্দ' (দন্ডবিধি) সমূহ হতে কোন 'হদ্দ' কায়েম করাতে বাধা সৃষ্টি করল, সে ব্যক্তি নিশ্চয় আল্লাহ আয্যা অজাল্লার বিরোধিতা করল।" (আবু দাউদ ৩৫৯৯, হাকেম ২/২৭, তাবারানী ১৩২৫৪, বাইহাকী ১১৭৭৩, সহীহুল জামে' ৬১৯৬নং)
৬। অপরাধ প্রমাণে সামান্য সন্দেহ হলে দন্ডবিধি প্রয়োগ করা যাবে না। (অন্য শাস্তি দেওয়া যাবে।)
৭। নির্ধারিত দন্ডবিধিই হল নির্দিষ্ট অপরাধের সর্বশেষ পর্যায়ের সর্বোচ্চ শাস্তি। তার বেশি শাস্তি দেওয়া বৈধ নয়।
দন্ড কি শুধু পাপ বন্ধ করার জন্য, নাকি পাপখন্ডন করার জন্যও?
দন্ডবিধি এসেছে অপরাধীর অপরাধ বন্ধ করার জন্য। যাতে সে পুনর্বার আর ঐ অপরাধে লিপ্ত না হয় এবং তা দেখে অন্যেরাও শিক্ষা পেয়ে অপরাধে পদক্ষেপ না করে।
তবে তা পাপ খন্ডন করে এবং পরকালের শাস্তি মকুব করে কি না, তা নিয়ে দুই রকম বর্ণনা পাওয়া যায়।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّمَا جَزَاء الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقْتَلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ } (৩৩) সূরা মায়েদা
"যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করে (অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়) তাদের শাস্তি এই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা বিপরীত দিক হতে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ হতে নির্বাসিত করা হবে। ইহকালে এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও পরকালে তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে।" (মায়িদাহঃ ৩৩)
পক্ষান্তরে হাদীসের বর্ণনায় আছে, মহানবী বলেছেন,
بَايِعُونِي عَلَى أَنْ لَا تُشْرِكُوا بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا تَسْرِقُوا وَلَا تَزْنُوا ... فَمَنْ وَفَى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَعُوقِبَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَتُهُ وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَسَتَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ إِنْ شَاءَ غَفَرَ لَهُ وَإِنْ شَاءَ عَذَّبَهُ)).
"তোমরা আমার সাথে বায়াত কর এই মর্মে যে, আল্লাহর সঙ্গে কোন কিছুকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে তা পালন করবে, তার পুরস্কার আল্লাহর দায়িত্বে। আর যে ব্যক্তি উক্ত কিছুতে লিপ্ত হবে এবং তাকে শাস্তি দেওয়া হবে, তা তার কাফ্ফারা (প্রায়শ্চিত্ত) হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি উক্ত কিছুতে লিপ্ত হবে এবং আল্লাহ তাকে (দুনিয়াতে) গোপন করবেন, (আখেরাতে) তিনি চাইলে তাকে ক্ষমা ক'রে দেবেন, না চাইলে তাকে শাস্তি দেবেন।" (বুখারী ৩৮৯২, ৬৭৮৪, মুসলিম ৪৫৫৮নং)
অন্য বর্ণনায় আছে,
فَمَنْ وَفَى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ وَمَنْ أَتَى مِنْكُمْ حَدًّا فَأَقِيمَ عَلَيْهِ فَهُوَ كَفَّارَتُهُ ..
"---সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে তা পালন করবে, তার পুরস্কার আল্লাহর দায়িত্বে। আর যে ব্যক্তি কোন দন্ডনীয় অপরাধ করবে এবং তার উপর দন্ড প্রয়োগ করা হবে, তা তার জন্য কাফ্ফারা হয়ে যাবে।" (মুসলিম ৪৫৬০নং)
অবশ্য দন্ড পাওয়ার সাথে সাথে তওবা করলে আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমাশীল, দয়াবান। মহানবী সেই ব্যক্তির ব্যপারে বলেছিলেন, যাকে ব্যভিচারের শাস্তি প্রদান ক'রে হত্যা করা হয়েছিল,
لَقَدْ تَابَ تَوْبَةً لَوْ قُسِمَتْ بَيْنَ أُمَّةٍ لَوَسِعَتْهُمْ ..
"সে এমন তওবা করেছে যে, যদি তা কোন উম্মতের মধ্যে বন্টন ক'রে দেওয়া হতো, তাহলে তা তাদের জন্য যথেষ্ট হতো।" (মুসলিম ৪৫২৭নং)
আর সেই গামেদিয়া মহিলার ব্যাপারে বলেছিলেন, যাকে ব্যভিচারের দন্ড প্রয়োগ ক'রে হত্যা করা হয়েছিল,
لَقَدْ تَابَتْ تَوْبَةً لَوْ قُسِمَتْ بَيْنَ سَبْعِينَ مِنْ أَهْلِ المَدِينَةِ لَوَسِعَتْهُمْ، وَهَلْ وَجَدْتَ أَفْضَلَ مِنْ أَنْ جَادَتْ بنفسها الله - عز وجل - ؟!))
"এই স্ত্রী লোকটি এমন বিশুদ্ধ তওবা করেছে, যদি তা মদীনার ৭০টি লোকের মধ্যে বন্টন করা হতো, তাহলে তা তাদের জন্য যথেষ্ট হতো। এর চেয়ে কি তুমি কোন উত্তম কাজ পেয়েছ যে, সে মহান আল্লাহর জন্য নিজের প্রাণকে কুরবান ক'রে দিল?" (মুসলিম ৪৫২৮-৪৫২৯নং)
মুর্তাদ হওয়ার দন্ডঃ
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَن يَرْتَدِدْ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُوْلَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَأُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} (۲۱۷) سورة البقرة
"তোমাদের মধ্যে যে কেউ নিজ ধর্ম ত্যাগ করে এবং সে সত্যপ্রত্যাখ্যানকারী (কাফের) রূপে মৃত্যুবরণ করে, তাদের ইহকাল ও পরকালের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। তারাই দোযখবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।" (বাক্বারাহঃ ২১৭)
মহানবী বলেছেন,
لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّى رَسُولُ اللَّهِ إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ الثَّيِّبُ الزَّانِي وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ وَالتَّارِكُ لِدِينِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ ..
"তিন ব্যক্তি ছাড়া 'আল্লাহ ব্যতীত কেউ সত্য উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর রসূল' এ কথায় সাক্ষ্যদাতা কোন মুসলিমের খুন (কারো জন্য) বৈধ নয়; বিবাহিত ব্যভিচারী, খুনের বদলে হত্যাযোগ্য খুনী এবং দ্বীন ও জামাআত ত্যাগী।" (বুখারী ৬৮৭৮, মুসলিম ৪৪৬৮-৪৪৭০নং আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ)
উল্লেখ যে, ইসলাম একমাত্র আল্লাহর দ্বীন। ইসলাম গ্রহণ করতে কাউকে বাধ্য করা যাবে না। কিন্তু ইসলাম থেকে বের হওয়ার কারো এখতিয়ার নেই। তাই গ্রহণের পর প্রত্যাখ্যানের এত বড় সাজা।
আল্লাহ বা রসূলকে গালি দেওয়ার দন্ডঃ
কোন মুসলিম আল্লাহ বা তাঁর রসূলকে গালি দিলে সে কাফের ও মুর্তাদ হয়ে যায়। তাই সরকার তারও শাস্তি মৃত্যুদন্ড দান করে।
আবু বাকর সিদ্দীক -এর খিলাফতকালে ইয়ামানের দুই মহিলা মহানবী-এর নিন্দা ক'রে গান গেয়েছিল। সেখানকার গভর্নর মুহাজির বিন আবী রাবীআহ শান্তি স্বরূপ তাদের হাত কেটে নিয়েছিলেন এবং দাঁত ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। সে খবর পেয়ে সিদ্দীক তাঁকে লিখে পাঠান,
(لولا ما سبقتني فيها لأمرتك بقتلها، لأن حد الأنبياء ليس يشبه الحدود، فمن تعاطى ذلك من مسلم فهو مرتد أو معاهد فهو محارب غادر)).
'যদি ওর ব্যাপারে তুমি আমার আগাম ব্যবস্থা না নিতে, তাহলে আমি তোমাকে আদেশ দিতাম যে, তুমি ওকে হত্যা করে দাও। কারণ আম্বিয়াগণের ব্যাপারে কৃত অপরাধের দন্ডবিধি অন্যান্য দন্ডবিধির সদৃশ নয়। সুতরাং কোন মুসলিম সে অপরাধ করলে সে মুর্তাদ হয়ে যায় এবং কোন (অমুসলিম) চুক্তিবদ্ধ মানুষ সে অপরাধ করলে চুক্তি ভঙ্গকারী যুদ্ধকামীতে পরিণত হয়। (আবু বাক্স সিদ্দীক ৪/৬১)
একদা দ্বিতীয় খলীফা উমার বিন খাত্তাব -এর নিকট এক ব্যক্তিকে ধরে আনা হল, সে আল্লাহর রসূল -কে গালি দিতো। তিনি তাকে হত্যা করলেন এবং বললেন,
(من سب الله أو سب أحدا من الأنبياء فاقتلوه.
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আল্লাহকে গালি দেবে অথবা কোন এক নবীকে গালি দেবে, তাকে হত্যা কর। (আসফাহানী, কানযুল উম্মাল ৩৫৪৬৫নং)
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ)কে মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসকারী শান্তিপ্রিয় এমন অমুসলিমের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হল, যে মহানবী -কে গালি দেয়, তার শাস্তি কী? উত্তরে তিনি বললেন, 'অপরাধ প্রমাণিত হলে নবী -কে গালিদাতা ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে, তাতে সে মুসলিম হোক অথবা অমুসলিম।' (খাল্লাল, আস্-স্বারিম ১/১০)
ব্যভিচারের দন্ডঃ
বিবাহ বা বিবাহ-অনুরূপ সম্পর্ক বহির্ভূত নারী-পুরুষের সঙ্গমকে ব্যভিচার বলা হয়।
ইসলাম কেবল ব্যভিচারের শাস্তি ঘোষণা করেই চুপ থাকেনি, বরং যাতে মানুষ সেই শাস্তির উপযুক্ত না হয়, তারও নানা ব্যবস্থা রেখেছে। আর এর জন্য সবচেয়ে বড় ব্যবস্থা হল বিবাহ।
সুতরাং সঠিক বিবাহ বন্ধনের সাথে নারী-পুরুষ দৈহিক মিলন করলে তাদের যৌনক্ষুধাও নিবারিত হবে এবং সেটা কোন অপরাধ হবে না। তবে সঠিক বিবাহ বন্ধন হওয়ার ৪টি শর্ত রয়েছে:-
এক: বর-কনের প্রস্তাব ও গ্রহণ (উভয়ের সম্মতিক্রমে কাযীর মাধ্যমে ঈজাব-কবুল হতে হবে)।
দুইঃ মোহর হতে হবে (যদিও তা অনির্ধারিত বা ঋণ হিসাবে থাকে)।
তিনঃ মেয়ের অভিভাবকের সম্মতি থাকতে হবে।
চারঃ বন্ধনের সময় দুজন মুসলিম সাক্ষী থাকতে হবে।
উক্ত চারটির মধ্যে একটি শর্ত না পাওয়া গেলে বিবাহ শুদ্ধ নয়। আর সে ক্ষেত্রে যদি কোন যুবক-যুবতী অশুদ্ধ বন্ধন নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সংসার করে, তাহলে তাদেরকে ব্যভিচারের দন্ড দেওয়া যাবে না। কারণ সেটা সন্দিহান। আর সন্দেহের কারণে দন্ডবিধি প্রয়োগ প্রতিহত হয়।
বলা বাহুল্য, ইসলাম ব্যভিচারকে হারাম ঘোষণা করেছে। বরং তার নিকটবর্তী হতে নিষেধ ক'রে মহান আল্লাহ বলেছেন,
(وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبِيلاً) (۳۲) سورة الإسراء
"তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।" (বানী ইস্রাঈল: ৩২)
নিঃসন্দেহে ব্যভিচার একটি অশ্লীলতা ও মহাপাপ; যদিও তা বিবাহের পূর্বে ভালোবাসার নামে হয়। মহান কৌশলময় আল্লাহ মুসলিমকে এমন জঘন্য পাপে লিপ্ত হওয়া এবং তার শাস্তি পেয়ে লাঞ্ছিত হওয়া থেকে সুরক্ষিত রাখার মানসে নানাবিধ ব্যবস্থা ও তদবীর প্রদান করেছেন। যাতে তার মান-সম্ভ্রম ও তার পরিবারের মর্যাদা ধূলিসাৎ না হয়ে যায়। যাতে মুসলিম তার জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে না দেয় এবং আল্লাহর দেওয়া জীবনকে আল্লাহরই ইবাদতে ব্যয় করতে পারে। আর সেই সাথে অন্য মুসলিমেরও মান-সম্ভ্রম অক্ষত ও বজায় থাকে।
ব্যভিচার বন্ধের লক্ষ্যে সংক্ষেপে কিছু তদবীর নিম্নরূপঃ-
১। শরীয়ত মুসলিম যুবককে বিবাহ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَأَنكِحُوا الْأَيَامَى مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ إِن يَكُونُوا فُقَرَاء يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ) (۳۲) سورة النور
"তোমাদের মধ্যে যাদের স্বামী-স্ত্রী নেই, তাদের বিবাহ সম্পাদন কর এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎ, তাদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত ক'রে দেবেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।" (নূরঃ ৩২)
মহানবী বলেছেন,
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجُ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءَ ..
"হে যুবকদল! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি (বিবাহের অর্থাৎ স্ত্রীর ভরণপোষণ ও রতিক্রিয়ার) সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কারণ, বিবাহ চক্ষুকে দস্তুরমত সংযত করে এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করে। আর যে ব্যক্তি ঐ সামর্থ্য রাখে না সে যেন রোযা রাখে। কারণ, তা যৌনেন্দ্রিয় দমনকারী।" (বুখারী ৫০৬৫-৫০৬৬, মুসলিম ৩৪৬৪-৩৪৬৬, মিশকাত ৩০৮০নং)
শরীয়ত বিবাহ করাকে অর্ধেক ঈমান হিসাবে গণ্য করেছে। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
((مَنْ تَزَوَّجَ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ نِصْفَ الإِيمَانِ فَلْيَتَّقِ اللَّهُ فِي النَّصْفِ الْبَاقِي)).
“যে ব্যক্তি বিবাহ করে, সে তার অর্ধেক ঈমান পূর্ণ করে, অতএব বাকী অর্ধেকাংশে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।" (ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৭৬৪৭, ৮৭৯৪, সঃ জামে' ৬১৪৮নং)
শুধু তাই নয়, বরং ইসলাম স্ত্রীকে দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসাবে গণ্য করেছে এবং মিলনের মাঝে সওয়াবও নিহিত রেখেছে। এ ছাড়া বিবাহ করা হল সকল নবীর সুন্নত।
২। শরীয়ত বিবাহ সহজ করার লক্ষ্যে তার মোহর কম করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। মহানবী বলেন,
(إِنَّ مِنْ يُمْنِ الْمَرْأَةِ تَيْسِيرَ خِطْبَتِهَا وَتَيْسِيرَ صَدَاقِهَا وَتَيْسِيرَ رَحِمِهَا)).
"নারীর অন্যতম বর্কত এই যে, তার পয়গাম সহজ হবে, তার মোহর স্বল্প হবে এবং তার গর্ভাশয় সন্তানময় হবে।" (আহমাদ ২৪৪৭৮, হাকেম ২৭৩৯, বাইহাক্বী ১৪৭৪৬, সঃ জামে' ২২৩৫নং)
৩। স্ত্রীর সাথে সদ্ব্যবহার করতে আদেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا } (۱۹) سورة النساء
"তাদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন কর; তোমরা যদি তাদেরকে ঘৃণা কর, তাহলে এমন হতে পারে যে, আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তাকে ঘৃণা করছ।" (নিসাঃ ১৯)
আর মহানবী বলেছেন,
اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْراً )).
"তোমরা স্ত্রীদের জন্য মঙ্গলকামী হও।" (বুখারী ৩৩৩১, মুসলিম ৩৭২০নং)
যেমন পরস্পরের মাঝে আকর্ষণ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে উভয়কেই সাজসজ্জা করতে উৎসাহিত করা হয়েছে।
৪। স্বামী-স্ত্রীকে একে অন্য থেকে দীর্ঘ সময় দূরে না থাকতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে কোন পুরুষকে সেই স্ত্রীর কাছে যেতে ও নির্জনতা অবলম্বন করতে নিষেধ করা হয়েছে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, স্বামী-স্ত্রীর অন্যাসক্ত হয়ে পড়ার পিছনে দ্বীনদারির অবর্তমানতা ছাড়া আরও তিনটি কারণ রয়েছে:-
(ক) কথাবার্তা, ব্যবহার ও আচরণে প্রেমের আবেশ না থাকা। (রোমান্স না থাকা।)
(খ) অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন দেখা দেওয়া এবং স্বামীর সে প্রয়োজন মিটাতে না পারা।
(গ) দৈহিক মিলনে আসক্তি না থাকা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মিলনে স্ত্রীর আসক্তি ও আগ্রহ থাকে না। তাই শরীয়ত স্ত্রীকে সতর্ক করেছে নানা ভাবে। মহানবী বলেছেন,
(( إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فَرَاشِهِ فَلَمْ تَأْتِهِ ، فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا، لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ )). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"যদি কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে নিজ বিছানায় ডাকে এবং সে না আসে, অতঃপর সে (স্বামী) তার প্রতি রাগান্বিত অবস্থায় রাত কাটায়, তাহলে ফিরিস্তাগণ তাকে সকাল অবধি অভিসম্পাত করতে থাকেন।" অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, "যখন স্ত্রী নিজ স্বামীর বিছানা ত্যাগ করে (অন্যত্র) রাত্রিযাপন করে, তখন ফিরিশাবর্গ সকাল পর্যন্ত তাকে অভিশাপ দিতে থাকেন।" আর এক বর্ণনায় আছে যে, "সেই আল্লাহর কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! কোন স্বামী তার স্ত্রীকে নিজ বিছানার দিকে আহবান করার পর সে আসতে অস্বীকার করলে যিনি আকাশে আছেন তিনি (আল্লাহ) তার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন, যে পর্যন্ত না স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যায়।" (বুখারী ৫১৯৩, মুসলিম ১৪৩৬, আবু দাউদ ২১৪১নং, নাসাঈ)
মহানবী বলেছেন,
((لَا تَصُومُ الْمَرْأَةُ يَوْمًا فِي غَيْرِ رَمَضَانَ وَزَوْجُهَا شَاهِدٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ)).
"মহিলা যেন স্বামীর বর্তমানে তার বিনা অনুমতিতে রমযানের রোযা ছাড়া একটি দিনও রোযা না রাখে।" (দারেমী ১৭২০নং)
৫। দাম্পত্যের চাকা অচল হলে শরীয়ত বিবাহ-বিচ্ছেদকে সহজ করেছে। কোনও বড় ক্ষতি বা ত্রুটির ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে।
৬। পুরুষের জন্য একাধিক বিবাহ বৈধ করা হয়েছে। এর পশ্চাতে একাধিক যুক্তি রয়েছে।
(ক) পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেশি।
(খ) পুরুষের সংখ্যা যুদ্ধ-বিগ্রহ প্রভৃতি দুর্ঘটনায় বেশি কমতে থাকে।
(গ) বিবাহের বয়সোত্তীর্ণা, তালাকপ্রাপ্তা ও বিধবাদের সংসার গড়তে বহু বিবাহই একটি বড় সমাধান।
এ ক্ষেত্রে যদি মহিলা স্বামীহীনা থেকে পিছল পথে পা বাড়ায়, তাহলে ব্যভিচারে আছড়ে পড়া ছাড়া আর কী হতে পারে?
পরন্তু বহু বিবাহের শর্ত আছে, তা পূরণ না হলে বহু বিবাহ বৈধ নয়।
(ক) স্বামীর যেন এমন বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা থাকে, যার মাধ্যমে সে একাধিক স্ত্রীর সংসার সুষ্ঠুভাবে সামাল দিতে সক্ষম হয়।
(খ) স্ত্রীদের ভরণপোষণের জন্য আর্থিক ক্ষমতা তথা তাদের যৌন চাহিদার মিটানোর জন্য যৌন ক্ষমতা বর্তমান থাকে।
(গ) স্ত্রীদের মাঝে যেন ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা বজায় থাকে। নচেৎ একাধিক বিবাহ বৈধ নয়।
একাধিক পুরুষ একটি মহিলার জীবনে শান্তি আনতে পারে না। তাছাড়া মহিলা একাধিক স্বামী গ্রহণ করলে বংশধারা ও সন্তানের পিতৃপরিচয় হারিয়ে যাবে।
৭। ইসলাম মদ্যপানকে হারাম করেছে। কারণ মদের নেশা ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায়। সাধারণতঃ মদ্যপায়ীরাই বেশি ব্যভিচারী হয়ে থাকে।
৮। ইসলাম গান-বাজনা শোনাকে হারাম করেছে। কারণ অধিকাংশ গানে যৌন অনুভূতি জাগ্রত করে। আরবীতে বলা হয়, 'ইন্নাল গিনা বারীদুয যিনা।' অর্থাৎ, গান হল ব্যভিচারের ডাকঘর।
৯। ব্যভিচারের পথ বন্ধ করতে এবং যৌন-ক্ষুধা নিবারণ করতে শরীয়ত রোযা রাখা বিধিবদ্ধ করেছে। মহানবী বলেছেন,
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجُ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ ..
"হে যুবকদল! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি (বিবাহের অর্থাৎ স্ত্রীর ভরণপোষণ ও রতিক্রিয়ার) সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কারণ, বিবাহ চক্ষুকে দস্তুরমত সংযত করে এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করে। আর যে ব্যক্তি ঐ সামর্থ্য রাখে না সে যেন রোযা রাখে। কারণ, তা যৌনেন্দ্রিয় দমনকারী।" (বুখারী ৫০৬৫-৫০৬৬, মুসলিম ৩৪৬৪-৩৪৬৬, মিশকাত ৩০৮০নং)
১০। মহিলাদেরকে বাড়ির ভিতরে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى} (৩৩) سورة الأحزاب
"তোমরা স্বগৃহে অবস্থান কর এবং (প্রাক-ইসলামী) জাহেলী যুগের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়িয়ো না।" (আহযাবঃ ৩৩)
আর মহানবী বলেছেন,
المرأة عورة وإنها إذا خرجت من بيتها استشرفها الشيطان وإنها لا تكون أقرب إلى الله منها في قعر بيتها.
"মেয়ে মানুষ (সবটাই) লজ্জাস্থান (গোপনীয়)। আর সে যখন নিজ বাড়ি থেকে বের হয়, তখন শয়তান তাকে পুরুষের দৃষ্টিতে সুশোভন করে তোলে। সে নিজ বাড়ির অন্দর মহলে অবস্থান ক'রে আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী থাকে।" (ত্বাবারানীর আওসাত্ব ২৮৯০, সহীহ তারগীব ৩৪৪নং)
পুরুষের জন্য নারী সবচেয়ে বড় ফিতনা। তাই অতি প্রয়োজন ছাড়া তাকে পর-পুরুষের চোখে সহজলভ্য হতে নিষেধ করা হয়েছে।
১১। অপরের বাড়ি প্রবেশের অনুমতি তথা আরো অন্যান্য আদব শিক্ষা দিয়েছে। যাতে বাড়ির ভিতরের কারো এমন অঙ্গ দৃষ্টিগোচর না হয়, যার ফলে ফিতনা সৃষ্টি হতে পারে।
১২। ব্যভিচারের ছিদ্রপথ বন্ধ করার লক্ষ্যে শরীয়ত যে কোনও স্থানে বেগানা নারী-পুরুষের একাকিত্ব অবলম্বন করাকে হারাম ঘোষণা করেছে। মহানবী বলেছেন,
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَم ». متفق عَلَيْهِ
"মাহরামের উপস্থিতি ছাড়া কোন পুরুষ যেন কোন মহিলার সাথে নির্জনবাস না করে।" (বুখারী ৫২৩৩, মুসলিম ৩৩৩৬নং)
ألا لا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ ، إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ)).
"সতর্ক হও! যখনই কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনতা অবলম্বন করে, তখনই শয়তান তাদের তৃতীয় সাথী (কোটনা) হয়।" (সহীহ তিরমিযী ৯৩৪নং, নাসাঈর কুবরা ৯২১৯, বাইহাক্বী ১৩৯০৪, হাকেম ৩৮৭, ৩৯০, ত্বাবারানী ৫৬১নং)
১৩। পর-পুরুষের সাথে কথা বলার সময় মহিলাকে আকর্ষণীয় স্বরে ও মোহনীয় কণ্ঠে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا}
“(হে নারীগণ!) যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কন্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর। (স্বাভাবিকভাবে কথা বল।)” (আহযাবঃ ৩২)
১৪। মহিলাদেরকে পর্দার আদেশ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ ....) (۳۱) سورة النور
"তারা যেন তাদের স্বামী---ব্যতীত কারও নিকট তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।" (নূর: ৩১)
{ وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعاً فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَاب } [ الأحزاب : ٥٣ ]
অর্থাৎ, তোমরা তাদের নিকট হতে কিছু চাইলে পর্দার অন্তরাল হতে চাও। (সূরা আহযাব ৫৩ আয়াত)
{يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاء الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ}
"হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও বিশ্বাসীদের রমণীগণকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের (মুখমন্ডলের) উপর টেনে দেয়।" (আহযাবঃ ৫৯)
সতর্কতার বিষয় যে, ইভটিজিং ও ধর্ষণের অধিকাংশ কারণ হল মহিলার বেপর্দা ও বেলেল্লাপনা পোশাক।
১৫। ব্যভিচারের পথ খুলতে পারে এই আশঙ্কায় বলা হয়েছে,
(( لَا تُبَاشِرِ المَرْأَةُ المَرْأَةَ ، فَتَنْعَتَهَا لِزَوْجِهَا كَأَنَّهُ يَنْظُرُ إِلَيْهَا )). رواه البخاري
"কোন মহিলা যেন অন্য কোন মহিলাকে (নগ্ন) কোলাকুলি না করে। (কারণ) সে পরে তার স্বামীর কাছে তা এমনভাবে বর্ণনা করবে যে, যেন সে (তা শুনে) ঐ মহিলাকে প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করছে।" (বুখারী ৫২৪০-৫২৪১নং)
১৬। স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাড়ির বাইরে যেতে স্ত্রীকে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন তার অনুমতি ছাড়া কোন পুরুষকে বাড়ির ভিতরে আসতে অনুমতি দিতেও নিষেধ করা হয়েছে।
১৭। পর্দাই যথেষ্ট নয়। পর্দার সাথেও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা শরীয়তে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
১৮। এগানা পুরুষ বা স্বামীর সঙ্গ ছাড়া মহিলাকে একাকিনী সফর করতে নিষেধ করা হয়েছে। মহানবী বলেছেন,
(( لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةِ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ ، وَلَا تُسَافِرُ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ )).
"কোন পুরুষ যেন কোন বেগানা নারীর সঙ্গে তার সাথে এগানা পুরুষ ছাড়া অবশ্যই নির্জনতা অবলম্বন না করে। আর মাহরাম ব্যতিরেকে কোন নারী যেন (একাকিনী) সফর না করে।" (বুখারী ৫২৩৩, মুসলিম ۱۳۴۱নং)
১৯। বেগানা নারী-পুরুষের স্পর্শকে হারাম করা হয়েছে। অবৈধ করা হয়েছে মুসাফাহাকেও। মহানবী বলেছেন,
((لأَنْ يُطْعَنَ فِي رَأْسِ رَجُل بِمِخْيَطٍ مِنْ حَدِيدٍ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمَسَّ امْرَأَةً لَا تَحِلُّ لَهُ)).
"কোন ব্যক্তির মাথায় লৌহ সুচ দ্বারা খোঁচা যাওয়া ভালো, তবুও যে নারী তার জন্য অবৈধ, তাকে স্পর্শ করা ভালো নয়।" (ত্বাবারানী ১৬৮৮০-১৬৮৮১, সিঃ সহীহাহ ২২৬ নং)
২০। ব্যভিচারের ছিদ্রপথ বন্ধ করার লক্ষ্যেই নজরবাজিকে ইসলাম হারাম ঘোষণা করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ (۳۰) وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ} (۳۱)
"মু'মিনদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের যৌন অঙ্গকে সাবধানে সংযত রাখে; এটিই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। ওরা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত। মু'মিন নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে।" (নূরঃ৩০-৩১)
বলা বাহুল্য, নিজ সম্ভ্রম বাঁচানোর এটাই হল প্রাথমিক প্রয়াস। জারীর বিন আব্দুল্লাহ বলেন, আচমকা দৃষ্টি সম্পর্কে আমি রাসূলুল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমাকে আদেশ করলেন, যেন আমি আমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিই। (মুসলিম ৫৭৭০নং)
একদা তিনি আলী -কে বলেছিলেন,
يَا عَلِيُّ لَا تُتبع النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ فَإِنَّ لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ ...
"হে আলী! একবার নজর পড়ে গেলে আর দ্বিতীয়বার তাকিয়ে দেখো না। প্রথমবারের (অনিচ্ছাকৃত) নজর তোমার জন্য বৈধ। কিন্তু দ্বিতীয়বারের নজর বৈধ নয়।" (আহমাদ, আবু দাউদ ২১৫১, তিরমিযী ২৭৭৭, হাকেম ২৭৮৮, বাইহাক্বী ১৩২৯৩, সহীহুল জামে' ৭৯৫৩ নং)
২০। ব্যভিচারের দিকে আকর্ষণ করবে বলেই মহিলাকে সুগন্ধ ব্যবহার ক'রে পর পুরুষের সামনে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। মহানবী বলেছেন,
كُلُّ عَيْنِ زَانِيَةٌ ، وَالْمَرْأَةُ إِذَا اسْتَعْطَرَتْ فَمَرَّتْ بِالْمَجْلِسِ فَهِيَ كَذَا وَكَذَا ، يَعْنِي زَانِيَةً.
"প্রত্যেক চক্ষুই ব্যভিচারী। আর রমণী যদি সুগন্ধি ব্যবহার করে কোন (পুরুষের) মজলিসের পাশ দিয়ে পার হয়ে যায় তাহলে সে এক বেশ্যা।" (আহমাদ, সঃ তিরমিযী ২২৩৭, আবু দাউদ ৪৪১৭নং)
এত কিছু অমান্য বা মান্য করার পরেও যদি কেউ ব্যভিচার করে, তাহলে শরীয়ত তার শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছে। অবশ্য শাস্তিতে ক্রমপর্যায় খেয়াল রাখা হয়েছে। সুতরাং মহান আল্লাহ বলেছেন,
{الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِئَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِين اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ} (২) سورة النساء
"তোমাদের মধ্যে যে দু'জন এতে (ব্যভিচারে) লিপ্ত হবে, তাদের উভয়কে শাস্তি দাও। তবে যদি তারা তওবা করে এবং সংশোধন ক'রে নেয়, তাহলে তাদেরকে রেহাই দাও। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু।" (নিসাঃ ১৬)
অতঃপর আরও কঠিন শাস্তির কথা ঘোষণা দিয়ে বলেছেন,
{وَاللَّاتِي يَأْتِينَ الْفَاحِشَةَ مِن نِّسَائِكُمْ فَاسْتَشْهِدُوا عَلَيْهِنَّ أَرْبَعَةً مِّنكُمْ فَإِن شَهِدُوا فَأَمْسِكُوهُنَّ فِي الْبُيُوتِ حَتَّى يَتَوَفَّاهُنَّ الْمَوْتُ أَوْ يَجْعَلَ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلاً } (১৫) النساء
"তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ব্যভিচার করে, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য হতে চার জন সাক্ষী উপস্থিত কর। সুতরাং যদি তারা সাক্ষ্য দেয়, তাহলে তাদেরকে গৃহবন্দী ক'রে রাখ, যে পর্যন্ত না তাদের মৃত্যু হয় অথবা আল্লাহ তাদের জন্য অন্য কোন ব্যবস্থা করেন।" (নিসাঃ ১৫)
অতঃপর ব্যবস্থা আসে। এ ব্যাপারে মহানবী বলেছেন,
خُذُوا عَنِّى خُذُّوا عَنِّى قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلاً الثَّيِّبُ بِالتَّيِّبِ جَلْدُ مِائَةٍ وَرَمْي بِالْحِجَارَةِ وَالْبَكْرُ بِالْبَكْرِ جَلْدُ مِائَةٍ وَنَفْى سَنَةٍ ..
"তোমরা আমার নিকট থেকে (বিধান) গ্রহণ কর, তোমরা আমার নিকট থেকে (বিধান) গ্রহণ কর, আল্লাহ ব্যভিচারিণীদের জন্য ব্যবস্থা দিয়েছেন, বিবাহিত-বিবাহিতা হলে এক শত বেত্রাঘাত ও পাথর নিক্ষেপ ক'রে হত্যা। আর কুমার-কুমারী হলে এক শত বেত্রাঘাত ও এক বছর নির্বাসন।" (আহমাদ ১৫৯১০, মুসলিম ৪৫০৯, আবু দাউদ ৪৪১৭, তিরমিযী ১৪৩৪নং)
আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
{الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِئَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِين اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ} (২)
"ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী---ওদের প্রত্যেককে একশো কশাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকরীকরণে ওদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে অভিভূত না করে; যদি তোমরা আল্লাহতে এবং পরকালে বিশ্বাসী হও। আর বিশ্বাসীদের একটি দল যেন ওদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।" (নূর: ২)
অবশ্য অনেকে সূরা নিসার উল্লিখিত ১৫নং আয়াতকে মহিলায়-মহিলায় সমকামিতা এবং ১৬নং আয়াতকে পুরুষে-পুরুষে সমকামিতার শাস্তি-বিধান মনে করেছেন। আর আল্লাহই ভালো জানেন।
কুরআন মাজীদে বিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি পাথর মেরে হত্যা করার বিধানের আয়াত ছিল। পরবর্তীতে তার তেলাওয়াত রহিত হয়, কিন্তু বিধান অবশিষ্ট থাকে। সুন্নাহতে সে বিধান স্পষ্ট রয়েছে। মহানবী বলেন,
لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ الثَّيِّبُ الزَّانِي وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ وَالتَّارِكْ لِدِينِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ ».
“তিন ব্যক্তি ছাড়া 'আল্লাহ ব্যতীত কেউ সত্য উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর রসূল' এ কথায় সাক্ষ্যদাতা কোন মুসলিমের খুন (কারো জন্য) বৈধ নয়; বিবাহিত ব্যভিচারী, খুনের বদলে হত্যাযোগ্য খুনী এবং দ্বীন ও জামাআত ত্যাগী।” (বুখারী ৬৮৭৮, মুসলিম ৪৪৬৮-৪৪৭০নং আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ)
আর তিনি তাঁর জীবনে মায়েয নামক এক পুরুষ ও গামেদিয়া এক মহিলাকে পাথর মেরে হত্যা করার আদেশ দিয়েছেন। আরো এক মহিলাকে পাথর মেরে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন, যে তার কাজের লোকের সাথে ব্যভিচার করছিল।
এ ছাড়া ব্যভিচারীর অন্য শাস্তি হলঃ-
১। ব্যভিচারী ফাসেক, তার সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য।
২। ব্যভিচারীর সাথে সচ্চরিত্র মুসলিমের বিবাহ বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{الزَّانِي لَا يَنكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً وَالزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَا إِلَّا زَانِ أَوْ مُشْرِكٌ وَحُرِّمَ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ} (۳) سورة النور
"ব্যভিচারী কেবল ব্যভিচারিণী অথবা অংশীবাদিনীকেই বিবাহ করবে এবং ব্যভিচারিণীকে কেবল ব্যভিচারী অথবা অংশীবাদীই বিবাহ করবে। বিশ্বাসীদের জন্য তা অবৈধ।" (নূর: ৩)
৩। ব্যভিচারীকে 'খবীস' বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ وَالطَّيِّبَاتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ لِلطَّيِّبَاتِ أُوْلَئِكَ مُبَرَّؤُونَ مِمَّا يَقُولُونَ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ} (٢٦) سورة النور
"দুশ্চরিত্র নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য; দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্র নারীর জন্য; সচ্চরিত্র নারী সচ্চরিত্র পুরুষের জন্য এবং সচ্চরিত্র পুরুষ সচ্চরিত্র নারীর জন্য (উপযুক্ত)। এ (সচ্চরিত্র) দের সম্বন্ধে লোকে যা বলে, এরা তা হতে পবিত্র। এদের জন্য আছে ক্ষমা এবং সম্মানজনক জীবিকা।" (নূর: ২৬)
৪। পরকালে জাহান্নামে আগুনের চুল্লিতে ওঠা-নামা করবে।
কিন্তু দুনিয়াতে এ অপরাধের শাস্তি এত বড় কেন?
নিঃসন্দেহে এ অপরাধ একটি চারিত্রিক বড় অপরাধ। এটা এমন একটি অশ্লীলতা, যার ফলে মানুষের দৈহিক, চারিত্রিক ও সামাজিক ক্ষতি রয়েছে।
১। ব্যভিচার মানব-সমাজকে ধ্বংস করতে পারে। যাতে শুধু যৌনক্ষুধা নিবারণের চাহিদা থাকে এবং সন্তান গ্রহণের কোন উদ্দেশ্য ও ইচ্ছা থাকে না।
২। অযাচিত সন্তান গর্ভে এসে গেলে তাকে হত্যা করা হয়। ব্যভিচারই বৃদ্ধি করে ভ্রূণ-হত্যার অপরাধ।
৩। ব্যভিচার মানুষকে সাময়িক সুখ দেয়, স্থায়ী শান্তি দেয় না।
৪। ব্যভিচারের ফলে ভয়ানক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে সমাজে। কখনো তা বংশধরদের মাঝে অবস্থায়ী হয়ে যায়।
৫। ব্যভিচার অনেক সময় খুনাখুনির দিকে পথপ্রদর্শন করে। অনেক সময় ঈর্ষায় স্বামী তার স্ত্রীকে অথবা স্ত্রী তার স্বামীকে হত্যা করে।
৬। ব্যভিচার দাম্পত্য জীবনের সুশৃঙ্খলতা নষ্ট করে, সংসারের সুখ হরণ করে, স্বামী-স্ত্রীর সুমধুর সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে। অনেক সময় বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে এবং তার ফলে তাদের সন্তানের ভাগ্যে জোটে ছন্নছাড়া জীবন, গড়ে ওঠে অপরাধী হয়ে।
৭। ব্যভিচার বংশধারা ধ্বংস করে এবং অন্য বংশের অযাচিত সন্তানকে নিজ বংশের উত্তরাধিকারী বানায়।
৮। ব্যভিচারে স্ত্রী তার স্বামীকে পর-পুরুষের সন্তান উপহার দেয় এবং কাকের বাসায় কোকিলের ছানা মানুষ হয়।
৯। ব্যভিচার শুধু শারীরিক ও সাময়িক একটা সম্পর্ক, যার পশ্চাতে কোন দায়িত্বশীলতা ও দায়বদ্ধতা নেই। যাতে শুধু পশুবৃত্তি ও কাম চরিতার্থের উদ্দেশ্য প্রবল থাকে।
১০। ব্যভিচার সমাজের সুষ্ঠুতা নষ্ট করে এবং চরিত্রহীনতা মানুষকে কর্তব্যহীন ক'রে গড়ে তোলে।
আরো কত শত ক্ষতি আছে এই অশ্লীলতায়। নিঃসন্দেহে সুসভ্য মানব-সমাজে তার বহুমুখী ক্ষতির চাইতে শাস্তির ভার নেহাতই কম। পরন্ত যৌনক্ষুধা নিবারণের বৈধ সুব্যবস্থা আছে, কিন্তু ব্যভিচারী তা গ্রহণ না ক'রে অবৈধ পথে পা বাড়ায়, তার ফলেই তার শাস্তি এত বেশি কঠিন, এত বেশি নৃশংস।
ব্যভিচারের দন্ডবিধি মানুষের প্রাণ, মান ও দাম্পত্য-সুখ রক্ষা করে। চারিত্রিক অবক্ষয় থেকে সমাজকে মুক্তি দেয়।
কোন্ ব্যভিচার নির্ধারিত দন্ডবিধি অনিবার্য করে?
যে অবৈধ সঙ্গমের ফলে দন্ডবিধি অনিবার্য হয়, তার কয়েকটি শর্ত রয়েছে:-
১। পুংলিঙ্গের অগ্রভাগ (সুপারির মতো অংশ) স্ত্রীলিংগে প্রবেশ হতে হবে; তাতে বীর্যপাত হোক বা না হোক।
২। উভয়ের মধ্যে সন্ধিগ্ধ বিবাহের কোন সম্পর্ক থাকবে না।
সুতরাং মহিলার যোনিপথের বাইরে বীর্যপাত করলে অথবা তাদের মাঝে কোন অশুদ্ধ বিবাহের সম্পর্ক থাকলে ঐ দন্ড প্রয়োগ হবে না।
প্রস্তরাঘাতে মৃত্যুদন্ডের শর্ত হল, বিবাহিত হতে হবে, যদিও বর্তমানে স্বামী বা স্ত্রী কাছে নেই। তালাক হয়েছে বা একজনের মৃত্যুবিয়োগ ঘটেছে।
অবশ্য বিবাহিত প্রমাণ করার সাথে সাথে শর্ত হল:-
১। ব্যভিচারী যেন জ্ঞানসম্পন্ন সাবালক হয়। সুতরাং পাগল বা নাবালক হলে নির্ধারিত দন্ডবিধি প্রয়োগ করা যাবে না। তবে তাদেরকে অন্য শাস্তি দিতে হবে।
২। স্বাধীন হতে হবে। নচেৎ ক্রীতদাস-দাসী হলে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে না। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَإِذَا أُحْصِنَّ فَإِنْ أَتَيْنَ بِفَاحِشَةٍ فَعَلَيْهِنَّ نِصْفُ مَا عَلَى الْمُحْصَنَاتِ مِنَ الْعَذَابِ}
"অতঃপর বিবাহিতা হয়ে যদি তারা ব্যভিচার করে, তাহলে তাদের শাস্তি স্বাধীন নারীর অর্ধেক।" (নিসাঃ ২৫) আর মৃত্যুদন্ডকে অর্ধেক করা যায় না।
৩। শুদ্ধ বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে এবং স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গম হতে হবে। যদিও তাতে বীর্যপাত না হয় অথবা সে সঙ্গম বৈধ না হয়। (যেমন মাসিক অবস্থায় বা রমযানের দিনের বেলায় সহবাস করে।)
ব্যাভিচারের দন্ডবিধি প্রয়োগ করার ৪টি শর্ত আছে:-
১। জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে।
২। সাবালক হতে হবে।
৩। স্বেচ্ছায় ব্যভিচার করবে।
৪। হারাম জেনে করবে।
সুতরাং পাগল, নাবালক, ধর্ষিতা ও ব্যভিচার হারাম জানে না---এমন নারী-পুরুষের উপর নির্ধারিত দন্ডবিধি প্রয়োগ হবে না। অন্য শাস্তি প্রয়োগ করা হবে।
এর পরেও ব্যভিচার প্রমাণিত হতে হবে। সে স্বীকার করবে যে, সে ব্যভিচার করেছে অথবা মহিলা গর্ভবতী হয়ে যাবে অথবা ৪ জন পুরুষ ঐ ব্যভিচারের সাক্ষ্য প্রদান করবে।
সাক্ষী ৩ জন হলে চলবে না। সাক্ষীদের সকলকে দোষমুক্ত নিষ্কলঙ্ক পুরুষ হতে হবে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে মহিলা বা পাপাচারীদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না।
চারজন সাক্ষীকেই সচক্ষে সঙ্গমকার্য দর্শন করতে হবে। তারা বয়ানে প্রকাশ করবে যে, পুরুষের লিঙ্গকে মহিলার যোনিপথে ঠিক সুর্মাদানির ভিতরে সুর্মাকাঠি বা কুয়োর মধ্যে রশি প্রবেশ করার মতো দেখেছে। কেবল উভয়কে একটি বন্ধ কক্ষে বা এক বিছানায় বা একটি লেপের নিচে শয়নাবস্থায় দেখা যথেষ্ট নয়।
চারজনের মধ্যে যদি একজন অন্যভাবে সাক্ষ্য দেয় অথবা সাক্ষ্য প্রত্যাহার ক'রে নেয়, তাহলেও নির্ধারিত দন্ডবিধি প্রয়োগ করা যাবে না। যেহেতু অপরাধ প্রমানে কোন প্রকার সন্দেহ সৃষ্টি হলে উক্ত দন্ড কার্যকর হবে না।
বাস্তবে এমন সাক্ষ্যভিত্তিক প্রমাণ মেলা বড় দুষ্কর। তবুও দন্ড রাখা হয়েছে, যাতে অপরাধে পা বাড়াতে অপরাধী সাহস না পায়।
পক্ষান্তরে অভিযোগ দায়ের করার পর যদি তা প্রমাণিত না হয়, তাহলে উল্টে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে অপবাদের দন্ডবিধি প্রয়োগ করা হবে।
তাহলে ব্যভিচারের অপরাধ প্রমাণে কেন এত সূক্ষ্মতা, কেন এত কঠিনতা?
যাতে কোন মানুষ কারো বিরুদ্ধে এমন জঘন্য অপরাধের অপবাদ আরোপ করতে সাহস না পায় এবং অনায়াসে কোন মানুষ কোন মানুষের ইজ্জত-সম্ভ্রমে কালিমা লেপন না করতে পারে। যেমন এই অপবাদ সহজে প্রমাণ ক'রে কেউ কাউকে কষাঘাত বা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে না পারে। (দ্রঃ ফিকহুস সুন্নাহ এবং আল-হুদুদ অত্-তা'যীরাত)
অপবাদ দেওয়ার দন্ডবিধিঃ
ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়া একটি মহা অপরাধ। কোন পবিত্র দেহে কলঙ্কের কালিমা লেপন করা একটি মহাপাপ। ইসলাম চেয়েছে এই অপরাধের মূলোৎপাটন ঘটাতে। যাতে কেউ কারো মান-সম্মানে আঁচড় হানতে না পারে। কোন সতী নারীর চরিত্রে কলঙ্ক লেপন ক'রে তাকে সমাজে বিব্রতকর জীবনযাপন করতে বাধ্য না করে। তার বিরুদ্ধে অপবাদ রচনা ও রটনা ক'রে তার বিবাহে বাদ সাধতে না পারে।
ইসলাম চেয়েছে, কোন মানুষ যেন নিজের ক্ষুরধার জিহ্বা-অস্ত্র দিয়ে অপরের সম্ভ্রম-বাগানে ধ্বংসলীলা না চালাতে পারে। তাই সে অপরাধকে সর্বনাশী আখ্যা দিয়ে মুসলিমকে সতর্ক করেছে। মহানবী বলেছেন,
اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبَقَاتِ .. قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا هُنَّ قَالَ « الشَّرْكُ بِاللَّهِ وَالسِّحْرُ وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ وَأَكُلُ الرِّبَا وَالتَّوَلَّى يَوْمَ الزَّحْفِ وَقَدْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ ..
"সাতটি সর্বনাশী কর্ম হতে দূরে থাক।" সকলে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! তা কী কী?' তিনি বললেন, "আল্লাহর সাথে শির্ক করা, যাদু করা, ন্যায় সঙ্গত অধিকার ছাড়া আল্লাহ যে প্রাণ হত্যা করা হারাম করেছেন তা হত্যা করা, সূদ খাওয়া, এতীমের মাল ভক্ষণ করা, (যুদ্ধক্ষেত্র হতে) যুদ্ধের দিন পলায়ন করা এবং সতী উদাসীনা মুমিনা নারীর চরিত্রে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া।" (বুখারী ২৭৬৬, ৬৮৫৭, মুসলিম ২৭২নং, আবু দাউদ, নাসাঈ)
পরম্ভ এ সর্বনাশী অপরাধ যে ঘটাবে, তার জন্য রয়েছে ইহ-পরকালে নানা শাস্তি।
০ নির্ধারিত দন্ড রয়েছে আশি চাবুক।
০ অপরাধী সাক্ষী হওয়ার যোগ্যতা হারাবে।
০ সে হবে আল্লাহর নিকট মিথ্যুক, ফাসেক ও অভিশপ্ত।
০ পরকালে সে পাবে কঠিন শাস্তি।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَداً وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ} (٤)
"যারা সাধুী রমণীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর স্বপক্ষে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশি বার কশাঘাত করবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না; এরাই তো সত্যত্যাগী।" (নূর: ৪)
{لَوْلَا جَاؤُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاء فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاء فَأُوْلَئِكَ عِندَ اللَّهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ}
"তারা কেন এ ব্যাপারে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করেনি? যেহেতু তারা সাক্ষী উপস্থিত করেনি, সে কারণে তারা আল্লাহর নিকটে মিথ্যাবাদী।" (নূর: ১৩)
{إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} (۱۹) سورة النور
"যারা বিশ্বাসীদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য আছে ইহলোকে ও পরলোকে মর্মন্তুদ শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না।" (নূর: ১৯)
{إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ (۲۳) يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (٢٤) يَوْمَئِذٍ يُوَفِّيهِمُ اللَّهُ دِينَهُمُ الْحَقَّ وَيَعْلَمُونَ أَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ الْمُبِينُ} (٢٥)
"যারা সাধুী, নিরীহ ও বিশ্বাসী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা ইহলোক ও পরলোকে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য আছে মহাশাস্তি। যেদিন তাদের বিরুদ্ধে তাদের রসনা, তাদের হাত ও পা তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে সাক্ষি দেবে। সেদিন আল্লাহ তাদের প্রাপ্য প্রতিফল পুরোপুরি দেবেন এবং তারা জানবে, আল্লাহই সত্য, স্পষ্ট প্রকাশক। (নূর: ২৩-২৫)
বিদিত যে, উক্ত আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হওয়ার কারণই ছিল মা আয়েশার চরিত্রে কলঙ্কের কালিমা লেপন। অতঃপর বিধান অনুযায়ী অপরাধীদের উপর নির্ধারিত দন্ডবিধি প্রয়োগ করা হয়।
অবশ্য এ দন্ডবিধি প্রয়োগেও নানা সাবধানতা ও শর্তাবলী আছে। সংক্ষেপের উদ্দেশ্যে তা উল্লেখ করা গেল না।
কত শত এমন হয় যে, অপবাদ রচনা ক'রে রটিয়ে বেড়ায় কিন্তু শাস্তি পায় না। হয়তো ধরা পড়ে না অথবা প্রমাণ করা যায় না অথবা দেশের তাগুতী আইনে অথবা কলঙ্কিত দুর্বল হওয়ার কারণে অপরাধী বেঁচে যায়। তাদের জন্য সর্বোচ্চ বিচারালয় রয়েছে শেষ বিচারের দিনে। মহানবী বলেছেন,
(( مَنْ قَدْفَ مَمْلُوكَهُ بِالزِّنَى يُقَامُ عَلَيْهِ الحَدُّ يَومَ القِيَامَةِ ، إِلَّا أَنْ يَكُونَ كَمَا قَالَ )).
"যে ব্যক্তি নিজ মালিকানাধীন দাসের উপর ব্যভিচারের অপবাদ দেবে, কিয়ামতের দিন তার উপর হদ (দণ্ডবিধি) প্রয়োগ করা হবে। তবে সে যা বলেছে, দাস যদি তাই হয় (তাহলে ভিন্ন কথা।)" (বুখারী ৬৮৫৮, মুসলিম ৪৪০১নং)
সমকামিতার দন্ডবিধিঃ
সমকামিতা একটি চরিত্র-বিধ্বংসী জঘন্য অপরাধ। দ্বীন ও দুনিয়াতে এটা এক প্রকার প্রকৃতি-বিরোধী বিরল ও বিকৃত যৌনাচার। এমন অপরাধের ফলে মানুষের চরিত্র ও সমাজ ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হয়।
এই অপরাধ পৃথিবীর ইতিহাসে যে জাতি সংঘটিত করে, মহান সৃষ্টিকর্তা তাদের কাছে নবী লুত-কে প্রেরণ ক'রে সতর্ক করেছিলেন। পরিশেষে তারা বিরত না হলে তিনি তাদেরকে ধ্বংস ক'রে দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
"আমি লুতকেও পাঠিয়েছিলাম, সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, 'তোমরা এমন কুকর্ম করছ, যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেউ করেনি। তোমরা তো কাম-তৃপ্তির জন্য নারী ছেড়ে পুরুষের নিকট গমন কর, তোমরা তো সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়।' উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু বলল, 'এদের (লুত এবং তার সঙ্গীদের) কে জনপদ হতে বহিষ্কার কর। এরা তো এমন লোক যারা পবিত্র থাকতে চায়।' অতঃপর তার স্ত্রী ব্যতীত তাকে ও তার পরিজনবর্গকে রক্ষা করেছিলাম। তার স্ত্রী ছিল ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভূত। তাদের উপর মুষলধারে পাথর-বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম, সুতরাং অপরাধীদের পরিণাম কী হয়েছিল তা লক্ষ্য কর।" (আ'রাফঃ ৮০-৮৪)
তিনি অন্যত্র বলেছেন,
"যখন আমার ফিরিস্তারা লুতের নিকট উপস্থিত হল, তখন সে তাদের ব্যাপারে চিন্তান্বিত হল এবং তাদের কারণে তার হৃদয় সঙ্কুচিত হয়ে গেল। আর বলল, 'আজকের দিনটি অতি কঠিন।' আর তার সম্প্রদায় তার কাছে ছুটে এল এবং তারা পূর্ব হতে কুকর্ম করেই আসছিল; লুত বলল, 'হে আমার সম্প্রদায়! (তোমাদের ঘরে) আমার (উম্মতী) এই কন্যারা রয়েছে, এরা তোমাদের জন্য পবিত্রতম। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে আমার মেহমানদের ব্যাপারে লাঞ্ছিত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কোন ভালো মানুষ নেই?' তারা বলল, 'তুমি নিশ্চয় জানো যে, তোমার এই কন্যাগুলিতে আমাদের কোন প্রয়োজন নেই, আর আমরা কী চাই, তাও তুমি অবশ্যই জানো।' সে বলল, 'হায়! যদি তোমাদের উপর আমার শক্তি থাকত, অথবা আমি কোন দৃঢ় স্তম্ভের (শক্তিশালী দলের) আশ্রয় নিতে পারতাম।' তারা বলল, 'হে লুত! আমরা তো তোমার প্রতিপালক প্রেরিত (ফিরিশতা), ওরা কখনই তোমার নিকট পৌঁছতে পারবে না। অতএব তুমি রাত্রির কোন এক ভাগে নিজের পরিবারবর্গকে নিয়ে (অন্যত্র) চলে যাও। তোমাদের কেউ যেন পিছনের দিকে ফিরেও না দেখে, কিন্তু তোমার স্ত্রী নয়, তার উপরেও ঐ (আযাব) আসবে, যা অন্যান্যদের উপরে আসবে। তাদের (শাস্তির) নির্ধারিত সময় হল প্রভাতকাল; প্রভাত কি নিকটবর্তী নয়?' অতঃপর যখন আমার হুকুম এসে পৌঁছল, তখন আমি ঐ ভূ-খন্ডের উপরিভাগকে নীচে ক'রে দিলাম এবং তার উপর ক্রমাগত ঝামা পাথর বর্ষণ করলাম। যা বিশেষরূপে চিহ্নিত করা ছিল তোমার প্রতিপালকের নিকট; আর ঐ (জনপদ) গুলি এই যালেমদের নিকট হতে বেশী দূরে নয়।" (হুদঃ ৭৭-৮৩)
সমকামী অভিশপ্ত। মহানবী বলেছেন,
((لَعَنَ اللَّهُ مَنْ عَمِلَ عَمَلَ قَوْمٍ لُوطٍ لَعَنَ اللَّهُ مَنْ عَمِلَ عَمَلَ قَوْمٍ لُوطٍ ثَلَاثًا.
"আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে অভিসম্পাত করুন, যে লুত জাতির কর্ম (সমকামিতা) করে।" এ কথা তিনি তিনবার বলেছেন। (আহমাদ ২৯১৩, নাসাঈর কুবরা ৭৩৩৭নং)
বরং কিয়ামতে মহান আল্লাহ এমন অপরাধীর দিকে তাকিয়েও দেখবেন না। আল্লাহর রসূল বলেন,
لَا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَى رَجُل أَتَى رَجُلاً أَوِ امْرَأَةً فِي الدُّبُر).
"আল্লাহ আয্যা অজাল্ল (কিয়ামতের দিন) সেই ব্যক্তির দিকে চেয়েও দেখবেন না, যে ব্যক্তি কোন পুরুষের মলদ্বারে অথবা কোন স্ত্রীর পায়খানা-দ্বারে সঙ্গম করে।" (তিরমিযী ১১৬৫, নাসাঈর কুবরা ৯০০১, ইবনে হিব্বান ৪৪১৮, সহীহুল জামে' ৭৮০১নং)
আর দুনিয়াতে রয়েছে তার কঠিনতম শাস্তি। মহানবী বলেছেন,
مَنْ وَجَدْتُمُوهُ يَعْمَلُ عَمَلَ قَوْمٍ لُوطٍ فَاقْتُلُوا الْفَاعِلَ وَالْمَفْعُولَ بِهِ ».
"তোমরা যে ব্যক্তিকে লুত নবীর উম্মতের মত সমকামে লিপ্ত পাবে, সে ব্যক্তি ও তার সহকর্মীকে হত্যা করে ফেলো।" (আহমাদ ২৭৩২, আবু দাউদ ৪৪৬৪, তিরমিযী ১৪৫৬, ইবনে মাজাহ ২৫৬১, বাইহাকী ১৭৪৭৫, সহীহুল জামে' ৬৫89নং)
হ্যাঁ, এমন নিকৃষ্ট শ্রেণীর বিকৃত যৌনাচারীর এমনই শাস্তি উপযুক্ত। যাতে অপরাধী এমন নোংরামির দিকে পা বাড়াতে ভয় করে এবং তাতে লিপ্ত হওয়ার পূর্বে ভাবতে গিয়ে যৌন উত্তেজনা স্তিমিত হয়ে যায়।
ইসলাম উক্ত অপরাধীর জন্য এমন দন্ডবিধি রেখেছে, যেহেতু অপরাধ খুবই জঘন্য। তার ফলে ব্যক্তি ও সমাজ-জীবনে মন্দ প্রভাব পড়ে।
এই অপরাধের ফলে নানা ব্যাধি সৃষ্টি হয়।
এই অপরাধের ফলে উভয় অপরাধীর নারীর প্রতি আকর্ষণ নষ্ট হয়ে যায়। আর তার ফলে বিবাহের মতো পবিত্র বন্ধন-ব্যবস্থা অচল হতে থাকে। অনেক সময় অনেকে বিবাহ করলেও বিকৃত যৌনাচারের ফলে স্ত্রী-সঙ্গমে ব্যর্থ হয়। আর তার ফলে মানব-বংশধারা বিঘ্নিত হয়।
বড় দুঃখের বিষয় যে, বর্তমানে এমন অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধি লাভ করছে এবং এমন নোংরামিকে অপরাধ বলে স্বীকার করা হচ্ছে না। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নামক যন্ত্রের সাহায্যে এমন 'হারাম'কে 'হালাল'-এ পরিণত করা হচ্ছে। এমন অপরাধীরা সামাজিক মর্যাদা লাভের জন্য নিজেদেরকে প্রকাশ ক'রে মিছিল-মিটিং করছে। গণতন্ত্রে তাদের অপরাধ তথা পুরুষে-পুরুষে ও নারীতে-নারীতে বিবাহ করার বৈধতা লাভ করছে। শুধু তাই নয়, প্রকাশ্যে কোন কোন রাষ্ট্রের পুরুষ রাষ্ট্রপ্রধান পুরুষকে বিবাহ করছে। তার মানে সে দেশের মানুষদের নিকট এটা কোন অপরাধ নয়। বলা বাহুল্য সে দেশের রাজার এই অবস্থা হলে তাকে নির্বাচনকারী প্রজাদের অবস্থা কী, তা অনুমেয়।
পশুগমনের দন্ডবিধিঃ
পশুবৎ বিকৃত যৌনাচারীর শাস্তি সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
مَنْ وَجَدْتُمُوهُ وَقَعَ عَلَى بَهِيمَةٍ فَاقْتُلُوهُ وَاقْتُلُوا الْبَهِيمَةَ مَعَهُ ..
"যে ব্যক্তিকে কোন পশু-সঙ্গমে লিপ্ত পাবে, সে ব্যক্তি ও সে পশুকে তোমরা হত্যা করে ফেলবে।" (তিরমিযী ১৪৫৫, ইবনে মাজাহ ২৫৬৪, হাকেম ৮০৪৯, বাইহাক্বী ১৭৪৯১, ১৭৪৯২, সহীহুল জামে' ৬৫৮৮নং)
চুরির দন্ডবিধিঃ
ইসলাম মানুষের সম্পদের হিফাযতের জন্য এই দন্ড বিধিবদ্ধ করেছে। হারাম ঘোষণা করেছে চুরিকে। মহানবী বলেছেন,
(( الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمُ ، لَا يَخُونُهُ ، وَلَا يَكْذِبُهُ ، وَلَا يَخْذُلُهُ ، كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ عِرْضُهُ وَمَالُهُ وَدَمُهُ ، التَّقْوى هاهنا ، بِحَسْبِ امْرِىءٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْتَقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِم )).
“মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, তাকে মিথ্যা বলবে না (বা মিথ্যাবাদী ভাববে না), তার সাহায্য না ক'রে তাকে অসহায় ছেড়ে দেবে না। এক মুসলিমের মর্যাদা, মাল ও খুন অপর মুসলিমের জন্য হারাম। আল্লাহভীতি এখানে (অন্তরে) রয়েছে। কোন মুসলমান ভাইকে তুচ্ছ মনে করাটাই একটি মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।” (তিরমিযী ১৯২৭নং)
কোন ঈমানদারের অভ্যাস চুরি করা হতে পারে না। কেন না রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
لا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَسْرِقُ السَّارِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ ..
"কোন ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে ব্যভিচার করতে পারে না। কোন চোর যখন চুরি করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে চুরি করতে পারে না এবং কোন মদ্যপায়ী যখন মদ্যপান করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে মদ্যপান করতে পারে না।" (বুখারী ২৪৭৫, মুসলিম ২১১নং, আসহাবে সুনান)
চোরের শাস্তির ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاء بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ }
“চোর এবং চোরনীর হাত কেটে ফেলো, এ তাদের কৃতকর্মের ফল এবং আল্লাহর তরফ হতে শাস্তি। বস্তুতঃ আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।” (মায়িদাহঃ ৩৮)
আর মহানবী বলেছেন,
لَعَنَ اللَّهُ السَّارِقَ يَسْرِقُ الْبَيْضَةَ فَتُقْطَعُ يَدُهُ وَيَسْرِقُ الْحَبْلَ فَتُقْطَعُ يَدُهُ ..
“আল্লাহ চোরকে অভিশপ্ত করুন; সে ডিম (অথবা হেলমেট) চুরি করে, ফলে তার হাত কাটা যায় এবং রশি চুরি করে, ফলে তার হাত কাটা যায়।” (বুখারী ৬৭৮৩, ৬৭৯৯, মুসলিম ৪৫০৩নং)
আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, মহানবী-এর যুগে (এক উচ্চবংশীয়া) মাখযুমী মহিলা লোকের কাছে জিনিস ধার নিত, অতঃপর তা অস্বীকার করত। এই শ্রেণীর চুরি করার ফলে ধরা পড়লে নবী তার হাত কাটার আদেশ দিলেন। তাকে নিয়ে তার আত্মীয়-স্বজন সহ কুরাইশ বংশের লোকেরা বড় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। (তার হাত যাতে কাটা না হয় সেই চেষ্টায়) তারা বলাবলি করল, 'ওর ব্যাপারে আল্লাহর রসূল-এর সঙ্গে কে কথা বলবে?' পরিশেষে তারা বলল, 'আল্লাহর রসূল-এর প্রিয়পাত্র উসামাহ বিন যায়দ ছাড়া আর কে (এ ব্যাপারে) তাঁর সাথে কথা বলার দুঃসাহস করবে?' সুতরাং (তাদের অনুরোধ মতে) উসামাহ তাঁর সাথে কথা বললেন (এবং ঐ মহিলার হাত যাতে কাটা না যায় সে ব্যাপারে সুপারিশ করলেন)। এর ফলে আল্লাহর রসূল বললেন, “হে উসামাহ! তুমি কি আল্লাহর দন্ডবিধিসমূহের এক দন্ডবিধি (কায়েম না হওয়ার) ব্যাপারে সুপারিশ করছ?!" অতঃপর তিনি দন্ডায়মান হয়ে ভাষণে বললেন,
أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ وَإِذَا سَرَقَ فيهم الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ وَايْمُ اللهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا ..
"তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতরা এ জন্যই ধ্বংস হয়েছিল যে, তাদের মধ্যে কোন উচ্চবংশীয় (বা ধনী) লোক চুরি করলে তারা তাকে (দন্ড না দিয়ে) ছেড়ে দিত। আর কোন (নিম্নবংশীয়, গরীব বা) দুর্বল লোক চুরি করলে তারা তার উপর দন্ডবিধি প্রয়োগ করত। পক্ষান্তরে আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমা যদি চুরি করত, তাহলে আমি তারও হাত কেটে দিতাম।" (বুখারী ৩৪৭৫, ৬৭৮৮, মুসলিম ৪৫০৫-৪৫০৭নং, আসহাবে সুনান)
মানবাধিকারের ঠিকেদাররা হাল্লা করে, এ শাস্তিতে নাকি মানবাধিকার লংঘন হয়। তা মেনে নিলেও তারা বলুক যে, কয়েকটা মানবাধিকার লংঘন ক'রে দেশে কত শত মানবাধিকার রক্ষা করা যায়। তারা তথাকথিত মানবিধকার রক্ষাকারীর দেশের সাথে সেই দেশের তুলনা ক'রে দেখুক, যে দেশে চোরের এ শাস্তি প্রচলিত আছে। তাহলেই বুঝতে পারবে মহান সৃষ্টিকর্তার আইন ও তাদের কল্পনাপ্রসূত আইনের মাঝে কত পার্থক্য, কত তারতম্য!
পরম্ভ সে শাস্তি প্রয়োগ করতেও বিচারকগণকে বিলকুল নিঃসন্দেহ হতে হয়। নচেৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামান্য সন্দেহের কারণে নির্ধারিত কোন দন্ডবিধিই প্রয়োগ করা হয় না, যেমন সে কথা পূর্বেও আলোচিত হয়েছে।
রাহাজানি প্রভৃতির দন্ডবিধিঃ
সশস্ত্র ডাকাতি, লুঠতরাজ, রাহাজানি, ধর্ষণ, স্মাগলিং প্রভৃতির শাস্তির ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّمَا جَزَاء الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ } (۳۳) سورة المائدة
"যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করে (অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়) তাদের শাস্তি এই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা বিপরীত দিক হতে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ হতে নির্বাসিত করা হবে। ইহকালে এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও পরকালে তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে।" (মায়িদাহঃ ৩৩)
নিঃসন্দেহে এ কাজ কোন মুসলিম করতে পারে না। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السَّلَاحَ فَلَيْسَ مِنَّا )
"সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমাদের উপর অস্ত্র তোলে। (মুসলিম ৭৫নং)
মদ্যপানের শাস্তিঃ
মদ ও মাদকদ্রব্য সেবন একটি সামাজিক অপরাধ। বৈয়াক্তিক, সাংসারিক ও সামাজিক জীবনে সে অপরাধের অপকারিতা কারো অবিদিত নয়। মদ একাধিক অপরাধ আকর্ষণ করে। তাই ইসলামে মদ হারাম। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (۹۰) إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ} (۹۱) سورة المائدة
"হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাযে বাধা দিতে চায়! অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না? (মায়িদাহঃ ৯০-৯১)
মদ বহু পাপের ছিদ্রপথ। বহু অপরাধের চাবিকাঠি। মহানবী বলেছেন,
الْخَمْرُ أُمُّ الْفَوَاحِشَ وَأَكْبَرُ الْكَبَائِرِ مَنْ شَرِبَهَا وَقَعَ عَلَى أُمِّهِ وَخَالَتِهِ وَعَمَّتِهِ)).
"মদ হল যাবতীয় অশ্লীলতার প্রধান এবং সবচেয়ে বড় পাপ। যে ব্যক্তি তা পান করল, সে যেন নিজ মা, খালা ও ফুফুর সাথে ব্যভিচার করল!" (ত্বাবারানী, সঃ জামে' ৩৩৪৫নং)
لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ شَيْئًا ، وَإِنْ قُطِّعْتَ وَحُرِّقْتَ ، وَلَا تَتْرُكْ صَلَاةً مَكْتُوبَةً مُتَعَمِّدًا ، فَمَنْ تَرَكَهَا مُتَعَمِّدًا ، فَقَدْ بَرِئَتْ مِنْهُ الدَّمَّةُ ، وَلَا تَشْرَبْ الْخَمْرَ ، فَإِنَّهَا مِفْتَاحُ كُلِّ شَ).
"তুমি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না---যদিও (এ ব্যাপারে) তোমাকে হত্যা করা হয় অথবা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ইচ্ছাকৃত ফরয নামায ত্যাগ করো না। কারণ যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নামায ত্যাগ করে, তার উপর থেকে (আল্লাহর) দায়িত্ব উঠে যায়। আর মদ পান করো না, কারণ মদ হল প্রত্যেক অমঙ্গলের (পাপাচারের) চাবিকাঠি।" (ইবনে মাজাহ ৪০৩৪, সহীহ ইবনে মাজাহ ৩২৫৯নং)
এই জন্য কোন মু'মিন মদপান করতে পারে না। ঈমানের সাথে মদের সখ্য হতে পারে না। মহানবী বলেছেন,
لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَسْرِقُ السَّارِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ ..
"কোন ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে ব্যভিচার করতে পারে না। কোন চোর যখন চুরি করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে চুরি করতে পারে না এবং কোন মদ্যপায়ী যখন মদ্যপান করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে মদ্যপান করতে পারে না।" (বুখারী ২৪৭৫, মুসলিম ২১১নং, আসহাবে সুনান)
মদ্যপায়ী অভিশপ্ত। অভিশপ্ত মদের সাথে যুক্ত সকল ব্যক্তিবর্গ। আনাস বিন মালেক বলেছেন, "মদের সাথে সম্পৃক্ত দশ প্রকার মানুষের উপর রাসূলুল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন। তার প্রস্তুরকারীর উপর, যে প্রস্তুত করায় তার উপর, তার পানকারীর উপর, যে তা বয়ে নিয়ে যায় তার উপর, যার জন্য বয়ে নিয়ে যায় তার উপর, যে পান করায় তার উপর, যে তা বিক্রি করে তার উপর, যে (বিক্রি ক'রে) তার অর্থ খায় তার উপর এবং যে ক্রয় করে ও যার জন্য ক্রয় করা হয় তাদের উপর।" (সুনানে তিরমিযী ১২৯৫, ইবনে মাজাহ ৩৩৮১, ত্বাবারানীর আওসাত্ব ১৩৫৫নং)
মদ এমন একটি অখাদ্য, যা পেটে গেলে ৪০ দিন নামায কবুল হয় না। মদ পেটে থাকা অবস্থায় মারা গেলে মুসলিমের মরণ মরবে না মদ্যপায়ী। মহানবী বলেছেন,
الْخَمْرُ أُمُّ الْخَبَائِثِ ، فَمَنْ شَرِبَهَا لَمْ تُقْبَلْ مِنْهُ صَلَاتُهُ أَرْبَعِينَ يَوْمًا، فَإِنْ مَاتَ وَهِيَ فِي بَطْنِهِ مَاتَ مَيْتَةً جَاهِلِيَّةً)).
"মদ যাবতীয় নোংরামির মূল। যে কেউ তা পান করবে, তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। (যে ব্যক্তি তার মূত্রথলিতে ঐ মদের কিছু পরিমাণ রাখা অবস্থায় মারা যাবে, তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যাবে) এবং যে কেউ তা নিজ পেটে রেখে মারা যাবে, সে জাহেলী যুগের মরণ মরবে।" (ত্বাবারানী ১৫৪৩, দারাকুত্বনী ৪/২৪৭, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৬৯৫নং)
মদ্যপায়ীর মরণ হবে জাহেলী যুগের ইসলাম-বহির্ভূত মরণ, মুশরিক পৌত্তলিকের মরণ। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
((مَنْ مَاتَ مُدْمِنَ خَمْرٍ لَقِيَ اللَّهَ كَعَابِدِ وَثَن)).
“যে ব্যক্তি মদ্যপানে অভ্যাস থাকা অবস্থায় মারা যাবে, সে ব্যক্তি মূর্তিপূজকের মতো (পাপী) হয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে।” (ত্বাবারানীর কাবীর ১২২৫৮, সিলসিলাহ সহীহাহ ৬৭৭নং)
বেহেস্তীরা বেহেশতে পবিত্র মদ পান করবে। কিন্তু কেউ দুনিয়াতে অপবিত্র ও হারাম মদ পান করলে তাকে আখেরাতে সেই পবিত্র মদ্যপানে বঞ্চিত করা হবে। মহানবী বলেছেন,
كُلُّ مُسْكِرِ خَمْرٌ وَكُلُّ مُسْكِرِ حَرَامٌ وَمَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ فِي الدُّنْيَا فَمَاتَ وَهُوَ يُدْمِنُهَا لَمْ يَشْرَبْهَا فِي الْآخِرَةِ ».
"প্রত্যেক প্রমত্ততা (জ্ঞানশূন্যতা) আনয়নকারী বস্তুই হল মদ এবং প্রত্যেক প্রমত্ততা আনয়নকারী বস্তুই হল হারাম। আর যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মদ পান করতে করতে তাতে অভ্যাসী হয়ে মারা যায়, সে ব্যক্তি আখেরাতে (জান্নাতে পবিত্র) মদ পান করতে পাবে না।" (বেহেস্তে যেতে পারবে না।) (বুখারী ৫৫৭৫, মুসলিম ৫৩৩৬নং)
তার মানে সে জান্নাতই প্রবেশ করতে পারবে না। যার নামায থাকবে না, সে কি জান্নাতী হবে? মহানবী বলেছেন,
مَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً أَرْبَعِينَ صَبَاحًا فَإِنْ تَابَ تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ فَإِنْ عَادَ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً أَرْبَعِينَ صَبَاحًا فَإِنْ تَابَ تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ فَإِنْ عَادَ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً أَرْبَعِينَ صَبَاحًا فَإِنْ تَابَ تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ فَإِنْ عَادَ الرَّابِعَةَ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً أَرْبَعِينَ صَبَاحًا فَإِنْ تَابَ لَمْ يَتُبِ اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَقَاهُ مِنْ نَهْرِ الْخَبَالِ)). قِيلَ يَا أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ وَمَا تَهْرُ الْخَبَالِ؟ قَالَ نَهْرٌ مِنْ صَدِيدِ أَهْلِ النَّارِ.
“যে ব্যক্তি মদ পান করবে, সে ব্যক্তির ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। কিন্তু এরপর যদি সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করে নেবেন। অন্যথা যদি সে পুনরায় পান করে, তাহলে অনুরূপ তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। যদি এর পরেও সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করে নেবেন। অন্যথা যদি সে তৃতীয়বার পান করে, তাহলে অনুরূপ তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। কিন্তু এর পরেও যদি সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করে নেবেন। অন্যথা যদি সে চতুর্থবার তা পান করে, তাহলে অনুরূপ তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। কিন্তু এরপরে সে যদি তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন না, তিনি তার প্রতি ক্রোধান্বিত হন এবং (পরকালে) তাকে 'খাবাল নদী' থেকে পানীয় পান করাবেন।"
ইবনে উমার-কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'হে আবু আব্দুর রহমান! 'খাবাল-নদী' কী?' উত্তরে তিনি বললেন, 'তা হল জাহান্নামবাসীদের পুঁজ দ্বারা প্রবাহিত (জাহান্নামের) এক নদী।' (তিরমিযী ১৮৬২, হাকেম ৪/১৪৬, নাসাঈ, সহীহুল জামে' ৬৩১২-৬৩১৩নং)
মহানবী আরও বলেছেন,
وَثَلاثَةٌ لا يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ العاقُ لِوَالِدَيْهِ والمُدْمِنُ الخَمْرَ والمَنَّانُ بِما أَعْطَى)).
"---আর তিন ব্যক্তি বেহেশে যাবে না; পিতা-মাতার নাফরমান ছেলে, মদপানে অভ্যাসী মাতাল এবং দান করার পর যে বলে ও গর্ব করে বেড়ায় এমন খোঁটাদানকারী ব্যক্তি।" (আহমাদ ৬১৮০, নাসাঈর কুবরা ২৩৪৩, হাকেম ২৫৬২, সহীহুল জামে' ৩০৭১নং)
মদপানের দন্ড হল ৪০ চাবুক। ব্যক্তি বিশেষের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে ৮০ চাবুকও লাগানো যায়। আবার কখনো কেবল হাত, জুতা বা কাপড়ের আঘাত দিয়েও শাস্তি দেওয়া যায়। আর তা হবে পরিস্থিতি অনুসারে বিচারকের বিচার-নির্ভর।
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, মদ পান করেছে এমন এক ব্যক্তিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হাজির করা হল। তিনি আদেশ দিলেন, 'ওকে তোমরা মারো।' আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, (তাঁর আদেশ অনুযায়ী আমরা তাকে মারতে আরম্ভ করলাম।) আমাদের কেউ তাকে হাত দ্বারা মারতে লাগল, কেউ আপন জুতা দ্বারা, কেউ নিজ কাপড় দ্বারা। অতঃপর যখন সে ফিরে যেতে লাগল, তখন কিছু লোক বলে উঠল, 'আল্লাহ তোমাকে লাঞ্ছিত করুক।' তা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
لا تَقُولُوا هَذَا ، لَا تُعِينُوا عَلَيْهِ الشَّيْطَانِ)).
"এরূপ বলো না এবং ওর বিরুদ্ধে শয়তানকে সহযোগিতা করো না।" (বুখারী ৬৭৭৭নং)
যাদু করার শাস্তিঃ
যাদু সত্য এবং তার দ্বারা মানুষের ক্ষতি করা হয়। যাদু এক প্রকার শির্কও। তা একটি সর্বনাশী অপরাধ। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ ... قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا هُنَّ قَالَ : الشَّرْكُ بِاللَّهِ وَالسِّحْرُ وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ وَأَكْلُ الرِّبَا وَالتَّوَلَّى يَوْمَ الزَّحْفِ وَقَدْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ ..
"সাতটি সর্বনাশী কর্ম হতে দূরে থাক।" সকলে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! তা কী কী?' তিনি বললেন, "আল্লাহর সাথে শির্ক করা, যাদু করা, ন্যায় সঙ্গত অধিকার ছাড়া আল্লাহ যে প্রাণ হত্যা করা হারাম করেছেন তা হত্যা করা, সূদ খাওয়া, এতীমের মাল ভক্ষণ করা, (যুদ্ধক্ষেত্র হতে) যুদ্ধের দিন পলায়ন করা এবং সতী উদাসীনা মুমিনা নারীর চরিত্রে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া।" (বুখারী ২৭৬৬, ৬৮৫৭, মুসলিম ২৭২নং, আবু দাউদ, নাসাঈ)
তাই যাদুকরের শাস্তি হল, তরবারি দ্বারা শিরশ্ছেদ। (দ্রঃ সিঃ যয়ীফাহ ১৪৪৬নং)
📄 যে অপরাধের শাস্তি অপরাধের মতোই : খুনের বদলে খুন
ইসলাম মানুষকে পৃথিবীতে বাঁচার অধিকার দিয়েছে। মহান আল্লাহ তাকে ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাই তিনি পরস্পরকে হত্যা বা আত্মহত্যা করতে নিষেধ করেছেন। মানুষের প্রাণের প্রতি গুরুত্বারোপ ক'রে তিনি বলেছেন,
{مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعاً وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعاً} [المائدة : ٣٢]
অর্থাৎ, এ কারণেই বনী ইস্রাঈলের প্রতি এ বিধান দিলাম যে, যে ব্যক্তি নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করার দন্ডদান উদ্দেশ্য ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষকেই হত্যা করল। আর কেউ কারো প্রাণরক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করল। (মায়েদাহঃ ৩২)
মানুষ খুন করা একটা সর্বনাশী কর্ম। খুন করাকে মহা অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে ইসলামে। নানাভাবে সে কথা বলা হয়েছে হাদীসে। মহানবী বলেছেন,
((لَزَوَالُ الدُّنْيَا ، أَهْوَنُ عِنْدَ اللَّهِ ، مِنْ قَتْلِ رَجُلٍ مُسْلِمٍ)).
"একজন মুসলিমকে খুন করার চাইতে জগৎ ধ্বংস হয়ে যাওয়া আল্লাহর নিকট অধিক সহজ।" (তিরমিযী ১৩৯৫, নাসাঈ ৩৯৮৭নং)
((كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ : دَمُهُ وَعِرْضُهُ وَمَالُهُ )) . رواه مسلم
"প্রত্যেক মুসলিমের রক্ত, সম্ভ্রম ও ধন-সম্পদ অন্য মুসলিমের উপর হারাম।" (মুসলিম ৬৭০৬নং)
((سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ ، وَقِتَالُهُ كُفْرٌ)). متفق عَلَيْهِ
"মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেকী (আল্লাহর অবাধ্যাচরণ) এবং তার সাথে লড়াই করা কুফরী।" (বুখারী ৪৮, ৬০৪৪, মুসলিম ২৩০নং, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)
((لَنْ يَزَالَ الْمُؤْمِنُ فِي فُسْحَةٍ مِنْ دِينِهِ مَا لَمْ يُصِبْ دَمًا حَرَامًا.
"মু'মিন ব্যক্তি তার দ্বীনের প্রশস্ততায় থাকে; যতক্ষণ না সে অবৈধ রক্তপাতে লিপ্ত হয়।" (আহমাদ ৫৬৮১, বুখারী ৬৮৬২নং)
(( أَوَّلُ مَا يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ يَوْمَ القِيَامَةِ فِي الدِّمَاء )) . متفق عليه
"কিয়ামতের দিন (মানবিক অধিকারের বিষয়) সর্বপ্রথমে লোকেদের মধ্যে যে বিচার করা হবে তা রক্ত সম্পর্কিত হবে।" (বুখারী ৬৮৬৪, মুসলিম ৪৪৭৫নং)
يَجِيءُ الْمَقْتُولُ بِالْقَاتِلِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ نَاصِيَتُهُ وَرَأْسُهُ بِيَدِهِ وَأَوْدَاجُهُ تَشْخُبُ دَمًا يَقُولُ يَا رَبِّ هَذَا قَتَلَنِي حَتَّى يُدْنِيَهُ مِنَ الْعَرْشِ)).
"কিয়ামতের দিন খুন হয়ে নিহত ব্যক্তি তার খুনীকে তার মাথা ও কপালের চুল ধরে উপস্থিত করবে। আর সে সময় তার শিরাগুলো থেকে রক্তের ফিনকি ছুটবে। সে বলবে, 'হে আমার প্রতিপালক! আপনি একে জিজ্ঞাসা করুন, ও কেন আমাকে খুন করেছে?' পরিশেষে সে তাকে আরশের নিকটবর্তী করবে।" (তিরমিযী ৩০২৯, নাসাঈ ৪০০৫, ইবনে মাজাহ ২৬২১, সহীহুল জামে' ৮০৩১নং)
( إِذا التَّقَى المُسلِمَانِ بِسَيْفَيهِمَا فَالقَاتِلُ وَالمَقْتُولُ فِي النَّار (( قُلْتُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ! هذا القَاتِلُ فَمَا بَالُ المَقْتُول ؟ قَالَ : (( إِنَّهُ كَانَ حَريصاً عَلَى قتل صَاحِبِهِ )). مُتَّفَقٌ عليه.
"যখন দু'জন মুসলমান তরবারি নিয়ে আপোসে লড়াই করে, তখন হত্যাকারী ও নিহত দু'জনই দোযখে যাবে।" আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! হত্যাকারীর দোযখে যাওয়া তো স্পষ্ট; কিন্তু নিহত ব্যক্তির ব্যাপার কী?' তিনি বললেন, "সেও তার সঙ্গীকে হত্যা করার জন্য লালায়িত ছিল।" (বুখারী ৩১, ৬৮৭৫, মুসলিম ৭৪৩৪নং)
كُلُّ ذَنْبٍ عَسَى اللَّهُ أَنْ يَغْفِرَهُ إِلَّا مَنْ مَاتَ مُشْركًا أَوْ مُؤْمِنٌ قَتَلَ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا ..
"যে ব্যক্তি মুশরিক হয়ে মারা যায় অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করে, সে ব্যক্তির পাপ ছাড়া অন্যান্য ব্যক্তির পাপকে আল্লাহ মাফ ক'রে দিতে পারেন।" (আহমাদ ১৬৯০৭, নাসাঈ ৩৯৮৪, হাকেম ৮০৩১-৮০৩২, আবু দাউদ ৪২৭২নং আবু দারদা হতে, সহীহুল জামে' ৪৫২৪নং)
আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا } (۹۳) سورة النساء
"যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন বিশ্বাসীকে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম। সেখানে সে চিরকাল থাকবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে অভিসম্পাত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত ক'রে রাখবেন।" (নিসাঃ ৯৩)
কেবল মুসলিমই নয়, অমুসলিমকেও হত্যা করলে পরিত্রাণ পাবে না হত্যাকারী। মহানবী বলেছেন,
((مَنْ قَتَلَ نَفْسًا مُعَاهَدًا لَمْ يَرِحْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ أَرْبَعِينَ عاما)).
"যে ব্যক্তি কোন (মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসকারী) যিম্মী (অথবা সন্ধিচুক্তির পর বিপক্ষের কাউকে) হত্যা করবে, সে ব্যক্তি বেহেশ্বের সুবাসও পাবে না। অথচ তার সুবাস ৪০ বছরে অতিক্রম্য দূরবর্তী স্থান হতে পাওয়া যাবে।" (বুখারী ৩১৬৬, ৬৯১৪, ইবনে মাজাহ ২৬৮৬নং)
হত্যার প্রকারভেদঃ
সাধারণতঃ হত্যা ৩ প্রকার হয়ে থাকে।
এক: ইচ্ছাকৃত হত্যা।
ইচ্ছা করেই এমন জিনিসের মাধ্যমে মেরে ফেলা, যার মাধ্যমে সাধারণতঃ হত্যা করা যায়। আর এ হত্যায় অপরাধী হয় ৩টি শর্তেঃ-
(ক) জ্ঞানসম্পন্ন সাবালক স্বেচ্ছায় হত্যায় করবে।
(খ) যার রক্তপাত বৈধ নয়, এমন কোন মানুষকে হত্যা করবে।
(গ) এমন জিনিস বা মাধ্যম প্রয়োগ ক’রে হত্যা করবে, যা দিয়ে সাধারণতঃ হত্যা করা যায়।
এতে আছে মহাপাপ। এতে আছে ক্বিস্বাস (খুনের বদলে খুন)। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ والأُنثَى بالأُنثَى فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتَّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءِ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ ذَلِكَ تَخْفِيفٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ فَمَنِ اعْتَدَى بَعْدَ ذَلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ} (۱۷۸) سورة البقرة
“হে বিশ্বাসিগণ! নরহত্যার ব্যাপারে তোমাদের জন্য ক্বিস্বাসের (প্রতিশোধ গ্রহণের বিধান) বিধিবদ্ধ করা হল; স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস ও নারীর বদলে নারী। কিন্তু তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কিছুটা ক্ষমা প্রদর্শন করা হলে, প্রচলিত প্রথার অনুসরণ করা ও সদয়ভাবে তার দেয় পরিশোধ করা উচিত। এ তো তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ভার লাঘব ও অনুগ্রহ। এর পরও যে সীমালংঘন করে, তার জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে।” (বাক্বারাহঃ ১৭৮)
জাহেলিয়াতের যুগে কোন আইন-কানুন ছিল না, তাই সবল গোত্রগুলো দুর্বল গোত্রগুলোর উপর যেভাবে চাইতো যুলুম-অত্যাচার করত। তাদের যুলুমের একটি প্রকার এ রকম ছিল যে, যদি সবল গোত্রের কোন পুরুষ হত্যা হয়ে যেত, তাহলে তারা কেবল হত্যাকারীকে হত্যা করার পরিবর্তে তার (হত্যাকারীর) পরিবারের কয়েকজনকে এমন কি কখনো কখনো পুরো গোত্রকে বিনাশ করার প্রচেষ্টা করত এবং মহিলার পরিবর্তে পুরুষকে ও ক্রীতদাসের পরিবর্তে স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করত। মহান আল্লাহ এই ভেদাভেদ উচ্ছেদ ক’রে বললেন, যে হত্যা করবে, ক্বিসাসে (প্রতিশোধ গ্রহণে) কেবল তাকেই হত্যা করা হবে। হত্যাকারী স্বাধীন ব্যক্তি হলে, বদলায় ঐ স্বাধীন ব্যক্তিকেই, ক্রীতদাস হলে, ঐ ক্রীতদাসকেই এবং মহিলা হলে, ঐ মহিলাকেই হত্যা করা হবে। ক্রীতদাসের পরিবর্তে স্বাধীন ব্যক্তিকে, মহিলার পরিবর্তে পুরুষকে অথবা একজন পুরুষের পরিবর্তে কয়েকজন পুরুষকে হত্যা করা যাবে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, পুরুষ যদি মহিলাকে হত্যা করে, তাহলে ক্বিস্বাসে কোন মহিলাকে হত্যা করা হবে অথবা মহিলা যদি পুরুষকে হত্যা করে, তবে ক্বিস্বাসে কোন পুরুষকে হত্যা করা হবে (যেমন শব্দের বাহ্যিক ভাবার্থ থেকে এটাই ফুটে উঠছে)। বরং শব্দগুলো আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ অনুপাতে সন্নিবিষ্ট হয়েছে; যার পরিষ্কার অর্থ (লক্ষ্যার্থ) হল, ক্বিস্বাসে হত্যাকারীকেই হত্যা করা হবে। তাতে সে পুরুষ হোক অথবা মহিলা, সবল হোক কিংবা দুর্বল। হাদীসে এসেছে, "সমস্ত মুসলিমের রক্ত (পুরুষ হোক বা মহিলা) সমান।" (আবু দাউদ ২৭৫১)
সুতরাং, আয়াতের অর্থ হল তা-ই, যা অন্য আয়াতে এসেছে,
{وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالأنف بالأنف والأذن بالأذن وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصِ فَمَن تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَّهُ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ} (٤٥) سورة المائدة
"তাদের জন্য ওতে (তওরাতে) বিধান দিয়েছিলাম যে, প্রাণের বদল প্রাণ, চোখের বদল চোখ, নাকের বদল নাক, কানের বদল কান, দাঁতের বদল দাঁত এবং জখমের বদল অনুরূপ জখম। অতঃপর কেউ তা ক্ষমা করলে ওতে তারই পাপ মোচন হবে। আর আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই অত্যাচারী।" (মায়িদাহঃ ৪৫)
উক্ত আয়াতটিতে আহলে কিতাবের কিতাবে উল্লিখিত বিধানের কথা বলা হয়েছে। তা কি মুসলিমদের জন্য মান্য? উসূল (ফিক্বহী মৌলনীতির) উলামাগণ লিখেছেন যে, বিগত শরীয়তের বিধান যদি আল্লাহ অব্যাহত রাখেন, তাহলে তার উপর আমল করা আমাদের জন্যও জরুরী। আর উক্ত আয়াতের বিধান রহিত হয়নি। সুতরাং এটাই ইসলামী শরীয়তের একটা বিধান, যা হাদীস থেকেও প্রমাণিত।
হানাফী উলামাগণ উক্ত আয়াত থেকে সাব্যস্ত করেছেন যে, মুসলিমকে কাফেরের ক্বিস্বাসে হত্যা করা যাবে। কিন্তু অধিকাংশ আলেমগণ এ কথার সমর্থন করেননি। কেননা, হাদীস দ্বারা أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ জানের বদলে জানের ব্যাপক বিধান থেকে দুটি অবস্থা বহির্ভূত:-
(ক) যদি কোন মুসলিম কোন কাফেরকে হত্যা ক'রে ফেলে, তাহলে কাফেরের পরিবর্তে মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না। কারণ, হাদীসে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, "মুসলিমকে কাফেরের ক্বিস্বাসে হত্যা করা যাবে না।" (বুখারী ১১১নং, ফাতহুল ক্বাদীর)
(খ) অনুরূপভাবে কোন স্বাধীন ব্যক্তি যদি কোন ক্রীতদাসকে হত্যা ক'রে ফেলে, তাহলে তাকে তার পরিবর্তে হত্যা করা যাবে না। (বিস্তারিত দেখুনঃ ফাতহুল বারী, নায়নুল আওতার ইত্যাদি)
এ আইনে ইতর-ভদ্রের সমানাধিকার নেই। রয়েছে প্রত্যেক মানুষের তার যথার্থ মর্যাদা। আর এটাই প্রকৃত ন্যায়পরায়ণতা।
কোন কারণবশতঃ একটি প্রাণ নষ্ট হয়েছে, তাহলে তার বদলে আরও একটি প্রাণ নষ্ট করায় কি মানবাধিকার লংঘন হয় না? এর উত্তরে মহান আল্লাহ জ্ঞানীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন,
{وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ يَا أُولِي الأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ} (۱۷۹) سورة البقرة
"হে বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! তোমাদের জন্য ক্বিস্বাসে (প্রতিশোধ গ্রহণের বিধানে) জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা সাবধান হতে পার।" (বাক্বারাহঃ ১৭৯)
জীবন নষ্ট করাতে কীভাবে জীবন রয়েছে?
যখন হত্যাকারীর এই ভয় হবে যে, আমাকেও ক্বিস্বাসে হত্যা করা হবে, তখন সে কাউকে হত্যা করতে সাহস পাবে না। আর তার ফলে মানুষ জীবন লাভ করবে এবং মানবের প্রকৃত অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে।
তদনুরূপ ক্বিস্বাসে খুনীকে খুন করা হলে নিহত ব্যক্তির পরিবারের লোকেরা মানসিক শান্তি পাবে এবং প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবল ইচ্ছা তাদের শোকাহত মন থেকে দূর হয়ে যাবে। নচেৎ এমন হতে পারে যে, প্রতিশোধ নিতে গিয়ে একটার জায়গায় দুটো অথবা খুনীর জায়গায় তার কোন নিরপরাধ আত্মীয়কে খুন করা হতে পারে। ফলে তারাও পাল্টা প্রতিশোধ নিতে আবারও খুন করতে বদ্ধপরিকর হতে পারে। আর এইভাবে খুনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকতে পারে। কিন্তু 'ক্বিস্বাস'-এর আইন সেই ধারাবাহিকতা প্রতিহত করে এবং মানুষকে একটার জায়গায় বহু খুন থেকে জীবন দান করে।
যে সমাজে ক্বিস্বাসের আইন বলবৎ থাকে, সে সমাজে এ (কিস্বাসে হত্যা হওয়ার) ভয় সমাজকে হত্যা ও খুনোখুনি থেকে সুরক্ষিত রাখে এবং এরই ফলে সমাজে নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আর এর (বাস্তব) দৃশ্য আজও সৌদী আরবে লক্ষ্য করা যেতে পারে, যেখানে---আলহামদু লিল্লাহ---ইসলামী দন্ড-বিধির কার্যকারিতার বরকতসমূহ বিদ্যমান রয়েছে। যদি অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলিও ইসলামী দন্ড-বিধি কার্যকরী ক'রে জনসাধারণের জন্য শান্তিময় জীবন-যাপনের সুব্যবস্থা করতে পারত, তাহলে কতই না ভাল হত! (আহসানুল বায়ান)
নিহত ব্যক্তির ওয়ারেসগণ খুনীকে ক্ষমা ক'রে রক্তপণ নিতে পারে। তা আদায় করতে হবে অপরাধীর মাল থেকে। আর এ ক্ষেত্রে তাকে কাফফারাও আদায় করতে হবে।
ক্ষমা ক'রে দেওয়ার দু'টি পদ্ধতি। যথাঃ-
(ক) মালের কোন বিনিময় গ্রহণ ছাড়াই কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ক্ষমা ক'রে দেওয়া।
(খ) ক্বিসাসের পরিবর্তে মুক্তিপণ গ্রহণ করা।
দ্বিতীয় পদ্ধতি অবলম্বন করলে মুক্তিপণের দাবীদারকে বলা হয়েছে যে, সে যেন প্রচলিত নিয়মের অনুসরণ করে। আর وَادَاءُ إِلَيْهِ بِإِحْسَان[ এ হত্যাকারীকে বলা হচ্ছে যে, সে যেন কোন সংকীর্ণতা সৃষ্টি না ক'রে বিনিময় ভালভাবে আদায় ক'রে দেয়। হতের আত্মীয়রা তার প্রাণ না নিয়ে তার উপর যে অনুগ্রহ করল, তার বদলাও অনুগ্রহের সাথে হওয়া দরকার। هَلْ جَزَاءُ الْإِحْسَانِ إِلَّا الْإِحْسَانُ] (الرحمن : ٦٠)
"উত্তম কাজের জন্য উত্তম বিনিময় ব্যতীত আর কী হতে পারে?" (রাহমানঃ ৬০)
মহান আল্লাহ বলেছেন, এই লাঘব এবং অনুগ্রহ (অর্থাৎ, ক্বিস্বাস, ক্ষমা অথবা মুক্তিপণ গ্রহণ এই তিনটি পদ্ধতিই) আল্লাহর পক্ষ থেকে খাস তোমাদের জন্যই। ইতিপূর্বে তাওরাতধারীদের জন্য কেবল ক্বিস্বাস ও ক্ষমা ছিল। মুক্তিপণ ছিল না। আর ইঞ্জীলধারীদের মাঝে কেবল ক্ষমা ছিল; ক্বিস্বাস ছিল না এবং মুক্তিপণও না। (ইবনে কাষীর)
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, "এর পরও যে সীমালংঘন করে, তার জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে।" অর্থাৎ, মুক্তিপণ গ্রহণ করার পর যদি আবার হত্যাকারীকে হত্যা করা হয়, তাহলে তা সীমালংঘন ও বাড়াবাড়ি হবে এবং এর শাস্তি তাকে দুনিয়াতেও ভোগ করতে হবে এবং আখেরাতেও।
ইচ্ছাকৃত খুনের বিধানে আরো একটি ধারা হল, যাকে খুন করা হয়, খুনী যদি তার ওয়ারেস হয়, তাহলে সে মীরাস থেকে বঞ্চিত হবে।
দুইঃ প্রায় ইচ্ছাকৃত হত্যা।
এতে মেরে ফেলার ইচ্ছা থাকে না এবং এমন কিছু দিয়ে ইচ্ছাকৃত আঘাত করা, যার দ্বারা সাধারণতঃ হত্যা করা যায় না। এতে ক্বিস্বাস নেই। রক্তপণ আছে। তা আদায় করতে হবে অপরাধীর (আস্বাবা) ওয়ারেসদেরকে। এতে পাপ আছে। তওবা করতে হবে।
তিনঃ অনিচ্ছাকৃত হত্যা।
তাতে মারার কোন ইচ্ছাই থাকে না। কিন্তু ভুল ক'রে তার হাতে হত্যাকান্ড ঘটে যায় অথবা কোনভাবে সে হত্যার কারণ প্রতিপন্ন হয়। এতে ক্বিস্বাস নেই; আছে রক্তপণ। আদায় করতে হবে তার (আস্বাবা) ওয়ারেসদেরকে। আছে কাফফারা। এতে পাপ হয় না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَا كَانَ لِمُؤْمِن أَن يَقْتُلَ مُؤْمِنًا إِلَّا خَطَئًا وَمَن قَتَلَ مُؤْمِنًا خَطَنًا فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ وَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ إِلَّا أَن يَصَّدَّقُوا فَإِن كَانَ مِن قَوْمٍ عَدُوٌّ لَّكُمْ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ وَإِن كَانَ مِن قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ مِّيثَاقٌ فَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ وَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةً فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ تَوْبَةً مِّنَ اللَّهِ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا }
"কোন বিশ্বাসীকে হত্যা করা কোন বিশ্বাসীর জন্য সংগত নয়, তবে ভুলবশতঃ হত্যা ক'রে ফেললে সে কথা স্বতন্ত্র। কেউ কোন বিশ্বাসীকে ভুলবশতঃ হত্যা করলে এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা এবং তার (নিহতের) পরিজনবর্গকে রক্তপণ অর্পণ করা বিধেয়। তবে যদি তারা ক্ষমা ক'রে দেয়, তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু যদি সে তোমাদের শত্রু পক্ষের লোক হয় এবং বিশ্বাসী হয়, তবে এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা বিধেয়। আর যদি সে এমন এক সম্প্রদায়ভুক্ত হয়, যার সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ, তবে তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ অর্পণ এবং এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা বিধেয়। কেউ যদি (উক্ত দাস) না পায় (বা মুক্ত করার সামর্থ্য না রাখে), তাহলে সে একাদিক্রমে দু'মাস রোযা রাখবে। তওবার (সংশোধনের) জন্য এ আল্লাহর বিধান। বস্তুতঃ আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।" (নিসাঃ ৯২)
দন্ডবিধি প্রয়োগ করবে কেবল সরকার
ইসলামে যে সকল অপরাধের 'ক্বিস্বাস ও হুদুদ' (দন্ডবিধি) আছে, তা প্রয়োগ করবে একমাত্র ক্ষমতাসীন শাসক। খুনের বদলে খুন, বিবাহিত ব্যভিচারীকে হত্যা, মুর্তাদকে হত্যা, চোরের হাত কাটা ইত্যাদি শাস্তি কোন আম জনসাধারণ দিতে পারে না। যেহেতু সকলেই নিজের নিজের ইচ্ছানুযায়ী বিচার ক'রে দন্ড দিতে থাকলে পরিবেশে বিশাল বিশৃঙ্খলা ও अराजকতা দেখা দেবে। সবল দুর্বলকে ধ্বংস ও বিনাশ ক'রে ছাড়বে।
সুতরাং ইসলামী সরকার এমন সকল অপরাধীকে পাকড়াও ক'রে ইসলামী আদালতের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণ ক'রে সে শাস্তি প্রয়োগ করবে। আর সরকার না করলে বা ইসলামী না হলেও কোন সাধারণ নাগরিক তা করতে পারবে না। ('নবী নিয়ে ব্যঙ্গ' দ্রঃ)
📄 যে সকল অপরাধে কাফফারা আবশ্যক
'কাফ্ফারা' হল সেই জিনিস, যার মাধ্যমে অপরাধী অপরাধ থেকে মুক্ত ও ক্ষমাপ্রাপ্ত হতে পারে। কিছু পাপের প্রায়শ্চিত্তবিধান বর্ণিত হয়েছে ইসলামে। তার সাথে তওবাও করতে হয় মহান প্রতিপালকের নিকটে, যেহেতু তা পাপ।
প্রথমতঃ কসমের কাফ্ফারা
ভবিষ্যতে কোন কর্ম করা বা না করার উপরে তাকীদ আরোপ করার উদ্দেশ্যে অথবা শ্রোতার মনে কোন কথার সন্দেহ দূরীকরণের উদ্দেশ্যে কসম খাওয়া এক প্রকার ইবাদত এবং তাতে যার নামে কসম খাওয়া হয়, তার তাযীম উদ্দিষ্ট হয়। তাই আল্লাহ ও তাঁর নাম ও গুণাবলী ব্যতীত অন্য কিছুর কসম খাওয়া শির্ক। মহানবী বলেছেন,
(( إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَنْهَاكُمْ أَنْ تَحْلِفُوا بِآبَائِكُمْ، فَمَنْ كَانَ حَالِفًا ، فَلْيَحْلِفْ بِاللَّهِ ، أَوْ لِيَصْمُتْ )) . متفق عَلَيْهِ
"নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের বাপ-দাদার নামে শপথ করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং যে শপথ করতে চায়, সে যেন আল্লাহর নামে শপথ করে; নচেৎ চুপ থাকে।" (বুখারী ৬১০৮, ৬৬৪৬, মুসলিম ৪৩৪৬নং)
ইবনে উমার হতে বর্ণিত, তিনি একটি লোককে বলতে শুনলেন, 'না, কা'বার কসম!' ইবনে উমার বললেন, 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কসম খেয়ো না। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি যে,
(( مَنْ حَلَفَ بِغَيرِ اللهِ ، فَقَدْ كَفَرَ أَوْ أَشْرَكَ )) .
"যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর নামে কসম করে, সে কুফরী অথবা শির্ক করে।" (আহমাদ, তিরমিযী ১৫৩৫, ইবনে হিব্বান, হাকেম ১/৫২, সহীহুল জামে' ৬২০৪নং)
বলা বাহুল্য, বৈধ নয় গায়রুল্লাহর কসম খাওয়া, যেমন বৈধ নয় আল্লাহর নামেও মিথ্যা কসম খাওয়া।
কিন্তু যে বৈধ কসম খাওয়া হয়, তা রক্ষা করা আবশ্যক। ভঙ্গ করলে কাফফারা জরুরী হয়। অবশ্য কথার ভিতরে মুদ্রাদোষে যে সকল অনিচ্ছাকৃত নিরর্থক শপথ করা হয়, তা দয়াময় আল্লাহ ধরেন না। আর কসম ভাঙ্গার কাফফারা হলঃ-
(এক) দশজন মিসকীনকে মধ্যম ধরনের খাদ্যদান। পাকিয়ে এক বেলা খাওয়ানো অথবা প্রত্যেককে সওয়া এক কিলো ক'রে চাল দান করা। অথবা দশজন দরিদ্রকে বস্ত্র (লুঙ্গি-গেঞ্জি) দান করা। অথবা একটি ক্রীতদাস স্বাধীন করা।
(দুই) এ সবে অসমর্থ হলে তিনটি রোযা পালন করা।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا عَقَدتُمُ الْأَيْمَانَ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ ذَلِكَ كَفَّارَةُ أَيْمَانِكُمْ إِذَا حَلَفْتُمْ وَاحْفَظُوا أَيْمَانَكُمْ كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ) (۸۹) سورة المائدة
"আল্লাহ তোমাদেরকে দায়ী করবেন না তোমাদের নিরর্থক শপথের জন্য, কিন্তু যে সব শপথ তোমরা ইচ্ছাকৃতভাবে কর, সেই সকলের জন্য তিনি তোমাদেরকে দায়ী করবেন। অতঃপর এর কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) হল, দশজন দরিদ্রকে মধ্যম ধরনের খাদ্য দান করা; যা তোমরা তোমাদের পরিজনদেরকে খেতে দাও, অথবা তাদেরকে বস্ত্র দান করা, কিংবা একটি দাস মুক্ত করা। কিন্তু যার (এ সবে) সামর্থ্য নেই, তার জন্য তিন দিন রোযা পালন করা। তোমরা শপথ করলে এটিই হল তোমাদের শপথের প্রায়শ্চিত্ত। তোমরা তোমাদের শপথ রক্ষা কর। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করেন, যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।" (মায়িদাহঃ ৮৯)
মিথ্যা কসম খাওয়া ও তার কাফফারা
অতীতের কোন কর্ম করা বা না করার উপর মিথ্যা কসম খাওয়া বিশাল গোনাহ। তবে তাতে কোন কাফফারা নেই।
(( الكَبَائِرُ : الإِشْرَاكُ بِاللهِ ، وَعُقُوقُ الوَالِدَيْنِ ، وَقَتْلُ النَّفْسِ ، وَاليَمِينُ الغَمُوسُ )) .
"কাবীরাহ গোনাহ হচ্ছে আল্লাহর সাথে শির্ক করা। মাতা-পিতার অবাধ্যাচরণ করা, (অন্যায় ভাবে) কোন প্রাণ হত্যা করা, মিথ্যা কসম খাওয়া।" (বুখারী ৬৬৭৫, ৬৮৭০নং)
এর অন্য বর্ণনায় আছে, জনৈক মরুবাসী নবী-এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করল, 'মহাপাপ কী কী? হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "আল্লাহর সাথে শির্ক (অংশীদার স্থাপন) করা।" সে বলল, 'তারপর কী?' তিনি বললেন, "মিথ্যা কসম।" (সে বলল,) আমি বললাম, 'মিথ্যা কসম কী?' তিনি বললেন, "যার দ্বারা মুসলিমের মাল আত্মসাৎ করা হয়।" অর্থাৎ এমন কসম দ্বারা, যাতে সে মিথ্যাবাদী থাকে। (৬৯২০নং)
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلاً أُوْلَئِكَ لَا خَلَاقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ وَلَا يَنظُرُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ} (۷۷)
"যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথকে স্বল্প মূল্যে বিক্রয় করে, পরকালে তাদের কোন অংশ নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, আর তাদের দিকে চেয়ে দেখবেন না এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।" (আলে ইমরানঃ ৭৭)
গায়রুল্লাহর নামে কসমের কাফফারা সম্বন্ধে মহানবী বলেছেন,
((مَنْ حَلَفَ فَقَالَ فِي حَلِفِهِ : وَاللَّاتِ وَالْعُزَّى، فَلْيَقُلْ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ.
"যে ব্যক্তি হলফ করে তাতে বলে 'লাত ও উয্যার (কোন গায়রুল্লাহর) কসম' সে যেন 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে।" (বুখারী ৪৮৬০, মুসলিম ৪৩৪৯নং)
নযর পালন না করা ও তার কাফ্ফারা
সাধারণতঃ নযর মানা মকরূহ। এতে লাভ কিছু হয় না। বিশেষ ক'রে সেই নযর, যাতে মহান আল্লাহর সাথে শর্তারোপ করা হয়, 'আল্লাহ যদি তুমি এই কর, তাহলে আমি এই করব।' আর ধারণা করা হয় যে, এই বিনিময় শর্তে আল্লাহ অবশ্যই তাকে অভীষ্ট জিনিস দান করবেন! মহানবী বিশেষ ক'রে এই বাজি ধরার মানত মানতে নিষেধ ক'রে বলেছেন,
النَّدْرُ لَا يُقَدِّمُ شَيْئًا وَلَا يُؤَخِّرُهُ وَإِنَّمَا يُسْتَخْرَجُ بِهِ مِنَ الْبَخِيلِ ..
"নযর (তকদীর থেকে) কোন কিছুকে আগা-পিছা করতে পারে না। আসলে এর মাধ্যমে কেবল কূপণের মাল বের করা হয়।" (মুসলিম ৪৩২৫-৪৩৩১, আবু দাউদ ৩২৮৯, তিরমিযী ১৫৩৮, নাসাঈ ৩৮০১-৩৮০২, ইবনে মাজাহ ২১২নং)
অবশ্য নযর মানলে তা পালন করা ওয়াজেব। তা এক প্রকার ইবাদত, যা গায়রুল্লাহর নামে মানা শির্ক। মহানবী বলেছেন,
((مَنْ نَدْرَ أَنْ يُطِيعَ اللَّهَ فَلْيُطِعْهُ وَمَنْ نَدْرَ أَنْ يَعْصِيَهُ فَلَا يَعْصِهِ)).
"যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করার নযর মানে, সে যেন (তা পুরা করে) তার আনুগত্য করে এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতা করার নযর মানে, সে যেন (তা পুরণ না করে এবং) তাঁর অবাধ্যতা না করে।" (বুখারী ৬৬৯৬, ৬৭০০, সহীহুল জামে' ৬৪৪১)
কোন অবাধ্যতা বা পাপ কাজ করার মানত মানলে, তা পালন করা যাবে না, পরন্তু তাতে কাফফারা লাগবে। মহানবী বলেছেন,
لا نَدْرَ فِي مَعْصِيَةٍ وَكَفَّارَتُهُ كَفَّارَةٌ يَمِين ..
"(আল্লাহর) অবাধ্যতায় কোন নযর নেই। আর তার কাফ্ফারা হল কসমের কাফফারা।" (আবু দাউদ ৩২৯২, ৩২৯৪, তিরমিযী ১৫২৪, নাসাঈ ৩৮৩৪, ইবনে মাজাহ ২১২৫নং)
কোন এমন আনুগত্য করার নযর মানলে, যা করার ক্ষমতা সে রাখে না, তাতে কাফফারা লাগবে। কোন এমন আনুগত্য করার নযর মানলে, যা করার ক্ষমতা ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে অক্ষম হয়ে পড়ে, তাতে কাফফারা লাগবে।
অনির্দিষ্ট কোন নযর মানলে, যেমন এই বলা যে, 'আল্লাহর নামে নযর মানলাম', তা কাফফারা দিয়ে পালন করতে হবে।
আর কাফফারা হল কসমের কাফফারা। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
كَفَّارَةُ النَّدْرِ كَفَّارَةُ الْيَمِينِ ..
"নযরের কাফফারা হল কসমের কাফ্ফারা।" (মুসলিম ৪৩৪২, নাসাঈ ৩৮৩২নং)
যিহার করা ও তার কাফফারা
স্ত্রীর পিঠকে কোন মাহরাম মহিলা (মা-বোন ইত্যাদি)র পিঠের সাথে তুলনা করাকে 'যিহার' বলা হয়। অর্থাৎ, তার পিঠ যেমন আমার পক্ষে হারাম, তেমনি তোমার পিঠও আমার পক্ষে হারাম। এমন কথা বলে স্ত্রীকে নিজের জন্য হারাম করা অবশ্যই মহা অপরাধ। এমন অপরাধে স্ত্রী মা হয়ে যায় না এবং তালাকও হয় না, তবে কাফফারা লাগে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
الَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِنكُم مِّن نِّسَائِهِم مَّا هُنَّ أُمَّهَاتِهِمْ إِنْ أُمَّهَاتُهُمْ إِلَّا اللَّائِي وَلَدْتَهُمْ وَإِنَّهُمْ لَيَقُولُونَ مُنكَرًا مِّنَ الْقَوْلِ وَزُورًا وَإِنَّ اللَّهَ لَعَفُوٌّ غَفُورٌ} (۲) سورة المجادلة
"তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে 'যিহার' করে, (তারা জেনে রাখুক যে,) তাদের স্ত্রীরা তাদের মাতা নয়; যারা তাদেরকে জন্মদান করে, শুধু তারাই তাদের মাতা, তারা তো অসঙ্গত ও ভিত্তিহীন কথাই বলে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পাপমোচনকারী, পরম ক্ষমাশীল।" (মুজাদালাহঃ ২)
যিহারের কাফফারা
এমন গর্হিত ও অবাস্তব কথা বলার জন্য শাস্তিভোগ ও কাফফারা আদায় করতে হয়। যিহারের কাফফারার বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,
{وَالَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِن نَّسَائِهِمْ ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا قَالُوا فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مِّن قَبْلِ أَن يَتَمَاسًا ذَلِكُمْ تُوعَظُونَ بِهِ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ (۳) فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ مِن قَبْل أَن يَتَمَاسًا فَمَن لَّمْ يَسْتَطِعْ فَإِطْعَامُ سِتِّينَ مِسْكِينًا ذَلِكَ لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَلِلْكَافِرِينَ عَذَابٌ أَلِيمٌ} (٤) سورة المجادلة
"যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে 'যিহার' করে এবং পরে তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে, তাহলে (এর প্রায়শ্চিত্ত) একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাসের মুক্তিদান। এর দ্বারা তোমাদেরকে সদুপদেশ দেওয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন। কিন্তু যার এ সামর্থ্য থাকবে না, (তার প্রায়শ্চিত্ত) একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একাদিক্রমে দুই মাস রোযা পালন। যে তাতেও অসমর্থ হবে, সে ষাটজন অভাবগ্রস্তকে খাওয়াবে। এটা এই জন্য যে, তোমরা যেন আল্লাহ ও তাঁর রসূলে বিশ্বাস স্থাপন কর। এ হল আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি-বিধান। আর অবিশ্বাসীদের জন্য বেদনাদায়ক শাস্তি রয়েছে।" (মুজাদালাহঃ ৩-৪)
লক্ষণীয় যে, স্ত্রী হালাল করতে হলে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে কাফফারা আদায় করতে হবে।
(এক) একটি দাসমুক্ত করতে হবে।
(দুই) দাসমুক্তির সামর্থ্য বা ব্যবস্থা না থাকলে একটানা ২ মাস (৬০ দিন) রোযা রাখতে হবে। শরয়ী ওযর ছাড়া গ্যাপ দেওয়া যাবে না।
(তিন) তাতে অসমর্থ হলে ৬০ জন মিসকীন খাওয়াতে হবে। মোটামুটি ৭৫ কিলো চাল মিসকীনদেরকে দান করলেও চলবে।
পক্ষান্তরে যদি কোন স্ত্রী তার স্বামীকে বলে, 'তুমি আমার উপর আমার বাপের পিঠের মতো', তবে যিহার হবে না। কারণ যিহার একমাত্র স্বামীর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। এমতাবস্থায় সেই নারীর উপর কসমের কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে।
ঈলা ও তার কাফ্ফারা
সহবাসে সমর্থ স্বামীর চিরদিনকার জন্য বা চার মাসের অধিক দিনের জন্য স্ত্রী-সহবাস না করার কসম খাওয়াকে 'ঈলা' বলা হয়।
ঈলা করা হারাম। কারণ এতে স্ত্রীকে তার সহবাসের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, অথচ তার উক্ত অধিকার আদায় করা স্বামীর পক্ষে ওয়াজিব।
তবে হ্যাঁ, যদি কেউ ঈলা করতে চায়, তবে তা শর্ত-সাপেক্ষে করতে পারে এবং তার কাফফারা আদায় করতে হবে। ঈলা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,
{لِلَّذِينَ يُؤْلُونَ مِنْ نِسَائِهِمْ تَرَبُّصُ أَرْبَعَةِ أَشْهُرٍ فَإِنْ فَاءُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ (٢٢٦) وَإِنْ عَزَمُوا الطَّلَاقَ فَإِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ} (۲۲۷)
"যারা নিজেদের স্ত্রীর কাছে না যাওয়ার শপথ (কসম) করে, তারা চার মাস অপেক্ষা করবে। অতঃপর তারা যদি (মিলনে) ফিরে আসে, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। আর যদি তারা তালাকই দিতে (বিবাহ বিচ্ছেদ করতে) সংকল্পবদ্ধ হয়, তবে আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" (বাক্বারাহঃ ২২৬-২২৭)
আয়াতদ্বয়ের অর্থ হল যারা এরূপ কসম করবে তাদের জন্য চার মাসের অবকাশ থাকবে। অতএব স্বামী যদি চার মাসের মধ্যে কসম ভেঙ্গে স্ত্রীর কাছে আসে এবং কসমের কাফফারা আদায় ক'রে দেয়, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা ক'রে দেবেন। পক্ষান্তরে যদি চার মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও কসম না ভাঙ্গে, তাহলে তাকে তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করার ও কসমের কাফফারা আদায় করার আদেশ দেওয়া হবে। এতেও সম্মত না হলে তাকে স্ত্রীর দাবী অনুযায়ী তালাক দিতে বাধ্য করা হবে। সে নিজে তালাক না দিলে কাযী তালাক দিয়ে তাদেরকে আলাদা ক'রে দেবে।
আর যদি চার মাসের কম সময়ের শর্ত রেখে ঈলা করে, তাহলে তার নির্দেশ হচ্ছে এই যে, যদি কসম ভঙ্গ করে, তাহলে কাফফারা ওয়াজিব হবে। পক্ষান্তরে কসম পূর্ণ করলে স্ত্রীকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। উক্ত সময়ের মধ্যে সহবাসের দাবী করতে পারবে না এবং তাকে তালাকের আদেশ দেওয়া যাবে না। যেমন বুখারী-মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে "রাসূলুল্লাহে তাঁর স্ত্রীগণ থেকে এক মাসের ঈলা করেছিলেন, অতঃপর তিনি উনত্রিশ দিন পর অবতরণ করেন এবং বলেন, "মাস কখন কখন উনত্রিশ দিনেরও হয়।" (তফসীর ইবনে কাসীর)
ঈলার শর্তাবলীঃ
১। ঈলাকারীকে স্ত্রী সঙ্গমের ক্ষমতাবান হতে হবে, যদি সে স্ত্রী সঙ্গম করতে অক্ষম হয়, তবে ঈলা হবে না।
২। ঈলাকারীকে আল্লাহ শব্দ দ্বারা বা তাঁর গুণবাচক নাম দ্বারা কসম করতে হবে, তালাক বা নযর ইত্যাদির দ্বারা নয়।
৩। স্ত্রীর যোনিপথে সঙ্গম না করার কসম হতে হবে।
৪। সঙ্গম থেকে চার মাসের অধিক বিরত থাকার কসম হতে হবে।
৫। এমন স্ত্রী হতে হবে, যার সাথে সঙ্গম করা সম্ভব। (ইশা'রাত ফী আহকামিল কাফফারাত ৮০ পৃঃ)
ঈলার কাফফারা ৪-
ঈলা হল কসমের অন্তর্ভুক্ত, অতএব কসমের কাফফারাই হল তার কাফফারা। আর তা হল দশজন মিসকীনকে খাবার দেবে অথবা পোষাক দান করবে অথবা একজন দাস বা দাসী মুক্ত করবে, উক্ত সকল কাফফারা আদায়ে অসমর্থ হলে তিন দিন রোযা রাখবে।
মাসিকাবস্থায় স্ত্রী-সহবাস ও তার কাফফারা
মাসিকাবস্থায় সহবাস করা সর্বসম্মতভাবে হারাম। মহান আল্লাহ বলেন,
{وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذَى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاء فِي الْمَحِيضِ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّى يَطْهُرْنَ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللهُ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ} البقرة ٢٢٢
"লোকে তোমাকে রজঃস্রাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তুমি বল, তা অশুচি। সুতরাং তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রীসঙ্গ বর্জন কর এবং যতদিন না তারা পবিত্র হয়, (সহবাসের জন্য) তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হয়, তখন তাদের নিকট ঠিক সেইভাবে গমন কর, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাপ্রার্থিগণকে এবং যারা পবিত্র থাকে, তাদেরকে পছন্দ করেন।" (বাক্বারাহঃ ২২২)
মাসিকাবস্থায় সঙ্গম করা এক প্রকার কুফরী। মহানবী বলেছেন,
مَنْ أَتَى حَائِضًا أَوْ امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا أَوْ كَاهِنَا فَصَدَّقَهُ فَقَدْ بَرِئْ مِمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ عَلَى مُحَمَّدٍ عَلَيْهِ الصَّلَاةِ وَالسَّلَامُ».
"যে ব্যক্তি কোন ঋতুমতী স্ত্রী (মাসিক অবস্থায়) সঙ্গম করে অথবা কোন স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাস করে, অথবা কোন গণকের নিকট উপস্থিত হয়ে (সে যা বলে তা) বিশ্বাস করে, সে ব্যক্তি মুহাম্মাদ-এর অবতীর্ণ কুরআনের সাথে কুফরী করে।" (অর্থাৎ কুরআনকেই সে অবিশ্বাস ও অমান্য করে। কারণ, কুরআনে এ সব কুকর্মকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।) (আহমাদ ৯২৯০, আবু দাউদ ৩৯০৬, তিরমিযী ১৩৫, ইবনে মাজাহ ৬৩৯, বাইহাক্বী ১৪৫০৪নং)
কেউ মাসিকাবস্থায় সহবাস করে ফেললে সে গোনাহগার হবে এবং তার জন্য কাফফারা আদায় করতে হবে। আর তা হল কিছু ওলামার মতে মাসিক আসার প্রথম দিকে হলে এক দীনার (সওয়া চার গ্রাম পরিমাণ সোনা অথবা তার মূল্য), আর শেষের দিকে হলে এর অর্ধেক পরিমাণ সাদকা করা। (আবু দাউদ ২৬৫নং)
ইবনে আব্বাস নবী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যে ব্যক্তি মাসিকাবস্থায় স্ত্রী সহবাস করে, তার সম্পকে নবী বলেছেন, "সে এক দীনার বা অর্ধ দীনার সাদকা করবে।" (আবু দাউদ ২৬৪, নাসাঈ ২৮৯, ইবনে মাজাহ ৬৪০, হাকেম ৬১২নং)
সুতরাং এক দীনার বা অর্ধ দীনার সাদকা করার ব্যাপারে এখতিয়ার থাকবে। যে কোন একটা আদায় ক'রে দিলে কাফফারা আদায় হয়ে যাবে। (আল-মুগনী ১/৪১৮)
আর যদি কেউ হায়েয বন্ধ হওয়ার পর গোসল করার পূর্বেই সহবাস করে ফেলে, তবে সহীহ মত অনুযায়ী তার জন্য কাফফারা আদায় করতে হবে না। কেননা যে অশুচিতার কারণে সহবাস নিষিদ্ধ ছিল, তা ঋতু বন্ধ হওয়ার কারণে দূর হয়ে গেছে। আর কাফফারা তখনই দিতে হবে, যখন মাসিকাবস্থায় সহবাস হবে, অন্য সময় নয়। (আল-মুগনী ১/৪১৮)
মাসিকাবস্থায় সহবাস হওয়াতে যদি স্ত্রী সম্মত থাকে, তবে স্ত্রীর উপরও কাফফারা ওয়াজিব হবে। আর যদি স্ত্রীর ইচ্ছার বিপরীত জোরপূর্বক সহবাস হয়, তবে তার উপর কাফফারা ওয়াজিব নয়। (আল-মুগনী ১/৪১৯)
জ্ঞাতব্য যে, মাসিক ও প্রসবোত্তর স্রাবে স্ত্রী-সহবাসের বিধান একই। (আল-মুগনী ১/৪১৯)
রমযানের রোযা অবস্থায় স্ত্রীসঙ্গম ও তার কাফ্ফারা
সঙ্গম বলতে স্ত্রী-যোনীতে স্বামীর (সুপারির মত) লিঙ্গাগ্র প্রবেশ হলেই রোযা নষ্ট হয়ে যায়; তাতে বীর্যপাত হোক, আর নাই হোক। তদনুরূপ অবৈধভাবে পায়খানা-দ্বারে লিঙ্গাগ্র প্রবেশ করালেও রোযা বাতিল গণ্য হয়।
জ্ঞাতব্য যে, স্ত্রীর পায়খানাদ্বারে সঙ্গম করা মহাপাপ এবং এক প্রকার কুফরী।
বলা বাহুল্য রোযা অবস্থায় যখনই রোযাদার স্ত্রী-মিলন করবে, তখনই তার রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। সুতরাং এ মিলন যদি রমযানের দিনে সংঘটিত হয় এবং রোযা রোযাদারের জন্য ফরয হয়, (অর্থাৎ রোযা কাযা করা তার জন্য বৈধ না হয়) তাহলে ঐ মিলনের ফলে যথাক্রমে ৫টি জিনিস সংঘটিত হবে:-
(ক) কাবীরা গোনাহ; আর তার ফলে তাকে তওবা করতে হবে।
(খ) তার রোযা বাতিল হয়ে যাবে।
(গ) তাকে ঐ দিনের অবশিষ্ট অংশ পানাহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে।
(ঘ) ঐ দিনের রোযা (রমযান পর) কাযা করতে হবে।
(ঙ) বৃহৎ কাফফারা আদায় করতে হবে। আর তা হল, একটি ক্রীতদাসকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতে হবে। তাতে সক্ষম না হলে, লাগাতার (একটানা) দুই মাস রোযা রাখতে হবে। আর তাতে সক্ষম না হলে, ৬০ জন মিসকীনকে খাদ্যদান করতে হবে।
এ ব্যাপারে মূল ভিত্তি হল, মহান আল্লাহর এই বাণী, أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَى نِسَائِكُمْ ...) الآية অর্থাৎ, রোযার রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রী-সম্ভোগ হালাল করা হয়েছে। (বাক্বারাহঃ ১৮৭)
আর আবু হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা নবী-এর কাছে বসে ছিলাম। এমন সময় তাঁর নিকট এক ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমি ধ্বংসগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।' তিনি বললেন, "কোন জিনিস তোমাকে ধ্বংসগ্রস্ত করে ফেলল?" লোকটি বলল, 'আমি রোযা অবস্থায় আমার স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে ফেলেছি।' এ কথা শুনে আল্লাহর রসূল তাকে বললেন, "তুমি কি একটি ক্রীতদাস মুক্ত করতে পারবে?" লোকটি বলল, 'জী না।' তিনি বললেন, "তাহলে কি তুমি একটানা দুই মাস রোযা রাখতে পারবে?” সে বলল, 'জী না।' তিনি বললেন, "তাহলে কি তুমি ৬০ জন মিসকীনকে খাদ্যদান করতে পারবে?” লোকটি বলল, 'জী না।' --- (বুখারী ১৯৩৭, মুসলিম ১১১১নং)
যে মহিলার উপর রোযা ফরয, সেই মহিলা সম্মত হয়ে রমযানের দিনে স্বামী-সঙ্গম করলে তারও উপর কাফফারা ওয়াজেব। অবশ্য তার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও স্বামী যদি তার সাথে জোরপূর্বক সহবাস করতে চায়, তাহলে তার জন্য যথাসাধ্য তা প্রতিহত করা জরুরী। রুখতে না পারলে তার উপর কাফফারা ওয়াজেব নয়।
এই জন্যই যে মহিলা জানে যে, তার স্বামীর কামশক্তি বেশী; সে তার কাছে প্রেম-হৃদয়ে কাছাকাছি হলে নিজের যৌন-পিপাসা দমন রাখতে পারে না, সেই মহিলার জন্য উচিত, রমযানের দিনে তার কাছ থেকে দূরে-দূরে থাকা এবং প্রসাধন ও সাজ-সজ্জা না করা। তদনুরূপ স্বামীর জন্যও উচিত, পদস্থলনের জায়গা থেকে দূরে থাকা এবং রোযা থাকা অবস্থায় স্ত্রীর কাছ না ঘেঁষা; যদি আশঙ্কা হয় যে, উগ্র যৌন-কামনায় সে তার মনকে কাবু রাখতে পারবে না। কারণ, এ কথা বিদিত যে, প্রত্যেক নিষিদ্ধ জিনিসই ঈপ্সিত। (দ্রঃ আশ্-শারহুল মুমতে' ৬/৪১৫, সাবউনা সুয়াল ৭০নং, ফাইযুর রাহীমির রাহমান, ফী আহকামি অমাওয়াইযি রামাযান ৬১পৃঃ)
পক্ষান্তরে যদি রমযানের রোযা কাযা রাখতে গিয়ে স্ত্রী-সঙ্গম ক'রে ফেলে, তাহলে তার ফলে কাফফারা নেই। আর তার জন্য ঐ দিনের বাকী অংশ পানাহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকাও জরুরী নয়। অবশ্য তার গোনাহ হবে। কারণ, সে ইচ্ছাকৃত একটি ওয়াজেব রোযা নষ্ট করে তাই। (আশ-শারহুল মুমতে' ৬/৪১৩, আহকামুন মিনাস সিয়াম, ক্যাসেট, ইবনে উষাইমীন)
মুসাফির যদি সফরে থাকা অবস্থায় রোযা রেখে স্ত্রী-সহবাস ক'রে ফেলে, তাহলে তার জন্য কেবল কাযা ওয়াজেব, কাফ্ফারা ওয়াজেব নয়। যেমন, ঐ দিনের বাকী অংশ পানাহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকাও তার জন্য জরুরী নয়। কেননা, সে মুসাফির। আর মুসাফিরের জন্য সফরে রোযা ভাঙ্গা (এবং পরে কাযা করা) বৈধ।
অনুরূপভাবে এমন রোগী, যার রোগের জন্য রোযা ভাঙ্গা বৈধ ছিল; কিন্তু কষ্ট ক'রে সে রোযা রেখেছিল। সে যদি তার স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে, যে সেই দিনেই মাসিক থেকে পবিত্রা হয়েছে, তাহলে তারও গোনাহ হবে না; অবশ্য কাযা ওয়াজেব। (আশ্-শারহুল মুমতে' ৬/৪১৩)
যে ব্যক্তি যে বৈধ ওযরের ফলে রোযা বন্ধ রেখেছিল, দিনের মধ্যে তার সেই ওযর দূর হয়ে যাওয়ার পর যদি স্ত্রী-সহবাস করে, তাহলে তার জন্য কাফফারা ওয়াজেব নয়। যেমন, কোন মুসাফির যদি দিন থাকতে রোযা না রেখে ঘরে ফিরে দেখে যে, তার স্ত্রী সেই দিনেই (ফজরের পর) মাসিক থেকে পবিত্রা হয়েছে, তাহলে সঠিক মতে তাদের জন্য সঙ্গম বৈধ। এতে স্বামী-স্ত্রীর কোন প্রকার পাপ হবে না। যেহেতু ঐ দিন শরীয়তের অনুমতিক্রমে তাদের জন্য মান্য নয় এবং ঐ দিনে রোযা না রাখাও তাদের পক্ষে অনুমোদিত। (ঐ ৬/৪২১)
যদি কোন ব্যক্তি সুস্থ অবস্থায় রোযা রেখে স্ত্রী-সহবাস করার পর দিন থাকতেই এমন অসুস্থ হয়ে পড়ে, যাতে তার জন্য রোযা ভাঙ্গা বৈধ, তাহলেও তার জন্য কাফফারা ওয়াজেব; যদিও তার জন্য দিনের শেষভাগে (অসুস্থ হওয়ার পর) রোযা ভাঙ্গা বৈধ। কারণ, সহবাসের সময় সে তাতে অনুমতিপ্রাপ্ত ছিল না।
তদনুরূপ যে ব্যক্তি দিনের প্রথমাংশে সহবাস করার পর সফর করে তাহলে তার জন্যও কাফফারা ওয়াজেব; যদিও সফর করার পরে ঐ দিনেই তার জন্য রোযা ভাঙ্গা বৈধ। কেননা, রোযা ভাঙ্গা বৈধ হওয়ার পূর্বেই সে (রমযান) মাসের মর্যাদা ক্ষুন্ন করেছে। (ঐ ৬/৪২২)
যদি কোন ব্যক্তি (কাফফারা থেকে রেহাই পাওয়ার বাহানায়) প্রথমে কিছু খেয়ে অথবা পান করে তারপর স্ত্রী-সঙ্গম করে, তাহলে তার পাপ অধিক। যেহেতু সে রমযানের মর্যাদাকে পানাহার ও সঙ্গমের মাধ্যমে ডবল ক'রে নষ্ট করেছে। বৃহৎ কাফফারা তার হক্কে অধিক কার্যকর। আর তার ঐ বাহানা ও ছলনা নিজের ঘাড়ে বোঝা স্বরূপ। তার জন্য খাঁটি তওবা ওয়াজেব। (সাবউনা সুয়াল ৪৭নং)
জ্ঞাতব্য যে, যার জন্য রোযা রাখা ফরয, তার রমযান মাসে দিনে রোযা অবস্থায় সঙ্গম ছাড়া অন্য কোন কারণে বা অন্য কোন রোযায় কাফফারা ওয়াজেব হয় না, বলা বাহুল্য, নফল রোযা রেখে, কসমের কাফফারার রোযা রেখে, কোন অসুবিধার ফলে ইহরাম অবস্থায় কোন নিষিদ্ধ কাজ ক'রে ফেললে তার জরিমানার রোযা রেখে, তামাত্তু হজ্জ করতে গিয়ে কুরবানী দিতে না পেরে তার বিনিময়ে রোযা রেখে অথবা নযরের রোযা রেখে স্ত্রী-সহবাস ক'রে ফেললে কাফফারা ওয়াজেব নয়। যেমন সঙ্গম না করে (স্ত্রী-যোনীর বাইরে) বীর্যপাত করে ফেললেও কাফফারা ওয়াজেব নয়। (আশ্-শারহুল মুমতে' ৬/৪২২-৪২৩) অবশ্য কাযা তো ওয়াজেবই।
জ্ঞাতব্য যে, ব্যভিচার করে ফেললেও সহবাসের মতই কাফফারা ওয়াজেব। (আল-ফাওয়াইদুল জালিয়্যাহ, ইবনে বায ১১৯পৃঃ) তাছাড়া ব্যভিচারের সাজা ও তওবা তো আছেই। (আমার 'রমযানের ফাযায়েল ও মাসায়েল' বই থেকে)
ইহরাম অবস্থায় শিকার করার কাফফারা
ইহরাম অবস্থায় বা হারাম সীমানার শিকার করা ও তার কাফফারা
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَأَنتُمْ حُرُمٌ وَمَن قَتَلَهُ مِنكُم مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاء مِّثْلُ مَا قَتَلَ مِنَ النَّعَمِ يَحْكُمُ بِهِ ذَوَا عَدْلٍ مِّنكُمْ هَدْيًا بَالِغَ الْكَعْبَةِ أَوْ كَفَّارَةٌ طَعَامُ مَسَاكِينَ أَو عَدْلُ ذلك صِيَامًا لِّيَذُوقَ وَبَالَ أَمْرِهِ عَفَا اللَّهُ عَمَّا سَلَفَ وَمَنْ عَادَ فَيَنتَقِمُ اللَّهُ مِنْهُ وَاللَّهُ عَزِيزٌ ذُو انتقام} (৯৫) সূরা আল-মায়েদা
"হে বিশ্বাসিগণ! ইহরামে থাকা অবস্থায় তোমরা শিকার জন্তু বধ করো না, তোমাদের মধ্যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে তা বধ করলে, যা বধ করল তার বিনিময় হচ্ছে অনুরূপ গৃহপালিত জন্তু, যার মীমাংসা করবে তোমাদের মধ্যে দু'জন ন্যায়বান লোক কা'বাতে প্রেরিতব্য কুরবানীরূপে। অথবা ওর বিনিময় হবে দরিদ্রকে অন্ন দান করা কিংবা সমপরিমাণ রোযা পালন করা, যাতে সে আপন কৃতকর্মের ফল ভোগ করে। যা গত হয়েছে আল্লাহ তা ক্ষমা করেছেন। কিন্তু কেউ তা পুনরায় করলে, আল্লাহ তার নিকট হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন এবং আল্লাহ পরাক্রমাশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী।" (মায়িদাহঃ ৯৫)
ফিয়াহ দেওয়ার দুটি নিয়মঃ
প্রথমত: যে পশু শিকার করেছে, যদি তার মতো জন্তু পাওয়া যায়, তবে তিন রকমভাবে কাফফারা আদায় করতে পারবে:-
১। যে শিকার হত্যা করেছে, তার অনুরূপ জন্তু যবেহ ক'রে সমস্ত গোশত মক্কার দরিদ্রদের মাঝে বন্টন ক'রে দিতে হবে।
২। তার বা তার মতো জন্তুর দাম ধরে খাবার ক্রয় ক'রে মিসকীনদের মাঝে বন্টন করতে হবে, প্রত্যেক মিসকীনকে অর্ধ সা' (সওয়া এক কিলো) দিতে হবে।
৩। অথবা সেই খাবার যত জন মিসকীনকে দেওয়া যাবে, তার সংখ্যা পরিমাণ রোযা রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত: যে পশু শিকার করেছে যদি তার মতো না পাওয়া যায়, তাহলে উপরে বর্ণিত দুই ও তিন নম্বর নিয়মে কাফফারা আদায় করতে হবে।
অনিচ্ছাকৃত নরহত্যা ও তার কাফফারা
এ ব্যাপারে ইতিপূর্বে খুনের বদলে খুনের বর্ণনায় উল্লিখিত হয়েছে যে, যে হত্যাকান্ডে মারার কোন ইচ্ছাই থাকে না। কিন্তু ভুল ক'রে তার হাতে হত্যাকান্ড ঘটে যায় অথবা কোনভাবে সে হত্যার কারণ প্রতিপন্ন হয়, তাহলে তাতে ক্বিস্বাস নেই; আছে রক্তপণ। আদায় করতে হবে তার (আস্বাবা) ওয়ারেসদেরকে। আছে কাফফারা। এতে পাপ হয় না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَا كَانَ لِمُؤْمِن أَن يَقْتُلَ مُؤْمِنًا إِلَّا خَطَئًا وَمَن قَتَلَ مُؤْمِنًا خَطَئًا فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ وَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ إِلَّا أَن يَصَّدَّقُوا فَإِن كَانَ مِن قَوْمٍ عَدُوٌّ لَّكُمْ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ وَإِن كَانَ مِن قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ مِّيثَانٌ فَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ وَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةً فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ تَوْبَةً مِّنَ اللَّهِ وَكَانَ اللهُ عَلِيمًا حَكِيمًا} (۹۲) النساء
"কোন বিশ্বাসীকে হত্যা করা কোন বিশ্বাসীর জন্য সংগত নয়, তবে ভুলবশতঃ হত্যা ক'রে ফেললে সে কথা স্বতন্ত্র। কেউ কোন বিশ্বাসীকে ভুলবশতঃ হত্যা করলে এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা এবং তার (নিহতের) পরিজনবর্গকে রক্তপণ অর্পণ করা বিধেয়। তবে যদি তারা ক্ষমা ক'রে দেয়, তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু যদি সে তোমাদের শত্রু পক্ষের লোক হয় এবং বিশ্বাসী হয়, তবে এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা বিধেয়। আর যদি সে এমন এক সম্প্রদায়ভুক্ত হয়, যার সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ, তবে তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ অর্পণ এবং এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা বিধেয়। কেউ যদি (উক্ত দাস) না পায় (বা মুক্ত করার সামর্থ্য না রাখে), তাহলে সে একাদিক্রমে দু'মাস রোযা রাখবে। তওবার (সংশোধনের) জন্য এ আল্লাহর বিধান। বস্তুতঃ আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।" (নিসাঃ ৯২)
📄 যে পাপ পূর্ববর্তী জাতির ব্যাধি
কিছু পাপ এই উম্মত করে, প্রকৃত প্রস্তাবে তা পূর্ববর্তী বহু জাতির পাপ, প্রাচীন কালের পাপ। তার মধ্যে একটি পাপ হল হিংসা। হিংসা পৃথিবীর মানুষের ইতিহাসে সর্বপ্রথম করে ইবলীস আদমের প্রতি। তারপর আদম সন্তানের মধ্যে করে কাবীল হাবীলের প্রতি। পরিণামে ইবলীস বিতাড়িত শয়তান ও আদম সন্তানের চিরশত্রু হয়েছে। আর কাবীল হাবীলকে হত্যা ক'রে চিরলাঞ্ছিত ও চিরপাপী হয়েছে। মহানবী বলেছেন,
(( لَيْسَ مِنْ نَفْسٍ تُقْتَلُ ظُلْماً إِلَّا كَانَ عَلَى ابْنِ آدَمَ الأَوَّلِ كِفْلٌ مِنْ دَمِهَا ، لأَنَّهُ كَانَ أَوَّلَ مَنْ سَنَّ القَتَلَ )). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"যে কোন প্রাণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হবে, তার পাপের একটা অংশ আদমের প্রথম সন্তান (কাবীল) এর উপর বর্তাবে। কেননা, সে হত্যার রীতি সর্বপ্রথম চালু করেছে।" (বুখারী ৩৩৩৫, মুসলিম ৪৪৭৩, তিরমিযী ২৬৭৩, নাসাঈ ৩৯৮৫, ইবনে মাজাহ ২৬১৬নং)
হিংসা একটি কদর্য আচরণ। হিংসা থেকেই আসে অহংকার, হিংসা থেকেই আসে বিদ্বেষ ও ঘৃণা। হিংসা থেকেই আসে অসম্মান, অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ। আর তা হল পূর্ববর্তী জাতিসমূহের উল্লেখযোগ্য একটি ব্যাধি। মহানবী নিজ উম্মতের মাঝে সে ব্যাধি লক্ষ্য ক'রে বলেছেন,
((دَبَّ إِلَيْكُمْ دَاءُ الأُمَمِ قَبْلَكُمْ : الْحَسَدُ وَالْبَغْضَاءُ ، هِيَ الْحَالِقَةُ ، لَا أَقُولُ تَحْلِقُ الشَّعَرَ، وَلَكِنْ تَحْلِقُ الدِّينَ ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ ، لَا تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا ، وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا ، أَفَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِمَا يُثْبِتُ ذَاكُمْ لَكُمْ ؟ أَفْشُوا السَّلَامِ بَيْنَكُمْ)).
"তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের রোগ হিংসা ও বিদ্বেষ তোমাদের মাঝে অনুপ্রবেশ করেছে। আর বিদ্বেষ হল মুন্ডনকারী। আমি বলছি না যে, তা কেশ মুন্ডন করে; বরং দ্বীন মুন্ডন (ধ্বংস) করে ফেলে। সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার জান আছে! তোমরা বেহেস্তে ততক্ষণ প্রবেশ করতে পারবে না; যতক্ষণ পর্যন্ত না ঈমান এনেছ। আর (পূর্ণ) ঈমানও ততক্ষণ পর্যন্ত আনতে পারবে না; যতক্ষণ না আপোসে সম্প্রীতি কায়েম করেছ। আমি কি তোমাদেরকে এমন কর্মের কথা বাতলে দেব না; যা তোমাদের ঐ সম্প্রীতিকে দৃঢ় করবে? তোমাদের আপোসে সালাম প্রচার কর।" (তিরমিযী ২৫১০, বাযযার বাইহাকীর শুআবুল ঈমান সহীহ তিরমিযী ২০৩৮নং)
হিংসা এক পর্যায়ে মানুষকে নিষ্ঠুর ক'রে তোলে। অনেক সময় অত্যাচার, অনাচার ও বিদ্রোহের শিকার হয়ে নিজ দ্বীনকে নষ্ট ক'রে ফেলে, যেমন ক্ষুর বা ব্লেড চুলকে চেঁছে পরিষ্কার ক'রে ফেলে। আর যেহেতু সালাম (পরস্পরের শান্তির দোয়া বিনিময়) সম্প্রীতি বয়ে আনে এবং পরস্পরের হৃদয় থেকে বিদ্বেষ দূরীভূত করে, সেহেতু উক্ত হাদীসের শেষে বিশেষভাবে রোগের একটি চিকিৎসা স্বরূপ তা বর্ণিত হয়েছে।
পূর্ববর্তী জাতিসমূহের আরো কিছু ব্যাধির প্রতি ইঙ্গিত ক'রে একদা মহানবী বলেন, "অদূর ভবিষ্যতে আমার উম্মতের মাঝে বিজাতির ব্যাধি পৌঁছবে।" সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহর রসূল! বিজাতির ব্যাধি কী?' উত্তরে তিনি বললেন, الأَشَرُ وَالبَطَرُ، وَالتَّكَاثُرُ وَالتَّنَاجُسُ فِي الدُّنْيَا، وَالتَّبَاغُضُ وَالتَّحَاسُدُ، حَتَّى يَكُونَ البَغْي.
"অকৃতজ্ঞতা, সগর্ব আনন্দ, প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা, পার্থিব প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পরস্পর বিদ্বেষ ও হিংসা ও পরিশেষে সীমা লংঘন বা অত্যাচার।" (হাকেম ৭৩১১, সিঃ সহীহাহ ৬৮০নং)
বিজাতির অর্থশালী হওয়ার প্রধানতঃ তিনটি কারণ, যা কোন মুসলিম করতে পারে না। সূদী কারবার, নারীদেহ বা রূপ-ব্যবসা ও মাদকদ্রব্যের ব্যবসা। এরই মাধ্যমে তাদের আপোসে আর্থিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুঙ্গে থাকে। তার ফলে তারা সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে যায়, কারুনের মতো মনের ভিতরে সগর্ব আনন্দ (দন্ত) ও অহংকার সৃষ্টি হয়। আর্থিক আতিশয্যের ফলে তারা নানা আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে ওঠে। পার্থিব প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তাদেরকে উদাস ও মত্ত-মাতাল ক'রে তোলে। অর্থোপার্জনের পথে এমন নেশাখোর মাতালের মতো অগ্রসর হয় যে, সামনের সকল বাধাকে যেভাবেই হোক উল্লংঘন করে। দ্বীনের বাধা তো মানেই না, দুনিয়ার আইনের বাধাকেও তারা সহজে অতিক্রম করতে পারে।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অনুকরণ করেছে মুসলিমরাও। বিজাতির সেই সংক্রামক ব্যাধি সংক্রমণ করেছে মুসলিম সমাজে। যার ফলে রাঘববোয়াল তো বটেই, চুনো-পুঁটি দুনিয়াদাররাও উক্তরূপ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে নয়। তাদের অনুকরণে এরাও অর্থের পিছনে অন্ধের মতো ছুটে চলেছে। অর্থের লোভে তাদের অনুভূতি এতটাই ভোঁতা হয়ে গেছে যে, তারা হালাল-হারামের কোন তমীয করে না, মান-সম্মানের খেয়াল রাখে না, লোকনিন্দার কোন পরোয়া করে না। সমাজের নজরে সে তুচ্ছ হচ্ছে, সে কথার কোন তোয়াক্কা করে না। কারণ টাকার প্রলেপ দিয়ে তা ঢেকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি লাভ ক'রে থাকে ধন-উপাস্যের কাছে।
তখন লোকে তাকে 'দুনিয়াদার', 'ধনদাস' বা 'লোভী' যাই বলুক না কেন, তাতে তার কোন লজ্জা হয় না। বরং মানসিকতার বিকৃতির ফলে 'গাধা' ডাককেও তার কানে 'দাদা' মনে হয়। কুনামে ডাকলেও তার রাগ হয় না, বরং তা শুনে 'হা-হা' ক'রে হাসে!
একদা এক কুকুর এসে এক সিংহকে বলল, 'হে পশুরাজ! আমি আমার নাম পরিবর্তন করতে চাই। দয়া ক'রে আমার নামটা বদলে দিন। কারণ আমার নামটা বড় বিশ্রী ও অসভ্য।'
সিংহ বলল, 'তুমি তো বিশ্বাসঘাতক ও নির্লজ্জ। তোমার আচরণ বড় হীন। অতএব এ নামই তোমার জন্য যথার্থ ও সার্থক।'
কুকুর বলল, 'তাহলে আমাকে পরীক্ষা ক'রে দেখুন, আমি সুন্দর নামের কাজ করতে পারি কি না।'
সিংহ কুকুরকে এক টুকরা গোশ্ত দিয়ে বলল, 'ঠিক আছে। এটা আমার জন্য কাল পর্যন্ত তোমার কাছে যত্ন ক'রে আমানত রেখে দাও। কাল আমি তোমার কাছ থেকে এটা নেব, আর তোমার নাম পাল্টে দিয়ে এক সুন্দর মতো নাম রেখে আসব।'
গোশ্ত টুকরাটি নিয়ে কুকুর বাসায় ফিরল। ক্ষিদে লাগলে সে গোশ্তের দিকে তাকিয়ে জিভের লাল ফেলতে শুরু করল। খাওয়ার ইচ্ছে হলেও নাম পাল্টাবার কথা মনে পড়লে ধৈর্যের সাথে সিংহের অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু যখনই তার প্রবৃত্তিতে লালসার উদ্রেক হল, তখনই আর ধৈর্যের বালির বাঁধ আটকে রাখতে পারল না। অবশেষে 'ভালো নাম নিয়েই বা আর কী হবে? 'কুকুর'ও তো ভালো নাম।'---এই বলেই সে গোশ্ত টুকরাটি খেয়েই ফেলল।
পার্থিব প্রতিযোগিতা ও আর্থিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সকল বিপদের মূল, সকল দুষ্কর্মের মাথা, সকল ফিতনার গোড়া। অর্থই হল সব কিছু, আবার অর্থই অনর্থের মূল। অর্থ-লালসা ও পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রাচীন রোগ হল পূর্ববর্তী জাতিসমূহের। কিন্তু স্বজাতির মাঝেও সে রোগের জীবাণু সংক্রমিত। সুতরাং জ্ঞানবান সাবধান।