📄 পাপ পাপীকে আত্মভোলা করে
পাপী পাপ করতে থাকলে আত্মভোলা হয়। নিজের আত্মার উন্নতি ও পরিত্রাণের কথা বিস্মৃত হয়। আর আত্মবিস্মৃত হলে পাপী আত্মার প্রতি অবহেলা করে এবং ধীরে ধীরে তাকে নষ্ট ক'রে ফেলে। আর এটা এমন ধ্বংসের পথ, যাতে মুক্তির কোন উপায় অবশিষ্ট থাকে না।
মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنسَاهُمْ أَنفُسَهُمْ أَوْلَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ} (۱۹)
"আর তাদের মত হয়ো না, যারা আল্লাহকে বিস্মৃত হয়েছে, ফলে আল্লাহ তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করেছেন। তারাই তো পাপাচারী।" (হাশরঃ ১৯)
অর্থাৎ, আল্লাহ শাস্তিস্বরূপ তাদেরকে এমন করে দিলেন যে, তারা এমন সব কাজ করা থেকে উদাসীন হয়ে গেল যাতে ছিল তাদের উপকার এবং যার দ্বারা তারা নিজেদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচাতে পারত। এইভাবে মানুষ আল্লাহকে ভুলে আসলে নিজেকেই ভুলে যায়। তার জ্ঞান-বুদ্ধি তাকে সঠিক দিক-নির্দেশনা করে না। চোখ দু'টি তাকে সঠিক পথ দেখায় না এবং তার কান সত্য কথা শুনতে বধির হয়ে যায়। ফলে তার দ্বারা এমন কাজ হয়ে যায়, যাতে থাকে তার নিজেরই ধ্বংস ও বিনাশ। (আহসানুল বায়ান)
নিশ্চয় এটা এক প্রকার শাস্তি মহান প্রতিপালকের পক্ষ থেকে। যেমন তিনি মুনাফিকদের ব্যাপারে বলেছেন,
الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُم مِّن بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمُنكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ {وَيَقْبِضُونَ أَيْدِيَهُمْ نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ هُمُ الْفَاسِقُونَ} (٦٧) سورة التوبة
"আল্লাহ মুনাফিক্ব পুরুষ, মুনাফিক্ব নারী ও কাফেরদেরকে জাহান্নামের আগুনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, এটা তাদের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাদেরকে অভিশাপ করেছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী শাস্তি।" (তাওবাহঃ ৬৮)
সুতরাং যে ব্যক্তি নিজ প্রতিপালককে বিস্মৃত হয়, সে দুটি শাস্তি প্রাপ্ত হয়:
এক: মহান প্রতিপালক তাকে ভুলে যান।
দুইঃ তাকে তিনি আত্মভোলা ক'রে দেন।
মহান আল্লাহর বান্দাকে ভুলে যাওয়ার অর্থ হল, তিনি তাকে বর্জন ও উপেক্ষা করেন, ফলে সে হিফাযত বহির্ভূত হয়ে ধ্বংসের পথে অগ্রসর হয়। আর নিশ্চয় তা বান্দার জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে বড় দুর্ভাগ্যজনক।
পক্ষান্তরে আত্মবিস্মৃত করার অর্থ হল, বান্দার নিজের আত্মার কল্যাণ ও তার সুখ, পরিত্রাণ ও সংশুদ্ধির কথা তার স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা। যেমন কারো জমিতে ফসল আছে, অথবা বাগানে গাছ আছে, কিন্তু সে ভুলে গিয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত থাকে। সে তা সিঞ্চন করে না, দেখাশোনা করে না, ঘেরা-বেড়া দেয় না। সুতরাং তার সে ফল-ফসল নষ্ট হতে বাধ্য।
অথবা কারো পশু আছে। কিন্তু অন্য কিছু নিয়ে মশগুল হওয়ার ফলে সে তার দেখাশোনা করে না, খেতে দেয় না। তাও নষ্ট হতে বাধ্য।
অথবা কারো ধন-সম্পদ আছে। কিন্তু অন্য কোন বিষয়ে ব্যাপৃত হওয়ার ফলে সে তার হিফাযত করে না, অবহেলায় সঠিক সংরক্ষণ করে না, তালা দিয়ে বা পাহারা দিয়ে রাখে না। নিশ্চয় সে সম্পদ চুরি হয়ে অথবা নষ্ট হয়ে যাবে।
আল্লাহভোলা তথা আত্মভোলা বান্দা আত্মার ব্যাধি সম্বন্ধে সচেতন থাকে না। ফলে তা ব্যাধিগ্রস্ত হওয়ার পরেও তার চিকিৎসা করতে প্রয়াস পায় না। যে রোগ আত্মকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে, সে রোগের কোন উপসর্গও তার কাছে ধরা পড়ে না। সুতরাং এ হল মহাশাস্তি। যে শাস্তির ফলে বান্দা নিজের সুখ-দুঃখের কথা ভুলে যায়। নিজের সাফল্য ও পরিত্রাণের কথা বিস্মৃত হয়। নিজ হৃদয়ের রোগ ও তার চিকিৎসা সম্বন্ধে উদাসীন থাকে। ভুলে যায় পরকালের চিরস্থায়ী সুখ-দুঃখের কথা।
আপনি ভেবে দেখলে দেখতে পাবেন, দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষই আত্মভোলা। আত্মার উন্নতি ও কল্যাণের কথা চিন্তাই করে না। রঙিন বর্তমান পেয়ে ভবিষ্যৎকে ভুলে থাকে। সাময়িক সুখের ব্যস্ততায় প্রকৃত সুখের কথা বিস্মৃত হয়। লাভজনক ব্যবসা উপেক্ষা ক'রে ক্ষতিকর ব্যবসায় নিরত হয়। সুতরাং কত বড় সে ভুল, যে ভুলে মানুষ নিজেকে ভুলে যায়! (আষারুয যুনুব ৪৮-পৃঃ)
📄 পাপ পাপীকে সমাজে লাঞ্ছিত করে
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে এমন অনেক বিষয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, যার বিপরীত কেউ কিছু করলে সে সমাজ-বিরোধী হয়ে যায়। ইসলামী সমাজে যে কেউ শরীয়ত-বিরোধী কাজ করলে সে সমাজ-বিরোধী বলে গণ্য হয়। আর যে সমাজ-বিরোধী হয়, সমাজে তার মান থাকে না। কারো নিকট সে সম্মান পায় না। লোকে হয়তো তাকে ভয় করে, কিন্তু কেউ তাকে শ্রদ্ধা করে না। আঙ্গুলের নখের মতো অনেক সময় সে সমাজের কাজে আসে, কিন্তু একটু লম্বা হলে কেটে ফেলা হয়।
চর্চা ও বদনাম হয় সমাজ-বিরোধী পামরের। ইজ্জত থাকে না কোন সাজা-পাওয়া অপরাধীর। মান-সম্মান থাকে না জেল-খাটা আসামীর। সম্মান পায় না বেশ্যাবৃত্তি থেকে ফিরে আসা মেয়ে। সামাজিক মর্যাদা পায় না অসামাজিক কোন কাজে জড়িত অপরাধী। বহু চেষ্টায় হারানো মর্যাদা ফিরিয়ে আনলেও লোকে বলে 'গোবুরে পদ্মফুল' বা 'ধোয়া তুলসী'।
তওবার ফলে পাপীর পাপকে মহান আল্লাহ ক্ষমা করলেও বিবেকের কাছে সে অপরাধী থাকে। ফলে লজ্জা ও লাঞ্ছনা তার পিছু ছাড়ে না। মানুষ যত গোপনেই পাপ করুক না কেন, তার শাস্তি সে প্রকাশ্যেই পায়। আর তার ফলে ছড়িয়ে পড়ে তার অপমানের কথা।
আসলে ইসলামী সমাজে একমাত্র মর্যাদা ও সম্মান আছে তার, যে নিজ প্রতিপালকের অনুগত। ইসলামের যে যত বেশি অনুসারী, মুসলিম সমাজে সে তত বেশি মর্যাদাবান। সম্মানদাতা 'রব্বুল ইয্যাহ' মহান আল্লাহ। সম্মান আছে তাঁর কাছে, তাঁর আনুগত্যে ও ইবাদতে। তিনি বলেছেন,
{مَن كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعًا} (۱۰) سورة فاطر
"কেউ ইজ্জত-সম্মান চাইলে (সে জেনে রাখুক, সকল ইজ্জত-সম্মান তো আল্লাহরই।" (ফাত্বিরঃ ১০)
{الَّذِينَ يَتَّخِذُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاء مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَيَبْتَغُونَ عِندَهُمُ الْعِزَّةَ فَإِنَّ العِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا} (۱۳۹) سورة النساء
"যারা বিশ্বাসীদের পরিবর্তে অবিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে। তারা কি তাদের নিকট সম্মান অনুসন্ধান করে? অথচ সমস্ত সম্মান তো আল্লাহরই।" (নিসাঃ ১৩৯)
{وَلَا يَحْزُنكَ قَوْلُهُمْ إِنَّ الْعِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ} (٦٥) سورة يونس
"আর ওদের কথা যেন তোমাকে দুঃখ না দেয়। নিশ্চয়ই যাবতীয় শক্তি-সম্মান আল্লাহরই জন্য, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা।" (ইউনুসঃ ৬৫)
{يَقُولُونَ لَئِن رَّجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَدْلَ وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ} (۸) سورة المنافقون
"তারা বলে, 'আমরা মদীনায় ফিরে গেলে সেখান হতে সম্মানী অবশ্যই হীনকে বহিষ্কার করবে।' বস্তুতঃ যাবতীয় সম্মান তো আল্লাহরই এবং তাঁর রসূল ও বিশ্বাসীদের। কিন্তু মুনাফিক (কপট) রা তা জানে না।" (মুনাফিকুনঃ ৮)
মোট কথা সম্মান কাফের ও মুনাফিকদের নিকট নেই। সম্মান পাপাচরণের মাঝে নেই। সম্মান আছে মহান আল্লাহর নিকট। তাঁর নিকট সম্মানীকে সম্মান দেয় মুসলিমরা। তাঁরই যিক্র, ইবাদত ও আনুগত্যের মাঝে আছে চির সম্মান। মহান আল্লাহর অনুগত বান্দাই প্রকৃত সম্মানী; যদিও সে একজন অসহায় দরিদ্র।
মহান আল্লাহর অবাধ্য বান্দা যত বড়ই ধনী হোক, যত বড়ই পদস্থ অফিসার হোক, যত বড়ই সামাজিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হোক, মুসলিমদের নিকট তার কোন সম্মান নেই। আল্লাহর নিকট তো নেই-ই। অবাধ্য হলে কি কেউ সম্মান পায়? সে তো শাস্তিযোগ্য অপরাধী।
মহান আল্লাহর বিধানের অনুসারী মানুষই হল প্রকৃত সম্মানের অধিকারী। একদা রাসূলুল্লাহ মদীনার আনসারদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন,
«يَا مَعْشَرَ الأَنصار أَلَمْ تَكُونُوا أَذِلَّةً فَأَعَزَّكُمُ اللَّهُ؟».
অর্থাৎ, হে আনসার দল! তোমরা কি সম্মানহারা ছিলে না, অতঃপর আল্লাহ তোমাদেরকে সম্মানদান করলেন? তাঁরা বলেছিলেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রসূল সত্যই বলেছেন।' (আহমাদ ১১৫৪৭নং)
ইসলামের অনুসারীই হল সম্মানের অধিকারী। ইসলাম অবলম্বন করেই মানুষ মর্যাদার অধিকারী হতে পারে। ইসলাম ছাড়া অন্য বিধান অবলম্বন করলে মানুষ অপদস্থ হয়। উমার ফারুক বলেছেন,
إِنَّا كُنَّا أَدْلَّ قَومٍ فَأَعَزَّنَا اللهُ بِالإِسْلَامِ، فَمَهِمَا تَطلُبِ العِزَّ بِغَيرِ مَا أَعَزَّنَا اللَّهُ بِهِ، أَذَلَّنَا اللَّه
'আমরা ছিলাম সবার চেয়ে নিকৃষ্ট জাতি। আল্লাহ আমাদেরকে ইসলাম দ্বারা সম্মান দান করেছেন। সুতরাং আল্লাহ আমাদেরকে যে জিনিস দ্বারা সম্মানিত করেছেন, তা ছাড়া অন্য জিনিস দ্বারা যখনই আমরা সম্মান অনুসন্ধান করব, তখনই আল্লাহ আমাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন।' অন্য এক বর্ণনায় আছে, 'আমরা এমন এক জাতি, যাদেরকে আল্লাহ ইসলাম দ্বারা সম্মানিত করেছেন। সুতরাং আমরা তা ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা সম্মান অনুসন্ধান করব না।' (হাকেম ২০৭-২০৮, ৪৪৮১, সহীহ তারগীব ২৮৯৩ নং, সিলসিলাহ সহীহাহ ১/১১৭)
বলা বাহুল্য, আল্লাহর অনুগত বান্দা সম্মানীয় আল্লাহর সম্মান দানের ফলে, সে তাঁকে নিয়েই শক্তিশালী। সে নিজ কর্মে প্রশংসনীয়, পরিণামে সফলকাম। পক্ষান্তরে পাপাচারী লাঞ্ছিত। সে আল্লাহর অনুগত নয়, তাই তার কোন সম্মান নেই। সে নিজ কর্মে নিন্দনীয় এবং পরিণামে অকৃতকার্য। মহানবী বলেছেন,
وَجُعِلَ الدَّلَّةُ وَالصَّغَارُ عَلَى مَن خَالَفَ أَمْرِي».
"অপমান ও লাঞ্ছনা রাখা হয়েছে আমার আদেশের বিরোধীদের জন্য।" (আহমাদ ৫১১৪-৫১১৫, ৫৬৬৭, শুআবুল মান ৯৮, সঃ জামে' ২৮৩১নং)
মহানবী-এর বিরোধীরা পাপাচারী দুইভাবেঃ-
এক: তাঁর আদেশ-নিষেধ পালন না করার মাধ্যমে অবাধ্যাচরণ ক'রে। তাদের মাঝে থাকে কুপ্রবৃত্তি ও আত্মতৃপ্তির আচরণ।
দুইঃ তাঁর শরীয়তে নতুন কিছু আবিষ্কার ক'রে। তাদের মাঝে থাকে সন্দিহান ও খেয়ালখুশির আচরণ।
আর দুই শ্রেণীর বিরুদ্ধাচরণেই আছে লাঞ্ছনা ও অপমান।
ইসলামী সমাজে আল্লাহর অনুগত বান্দাগণ সম্মান পেয়ে থাকে। আল্লাহই তাদেরকে সম্মানিত করেন এবং তাঁর অনুগত বান্দাগণও তাদেরকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করে। পক্ষান্তরে আল্লাহর অবাধ্য বান্দাগণ অসম্মান পেয়ে থাকে। আল্লাহই তাদেরকে অসম্মানিত করেন এবং তাঁর অনুগত বান্দাগণও তাদেরকে অসম্মান ও অশ্রদ্ধা করে। ইবনুল কাইয়েম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,
وَهُوَ الْمُعِزُّ لِأَهْل طَاعَتِهِ وَذَا عِزُّ حَقِيقِيُّ بِلَا بُطَلَان دَّارَينِ ذَلَّ شَقًّا وَذَلَّ هَوَان وَهُوَ الْمُذِلُّ لِمَنْ يَشَاءُ بِذِلَّةِ الـ .
অর্থাৎ, তিনিই নিজ অনুগতদের সম্মানদাতা এবং সেই নিঃসন্দেহে প্রকৃত সম্মানী। আর তিনিই যাকে ইচ্ছা ইহ-পরকালে দুর্ভাগ্য ও লাঞ্ছনা দিয়ে অপমান ক'রে থাকেন। (আল-কাফিয়াতুশ শাফিয়াহ ২১৩পৃঃ)
লক্ষণীয় যে, মুসলিম উম্মাহ আজ লাঞ্ছনা ও দুর্দশার শিকার। আর নিশ্চিতরূপে তার কারণ হল পাপাচরণ ও দ্বীন থেকে বিমুখ হওয়ার অনিবার্য পরিণতি। দুনিয়ার দিকে বেশি ঝুঁকে পড়া এবং তার জন্য দ্বীনকে পশ্চাতে ফেলার ফল স্বরূপ সকল জাতির কাছে সে অবহেলিত ও লাঞ্ছিত। দ্বীনকে সঠিকরূপে পালন ও উপস্থাপন করতে অক্ষম তথা দুনিয়াদারিতেও দুর্বল হওয়ার কারণে এ জাতি পশ্চাদ্বর্তী ও অপরের অনুবর্তী।
মহানবী বলেছেন,
يُوشِكُ الْأُمَمُ أَنْ تَدَاعَى عَلَيْكُمْ كَمَا تَدَاعَى الأَكَلَةُ إِلَى قَصْعَتِهَا ». فَقَالَ قَائِلٌ وَمِنْ قِلَّةٍ نَحْنُ يَوْمَئِذٍ قَالَ « بَلْ أَنْتُمْ يَوْمَئِذٍ كَثِيرٌ وَلَكِنَّكُمْ غُثَاءٌ كَغَثَاءِ السَّيْلِ وَلَيَنْزِعَنَّ اللَّهُ مِنْ صُدُورٍ عَدُوِّكُمُ الْمَهَابَةَ مِنْكُمْ وَلَيَقْذِفَنَّ اللَّهُ فِي قُلُوبِكُمُ الْوَهَنَ ». فَقَالَ قَائِلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا الْوَهَنُ قَالَ : حُبُّ الدُّنْيَا وَكَرَاهِيَةُ الْمَوْتِ ..
"অনতিদূরে সকল বিজাতি তোমাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে, যেমন ভোজনকারীরা ভোজপাত্রের উপর একত্রিত হয়। (এবং চারদিক থেকে ভোজন করে থাকে।)" একজন বলল, 'আমরা কি তখন সংখ্যায় কম থাকব, হে আল্লাহর রসূল?' তিনি বললেন, "বরং তখন তোমরা সংখ্যায় অনেক থাকবে। কিন্তু তোমরা হবে তরঙ্গতাড়িত আবর্জনার ন্যায় (শক্তিহীন, মূল্যহীন)। আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের বক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি ভীতি তুলে নেবেন এবং তোমাদের হৃদয়ে দুর্বলতা সঞ্চার করবেন।" একজন বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! দুর্বলতা কী?' তিনি বললেন, "দুনিয়াকে ভালোবাসা এবং মরতে না চাওয়া।" (আবু দাউদ ৪২৯৯, মুসনাদে আহমাদ ২২৩৯৭নং)
দুনিয়ার নেতৃত্বদানের জন্য যে জাতির অভ্যুত্থান, যে জাতি সারা বিশ্বের সুউন্নত জাতি, সে জাতির উন্নয়নের শর্ত খুইয়ে বসে অবনতির শিকারে পরিণত হয়েছে। আজ শুধু বিজাতিরাই নয়, স্বজাতি ও নিজেরাও নিজেদেরকে হেয় ও তুচ্ছ ধারণা করতে শুরু করেছে। অথচ মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ } (۱۳۹) سورة آل عمران
"তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না, তোমরাই হবে সর্বোপরি (বিজয়ী); যদি তোমরা মু'মিন হও।" (আলে ইমরানঃ ১৩৯)
'মু'মিন হওয়া'র শর্ত পালন করতে পারেনি এ জাতি, তাই সে আজ হীনবল ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, লাঞ্ছিত, অবহেলিত ও পদদলিত। সংগ্রামের সাথে দ্বীনের দিকে প্রত্যাবর্তন না করলে এবং দুনিয়ার উপর দ্বীনকে প্রাধান্য না দিলে এ জাতি দুনিয়াতে সম্মান পাবে না।
মহানবী বলেছেন,
إِذَا تَبَايَعْتُمْ بِالْعِينَةِ وَأَخَذْتُمْ أَدْنَابَ الْبَقَرِ وَرَضِيتُمْ بِالزَّرْعِ وَتَرَكْتُمُ الْجِهَادَ سَلَّطَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ دُلا لَا يَنْزِعُهُ حَتَّى تَرْجِعُوا إِلَى دِينِكُمْ ..
"যখন তোমরা 'ঈনাহ' ব্যবসা করবে এবং গরুর লেজ ধরে কেবল চাষ-বাস নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে, আর জিহাদ ত্যাগ করে বসবে, তখন আল্লাহ তোমাদের উপর এমন হীনতা চাপিয়ে দেবেন; যা তোমাদের হৃদয় থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত দূর করবেন না; যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের দ্বীনের প্রতি প্রত্যাবর্তন করেছ।" (আহমাদ ৫৫৬২, আবু দাউদ ৩৪৬৪, বাইহাকী ১০৪৮৪নং)
আবু উমামা ফাল ও হাল-চাষের কিছু সাজ-সরঞ্জাম দেখে বললেন, আমি শুনেছি নবী বলেছেন,
لَا يَدْخُلُ هَذَا بَيْتَ قَوْمٍ إِلَّا أَدْخَلَهُ اللَّهُ الدُّلَّ).
"যে জাতির ঘরে এই জিনিস প্রবেশ করবে, সেই জাতির ঘরে আল্লাহ লাঞ্ছনা প্রবিষ্ট করবেন।" (বুখারী ২৩২১, ত্বাবারানীর আওসাত্ম ৮৯২১নং)
সংগ্রামী জাতি উন্নত থাকে, যারা মরতে জানে, তারাই বেঁচে থাকে। সংগ্রাম-বিমুখ হলে জাতি শুধু অবহেলিতই নয়, বরং এক সময় ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মহানবী বলেন,
.... فِرْقَةٌ يَأْخُذُونَ أَدْنَابَ الْبَقَرِ وَالْبَرِّيَّةِ وَهَلَكُوا .......
"----- এক সম্প্রদায় হবে, যারা গরুর লেজ ধরে চাষবাস করবে এবং জিহাদে বিমুখতা প্রকাশ করবে, তারা হবে ধ্বংস।" (আবু দাউদ ৪৩০৬, মিশকাত ৫৪৩২ নং)
সঠিক জিহাদ ও সংগ্রাম জাতিকে উজ্জীবিত করে, প্রাণহীনে প্রাণদান করে। আর সঠিক দ্বীনের দিকে প্রত্যাবর্তন না করলে সঠিক জিহাদ ও সংগ্রাম করতেও জাতি ভ্রষ্ট হবে। সুতরাং সঠিকভাবে ফিরতে হবে সেই দ্বীনের দিকে, যে দ্বীন ছিল মহানবী ও সাহাবার যুগে।
আবু ওয়াক্বেদ লাইযী বলেন, একদা আমরা এক বিছানার উপর বসে ছিলাম। রসূল বলেন, "অদূর ভবিষ্যতে ফিতনা দেখা দেবে।" সকলে বলল, 'তখন আমরা কী করব হে আল্লাহর রসূল?' তিনি বিছানায় হাত রেখে খামচে ধরে বললেন, "এইরূপ করবে।" আরো একদিন রাসূলুল্লাহ লোকেদেরকে বললেন, "অদূর ভবিষ্যতে ফিতনা দেখা দেবে।"
কিন্তু অনেক লোকে সে কথা শুনতে পেল না। মুআয বললেন, 'তোমরা কি শুনছ, রাসূলুল্লাহ কী বলছেন?' তারা বলল, 'তিনি কী বললেন?'
মুআয বললেন, তিনি বললেন, "অদূর ভবিষ্যতে ফিতনা দেখা দেবে।" লোকেরা বলল, 'তাহলে আমরা কী করতে পারি হে আল্লাহর রসূল?' তিনি বললেন,
تَرْجِعُونَ إِلَى أَمْرِكُمُ الْأَوَّل
"তোমরা তোমাদের প্রথম বিষয়ে ফিরে যাবে।" (ত্বাহাবীর মুশকিলুল আষার ৪৮১১, সিঃ সহীহাহ ৩১৬৫নং)
বলা বাহুল্য, জাতির উচিত, সর্বাগ্রে সেই প্রথম বিষয়ের দিকে প্রত্যাবর্তন করা। সকল বিষয়ে রাসূল ও সাহাবার আদর্শের দিকে রুজু করা। আক্বীদা, ইবাদত, ব্যবহার ও রাজকার্যের সকল ক্ষেত্রে তাঁদের আদর্শ নির্দ্বিধায় বরণ ক'রে নেওয়া। ইমাম মালেক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,
لَنْ يَصْلُحَ آخِرُ هَذِهِ الْأُمَّةِ، إِلَّا بِمَا صَلَحَ بِهِ أَوَّلُهَا».
"প্রথম দল যা নিয়ে সংশুদ্ধ ছিল, তা ব্যতিরেকে এ উম্মতের শেষ দল কখনই সংশুদ্ধ হতে পারে না।"
📄 যে পাপের শাস্তি সত্ত্বর দুনিয়াতেই ভুগতে হয়
কিছু পাপ আছে, যার শাস্তি দুনিয়াতেই ত্বরান্বিত করা হয়। পরন্তু আখেরাতেও তার শাস্তি অপেক্ষমাণ থাকে। তার মধ্যে বিদ্রোহ ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা অন্যতম। মহানবী বলেছেন,
مَا مِنْ ذَنْبٍ أَجْدَرُ أَنْ يُعَجِّلَ اللَّهُ تَعَالَى لِصَاحِبِهِ الْعُقُوبَةَ فِي الدُّنْيَا - مَعَ مَا يَدَّخِرُ لَهُ فِي الآخِرَةِ - مِثْلُ الْبَغْيِ وَقَطِيعَةِ الرَّحِمِ ..
"যুলুমবাজী ও (রক্তের) আত্মীয়তা ছিন্ন করা ছাড়া এমন উপযুক্ত আর কোন পাপাচার নেই, যার শাস্তি পাপাচারীর জন্য দুনিয়াতেই আল্লাহ অবিলম্বে প্রদান করে থাকেন এবং সেই সাথে আখেরাতের জন্যও জমা করে রাখেন।" (আহমাদ ২০৩৭৪, ২০৩৯৯, বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ ২৯, আবু দাউদ ৪৯০৪, তিরমিযী ২৫১১, ইবনে মাজাহ ৪২১১নং, হাকেম ৩৩৫৯, ইবনে হিব্বান ৪৫৫, সহীহুল জামে' ৫৭০৪নং)
لَيْسَ شَيْءٌ أَطِيعَ اللَّهُ فِيهِ أَعْجَلَ ثَوَابًا مِنْ صِلَةِ الرَّحِمِ وَلَيْسَ شَيْءٌ أَعْجَلَ عِقَابًا مِنَ الْبَغْيِ وَقَطِيعَةِ الرَّحِمِ وَالْيَمِينِ الْفَاجِرَةِ تَدَعُ الدِّيَارَ بَلاقِعَ ..
"আল্লাহর আনুগত্য করা হয় এমন আমলের মধ্যে সবচেয়ে বেশী তাড়াতাড়ি যে আমলের সওয়াব পাওয়া যায়, তা হল আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখা। আর যে বদ আমলের শাস্তি সত্বর দেওয়া হয়, তা হল বিদ্রোহ, আত্মীয়তার বন্ধন ছেদন করা এবং মিথ্যা কসম খাওয়া, যা দেশ-মাটিকে মরুময় ক'রে তোলে।" (বাইহাকী ২০৩৬৪, সহীহুল জামে' ৫৩৯১নং)
((بَابَانِ مُعَجَّلان عُقُوبَتُهُما فِي الدُّنْيَا البَغْيُ والعُقُوقُ)).
"দুটি (পাপ) দরজা এমন রয়েছে, যার শাস্তি দুনিয়াতেই ত্বরান্বিত করা হয়; বিদ্রোহ ও পিতা-মাতার অবাধ্যাচরণ।" (হাকেম ৭৩৫০, সহীহুল জামে' ২৮১০নং)
((مَا مِنْ ذَنْبٍ أَجْدَرَ أَنْ يُعَجِّلَ الله تَعَالَى لِصَاحِبِهِ الْعُقُوبَةَ فِي الدُّنْيَا مَعْ مَا يَدَّخِرُهُ لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ قَطِيعَةِ الرَّحِمِ وَالْخِيَانَةِ وَالْكَذِبِ وَإِنَّ أَعْجَلَ الطَّاعَةِ ثَوَاباً لَصِلَةُ الرَّحِمِ حَتَّى أَنَّ أَهْلَ الْبَيْتِ لَيَكُونُوا فَجَرَةً فَتَنْمُو أَمْوَالُهُمْ وَيَكْثُرُ عَدَدُهُمْ إِذَا تَوَاصَلُوا)).
"যুলুমবাজী করা, (রক্তের) আত্মীয়তা ছিন্ন করা, খিয়ানত করা ও মিথ্যা বলা ছাড়া এমন উপযুক্ত আর কোন পাপাচার নেই, যার শাস্তি পাপাচারীর জন্য দুনিয়াতেই আল্লাহ অবিলম্বে প্রদান করে থাকেন এবং সেই সাথে আখেরাতের জন্যও জমা করে রাখেন। আর সবচেয়ে শীঘ্র সওয়াব আয়নয়নকারী আনুগত্য হল আত্মীয়তার বন্ধন বজায় করা। এমনকি বাড়ির লোক পাপাচারী (দরিদ্র) হয়, তা সত্ত্বেও আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখার ফলে তাদের ধন ও জনে বৃদ্ধি লাভ হয়।" (ত্বাবারানী, সঃ জামে' ৫৭০৫নং)
শাস্তি ত্বরান্বিতকারী পাপসমূহের মধ্যে রয়েছে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ। মানুষের প্রতি অন্যায়াচরণ করা। আসলে এটা শুরু হয় হিংসা ও অহংকার থেকে। এ আচরণের সবচেয়ে ভীষণ হল মুসলিম সরকারের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করা। অথবা জিহাদের শর্তাবলী পূরণ হওয়ার আগে সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করা।
অবশ্য এটা কেবল গদি দখলের উদ্দেশ্যে হতে পারে, হতে পারে ভুল বুঝে সরকারকে 'কাফের' ধারণা ক'রে। তবে তার ফলে যে পরিণাম সৃষ্টি হয়, তা কম-বেশি সকলের জানা। যেহেতু তখন শুধু জিহাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, চলে যায় গুপ্ত খুন ও সন্ত্রাসে। তা দমন করতে ক্ষমতাসীন সরকার সকল শক্তি ব্যয় করে। আর তখন দেশে যে অশান্তি সৃষ্টি হয় এবং কত শত নিরপরাধ 'উলুখাগড়া'র প্রাণ যায়, তা বর্তমান বিশ্বে প্রায় সকলেই জানতে-দেখতে পারে।
নিঃসন্দেহে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ পূর্ববর্তী জাতির আচরণ। আর মহানবী বলেছেন, "আমার উম্মতের মাঝে পূর্ববর্তী সকল জাতির ব্যাধি এসে পৌঁছবে: অহংকার, প্রত্যাখ্যান, প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা, পার্থিব প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পরস্পর বিদ্বেষ, হিংসা এবং পরিশেষে যুলম বা বিদ্রোহ অতঃপর খুনাখুনি।" (হাকেম, সঃ জামে' ৩৬৫৮নং)
মানুষ বিনয়ী হলে হক গ্রহণ করে, নিজের থেকে ছোট ব্যক্তিত্বের নিকট থেকেও হক মেনে নেয়। কিন্তু অহংকারী হলে হক প্রত্যাখ্যান করে, নিজে জ্ঞানে-মানে ছোট হওয়া সত্ত্বেও বড় ব্যক্তিত্বের নিকট থেকে হক গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। ফলে কথায় ও কাজে সেই 'হামবড়াই' প্রকাশ ও প্রচার করে। গর্ব করে ও নিজেকে হিরো এবং তুচ্ছজ্ঞান ক'রে অপরকে জিরো ভাবে। এটা অন্যায়। আর এ অন্যায়ের শাস্তিও আসে সত্বর।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّمَا بَغْيُكُمْ عَلَى أَنفُسِكُم مَّتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا} (۲۳) سورة يونس
"হে লোক সকল! (শুনে রাখ) তোমাদের বিদ্রোহাচরণ তোমাদেরই (জন্য ক্ষতিকর) হবে, (এ হল) পার্থিব জীবনের উপভোগ্য।" (ইউনুসঃ ২৩)
ইবনে উয়াইনাহ বলেছেন, 'উদ্দেশ্য হল, বিদ্রোহীর জন্য বিদ্রোহের শাস্তি দুনিয়াতেই ত্বরান্বিত করা হয়। বলা হয়, বিদ্রোহই হল বিদ্রোহীর বধ্যভূমি।' (শারহে বুখারী, ইবনে বাত্তাল ৯/২৫৮)
দ্বিতীয় পাপ হল, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা। কোন শরয়ী কারণ ছাড়া আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় না রাখা। তার মধ্যে সবচেয়ে নিকটাত্মীয় হল পিতামাতা। তাদের সাথে সম্পর্ক না রাখা বড় পাপ। আর সে পাপের শাস্তিও পাপী সত্বর দুনিয়াতে ভোগ করে। পিতামাতার দুআ-বদ্দুআ সন্তানের জন্য সত্বর লাগে। অন্য কোন শাস্তি না পেলেও পাপী নিজ সন্তানের নিকট থেকে অনুরূপ প্রতিশোধ দিতে বাধ্য হয়। সে যেমন পিতামাতার সঙ্গে আচরণ করে, তার সন্তানরাও তার সাথে তেমনই আচরণ করে।
এরপর রয়েছে খিয়ানত, বিশ্বাসঘাতকতা ও মিথ্যাবাদিতার সাজা। পরকাল আসার আগেই ইহকালে পাপী প্রত্যক্ষ করে নিজ পাপের প্রতিক্রিয়া। যখন-তখন করে পাপ সময় হলে ফলে।
📄 যে সকল অপরাধের নির্দিষ্ট দন্ডবিধি আছে
ইসলামে বড় বড় কিছু পাপ আছে, যার নির্ধারিত দন্ডবিধি আছে, যাকে 'হদ্দ' বলা হয়। হদ্দ মানে সীমা, বিরত হওয়া।
শরয়ী পরিভাষায় হদ্দ হল, আল্লাহর অধিকারে নির্ধারিত অনিবার্য শাস্তি। নির্ধারিত দন্ডকে 'হদ্দ' এই জন্য বলা হয় যে, মহান সৃষ্টিকর্তা তা সীমাবদ্ধ ও নির্ধারণ করেছেন। আর যেহেতু তা অপরাধীকে পুনর্বার অপরাধ করা হতে বিরত রাখে।
'আল্লাহর অধিকারে' বলতে বুঝানো হয়েছে, তা মানুষের অধিকারভুক্ত নয়। মানুষের অধিকারভুক্ত শাস্তি হল 'কিস্বাস' (খুনের বদলে খুন)।
হদ্দ ও ক্বিস্বাসের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে, আর তা নিম্নরূপঃ-
এক: হদ্দের শাস্তি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত হয়েছে। যেমন চোরের হাত কাটা হবে। কিন্তু ক্বিস্বাসে এখতিয়ার আছে। খুনীকে হত্যা করা হবে অথবা তার নিকট থেকে রক্তপণ নেওয়া হবে অথবা তাকে ক্ষমা করাও যেতে পারে।
দুইঃ ক্বিস্বাসে সুপারিশ বৈধ। কিন্তু হদ্দে সুপারিশ বৈধ নয়। এ ব্যাপারে উসামার হাদীস প্রসিদ্ধ, "হে উসামাহ! তুমি কি আল্লাহর দন্ডবিধিসমূহের এক দন্ডবিধি (কায়েম না হওয়ার) ব্যাপারে সুপারিশ করছ?!" (বুখারী ৩৪৭৫, ৬৭৮৮, মুসলিম ৪৫০৫-৪৫০৭নং, আসহাবে সুনান)
বলা বাহুল্য, ক্বিস্বাসে ত্যাগ স্বীকার ও ক্ষমা করা বৈধ। কিন্তু হদ্দে ত্যাগ স্বীকার বা অভিযোগ প্রত্যাহার করা বৈধ নয়; যখন তা সরকারের কাছে পৌছে যায়।
হদ্দ বা দন্ডবিধির বৈশিষ্ট্যঃ
১। তা হল আল্লাহর অধিকার, মানুষের নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَقْرَبُوهَا} (۱۸۷) سورة البقرة
"এগুলি আল্লাহর সীমারেখা; সুতরাং এর ধারে-পাশে যেয়ো না।" (বাক্বারাহঃ ১৮৭)
{تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ} (۲۲۹)
"এ সব আল্লাহর সীমারেখা। অতএব তা তোমরা লংঘন করো না। আর যারা আল্লাহর (নির্দিষ্ট) সীমারেখা লংঘন করে, তারাই অত্যাচারী।" (বাক্বারাহঃ ২২৯)
২। উক্ত দন্ডবিধির অপরাধ ও তার দন্ড সুনির্ধারিত।
৩। দন্ড দুইভাবে সাব্যস্ত হবে: স্বীকার করার মাধ্যমে অথবা সাক্ষীর ভিত্তিতে।
৪। দন্ডবিধি প্রয়োগ করবে রাষ্ট্রপ্রধান অথবা তার প্রতিনিধি (প্রশাসন)। সাধারণ মানুষের জন্য তা প্রয়োগ করা বৈধ নয়।
৫। দন্ডবিধিতে সুপারিশ বা ক্ষমা বৈধ নয়। যেমন পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। মহানবী বলেছেন,
مَنْ حَالَتْ شَفَاعَتُهُ دُونَ حَدٍ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ فَقَدْ ضَادَّ اللَّهَ ..
"যে ব্যক্তির সুপারিশ আল্লাহর 'হদ্দ' (দন্ডবিধি) সমূহ হতে কোন 'হদ্দ' কায়েম করাতে বাধা সৃষ্টি করল, সে ব্যক্তি নিশ্চয় আল্লাহ আয্যা অজাল্লার বিরোধিতা করল।" (আবু দাউদ ৩৫৯৯, হাকেম ২/২৭, তাবারানী ১৩২৫৪, বাইহাকী ১১৭৭৩, সহীহুল জামে' ৬১৯৬নং)
৬। অপরাধ প্রমাণে সামান্য সন্দেহ হলে দন্ডবিধি প্রয়োগ করা যাবে না। (অন্য শাস্তি দেওয়া যাবে।)
৭। নির্ধারিত দন্ডবিধিই হল নির্দিষ্ট অপরাধের সর্বশেষ পর্যায়ের সর্বোচ্চ শাস্তি। তার বেশি শাস্তি দেওয়া বৈধ নয়।
দন্ড কি শুধু পাপ বন্ধ করার জন্য, নাকি পাপখন্ডন করার জন্যও?
দন্ডবিধি এসেছে অপরাধীর অপরাধ বন্ধ করার জন্য। যাতে সে পুনর্বার আর ঐ অপরাধে লিপ্ত না হয় এবং তা দেখে অন্যেরাও শিক্ষা পেয়ে অপরাধে পদক্ষেপ না করে।
তবে তা পাপ খন্ডন করে এবং পরকালের শাস্তি মকুব করে কি না, তা নিয়ে দুই রকম বর্ণনা পাওয়া যায়।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّمَا جَزَاء الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقْتَلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ } (৩৩) সূরা মায়েদা
"যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করে (অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়) তাদের শাস্তি এই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা বিপরীত দিক হতে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ হতে নির্বাসিত করা হবে। ইহকালে এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও পরকালে তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে।" (মায়িদাহঃ ৩৩)
পক্ষান্তরে হাদীসের বর্ণনায় আছে, মহানবী বলেছেন,
بَايِعُونِي عَلَى أَنْ لَا تُشْرِكُوا بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا تَسْرِقُوا وَلَا تَزْنُوا ... فَمَنْ وَفَى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَعُوقِبَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَتُهُ وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَسَتَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ إِنْ شَاءَ غَفَرَ لَهُ وَإِنْ شَاءَ عَذَّبَهُ)).
"তোমরা আমার সাথে বায়াত কর এই মর্মে যে, আল্লাহর সঙ্গে কোন কিছুকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে তা পালন করবে, তার পুরস্কার আল্লাহর দায়িত্বে। আর যে ব্যক্তি উক্ত কিছুতে লিপ্ত হবে এবং তাকে শাস্তি দেওয়া হবে, তা তার কাফ্ফারা (প্রায়শ্চিত্ত) হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি উক্ত কিছুতে লিপ্ত হবে এবং আল্লাহ তাকে (দুনিয়াতে) গোপন করবেন, (আখেরাতে) তিনি চাইলে তাকে ক্ষমা ক'রে দেবেন, না চাইলে তাকে শাস্তি দেবেন।" (বুখারী ৩৮৯২, ৬৭৮৪, মুসলিম ৪৫৫৮নং)
অন্য বর্ণনায় আছে,
فَمَنْ وَفَى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ وَمَنْ أَتَى مِنْكُمْ حَدًّا فَأَقِيمَ عَلَيْهِ فَهُوَ كَفَّارَتُهُ ..
"---সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে তা পালন করবে, তার পুরস্কার আল্লাহর দায়িত্বে। আর যে ব্যক্তি কোন দন্ডনীয় অপরাধ করবে এবং তার উপর দন্ড প্রয়োগ করা হবে, তা তার জন্য কাফ্ফারা হয়ে যাবে।" (মুসলিম ৪৫৬০নং)
অবশ্য দন্ড পাওয়ার সাথে সাথে তওবা করলে আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমাশীল, দয়াবান। মহানবী সেই ব্যক্তির ব্যপারে বলেছিলেন, যাকে ব্যভিচারের শাস্তি প্রদান ক'রে হত্যা করা হয়েছিল,
لَقَدْ تَابَ تَوْبَةً لَوْ قُسِمَتْ بَيْنَ أُمَّةٍ لَوَسِعَتْهُمْ ..
"সে এমন তওবা করেছে যে, যদি তা কোন উম্মতের মধ্যে বন্টন ক'রে দেওয়া হতো, তাহলে তা তাদের জন্য যথেষ্ট হতো।" (মুসলিম ৪৫২৭নং)
আর সেই গামেদিয়া মহিলার ব্যাপারে বলেছিলেন, যাকে ব্যভিচারের দন্ড প্রয়োগ ক'রে হত্যা করা হয়েছিল,
لَقَدْ تَابَتْ تَوْبَةً لَوْ قُسِمَتْ بَيْنَ سَبْعِينَ مِنْ أَهْلِ المَدِينَةِ لَوَسِعَتْهُمْ، وَهَلْ وَجَدْتَ أَفْضَلَ مِنْ أَنْ جَادَتْ بنفسها الله - عز وجل - ؟!))
"এই স্ত্রী লোকটি এমন বিশুদ্ধ তওবা করেছে, যদি তা মদীনার ৭০টি লোকের মধ্যে বন্টন করা হতো, তাহলে তা তাদের জন্য যথেষ্ট হতো। এর চেয়ে কি তুমি কোন উত্তম কাজ পেয়েছ যে, সে মহান আল্লাহর জন্য নিজের প্রাণকে কুরবান ক'রে দিল?" (মুসলিম ৪৫২৮-৪৫২৯নং)
মুর্তাদ হওয়ার দন্ডঃ
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَن يَرْتَدِدْ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُوْلَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَأُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} (۲۱۷) سورة البقرة
"তোমাদের মধ্যে যে কেউ নিজ ধর্ম ত্যাগ করে এবং সে সত্যপ্রত্যাখ্যানকারী (কাফের) রূপে মৃত্যুবরণ করে, তাদের ইহকাল ও পরকালের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। তারাই দোযখবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।" (বাক্বারাহঃ ২১৭)
মহানবী বলেছেন,
لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّى رَسُولُ اللَّهِ إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ الثَّيِّبُ الزَّانِي وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ وَالتَّارِكُ لِدِينِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ ..
"তিন ব্যক্তি ছাড়া 'আল্লাহ ব্যতীত কেউ সত্য উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর রসূল' এ কথায় সাক্ষ্যদাতা কোন মুসলিমের খুন (কারো জন্য) বৈধ নয়; বিবাহিত ব্যভিচারী, খুনের বদলে হত্যাযোগ্য খুনী এবং দ্বীন ও জামাআত ত্যাগী।" (বুখারী ৬৮৭৮, মুসলিম ৪৪৬৮-৪৪৭০নং আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ)
উল্লেখ যে, ইসলাম একমাত্র আল্লাহর দ্বীন। ইসলাম গ্রহণ করতে কাউকে বাধ্য করা যাবে না। কিন্তু ইসলাম থেকে বের হওয়ার কারো এখতিয়ার নেই। তাই গ্রহণের পর প্রত্যাখ্যানের এত বড় সাজা।
আল্লাহ বা রসূলকে গালি দেওয়ার দন্ডঃ
কোন মুসলিম আল্লাহ বা তাঁর রসূলকে গালি দিলে সে কাফের ও মুর্তাদ হয়ে যায়। তাই সরকার তারও শাস্তি মৃত্যুদন্ড দান করে।
আবু বাকর সিদ্দীক -এর খিলাফতকালে ইয়ামানের দুই মহিলা মহানবী-এর নিন্দা ক'রে গান গেয়েছিল। সেখানকার গভর্নর মুহাজির বিন আবী রাবীআহ শান্তি স্বরূপ তাদের হাত কেটে নিয়েছিলেন এবং দাঁত ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। সে খবর পেয়ে সিদ্দীক তাঁকে লিখে পাঠান,
(لولا ما سبقتني فيها لأمرتك بقتلها، لأن حد الأنبياء ليس يشبه الحدود، فمن تعاطى ذلك من مسلم فهو مرتد أو معاهد فهو محارب غادر)).
'যদি ওর ব্যাপারে তুমি আমার আগাম ব্যবস্থা না নিতে, তাহলে আমি তোমাকে আদেশ দিতাম যে, তুমি ওকে হত্যা করে দাও। কারণ আম্বিয়াগণের ব্যাপারে কৃত অপরাধের দন্ডবিধি অন্যান্য দন্ডবিধির সদৃশ নয়। সুতরাং কোন মুসলিম সে অপরাধ করলে সে মুর্তাদ হয়ে যায় এবং কোন (অমুসলিম) চুক্তিবদ্ধ মানুষ সে অপরাধ করলে চুক্তি ভঙ্গকারী যুদ্ধকামীতে পরিণত হয়। (আবু বাক্স সিদ্দীক ৪/৬১)
একদা দ্বিতীয় খলীফা উমার বিন খাত্তাব -এর নিকট এক ব্যক্তিকে ধরে আনা হল, সে আল্লাহর রসূল -কে গালি দিতো। তিনি তাকে হত্যা করলেন এবং বললেন,
(من سب الله أو سب أحدا من الأنبياء فاقتلوه.
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আল্লাহকে গালি দেবে অথবা কোন এক নবীকে গালি দেবে, তাকে হত্যা কর। (আসফাহানী, কানযুল উম্মাল ৩৫৪৬৫নং)
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ)কে মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসকারী শান্তিপ্রিয় এমন অমুসলিমের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হল, যে মহানবী -কে গালি দেয়, তার শাস্তি কী? উত্তরে তিনি বললেন, 'অপরাধ প্রমাণিত হলে নবী -কে গালিদাতা ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে, তাতে সে মুসলিম হোক অথবা অমুসলিম।' (খাল্লাল, আস্-স্বারিম ১/১০)
ব্যভিচারের দন্ডঃ
বিবাহ বা বিবাহ-অনুরূপ সম্পর্ক বহির্ভূত নারী-পুরুষের সঙ্গমকে ব্যভিচার বলা হয়।
ইসলাম কেবল ব্যভিচারের শাস্তি ঘোষণা করেই চুপ থাকেনি, বরং যাতে মানুষ সেই শাস্তির উপযুক্ত না হয়, তারও নানা ব্যবস্থা রেখেছে। আর এর জন্য সবচেয়ে বড় ব্যবস্থা হল বিবাহ।
সুতরাং সঠিক বিবাহ বন্ধনের সাথে নারী-পুরুষ দৈহিক মিলন করলে তাদের যৌনক্ষুধাও নিবারিত হবে এবং সেটা কোন অপরাধ হবে না। তবে সঠিক বিবাহ বন্ধন হওয়ার ৪টি শর্ত রয়েছে:-
এক: বর-কনের প্রস্তাব ও গ্রহণ (উভয়ের সম্মতিক্রমে কাযীর মাধ্যমে ঈজাব-কবুল হতে হবে)।
দুইঃ মোহর হতে হবে (যদিও তা অনির্ধারিত বা ঋণ হিসাবে থাকে)।
তিনঃ মেয়ের অভিভাবকের সম্মতি থাকতে হবে।
চারঃ বন্ধনের সময় দুজন মুসলিম সাক্ষী থাকতে হবে।
উক্ত চারটির মধ্যে একটি শর্ত না পাওয়া গেলে বিবাহ শুদ্ধ নয়। আর সে ক্ষেত্রে যদি কোন যুবক-যুবতী অশুদ্ধ বন্ধন নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সংসার করে, তাহলে তাদেরকে ব্যভিচারের দন্ড দেওয়া যাবে না। কারণ সেটা সন্দিহান। আর সন্দেহের কারণে দন্ডবিধি প্রয়োগ প্রতিহত হয়।
বলা বাহুল্য, ইসলাম ব্যভিচারকে হারাম ঘোষণা করেছে। বরং তার নিকটবর্তী হতে নিষেধ ক'রে মহান আল্লাহ বলেছেন,
(وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبِيلاً) (۳۲) سورة الإسراء
"তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।" (বানী ইস্রাঈল: ৩২)
নিঃসন্দেহে ব্যভিচার একটি অশ্লীলতা ও মহাপাপ; যদিও তা বিবাহের পূর্বে ভালোবাসার নামে হয়। মহান কৌশলময় আল্লাহ মুসলিমকে এমন জঘন্য পাপে লিপ্ত হওয়া এবং তার শাস্তি পেয়ে লাঞ্ছিত হওয়া থেকে সুরক্ষিত রাখার মানসে নানাবিধ ব্যবস্থা ও তদবীর প্রদান করেছেন। যাতে তার মান-সম্ভ্রম ও তার পরিবারের মর্যাদা ধূলিসাৎ না হয়ে যায়। যাতে মুসলিম তার জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে না দেয় এবং আল্লাহর দেওয়া জীবনকে আল্লাহরই ইবাদতে ব্যয় করতে পারে। আর সেই সাথে অন্য মুসলিমেরও মান-সম্ভ্রম অক্ষত ও বজায় থাকে।
ব্যভিচার বন্ধের লক্ষ্যে সংক্ষেপে কিছু তদবীর নিম্নরূপঃ-
১। শরীয়ত মুসলিম যুবককে বিবাহ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَأَنكِحُوا الْأَيَامَى مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ إِن يَكُونُوا فُقَرَاء يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ) (۳۲) سورة النور
"তোমাদের মধ্যে যাদের স্বামী-স্ত্রী নেই, তাদের বিবাহ সম্পাদন কর এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎ, তাদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত ক'রে দেবেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।" (নূরঃ ৩২)
মহানবী বলেছেন,
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجُ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءَ ..
"হে যুবকদল! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি (বিবাহের অর্থাৎ স্ত্রীর ভরণপোষণ ও রতিক্রিয়ার) সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কারণ, বিবাহ চক্ষুকে দস্তুরমত সংযত করে এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করে। আর যে ব্যক্তি ঐ সামর্থ্য রাখে না সে যেন রোযা রাখে। কারণ, তা যৌনেন্দ্রিয় দমনকারী।" (বুখারী ৫০৬৫-৫০৬৬, মুসলিম ৩৪৬৪-৩৪৬৬, মিশকাত ৩০৮০নং)
শরীয়ত বিবাহ করাকে অর্ধেক ঈমান হিসাবে গণ্য করেছে। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
((مَنْ تَزَوَّجَ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ نِصْفَ الإِيمَانِ فَلْيَتَّقِ اللَّهُ فِي النَّصْفِ الْبَاقِي)).
“যে ব্যক্তি বিবাহ করে, সে তার অর্ধেক ঈমান পূর্ণ করে, অতএব বাকী অর্ধেকাংশে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।" (ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৭৬৪৭, ৮৭৯৪, সঃ জামে' ৬১৪৮নং)
শুধু তাই নয়, বরং ইসলাম স্ত্রীকে দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসাবে গণ্য করেছে এবং মিলনের মাঝে সওয়াবও নিহিত রেখেছে। এ ছাড়া বিবাহ করা হল সকল নবীর সুন্নত।
২। শরীয়ত বিবাহ সহজ করার লক্ষ্যে তার মোহর কম করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। মহানবী বলেন,
(إِنَّ مِنْ يُمْنِ الْمَرْأَةِ تَيْسِيرَ خِطْبَتِهَا وَتَيْسِيرَ صَدَاقِهَا وَتَيْسِيرَ رَحِمِهَا)).
"নারীর অন্যতম বর্কত এই যে, তার পয়গাম সহজ হবে, তার মোহর স্বল্প হবে এবং তার গর্ভাশয় সন্তানময় হবে।" (আহমাদ ২৪৪৭৮, হাকেম ২৭৩৯, বাইহাক্বী ১৪৭৪৬, সঃ জামে' ২২৩৫নং)
৩। স্ত্রীর সাথে সদ্ব্যবহার করতে আদেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا } (۱۹) سورة النساء
"তাদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন কর; তোমরা যদি তাদেরকে ঘৃণা কর, তাহলে এমন হতে পারে যে, আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তাকে ঘৃণা করছ।" (নিসাঃ ১৯)
আর মহানবী বলেছেন,
اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْراً )).
"তোমরা স্ত্রীদের জন্য মঙ্গলকামী হও।" (বুখারী ৩৩৩১, মুসলিম ৩৭২০নং)
যেমন পরস্পরের মাঝে আকর্ষণ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে উভয়কেই সাজসজ্জা করতে উৎসাহিত করা হয়েছে।
৪। স্বামী-স্ত্রীকে একে অন্য থেকে দীর্ঘ সময় দূরে না থাকতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে কোন পুরুষকে সেই স্ত্রীর কাছে যেতে ও নির্জনতা অবলম্বন করতে নিষেধ করা হয়েছে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, স্বামী-স্ত্রীর অন্যাসক্ত হয়ে পড়ার পিছনে দ্বীনদারির অবর্তমানতা ছাড়া আরও তিনটি কারণ রয়েছে:-
(ক) কথাবার্তা, ব্যবহার ও আচরণে প্রেমের আবেশ না থাকা। (রোমান্স না থাকা।)
(খ) অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন দেখা দেওয়া এবং স্বামীর সে প্রয়োজন মিটাতে না পারা।
(গ) দৈহিক মিলনে আসক্তি না থাকা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মিলনে স্ত্রীর আসক্তি ও আগ্রহ থাকে না। তাই শরীয়ত স্ত্রীকে সতর্ক করেছে নানা ভাবে। মহানবী বলেছেন,
(( إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فَرَاشِهِ فَلَمْ تَأْتِهِ ، فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا، لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ )). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"যদি কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে নিজ বিছানায় ডাকে এবং সে না আসে, অতঃপর সে (স্বামী) তার প্রতি রাগান্বিত অবস্থায় রাত কাটায়, তাহলে ফিরিস্তাগণ তাকে সকাল অবধি অভিসম্পাত করতে থাকেন।" অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, "যখন স্ত্রী নিজ স্বামীর বিছানা ত্যাগ করে (অন্যত্র) রাত্রিযাপন করে, তখন ফিরিশাবর্গ সকাল পর্যন্ত তাকে অভিশাপ দিতে থাকেন।" আর এক বর্ণনায় আছে যে, "সেই আল্লাহর কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! কোন স্বামী তার স্ত্রীকে নিজ বিছানার দিকে আহবান করার পর সে আসতে অস্বীকার করলে যিনি আকাশে আছেন তিনি (আল্লাহ) তার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন, যে পর্যন্ত না স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যায়।" (বুখারী ৫১৯৩, মুসলিম ১৪৩৬, আবু দাউদ ২১৪১নং, নাসাঈ)
মহানবী বলেছেন,
((لَا تَصُومُ الْمَرْأَةُ يَوْمًا فِي غَيْرِ رَمَضَانَ وَزَوْجُهَا شَاهِدٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ)).
"মহিলা যেন স্বামীর বর্তমানে তার বিনা অনুমতিতে রমযানের রোযা ছাড়া একটি দিনও রোযা না রাখে।" (দারেমী ১৭২০নং)
৫। দাম্পত্যের চাকা অচল হলে শরীয়ত বিবাহ-বিচ্ছেদকে সহজ করেছে। কোনও বড় ক্ষতি বা ত্রুটির ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে।
৬। পুরুষের জন্য একাধিক বিবাহ বৈধ করা হয়েছে। এর পশ্চাতে একাধিক যুক্তি রয়েছে।
(ক) পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেশি।
(খ) পুরুষের সংখ্যা যুদ্ধ-বিগ্রহ প্রভৃতি দুর্ঘটনায় বেশি কমতে থাকে।
(গ) বিবাহের বয়সোত্তীর্ণা, তালাকপ্রাপ্তা ও বিধবাদের সংসার গড়তে বহু বিবাহই একটি বড় সমাধান।
এ ক্ষেত্রে যদি মহিলা স্বামীহীনা থেকে পিছল পথে পা বাড়ায়, তাহলে ব্যভিচারে আছড়ে পড়া ছাড়া আর কী হতে পারে?
পরন্তু বহু বিবাহের শর্ত আছে, তা পূরণ না হলে বহু বিবাহ বৈধ নয়।
(ক) স্বামীর যেন এমন বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা থাকে, যার মাধ্যমে সে একাধিক স্ত্রীর সংসার সুষ্ঠুভাবে সামাল দিতে সক্ষম হয়।
(খ) স্ত্রীদের ভরণপোষণের জন্য আর্থিক ক্ষমতা তথা তাদের যৌন চাহিদার মিটানোর জন্য যৌন ক্ষমতা বর্তমান থাকে।
(গ) স্ত্রীদের মাঝে যেন ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা বজায় থাকে। নচেৎ একাধিক বিবাহ বৈধ নয়।
একাধিক পুরুষ একটি মহিলার জীবনে শান্তি আনতে পারে না। তাছাড়া মহিলা একাধিক স্বামী গ্রহণ করলে বংশধারা ও সন্তানের পিতৃপরিচয় হারিয়ে যাবে।
৭। ইসলাম মদ্যপানকে হারাম করেছে। কারণ মদের নেশা ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায়। সাধারণতঃ মদ্যপায়ীরাই বেশি ব্যভিচারী হয়ে থাকে।
৮। ইসলাম গান-বাজনা শোনাকে হারাম করেছে। কারণ অধিকাংশ গানে যৌন অনুভূতি জাগ্রত করে। আরবীতে বলা হয়, 'ইন্নাল গিনা বারীদুয যিনা।' অর্থাৎ, গান হল ব্যভিচারের ডাকঘর।
৯। ব্যভিচারের পথ বন্ধ করতে এবং যৌন-ক্ষুধা নিবারণ করতে শরীয়ত রোযা রাখা বিধিবদ্ধ করেছে। মহানবী বলেছেন,
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجُ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ ..
"হে যুবকদল! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি (বিবাহের অর্থাৎ স্ত্রীর ভরণপোষণ ও রতিক্রিয়ার) সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কারণ, বিবাহ চক্ষুকে দস্তুরমত সংযত করে এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করে। আর যে ব্যক্তি ঐ সামর্থ্য রাখে না সে যেন রোযা রাখে। কারণ, তা যৌনেন্দ্রিয় দমনকারী।" (বুখারী ৫০৬৫-৫০৬৬, মুসলিম ৩৪৬৪-৩৪৬৬, মিশকাত ৩০৮০নং)
১০। মহিলাদেরকে বাড়ির ভিতরে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى} (৩৩) سورة الأحزاب
"তোমরা স্বগৃহে অবস্থান কর এবং (প্রাক-ইসলামী) জাহেলী যুগের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়িয়ো না।" (আহযাবঃ ৩৩)
আর মহানবী বলেছেন,
المرأة عورة وإنها إذا خرجت من بيتها استشرفها الشيطان وإنها لا تكون أقرب إلى الله منها في قعر بيتها.
"মেয়ে মানুষ (সবটাই) লজ্জাস্থান (গোপনীয়)। আর সে যখন নিজ বাড়ি থেকে বের হয়, তখন শয়তান তাকে পুরুষের দৃষ্টিতে সুশোভন করে তোলে। সে নিজ বাড়ির অন্দর মহলে অবস্থান ক'রে আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী থাকে।" (ত্বাবারানীর আওসাত্ব ২৮৯০, সহীহ তারগীব ৩৪৪নং)
পুরুষের জন্য নারী সবচেয়ে বড় ফিতনা। তাই অতি প্রয়োজন ছাড়া তাকে পর-পুরুষের চোখে সহজলভ্য হতে নিষেধ করা হয়েছে।
১১। অপরের বাড়ি প্রবেশের অনুমতি তথা আরো অন্যান্য আদব শিক্ষা দিয়েছে। যাতে বাড়ির ভিতরের কারো এমন অঙ্গ দৃষ্টিগোচর না হয়, যার ফলে ফিতনা সৃষ্টি হতে পারে।
১২। ব্যভিচারের ছিদ্রপথ বন্ধ করার লক্ষ্যে শরীয়ত যে কোনও স্থানে বেগানা নারী-পুরুষের একাকিত্ব অবলম্বন করাকে হারাম ঘোষণা করেছে। মহানবী বলেছেন,
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَم ». متفق عَلَيْهِ
"মাহরামের উপস্থিতি ছাড়া কোন পুরুষ যেন কোন মহিলার সাথে নির্জনবাস না করে।" (বুখারী ৫২৩৩, মুসলিম ৩৩৩৬নং)
ألا لا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ ، إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ)).
"সতর্ক হও! যখনই কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনতা অবলম্বন করে, তখনই শয়তান তাদের তৃতীয় সাথী (কোটনা) হয়।" (সহীহ তিরমিযী ৯৩৪নং, নাসাঈর কুবরা ৯২১৯, বাইহাক্বী ১৩৯০৪, হাকেম ৩৮৭, ৩৯০, ত্বাবারানী ৫৬১নং)
১৩। পর-পুরুষের সাথে কথা বলার সময় মহিলাকে আকর্ষণীয় স্বরে ও মোহনীয় কণ্ঠে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا}
“(হে নারীগণ!) যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কন্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর। (স্বাভাবিকভাবে কথা বল।)” (আহযাবঃ ৩২)
১৪। মহিলাদেরকে পর্দার আদেশ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ ....) (۳۱) سورة النور
"তারা যেন তাদের স্বামী---ব্যতীত কারও নিকট তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।" (নূর: ৩১)
{ وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعاً فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَاب } [ الأحزاب : ٥٣ ]
অর্থাৎ, তোমরা তাদের নিকট হতে কিছু চাইলে পর্দার অন্তরাল হতে চাও। (সূরা আহযাব ৫৩ আয়াত)
{يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاء الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ}
"হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও বিশ্বাসীদের রমণীগণকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের (মুখমন্ডলের) উপর টেনে দেয়।" (আহযাবঃ ৫৯)
সতর্কতার বিষয় যে, ইভটিজিং ও ধর্ষণের অধিকাংশ কারণ হল মহিলার বেপর্দা ও বেলেল্লাপনা পোশাক।
১৫। ব্যভিচারের পথ খুলতে পারে এই আশঙ্কায় বলা হয়েছে,
(( لَا تُبَاشِرِ المَرْأَةُ المَرْأَةَ ، فَتَنْعَتَهَا لِزَوْجِهَا كَأَنَّهُ يَنْظُرُ إِلَيْهَا )). رواه البخاري
"কোন মহিলা যেন অন্য কোন মহিলাকে (নগ্ন) কোলাকুলি না করে। (কারণ) সে পরে তার স্বামীর কাছে তা এমনভাবে বর্ণনা করবে যে, যেন সে (তা শুনে) ঐ মহিলাকে প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করছে।" (বুখারী ৫২৪০-৫২৪১নং)
১৬। স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাড়ির বাইরে যেতে স্ত্রীকে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন তার অনুমতি ছাড়া কোন পুরুষকে বাড়ির ভিতরে আসতে অনুমতি দিতেও নিষেধ করা হয়েছে।
১৭। পর্দাই যথেষ্ট নয়। পর্দার সাথেও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা শরীয়তে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
১৮। এগানা পুরুষ বা স্বামীর সঙ্গ ছাড়া মহিলাকে একাকিনী সফর করতে নিষেধ করা হয়েছে। মহানবী বলেছেন,
(( لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةِ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ ، وَلَا تُسَافِرُ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ )).
"কোন পুরুষ যেন কোন বেগানা নারীর সঙ্গে তার সাথে এগানা পুরুষ ছাড়া অবশ্যই নির্জনতা অবলম্বন না করে। আর মাহরাম ব্যতিরেকে কোন নারী যেন (একাকিনী) সফর না করে।" (বুখারী ৫২৩৩, মুসলিম ۱۳۴۱নং)
১৯। বেগানা নারী-পুরুষের স্পর্শকে হারাম করা হয়েছে। অবৈধ করা হয়েছে মুসাফাহাকেও। মহানবী বলেছেন,
((لأَنْ يُطْعَنَ فِي رَأْسِ رَجُل بِمِخْيَطٍ مِنْ حَدِيدٍ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمَسَّ امْرَأَةً لَا تَحِلُّ لَهُ)).
"কোন ব্যক্তির মাথায় লৌহ সুচ দ্বারা খোঁচা যাওয়া ভালো, তবুও যে নারী তার জন্য অবৈধ, তাকে স্পর্শ করা ভালো নয়।" (ত্বাবারানী ১৬৮৮০-১৬৮৮১, সিঃ সহীহাহ ২২৬ নং)
২০। ব্যভিচারের ছিদ্রপথ বন্ধ করার লক্ষ্যেই নজরবাজিকে ইসলাম হারাম ঘোষণা করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ (۳۰) وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ} (۳۱)
"মু'মিনদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের যৌন অঙ্গকে সাবধানে সংযত রাখে; এটিই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। ওরা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত। মু'মিন নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে।" (নূরঃ৩০-৩১)
বলা বাহুল্য, নিজ সম্ভ্রম বাঁচানোর এটাই হল প্রাথমিক প্রয়াস। জারীর বিন আব্দুল্লাহ বলেন, আচমকা দৃষ্টি সম্পর্কে আমি রাসূলুল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমাকে আদেশ করলেন, যেন আমি আমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিই। (মুসলিম ৫৭৭০নং)
একদা তিনি আলী -কে বলেছিলেন,
يَا عَلِيُّ لَا تُتبع النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ فَإِنَّ لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ ...
"হে আলী! একবার নজর পড়ে গেলে আর দ্বিতীয়বার তাকিয়ে দেখো না। প্রথমবারের (অনিচ্ছাকৃত) নজর তোমার জন্য বৈধ। কিন্তু দ্বিতীয়বারের নজর বৈধ নয়।" (আহমাদ, আবু দাউদ ২১৫১, তিরমিযী ২৭৭৭, হাকেম ২৭৮৮, বাইহাক্বী ১৩২৯৩, সহীহুল জামে' ৭৯৫৩ নং)
২০। ব্যভিচারের দিকে আকর্ষণ করবে বলেই মহিলাকে সুগন্ধ ব্যবহার ক'রে পর পুরুষের সামনে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। মহানবী বলেছেন,
كُلُّ عَيْنِ زَانِيَةٌ ، وَالْمَرْأَةُ إِذَا اسْتَعْطَرَتْ فَمَرَّتْ بِالْمَجْلِسِ فَهِيَ كَذَا وَكَذَا ، يَعْنِي زَانِيَةً.
"প্রত্যেক চক্ষুই ব্যভিচারী। আর রমণী যদি সুগন্ধি ব্যবহার করে কোন (পুরুষের) মজলিসের পাশ দিয়ে পার হয়ে যায় তাহলে সে এক বেশ্যা।" (আহমাদ, সঃ তিরমিযী ২২৩৭, আবু দাউদ ৪৪১৭নং)
এত কিছু অমান্য বা মান্য করার পরেও যদি কেউ ব্যভিচার করে, তাহলে শরীয়ত তার শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছে। অবশ্য শাস্তিতে ক্রমপর্যায় খেয়াল রাখা হয়েছে। সুতরাং মহান আল্লাহ বলেছেন,
{الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِئَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِين اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ} (২) سورة النساء
"তোমাদের মধ্যে যে দু'জন এতে (ব্যভিচারে) লিপ্ত হবে, তাদের উভয়কে শাস্তি দাও। তবে যদি তারা তওবা করে এবং সংশোধন ক'রে নেয়, তাহলে তাদেরকে রেহাই দাও। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু।" (নিসাঃ ১৬)
অতঃপর আরও কঠিন শাস্তির কথা ঘোষণা দিয়ে বলেছেন,
{وَاللَّاتِي يَأْتِينَ الْفَاحِشَةَ مِن نِّسَائِكُمْ فَاسْتَشْهِدُوا عَلَيْهِنَّ أَرْبَعَةً مِّنكُمْ فَإِن شَهِدُوا فَأَمْسِكُوهُنَّ فِي الْبُيُوتِ حَتَّى يَتَوَفَّاهُنَّ الْمَوْتُ أَوْ يَجْعَلَ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلاً } (১৫) النساء
"তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ব্যভিচার করে, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য হতে চার জন সাক্ষী উপস্থিত কর। সুতরাং যদি তারা সাক্ষ্য দেয়, তাহলে তাদেরকে গৃহবন্দী ক'রে রাখ, যে পর্যন্ত না তাদের মৃত্যু হয় অথবা আল্লাহ তাদের জন্য অন্য কোন ব্যবস্থা করেন।" (নিসাঃ ১৫)
অতঃপর ব্যবস্থা আসে। এ ব্যাপারে মহানবী বলেছেন,
خُذُوا عَنِّى خُذُّوا عَنِّى قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلاً الثَّيِّبُ بِالتَّيِّبِ جَلْدُ مِائَةٍ وَرَمْي بِالْحِجَارَةِ وَالْبَكْرُ بِالْبَكْرِ جَلْدُ مِائَةٍ وَنَفْى سَنَةٍ ..
"তোমরা আমার নিকট থেকে (বিধান) গ্রহণ কর, তোমরা আমার নিকট থেকে (বিধান) গ্রহণ কর, আল্লাহ ব্যভিচারিণীদের জন্য ব্যবস্থা দিয়েছেন, বিবাহিত-বিবাহিতা হলে এক শত বেত্রাঘাত ও পাথর নিক্ষেপ ক'রে হত্যা। আর কুমার-কুমারী হলে এক শত বেত্রাঘাত ও এক বছর নির্বাসন।" (আহমাদ ১৫৯১০, মুসলিম ৪৫০৯, আবু দাউদ ৪৪১৭, তিরমিযী ১৪৩৪নং)
আর মহান আল্লাহ বলেছেন,
{الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِئَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِين اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ} (২)
"ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী---ওদের প্রত্যেককে একশো কশাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকরীকরণে ওদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে অভিভূত না করে; যদি তোমরা আল্লাহতে এবং পরকালে বিশ্বাসী হও। আর বিশ্বাসীদের একটি দল যেন ওদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।" (নূর: ২)
অবশ্য অনেকে সূরা নিসার উল্লিখিত ১৫নং আয়াতকে মহিলায়-মহিলায় সমকামিতা এবং ১৬নং আয়াতকে পুরুষে-পুরুষে সমকামিতার শাস্তি-বিধান মনে করেছেন। আর আল্লাহই ভালো জানেন।
কুরআন মাজীদে বিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি পাথর মেরে হত্যা করার বিধানের আয়াত ছিল। পরবর্তীতে তার তেলাওয়াত রহিত হয়, কিন্তু বিধান অবশিষ্ট থাকে। সুন্নাহতে সে বিধান স্পষ্ট রয়েছে। মহানবী বলেন,
لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ الثَّيِّبُ الزَّانِي وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ وَالتَّارِكْ لِدِينِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ ».
“তিন ব্যক্তি ছাড়া 'আল্লাহ ব্যতীত কেউ সত্য উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর রসূল' এ কথায় সাক্ষ্যদাতা কোন মুসলিমের খুন (কারো জন্য) বৈধ নয়; বিবাহিত ব্যভিচারী, খুনের বদলে হত্যাযোগ্য খুনী এবং দ্বীন ও জামাআত ত্যাগী।” (বুখারী ৬৮৭৮, মুসলিম ৪৪৬৮-৪৪৭০নং আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ)
আর তিনি তাঁর জীবনে মায়েয নামক এক পুরুষ ও গামেদিয়া এক মহিলাকে পাথর মেরে হত্যা করার আদেশ দিয়েছেন। আরো এক মহিলাকে পাথর মেরে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন, যে তার কাজের লোকের সাথে ব্যভিচার করছিল।
এ ছাড়া ব্যভিচারীর অন্য শাস্তি হলঃ-
১। ব্যভিচারী ফাসেক, তার সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য।
২। ব্যভিচারীর সাথে সচ্চরিত্র মুসলিমের বিবাহ বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{الزَّانِي لَا يَنكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً وَالزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَا إِلَّا زَانِ أَوْ مُشْرِكٌ وَحُرِّمَ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ} (۳) سورة النور
"ব্যভিচারী কেবল ব্যভিচারিণী অথবা অংশীবাদিনীকেই বিবাহ করবে এবং ব্যভিচারিণীকে কেবল ব্যভিচারী অথবা অংশীবাদীই বিবাহ করবে। বিশ্বাসীদের জন্য তা অবৈধ।" (নূর: ৩)
৩। ব্যভিচারীকে 'খবীস' বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ وَالطَّيِّبَاتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ لِلطَّيِّبَاتِ أُوْلَئِكَ مُبَرَّؤُونَ مِمَّا يَقُولُونَ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ} (٢٦) سورة النور
"দুশ্চরিত্র নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য; দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্র নারীর জন্য; সচ্চরিত্র নারী সচ্চরিত্র পুরুষের জন্য এবং সচ্চরিত্র পুরুষ সচ্চরিত্র নারীর জন্য (উপযুক্ত)। এ (সচ্চরিত্র) দের সম্বন্ধে লোকে যা বলে, এরা তা হতে পবিত্র। এদের জন্য আছে ক্ষমা এবং সম্মানজনক জীবিকা।" (নূর: ২৬)
৪। পরকালে জাহান্নামে আগুনের চুল্লিতে ওঠা-নামা করবে।
কিন্তু দুনিয়াতে এ অপরাধের শাস্তি এত বড় কেন?
নিঃসন্দেহে এ অপরাধ একটি চারিত্রিক বড় অপরাধ। এটা এমন একটি অশ্লীলতা, যার ফলে মানুষের দৈহিক, চারিত্রিক ও সামাজিক ক্ষতি রয়েছে।
১। ব্যভিচার মানব-সমাজকে ধ্বংস করতে পারে। যাতে শুধু যৌনক্ষুধা নিবারণের চাহিদা থাকে এবং সন্তান গ্রহণের কোন উদ্দেশ্য ও ইচ্ছা থাকে না।
২। অযাচিত সন্তান গর্ভে এসে গেলে তাকে হত্যা করা হয়। ব্যভিচারই বৃদ্ধি করে ভ্রূণ-হত্যার অপরাধ।
৩। ব্যভিচার মানুষকে সাময়িক সুখ দেয়, স্থায়ী শান্তি দেয় না।
৪। ব্যভিচারের ফলে ভয়ানক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে সমাজে। কখনো তা বংশধরদের মাঝে অবস্থায়ী হয়ে যায়।
৫। ব্যভিচার অনেক সময় খুনাখুনির দিকে পথপ্রদর্শন করে। অনেক সময় ঈর্ষায় স্বামী তার স্ত্রীকে অথবা স্ত্রী তার স্বামীকে হত্যা করে।
৬। ব্যভিচার দাম্পত্য জীবনের সুশৃঙ্খলতা নষ্ট করে, সংসারের সুখ হরণ করে, স্বামী-স্ত্রীর সুমধুর সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে। অনেক সময় বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে এবং তার ফলে তাদের সন্তানের ভাগ্যে জোটে ছন্নছাড়া জীবন, গড়ে ওঠে অপরাধী হয়ে।
৭। ব্যভিচার বংশধারা ধ্বংস করে এবং অন্য বংশের অযাচিত সন্তানকে নিজ বংশের উত্তরাধিকারী বানায়।
৮। ব্যভিচারে স্ত্রী তার স্বামীকে পর-পুরুষের সন্তান উপহার দেয় এবং কাকের বাসায় কোকিলের ছানা মানুষ হয়।
৯। ব্যভিচার শুধু শারীরিক ও সাময়িক একটা সম্পর্ক, যার পশ্চাতে কোন দায়িত্বশীলতা ও দায়বদ্ধতা নেই। যাতে শুধু পশুবৃত্তি ও কাম চরিতার্থের উদ্দেশ্য প্রবল থাকে।
১০। ব্যভিচার সমাজের সুষ্ঠুতা নষ্ট করে এবং চরিত্রহীনতা মানুষকে কর্তব্যহীন ক'রে গড়ে তোলে।
আরো কত শত ক্ষতি আছে এই অশ্লীলতায়। নিঃসন্দেহে সুসভ্য মানব-সমাজে তার বহুমুখী ক্ষতির চাইতে শাস্তির ভার নেহাতই কম। পরন্ত যৌনক্ষুধা নিবারণের বৈধ সুব্যবস্থা আছে, কিন্তু ব্যভিচারী তা গ্রহণ না ক'রে অবৈধ পথে পা বাড়ায়, তার ফলেই তার শাস্তি এত বেশি কঠিন, এত বেশি নৃশংস।
ব্যভিচারের দন্ডবিধি মানুষের প্রাণ, মান ও দাম্পত্য-সুখ রক্ষা করে। চারিত্রিক অবক্ষয় থেকে সমাজকে মুক্তি দেয়।
কোন্ ব্যভিচার নির্ধারিত দন্ডবিধি অনিবার্য করে?
যে অবৈধ সঙ্গমের ফলে দন্ডবিধি অনিবার্য হয়, তার কয়েকটি শর্ত রয়েছে:-
১। পুংলিঙ্গের অগ্রভাগ (সুপারির মতো অংশ) স্ত্রীলিংগে প্রবেশ হতে হবে; তাতে বীর্যপাত হোক বা না হোক।
২। উভয়ের মধ্যে সন্ধিগ্ধ বিবাহের কোন সম্পর্ক থাকবে না।
সুতরাং মহিলার যোনিপথের বাইরে বীর্যপাত করলে অথবা তাদের মাঝে কোন অশুদ্ধ বিবাহের সম্পর্ক থাকলে ঐ দন্ড প্রয়োগ হবে না।
প্রস্তরাঘাতে মৃত্যুদন্ডের শর্ত হল, বিবাহিত হতে হবে, যদিও বর্তমানে স্বামী বা স্ত্রী কাছে নেই। তালাক হয়েছে বা একজনের মৃত্যুবিয়োগ ঘটেছে।
অবশ্য বিবাহিত প্রমাণ করার সাথে সাথে শর্ত হল:-
১। ব্যভিচারী যেন জ্ঞানসম্পন্ন সাবালক হয়। সুতরাং পাগল বা নাবালক হলে নির্ধারিত দন্ডবিধি প্রয়োগ করা যাবে না। তবে তাদেরকে অন্য শাস্তি দিতে হবে।
২। স্বাধীন হতে হবে। নচেৎ ক্রীতদাস-দাসী হলে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে না। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَإِذَا أُحْصِنَّ فَإِنْ أَتَيْنَ بِفَاحِشَةٍ فَعَلَيْهِنَّ نِصْفُ مَا عَلَى الْمُحْصَنَاتِ مِنَ الْعَذَابِ}
"অতঃপর বিবাহিতা হয়ে যদি তারা ব্যভিচার করে, তাহলে তাদের শাস্তি স্বাধীন নারীর অর্ধেক।" (নিসাঃ ২৫) আর মৃত্যুদন্ডকে অর্ধেক করা যায় না।
৩। শুদ্ধ বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে এবং স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গম হতে হবে। যদিও তাতে বীর্যপাত না হয় অথবা সে সঙ্গম বৈধ না হয়। (যেমন মাসিক অবস্থায় বা রমযানের দিনের বেলায় সহবাস করে।)
ব্যাভিচারের দন্ডবিধি প্রয়োগ করার ৪টি শর্ত আছে:-
১। জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে।
২। সাবালক হতে হবে।
৩। স্বেচ্ছায় ব্যভিচার করবে।
৪। হারাম জেনে করবে।
সুতরাং পাগল, নাবালক, ধর্ষিতা ও ব্যভিচার হারাম জানে না---এমন নারী-পুরুষের উপর নির্ধারিত দন্ডবিধি প্রয়োগ হবে না। অন্য শাস্তি প্রয়োগ করা হবে।
এর পরেও ব্যভিচার প্রমাণিত হতে হবে। সে স্বীকার করবে যে, সে ব্যভিচার করেছে অথবা মহিলা গর্ভবতী হয়ে যাবে অথবা ৪ জন পুরুষ ঐ ব্যভিচারের সাক্ষ্য প্রদান করবে।
সাক্ষী ৩ জন হলে চলবে না। সাক্ষীদের সকলকে দোষমুক্ত নিষ্কলঙ্ক পুরুষ হতে হবে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে মহিলা বা পাপাচারীদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না।
চারজন সাক্ষীকেই সচক্ষে সঙ্গমকার্য দর্শন করতে হবে। তারা বয়ানে প্রকাশ করবে যে, পুরুষের লিঙ্গকে মহিলার যোনিপথে ঠিক সুর্মাদানির ভিতরে সুর্মাকাঠি বা কুয়োর মধ্যে রশি প্রবেশ করার মতো দেখেছে। কেবল উভয়কে একটি বন্ধ কক্ষে বা এক বিছানায় বা একটি লেপের নিচে শয়নাবস্থায় দেখা যথেষ্ট নয়।
চারজনের মধ্যে যদি একজন অন্যভাবে সাক্ষ্য দেয় অথবা সাক্ষ্য প্রত্যাহার ক'রে নেয়, তাহলেও নির্ধারিত দন্ডবিধি প্রয়োগ করা যাবে না। যেহেতু অপরাধ প্রমানে কোন প্রকার সন্দেহ সৃষ্টি হলে উক্ত দন্ড কার্যকর হবে না।
বাস্তবে এমন সাক্ষ্যভিত্তিক প্রমাণ মেলা বড় দুষ্কর। তবুও দন্ড রাখা হয়েছে, যাতে অপরাধে পা বাড়াতে অপরাধী সাহস না পায়।
পক্ষান্তরে অভিযোগ দায়ের করার পর যদি তা প্রমাণিত না হয়, তাহলে উল্টে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে অপবাদের দন্ডবিধি প্রয়োগ করা হবে।
তাহলে ব্যভিচারের অপরাধ প্রমাণে কেন এত সূক্ষ্মতা, কেন এত কঠিনতা?
যাতে কোন মানুষ কারো বিরুদ্ধে এমন জঘন্য অপরাধের অপবাদ আরোপ করতে সাহস না পায় এবং অনায়াসে কোন মানুষ কোন মানুষের ইজ্জত-সম্ভ্রমে কালিমা লেপন না করতে পারে। যেমন এই অপবাদ সহজে প্রমাণ ক'রে কেউ কাউকে কষাঘাত বা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে না পারে। (দ্রঃ ফিকহুস সুন্নাহ এবং আল-হুদুদ অত্-তা'যীরাত)
অপবাদ দেওয়ার দন্ডবিধিঃ
ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়া একটি মহা অপরাধ। কোন পবিত্র দেহে কলঙ্কের কালিমা লেপন করা একটি মহাপাপ। ইসলাম চেয়েছে এই অপরাধের মূলোৎপাটন ঘটাতে। যাতে কেউ কারো মান-সম্মানে আঁচড় হানতে না পারে। কোন সতী নারীর চরিত্রে কলঙ্ক লেপন ক'রে তাকে সমাজে বিব্রতকর জীবনযাপন করতে বাধ্য না করে। তার বিরুদ্ধে অপবাদ রচনা ও রটনা ক'রে তার বিবাহে বাদ সাধতে না পারে।
ইসলাম চেয়েছে, কোন মানুষ যেন নিজের ক্ষুরধার জিহ্বা-অস্ত্র দিয়ে অপরের সম্ভ্রম-বাগানে ধ্বংসলীলা না চালাতে পারে। তাই সে অপরাধকে সর্বনাশী আখ্যা দিয়ে মুসলিমকে সতর্ক করেছে। মহানবী বলেছেন,
اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبَقَاتِ .. قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا هُنَّ قَالَ « الشَّرْكُ بِاللَّهِ وَالسِّحْرُ وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ وَأَكُلُ الرِّبَا وَالتَّوَلَّى يَوْمَ الزَّحْفِ وَقَدْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ ..
"সাতটি সর্বনাশী কর্ম হতে দূরে থাক।" সকলে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! তা কী কী?' তিনি বললেন, "আল্লাহর সাথে শির্ক করা, যাদু করা, ন্যায় সঙ্গত অধিকার ছাড়া আল্লাহ যে প্রাণ হত্যা করা হারাম করেছেন তা হত্যা করা, সূদ খাওয়া, এতীমের মাল ভক্ষণ করা, (যুদ্ধক্ষেত্র হতে) যুদ্ধের দিন পলায়ন করা এবং সতী উদাসীনা মুমিনা নারীর চরিত্রে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া।" (বুখারী ২৭৬৬, ৬৮৫৭, মুসলিম ২৭২নং, আবু দাউদ, নাসাঈ)
পরম্ভ এ সর্বনাশী অপরাধ যে ঘটাবে, তার জন্য রয়েছে ইহ-পরকালে নানা শাস্তি।
০ নির্ধারিত দন্ড রয়েছে আশি চাবুক।
০ অপরাধী সাক্ষী হওয়ার যোগ্যতা হারাবে।
০ সে হবে আল্লাহর নিকট মিথ্যুক, ফাসেক ও অভিশপ্ত।
০ পরকালে সে পাবে কঠিন শাস্তি।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَداً وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ} (٤)
"যারা সাধুী রমণীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর স্বপক্ষে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশি বার কশাঘাত করবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না; এরাই তো সত্যত্যাগী।" (নূর: ৪)
{لَوْلَا جَاؤُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاء فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاء فَأُوْلَئِكَ عِندَ اللَّهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ}
"তারা কেন এ ব্যাপারে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করেনি? যেহেতু তারা সাক্ষী উপস্থিত করেনি, সে কারণে তারা আল্লাহর নিকটে মিথ্যাবাদী।" (নূর: ১৩)
{إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} (۱۹) سورة النور
"যারা বিশ্বাসীদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য আছে ইহলোকে ও পরলোকে মর্মন্তুদ শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না।" (নূর: ১৯)
{إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ (۲۳) يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (٢٤) يَوْمَئِذٍ يُوَفِّيهِمُ اللَّهُ دِينَهُمُ الْحَقَّ وَيَعْلَمُونَ أَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ الْمُبِينُ} (٢٥)
"যারা সাধুী, নিরীহ ও বিশ্বাসী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা ইহলোক ও পরলোকে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য আছে মহাশাস্তি। যেদিন তাদের বিরুদ্ধে তাদের রসনা, তাদের হাত ও পা তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে সাক্ষি দেবে। সেদিন আল্লাহ তাদের প্রাপ্য প্রতিফল পুরোপুরি দেবেন এবং তারা জানবে, আল্লাহই সত্য, স্পষ্ট প্রকাশক। (নূর: ২৩-২৫)
বিদিত যে, উক্ত আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হওয়ার কারণই ছিল মা আয়েশার চরিত্রে কলঙ্কের কালিমা লেপন। অতঃপর বিধান অনুযায়ী অপরাধীদের উপর নির্ধারিত দন্ডবিধি প্রয়োগ করা হয়।
অবশ্য এ দন্ডবিধি প্রয়োগেও নানা সাবধানতা ও শর্তাবলী আছে। সংক্ষেপের উদ্দেশ্যে তা উল্লেখ করা গেল না।
কত শত এমন হয় যে, অপবাদ রচনা ক'রে রটিয়ে বেড়ায় কিন্তু শাস্তি পায় না। হয়তো ধরা পড়ে না অথবা প্রমাণ করা যায় না অথবা দেশের তাগুতী আইনে অথবা কলঙ্কিত দুর্বল হওয়ার কারণে অপরাধী বেঁচে যায়। তাদের জন্য সর্বোচ্চ বিচারালয় রয়েছে শেষ বিচারের দিনে। মহানবী বলেছেন,
(( مَنْ قَدْفَ مَمْلُوكَهُ بِالزِّنَى يُقَامُ عَلَيْهِ الحَدُّ يَومَ القِيَامَةِ ، إِلَّا أَنْ يَكُونَ كَمَا قَالَ )).
"যে ব্যক্তি নিজ মালিকানাধীন দাসের উপর ব্যভিচারের অপবাদ দেবে, কিয়ামতের দিন তার উপর হদ (দণ্ডবিধি) প্রয়োগ করা হবে। তবে সে যা বলেছে, দাস যদি তাই হয় (তাহলে ভিন্ন কথা।)" (বুখারী ৬৮৫৮, মুসলিম ৪৪০১নং)
সমকামিতার দন্ডবিধিঃ
সমকামিতা একটি চরিত্র-বিধ্বংসী জঘন্য অপরাধ। দ্বীন ও দুনিয়াতে এটা এক প্রকার প্রকৃতি-বিরোধী বিরল ও বিকৃত যৌনাচার। এমন অপরাধের ফলে মানুষের চরিত্র ও সমাজ ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হয়।
এই অপরাধ পৃথিবীর ইতিহাসে যে জাতি সংঘটিত করে, মহান সৃষ্টিকর্তা তাদের কাছে নবী লুত-কে প্রেরণ ক'রে সতর্ক করেছিলেন। পরিশেষে তারা বিরত না হলে তিনি তাদেরকে ধ্বংস ক'রে দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
"আমি লুতকেও পাঠিয়েছিলাম, সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, 'তোমরা এমন কুকর্ম করছ, যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেউ করেনি। তোমরা তো কাম-তৃপ্তির জন্য নারী ছেড়ে পুরুষের নিকট গমন কর, তোমরা তো সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়।' উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু বলল, 'এদের (লুত এবং তার সঙ্গীদের) কে জনপদ হতে বহিষ্কার কর। এরা তো এমন লোক যারা পবিত্র থাকতে চায়।' অতঃপর তার স্ত্রী ব্যতীত তাকে ও তার পরিজনবর্গকে রক্ষা করেছিলাম। তার স্ত্রী ছিল ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভূত। তাদের উপর মুষলধারে পাথর-বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম, সুতরাং অপরাধীদের পরিণাম কী হয়েছিল তা লক্ষ্য কর।" (আ'রাফঃ ৮০-৮৪)
তিনি অন্যত্র বলেছেন,
"যখন আমার ফিরিস্তারা লুতের নিকট উপস্থিত হল, তখন সে তাদের ব্যাপারে চিন্তান্বিত হল এবং তাদের কারণে তার হৃদয় সঙ্কুচিত হয়ে গেল। আর বলল, 'আজকের দিনটি অতি কঠিন।' আর তার সম্প্রদায় তার কাছে ছুটে এল এবং তারা পূর্ব হতে কুকর্ম করেই আসছিল; লুত বলল, 'হে আমার সম্প্রদায়! (তোমাদের ঘরে) আমার (উম্মতী) এই কন্যারা রয়েছে, এরা তোমাদের জন্য পবিত্রতম। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে আমার মেহমানদের ব্যাপারে লাঞ্ছিত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কোন ভালো মানুষ নেই?' তারা বলল, 'তুমি নিশ্চয় জানো যে, তোমার এই কন্যাগুলিতে আমাদের কোন প্রয়োজন নেই, আর আমরা কী চাই, তাও তুমি অবশ্যই জানো।' সে বলল, 'হায়! যদি তোমাদের উপর আমার শক্তি থাকত, অথবা আমি কোন দৃঢ় স্তম্ভের (শক্তিশালী দলের) আশ্রয় নিতে পারতাম।' তারা বলল, 'হে লুত! আমরা তো তোমার প্রতিপালক প্রেরিত (ফিরিশতা), ওরা কখনই তোমার নিকট পৌঁছতে পারবে না। অতএব তুমি রাত্রির কোন এক ভাগে নিজের পরিবারবর্গকে নিয়ে (অন্যত্র) চলে যাও। তোমাদের কেউ যেন পিছনের দিকে ফিরেও না দেখে, কিন্তু তোমার স্ত্রী নয়, তার উপরেও ঐ (আযাব) আসবে, যা অন্যান্যদের উপরে আসবে। তাদের (শাস্তির) নির্ধারিত সময় হল প্রভাতকাল; প্রভাত কি নিকটবর্তী নয়?' অতঃপর যখন আমার হুকুম এসে পৌঁছল, তখন আমি ঐ ভূ-খন্ডের উপরিভাগকে নীচে ক'রে দিলাম এবং তার উপর ক্রমাগত ঝামা পাথর বর্ষণ করলাম। যা বিশেষরূপে চিহ্নিত করা ছিল তোমার প্রতিপালকের নিকট; আর ঐ (জনপদ) গুলি এই যালেমদের নিকট হতে বেশী দূরে নয়।" (হুদঃ ৭৭-৮৩)
সমকামী অভিশপ্ত। মহানবী বলেছেন,
((لَعَنَ اللَّهُ مَنْ عَمِلَ عَمَلَ قَوْمٍ لُوطٍ لَعَنَ اللَّهُ مَنْ عَمِلَ عَمَلَ قَوْمٍ لُوطٍ ثَلَاثًا.
"আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে অভিসম্পাত করুন, যে লুত জাতির কর্ম (সমকামিতা) করে।" এ কথা তিনি তিনবার বলেছেন। (আহমাদ ২৯১৩, নাসাঈর কুবরা ৭৩৩৭নং)
বরং কিয়ামতে মহান আল্লাহ এমন অপরাধীর দিকে তাকিয়েও দেখবেন না। আল্লাহর রসূল বলেন,
لَا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَى رَجُل أَتَى رَجُلاً أَوِ امْرَأَةً فِي الدُّبُر).
"আল্লাহ আয্যা অজাল্ল (কিয়ামতের দিন) সেই ব্যক্তির দিকে চেয়েও দেখবেন না, যে ব্যক্তি কোন পুরুষের মলদ্বারে অথবা কোন স্ত্রীর পায়খানা-দ্বারে সঙ্গম করে।" (তিরমিযী ১১৬৫, নাসাঈর কুবরা ৯০০১, ইবনে হিব্বান ৪৪১৮, সহীহুল জামে' ৭৮০১নং)
আর দুনিয়াতে রয়েছে তার কঠিনতম শাস্তি। মহানবী বলেছেন,
مَنْ وَجَدْتُمُوهُ يَعْمَلُ عَمَلَ قَوْمٍ لُوطٍ فَاقْتُلُوا الْفَاعِلَ وَالْمَفْعُولَ بِهِ ».
"তোমরা যে ব্যক্তিকে লুত নবীর উম্মতের মত সমকামে লিপ্ত পাবে, সে ব্যক্তি ও তার সহকর্মীকে হত্যা করে ফেলো।" (আহমাদ ২৭৩২, আবু দাউদ ৪৪৬৪, তিরমিযী ১৪৫৬, ইবনে মাজাহ ২৫৬১, বাইহাকী ১৭৪৭৫, সহীহুল জামে' ৬৫89নং)
হ্যাঁ, এমন নিকৃষ্ট শ্রেণীর বিকৃত যৌনাচারীর এমনই শাস্তি উপযুক্ত। যাতে অপরাধী এমন নোংরামির দিকে পা বাড়াতে ভয় করে এবং তাতে লিপ্ত হওয়ার পূর্বে ভাবতে গিয়ে যৌন উত্তেজনা স্তিমিত হয়ে যায়।
ইসলাম উক্ত অপরাধীর জন্য এমন দন্ডবিধি রেখেছে, যেহেতু অপরাধ খুবই জঘন্য। তার ফলে ব্যক্তি ও সমাজ-জীবনে মন্দ প্রভাব পড়ে।
এই অপরাধের ফলে নানা ব্যাধি সৃষ্টি হয়।
এই অপরাধের ফলে উভয় অপরাধীর নারীর প্রতি আকর্ষণ নষ্ট হয়ে যায়। আর তার ফলে বিবাহের মতো পবিত্র বন্ধন-ব্যবস্থা অচল হতে থাকে। অনেক সময় অনেকে বিবাহ করলেও বিকৃত যৌনাচারের ফলে স্ত্রী-সঙ্গমে ব্যর্থ হয়। আর তার ফলে মানব-বংশধারা বিঘ্নিত হয়।
বড় দুঃখের বিষয় যে, বর্তমানে এমন অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধি লাভ করছে এবং এমন নোংরামিকে অপরাধ বলে স্বীকার করা হচ্ছে না। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নামক যন্ত্রের সাহায্যে এমন 'হারাম'কে 'হালাল'-এ পরিণত করা হচ্ছে। এমন অপরাধীরা সামাজিক মর্যাদা লাভের জন্য নিজেদেরকে প্রকাশ ক'রে মিছিল-মিটিং করছে। গণতন্ত্রে তাদের অপরাধ তথা পুরুষে-পুরুষে ও নারীতে-নারীতে বিবাহ করার বৈধতা লাভ করছে। শুধু তাই নয়, প্রকাশ্যে কোন কোন রাষ্ট্রের পুরুষ রাষ্ট্রপ্রধান পুরুষকে বিবাহ করছে। তার মানে সে দেশের মানুষদের নিকট এটা কোন অপরাধ নয়। বলা বাহুল্য সে দেশের রাজার এই অবস্থা হলে তাকে নির্বাচনকারী প্রজাদের অবস্থা কী, তা অনুমেয়।
পশুগমনের দন্ডবিধিঃ
পশুবৎ বিকৃত যৌনাচারীর শাস্তি সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
مَنْ وَجَدْتُمُوهُ وَقَعَ عَلَى بَهِيمَةٍ فَاقْتُلُوهُ وَاقْتُلُوا الْبَهِيمَةَ مَعَهُ ..
"যে ব্যক্তিকে কোন পশু-সঙ্গমে লিপ্ত পাবে, সে ব্যক্তি ও সে পশুকে তোমরা হত্যা করে ফেলবে।" (তিরমিযী ১৪৫৫, ইবনে মাজাহ ২৫৬৪, হাকেম ৮০৪৯, বাইহাক্বী ১৭৪৯১, ১৭৪৯২, সহীহুল জামে' ৬৫৮৮নং)
চুরির দন্ডবিধিঃ
ইসলাম মানুষের সম্পদের হিফাযতের জন্য এই দন্ড বিধিবদ্ধ করেছে। হারাম ঘোষণা করেছে চুরিকে। মহানবী বলেছেন,
(( الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمُ ، لَا يَخُونُهُ ، وَلَا يَكْذِبُهُ ، وَلَا يَخْذُلُهُ ، كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ عِرْضُهُ وَمَالُهُ وَدَمُهُ ، التَّقْوى هاهنا ، بِحَسْبِ امْرِىءٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْتَقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِم )).
“মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, তাকে মিথ্যা বলবে না (বা মিথ্যাবাদী ভাববে না), তার সাহায্য না ক'রে তাকে অসহায় ছেড়ে দেবে না। এক মুসলিমের মর্যাদা, মাল ও খুন অপর মুসলিমের জন্য হারাম। আল্লাহভীতি এখানে (অন্তরে) রয়েছে। কোন মুসলমান ভাইকে তুচ্ছ মনে করাটাই একটি মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।” (তিরমিযী ১৯২৭নং)
কোন ঈমানদারের অভ্যাস চুরি করা হতে পারে না। কেন না রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
لا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَسْرِقُ السَّارِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ ..
"কোন ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে ব্যভিচার করতে পারে না। কোন চোর যখন চুরি করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে চুরি করতে পারে না এবং কোন মদ্যপায়ী যখন মদ্যপান করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে মদ্যপান করতে পারে না।" (বুখারী ২৪৭৫, মুসলিম ২১১নং, আসহাবে সুনান)
চোরের শাস্তির ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاء بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ }
“চোর এবং চোরনীর হাত কেটে ফেলো, এ তাদের কৃতকর্মের ফল এবং আল্লাহর তরফ হতে শাস্তি। বস্তুতঃ আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।” (মায়িদাহঃ ৩৮)
আর মহানবী বলেছেন,
لَعَنَ اللَّهُ السَّارِقَ يَسْرِقُ الْبَيْضَةَ فَتُقْطَعُ يَدُهُ وَيَسْرِقُ الْحَبْلَ فَتُقْطَعُ يَدُهُ ..
“আল্লাহ চোরকে অভিশপ্ত করুন; সে ডিম (অথবা হেলমেট) চুরি করে, ফলে তার হাত কাটা যায় এবং রশি চুরি করে, ফলে তার হাত কাটা যায়।” (বুখারী ৬৭৮৩, ৬৭৯৯, মুসলিম ৪৫০৩নং)
আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, মহানবী-এর যুগে (এক উচ্চবংশীয়া) মাখযুমী মহিলা লোকের কাছে জিনিস ধার নিত, অতঃপর তা অস্বীকার করত। এই শ্রেণীর চুরি করার ফলে ধরা পড়লে নবী তার হাত কাটার আদেশ দিলেন। তাকে নিয়ে তার আত্মীয়-স্বজন সহ কুরাইশ বংশের লোকেরা বড় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। (তার হাত যাতে কাটা না হয় সেই চেষ্টায়) তারা বলাবলি করল, 'ওর ব্যাপারে আল্লাহর রসূল-এর সঙ্গে কে কথা বলবে?' পরিশেষে তারা বলল, 'আল্লাহর রসূল-এর প্রিয়পাত্র উসামাহ বিন যায়দ ছাড়া আর কে (এ ব্যাপারে) তাঁর সাথে কথা বলার দুঃসাহস করবে?' সুতরাং (তাদের অনুরোধ মতে) উসামাহ তাঁর সাথে কথা বললেন (এবং ঐ মহিলার হাত যাতে কাটা না যায় সে ব্যাপারে সুপারিশ করলেন)। এর ফলে আল্লাহর রসূল বললেন, “হে উসামাহ! তুমি কি আল্লাহর দন্ডবিধিসমূহের এক দন্ডবিধি (কায়েম না হওয়ার) ব্যাপারে সুপারিশ করছ?!" অতঃপর তিনি দন্ডায়মান হয়ে ভাষণে বললেন,
أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ وَإِذَا سَرَقَ فيهم الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ وَايْمُ اللهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا ..
"তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতরা এ জন্যই ধ্বংস হয়েছিল যে, তাদের মধ্যে কোন উচ্চবংশীয় (বা ধনী) লোক চুরি করলে তারা তাকে (দন্ড না দিয়ে) ছেড়ে দিত। আর কোন (নিম্নবংশীয়, গরীব বা) দুর্বল লোক চুরি করলে তারা তার উপর দন্ডবিধি প্রয়োগ করত। পক্ষান্তরে আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমা যদি চুরি করত, তাহলে আমি তারও হাত কেটে দিতাম।" (বুখারী ৩৪৭৫, ৬৭৮৮, মুসলিম ৪৫০৫-৪৫০৭নং, আসহাবে সুনান)
মানবাধিকারের ঠিকেদাররা হাল্লা করে, এ শাস্তিতে নাকি মানবাধিকার লংঘন হয়। তা মেনে নিলেও তারা বলুক যে, কয়েকটা মানবাধিকার লংঘন ক'রে দেশে কত শত মানবাধিকার রক্ষা করা যায়। তারা তথাকথিত মানবিধকার রক্ষাকারীর দেশের সাথে সেই দেশের তুলনা ক'রে দেখুক, যে দেশে চোরের এ শাস্তি প্রচলিত আছে। তাহলেই বুঝতে পারবে মহান সৃষ্টিকর্তার আইন ও তাদের কল্পনাপ্রসূত আইনের মাঝে কত পার্থক্য, কত তারতম্য!
পরম্ভ সে শাস্তি প্রয়োগ করতেও বিচারকগণকে বিলকুল নিঃসন্দেহ হতে হয়। নচেৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামান্য সন্দেহের কারণে নির্ধারিত কোন দন্ডবিধিই প্রয়োগ করা হয় না, যেমন সে কথা পূর্বেও আলোচিত হয়েছে।
রাহাজানি প্রভৃতির দন্ডবিধিঃ
সশস্ত্র ডাকাতি, লুঠতরাজ, রাহাজানি, ধর্ষণ, স্মাগলিং প্রভৃতির শাস্তির ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّمَا جَزَاء الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ } (۳۳) سورة المائدة
"যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করে (অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়) তাদের শাস্তি এই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা বিপরীত দিক হতে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ হতে নির্বাসিত করা হবে। ইহকালে এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও পরকালে তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে।" (মায়িদাহঃ ৩৩)
নিঃসন্দেহে এ কাজ কোন মুসলিম করতে পারে না। যেহেতু মহানবী বলেছেন,
مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السَّلَاحَ فَلَيْسَ مِنَّا )
"সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমাদের উপর অস্ত্র তোলে। (মুসলিম ৭৫নং)
মদ্যপানের শাস্তিঃ
মদ ও মাদকদ্রব্য সেবন একটি সামাজিক অপরাধ। বৈয়াক্তিক, সাংসারিক ও সামাজিক জীবনে সে অপরাধের অপকারিতা কারো অবিদিত নয়। মদ একাধিক অপরাধ আকর্ষণ করে। তাই ইসলামে মদ হারাম। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (۹۰) إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ} (۹۱) سورة المائدة
"হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাযে বাধা দিতে চায়! অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না? (মায়িদাহঃ ৯০-৯১)
মদ বহু পাপের ছিদ্রপথ। বহু অপরাধের চাবিকাঠি। মহানবী বলেছেন,
الْخَمْرُ أُمُّ الْفَوَاحِشَ وَأَكْبَرُ الْكَبَائِرِ مَنْ شَرِبَهَا وَقَعَ عَلَى أُمِّهِ وَخَالَتِهِ وَعَمَّتِهِ)).
"মদ হল যাবতীয় অশ্লীলতার প্রধান এবং সবচেয়ে বড় পাপ। যে ব্যক্তি তা পান করল, সে যেন নিজ মা, খালা ও ফুফুর সাথে ব্যভিচার করল!" (ত্বাবারানী, সঃ জামে' ৩৩৪৫নং)
لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ شَيْئًا ، وَإِنْ قُطِّعْتَ وَحُرِّقْتَ ، وَلَا تَتْرُكْ صَلَاةً مَكْتُوبَةً مُتَعَمِّدًا ، فَمَنْ تَرَكَهَا مُتَعَمِّدًا ، فَقَدْ بَرِئَتْ مِنْهُ الدَّمَّةُ ، وَلَا تَشْرَبْ الْخَمْرَ ، فَإِنَّهَا مِفْتَاحُ كُلِّ شَ).
"তুমি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না---যদিও (এ ব্যাপারে) তোমাকে হত্যা করা হয় অথবা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ইচ্ছাকৃত ফরয নামায ত্যাগ করো না। কারণ যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নামায ত্যাগ করে, তার উপর থেকে (আল্লাহর) দায়িত্ব উঠে যায়। আর মদ পান করো না, কারণ মদ হল প্রত্যেক অমঙ্গলের (পাপাচারের) চাবিকাঠি।" (ইবনে মাজাহ ৪০৩৪, সহীহ ইবনে মাজাহ ৩২৫৯নং)
এই জন্য কোন মু'মিন মদপান করতে পারে না। ঈমানের সাথে মদের সখ্য হতে পারে না। মহানবী বলেছেন,
لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَسْرِقُ السَّارِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ ..
"কোন ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে ব্যভিচার করতে পারে না। কোন চোর যখন চুরি করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে চুরি করতে পারে না এবং কোন মদ্যপায়ী যখন মদ্যপান করে, তখন মু'মিন থাকা অবস্থায় সে মদ্যপান করতে পারে না।" (বুখারী ২৪৭৫, মুসলিম ২১১নং, আসহাবে সুনান)
মদ্যপায়ী অভিশপ্ত। অভিশপ্ত মদের সাথে যুক্ত সকল ব্যক্তিবর্গ। আনাস বিন মালেক বলেছেন, "মদের সাথে সম্পৃক্ত দশ প্রকার মানুষের উপর রাসূলুল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন। তার প্রস্তুরকারীর উপর, যে প্রস্তুত করায় তার উপর, তার পানকারীর উপর, যে তা বয়ে নিয়ে যায় তার উপর, যার জন্য বয়ে নিয়ে যায় তার উপর, যে পান করায় তার উপর, যে তা বিক্রি করে তার উপর, যে (বিক্রি ক'রে) তার অর্থ খায় তার উপর এবং যে ক্রয় করে ও যার জন্য ক্রয় করা হয় তাদের উপর।" (সুনানে তিরমিযী ১২৯৫, ইবনে মাজাহ ৩৩৮১, ত্বাবারানীর আওসাত্ব ১৩৫৫নং)
মদ এমন একটি অখাদ্য, যা পেটে গেলে ৪০ দিন নামায কবুল হয় না। মদ পেটে থাকা অবস্থায় মারা গেলে মুসলিমের মরণ মরবে না মদ্যপায়ী। মহানবী বলেছেন,
الْخَمْرُ أُمُّ الْخَبَائِثِ ، فَمَنْ شَرِبَهَا لَمْ تُقْبَلْ مِنْهُ صَلَاتُهُ أَرْبَعِينَ يَوْمًا، فَإِنْ مَاتَ وَهِيَ فِي بَطْنِهِ مَاتَ مَيْتَةً جَاهِلِيَّةً)).
"মদ যাবতীয় নোংরামির মূল। যে কেউ তা পান করবে, তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। (যে ব্যক্তি তার মূত্রথলিতে ঐ মদের কিছু পরিমাণ রাখা অবস্থায় মারা যাবে, তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যাবে) এবং যে কেউ তা নিজ পেটে রেখে মারা যাবে, সে জাহেলী যুগের মরণ মরবে।" (ত্বাবারানী ১৫৪৩, দারাকুত্বনী ৪/২৪৭, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৬৯৫নং)
মদ্যপায়ীর মরণ হবে জাহেলী যুগের ইসলাম-বহির্ভূত মরণ, মুশরিক পৌত্তলিকের মরণ। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
((مَنْ مَاتَ مُدْمِنَ خَمْرٍ لَقِيَ اللَّهَ كَعَابِدِ وَثَن)).
“যে ব্যক্তি মদ্যপানে অভ্যাস থাকা অবস্থায় মারা যাবে, সে ব্যক্তি মূর্তিপূজকের মতো (পাপী) হয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে।” (ত্বাবারানীর কাবীর ১২২৫৮, সিলসিলাহ সহীহাহ ৬৭৭নং)
বেহেস্তীরা বেহেশতে পবিত্র মদ পান করবে। কিন্তু কেউ দুনিয়াতে অপবিত্র ও হারাম মদ পান করলে তাকে আখেরাতে সেই পবিত্র মদ্যপানে বঞ্চিত করা হবে। মহানবী বলেছেন,
كُلُّ مُسْكِرِ خَمْرٌ وَكُلُّ مُسْكِرِ حَرَامٌ وَمَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ فِي الدُّنْيَا فَمَاتَ وَهُوَ يُدْمِنُهَا لَمْ يَشْرَبْهَا فِي الْآخِرَةِ ».
"প্রত্যেক প্রমত্ততা (জ্ঞানশূন্যতা) আনয়নকারী বস্তুই হল মদ এবং প্রত্যেক প্রমত্ততা আনয়নকারী বস্তুই হল হারাম। আর যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মদ পান করতে করতে তাতে অভ্যাসী হয়ে মারা যায়, সে ব্যক্তি আখেরাতে (জান্নাতে পবিত্র) মদ পান করতে পাবে না।" (বেহেস্তে যেতে পারবে না।) (বুখারী ৫৫৭৫, মুসলিম ৫৩৩৬নং)
তার মানে সে জান্নাতই প্রবেশ করতে পারবে না। যার নামায থাকবে না, সে কি জান্নাতী হবে? মহানবী বলেছেন,
مَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً أَرْبَعِينَ صَبَاحًا فَإِنْ تَابَ تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ فَإِنْ عَادَ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً أَرْبَعِينَ صَبَاحًا فَإِنْ تَابَ تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ فَإِنْ عَادَ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً أَرْبَعِينَ صَبَاحًا فَإِنْ تَابَ تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ فَإِنْ عَادَ الرَّابِعَةَ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً أَرْبَعِينَ صَبَاحًا فَإِنْ تَابَ لَمْ يَتُبِ اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَقَاهُ مِنْ نَهْرِ الْخَبَالِ)). قِيلَ يَا أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ وَمَا تَهْرُ الْخَبَالِ؟ قَالَ نَهْرٌ مِنْ صَدِيدِ أَهْلِ النَّارِ.
“যে ব্যক্তি মদ পান করবে, সে ব্যক্তির ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। কিন্তু এরপর যদি সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করে নেবেন। অন্যথা যদি সে পুনরায় পান করে, তাহলে অনুরূপ তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। যদি এর পরেও সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করে নেবেন। অন্যথা যদি সে তৃতীয়বার পান করে, তাহলে অনুরূপ তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। কিন্তু এর পরেও যদি সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করে নেবেন। অন্যথা যদি সে চতুর্থবার তা পান করে, তাহলে অনুরূপ তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। কিন্তু এরপরে সে যদি তওবা করে, তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন না, তিনি তার প্রতি ক্রোধান্বিত হন এবং (পরকালে) তাকে 'খাবাল নদী' থেকে পানীয় পান করাবেন।"
ইবনে উমার-কে জিজ্ঞাসা করা হল, 'হে আবু আব্দুর রহমান! 'খাবাল-নদী' কী?' উত্তরে তিনি বললেন, 'তা হল জাহান্নামবাসীদের পুঁজ দ্বারা প্রবাহিত (জাহান্নামের) এক নদী।' (তিরমিযী ১৮৬২, হাকেম ৪/১৪৬, নাসাঈ, সহীহুল জামে' ৬৩১২-৬৩১৩নং)
মহানবী আরও বলেছেন,
وَثَلاثَةٌ لا يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ العاقُ لِوَالِدَيْهِ والمُدْمِنُ الخَمْرَ والمَنَّانُ بِما أَعْطَى)).
"---আর তিন ব্যক্তি বেহেশে যাবে না; পিতা-মাতার নাফরমান ছেলে, মদপানে অভ্যাসী মাতাল এবং দান করার পর যে বলে ও গর্ব করে বেড়ায় এমন খোঁটাদানকারী ব্যক্তি।" (আহমাদ ৬১৮০, নাসাঈর কুবরা ২৩৪৩, হাকেম ২৫৬২, সহীহুল জামে' ৩০৭১নং)
মদপানের দন্ড হল ৪০ চাবুক। ব্যক্তি বিশেষের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে ৮০ চাবুকও লাগানো যায়। আবার কখনো কেবল হাত, জুতা বা কাপড়ের আঘাত দিয়েও শাস্তি দেওয়া যায়। আর তা হবে পরিস্থিতি অনুসারে বিচারকের বিচার-নির্ভর।
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, মদ পান করেছে এমন এক ব্যক্তিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হাজির করা হল। তিনি আদেশ দিলেন, 'ওকে তোমরা মারো।' আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, (তাঁর আদেশ অনুযায়ী আমরা তাকে মারতে আরম্ভ করলাম।) আমাদের কেউ তাকে হাত দ্বারা মারতে লাগল, কেউ আপন জুতা দ্বারা, কেউ নিজ কাপড় দ্বারা। অতঃপর যখন সে ফিরে যেতে লাগল, তখন কিছু লোক বলে উঠল, 'আল্লাহ তোমাকে লাঞ্ছিত করুক।' তা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
لا تَقُولُوا هَذَا ، لَا تُعِينُوا عَلَيْهِ الشَّيْطَانِ)).
"এরূপ বলো না এবং ওর বিরুদ্ধে শয়তানকে সহযোগিতা করো না।" (বুখারী ৬৭৭৭নং)
যাদু করার শাস্তিঃ
যাদু সত্য এবং তার দ্বারা মানুষের ক্ষতি করা হয়। যাদু এক প্রকার শির্কও। তা একটি সর্বনাশী অপরাধ। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ ... قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا هُنَّ قَالَ : الشَّرْكُ بِاللَّهِ وَالسِّحْرُ وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ وَأَكْلُ الرِّبَا وَالتَّوَلَّى يَوْمَ الزَّحْفِ وَقَدْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ ..
"সাতটি সর্বনাশী কর্ম হতে দূরে থাক।" সকলে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! তা কী কী?' তিনি বললেন, "আল্লাহর সাথে শির্ক করা, যাদু করা, ন্যায় সঙ্গত অধিকার ছাড়া আল্লাহ যে প্রাণ হত্যা করা হারাম করেছেন তা হত্যা করা, সূদ খাওয়া, এতীমের মাল ভক্ষণ করা, (যুদ্ধক্ষেত্র হতে) যুদ্ধের দিন পলায়ন করা এবং সতী উদাসীনা মুমিনা নারীর চরিত্রে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া।" (বুখারী ২৭৬৬, ৬৮৫৭, মুসলিম ২৭২নং, আবু দাউদ, নাসাঈ)
তাই যাদুকরের শাস্তি হল, তরবারি দ্বারা শিরশ্ছেদ। (দ্রঃ সিঃ যয়ীফাহ ১৪৪৬নং)