📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 আত্মবিশ্বাস ও আশার উপর পাপের প্রভাব

📄 আত্মবিশ্বাস ও আশার উপর পাপের প্রভাব


মানুষ যখন পাপ করতে থাকে এবং সে তাতে তৃপ্তি পায়, তখন তা নেশা ও পেশাতে পরিণত হয়। পরিশেষে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, সে ভালো হওয়ার চেষ্টাও করে না। কেউ উপদেশ দিতে গেলে তা গ্রাহ্যও করে না।
গোনাহ আত্মবিশ্বাস বিনষ্ট করে। পাপী নিজের উপর ভরসা রাখতে পারে না। তার মনে সাফল্যের আশা ফুরিয়ে যায়। পাপ করতে করতে পাপী হতাশার শিকার হয়ে পড়ে। সে ভাবে, সে আর সমাজের মূল স্রোতধারায় ফিরতে পারবে না। সমাজ তাকে গ্রহণ করবে না। মহান আল্লাহও তাকে ক্ষমা করবেন না।
ঈমান আনার পূর্বে অথবা তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুভূতি সৃষ্টি হওয়ার পূর্বে যতই গোনাহ করে থাক, মানুষ যেন এই মনে না করে যে, আমি তো অনেক বড় পাপী, আমাকে আল্লাহ কেন ক্ষমা করবেন? বরং সত্য হৃদয়ে যদি ঈমান আনে বা নিষ্ঠার সাথে যদি তওবা করে, তবে মহান আল্লাহ সমস্ত পাপকে মাফ ক'রে দেবেন।
কিছু কাফের ও মুশরিক এমন ছিল, যারা প্রচুর হত্যা ও ব্যভিচারে লিপ্ত ছিল। এরা নবী করীম ﷺ-এর কাছে উপস্থিত হয়ে বলল যে, আপনার দাওয়াত তো সঠিক, কিন্তু আমরা অনেক পাপের পাপী। যদি আমরা ঈমান আনি, তবে এই সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যাবে কি?
উক্ত প্রশ্নের উত্তরে মহান আল্লাহ আয়াত অবতীর্ণ করলেন,
{قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ } (٥٣) سورة الزمر
"ঘোষণা করে দাও (আমার এ কথা), হে আমার দাসগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছ, তারা আল্লাহর করুণা হতে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত পাপ মাফ ক'রে দেবেন। নিশ্চয় তিনিই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (যুমার: ৫৩, সহীহ বুখারী, তাফসীর সূরা যুমার)

তবে এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা পাওয়ার আশায় খুব পাপ ক'রে যাও। তাঁর যাবতীয় বিধি-বিধান ও ফরয কার্যাদির ব্যাপারে কোনই পরোয়া করো না এবং আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা ও নিয়ম-নীতি নিষ্ঠুরতার সাথে লঙ্ঘন ক'রে যাও।
কারণ এইভাবে তাঁর ক্রোধ ও প্রতিশোধকে আহবান জানিয়ে তাঁর রহমত ও ক্ষমা পাওয়ার আশা করা একেবারে বোকামি ও খামখেয়ালী। এটা হল নিম ফলের বীজ লাগিয়ে আঙ্গুর ফলের আশা রাখার মতই। এই ধরনের মানুষের স্মরণ রাখা উচিত যে, তিনি যেমন তাঁর বান্দাদের জন্য غَفُورٌ رَّحِيمٌ (মহা ক্ষমাশীল পরম করুণাময়) তেমনি তিনি তাঁর অবাধ্যজনদের জন্য عَزِيزٌ ذُو انْتِقَامِ (পরাক্রমশালী প্রতিশোধগ্রহণকারী) ও বটেন। তাই তো কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে এই উভয় দিককে এক সাথেই বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন,
نَبِّئْ عِبَادِي أَنِّي أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيمُ ، وَأَنَّ عَذَابِي هُوَ الْعَذَابُ الْأَلِيمُ)
অর্থাৎ, আমার বান্দাদেরকে বলে দাও, নিশ্চয় আমিই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু এবং আমার শাস্তিই হল অতি মর্মন্তুদ শাস্তি। (সূরা হিজর ৪৯-৫০ আয়াত)

সম্ভবতঃ এটাই কারণ যে, এখানে আয়াতের আরম্ভ يَا عِبَادِي (হে আমার বান্দাগণ!) দিয়ে হয়েছে। যার দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, যে ব্যক্তি ঈমান আনে অথবা সত্য হৃদয়ে তওবা ক'রে প্রকৃত অর্থে সে তাঁর বান্দা হয়ে যাবে, তার পাপ যদি সমুদ্রের ফেনা বরাবরও হয়, তবুও তা মাফ হয়ে যাবে। তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য অবশ্যই ক্ষমাশীল ও দয়াবান। যেমন, হাদীসে একশত মানুষের খুনীর তওবার ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে। (বুখারী: আম্বিয়া অধ্যায়, মুসলিমঃ তওবা অধ্যায়, দ্রঃ তফসীর আহসানুল বয়ান)

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 পাপী এক শ্রেণীর কয়েদী

📄 পাপী এক শ্রেণীর কয়েদী


মহানবী বলেছেন,
مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَقَدْ وُكِّلَ بِهِ قَرِيتُهُ مِنَ الْجِنِّ .. قَالُوا وَإِيَّاكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ . وَإِيَّايَ إِلَّا أَنَّ اللَّهَ أَعَائِنِي عَلَيْهِ فَأَسْلَمَ فَلَا يَأْمُرُنِي إِلَّا بِخَيْرٍ ..
"তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যার সাথে সঙ্গী জ্বিন নিযুক্ত নেই।" লোকেরা বলল, 'আর আপনার সাথেও কি আছে, হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "আমার সাথেও আছে। তবে আল্লাহ তার বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করেছেন বলে সে ইসলাম গ্রহণ করেছে (বা আমি নিরাপদে থাকি)। সুতরাং আমাকে সে মঙ্গল ছাড়া অন্য কিছুর আদেশ দেয় না।" (মুসলিম ৭২৮৬নং)

একদা রাত্রি বেলায় আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) সতীনদের প্রতি ঈর্ষা প্রকাশ করলে মহানবী ﷺ তাঁকে বললেন, يَا عَائِشَةُ أَخَدْكِ شَيْطَانُكِ». فَقُلْتُ : أَمَا لَكَ شَيْطَانٌ؟ قَالَ : مَا مِنْ آدَمِيٌّ إِلَّا لَهُ شَيْطَانٌ. فَقُلْتُ : وَأَنْتَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ : وَأَنَا ، لَكِنِّى دَعَوْتُ اللَّهَ عَلَيْهِ فَأَسْلَم.
"আয়েশা! তোমাকে তোমার শয়তান ধরেছে।" আয়েশা বললেন, 'আপনার কি শয়তান নেই?' তিনি বললেন, এমন কোন আদম-সন্তান (আদমী বা মানুষ) নেই, যার শয়তান নেই। আয়েশা বললেন, 'আর আপনি হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "আর আমিও। তবে আমি তার বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে দুআ করেছি, তাই আমি নিরাপদ থাকি।" (বাইহাক্বী ২৫৫২, হাকেম ৮৩২, ইবনে হিব্বান ১৯৩৩, ইবনে খুযাইমা ৬৫৪নং)

মু'মিন মানুষ ফিরিশ্তার দিক-নির্দেশনার উপর চলে এবং শয়তানকে পরাস্ত করে। যখনই শয়তান তাকে ভ্রষ্ট বা বিপথগামী করতে চায়, তখনই সে শয়তানকে প্রতিহত করে। মহানবী বলেছেন,
((إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَيُنْضِي شَيَاطِينَهُ كَمَا يُنْضِي أَحَدُكُمْ بَعِيرَهُ فِي السَّفَرِ)).
"নিশ্চয় মু'মিন তার শয়তানদেরকে কৃশ ক'রে ফেলে, যেমন তোমাদের কেউ সফরে তার (সওয়ারী) উটকে কৃশ ক'রে ফেলে।" (আহমাদ ৮-৯৪০, আবু য়্যা'লা, সিঃ সহীহাহ ৩৫৮৬নং)

কিন্তু পাপী তার বিপরীত। পাপী তার শয়তানের হাতে বন্দী হয়ে যায়, তার সফরের সওয়ারী বা বাহন হয়ে যায়। আর লাগাম থাকে তার হাতে। শয়তান যেমন তার মনে প্রক্ষিপ্ত করে, তেমন চলে, বলে ও করে।
পাপী নিজ খেয়ালখুশীর কারাগারের কয়েদী হয়ে যায়। কুপ্রবৃত্তির কয়েদখানা থেকে সে বের হতে পারে না।
আর তার থেকে বেশি দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তি আর কে হতে পারে, যাকে তার চিরশত্রু বন্দী বানিয়ে নিয়েছে? খেয়ালখুশীর কারাগার অপেক্ষা আর কোন কারাগার বেশি সংকীর্ণ হতে পারে? কুপ্রবৃত্তির কয়েদখানা ছাড়া আর কোন কয়েদখানা বেশি কষ্টদায়ক হতে পারে?
প্রকৃত কয়েদী সে নয়, যাকে তার পরিবার-পরিজন থেকে দূরে রাখা হয়েছে। বরং প্রকৃতপক্ষে কয়েদী সেই মানুষ, যাকে তার মহান প্রতিপালক থেকে দূরে রাখা হয়েছে। প্রকৃত কারারুদ্ধ সেই ব্যক্তি, যার হৃদয় তার খেয়ালখুশীর কারাকক্ষে বন্দী আছে।
সুতরাং সে ব্যক্তি কীভাবে পরকালের শুভ পরিণামের পথে যাত্রা করবে, যে আসলে একজন জেল-কয়েদী ও হাত-পা বাঁধা ব্যক্তি?

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 প্রাকৃতিক দুর্যোগ আনয়নে পাপের প্রভাব

📄 প্রাকৃতিক দুর্যোগ আনয়নে পাপের প্রভাব


'যে করে পাপ, সে সাত বেটার বাপ।' পার্থিব দৃষ্টিভঙ্গিতে এ কথা ধ্রুব সত্য। এ জন্যই তো "দুনিয়া মুমিনদের পক্ষে কারাগার এবং কাফেরদের জন্য (গুলজার) বেহেশ্ স্বরূপ।" (মুসলিম, আহমদ, তিরমিযী প্রমুখ, সহীহুল জামে' ৩৪১২ নং) কিন্তু পাপী দুনিয়াতে 'সাত বেটার বাপ' হলেও আখেরাতে সে নিহাতই নিঃস্ব ও মিসকীন। পক্ষান্তরে একথাও সত্য যে, 'যখন তখন করে পাপ সময় বুঝে ফলে।'
সুতরাং কিছু পাপ আছে যার সাজা দুনিয়াতেই পাওয়া যায়। নচেৎ পাপের শাস্তি ভোগ করার কঠিনতম ও ভয়ঙ্কর মহাকাল হল পরকাল।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَرَبُّكَ الْغَفُورُ ذُو الرَّحْمَةِ لَوْ يُؤَاخِذُهُمْ بِمَا كَسَبُوا لَعَجَّلَ لَهُمُ الْعَذَابَ بَلْ لَّهُمْ مَوْعِدٌ لَّنْ يَجِدُوا مِنْ دُونِهِ مَوْثِلاً )
অর্থাৎ, আর তোমার প্রতিপালক ক্ষমাশীল দয়াবান। ওদের কৃতকর্মের ফলে তিনি ওদেরকে শাস্তি দিতে চাইলে ওদের শাস্তি ত্বরান্বিত করতেন; কিন্তু ওদের জন্য এক প্রতিশ্রুত মুহূর্ত রয়েছে, যা থেকে ওদের কোন পরিত্রাণ নেই। (কাহাফঃ ৫৮ আয়াত)

তিনি আরো বলেন, لَوْ يُؤَاخِذُ اللَّهُ النَّاسَ بِمَا كَسَبُوا مَا تَرَكَ عَلَى ظَهْرِهَا مِنْ دَابَّةٍ وَلَكِنْ يُؤَخِّرُهُمْ إِلَى أَجَلٍ مُسَمَّى ، فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِعِبَادِهِ بَصِيرًا )
অর্থাৎ, আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের কৃতকর্মের জন্য পাকড়াও করতেন তাহলে ভূ-পৃষ্ঠে চলমান কোন জীবকেই রেহাই দিতেন না। কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকেন। অতঃপর তাদের সে নির্দিষ্ট মেয়াদ এসে গেলে আল্লাহর সব বান্দা তাঁর দৃষ্টিতে থাকবে। (তখন তিনি তাদেরকে শাস্তি অথবা পুরস্কার দেবেন।) (সূরা ফাত্বির ৪৫ আয়াত)

আবার তিনি বলেন, ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُمْ بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ )
অর্থাৎ, মানুষের কর্মদোষে জলে-স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা (সৎপথে) ফিরে আসে। (সূরা রুম ৪১ আয়াত)

তিনি অন্যত্র বলেন, وَمَا أَصَابَكُمْ مِّنْ مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُوا عَنْ كَثِير
অর্থাৎ, তোমাদের উপর যে সব বিপদ-আপদ আসে তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল। আর তোমাদের বহু অপরাধ তিনি ক্ষমা করে দেন। (শূরাঃ ৩০)

আর ত্বরান্বিত শাস্তির ফলেই ধ্বংস হয়েছে বহু উম্মত। কুরআন ও সুন্নায় এ কথার ভূরি ভূরি নজীর বর্তমান।
মহান আল্লাহ বলেছেন, {فَكُلًّا أَخَذْنَا بِذَنْبِهِ فَمِنْهُمْ مَّنْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِ حَاصِبًا وَمِنْهُمْ مَّنْ أَخَذَتْهُ الصَّيْحَةُ وَمِنْهُمْ مَنْ خَسَفْنَا بِهِ الْأَرْضِ وَمِنْهُم مَّنْ أَغْرَقْنَا وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِن كَانُوا أَنفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ } (٤٠) سورة العنكبوت
"সুতরাং ওদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ অপরাধের জন্য পাকড়াও করলাম; ওদের কারও প্রতি প্রেরণ করলাম পাথর বর্ষণকারী ঝড়, কাকেও আঘাত করল মহাগর্জন, কাকেও আমি মাটির নিচে ধসিয়ে দিলাম এবং কাকেও মারলাম ডুবিয়ে। আল্লাহ তাদের প্রতি কোন যুলুম করেননি; আসলে তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম করেছিল।" (আনকাবুতঃ ৪০)

পাপের কারেন্ট শাস্তি স্বরূপ আসে প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগ। অনেকে তাকে 'প্রকৃতির তান্ডব' বলে থাকে। কিন্তু আসলে মহান সৃষ্টিকর্তা প্রতিশোধ গ্রহণকারী। মানুষের কোন কোন পাপের শাস্তি দুনিয়াতেই ত্বরান্বিত করেন।
পূর্ববর্তী বহু জাতিকে তাদের পাপের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। এ উম্মতের মাঝেও সে দুর্যোগ আসছে ও আসতে পারে, যদি পাপাচরণে পূর্ববর্তীদের পথ অবলম্বন করে। মহানবী বলেছেন,
((لَيَكُونَنَّ فِي هَذِهِ الْأُمَّةِ خَسْفٌ وَقَدْفٌ وَمَسْخٌ وَذَلِكَ إِذَا شَرِبُوا الخُمُورَ وَاتَّخَذُوا الْقَيْنَاتِ وَضَرَبُوا بالمعازف)).
"অবশ্যই আমার উম্মতের মাঝে (কিছু লোককে) মাটি ধসিয়ে, পাথর বর্ষণ করে এবং আকার বিকৃত করে (ধ্বংস করা) হবে। আর এ শাস্তি তখন আসবে, যখন তারা মদ পান করবে, নর্তকী রাখবে এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাবে।" (ইবনে আবিদ দুনয়া, সহীহুল জামে' ৫৪৬৭নং)

لَيَشْرَبَنَّ أُنَاسٌ مِنْ أُمَّتِي الخَمْرَ يُسَمُّونَهَا بِغَيْرِ اسْمِهَا وَيُضْرَبُ عَلَى رُؤُوسِهِمْ بِالْمَعَازِفِ وَالْقَيْنَاتِ يَخْسِفُ الله بهِمُ الأَرْضِ وَيَجْعَلُ مِنْهُمْ قِرَدَةً وَخَنَازِينَ).
"অবশ্যই আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে, তাদের মাথার উপরে বাদ্যযন্ত্র বাজানো হবে এবং নর্তকী নাচবে। আল্লাহ তাদেরকে মাটিতে ধসিয়ে দেবেন এবং বানর ও শূকরে পরিণত করবেন!" (ইবনে মাজাহ ৪০২০, ইবনে হিব্বান ৬৭৫৮, তাবারানী ৩৩৪২, বাইহাকী ১৭ ১৬০, সহীহুল জামে' ৫৪৫৪ নং)

ভেবে দেখার বিষয় যে, এই যুগ কি সেই নৃত্য-বাদ্যের যুগ নয়? সে যুগের নৃত্য- বাদ্য স্বস্থানে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে তা সারা বিশ্বে সম্প্রচারিত হচ্ছে। সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির ছোবল আজ ঘরে-ঘরে হানা দিচ্ছে। এ যুগ কি সেই যুগ নয়, যে যুগে ঝড়-তুফান বেশি হচ্ছে, বজ্রপাত বেড়ে চলেছে, ভূমিকম্প ও ভূমিধস মানুষকে শায়েস্তা করছে? মহান আল্লাহ বলেছেন,
{أَفَأَمِنَ الَّذِينَ مَكَرُوا السَّيِّئَاتِ أَن يَخْسِفَ اللهُ بِهِمُ الأَرْضِ أَوْ يَأْتِيَهُمُ الْعَذَابُ مِنْ حَيْثُ لا يَشْعُرُونَ (٤٥) أَوْ يَأْخُدُهُمْ فِي تَقَلُّبِهِمْ فَمَا هُمْ بِمُعْجِزِينَ (٤٦) أَوْ يَأْخُدُهُمْ عَلَى تَخَوُّفٍ فَإِنَّ رَبَّكُمْ لَرَءُوفٌ رَحِيمٌ} (٤٧) سورة النحل
"যারা জঘন্য ষড়যন্ত্র করে, তারা কি এ বিষয়ে নিশ্চিত আছে যে, আল্লাহ তাদেরকে ভূগর্ভে ধসিয়ে দেবেন না অথবা এমন দিক হতে শাস্তি আসবে না, যার তারা টেরও পাবে না? অথবা চলাফেরা করতে থাকাকালে তিনি তাদেরকে পাকড়াও করবেন না; অতঃপর তারা তা ব্যর্থ করতে পারবে না? অথবা তাদেরকে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় পাকড়াও করবেন না? তোমাদের প্রতিপালক তো অবশ্যই অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু।" (নাহলঃ ৪৫-৪৭)

কেউ নিশ্চিত নয়। অকস্মাৎ আযাব এসে ধ্বংস ক'রে যেতে পারে। খেলায় রত থাকা অবস্থায় অতর্কিতে শাস্তি আসতে পারে। সমুদ্র-সৈকতে নগ্নাবস্থায় সূর্য-স্নান করার সময় অথবা কোন পানশালায় নৃত্যগীতে মশগুল থাকার সময় অথবা কোন প্রমোদ-বিহারে মত্ত থাকার সময় নিমেষে প্রকৃতির আক্রমণ সকল খেলা সাঙ্গ করতে পারে। একই সাথে লক্ষ-লক্ষ মানুষ, অসংখ্য জীব-জন্তু, শত-সহস্র ঘর- বাড়ি, কোটি-কোটি টাকার ধন-সম্পদ, ফল-ফসল ইত্যাদি ধ্বংস করতে পারে। প্রকৃতির নিয়মের নিয়ামক আল্লাহ তাদের প্রতি কোন যুলুম করেন না; আসলে তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম ক'রে থাকে। স্বকৃত বহু পাপের কিছু শাস্তি তারা ইহকালে ভোগ ক'রে থাকে।

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 পাপ পাপীকে আল্লাহর কাছে হেয় করে

📄 পাপ পাপীকে আল্লাহর কাছে হেয় করে


আল্লাহর অবাধ্যাচরণ ক'রে পাপ করলে নিশ্চয় পাপী আল্লাহর কাছে হেয় ও ঘৃণ্য হবে। আর
{وَمَن يُهِنِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِن مُّكْرِمٍ إِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يَشَاء} (十八) سورة الحج
"আল্লাহ যাকে হেয় করেন, তার সম্মানদাতা কেউই নেই; নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন।" (হাজ্জঃ ১৮) তিনি যাকে সম্মান দেন, তাকে অপমানকারী কেউ নেই। আমরা বিতরের কুনুতে দুআ ক'রে থাকি, '(হে আল্লাহ!) নিশ্চয় প্রিয়জন লাঞ্ছিত হয় না এবং তোমার শত্রু সম্মানিত হয় না।" (আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, আহমাদ, বাইহাকী, ইবনে মাজাহ, ইরওয়াউল গলীল ২/১৭২)

তাঁর বিরুদ্ধাচরণ ও শত্রুতা করলে অবশ্যই মানুষ লাঞ্ছিত, পদদলিত ও অবহেলিত হবে। তিনি তাকে দুনিয়াতে লাঞ্ছিত করবেন মানুষ দ্বারা, লাঞ্ছিত করবেন নানা বিপদ-আপদ ও শাস্তি দ্বারা। আর আখেরাতেও লাঞ্ছিত করবেন জাহান্নামের শাস্তি দ্বারা।
মহান আল্লাহর কাছে বর্ণবৈষম্য নেই। বংশ-মর্যাদা ও রূপ-সৌন্দর্য নিক্তি নয় তাঁর। তিনি কারো বাহ্যিক রূপ ও আকার-আকৃতি, দেশ বা ভাষা দেখে ভালো- মন্দের বিচার করেন না। তিনি মানুষের হৃদয় ও আমল দেখেন। সুতরাং যার তাক্বওয়া বেশি হয়, সেই হয় তাঁর নিকট মর্যাদাবান ও সম্মানের পাত্র এবং যে যত বড় পাপী হয়, সে তত বড় অপদার্থ ও তাঁর ঘৃণার পাত্র হয়।

মহান আল্লাহ বলেছেন, {يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ} (۱۳) سورة الحجرات
"হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরেরর সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক আল্লাহ-ভীরু। আল্লাহ সবকিছু জানেন, সব কিছুর খবর রাখেন।" (হুজুরাতঃ ১৩)

মহানবী বলেছেন, لينتهين أقوام يفتخرون بآبائهم الذين مَاتُوا ، إِنَّمَا هم فحم جَهَنَّمَ ، أَو لَيَكُونَن أَهْون على الله من الجعل الذي يدهده الخرء بأنفه ، إن الله قد أذهب عَنْكُم عَبيَّةِ الْجَاهِلِيَّة وَفَخْرِهَا بِالْآبَاءِ ، إِنَّمَا هُوَ مُؤْمِن تَقِيّ أو فاجر شقي ، [النَّاس كلهم بنو آدم ، وآدم خلق من تراب)).
"লোকেরা যেন মৃত বাপ-দাদাদের নিয়ে ফখর করা অবশ্যই ত্যাগ করে। তারা তো জাহান্নামের কয়লা মাত্র। তা ত্যাগ না করলে তারা সেই গোবুরে পোকার চেয়েও নিকৃষ্ট হবে যে নিজ নাক দ্বারা মল ঠেলে নিয়ে যায়। অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের নিকট থেকে জাহেলিয়াতের গর্ব ও ফখর দূর করে দিয়েছেন। (মুসলিম) তো মুত্তাকী (সংযমশীল) মুমিন অথবা পাপাচারী বদমায়াশ। মানুষ সকলেই আদমের সন্তান এবং আদম মাটি হতে সৃষ্ট।" (তিরমিযী ৩৯৫৫, আহমাদ, আবু দাউদ, বাইহাক্বী, সহীহুল জামে' ৫৪৮-২নং)

অন্য এক বর্ণনায় আছে, فَالنَّاسُ رَجُلانِ : بَر تَقِيُّ كَرِيمٌ عَلَى اللهِ ، وَفَاجِرٌ شَقِيٌّ هَيِّنٌ عَلَى اللَّهِ».
"সকল মানুষ হল দুটি মানুষের মতো; সৎশীল, সংযমী এবং আল্লাহর নিকট মর্যাদাবান আর পাপাচারী বদমাশ এবং আল্লাহর নিকট অপদার্থ।" (তিরমিযী ২২৭০নং)

*****

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00