📄 দুআ কবলে পাপের প্রভাব
মহান আল্লাহ পরম করুণাময়। তিনি বান্দাকে দান করেন, চাইলে দান করেন, না চাইলেও দান করেন। মু'মিনকে দান করেন, কাফেরকেও দান করেন। এ হল দুনিয়ার চাওয়া-পাওয়া। কিন্তু দ্বীন ও আখেরাত কেবল সেই লাভ করে, যাকে তিনি পছন্দ করেন ও ভালোবাসেন। মহানবী বলেছেন,
((إن الله قسم بينكم أخلاقكم كما قسم بينكم أرزاقكم، وإن الله يؤتي المال من يحب ومن لا يحب، ولا يؤتى الإيمان إلا من أحب، فإذا أحب الله عبداً أعطاه الإيمان)).
"নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের মাঝে তোমাদের চরিত্র বন্টন ক'রে দিয়েছেন, যেমন তিনি তোমাদের মাঝে তোমাদের রুযী বন্টন ক'রে দিয়েছেন। নিশ্চয় তিনি তাকে দুনিয়া দান করেন, যাকে তিনি ভালোবাসেন এবং যাকে তিনি ভালোবাসেন না। কিন্তু তিনি ঈমান দান করেন কেবল তাকে, যাকে তিনি ভালোবাসেন। সুতরাং যখন আল্লাহ কোন বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তিনি তাকে ঈমান দান করেন।" (ত্বাবারানী ৮৮৯৭, প্রমুখ, সিঃ সহীহাহ ২৭১৪নং)
মহান প্রতিপালকের নিকট চাইলে তিনি দান করেন। কেউ দুই হাত তুলে কিছু চাইলে তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন। আবার তাঁর নিকট না চাইলে তিনি রাগ করেন। অভাবী দাস হয়েও আপন প্রভুর নিকট প্রার্থনা না করা এক প্রকার অহংকার। আর অহংকারীকে তিনি ভালোবাসেন না। কিন্তু যে দাস আপন প্রভুর অবাধ্য, যে নিজ প্রভুর বিরুদ্ধাচরণ করে, আদেশ লংঘন করে, নিষেধ অমান্য করে, সেই সাথে তাঁর নিকট প্রার্থনা করলে তিনি কি দান করবেন? মহান প্রভু বললেন, "তোমরা হালাল খাদ্য ভক্ষণ কর।" দাস সে আদেশ অমান্য ক'রে হারাম খাদ্য খেতে থাকল, হারাম পরতে লাগল এবং পাপ পথে অর্জিত ধন দিয়ে নিজের দেহ প্রতিপালিত করতে থাকল এবং সেই সাথে প্রভুর নিকট এটা-সেটা চাইতে লাগল। প্রভু কি সেই নাফরমান দাসকে দান করবেন? মহানবী বলেছেন,
أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا وَإِنَّ اللَّهَ أَمَرَ الْمُؤْمِنِينَ بِمَا أَمَرَ بِهِ الْمُرْسَلِينَ فَقَالَ ( يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّى بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ) وَقَالَ (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ) .. ثُمَّ ذَكَرَ الرَّجُلَ يُطِيلُ السَّفَرَ أَشْعَثَ أَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ يَا رَبِّ يَا رَبِّ وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ وَغُذِيَ بِالْحَرَامِ فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذَلِكَ ..
"অবশ্যই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র (মালই) কবুল করে থাকেন। আল্লাহ মুমিনদেরকে সেই আদেশ করেছেন, যে আদেশ করেছেন আম্বিয়াগণকে। সুতরাং তিনি আম্বিয়াগণের উদ্দেশ্যে বলেছেন, 'হে রসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তুসমূহ থেকে আহার কর এবং সৎকাজ কর। তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবহিত।' (সূরা মু'মিনুন ৫১ আয়াত) আর তিনি (মুমিনদের উদ্দেশ্যে) বলেছেন, 'হে মুমিনগণ! আমি তোমাদেরকে যে সব রুজী দান করেছি তা থেকে পবিত্র বস্তু আহার কর---।' (বাক্বারাহ ১৭২) অতঃপর তিনি সেই ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে লম্বা সফর করে আলুথালু ধূলিমলিন বেশে নিজ হাত দু'টিকে আকাশের দিকে লম্বা করে তুলে দুআ করে, 'হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রভু!' কিন্তু তার আহার্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পরিধেয় লেবাস হারাম এবং হারাম দ্বারাই তার পুষ্টিবিধান হয়েছে। অতএব তার দুআ কীভাবে কবুল হতে পারে? (মুসলিম ২৩৯৩, তিরমিযী ২৯৮৯, দারেমী ২৭১৭নং)
কেউ কি তার অবাধ্য দাসদাসীকে খেতে-পরতে দেবে? তার ভরণপোষণ করবে? কেউ কি তার অবাধ্য স্ত্রীকে যথার্থ স্ত্রীর মর্যাদা দান করবে?
অন্যায় দেখে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, অন্যায় প্রতিহত করা, সৎ কাজের আদেশ দেওয়া ও অসৎ কাজে বাধা দেওয়া, এ সবই মহান প্রভুর আদেশ। কিন্তু যে দাস সে আদেশ লংঘন করে, সে তাঁর নিকট কিছু চাইলে কি তিনি তাকে তা দান করবেন? মোটেই না। মহানবী বলেছেন,
(( وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ، وَلَتَنْهَوْنَ عَنْ الْمُنْكَرِ أَوْ لَيُوشِكَنَّ اللَّهُ أَنْ يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عِقَابِاً مِنْهُ ثُمَّ تَدْعُوْنَهُ فَلَا يُسْتَجَابُ لَكُمْ )).
"তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ আছে! তোমরা অবশ্যই ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে, তা না হলে শীঘ্রই আল্লাহ তাআলা তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের উপর আযাব পাঠাবেন। অতঃপর তোমরা তাঁর কাছে দুআ করবে; কিন্তু তা কবুল করা হবে না।" (আহমাদ, তিরমিযী ২১৬৯, সহীহুল জামে ৭০৭০নং)
মহান আল্লাহ মুসলিমকে মুসলিম ও সতী নারী বিবাহ করতে বলেছেন। অসতী নারী বিবাহ করাকে মুসলিমদের জন্য হারাম করেছেন। (নূরঃ৩) কিন্তু কেউ কোন স্বার্থবশে অথবা অবৈধ ভালোবাসার আকর্ষণে তেমন নারী বিবাহ করল। অথবা বিবাহ করার পর জানতে পারল যে, সে অসতী ও ভ্রষ্টা। তা সত্ত্বেও সে তার সাথে সংসার করতে থাকল। তার মানে তার চরিত্র খারাপ জেনেও তাকে ভালোবাসতে থাকল। এটা কি মহান প্রতিপালকের অবাধ্যাচরণ ও বিরুদ্ধাচরণ নয়?
এর পরেও সে আল্লাহর কাছে দুআ করলে কি কবুল হবে? কক্ষনো না।
এক ব্যক্তি অপরকে ঋণ দিল অথবা কোন দেনা-পাওনার চুক্তি করল, কিন্তু কোন সাক্ষ্য রাখল না। অথচ মহান আল্লাহর বিধান তাতে সাক্ষী রেখে লেখালিখি ক'রে নেওয়া। (সূরা বাক্বারাহঃ ২৮-২)
এ বিধান লংঘন করা এক প্রকার অবাধ্যাচরণ। এই অবজ্ঞা মনে রেখে প্রভুর কাছে কিছু চাইলে কি পাওয়ার আশা করা যেতে পারে?
নির্বোধদের হাতে টাকা-পয়সা দেওয়া নিষিদ্ধ। তাতে অর্থনষ্ট ঘটে। সে বিধান যারা উপেক্ষা করে, তাদের প্রার্থনা কি মঞ্জুর হতে পারে? মহানবী বলেছেন,
ثَلَاثَةٌ يَدْعُونَ اللَّهَ فَلَا يُسْتَجَابُ لَهُمْ رَجُلٌ كَانَتْ تَحْتَهُ امْرَأَةً سَيِّئَةُ الْخُلُقِ فَلَمْ يُطَلِّقُهَا وَرَجُلٌ كَانَ لَهُ عَلَى رَجُل مَال فَلَمْ يُشْهِدْ عَلَيْهِ وَرَجُلٌ آتَى سَفِيهَا مَالَهُ وَقَدْ قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ (وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمْ) ..
"তিন ব্যক্তি দুআ করে কিন্তু কবুল হয় না; যে তার অসৎ চরিত্রের স্ত্রীকে তালাক দেয় না। যে ঋণ দিয়ে সাক্ষী রাখে না এবং যে নির্বোধকে নিজের অর্থ প্রদান করে; অথচ আল্লাহ বলেছেন, "তোমরা নির্বোধদেরকে তোমাদের অর্থ প্রদান করো না।" (নিসাঃ ২) (হাকেম ৩ ১৮-১, বাইহাক্বী ২১০২২, সঃ জামে' ৩০৭৫নং)
অনুরূপ অন্যান্য পাপকেও অনুমান করা যেতে পারে যে, তা করা অবস্থায় মহান প্রতিপালক পাপীর দুআ কবুল করেন না।
অনাবৃষ্টি হলে লোকে অভিযোগ করে, দুআ কবুল হয় না কেন? 'আল্লাহুম্মাসকিনা-আল্লাহুম্মাসক্বিনা' প্রার্থনা করা সত্ত্বেও তা মঞ্জুর হয় না কেন? বড় আলেম দিয়ে দুআ করানো সত্ত্বেও আল্লাহ বৃষ্টি দেন না কেন? উত্তর তাদের কাছেই। তারা আল্লাহর বাধ্য বান্দা হয় না কেন? তারা অর্থের যাকাত ও ফসলের ওশর আদায় করে না কেন?
'খাবার বেলা নেবার মা, উলু দেবার বেলা মুখে ঘা।' কিছু না দিয়ে কিছু পাওয়ার আশা করা কি ভুল নয়? এটা কি বড় স্বার্থপরতা নয়?
📄 ফিরিশতা ও মু’মিনদের দুআ থেকে বঞ্চনা
যারা মু'মিন-মুসলিম, তাদের জন্য ফিরিস্তা দুআ করেন। তাঁরা তাদের জন্য মহান প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তাদের জন্য জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তি প্রার্থনা করেন। তাদের ও তাদের পরিবারের জন্য জান্নাত প্রার্থনা করেন। তাদের পাপ ও পাপের শাস্তি হতে নিষ্কৃতির প্রার্থনা করেন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَّحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ (۷) رَبَّنَا وَأَدْخِلْهُمْ جَنَّاتِ عَدْنِ الَّتِي وَعَدْتَهُمْ وَمَنْ صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (۸) وَقِهِمُ السَّيِّئَاتِ وَمَنْ تَقِ السَّيِّئَاتِ يَوْمَئِذٍ فَقَدْ رَحِمْتَهُ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ} (9) سورة غافر
"যারা আরশ ধারণ ক'রে আছে এবং যারা এর চারিপাশ ঘিরে আছে, তারা তাদের প্রতিপালকের পবিত্রতা ও মহিমা প্রশংসার সাথে ঘোষণা করে এবং তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং বিশ্বাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা ক'রে বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার দয়া ও জ্ঞান সর্বব্যাপী; অতএব যারা তওবা করে ও তোমার পথ অবলম্বন করে, তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর এবং জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা কর। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তাদেরকে স্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ দান কর; যার প্রতিশ্রুতি তুমি তাদের দিয়েছ (এবং তাদের) পিতা-মাতা, পতি-পত্নী ও সন্তান সন্ততিদের মধ্যে (যারা) সৎকাজ করেছে, তাদেরকেও (জান্নাত প্রবেশের অধিকার দাও)। নিশ্চয়ই তুমি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। এবং তুমি তাদেরকে শাস্তি হতে রক্ষা কর। সেদিন তুমি যাকে শাস্তি হতে রক্ষা করবে, তাকে তো দয়াই করবে। আর এটিই তো মহাসাফল্য।' (মু'মিনঃ ৭-৯)
মহানবী বহু দুআ করেছেন উম্মতের জন্য। মু'মিনরাও একে অন্যের জন্য দুআ ক'রে থাকে। বিশেষ ক'রে জানাযা, কবর যিয়ারত ইত্যাদির সময় ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়ে থাকে।
কিন্তু যারা মহা অপরাধী মুশরিক, তাদের জন্য সে দুআ করা বৈধ নয়। তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার দুআ কাজেও লাগে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ} (۱۱۳) سورة التوبة
"অংশীবাদীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নবী ও বিশ্বাসীদের জন্য সঙ্গত নয়; যদিও তারা আত্মীয়ই হোক না কেন, তাদের কাছে একথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে, তারা জাহান্নামের অধিবাসী।" (তাওবাহঃ ১১৩)
যারা ভীষণ অপরাধী মুনাফিক, তাদের জন্যও ক্ষমাপ্রার্থনার দুআ কাজে লাগে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِن تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ} (۸۰) سورة التوبة
"তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা না কর (উভয়ই সমান); যদি তুমি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমা প্রার্থনা কর, তবুও আল্লাহ তাদেরকে কখনই ক্ষমা করবেন না; যেহেতু তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে কুফরী করেছে। আর আল্লাহ অবাধ্য সম্প্রদায়কে পথপ্রদর্শন করেন না।" (তাওবাহঃ ৮০)
{سَوَاء عَلَيْهِمْ أَسْتَغْفَرْتَ لَهُمْ أَمْ لَمْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ لَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ} (٦) سورة المنافقون
"তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা না কর, উভয়ই তাদের জন্য সমান। আল্লাহ তাদেরকে কখনো ক্ষমা করবেন না। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।" (মুনাফিকুন: ৬)
📄 আত্মবিশ্বাস ও আশার উপর পাপের প্রভাব
মানুষ যখন পাপ করতে থাকে এবং সে তাতে তৃপ্তি পায়, তখন তা নেশা ও পেশাতে পরিণত হয়। পরিশেষে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, সে ভালো হওয়ার চেষ্টাও করে না। কেউ উপদেশ দিতে গেলে তা গ্রাহ্যও করে না।
গোনাহ আত্মবিশ্বাস বিনষ্ট করে। পাপী নিজের উপর ভরসা রাখতে পারে না। তার মনে সাফল্যের আশা ফুরিয়ে যায়। পাপ করতে করতে পাপী হতাশার শিকার হয়ে পড়ে। সে ভাবে, সে আর সমাজের মূল স্রোতধারায় ফিরতে পারবে না। সমাজ তাকে গ্রহণ করবে না। মহান আল্লাহও তাকে ক্ষমা করবেন না।
ঈমান আনার পূর্বে অথবা তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুভূতি সৃষ্টি হওয়ার পূর্বে যতই গোনাহ করে থাক, মানুষ যেন এই মনে না করে যে, আমি তো অনেক বড় পাপী, আমাকে আল্লাহ কেন ক্ষমা করবেন? বরং সত্য হৃদয়ে যদি ঈমান আনে বা নিষ্ঠার সাথে যদি তওবা করে, তবে মহান আল্লাহ সমস্ত পাপকে মাফ ক'রে দেবেন।
কিছু কাফের ও মুশরিক এমন ছিল, যারা প্রচুর হত্যা ও ব্যভিচারে লিপ্ত ছিল। এরা নবী করীম ﷺ-এর কাছে উপস্থিত হয়ে বলল যে, আপনার দাওয়াত তো সঠিক, কিন্তু আমরা অনেক পাপের পাপী। যদি আমরা ঈমান আনি, তবে এই সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যাবে কি?
উক্ত প্রশ্নের উত্তরে মহান আল্লাহ আয়াত অবতীর্ণ করলেন,
{قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ } (٥٣) سورة الزمر
"ঘোষণা করে দাও (আমার এ কথা), হে আমার দাসগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছ, তারা আল্লাহর করুণা হতে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত পাপ মাফ ক'রে দেবেন। নিশ্চয় তিনিই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (যুমার: ৫৩, সহীহ বুখারী, তাফসীর সূরা যুমার)
তবে এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা পাওয়ার আশায় খুব পাপ ক'রে যাও। তাঁর যাবতীয় বিধি-বিধান ও ফরয কার্যাদির ব্যাপারে কোনই পরোয়া করো না এবং আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা ও নিয়ম-নীতি নিষ্ঠুরতার সাথে লঙ্ঘন ক'রে যাও।
কারণ এইভাবে তাঁর ক্রোধ ও প্রতিশোধকে আহবান জানিয়ে তাঁর রহমত ও ক্ষমা পাওয়ার আশা করা একেবারে বোকামি ও খামখেয়ালী। এটা হল নিম ফলের বীজ লাগিয়ে আঙ্গুর ফলের আশা রাখার মতই। এই ধরনের মানুষের স্মরণ রাখা উচিত যে, তিনি যেমন তাঁর বান্দাদের জন্য غَفُورٌ رَّحِيمٌ (মহা ক্ষমাশীল পরম করুণাময়) তেমনি তিনি তাঁর অবাধ্যজনদের জন্য عَزِيزٌ ذُو انْتِقَامِ (পরাক্রমশালী প্রতিশোধগ্রহণকারী) ও বটেন। তাই তো কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে এই উভয় দিককে এক সাথেই বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন,
نَبِّئْ عِبَادِي أَنِّي أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيمُ ، وَأَنَّ عَذَابِي هُوَ الْعَذَابُ الْأَلِيمُ)
অর্থাৎ, আমার বান্দাদেরকে বলে দাও, নিশ্চয় আমিই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু এবং আমার শাস্তিই হল অতি মর্মন্তুদ শাস্তি। (সূরা হিজর ৪৯-৫০ আয়াত)
সম্ভবতঃ এটাই কারণ যে, এখানে আয়াতের আরম্ভ يَا عِبَادِي (হে আমার বান্দাগণ!) দিয়ে হয়েছে। যার দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, যে ব্যক্তি ঈমান আনে অথবা সত্য হৃদয়ে তওবা ক'রে প্রকৃত অর্থে সে তাঁর বান্দা হয়ে যাবে, তার পাপ যদি সমুদ্রের ফেনা বরাবরও হয়, তবুও তা মাফ হয়ে যাবে। তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য অবশ্যই ক্ষমাশীল ও দয়াবান। যেমন, হাদীসে একশত মানুষের খুনীর তওবার ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে। (বুখারী: আম্বিয়া অধ্যায়, মুসলিমঃ তওবা অধ্যায়, দ্রঃ তফসীর আহসানুল বয়ান)
📄 পাপী এক শ্রেণীর কয়েদী
মহানবী বলেছেন,
مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَقَدْ وُكِّلَ بِهِ قَرِيتُهُ مِنَ الْجِنِّ .. قَالُوا وَإِيَّاكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ . وَإِيَّايَ إِلَّا أَنَّ اللَّهَ أَعَائِنِي عَلَيْهِ فَأَسْلَمَ فَلَا يَأْمُرُنِي إِلَّا بِخَيْرٍ ..
"তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যার সাথে সঙ্গী জ্বিন নিযুক্ত নেই।" লোকেরা বলল, 'আর আপনার সাথেও কি আছে, হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "আমার সাথেও আছে। তবে আল্লাহ তার বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করেছেন বলে সে ইসলাম গ্রহণ করেছে (বা আমি নিরাপদে থাকি)। সুতরাং আমাকে সে মঙ্গল ছাড়া অন্য কিছুর আদেশ দেয় না।" (মুসলিম ৭২৮৬নং)
একদা রাত্রি বেলায় আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) সতীনদের প্রতি ঈর্ষা প্রকাশ করলে মহানবী ﷺ তাঁকে বললেন, يَا عَائِشَةُ أَخَدْكِ شَيْطَانُكِ». فَقُلْتُ : أَمَا لَكَ شَيْطَانٌ؟ قَالَ : مَا مِنْ آدَمِيٌّ إِلَّا لَهُ شَيْطَانٌ. فَقُلْتُ : وَأَنْتَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ : وَأَنَا ، لَكِنِّى دَعَوْتُ اللَّهَ عَلَيْهِ فَأَسْلَم.
"আয়েশা! তোমাকে তোমার শয়তান ধরেছে।" আয়েশা বললেন, 'আপনার কি শয়তান নেই?' তিনি বললেন, এমন কোন আদম-সন্তান (আদমী বা মানুষ) নেই, যার শয়তান নেই। আয়েশা বললেন, 'আর আপনি হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "আর আমিও। তবে আমি তার বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে দুআ করেছি, তাই আমি নিরাপদ থাকি।" (বাইহাক্বী ২৫৫২, হাকেম ৮৩২, ইবনে হিব্বান ১৯৩৩, ইবনে খুযাইমা ৬৫৪নং)
মু'মিন মানুষ ফিরিশ্তার দিক-নির্দেশনার উপর চলে এবং শয়তানকে পরাস্ত করে। যখনই শয়তান তাকে ভ্রষ্ট বা বিপথগামী করতে চায়, তখনই সে শয়তানকে প্রতিহত করে। মহানবী বলেছেন,
((إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَيُنْضِي شَيَاطِينَهُ كَمَا يُنْضِي أَحَدُكُمْ بَعِيرَهُ فِي السَّفَرِ)).
"নিশ্চয় মু'মিন তার শয়তানদেরকে কৃশ ক'রে ফেলে, যেমন তোমাদের কেউ সফরে তার (সওয়ারী) উটকে কৃশ ক'রে ফেলে।" (আহমাদ ৮-৯৪০, আবু য়্যা'লা, সিঃ সহীহাহ ৩৫৮৬নং)
কিন্তু পাপী তার বিপরীত। পাপী তার শয়তানের হাতে বন্দী হয়ে যায়, তার সফরের সওয়ারী বা বাহন হয়ে যায়। আর লাগাম থাকে তার হাতে। শয়তান যেমন তার মনে প্রক্ষিপ্ত করে, তেমন চলে, বলে ও করে।
পাপী নিজ খেয়ালখুশীর কারাগারের কয়েদী হয়ে যায়। কুপ্রবৃত্তির কয়েদখানা থেকে সে বের হতে পারে না।
আর তার থেকে বেশি দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তি আর কে হতে পারে, যাকে তার চিরশত্রু বন্দী বানিয়ে নিয়েছে? খেয়ালখুশীর কারাগার অপেক্ষা আর কোন কারাগার বেশি সংকীর্ণ হতে পারে? কুপ্রবৃত্তির কয়েদখানা ছাড়া আর কোন কয়েদখানা বেশি কষ্টদায়ক হতে পারে?
প্রকৃত কয়েদী সে নয়, যাকে তার পরিবার-পরিজন থেকে দূরে রাখা হয়েছে। বরং প্রকৃতপক্ষে কয়েদী সেই মানুষ, যাকে তার মহান প্রতিপালক থেকে দূরে রাখা হয়েছে। প্রকৃত কারারুদ্ধ সেই ব্যক্তি, যার হৃদয় তার খেয়ালখুশীর কারাকক্ষে বন্দী আছে।
সুতরাং সে ব্যক্তি কীভাবে পরকালের শুভ পরিণামের পথে যাত্রা করবে, যে আসলে একজন জেল-কয়েদী ও হাত-পা বাঁধা ব্যক্তি?