📄 নিরাপত্তা অপনোদনে পাপের প্রভাব
নিরাপত্তা একটি বড় নেয়ামত। নচেৎ বাড়ি থেকে বের হয়ে যদি ফিরে আসার আশা না থাকে অথবা পথিমধ্যে কোথাও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সে পরিবেশে বাঁচার সুখ কী? মহিলাদের নিরাপত্তা নেই, তারা ইভটিজিং ও ধর্ষণের শিকার হয়। টাকা-পয়সা সাথে নেওয়াতে নিরাপত্তা নেই, রাস্তার মধ্যে ছিন্তাইয়ের ভয়। যুদ্ধ-বিগ্রহ, বিদ্রোহ ও সন্ত্রাসের সামনে গুলি বা বোমার আঘাত খাওয়ার ভয়, তাতেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়।
পাপ করে এক শ্রেণীর মানুষ, আর ভুগতে হয় নিরপরাধ মানুষদেরকে। অবশ্য অকৃতজ্ঞতার শাস্তি স্বরূপ সেই দেশের মানুষদের উপরে এমন অনিরাপত্তা ও ত্রাসের আযাব চাপিয়ে দেওয়া হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلاً قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُّطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّن كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بأَنْعُمِ اللَّهِ فَأَذَاقَهَا اللهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ} (۱۱۲)
"আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসত সর্বদিক হতে প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল; ফলে তারা যা করত, তার জন্য আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ।" (নাহলঃ ১১২)
নারী পাপ করে অশালীন পোশাক পরিধান ক'রে এবং পাপাচারী লম্পটদের যৌন-শিকার হয়। কখনো বা নারী কেবল ধর্ষিতা হয়, কখনো বা সে খুন হয় অথবা তার সাথে প্রতিবাদী আত্মীয় খুন হয়। নারীর অমূল্য সম্পদ তার রূপ-যৌবন। যার হিফাযত হয় না বলে ডাকাতির শিকার হয়। ফলে তার রূপ-যৌবনই তার বড় দুশমন রূপে পরিগণিত হয় এবং অধিকাংশ সময়ে সে নিরাপত্তার অভাবে দুশ্চিন্তায় কালাতিপাত করে।
ডাকাত ও লুঠেরা দলের পাপের ফলে নিরাপদ সমাজে অনিরাপত্তার ত্রাস বিরাজ করে। মহান আল্লাহর বিধানানুযায়ী দেশ পরিচালিত হয় না বলে তারা দুঃসাহসিক দাপটে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
'রাজা-রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়।' সেখানেও যালেম রাজা বা রাষ্ট্রনেতাদের আগ্রাসনের মুখে পড়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে সাধারণ মানুষ। ক্ষমতা বা গদি দখলের লোভে বিদ্রোহ করে কোন গোষ্ঠী। তার ফলে সৃষ্টি হয় যুদ্ধ ও সন্ত্রাস। আর তার মাসুল দেয় সাধারণ মানুষ। বিশেষ ক'রে ভোটের সময় ক্ষমতার দ্বন্দ্বে শান্তিপূর্ণ পরিবেশের একটি চিত্র এক কবির বিকৃত কবিতায় নিম্নরূপঃ-
আমাদের ছোট গাঁয়ে ছোট ছোট ঘর,
থাকি সেথা সবে মিলে ভোেট এলে পর।
পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই-ভাই,
ভোেট এলে দলাদলি হই ঠাঁই-ঠাঁই।
আমাদের ছোট গ্রাম মায়ের সমান,
ভোটের সময়ে তার রাখি নাকো মান।
মাঠ-ভরা ধান আর জল-ভরা দীঘি,
ভোটের বোমায় তাতে আগুনে দি ঘি।
কেউ সেথা নেচে মরে কেউ ভরে ঝুলি,
তবুও 'মুসলিম' মোরা বড় বড় বুলি।
রাজনীতির ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সমাজের মানুষ নানা দলে বিভক্ত হয় এবং একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিরোধী হয়ে শান্তির নীড়কে নরকে পরিণত করে। কেউ দেয় মাটির জন্য প্রাণ, কেউ দেয় পার্টির জন্য জান, কেউ হয় অন্যকে গদিতে বসানোর জন্য কুরবান। এরা জান দেয়, জান নেয়, এদের কাছে নেই কোন পরিত্রাণ।
আরো একটা পাপের কথা চিন্তা করুন, যদিও সে পাপ তথাকথিত অনেক উদারপন্থীদের নিকট 'কিন্তু নয়'। ওটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। ওটা পাপ নয়, ওটা কাপ। ওটা ভালোবাসা! ওটা পছন্দ ক'রে বিয়ে করা।
কিন্তু ঐ পাপের মৃদু বাতাস যখন ঘরে আসে এবং ধীরে ধীরে তা তুফানে পরিণত হয়, তখন তার ফলে সে ঘরের নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটে। প্রেম প্রত্যাখ্যাত হলে অথবা একপক্ষ মেনে না নিলে যুদ্ধ বাধে। আর তাতে ধ্বংস হয় অর্থ, চলে যায় মানীর মান। অনেক সময় ক্ষয় হয় কত মানুষের প্রাণ। ছোট্ট একটা দেশলাই কাঠির মতো বাক্সে চুপচাপ থাকে। সময়ে ঘর্ষণের ফলে ছারখার করে পরিবারকে।
যে বাপ-মা বা ভাই-দোলাভাই কষ্ট ক'রে বুকের মাঝে আগলে আগলে মানুষ করে, তাদেরই বুকে লাথি মেরে রসিক নাগরের সাথে বেরিয়ে গিয়ে নির্লজ্জের মতো বলে, 'আই এম এ্যাডাল্ট!'
তার মানে, বড় হয়ে আমার নিজের জীবন বেছে নেওয়ার অধিকার আছে। কে বড় করল তা দেখব কেন? যে যৌবনের আকর্ষণে নাগর পেয়ে ধন্য হল, সে যৌবন দেহে কে এনে দিল, তা দেখব কেন? আমি যে নেমকহারাম।
তাই দুঃখ নেই এদের প্রতি, যেহেতু তারা নেমকহারাম। কিন্তু দুঃখ হল তাদের প্রতি, যারা তাদের এই নির্লজ্জতাকে প্রশ্রয় দেয় ও মেনে নেয় অথবা যারা মেনে নিতে বাধ্য করায়।
📄 সাফল্য লাভে পাপের প্রভাব
যে ঘরে পাপ ঢোকে, সে ঘরে বর্কত থাকে না। যে ব্যক্তি পাপাচরণে মগ্ন থাকে, সে সাফল্যের মুখ দর্শন করতে পারে না। পাপ করার ফলে কৃতকার্যতা মুখ ফিরিয়ে নেয়। কাজে কাজে আটকে যায়। সহজ জিনিস কঠিন হয়ে যায়। যেমন মহান আল্লাহকে ভয় করলে সকল কাজ সহজ হয়ে যায় এবং সাফল্যের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়।
মহান আল্লাহকে যে ভয় করে, সে পরীক্ষায় পড়তে পারে। অতঃপর সে পাশ করলে সাফল্য তাকে স্বাগত জানায়।
আল্লাহর দুশমনকে বাহ্যদৃষ্টিতে সফল মনে হলেও প্রকৃত সফলতা তাকে ধরা দেয় না। এই জন্য 'যে করে পাপ, সে সাত বেটার বাপ। আর যে করে পুণ্য, তার কাঁদতে যায় জন্ম' বাহ্যদৃষ্টির অভিজ্ঞতার ফল। নচেৎ প্রকৃত দৃষ্টিতে আল্লাহ-ওয়ালারাই সফল।
একটি উদাহরণে উভয় দৃষ্টিভঙ্গিতে তফাৎ স্পষ্ট হয়ে যাবে। বিশাল ধনবান কারুন। ধনবান হল বলবান, আর অনেকের দৃষ্টিতে ধনবানই ভগবান। কিন্তু অন্য দৃষ্টিতে সে ভাগ্যবান নয়। কারণ সে ধনলাভে সফল ছিল, কিন্তু প্রকৃত সুখলাভে সফল ছিল না। মহান আল্লাহ উভয় দৃষ্টির কথা তাঁর কুরআনে উল্লেখ করেছেন,
{فَخَرَجَ عَلَى قَوْمِهِ فِي زِينَتِهِ قَالَ الَّذِينَ يُرِيدُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا يَا لَيْتَ لَنَا مِثْلَ مَا أُوتِيَ قَارُونُ إِنَّهُ لَذُو حَظٍّ عَظِيمٍ (۷۹) وَقَالَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ وَيْلَكُمْ ثَوَابُ اللَّهِ خَيْرٌ لِّمَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا وَلَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الصَّابِرُونَ} (۸۰) سورة القصص
"কারুন তার সম্প্রদায়ের সম্মুখে জাঁকজমক সহকারে বের হল। যারা পার্থিব জীবন কামনা করত তারা বলল, 'আহা! কারুনকে যা দেওয়া হয়েছে, সেরূপ যদি আমাদেরও থাকত; প্রকৃতই সে মহা ভাগ্যবান।' আর যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল তারা বলল, 'ধিক্ তোমাদের! যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ। আর ধৈর্যশীল ব্যতীত তা অন্য কেউ পায় না।" (ক্বাস্বাস্বঃ ৭৯-৮০)
কারুন সফল ছিল না। কারণ, মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَخَسَفْنَا بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضِ فَمَا كَانَ لَهُ مِن فِئَةٍ يَنصُرُونَهُ مِن دُونِ اللَّهِ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُنتَصِرِينَ (۸۱) وَأَصْبَحَ الَّذِينَ تَمَنَّوْا مَكَانَهُ بِالْأَمْسِ يَقُولُونَ وَيْكَأَنَّ اللَّهَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَن يَشَاء مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَوْلَا أَن مَّنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا لَخَسَفَ بِنَا وَيْكَأَنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ} (۸۲)
"অতঃপর আমি কারুনকে ও তার প্রাসাদকে মাটিতে ধসিয়ে দিলাম। তার স্বপক্ষে এমন কোন দল ছিল না, যে আল্লাহর শাস্তির বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করতে পারত এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিল না। পূর্বদিন যারা তার (মত) মর্যাদা কামনা করেছিল তারা বলতে লাগল, 'দেখ, আল্লাহ তাঁর দাসদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা তার রুযী বর্ধিত করেন এবং যার জন্য ইচ্ছা তা হ্রাস করেন। যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করতেন, তবে আমাদেরকেও তিনি মাটিতে ধসিয়ে দিতেন। দেখ, অকৃতজ্ঞরা সফলকাম হয় না।' (কাস্বাস্বঃ ৮১-৮২)
অনুরূপ "অপরাধীরা সফলকাম হয় না।" (ইউনুসঃ ১৭) "সফলকাম হয় না যালেমরা।" (কাস্বাস্বঃ ৩৭)
আরো উদাহরণ নিতে পারেন ধন সঞ্চয়কারী পাপীর, যে মদ ও নারীর পশ্চাতে অর্থ ব্যয় ক'রে নানা পাপ করে। সে কি দুনিয়াতেই সফলকাম হতে পারবে?
যে ছাত্র-ছাত্রী অবৈধ প্রেম-ভালোবাসা বা বিকৃত যৌন-চিন্তার পাপে লিপ্ত থাকবে, সে কি তার জীবনাকাশে সফলতার সূর্যকে উদিত দেখতে পাবে?
না, তারা দুনিয়াতেও সফল হবে না। আর আখেরাতের সফলতা তো অনেক দূরের কথা।
📄 দুআ কবলে পাপের প্রভাব
মহান আল্লাহ পরম করুণাময়। তিনি বান্দাকে দান করেন, চাইলে দান করেন, না চাইলেও দান করেন। মু'মিনকে দান করেন, কাফেরকেও দান করেন। এ হল দুনিয়ার চাওয়া-পাওয়া। কিন্তু দ্বীন ও আখেরাত কেবল সেই লাভ করে, যাকে তিনি পছন্দ করেন ও ভালোবাসেন। মহানবী বলেছেন,
((إن الله قسم بينكم أخلاقكم كما قسم بينكم أرزاقكم، وإن الله يؤتي المال من يحب ومن لا يحب، ولا يؤتى الإيمان إلا من أحب، فإذا أحب الله عبداً أعطاه الإيمان)).
"নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের মাঝে তোমাদের চরিত্র বন্টন ক'রে দিয়েছেন, যেমন তিনি তোমাদের মাঝে তোমাদের রুযী বন্টন ক'রে দিয়েছেন। নিশ্চয় তিনি তাকে দুনিয়া দান করেন, যাকে তিনি ভালোবাসেন এবং যাকে তিনি ভালোবাসেন না। কিন্তু তিনি ঈমান দান করেন কেবল তাকে, যাকে তিনি ভালোবাসেন। সুতরাং যখন আল্লাহ কোন বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তিনি তাকে ঈমান দান করেন।" (ত্বাবারানী ৮৮৯৭, প্রমুখ, সিঃ সহীহাহ ২৭১৪নং)
মহান প্রতিপালকের নিকট চাইলে তিনি দান করেন। কেউ দুই হাত তুলে কিছু চাইলে তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন। আবার তাঁর নিকট না চাইলে তিনি রাগ করেন। অভাবী দাস হয়েও আপন প্রভুর নিকট প্রার্থনা না করা এক প্রকার অহংকার। আর অহংকারীকে তিনি ভালোবাসেন না। কিন্তু যে দাস আপন প্রভুর অবাধ্য, যে নিজ প্রভুর বিরুদ্ধাচরণ করে, আদেশ লংঘন করে, নিষেধ অমান্য করে, সেই সাথে তাঁর নিকট প্রার্থনা করলে তিনি কি দান করবেন? মহান প্রভু বললেন, "তোমরা হালাল খাদ্য ভক্ষণ কর।" দাস সে আদেশ অমান্য ক'রে হারাম খাদ্য খেতে থাকল, হারাম পরতে লাগল এবং পাপ পথে অর্জিত ধন দিয়ে নিজের দেহ প্রতিপালিত করতে থাকল এবং সেই সাথে প্রভুর নিকট এটা-সেটা চাইতে লাগল। প্রভু কি সেই নাফরমান দাসকে দান করবেন? মহানবী বলেছেন,
أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا وَإِنَّ اللَّهَ أَمَرَ الْمُؤْمِنِينَ بِمَا أَمَرَ بِهِ الْمُرْسَلِينَ فَقَالَ ( يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّى بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ) وَقَالَ (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ) .. ثُمَّ ذَكَرَ الرَّجُلَ يُطِيلُ السَّفَرَ أَشْعَثَ أَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ يَا رَبِّ يَا رَبِّ وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ وَغُذِيَ بِالْحَرَامِ فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذَلِكَ ..
"অবশ্যই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র (মালই) কবুল করে থাকেন। আল্লাহ মুমিনদেরকে সেই আদেশ করেছেন, যে আদেশ করেছেন আম্বিয়াগণকে। সুতরাং তিনি আম্বিয়াগণের উদ্দেশ্যে বলেছেন, 'হে রসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তুসমূহ থেকে আহার কর এবং সৎকাজ কর। তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবহিত।' (সূরা মু'মিনুন ৫১ আয়াত) আর তিনি (মুমিনদের উদ্দেশ্যে) বলেছেন, 'হে মুমিনগণ! আমি তোমাদেরকে যে সব রুজী দান করেছি তা থেকে পবিত্র বস্তু আহার কর---।' (বাক্বারাহ ১৭২) অতঃপর তিনি সেই ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে লম্বা সফর করে আলুথালু ধূলিমলিন বেশে নিজ হাত দু'টিকে আকাশের দিকে লম্বা করে তুলে দুআ করে, 'হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রভু!' কিন্তু তার আহার্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পরিধেয় লেবাস হারাম এবং হারাম দ্বারাই তার পুষ্টিবিধান হয়েছে। অতএব তার দুআ কীভাবে কবুল হতে পারে? (মুসলিম ২৩৯৩, তিরমিযী ২৯৮৯, দারেমী ২৭১৭নং)
কেউ কি তার অবাধ্য দাসদাসীকে খেতে-পরতে দেবে? তার ভরণপোষণ করবে? কেউ কি তার অবাধ্য স্ত্রীকে যথার্থ স্ত্রীর মর্যাদা দান করবে?
অন্যায় দেখে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, অন্যায় প্রতিহত করা, সৎ কাজের আদেশ দেওয়া ও অসৎ কাজে বাধা দেওয়া, এ সবই মহান প্রভুর আদেশ। কিন্তু যে দাস সে আদেশ লংঘন করে, সে তাঁর নিকট কিছু চাইলে কি তিনি তাকে তা দান করবেন? মোটেই না। মহানবী বলেছেন,
(( وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ، وَلَتَنْهَوْنَ عَنْ الْمُنْكَرِ أَوْ لَيُوشِكَنَّ اللَّهُ أَنْ يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عِقَابِاً مِنْهُ ثُمَّ تَدْعُوْنَهُ فَلَا يُسْتَجَابُ لَكُمْ )).
"তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ আছে! তোমরা অবশ্যই ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে, তা না হলে শীঘ্রই আল্লাহ তাআলা তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের উপর আযাব পাঠাবেন। অতঃপর তোমরা তাঁর কাছে দুআ করবে; কিন্তু তা কবুল করা হবে না।" (আহমাদ, তিরমিযী ২১৬৯, সহীহুল জামে ৭০৭০নং)
মহান আল্লাহ মুসলিমকে মুসলিম ও সতী নারী বিবাহ করতে বলেছেন। অসতী নারী বিবাহ করাকে মুসলিমদের জন্য হারাম করেছেন। (নূরঃ৩) কিন্তু কেউ কোন স্বার্থবশে অথবা অবৈধ ভালোবাসার আকর্ষণে তেমন নারী বিবাহ করল। অথবা বিবাহ করার পর জানতে পারল যে, সে অসতী ও ভ্রষ্টা। তা সত্ত্বেও সে তার সাথে সংসার করতে থাকল। তার মানে তার চরিত্র খারাপ জেনেও তাকে ভালোবাসতে থাকল। এটা কি মহান প্রতিপালকের অবাধ্যাচরণ ও বিরুদ্ধাচরণ নয়?
এর পরেও সে আল্লাহর কাছে দুআ করলে কি কবুল হবে? কক্ষনো না।
এক ব্যক্তি অপরকে ঋণ দিল অথবা কোন দেনা-পাওনার চুক্তি করল, কিন্তু কোন সাক্ষ্য রাখল না। অথচ মহান আল্লাহর বিধান তাতে সাক্ষী রেখে লেখালিখি ক'রে নেওয়া। (সূরা বাক্বারাহঃ ২৮-২)
এ বিধান লংঘন করা এক প্রকার অবাধ্যাচরণ। এই অবজ্ঞা মনে রেখে প্রভুর কাছে কিছু চাইলে কি পাওয়ার আশা করা যেতে পারে?
নির্বোধদের হাতে টাকা-পয়সা দেওয়া নিষিদ্ধ। তাতে অর্থনষ্ট ঘটে। সে বিধান যারা উপেক্ষা করে, তাদের প্রার্থনা কি মঞ্জুর হতে পারে? মহানবী বলেছেন,
ثَلَاثَةٌ يَدْعُونَ اللَّهَ فَلَا يُسْتَجَابُ لَهُمْ رَجُلٌ كَانَتْ تَحْتَهُ امْرَأَةً سَيِّئَةُ الْخُلُقِ فَلَمْ يُطَلِّقُهَا وَرَجُلٌ كَانَ لَهُ عَلَى رَجُل مَال فَلَمْ يُشْهِدْ عَلَيْهِ وَرَجُلٌ آتَى سَفِيهَا مَالَهُ وَقَدْ قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ (وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمْ) ..
"তিন ব্যক্তি দুআ করে কিন্তু কবুল হয় না; যে তার অসৎ চরিত্রের স্ত্রীকে তালাক দেয় না। যে ঋণ দিয়ে সাক্ষী রাখে না এবং যে নির্বোধকে নিজের অর্থ প্রদান করে; অথচ আল্লাহ বলেছেন, "তোমরা নির্বোধদেরকে তোমাদের অর্থ প্রদান করো না।" (নিসাঃ ২) (হাকেম ৩ ১৮-১, বাইহাক্বী ২১০২২, সঃ জামে' ৩০৭৫নং)
অনুরূপ অন্যান্য পাপকেও অনুমান করা যেতে পারে যে, তা করা অবস্থায় মহান প্রতিপালক পাপীর দুআ কবুল করেন না।
অনাবৃষ্টি হলে লোকে অভিযোগ করে, দুআ কবুল হয় না কেন? 'আল্লাহুম্মাসকিনা-আল্লাহুম্মাসক্বিনা' প্রার্থনা করা সত্ত্বেও তা মঞ্জুর হয় না কেন? বড় আলেম দিয়ে দুআ করানো সত্ত্বেও আল্লাহ বৃষ্টি দেন না কেন? উত্তর তাদের কাছেই। তারা আল্লাহর বাধ্য বান্দা হয় না কেন? তারা অর্থের যাকাত ও ফসলের ওশর আদায় করে না কেন?
'খাবার বেলা নেবার মা, উলু দেবার বেলা মুখে ঘা।' কিছু না দিয়ে কিছু পাওয়ার আশা করা কি ভুল নয়? এটা কি বড় স্বার্থপরতা নয়?
📄 ফিরিশতা ও মু’মিনদের দুআ থেকে বঞ্চনা
যারা মু'মিন-মুসলিম, তাদের জন্য ফিরিস্তা দুআ করেন। তাঁরা তাদের জন্য মহান প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তাদের জন্য জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তি প্রার্থনা করেন। তাদের ও তাদের পরিবারের জন্য জান্নাত প্রার্থনা করেন। তাদের পাপ ও পাপের শাস্তি হতে নিষ্কৃতির প্রার্থনা করেন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَّحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ (۷) رَبَّنَا وَأَدْخِلْهُمْ جَنَّاتِ عَدْنِ الَّتِي وَعَدْتَهُمْ وَمَنْ صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (۸) وَقِهِمُ السَّيِّئَاتِ وَمَنْ تَقِ السَّيِّئَاتِ يَوْمَئِذٍ فَقَدْ رَحِمْتَهُ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ} (9) سورة غافر
"যারা আরশ ধারণ ক'রে আছে এবং যারা এর চারিপাশ ঘিরে আছে, তারা তাদের প্রতিপালকের পবিত্রতা ও মহিমা প্রশংসার সাথে ঘোষণা করে এবং তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং বিশ্বাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা ক'রে বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার দয়া ও জ্ঞান সর্বব্যাপী; অতএব যারা তওবা করে ও তোমার পথ অবলম্বন করে, তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর এবং জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা কর। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তাদেরকে স্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ দান কর; যার প্রতিশ্রুতি তুমি তাদের দিয়েছ (এবং তাদের) পিতা-মাতা, পতি-পত্নী ও সন্তান সন্ততিদের মধ্যে (যারা) সৎকাজ করেছে, তাদেরকেও (জান্নাত প্রবেশের অধিকার দাও)। নিশ্চয়ই তুমি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। এবং তুমি তাদেরকে শাস্তি হতে রক্ষা কর। সেদিন তুমি যাকে শাস্তি হতে রক্ষা করবে, তাকে তো দয়াই করবে। আর এটিই তো মহাসাফল্য।' (মু'মিনঃ ৭-৯)
মহানবী বহু দুআ করেছেন উম্মতের জন্য। মু'মিনরাও একে অন্যের জন্য দুআ ক'রে থাকে। বিশেষ ক'রে জানাযা, কবর যিয়ারত ইত্যাদির সময় ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়ে থাকে।
কিন্তু যারা মহা অপরাধী মুশরিক, তাদের জন্য সে দুআ করা বৈধ নয়। তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার দুআ কাজেও লাগে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ} (۱۱۳) سورة التوبة
"অংশীবাদীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নবী ও বিশ্বাসীদের জন্য সঙ্গত নয়; যদিও তারা আত্মীয়ই হোক না কেন, তাদের কাছে একথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে, তারা জাহান্নামের অধিবাসী।" (তাওবাহঃ ১১৩)
যারা ভীষণ অপরাধী মুনাফিক, তাদের জন্যও ক্ষমাপ্রার্থনার দুআ কাজে লাগে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِن تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ} (۸۰) سورة التوبة
"তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা না কর (উভয়ই সমান); যদি তুমি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমা প্রার্থনা কর, তবুও আল্লাহ তাদেরকে কখনই ক্ষমা করবেন না; যেহেতু তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে কুফরী করেছে। আর আল্লাহ অবাধ্য সম্প্রদায়কে পথপ্রদর্শন করেন না।" (তাওবাহঃ ৮০)
{سَوَاء عَلَيْهِمْ أَسْتَغْفَرْتَ لَهُمْ أَمْ لَمْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ لَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ} (٦) سورة المنافقون
"তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা না কর, উভয়ই তাদের জন্য সমান। আল্লাহ তাদেরকে কখনো ক্ষমা করবেন না। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।" (মুনাফিকুন: ৬)