📄 মহান আল্লাহর আনুগত্যে পাপের প্রভাব
পাপাচরণের অশুভ পরিণাম মহান আল্লাহর আনুগত্যে অন্তরায় হয়। মহান মা'বুদের ইবাদতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যে পাপাচরণ করে, সে কি অনায়াসে কোন পুণ্যকার্যের প্রয়াস লাভ করতে পারে?
মানুষ যখন মহান আল্লাহর আনুগত্যে মনোযোগ দেয়, তখন তার আনুগত্য বৃদ্ধিলাভ করে। মহান আল্লাহর ইবাদত সহজ থেকে আরও সহজ হয়ে উঠে। একটার পর আরও একটা ইবাদত সম্পাদন করার তওফীক লাভ করে। আর তা সকল কিছুর চাইতে তার নিকট সহজ হয়ে যায়। পরিশেষে তা বর্জন করা তার পক্ষে বড় কঠিন হয়ে পড়ে। সুতরাং যদি কোন আনুগত্যশীল বান্দাকে বলা হয়, 'ফজরের নামাযটা ঘরে আদায় কর।' তাহলে তার মন সংকীর্ণতা অনুভব করবে। প্রশস্ত পৃথিবী যেন তার নিকট সংকীর্ণ হয়ে যাবে। মসজিদে গিয়ে জামাআতে নামায না পড়তে পেলে সে পানির মাছের মতো পাড়ে তড়পাতে থাকবে। পুনরায় মসজিদে ফিরতে পারলে তার হৃদয় সান্ত্বনা পাবে, তার মনে প্রশান্তি আসবে, তার চক্ষু শীতল হবে।
অনুরূপ যদি কোন অপরাধী তার অপরাধে বাধাপ্রাপ্ত হয়, তাহলে তার বক্ষ সংকীর্ণতায় অস্বস্তিবোধ করবে। যতক্ষণ না তা সংঘটন করতে পেরেছে, ততক্ষণ সে তার মনে শান্তি ফিরে পাবে না; বরং অনেক সময় তার পেটের ভাত হজম হবে না এবং হজম হওয়া খাদ্য পায়খানা হয়ে নেমে আসবে না।
এমনকি বহু অপরাধী আছে, যে অপরাধ ক'রে হয়তো কোন তৃপ্তি পায় না, কিন্তু তবুও তা ক'রে যায়। কারণ তা বর্জন করতে তার কষ্ট হয়। আরবী কবি হাসান বিন হানি' বলেছেন,
وَأُخْرَى تَدَاوَيْتُ مِنْهَا بِهَا ............ وَكَأْسٌ شَرِبْتُ عَلَى لَذَّةٍ
'এক গ্লাস পান করেছি তৃপ্তির সাথে। আর দ্বিতীয় গ্লাস পান করেছি তা বর্জনের ঔষধ স্বরূপ।'
অর্থাৎ, প্রথম গ্লাস মদ পান ক'রে মদ্যপ তৃপ্তিলাভ করে, কিন্তু এখন সে পান করে, যাতে মদ্যপান করার কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে পারে। কারণ সে পাপী তখন দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনার সিন্ধুতে হাবুডুবু খায়। নানা কুচিন্তা ও পাওয়া-না পাওয়ার আশা ও নিরাশার ঝড়-তুফানে ঘুরপাক খায়।
তখন সে বলে,
دَعْ عَنْكَ لَوْمِي فَإِنَّ اللَّوْمَ إِغْرَاءُ ............ وَدَاوِنِي بِالَّتِي كَانَتْ هِيَ الدَّاءُ
'আমাকে ভর্ৎসনা করা বর্জন কর। কারণ ভর্ৎসনা হল প্ররোচনা। বরং আমার সেই ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা কর, যা আসলে রোগ ছিল।'
অন্য ভাষায় বলে,
كَانَتْ دَوَائِي وَهِيَ دَائِي بِعَيْنِهِ ............ كَمَا يَتَدَاوَى شَارِبُ الخَمْرِ بِالخَمْر
'আমার ওষুধ ছিল তাই যা হুবহু আমার ব্যাধি ছিল। যেমন মদ্যপ মদ দিয়ে রোগের চিকিৎসা করে।'
পাপী পাপের দলদলে পড়ে যত নড়াসরা করতে থাকে, ততই সে তার গভীর অভ্যন্তরে তলিয়ে যেতে থাকে। আর তওবার সুযোগ লাভ না করলে বঞ্চিত থাকে আনুগত্যের স্বাদ থেকে। (দ্রঃ আ-যারুয যুনুব ১০পৃঃ)
কয়েক সেকেন্ডের মনোতৃপ্তি কয়েক বছরের, বরং সারা জীবনের জন্য লাঞ্ছনা আনতে পারে।
কত গোনাহ এমন আছে, যা নির্জন রাত্রে মহান আল্লাহর মুনাজাতে বঞ্চনা আনতে পারে।
দৃষ্টিপাতের কত পাপ মানুষকে অভিজ্ঞান থেকে বঞ্চিত করে। সুতরাং কোথায় পাবে সে আনুগত্যের প্রয়াস?
সে মানুষ ইবাদতের স্বাদ কীভাবে জানবে, যে অবাধ্যাচরণের সমুদ্রে নিমজ্জিত থাকে? পাপাচরণের বড় শাস্তি হল পুণ্যাচরণের তৃপ্তি থেকে বঞ্চনা। আর সে বঞ্চনা আসে পাপীর দুর্বল ঈমান ও বিকারগ্রস্ত হৃদয়ের ঔদাস্যের কারণে।
বানী ইসরাঈলের কোন এক পাপাচারী ব্যক্তি বলল, 'হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার কত অবাধ্যতা করছি! আর তুমি আমাকে শাস্তি দিচ্ছ না।' কোন নবীর মাধ্যমে তাকে বলা হল, 'আমি তোমাকে কত শাস্তি দিই, অথচ তুমি বুঝতে পার না। আমি কি তোমাকে আমার স্মরণ ও ধ্যানে মগ্ন হওয়া থেকে বঞ্চিত করিনি?' (হিয়্যাতুল আওলিয়া ১০/১৬৮, ফাইযুল ক্বাদীর ২/১৪১)
📄 লজ্জাশীলতা অপনোদনে পাপের প্রভাব
লজ্জাশীলতা পুরুষের সৌন্দর্য ও নারীর ভূষণ। লজ্জাশীলতাই মানব-চরিত্রের শ্রেষ্ঠাংশ ও মু'মিনের ঈমানের একাংশ। মহানবী বলেছেন,
((إِنَّ لِكُلِّ دِينِ خُلُقًا ، وَخُلُقُ الإِسْلَامِ الْحَيَاءُ)).
"প্রত্যেক ধর্মে সচ্চরিত্রতা আছে, ইসলামের সচ্চরিত্রতা হল লজ্জাশীলতা।" (ইবনে মাজাহ ৪১৮১-৪১৮-২, সহীহুল জামে ২১৪৯নং)
الإِيمَانُ بَضْعُ وَسَبْعُونَ أَوْ بضْعٌ وَسِتُونَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَن الطَّرِيقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَان ».
"ঈমান সত্তর বা ষাটের অধিক শাখাবিশিষ্ট; যার উত্তম (ও প্রধান) শাখা 'লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই) বলা এবং সবচেয়ে ক্ষুদ্র শাখা পথ হতে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের অন্যতম শাখা।" (মুসলিম ১৬২নং)
((إِنَّ الحَيَاء والإيمانَ قُرنا جميعاً فإذا رُفِعَ أَحَدُهُمَا رُفِعَ الْآخَرُ).
"অবশ্যই লজ্জাশীলতা ও ঈমান একই সূত্রে গাঁথা। একটি চলে গেলে অপরটিও চলে যায়।" (হাকেম ৫৮, মিশকাত ৫০৯৪, সহীহুল জামে ১৬০৩নং)
লজ্জাশীলতা মানুষকে ভদ্র রাখে, নারীকে সতী রাখে। লজ্জাশীল সমাজ হয় সুশীল ও চরিত্রবান। কিন্তু যে মানুষ পাপ করতে থাকে, সে মানুষের মন থেকে লজ্জাশীলতা বিলীন হয়ে যায়। যে নারী পাপাচারে লিপ্ত হয়, তার জীবন থেকে লজ্জাশীলতা ও তার দেহ থেকে আবরণ সরে যায়। যে সমাজ পাপাচারে নিমজ্জিত, সে সমাজের লজ্জাশীলতার নৌকারও ভরাডুবি হয়।
যে মানুষ ব্যভিচার করে, তার কি লজ্জা থাকে? যে মানুষ নোংরা জিনিস দেখে ও সপরিবারে দর্শক হয়, তার ও তার পরিবারের কি শরমের পর্দা থাকে? যে সমাজের মানুষ অশ্লীলতায় মগ্ন, সে সমাজে কি সভ্য মানুষ থাকে?
লজ্জাশীলতা পাপকাজ করতে বাধা দেয়, যেমন পাপকাজ লজ্জাহীনতা সৃষ্টি করে। আরবী কবি বলেছেন,
وَرُبَّ قَبِيحَةٍ مَا حَالَ بَيْنِي وَبَيْنَ رُكُوبِهَا إِلَّا الحَيَاءُ
فَكَانَ هُوَ الدَّوَاءَ لَهَا وَلَكِن إِذَا ذَهَبَ الحَيَاءُ فَلَا دَوَاء
অর্থাৎ, কত নোংরামিতে লিপ্ত হতে অন্তরায় হয়েছে কেবল লজ্জা। নোংরামি দূরীকরণে লজ্জাশীলতাই ছিল ঔষধ। কিন্তু লজ্জা চলে গেলে কোন ঔষধ অবশিষ্ট থাকে না।
অন্য এক কবি কত সুন্দরই না বলেছেন,
إِذَا لَمْ تَخْشَ عَاقِبَةَ اللَّيَالِي وَلَمْ تَسْتَحْيِ فَاصْنَعْ مَا تَشَاءُ
فَلَا وَاللَّاهِ مَا فِي العَيْشِ خَيْرٌ وَلَا الدُّنْيَا إِذَا ذَهَبَ الحَيَاءُ
يَعِيشُ المَرْءُ مَا اسْتَحْيَى بخير ...... وَيَبْقَى العُودُ مَا بَقِيَ اللَّحَاءُ
অর্থাৎ, যদি তুমি যুগের পরিণামকে ভয় না কর এবং লজ্জা-শরম না কর, তাহলে তোমার যা ইচ্ছা তাই কর।
আল্লাহর কসম! সে জীবন ও সংসারে কোন মঙ্গল নেই, যদি লজ্জাশীলতা চলে যায়।
মানুষ যতদিন লজ্জাশীল থাকে, ততদিন সকুশল জীবন যাপন করে। (যেমন) কাঠ (গাছ) অবশিষ্ট থাকে, যতদিন তার ছাল অবশিষ্ট থাকে।
নির্লজ্জদের পোশাকে শালীনতা ও পর্দা নেই। ব্যবহারে ভদ্রতা নেই। বড়দের প্রতি সম্মান নেই।
নির্লজ্জরা প্রকাশ্যে অশ্লীলতা প্রদর্শন করে, প্রকাশ্যে পাপাচারে লিপ্ত হয়। নারী-পুরুষে প্রকাশ্যে ঘনিষ্ট হয়। প্রেমিকাকে লোকারণ্যে চুম্বন দেয়। রাস্তায়-রাস্তায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করে যুবক-যুবতীর পরস্পরের চুম খেয়ে, মাসিকের প্যাড দিয়ে, মহিলার অন্তর্বাস পরে!
দেওয়ালে কুরুচিপূর্ণ অসভ্য লেখালিখি, বাথরুমের ভিতরেও অশ্লীল লেখা। টিভি, নেট প্রভৃতি প্রচার মাধ্যমেও নির্লজ্জতার আম সম্প্রচার।
বেশ্যাবৃত্তির অনুমতি ও অনুমোদন, সমকামিতার বৈধতা, ব্যভিচারী, বেশ্যা ও সমকামীদের অধিকারের (?) দাবীতে প্রকাশ্যে জনসভা ও গণমিছিল!
সকলের সামনে ধূমপান করা, গান-বাজনা শোনা।
আরো কত ধরনের নির্লজ্জতার পাপ প্রদর্শন। মহানবী সত্যই বলেছেন,
((إِنَّ مِمَّا أَدْرَكَ النَّاسُ مِنْ كَلَامِ النُّبُوَّةِ إِذا لَمْ تَسْتَحْيِ فَاصْنَعْ مَا شِئْتَ)).
"প্রথম নবুঅতের বাণীসমূহের যা লোকেরা পেয়েছে তার মধ্যে একটি বাণী এই যে, তোমার লজ্জা না থাকলে যা মন তাই কর।" (আহমাদ ১৭০৯০, বুখারী ৩৪৮৪, আবু দাউদ ৪৭৯৯, ইবনে মাজাহ ৪১৮৩, সহীহুল জামে ২২৩০নং)
📄 নিরাপত্তা অপনোদনে পাপের প্রভাব
নিরাপত্তা একটি বড় নেয়ামত। নচেৎ বাড়ি থেকে বের হয়ে যদি ফিরে আসার আশা না থাকে অথবা পথিমধ্যে কোথাও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সে পরিবেশে বাঁচার সুখ কী? মহিলাদের নিরাপত্তা নেই, তারা ইভটিজিং ও ধর্ষণের শিকার হয়। টাকা-পয়সা সাথে নেওয়াতে নিরাপত্তা নেই, রাস্তার মধ্যে ছিন্তাইয়ের ভয়। যুদ্ধ-বিগ্রহ, বিদ্রোহ ও সন্ত্রাসের সামনে গুলি বা বোমার আঘাত খাওয়ার ভয়, তাতেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়।
পাপ করে এক শ্রেণীর মানুষ, আর ভুগতে হয় নিরপরাধ মানুষদেরকে। অবশ্য অকৃতজ্ঞতার শাস্তি স্বরূপ সেই দেশের মানুষদের উপরে এমন অনিরাপত্তা ও ত্রাসের আযাব চাপিয়ে দেওয়া হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلاً قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُّطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّن كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بأَنْعُمِ اللَّهِ فَأَذَاقَهَا اللهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ} (۱۱۲)
"আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসত সর্বদিক হতে প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল; ফলে তারা যা করত, তার জন্য আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ।" (নাহলঃ ১১২)
নারী পাপ করে অশালীন পোশাক পরিধান ক'রে এবং পাপাচারী লম্পটদের যৌন-শিকার হয়। কখনো বা নারী কেবল ধর্ষিতা হয়, কখনো বা সে খুন হয় অথবা তার সাথে প্রতিবাদী আত্মীয় খুন হয়। নারীর অমূল্য সম্পদ তার রূপ-যৌবন। যার হিফাযত হয় না বলে ডাকাতির শিকার হয়। ফলে তার রূপ-যৌবনই তার বড় দুশমন রূপে পরিগণিত হয় এবং অধিকাংশ সময়ে সে নিরাপত্তার অভাবে দুশ্চিন্তায় কালাতিপাত করে।
ডাকাত ও লুঠেরা দলের পাপের ফলে নিরাপদ সমাজে অনিরাপত্তার ত্রাস বিরাজ করে। মহান আল্লাহর বিধানানুযায়ী দেশ পরিচালিত হয় না বলে তারা দুঃসাহসিক দাপটে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
'রাজা-রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়।' সেখানেও যালেম রাজা বা রাষ্ট্রনেতাদের আগ্রাসনের মুখে পড়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে সাধারণ মানুষ। ক্ষমতা বা গদি দখলের লোভে বিদ্রোহ করে কোন গোষ্ঠী। তার ফলে সৃষ্টি হয় যুদ্ধ ও সন্ত্রাস। আর তার মাসুল দেয় সাধারণ মানুষ। বিশেষ ক'রে ভোটের সময় ক্ষমতার দ্বন্দ্বে শান্তিপূর্ণ পরিবেশের একটি চিত্র এক কবির বিকৃত কবিতায় নিম্নরূপঃ-
আমাদের ছোট গাঁয়ে ছোট ছোট ঘর,
থাকি সেথা সবে মিলে ভোেট এলে পর।
পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই-ভাই,
ভোেট এলে দলাদলি হই ঠাঁই-ঠাঁই।
আমাদের ছোট গ্রাম মায়ের সমান,
ভোটের সময়ে তার রাখি নাকো মান।
মাঠ-ভরা ধান আর জল-ভরা দীঘি,
ভোটের বোমায় তাতে আগুনে দি ঘি।
কেউ সেথা নেচে মরে কেউ ভরে ঝুলি,
তবুও 'মুসলিম' মোরা বড় বড় বুলি।
রাজনীতির ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সমাজের মানুষ নানা দলে বিভক্ত হয় এবং একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিরোধী হয়ে শান্তির নীড়কে নরকে পরিণত করে। কেউ দেয় মাটির জন্য প্রাণ, কেউ দেয় পার্টির জন্য জান, কেউ হয় অন্যকে গদিতে বসানোর জন্য কুরবান। এরা জান দেয়, জান নেয়, এদের কাছে নেই কোন পরিত্রাণ।
আরো একটা পাপের কথা চিন্তা করুন, যদিও সে পাপ তথাকথিত অনেক উদারপন্থীদের নিকট 'কিন্তু নয়'। ওটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। ওটা পাপ নয়, ওটা কাপ। ওটা ভালোবাসা! ওটা পছন্দ ক'রে বিয়ে করা।
কিন্তু ঐ পাপের মৃদু বাতাস যখন ঘরে আসে এবং ধীরে ধীরে তা তুফানে পরিণত হয়, তখন তার ফলে সে ঘরের নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটে। প্রেম প্রত্যাখ্যাত হলে অথবা একপক্ষ মেনে না নিলে যুদ্ধ বাধে। আর তাতে ধ্বংস হয় অর্থ, চলে যায় মানীর মান। অনেক সময় ক্ষয় হয় কত মানুষের প্রাণ। ছোট্ট একটা দেশলাই কাঠির মতো বাক্সে চুপচাপ থাকে। সময়ে ঘর্ষণের ফলে ছারখার করে পরিবারকে।
যে বাপ-মা বা ভাই-দোলাভাই কষ্ট ক'রে বুকের মাঝে আগলে আগলে মানুষ করে, তাদেরই বুকে লাথি মেরে রসিক নাগরের সাথে বেরিয়ে গিয়ে নির্লজ্জের মতো বলে, 'আই এম এ্যাডাল্ট!'
তার মানে, বড় হয়ে আমার নিজের জীবন বেছে নেওয়ার অধিকার আছে। কে বড় করল তা দেখব কেন? যে যৌবনের আকর্ষণে নাগর পেয়ে ধন্য হল, সে যৌবন দেহে কে এনে দিল, তা দেখব কেন? আমি যে নেমকহারাম।
তাই দুঃখ নেই এদের প্রতি, যেহেতু তারা নেমকহারাম। কিন্তু দুঃখ হল তাদের প্রতি, যারা তাদের এই নির্লজ্জতাকে প্রশ্রয় দেয় ও মেনে নেয় অথবা যারা মেনে নিতে বাধ্য করায়।
📄 সাফল্য লাভে পাপের প্রভাব
যে ঘরে পাপ ঢোকে, সে ঘরে বর্কত থাকে না। যে ব্যক্তি পাপাচরণে মগ্ন থাকে, সে সাফল্যের মুখ দর্শন করতে পারে না। পাপ করার ফলে কৃতকার্যতা মুখ ফিরিয়ে নেয়। কাজে কাজে আটকে যায়। সহজ জিনিস কঠিন হয়ে যায়। যেমন মহান আল্লাহকে ভয় করলে সকল কাজ সহজ হয়ে যায় এবং সাফল্যের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়।
মহান আল্লাহকে যে ভয় করে, সে পরীক্ষায় পড়তে পারে। অতঃপর সে পাশ করলে সাফল্য তাকে স্বাগত জানায়।
আল্লাহর দুশমনকে বাহ্যদৃষ্টিতে সফল মনে হলেও প্রকৃত সফলতা তাকে ধরা দেয় না। এই জন্য 'যে করে পাপ, সে সাত বেটার বাপ। আর যে করে পুণ্য, তার কাঁদতে যায় জন্ম' বাহ্যদৃষ্টির অভিজ্ঞতার ফল। নচেৎ প্রকৃত দৃষ্টিতে আল্লাহ-ওয়ালারাই সফল।
একটি উদাহরণে উভয় দৃষ্টিভঙ্গিতে তফাৎ স্পষ্ট হয়ে যাবে। বিশাল ধনবান কারুন। ধনবান হল বলবান, আর অনেকের দৃষ্টিতে ধনবানই ভগবান। কিন্তু অন্য দৃষ্টিতে সে ভাগ্যবান নয়। কারণ সে ধনলাভে সফল ছিল, কিন্তু প্রকৃত সুখলাভে সফল ছিল না। মহান আল্লাহ উভয় দৃষ্টির কথা তাঁর কুরআনে উল্লেখ করেছেন,
{فَخَرَجَ عَلَى قَوْمِهِ فِي زِينَتِهِ قَالَ الَّذِينَ يُرِيدُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا يَا لَيْتَ لَنَا مِثْلَ مَا أُوتِيَ قَارُونُ إِنَّهُ لَذُو حَظٍّ عَظِيمٍ (۷۹) وَقَالَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ وَيْلَكُمْ ثَوَابُ اللَّهِ خَيْرٌ لِّمَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا وَلَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الصَّابِرُونَ} (۸۰) سورة القصص
"কারুন তার সম্প্রদায়ের সম্মুখে জাঁকজমক সহকারে বের হল। যারা পার্থিব জীবন কামনা করত তারা বলল, 'আহা! কারুনকে যা দেওয়া হয়েছে, সেরূপ যদি আমাদেরও থাকত; প্রকৃতই সে মহা ভাগ্যবান।' আর যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল তারা বলল, 'ধিক্ তোমাদের! যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ। আর ধৈর্যশীল ব্যতীত তা অন্য কেউ পায় না।" (ক্বাস্বাস্বঃ ৭৯-৮০)
কারুন সফল ছিল না। কারণ, মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَخَسَفْنَا بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضِ فَمَا كَانَ لَهُ مِن فِئَةٍ يَنصُرُونَهُ مِن دُونِ اللَّهِ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُنتَصِرِينَ (۸۱) وَأَصْبَحَ الَّذِينَ تَمَنَّوْا مَكَانَهُ بِالْأَمْسِ يَقُولُونَ وَيْكَأَنَّ اللَّهَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَن يَشَاء مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَوْلَا أَن مَّنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا لَخَسَفَ بِنَا وَيْكَأَنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ} (۸۲)
"অতঃপর আমি কারুনকে ও তার প্রাসাদকে মাটিতে ধসিয়ে দিলাম। তার স্বপক্ষে এমন কোন দল ছিল না, যে আল্লাহর শাস্তির বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করতে পারত এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিল না। পূর্বদিন যারা তার (মত) মর্যাদা কামনা করেছিল তারা বলতে লাগল, 'দেখ, আল্লাহ তাঁর দাসদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা তার রুযী বর্ধিত করেন এবং যার জন্য ইচ্ছা তা হ্রাস করেন। যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করতেন, তবে আমাদেরকেও তিনি মাটিতে ধসিয়ে দিতেন। দেখ, অকৃতজ্ঞরা সফলকাম হয় না।' (কাস্বাস্বঃ ৮১-৮২)
অনুরূপ "অপরাধীরা সফলকাম হয় না।" (ইউনুসঃ ১৭) "সফলকাম হয় না যালেমরা।" (কাস্বাস্বঃ ৩৭)
আরো উদাহরণ নিতে পারেন ধন সঞ্চয়কারী পাপীর, যে মদ ও নারীর পশ্চাতে অর্থ ব্যয় ক'রে নানা পাপ করে। সে কি দুনিয়াতেই সফলকাম হতে পারবে?
যে ছাত্র-ছাত্রী অবৈধ প্রেম-ভালোবাসা বা বিকৃত যৌন-চিন্তার পাপে লিপ্ত থাকবে, সে কি তার জীবনাকাশে সফলতার সূর্যকে উদিত দেখতে পাবে?
না, তারা দুনিয়াতেও সফল হবে না। আর আখেরাতের সফলতা তো অনেক দূরের কথা।