📄 ইলম অর্জনে পাপের প্রভাব
দ্বীনী ইলমের উত্তম সহায়ক হল আল্লাহর তাক্বওয়া ও পরহেযগারী। আর তার মানেই যথাসাধ্য শরয়ী আদেশ মান্য করা এবং সকল প্রকার নিষেধ বর্জন করা। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَاتَّقُوا اللَّهَ وَيُعَلِّمُكُمُ اللَّهُ }
অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহর তাক্বওয়া অবলম্বন কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে ইল্ম দান করবেন। (বাক্বারাহঃ ২৮২)
পক্ষান্তরে ইল্ম থেকে বঞ্চনার সবচেয়ে বড় কারণ হল পাপাচরণ। ইল্ম অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হল আল্লাহর অবাধ্যাচরণ।
বহু তালেবে-ইল্ম স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার অভিযোগ করে। কত শোনে, কিন্তু কিছু মনে থাকে না। কত পড়ে, কিন্তু ভুলে যায়। অথচ তারা হয়তো জানে না যে, এটা তাদের জন্য মহান প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এক প্রকার সত্বর শাস্তি। তাদের কোন কৃত পাপের শাস্তি।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, বুদ্ধিমত্তায় সকল মানুষ সমান নয়। কারো বুদ্ধি তীক্ষ্ণ, কারো ভোঁতা। কারো বেশি, কারো কম। আর তা মানুষের মাঝে তিনিই বন্টন করেছেন, যিনি সকলের রুযী বন্টন করেছেন। তবুও নিজ কর্মদোষে মানুষ যেমন বহু রুযী থেকে বঞ্চিত হয়, তেমনি নিজ পাপাচরণের কারণে অনেক ইল্ম থেকেও বঞ্চিত হয়। এই বয়সে বিশেষ ক'রে যৌন-জীবন সংক্রান্ত পাপে গুপ্তভাবে জড়িত থেকে বহু ছাত্র-ছাত্রী নিজেদের স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল ক'রে ফেলে।
ইল্মের জন্য অন্তরকে যদি বিশুদ্ধ করা যায়, তাহলে ইল্ম বৃদ্ধি পায় এবং তার বর্কত প্রকাশিত হয়। যেমন কোন জমিকে যদি চাষের জন্য ঘাস, আগাছা ইত্যাদি থেকে পরিষ্কার করে উপযুক্ত করা হয়, তবে তার ফল-ফসল বৃদ্ধিলাভ ক'রে থাকে। রসূল বলেন, "জেনে রেখো, দেহের মধ্যে একটি পিন্ড আছে; যা সংশোধিত হলে সারা দেহ সংশোধিত হয় এবং তা বিকারগ্রস্ত হলে সারা দেহ বিকারগ্রস্ত হয়ে যায়। জেনে রেখো, তা হল হৃৎপিন্ড (বা হৃদয়)।" (বুখারী ও মুসলিম)
সাহল বলেন, 'সেই হৃদয়ে (ইলমী) নূর প্রবেশ করা অসম্ভব যে হৃদয়ে এমন বস্তু অবশিষ্ট থাকে, যা আল্লাহ আয্যা অজাল্ল অপছন্দ করেন।' (তাযকিরাতুস সা-মে' ৬৭ পৃঃ)
সুতরাং তালেবে ইলমের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করা একান্ত আবশ্যক। তওবা ও অনুশোচনার সাথে আল্লাহর অভিমুখী হয়ে পাপ ও অন্যথাচরণ হতে প্রত্যাবর্তন করা নিতান্ত জরুরী। যেহেতু পাপ ও অবাধ্যতায় এমন কুপ্রভাব আছে, যাতে ইল্ম থেকে বঞ্চিত হতে হয় অথবা তার বর্কত উঠে যায়।
ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বলেন, 'পাপাচরণের নিকৃষ্ট ও নিন্দিত প্রভাব আছে, যা অন্তর ও দেহের পক্ষে ইহ-পরকালে এতই অপকারী যে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। তন্মধ্যে ইল্ম থেকে বঞ্চিত হওয়া অন্যতম। যেহেতু ইল্ম একপ্রকার নূর (জ্যোতি) যা আল্লাহ তাআলা মানুষের হৃদয়ে প্রক্ষেপ ক'রে থাকেন। আর পাপাচরণ ঐ জ্যোতিকে নির্বাপিত করে ফেলে।'
একদা ইমাম শাফেয়ী ইমাম মালেকের সম্মুখে পড়তে বসলে ইমাম মালেক তাঁর সজাগ বুদ্ধিমত্তা, মেধার ঔজ্জ্বল্য এবং উপলব্ধির পরিপূর্ণতা দেখে বিস্মিত হয়ে বললেন, 'আমি দেখছি যে, আল্লাহ তোমার হৃদয়ে নূর প্রক্ষিপ্ত করেছেন। অতএব তা পাপাচরণের অন্ধকার দ্বারা নিভিয়ে দিয়ো না।'
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন,
شكوت إلى وكيع سوء حفظى + فأرشدني إلى ترك المعاصي
وأخبرني بأن العلم نور + ونور الله لا يهدى لعاصي
'আমি আমার ওস্তাদ অকী'র নিকট আমার মুখস্থশক্তি দুর্বল হওয়ার অভিযোগ করলাম। তিনি আমাকে পাপাচরণ পরিহার করতে নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, 'জেনে রেখো, ইল্ম আল্লাহর তরফ হতে আসা (অনুগ্রহ বা) নূর। আর আল্লাহর (অনুগ্রহ বা) নূর কোন পাপিষ্ঠকে দেওয়া হয় না।' (আল-জাওয়াবুল কাফী ৫৪ পৃঃ)
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ)
অর্থাৎ, আল্লাহ অবশ্যই কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না; যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে। (রা'দঃ ১১)
তিনি আরো বলেন,
كلا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ )
অর্থাৎ, কক্ষনো না। ওদের কৃতকর্মের ফলেই ওদের হৃদয়ে জং ধরে গেছে। (মুত্বাফফিফীন: ১৪)
ইবনুল জওযী (রঃ) বলেন, আব্দুল্লাহ বিন জালা' হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি এক খ্রিস্টান সুবদন কিশোরের প্রতি তাকিয়ে ছিলাম। এমন সময় আবু আব্দুল্লাহ বালখী আমার নিকট বেয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি আমার উদ্দেশ্যে বললেন, 'কেন দাঁড়িয়ে আছ এখানে?' আমি বললাম, 'চাচাজী! আপনি কি ঐ রূপ দেখছেন না? কীভাবে ওকে অগ্নিদগ্ধ করা হবে?' তা শুনে তিনি তাঁর হাত আমার কাঁধে মেরে বললেন, 'এর প্রতিফল তুমি পাবেই, যদিও কিছু বিলম্বে।' তিনি বলেন, 'আমি তার প্রতিফল ৪০ বছর পর পেলাম; আমাকে কুরআন ভুলিয়ে দেওয়া হল।'
আবু আইয়ান বলেন, আমি আমার ওস্তায আবুবকর দাক্কাকের সাথে ছিলাম। ইতিমধ্যে এক কিশোর পার হয়ে যাচ্ছিল। আমি তার দিকে তাকিয়ে ফেললাম। আমার ওস্তায আমাকে ওর প্রতি তাকিয়ে থাকতে দেখলে তিনি আমাকে বললেন, 'বেটা! এর প্রতিফল তুমি পাবে---যদিও কিছু পরে।' অতঃপর আমি ২০ বছর ধরে লক্ষ্য করেও ঐ প্রতিফল বুঝতে পারলাম না। একদা রাত্রিকালে ঐ কথা চিন্তা করে ঘুমিয়েছি। সকালে জাগ্রত হয়ে দেখি আমাকে কুরআন বিস্মৃত করা হয়েছে। (তালবীসে ইবলীস ৩১০ পৃঃ)
এ তো সুদর্শন কিশোর দেখার প্রতিফল। তাহলে সুবদনা ও সুদর্শনা কিশোরী ও যুবতী দেখলে এবং তাদের সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করলে তার প্রতিফল কী? নেট বা মেমোরির মাধ্যমে নোংরা ছবি দেখলে তার কুফল কী?
মনের মণিকোঠা যদি বাজে চিন্তা, যৌন ও অশ্লীল কল্পনা এবং কোন অবৈধ নারী-প্রেমের মৃদু পরশ থেকে মুক্ত ও পবিত্র না হয় তাহলে সফলতার আশা নেই। প্রেমের আবেগে পড়ে ধ্বংস হবে জীবনের বহু মূল্যবান সময়, অবাস্তব কল্পনাবিহারে নষ্ট হবে সুন্দর ও স্বচ্ছ স্মৃতি ও বুঝশক্তি। আর কামনার দহন ও দংশনে নিপীড়িত হবে সুস্বাস্থ্য। ফলে উপর-পড়া ঐ সতীনের ঈর্ষায় ইল্ম যে তালেবের নিকট থেকে 'খোলা তালাক' নিয়ে বিদায় নেবে তা বলাই বাহুল্য।
আবু হামেদ বলেন, যদি তুমি বল যে, 'কত অসৎচরিত্রের তালেবে ইল্ম ইল্ম অর্জন করেছে। (বড় আলেম হয়েছে) তাহলে?' কিন্তু প্রকৃত উপকারী, পরকালে ফলপ্রদ এবং সৌভাগ্য আনয়নকারী ইল্ম থেকে তারা বহু দূরে। যেহেতু এই ইলমের অগ্রভাগে সেই মন-মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হবে, যাতে তালেবে ইল্ম পাপাচরণকে সর্বনাশী ও সর্বহারী হলাহল জানবে। অথচ তুমি কি দেখেছ যে, প্রাণহারী গরল জানা সত্ত্বেও কেউ তা ভক্ষণ করছে? তুমি যা ঐ শ্রেণীর আলেমদের নিকট থেকে শুনে থাক, তা তো মুখের কথামাত্র, যা ওরা কখনো তাদের জিহ্বা দ্বারা শোভন ক'রে প্রকাশ ক'রে থাকে। আবার কখনো তাদের অন্তর দ্বারা তা প্রত্যাখ্যান ক'রে থাকে। আর তা ইল্মের কোন অংশই নয়।
ইবনে মাসউদ বলেন, 'অধিক রেওয়ায়েত (বর্ণনা করা) ই ইল্ম নয়। ইল্ম তো এক জ্যোতি যা হৃদয়ে প্রক্ষিপ্ত হয়।'
অনেকে বলেন, ইল্ম তো আল্লাহভীতির নাম। যেহেতু আল্লাহ তাআলা বলেন,
{إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاء} (২৮) سورة فاطر
"আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে ওলামাগণই তাঁকে ভয় করে থাকে।" (সূরা ফাতির: ২৮, আরো দ্রঃ দ্বীনী ইলমের নৈতিকতা)
আমের শা'বী বলেন, 'আমি বাজারে গেলে কানে আঙ্গুল রেখে নিই, যাতে লোকেদের শব্দ আমার স্মৃতিস্থ না হয়ে যায়।'
যেহেতু তিনি ছিলেন ইল্মের এক মহান ব্যক্তিত্ব। তিনি আল্লাহকে ভয় করতেন, তাক্বওয়ার সাথে আল্লাহর পথ চলতেন। তাই তিনি আল্লাহর ইল্ম লাভের অধিকারী হয়েছিলেন।
মহান আল্লাহ ইয়াহুদীদের ব্যাপারে বলেছেন,
{ وَنَسُوا حَظًّا مِّمَّا ذُكِّرُوا بِهِ} (১৩) سورة المائدة
"এবং তারা যা উপদিষ্ট হয়েছিল তার একাংশ ভুলে গেছে।" (মায়িদাহঃ ১৩)
এর ব্যাখ্যায় অনেকে বলেছেন, তারা ইল্ম ভুলে গিয়েছিল। তারা যখন মহান আল্লাহর অবাধ্যাচরণ করল এবং নিষিদ্ধ জিনিস দর্শন করল, তখন ইল্ম বিস্মৃত হল।
বলা বাহুল্য, যদি কোন ছাত্র নগ্ন মহিলা দেখে, কারো প্রেমে ফাঁসে, সেক্সী ছবি দেখে বা বই পড়ে, অবৈধ গান-বাজনা শোনাতে অভ্যস্ত হয়, ফাসেকদের সাথে ওঠা-বসা করে, নামাযে কুঁড়েমি ও আলস্য থাকে, আল্লাহর যিকক্রে ঔদাস্য থাকে, দুনিয়াদারী চিন্তায় মগ্ন থাকে, পরচর্চা ও গীবতে তৃপ্তি লাভ করে, মিথ্যা কথা বলার অভ্যাসি হয়, আত্মমুগ্ধ ও অহংকারী হয় অথবা হিংসুক ও পরশ্রীকাতর হয়, তাহলে সে কি ইলমের মতো মানিক লাভে ধন্য হতে পারে?
কখনই না। ইল্ম হল আলো। আর পাপের অন্ধকারে সে আলো বিলীন হয়ে যায়। স্মৃতির আধারকে পাপচিন্তার আঁধার আচ্ছাদিত ক'রে ফেলে। ফলে মুখস্থ ও ঠোঁটস্থ করা পাঠ অতি সহজে ভুলে যায় পাপী।
কত হাফেয সাহেবকে দেখবেন, পাপাচরণ ও দুনিয়াদারী চিন্তায় নিমজ্জিত হওয়ার ফলে কুরআন ভুলে বসে থাকে। পরন্তু এমনিতেই কুরআন তো রশি খোলা উটের মতো। খেয়াল না রাখলে ফাঁকি দিয়ে স্মৃতির আস্তাবল থেকে পলায়ন করে।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'মহান আল্লাহ পাপের শাস্তি স্বরূপ যা কিছু নির্ধারণ করেছেন, তার মধ্যে আছে, হিদায়াত, ইল্ম ছিনিয়ে নেওয়া।' (মাজমুউ ফাতাওয়া ১৪/১৫২)
যাহহাক বিন মুযাহিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'যে ব্যক্তিই কুরআন হিফ্য করার পর তা ভুলে যায়, সে ব্যক্তিই কোন পাপের প্রতিফল পেয়ে তা ভুলে যায়। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِير} (٣٠) الشورى
"তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে, তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তিনি ক্ষমা ক'রে দেন।" (শূরাঃ ৩০) আর কুরআন ভুলে যাওয়া এক মহা বিপদ।' (যুহদ, ইবনুল মুবারাক ৮৫নং)
📄 রুযী উপার্জনে পাপের প্রভাব
পাপাচরণের ফলে বান্দা অনেক রুযী থেকে বঞ্চিত হয়। যেমন তাক্বওয়ার ফলে অনেক বান্দা রুযী লাভ ক'রে থাকে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقُواْ لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِن كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُم بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ} (٩٦) سورة الأعراف
"আর যদি জনপদের অধিবাসীবৃন্দ বিশ্বাস করত ও সাবধান হত, তাহলে তাদের জন্য আমি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর কল্যাণ-দ্বার উন্মুক্ত ক'রে দিতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা মনে করল। ফলে তাদের কৃতকর্মের জন্য আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম।" (আ'রাফঃ ৯৬)
{وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا (۲) وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ} (۳) الطلاق
"আর যে কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার নিষ্কৃতির পথ ক'রে দেবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে রুযী দান করবেন।" (ত্বালাক্বঃ ২-৩)
যদি কেউ বলে, তাহলে কাফের ও ফাসেকরা এত সুখী কেন? তারা এত শত পাপ করা সত্ত্বেও রুযী পায় কেন?
তাহলে তার উত্তর হল, মহানবী-এর বাণী,
তিনি বলেছেন,
(( لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ الله جَنَاحَ بَعُوضَةٍ ، مَا سَقَى كَافِراً مِنْهَا شَرْبَةَ مَاءٍ )).
"যদি আল্লাহর নিকট মশার ডানার সমান দুনিয়ার (মূল্য বা ওজন) থাকত, তাহলে তিনি কোন কাফেরকে তার (দুনিয়ার) এক ঢোক পানিও পান করাতেন না।" (তিরমিযী ২৩২০, ইবনে মাজাহ ৪১১০, মিশকাত ৫১৭৭ নং)
তাছাড়া মহান আল্লাহর এক চিরন্তন রীতি হল, তিনি অবাধ্যাচারীদেরকে ঢিল দিয়ে থাকেন। মহানবী বলেছেন,
إِذَا رَأَيْتَ اللهَ يُعطِي العَبدَ مِنَ الدُّنْيَا عَلَى مَعَاصِيهِ مَا يُحِبُّ، فَإِنَّمَا هُوَ اسْتِدْرَاجُ
"যদি দেখ, পাপ করা সত্ত্বেও আল্লাহ বান্দাকে তার ইচ্ছামতো (সুখ-সমৃদ্ধি) দান করছেন, তাহলে তা আসলে ঢিল দেওয়া।" অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন,
{فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى إِذَا فَرِحُوا بِمَا أُوتُوا أَخَذْنَاهُم بَغْتَةً فَإِذَا هُم مُّبْلِسُونَ} (٤٤) سورة الأنعام
"তাদেরকে যে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল, তারা যখন তা বিস্মৃত হল, তখন তাদের জন্য সমস্ত কিছুর দ্বার উন্মুক্ত ক'রে দিলাম, অবশেষে তাদেরকে যা দেওয়া হল, যখন তারা তাতে মত্ত হল, তখন অকস্মাৎ তাদেরকে পাকড়াও করলাম। ফলে তখনই তারা নিরাশ হয়ে পড়ল।" (আনআম: ৪৪, আহমাদ ৪/১৪৫, সিঃ সহীহাহ ৪১৩নং)
অর্থাৎ, তারা যখন তাদের সুস্থতা, নিরাপত্তা, ধন-সম্পদ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ইত্যাদি নিয়ে গর্বমূলক আনন্দিত ছিল, তখনই মহান প্রতিপালক তাদেরকে পাকড়াও করলেন। আর "নিশ্চয় তাঁর পাকড়াও যন্ত্রণাদায়ক কঠিন।" (হৃদঃ ১০২) আর অকস্মাৎ পাকড়াও কঠিনই হয়, যেহেতু তাতে অপরাধীরা অপ্রস্তুত থাকে।
যারা পাপী নয়, তাদের রুযী ও সুখ-সমৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য না হলেও তারা সুখী। রুযী যথেষ্ট পরিমাণের হলে সেটাই কাম্য। "যথেষ্ট অল্প রুযী অপর্যাপ্ত উদাসকারী রুযী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।" এ কথা হাদীসে এসেছে। (আহমাদ ৫/১৯৭, সঃ তারগীব ১৭৬০নং)
বলা বাহুল্য, কত শত ধনাঢ্য ব্যক্তির ধন তাকে সুখ দিতে পারেনি। যেহেতু এমন ধনদাসদের সাথে থাকে, নিরন্তর দুশ্চিন্তা, অবিরাম ক্লান্তি এবং অন্তহীন আক্ষেপ। যেহেতু মানুষের ধন-তৃষ্ণা মিটতে চায় না। পিপাসায় শরবত পান করার মতো মনে তৃপ্তি আসে না। মহানবী বলেছেন,
(( لَوْ أَنَّ لابن آدَمَ وَادِياً مِنْ ذَهَبٍ أَحَبَّ أَنْ يَكُونَ لَهُ وَادِيانِ ، وَلَنْ يَمْلأَ فَاهُ إِلَّا التُّرَابُ ، وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ تَابَ )). مُتَّفَقٌ عليه
"আদম সন্তানের মালিকানায় যদি সোনার একটি উপত্যকাও হয়, তবুও সে অনুরূপ আরো একটির মালিক হওয়ার অভিলাষী থাকবে। পরন্তু একমাত্র মাটিই আদম সন্তানের চোখ (পেট) পূর্ণ করতে পারে। অবশ্য যে ব্যক্তি তওবা করবে, আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করবেন।" (বুখারী ৬৪৩৭, মুসলিম ২৪৬২নং)
পক্ষান্তরে কত শত মানুষ আছে, যারা ধনী নয়, কিন্তু অত্যন্ত সুখী। মহানবী ﷺ বলেছেন,
((مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمْ آمِنًا فِي سِرْبِهِ مُعَافَى فِي جَسَدِهِ عِنْدَهُ قُوتُ يَوْمِهِ فَكَأَنَّمَا حِيزَتْ لَهُ الدُّنْيا بحذافيرها)).
"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার ঘরে অথবা গোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপদে ও সুস্থ শরীরে সকাল করেছে এবং তার কাছে প্রতি দিনের খাবার আছে, তাকে যেন পার্থিব সমস্ত সম্পদ দান করা হয়েছে।" (তিরমিযী ২৩৪৬, ইবনে মাজাহ ৪১৪১নং)
আরবী কবি হুত্বাইআহ বলেছেন,
وَلَكِنَّ التَّقِيَّ هُوَ السَّعِيدُ
وَلَستُ أَرَى السَّعَادَةَ جَمْعَ مَالَ ... وتقوَى اللَّهِ خَيْرُ الزَّادِ ذُخِرًا ... وَعِندَ اللَّهِ لِلأَتْقَى مَزِيدُ
অর্থাৎ, ধন সঞ্চয়ে সুখ আছে বলে মনে করি না। আসলে মুত্তাক্বী ব্যক্তিই হল প্রকৃত সুখী। সঞ্চয়ে আল্লাহর তাক্বওয়া হল উত্তম সম্বল। আর আল্লাহর নিকট মুত্তাক্বীর জন্য আছে আরো বেশি।
পক্ষান্তরে পাপী ধনী সুখী নয়। কোন মানুষের জন্য দুটি হাতে তিনটি ফুটবল রাখা সম্ভব নয়। তদনুরূপ একটি মানুষের ভিতরে সুস্বাস্থ্য, ধন ও মানসিক শান্তি একই সঙ্গে থাকতে পারে না। সাধারণতঃ পাপীরা ধন পায়, কিন্তু সুখ পায় না। কিন্তু সৎ লোকেরা ধন না পেলেও মানসিক সুখ পেয়ে ধন্য হয়。
📄 বরকত নষ্টে পাপের প্রভাব
অনেক মানুষ আছে, যারা নিজের পায়ে কুড়ুল মারে। অপরের নেমকহারামি ক'রে নিজের স্বার্থ নষ্ট করে। যে দেয়, তার অবাধ্যাচরণ করলে, সে কি আর দেবে? পালনকর্তার অবাধ্যাচরণ করলে তিনি কি দান-প্রতিদানের ইচ্ছা রাখবেন?
পাপাচরণের ফলে মানুষ রুযী থেকে বঞ্চিত হয়, রুযী পেলেও তার বর্কত থেকে বঞ্চিত হয়। দীর্ঘায়ু লাভ করলেও তাতে কোন বর্কত থাকে না। বড় আলেম হলেও ইলমের বর্কত তুলে নেওয়া হয়। বড় কাজী হলেও কাজের বর্কত ছিনিয়ে নেওয়া হয়। বিশাল টাকার মালিক হলেও টাকার বর্কত উঠিয়ে নেওয়া হয়।
পাপী মানুষের দ্বীন-দুনিয়ার বর্কত তুলে নেওয়া হয়। না তার দ্বীনী কাজের বর্কত থাকে, আর না তার দুনিয়ার কাজে। ফল-ফসল থেকে বর্কত তুলে নেওয়া হয়, যদিও তা দেখতে প্রচুর। গবাদি পশু ও পানির মাছের বর্কত চলে যায় আদম সন্তানের কৃত পাপের জন্য। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقُوا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِن كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُم بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ} (٩٦) سورة الأعراف
"যদি জনপদের অধিবাসীবৃন্দ বিশ্বাস করত ও সাবধান হত, তাহলে তাদের জন্য আমি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর কল্যাণ-দ্বার উন্মুক্ত ক'রে দিতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা মনে করল। ফলে তাদের কৃতকর্মের জন্য আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম।" (আ'রাফঃ ৯৬)
{وَأَلَّو اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُم مَّاء غَدَقًا } (١٦) سورة الجن
"আর এই যে, তারা যদি সত্য পথে প্রতিষ্ঠিত থাকত, তাহলে তাদেরকে আমি অবশ্যই প্রচুর পানি পান করাতাম।" (জ্বিনঃ ১৬)
হারাম উপায়ে বহু রুযী উপার্জন করা যায়, কিন্তু তাতে বর্কত থাকে না। মহান রুযীদাতা হারাম রুযীতে বর্কত দেন না। মহানবী বলেছেন,
((إِنَّ رُوحَ القُدُسِ نَفَتَ فِي رُوعِي أَن نَفْساً لنْ تَمُوتَ حَتَّى تَسْتَكْمِلَ أَجَلَهَا وَتَسْتَوْعِبَ رزْقَهَا فَاتَّقُوا الله وأجْمِلُوا في الطَّلب ولا يَحْمِلُنَّ أَحَدَكُمُ اسْتِبْطاءُ الرِّزْقِ أَنْ يَطْلُبَهُ بِمَعْصِيَةِ الله فإن الله تعالى لا يُنالُ ما عِنْدَهُ إِلا بِطاعَتِهِ)).
"জিবরীল আমার হৃদয়ে প্রক্ষিপ্ত করেছেন যে, কোন আত্মই তার ভাগ্যে নির্ধারিত সর্বশেষ আয়ু ও রুযী পূর্ণ না করা পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং রুজী সন্ধানে মধ্যবর্তী পন্থা (সুন্দর ও স্বাভাবিক বৈধ পথ) অবলম্বন কর। রুযী আসতে দেরী দেখে তোমাদের কেউ যেন আল্লাহর অবাধ্য হয়ে তার সন্ধানে উদ্বুদ্ধ না হয়। যেহেতু (রুযী আল্লাহর হাতে আর) তা তাঁর বাধ্য না হয়ে অর্জন করা যায় না।" (হিল্ইয়াহ ১০২৭, সহীহুল জামে' ২০৮৫নং)
অর্থ-সম্পদ ও ফল-ফসল বাহ্যতঃ প্রচুর থাকলেই তা প্রাচুর্যের নিদর্শন নয়। প্রাচুর্যের নিদর্শন হল তাতে বর্কত হওয়া, একটা হলেও এক শতের কাজ করা। অনুরূপ কেউ দীর্ঘজীবী হলেই তা উপকারী হয় না, অল্প আয়ু পেয়েও বহু মানুষ মরেও অমর থাকে। বহু মানুষ অনেকের জন্য অনেক কিছুর জন্য অনেক কিছু করে, কিন্তু যে একমাত্র মহান প্রতিপালকের জন্য কিছু করে, তাই হয় অনেক কিছু।
ইবনুল কাইয়েম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'আল্লাহর অবাধ্যাচরণ রুযী ও আয়ুর বর্কত নিশ্চিহ্ন হওয়ার কারণ এই যে, শয়তান পাপ ও পাপীদের কাজে নিযুক্ত থাকে। সুতরাং তাদের উপর তার আধিপত্য থাকে। তাই প্রত্যেক সেই জিনিস, যার সাথে শয়তান মিলিত আছে, সে জিনিসের বর্কত বিলুপ্ত। আর প্রত্যেক সেই জিনিস, যা আল্লাহর জন্য নয়, তার বর্কত বিনাশিত।' (আদ্-দাউ অদ্-দাওয়া ১৩১- ১৩২পৃঃ)
যে সময়কে মু'মিন আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করে, সেই সময় তার জন্য মুবারক বা বর্কতময়। আর যে সময়কে সে আল্লাহর অবাধ্যাচরণে ব্যয় করে, তা তার জন্য বর্কতছিন্ন। সুতরাং বর্কতছিন্নতার মূল হল মহান আল্লাহর অবাধ্যাচরণ। (লাত্মাইফুল মাআরিফ ১৫১পৃঃ) পক্ষান্তরে প্রাচুর্য ও বর্কত হল মহান আল্লাহর আনুগত্য ও তাক্বওয়ার কাজ।
অকৃতজ্ঞতা এক পাপ, আর সেই পাপের কারণে নেয়ামতের বর্কত চলে যায় এবং অকৃতজ্ঞ নেমকহারামদের সেই নেয়ামত ধ্বংস করা হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ} (۷)
"যখন তোমাদের প্রতিপালক ঘোষণা করেছিলেন, তোমরা কৃতজ্ঞ হলে তোমাদেরকে অবশ্যই অধিক দান করব, আর অকৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমার শাস্তি হবে কঠোর।" (ইব্রাহীমঃ ৭)
{ وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلاً قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُّطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّن كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ اللَّهِ فَأَذَاقَهَا اللَّهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ} (۱۱۲)
"আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসত সর্বদিক হতে প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল; ফলে তারা যা করত, তার জন্য আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ।" (নাহলঃ ১১২)
কোন কোন অবাধ্যাচরণের জন্য ব্যবসায়ীর ব্যবসার বর্কত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মহানবী বলেছেন,
البيعان بالخيَارِ مَا لَمْ يَتَفَرَّقَا ، فَإِنْ صَدَقا وَبَيَّنَا بُوركَ لَهُمَا في بيعهما ، وإِنْ كَتَمَا وَكَذْبَا مُحِقَتْ بركَةُ بَيعِهما)). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত (চুক্তি পাকা বা বাতিল করার) স্বাধীনতা রয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা পৃথক (বিক্রয়-স্থল হতে স্থানান্তরিত) না হবে। আর যদি তারা সত্য কথা বলে এবং (পণ্যদ্রব্যের প্রকৃতত্ব) খুলে বলে, (দোষ-ত্রুটি গোপন না রাখে, তাহলে তাদের কেনা-বেচার মধ্যে বর্কত দেওয়া হয়। আর তারা যদি (দোষ-ত্রুটি) গোপন রাখে এবং মিথ্যা বলে, তাহলে তাদের দু'জনের কেনা-বেচার বর্কত রহিত করা হয়।" (বুখারী ২০৭৯,২১১৪, মুসলিম ৩৯৩৭, আবুদাউদ ৩৪৫৯, তিরমিযী ১২৪৬নং, নাসাঈ)
তিনি আরো বলেছেন,
(( الْحَلِفُ مُنَفِّقَةٌ لِلسِّلْعَةِ مُمْحِقَةٌ لِلْبَرَكَةِ)). وفي رواية مسلم : ( الْحَلِفُ مَنْفَقَةً لِلسِّلْعَةِ مَمْحَقَةٌ لِلربح ..
"হলফ পণ্য দ্রব্য অধিক (চালু) বিক্রয় করে, (কিন্তু) বর্কত বিনষ্ট করে। (বুখারী ২০৮৭, মুসলিম ৪২০৯নং)
إِيَّاكُمْ وَكَثْرَةَ الْحَلِفِ فِي الْبَيْعِ فَإِنَّهُ يُنَفِّقُ ثُمَّ يَمْحَقُ ..
"তোমরা ব্যবসায় অধিক কসম খাওয়া থেকে দূরে থাক, কারণ তা পণ্য দ্রব্য অধিক চলতি করে। অতঃপর (তার বর্কত বা লাভ) ধ্বংস করে।" (মুসলিম ৪২ ১০নং)
এইভাবে এক একটি পাপ এক এক শ্রেণীর বর্কত তুলে নেয়। সুতরাং পাপ ক'রে পাপী নিজেরই ক্ষতি করে। তাই সাধু সাবধান!
📄 পাপ শাস্তি ও গযব আনয়ন করে এবং নেয়ামত ধ্বংস করে
মহান আল্লাহ যদিও পরম করুণাময়, মহাক্ষমাশীল, তবুও তিনি মহাপরাক্রমশালী প্রতিশোধ গ্রহণকারী। তবে তাঁর ইচ্ছাময় নীতি আছে। তাই তিনি সাধারণতঃ সাথে সাথে তাঁর অবাধ্যাচরণের শাস্তি দেন না। কিন্তু বিচার দিনে তার বিচার নেবেন ও শাস্তি দেবেন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ وَرَبُّكَ الْغَفُورُ ذُو الرَّحْمَةِ لَوْ يُؤَاخِذُهُم بِمَا كَسَبُوا لَعَجَّلَ لَهُمُ الْعَذَابَ بَل لَّهُم مَّوْعِدٌ لَّن يَجِدُوا مِن دُونِهِ مَوْثِلًا} (৫৮) سورة الكهف
অর্থাৎ, তোমার প্রতিপালক পরম ক্ষমাশীল, দয়াবান। তাদের কৃতকর্মের জন্য তিনি তাদেরকে পাকড়াও করলে তিনি তাদের শাস্তি ত্বরান্বিত করতেন; কিন্তু তাদের জন্য রয়েছে এক প্রতিশ্রুত মুহূর্ত; যা হতে তাদের কোন আশ্রয়স্থল নেই। (কাহফঃ ৫৮)
তিনি আরো বলেছেন,
{ وَلَوْ يُؤَاخِذُ اللَّهُ النَّاسَ بِظُلْمِهِم مَّا تَرَكَ عَلَيْهَا مِن دَابَّةٍ وَلَكِن يُؤَخِّرُهُمْ إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ) (٦١) سورة النحل
অর্থাৎ, আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের সীমালংঘনের জন্য শাস্তি দিতেন, তাহলে ভূপৃষ্ঠে কোন জীব-জন্তকেই রেহাই দিতেন না, কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকেন; অতঃপর যখন তাদের সময় আসে, তখন তারা মুহূর্তকালও বিলম্ব অথবা অগ্রগামী করতে পারে না। (নাহলঃ ৬১)
হ্যাঁ, মানুষ যেভাবে পাপপ্রবণ ও অপরাধী, তার হিসাব দুনিয়াতে নিলেই সবাই ধ্বংস হয়ে যেতো। আর তাহলে দুনিয়ার এই সংসার অবশিষ্ট থাকত না। তবে এমন নয় যে, তিনি দুনিয়াতে কাউকে কোন পাপের শাস্তিই দেন না। বরং অনেক সময় মানুষকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি কারেন্ট শাস্তি প্রেরণ করেন। দুনিয়ার বুকেই পাপীকে শায়েস্তা করেন। অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি, ঝড়-তুফান, ভূমিকম্প, সমুদ্র-উচ্ছ্বাস ইত্যাদি দ্বারা মানুষকে সতর্ক করেন। তিনি বলেন,
{أَوَلَا يَرَوْنَ أَنَّهُمْ يُفْتَنُونَ فِي كُلِّ عَامٍ مَّرَّةً أَوْ مَّرَّتَيْنِ ثُمَّ لَا يَتُوبُونَ وَلَا هُمْ يَذَّكَّرُونَ}
অর্থাৎ, তারা কি লক্ষ্য করে না যে, তারা প্রতি বছর একবার বা দু'বার কোন না কোন বিপদে পতিত হয়ে থাকে? তবুও তারা তওবা করে না এবং উপদেশ গ্রহণও করে না। (তাওবাহঃ ১২৬)
{ ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ) (٤١) سورة الروم
অর্থাৎ, মানুষের কৃতকর্মের দরুন জলে-স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে; যাতে ওদের কোন কোন কর্মের শাস্তি ওদেরকে আস্বাদন করানো হয়। যাতে ওরা (সৎপথে) ফিরে আসে। (রুমঃ ৪১)
{وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ} (٣٠) الشورى
অর্থাৎ, তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে, তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তিনি ক্ষমা ক'রে দেন। (শূরাঃ ৩০)
মানুষের কাছে বহু রকমের বিপদ-আপদ আসে। মানুষের শরীরে রোগ-বালার বিপদ আছে, আত্মীয়-বিয়োগের বিপদ আছে, ধন-সম্পদ নষ্টের বিপদ আছে, শত্রুর শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষের বিপদ আছে, এ সকল বিপদ হতে পারে তার কোন কোন কৃতকর্মের প্রতিফল। সকল কুকর্মের নয়, যেহেতু মহান আল্লাহ অনেক পাপকে ক্ষমা ক'রে দেন।
ইবনুল কাইয়েম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'কোন জানা বা অজানা পাপের কারণেই বান্দার উপর এমন কাউকে আধিপত্য দেওয়া হয়, যে তাকে কষ্ট দেয়। আর অজানা পাপ জানা পাপ অপেক্ষা অনেক গুণ বেশি এবং যা কিছু সে ক'রে ও জেনে বিস্মৃত হয়, তা স্মরণে থাকা অপেক্ষা অনেক গুণ বেশি।' (বাদাইউল ফাওয়াইদ ২/৭৭০)
রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
مَا اخْتَلَجَ عِرَةٌ، وَلَا عَينٌ إِلَّا بِذَنبٍ، وَمَا يَدفَعُ اللَّهُ عَنْهُ] أَكثَرُ
অর্থাৎ, কোন শিরা অথবা চক্ষু কোন পাপ ছাড়া স্পন্দন করে না। আর আল্লাহ তার উপর থেকে যা প্রতিহত করেন, তা অনেক বেশি। (ত্বাবারানীর সাগীর ১০৫৩, সঃ জামে' ৫৫২ ১নং)
হ্যাঁ, অধিকাংশ অপরাধই তিনি ক্ষমা করেন। তা না হলে মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতো। কিন্তু পাপাচার যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন তার শাস্তি এসে পড়ে বিলম্বে অথবা অবিলম্বে। এ কথার সাক্ষ্য রয়েছে ইতিহাসে। আল-কুরআনে বহু এমন জাতির ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে, যারা তাদের পাপাচরণের কারণে বিনাশপ্রাপ্ত হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন,
كَدَأْبِ آلِ فِرْعَوْنَ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ كَفَرُوا بِآيَاتِ اللَّهِ فَأَخَذَهُمُ اللَّهُ بِذُنُوبِهِمْ إِنَّ اللَّهَ قَوِيٌّ شَدِيدُ الْعِقَابِ (٥٢) ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ لَمْ يَكُ مُغَيِّراً نِعْمَةً أَنْعَمَهَا عَلَى قَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ وَأَنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ (٥٣) كَدَأْبِ آلِ فِرْعَوْنَ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ كَذَّبُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ فَأَهْلَكْنَاهُمْ بِذُنُوبِهِمْ وَأَغْرَقْنَا آلَ فِرْعَوْنَ وَكُلٌّ كَانُوا ظَالِمِينَ} (৫৪)
অর্থাৎ, ফিরআউনের বংশধর ও তাদের পূর্ববর্তিগণের অভ্যাসের ন্যায় এরা আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে প্রত্যাখ্যান করে। সুতরাং আল্লাহ তাদের পাপের জন্য তাদেরকে শাস্তি দেন। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান, শাস্তিদানে কঠোর। এ এজন্য যে, আল্লাহ কোন সম্প্রদায়কে যে সম্পদ দান করেন, তিনি তা (ধ্বংস দিয়ে) পরিবর্তন করেন না; যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আর নিশ্চিত আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। ফিরআউনের বংশধর ও তাদের পূর্ববর্তিগণের অভ্যাসের ন্যায় এরা এদের প্রতিপালকের নিদর্শনসমূহকে মিথ্যাজ্ঞান করে। তাদের পাপের জন্য আমি তাদেরকে ধ্বংস করেছি এবং ফিরআউনের বংশধরকে (সমুদ্রে) নিমজ্জিত করেছি। আর তারা সকলেই ছিল অত্যাচারী। (আনফালঃ ৫২-৫৪)
{وَإِذَا أَرَدْنَا أَن نُّهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيرًا (١٦) وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِنَ الْقُرُونِ مِن بَعْدِ نُوحٍ وَكَفَى بِرَبِّكَ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيرًا بَصِيرًا} (۱۷) سورة الإسراء
অর্থাৎ, যখন আমি কোন জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন ওর সমৃদ্ধিশালী ব্যক্তিদেরকে (সৎকর্ম করতে) আদেশ করি, অতঃপর তারা সেথায় অসৎকর্ম করে; ফলে ওর প্রতি দন্ডাজ্ঞা ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় এবং ওটাকে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি। নূহের পর আমি কত মানব গোষ্ঠীকে ধ্বংস করেছি। তোমার প্রতিপালকই তাঁর দাসদের পাপাচরণের সংবাদ রাখা ও পর্যবেক্ষণের জন্য যথেষ্ট। (বানী ইস্রাঈলঃ ১৬-১৭)
পাপের প্রতিফল স্বরূপ ইবলীস ফিরিস্তাতুল্য আবেদ থেকে শয়তানে পরিণত হয়েছে। হিংসা, অহংকার ও অবাধ্যাচরণের ফলে সে বিতাড়িত হয়েছে। অভিশপ্ত ও জাহান্নামী হয়েছে। তার চোহারাকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও কুৎসিত বানানো হয়েছে। তার অভ্যন্তরকে তার চেহারা অপেক্ষা বেশি কুৎসিত করা হয়েছে।
অবাধ্যাচরণের ফল স্বরূপ আমাদের আদি পিতা-মাতা চির সুখময় স্থান বেহেস্ত থেকে বহিষ্কৃত হয়ে এই কষ্টময় পৃথিবীতে স্থান পেয়েছেন।
পাপের ফল স্বরূপ তুফান এসেছিল নূহ -এর সম্প্রদায়ের উপর এবং তার নৌকায় আরোহণকারী ছাড়া সকলকে ধ্বংস করা হয়েছিল। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَكَذَّبُوهُ فَأَنجَيْنَاهُ وَالَّذِينَ مَعَهُ فِي الْفُلْكِ وَأَغْرَقْنَا الَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْماً عَمِينَ} (৬৪) سورة الأعراف
"অতঃপর তারা তাকে মিথ্যাবাদী বলে। ফলে তাকে ও তার সঙ্গে যারা নৌকায় ছিল, আমি তাদেরকে উদ্ধার করি। আর যারা আমার নিদর্শনাবলী প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাদেরকে (তুফানে) নিমজ্জিত করি। নিশ্চয় তারা ছিল এক অন্ধ সম্প্রদায়।" (আ'রাফঃ ৬৪)
এইভাবেই অনেকের অনেক পাপ ও অবাধ্যাচরণের ফলে তাদের জীবনে শাস্তি ও লাঞ্ছনার তুফান এসে তাদের সম্ভ্রম ও সম্পদ ধ্বংস ক'রে দেয়। কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের তুফান এসে ধ্বংস ক'রে যায় তাদের ঘর-বাড়িকে।
আ'দ জাতির প্রতি হূদ-কে প্রেরণ করা হয়েছিল। কিন্তু তারা তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনি। অবাধ্যাচরণের ফলে তাদেরকে ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রচন্ড ঝড়ো-হাওয়া দ্বারা। (হা-ক্কাহঃ ৬) মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَأَنجَيْنَاهُ وَالَّذِينَ مَعَهُ بِرَحْمَةٍ مِّنَّا وَقَطَعْنَا دَابِرَ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَمَا كَانُوا مُؤْمِنِينَ}
"অতঃপর তাকে ও তার সঙ্গীদেরকে আমার দয়াতে উদ্ধার করেছিলাম এবং আমার নিদর্শনসমূহকে যারা মিথ্যা মনে করেছিল এবং যারা অবিশ্বাসী ছিল, তাদেরকে নির্মূল করেছিলাম।" (আ'রাফঃ ৭২)
সামুদ জাতির প্রতি নবী সালেহ-কে প্রেরণ করা হয়েছিল। কিন্তু তারা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ফলে তাদেরকে ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রলয়ঙ্কর গর্জন দ্বারা। (হা-ক্কাহঃ ৫) তাদের নিদর্শন স্বরূপ একটি উটনী দেওয়া হয়েছিল। মহান আল্লাহ বলেন,
{فَعَقَرُوا النَّاقَةَ وَعَتَوْا عَنْ أَمْرِ رَبِّهِمْ وَقَالُوا يَا صَالِحُ ائْتِنَا بِمَا تَعِدُنَا إِنْ كُنتَ مِنْ الْمُرْسَلِينَ (۷۷) فَأَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَةُ فَأَصْبَحُوا فِي دَارِهِمْ جَاثِمِينَ} (۷৮) سورة الأعراف
"অতঃপর তারা সেই উটনীকে বধ করল এবং আল্লাহর আদেশ অমান্য করল এবং বলল, 'হে স্বালেহ! তুমি রসূল হলে আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছ, তা আনয়ন কর।' অতঃপর তারা ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হল, ফলে তারা নিজ গৃহে নতজানু অবস্থায় ধ্বংস হয়ে গেল।" (আ'রাফঃ ৭৭-৭৮)
লুত-কে এমন এক জাতির নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল, যারা অভিনব বিকৃত যৌনাচার সমকামিতায় লিপ্ত ছিল। তিনি তাদেরকে নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা তাঁকে অবিশ্বাস করল। সুতরাং তারা তাদের কুকর্মের শাস্তি প্রত্যক্ষ করল। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ فَلَمَّا جَاء أَمْرُنَا جَعَلْنَا عَالِيَهَا سَافِلَهَا وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهَا حِجَارَةً مِّن سِجِّيلٍ مَّنضُودٍ}
"অতঃপর যখন আমার হুকুম এসে পৌঁছল, তখন আমি ঐ ভূ-খন্ডের উপরিভাগকে নীচে ক'রে দিলাম এবং তার উপর ক্রমাগত ঝামা পাথর বর্ষণ করলাম।" (হৃদঃ ৮২)
{وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَراً فَانظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ} (٨٤) سورة الأعراف
"তাদের উপর মুষলধারে পাথর-বৃষ্টি বর্ষণ করলাম, সুতরাং অপরাধীদের পরিণাম কী হয়েছিল তা লক্ষ্য কর।" (আ'রাফ: ৮৪)
শুআইব নবী-কে প্রেরণ করা হয়েছিল মাদয়ান শহরে। তারা ওজনে কম-বেশি দেওয়ার অপরাধে ব্যাপকভাবে লিপ্ত ছিল। মেপে অথবা ওজন ক'রে নেবার সময় বেশি নিত এবং দেবার সময় কম দিত। নবী নিষেধ করলেও তারা তাঁর কথা অমান্য করল। মহান আল্লাহ বলেন,
{فَأَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَةُ فَأَصْبَحُواْ فِي دَارِهِمْ جَاثِمِينَ} (۹۱) سورة الأعراف
"অতঃপর তারা ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হল, ফলে তারা নিজগৃহে উপুড় অবস্থায় ধ্বংস হয়ে গেল।" (আ'রাফঃ ৯১)
মহান আল্লাহ ফিরআউন ও তার সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার ব্যাপারে বলেন,
{ثُمَّ بَعَثْنَا مِن بَعْدِهِم مُّوسَى بِآيَاتِنَا إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَئِهِ فَظَلَمُوا بِهَا فَانظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُفْسِدِينَ) (۱۰۳) سورة الأعراف
"অতঃপর তাদের পর মুসাকে আমার নিদর্শনাবলীসহ ফিরআউন ও তার পারিষদবর্গের নিকট পাঠাই, কিন্তু তারা তা অস্বীকার করে। সুতরাং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কী হয়েছিল, তা লক্ষ্য কর।" (আ'রাফঃ ১০৩)
{فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمُ الطُّوفَانَ وَالْجَرَادَ وَالْقُمَّلَ وَالصَّفَادِعَ وَالدَّمَ آيَاتٍ مُّفَصَّلَاتٍ فَاسْتَكْبَرُوا وَكَانُوا قَوْمًا مُّجْرِمِينَ) (۱۳۳) سورة الأعراف
"অতঃপর আমি তাদের প্রতি প্লাবন, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্ত প্রেরণ করি; এগুলি ছিল স্পষ্ট নিদর্শন। কিন্তু তারা দাম্ভিকই রয়ে গেল, আর তারা ছিল এক অপরাধী সম্প্রদায়।" (আ'রাফঃ ১৩৩)
{فَانتَقَمْنَا مِنْهُمْ فَأَغْرَقْنَاهُمْ فِي الْيَمِّ بِأَنَّهُمْ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَكَانُوا عَنْهَا غَافِلِينَ} (١٣٦)
"সুতরাং আমি তাদের প্রতিশোধ নিলাম এবং তাদেরকে অতল সমুদ্রে নিমজ্জিত করলাম, কারণ তারা আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা মনে করত এবং এ সম্বন্ধে তারা ঔদাস্য প্রকাশ করত।" (আ'রাফঃ ১৩৬)
মূসা নবী -এর জাতির এক ব্যক্তি ছিল কারূন। মহান আল্লাহ তার কাহিনী কুরআনে উল্লেখ করেছেন।
"কারুন ছিল মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত, কিন্তু সে তাদের প্রতি যুলুম করেছিল। আমি তাকে ধনভান্ডার দান করেছিলাম, যার চাবিগুলি বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল। স্মরণ কর, তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিল, 'দম্ভ করো না, আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার মাধ্যমে পরলোকের কল্যাণ অনুসন্ধান কর। আর তুমি তোমার ইহলোকের অংশ ভুলে যেয়ো না। তুমি (পরের প্রতি) অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। আল্লাহ অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না।' সে বলল, 'এ সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি।' সে কি জানত না যে, আল্লাহ তার পূর্বে বহু মানবগোষ্ঠীকে ধ্বংস করেছেন, যারা তার থেকেও শক্তিতে ছিল প্রবল, সম্পদে ছিল প্রাচুর্যশালী? আর অপরাধীদেরকে তাদের অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাও করা হবে না। কারুন তার সম্প্রদায়ের সম্মুখে জাঁকজমক সহকারে বের হল। যারা পার্থিব জীবন কামনা করত তারা বলল, 'আহা! কারুনকে যা দেওয়া হয়েছে, সেরূপ যদি আমাদেরও থাকত; প্রকৃতই সে মহা ভাগ্যবান।' আর যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল তারা বলল, 'ধিক্ তোমাদের! যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ। আর ধৈর্যশীল ব্যতীত তা অন্য কেউ পায় না।' (ক্বাস্বাস্বঃ ৭৬-৮০)
{فَخَسَفْنَا بِهِ وَبَدَارِهِ الْأَرْضِ فَمَا كَانَ لَهُ مِن فِئَةٍ يَنصُرُونَهُ مِن دُونِ اللَّهِ وَمَا كَانَ مِنَ المنتصرين) (۸۱) سورة القصص
"অতঃপর আমি কারুনকে ও তার প্রাসাদকে মাটিতে ধসিয়ে দিলাম। তার স্বপক্ষে এমন কোন দল ছিল না, যে আল্লাহর শাস্তির বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করতে পারত এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিল না।" (ক্বাস্বাস্বঃ ৮১)
মহান সৃষ্টিকর্তা পূর্বে যে জাতিকেই ধ্বংস করেছেন, তাদেরকে তাদের পাপকর্মের প্রতিফল স্বরূপ ধ্বংস করেছেন। তিনি বলেছেন,
{فَكُلًّا أَخَذْنَا بِدْبهِ فَمِنْهُم مَّنْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِ حَاصِبًا وَمِنْهُم مَّنْ أَخَذَتْهُ الصَّيْحَةُ وَمِنْهُم مَّنْ خَسَفْنَا بِهِ الْأَرْضِ وَمِنْهُم مَّنْ أَغْرَقْنَا وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِن كَانُوا أَنفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ} (٤٠) سورة العنكبوت
"সুতরাং ওদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ অপরাধের জন্য পাকড়াও করলাম; ওদের কারও প্রতি প্রেরণ করলাম পাথর বর্ষণকারী ঝড়, কাকেও আঘাত করল মহাগর্জন, কাকেও আমি মাটির নিচে ধসিয়ে দিলাম এবং কাকেও মারলাম ডুবিয়ে। আল্লাহ তাদের প্রতি কোন যুলুম করেননি; আসলে তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম করেছিল।" (আনকাবুতঃ ৪০)
বলাই বাহুল্য যে, পাপ হল প্রত্যেক ধ্বংসের মূল। অপরাধ হল প্রত্যেক দুর্ভাগ্যের পথ। যে জাতির মাঝে পাপ অনুপ্রবেশ করে, সে জাতি ধ্বংস হয়ে যায়। যে দেশের মাঝে পাপ ব্যাপক হয়ে যায়, সে দেশ বিনাশপ্রাপ্ত হয়। যে ঘরে পাপ ঢোকে, সে ঘর অশান্তির বাসা হয়। অপরাধ ব্যতিত সৃষ্টিকর্তা কাউকে সাজা দেন না। আর তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা ছাড়া কাউকে মুক্তি দেন না।
হ্যাঁ, মানুষের কর্মদোষেই আযাব আসে। আর তওবা ছাড়া তা রদ্দ হয় না। পাপ ব্যাপক আকার ধারণ করলে তার শাস্তি অবধার্য হয়ে যায় এবং পরকালের পূর্বেই ইহকালেই কোন কোন জাতিকে শায়েস্তা করা হয়।
বিশেষ কয়েকটি পাপের কারেন্ট শাস্তি বর্ণিত হয়েছে হাদীসে। মহানবী ﷺ বলেছেন,
((لَيَشْرَبَنَّ أُنَاسٌ مِنْ أُمَّتِي الخَمْرَ يُسَمُّونَهَا بِغَيْرِ اسْمِهَا وَيُضْرَبُ عَلَى رُؤُوسِهِمْ بِالْمَعَازِفِ وَالْقَيْنَاتِ يَخْسِفُ الله بهِمُ الأَرْضِ وَيَجْعَلُ مِنْهُمْ قِرَدَةً وَخَنَازِينَ)).
"অবশ্যই আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে, তাদের মাথার উপরে বাদ্যযন্ত্র বাজানো হবে এবং নর্তকী নাচবে। আল্লাহ তাদেরকে মাটিতে ধসিয়ে দেবেন এবং বানর ও শূকরে পরিণত করবেন!" (ইবনে মাজাহ ৪০২০, ইবনে হিব্বান ৬৭৫৮, তাবারানী ৩৩৪২, বাইহাকী ১৭১৬০, সহীহুল জামে' ৫৪৫৪ নং)
((لَيَكُونَنَّ فِي هَذِهِ الْأُمَّةِ خَسْفٌ وَقَدْفٌ وَمَسْخٌ وَذَلِكَ إِذا شَرِبُوا الخُمُورَ وَاتَّخَذُوا الْقَيْنَاتِ وَضَرَبُوا بالمعازف)).
"অবশ্যই আমার উম্মতের মাঝে (কিছু লোককে) মাটি ধসিয়ে, পাথর বর্ষণ করে এবং আকার বিকৃত করে (ধ্বংস করা) হবে। আর এ শাস্তি তখন আসবে, যখন তারা মদ পান করবে, নর্তকী রাখবে এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাবে।" (ইবনে আবিদ দুনয়া, সহীহুল জামে' ৫৪৬৭নং)
((ما منع قوم الزكاة إلا ابتلاهم الله بالسنين)).
“যে জাতিই যাকাত প্রদানে বিরত থেকেছে, সে জাতিকেই আল্লাহ দুর্ভিক্ষ দ্বারা আক্রান্ত করেছেন।” (ত্বাবারানীর আউসাত্ব ৪৫৭৭, ৬৭৮৮, হাকেম ২৫৭৭, বাইহাকী ৬৬২৫ অনুরূপ, সহীহ তারগীব ৭৬৩নং)
((يَا مَعْشَرَ الْمُهَاجِرِينَ خَمْسٌ إِذَا ابْتُلِيتُمْ بِهِنَّ وَأَعُوذُ بِاللَّهِ أَنْ تُدْرِكُوهُنَّ لَمْ تَظْهَر الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ قَطُّ حَتَّى يُعْلِنُوا بِهَا إِلَّا فَشَا فِيهِمُ الطَّاعُونُ وَالْأَوْجَاعُ الَّتِي لَمْ تَكُنْ مَضَتْ في أَسْلَافِهِمُ الَّذِينَ مَضَوْا وَلَمْ يَنْقُصُوا الْمِكْيَالَ وَالْمِيزَانَ إِلَّا أُخِذُوا بِالسِّنِينَ وَشِدَّةِ الْمَوْنَةِ وَجَوْرِ السُّلْطَانِ عَلَيْهِمْ. وَلَمْ يَمْنَعُوا زَكَاةَ أَمْوَالِهِمْ إِلَّا مُنِعُوا الْقَطْرَ مِنَ السَّمَاءِ وَلَوْلَا الْبَهَائِمُ لَمْ يُمْطَرُوا وَلَمْ يَنْقُضُوا عَهْدَ اللَّهِ وَعَهْدَ رَسُولِهِ إِلَّا سَلَّطَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ عَدُوًّا مِنْ غَيْرِهِمْ فَأَخَدُّوا بَعْضَ مَا فِي أَيْدِيهِمْ. وَمَا لَمْ تَحْكُمْ أَئِمَّتُهُمْ بِكِتَابِ اللَّهِ وَيَتَخَيَّرُوا مِمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ إِلَّا جَعَلَ اللَّهُ بَأْسَهُمْ بَيْنَهُمْ)).
"হে মুহাজিরদল! পাঁচটি কর্ম এমন রয়েছে যাতে তোমরা লিপ্ত হয়ে পড়লে (উপযুক্ত শাস্তি তোমাদেরকে গ্রাস করবে)। আমি আল্লাহর নিকট পানাহ চাই, যাতে তোমরা তা প্রত্যক্ষ না কর।
যখনই কোন জাতির মধ্যে অশ্লীলতা (ব্যভিচার) প্রকাশ্যভাবে ব্যাপক হবে, তখনই সেই জাতির মধ্যে প্লেগ এবং এমন মহামারী ব্যাপক হবে যা তাদের পূর্বপুরুষদের মাঝে ছিল না।
যে জাতিই মাপ ও ওজনে কম দেবে, সে জাতিই দুর্ভিক্ষ, কঠিন খাদ্য-সংকট এবং শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারের শিকার হবে।
যে জাতিই তার মালের যাকাত দেওয়া বন্ধ করবে, সে জাতির জন্যই আকাশ হতে বৃষ্টি বন্ধ করে দেওয়া হবে। যদি অন্যান্য প্রাণীকুল না থাকত, তাহলে তাদের জন্য আদৌ বৃষ্টি হত না।
যে জাতি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে, সে জাতির উপরেই তাদের বিজাতীয় শত্রুদলকে ক্ষমতাসীন করা হবে; যারা তাদের মালিকানা-ভুক্ত বহু ধন-সম্পদ নিজেদের কুক্ষিগত করবে।
আর যে জাতির শাসকগোষ্ঠী যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহর কিতাব (বিধান) অনুযায়ী দেশ শাসন করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি তাদের মাঝে গৃহদ্বন্দ্ব অবস্থায়ী রাখবেন।" (বাইহাকী, ইবনে মাজাহ ৪০ ১৯নং, সহীহ তারগীব ৭৬৪নং)
ইবনে আব্বাস কর্তৃক বর্ণিত, একদা আল্লাহর রসূল বললেন, “পাঁচটির প্রতিফল পাঁচটি।” জিজ্ঞাসা করা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! পাঁচটির প্রতিফল পাঁচটি কী?' তিনি বললেন,
((مَا نَقَضَ قَوْمُ الْعَهْدَ إِلا سُلَّطَ عَلَيْهِمْ عَدُوُّهُمْ ، وَمَا حَكَمُوا بِغَيْرِ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ إِلَّا فَشَا فِيهِمُ الْفَقْرُ، وَلَا ظَهَرَتْ فِيهِمُ الْفَاحِشَةُ إِلا فَشَا فِيهِمُ الْمَوْتُ ، وَلَا طَفَّفُوا الْمِكْيَالَ إِلَّا مُنِعُوا النَّبَاتِ وَأُخِذُوا بِالسِّنِينَ، وَلا مَنْعُوا الزَّكَاةَ إِلَّا حُبِسَ عَنْهُمُ الْقَطْرُ)).
"যে জাতিই (আল্লাহর) প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে, সেই জাতির উপরেই তাদের শত্রুকে ক্ষমতাসীন করা হবে। যে জাতিই আল্লাহর অবতীর্ণকৃত সংবিধান ছাড়া অন্য দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, সেই জাতির মাঝেই দরিদ্রতা ব্যাপক হবে। যে জাতির মাঝে অশ্লীলতা (ব্যভিচার) প্রকাশ পাবে, সে জাতির মাঝেই মৃত্যু ব্যাপক হবে। যে জাতিই যাকাত দেওয়া বন্ধ করবে, সেই জাতির জন্যই বৃষ্টি বন্ধ করে দেওয়া হবে। যে জাতি দাঁড়ি-মারা শুরু করবে, সে জাতি ফসল থেকে বঞ্চিত হবে এবং দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হবে।" (ত্বাবারানীর কাবীর ১০৮-৩০, সহীহ তারগীব ৭৬৫নং)
অশ্লীলতা ব্যাপক হওয়ার কারণে মানুষের মাঝে নতুন নতুন রোগ সৃষ্টি হবে, যে সব রোগ পূর্বে ছিল না। বিশ্বায়নের যুগে অশ্লীলতার বন্যা প্রত্যেক ঘরে প্রবেশ করবে। কেউ অশ্লীল কাজে লিপ্ত না হলেও দর্শনে লিপ্ত হবে। বয়স হওয়ার পূর্বেই ছেলে-মেয়েরা সাবালক-সাবালিকা হবে। ব্যভিচারের তুফান বন্ধ করতে অপারগ বা অনিচ্ছুক হলে জন্মনিরোধের ব্যবস্থা বৃদ্ধি করা হবে। ব্যভিচার ও সমকামিতাকে আইনী বৈধতা দেওয়া হবে। আর তারই শাস্তি স্বরূপ আসবে নতুন নতুন নানা মহামারী।
ধর্মে-ধর্মে হানাহানির ফল স্বরূপ সৃষ্টি হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং রাজনীতি থেকে ধর্মকে পৃথক রাখার পরিকল্পনা। ধর্মকে ব্যক্তিগতভাবে সীমাবদ্ধ রাখলে ধর্মের অনেক কিছু অমানা থেকে যায়। আর তাতে মহান আল্লাহর দ্বীন পরিপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠালাভ করতে পারে না।
কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, বহু মুসলিম রাষ্ট্রনেতা নিজের গদিকে টিকিয়ে রাখার জন্য দ্বীনকে পরিপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহ দেখান না। তারা নিজেরা দ্বীন পালন করতে চায় না এবং তা মানুষের মনে-মগজে ও সমাজে প্রতিষ্ঠালাভ করুক, তা চান না।
মহান আল্লাহর আইনে কোন যুলম নেই। কিন্তু তা অচল মনে করে মানুষের মনগড়া আইন চালাতে চায়, অথচ তাতে আছে যুলম ও অবিচার। তার ফলে শাস্তি স্বরূপ নেমে আসে দরিদ্রতা, গৃহযুদ্ধ ও রক্তক্ষয়ী লড়াই। একটি স্বৈরাচারীর গদির মোকাবেলায় কুরবান হয় লক্ষ-লক্ষ মানুষ। না রাষ্ট্রনেতা সুখে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে, আর না রাষ্ট্রের নাগরিকরা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে কালাতিপাত করতে পারে। রাজনীতির সাম-দান-ভেদ-দন্ড প্রয়োগ করার ফলে সে রাষ্ট্রের মানুষরা নানা দলে বিভক্ত হয়ে যায়। আর দলাদলির ফলে পরস্পরের মাঝে সৃষ্টি হয় বিদ্বেষ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিহিংসা। এ সব কিছু হয় মহান সৃষ্টিকর্তার বিধানকে অবজ্ঞা করার ফলে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمِنَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّا نَصَارَى أَخَذْنَا مِيثَاقَهُمْ فَنَسُوا حَظًّا مِّمَّا ذُكِّرُوا بِهِ فَأَغْرَيْنَا بَيْنَهُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَسَوْفَ يُنَبِّئُهُمُ اللهُ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ} (١٤) المائدة
"যারা বলে, 'আমরা নাসারা' (খ্রিস্টান), তাদেরও অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু তারা যা উপদিষ্ট হয়েছিল তার একাংশ ভুলে বসে। সুতরাং আমি তাদের মাঝে কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী শত্রুতা ও বিদ্বেষ জাগরুক রেখেছি। আর তারা যা করত, আল্লাহ অচিরেই তাদেরকে তা জানিয়ে দেবেন।" (মায়িদাহঃ ১৪)
পাপের প্রতিফল স্বরূপ মানুষের নেয়ামত ধ্বংস হয়, নেয়ামতের বর্কত বিলীন হয়, মানুষে-মানুষে হানাহানি চলে এবং পরস্পর পরস্পরকে অভিশাপ দেয় ও দোষারোপ করে। মানুষের পাপের শাস্তি স্বরূপ প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয়। মহান সৃষ্টিকর্তা তার মাধ্যমে আদম-সন্তানকে কখনো কখনো শায়েস্তা করেন। তার ফলে মন্দের সাথে ভালো লোকেরাও শাস্তি পায়, শাস্তি পায় জীবজন্তুরা।
মুজাহিদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'কঠিন দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে এবং আকাশের বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেলে পশু-পক্ষী আদম-সন্তানের পাপীদেরকে অভিশাপ ক'রে থাকে এবং বলে, এ হল আদম-সন্তানের পাপের অশুভ ফল।'
মানুষ সৃষ্টিকর্তার দোষ দেয়, দোষ দেয় প্রকৃতিকে। অথচ সে জানে না বা মানে না যে, তার নিজের দোষেই প্রকৃতির তান্ডব চলে তার উপর। প্রতিপালক কারো প্রতি অন্যায় করেন না, মানুষ নিজের প্রতি নিজেই অন্যায় করে। আরবী কবি বলেছেন,
إِذَا كُنتَ فِي نِعْمَةٍ فَارِعَهَا وَحَافِظُ عَلَيْهَا بشكر الإله
فَإِنَّ المَعَاصِي تُزِيلُ النَّعَمِ فشكرُ الإِلَهِ يُزِيلُ النَّقَمِ
অর্থাৎ, তুমি নেয়ামতে থাকলে তার হিফাযত কর। কারণ পাপাচরণ নেয়ামত ধ্বংস করে।
আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন ক'রে তার সংরক্ষা কর। কারণ আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আকস্মিক শাস্তি প্রতিহত করে।
কৃতজ্ঞতার মাহাত্ম্যের জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, তা বর্তমান নেয়ামতের হিফাযত করে এবং তার ঋদ্ধি-বৃদ্ধি ঘটায়। উপস্থিত নেয়ামতকে বেঁধে রাখে এবং অনাগত সম্পদকে আকর্ষণ ও শিকার করে। পক্ষান্তরে অকৃতজ্ঞতার ফলে নেয়ামত পলায়ন করে অথবা তার বর্কত বিলুপ্ত হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ} (۷)
"যখন তোমাদের প্রতিপালক ঘোষণা করেছিলেন, তোমরা কৃতজ্ঞ হলে তোমাদেরকে অবশ্যই অধিক দান করব, আর অকৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমার শাস্তি হবে কঠোর।" (ইব্রাহীমঃ ৭)
বলা বাহুল্য, কৃতঘ্নতা নেয়ামতের উপর আযাব আনয়ন করে এবং পরিশেষে তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মানুষের পাপাচরণের ফলে অতর্কিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসে কত শত নেয়ামতকে ধূলিস্মাৎ করে যায়।
اللَّهُمَّ إِنَّا نَعُوذُ بِكَ مِنْ زَوَالِ نِعْمَتِكَ وَتَحَوُّلِ عَافِيَتِكَ وَفَجْأَةِ نِقْمَتِكَ وَجَمِيعِ سَخَطِكَ.
হে আল্লাহ! অবশ্যই আমরা তোমার নিকট তোমার নেয়ামত ও অনুগ্রহের অপসরণ, নিরাপত্তার প্রত্যাবর্তন, আকস্মিক প্রতিশোধ এবং যাবতীয় ক্রোধ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি。