📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 জয়-পরাজয়ে অবাধ্যচারণের প্রভাব

📄 জয়-পরাজয়ে অবাধ্যচারণের প্রভাব


হক-বাতিলের সংঘর্ষ হয়েছে, হচ্ছে এবং হতে থাকবে। হকপন্থীরা যদি সত্যই আল্লাহর দ্বীনকে উন্নত করার জন্য সংগ্রাম করে, তাহলে তিনি অবশ্যই তাদেরকে বিজয়ী করেন।
বিজয় লাভের যে সকল শর্তাবলী আছে, তার মধ্যে অন্যতম হল সেনাপতির আনুগত্য। আনুগত্য না থাকলে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।
উহুদ যুদ্ধের দিন সৈন্য-বিন্যাস করার সময় নবী ৫০ জন তীরন্দাজ সাহাবাকে উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এক ছোট্ট পাহাড়ে পাহারা দিতে আদেশ করলেন, যাতে শত্রুপক্ষ পিছন দিক থেকে আক্রমণ না ক'রে বসে। তাঁদেরকে এ কথাও বলে দেওয়া হয়েছিল যে, যুদ্ধে হার-জিত যাই-বা হোক, তাঁরা যেন কোন অবস্থাতেই ঘাঁটি না ছাড়েন। কিন্তু যুদ্ধের প্রথম দিকে মুসলিম বাহিনীর বিজয় পরিলক্ষিত হলে তাঁরা নববী নির্দেশ লংঘন করলে পিছন থেকে কাফেররা পাল্টা আক্রমণ চালায়। ফলে মুসলিমগণ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। সুতরাং শত্রু পিছন থেকে আল্লাহর রসূল-এর কাছে পৌঁছতে সক্ষম হয়। আঘাতে তাঁর নিচের চোয়ালের ডান দিকের (ঠিক মাঝের পার্শ্ববর্তী) দুটি দাঁত ভেঙ্গে যায় এবং তাঁর কপাল বিক্ষত হয়। চোট লাগে তাঁর চেহারায়। গালের উপরি অংশে শিরস্ত্রাণের দুটি কড়া ঢুকে যায়।। তা দাঁত দিয়ে তুলতে গিয়ে আবু উবাইদা-এর মাঝের দাঁত দুটি ভেঙ্গে যায়। মুসলিম বাহিনীর ৭০ জন লোক শহীদ হন। তাঁদের মধ্যে আল্লাহর সিংহ (মহানবী-এর চাচা) হামযাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব অন্যতম। শত্রুপক্ষ (হিন্দু) তাঁর কলিজা বের ক'রে দাঁতে চিবিয়ে রাগ মিটায়! মহান আল্লাহ সেদিনকার সেই বিজয়ের পর পরাজয়ের মর্মান্তিক ফলাফল ও তার কারণ উল্লেখ করেছেন কুরআনে। তিনি বলেছেন,
{وَلَقَدْ صَدَقَكُمُ اللَّهُ وَعْدَهُ إِذْ تَحُسُّونَهُم بِإِذْنِهِ حَتَّى إِذَا فَشِلْتُمْ وَتَنَازَعْتُمْ فِي الْأَمْرِ وَعَصَيْتُم مِّن بَعْدِ مَا أَرَاكُم مَّا تُحِبُّونَ مِنكُم مَّن يُرِيدُ الدُّنْيَا وَمِنكُم مَّن يُرِيدُ الْآخِرَةَ ثُمَّ صَرَفَكُمْ عَنْهُمْ لِيَبْتَلِيَكُمْ وَلَقَدْ عَفَا عَنكُمْ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ } (١৫২)
অর্থাৎ, আর আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছিলেন, যখন তোমরা তাদেরকে আল্লাহর নির্দেশক্রমে হত্যা করছিলে। অবশেষে যখন তোমরা সাহস হারিয়েছিলে এবং (রসূলের) নির্দেশ সম্বন্ধে মতভেদ সৃষ্টি করেছিলে এবং যা তোমরা পছন্দ কর তা (বিজয়) তোমাদেরকে দেখানোর পরে তোমরা অবাধ্য হয়েছিলে (তখন বিজয় রহিত হল)। তোমাদের কতক লোক ইহকাল কামনা করেছিল এবং কতক লোক পরকাল কামনা করেছিল। অতঃপর তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য তিনি তোমাদেরকে তাদের মোকাবেলায় পশ্চাতে ফিরিয়ে দিলেন। তবুও (কিন্তু) তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করলেন। বস্তুতঃ আল্লাহ বিশ্বাসীদের প্রতি অনুগ্রহশীল। (আলে ইমরানঃ ১৫২)

এইভাবেই অবাধ্যাচরণ অধোগতি আনয়ন করে এবং বিজয়কে পরাজয়ে পরিবর্তন করে।
সে উম্মাহ কীভাবে মহান আল্লাহর কাছে বিজয় কামনা করে, যে বিজয়ের শর্তাবলী পালনে অবজ্ঞা প্রদর্শন করে? যে জাতি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের শত-সহস্র বিষয়ে অবাধ্যাচরণ করে, সে জাতি বিজয় লাভে আল্লাহর সাহায্য কামনা করে কোন মনে?
যে জাতি মহান প্রতিপালকের ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে এবং তাঁর রসূলের আদেশ-নিষেধ পালনে উন্নাসিকতা প্রদর্শন করে, সে জাতি উম্মতের পরাজয় হলে 'কেন হল' প্রশ্ন করে কোন্ মুখে? মহান আল্লাহ বলেছেন,
{أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُم مُّصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُم مِّثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّى هَذَا قُلْ هُوَ مِنْ عِندِ أَنْفُسِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ} (١٦٥) سورة آل عمران
"যখন তোমাদের উপর (উহুদের যুদ্ধের বিপদ) এসেছিল (৭০ জন শহীদ হয়েছিল), যার দ্বিগুণ বিপদ (বদরের যুদ্ধে) তোমরা তাদের উপর আনয়ন করেছিলে; (তাদের ৭০ জনকে হত্যা এবং ৭০ জনকে বন্দী করেছিলে), তখন তোমরা বলেছিলে, এ কোথা থেকে এল? বল, (হে নবী!) এ তোমাদের নিজেদেরই কাছ থেকে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্ব শক্তিমান।" (আলে ইমরানঃ ১৬৫)

নিজেদেরই অবাধ্যাচরণের কুফল। সুতরাং স্পষ্ট যে, অবাধ্যাচরণ থাকলে অনেক সময় বিজয় পরাজয়ে পরিবর্তিত হতে পারে। এ পরিবর্তন যদি সেই যুদ্ধে হয়, যে যুদ্ধে মানবকুল শিরোমণি খোদ আল্লাহর দূত শরীক থাকেন এবং তাঁর সাথে তাঁর সহচরগণ অংশগ্রহণ করেন। এতদ্ সত্ত্বেও তাঁদের অবাধ্যাচরণের সত্বর শাস্তি আসতে পারে, তাহলে বর্তমানের যুদ্ধ-বিগ্রহে কী হতে পারে, তা অনুমেয়। যে সকল যুদ্ধ-বিগ্রহের আগা-গোড়া কেবল অবাধ্যাচরণ ও পাপাচরণ। যে সকল যুদ্ধে শরীক থাকে এমন সব লোক, যাদের ঈমানের ব্যাপারে মহান আল্লাহই ভালো জানেন।
বিজয়ের শর্তাবলী পালিত না হলে বিজয় আসবে কেন? কার্যকারণ না থাকলে কি কার্য সম্পাদিত হয়? বিবাহের পর মিলন না ঘটলে কি সন্তান হয়? গাছ না লাগিয়ে কি ফল পাওয়া যায়? নিম গাছে কি ডালিম ফল পাওয়ার আশা ভুল নয়? (আয-যিয়াউল লামে' ৩২৭পৃঃ)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
((إِنَّ هَذَا الْأَمْرَ فِي قُرَيْشٍ مَا دَامُوا إِذَا اسْتَرْحَمُوا رَحِمُوا وَإِذَا حَكَمُوا عَدَلُوا وَإِذَا قَسَمُوا أَقْسَطُوا فَمَنْ لَمْ يَفْعَلْ ذَلِكَ مِنْهُمْ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ لَا يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَلَا عَدْلٌ)).
"এই নেতৃত্ব থাকবে কুরাইশদের মাঝে। যতক্ষণ তাদের কাছে দয়া ভিক্ষা করা হলে তারা দয়া করবে, বিচার করলে ইনসাফ করবে, বিতরণ করলে ন্যায়ভাবে করবে। তাদের মধ্যে যে তা করবে না, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশামন্ডলী এবং সমগ্র মানবমন্ডলীর অভিশাপ। তার নিকট থেকে নফল-ফরয কোন ইবাদতই কবুল করা হবে না।" (আহমাদ ১২৯০০, ১৯৫৪১, আবু য়‍্যা'লা ৪০৩২-৪০৩৩, ত্বাবারানী ৭২৪, সিঃ সহীহাহ ২৮৫৮-নং)

ইবনে মাসউদ বলেন, একদা তাঁর হাতে একটি গাছের ডাল ছিল। সেই সময় তিনি কুরাইশকে সম্বোধন ক'রে বললেন,
يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ ! فَإِنَّكُمْ أَهْلُ هَذا الأَمْرِ ، مَا لَمْ تَعْصُوا اللهَ ، فَإِذَا عَصَيْتُمُوهُ، بَعَثَ إِلَيْكُمْ مَنْ يَلْحَاكُمْ كَمَا يُلْحَى هَذَا القَضِيبُ
"হে কুরাইশ! তোমরাই হলে এই নেতৃতত্বের উপযুক্ত; যতদিন তোমরা আল্লাহর অবাধ্যাচরণ না করেছ। সুতরাং যেদিন তোমরা তাঁর অবাধ্যাচরণ করবে, সেদিন তিনি তোমাদের নিকট এমন লোক প্রেরণ করবেন, যে তোমাদেরকে ছিলে দেবেন, যেমন এই ডালকে ছেলা হয়।"
অতঃপর তিনি তাঁর হাতের ডালটির ছাল ছিলে দিলেন এবং তার সাদা শক্ত অংশ বের হয়ে গেল। (আহমাদ ৪৩৮০, সিঃ সহীহাহ ১৫৫২নং)

উক্ত হাদীসটি প্রমাণ করে যে, জাতির বিজয় ও প্রতিষ্ঠা লাভের শর্ত হল অবাধ্যাচরণ ও পাপাচরণ না করা। সে শর্ত মান্য না করা হলে জাতির বিজয়, শাসন-ক্ষমতা ও আধিপত্য হাতছাড়া হয়।
যেমন উক্ত হাদীসটি মহানবী ﷺ-এর নবুঅতের একটি জ্বলন্ত প্রমাণ। যেহেতু তাঁর সেই বাণীর বাস্তব রূপ কুরাইশদের মাঝে প্রকাশ পেয়েছে। কুরাইশদের খিলাফত ও নেতৃত্ব কয়েক শতাব্দী যাবৎ কায়েম ছিল। অতঃপর তারা তাদের প্রতিপালকের অবাধ্যাচরণ করলে এবং নিজেদের খেয়ালখুশীর অনুসরণ করলে তাদের নিকট থেকে ক্ষমতা চলে গেল। মহান আল্লাহ তাদের উপরে অনারব জাতিকে আধিপত্য দিলে তারা তাদের নিকট থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিল। আর তাদের পর থেকেই মুসলিমরা লাঞ্ছিত হতে লাগল। অবশ্য আল্লাহর ইচ্ছায় সে লাঞ্ছনা কোন কোন স্থানে ছিল না।
সুতরাং আজও যদি মুসলিমরা তাদের ইসলামী রাষ্ট্র ও হারানো গৌরব সত্যিই ফিরিয়ে আনতে চায়, তাহলে তাদের উচিত, সর্বাগ্রে মহান প্রতিপালকের নিকট তওবা করা, তাঁর দ্বীনের গন্ডিতে ফিরে আসা এবং তাঁর শরীয়তের নির্দেশ পালন করা। (সিঃ সহীহাহ ৪/৭০)

জুবাইর বিন নুফাইর বলেন, যখন পারস্য জয় হল এবং পারস্যবাসীদের পরিবার পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল এবং তারা একে অন্যের নিকট কাঁদতে লাগল, তখন আমি আবুদ দারদাকে একাকী বসে কাঁদতে দেখলাম। আমি বললাম, 'হে আবুদ দারদা! ইসলাম ও মুসলিমদের বিজয়ের দিনে আপনি কাঁদছেন কেন?' উত্তরে তিনি বললেন, 'ধ্বংস হোক তোমার হে জুবাইর! আল্লাহর নিকট তাঁর সৃষ্টি কত অপদার্থ, যখন তারা আল্লাহর নির্দেশ উপেক্ষা করে! এতদিন তারা একটি প্রবল আধিপত্য বিস্তারকারী জাতি ছিল। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ উপেক্ষা করা ফলে তাদের অবস্থ কী হল তা দেখছ।' (যুহদ, আহমাদ ১৭৬পৃঃ)

আবুদ দারদা -এর উক্ত বাণী মুসলিম উম্মাহ'র বর্তমান লাঞ্ছনা ও দুর্দশার কারণ সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে আলোকপাত করে। উম্মাহ যখন মহান প্রতিপালকের নির্দেশ অগ্রাহ্য করল, তখন এই শতধা বিচ্ছিন্ন অবস্থা, গৃহদ্বন্দ্ব ও লাঞ্ছনার শিকার হয়ে গেল। (আষারুয যুনুব ফী হাদমিল উমামি অশ-শুউব ৬২পৃঃ)

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 ইলম অর্জনে পাপের প্রভাব

📄 ইলম অর্জনে পাপের প্রভাব


দ্বীনী ইলমের উত্তম সহায়ক হল আল্লাহর তাক্বওয়া ও পরহেযগারী। আর তার মানেই যথাসাধ্য শরয়ী আদেশ মান্য করা এবং সকল প্রকার নিষেধ বর্জন করা। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَاتَّقُوا اللَّهَ وَيُعَلِّمُكُمُ اللَّهُ }
অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহর তাক্বওয়া অবলম্বন কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে ইল্ম দান করবেন। (বাক্বারাহঃ ২৮২)

পক্ষান্তরে ইল্ম থেকে বঞ্চনার সবচেয়ে বড় কারণ হল পাপাচরণ। ইল্ম অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হল আল্লাহর অবাধ্যাচরণ।
বহু তালেবে-ইল্ম স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার অভিযোগ করে। কত শোনে, কিন্তু কিছু মনে থাকে না। কত পড়ে, কিন্তু ভুলে যায়। অথচ তারা হয়তো জানে না যে, এটা তাদের জন্য মহান প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এক প্রকার সত্বর শাস্তি। তাদের কোন কৃত পাপের শাস্তি।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, বুদ্ধিমত্তায় সকল মানুষ সমান নয়। কারো বুদ্ধি তীক্ষ্ণ, কারো ভোঁতা। কারো বেশি, কারো কম। আর তা মানুষের মাঝে তিনিই বন্টন করেছেন, যিনি সকলের রুযী বন্টন করেছেন। তবুও নিজ কর্মদোষে মানুষ যেমন বহু রুযী থেকে বঞ্চিত হয়, তেমনি নিজ পাপাচরণের কারণে অনেক ইল্ম থেকেও বঞ্চিত হয়। এই বয়সে বিশেষ ক'রে যৌন-জীবন সংক্রান্ত পাপে গুপ্তভাবে জড়িত থেকে বহু ছাত্র-ছাত্রী নিজেদের স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল ক'রে ফেলে।

ইল্মের জন্য অন্তরকে যদি বিশুদ্ধ করা যায়, তাহলে ইল্ম বৃদ্ধি পায় এবং তার বর্কত প্রকাশিত হয়। যেমন কোন জমিকে যদি চাষের জন্য ঘাস, আগাছা ইত্যাদি থেকে পরিষ্কার করে উপযুক্ত করা হয়, তবে তার ফল-ফসল বৃদ্ধিলাভ ক'রে থাকে। রসূল বলেন, "জেনে রেখো, দেহের মধ্যে একটি পিন্ড আছে; যা সংশোধিত হলে সারা দেহ সংশোধিত হয় এবং তা বিকারগ্রস্ত হলে সারা দেহ বিকারগ্রস্ত হয়ে যায়। জেনে রেখো, তা হল হৃৎপিন্ড (বা হৃদয়)।" (বুখারী ও মুসলিম)
সাহল বলেন, 'সেই হৃদয়ে (ইলমী) নূর প্রবেশ করা অসম্ভব যে হৃদয়ে এমন বস্তু অবশিষ্ট থাকে, যা আল্লাহ আয্যা অজাল্ল অপছন্দ করেন।' (তাযকিরাতুস সা-মে' ৬৭ পৃঃ)

সুতরাং তালেবে ইলমের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করা একান্ত আবশ্যক। তওবা ও অনুশোচনার সাথে আল্লাহর অভিমুখী হয়ে পাপ ও অন্যথাচরণ হতে প্রত্যাবর্তন করা নিতান্ত জরুরী। যেহেতু পাপ ও অবাধ্যতায় এমন কুপ্রভাব আছে, যাতে ইল্ম থেকে বঞ্চিত হতে হয় অথবা তার বর্কত উঠে যায়।
ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বলেন, 'পাপাচরণের নিকৃষ্ট ও নিন্দিত প্রভাব আছে, যা অন্তর ও দেহের পক্ষে ইহ-পরকালে এতই অপকারী যে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। তন্মধ্যে ইল্ম থেকে বঞ্চিত হওয়া অন্যতম। যেহেতু ইল্ম একপ্রকার নূর (জ্যোতি) যা আল্লাহ তাআলা মানুষের হৃদয়ে প্রক্ষেপ ক'রে থাকেন। আর পাপাচরণ ঐ জ্যোতিকে নির্বাপিত করে ফেলে।'

একদা ইমাম শাফেয়ী ইমাম মালেকের সম্মুখে পড়তে বসলে ইমাম মালেক তাঁর সজাগ বুদ্ধিমত্তা, মেধার ঔজ্জ্বল্য এবং উপলব্ধির পরিপূর্ণতা দেখে বিস্মিত হয়ে বললেন, 'আমি দেখছি যে, আল্লাহ তোমার হৃদয়ে নূর প্রক্ষিপ্ত করেছেন। অতএব তা পাপাচরণের অন্ধকার দ্বারা নিভিয়ে দিয়ো না।'
ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন,
شكوت إلى وكيع سوء حفظى + فأرشدني إلى ترك المعاصي
وأخبرني بأن العلم نور + ونور الله لا يهدى لعاصي
'আমি আমার ওস্তাদ অকী'র নিকট আমার মুখস্থশক্তি দুর্বল হওয়ার অভিযোগ করলাম। তিনি আমাকে পাপাচরণ পরিহার করতে নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, 'জেনে রেখো, ইল্ম আল্লাহর তরফ হতে আসা (অনুগ্রহ বা) নূর। আর আল্লাহর (অনুগ্রহ বা) নূর কোন পাপিষ্ঠকে দেওয়া হয় না।' (আল-জাওয়াবুল কাফী ৫৪ পৃঃ)

আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ)
অর্থাৎ, আল্লাহ অবশ্যই কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না; যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে। (রা'দঃ ১১)

তিনি আরো বলেন,
كلا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ )
অর্থাৎ, কক্ষনো না। ওদের কৃতকর্মের ফলেই ওদের হৃদয়ে জং ধরে গেছে। (মুত্বাফফিফীন: ১৪)

ইবনুল জওযী (রঃ) বলেন, আব্দুল্লাহ বিন জালা' হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি এক খ্রিস্টান সুবদন কিশোরের প্রতি তাকিয়ে ছিলাম। এমন সময় আবু আব্দুল্লাহ বালখী আমার নিকট বেয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি আমার উদ্দেশ্যে বললেন, 'কেন দাঁড়িয়ে আছ এখানে?' আমি বললাম, 'চাচাজী! আপনি কি ঐ রূপ দেখছেন না? কীভাবে ওকে অগ্নিদগ্ধ করা হবে?' তা শুনে তিনি তাঁর হাত আমার কাঁধে মেরে বললেন, 'এর প্রতিফল তুমি পাবেই, যদিও কিছু বিলম্বে।' তিনি বলেন, 'আমি তার প্রতিফল ৪০ বছর পর পেলাম; আমাকে কুরআন ভুলিয়ে দেওয়া হল।'

আবু আইয়ান বলেন, আমি আমার ওস্তায আবুবকর দাক্কাকের সাথে ছিলাম। ইতিমধ্যে এক কিশোর পার হয়ে যাচ্ছিল। আমি তার দিকে তাকিয়ে ফেললাম। আমার ওস্তায আমাকে ওর প্রতি তাকিয়ে থাকতে দেখলে তিনি আমাকে বললেন, 'বেটা! এর প্রতিফল তুমি পাবে---যদিও কিছু পরে।' অতঃপর আমি ২০ বছর ধরে লক্ষ্য করেও ঐ প্রতিফল বুঝতে পারলাম না। একদা রাত্রিকালে ঐ কথা চিন্তা করে ঘুমিয়েছি। সকালে জাগ্রত হয়ে দেখি আমাকে কুরআন বিস্মৃত করা হয়েছে। (তালবীসে ইবলীস ৩১০ পৃঃ)

এ তো সুদর্শন কিশোর দেখার প্রতিফল। তাহলে সুবদনা ও সুদর্শনা কিশোরী ও যুবতী দেখলে এবং তাদের সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করলে তার প্রতিফল কী? নেট বা মেমোরির মাধ্যমে নোংরা ছবি দেখলে তার কুফল কী?
মনের মণিকোঠা যদি বাজে চিন্তা, যৌন ও অশ্লীল কল্পনা এবং কোন অবৈধ নারী-প্রেমের মৃদু পরশ থেকে মুক্ত ও পবিত্র না হয় তাহলে সফলতার আশা নেই। প্রেমের আবেগে পড়ে ধ্বংস হবে জীবনের বহু মূল্যবান সময়, অবাস্তব কল্পনাবিহারে নষ্ট হবে সুন্দর ও স্বচ্ছ স্মৃতি ও বুঝশক্তি। আর কামনার দহন ও দংশনে নিপীড়িত হবে সুস্বাস্থ্য। ফলে উপর-পড়া ঐ সতীনের ঈর্ষায় ইল্ম যে তালেবের নিকট থেকে 'খোলা তালাক' নিয়ে বিদায় নেবে তা বলাই বাহুল্য।

আবু হামেদ বলেন, যদি তুমি বল যে, 'কত অসৎচরিত্রের তালেবে ইল্ম ইল্ম অর্জন করেছে। (বড় আলেম হয়েছে) তাহলে?' কিন্তু প্রকৃত উপকারী, পরকালে ফলপ্রদ এবং সৌভাগ্য আনয়নকারী ইল্ম থেকে তারা বহু দূরে। যেহেতু এই ইলমের অগ্রভাগে সেই মন-মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হবে, যাতে তালেবে ইল্ম পাপাচরণকে সর্বনাশী ও সর্বহারী হলাহল জানবে। অথচ তুমি কি দেখেছ যে, প্রাণহারী গরল জানা সত্ত্বেও কেউ তা ভক্ষণ করছে? তুমি যা ঐ শ্রেণীর আলেমদের নিকট থেকে শুনে থাক, তা তো মুখের কথামাত্র, যা ওরা কখনো তাদের জিহ্বা দ্বারা শোভন ক'রে প্রকাশ ক'রে থাকে। আবার কখনো তাদের অন্তর দ্বারা তা প্রত্যাখ্যান ক'রে থাকে। আর তা ইল্মের কোন অংশই নয়।
ইবনে মাসউদ বলেন, 'অধিক রেওয়ায়েত (বর্ণনা করা) ই ইল্ম নয়। ইল্ম তো এক জ্যোতি যা হৃদয়ে প্রক্ষিপ্ত হয়।'

অনেকে বলেন, ইল্ম তো আল্লাহভীতির নাম। যেহেতু আল্লাহ তাআলা বলেন,
{إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاء} (২৮) سورة فاطر
"আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে ওলামাগণই তাঁকে ভয় করে থাকে।" (সূরা ফাতির: ২৮, আরো দ্রঃ দ্বীনী ইলমের নৈতিকতা)

আমের শা'বী বলেন, 'আমি বাজারে গেলে কানে আঙ্গুল রেখে নিই, যাতে লোকেদের শব্দ আমার স্মৃতিস্থ না হয়ে যায়।'
যেহেতু তিনি ছিলেন ইল্মের এক মহান ব্যক্তিত্ব। তিনি আল্লাহকে ভয় করতেন, তাক্বওয়ার সাথে আল্লাহর পথ চলতেন। তাই তিনি আল্লাহর ইল্ম লাভের অধিকারী হয়েছিলেন।
মহান আল্লাহ ইয়াহুদীদের ব্যাপারে বলেছেন,
{ وَنَسُوا حَظًّا مِّمَّا ذُكِّرُوا بِهِ} (১৩) سورة المائدة
"এবং তারা যা উপদিষ্ট হয়েছিল তার একাংশ ভুলে গেছে।" (মায়িদাহঃ ১৩)
এর ব্যাখ্যায় অনেকে বলেছেন, তারা ইল্ম ভুলে গিয়েছিল। তারা যখন মহান আল্লাহর অবাধ্যাচরণ করল এবং নিষিদ্ধ জিনিস দর্শন করল, তখন ইল্ম বিস্মৃত হল।

বলা বাহুল্য, যদি কোন ছাত্র নগ্ন মহিলা দেখে, কারো প্রেমে ফাঁসে, সেক্সী ছবি দেখে বা বই পড়ে, অবৈধ গান-বাজনা শোনাতে অভ্যস্ত হয়, ফাসেকদের সাথে ওঠা-বসা করে, নামাযে কুঁড়েমি ও আলস্য থাকে, আল্লাহর যিকক্রে ঔদাস্য থাকে, দুনিয়াদারী চিন্তায় মগ্ন থাকে, পরচর্চা ও গীবতে তৃপ্তি লাভ করে, মিথ্যা কথা বলার অভ্যাসি হয়, আত্মমুগ্ধ ও অহংকারী হয় অথবা হিংসুক ও পরশ্রীকাতর হয়, তাহলে সে কি ইলমের মতো মানিক লাভে ধন্য হতে পারে?
কখনই না। ইল্ম হল আলো। আর পাপের অন্ধকারে সে আলো বিলীন হয়ে যায়। স্মৃতির আধারকে পাপচিন্তার আঁধার আচ্ছাদিত ক'রে ফেলে। ফলে মুখস্থ ও ঠোঁটস্থ করা পাঠ অতি সহজে ভুলে যায় পাপী।
কত হাফেয সাহেবকে দেখবেন, পাপাচরণ ও দুনিয়াদারী চিন্তায় নিমজ্জিত হওয়ার ফলে কুরআন ভুলে বসে থাকে। পরন্তু এমনিতেই কুরআন তো রশি খোলা উটের মতো। খেয়াল না রাখলে ফাঁকি দিয়ে স্মৃতির আস্তাবল থেকে পলায়ন করে।

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'মহান আল্লাহ পাপের শাস্তি স্বরূপ যা কিছু নির্ধারণ করেছেন, তার মধ্যে আছে, হিদায়াত, ইল্ম ছিনিয়ে নেওয়া।' (মাজমুউ ফাতাওয়া ১৪/১৫২)

যাহহাক বিন মুযাহিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'যে ব্যক্তিই কুরআন হিফ্য করার পর তা ভুলে যায়, সে ব্যক্তিই কোন পাপের প্রতিফল পেয়ে তা ভুলে যায়। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِير} (٣٠) الشورى
"তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে, তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তিনি ক্ষমা ক'রে দেন।" (শূরাঃ ৩০) আর কুরআন ভুলে যাওয়া এক মহা বিপদ।' (যুহদ, ইবনুল মুবারাক ৮৫নং)

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 রুযী উপার্জনে পাপের প্রভাব

📄 রুযী উপার্জনে পাপের প্রভাব


পাপাচরণের ফলে বান্দা অনেক রুযী থেকে বঞ্চিত হয়। যেমন তাক্বওয়ার ফলে অনেক বান্দা রুযী লাভ ক'রে থাকে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقُواْ لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِن كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُم بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ} (٩٦) سورة الأعراف
"আর যদি জনপদের অধিবাসীবৃন্দ বিশ্বাস করত ও সাবধান হত, তাহলে তাদের জন্য আমি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর কল্যাণ-দ্বার উন্মুক্ত ক'রে দিতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা মনে করল। ফলে তাদের কৃতকর্মের জন্য আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম।" (আ'রাফঃ ৯৬)

{وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا (۲) وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ} (۳) الطلاق
"আর যে কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার নিষ্কৃতির পথ ক'রে দেবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে রুযী দান করবেন।" (ত্বালাক্বঃ ২-৩)

যদি কেউ বলে, তাহলে কাফের ও ফাসেকরা এত সুখী কেন? তারা এত শত পাপ করা সত্ত্বেও রুযী পায় কেন?
তাহলে তার উত্তর হল, মহানবী-এর বাণী,
তিনি বলেছেন,
(( لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ الله جَنَاحَ بَعُوضَةٍ ، مَا سَقَى كَافِراً مِنْهَا شَرْبَةَ مَاءٍ )).
"যদি আল্লাহর নিকট মশার ডানার সমান দুনিয়ার (মূল্য বা ওজন) থাকত, তাহলে তিনি কোন কাফেরকে তার (দুনিয়ার) এক ঢোক পানিও পান করাতেন না।" (তিরমিযী ২৩২০, ইবনে মাজাহ ৪১১০, মিশকাত ৫১৭৭ নং)

তাছাড়া মহান আল্লাহর এক চিরন্তন রীতি হল, তিনি অবাধ্যাচারীদেরকে ঢিল দিয়ে থাকেন। মহানবী বলেছেন,
إِذَا رَأَيْتَ اللهَ يُعطِي العَبدَ مِنَ الدُّنْيَا عَلَى مَعَاصِيهِ مَا يُحِبُّ، فَإِنَّمَا هُوَ اسْتِدْرَاجُ
"যদি দেখ, পাপ করা সত্ত্বেও আল্লাহ বান্দাকে তার ইচ্ছামতো (সুখ-সমৃদ্ধি) দান করছেন, তাহলে তা আসলে ঢিল দেওয়া।" অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন,
{فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى إِذَا فَرِحُوا بِمَا أُوتُوا أَخَذْنَاهُم بَغْتَةً فَإِذَا هُم مُّبْلِسُونَ} (٤٤) سورة الأنعام
"তাদেরকে যে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল, তারা যখন তা বিস্মৃত হল, তখন তাদের জন্য সমস্ত কিছুর দ্বার উন্মুক্ত ক'রে দিলাম, অবশেষে তাদেরকে যা দেওয়া হল, যখন তারা তাতে মত্ত হল, তখন অকস্মাৎ তাদেরকে পাকড়াও করলাম। ফলে তখনই তারা নিরাশ হয়ে পড়ল।" (আনআম: ৪৪, আহমাদ ৪/১৪৫, সিঃ সহীহাহ ৪১৩নং)

অর্থাৎ, তারা যখন তাদের সুস্থতা, নিরাপত্তা, ধন-সম্পদ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ইত্যাদি নিয়ে গর্বমূলক আনন্দিত ছিল, তখনই মহান প্রতিপালক তাদেরকে পাকড়াও করলেন। আর "নিশ্চয় তাঁর পাকড়াও যন্ত্রণাদায়ক কঠিন।" (হৃদঃ ১০২) আর অকস্মাৎ পাকড়াও কঠিনই হয়, যেহেতু তাতে অপরাধীরা অপ্রস্তুত থাকে।

যারা পাপী নয়, তাদের রুযী ও সুখ-সমৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য না হলেও তারা সুখী। রুযী যথেষ্ট পরিমাণের হলে সেটাই কাম্য। "যথেষ্ট অল্প রুযী অপর্যাপ্ত উদাসকারী রুযী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।" এ কথা হাদীসে এসেছে। (আহমাদ ৫/১৯৭, সঃ তারগীব ১৭৬০নং)

বলা বাহুল্য, কত শত ধনাঢ্য ব্যক্তির ধন তাকে সুখ দিতে পারেনি। যেহেতু এমন ধনদাসদের সাথে থাকে, নিরন্তর দুশ্চিন্তা, অবিরাম ক্লান্তি এবং অন্তহীন আক্ষেপ। যেহেতু মানুষের ধন-তৃষ্ণা মিটতে চায় না। পিপাসায় শরবত পান করার মতো মনে তৃপ্তি আসে না। মহানবী বলেছেন,
(( لَوْ أَنَّ لابن آدَمَ وَادِياً مِنْ ذَهَبٍ أَحَبَّ أَنْ يَكُونَ لَهُ وَادِيانِ ، وَلَنْ يَمْلأَ فَاهُ إِلَّا التُّرَابُ ، وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ تَابَ )). مُتَّفَقٌ عليه
"আদম সন্তানের মালিকানায় যদি সোনার একটি উপত্যকাও হয়, তবুও সে অনুরূপ আরো একটির মালিক হওয়ার অভিলাষী থাকবে। পরন্তু একমাত্র মাটিই আদম সন্তানের চোখ (পেট) পূর্ণ করতে পারে। অবশ্য যে ব্যক্তি তওবা করবে, আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করবেন।" (বুখারী ৬৪৩৭, মুসলিম ২৪৬২নং)

পক্ষান্তরে কত শত মানুষ আছে, যারা ধনী নয়, কিন্তু অত্যন্ত সুখী। মহানবী ﷺ বলেছেন,
((مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمْ آمِنًا فِي سِرْبِهِ مُعَافَى فِي جَسَدِهِ عِنْدَهُ قُوتُ يَوْمِهِ فَكَأَنَّمَا حِيزَتْ لَهُ الدُّنْيا بحذافيرها)).
"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার ঘরে অথবা গোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপদে ও সুস্থ শরীরে সকাল করেছে এবং তার কাছে প্রতি দিনের খাবার আছে, তাকে যেন পার্থিব সমস্ত সম্পদ দান করা হয়েছে।" (তিরমিযী ২৩৪৬, ইবনে মাজাহ ৪১৪১নং)

আরবী কবি হুত্বাইআহ বলেছেন,
وَلَكِنَّ التَّقِيَّ هُوَ السَّعِيدُ
وَلَستُ أَرَى السَّعَادَةَ جَمْعَ مَالَ ... وتقوَى اللَّهِ خَيْرُ الزَّادِ ذُخِرًا ... وَعِندَ اللَّهِ لِلأَتْقَى مَزِيدُ
অর্থাৎ, ধন সঞ্চয়ে সুখ আছে বলে মনে করি না। আসলে মুত্তাক্বী ব্যক্তিই হল প্রকৃত সুখী। সঞ্চয়ে আল্লাহর তাক্বওয়া হল উত্তম সম্বল। আর আল্লাহর নিকট মুত্তাক্বীর জন্য আছে আরো বেশি।
পক্ষান্তরে পাপী ধনী সুখী নয়। কোন মানুষের জন্য দুটি হাতে তিনটি ফুটবল রাখা সম্ভব নয়। তদনুরূপ একটি মানুষের ভিতরে সুস্বাস্থ্য, ধন ও মানসিক শান্তি একই সঙ্গে থাকতে পারে না। সাধারণতঃ পাপীরা ধন পায়, কিন্তু সুখ পায় না। কিন্তু সৎ লোকেরা ধন না পেলেও মানসিক সুখ পেয়ে ধন্য হয়。

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 বরকত নষ্টে পাপের প্রভাব

📄 বরকত নষ্টে পাপের প্রভাব


অনেক মানুষ আছে, যারা নিজের পায়ে কুড়ুল মারে। অপরের নেমকহারামি ক'রে নিজের স্বার্থ নষ্ট করে। যে দেয়, তার অবাধ্যাচরণ করলে, সে কি আর দেবে? পালনকর্তার অবাধ্যাচরণ করলে তিনি কি দান-প্রতিদানের ইচ্ছা রাখবেন?
পাপাচরণের ফলে মানুষ রুযী থেকে বঞ্চিত হয়, রুযী পেলেও তার বর্কত থেকে বঞ্চিত হয়। দীর্ঘায়ু লাভ করলেও তাতে কোন বর্কত থাকে না। বড় আলেম হলেও ইলমের বর্কত তুলে নেওয়া হয়। বড় কাজী হলেও কাজের বর্কত ছিনিয়ে নেওয়া হয়। বিশাল টাকার মালিক হলেও টাকার বর্কত উঠিয়ে নেওয়া হয়।
পাপী মানুষের দ্বীন-দুনিয়ার বর্কত তুলে নেওয়া হয়। না তার দ্বীনী কাজের বর্কত থাকে, আর না তার দুনিয়ার কাজে। ফল-ফসল থেকে বর্কত তুলে নেওয়া হয়, যদিও তা দেখতে প্রচুর। গবাদি পশু ও পানির মাছের বর্কত চলে যায় আদম সন্তানের কৃত পাপের জন্য। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقُوا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِن كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُم بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ} (٩٦) سورة الأعراف
"যদি জনপদের অধিবাসীবৃন্দ বিশ্বাস করত ও সাবধান হত, তাহলে তাদের জন্য আমি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর কল্যাণ-দ্বার উন্মুক্ত ক'রে দিতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা মনে করল। ফলে তাদের কৃতকর্মের জন্য আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম।" (আ'রাফঃ ৯৬)

{وَأَلَّو اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُم مَّاء غَدَقًا } (١٦) سورة الجن
"আর এই যে, তারা যদি সত্য পথে প্রতিষ্ঠিত থাকত, তাহলে তাদেরকে আমি অবশ্যই প্রচুর পানি পান করাতাম।" (জ্বিনঃ ১৬)

হারাম উপায়ে বহু রুযী উপার্জন করা যায়, কিন্তু তাতে বর্কত থাকে না। মহান রুযীদাতা হারাম রুযীতে বর্কত দেন না। মহানবী বলেছেন,
((إِنَّ رُوحَ القُدُسِ نَفَتَ فِي رُوعِي أَن نَفْساً لنْ تَمُوتَ حَتَّى تَسْتَكْمِلَ أَجَلَهَا وَتَسْتَوْعِبَ رزْقَهَا فَاتَّقُوا الله وأجْمِلُوا في الطَّلب ولا يَحْمِلُنَّ أَحَدَكُمُ اسْتِبْطاءُ الرِّزْقِ أَنْ يَطْلُبَهُ بِمَعْصِيَةِ الله فإن الله تعالى لا يُنالُ ما عِنْدَهُ إِلا بِطاعَتِهِ)).
"জিবরীল আমার হৃদয়ে প্রক্ষিপ্ত করেছেন যে, কোন আত্মই তার ভাগ্যে নির্ধারিত সর্বশেষ আয়ু ও রুযী পূর্ণ না করা পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং রুজী সন্ধানে মধ্যবর্তী পন্থা (সুন্দর ও স্বাভাবিক বৈধ পথ) অবলম্বন কর। রুযী আসতে দেরী দেখে তোমাদের কেউ যেন আল্লাহর অবাধ্য হয়ে তার সন্ধানে উদ্বুদ্ধ না হয়। যেহেতু (রুযী আল্লাহর হাতে আর) তা তাঁর বাধ্য না হয়ে অর্জন করা যায় না।" (হিল্‌ইয়াহ ১০২৭, সহীহুল জামে' ২০৮৫নং)

অর্থ-সম্পদ ও ফল-ফসল বাহ্যতঃ প্রচুর থাকলেই তা প্রাচুর্যের নিদর্শন নয়। প্রাচুর্যের নিদর্শন হল তাতে বর্কত হওয়া, একটা হলেও এক শতের কাজ করা। অনুরূপ কেউ দীর্ঘজীবী হলেই তা উপকারী হয় না, অল্প আয়ু পেয়েও বহু মানুষ মরেও অমর থাকে। বহু মানুষ অনেকের জন্য অনেক কিছুর জন্য অনেক কিছু করে, কিন্তু যে একমাত্র মহান প্রতিপালকের জন্য কিছু করে, তাই হয় অনেক কিছু।

ইবনুল কাইয়েম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'আল্লাহর অবাধ্যাচরণ রুযী ও আয়ুর বর্কত নিশ্চিহ্ন হওয়ার কারণ এই যে, শয়তান পাপ ও পাপীদের কাজে নিযুক্ত থাকে। সুতরাং তাদের উপর তার আধিপত্য থাকে। তাই প্রত্যেক সেই জিনিস, যার সাথে শয়তান মিলিত আছে, সে জিনিসের বর্কত বিলুপ্ত। আর প্রত্যেক সেই জিনিস, যা আল্লাহর জন্য নয়, তার বর্কত বিনাশিত।' (আদ্‌-দাউ অদ্‌-দাওয়া ১৩১- ১৩২পৃঃ)

যে সময়কে মু'মিন আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করে, সেই সময় তার জন্য মুবারক বা বর্কতময়। আর যে সময়কে সে আল্লাহর অবাধ্যাচরণে ব্যয় করে, তা তার জন্য বর্কতছিন্ন। সুতরাং বর্কতছিন্নতার মূল হল মহান আল্লাহর অবাধ্যাচরণ। (লাত্মাইফুল মাআরিফ ১৫১পৃঃ) পক্ষান্তরে প্রাচুর্য ও বর্কত হল মহান আল্লাহর আনুগত্য ও তাক্বওয়ার কাজ।

অকৃতজ্ঞতা এক পাপ, আর সেই পাপের কারণে নেয়ামতের বর্কত চলে যায় এবং অকৃতজ্ঞ নেমকহারামদের সেই নেয়ামত ধ্বংস করা হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ} (۷)
"যখন তোমাদের প্রতিপালক ঘোষণা করেছিলেন, তোমরা কৃতজ্ঞ হলে তোমাদেরকে অবশ্যই অধিক দান করব, আর অকৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমার শাস্তি হবে কঠোর।" (ইব্রাহীমঃ ৭)

{ وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلاً قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُّطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّن كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ اللَّهِ فَأَذَاقَهَا اللَّهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ} (۱۱۲)
"আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসত সর্বদিক হতে প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল; ফলে তারা যা করত, তার জন্য আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ।" (নাহলঃ ১১২)

কোন কোন অবাধ্যাচরণের জন্য ব্যবসায়ীর ব্যবসার বর্কত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মহানবী বলেছেন,
البيعان بالخيَارِ مَا لَمْ يَتَفَرَّقَا ، فَإِنْ صَدَقا وَبَيَّنَا بُوركَ لَهُمَا في بيعهما ، وإِنْ كَتَمَا وَكَذْبَا مُحِقَتْ بركَةُ بَيعِهما)). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত (চুক্তি পাকা বা বাতিল করার) স্বাধীনতা রয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা পৃথক (বিক্রয়-স্থল হতে স্থানান্তরিত) না হবে। আর যদি তারা সত্য কথা বলে এবং (পণ্যদ্রব্যের প্রকৃতত্ব) খুলে বলে, (দোষ-ত্রুটি গোপন না রাখে, তাহলে তাদের কেনা-বেচার মধ্যে বর্কত দেওয়া হয়। আর তারা যদি (দোষ-ত্রুটি) গোপন রাখে এবং মিথ্যা বলে, তাহলে তাদের দু'জনের কেনা-বেচার বর্কত রহিত করা হয়।" (বুখারী ২০৭৯,২১১৪, মুসলিম ৩৯৩৭, আবুদাউদ ৩৪৫৯, তিরমিযী ১২৪৬নং, নাসাঈ)

তিনি আরো বলেছেন,
(( الْحَلِفُ مُنَفِّقَةٌ لِلسِّلْعَةِ مُمْحِقَةٌ لِلْبَرَكَةِ)). وفي رواية مسلم : ( الْحَلِفُ مَنْفَقَةً لِلسِّلْعَةِ مَمْحَقَةٌ لِلربح ..
"হলফ পণ্য দ্রব্য অধিক (চালু) বিক্রয় করে, (কিন্তু) বর্কত বিনষ্ট করে। (বুখারী ২০৮৭, মুসলিম ৪২০৯নং)

إِيَّاكُمْ وَكَثْرَةَ الْحَلِفِ فِي الْبَيْعِ فَإِنَّهُ يُنَفِّقُ ثُمَّ يَمْحَقُ ..
"তোমরা ব্যবসায় অধিক কসম খাওয়া থেকে দূরে থাক, কারণ তা পণ্য দ্রব্য অধিক চলতি করে। অতঃপর (তার বর্কত বা লাভ) ধ্বংস করে।" (মুসলিম ৪২ ১০নং)

এইভাবে এক একটি পাপ এক এক শ্রেণীর বর্কত তুলে নেয়। সুতরাং পাপ ক'রে পাপী নিজেরই ক্ষতি করে। তাই সাধু সাবধান!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00