📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 পারিবারিক জীবনে পাপের প্রভাব

📄 পারিবারিক জীবনে পাপের প্রভাব


পিতামাতা ও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে পরিবার গঠিত হয়। এ পরিবারের সুখ নিশ্চিত করেছে ইসলাম। সংসারের নানা পদক্ষেপে মতভেদ অস্বাভাবিক নয়। তবে তাতে কলহ-বিবাদ করা নিশ্চয় ইসলাম পছন্দ করে না।
সংসারের সকলেই যদি পাপ ও অবাধ্যাচরণ থেকে বিরত থাকতে পারে, তাহলেই সে সংসার সুখী সংসার হয়। নচেৎ তাদের সে ঘরে সুখ-পাখী বাসা বাঁধে না।
পরিবারের সকলেই পাপ বর্জন না করলে শান্তি আসে না। উদাহরণ স্বরূপ ট্রাফিক-রুলসের কথা ভাবতে পারেন। সকল ড্রাইভার যদি সে সব রুল মেনে গাড়ি না চালায়, তাহলে দুর্ঘটনা এড়ানো মোটেই সম্ভব হয় না।
পিতামাতা যদি সন্তানের তরবিয়তে ইসলামের নিয়ম-নীতির অনুসরণ না করে, সন্তান যদি পিতামাতার অবাধ্যাচরণ বর্জন না করে, স্বামী যদি স্ত্রীর ব্যাপারে ইসলামী বিধি-বিধান মান্য না করে, স্ত্রী যদি স্বামীর অবাধ্যাচরণ থেকে বিরত না হয়, তাহলে বলুন, কীভাবে সে পরিবারের বাগানে সুখের ফুল ফুটবে?
পিতা বা মাতার অথবা উভয়ের পাপের ফলে সন্তানরা ছন্নছাড়া হয়।
ছেলে অথবা মেয়ে পাপের আগুন টেনে এনে সুখের সংসারকে ভষ্মীভূত করে।
মহান আল্লাহর মীরাস-বন্টনে পাপময় হস্তক্ষেপ হলে বিদ্বেষ ও কলহের ঝড় আসে।
সাংসারিক কাজকর্ম বা জমি-জায়গা নিয়ে ভাইয়ে-ভাইয়ের দ্বন্দ্ব সংসারকে রণক্ষেত্রে পরিণত করে।
গৃহস্থালি কাজ নিয়ে শাশুড়ী-বউয়ের কলহে সংসার জাহান্নামে পরিণত হয়। কোন সংসারে চলে বধূ-নির্যাতন, কোন সংসারে চলে শ্বশুর-শাশুড়ী-নিগ্রহ। মেনে ও মানিয়ে চলার পদ্ধতি না মানার ফলে সুখের ফুলবাগানে দুঃখের তুফান আসে।
নিশ্চয় তাদের কোন না কোন পাপ থাকে, কোন অবাধ্যাচরণ ও ঔদ্ধত্য থাকে, কোন হঠকারিতা বা হিংসা থাকে।
কোন সংসারে অবৈধ সম্পর্কের জেরে অশান্তির সর্বনাশী তুফান আসে। ব্যাপক ধ্বংস-লীলা চালিয়ে দূর থেকে ভ্রূকুটি হানে। পাপের দাপটে পুণ্যের সংসার কম্পাসহীন জলজাহাজের মতো মাঝ সমুদ্রে ভাসতে থাকে।
তাই তো ইসলামের নির্দেশ এলো পরিবারের প্রধানের কাছে, তাকেই বলা হল,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ} (৬) سورة التحريم
"হে মু'মিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর অগ্নি হতে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম-হৃদয়, কঠোর-স্বভাব ফিরিস্তাগণ, যারা আল্লাহ যা তাদেরকে আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং তারা যা করতে আদিষ্ট হয়, তাই করে। (তাহরীমঃ ৬)

আল্লাহর রসূল বলেন,
((إِنَّ اللَّهَ سَائِلٌ كُلَّ رَاعٍ عَمَّا اسْتَرْعَاهُ ، حَفِظَ ذَلِكَ أَمْ ضَيَّعَ ، حَتَّى يَسْأَلَ الرَّجُلَ عَنْ أَهْلِ بَيْتِهِ)).
"আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক রক্ষককে তার রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে এবং প্রত্যেক তত্ত্বাবধায়ক ও অভিভাবককে তার তত্ত্বাবধান ও অভিভাবকত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন। যথার্থই কি তারা তাদের কর্তব্য পালন করেছে, নাকি অবহেলা হেতু তা বিনষ্ট করেছে?" (নাসাঈ ৯১৭৪, ইবনে হিব্বান ৪৪৯২, সঃ জামে' ১৭৭৪নং)

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 পরীক্ষাগারে অপরাধের প্রভাব

📄 পরীক্ষাগারে অপরাধের প্রভাব


যাঁরা স্কুল-মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন, তাঁদের পরীক্ষার অভিজ্ঞতা আছে অল্প-বিস্তর। পরীক্ষা দিতে যেন মন চায় না। পরীক্ষাগারে গিয়ে মন আতঙ্কিত থাকে। পাশ-ফেলের টানাপোড়েনে মন দগ্ধিত হয়। যে ছাত্ররা পরীক্ষার আগে মেহনত করে, তারা কিন্তু তত আতঙ্কিত হয় না। বেশি আতঙ্কিত হয় পড়াশোনাতে ফাঁকিবাজরা। তাদের মধ্যে কেমন যেন অস্থিরতা থাকে। প্রশ্নপত্র হাতে আসতে তাদের প্রাণ যেন পানিশূন্য হয়ে যায়, ঠোঁট শুকিয়ে যায়, হাত কাঁপতে লাগে। ফেল হওয়ার ভয়ে পাশ করার ফন্দি আঁটে। তারা অপরাধী। মেহনত না করে তারা চিরকুট করে। পরের দেখে নকল করতে চায়। পরীক্ষককে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে। ঘুস দিতে চেষ্টা করে। হুমকি দেয়, ধমকি দেয়। গন্ডগোল বাধায়, ভাঙচুর চালায়। পরিশেষে তার খাতাটি ক্যান্সিল হয়। পরীক্ষার হল থেকে সে বহিষ্কৃত হয়। তার ভাগ্যে 'ফেল' থাকে অবধার্য।

এ পৃথিবী আমাদের আসল ঠিকানা নয়। আমাদের আসল ঠিকানা হল জান্নাত। আমাদের আদি পিতামাতা জান্নাতের বাসিন্দা, বেহেশতের নাগরিক। মহান আল্লাহ আবার আমাদেরকে সেই বেহেশতে পুনরায় বাস করার অধিকার দান করবেন। তবে তিনি আমাদের পরীক্ষা নেবেন। সেই পরীক্ষায় যারা পাশ করবে, কেবল তাদেরকেই তাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেবেন। তাঁর পরীক্ষায় ফেল করলে অন্য রাজ্যের নাগরিক বানাবেন।
পৃথিবীর এ পরীক্ষাগারে বহু অপরাধী আছে। বরং অধিকাংশ মানুষই অপরাধী। অনেকে পরীক্ষা মানতে চায় না। অনেকে পরীক্ষাগারে নানা অপরাধ করে এবং জোরপূর্বক পাশ করতে চায়। অনেকে না পড়ে পাশ করতে ও জান্নাতের সার্টিফিকেট নিতে চায়। ধরাকে সরা জ্ঞান করার অপরাধে তাদের ভাগ্যে 'ফেল' ছাড়া কিছুই জোটে না। পরিশেষে তার বেহেশতের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয় এবং তাকে অগ্নিরাজ্যের একজন প্রজা হিসাবে গণ্য করা হয়।
এ জীবন পরীক্ষার জন্য। মৃত্যুর পর তার ফলাফল। পরিক্ষক মহান সৃষ্টি কর্তা।
تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (۱) الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ} (۲) سورة الملك
"মহা মহিমান্বিত তিনি সর্বময় কর্তৃত্ব যাঁর হাতে এবং তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন তোমাদেরকে পরীক্ষা করবার জন্য; কে তোমাদের মধ্যে কর্মে সর্বোত্তম? আর তিনি পরাক্রমশালী, বড় ক্ষমাশীল।" (মুল্কঃ ১-২)

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 জাতির ঐক্যে পাপের প্রভাব

📄 জাতির ঐক্যে পাপের প্রভাব


মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করতে ভালোবাসে। কোন মানুষই জীবনে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। সকলেই একে অন্যকে পরিপূর্ণতা দান করে। তবে সকলের প্রকৃতি এক নয়। এক নয় পছন্দ ও চাহিদা। তাই মতভেদ থাকবেই। মহান আল্লাহ চাইলে সকল মানুষ এক মতাবলম্বী হতো। তিনি চাইলে সকল মানুষ হিদায়াতপ্রাপ্ত হতো। কিন্তু তিনি চাননি, যাতে তিনি মানুষকে পরীক্ষা করেন। তবুও তিনি নবী ও কিতাবের মাধ্যমে মানুষকে এক হতে বলেছেন। তিনি বলেছেন,
{إِنَّ هَذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاعْبُدُون} (۹۲) سورة الأنبياء
"নিঃসন্দেহে তোমাদের এ জাতি, একই জাতি। আর আমিই তোমাদের প্রতিপালক। অতএব তোমরা আমার উপাসনা কর।" (আম্বিয়াঃ ৯২)

{وَإِنَّ هَذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاتَّقُون} (٥٢) سورة المؤمنون
"নিশ্চয় তোমাদের এই জাতি একই জাতি এবং আমিই তোমাদের প্রতিপালক; অতএব তোমরা আমাকে ভয় কর।" (মু'মিনুনঃ ৫২)

কিন্তু না, মানুষ বিভক্ত হল আস্তিকে ও নাস্তিকে, বিশ্বাসীতে ও অবিশ্বাসীতে। অবিশ্বাসীরাও দলে দলে ভাগ হতে থাকল। ইয়াহুদী ৭১ দলে এবং খ্রিস্টান ৭২ দলে বিভক্ত হয়ে গেল। এই ভাবে প্রত্যেক জাতিই ভেঙ্গে খানখান হল। মুসলিম জাতির উচিত ছিল না দলে দলে বিভক্ত হওয়া। সৃষ্টিকর্তা সে জাতিকে বিশেষভাবে সতর্ক ক'রে বলেছেন,
{وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا } (۱۰۳) سورة آل عمران
"তোমরা সকলে আল্লাহর রশি (ধর্ম বা কুরআন) কে শক্ত ক'রে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।" (আলে ইমরানঃ ১০৩)

{ وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِن بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُوْلَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ} (١٠٥) سورة آل عمران
"তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা তাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শন আসার পর (বিভিন্ন দলে) বিভক্ত হয়েছে ও নিজেদের মধ্যে মতান্তর সৃষ্টি করেছে। তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।" (আলে ইমরানঃ ১০৫)

{ شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاء وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ} (۱۳) سورة الشورى
"তিনি তোমাদের জন্য নির্ধারিত করেছেন ধর্ম; যার নির্দেশ দিয়েছিলেন নূহকে এবং যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি তোমাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই বলে যে, 'তোমরা ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওতে মতভেদ করো না।' তুমি অংশীবাদীদেরকে যার প্রতি আহবান করছ, তা তাদের নিকট দুর্বহ মনে হয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী হয়, তাকে ধর্মের দিকে পরিচালিত করোনা।" (শূরাঃ ১৩)

{إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ } (١٥٩) سورة الأنعام
"অবশ্যই যারা ধর্ম সম্বন্ধে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোন কাজের দায়িত্ব তোমার নেই, তাদের বিষয় আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। তিনিই তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে তাদেরকে অবহিত করবেন।" (আনআমঃ ১৫৯)

{مُنِيبِينَ إِلَيْهِ وَاتَّقُوهُ وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ (۳۱) مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ} (۳۲) سورة الروم
"তোমরা বিশুদ্ধ-চিত্তে তাঁর অভিমুখী হও; তাঁকে ভয় কর। যথাযথভাবে নামায পড় এবং অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না; যারা ধর্ম সম্বন্ধে নানা মত সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে; প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত।" (রুমঃ ৩১-৩২)

কিন্তু না, উম্মাহ সে সকল নির্দেশ পালন করতে ব্যর্থ হল। মানুষের প্রকৃতি অনুসারে শুরু হল মতানৈক্য ও দলাদলি। তিয়াত্তর দলে ভাগ হল বা হবে মুসলিম উম্মাহ।
নেতৃত্বলোভের কারণে অথবা নেতৃত্ব অমান্য করার কারণে অথবা কোন ব্যক্তি বিশেষের ব্যাপারে অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি করার কারণে অথবা আপন খেয়ালখুশির অনুসরণ করার কারণে নানা ফির্কা ও দল সৃষ্টি হয়েছে ইসলামে। প্রত্যেক দলেরই দাবী, তারাই হকপন্থী। প্রত্যেক দলই অপর দলকে ভ্রষ্ট মনে করে। অনেক সময় মনে হয় জাতির মৌলিক নামে সকলেই ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু আসলে তারা অভ্যন্তরে ছিন্নভিন্ন। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সমুদ্র ও মেঘ মিলে-মিশে একাকার হয়ে আছে। কিন্তু কাছে থেকে দেখলে দেখা যাবে, তারা মোটেই মিলিত নয়।

অবাধ্যাচরণ ও পাপাচরণের ফলে জাতির মাঝে বিচ্ছিন্নতা আসে। ছোট ছোট কারণ থেকে সৃষ্টি হয় ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য, ভালো লাগা থেকেই সৃষ্টি হয় ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব। অনুরূপ ছোট ছোট কারণ থেকেই সৃষ্টি হয় ঘৃণা ও বিদ্বেষ, খারাপ লাগা থেকেই সৃষ্টি হয় বিতৃষ্ণা ও অশ্রদ্ধা।
উদাহরণ স্বরূপ সালাম দেওয়া। সালাম বিনিময়ে সম্প্রীতি সৃষ্টি হয়। না দিলে মনোমালিন্য আসে। অনুরূপ অনেক অন্য কারণেও সৃষ্টি হতে পারে ভালোবাসা অথবা ঘৃণা। তা বলে তা শত্রুতার পর্যায়ে পৌছানো উচিত নয়। একে অপরকে অপবাদ দেওয়া এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে সমালোচনা করার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া আদৌ উচিত নয়। নচেৎ সেখান থেকেই সৃষ্টি হবে বিচ্ছিন্নতা ও সংহতির ফাটল।
আপোসের মতভেদ থাকতে পারে। তা বলে তা শত্রুতার পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া উচিত নয়। নচেৎ প্রত্যেকের স্ত্রী তার সবচেয়ে বড় শত্রুরূপে পরিগণিত হতো। এই জন্য মহানবী বলেছেন,
(( لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقاً رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ )). رواه مسلم
“কোন ঈমানদার পুরুষ যেন কোন ঈমানদার নারী (স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। যদি সে তার একটি আচরণে অসন্তুষ্ট হয়, তবে অন্য আচরণে সন্তুষ্ট হবে।” (মুসলিম ৩৭২ ১নং)

বলা বাহুল্য, যে কোনও অন্যায়াচরণ যদি ছোট থাকতেই বন্ধ করা যায়, তাহলে বিচ্ছেদে পৌঁছে সম্পর্কে ছেদ পড়ে না। পরন্তু ছোটকে তুচ্ছ ও অবজ্ঞা করলেই তা বড় আকার ধারণ করতে দেরি হয় না।
সম্প্রীতি ও ঐক্যে ফাটল ধরায় কোনও পাপ। দুজনের মাঝে সম্পর্কে চির সৃষ্টি করে কোনও অপরাধ। মহানবী বলেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ ، مَا تَوَادَّ اثنان فَفَرِّقَ بَيْنَهُمَا ، إِلَّا بِذَنْبٍ يُحْدِثُهُ أَحَدُهُمَا.
“সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ আছে। দুজনের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টির পর বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয় না। হলে একমাত্র তাদের একজনের কোন পাপ করার ফলেই হয়।” (আহমদ ৫৩৫৭, সিঃ সহীহাহ ৬৩৭নং)

হাদীসে কোন অপরাধ বা পাপের কথা নির্দিষ্ট ক'রে বলা হয়নি। তবুও অভিজ্ঞরা জানেন যে, ভালোবাসার সংসারে যে কোন ধরনের অপরাধ, অন্যায়, পাপ, অবজ্ঞা বা ত্রুটি সৃষ্টি করে ঠুনকো কাঁচে চির।
অনেকে ধারণা করে যে, গৌণ বিষয়ক কোন আমল, কোন সুন্নত বা বাহ্যিক আচার-আচরণ বা আনুষ্ঠানিকতা কোন ফাটল সৃষ্টি করতে পারে না। কিন্তু তাদের ধারণা সঠিক নয়। উক্ত বিষয়গুলি নিয়ে ফাটল সৃষ্টি করা উচিত নয়, সে কথা ঠিক। কিন্তু তার মাধ্যমেও অনৈক্য সৃষ্টি হতে পারে। বাহ্যিক অনৈক্যের ফলে আভ্যন্তরিক ঐক্যে ফাটল তৈরি হতে পারে।
লক্ষ্য করুন, মসজিদের জামাআতের ক্ষেত্রে মহান নেতা নবী মুহাম্মাদ -এর তরবিয়ত।
নু'মান ইবনে বাশীর বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি,
(( لَتُسَوُّنَّ صُفُوفَكُمْ ، أَوْ لَيُخَالِفَنَّ اللَّهُ بَيْنَ وُجُوهِكُمْ )).
“তোমরা নিজেদের কাতার জরুর সোজা ক'রে নাও; নচেৎ আল্লাহ তোমাদের মুখমন্ডলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি ক'রে দিবেন।” (মালেক, বুখারী ৭১৭, মুসলিম ১০০৬নং)

অন্য বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ আমাদের কাতারগুলি এমনভাবে সোজা করতেন, যেন তিনি এর দ্বারা তীর সোজা করেছেন। (তিনি তাতে প্রবৃত্ত থাকতেন) যতক্ষণ না তিনি জানতে পারতেন যে, আমরা তাঁর কথা বুঝে ফেলেছি। একদিন তিনি বাইরে এলেন (তারপর মুআযয্যিন) তাকবীর দিতে উদ্যত হচ্ছিল, এমন সময় একটি লোকের উপর তাঁর দৃষ্টি পড়ল, যার বুক কাতার থেকে আগে বেরিয়ে ছিল। তিনি বললেন,
(( عِبَادَ اللَّهِ ! لتُسَوُّنَّ صُفُوفَكُمْ ، أَوْ لَيُخَالِفَنَّ اللَّهُ بَيْنَ وُجُوهِكُمْ )) .
"আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা নিজেদের কাতার সোজা ক'রে নাও; নচেৎ তোমাদের মুখমন্ডলের মধ্যে আল্লাহ বিভিন্নতা ও বিভেদ সৃষ্টি করে দিবেন।" (মুসলিম ১০০৭নং)

অর্থ হল, তোমাদের চেহারার আকৃতি বদলে দেবেন, অথবা তোমাদের মাঝে বিদ্বেষ সৃষ্টি করবেন। তোমাদের মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা জন্ম নেবে, যার অনিবার্য পরিণতি হবে অনৈক্য, অশান্তি, দ্বন্দ্ব-কলহ তথা অধঃপতন।
এই হল ছোট জামাআত থেকে বড় জামাআতের জন্য মোক্ষম তরবিয়ত ও ট্রেনিং। সুশৃঙ্খল ও সুসংহত জীবনযাপনের প্রারম্ভিক অনুশীলন।

আবু দাউদ ও ইবনে হিব্বানের এক বর্ণনায় আছে, একদা আল্লাহর রসূল লোকেদের প্রতি অভিমুখ ক'রে বললেন, "তোমরা তোমাদের কাতার সোজা কর, নচেৎ আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের হৃদয়-মাঝে (পরস্পরের প্রতি) বিদ্বেষ সৃষ্টি করে দেবেন।"
বর্ণনাকারী বলেন, 'আমি দেখেছি, (প্রত্যেক) লোক তার পার্শ্ববর্তী ভাইয়ের বাহুমূলের সাথে বাহুমূল, হাঁটুতে হাঁটু ও গাঁটে গাঁট (টাখ্নাতে টাখ্না) লাগিয়ে দিত।' (আবু দাউদ ৬৬২, ইবনে হিব্বান ২১৭৬, ইবনে খুযাইমা ১৬০, সহীহ তারগীব ৫১২নং)

আসলেই সাহাবাগণ ব্যাপারটা বুঝেছিলেন, তাই অনুরূপ আমল করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ তাঁদের সেই আমলে মৌন সমর্থন জানিয়েছিলেন। তিনি জেনেছিলেন, বাইরের এই কিঞ্চিৎ ভিন্নতা, এই সামান্যতম তফাৎ, দেহ থেকে দেহের অল্প দূরত্বই প্রত্যেকের হৃদয়ে ফাটল সৃষ্টি করতে পারে। এই জন্যই তিনি বিভিন্ন শব্দে উক্ত বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে বর্ণনা করেছেন এবং কার্যতঃ তা সাহাবাগণের আমলে পরিণত করার সার্বিক চেষ্ট করেছেন।

বারা' ইবনে আযেব বলেন, রাসূলুল্লাহ নামাযে কাতারের ভিতরে ঢুকে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত চলা ফেরা করতেন এবং আমাদের বুকে ও কাঁধে হাত দিতেন (অর্থাৎ, হাত দিয়ে কাতার ঠিক করতেন) আর বলতেন,
(( لَا تَخْتَلِفُوا فَتَخْتَلِفَ قُلُوبُكُمْ )).
"তোমরা বিভেদ করো না (অর্থাৎ, কাতার থেকে আগে পিছে হয়ো না।) নচেৎ তোমাদের অন্তর রাজ্যেও বিভেদ সৃষ্টি হবে।" (আবু দাউদ ৬৬৪নং)

শয়তান মুসলিমের শত্রু। সে এই শ্রেণীর ছোট-ছোট ফাটলের সুযোগ গ্রহণ ক'রে বড় ভাঙ্গন সৃষ্টি করতে পারে। একজন নামাযী যখন পাশের নামাযীর গায়ে গা না লাগায় অথবা লাগালে সরে যায়, তখন শয়তান উভয়ের মনে কুমন্ত্রণা দেয়, 'দেখ, ও তোকে ঘৃণা করে। তাই তো তোর গায়ে গা লাগাল না অথবা সরে গেল।' কারো কারো মনে কুমন্ত্রণা দেয়, 'দেখ, ও কত বড় বেয়াদব! তুই এত বড় মানুষ, আর ও ছোট হয়ে তোর গায়ে গা বা পায়ে পা লাগায়?' এর মনে ফুসমন্ত্র দেয়, 'দেখ তোকে ছোট ভাবছে।' ফলে নামাযের ভিতরেই মানসিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। হতে হতে এক পর্যায়ে তা বিদ্বেষ ও শত্রুতার দ্বারপ্রান্তে গিয়ে উপনীত হয়। শয়তানের এই চক্রান্ত অনুধাবন ক'রে মহানবী বলতেন,
أَقِيمُوا الصُّفُوفَ ، وَحَادُّوا بَيْنَ الْمَنَاكِبِ ، وَسُدُّوا الخَلَلَ ، وَلِينُوا بِأَيْدِي إِخْوَانِكُمْ ، ولَا تَدْرُوا فُرْجَاتٍ لِلشَّيْطَانِ ، وَمَنْ وَصَلَ صَفَا وَصَلَهُ اللهُ ، وَمَنْ قَطَعَ صَفَا قَطَعَهُ اللَّهُ)).
"তোমরা কাতারগুলি সোজা ক'রে নাও। পরস্পর বাহুমূলে বাহুমূল মিলিয়ে নাও। (কাতারের) ফাঁক বন্ধ ক'রে নাও। তোমাদের ভাইদের জন্য হাতের বাজু নরম ক'রে দাও। আর শয়তানের জন্য ফাঁক ছেড়ো না। (মনে রাখবে,) যে ব্যক্তি কাতার মিলাবে, আল্লাহ তার সাথে মিল রাখবেন, আর যে ব্যক্তি কাতার ছিন্ন করবে (মানে কাতারে ফাঁক রাখবে), আল্লাহও তার সাথে (সম্পর্ক) ছিন্ন করবেন।" (আবু দাউদ ৬৬৬নং)

رُدُّوا صُفُوفَكُمْ ، وَقَارِبُوا بَيْنَهَا ، وَحَادُّوا بِالأَعْنَاقِ، فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنِّي لَأَرَى الشَّيْطَانَ يَدْخُلُ مِنْ خَلَلِ الصَّفْ ، كَأَنَّهُ الحَدْفُ )).
"ঘন ক'রে কাতার বাঁধো এবং কাতারগুলিকে পরস্পরের কাছাকাছি রাখো। ঘাড়সমূহ একে অপরের বরাবর কর। সেই মহান সত্তার শপথ! যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে, কাতারের মধ্যেকার ফাঁকে শয়তানকে আমি প্রবেশ করতে দেখতে পাই, যেন তা কালো ছাগলের ছানা।" (আবু দাউদ ৬৬৭, ইবনে হিব্বান ৬৩৩৯, ইবনে খুযাইমা ১৫৪৫নং)

মসজিদের মাঝে এই মহান এক সুন্নতকে অনেকে অবজ্ঞা করতে পারে, যে সুন্নতকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন মুহাম্মাদী মাদ্রাসার ছাত্রগণ। আর যে সুন্নতকে অবহেলা করার অপরাধে আজ সমাজে ও জামাআতের মনে মনে মিল নেই। এইভাবে অন্য বিষয়েও বাহ্যিক কত মতবিরোধ পৌঁছে দেয় বিচ্ছিন্নতা, অনৈক্য ও গৃহদ্বন্দ্বে।

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 জয়-পরাজয়ে অবাধ্যচারণের প্রভাব

📄 জয়-পরাজয়ে অবাধ্যচারণের প্রভাব


হক-বাতিলের সংঘর্ষ হয়েছে, হচ্ছে এবং হতে থাকবে। হকপন্থীরা যদি সত্যই আল্লাহর দ্বীনকে উন্নত করার জন্য সংগ্রাম করে, তাহলে তিনি অবশ্যই তাদেরকে বিজয়ী করেন।
বিজয় লাভের যে সকল শর্তাবলী আছে, তার মধ্যে অন্যতম হল সেনাপতির আনুগত্য। আনুগত্য না থাকলে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।
উহুদ যুদ্ধের দিন সৈন্য-বিন্যাস করার সময় নবী ৫০ জন তীরন্দাজ সাহাবাকে উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এক ছোট্ট পাহাড়ে পাহারা দিতে আদেশ করলেন, যাতে শত্রুপক্ষ পিছন দিক থেকে আক্রমণ না ক'রে বসে। তাঁদেরকে এ কথাও বলে দেওয়া হয়েছিল যে, যুদ্ধে হার-জিত যাই-বা হোক, তাঁরা যেন কোন অবস্থাতেই ঘাঁটি না ছাড়েন। কিন্তু যুদ্ধের প্রথম দিকে মুসলিম বাহিনীর বিজয় পরিলক্ষিত হলে তাঁরা নববী নির্দেশ লংঘন করলে পিছন থেকে কাফেররা পাল্টা আক্রমণ চালায়। ফলে মুসলিমগণ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। সুতরাং শত্রু পিছন থেকে আল্লাহর রসূল-এর কাছে পৌঁছতে সক্ষম হয়। আঘাতে তাঁর নিচের চোয়ালের ডান দিকের (ঠিক মাঝের পার্শ্ববর্তী) দুটি দাঁত ভেঙ্গে যায় এবং তাঁর কপাল বিক্ষত হয়। চোট লাগে তাঁর চেহারায়। গালের উপরি অংশে শিরস্ত্রাণের দুটি কড়া ঢুকে যায়।। তা দাঁত দিয়ে তুলতে গিয়ে আবু উবাইদা-এর মাঝের দাঁত দুটি ভেঙ্গে যায়। মুসলিম বাহিনীর ৭০ জন লোক শহীদ হন। তাঁদের মধ্যে আল্লাহর সিংহ (মহানবী-এর চাচা) হামযাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব অন্যতম। শত্রুপক্ষ (হিন্দু) তাঁর কলিজা বের ক'রে দাঁতে চিবিয়ে রাগ মিটায়! মহান আল্লাহ সেদিনকার সেই বিজয়ের পর পরাজয়ের মর্মান্তিক ফলাফল ও তার কারণ উল্লেখ করেছেন কুরআনে। তিনি বলেছেন,
{وَلَقَدْ صَدَقَكُمُ اللَّهُ وَعْدَهُ إِذْ تَحُسُّونَهُم بِإِذْنِهِ حَتَّى إِذَا فَشِلْتُمْ وَتَنَازَعْتُمْ فِي الْأَمْرِ وَعَصَيْتُم مِّن بَعْدِ مَا أَرَاكُم مَّا تُحِبُّونَ مِنكُم مَّن يُرِيدُ الدُّنْيَا وَمِنكُم مَّن يُرِيدُ الْآخِرَةَ ثُمَّ صَرَفَكُمْ عَنْهُمْ لِيَبْتَلِيَكُمْ وَلَقَدْ عَفَا عَنكُمْ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ } (١৫২)
অর্থাৎ, আর আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছিলেন, যখন তোমরা তাদেরকে আল্লাহর নির্দেশক্রমে হত্যা করছিলে। অবশেষে যখন তোমরা সাহস হারিয়েছিলে এবং (রসূলের) নির্দেশ সম্বন্ধে মতভেদ সৃষ্টি করেছিলে এবং যা তোমরা পছন্দ কর তা (বিজয়) তোমাদেরকে দেখানোর পরে তোমরা অবাধ্য হয়েছিলে (তখন বিজয় রহিত হল)। তোমাদের কতক লোক ইহকাল কামনা করেছিল এবং কতক লোক পরকাল কামনা করেছিল। অতঃপর তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য তিনি তোমাদেরকে তাদের মোকাবেলায় পশ্চাতে ফিরিয়ে দিলেন। তবুও (কিন্তু) তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করলেন। বস্তুতঃ আল্লাহ বিশ্বাসীদের প্রতি অনুগ্রহশীল। (আলে ইমরানঃ ১৫২)

এইভাবেই অবাধ্যাচরণ অধোগতি আনয়ন করে এবং বিজয়কে পরাজয়ে পরিবর্তন করে।
সে উম্মাহ কীভাবে মহান আল্লাহর কাছে বিজয় কামনা করে, যে বিজয়ের শর্তাবলী পালনে অবজ্ঞা প্রদর্শন করে? যে জাতি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের শত-সহস্র বিষয়ে অবাধ্যাচরণ করে, সে জাতি বিজয় লাভে আল্লাহর সাহায্য কামনা করে কোন মনে?
যে জাতি মহান প্রতিপালকের ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে এবং তাঁর রসূলের আদেশ-নিষেধ পালনে উন্নাসিকতা প্রদর্শন করে, সে জাতি উম্মতের পরাজয় হলে 'কেন হল' প্রশ্ন করে কোন্ মুখে? মহান আল্লাহ বলেছেন,
{أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُم مُّصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُم مِّثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّى هَذَا قُلْ هُوَ مِنْ عِندِ أَنْفُسِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ} (١٦٥) سورة آل عمران
"যখন তোমাদের উপর (উহুদের যুদ্ধের বিপদ) এসেছিল (৭০ জন শহীদ হয়েছিল), যার দ্বিগুণ বিপদ (বদরের যুদ্ধে) তোমরা তাদের উপর আনয়ন করেছিলে; (তাদের ৭০ জনকে হত্যা এবং ৭০ জনকে বন্দী করেছিলে), তখন তোমরা বলেছিলে, এ কোথা থেকে এল? বল, (হে নবী!) এ তোমাদের নিজেদেরই কাছ থেকে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্ব শক্তিমান।" (আলে ইমরানঃ ১৬৫)

নিজেদেরই অবাধ্যাচরণের কুফল। সুতরাং স্পষ্ট যে, অবাধ্যাচরণ থাকলে অনেক সময় বিজয় পরাজয়ে পরিবর্তিত হতে পারে। এ পরিবর্তন যদি সেই যুদ্ধে হয়, যে যুদ্ধে মানবকুল শিরোমণি খোদ আল্লাহর দূত শরীক থাকেন এবং তাঁর সাথে তাঁর সহচরগণ অংশগ্রহণ করেন। এতদ্ সত্ত্বেও তাঁদের অবাধ্যাচরণের সত্বর শাস্তি আসতে পারে, তাহলে বর্তমানের যুদ্ধ-বিগ্রহে কী হতে পারে, তা অনুমেয়। যে সকল যুদ্ধ-বিগ্রহের আগা-গোড়া কেবল অবাধ্যাচরণ ও পাপাচরণ। যে সকল যুদ্ধে শরীক থাকে এমন সব লোক, যাদের ঈমানের ব্যাপারে মহান আল্লাহই ভালো জানেন।
বিজয়ের শর্তাবলী পালিত না হলে বিজয় আসবে কেন? কার্যকারণ না থাকলে কি কার্য সম্পাদিত হয়? বিবাহের পর মিলন না ঘটলে কি সন্তান হয়? গাছ না লাগিয়ে কি ফল পাওয়া যায়? নিম গাছে কি ডালিম ফল পাওয়ার আশা ভুল নয়? (আয-যিয়াউল লামে' ৩২৭পৃঃ)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
((إِنَّ هَذَا الْأَمْرَ فِي قُرَيْشٍ مَا دَامُوا إِذَا اسْتَرْحَمُوا رَحِمُوا وَإِذَا حَكَمُوا عَدَلُوا وَإِذَا قَسَمُوا أَقْسَطُوا فَمَنْ لَمْ يَفْعَلْ ذَلِكَ مِنْهُمْ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ لَا يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَلَا عَدْلٌ)).
"এই নেতৃত্ব থাকবে কুরাইশদের মাঝে। যতক্ষণ তাদের কাছে দয়া ভিক্ষা করা হলে তারা দয়া করবে, বিচার করলে ইনসাফ করবে, বিতরণ করলে ন্যায়ভাবে করবে। তাদের মধ্যে যে তা করবে না, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশামন্ডলী এবং সমগ্র মানবমন্ডলীর অভিশাপ। তার নিকট থেকে নফল-ফরয কোন ইবাদতই কবুল করা হবে না।" (আহমাদ ১২৯০০, ১৯৫৪১, আবু য়‍্যা'লা ৪০৩২-৪০৩৩, ত্বাবারানী ৭২৪, সিঃ সহীহাহ ২৮৫৮-নং)

ইবনে মাসউদ বলেন, একদা তাঁর হাতে একটি গাছের ডাল ছিল। সেই সময় তিনি কুরাইশকে সম্বোধন ক'রে বললেন,
يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ ! فَإِنَّكُمْ أَهْلُ هَذا الأَمْرِ ، مَا لَمْ تَعْصُوا اللهَ ، فَإِذَا عَصَيْتُمُوهُ، بَعَثَ إِلَيْكُمْ مَنْ يَلْحَاكُمْ كَمَا يُلْحَى هَذَا القَضِيبُ
"হে কুরাইশ! তোমরাই হলে এই নেতৃতত্বের উপযুক্ত; যতদিন তোমরা আল্লাহর অবাধ্যাচরণ না করেছ। সুতরাং যেদিন তোমরা তাঁর অবাধ্যাচরণ করবে, সেদিন তিনি তোমাদের নিকট এমন লোক প্রেরণ করবেন, যে তোমাদেরকে ছিলে দেবেন, যেমন এই ডালকে ছেলা হয়।"
অতঃপর তিনি তাঁর হাতের ডালটির ছাল ছিলে দিলেন এবং তার সাদা শক্ত অংশ বের হয়ে গেল। (আহমাদ ৪৩৮০, সিঃ সহীহাহ ১৫৫২নং)

উক্ত হাদীসটি প্রমাণ করে যে, জাতির বিজয় ও প্রতিষ্ঠা লাভের শর্ত হল অবাধ্যাচরণ ও পাপাচরণ না করা। সে শর্ত মান্য না করা হলে জাতির বিজয়, শাসন-ক্ষমতা ও আধিপত্য হাতছাড়া হয়।
যেমন উক্ত হাদীসটি মহানবী ﷺ-এর নবুঅতের একটি জ্বলন্ত প্রমাণ। যেহেতু তাঁর সেই বাণীর বাস্তব রূপ কুরাইশদের মাঝে প্রকাশ পেয়েছে। কুরাইশদের খিলাফত ও নেতৃত্ব কয়েক শতাব্দী যাবৎ কায়েম ছিল। অতঃপর তারা তাদের প্রতিপালকের অবাধ্যাচরণ করলে এবং নিজেদের খেয়ালখুশীর অনুসরণ করলে তাদের নিকট থেকে ক্ষমতা চলে গেল। মহান আল্লাহ তাদের উপরে অনারব জাতিকে আধিপত্য দিলে তারা তাদের নিকট থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিল। আর তাদের পর থেকেই মুসলিমরা লাঞ্ছিত হতে লাগল। অবশ্য আল্লাহর ইচ্ছায় সে লাঞ্ছনা কোন কোন স্থানে ছিল না।
সুতরাং আজও যদি মুসলিমরা তাদের ইসলামী রাষ্ট্র ও হারানো গৌরব সত্যিই ফিরিয়ে আনতে চায়, তাহলে তাদের উচিত, সর্বাগ্রে মহান প্রতিপালকের নিকট তওবা করা, তাঁর দ্বীনের গন্ডিতে ফিরে আসা এবং তাঁর শরীয়তের নির্দেশ পালন করা। (সিঃ সহীহাহ ৪/৭০)

জুবাইর বিন নুফাইর বলেন, যখন পারস্য জয় হল এবং পারস্যবাসীদের পরিবার পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল এবং তারা একে অন্যের নিকট কাঁদতে লাগল, তখন আমি আবুদ দারদাকে একাকী বসে কাঁদতে দেখলাম। আমি বললাম, 'হে আবুদ দারদা! ইসলাম ও মুসলিমদের বিজয়ের দিনে আপনি কাঁদছেন কেন?' উত্তরে তিনি বললেন, 'ধ্বংস হোক তোমার হে জুবাইর! আল্লাহর নিকট তাঁর সৃষ্টি কত অপদার্থ, যখন তারা আল্লাহর নির্দেশ উপেক্ষা করে! এতদিন তারা একটি প্রবল আধিপত্য বিস্তারকারী জাতি ছিল। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ উপেক্ষা করা ফলে তাদের অবস্থ কী হল তা দেখছ।' (যুহদ, আহমাদ ১৭৬পৃঃ)

আবুদ দারদা -এর উক্ত বাণী মুসলিম উম্মাহ'র বর্তমান লাঞ্ছনা ও দুর্দশার কারণ সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে আলোকপাত করে। উম্মাহ যখন মহান প্রতিপালকের নির্দেশ অগ্রাহ্য করল, তখন এই শতধা বিচ্ছিন্ন অবস্থা, গৃহদ্বন্দ্ব ও লাঞ্ছনার শিকার হয়ে গেল। (আষারুয যুনুব ফী হাদমিল উমামি অশ-শুউব ৬২পৃঃ)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00