📄 জ্ঞানের উপর পাপের প্রভাব
মহান প্রতিপালক মানুষকে জ্ঞান দ্বারা বহু জীবের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং সেই জ্ঞান যাতে বিলুপ্ত না হয়, তার জন্য মদকে হারাম করেছেন। যে জিনিস মাদকতা ও নেশা আনে, তাই মদ বা মাদকদ্রব্য; যা সেবন করলে জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ জ্ঞানশূন্য হয়ে যায়। আর জ্ঞানশূন্য হলে তার দ্বারা বহু কুকাম ঘটে যায়। এই জন্য কুরআনে মদকে অপবিত্র ও শয়তানী কর্ম বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (٩٠) سورة المائدة
“হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (মায়িদাহঃ ৯০)
আর মহানবী বলেছেন,
(الْخَمْرُ أُمُّ الْفَوَاحِشَ وَأَكْبَرُ الْكَبَائِرِ مَنْ شَرِبَهَا وَقَعَ عَلَى أُمِّهِ وَخَالَتِهِ وَعَمَّتِهِ)).
“মদ হল যাবতীয় অশ্লীলতার প্রধান এবং সবচেয়ে বড় পাপ। যে ব্যক্তি তা পান করল, সে যেন নিজ মা, খালা ও ফুফুর সাথে ব্যভিচার করল!” (ত্বাবারানী, সঃ জামে' ৩৩৪৫নং)
الْخَمْرُ أُمُّ الْخَبَائِثِ، فَمَنْ شَرِبَهَا لَمْ تُقْبَلْ مِنْهُ صَلَاتُهُ أَرْبَعِينَ يَوْمًا، فَإِنْ مَاتَ وَهِيَ فِي بَطْنِهِ مَاتَ مَيْتَةً جَاهِلِيَّةً)).
"মদ যাবতীয় নোংরামির মূল। যে কেউ তা পান করবে, তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। (যে ব্যক্তি তার মূত্রথলিতে ঐ মদের কিছু পরিমাণ রাখা অবস্থায় মারা যাবে, তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যাবে এবং) যে কেউ তা নিজ পেটে রেখে মারা যাবে, সে জাহেলী যুগের মরণ মরবে।" (ত্বাবারানী ১৫৪৩, দারাকুত্বনী ৪/২৪৭, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৬৯৫নং)
আবু দারদা বলেন, আমাকে আমার বন্ধু বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন যে,
((لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ شَيْئًا ، وَإِنْ قُطَّعْتَ وَحُرِّقْتَ ، وَلَا تَتْرُكْ صَلَاةً مَكْتُوبَةً مُتَعَمِّدًا ، فَمَنْ تَرَكَهَا مُتَعَمِّدًا ، فَقَدْ بَرنَتْ مِنْهُ الدَّمَّةُ ، وَلَا تَشْرَبِ الْخَمْرَ ، فَإِنَّهَا مِفْتَاحُ كُلَّ شَ).
"তুমি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না---যদিও (এ ব্যাপারে) তোমাকে হত্যা করা হয় অথবা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ইচ্ছাকৃত ফরয নামায ত্যাগ করো না। কারণ যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নামায ত্যাগ করে, তার উপর থেকে (আল্লাহর) দায়িত্ব উঠে যায়। আর মদ পান করো না, কারণ মদ হল প্রত্যেক অমঙ্গলের (পাপাচারের) চাবিকাঠি।" (ইবনে মাজাহ ৪০৩৪, সহীহ ইবনে মাজাহ ৩২৫৯নং)
বলা বাহুল্য, মদ্যপায়ী অপরাধী। আর তার অপরাধের ফলে প্রথম ক্ষতি হয় নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার।
📄 মান-সম্ভ্রমের উপর পাপের প্রভাব
প্রকৃত মানুষ হল সেই, যার মনুষত্ব আছে, মনুষ্যত্ববোধ আছে। যার ঈমানের সাথে সুন্দর চরিত্র আছে। কিন্তু অনেক সময় মানুষ এমন পাপ করে, যার ফলে তার নিজের মান-সম্ভ্রম নষ্ট ক'রে ফেলে। মহান আল্লাহর কাছে তো বটেই, মানুষের কাছেও তার সম্মান ধূলিস্মাৎ হয়।
যে কোনও সামাজিক অপরাধে মানুষ সমাজের চোখে চ্যুত হয়ে যায়। চুরি- ডাকাতি, খুন, অবৈধ প্রেম-ভালোবাসা, ব্যভিচার, ধর্ষণ, সুদখোরি, মিথ্যাবাদিতা, চুগলখোরি, গীবত, অহংকার ইত্যাদি মহাপাপে লিপ্ত হওয়ার ফলেও সে মানুষের চোখে ছোট হয়ে যায়। কিন্তু এখানে বলার উদ্দেশ্য, বংশীয় মান-মর্যাদা। বলা বাহুল্য, এর সংরক্ষার জন্য ইসলাম পবিত্র বিবাহের বিধান দিয়েছে এবং এমন পাপকেও ইসলাম 'পাপ' বলে চিহ্নিত করেছে, যা বংশীয় সম্মান ও কুলমানকে প্রভাবান্বিত করে এবং পবিত্র বংশে অবৈধ সংমিশ্রণ ঘটায়।
যেমন সেই লক্ষ্যে ইসলাম ব্যভিচারকে 'হারাম' ঘোষণা করেছে এবং ইহ-পরকালে তার শাস্তি নির্ধারণ করেছে। ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া তো দূরের কথা, তার ভূমিকা ও অবতরণিকায় যেতে এবং তার নিকটবর্তী হতেও নিষেধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبيلاً) (۳۲) سورة الإسراء
"তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।" (বানী ইস্রাঈল: ৩২)
ব্যভিচারের দিকে আকর্ষণ করে এমন সমূহ আচরণকে নিষিদ্ধ করেছে ইসলাম। ব্যভিচারের সকল চোরা পথকে বন্ধ করা হয়েছে ইসলামী নৈতিকতায়।
সুতরাং ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কে বলেছে চক্ষু অবনত করতে। কারণ ঘসাঘসি থেকেই আগুন লাগে এবং চোখাচোখি থেকেই শুরু হয় কাছাকাছি হওয়ার প্রস্তুতি। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ (۳۰) وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ} (۳۱)
"মু'মিনদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের যৌন অঙ্গকে সাবধানে সংযত রাখে; এটিই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। ওরা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত। মু'মিন নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে।" (নূর: ৩০-৩১)
বলা বাহুল্য, নিজ সম্ভ্রম বাঁচানোর এটাই হল প্রাথমিক প্রয়াস। জারীর বিন আব্দুল্লাহ বলেন, আচমকা দৃষ্টি সম্পর্কে আমি রাসূলুল্লাহ -কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমাকে আদেশ করলেন, যেন আমি আমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিই। (মুসলিম ৫৭৭০নং)
একদা তিনি আলী -কে বলেছিলেন,
يَا عَلِيُّ لَا تُتَّبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ فَإِنَّ لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ ..
"হে আলী! একবার নজর পড়ে গেলে আর দ্বিতীয়বার তাকিয়ে দেখো না। প্রথমবারের (অনিচ্ছাকৃত) নজর তোমার জন্য বৈধ। কিন্তু দ্বিতীয়বারের নজর বৈধ নয়।" (আহমাদ, আবু দাউদ ২১৫১, তিরমিযী ২৭৭৭, হাকেম ২৭৮৮, বাইহাক্বী ১৩২৯৩, সহীহুল জামে' ৭৯৫৩ নং)
তিনি বলেছেন,
(( لَا يَنْظُرُ الرَّجُلُ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ ، وَلَا المَرْأَةُ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ ، وَلَا يُفْضِي الرَّجُلُ إِلَى الرَّجُلِ فِي ثَوْبِ وَاحِدٍ ، وَلَا تُفْضِي المَرْأةُ إِلَى المَرْأَةِ فِي الثَّوْبِ الواحِدِ )) .
“কোন পুরুষ অন্য পুরুষের গুপ্তাঙ্গের দিকে যেন না তাকায়। কোন নারী অন্য নারীর গুপ্তস্থানের দিকে যেন না তাকায়। কোন পুরুষ অন্য পুরুষের সঙ্গে একই কাপড়ে যেন (উলঙ্গ) শয়ন না করে। (অনুরূপভাবে) কোন নারী, অন্য নারীর সাথে একই কাপড়ে যেন (উলঙ্গ) শয়ন না করে। (মুসলিম ৭৯৪নং)
আর এ সকল নির্দেশ হল কেবল নিজের সম্ভ্রম বাঁচানোর উদ্দেশ্যে। যারা এ সকল আদেশ লংঘন করার পাপ করে, তাদের মান-সম্মান একদিন না একদিন ভূলুণ্ঠিত অবশ্যই হয়।
দর্শনঘটিত কোন অনভিপ্রেত অপরাধ না ঘটতে দেওয়ার মানসে প্রবেশানুমতির বিধান রয়েছে ইসলামে। বাড়ির ইজ্জত যাতে নষ্ট না হয়, কোন মহিলার প্রতি অথবা কারো গোপনাঙ্গের প্রতি যেন দৃষ্টিপাত না হয়, তার জন্যই কুরআন বলেছে,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ (۲۷) فَإِن لَّمْ تَجِدُوا فِيهَا أَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوهَا حَتَّى يُؤْذِنَ لَكُمْ وَإِن قِيلَ لَكُمُ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا هُوَ أَزْكَى لَكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ}
"হে মু'মিনগণ! তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য কারও গৃহে গৃহবাসীদের অনুমতি না নিয়ে ও তাদেরকে সালাম না দিয়ে প্রবেশ করো না। এটিই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। যদি তোমরা গৃহে কাউকেও না পাও, তাহলে তোমাদেরকে যতক্ষণ না অনুমতি দেওয়া হয়, ততক্ষণ ওতে প্রবেশ করবে না। যদি তোমাদেরকে বলা হয়, 'ফিরে যাও' তবে তোমরা ফিরে যাবে; এটিই তোমাদের জন্য পবিত্রতম। আর তোমরা যা কর, সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত।" (নূর : ২৭-২৯)
মহানবী বলেছেন,
(( إِنَّمَا جُعِلَ الإِسْتِبْدَانُ مِنْ أجل البَصَ). متفقٌ عَلَيْهِ
"দৃষ্টির কারণেই তো (প্রবেশ) অনুমতির বিধান করা হয়েছে।" (অর্থাৎ, দৃষ্টি থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে ঐ নির্দেশ।) (বুখারী ৬২৪১, মুসলিম ৫৭৬৪নং)
উকি মেরে বাড়ির ভিতরে তাকিয়ে দেখা এক মহা অপরাধ। এ ব্যাপারে কড়া নির্দেশ রয়েছে ইসলামের। মহানবী বলেছেন,
مَن اطَّلَعَ فِي بَيْتِ قَوْمٍ بِغَيْرِ إِذْنِهِمْ فَقَدْ حَلَّ لَهُمْ أَنْ يَفْقَنُوا عَيْنَهُ ..
"যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের গৃহে তাদের অনুমতি না নিয়ে উঁকি মেরে দেখে সে ব্যক্তির চোখে (ঢিল ছুঁড়ে) তাকে কানা ক'রে দেওয়া তাদের জন্য বৈধ হয়ে যায়।" (বুখারী ৬৯০২, মুসলিম ৫৭৬৮নং, আবু দাউদ, নাসাঈ)
((مَنْ اطَّلَعَ فِي بَيْتِ قَوْمٍ بِغَيْرِ إِذْنِهِمْ فَفَقَنُوا عَيْنَهُ فَلَا دِيَةً لَهُ وَلَا قِصَاصَ)).
"যে ব্যক্তি কোন গোষ্ঠীর গৃহে তাদের বিনা অনুমতিতে উকি মারে এবং তারা (দেখতে পেয়ে) তার চক্ষু ফুটিয়ে দেয়, তবে তাতে কোন (দন্ডনীয়) রক্তপণ (দিয়াত) বা অনুরূপ বদলা (ক্বিসাস) নেই।" (আহমাদ ৮৯৯৭, দারাকুত্বনী ৩৪৮, ইবনে হিব্বান ৪০০৬নং)
দৃষ্টি হল প্রেমমেঘের প্রথম বৃষ্টি। আর বাদলের ধারাপাত শুরু হলে পাপ বন্যায় বানভাসি হতে দেরী লাগে না। তাই ইসলামের বিধানে দৃষ্টি-সংযমের অনুশীলন।
ব্যভিচারের একটি প্রধান ভূমিকা হল স্পর্শ। মিলনের ইচ্ছা না থাকলেও কোন অবৈধ নারী-দেহ স্পর্শ করা বৈধ নয় ইসলামে। কারণ সেই পরশই হতে পারে মিলনের দূত। আর ঘটাতে পারে নৈতিকতা ধ্বংসের অনেক বড় পাপ। সেই জন্য মহানবী বলেছেন,
((لأَنْ يُطْعَنَ فِي رَأْس رَجُل بِمِخْيَطٍ مِنْ حَدِيدٍ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمَسَّ امْرَأَةً لَا تَحِلُّ لَهُ)).
"কোন ব্যক্তির মাথায় লৌহ সুচ দ্বারা খোঁচা যাওয়া ভালো, তবুও যে নারী তার জন্য অবৈধ, তাকে স্পর্শ করা ভালো নয়।" (ত্বাবারানী ১৬৬৮৮-০-১৬৮৮১, সিঃ সহীহাহ ২২৬ নং)
বিশেষ ক'রে ভিড়ের মাঝে স্পর্শ থেকে সতর্ক থাকে চরিত্রবান পুরুষ। আর ভিড়ের সুযোগ নিয়ে নারী-দেহ বা তার কোমলাঙ্গ স্পর্শ করে চরিত্রহীন পুরুষ।
পর্দাহীনতা ব্যভিচারের একটি বড় ছিদ্রপথ। নারীদেহ দর্শনসুলভ হওয়ার ফলে ব্যবহারসুলভ হয়ে উঠে। ব্যভিচার ও ধর্ষণের বাজার গরম হয়। বেড়ে চলে কুমারী মা ও অবৈধ সন্তানের সংখ্যা। তাতে ইজ্জত যায় উভয় পক্ষের। তাই সেই চোরাপথ রুদ্ধ করার লক্ষ্যে এবং পবিত্র পরিবার গঠনের উদ্দেশ্যে ইসলাম পর্দার বিধান দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاء بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاء بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَو التَّابِعِينَ غَيْر أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَو الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاء وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (۳۱) سورة النور
"মু'মিন নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে। তারা যা সাধারণতঃ প্রকাশ থাকে তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য যেন প্রদর্শন না করে, তারা তাদের বক্ষঃস্থল যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত রাখে। তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগিনী পুত্র, তাদের নারীগণ, নিজ অধিকারভুক্ত দাস, যৌনকামনা- রহিত অনুচর পুরুষ অথবা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত কারও নিকট তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। আর তারা যেন এমন সজোরে পদক্ষেপ না করে, যাতে তাদের গোপন আভরণ প্রকাশ পেয়ে যায়। হে মু'মিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।" (নূর: ৩১)
মহানবী বলেছেন,
خَيْرُ نِسَائِكُمُ الْوَدُودُ الْوَلُودُ الْمَوَاتِيَةُ الْمُوَاسِيَةُ إِذَا اتَّقَيْنَ اللَّهَ وَشَرُّ نِسَائِكُمُ الْمُتَبَرِّجَاتُ الْمُتَخَيَّلاتُ وَهُنَّ الْمُنَافِقَاتُ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مِنْهُنَّ إِلَّا مِثْلُ الْغُرَابِ الْأَعْصَمِ ..
"তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ স্ত্রী সে, যে প্রেমময়ী, অধিক সন্তানদাত্রী, যে (স্বামীর) সহমত অবলম্বন করে, (স্বামীকে বিপদে-শোকে) সান্ত্বনা দেয় এবং সেই সাথে আল্লাহর ভয় রাখে। আর তোমাদের সবচেয়ে খারাপ মেয়ে তারা, যারা বেপর্দা, অহংকারী, তারা কপট নারী, তাদের মধ্যে লাল রঙের ঠোঁট ও পা-বিশিষ্ট কাকের মতো (বিরল) সংখ্যক বেহেশে যাবে।" (বাইহাক্বী ১৩২৫৬নং)
তিনি আরো বলেছেন,
((الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ فَإِذَا خَرَجَتِ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ)).
"মেয়ে মানুষ (সবটাই) লজ্জাস্থান (গোপনীয়)। আর সে যখন বের হয়, তখন শয়তান তাকে পুরুষের দৃষ্টিতে সুশোভন করে তোলে।" (তিরমিযী ১১৭৩, মিশকাত ৩১০৯ নং)
তিনি আরো বলেছেন, "মহিলা হল গোপনীয় জিনিস। বাইরে বের হলে শয়তান তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে নির্নিমেষ তাকিয়ে দেখতে থাকে।" (ত্বাবারানী, ইবনে হিব্বান, ইবনে খুযাইমা, সহীহ তারগীব ৩৩৯, ৩৪১, ৩৪২নং)
একা বাইরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে মহিলাকে। বিপদের ভয়েই তাদের নিরাপত্তার জন্যই সঙ্গে স্বামী অথবা কোন এগানা (মাহরাম) পুরুষ সঙ্গী থাকার শর্তারোপ করা হয়েছে। তাতে ইভটিজিং-সহ আরো অন্যান্য অঘটনের হাত থেকে মহিলা নিষ্কৃতি পেতে পারে।
বিশেষ ক'রে মহিলার একাকিনী সফর করা নিষিদ্ধ। পুরুষের ক্ষেত্রেই একা সফরের নিন্দা করা হয়েছে। মহানবী বলেছেন,
(( الرَّاكِبُ شَيْطَانٌ ، وَالرَّاكِبَانِ شَيْطَانَان ، وَالثَّلَاثَةُ رَكْبٌ )).
"একজন (সফরকারী) আরোহী একটি শয়তান এবং দু'জন আরোহী দু'টি শয়তান। আর তিনজন আরোহী একটি কাফেলা।" (আহমাদ, আবু দাউদ ২৬০৭নং, তিরমিযী, হাকেম ২/১০২, সহীহুল জামে' ৩৫২৪নং)
এ কথা যদি পুরুষের ক্ষেত্রে হয়, তাহলে মহিলার ক্ষেত্রে কী হতে পারে, তা সহজে অনুমেয়।
বলা বাহুল্য, মহিলাকে বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সে যেন একাকিনী সফর না করে। কোন সফরই না, ইবাদতের সফরও না। মহানবী বলেছেন,
(( لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ تُسَافِرُ مَسِيرَةَ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ عَلَيْهَا )). متفقٌ عَلَيْهِ
"আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি যে নারী ঈমান রাখে, তার মাহরামের সঙ্গ ছাড়া একাকিনী এক দিন এক রাতের দূরত্ব সফর করা বৈধ নয়।" (বুখারী ১০৮৮, মুসলিম ৩৩৩১-৩৩৩২নং)
((لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةِ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ ، وَلَا تُسَافِرُ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ».
"কোন পুরুষ যেন কোন বেগানা নারীর সঙ্গে তার সাথে এগানা পুরুষ ছাড়া অবশ্যই নির্জনতা অবলম্বন না করে। আর মাহরাম ব্যতিরেকে কোন নারী যেন সফর না করে।"
এক ব্যক্তি আবেদন করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার স্ত্রী হজ্জ পালন করতে বের হয়েছে। আর আমি অমুক অমুক যুদ্ধে নাম লিখিয়েছি।' তিনি বললেন,
(( انْطَلِقْ فَحُجَّ مَعَ امْرَأَتِكَ)).
"যাও, তুমি তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হজ্জ কর।" (বুখারী ৫২৩৩, মুসলিম ১৩৪১নং)
কিন্তু ইসলামের এই নীতিকে উল্লংঘন করার ফলে যে অপরাধ মহিলারা করে, তারই সত্বর কুফল স্বরূপ তাদের জীবনে অভিশাপ নেমে আসে। চিরদিনকার জন্য পবিত্রতা ও সতীত্ব নষ্ট হয়ে যায় অনেক মহিলার চরিত্র থেকে। কেউ ইভটিজিংয়ের শিকার হয়, কেউ বা হয় ধর্ষিতা। কেউ তা ঢেকে রাখে, কেউ প্রকাশ ক'রে সাহসের সাথে ধর্ষকের শাস্তি দেয়। শাস্তি তো দৃষ্টান্তমূলক হয় না। ফলে মহিলার যা হারিয়ে যাওয়ার তা হারিয়ে যায়। যে দাগ লেগে যায়, তা আর মুছে না। এই জন্যই নারী-স্বাধীনতার আহবায়করা যা বলে তাদের কথায় কান না দিয়ে যদি ইসলামের বিধান মেনে মহিলা পূর্ব সতর্কতামূলক কাজ করত এবং একাকিনী সফর না করত, তাহলে হয়তো সে অনেকটা সুরক্ষিতা থাকতে পারত। বাঁচতে পারত শ্লীলতাহানির ছোবল থেকে, থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাছারি ও নানা জেরা-কৈফিয়তের হাত থেকে। রেহাই পেত হুমকি-ধমকি ও খুন হওয়ার আশঙ্কা থেকে।
মেয়ের কি একাকিনী সফরের অধিকার নেই? একাকিনী বা পছন্দসই (অর্ধনগ্ন) পোশাকে বের হলেই কি পুরুষদের অধিকার জন্মে যায় ইভটিজিং করার? না, তা হয়তো নয়। কিন্তু এর ফলে সংঘটিত বিপদের জন্য মহিলার উন্নাসিকতা অনেকটাই দায়ী।
আত্মরক্ষার জন্য মহিলার ক্যারাটে শেখা দরকার।
তা হয়তো মোকাবেলার সময় কাজে দেবে। কিন্তু অকস্মাৎ বিপদের হাত থেকে রেহাই পাবে না।
এর জন্য প্রশাসনকে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।
প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ করলে এবং অপরাধীকে মৃত্যুদন্ড দিলেও কি মহিলার যা হারিয়ে গেছে, তা আর ফেরৎ পাবে?
যার কেউ নেই, সে কী করবে? বাইরে যেতে বাধ্য হলে সে কী করবে?
সে কথা আলাদা। প্রয়োজনের তাকীদের আদেশ পালনের বোঝা হাল্কা হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوا وَأَطِيعُوا} (١٦) سورة التغابن
"তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর এবং শোনো ও আনুগত্য কর।" (তাগাবুনঃ ১৬)
সুতরাং ভেবে দেখুন, আপনার মনে ভয়ের পরিমাণ কতটুকু? ভয় আছে, নাকি অনীহা কাজ করছে?
পুরুষের মনে নারীর প্রতি প্রকৃতিগত আকর্ষণ আছে। অনেক পুরুষের মাঝে তা সুপ্ত থাকে। অনেক পুরুষের মাঝে তা প্রদমিত থাকে। কিন্তু অনেক সময় নারীই সেই আকর্ষণকে জাগ্রত ও মুক্ত করে। সৎ চরিত্রের পুরুষ তা দমন করে। কিন্তু অসৎ চরিত্রের পুরুষ দমনে অক্ষম হয় এবং স্বাভাবিকভাবেই সেই আকর্ষণকারিণী নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আর তার ফলে তার মনে সেই নারীকে কাছে পাওয়ার তীব্র বাসনা প্রকট ও প্রবল হয়ে উঠে। এই জন্য মৌলিকভাবে এই অঘটনের সূত্রপাত ও ছিদ্রপথ বন্ধ করার লক্ষ্যে ইসলাম নানা বিধান দিয়েছে। তার মধ্যে একটা হল, মহিলা পথ চলাকালে বাজনাদার অলংকার পরবে না। কুরআন বলেছে,
{وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ} (۳۱) سورة النور
"তারা যেন এমন সজোরে পদক্ষেপ না করে, যাতে তাদের গোপন আভরণ প্রকাশ পেয়ে যায়।" (নূর: ৩১)
মহিলা এমন আকর্ষণীয় চাল-চলন প্রদর্শন করবে না, যাতে পুরুষ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। পর্দার ভিতরেও এমন সাজসজ্জা প্রকাশ করবে না, যাতে পুরুষের নজর কাড়ে। সুকেশিনী মহিলা পর্দার ভিতরে কেশ গোপন করবে, কিন্তু এমন উঁচু ক'রে রাখবে না, যাতে তার সেই কেশের কথা পুরুষ অনুমান করতে পারে এবং অসৎ চরিত্রের পুরুষ তার প্রতি লোভনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে, আর সেই সাথে মনের অভ্যন্তরে তার 'ভালোলাগা'টা 'ভালোবাসা'য় পরিণত না হয়ে যায়।
যে মহিলা ইসলামের এ বিধি লংঘন করে, তার জীবনে নেমে আসে অভিশাপ। সাধারণতঃ সে অপরাধিনীর চরিত্র ভালো হয় না এবং পরকালে তার জন্য শাস্তি অপেক্ষা করে। মহানবী বলেছেন,
صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا قَوْمٌ مَعَهُمْ سِيَاطٌ كَأَذْنَابِ الْبَقَرِ يَضْرِبُونَ بِهَا النَّاسَ وَنِسَاءً كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلاتٌ مَائِلَاتٌ رُءُوسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْمَائِلَةِ لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ ريحَهَا وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ كَذَا وَكَذَا ..
"দুই শ্রেণীর মানুষ জাহান্নামের অধিবাসী; যাদেরকে আমি দেখিনি। (তারা ভবিষ্যতে আসবে।) প্রথম শ্রেণী (অত্যাচারীর দল) যাদের সঙ্গে থাকবে গরুর লেজের মত চাবুক, যদ্বারা তারা লোককে প্রহার করবে। আর দ্বিতীয় শ্রেণী হল সেই নারীদল; যারা কাপড় তো পরিধান করবে, কিন্তু তারা বস্তুতঃ উলঙ্গ থাকবে, যারা পুরুষদের আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও তাদের প্রতি আকৃষ্ট হবে, যাদের মস্তক (খোঁপা বাঁধার কারণে) উটের হিলে যাওয়া কুঁজের মতো হবে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, তার গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধ এত এত দূরবর্তী স্থান থেকেও পাওয়া যাবে।" (আহমাদ ৮৬৬৫, মুসলিম ৫৭০৪, সিঃ সহীহাহ ১৩২৬নং)
উক্ত শ্রেণীর আকর্ষণকারিণী বেপর্দা মহিলারা অভিশপ্তা। মুসলিমরা তাদেরকে অভিশাপ দিতে আদিষ্ট হয়েছে। মহানবী বলেছেন,
((سَيَكُونُ فِي آخِرِ أُمَّتِي رِجَالٌ يَرْكَبُونَ عَلَى السُّرُوجِ كَأَشْبَاهِ الرِّجَالِ يَنْزِلُونَ عَلَى أَبْوَابِ الْمَسْجِدِ نِسَاؤُهُمْ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ عَلَى رُءُوسِهِمْ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْعِجَافِ الْعَنُوهُنَّ فَإِنَّهُنَّ مَلْعُونَاتٌ .......
"আমার শেষ যামানার উম্মতের মধ্যে কিছু এমন লোক হবে যারা ঘরের মত জিন্ (মোটর গাড়ি) তে সওয়ার হয়ে মসজিদের দরজায় দরজায় নামবে। (গাড়ি করে নামায পড়তে আসবে।) আর তাদের মহিলারা হবে অর্ধনগ্না; যাদের মাথা কৃশ উটের কুঁজের মতো (খোঁপা) হবে। তোমরা তাদেরকে অভিশাপ করো। কারণ, তারা অভিশপ্তা!" (আহমাদ ৭০৮-৩, ইবনে হিব্বান, ত্বাবারানী, সিঃ সহীহাহ ২৬৮-৩নং)
প্রদমিত বা সুপ্ত যৌনবাসনাকে মুক্ত বা জাগরিত করার আরো একটি অসীলা হল, মহিলার সুবাস বিতরণ করা। মহিলার নিকট থেকে বিতরিত এই সুবাসের ফলে পুরুষ আকৃষ্ট হয়। যে সৌন্দর্য ও সৌরভের একমাত্র অধিকারী তার স্বামী। কিন্তু পাপিনী ইসলামের সে বিধানের প্রতি উন্নাসিকতা প্রদর্শন করে। ফলে নিজের ক্ষতি নিজে করে। প্রকৃতপক্ষে এমন সুবাস বিতরণ ক'রে আকর্ষণ করার অভ্যাস ভালো মেয়েদের হয় না। তাই মহানবী বলেছেন,
((كُلُّ عَيْنِ زَانِيَةٌ ، وَالْمَرْأَةُ إِذا اسْتَعْطَرَتْ فَمَرَّتْ بِالْمَجْلِسِ فَهِيَ كَذَا وَكَذَا ))، يَعْنِي زَانِيَةً.
"প্রত্যেক চক্ষুই ব্যভিচারী। আর রমণী যদি সুগন্ধি ব্যবহার করে কোন (পুরুষের) মজলিসের পাশ দিয়ে পার হয়ে যায় তাহলে সে এক বেশ্যা।" (আহমাদ, সঃ তিরমিযী ২২৩৭, আবু দাউদ ৪১৭৫নং)
আবু হুরাইরা একদা চাশতের সময় মসজিদ থেকে বের হলেন। দেখলেন, একটি মহিলা মসজিদ প্রবেশে উদ্যত। তার দেহ বা লেবাস থেকে উৎকৃষ্ট সুগন্ধির সুবাস ছড়াচ্ছিল। আবু হুরাইরা মহিলাটির উদ্দেশে বললেন, 'আলাইকিস্ সালাম।' মহিলাটি সালামের উত্তর দিল। তিনি তাকে প্রশ্ন করলেন, 'কোথায় যাবে তুমি?' সে বলল, 'মসজিদে।' বললেন, 'কি জন্য এমন সুন্দর সুগন্ধি মেখেছ তুমি?' বলল, 'মসজিদের জন্য।' বললেন, 'আল্লাহর কসম?' বলল, 'আল্লাহর কসম।' পুনরায় বললেন, 'আল্লাহর কসম?' বলল, 'আল্লাহর কসম।' তখন তিনি বললেন, 'তবে শোন, আমাকে আমার প্রিয়তম আবুল কাসেম বলেছেন যে,
((لَا تُقْبَلُ لِاْمْرَأَةٍ صَلَاةٌ تَطَيَّبَتْ بِطِيبٍ لِغَيْرِ زَوْجِهَا حَتَّى تَغْتَسِلَ مِنْهُ غُسْلَهَا مِنَ الْجَنَابَةِ)).
“সেই মহিলার কোন নামায কবুল হয় না, যে তার স্বামী ছাড়া অন্য কারোর জন্য সুগন্ধি ব্যবহার করে; যতক্ষণ না সে নাপাকীর গোসল করার মত গোসল ক'রে নেয়।” অতএব তুমি ফিরে যাও, গোসল করে সুগন্ধি ধুয়ে ফেল। তারপর ফিরে এসে নামায পড়ো।' (আবু দাউদ ৪১৭৬, নাসাঈ ৫১২৭, ইবনে মাজাহ ৪০০২, বাইহাক্বী ৫৫৮২, সিলসিলাহ সহীহাহ ১০৩ ১নং)
সুপ্ত ও গুপ্ত যৌন কামনাকে জাগ্রত ও প্রকাশ করে মোহনীয় কণ্ঠে মহিলার কথোপকথন। মিষ্টি কথার আকর্ষণে অসৎ চরিত্রের লোকের মন মুগ্ধ হয়। ফলে তাকে না দেখলেও সুন্দর কথার উপর সুন্দর চেহারা কল্পনা করে এবং তা এক নজর দেখার কামনা পোষণ করতে শুরু করে। আর এইভাবে তাকে ধীরে-ধীরে ব্যভিচারের দিকে অগ্রসর করে। তাই ইসলাম গোড়াতেই তার শিকড় নির্মূল করার ব্যবস্থা দিয়ে বলেছে,
إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا}
“(হে নারীগণ!) যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কন্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর। (স্বাভাবিকভাবে কথা বল।)” (আহযাবঃ ৩২)
নিদ্রিত যৌন বাসনাকে জাগিয়ে তোলে নারী-পুরুষের পৃথক স্থানে নির্জনতাবলম্বন। যে স্থানে বা বাড়িতে যুবক-যুবতী একাকিত্ব অবলম্বন করে, সে স্থানে উভয়ের মনে এক প্রকার বাসনা সৃষ্টি হয়, যে বাসনা তাদেরকে ব্যভিচারের পথ প্রদর্শন করতে পারে। এই জন্য ইসলামের বিধান হল, বাড়িতে মহিলা একা থাকলে বেগানা পুরুষের উচিত, তার নিকট প্রবেশ না করা এবং কোন জরুরী প্রয়োজন পড়লে পর্দার অন্তরাল থেকেই তা পূরণ করা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
{ وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعاً فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ } [ الأحزاب : ٥٣ ]
অর্থাৎ, তোমরা তাদের নিকট হতে কিছু চাইলে পর্দার অন্তরাল হতে চাও। (সূরা আহযাব ৫৩ আয়াত)
একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন,
(( إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ ! )) فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الأَنْصَارِ : أَفَرَأَيْتَ الحَمْوَ ؟ قَالَ : (( الحمو المَوْتُ ! )) . متفق عَلَيْهِ
"তোমরা (বেগানা) নারীদের নিকট (একাকী) যাওয়া থেকে বিরত থাক।” (এ কথা শুনে) জনৈক আনসারী নিবেদন করল, 'স্বামীর আত্মীয় সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?' তিনি বললেন, "স্বামীর আত্মীয় তো মৃত্যুসম (বিপজ্জনক)।" (বুখারী ৫২৩২, মুসলিম ২১৭২, তিরমিযী ১১৭১নং)
তিনি বলেছেন,
(( لا تَلِجُوا عَلَى الْمُغِيبَاتِ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنْ أَحَدِكُمْ مَجْرَى الدَّم)).
"তোমরা সেই মহিলাদের নিকট গমন করো না যাদের স্বামীরা অনুপস্থিত আছে। কারণ, শয়তান তোমাদের রক্তশিরায় প্রবাহিত হয়।" (আহমাদ ১৪৩২৪, সঃ তিরমিযী ৯৩৫নং, সঃ ইবনে মাজাহ ১৭৭৯নং)
হ্যাঁ, স্বামী না থাকলে এবং মহিলা একাকিনী থাকলে পরপুরুষের সাথে অঘটন ঘটতেই পারে। সেই নির্জন স্থানে উভয়ের মনে কুমন্ত্রণা দেয় শয়তান। একজনকে অপরজনের প্রতি আকৃষ্ট করে। মহানবী ﷺ বলেছেন,
(( أَلا لا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةِ ، إِلَّا كَانَ ثَالِثَهَمَا الشَّيْطَانُ)).
"যখনই কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনতা অবলম্বন করে, তখনই শয়তান তাদের তৃতীয় সাথী (কোটনা) হয়।" (সহীহ তিরমিযী ৯৩৪নং, নাসাঈর কুবরা ৯২১৯, বাইহাক্বী ১৩৯০৪, হাকেম ৩৮-৭, ৩৯০, ত্বাবারানী ৫৬১নং)
এই জন্যই ইসলামের বিধান হল,
« لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةِ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ ». متفق عَلَيْهِ
"মাহরামের উপস্থিতি ছাড়া কোন পুরুষ যেন কোন মহিলার সাথে নির্জনবাস না করে।" (বুখারী ৫২৩৩, মুসলিম ৩৩৩৬নং)
কোন ক্ষেত্রেই না, না পার্থিব ও সাংসারিক কোন ক্ষেত্রে। আর না পারলৌকিক ও ইবাদতের ক্ষেত্রে। না কোন নির্জন প্রান্তরে বা কক্ষে। আর না কোন মসজিদ বা কুরআনের দর্সগাহে। না ডাক্তারের সাথে, আর না-ই নিজ হবু বর বা কনের সাথে। কারণ কোন ক্ষেত্রেই শয়তান নিজ কর্তব্যে অবহেলা করে না। আর আপনি নিজেও বলতে বাধ্য,
{وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّيَ إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ}
"আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না, মানুষের মন অবশ্যই মন্দকর্ম প্রবণ, কিন্তু সে নয় যার প্রতি আমার প্রতিপালক দয়া করেন। নিশ্চয় আমার প্রতিপালক অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (ইউসুফ: ৫৩)
যেখানে নারী-পুরুষের গোপনাঙ্গ দেখা যায়, সেখানে যাওয়া উচিত নয়, যেতে দেওয়া উচিত নয়। তাতেও নিজের ইজ্জত পরে দেখবে এবং পরের ইজ্জত নজরে আসবে। সেখানেও রয়েছে মান-সম্মানহানির ব্যাপার, রয়েছে আকর্ষণ ও ভালোলাগা থেকে ভালোবাসার ব্যাপার।
ইসলামের বিধান হল, সাধারণী স্নানঘাটে স্নান করা যাবে না, বিশেষ ক'রে মহিলাদের জন্য হারাম। যেমন খোলামেলা পুকুরঘাট, নদীঘাট বা সমুদ্রতীরে গোসল করা বৈধ নয়। অথবা কোন আম গোসলখানায় গোসল করা জায়েয নয়। মহানবী বলেছেন,
(وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يُدْخِلْ حَلِيلَتَهُ الْحَمَّامَ))
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে সে যেন তার স্ত্রীকে সাধারণ গোসলখানায় প্রবেশ করতে না দেয়।" (আহমাদ ১৪৬৫১, সহীহ তারগীব ১৬০নং)
উম্মে দারদা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি সাধারণ গোসলখানা হতে বের হলাম। ইত্যবসরে নবী -এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলে তিনি আমাকে বললেন, “কোথেকে, হে উম্মে দারদা?!" আমি বললাম, 'গোসলখানা থেকে।' তিনি বললেন,
((وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا مِنْ امْرَأَةٍ تَضَعُ ثِيَابَهَا فِي غَيْرِ بَيْتِ أَحَدٍ مِنْ أُمَّهَاتِهَا إِلَّا وَهِيَ هَاتِكَةٌ كُلَّ سِتْرِ بَيْنَهَا وَبَيْنَ الرَّحْمَنِ)).
"সেই সত্তার শপথ; যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! যে কোনও মহিলা তার কোন মায়ের ঘর ছাড়া অন্য স্থানে নিজের কাপড় খোলে, সে তার ও পরম দয়াময় (আল্লাহর) মাঝে প্রত্যেক পর্দা বিদীর্ণ করে ফেলে।" (আহমাদ ২৭০৩৮, তাবারানীর কাবীর, সহীহ তারগীব ১৬২নং)
তিনি আরো বলেছেন,
((أَيُّمَا امْرَأَةٍ نَزَعَتْ ثِيَابَهَا فِي غَيْرِ بَيْتِهَا خَرَقَ اللَّهُ عَنْهَا سِتْرًا)).
"যে নারী স্বগৃহ ছাড়া অন্য স্থানে নিজের পর্দা রাখে (কাপড় খোলে) আল্লাহ তার পর্দা ও লজ্জাশীলতাকে বিদীর্ণ করে দেন। (অথবা সে নিজে করে দেয়।) (আহমাদ ২৬৬১১, ত্বাবারানী ৭১০, হাকেম ৭৭৮২, শুআবুল ঈমান বাইহাক্বী ৭৭৭৪নং)
((أَيُّمَا امْرَأَةٍ نَزَعَتْ ثِيَابَهَا فِي غَيْرِ بَيْتِ زَوْجِهَا هَتَكَتْ سِتْرَ مَا بَيْنَهَا وَبَيْنَ رَبِّهَا)).
"যে মহিলা নিজের স্বামীগৃহ ছাড়া অন্য গৃহে নিজের কাপড় খোলে, সে আল্লাহ আয্যা অজাল্লা ও তার নিজের মাঝে পর্দা বিদীর্ণ করে ফেলে।" (আহমাদ ২৪১৪০, তিরমিযী ২৮০৩, ইবনে মাজাহ ৩৭৫০, হাকেম, সঃ জামে' ২৭১০নং)
বলা বাহুল্য, নারী-পুরুষ উভয়কেই গোসল করার সময় পর্দা করা উচিত। লজ্জাশীলতা ঈমানের অঙ্গ। আর নারীর ভূষণই হল লজ্জাশীলতা। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ حَيِيٌّ سِتِّيرُ يُحِبُّ الْحَيَاءَ وَالسَّتْرَ فَإِذَا اغْتَسَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْتَتِرُ ..
"অবশ্যই আল্লাহ আয্যা অজাল্ল অতি লজ্জাশীল ও গোপনকারী। তিনি লজ্জাশীলতা ও গোপনীয়তাকে পছন্দ করেন। সুতরাং তোমাদের কেউ গোসল করলে সে যেন পর্দা করে নেয়।" (আহমাদ ১৭৫০৯, আবু দাউদ ৪০ ১২, নাসাঈ ৪০৬নং)
ব্যাভিচারের একটি চোরাপথ হল বিবাহে অনীহা প্রকাশ করা। নানা অমূলক ওযরে ও খোঁড়া অজুহাতে বিবাহ করে না অনেক যুবক-যুবতী অথবা বিবাহ দিতে চায় না অনেক অভিভাবক।
কেউ বলে, 'ছেলে এখন ছোট, তার বয়স হয়নি।' অথচ তার মন নারীর নেশাতে চুর হয়ে আছে।
কেউ বলে, 'নিজের পায়ে দাঁড়াক, চাকরী পাক তারপর।'
কেউ মনোমতো পণ বা যৌতুক পায় না, তাই বিবাহে দেরী করে।
কেউ চাকরীর টাকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে চাকরি-ওয়ালী মেয়ের বিবাহে বিলম্ব করে।
কেউ কিশোরী মেয়ে আছে বলে তার বিয়ের বয়স ও বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত বিয়ের উপযুক্ত ছেলের বিয়ে পিছিয়ে দেয়।
অথচ মহান প্রতিপালকের নির্দেশ হল,
{وَأَنكِحُوا الْأَيَامَى مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ إِن يَكُونُوا فُقَرَاء يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ) (۳۲) سورة النور
"তোমাদের মধ্যে যাদের স্বামী-স্ত্রী নেই, তাদের বিবাহ সম্পাদন কর এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎ, তাদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত ক'রে দেবেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।" (নূরঃ ৩২)
আর মহানবী বলেছেন,
((إِذَا أَتَاكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ خُلُقَهُ وَدِينَهُ فَزَوِّجُوهُ ، إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ عريض)).
"তোমাদের নিকট যখন এমন ব্যক্তি (বিবাহের পয়গাম নিয়ে) আসে; যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা মুগ্ধ, তখন তার সাথে (মেয়ের) বিবাহ দাও। যদি তা না কর তাহলে পৃথিবীতে ফিৎনা ও মহাফাসাদ সৃষ্টি হয়ে যাবে।" (তিরমিযী ১০৮-৪, ইবনে মাজাহ ১৯৬৭, মিশকাত ৩০৯০, সিঃ সহীহাহ ১০২২নং)
বৈবাহিক জীবন অবলম্বন না করলে সত্যই মহাফাসাদ সৃষ্টি হয় পৃথিবীতে। বিবাহে যারা অনীহা প্রকাশ করেছে, যারা বিনা বিবাহে 'লিভ-টুগেদার' করে, যারা সমকামী হয়ে জীবন অতিবাহিত করে, তাদের জীবন নিশ্চয় সুশৃঙ্খল নয়। তাদের জীবনে থাকে নানা ফিতনা, ফাসাদ, অশান্তি ও অপমান। সে বেহায়াদের জীবন ছন্নছাড়া বাঁধনহারা। ঠিক হুইলের সাথে বাঁধন-ছেড়া ঘুড়ির মতো। কখন যে কোন হাওয়ায় উড়ে গিয়ে কোথায় পড়ে, তার ঠিকানা কেউ কি বলতে পারে?
ব্যভিচারের আরো একটি ছিদ্রপথ হল অভিভাবকের অভিভাবকত্বে অবজ্ঞা ও অবহেলা করা অথবা উদার মনোভাবের পরিচয় দিয়ে জেনেশুনে মেয়ের কাপ ও পাপ দেখে চুপ থাকা। যাকে মেড়ামি বা ভেড়ামি বলা যায়। মহানবী বলেছেন,
((ثَلَاثَةٌ لَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْعَاقُّ وَالِدَيْهِ وَالْمَرْأَةُ الْمُتَرَجِّلَةُ الْمُتَشَبِّهَةُ بِالرِّجَالِ وَالدَّيُّوتُ .......
"তিন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং তাদের প্রতি আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকিয়েও দেখবেন না; পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, পুরুষবেশিনী বা পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বনকারিণী মহিলা এবং দাইয়ূস (মেড়া) পুরুষ; (যে তার স্ত্রী, কন্যা ও বোনের চরিত্রহীনতা ও নোংরামিতে চুপ থাকে এবং বাধা দেয় না।) (আহমাদ ৬১৮০, নাসাঈ ২৫৬২, সহীহুল জামে' ৩০৭ ১নং)
এই মেড়াদের কি ভদ্র সমাজে কোন মান আছে বলতে পারেন?
মোটেই না। অবশ্য যুগের হাওয়া দেখে অনেকে জীবন-তরীর পাল তুলে ফায়দা নিতে চায়। বিয়ের অনুষ্ঠান ব্যয়বহুল দেখে অনেকে চায়, মেয়ের বিয়ে বিনা পয়সায় হয় তো হয়ে যাক। তার জন্য মেয়ের অস্বাভাবিক আচরণ দেখেও আপত্তি ও প্রতিবাদ করে না। ছেলে-বন্ধুদের সাথে অবাধে মেলামিশা করছে দেখেও বাধা দেয় না। তাদের মন বলে, 'ঘটে তো ঘটে যাক, পটে তো পটে যাক, লাগে তো লেগে যাক, আর বিনা পয়সায় বিয়েটা হয় তো হয়ে যাক।'
সে ক্ষেত্রে তারা জেনেশুনে দায়িত্ব এড়াতে চায়। ভুলে যায় শরীয়তের নির্দেশ, ভুলে যায় নিজ মান-সম্মানের কথা। কারণ, তার চাইতে বিশাল হল টাকা। কুল যায় তো চলে যাক, টাকা আমার জমা থাক। কিন্তু তারা জানে না যে, টাকা হারালে টাকা ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু মান হারালে মান ফিরে পাওয়া যায় না।
তারা জানে না অথবা মানে না যে, মহানবী বলেছেন,
(( كُلُّكُمْ رَاعٍ ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ : الإِمَامُ رَاعٍ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ فِي أَهْلِهِ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ ، وَالمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا وَمَسْئُولَةٌ عَنْ رَعِيَّتِهَا ، وَالخَادِم راع في مال سَيِّدِهِ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ ، وَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ )).
"প্রতিটি মানুষই দায়িত্বশীল। সুতরাং প্রত্যেকে অবশ্যই তার অধীনস্থদের দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। দেশের শাসক জনগণের দায়িত্বশীল। সে তার দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জবাবদিহী করবে। পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল। অতএব সে তার দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামীগৃহের দায়িত্বশীলা। কাজেই সে তার দায়িত্বশীলতা বিষয়ে জিজ্ঞাসিতা হবে। দাস তার প্রভুর সম্পদের দায়িত্বশীল। সে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনস্থের দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।" (বুখারী ৮৯৩, ২৪০৯, ৫১৮৮- প্রভৃতি, মুসলিম ৪৮-২৮-নং)
তিনি আরো বলেছেন,
(إِنَّ اللَّهَ سَائِلٌ كُلَّ رَاعٍ عَمَّا اسْتَرْعَاهُ ، حَفِظَ ذَلِكَ أَمْ ضَيَّعَ ، حَتَّى يَسْأَلَ الرَّجُلَ عَنْ أَهْل بَيْتِهِ)).
"আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক রক্ষককে তার রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে এবং প্রত্যেক তত্ত্বাবধায়ক ও অভিভাবককে তার তত্ত্বাবধান ও অভিভাবকত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন। যথার্থই কি তারা তাদের কর্তব্য পালন করেছে, নাকি অবহেলা হেতু তা বিনষ্ট করেছে?" (নাসাঈ ৯১৭৪, ইবনে হিব্বান ৪৪৯২, সঃ জামে' ১৭৭৪নং)
ব্যভিচারের একটি সূক্ষ্ম ছিদ্রপথ পরস্ত্রীর সৌন্দর্য নিজের স্বামীর কাছে বর্ণনা করা। যেখানে ঈর্ষা হওয়ার কথা, সেখানে তা না হয়ে পরস্ত্রীর রূপ-যৌবন নিজ স্বামীর কাছে বলে তৃপ্তি নিয়ে নিজের সর্বনাশ নিজেই ডেকে আনে কোন কোন অপরিণামদর্শী মহিলা। তার ফলে কিছু না হলেও স্বামীর হার্দিক ব্যভিচার হতে পারে। তাই শরীয়তের নিষেধাজ্ঞা হল,
(( لَا تُبَاشِرُ المَرْأَةُ المَرْأَةَ ، فَتَنْعَتَهَا لِزَوْجِهَا كَأَنَّهُ يَنْظُرُ إِلَيْهَا )). رواه البخاري
"কোন মহিলা যেন অন্য কোন মহিলাকে (নগ্ন) কোলাকুলি না করে। (কারণ) সে পরে তার স্বামীর কাছে তা এমনভাবে বর্ণনা করবে যে, যেন সে (তা শুনে) ঐ মহিলাকে প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করছে।" (বুখারী ৫২৪০-৫২৪১নং)
নিজ সম্ভ্রম বাঁচানোর মূলে যে জিনিস প্রধান ভূমিকা পালন করে, তা হল ঈমানের পর লজ্জাশীলতা। অবশ্য লজ্জাশীলতাও ঈমানের অন্যতম শাখা। সুতরাং মানুষ যখন লজ্জা-শরমের মাথা খায়, তখন নিজের ইজ্জত-সম্ভ্রমের খেয়াল রাখে না। খেয়াল রাখে না জাত-কুল-মানের মর্যাদার। খেয়াল রাখে না দ্বীন ও সমাজের। সকল কিছুকে তুচ্ছ ক'রে নির্লজ্জ নিজেকে সফল ও সুখী ধারণা করে। লজ্জাহীনতার তুফানে নিজ শিক্ষা, সংস্কার, চরিত্র, বংশীয় মর্যাদা ইত্যাদি ভেসে গেলেও সে নিজেকে 'বিজয়ী' ধারণা করে। কারণ সে তখন নিজেকে ভাবে, একজন 'হিরো' অথবা 'হিরোইন'। অথচ সে অনুভব করেও করে না যে, তার সে ধারণা ভুল। তার সামাজিক মর্যাদা ধূলামলিন। মহানবী বলেছেন,
((مَا كَانَ الْفُحْشُ فِي شَيْءٍ قَطُّ إِلَّا شَانَهُ وَلَا كَانَ الْحَيَاءُ فِي شَيْءٍ قَطُّ إِلَّا زَانَهُ)).
"অশ্লীলতা (নির্লজ্জতা) যে বিষয়েই থাকে, সে বিষয়কে তা সৌন্দর্যহীন (মান) করে ফেলে। আর লজ্জাশীলতা যে বিষয়েই থাকে, সে বিষয়কে তা সৌন্দর্যময় (মনোহর) করে তোলে।" (আহমাদ ১২৬৮-৯, বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ, সহীহ তিরমিযী ১৬০৭, ইবনে মাজাহ ৪১৮-৫৮, সহীহুল জামে' ৫৬৫৫নং)
নির্লজ্জের লজ্জা অবশিষ্ট থাকে না বলেই মান-সম্মানের খেয়াল না রেখেই সমাজে প্রকাশ্যে ধৃষ্টতা প্রদর্শন করতে পারে। কোন মানুষের কোন প্রকার পরোয়া না ক'রে নির্লজ্জতার ভূমিকা পালনে বড় পটীয়ান বা পটীয়সী হয়। মহানবী বলেছেন,
((إِنَّ مِمَّا أَدْرَكَ النَّاسُ مِنْ كَلَامِ النُّبُوَّةِ إِذا لَمْ تَسْتَحْيِ فَاصْنَعْ مَا شِئْتَ)).
"প্রথম নবুঅতের বাণীসমূহের যা লোকেরা পেয়েছে তার মধ্যে একটি বাণী এই যে, তোমার লজ্জা না থাকলে যা মন তাই কর।" (আহমাদ ১৭০৯০, বুখারী ৩৪৮৪, আবু দাউদ ৪৭৯৯, ইবনে মাজাহ ৪১৮-৩, সহীহুল জামে ২২৩০নং)
পক্ষান্তরে যে এমন কোন অপরাধ করে না, যার ফলে নিজ মান-সম্ভ্রমে আঁচড় পড়ে, সে চরিত্রবান। আর চরিত্রবানের প্রধান ভূমিকা হল লজ্জাশীল হওয়া। মহানবী বলেছেন,
((إِنَّ لِكُلِّ دِين خُلُقًا ، وَخُلُقُ الإِسْلامِ الْحَيَاءُ)).
"প্রত্যেক ধর্মে সচ্চরিত্রতা আছে, ইসলামের সচ্চরিত্রতা হল লজ্জাশীলতা।" (ইবনে মাজাহ ৪১৮-১-৪১৮২, সহীহুল জামে ২১৪৯নং)
বলা বাহুল্য, যে নির্লজ্জতা প্রদর্শনের পাপ করে, তার মান-সম্মান থাকে না, না আল্লাহর কাছে, আর না মানুষের কাছে।
অবশ্য দুটি জিনিস উক্ত নির্লজ্জতার ব্যাপারে সহযোগিতা করে অথবা ঢাকা- চাপা দেওয়ার কাজ করে। আর তা হল রাজনৈতিক প্রভাবশালিতা ও অর্থশালিতা। প্রভাবশালীদের অপরাধ সমাজে লঘুজ্ঞান করা হয়। তবে তলায় তলায় থাকে তাদের প্রতি আন্তরিক ঘৃণা।
ইসলাম যেমন নিজের ইজ্জত নিজে নষ্ট করতে নিষেধ করেছে, তেমনি নিষেধ করেছে অপরের ইজ্জত নষ্ট করতে। অবৈধ করেছে এমন আচরণকে, যাতে অপরের সম্ভ্রমে আঘাত লাগে। মহানবী বলেছেন,
(( كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ : دَمُهُ وَعِرْضُهُ وَمَالُهُ )) . رواه مسلم
"প্রত্যেক মুসলিমের রক্ত, সম্ভ্রম ও ধন-সম্পদ অন্য মুসলিমের উপর হারাম।" (মুসলিম ৬৭০৬নং)
(( أَلَا إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ عَلَيْكُمْ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا ، فِي بَلَدِكُم هَذَا ، في شَهْرِكُمْ هَذَا ، أَلا هَلْ بَلَغْتُ ؟ ( قَالُوا : نَعَمْ ، قَالَ : (( اللَّهُمَّ اشْهَدْ )) ثلاثاً.
"সতর্ক হয়ে যাও, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি তোমাদের রক্ত ও মাল হারাম ক'রে দিয়েছেন; যেমন তোমাদের এদিন হারাম তোমাদের এই শহরে, তোমাদের এই মাসে। শোনো! আমি কি (আল্লাহর পয়গাম) পৌঁছে দিয়েছি?" সাহাবীগণ বললেন, 'হ্যাঁ।' অতঃপর তিনি তিনবার বললেন, “হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক।” (বুখারী ৪৪০২, কিছু অংশ মুসলিম ২৩৪নং)
((الرِّبَا اثْنَانِ وَسَبْعُونَ بَاباً أَدْنَاهَا مِثْلُ إتيان الرَّجُل أُمَّهُ ، وَإِنَّ أَرْبَى الرِّبَا اسْتِطَالَةُ الرَّجُلِ فِي عَرْضِ أَخِيهِ)).
"সূদ (খাওয়ার পাপ হল) ৭২ প্রকার। যার মধ্যে সবচেয়ে ছোট পাপ হল মায়ের সাথে ব্যভিচার করার মতো! আর সবচেয়ে বড় (পাপের) সুদ হল নিজ (মুসলিম) ভাইয়ের সম্ভ্রম নষ্ট করা।" (ত্বাবারানীর আউসাত্ব ৭১৫১, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৮৭১নং)
উমার বলেছেন, 'কোন ব্যক্তির বাকপটুতা যেন তোমাদেরকে মুগ্ধ না করে। ব্যক্তি হল সেই, যে আমানত আদায় করল এবং লোকের সম্ভ্রম লুটা থেকে বিরত থাকল।' (আল-ইসাবাহ ৬৪০২নং)
ইসলাম নিষেধ করেছে কোন মানুষের চরিত্রে কালিমা লেপন করতে, বিনা অপরাধে অপরকে কষ্ট দিতে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ وَالَّذِينَ يُؤْدُّونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا }
"যারা বিনা অপরাধে বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ এবং স্পষ্ট অপরাধের বোঝা বহন করে।" (আহযাবঃ ৫৮)
নির্দোষ চরিত্রে কলঙ্ক দেওয়া এক মহা অপরাধ। অপরাধীরা নবীপত্নীর চরিত্রেও অপবাদ দিতে কসুর করেনি। মহান আল্লাহ সে চরিত্রের পবিত্রতা ঘোষণা ক'রে মুসলিমদের জন্য একটি সাধারণ বিধান দিয়ে বলেছেন,
{وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاء فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ} (٤) سورة النور
"যারা সাধুী রমণীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর স্বপক্ষে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশি বার কশাঘাত করবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না; এরাই তো সত্যত্যাগী।" (নূর: ৪)
কিন্তু যে পরিবেশে এ বিধান কার্যকর করা হয় না, সে পরিবেশে কত নিরপরাধ মানুষের প্রতি মিথ্যারোপ করা হয়, তার ইয়ত্তা নেই। দেশের আইন সেই সকল অপরাধীদের শায়েস্তা করতে পারে না বিধায় অপরাধ তথা অপবাদের বাজার গরম থাকে মজলিসে-মজলিসে। কিন্তু তারা হয়তো জানে না বা বিশ্বাস করে না যে, দুনিয়ার বিচার থেকে বেঁচে গেলেও শেষ বিচারের দিন তাদের উপর ঐ দন্ডবিধি প্রয়োগ করা হবে। মহানবী বলেছেন,
(( مَنْ قَدْفَ مَمْلُوكَهُ بِالزِّنَى يُقَامُ عَلَيْهِ الحَدُّ يَومَ القِيَامَةِ ، إِلَّا أَنْ يَكُونَ كَمَا قَالَ )).
"যে ব্যক্তি নিজ মালিকানাধীন দাসের উপর ব্যভিচারের অপবাদ দেবে, কিয়ামতের দিন তার উপর হদ (দণ্ডবিধি) প্রয়োগ করা হবে। তবে সে যা বলেছে, দাস যদি তাই হয় (তাহলে ভিন্ন কথা।)" (বুখারী ৬৮৫৮, মুসলিম ৪৪০ ১নং)
বহু মানুষ আছে, যারা ভালোর ঘরে মন্দ চায়। পবিত্র পরিবেশে অপবিত্রতা কামনা করে। পরিচ্ছন্ন পরিবারে নোংরামি প্রবেশ করাতে চায়। তারা চায় সৎ লোকের বাড়িতে পাপ অনুপ্রবেশ করুক। বেশ্যা চায়, সারা দুনিয়ার মেয়েরা বেশ্যা হোক। তারা চায়, আমার মেয়ে যেমন প্রেম ক'রে বেরিয়ে গেছে, তেমনি অন্যের মেয়েও বেরিয়ে যাক, আমার ছেলে যেমন লম্পট, তেমনি অন্যের ছেলেও লম্পট হোক। অনেকে অন্যের ঘরে ছলে-বলে-কলে-কৌশলে অশ্লীলতা প্রবিষ্ট করে এবং অনেকে তাতে অক্ষম হলে অপবাদ রচনা করে রটনা করে। তারা চায় না, কোন সৎ লোকের পরিবেশ ভালো থাকুক। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} (۱۹) سورة النور
"যারা মু'মিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য আছে ইহলোকে ও পরলোকে মর্মন্তুদ শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না।" (নূর: ১৯)
পবিত্র চরিত্রে কলঙ্ক দেওয়া একটি কদর্য আচরণ ও সর্বনাশী কর্ম। একদা মহানবী বললেন,
اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ ..
“তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী কর্ম হতে দূরে থাক।” সকলে বলল, ‘হে আল্লাহর রসূল! তা কী কী?’ তিনি বললেন,
ه الشَّرْكُ بِاللَّهِ وَالسِّحْرُ وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ وَأَكْلُ الرِّبَا وَالتَّوَلَّى يَوْمَ الزَّحْفِ وَقَدْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ ..
“আল্লাহর সাথে শির্ক করা, যাদু করা, ন্যায় সঙ্গত অধিকার ছাড়া আল্লাহ যে প্রাণ হত্যা করা হারাম করেছেন তা হত্যা করা, সুদ খাওয়া, এতীমের মাল ভক্ষণ করা, (যুদ্ধক্ষেত্র হতে) যুদ্ধের দিন পলায়ন করা এবং সতী উদাসীনা মুমিনা নারীর চরিত্রে মিথ্যা কলঙ্ক দেওয়া।” (বুখারী ২৭৬৬, মুসলিম ২৭২নং, আবু দাউদ, নাসাঈ)
তিনি আরো বলেছেন,
وَمَنْ قَالَ فِي مُؤْمِن مَا لَيْسَ فِيهِ حُبِسَ فِي رَدْغَةِ الْخَبَالِ حَتَّى يَخْرُجَ مِمَّا قَالَ ».
“আর যে ব্যক্তি কোন মুমিন মানুষের চরিত্রে এমন কথা বলে, যা তার মধ্যে নেই, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ জাহান্নামের নর্দমায় বাস করতে দেবেন; যতক্ষণ পর্যন্ত না সে যা বলেছে তা হতে বের হয়ে এসেছে। কিন্তু তখন আর সে বের হতে পারবে না।” (আবু দাউদ ৩৫৯৭, হাকেম ২/২৭, ত্বাবারানী ১৩২৫৪, বাইহাকী ১১৭৭৩, সহীহুল জামে' ৬১৯৬নং)
এই সকল কথা জেনেও আলেম হয়ে নির্দ্বিধায় আলেমকে অপবাদ দেয়, ‘অমুক দরবারী আলেম। অমুক সরকারের পা-চাঁটা। অমুক ইয়াহুদীর দালাল। অমুক ইংরেজের আওলাদ। অমুক দাজ্জালের গোলাম।’ ইত্যাদি। তাহলে আর জাহেলদের ব্যাপারে কী বলবেন?
এইভাবে হয়তো অনেকে তার বক্তব্য ও লেখনীতে প্রকাশ করে না, কিন্তু মনে মনে অনেকের প্রতি কুধারণা পোষণ করে। আর তা যে কোন সময়ে গীবত বা অপবাদের আকার ধারণ করতে পারে। অথচ এ ব্যাপারে ইসলামের বিধান কত সুন্দর! মহানবী বলেছেন,
(( إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ ، فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الحَدِيثِ ، وَلَا تَحَسَّسُوا وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا تَنَافَسُوا ، وَلَا تَحَاسَدُوا ، وَلَا تَبَاغَضُوا ، وَلَا تَدَابَرُوا ، وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا كَمَا أَمَرَكُمْ الْمُسْلِمُ أَخُو المُسْلِمِ ، لَا يَظْلِمُهُ ، وَلَا يَخْذُلُهُ وَلَا يَحْقِرُهُ ، التَّقْوَى هَاهُنَا التَّقْوَى هَاهُنَا )) وَيُشِيرُ إِلَى صَدْرِهِ (( بِحَسْبِ امْرِيءٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ ، كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ : دَمُهُ ، وَعِرْضُهُ ، وَمَالُهُ ، إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى أَجْسَادِكُمْ ، وَلَا إِلَى صُوَرِكُمْ ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ )) .
"তোমরা কুধারণা পোষণ করা থেকে বিরত থাক। কারণ কুধারণা সব চাইতে বড় মিথ্যা কথা। অপরের গোপনীয় দোষ খুঁজে বেড়ায়ো না, অপরের জাসুসী করো না, একে অপরের সাথে (অসৎ কাজে) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করো না, পরস্পর হিংসা করো না, পরস্পরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করো না, একে অপরের বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন হয়ো না। তোমরা আল্লাহর বান্দা, ভাই ভাই হয়ে যাও; যেমন তিনি তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে তার প্রতি যুলুম করবে না, তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেবে না এবং তাকে তুচ্ছ ভাববে না। আল্লাহভীতি এখানে রয়েছে। আল্লাহভীতি এখানে রয়েছে। (এই সাথে তিনি নিজ বুকের দিকে ইঙ্গিত করলেন।) কোন মুসলমান ভাইকে তুচ্ছ ভাবা একটি মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রত্যেক মুসলমানের রক্ত, সম্ভ্রম ও সম্পদ অপর মুসলমানের উপর হারাম। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের দেহ ও আকার- আকৃতি দেখেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমল দেখেন।" (মুসলিম ৬৭০১-৬৭০৫, বুখারী ৫১৪৩, ৬০৬৪, ৬০৬৬, ৬৭২৪নং)
আসলেই হৃদয়ের 'তাক্বওয়া' এমন জিনিস, দুশমন হলেও তার কথা ও আচরণে সংযম সৃষ্টি করে, ন্যায়পরায়ণতার গন্ডি থেকে বের হতে বাধাদান করে। 'তাক্বওয়া' হল উত্তম সম্বল। 'তাক্বওয়া' হল উত্তম লেবাস। ইল্ম হল অলংকার। কিন্তু যে সম্বলহীন বিবস্ত্র, তার অলংকারে কী শোভা দেবে?
অনেকে অপরের ছিদ্রান্বেষণ ক'রে ও দোষ খুঁজে তাকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করতে প্রয়াস পায়। অপরের গোপন ত্রুটি অনুসন্ধান ক'রে লোকালয়ে তাকে উলঙ্গ করে। নিশ্চয় তারা ফাসাদী। মহানবী বলেছেন,
(( إِنَّكَ إِنِ اتَّبَعْتَ عَوْرَاتِ الْمُسْلِمِينَ أَفْسَدْتَهُمْ ، أَوْ كِدْتَ أَنْ تُفْسِدَهُمْ ))
"যদি তুমি মুসলমানদের গুপ্ত দোষগুলি খুঁজে বেড়াও, তাহলে তুমি তাদের মাঝে ফাসাদ সৃষ্টি ক'রে দেবে অথবা তাদের মধ্যে ফাসাদ সৃষ্টি করার উপক্রম হবে।" (আবু দাউদ ৪৮৯০নং)
এমন ফাসাদীদের আচরণে থাকে মুনাফিকী আচরণ। যে মুনাফিকদেরকে সম্বোধন ক'রে মহানবী বলেছেন,
يَا مَعْشَرَ مَنْ آمَنَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يَدْخُل الإِيمَانُ قَلْبَهُ لا تَغْتَابُوا الْمُسْلِمِينَ وَلَا تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ فَإِنَّهُ مَنِ اتَّبَعَ عَوْرَاتِهِمْ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ فِي بَيْتِهِ ..
"হে সেই মানুষের দল; যারা মুখে ঈমান এনেছে এবং যাদের হৃদয়ে ঈমান স্থান পায়নি (তারা শোন)! তোমরা মুসলিমদের গীবত করো না এবং তাদের দোষ খুঁজে বেড়ায়ো না। কারণ, যে ব্যক্তি তাদের দোষ খুঁজবে, আল্লাহ তার দোষ ধরবেন। আর আল্লাহ যার দোষ ধরবেন, তাকে তার ঘরের ভিতরেও লাঞ্ছিত করবেন।" (আহমাদ ৪/৪২০, আবু দাউদ ৪৮৮২, আবু য়্যা'লা, সহীহুল জামে' ৭৯৮৪নং)
হে আল্লাহ! সেই মুনাফিকদেরকে তুমি সত্বর লাঞ্ছিত কর, যারা নিরপরাধ মানুষদের দোষ ধ'রে ও প্রচার ক'রে বেড়ায়।
পরন্তু এই শ্রেণীর মানুষরাও দোষমুক্ত নয়। কিন্তু নিজেদের দোষকে দোষ মনে করে না। পরের সামান্য দোষকেও অসামান্য ও বিশালরূপে দেখতে পায়। মহানবী বলেছেন,
((يَبْصُرُ أَحَدُكُمُ الْقَدْى فِي عَيْنٍ أَخِيهِ وَيَنْسَى الْجِدْعَ فِي عَيْنِهِ)).
"তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের চোখে কুটা দেখতে পায়, কিন্তু নিজের চোখে গাছের গুঁড়ি দেখতে ভুলে যায়!" (ইবনে হিব্বান ৫৭৬১, সহীহুল জামে ৮০ ১৩নং)
এখানেই শেষ নয়, তারা সেই দোষ অপরের কাছে গেয়ে বেড়ায়। কথায় ও কলমে অপরের গীবত করে। যে গীবত মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার সমান। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بعْضُكُم بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ) (۱۲) سورة الحجرات
"হে মু'মিনগণ! তোমরা বহুবিধ ধারণা হতে দূরে থাক; কারণ কোন কোন ধারণা পাপ। আর তোমরা অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা (গীবত) করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভ্রাতার গোস্ত ভক্ষণ করতে চাইবে? বস্তুতঃ তোমরা তো এটাকে ঘৃণ্যই মনে কর। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ তাওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু। (হুজুরাতঃ ১২)
ভালো-মন্দ ও আলেম-জাহেল প্রায় সকল নারী-পুরুষের আচরণে থাকে পরের সম্ভ্রমহরণকারী এই মহাপাপ। কুরআন-হাদীসের বাণী তাদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করতে পারে না। দুনিয়াতে তাদের তেমন কোন শাস্তি প্রয়োগ করা হয় না। তাই আখেরাতে আছে চরম শাস্তি। মহানবী বলেছেন,
(( لَمَّا عُرِجَ بِي مَرَرْتُ بِقَومٍ لَهُمْ أَطْفَارٌ مِنْ نُحَاسِ يَحْمِشُونَ وُجُوهَهُمْ وَصُدُورَهُمْ فَقُلْتُ : مَنْ هَؤُلَاءِ يَا جِبْرِيلُ ؟ قَالَ : هَؤُلَاءِ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ لُحُومَ النَّاسِ ، وَيَقَعُونَ فِي أَعْرَاضِهِمْ ! )) . رواه أبو داود
"যখন আমাকে মি'রাজে নিয়ে যাওয়া হল, সে সময় এমন ধরনের কিছু মানুষের নিকট দিয়ে অতিক্রম করলাম, যাদের নখ ছিল তামার, তা দিয়ে তারা নিজেদের মুখমন্ডল নুচে ক্ষত-বিক্ষত করছিল। আমি, প্রশ্ন করলাম, ওরা কারা? হে জিব্রীল! তিনি বললেন, ওরা সেই লোক, যারা মানুষের মাংস ভক্ষণ করত ও তাদের সম্ভ্রম লুটে বেড়াত।" (আহমাদ ৩/২২৪, সহীহ আবু দাউদ ৪০৮২ নং)
অপরকে গালি দেওয়ার পাপের প্রভাব পড়ে মানুষের চরিত্রে, বংশে ও সম্মানে। অথচ যাকে গালি দেওয়া হয়, সে গালি খাওয়ার যোগ্য না হলে সে গালি ফিরে এসে গালিদাতাকেই লাগে।
মহানবী বলেছেন,
(( لَا يَرْمِي رَجُلٌ رَجُلاً بِالفِسْقِ أَوِ الكُفْرِ ، إِلَّا ارْتَدَّتْ عَلَيْهِ ، إِنْ لَمْ يَكُنْ صَاحِبُهُ كَذَلِكَ )) . رواه البخاري
"যখন কোন মানুষ অন্য মানুষের প্রতি 'ফাসেক' অথবা 'কাফের' বলে অপবাদ দেয়, তখনই তা তার উপরেই বর্তায়; যদি তার প্রতিপক্ষ তা না হয়।" (বুখারী ৬০৪৫নং)
নিশ্চয় গালি দেওয়া মহাপাপ। গালি দেওয়া ফাসেকের কাজ। মহানবী বলেছেন,
(سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ ، وَقِتَالُهُ كُفْرٌ). متفق عَلَيْهِ
"মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেকী (আল্লাহর অবাধ্যাচরণ) এবং তার সাথে লড়াই করা কুফরী।" (বুখারী ৪৮, ৬০৪৪, মুসলিম ২৩০নং, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)
গালি দেওয়া শয়তানের কাজ এবং রাগে গালি দেওয়ার সময় গালিদাতা মিথ্যাই বলে। এই জন্য গালির বদলেও গালি দেওয়া উচিত নয়। ইয়ায বিন হিমার বলেন, একদা আমি বললাম, 'হে আল্লাহর নবী! আমার চাইতে ছোট হয়েও আমার সম্প্রদায়ের কোন লোক যদি আমাকে গালি-গালাজ করে, তাহলে আমি তার প্রতিশোধ নিলে দোষ আছে কি?' উত্তরে তিনি বললেন,
(( الْمُسْتَبَّانِ شَيْطَانَانِ يَتَهَاتَرَانِ وَيَتَكَاذِبَانِ)).
"উভয় গালমন্দকারী দুই শয়তান। এরা পরস্পরের উপর মিথ্যা দোষারোপ করে এবং অসত্য বলে।" (আহমাদ ১৭৪৮-৩, বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ, ইবনে হিব্বান, সহীহুল জামে' ৬৬৯৬নং)
কত মানুষ সম্মানীর অসম্মান করে। তার সাথে মতে মিলে না বলে মুখে ও কলমে তাকে খোঁচা দেয়, খোঁটা দেয়। তার প্রতি হিংসা আছে বলে তার ব্যাপারে বিষোদ্গার করে। আত্মমুগ্ধতায় অন্ধ মানুষের অহংকার আছে বলে অপরকে লোকের কাছে অসম্মান করে।
'দুষ্টগণে ঘাট পেলে হাট মাঝে বলে,
অনা'সে মানীর মান ফেলে দেয় জলে।'
যে ব্যক্তি মানীর মানহানি করে, সে আর কি সত্যিকারার্থে নবীর উম্মতী হতে পারে? মহানবী বলেছেন,
((لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرِنَا ، وَيَعْرِفْ شَرَفَ كَبيرنَا )).
"সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং আমাদের বড়দের সম্মান জানে না।" (তিরমিযী ১৯২০নং) আবু দাউদের বর্ণনায় আছেঃ "আমাদের বড়দের অধিকার জানে না।" (আবু দাউদ ৪৯৪৫নং)
তিনি আরো বলেছেন,
((لَيْسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَمْ يُجِلَّ كَبِيرَنَا وَيَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا حَقَّهُ)).
"সে ব্যক্তি আমার উম্মতের দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি আমাদের বড়দেরকে সম্মান দেয় না, ছোটদেরকে স্নেহ করে না এবং আলেমের অধিকার চেনে না।" (আহমাদ ২২৭৫৫, ত্বাবারানী, হাকেম, সহীহ তারগীব ৯৫ নং)
অজ্ঞতা ও আত্মমুগ্ধতা মানুষকে মানীর মানহানি করতে উদ্বুদ্ধ করে। আত্মসচেতন মানুষ প্রত্যেক সম্মানীকে তার যথার্থ সম্মান প্রদান করে। প্রস্তুত থাকে সেই দিনের জন্য, যেদিনে প্রত্যেক অন্যায়ের প্রতিশোধ দিতে হবে। মহানবী বলেছেন,
(( مَنْ كَانَتْ عِنْدَهُ مَظْلِمَةٌ لأخيه ، مِنْ عِرْضِهِ أَوْ مِنْ شَيْءٍ ، فَلْيَتَحَلَّلَهُ مِنْهُ اليَوْمَ قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارٍ وَلَا دِرْهَمْ ، إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِهِ ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ )). رواه البخاري
"যদি কোন ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি তার সম্ভ্রম বা অন্য কিছুতে কোন যুলুম ও অন্যায় করে থাকে, তাহলে সেদিন আসার পূর্বেই সে যেন আজই তার নিকট হতে (ক্ষমা চাওয়া অথবা প্রতিশোধ দেওয়ার মাধ্যমে) নিজেকে মুক্ত করে নেয়; যেদিন (ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য) না দীনার হবে না দিরহাম। (সেদিন) যালেমের নেক আমল থাকলে তার যুলুম অনুপাতে নেকী তার নিকট থেকে কেটে নিয়ে (মযলুমকে দেওয়া) হবে। পক্ষান্তরে যদি তার নেকী না থাকে (অথবা নিঃশেষ হয়ে যায়) তাহলে তার (মযলুম) প্রতিবাদীর গোনাহ নিয়ে তার ঘাড়ে চাপানো হবে।" (বুখারী ২৪৪৯, ৬৫৩৪, তিরমিযী ২৪১৯নং)
সম্ভ্রম বাঁচাতে সতর্কতাবলম্বন করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য। যে সন্দিগ্ধ কাজ করলে তার চরিত্রে দাগ লাগতে পারে, সে কাজ করা উচিত নয়। যে স্থানে গেলে তার সম্ভ্রম নষ্ট হতে পারে, সে স্থানে যাওয়া তার জন্য শোভনীয় নয়। যার সাথে পথ চললে তার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতে পারে, তার সাথে পথ চলা সঙ্গত নয়। এ ব্যাপারে ব্যাপক নির্দেশ দিয়ে মহানবী বলেছেন,
(( إِنَّ الحَلالَ بَيِّنُ ، وَإِنَّ الحَرامَ بَيِّنُ ، وَبَيْنَهُمَا مُشْتَبَهَاتٌ لَا يَعْلَمُهُنَّ كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ ، فَمَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ ، اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ ، وَمَنْ وَقَعَ فِي الشُّبُهَاتِ وَقَعَ فِي الحَرَامِ ، كَالرَّاعِي يَرْعَى حَوْلَ الحِمَى يُوشِكُ أَنْ يَرْتَعَ فِيهِ ، أَلاَ وَإِنَّ لِكُلِّ مَلِكٍ حِمَى ، أَلَا وَإِنَّ حِمَى اللَّهِ مَحَارِمُهُ ، أَلَا وَإِنَّ فِي الجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَت صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ ، أَلَا وَهِيَ القَلْبُ )) متفقٌ عَلَيْهِ
"অবশ্যই হালাল বিবৃত ও স্পষ্ট এবং হারাম বিবৃত ও স্পষ্ট, আর উভয়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দিহান বস্তু; যা অনেক লোকেই জানে না। অতএব যে ব্যক্তি এই সন্দিহান বস্তুসমূহ হতে দূরে থাকবে, সে তার দ্বীন ও ইজ্জতকে বাঁচিয়ে নেবে এবং যে ব্যক্তি সন্দিহানে পতিত হবে (সন্দিগ্ধ বস্তু ভক্ষণ করবে), সে হারামে পতিত হবে। (এর উদাহরণ সেই) রাখালের মত, যে নিষিদ্ধ চারণভূমির আশেপাশে পশু চরায়, তার পক্ষে নিষিদ্ধ সীমানায় পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শোন! প্রত্যেক বাদশাহরই সংরক্ষিত চারণভূমি থাকে। আর শোন! আল্লাহর সংরক্ষিত চারণভূমি হল তাঁর হারামকৃত বস্তুসমূহ। শোন! দেহের মধ্যে একটি মাংসপিন্ড রয়েছে; যখন তা সুস্থ থাকে, তখন গোটা দেহটাই সুস্থ হয়ে থাকে। আর যখন তা খারাপ হয়ে যায়, তখন গোটা দেহটাই খারাপ হয়ে যায়। শোন! তা হল হৃৎপিণ্ড (অন্তর)।" (বুখারী ৫২, ২০৫১, মুসলিম ৪১৭৮নং)
যেমন প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য, অপরের সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হলে প্রতিবাদ করা। সম্ভ্রম লুণ্ঠনের পথে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং লুণ্ঠন সম্পাদিত হলে তার প্রতিকার খোঁজা। এ ক্ষেত্রে কারো উচিত নয় মুচকি হাসি হাসা, কারণ সে তার মত-বিরোধী। উচিত নয় চুপ থাকা, কারণ সে তার আত্মীয় নয়। সঙ্গত নয় মৌন সমর্থন করা, কারণ সে তার পোলাও খেতে পায় না। উচিত নয় তোষামদ করা, কারণ সে তার সম্মুখে নেই। এই প্রতিবাদে তার সওয়াব আছে। মহান আল্লাহর কাছে প্রতিদান আছে। মহানবী বলেছেন,
(( مَنْ رَدَّ عَنْ عِرْضٍ أَخِيهِ ، رَدَّ اللهُ عَنْ وَجْهِهِ النَّارَ يَومَ القِيَامَةِ )) .
"যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের সম্ভ্রম রক্ষা করবে, কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের আগুন থেকে তার চেহারাকে রক্ষা করবেন।" (তিরমিযী ১৯৩ ১নং, হাসান)
مَنْ ذَبَّ عَنْ عِرْضِ أَخِيهِ بِالْمَغِيبِ كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ يَعْتِقَهُ مِنَ النَّاسِ).
"যে ব্যক্তি তার (মুসলিম) ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে (তার গীবত করা ও ইজ্জত লুটার সময় প্রতিবাদ করে) তার সম্ভ্রম রক্ষা করে, সেই ব্যক্তি আল্লাহর নিকট এই অধিকার পায় যে, তিনি তাকে দোযখ থেকে মুক্ত করে দেন।" (আহমাদ ২৭৬০৯-২৭৬১০, ত্বাবারানী ১৯৯১৬, সহীহুল জামে' ৬২৪০ নং)
পক্ষান্তরে যদি কেউ তার কোন মুসলিম ভাইয়ের সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হতে দেখে প্রতিবাদ ক'রে তার সাহায্য না করে, তাহলে তার সম্ভ্রম বাঁচাতেও মহান আল্লাহ সাহায্য করবেন না। মহানবী বলেছেন,
مَا مِنِ امْرِئٍ يَخْذُلُ امْرَأَ مُسْلِمًا فِي مَوْضِعِ تُنْتَهَكُ فِيهِ حُرْمَتُهُ وَيُنْتَقَصُّ فِيهِ مِنْ عِرْضِهِ إِلَّا خَدْلَهُ اللَّهُ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ فِيهِ نُصْرَتَهُ وَمَا مِنِ امْرِئٍ يَنْصُرُ مُسْلِمًا فِي مَوْضِعِ يُنْتَقَصُ فِيهِ مِنْ عِرْضِهِ وَيُنْتَهَكُ فِيهِ مِنْ حُرْمَتِهِ إِلَّا نَصَرَهُ اللَّهُ فِي مَوْطِن يُحِبُّ نُصْرَتَهُ ..
"যে কোনও ব্যক্তি কোন মুসলিম ব্যক্তিকে সেই জায়গায় সাহায্য না করে বর্জন করবে, যেখানে তার সম্ভ্রম লুটা হয় এবং তার ইজ্জত নষ্ট করা হয়, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ সেই জায়গায় সাহায্য না করে বর্জন করবেন, যেখানে সে তাঁর সাহায্য পেতে পছন্দ করে। আর যে কোনও ব্যক্তি কোন মুসলিম ব্যক্তিকে সেই জায়গায় সাহায্য করবে, যেখানে তার সম্ভ্রম লুটা হয় এবং তার ইজ্জত নষ্ট করা হয়, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ সেই জায়গায় সাহায্য করবেন, যেখানে সে তাঁর সাহায্য পেতে পছন্দ করে।" (আবু দাউদ ৪৮৮-৬, সহীহুল জামে' ৫৬৯০নং)
সুতরাং হে মুসলিম! তুমিই প্রকৃত মানুষ। নিজের সম্ভ্রম বাঁচাও এবং প্রকৃত মানুষ হও।
📄 মাল-ধনের উপর পাপের প্রভাব
বহু পাপ এমন আছে, যা করার ফলে মানুষের মাল-ধনের ক্ষতি হয়। বহু বিধান এমন আছে, যা অমান্য করলে মানুষের সম্পদের সমূহ ক্ষতি হয়। ইসলামের একটি মৌলিক বিধান হচ্ছে,
(لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَار).
"কারো জন্য অপরের কোন প্রকার ক্ষতি করা বৈধ নয়। কোন দু'জনের জন্য প্রতিশোধমূলক পরস্পরকে ক্ষতিগ্রস্ত করাও বৈধ নয়।" (অথবা কেউ অপরের ক্ষতি করবে না এবং অপরের ক্ষতি করার পরিবর্তেও ক্ষতি করবে না।) (আহমাদ ২৮-৬৫, ইবনে মাজাহ ২৩৪১, সহীহুল জামে' ৭৫১৭নং)
এ বিধান অমান্য করলে মুসলিমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
হারাম উপার্জন করা ও খাওয়া হতে ইসলাম ভীতি প্রদর্শন করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضِ مِّنكُمْ وَلَا تَقْتُلُواْ أَنفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا} (۲۹) سورة النساء
“হে মু'মিনণ! তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। তবে তোমাদের পরস্পর সম্মতিক্রমে ব্যবসার মাধ্যমে (গ্রহণ করলে তা বৈধ)। আর নিজেদেরকে হত্যা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।” (নিসাঃ ২৯)
মহানবী বলেছেন,
أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ اللَّهَ طَيِّبُ لَا يَقْبَلُ إِلا طَيِّبًا وَإِنَّ اللَّهَ أَمَرَ الْمُؤْمِنِينَ بِمَا أَمَرَ بِهِ الْمُرْسَلِينَ فَقَالَ ( يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّى بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ) وَقَالَ (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ) .. ثُمَّ ذَكَرَ الرَّجُلَ يُطِيلُ السَّفَرَ أَشْعَثَ أَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ يَا رَبِّ يَا رَبِّ وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ وَغُذِيَ بالْحَرَامِ فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذلِكَ ..
“হে লোক সকল! অবশ্যই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র (মালই) কবুল করে থাকেন। আল্লাহ মুমিনদেরকে সেই আদেশ করেছেন, যে আদেশ করেছেন আম্বিয়াগণকে। সুতরাং তিনি আম্বিয়াগণের উদ্দেশ্যে বলেছেন, 'হে রসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তুসমূহ থেকে আহার কর এবং সৎকাজ কর। তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবহিত।' (সূরা মু'মিনুন ৫১ আয়াত)
আর তিনি (মুমিনদের উদ্দেশ্যে) বলেছেন, 'হে মুমিনগণ! আমি তোমাদেরকে যে সব রুজী দান করেছি তা থেকে পবিত্র বস্তু আহার কর---।' (বাক্বারাহ ১৭২)
অতঃপর তিনি সেই ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে লম্বা সফর করে আলুথালু ধূলিমলিন বেশে নিজ হাত দু'টিকে আকাশের দিকে লম্বা করে তুলে দুআ করে, 'হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রভু!' কিন্তু তার আহার্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পরিধেয় লেবাস হারাম এবং হারাম দ্বারাই তার পুষ্টিবিধান হয়েছে। অতএব তার দুআ কীভাবে কবুল হতে পারে? (মুসলিম ২৩৯৩, তিরমিযী ২৯৮৯, দারেমী ২৭১৭নং)
তিনি কা'ব বিন উজরার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন,
(يا كعب بن عجرة ! إنه لن يدخل الجنة لحم نبت من سحت)).
“হে কা'ব বিন উজরাহ! সে মাংস কোন দিন বেহেশ্ প্রবেশ করতে পারবে না, যার পুষ্টিসাধন হারাম খাদ্য দ্বারা করা হয়েছে।” (দারেমী ২৭৭৬নং)
"--- হে কা'ব বিন উজরাহ! যে মাংস হারাম খাদ্য দ্বারা প্রতিপালিত হবে, তার জন্য জাহান্নামই উপযুক্ত।" (সহীহ তিরমিযী ৫০ ১নং)
যাকাত আদায় ক'রে ইসলাম মুসলিমকে তার মালের পবিত্রতা ও বৃদ্ধি সাধন করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
অর্থের ব্যাপারে যাতে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তার জন্য ইসলাম ঋণের সুন্দর বিধান দিয়েছে।
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيْنِ إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى فَاكْتُبُوهُ وَلْيَكْتُب بَّيْنَكُمْ كَاتِبٌ بالْعَدْلِ وَلَا يَأْبَ كَاتِبٌ أَنْ يَكْتُبَ كَمَا عَلَّمَهُ اللهُ فَلْيَكْتُبْ وَلْيُمْلِلِ الَّذِي عَلَيْهِ الْحَقُّ وَلْيَتَّقِ اللَّهَ رَبَّهُ وَلَا يَبْخَسُ مِنْهُ شَيْئًا فَإِن كَانَ الَّذِي عَلَيْهِ الْحَقُّ سَفِيهَا أَوْ ضَعِيفًا أَوْ لَا يَسْتَطِيعُ أَن يُمِلَّ هُوَ فَلْيُمْلِلْ وَلِيُّهُ بِالْعَدْلِ وَاسْتَشْهِدُوا شَهِيدَيْن من رِّجَالِكُمْ فَإِن لَّمْ يَكُونَا رَجُلَيْنِ فَرَجُلٌ وَامْرَأَتَانِ مِمَّن تَرْضَوْنَ مِنَ الشُّهَدَاء أَن تَضِلَّ إِحْدَاهُمَا فَتُذَكِّرَ إِحْدَاهُمَا الْأُخْرَى وَلَا يَأْبَ الشُّهَدَاء إِذَا مَا دُعُوا وَلَا تَسْأَمُوا أَن تَكْتُبُوهُ صَغِيرًا أو كبيرًا إِلَى أَجَلِهِ ذَلِكُمْ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ وَأَقُومُ لِلشَّهَادَةِ وَأَدْنَى أَلا تَرْتَابُوا إِلا أَن تَكُونَ تِجَارَةً حَاضِرَةً تُدِيرُونَهَا بَيْنَكُمْ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَلا تَكْتُبُوهَا وَأَشْهِدُوا إِذَا تَبَايَعْتُمْ وَلَا يُضَارَّ كَاتِبٌ وَلَا شَهِيدٌ وَإِن تَفْعَلُوا فَإِنَّهُ فُسُوقٌ بِكُمْ وَاتَّقُوا اللهَ وَيُعَلِّمُكُمُ اللهُ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ} (۲۸۲) سورة البقرة
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরস্পর ঋণ দেওয়া-নেওয়া কর, তখন তা লিখে নাও। আর তোমাদের মধ্যে কোন লেখক যেন ন্যায়ভাবে তা লিখে দেয় এবং আল্লাহ যেরূপ শিক্ষা দিয়েছেন---সেইরূপ লিখতে কোন লেখক যেন অস্বীকার না করে। অতএব তার লিখে দেওয়াই উচিত। আর ঋণগ্রহীতা যেন লেখার বিষয় বলে দিয়ে লিখিয়ে নেয় এবং সে যেন স্বীয় প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করে এবং লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্র কম-বেশী না করে। অনন্তর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দুর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বলে দিতে অক্ষম হয়, তাহলে তার অভিভাবক যেন ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লেখায়। আর তোমাদের মধ্যে দু'জন পুরুষকে (এই আদান-প্রদানের) সাক্ষী কর। যদি দু'জন পুরুষ না পাও, তাহলে সাক্ষীদের মধ্যে যাদেরকে তোমরা পছন্দ কর তাদের মধ্য হতে একজন পুরুষ ও দু'জন মহিলাকে সাক্ষী কর; যাতে মহিলাদ্বয়ের একজন ভুলে গেলে যেন অন্য জন তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আর যখন (সাক্ষ্য দিতে) ডাকা হয়, তখন যেন সাক্ষীরা অস্বীকার না করে। (ঋণ) ছোট হোক, বড় হোক, তোমরা মেয়াদসহ লিখতে কোনরূপ অলসতা করো না। এ লেখা আল্লাহর নিকট ন্যায্যতর ও সাক্ষ্য (প্রমাণের) জন্য দৃঢ়তর এবং তোমাদের মধ্যে সন্দেহ উদ্রেক না হওয়ার অধিক নিকটতর। কিন্তু তোমরা পরস্পরে ব্যবসায় যে নগদ আদান-প্রদান কর, তা না লিখলে কোন দোষ নেই। তোমরা যখন পরস্পর বেচা-কেনা কর, তখন সাক্ষী রাখ। আর কোন লেখক ও সাক্ষী যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। যদি তোমরা তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত কর, তাহলে তা হবে তোমাদের পক্ষে পাপের বিষয়। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে মহাজ্ঞানী।" (বাক্বারাহঃ ২৮২)
মুসলিমকে ঋণদান করতে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং তাতে অর্ধেক অর্থ সাদকা করার সওয়াব নিহিত রেখেছে। অপর দিকে ঋণ পরিশোধ করার ব্যাপারে টাল-বাহানা করতে নিষেধ করেছে। মহানবী বলেছেন,
أَيُّمَا رَجُل يَدَيَّنُ دَيْنَا وَهُوَ مُجْمِعُ أَنْ لَا يُوَفِّيَهُ إِيَّاهُ لَقِيَ اللَّهُ سَارِقًا)).
"যে ব্যক্তি ঋণ করার পর তার মনে পাকা এই সংকল্প রাখে যে, সে তা পরিশোধ করবে না, সে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে 'চোর' হয়ে সাক্ষাৎ করবে।" (ইবনে মাজাহ ২৪১০ নং)
মহানবী সেই ব্যক্তির জানাযা পড়তেন না, যে ঋণ পরিশোধ না ক'রে মারা যেত। তিনি বলতেন,
يُغْفَرُ لِلشَّهِيدِ كُلُّ ذَنْبٍ إِلَّا الدَّيْنَ ..
"ঋণ পরিশোধ না করার পাপ ছাড়া শহীদের সমস্ত পাপকে মাফ করে দেওয়া হবে।" (মুসলিম ৪৯৯১, মিশকাত ২৯১২ নং)
পরের হক যাতে না মারা যায়, তার জন্য যথেষ্ট সতর্ক করেছে ইসলাম। ইহকালে পরিশোধ না ক'রে মারা গেলে পরকালে তাকে পরিশোধ করতে হবে। মহানবী বলেছেন,
مَنْ مَاتَ وَعَلَيْهِ دِينَارٌ أَوْ دِرْهَمٌ قُضِيَ مِنْ حَسَنَاتِهِ لَيْسَ ثُمَّ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَمْ)).
"যে ব্যক্তি একটি দীনার অথবা দিরহাম ঋণ রেখে মারা যাবে, সে ব্যক্তিকে (কিয়ামতে) নিজের নেকী থেকে পরিশোধ করতে হবে। কারণ, সেখানে কোন দীনার নেই, কোন দিরহামও নেই।" (ইবনে মাজাহ ২৪১৪, সহীহুল জামে' ৩৪১৮, ৬৫৪৬ নং)
“(সেখানে) যালেমের নেক আমল থাকলে তার যুলুম অনুপাতে নেকী তার নিকট থেকে কেটে নিয়ে (মযলুমকে দেওয়া) হবে। পক্ষান্তরে যদি তার নেকী না থাকে (অথবা নিঃশেষ হয়ে যায়) তাহলে তার (মযলুম) প্রতিবাদীর গোনাহ নিয়ে তার ঘাড়ে চাপানো হবে।” (বুখারী ২৪৪৯, ৬৫৩৪, তিরমিযী ২৪১৯নং)
ইসলামের বিধান হল, মজুরের হক নষ্ট করো না। মহানবী-এর নির্দেশ,
أعْطِ الأجيرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَجِفَّ عَرَقُهُ ..
"মজুরকে তার ঘাম শুকাবার পূর্বে তোমরা তার মজুরী দিয়ে দাও।" (বাইহাক্বী ১১৯৯৩, ইবনে মাজাহ ২৪৪৩, ইবনে উমার কর্তৃক, সহীহুল জামে' ১০৫৫নং)
ইসলামের বিধান হল, বিবাহিত বউকে তার নির্ধারিত মোহর প্রদান কর। বাকী রেখে দেনমোহর পরিশোধ না করলে স্ত্রীর অধিকার নষ্ট হয়। এ মহা অপরাধে নষ্ট হয় স্ত্রীধন। আর মহানবী বলেছেন,
إِنَّ أَعْظَمَ الذُّنُوبِ عِنْدَ اللَّهِ رَجُلٌ تَزَوَّجَ امْرَأَةً فَلَمَّا قَضَى حَاجَتَهُ مِنْهَا طَلَّقَهَا وَذَهَبَ بِمَهْرِهَا وَرَجُلٌ اسْتَعْمَلَ رَجُلاً فَذَهَبَ بِأَجْرَتِهِ وَآخَرُ يَقْتُلُ دَابَّةً عَبَثًا ..
"আল্লাহর নিকট সবচাইতে বড় পাপী সেই ব্যক্তি যে এক মহিলাকে বিবাহ করার পর তার নিকট থেকে তার প্রয়োজন মিটিয়ে নিয়ে তাকে তালাক দেয় এবং তার মোহর আত্মসাৎ করে। দ্বিতীয় হল সেই ব্যক্তি, যে একটি লোককে কাজে খাটিয়ে তার মজুরী আত্মসাৎ করে। আর তৃতীয় সেই ব্যক্তি যে খামোখা প্রাণী হত্যা করে।" (হাকেম ২৭৪৩, বাইহাকী ১৪৭৮-১, সহীহুল জামে' ১৫৬৭ নং)
স্বামীর মাল নষ্ট করার ব্যাপারেও স্ত্রীকে সতর্ক করা হয়েছে। মহানবী বলেছেন,
لا تنفق امْرَأَة من بيت زوجها إلا بإذن زوجها. قيل : يَا رَسُولَ اللَّهُ وَلَا الطَّعَامِ ؟ قَالَ : ((ذاك أفضل أَمْوَالنَّا)).
"স্বামীর অনুমতি ছাড়া কোন স্ত্রী যেন স্বামীর ঘরের কিছু খরচ না করে।” বলা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! খাবারও না?' তিনি বললেন, "তা তো আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ মাল।" (তিরমিযী ৬৭০, ২১২০, সহীহ তারগীব ৯৪৩নং)
হকদারের হক মারা হারাম করেছে ইসলাম। ওয়ারেসদের প্রাপ্য মীরাস বন্টন করার পর মহান আল্লাহ বলেছেন,
تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ (۱۳) وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَتَعَدَّ حُدُودَهُ يُدْخِلْهُ نَارًا خَالِدًا فِيهَا وَلَهُ عَذَابٌ مُّهِينٌ)) (١٤) سورة النساء
অর্থাৎ, এসব আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। এবং যে আল্লাহ ও রসূলের অনুগত হয়ে চলবে আল্লাহ তাকে বেহেস্তে স্থান দান করবেন, যার নীচে নদীসমূহ প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে এবং এ মহা সাফল্য। পক্ষান্তরে যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের অবাধ্য হবে এবং তাঁর নির্ধারিত সীমা লংঘন করবে তিনি তাকে আগুনে নিক্ষেপ করবেন। সেখানে সে চিরকাল থাকবে, আর তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনা-দায়ক শাস্তি। (সূরা নিসা ১৩-১৪ আয়াত)
এতীমদের মাল ভক্ষণ করতে নিষেধ করেছে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেছেন,
((وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ)) (٣٤) سورة الإسراء
অর্থাৎ, পিতৃহীন বয়োপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্যে ছাড়া তার সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না। (সূরা ইসরা ৩৪ আয়াত)
وَآتُوا الْيَتَامَى أَمْوَالَهُمْ وَلَا تَتَبَدَّلُوا الْخَبِيثَ بِالطَّيِّبِ وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَهُمْ إِلَى أَمْوَالِكُمْ إِنَّهُ كانَ حُوبًا كبيرًا)) (۲) سورة النساء
অর্থাৎ, আর তোমরা পিতৃহীনকে তাদের ধন-সম্পদ সমর্পণ কর এবং উৎকৃষ্টের সাথে নিকৃষ্ট বদল করো না, এবং তোমাদের সম্পদের সাথে তাদের সম্পদকে মিশ্রিত করে গ্রাস করো না; নিশ্চয় তা মহাপাপ। (সূরা নিসা ২ আয়াত)
((إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا))
"নিশ্চয় যারা পিতৃহীনদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে, তারা তাদের উদরে অগ্নি ভক্ষণ করে। আর তারা জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে।" (নিসা ৯-১০ আয়াত)
বলা বাহুল্য, এতীমের মাল ভক্ষণ করা একটি সর্বনাশী অপরাধ। যে পাপের জন্য শাস্তি রয়েছে জাহান্নামে। মহানবী ﷺ বলেছেন,
((اللَّهُمَّ إِنِّي أُحَرِّجُ حَقَّ الضَّعِيفَيْنِ الْيَتِيمِ وَالْمَرْأَةِ)).
"হে আল্লাহ! আমি দুই দুর্বল; এতীম ও নারীর অধিকার নষ্ট হওয়ার ব্যাপারে পাপ হওয়ার কথা ঘোষণা করছি।" (আহমাদ ৯৬৬৬, ইবনে মাজাহ ৩৬৭৮-নং)
মাল মহান আল্লাহর দেওয়া এক নিয়ামত। তার সংরক্ষা ও হিফাযত জরুরী। তিনি অযথা মাল নষ্ট করতে নিষেধ করেছেন। মহানবী ﷺ বলেছেন,
((إِنَّ اللَّهَ كَرِهَ لَكُمْ ثَلَاثًا: قِيلَ وَقَالَ وَإِضَاعَةَ الْمَالِ وَكَثْرَةَ السُّؤال)).
"আল্লাহ তোমাদের জন্য হারাম করেছেন, (ঘৃণিত করেছেন এবং আমি নিষিদ্ধ করছি) তিনটি কর্ম: জনরবে থাকা, সম্পদ অপচয় করা ও অধিক প্রশ্ন করা।" (বুখারী ১৪৭৭, মুসলিম ৪৫৮০, মিশকাত ৪৯১৫)
মহান প্রতিপালক অপব্যয় ও অপচয় করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন,
{يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ) (۳۱) سورة الأعراف
"হে আদমের বংশধরগণ! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান কর। পানাহার কর, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।" (আ'রাফঃ ৩১)
وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا (٢٦) إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا} (۲۷) سورة الإسراء
"তুমি আত্মীয়-স্বজনকে তার প্রাপ্য প্রদান কর এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। আর কিছুতেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয় যারা অপব্যয় করে, তারা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।" (বানী ইস্রাঈল: ২৬-২৭)
নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় তিনি পাগল ও শিশু প্রভৃতি নির্বোধদের হাতে মাল দিতে নিষেধ ক'রে বলেছেন,
{ وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاء أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللهُ لَكُمْ قِيَاماً وَارْزُقُوهُمْ فِيهَا وَاكْسُوهُمْ وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلاً مَّعْرُوفًا} (٥) سورة النساء
"আর আল্লাহ তোমাদের সম্পদকে---যা তোমাদের উপজীবিকা (জীবনযাত্রার অবলম্বন) করেছেন---তা নির্বোধদের (হাতে) অর্পণ করো না। তা হতে তাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা কর এবং তাদের সাথে মিষ্ট কথা বল।" (নিসাঃ ৫)
কুড়িয়ে পাওয়া মাল যাতে নষ্ট না হয় অথবা কেউ কুক্ষিগত না করে, তার জন্য মহানবী বলেছেন,
((ضَالَّةُ الْمُؤْمِن حَرْقُ النَّارِ)).
"মুমিনের হারিয়ে যাওয়া জিনিস দোযখের শিখা স্বরূপ।" (ত্বাবারানী ২০৬৯, বাইহাক্বী ১১৮৫১, সিলসিলাহ সহীহাহ ৬২০নং)
لَا يَأْوى الضَّالَّةَ إِلَّا ضَالُّ ..
"ভ্রষ্ট ছাড়া অন্য কেউ (এলান উদ্দেশ্য বিনা) ভ্রষ্ট পশুকে জায়গা দেয় না।" (আহমাদ ১৯১৪৮, আবু দাউদ ১৭২২নং)
তোলাবাজি করা বা মস্তানি ক'রে অর্থ আদায় করা ইসলামে বৈধ নয়। মহানবী বলেছেন,
((إِنَّ صَاحِبَ الْمَكْسِ فِي النَّارِ).
"নিশ্চয়ই চাঁদাবাজ জাহান্নামে যাবে।" (আহমাদ ১৭০০১, তাবারানী ৪৩৬৬, সিলসিলাহ সহীহাহ ৩৪০৫নং)
যাতে জনসাধারণ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তার জন্য ইসলাম খাদ্যপণ্য গুদামজাত ক'রে রাখতে নিষেধ করেছে। মহানবী বলেছেন,
لَا يَحْتَكِرُ إِلَّا خَاطِيُّ ..
"পাপী ছাড়া অন্য কেউ (দুষ্প্রাপ্যতার সময়) খাদ্য গুদামজাত করে না।" (মুসলিম ৪২০৭, আবু দাউদ ৩৪৪৭, তিরমিযী ১২৬৭, ইবনে মাজাহ ২১৫৪নং)
পরের সংরক্ষিত মাল গোপনে গ্রহণ করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার সাথে সাথে তার শাস্তিও ঘোষণা করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاء بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ }
"চোর এবং চোরনীর হাত কেটে ফেলো, এ তাদের কৃতকর্মের ফল এবং আল্লাহর তরফ হতে শাস্তি। বস্তুতঃ আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।" (মায়িদাহঃ ৩৮)
জিনিস ধার নিয়ে তা অস্বীকার করা এক প্রকার চুরি। সুতরাং তারও অনুরূপ শাস্তির বিধান রয়েছে ইসলামে। আর সে বিধান প্রয়োগে প্রভাবশালী ও সাধারণ অথবা সবল ও দুর্বল জনগণের মাঝে কোন পার্থক্য নেই।
আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) কর্তৃক বর্ণিত, মহানবী-এর যুগে (এক উচ্চবংশীয়া) মাখযুমী মহিলা লোকের কাছে জিনিস ধার নিত, অতঃপর তা অস্বীকার করত। এই শ্রেণীর চুরি করার ফলে ধরা পড়লে নবী তার হাত কাটার আদেশ দিলেন। তাকে নিয়ে তার আত্মীয়-স্বজন সহ কুরাইশ বংশের লোকেরা বড় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। (তার হাত যাতে কাটা না হয় সেই চেষ্টায়) তারা বলাবলি করল, 'ওর ব্যাপারে আল্লাহর রসূল-এর সঙ্গে কে কথা বলবে?' পরিশেষে তারা বলল, 'আল্লাহর রসূল-এর প্রিয়পাত্র উসামাহ বিন যায়দ ছাড়া আর কে (এ ব্যাপারে) তাঁর সাথে কথা বলার দুঃসাহস করবে?' সুতরাং (তাদের অনুরোধ মতে) উসামাহ তাঁর সাথে কথা বললেন (এবং ঐ মহিলার হাত যাতে কাটা না যায় সে ব্যাপারে সুপারিশ করলেন)। এর ফলে আল্লাহর রসূল বললেন, “হে উসামাহ! তুমি কি আল্লাহর দন্ডবিধিসমূহের এক দন্ডবিধি (কায়েম না হওয়ার) ব্যাপারে সুপারিশ করছ?!” অতঃপর তিনি দন্ডায়মান হয়ে ভাষণে বললেন,
أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ وَايْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يدها ».
"তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতরা এ জন্যই ধ্বংস হয়েছিল যে, তাদের মধ্যে কোন উচ্চবংশীয় (বা ধনী) লোক চুরি করলে তারা তাকে (দন্ড না দিয়ে) ছেড়ে দিত। আর কোন (নিম্নবংশীয়, গরীব বা) দুর্বল লোক চুরি করলে তারা তার উপর দন্ডবিধি প্রয়োগ করত। পক্ষান্তরে আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমা যদি চুরি করত, তাহলে আমি তারও হাত কেটে দিতাম।" (বুখারী ৩৪৭৫, ৬৭৮৮, মুসলিম ৪৫০৫-৪৫০৭নং, আসহাবে সুনান)
প্রকাশ্যে ছিন্তাই বা ডাকাতি করারও নিন্দা করা হয়েছে ইসলামে। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ النُّهْبَةَ لَيْسَتْ بِأَحَلَّ مِنَ الْمَيْتَةِ ». أَوْ إِنَّ الْمَيْتَةَ لَيْسَتْ بِأَحَلَّ مِنَ النُّهْبَةِ ..
"ছিনিয়ে নেওয়া মাল মৃত প্রাণী অপেক্ষা অধিক পবিত্র নয়।" (আবু দাউদ ২৭০৭, সহীহুল জামে' ১৯৮-৬নং)
মানুষ পরিশ্রম ক'রে উপার্জন করে, কিন্তু উক্ত শ্রেণীর অপরাধীরা সেই উপার্জিত অর্থ চুরি, ছিন্তাই অথবা ডাকাতি ক'রে খায়। 'কেউ খাবে কেউ খাবে না, তা হবে না তা হবে না।' এ কথা অবশ্যই ঠিক। তা বলে অন্যায়ভাবে পরের ধন ছিনিয়ে খাওয়া আদৌ ঠিক নয়। যারা পরিশ্রমবিমুখ, তারা খাবার পাওয়ার উপযুক্ত নয়। 'নো ওয়ার্ক, নো ব্রেড' শ্লোগানকেও ইসলাম সমর্থন করে। যারা নিঃস্ব, তারা ভিক্ষা করতে পারে, কিন্তু কর্মক্ষম ব্যক্তির ভিক্ষা করা বৈধ নয়। ইসলামী অর্থনীতিতে দরিদ্রদের 'রোটী, কাপড়া আওর মাকান'-এর ব্যবস্থা আছে। তাতে কোন প্রকার যুলুম করার অনুমতি নেই।
পরের জমি জবরদখল করার শাস্তিও কঠিন ভয়ানক। মহানবী বলেছেন,
أَيُّمَا رَجُلٍ ظَلَمَ شِبْرًا مِنْ الْأَرْضِ كَلَّفَهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ يَحْفِرَهُ حَتَّى يَبْلُغَ آخِرَ سَبْعِ أَرَضِينَ ثُمَّ يُطَوَّقَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ)).
"যে ব্যক্তি অর্ধহাত পরিমাণও জমি জবর-দখল (আত্মসাৎ) করবে, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন ঐ জমির সাত তবক পর্যন্ত খুঁড়তে আদেশ করবেন। অতঃপর তা তার গলায় বেড়িস্বরূপ ঝুলিয়ে দেওয়া হবে; যতক্ষণ পর্যন্ত না সমস্ত লোকেদের বিচার-নিষ্পত্তি শেষ হয়েছে (ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ সাত তবক আধ হাত জমি তার গলায় লটকানো থাকবে)!" (আহমাদ ১৭৫৭১, ত্বাবারানীর কাবীর ১৮১৪৬, ইবনে হিব্বান ৫১৪২, সহীহুল জামে' ২৭২২নং)
ধোঁকা-ধাপ্পা দিয়ে চুরি করাও কম পাপের নয়। লোককে ঠকিয়ে খাওয়া এবং ফাঁকি দিয়ে অর্থোপার্জন করলে সে কি সভ্য সমাজের সদস্য হতে পারে, নাকি চির সুন্দর ও চির সুখময় স্থান জান্নাতের উপযুক্ত হতে পারে? মহানবী বলেছেন,
((مَنْ غَشَنَا فَلَيْسَ مِنَّا ، وَالْمَكْرُ وَالْخِدَاعُ فِي النَّار).
"যে ব্যক্তি আমাদেরকে ধোঁকা দেয় সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। ধোঁকাবাজ ও চালবাজ জাহান্নামে যাবে।" (ত্বাবারানীর কাবীর ১০০৮-৬, ও সাগীর ৭৩৮, ইবনে হিব্বান ৫৬৭, ৫৫৫৯, সহীহুল জামে' ৬৪০৮ নং)
মানুষের অর্থ অন্যায়ভাবে গ্রাস করার অন্যতম পাপপন্থা হল সূদ খাওয়া।
الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا وَأَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا فَمَن جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّهِ فَانتَهَى فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ وَمَنْ عَادَ فَأُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ}
অর্থাৎ, যারা সূদ খায় তারা সেই ব্যক্তির মত দণ্ডায়মান হবে যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে দিয়েছে। তা এ জন্য যে, তারা বলে, 'বেচা-কেনা তো সূদের মতই।' অথচ আল্লাহ বেচা-কেনাকে বৈধ ও সুদকে অবৈধ করেছেন। সুতরাং যার কাছে তার প্রতিপালকের উপদেশ এসেছে, তারপর সে বিরত হয়েছে, অতীতে যা হয়েছে তা তারই এবং তার ব্যাপার আল্লাহর অধিকারভুক্ত। আর যারা পুনরায় (সূদ) নিতে আরম্ভ করবে, তারাই দোযখবাসী। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বৃদ্ধি করেন। আল্লাহ কোন অকৃতজ্ঞ পাপীকে ভালোবাসেন না। (সূরা বাক্বারাহ ২৭৫-২৭৬ আয়াত)
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ (۲۷۸) فَإِن لَّمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِّنَ اللهِ وَرَسُولِهِ وَإِن تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُؤُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ} (۲۷৯) سورة البقرة
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং বকেয়া সূদ ছেড়ে দাও; যদি তোমরা মু'মিন হও। যদি তোমরা না ছাড় তাহলে জেনে রাখ যে, এ হল আল্লাহ ও তার রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শামিল। কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই। তোমরা অত্যাচারী হবে না এবং অত্যাচারিতও না। (ঐ ২৭৮-২৭৯ আয়াত)
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا الرِّبَا أَضْعَافًا مُّضَاعَفَةً وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (۱۳۰) وَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِي أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ } (۱۳۱) سورة آل عمران
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ খেয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কর, তবেই তোমরা সফলকাম হতে পারবে। আর তোমরা সেই আগুনকে ভয় কর, যা কাফেরদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। (সূরা আ-লি ইমরান ১৩০ আয়াত)
সুদ খাওয়া একটি সর্বনাশী মহাপাপ। মহানবী সুদখোর ও সূদের সকল সহযোগীকে অভিশাপ করেছেন। জাবের হতে বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং তার উপর সাক্ষীদ্বয়কে অভিশাপ করেছেন, আর বলেছেন, "ওরা সকলেই সমান।" (মুসলিম ৪১৭৭নং)
সুদ খাওয়া এতই কদর্য অপরাধ যে, তা চরম অন্যায় এবং চরম অশ্লীল। মহানবী বলেছেন,
(( دِرْهَم رِبًا يَأْكُلُهُ الرَّجُلُ وَهُوَ يَعْلَمُ أَشَدُّ مِنْ سِتَّةٍ وَثَلَاثِينَ زَنْيَةً)).
"জেনেশুনে মানুষের মাত্র এক দিরহাম খাওয়া সূদ আল্লাহর নিকটে ৩৬ বার ব্যভিচার অপেক্ষা অধিক গুরুতর।" (আহমাদ ২১৯৫৭, ত্বাবারানীর আউসাত্ব ২৬৮২, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৫৫১৭, দারাকুত্বনী ৩/১৬, সহীহুল জামে' ৩৩৭৫নং)
বরং সবচেয়ে বড় অশ্লীল অপেক্ষাও বেশি বড় পাপ এই শোষণ অপরাধে। মহানবী বলেছেন,
الرِّبَا سَبْعُونَ حُوبًا ، أَيْسَرُهَا أَنْ يَنْكِحَ الرَّجُلُ أُمَّهُ.
"সুদ (পাপের দিক থেকে) ৭০ প্রকার। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট (পাপের) সুদ হল মায়ের সঙ্গে ব্যভিচার করা! (অর্থাৎ সুদ খাওয়ার গোনাহ মায়ের সাথে ব্যভিচার করার চেয়ে ৭০ গুণ বেশী।) (ইবনে মাজাহ ২২৭৪ নং, হাকেম ২/৩৭, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৫৫২০-৫৫২২, ইবনে আবী শাইবাহ ২২০০৫নং)
সুতরাং 'লা হাউলা অলা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।'
জুযার অর্থ হারাম। জুয়াতে মানুষ সর্বশান্ত হয়। তাই জুয়া ইসলামে বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
((يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالأَزْلامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (۹۰) إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنْتَهُونَ (۹۱) وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَاحْذَرُوا فَإِن تَوَلَّيْتُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّمَا عَلَى رَسُولِنَا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ)) (۹۲)
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ, সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাযে বাধা দিতে চায়! অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না? আল্লাহর অনুসরণ কর ও রসূলের অনুসরণ কর এবং সতর্ক হও, যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রাখ যে, স্পষ্ট প্রচারই আমার রসূলের কর্তব্য। (সূরা মাইদাহ ৯০-৯২ আয়াত)
ইসলামের বিধানে ঘুস নেওয়া-দেওয়া হারাম। আর্থিক এই অপরাধের ফলে অর্থ তো ব্যয় হয়ই, অনেক হকদারের হক নষ্ট হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُواْ بِهَا إِلَى الْحُكَامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ} (۱۸۸) سورة البقرة
অর্থাৎ, তোমরা একে অন্যের ধন অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং লোকেদের ধন-সম্পদের কিয়দংশ জেনে-শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকগণকে ঘুস দিয়ো না। (সূরা বাক্বারাহ ১৮৮ আয়াত)
আব্দুল্লাহ বিন আম্র বলেন, 'আল্লাহর রসূল ঘুষখোর, ঘুষদাতা (উভয়কেই) অভিশাপ করেছেন।' (আবু দাউদ ৩৫৮-২, তিরমিযী ১৩৩৭, ইবনে মাজাহ ২৩১৩, ইবনে হিব্বান, হাকেম ৪/১০২-১০৩, সহী আবু দাউদ ৩০৫৫নং)
ইসলামের বিধানে বিবাহের সময় মহিলা মোহর পাবে, পুরুষ নয়। তাই পণ বা যৌতুক নেওয়া-দেওয়া একটি মহা অপরাধ।
১। ফল-ফসল পাকার আগে এবং দুর্যোগমুক্ত হওয়ার পূর্বে ক্রয়-বিক্রয় হারাম। (বুখারী, মুসলিম প্রমুখ)
২। বাগান বা ক্ষেতের কয়েক বছরের ফল-ফসলকে বিক্রয় করা হারাম। (মুসলিম ১৫৩৬নং) যেহেতু পূর্বের তুলনায় এই ব্যবসাতে অধিক ধোঁকার আশঙ্কা আছে।
৩। এক পশুর বিনিময়ে অপর পশু ধারে ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। অবশ্য নগদ নগদ একটির বিনিময়ে দুটি ক্রয়-বিক্রয়ও বৈধ। (সিলসিলাহ সহীহাহ ২৪১৬নং)
৪। পশুর গর্ভস্থিত ভ্রূণের বিনিময়ে পশু ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। (বুখারী, মুসলিম ১৫১৪নং)
৫। জীবিত পশুর বিনিময়ে গোশ্ত বিক্রয় করা বৈধ নয়। (সহীহুল জামে' ৬৯৩৬নং)
৬। খেজুরের বিনিময়ে গাছপাকা খেজুর, কিশমিশের বিনিময়ে আঙ্গুর, পুরাতন গমের বিনিময়ে নতুন গম ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। (বুখারী, মুসলিম ১৫৪২নং) কারণ, তাতে ধোকা ও সূদের গন্ধ আছে।
৭। নির্দিষ্ট পরিমাণ খেজুরের পরিবর্তে এক রাশ খেজুর ক্রয়-বিক্রয় হারাম; যার পরিমাণ অজানা। (আহমাদ, মুসলিম, নাসাঈ, সহীহুল জামে' ৩৯৩৪নং)
৮। এক স্তূপ খাদ্যের বিনিময়ে এক স্তূপ খাদ্য অথবা নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যের বিনিময়ে এক স্তূপ খাদ্য ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। (নাসাঈ, সহীহুল জামে' ৭১৯৮নং) যেহেতু তাতেও ধোঁকার আশঙ্কা বর্তমান।
৯। কসম খেয়ে মাল বিক্রয় বৈধ নয়। কারণ তাতে ক্রেতা ধোঁকা খেয়ে থাকে। (মুসলিম ৪২১০নং)
১০। দালালি ক'রে পণ্যের দাম বৃদ্ধি করা এবং তা ক্রয়ের ইচ্ছা না রাখায় ক্রেতা ধোঁকা খায়। তাই তা বৈধ নয়। (বুখারী ২১৫৮, ২২৭৪, মুসলিম ৩৯০০নং)
দাঁড়ি মেরে ব্যবসা হারাম। তাতেও ধোঁকা দিয়ে মানুষের অর্থ অন্যায়ভাবে গ্রাস করা হয়। তাই ইসলামের বিধান হল,
{ وَأَوْفُوا الْكَيْلَ إِذَا كِلْتُمْ وَزِنُوا بِالقِسْطَاسِ الْمُسْتَقِيمِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً}
অর্থাৎ, মেপে দেওয়ার সময় পূর্ণমাপে দাও এবং ওজন কর সঠিক দাঁড়িপাল্লায়, এটাই উত্তম ও পরিণামে উৎকৃষ্ট। (সূরা ইসরা ৩৫ আয়াত)
মহান আল্লাহ এ পাপের ব্যাপারে মানুষকে সতর্ক ক'রে বলেছেন,
{ وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ وَإِذَا كَالُوهُمْ أَوْ وَزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ أَلا يَظُنُّ أُولَئِكَ أَنَّهُمْ مَبْعُوثُونَ لِيَوْمٍ عَظِيمٍ يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ }
অর্থাৎ, ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়, যারা লোকের নিকট হতে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাদের জন্য মেপে অথবা ওজন করে দেয় তখন কম দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে। এক মহা দিবসে; যেদিন দাঁড়াবে সমস্ত মানুষ বিশ্ব-জাহানের প্রতিপালকের সম্মুখে। (মুত্বাফফিফীন ১-৬ আয়াত)
আল্লাহর রসূল বলেন, "---- যে জাতি দাঁড়ি-মারা শুরু করবে, সে জাতি ফসল থেকে বঞ্চিত হবে এবং দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হবে।" (ত্বাবারানীর কাবীর, সহীহ তারগীব ৭৬০নং)
তিনি আরো বলেন, "--- যে জাতিই মাপ ও ওজনে কম দেবে, সে জাতিই দুর্ভিক্ষ, কঠিন খাদ্য-সংকট এবং শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারের শিকার হবে।" (বাইহাকী, ইবনে মাজাহ ৪০১৯নং, সহীহ তারগীব ৭৫৯নং)
আমানতে খেয়ানত করে উপার্জন বৈধ নয় ইসলামে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
{ إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا } [ النساء : ٥٨ ]
অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমানত তার মালিককে প্রত্যর্পণ করবে। (সূরা নিসা ৫৮ আয়াত)
তিনি আরো বলেছেন,
{ فَإِنْ أَمِنَ بَعْضُكُمْ بَعْضاً فَلْيُؤَدِّ الَّذِي اؤْتُمِنَ أَمَانَتَهُ } [ البقرة : ٢٨٣ ]
অর্থাৎ, যদি তোমরা পরস্পর পরস্পরকে বিশ্বাস কর, তাহলে যাকে বিশ্বাস করা হয় (যার কাছে আমানত রাখা হয়) সে যেন (বিশ্বাস বজায় রেখে) আমানত প্রত্যর্পণ করে এবং তার প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করে। (বাক্বারাহ ২৮৩ আয়াত)
মহানবী বলেছেন,
أَنَّ الأَمَانَةَ إِلَى مَنِ ائْتَمَنَكَ وَلَا تَخُنْ مَنْ خَانَكَ ..
"তোমার কাছে যে আমানত রেখেছে, তা তাকে প্রত্যর্পণ কর এবং যে তোমার খেয়ানত করেছে, তার খেয়ানত করো না।" (আবু দাউদ ৩৫৩৭, তিরমিযী ১২৬৪, হাকেম ২২৯৬, ত্বাবারানী, বাইহাক্বী, সিলসিলাহ সহীহাহ ৪২৩নং)
আমানতে খেয়ানত করা মুসলিমের আচরণ হতে পারে না। মহানবী বলেছেন,
( آية المنافق ثلاث : إِذا حَدَّثَ كَذَبَ ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ )). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
وفي رواية : (( وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى وَزَعَمَ أَنَّهُ مُسْلِمٌ )) .
"মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি; (১) কথা বললে মিথ্যা বলে। (২) ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং (৩) তার কাছে আমানত রাখা হলে তার খিয়ানত করে।" (বুখারী ৩৩, মুসলিম ২২০নং)
মুসলিমের অন্য বর্ণনায় আছে, "যদিও সে রোযা রাখে এবং নামায পড়ে ও ধারণা করে যে, সে মুসলিম (তবু সে মুনাফিক)।" (মুসলিম ২২২নং)
আনাস বিন মালেক কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল প্রায় খুতবাতে বলতেন,
لَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا أَمَانَةَ لَهُ وَلَا دِينَ لِمَنْ لَا عَهْدَ لَهُ ..
"যার আমানতদারী নেই, তার ঈমান নেই। আর যে অঙ্গীকার পালন করে না, তার দ্বীন নেই।" (আহমাদ ১২৩৮-২, বাইহাকী ১৩০৬৫, সহীহুল জামে' ৭১৭৯নং)
এইভাবে আরো কত শত পাপ আছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে মানুষের অর্থের উপর, সমাজের অর্থব্যবস্থার উপর। বলা বাহুল্য, ইসলাম এসেছে এই সকল পাপ বন্ধ ক'রে সমাজের অর্থনীতিকে পরিশুদ্ধ ও চাঙ্গা করতে।