📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 প্রাণের উপর পাপের প্রভাব

📄 প্রাণের উপর পাপের প্রভাব


এমন অনেক পাপ আছে, যার ফলে প্রাণহানি ঘটে। কেউ খুন করলে, খুনের বদলে তাকে সরকার খুন করবে।
কেউ বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও ব্যভিচার করলে, সরকার তাকে শিক্ষামূলক বিশেষ পদ্ধতিতে হত্যা করবে।
কেউ মুসলিম হওয়ার পর ইসলাম ত্যাগ করলে সরকার তাকে খুন করবে।
অনুরূপ কেউ মুসলিম সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলে, সরকার তাকে হত্যা করবে। এ ব্যাপারে ইসলামে বিধান রয়েছে। মহানবী বলেছেন,
لا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّى رَسُولُ اللَّهِ إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ الثَّيِّبُ الزَّانِ وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ وَالتَّارِكُ لِدِينِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ ..
"তিন ব্যক্তি ছাড়া 'আল্লাহ ব্যতীত কেউ সত্য উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর রসূল' এ কথায় সাক্ষ্যদাতা কোন মুসলিমের খুন (কারো জন্য) বৈধ নয়; বিবাহিত ব্যভিচারী, খুনের বদলে হত্যাযোগ্য খুনী এবং দ্বীন ও জামাআত ত্যাগী।" (বুখারী ৬৮-৭৮, মুসলিম ৪৪৬৮-৪৪৭০নং আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ)

مَا نَقَضَ قَوْمُ الْعَهْدَ قَطُّ إِلَّا كَانَ الْقَتْلُ بَيْنَهُمْ وَلَا ظَهَرَتِ الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ قَطُّ إِلَّا سَلَّطَ اللَّهُ عَلَيْهِمُ الْمَوْتَ وَلَا مَنْعَ قَوْمُ الزَّكَاةَ إِلَّا حَبَسَ اللَّهُ عَنْهُمُ الْقَطْرَ ..
"যখনই কোন জাতি তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তখনই তাদের মাঝে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যখনই কোন জাতির মাঝে অশ্লীলতা আত্মপ্রকাশ করে, তখনই সে জাতির জন্য আল্লাহ মৃত্যুকে আধিপত্য প্রদান করেন। (তাদের মধ্যে মৃত্যুর হার বেড়ে যায়।) আর যখনই কোন জাতি যাকাৎ-দানে বিরত হয়, তখনই তাদের জন্য (আকাশের) বৃষ্টি বন্ধ ক'রে দেওয়া হয়।" (হাকেম ২৫৭৭, বাইহাকী ৬৬২৫, ১৯৩২৩, বায্যার ৩২৯৯, সিলসিলাহ সহীহাহ ১০৭নং)

إِنَّهُ سَتَكُونُ هَنَّاتٌ وَهَنَاتٌ فَمَنْ أَرَادَ أَنْ يُفَرِّقَ أَمْرَ هَذِهِ الْأُمَّةِ وَهْيَ جَمِيعٌ فَاضْرِبُوهُ بالسَّيْفِ كَائِنَا مَنْ كَانَ ..
"অদূর ভবিষ্যতে বড় ফিতনা ও ফাসাদের প্রার্দুভাব ঘটবে। সুতরাং যে ব্যক্তি এই উম্মতের ঐক্য ও সংহতিকে (নষ্ট করে) বিচ্ছিন্নতা আনতে চাইবে সে ব্যক্তিকে তোমরা তরবারি দ্বারা হত্যা করে ফেলো; তাতে সে যেই হোক না কেন।" (মুসলিম ৪৯০২নং)

مَنْ أَتَاكُمْ وَأَمْرُكُمْ جَمِيعٌ عَلَى رَجُلٍ وَاحِدٍ يُرِيدُ أَنْ يَشُقَّ عَصَاكُمْ أَوْ يُفَرِّقَ جَمَاعَتَكُمْ فَاقْتُلُوهُ ..
"যখন তোমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি একই শাসকের শাসনাধীনে ঐক্যপূর্ণ, তখন যদি আর এক (শাসক) ব্যক্তি এসে তোমাদের সংহতি নষ্ট করতে চায় এবং জামাআতের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে তাকে হত্যা করো।" (মুসলিম ৪৯০৪নং)

((وَمَنْ بَايَعَ إِمَامًا فَأَعْطَاهُ صَفْقَةَ يَدِهِ وَثَمَرَةَ قَلْبِهِ فَلْيُطِعْهُ إِنِ اسْتَطَاعَ فَإِنْ جَاءَ آخَرُ يُنَازِعُهُ فَاضْرِبُوا عُنْقَ الآخر )).
"যে ব্যক্তি কোন রাষ্ট্রনায়কের হাতে বায়াত করল এবং এতে তাকে নিজ প্রতিশ্রুতি ও অন্তস্তল থেকে অঙ্গীকার প্রদান করল তার উচিত, যথাসাধ্য তার (সেই নায়কের সৎবিষয়ে) আনুগত্য করা। এরপর যদি অন্য এক (নায়ক) তার ক্ষমতা দখল করতে চায়, তাহলে ঐ দ্বিতীয় নায়কের গর্দান উড়িয়ে দাও।" (মুসলিম ৪৮৮-২নং প্রমুখ)

سَيَكُونُ فِي أُمَّتِي اخْتِلَافُ وَفُرْقَةٌ قَوْمٌ يُحْسِنُونَ الْقِيلَ وَيُسِيئُونَ الْفِعْلَ وَيَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ لا يُجَاوِزُ تَرَاقِيَهُمْ يَمْرُقُونَ مِنَ الدِّينِ مُرُوقَ السَّهْمِ مِنَ الرَّمِيَّةِ لَا يَرْجِعُونَ حَتَّى يَرْتَدَّ عَلَى فوقِهِ هُمْ شَرُّ الْخَلْقِ وَالْخَلِيقَةِ طُوبَى لِمَنْ قَتَلَهُمْ وَقَتَلُوهُ يَدْعُونَ إِلَى كِتَابِ اللَّهِ وَلَيْسُوا مِنْهُ فِي شَيْءٍ مَنْ قَاتَلَهُمْ كَانَ أَوْلَى بِاللَّهِ مِنْهُمْ .. قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا سِيمَاهُمْ قَالَ : « التَّحْلِيقُ ..
"আমার উম্মতের মাঝে মতবিরোধ ও বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হবে। একদল হবে যাদের কথাবার্তা সুন্দর হবে এবং কর্ম হবে অসুন্দর। তারা কুরআন পাঠ করবে, কিন্তু তা তাদের গলদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করবে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বের হয়ে যাবে, যেমন তীর শিকার ভেদ করে বের হয়ে যায়। তারা (সেইরূপ দ্বীনে) ফিরে আসবে না, যেরূপ তীর ধনুকে ফিরে আসে না। তারা সৃষ্টির সবচেয়ে নিকৃষ্ট জাতি। শুভ পরিণাম তার জন্য, যে তাদেরকে হত্যা করবে এবং যাকে তারা হত্যা করবে। তারা আল্লাহর কিতাবের দিকে মানুষকে আহবান করবে, অথচ তারা (সঠিকভাবে) তার উপরে প্রতিষ্ঠিত থাকবে না। যে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, সে হবে বাকী উম্মত অপেক্ষা আল্লাহর নিকটবর্তী। তাদের চিহ্ন হবে মাথা নেড়া।" (আহমাদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, হাকেম, সহীহুল জামে' ৩৬৬৮-নং)

সন্ত্রাস, ডাকাতি, রাহাজানি, লুঠতরাজ, ধর্ষণ ইত্যাদির শাস্তির ক্ষেত্রেও সরকার প্রাণদন্ডের সাজা দিতে পারে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّمَا جَزَاء الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ) (৩৩) سورة المائدة
"যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করে (অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়) তাদের শাস্তি এই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা বিপরীত দিক হতে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ হতে নির্বাসিত করা হবে। ইহকালে এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও পরকালে তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে।" (মায়িদাহঃ ৩৩)

অনুরূপ সমকামীর অপরাধ এমন গুরুতর যে, সরকার তাকে প্রাণদন্ড দেবে। মহানবী বলেছেন,
مَنْ وَجَدْتُمُوهُ يَعْمَلُ عَمَلَ قَوْمٍ لُوطٍ فَاقْتُلُوا الْفَاعِلَ وَالْمَفْعُولَ بِهِ ».
"তোমরা যে ব্যক্তিকে লুত নবীর উম্মতের মত সমকামে লিপ্ত পাবে, সে ব্যক্তি ও তার সহকর্মীকে হত্যা করে ফেলো।" (আহমাদ ২৭৩২, আবু দাউদ ৪৪৬৪, তিরমিযী ১৪৫৬, ইবনে মাজাহ ২৫৬১, বাইহাকী ১৭৪৭৫, সহীহুল জামে' ৬৫৮-৯নং)

অনুরূপ শাস্তি পশুগমনকারীরও। মহানবী বলেছেন,
مَنْ وَجَدْتُمُوهُ وَقَعَ عَلَى بَهِيمَةٍ فَاقْتُلُوهُ وَاقْتُلُوا الْبَهِيمَةَ مَعَهُ ».
"যে ব্যক্তিকে কোন পশু-সঙ্গমে লিপ্ত পাবে, সে ব্যক্তি ও একই সাথে সেই পশুকে তোমরা হত্যা করে ফেলবে।" (তিরমিযী ১৪৫৫, ইবনে মাজাহ ২৫৬৪, হাকেম ৮০৪৯, বাইহাক্বী ১৭৪৯১, ১৭৪৯২, সহীহুল জামে' ৬৫৮৮-নং)

বিবিধ আরো অন্য কারণে অপরাধী নিজেকে হত্যাযোগ্য ক'রে তোলে। যেমন অনেক কারণে অপরাধী নিজেই প্রাণ হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ হয়।
উক্ত বিধানসমূহ সরকার বহাল না করলে আবেগময় উগ্র যুবক তা নিজের হাতে নিয়ে প্রয়োগ করতে পারে, যদিও সে কাজ তার নয়, তার জন্য বৈধ নয়।
হিংসা মানুষকে প্রতিহিংসা ও হত্যাকান্ডে উৎসাহিত করতে পারে। যেমন হিংসায় অন্ধ হয়ে কাবীল নিজ ভাই হাবীলকে হত্যা করেছিল। মহান আল্লাহ সে কথা কুরআনে উল্লেখ করেছেন,
"আদমের দুই পুত্রের (হাবিল ও কাবিলের) বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শুনিয়ে দাও, যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল, তখন একজনের কুরবানী কবুল হল এবং অন্য জনের কুরবানী কবুল হল না। তাদের একজন বলল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন বলল, আল্লাহ তো সংযমীদের কুরবানীই কবুল ক'রে থাকেন। আমাকে হত্যা করার জন্য তুমি আমার প্রতি হাত তুললেও তোমাকে হত্যা করার জন্য আমি তোমার প্রতি হাত তুলব না, আমি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালককে ভয় করি। তুমি আমার ও তোমার পাপের ভার বহন কর এবং দোযখবাসী হও এই তো আমি চাই এবং এ হল যালেম (অনাচারী) দের কর্মফল। অতঃপর তার চিত্ত ভ্রাতৃ-হত্যায় তাকে উত্তেজিত করল, সুতরাং সে (কাবীল) তাকে (হাবীলকে) হত্যা করল, ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হল।" (মায়িদাহঃ ২৭-৩০)

হিংসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ইউসুফ নবী-এর ভাইগণ তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল।
হিংসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শরীক নিজ শরীককে খুন করে।
অর্থ ও সম্পদের লোভে পড়ে ওয়ারেস নিজ মুওয়ারিসকে হত্যা করে। মানুষের কাছে বিশ্বস্ত হয়ে অনুগ্রহকারী বা অন্নদাতাকে হত্যা করে।
মানুষ লোভে পড়ে অসদুপায়ে ধন উপার্জন করে। লোভ থাকার ফলে প্রয়োজনে ধন ব্যয় করতে কার্পণ্য করে। তার ফলে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন হয় এবং আপোসে মনোমালিন্য থেকে বিষয়টি রক্তারক্তিতে পৌঁছে যায়। মহানবী বলেছেন,
( اتَّقُوا الظُّلْمَ ، فَإِنَّ الظُّلْمَ ظُلُمَاتٌ يَوْمَ القِيَامَةِ ، وَاتَّقُوا الشُّحَّ ، فَإِنَّ الشُّحَّ أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ ، حَمَلَهُمْ عَلَى أَنْ سَفَكُوا دِمَاءَهُمْ وَاسْتَحَلُّوا مَحَارِمَهُمْ )). رواه مسلم
"অত্যাচার করা থেকে বাঁচ। কেননা, অত্যাচার কিয়ামতের দিনের অন্ধকার। আর কৃপণতা থেকে দূরে থাক। কেননা, কৃপণতা তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস ক'রে দিয়েছে। (এই কৃপণতাই) তাদেরকে প্ররোচিত করেছিল, ফলে তারা নিজেদের রক্তপাত ঘটিয়েছিল এবং তাদের উপর হারামকৃত বস্তুসমূহকে হালাল ক'রে নিয়েছিল।" (মুসলিম ৬৭৪১নং)

অবৈধ প্রেম এমন এক মহা অপরাধ, যার ফলে অনেক প্রাণহানি ঘটিয়ে থাকে মানুষ।
প্রেমে অসফল হয়ে প্রেমিক-প্রেমিকা আত্মহত্যা করে।
প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে প্রেমিক নিজ প্রেমিকাকে খুন করে।
প্রেমে বাধা পড়লে প্রেমিক অথবা প্রেমিকা তার পথের কাঁটা (মা-বাপ, ভাই, স্বামী বা স্ত্রী) কে সরিয়ে ফেলার জন্য হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ হয়।
প্রেমিক কখনই তার প্রেমের শরীক সহ্য করে না। তাই সে তাকে হত্যা ক'রে রাস্তা পরিষ্কার করে।
প্রেমে ঘনিষ্ঠ হয়ে ব্যভিচারে লিপ্ত হলে অবৈধ ও অযাচিত সন্তানকে হত্যা করা হয়।
খুনী নিজেকে বাঁচাতে আরো অধিক খুন করতে উদ্বুদ্ধ হয়। খুনের সাক্ষ্য লোপাটের উদ্দেশ্যে সাক্ষীকে খুন ক'রে আইনের চোখে ধূলা দেয়।
ধর্ষণ করার পর ধরা পড়ার ভয়ে ধর্ষিতাকে খুন করা হয়।
হাতুড়ে ডাক্তার ভুল চিকিৎসা ক'রে রোগীকে হত্যা করে।
শিশুখাদ্য, ঔষধ ইত্যাদির প্রস্তুতকারক অধিক মুনাফার আশায় ভেজাল মিশ্রিত ক্ষতিকর খাদ্য বা ঔষধ পরিবেশন ক'রে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।
মাদকদ্রব্য প্রস্তুতকারকরা তা মানুষের মাঝে পরিবেশন ক'রে মরণের পথ বাতলে দেয়।
এলাকা দখল বা গদি দখলের রাজনৈতিক লড়াইয়ে বহু মানুষের প্রাণহানি হয়।
এ সব এক একটি মহা অপরাধ। যার প্রভাব পড়ে মানুষের প্রাণের উপর। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ كَتَبْنَا عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنَّهُ مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الأرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا وَلَقَدْ جَاءَتْهُمْ رُسُلُنَا بِالبَيِّنَاتِ ثُمَّ إِنَّ كَثِيرًا مِّنْهُم بَعْدَ ذَلِكَ فِي الْأَرْضِ لَمُسْرِفُونَ} (۳۲) سورة المائدة
"এ কারনেই বনী ইস্রাঈলের প্রতি এ বিধান দিলাম যে, যে ব্যক্তি নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করার দন্ডদান উদ্দেশ্য ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষকেই হত্যা করল। আর কেউ কারো প্রাণরক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করল। তাদের নিকট তো আমার রসূলগণ স্পষ্ট প্রমাণ এনেছিল, কিন্তু এর পরও অনেকে পৃথিবীতে সীমালংঘনকারীই রয়ে গেল।" (মায়িদাহঃ ৩২)

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 শরীর ও স্বাস্থ্যে পাপের প্রভাব

📄 শরীর ও স্বাস্থ্যে পাপের প্রভাব


বহু পাপ আছে, শরীয়তের নিষেধাজ্ঞা অমান্য ক'রে পাপী তা করে এবং নিজের শরীর ও স্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি করে।
ব্যভিচার বা অবৈধ যৌনাচারের ফলে প্রাদুর্ভূত বিভিন্ন পুরনো রোগ তো আছেই। গনোরিয়া, সিফিলিস, শুক্রক্ষরণ প্রভৃতি যৌনরোগ ব্যভিচারীদের মাঝেই আধিপত্য বিস্তার করে। গনোরিয়া বা প্রমেহ রোগে জননাঙ্গে ঘা ও জ্বালা সৃষ্টি হয় এবং সেখান হতে পুঁজ নিঃসরণ হয়। মূত্রনালী জ্বালা করে, সুড়সুড় করে। মূত্রত্যাগে কষ্ট হয়। পানির মত প্রস্রাবের পর হলুদ পুঁজযুক্ত পদার্থ বের হয়। সে সঙ্গে মাথা ধরা ও ঘোরা, জ্বর এবং নিম্নগ্রন্থি-স্ফীতি তো আছেই।
সিফিলিস বা উপদংশ রোগ শরীরে প্রবেশ করার পর সপ্তাহ মধ্যে লাল দাগ ও ফুস্কুড়ি প্রকাশ পায়। এরপর হতে শরীর অনবরত চুলকায় ও তার চারধারে প্রদাহযুক্ত পানি-ভরা ফোস্কা দেখা দেয় এবং ঐ সব ফুস্কুড়ি হতে পরে গলে ঘা হয় ও পুঁজ বের হয়। রোগ পুরনো হলে নখ খসে যায়, চুল ওঠে এবং সর্বাঙ্গে উদ্ভেদ প্রকাশ পায়।
আর শুক্রক্ষরণ রোগে তরল বীর্য যখন-তখন ঝরতে থাকে। এর ফলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, বুক ধড়ফড় করে, মাথা ধরে ও ঘোরে ইত্যাদি।

অবৈধ যৌন-সংসর্গের কারণে আধুনিক এস রোগ হয়। আর এই নোংরামির ফলে ভবিষ্যতে আরো নতুন নতুন রোগ-ব্যাধির প্রাদুর্ভাব ঘটবে।
সত্য বলেছেন আল্লাহর নবী। সত্য তাঁর নবুওয়াতের অহীলব্ধ ভবিষ্যদ্বাণী। তিনি বলেছেন, “হে মুহাজিরদল! পাঁচটি কর্ম এমন রয়েছে যাতে তোমরা লিপ্ত হয়ে পড়লে (উপযুক্ত শাস্তি তোমাদেরকে গ্রাস করবে)। আমি আল্লাহর নিকট পানাহ চাই, যাতে তোমরা তা প্রত্যক্ষ না কর।
যখনই কোন জাতির মধ্যে অশ্লীলতা (ব্যভিচার) প্রকাশ্যভাবে ব্যাপক হবে, তখনই সেই জাতির মধ্যে প্লেগ এবং এমন মহামারী ব্যাপক হবে, যা তাদের পূর্বপুরুষদের মাঝে ছিল না----।" (বাইহাকী, ইবনে মাজাহ ৪০১৯নং, সহীহ তারগীব ৭৫৯নং)

নবী বলেন, "যখনই কোন জাতি তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তখনই তাদের মাঝে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যখনই কোন জাতির মাঝে অশ্লীলতা আত্মপ্রকাশ করে, তখনই সে জাতির জন্য আল্লাহ মৃত্যুকে আধিপত্য প্রদান করেন। (তাদের মধ্যে মৃতের হার বেড়ে যায়।) আর যখনই কোন জাতি যাকাৎ-দানে বিরত হয়, তখনই তাদের জন্য (আকাশের) বৃষ্টি বন্ধ ক'রে দেওয়া হয়।" (হাকেম ২/১২৬, বাইহাকী ৩/৩৪৬, বায্যার ৩২৯৯ নং, সিলসিলাহ সহীহাহ ১০৭নং)

আর কুরআন মানুষকে বলে,
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبِيلاً) (۳۲) سورة الإسراء
"তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।" (বানী ইস্রাঈল: ৩২)

অনেক যুবক হস্তমৈথুন ক'রে নিজের হাতে নিজের অমূল্য যৌবনকে ধ্বংস করে। এমনিতেই 'ধন-জন-যৌবন জোয়ারের পানি, আজ আছে কাল নেই, জানে সব জ্ঞানী।' তার উপর কৃত্রিম মৈথুনের মাধ্যমে বীর্যক্ষয় ক'রে যৌবন ফুরিয়ে যাওয়ার বহু পূর্বেই তা হারিয়ে ফেলে বহু নির্বোধ যুবক। আজ এসব কথায় হয়তো কেউ কর্ণপাত না করলেও কাল অবশ্যই বুঝতে পারবে, যখন বিবাহের পর বাসর রাতেই ফুলশয্যায় সুসজ্জিতা সুরভিতা দিলরুবা স্ত্রীর পাশে মাথায় হাত রেখে বসে পস্তাতে হবে! যখন ধ্বজভঙ্গ হয়ে পুরুষাঙ্গ শিথিল থাকলে অথবা সঞ্চালন মাত্র দ্রুতপতন ঘটলে ঐ অতিরিক্ত যৌন-পাগলামির জন্য বারবার আক্ষেপ করবে। কিন্তু তখন কি আর আক্ষেপ কাজে দেবে? সময়ে 'সোনা চেন নাই, খুঁটে বাঁধ নাই।' তখন 'সোনা ফেলে আঁচলে গিঁড়ে দিয়ে লাভ কী?'

হাত দ্বারা কৃত কৃত্রিম মৈথুনের ফলে পুরুষাঙ্গের কোষবৃদ্ধি (হাইড্রোসিল) রোগ হয়। শুক্রক্ষরণ রোগেরও সূত্রপাত হয় এই অতিরিক্ত হস্ত-সঙ্গমের ফলে। এতে বীর্য পাতলা হয়ে যায়। ফলে স্ত্রী-সহবাসের সময় দ্রুত বীর্যস্খলন ঘটে।
হস্তমৈথুনের ফলে কোষ্টবদ্ধতা রোগ সৃষ্টি হয়। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, অল্প কথায় রাগ ধরে বেশী, ধৈর্যশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, স্নায়বিক দুর্বলতা দেখা দেয়, দেহ-মন থেকে স্ফূর্তি চলে যায়, মন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়, শারীরিক দুর্বলতা প্রকাশ পায়, সুন্দর স্বাস্থ্য ধ্বংস হয়ে যায়, দৃষ্টিশক্তি লোপ পায়, পিঠ কুঁজিয়ে যায়, পিঠে এক প্রকার ব্যথা অনুভূত হয়।
হস্তমৈথুনের ফলে স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায়, পড়াশোনায় প্রচন্ড প্রভাব ফেলে এই গুপ্ত যৌনাচার।
হস্তমৈথুনের ফলে খাদ্য হজমে গোলযোগ দেখা দেয়। কর্তব্যে ত্রুটি প্রকাশ পায়, আল্লাহর ইবাদতে ঔদাস্য সৃষ্টি হয়, রোযা নষ্ট হয়ে যায়। আরো কত কি!

অনুরূপ নানা ক্ষতি আছে মাসিক অবস্থায় স্ত্রী-সহবাস করাতে, পায়খানাদ্বারে সঙ্গম করাতে এবং সমকাম করাতে। শরীয়ত সে বিষয়ে সতর্ক করেছে মানুষকে।
মদ, হেরোইন প্রভৃতি মাদকদ্রব্য সেবনে মানুষের যে শারীরিক ক্ষতি হয়, তা বলাই বাহুল্য। এ ছাড়া তামাক, গাঁজা, জর্দা, বিড়ি-সিগারেট প্রভৃতি দ্রব্য সেবনে রয়েছে স্বাস্থ্যগত নানা ক্ষতি।
ডাক্তারগণ উল্লেখ করেছেন যে, ধূমপান হার্ট, রক্তপ্রবাহ, বক্ষ এবং সারা দেহের জন্য ক্ষতিকর। রক্তনালী সংকীর্ণ ও বন্ধ করে ফেলে। শরীরে কফ জন্মায়। টিবি, ক্যান্সার প্রভৃতি রোগের সূত্রপাত হয় এই ধূমপান হতে।
চিকিৎসা-বিজ্ঞানের গবেষণা এ কথা প্রমাণ করেছে যে, ধূমপানের সাথে ফুসফুসের ক্যানসার, সিরোসিস, করান্যারি, অ্যানজাইনা, মুখগহ্বর, গলবিল, স্বরযন্ত্র ও শ্বাসনালীর ক্যানসার এবং আরো অনেক রোগের গভীর সম্পর্ক আছে।
পরিসংখ্যানের প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, এই ধূমপানজনিত রোগের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যুর শিকার হচ্ছে; যাদের বয়স ৩৪ থেকে ৬৫ বছর। ধূমপানের এই সর্বনাশী ক্ষতির হাত হতে মায়ের পেটের ভ্রূণ পর্যন্ত রক্ষা পায় না!

নোংরা ছবি দর্শনের নেশা একটি জঘন্য পাপ। মহান আল্লাহর নির্দেশ হল,
{قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ (۳۰) وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ}
"বিশ্বাসী পুরুষদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের যৌন অঙ্গকে সাবধানে সংযত রাখে; এটিই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। ওরা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত। বিশ্বাসী নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে।" (নূরঃ৩০-৩১)

একদা রাসূলুল্লাহ্ আলীকে বলেছেন,
يَا عَلِيُّ لَا تُتَّبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ فَإِنَّ لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ ».
"হে আলী! একবার নজর পড়ে গেলে আর দ্বিতীয়বার তাকিয়ে দেখো না। প্রথমবারের (অনিচ্ছাকৃত) নজর তোমার জন্য বৈধ। কিন্তু দ্বিতীয়বারের নজর বৈধ নয়। (আহমাদ, আবু দাউদ ২১৫১, তিরমিযী ২৭৭৭, হাকেম ২৭৮৮, বাইহাক্বী ১৩২৯৩, সহীহুল জামে' ৭৯৫৩ নং)

শরীয়তের উক্ত নির্দেশ অমান্য করার ফলে অপরাধীরা নিজেদের কী সর্বনাশ ডেকে আনে তা হয়তো অনেকে অনুমান করতে পারে না। বিশেষ ক'রে সেক্স ও সেক্সী দৃশ্য দেখতে দেখতে কত বড় পাপ ঘটিয়ে বসায় এর অপরাধীরা। মহা ক্ষতি করে ফেলে নিজেদের শরীরের।

* নগ্ন ছবি দেখার ফলে মস্তিষ্কের সম্মুখভাগ নষ্ট হয়ে যায়।
যৌন উত্তেজনামূলক নোংরা ফিল্ম দেখার অভ্যাস মাদকদ্রব্য সেবনের মতোই এক প্রকার ঘৃণ্য ক্ষতিকর অভ্যাস। এর ফলে মস্তিষ্কের সম্মুখভাগ Frontal Loob নষ্ট হয়ে যায়।
গবেষক Gordon S. Bruin বলেন, 'আমার ২০ বছর নোংরা ফিল্ম দর্শনের অভ্যাসীদের চিকিৎসা করতে গিয়ে লক্ষ্য করেছি, যৌন-মিলনের ফিল্ম দেখার অভ্যাস মাদকদ্রব্য সেবনে অভ্যাসের মতো একটি প্রকৃত ব্যাধি।
Cambridge University এর একটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে, pornography দর্শনের ফলে দর্শকের মস্তিষ্ক মাদকদ্রব্য সেবনকারীর মস্তিষ্কের মতো হয়ে যায়।
ফলে তার দর্শন মাদকদ্রব্য সেবনের নেশায় পরিণত হয়। মাদকদ্রব্য সেবন না ক'রে যেমন অভ্যাসীর স্বস্তি আসে না, শান্তি আসে না, ঠিক তেমনই অবস্থা ঘটে পর্ণগ্রাফী দর্শনে অভ্যাসীর।
বড় দুঃখের বিষয় যে, আধুনিক বিশ্বের বিশ্বায়নের যুগে আজ যত্রে-তত্রে নোংরা ছবির ছড়াছড়ি। ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে ২৮০০০ মানুষ নোংরা সাইটে প্রবেশ করছে এবং পশুবৎ যৌনমিলন দর্শন করছে। আরো দুঃখের বিষয় যে, এদের মধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশ হল মহিলা।
এর ফলে এত বৃহৎ সংখ্যক মানুষের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে নোংরা ও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যেহেতু যৌন-উত্তেজনা সৃষ্টিকারী দৃশ্য দেখামাত্র সাথে সাথে dopamine, oxytocin ও testosterone পদার্থ ক্ষরণ হতে থাকে এবং এমন তুফান সৃষ্টি করে, যা মস্তিষ্ককে তছনছ ক'রে ফেলে। ব্রেনের সিস্টেমকেই অস্বাভাবিক ক'রে তোলে এবং স্মৃতিশক্তি ও পড়াশোনার সর্বনাশ ঘটিয়ে ছাড়ে। তাতে ব্রেনের গুরুত্বপূর্ণ কোষ নষ্ট হতেও পারে।

নোংরা যৌনমিলনের ভিডিও দেখার সময় dopamine পদার্থ খুব বেশি আকারে বের হতে থাকে। আর তার ফলে মস্তিষ্কের সম্মুখস্থ অংশ দুর্বল হতে থাকে। আর এই অংশ কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বড় গুরুত্বপূর্ণ। বলা বাহুল্য, মস্তিষ্কের এই অংশটি গাড়ির ব্রেকের মতো। ভেবে দেখুন, আপনি যদি কোন ব্রেকহীন বা ব্রেক খারাপ হওয়া গাড়ি চালান, তাহলে যে কোন দুর্ঘনা ঘটতে বাধ্য। অনুরূপই অতিরিক্ত পর্ণগ্রাফী দর্শনের ফলে আপনি নিজের ব্যক্তিত্ব হারিয়ে ফেলতে পারেন। যেহেতু উক্ত পদার্থ অধিক ক্ষরণের ফলে আপনি আপনার নিজের আচরণের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবেন।
যেমন dopamine পদার্থটি মানুষের মানসিক সুখের জন্য অতীব জরুরী জিনিস। যখনই সুখের কোন বিষয় আসে, যেমন প্রচুর অর্থোপার্জন হয় অথবা কোন বিশাল সফলতা আসে, তখনই উক্ত পদার্থ ক্ষরণ হতে থাকে এবং তারই কারণে আমরা সুখ ও তৃপ্তি অনুভব করতে লাগি। কিন্তু যখনই কোন মানুষ পর্ণগ্রাফী দেখতে অভ্যাসী হয়ে পড়ে, তখনই dopamine পদার্থ বেশি বেশি ক্ষরণ হতে থাকে এবং তার ফলে ধীরে ধীরে সেই কোষগুলি দুর্বল হয়ে পড়ে, যেগুলি উক্ত পদার্থ ক্ষরণ করতে থাকে। আর ক্রমে ক্রমে পদার্থ হ্রাস পেতে থাকে এবং কোষগুলি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। যার ফলশ্রুতিতে মানুষের সুখানুভূতি লয়প্রাপ্ত হয়। সে কোন বিষয়ে আর তেমন সুখানুভব করে না, যেমন পূর্বে করত। তখন সে এমন কিছু অনুসন্ধান করে, যা আরো বেশি উত্তেজনা সৃষ্টি করে। ঠিক যেমনটি মাদকাসক্তির ফলে ঘটে থাকে। যা এক সময় এমন এক পরিস্থিতিতে এনে উপনীত করে, যখন মস্তিষ্কের বিশেষ কোষগুলি বিকল হয়ে যায়। আর এটা অবশ্যই প্রকৃত ধ্বংস।
মাদকাসক্তরা যতটা আসক্তি মাদকদ্রব্যের প্রতি রাখে, তার থেকে বেশি আসক্তি আসে নগ্ন নারীদেহ ও যৌন-মিলন দর্শনের প্রতি। মাদকদ্রব্য মাদকাসক্তদের যতটা ক্ষতি করে, তার থেকে বেশি ক্ষতি করে নগ্ন নারীদেহ ও যৌনমিলন দর্শনের মাধ্যমে উষ্ণ তৃপ্তি গ্রহণকারীদের। কিন্তু নেশার ঘোরে ক্ষতিগ্রস্তরা সে ক্ষতির কথা অনুভবও করতে পারে না। পরিশেষে সর্বনাশই তাদের ভাগ্য হয়।

* সেক্সী ফিল্ম দেখার অভ্যাস করার ফলে অপরাধীর দাম্পত্য জীবন ধ্বংস হয়ে যায়।
ব্রেনের মধ্যে oxytocin পদার্থ মানুষের মাঝে বিশ্বাস রক্ষার দায়িত্ব পালন করে থাকে। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যে বিশ্বস্ততা থাকে, তাও আসলে উক্ত পদার্থই সৃষ্টি করে থাকে।
অধিকাধিক পর্ণগ্রাফী দৃশ্য দেখার ফলে উক্ত পদার্থ প্রচুর পরিমাণে ক্ষরণ হয়। এর ফলে তার মনে সৃষ্টি হয় কাল্পনিক নারী-নেশা ও যৌনক্ষুধা। সুতরাং উক্ত পদার্থ ক্ষরণের স্বাভাবিক সিস্টেম বিগড়ে যায়, বিগড়ে যায় আরো কিছু হরমোন ক্ষরণের সিস্টেম। এরই ফলশ্রুতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার দাম্পত্য জীবন। অনেক ক্ষেত্রে ভেঙ্গে পড়ে আবেগ ও সম্প্রীতির জীবন।
বহু গবেষণা এ কথার তাকীদ করেছে যে, অশ্লীল ফিল্ম দর্শনই বহু দাম্পত্য সমস্যা ও পারিবারিক বিবাদের জন্য দায়ী।
পর্ণগ্রাফী দেখার ফলে যুবক হস্তমৈথুন বা অন্য কোন বিরল মৈথুনে আসক্ত হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে সে কাল্পনিক কোন যৌনময় জগতে বসবাস শুরু করে, যা স্বামী- স্ত্রীর বৈবাহিক যৌনজগৎ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। বিবাহ ও স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন তার কাছে যৌনক্ষুধা নিবারণের মাধ্যম বৈ অন্য কিছু মনে হয় না। এর ফলে বাস্তব দাম্পত্য সুখের কথা তার মন থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। অতঃপর বিবাহ করলেও সে তাতে অসফল ও অসুখী হয়। সাধারণতঃ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিশ্বাসঘাতকতার সন্দেহ জন্মে। পরিশেষে কাল্পনিক যৌনাচার অথবা ব্যভিচারের মাধ্যমে বাস্তব যৌনাচারের মাঝে সুখ অনুভব করতে চায়। আর এরই দরুন সে দম্পতির সংসারের শিশমহল ভেঙে চূর্ণ হয়ে যায়।

* সেক্সী ফিল্ম দেখার অভ্যাস করার ফলে অপরাধী ব্যভিচারের মতো বড় পাপ ঘটায়।
এ কথা স্বাভাবিক যে, অশ্লীল দৃশ্য দেখার ফলে দেহমন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ফলে হস্তমৈথুন বা অন্য কোন বিরল যৌনাচারে লিপ্ত হয়। তাতেও তৃপ্তি না পেলে এবং সহমতাবলম্বী সঙ্গী পেলে ব্যভিচার অথবা সমকামের মাধ্যমে মনের আগুন নির্বাপিত করে ও নিজের যৌনক্ষুধা নিবারণ করে এবং সেটা তার স্বাভাবিক চরিত্রে পরিণত হয়।

* সেক্সী ফিল্ম দেখার অভ্যাস করার ফলে অপরাধী ধর্ষণের মতো বড় পাপ ঘটায়।
অনেক দর্শকই বাস্তব সুখ ও তৃপ্তি অনুভব করতে গিয়ে ব্যভিচারী হয়ে যায়। পরন্তু অনেক সময় সহমতাবলম্বী সঙ্গী না পেলে ধর্ষণের মতো আরো বড় অপরাধ করতে উদ্বুদ্ধ হয়।
ডক্টর Victor B. Cline লিখেছেন, অশ্লীল ছবি দর্শকের চরিত্র বিরল প্রকৃতির হয়ে ওঠে। সুতরাং বলাৎকার, ইভটিজিং, শিশু অপহরণ ইত্যাদির মতো অপরাধ তার স্বাভাবিক আচরণ হয়ে যায়।

* সেক্সী ফিল্ম দেখার অভ্যাস করার ফলে অপরাধীর স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে থাকে।
গবেষণায় জানা গেছে যে, অশ্লীল সেক্সী চিত্রাবলী দর্শন অভ্যাসে পরিণত হওয়ার ফলে মানুষের স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। পড়ুয়াদের পড়াশোনায় বিশাল ক্ষতি হয়। মন বিক্ষিপ্ত ও উদাসীন হয়। মানসিক আরও অন্যান্য সমস্যা দেখা দেয়।

* সেক্সী ফিল্ম দেখার অভ্যাস করার ফলে নাবালক শিশুদের ভবিষ্যৎ বরবাদ হয়ে যায়।
যে সকল শিশুদের বয়স ১৪ বছরের নিম্নে, বিশেষ করে তাদের জীবন এই অশ্লীল চিত্রাবলী দর্শনের ফলে ভীষণভাবে প্রভাবান্বিত হয়। তাদের মস্তিষ্ক বিকৃত হতে থাকে। তারা অপরাধ জগতের দিকে ঢলে পড়ে। তারা ভাবে ফ্রি সেক্সই হল স্বাভাবিক জীবন। যৌবনের প্রথম পদক্ষেপেই যে সকল চিত্র দর্শন ক'রে বাস্তবে তা চরিতার্থ করতে চায়। ফলে নোংরা জীবনই তাদের আসল জীবন হয়ে দাঁড়ায়।

* সেক্সী ফিল্ম দেখার অভ্যাস করার ফলে অপরাধীর নানা রোগ সৃষ্টি হতে পারে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় জানা গেছে যে, অশ্লীল যৌনমিলনের ছবি দেখার ফলে মানুষের নানা রোগ দেখা দিতে পারে। যেমন হরমোন সমস্যা, হৃদরোগ, ব্লাডপ্রেসার, atherosclerosis ইত্যাদি।

স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের নগ্নদেহ দর্শন সে ক্ষতি করে না। গবেষণায় জানা গেছে যে, স্বামী-স্ত্রীর নগ্নদেহের বৈধ দর্শন ও যৌন-সংসর্গে উক্ত কোন ক্ষতির আশঙ্কাই নেই। বরং তা উভয়ের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ও বড় উপকারী। স্বামী-স্ত্রীর যৌনাচারের ফলে তাদের উভয়ের মধ্যে immunity system শক্তিশালী হয় এবং ব্রেনের সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।
স্বামী-স্ত্রীর যৌনাচারে dopamine, endorphins-oxytocin, serotonin এবং অন্যান্য পদার্থ স্বাভাবিক আকারে ক্ষরণের ফলে তাদের উভয়ের মনে অধিক প্রশান্তি ও ভালোবাসা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।
পক্ষান্তরে অন্য নারীদেহ নগ্ন দেখলে অথবা ব্যভিচারের মাধ্যমে উপভোগ করলে উক্ত পদার্থগুলি বেশি আকারে ক্ষরণ হতে থাকে। আর তা স্বভাবতই মস্তিষ্কের প্রভূত ক্ষতি সাধন করে, যেমন মাদকদ্রব্য মাদকাসক্তের ক'রে থাকে। বৈধ ও অবৈধ উভয় যৌনমিলনের মাঝে পার্থক্য করে প্রকৃত ও স্বাভাবিক প্রেমবন্ধনের অবর্তমানতা। তারই ফলে ব্রেন-ফাংশনে নানা ডিস্টার্ব সৃষ্টি হয়।
পূর্বেই বলা হয়েছে মস্তিষ্কের সম্মুখভাগ বা Frontal Loob গাড়ির ব্রেকের মতো। এই ভাগের কাজ হল পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু অবৈধ যৌনমিলন করা বা দেখার ফলে ধীরে ধীরে তার অনেকাংশ নষ্ট হয়ে যায়, ঠিক যেমন গাড়ি অস্বাভাবিক গতিতে চালালে ব্রেক নষ্ট হয়ে যায়। পক্ষান্তরে স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালালে তা সহজে নষ্ট হয় না। অনুরূপ স্বাভাবিক ও বৈধ সম্পর্কের যৌনমিলন করা ও দেখার ফলে উক্ত ক্ষতির আশঙ্কা থাকে না। বরং এর ফলে ব্রেনের উক্ত ভাগটি সতেজ, সক্রিয় ও মানব জীবনের বহু সাফল্যের সহযোগী হয়ে ওঠে। যেহেতু এ হল সুমহান স্রষ্টার সৃষ্টি। তিনিই স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই একে অন্যের পোশাক বানিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
{هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ} (۱۸۷) سورة البقرة
“তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।” (বাক্বারাহঃ ১৮৭)

বিবাহের বিধান দিয়ে তিনিই তাদের মাঝে ভালোবাসা ও স্নেহময় সম্পর্কের বাঁধনে উভয়কে বেঁধে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
{وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ} (۲۱) سورة الروم
“তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে আর একটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের সঙ্গিনীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা ওদের নিকট শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মায়া-মমতা সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।” (রুমঃ ২১)
কত সুন্দর মহান স্রষ্টা! কত সুন্দর তাঁর বিধান!! (সূত্র ইন্টারনেট)

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 জ্ঞানের উপর পাপের প্রভাব

📄 জ্ঞানের উপর পাপের প্রভাব


মহান প্রতিপালক মানুষকে জ্ঞান দ্বারা বহু জীবের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং সেই জ্ঞান যাতে বিলুপ্ত না হয়, তার জন্য মদকে হারাম করেছেন। যে জিনিস মাদকতা ও নেশা আনে, তাই মদ বা মাদকদ্রব্য; যা সেবন করলে জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ জ্ঞানশূন্য হয়ে যায়। আর জ্ঞানশূন্য হলে তার দ্বারা বহু কুকাম ঘটে যায়। এই জন্য কুরআনে মদকে অপবিত্র ও শয়তানী কর্ম বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (٩٠) سورة المائدة
“হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (মায়িদাহঃ ৯০)

আর মহানবী বলেছেন,
(الْخَمْرُ أُمُّ الْفَوَاحِشَ وَأَكْبَرُ الْكَبَائِرِ مَنْ شَرِبَهَا وَقَعَ عَلَى أُمِّهِ وَخَالَتِهِ وَعَمَّتِهِ)).
“মদ হল যাবতীয় অশ্লীলতার প্রধান এবং সবচেয়ে বড় পাপ। যে ব্যক্তি তা পান করল, সে যেন নিজ মা, খালা ও ফুফুর সাথে ব্যভিচার করল!” (ত্বাবারানী, সঃ জামে' ৩৩৪৫নং)

الْخَمْرُ أُمُّ الْخَبَائِثِ، فَمَنْ شَرِبَهَا لَمْ تُقْبَلْ مِنْهُ صَلَاتُهُ أَرْبَعِينَ يَوْمًا، فَإِنْ مَاتَ وَهِيَ فِي بَطْنِهِ مَاتَ مَيْتَةً جَاهِلِيَّةً)).
"মদ যাবতীয় নোংরামির মূল। যে কেউ তা পান করবে, তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। (যে ব্যক্তি তার মূত্রথলিতে ঐ মদের কিছু পরিমাণ রাখা অবস্থায় মারা যাবে, তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যাবে এবং) যে কেউ তা নিজ পেটে রেখে মারা যাবে, সে জাহেলী যুগের মরণ মরবে।" (ত্বাবারানী ১৫৪৩, দারাকুত্বনী ৪/২৪৭, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৬৯৫নং)

আবু দারদা বলেন, আমাকে আমার বন্ধু বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন যে,
((لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ شَيْئًا ، وَإِنْ قُطَّعْتَ وَحُرِّقْتَ ، وَلَا تَتْرُكْ صَلَاةً مَكْتُوبَةً مُتَعَمِّدًا ، فَمَنْ تَرَكَهَا مُتَعَمِّدًا ، فَقَدْ بَرنَتْ مِنْهُ الدَّمَّةُ ، وَلَا تَشْرَبِ الْخَمْرَ ، فَإِنَّهَا مِفْتَاحُ كُلَّ شَ).
"তুমি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না---যদিও (এ ব্যাপারে) তোমাকে হত্যা করা হয় অথবা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ইচ্ছাকৃত ফরয নামায ত্যাগ করো না। কারণ যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নামায ত্যাগ করে, তার উপর থেকে (আল্লাহর) দায়িত্ব উঠে যায়। আর মদ পান করো না, কারণ মদ হল প্রত্যেক অমঙ্গলের (পাপাচারের) চাবিকাঠি।" (ইবনে মাজাহ ৪০৩৪, সহীহ ইবনে মাজাহ ৩২৫৯নং)

বলা বাহুল্য, মদ্যপায়ী অপরাধী। আর তার অপরাধের ফলে প্রথম ক্ষতি হয় নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার।

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 মান-সম্ভ্রমের উপর পাপের প্রভাব

📄 মান-সম্ভ্রমের উপর পাপের প্রভাব


প্রকৃত মানুষ হল সেই, যার মনুষত্ব আছে, মনুষ্যত্ববোধ আছে। যার ঈমানের সাথে সুন্দর চরিত্র আছে। কিন্তু অনেক সময় মানুষ এমন পাপ করে, যার ফলে তার নিজের মান-সম্ভ্রম নষ্ট ক'রে ফেলে। মহান আল্লাহর কাছে তো বটেই, মানুষের কাছেও তার সম্মান ধূলিস্মাৎ হয়।
যে কোনও সামাজিক অপরাধে মানুষ সমাজের চোখে চ্যুত হয়ে যায়। চুরি- ডাকাতি, খুন, অবৈধ প্রেম-ভালোবাসা, ব্যভিচার, ধর্ষণ, সুদখোরি, মিথ্যাবাদিতা, চুগলখোরি, গীবত, অহংকার ইত্যাদি মহাপাপে লিপ্ত হওয়ার ফলেও সে মানুষের চোখে ছোট হয়ে যায়। কিন্তু এখানে বলার উদ্দেশ্য, বংশীয় মান-মর্যাদা। বলা বাহুল্য, এর সংরক্ষার জন্য ইসলাম পবিত্র বিবাহের বিধান দিয়েছে এবং এমন পাপকেও ইসলাম 'পাপ' বলে চিহ্নিত করেছে, যা বংশীয় সম্মান ও কুলমানকে প্রভাবান্বিত করে এবং পবিত্র বংশে অবৈধ সংমিশ্রণ ঘটায়।
যেমন সেই লক্ষ্যে ইসলাম ব্যভিচারকে 'হারাম' ঘোষণা করেছে এবং ইহ-পরকালে তার শাস্তি নির্ধারণ করেছে। ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া তো দূরের কথা, তার ভূমিকা ও অবতরণিকায় যেতে এবং তার নিকটবর্তী হতেও নিষেধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبيلاً) (۳۲) سورة الإسراء
"তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।" (বানী ইস্রাঈল: ৩২)

ব্যভিচারের দিকে আকর্ষণ করে এমন সমূহ আচরণকে নিষিদ্ধ করেছে ইসলাম। ব্যভিচারের সকল চোরা পথকে বন্ধ করা হয়েছে ইসলামী নৈতিকতায়।
সুতরাং ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কে বলেছে চক্ষু অবনত করতে। কারণ ঘসাঘসি থেকেই আগুন লাগে এবং চোখাচোখি থেকেই শুরু হয় কাছাকাছি হওয়ার প্রস্তুতি। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ (۳۰) وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ} (۳۱)
"মু'মিনদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের যৌন অঙ্গকে সাবধানে সংযত রাখে; এটিই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। ওরা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত। মু'মিন নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে।" (নূর: ৩০-৩১)

বলা বাহুল্য, নিজ সম্ভ্রম বাঁচানোর এটাই হল প্রাথমিক প্রয়াস। জারীর বিন আব্দুল্লাহ বলেন, আচমকা দৃষ্টি সম্পর্কে আমি রাসূলুল্লাহ -কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমাকে আদেশ করলেন, যেন আমি আমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিই। (মুসলিম ৫৭৭০নং)

একদা তিনি আলী -কে বলেছিলেন,
يَا عَلِيُّ لَا تُتَّبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ فَإِنَّ لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ ..
"হে আলী! একবার নজর পড়ে গেলে আর দ্বিতীয়বার তাকিয়ে দেখো না। প্রথমবারের (অনিচ্ছাকৃত) নজর তোমার জন্য বৈধ। কিন্তু দ্বিতীয়বারের নজর বৈধ নয়।" (আহমাদ, আবু দাউদ ২১৫১, তিরমিযী ২৭৭৭, হাকেম ২৭৮৮, বাইহাক্বী ১৩২৯৩, সহীহুল জামে' ৭৯৫৩ নং)

তিনি বলেছেন,
(( لَا يَنْظُرُ الرَّجُلُ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ ، وَلَا المَرْأَةُ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ ، وَلَا يُفْضِي الرَّجُلُ إِلَى الرَّجُلِ فِي ثَوْبِ وَاحِدٍ ، وَلَا تُفْضِي المَرْأةُ إِلَى المَرْأَةِ فِي الثَّوْبِ الواحِدِ )) .
“কোন পুরুষ অন্য পুরুষের গুপ্তাঙ্গের দিকে যেন না তাকায়। কোন নারী অন্য নারীর গুপ্তস্থানের দিকে যেন না তাকায়। কোন পুরুষ অন্য পুরুষের সঙ্গে একই কাপড়ে যেন (উলঙ্গ) শয়ন না করে। (অনুরূপভাবে) কোন নারী, অন্য নারীর সাথে একই কাপড়ে যেন (উলঙ্গ) শয়ন না করে। (মুসলিম ৭৯৪নং)

আর এ সকল নির্দেশ হল কেবল নিজের সম্ভ্রম বাঁচানোর উদ্দেশ্যে। যারা এ সকল আদেশ লংঘন করার পাপ করে, তাদের মান-সম্মান একদিন না একদিন ভূলুণ্ঠিত অবশ্যই হয়।

দর্শনঘটিত কোন অনভিপ্রেত অপরাধ না ঘটতে দেওয়ার মানসে প্রবেশানুমতির বিধান রয়েছে ইসলামে। বাড়ির ইজ্জত যাতে নষ্ট না হয়, কোন মহিলার প্রতি অথবা কারো গোপনাঙ্গের প্রতি যেন দৃষ্টিপাত না হয়, তার জন্যই কুরআন বলেছে,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ (۲۷) فَإِن لَّمْ تَجِدُوا فِيهَا أَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوهَا حَتَّى يُؤْذِنَ لَكُمْ وَإِن قِيلَ لَكُمُ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا هُوَ أَزْكَى لَكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ}
"হে মু'মিনগণ! তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য কারও গৃহে গৃহবাসীদের অনুমতি না নিয়ে ও তাদেরকে সালাম না দিয়ে প্রবেশ করো না। এটিই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। যদি তোমরা গৃহে কাউকেও না পাও, তাহলে তোমাদেরকে যতক্ষণ না অনুমতি দেওয়া হয়, ততক্ষণ ওতে প্রবেশ করবে না। যদি তোমাদেরকে বলা হয়, 'ফিরে যাও' তবে তোমরা ফিরে যাবে; এটিই তোমাদের জন্য পবিত্রতম। আর তোমরা যা কর, সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত।" (নূর : ২৭-২৯)

মহানবী বলেছেন,
(( إِنَّمَا جُعِلَ الإِسْتِبْدَانُ مِنْ أجل البَصَ). متفقٌ عَلَيْهِ
"দৃষ্টির কারণেই তো (প্রবেশ) অনুমতির বিধান করা হয়েছে।" (অর্থাৎ, দৃষ্টি থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে ঐ নির্দেশ।) (বুখারী ৬২৪১, মুসলিম ৫৭৬৪নং)

উকি মেরে বাড়ির ভিতরে তাকিয়ে দেখা এক মহা অপরাধ। এ ব্যাপারে কড়া নির্দেশ রয়েছে ইসলামের। মহানবী বলেছেন,
مَن اطَّلَعَ فِي بَيْتِ قَوْمٍ بِغَيْرِ إِذْنِهِمْ فَقَدْ حَلَّ لَهُمْ أَنْ يَفْقَنُوا عَيْنَهُ ..
"যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের গৃহে তাদের অনুমতি না নিয়ে উঁকি মেরে দেখে সে ব্যক্তির চোখে (ঢিল ছুঁড়ে) তাকে কানা ক'রে দেওয়া তাদের জন্য বৈধ হয়ে যায়।" (বুখারী ৬৯০২, মুসলিম ৫৭৬৮নং, আবু দাউদ, নাসাঈ)

((مَنْ اطَّلَعَ فِي بَيْتِ قَوْمٍ بِغَيْرِ إِذْنِهِمْ فَفَقَنُوا عَيْنَهُ فَلَا دِيَةً لَهُ وَلَا قِصَاصَ)).
"যে ব্যক্তি কোন গোষ্ঠীর গৃহে তাদের বিনা অনুমতিতে উকি মারে এবং তারা (দেখতে পেয়ে) তার চক্ষু ফুটিয়ে দেয়, তবে তাতে কোন (দন্ডনীয়) রক্তপণ (দিয়াত) বা অনুরূপ বদলা (ক্বিসাস) নেই।" (আহমাদ ৮৯৯৭, দারাকুত্বনী ৩৪৮, ইবনে হিব্বান ৪০০৬নং)

দৃষ্টি হল প্রেমমেঘের প্রথম বৃষ্টি। আর বাদলের ধারাপাত শুরু হলে পাপ বন্যায় বানভাসি হতে দেরী লাগে না। তাই ইসলামের বিধানে দৃষ্টি-সংযমের অনুশীলন।
ব্যভিচারের একটি প্রধান ভূমিকা হল স্পর্শ। মিলনের ইচ্ছা না থাকলেও কোন অবৈধ নারী-দেহ স্পর্শ করা বৈধ নয় ইসলামে। কারণ সেই পরশই হতে পারে মিলনের দূত। আর ঘটাতে পারে নৈতিকতা ধ্বংসের অনেক বড় পাপ। সেই জন্য মহানবী বলেছেন,
((لأَنْ يُطْعَنَ فِي رَأْس رَجُل بِمِخْيَطٍ مِنْ حَدِيدٍ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمَسَّ امْرَأَةً لَا تَحِلُّ لَهُ)).
"কোন ব্যক্তির মাথায় লৌহ সুচ দ্বারা খোঁচা যাওয়া ভালো, তবুও যে নারী তার জন্য অবৈধ, তাকে স্পর্শ করা ভালো নয়।" (ত্বাবারানী ১৬৬৮৮-০-১৬৮৮১, সিঃ সহীহাহ ২২৬ নং)
বিশেষ ক'রে ভিড়ের মাঝে স্পর্শ থেকে সতর্ক থাকে চরিত্রবান পুরুষ। আর ভিড়ের সুযোগ নিয়ে নারী-দেহ বা তার কোমলাঙ্গ স্পর্শ করে চরিত্রহীন পুরুষ।

পর্দাহীনতা ব্যভিচারের একটি বড় ছিদ্রপথ। নারীদেহ দর্শনসুলভ হওয়ার ফলে ব্যবহারসুলভ হয়ে উঠে। ব্যভিচার ও ধর্ষণের বাজার গরম হয়। বেড়ে চলে কুমারী মা ও অবৈধ সন্তানের সংখ্যা। তাতে ইজ্জত যায় উভয় পক্ষের। তাই সেই চোরাপথ রুদ্ধ করার লক্ষ্যে এবং পবিত্র পরিবার গঠনের উদ্দেশ্যে ইসলাম পর্দার বিধান দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاء بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاء بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَو التَّابِعِينَ غَيْر أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَو الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاء وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (۳۱) سورة النور
"মু'মিন নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে। তারা যা সাধারণতঃ প্রকাশ থাকে তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য যেন প্রদর্শন না করে, তারা তাদের বক্ষঃস্থল যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত রাখে। তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগিনী পুত্র, তাদের নারীগণ, নিজ অধিকারভুক্ত দাস, যৌনকামনা- রহিত অনুচর পুরুষ অথবা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত কারও নিকট তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। আর তারা যেন এমন সজোরে পদক্ষেপ না করে, যাতে তাদের গোপন আভরণ প্রকাশ পেয়ে যায়। হে মু'মিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।" (নূর: ৩১)

মহানবী বলেছেন,
خَيْرُ نِسَائِكُمُ الْوَدُودُ الْوَلُودُ الْمَوَاتِيَةُ الْمُوَاسِيَةُ إِذَا اتَّقَيْنَ اللَّهَ وَشَرُّ نِسَائِكُمُ الْمُتَبَرِّجَاتُ الْمُتَخَيَّلاتُ وَهُنَّ الْمُنَافِقَاتُ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مِنْهُنَّ إِلَّا مِثْلُ الْغُرَابِ الْأَعْصَمِ ..
"তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ স্ত্রী সে, যে প্রেমময়ী, অধিক সন্তানদাত্রী, যে (স্বামীর) সহমত অবলম্বন করে, (স্বামীকে বিপদে-শোকে) সান্ত্বনা দেয় এবং সেই সাথে আল্লাহর ভয় রাখে। আর তোমাদের সবচেয়ে খারাপ মেয়ে তারা, যারা বেপর্দা, অহংকারী, তারা কপট নারী, তাদের মধ্যে লাল রঙের ঠোঁট ও পা-বিশিষ্ট কাকের মতো (বিরল) সংখ্যক বেহেশে যাবে।" (বাইহাক্বী ১৩২৫৬নং)

তিনি আরো বলেছেন,
((الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ فَإِذَا خَرَجَتِ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ)).
"মেয়ে মানুষ (সবটাই) লজ্জাস্থান (গোপনীয়)। আর সে যখন বের হয়, তখন শয়তান তাকে পুরুষের দৃষ্টিতে সুশোভন করে তোলে।" (তিরমিযী ১১৭৩, মিশকাত ৩১০৯ নং)

তিনি আরো বলেছেন, "মহিলা হল গোপনীয় জিনিস। বাইরে বের হলে শয়তান তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে নির্নিমেষ তাকিয়ে দেখতে থাকে।" (ত্বাবারানী, ইবনে হিব্বান, ইবনে খুযাইমা, সহীহ তারগীব ৩৩৯, ৩৪১, ৩৪২নং)

একা বাইরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে মহিলাকে। বিপদের ভয়েই তাদের নিরাপত্তার জন্যই সঙ্গে স্বামী অথবা কোন এগানা (মাহরাম) পুরুষ সঙ্গী থাকার শর্তারোপ করা হয়েছে। তাতে ইভটিজিং-সহ আরো অন্যান্য অঘটনের হাত থেকে মহিলা নিষ্কৃতি পেতে পারে।
বিশেষ ক'রে মহিলার একাকিনী সফর করা নিষিদ্ধ। পুরুষের ক্ষেত্রেই একা সফরের নিন্দা করা হয়েছে। মহানবী বলেছেন,
(( الرَّاكِبُ شَيْطَانٌ ، وَالرَّاكِبَانِ شَيْطَانَان ، وَالثَّلَاثَةُ رَكْبٌ )).
"একজন (সফরকারী) আরোহী একটি শয়তান এবং দু'জন আরোহী দু'টি শয়তান। আর তিনজন আরোহী একটি কাফেলা।" (আহমাদ, আবু দাউদ ২৬০৭নং, তিরমিযী, হাকেম ২/১০২, সহীহুল জামে' ৩৫২৪নং)

এ কথা যদি পুরুষের ক্ষেত্রে হয়, তাহলে মহিলার ক্ষেত্রে কী হতে পারে, তা সহজে অনুমেয়।
বলা বাহুল্য, মহিলাকে বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সে যেন একাকিনী সফর না করে। কোন সফরই না, ইবাদতের সফরও না। মহানবী বলেছেন,
(( لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ تُسَافِرُ مَسِيرَةَ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ عَلَيْهَا )). متفقٌ عَلَيْهِ
"আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি যে নারী ঈমান রাখে, তার মাহরামের সঙ্গ ছাড়া একাকিনী এক দিন এক রাতের দূরত্ব সফর করা বৈধ নয়।" (বুখারী ১০৮৮, মুসলিম ৩৩৩১-৩৩৩২নং)

((لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةِ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ ، وَلَا تُسَافِرُ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ».
"কোন পুরুষ যেন কোন বেগানা নারীর সঙ্গে তার সাথে এগানা পুরুষ ছাড়া অবশ্যই নির্জনতা অবলম্বন না করে। আর মাহরাম ব্যতিরেকে কোন নারী যেন সফর না করে।"
এক ব্যক্তি আবেদন করল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার স্ত্রী হজ্জ পালন করতে বের হয়েছে। আর আমি অমুক অমুক যুদ্ধে নাম লিখিয়েছি।' তিনি বললেন,
(( انْطَلِقْ فَحُجَّ مَعَ امْرَأَتِكَ)).
"যাও, তুমি তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হজ্জ কর।" (বুখারী ৫২৩৩, মুসলিম ১৩৪১নং)

কিন্তু ইসলামের এই নীতিকে উল্লংঘন করার ফলে যে অপরাধ মহিলারা করে, তারই সত্বর কুফল স্বরূপ তাদের জীবনে অভিশাপ নেমে আসে। চিরদিনকার জন্য পবিত্রতা ও সতীত্ব নষ্ট হয়ে যায় অনেক মহিলার চরিত্র থেকে। কেউ ইভটিজিংয়ের শিকার হয়, কেউ বা হয় ধর্ষিতা। কেউ তা ঢেকে রাখে, কেউ প্রকাশ ক'রে সাহসের সাথে ধর্ষকের শাস্তি দেয়। শাস্তি তো দৃষ্টান্তমূলক হয় না। ফলে মহিলার যা হারিয়ে যাওয়ার তা হারিয়ে যায়। যে দাগ লেগে যায়, তা আর মুছে না। এই জন্যই নারী-স্বাধীনতার আহবায়করা যা বলে তাদের কথায় কান না দিয়ে যদি ইসলামের বিধান মেনে মহিলা পূর্ব সতর্কতামূলক কাজ করত এবং একাকিনী সফর না করত, তাহলে হয়তো সে অনেকটা সুরক্ষিতা থাকতে পারত। বাঁচতে পারত শ্লীলতাহানির ছোবল থেকে, থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাছারি ও নানা জেরা-কৈফিয়তের হাত থেকে। রেহাই পেত হুমকি-ধমকি ও খুন হওয়ার আশঙ্কা থেকে।
মেয়ের কি একাকিনী সফরের অধিকার নেই? একাকিনী বা পছন্দসই (অর্ধনগ্ন) পোশাকে বের হলেই কি পুরুষদের অধিকার জন্মে যায় ইভটিজিং করার? না, তা হয়তো নয়। কিন্তু এর ফলে সংঘটিত বিপদের জন্য মহিলার উন্নাসিকতা অনেকটাই দায়ী।
আত্মরক্ষার জন্য মহিলার ক্যারাটে শেখা দরকার।
তা হয়তো মোকাবেলার সময় কাজে দেবে। কিন্তু অকস্মাৎ বিপদের হাত থেকে রেহাই পাবে না।
এর জন্য প্রশাসনকে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।
প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ করলে এবং অপরাধীকে মৃত্যুদন্ড দিলেও কি মহিলার যা হারিয়ে গেছে, তা আর ফেরৎ পাবে?
যার কেউ নেই, সে কী করবে? বাইরে যেতে বাধ্য হলে সে কী করবে?
সে কথা আলাদা। প্রয়োজনের তাকীদের আদেশ পালনের বোঝা হাল্কা হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوا وَأَطِيعُوا} (١٦) سورة التغابن
"তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর এবং শোনো ও আনুগত্য কর।" (তাগাবুনঃ ১৬)
সুতরাং ভেবে দেখুন, আপনার মনে ভয়ের পরিমাণ কতটুকু? ভয় আছে, নাকি অনীহা কাজ করছে?

পুরুষের মনে নারীর প্রতি প্রকৃতিগত আকর্ষণ আছে। অনেক পুরুষের মাঝে তা সুপ্ত থাকে। অনেক পুরুষের মাঝে তা প্রদমিত থাকে। কিন্তু অনেক সময় নারীই সেই আকর্ষণকে জাগ্রত ও মুক্ত করে। সৎ চরিত্রের পুরুষ তা দমন করে। কিন্তু অসৎ চরিত্রের পুরুষ দমনে অক্ষম হয় এবং স্বাভাবিকভাবেই সেই আকর্ষণকারিণী নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আর তার ফলে তার মনে সেই নারীকে কাছে পাওয়ার তীব্র বাসনা প্রকট ও প্রবল হয়ে উঠে। এই জন্য মৌলিকভাবে এই অঘটনের সূত্রপাত ও ছিদ্রপথ বন্ধ করার লক্ষ্যে ইসলাম নানা বিধান দিয়েছে। তার মধ্যে একটা হল, মহিলা পথ চলাকালে বাজনাদার অলংকার পরবে না। কুরআন বলেছে,
{وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ} (۳۱) سورة النور
"তারা যেন এমন সজোরে পদক্ষেপ না করে, যাতে তাদের গোপন আভরণ প্রকাশ পেয়ে যায়।" (নূর: ৩১)

মহিলা এমন আকর্ষণীয় চাল-চলন প্রদর্শন করবে না, যাতে পুরুষ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। পর্দার ভিতরেও এমন সাজসজ্জা প্রকাশ করবে না, যাতে পুরুষের নজর কাড়ে। সুকেশিনী মহিলা পর্দার ভিতরে কেশ গোপন করবে, কিন্তু এমন উঁচু ক'রে রাখবে না, যাতে তার সেই কেশের কথা পুরুষ অনুমান করতে পারে এবং অসৎ চরিত্রের পুরুষ তার প্রতি লোভনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে, আর সেই সাথে মনের অভ্যন্তরে তার 'ভালোলাগা'টা 'ভালোবাসা'য় পরিণত না হয়ে যায়।
যে মহিলা ইসলামের এ বিধি লংঘন করে, তার জীবনে নেমে আসে অভিশাপ। সাধারণতঃ সে অপরাধিনীর চরিত্র ভালো হয় না এবং পরকালে তার জন্য শাস্তি অপেক্ষা করে। মহানবী বলেছেন,
صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا قَوْمٌ مَعَهُمْ سِيَاطٌ كَأَذْنَابِ الْبَقَرِ يَضْرِبُونَ بِهَا النَّاسَ وَنِسَاءً كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلاتٌ مَائِلَاتٌ رُءُوسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْمَائِلَةِ لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ ريحَهَا وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ كَذَا وَكَذَا ..
"দুই শ্রেণীর মানুষ জাহান্নামের অধিবাসী; যাদেরকে আমি দেখিনি। (তারা ভবিষ্যতে আসবে।) প্রথম শ্রেণী (অত্যাচারীর দল) যাদের সঙ্গে থাকবে গরুর লেজের মত চাবুক, যদ্বারা তারা লোককে প্রহার করবে। আর দ্বিতীয় শ্রেণী হল সেই নারীদল; যারা কাপড় তো পরিধান করবে, কিন্তু তারা বস্তুতঃ উলঙ্গ থাকবে, যারা পুরুষদের আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও তাদের প্রতি আকৃষ্ট হবে, যাদের মস্তক (খোঁপা বাঁধার কারণে) উটের হিলে যাওয়া কুঁজের মতো হবে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, তার গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধ এত এত দূরবর্তী স্থান থেকেও পাওয়া যাবে।" (আহমাদ ৮৬৬৫, মুসলিম ৫৭০৪, সিঃ সহীহাহ ১৩২৬নং)

উক্ত শ্রেণীর আকর্ষণকারিণী বেপর্দা মহিলারা অভিশপ্তা। মুসলিমরা তাদেরকে অভিশাপ দিতে আদিষ্ট হয়েছে। মহানবী বলেছেন,
((سَيَكُونُ فِي آخِرِ أُمَّتِي رِجَالٌ يَرْكَبُونَ عَلَى السُّرُوجِ كَأَشْبَاهِ الرِّجَالِ يَنْزِلُونَ عَلَى أَبْوَابِ الْمَسْجِدِ نِسَاؤُهُمْ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ عَلَى رُءُوسِهِمْ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْعِجَافِ الْعَنُوهُنَّ فَإِنَّهُنَّ مَلْعُونَاتٌ .......
"আমার শেষ যামানার উম্মতের মধ্যে কিছু এমন লোক হবে যারা ঘরের মত জিন্ (মোটর গাড়ি) তে সওয়ার হয়ে মসজিদের দরজায় দরজায় নামবে। (গাড়ি করে নামায পড়তে আসবে।) আর তাদের মহিলারা হবে অর্ধনগ্না; যাদের মাথা কৃশ উটের কুঁজের মতো (খোঁপা) হবে। তোমরা তাদেরকে অভিশাপ করো। কারণ, তারা অভিশপ্তা!" (আহমাদ ৭০৮-৩, ইবনে হিব্বান, ত্বাবারানী, সিঃ সহীহাহ ২৬৮-৩নং)

প্রদমিত বা সুপ্ত যৌনবাসনাকে মুক্ত বা জাগরিত করার আরো একটি অসীলা হল, মহিলার সুবাস বিতরণ করা। মহিলার নিকট থেকে বিতরিত এই সুবাসের ফলে পুরুষ আকৃষ্ট হয়। যে সৌন্দর্য ও সৌরভের একমাত্র অধিকারী তার স্বামী। কিন্তু পাপিনী ইসলামের সে বিধানের প্রতি উন্নাসিকতা প্রদর্শন করে। ফলে নিজের ক্ষতি নিজে করে। প্রকৃতপক্ষে এমন সুবাস বিতরণ ক'রে আকর্ষণ করার অভ্যাস ভালো মেয়েদের হয় না। তাই মহানবী বলেছেন,
((كُلُّ عَيْنِ زَانِيَةٌ ، وَالْمَرْأَةُ إِذا اسْتَعْطَرَتْ فَمَرَّتْ بِالْمَجْلِسِ فَهِيَ كَذَا وَكَذَا ))، يَعْنِي زَانِيَةً.
"প্রত্যেক চক্ষুই ব্যভিচারী। আর রমণী যদি সুগন্ধি ব্যবহার করে কোন (পুরুষের) মজলিসের পাশ দিয়ে পার হয়ে যায় তাহলে সে এক বেশ্যা।" (আহমাদ, সঃ তিরমিযী ২২৩৭, আবু দাউদ ৪১৭৫নং)

আবু হুরাইরা একদা চাশতের সময় মসজিদ থেকে বের হলেন। দেখলেন, একটি মহিলা মসজিদ প্রবেশে উদ্যত। তার দেহ বা লেবাস থেকে উৎকৃষ্ট সুগন্ধির সুবাস ছড়াচ্ছিল। আবু হুরাইরা মহিলাটির উদ্দেশে বললেন, 'আলাইকিস্ সালাম।' মহিলাটি সালামের উত্তর দিল। তিনি তাকে প্রশ্ন করলেন, 'কোথায় যাবে তুমি?' সে বলল, 'মসজিদে।' বললেন, 'কি জন্য এমন সুন্দর সুগন্ধি মেখেছ তুমি?' বলল, 'মসজিদের জন্য।' বললেন, 'আল্লাহর কসম?' বলল, 'আল্লাহর কসম।' পুনরায় বললেন, 'আল্লাহর কসম?' বলল, 'আল্লাহর কসম।' তখন তিনি বললেন, 'তবে শোন, আমাকে আমার প্রিয়তম আবুল কাসেম বলেছেন যে,
((لَا تُقْبَلُ لِاْمْرَأَةٍ صَلَاةٌ تَطَيَّبَتْ بِطِيبٍ لِغَيْرِ زَوْجِهَا حَتَّى تَغْتَسِلَ مِنْهُ غُسْلَهَا مِنَ الْجَنَابَةِ)).
“সেই মহিলার কোন নামায কবুল হয় না, যে তার স্বামী ছাড়া অন্য কারোর জন্য সুগন্ধি ব্যবহার করে; যতক্ষণ না সে নাপাকীর গোসল করার মত গোসল ক'রে নেয়।” অতএব তুমি ফিরে যাও, গোসল করে সুগন্ধি ধুয়ে ফেল। তারপর ফিরে এসে নামায পড়ো।' (আবু দাউদ ৪১৭৬, নাসাঈ ৫১২৭, ইবনে মাজাহ ৪০০২, বাইহাক্বী ৫৫৮২, সিলসিলাহ সহীহাহ ১০৩ ১নং)

সুপ্ত ও গুপ্ত যৌন কামনাকে জাগ্রত ও প্রকাশ করে মোহনীয় কণ্ঠে মহিলার কথোপকথন। মিষ্টি কথার আকর্ষণে অসৎ চরিত্রের লোকের মন মুগ্ধ হয়। ফলে তাকে না দেখলেও সুন্দর কথার উপর সুন্দর চেহারা কল্পনা করে এবং তা এক নজর দেখার কামনা পোষণ করতে শুরু করে। আর এইভাবে তাকে ধীরে-ধীরে ব্যভিচারের দিকে অগ্রসর করে। তাই ইসলাম গোড়াতেই তার শিকড় নির্মূল করার ব্যবস্থা দিয়ে বলেছে,
إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا}
“(হে নারীগণ!) যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কন্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর। (স্বাভাবিকভাবে কথা বল।)” (আহযাবঃ ৩২)

নিদ্রিত যৌন বাসনাকে জাগিয়ে তোলে নারী-পুরুষের পৃথক স্থানে নির্জনতাবলম্বন। যে স্থানে বা বাড়িতে যুবক-যুবতী একাকিত্ব অবলম্বন করে, সে স্থানে উভয়ের মনে এক প্রকার বাসনা সৃষ্টি হয়, যে বাসনা তাদেরকে ব্যভিচারের পথ প্রদর্শন করতে পারে। এই জন্য ইসলামের বিধান হল, বাড়িতে মহিলা একা থাকলে বেগানা পুরুষের উচিত, তার নিকট প্রবেশ না করা এবং কোন জরুরী প্রয়োজন পড়লে পর্দার অন্তরাল থেকেই তা পূরণ করা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
{ وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعاً فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ } [ الأحزاب : ٥٣ ]
অর্থাৎ, তোমরা তাদের নিকট হতে কিছু চাইলে পর্দার অন্তরাল হতে চাও। (সূরা আহযাব ৫৩ আয়াত)

একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন,
(( إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ ! )) فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الأَنْصَارِ : أَفَرَأَيْتَ الحَمْوَ ؟ قَالَ : (( الحمو المَوْتُ ! )) . متفق عَلَيْهِ
"তোমরা (বেগানা) নারীদের নিকট (একাকী) যাওয়া থেকে বিরত থাক।” (এ কথা শুনে) জনৈক আনসারী নিবেদন করল, 'স্বামীর আত্মীয় সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?' তিনি বললেন, "স্বামীর আত্মীয় তো মৃত্যুসম (বিপজ্জনক)।" (বুখারী ৫২৩২, মুসলিম ২১৭২, তিরমিযী ১১৭১নং)

তিনি বলেছেন,
(( لا تَلِجُوا عَلَى الْمُغِيبَاتِ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنْ أَحَدِكُمْ مَجْرَى الدَّم)).
"তোমরা সেই মহিলাদের নিকট গমন করো না যাদের স্বামীরা অনুপস্থিত আছে। কারণ, শয়তান তোমাদের রক্তশিরায় প্রবাহিত হয়।" (আহমাদ ১৪৩২৪, সঃ তিরমিযী ৯৩৫নং, সঃ ইবনে মাজাহ ১৭৭৯নং)

হ্যাঁ, স্বামী না থাকলে এবং মহিলা একাকিনী থাকলে পরপুরুষের সাথে অঘটন ঘটতেই পারে। সেই নির্জন স্থানে উভয়ের মনে কুমন্ত্রণা দেয় শয়তান। একজনকে অপরজনের প্রতি আকৃষ্ট করে। মহানবী ﷺ বলেছেন,
(( أَلا لا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةِ ، إِلَّا كَانَ ثَالِثَهَمَا الشَّيْطَانُ)).
"যখনই কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনতা অবলম্বন করে, তখনই শয়তান তাদের তৃতীয় সাথী (কোটনা) হয়।" (সহীহ তিরমিযী ৯৩৪নং, নাসাঈর কুবরা ৯২১৯, বাইহাক্বী ১৩৯০৪, হাকেম ৩৮-৭, ৩৯০, ত্বাবারানী ৫৬১নং)

এই জন্যই ইসলামের বিধান হল,
« لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةِ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ ». متفق عَلَيْهِ
"মাহরামের উপস্থিতি ছাড়া কোন পুরুষ যেন কোন মহিলার সাথে নির্জনবাস না করে।" (বুখারী ৫২৩৩, মুসলিম ৩৩৩৬নং)

কোন ক্ষেত্রেই না, না পার্থিব ও সাংসারিক কোন ক্ষেত্রে। আর না পারলৌকিক ও ইবাদতের ক্ষেত্রে। না কোন নির্জন প্রান্তরে বা কক্ষে। আর না কোন মসজিদ বা কুরআনের দর্সগাহে। না ডাক্তারের সাথে, আর না-ই নিজ হবু বর বা কনের সাথে। কারণ কোন ক্ষেত্রেই শয়তান নিজ কর্তব্যে অবহেলা করে না। আর আপনি নিজেও বলতে বাধ্য,
{وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّيَ إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ}
"আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না, মানুষের মন অবশ্যই মন্দকর্ম প্রবণ, কিন্তু সে নয় যার প্রতি আমার প্রতিপালক দয়া করেন। নিশ্চয় আমার প্রতিপালক অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (ইউসুফ: ৫৩)

যেখানে নারী-পুরুষের গোপনাঙ্গ দেখা যায়, সেখানে যাওয়া উচিত নয়, যেতে দেওয়া উচিত নয়। তাতেও নিজের ইজ্জত পরে দেখবে এবং পরের ইজ্জত নজরে আসবে। সেখানেও রয়েছে মান-সম্মানহানির ব্যাপার, রয়েছে আকর্ষণ ও ভালোলাগা থেকে ভালোবাসার ব্যাপার।
ইসলামের বিধান হল, সাধারণী স্নানঘাটে স্নান করা যাবে না, বিশেষ ক'রে মহিলাদের জন্য হারাম। যেমন খোলামেলা পুকুরঘাট, নদীঘাট বা সমুদ্রতীরে গোসল করা বৈধ নয়। অথবা কোন আম গোসলখানায় গোসল করা জায়েয নয়। মহানবী বলেছেন,
(وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يُدْخِلْ حَلِيلَتَهُ الْحَمَّامَ))
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে সে যেন তার স্ত্রীকে সাধারণ গোসলখানায় প্রবেশ করতে না দেয়।" (আহমাদ ১৪৬৫১, সহীহ তারগীব ১৬০নং)

উম্মে দারদা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি সাধারণ গোসলখানা হতে বের হলাম। ইত্যবসরে নবী -এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলে তিনি আমাকে বললেন, “কোথেকে, হে উম্মে দারদা?!" আমি বললাম, 'গোসলখানা থেকে।' তিনি বললেন,
((وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا مِنْ امْرَأَةٍ تَضَعُ ثِيَابَهَا فِي غَيْرِ بَيْتِ أَحَدٍ مِنْ أُمَّهَاتِهَا إِلَّا وَهِيَ هَاتِكَةٌ كُلَّ سِتْرِ بَيْنَهَا وَبَيْنَ الرَّحْمَنِ)).
"সেই সত্তার শপথ; যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! যে কোনও মহিলা তার কোন মায়ের ঘর ছাড়া অন্য স্থানে নিজের কাপড় খোলে, সে তার ও পরম দয়াময় (আল্লাহর) মাঝে প্রত্যেক পর্দা বিদীর্ণ করে ফেলে।" (আহমাদ ২৭০৩৮, তাবারানীর কাবীর, সহীহ তারগীব ১৬২নং)

তিনি আরো বলেছেন,
((أَيُّمَا امْرَأَةٍ نَزَعَتْ ثِيَابَهَا فِي غَيْرِ بَيْتِهَا خَرَقَ اللَّهُ عَنْهَا سِتْرًا)).
"যে নারী স্বগৃহ ছাড়া অন্য স্থানে নিজের পর্দা রাখে (কাপড় খোলে) আল্লাহ তার পর্দা ও লজ্জাশীলতাকে বিদীর্ণ করে দেন। (অথবা সে নিজে করে দেয়।) (আহমাদ ২৬৬১১, ত্বাবারানী ৭১০, হাকেম ৭৭৮২, শুআবুল ঈমান বাইহাক্বী ৭৭৭৪নং)

((أَيُّمَا امْرَأَةٍ نَزَعَتْ ثِيَابَهَا فِي غَيْرِ بَيْتِ زَوْجِهَا هَتَكَتْ سِتْرَ مَا بَيْنَهَا وَبَيْنَ رَبِّهَا)).
"যে মহিলা নিজের স্বামীগৃহ ছাড়া অন্য গৃহে নিজের কাপড় খোলে, সে আল্লাহ আয্যা অজাল্লা ও তার নিজের মাঝে পর্দা বিদীর্ণ করে ফেলে।" (আহমাদ ২৪১৪০, তিরমিযী ২৮০৩, ইবনে মাজাহ ৩৭৫০, হাকেম, সঃ জামে' ২৭১০নং)

বলা বাহুল্য, নারী-পুরুষ উভয়কেই গোসল করার সময় পর্দা করা উচিত। লজ্জাশীলতা ঈমানের অঙ্গ। আর নারীর ভূষণই হল লজ্জাশীলতা। মহানবী বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ حَيِيٌّ سِتِّيرُ يُحِبُّ الْحَيَاءَ وَالسَّتْرَ فَإِذَا اغْتَسَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْتَتِرُ ..
"অবশ্যই আল্লাহ আয্যা অজাল্ল অতি লজ্জাশীল ও গোপনকারী। তিনি লজ্জাশীলতা ও গোপনীয়তাকে পছন্দ করেন। সুতরাং তোমাদের কেউ গোসল করলে সে যেন পর্দা করে নেয়।" (আহমাদ ১৭৫০৯, আবু দাউদ ৪০ ১২, নাসাঈ ৪০৬নং)

ব্যাভিচারের একটি চোরাপথ হল বিবাহে অনীহা প্রকাশ করা। নানা অমূলক ওযরে ও খোঁড়া অজুহাতে বিবাহ করে না অনেক যুবক-যুবতী অথবা বিবাহ দিতে চায় না অনেক অভিভাবক।
কেউ বলে, 'ছেলে এখন ছোট, তার বয়স হয়নি।' অথচ তার মন নারীর নেশাতে চুর হয়ে আছে।
কেউ বলে, 'নিজের পায়ে দাঁড়াক, চাকরী পাক তারপর।'
কেউ মনোমতো পণ বা যৌতুক পায় না, তাই বিবাহে দেরী করে।
কেউ চাকরীর টাকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে চাকরি-ওয়ালী মেয়ের বিবাহে বিলম্ব করে।
কেউ কিশোরী মেয়ে আছে বলে তার বিয়ের বয়স ও বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত বিয়ের উপযুক্ত ছেলের বিয়ে পিছিয়ে দেয়।
অথচ মহান প্রতিপালকের নির্দেশ হল,
{وَأَنكِحُوا الْأَيَامَى مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ إِن يَكُونُوا فُقَرَاء يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ) (۳۲) سورة النور
"তোমাদের মধ্যে যাদের স্বামী-স্ত্রী নেই, তাদের বিবাহ সম্পাদন কর এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎ, তাদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত ক'রে দেবেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।" (নূরঃ ৩২)

আর মহানবী বলেছেন,
((إِذَا أَتَاكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ خُلُقَهُ وَدِينَهُ فَزَوِّجُوهُ ، إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ عريض)).
"তোমাদের নিকট যখন এমন ব্যক্তি (বিবাহের পয়গাম নিয়ে) আসে; যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা মুগ্ধ, তখন তার সাথে (মেয়ের) বিবাহ দাও। যদি তা না কর তাহলে পৃথিবীতে ফিৎনা ও মহাফাসাদ সৃষ্টি হয়ে যাবে।" (তিরমিযী ১০৮-৪, ইবনে মাজাহ ১৯৬৭, মিশকাত ৩০৯০, সিঃ সহীহাহ ১০২২নং)

বৈবাহিক জীবন অবলম্বন না করলে সত্যই মহাফাসাদ সৃষ্টি হয় পৃথিবীতে। বিবাহে যারা অনীহা প্রকাশ করেছে, যারা বিনা বিবাহে 'লিভ-টুগেদার' করে, যারা সমকামী হয়ে জীবন অতিবাহিত করে, তাদের জীবন নিশ্চয় সুশৃঙ্খল নয়। তাদের জীবনে থাকে নানা ফিতনা, ফাসাদ, অশান্তি ও অপমান। সে বেহায়াদের জীবন ছন্নছাড়া বাঁধনহারা। ঠিক হুইলের সাথে বাঁধন-ছেড়া ঘুড়ির মতো। কখন যে কোন হাওয়ায় উড়ে গিয়ে কোথায় পড়ে, তার ঠিকানা কেউ কি বলতে পারে?

ব্যভিচারের আরো একটি ছিদ্রপথ হল অভিভাবকের অভিভাবকত্বে অবজ্ঞা ও অবহেলা করা অথবা উদার মনোভাবের পরিচয় দিয়ে জেনেশুনে মেয়ের কাপ ও পাপ দেখে চুপ থাকা। যাকে মেড়ামি বা ভেড়ামি বলা যায়। মহানবী বলেছেন,
((ثَلَاثَةٌ لَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْعَاقُّ وَالِدَيْهِ وَالْمَرْأَةُ الْمُتَرَجِّلَةُ الْمُتَشَبِّهَةُ بِالرِّجَالِ وَالدَّيُّوتُ .......
"তিন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং তাদের প্রতি আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকিয়েও দেখবেন না; পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, পুরুষবেশিনী বা পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বনকারিণী মহিলা এবং দাইয়ূস (মেড়া) পুরুষ; (যে তার স্ত্রী, কন্যা ও বোনের চরিত্রহীনতা ও নোংরামিতে চুপ থাকে এবং বাধা দেয় না।) (আহমাদ ৬১৮০, নাসাঈ ২৫৬২, সহীহুল জামে' ৩০৭ ১নং)

এই মেড়াদের কি ভদ্র সমাজে কোন মান আছে বলতে পারেন?
মোটেই না। অবশ্য যুগের হাওয়া দেখে অনেকে জীবন-তরীর পাল তুলে ফায়দা নিতে চায়। বিয়ের অনুষ্ঠান ব্যয়বহুল দেখে অনেকে চায়, মেয়ের বিয়ে বিনা পয়সায় হয় তো হয়ে যাক। তার জন্য মেয়ের অস্বাভাবিক আচরণ দেখেও আপত্তি ও প্রতিবাদ করে না। ছেলে-বন্ধুদের সাথে অবাধে মেলামিশা করছে দেখেও বাধা দেয় না। তাদের মন বলে, 'ঘটে তো ঘটে যাক, পটে তো পটে যাক, লাগে তো লেগে যাক, আর বিনা পয়সায় বিয়েটা হয় তো হয়ে যাক।'
সে ক্ষেত্রে তারা জেনেশুনে দায়িত্ব এড়াতে চায়। ভুলে যায় শরীয়তের নির্দেশ, ভুলে যায় নিজ মান-সম্মানের কথা। কারণ, তার চাইতে বিশাল হল টাকা। কুল যায় তো চলে যাক, টাকা আমার জমা থাক। কিন্তু তারা জানে না যে, টাকা হারালে টাকা ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু মান হারালে মান ফিরে পাওয়া যায় না।
তারা জানে না অথবা মানে না যে, মহানবী বলেছেন,
(( كُلُّكُمْ رَاعٍ ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ : الإِمَامُ رَاعٍ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ فِي أَهْلِهِ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ ، وَالمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا وَمَسْئُولَةٌ عَنْ رَعِيَّتِهَا ، وَالخَادِم راع في مال سَيِّدِهِ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ ، وَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ )).
"প্রতিটি মানুষই দায়িত্বশীল। সুতরাং প্রত্যেকে অবশ্যই তার অধীনস্থদের দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। দেশের শাসক জনগণের দায়িত্বশীল। সে তার দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জবাবদিহী করবে। পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল। অতএব সে তার দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামীগৃহের দায়িত্বশীলা। কাজেই সে তার দায়িত্বশীলতা বিষয়ে জিজ্ঞাসিতা হবে। দাস তার প্রভুর সম্পদের দায়িত্বশীল। সে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনস্থের দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।" (বুখারী ৮৯৩, ২৪০৯, ৫১৮৮- প্রভৃতি, মুসলিম ৪৮-২৮-নং)

তিনি আরো বলেছেন,
(إِنَّ اللَّهَ سَائِلٌ كُلَّ رَاعٍ عَمَّا اسْتَرْعَاهُ ، حَفِظَ ذَلِكَ أَمْ ضَيَّعَ ، حَتَّى يَسْأَلَ الرَّجُلَ عَنْ أَهْل بَيْتِهِ)).
"আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক রক্ষককে তার রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে এবং প্রত্যেক তত্ত্বাবধায়ক ও অভিভাবককে তার তত্ত্বাবধান ও অভিভাবকত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন। যথার্থই কি তারা তাদের কর্তব্য পালন করেছে, নাকি অবহেলা হেতু তা বিনষ্ট করেছে?" (নাসাঈ ৯১৭৪, ইবনে হিব্বান ৪৪৯২, সঃ জামে' ১৭৭৪নং)

ব্যভিচারের একটি সূক্ষ্ম ছিদ্রপথ পরস্ত্রীর সৌন্দর্য নিজের স্বামীর কাছে বর্ণনা করা। যেখানে ঈর্ষা হওয়ার কথা, সেখানে তা না হয়ে পরস্ত্রীর রূপ-যৌবন নিজ স্বামীর কাছে বলে তৃপ্তি নিয়ে নিজের সর্বনাশ নিজেই ডেকে আনে কোন কোন অপরিণামদর্শী মহিলা। তার ফলে কিছু না হলেও স্বামীর হার্দিক ব্যভিচার হতে পারে। তাই শরীয়তের নিষেধাজ্ঞা হল,
(( لَا تُبَاشِرُ المَرْأَةُ المَرْأَةَ ، فَتَنْعَتَهَا لِزَوْجِهَا كَأَنَّهُ يَنْظُرُ إِلَيْهَا )). رواه البخاري
"কোন মহিলা যেন অন্য কোন মহিলাকে (নগ্ন) কোলাকুলি না করে। (কারণ) সে পরে তার স্বামীর কাছে তা এমনভাবে বর্ণনা করবে যে, যেন সে (তা শুনে) ঐ মহিলাকে প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করছে।" (বুখারী ৫২৪০-৫২৪১নং)

নিজ সম্ভ্রম বাঁচানোর মূলে যে জিনিস প্রধান ভূমিকা পালন করে, তা হল ঈমানের পর লজ্জাশীলতা। অবশ্য লজ্জাশীলতাও ঈমানের অন্যতম শাখা। সুতরাং মানুষ যখন লজ্জা-শরমের মাথা খায়, তখন নিজের ইজ্জত-সম্ভ্রমের খেয়াল রাখে না। খেয়াল রাখে না জাত-কুল-মানের মর্যাদার। খেয়াল রাখে না দ্বীন ও সমাজের। সকল কিছুকে তুচ্ছ ক'রে নির্লজ্জ নিজেকে সফল ও সুখী ধারণা করে। লজ্জাহীনতার তুফানে নিজ শিক্ষা, সংস্কার, চরিত্র, বংশীয় মর্যাদা ইত্যাদি ভেসে গেলেও সে নিজেকে 'বিজয়ী' ধারণা করে। কারণ সে তখন নিজেকে ভাবে, একজন 'হিরো' অথবা 'হিরোইন'। অথচ সে অনুভব করেও করে না যে, তার সে ধারণা ভুল। তার সামাজিক মর্যাদা ধূলামলিন। মহানবী বলেছেন,
((مَا كَانَ الْفُحْشُ فِي شَيْءٍ قَطُّ إِلَّا شَانَهُ وَلَا كَانَ الْحَيَاءُ فِي شَيْءٍ قَطُّ إِلَّا زَانَهُ)).
"অশ্লীলতা (নির্লজ্জতা) যে বিষয়েই থাকে, সে বিষয়কে তা সৌন্দর্যহীন (মান) করে ফেলে। আর লজ্জাশীলতা যে বিষয়েই থাকে, সে বিষয়কে তা সৌন্দর্যময় (মনোহর) করে তোলে।" (আহমাদ ১২৬৮-৯, বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ, সহীহ তিরমিযী ১৬০৭, ইবনে মাজাহ ৪১৮-৫৮, সহীহুল জামে' ৫৬৫৫নং)

নির্লজ্জের লজ্জা অবশিষ্ট থাকে না বলেই মান-সম্মানের খেয়াল না রেখেই সমাজে প্রকাশ্যে ধৃষ্টতা প্রদর্শন করতে পারে। কোন মানুষের কোন প্রকার পরোয়া না ক'রে নির্লজ্জতার ভূমিকা পালনে বড় পটীয়ান বা পটীয়সী হয়। মহানবী বলেছেন,
((إِنَّ مِمَّا أَدْرَكَ النَّاسُ مِنْ كَلَامِ النُّبُوَّةِ إِذا لَمْ تَسْتَحْيِ فَاصْنَعْ مَا شِئْتَ)).
"প্রথম নবুঅতের বাণীসমূহের যা লোকেরা পেয়েছে তার মধ্যে একটি বাণী এই যে, তোমার লজ্জা না থাকলে যা মন তাই কর।" (আহমাদ ১৭০৯০, বুখারী ৩৪৮৪, আবু দাউদ ৪৭৯৯, ইবনে মাজাহ ৪১৮-৩, সহীহুল জামে ২২৩০নং)

পক্ষান্তরে যে এমন কোন অপরাধ করে না, যার ফলে নিজ মান-সম্ভ্রমে আঁচড় পড়ে, সে চরিত্রবান। আর চরিত্রবানের প্রধান ভূমিকা হল লজ্জাশীল হওয়া। মহানবী বলেছেন,
((إِنَّ لِكُلِّ دِين خُلُقًا ، وَخُلُقُ الإِسْلامِ الْحَيَاءُ)).
"প্রত্যেক ধর্মে সচ্চরিত্রতা আছে, ইসলামের সচ্চরিত্রতা হল লজ্জাশীলতা।" (ইবনে মাজাহ ৪১৮-১-৪১৮২, সহীহুল জামে ২১৪৯নং)

বলা বাহুল্য, যে নির্লজ্জতা প্রদর্শনের পাপ করে, তার মান-সম্মান থাকে না, না আল্লাহর কাছে, আর না মানুষের কাছে।
অবশ্য দুটি জিনিস উক্ত নির্লজ্জতার ব্যাপারে সহযোগিতা করে অথবা ঢাকা- চাপা দেওয়ার কাজ করে। আর তা হল রাজনৈতিক প্রভাবশালিতা ও অর্থশালিতা। প্রভাবশালীদের অপরাধ সমাজে লঘুজ্ঞান করা হয়। তবে তলায় তলায় থাকে তাদের প্রতি আন্তরিক ঘৃণা।
ইসলাম যেমন নিজের ইজ্জত নিজে নষ্ট করতে নিষেধ করেছে, তেমনি নিষেধ করেছে অপরের ইজ্জত নষ্ট করতে। অবৈধ করেছে এমন আচরণকে, যাতে অপরের সম্ভ্রমে আঘাত লাগে। মহানবী বলেছেন,
(( كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ : دَمُهُ وَعِرْضُهُ وَمَالُهُ )) . رواه مسلم
"প্রত্যেক মুসলিমের রক্ত, সম্ভ্রম ও ধন-সম্পদ অন্য মুসলিমের উপর হারাম।" (মুসলিম ৬৭০৬নং)

(( أَلَا إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ عَلَيْكُمْ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا ، فِي بَلَدِكُم هَذَا ، في شَهْرِكُمْ هَذَا ، أَلا هَلْ بَلَغْتُ ؟ ( قَالُوا : نَعَمْ ، قَالَ : (( اللَّهُمَّ اشْهَدْ )) ثلاثاً.
"সতর্ক হয়ে যাও, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি তোমাদের রক্ত ও মাল হারাম ক'রে দিয়েছেন; যেমন তোমাদের এদিন হারাম তোমাদের এই শহরে, তোমাদের এই মাসে। শোনো! আমি কি (আল্লাহর পয়গাম) পৌঁছে দিয়েছি?" সাহাবীগণ বললেন, 'হ্যাঁ।' অতঃপর তিনি তিনবার বললেন, “হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক।” (বুখারী ৪৪০২, কিছু অংশ মুসলিম ২৩৪নং)

((الرِّبَا اثْنَانِ وَسَبْعُونَ بَاباً أَدْنَاهَا مِثْلُ إتيان الرَّجُل أُمَّهُ ، وَإِنَّ أَرْبَى الرِّبَا اسْتِطَالَةُ الرَّجُلِ فِي عَرْضِ أَخِيهِ)).
"সূদ (খাওয়ার পাপ হল) ৭২ প্রকার। যার মধ্যে সবচেয়ে ছোট পাপ হল মায়ের সাথে ব্যভিচার করার মতো! আর সবচেয়ে বড় (পাপের) সুদ হল নিজ (মুসলিম) ভাইয়ের সম্ভ্রম নষ্ট করা।" (ত্বাবারানীর আউসাত্ব ৭১৫১, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৮৭১নং)

উমার বলেছেন, 'কোন ব্যক্তির বাকপটুতা যেন তোমাদেরকে মুগ্ধ না করে। ব্যক্তি হল সেই, যে আমানত আদায় করল এবং লোকের সম্ভ্রম লুটা থেকে বিরত থাকল।' (আল-ইসাবাহ ৬৪০২নং)

ইসলাম নিষেধ করেছে কোন মানুষের চরিত্রে কালিমা লেপন করতে, বিনা অপরাধে অপরকে কষ্ট দিতে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ وَالَّذِينَ يُؤْدُّونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا }
"যারা বিনা অপরাধে বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ এবং স্পষ্ট অপরাধের বোঝা বহন করে।" (আহযাবঃ ৫৮)

নির্দোষ চরিত্রে কলঙ্ক দেওয়া এক মহা অপরাধ। অপরাধীরা নবীপত্নীর চরিত্রেও অপবাদ দিতে কসুর করেনি। মহান আল্লাহ সে চরিত্রের পবিত্রতা ঘোষণা ক'রে মুসলিমদের জন্য একটি সাধারণ বিধান দিয়ে বলেছেন,
{وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاء فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ} (٤) سورة النور
"যারা সাধুী রমণীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর স্বপক্ষে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশি বার কশাঘাত করবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না; এরাই তো সত্যত্যাগী।" (নূর: ৪)

কিন্তু যে পরিবেশে এ বিধান কার্যকর করা হয় না, সে পরিবেশে কত নিরপরাধ মানুষের প্রতি মিথ্যারোপ করা হয়, তার ইয়ত্তা নেই। দেশের আইন সেই সকল অপরাধীদের শায়েস্তা করতে পারে না বিধায় অপরাধ তথা অপবাদের বাজার গরম থাকে মজলিসে-মজলিসে। কিন্তু তারা হয়তো জানে না বা বিশ্বাস করে না যে, দুনিয়ার বিচার থেকে বেঁচে গেলেও শেষ বিচারের দিন তাদের উপর ঐ দন্ডবিধি প্রয়োগ করা হবে। মহানবী বলেছেন,
(( مَنْ قَدْفَ مَمْلُوكَهُ بِالزِّنَى يُقَامُ عَلَيْهِ الحَدُّ يَومَ القِيَامَةِ ، إِلَّا أَنْ يَكُونَ كَمَا قَالَ )).
"যে ব্যক্তি নিজ মালিকানাধীন দাসের উপর ব্যভিচারের অপবাদ দেবে, কিয়ামতের দিন তার উপর হদ (দণ্ডবিধি) প্রয়োগ করা হবে। তবে সে যা বলেছে, দাস যদি তাই হয় (তাহলে ভিন্ন কথা।)" (বুখারী ৬৮৫৮, মুসলিম ৪৪০ ১নং)

বহু মানুষ আছে, যারা ভালোর ঘরে মন্দ চায়। পবিত্র পরিবেশে অপবিত্রতা কামনা করে। পরিচ্ছন্ন পরিবারে নোংরামি প্রবেশ করাতে চায়। তারা চায় সৎ লোকের বাড়িতে পাপ অনুপ্রবেশ করুক। বেশ্যা চায়, সারা দুনিয়ার মেয়েরা বেশ্যা হোক। তারা চায়, আমার মেয়ে যেমন প্রেম ক'রে বেরিয়ে গেছে, তেমনি অন্যের মেয়েও বেরিয়ে যাক, আমার ছেলে যেমন লম্পট, তেমনি অন্যের ছেলেও লম্পট হোক। অনেকে অন্যের ঘরে ছলে-বলে-কলে-কৌশলে অশ্লীলতা প্রবিষ্ট করে এবং অনেকে তাতে অক্ষম হলে অপবাদ রচনা করে রটনা করে। তারা চায় না, কোন সৎ লোকের পরিবেশ ভালো থাকুক। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} (۱۹) سورة النور
"যারা মু'মিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য আছে ইহলোকে ও পরলোকে মর্মন্তুদ শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না।" (নূর: ১৯)

পবিত্র চরিত্রে কলঙ্ক দেওয়া একটি কদর্য আচরণ ও সর্বনাশী কর্ম। একদা মহানবী বললেন,
اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ ..
“তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী কর্ম হতে দূরে থাক।” সকলে বলল, ‘হে আল্লাহর রসূল! তা কী কী?’ তিনি বললেন,
ه الشَّرْكُ بِاللَّهِ وَالسِّحْرُ وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ وَأَكْلُ الرِّبَا وَالتَّوَلَّى يَوْمَ الزَّحْفِ وَقَدْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ ..
“আল্লাহর সাথে শির্ক করা, যাদু করা, ন্যায় সঙ্গত অধিকার ছাড়া আল্লাহ যে প্রাণ হত্যা করা হারাম করেছেন তা হত্যা করা, সুদ খাওয়া, এতীমের মাল ভক্ষণ করা, (যুদ্ধক্ষেত্র হতে) যুদ্ধের দিন পলায়ন করা এবং সতী উদাসীনা মুমিনা নারীর চরিত্রে মিথ্যা কলঙ্ক দেওয়া।” (বুখারী ২৭৬৬, মুসলিম ২৭২নং, আবু দাউদ, নাসাঈ)

তিনি আরো বলেছেন,
وَمَنْ قَالَ فِي مُؤْمِن مَا لَيْسَ فِيهِ حُبِسَ فِي رَدْغَةِ الْخَبَالِ حَتَّى يَخْرُجَ مِمَّا قَالَ ».
“আর যে ব্যক্তি কোন মুমিন মানুষের চরিত্রে এমন কথা বলে, যা তার মধ্যে নেই, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ জাহান্নামের নর্দমায় বাস করতে দেবেন; যতক্ষণ পর্যন্ত না সে যা বলেছে তা হতে বের হয়ে এসেছে। কিন্তু তখন আর সে বের হতে পারবে না।” (আবু দাউদ ৩৫৯৭, হাকেম ২/২৭, ত্বাবারানী ১৩২৫৪, বাইহাকী ১১৭৭৩, সহীহুল জামে' ৬১৯৬নং)

এই সকল কথা জেনেও আলেম হয়ে নির্দ্বিধায় আলেমকে অপবাদ দেয়, ‘অমুক দরবারী আলেম। অমুক সরকারের পা-চাঁটা। অমুক ইয়াহুদীর দালাল। অমুক ইংরেজের আওলাদ। অমুক দাজ্জালের গোলাম।’ ইত্যাদি। তাহলে আর জাহেলদের ব্যাপারে কী বলবেন?
এইভাবে হয়তো অনেকে তার বক্তব্য ও লেখনীতে প্রকাশ করে না, কিন্তু মনে মনে অনেকের প্রতি কুধারণা পোষণ করে। আর তা যে কোন সময়ে গীবত বা অপবাদের আকার ধারণ করতে পারে। অথচ এ ব্যাপারে ইসলামের বিধান কত সুন্দর! মহানবী বলেছেন,
(( إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ ، فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الحَدِيثِ ، وَلَا تَحَسَّسُوا وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا تَنَافَسُوا ، وَلَا تَحَاسَدُوا ، وَلَا تَبَاغَضُوا ، وَلَا تَدَابَرُوا ، وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا كَمَا أَمَرَكُمْ الْمُسْلِمُ أَخُو المُسْلِمِ ، لَا يَظْلِمُهُ ، وَلَا يَخْذُلُهُ وَلَا يَحْقِرُهُ ، التَّقْوَى هَاهُنَا التَّقْوَى هَاهُنَا )) وَيُشِيرُ إِلَى صَدْرِهِ (( بِحَسْبِ امْرِيءٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ ، كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ : دَمُهُ ، وَعِرْضُهُ ، وَمَالُهُ ، إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى أَجْسَادِكُمْ ، وَلَا إِلَى صُوَرِكُمْ ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ )) .
"তোমরা কুধারণা পোষণ করা থেকে বিরত থাক। কারণ কুধারণা সব চাইতে বড় মিথ্যা কথা। অপরের গোপনীয় দোষ খুঁজে বেড়ায়ো না, অপরের জাসুসী করো না, একে অপরের সাথে (অসৎ কাজে) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করো না, পরস্পর হিংসা করো না, পরস্পরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করো না, একে অপরের বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন হয়ো না। তোমরা আল্লাহর বান্দা, ভাই ভাই হয়ে যাও; যেমন তিনি তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে তার প্রতি যুলুম করবে না, তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেবে না এবং তাকে তুচ্ছ ভাববে না। আল্লাহভীতি এখানে রয়েছে। আল্লাহভীতি এখানে রয়েছে। (এই সাথে তিনি নিজ বুকের দিকে ইঙ্গিত করলেন।) কোন মুসলমান ভাইকে তুচ্ছ ভাবা একটি মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রত্যেক মুসলমানের রক্ত, সম্ভ্রম ও সম্পদ অপর মুসলমানের উপর হারাম। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের দেহ ও আকার- আকৃতি দেখেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমল দেখেন।" (মুসলিম ৬৭০১-৬৭০৫, বুখারী ৫১৪৩, ৬০৬৪, ৬০৬৬, ৬৭২৪নং)

আসলেই হৃদয়ের 'তাক্বওয়া' এমন জিনিস, দুশমন হলেও তার কথা ও আচরণে সংযম সৃষ্টি করে, ন্যায়পরায়ণতার গন্ডি থেকে বের হতে বাধাদান করে। 'তাক্বওয়া' হল উত্তম সম্বল। 'তাক্বওয়া' হল উত্তম লেবাস। ইল্ম হল অলংকার। কিন্তু যে সম্বলহীন বিবস্ত্র, তার অলংকারে কী শোভা দেবে?
অনেকে অপরের ছিদ্রান্বেষণ ক'রে ও দোষ খুঁজে তাকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করতে প্রয়াস পায়। অপরের গোপন ত্রুটি অনুসন্ধান ক'রে লোকালয়ে তাকে উলঙ্গ করে। নিশ্চয় তারা ফাসাদী। মহানবী বলেছেন,
(( إِنَّكَ إِنِ اتَّبَعْتَ عَوْرَاتِ الْمُسْلِمِينَ أَفْسَدْتَهُمْ ، أَوْ كِدْتَ أَنْ تُفْسِدَهُمْ ))
"যদি তুমি মুসলমানদের গুপ্ত দোষগুলি খুঁজে বেড়াও, তাহলে তুমি তাদের মাঝে ফাসাদ সৃষ্টি ক'রে দেবে অথবা তাদের মধ্যে ফাসাদ সৃষ্টি করার উপক্রম হবে।" (আবু দাউদ ৪৮৯০নং)

এমন ফাসাদীদের আচরণে থাকে মুনাফিকী আচরণ। যে মুনাফিকদেরকে সম্বোধন ক'রে মহানবী বলেছেন,
يَا مَعْشَرَ مَنْ آمَنَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يَدْخُل الإِيمَانُ قَلْبَهُ لا تَغْتَابُوا الْمُسْلِمِينَ وَلَا تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ فَإِنَّهُ مَنِ اتَّبَعَ عَوْرَاتِهِمْ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ فِي بَيْتِهِ ..
"হে সেই মানুষের দল; যারা মুখে ঈমান এনেছে এবং যাদের হৃদয়ে ঈমান স্থান পায়নি (তারা শোন)! তোমরা মুসলিমদের গীবত করো না এবং তাদের দোষ খুঁজে বেড়ায়ো না। কারণ, যে ব্যক্তি তাদের দোষ খুঁজবে, আল্লাহ তার দোষ ধরবেন। আর আল্লাহ যার দোষ ধরবেন, তাকে তার ঘরের ভিতরেও লাঞ্ছিত করবেন।" (আহমাদ ৪/৪২০, আবু দাউদ ৪৮৮২, আবু য়‍্যা'লা, সহীহুল জামে' ৭৯৮৪নং)

হে আল্লাহ! সেই মুনাফিকদেরকে তুমি সত্বর লাঞ্ছিত কর, যারা নিরপরাধ মানুষদের দোষ ধ'রে ও প্রচার ক'রে বেড়ায়।
পরন্তু এই শ্রেণীর মানুষরাও দোষমুক্ত নয়। কিন্তু নিজেদের দোষকে দোষ মনে করে না। পরের সামান্য দোষকেও অসামান্য ও বিশালরূপে দেখতে পায়। মহানবী বলেছেন,
((يَبْصُرُ أَحَدُكُمُ الْقَدْى فِي عَيْنٍ أَخِيهِ وَيَنْسَى الْجِدْعَ فِي عَيْنِهِ)).
"তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের চোখে কুটা দেখতে পায়, কিন্তু নিজের চোখে গাছের গুঁড়ি দেখতে ভুলে যায়!" (ইবনে হিব্বান ৫৭৬১, সহীহুল জামে ৮০ ১৩নং)

এখানেই শেষ নয়, তারা সেই দোষ অপরের কাছে গেয়ে বেড়ায়। কথায় ও কলমে অপরের গীবত করে। যে গীবত মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার সমান। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بعْضُكُم بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ) (۱۲) سورة الحجرات
"হে মু'মিনগণ! তোমরা বহুবিধ ধারণা হতে দূরে থাক; কারণ কোন কোন ধারণা পাপ। আর তোমরা অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা (গীবত) করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভ্রাতার গোস্ত ভক্ষণ করতে চাইবে? বস্তুতঃ তোমরা তো এটাকে ঘৃণ্যই মনে কর। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ তাওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু। (হুজুরাতঃ ১২)

ভালো-মন্দ ও আলেম-জাহেল প্রায় সকল নারী-পুরুষের আচরণে থাকে পরের সম্ভ্রমহরণকারী এই মহাপাপ। কুরআন-হাদীসের বাণী তাদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করতে পারে না। দুনিয়াতে তাদের তেমন কোন শাস্তি প্রয়োগ করা হয় না। তাই আখেরাতে আছে চরম শাস্তি। মহানবী বলেছেন,
(( لَمَّا عُرِجَ بِي مَرَرْتُ بِقَومٍ لَهُمْ أَطْفَارٌ مِنْ نُحَاسِ يَحْمِشُونَ وُجُوهَهُمْ وَصُدُورَهُمْ فَقُلْتُ : مَنْ هَؤُلَاءِ يَا جِبْرِيلُ ؟ قَالَ : هَؤُلَاءِ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ لُحُومَ النَّاسِ ، وَيَقَعُونَ فِي أَعْرَاضِهِمْ ! )) . رواه أبو داود
"যখন আমাকে মি'রাজে নিয়ে যাওয়া হল, সে সময় এমন ধরনের কিছু মানুষের নিকট দিয়ে অতিক্রম করলাম, যাদের নখ ছিল তামার, তা দিয়ে তারা নিজেদের মুখমন্ডল নুচে ক্ষত-বিক্ষত করছিল। আমি, প্রশ্ন করলাম, ওরা কারা? হে জিব্রীল! তিনি বললেন, ওরা সেই লোক, যারা মানুষের মাংস ভক্ষণ করত ও তাদের সম্ভ্রম লুটে বেড়াত।" (আহমাদ ৩/২২৪, সহীহ আবু দাউদ ৪০৮২ নং)

অপরকে গালি দেওয়ার পাপের প্রভাব পড়ে মানুষের চরিত্রে, বংশে ও সম্মানে। অথচ যাকে গালি দেওয়া হয়, সে গালি খাওয়ার যোগ্য না হলে সে গালি ফিরে এসে গালিদাতাকেই লাগে।
মহানবী বলেছেন,
(( لَا يَرْمِي رَجُلٌ رَجُلاً بِالفِسْقِ أَوِ الكُفْرِ ، إِلَّا ارْتَدَّتْ عَلَيْهِ ، إِنْ لَمْ يَكُنْ صَاحِبُهُ كَذَلِكَ )) . رواه البخاري
"যখন কোন মানুষ অন্য মানুষের প্রতি 'ফাসেক' অথবা 'কাফের' বলে অপবাদ দেয়, তখনই তা তার উপরেই বর্তায়; যদি তার প্রতিপক্ষ তা না হয়।" (বুখারী ৬০৪৫নং)

নিশ্চয় গালি দেওয়া মহাপাপ। গালি দেওয়া ফাসেকের কাজ। মহানবী বলেছেন,
(سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ ، وَقِتَالُهُ كُفْرٌ). متفق عَلَيْهِ
"মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেকী (আল্লাহর অবাধ্যাচরণ) এবং তার সাথে লড়াই করা কুফরী।" (বুখারী ৪৮, ৬০৪৪, মুসলিম ২৩০নং, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)

গালি দেওয়া শয়তানের কাজ এবং রাগে গালি দেওয়ার সময় গালিদাতা মিথ্যাই বলে। এই জন্য গালির বদলেও গালি দেওয়া উচিত নয়। ইয়ায বিন হিমার বলেন, একদা আমি বললাম, 'হে আল্লাহর নবী! আমার চাইতে ছোট হয়েও আমার সম্প্রদায়ের কোন লোক যদি আমাকে গালি-গালাজ করে, তাহলে আমি তার প্রতিশোধ নিলে দোষ আছে কি?' উত্তরে তিনি বললেন,
(( الْمُسْتَبَّانِ شَيْطَانَانِ يَتَهَاتَرَانِ وَيَتَكَاذِبَانِ)).
"উভয় গালমন্দকারী দুই শয়তান। এরা পরস্পরের উপর মিথ্যা দোষারোপ করে এবং অসত্য বলে।" (আহমাদ ১৭৪৮-৩, বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ, ইবনে হিব্বান, সহীহুল জামে' ৬৬৯৬নং)

কত মানুষ সম্মানীর অসম্মান করে। তার সাথে মতে মিলে না বলে মুখে ও কলমে তাকে খোঁচা দেয়, খোঁটা দেয়। তার প্রতি হিংসা আছে বলে তার ব্যাপারে বিষোদ্গার করে। আত্মমুগ্ধতায় অন্ধ মানুষের অহংকার আছে বলে অপরকে লোকের কাছে অসম্মান করে।
'দুষ্টগণে ঘাট পেলে হাট মাঝে বলে,
অনা'সে মানীর মান ফেলে দেয় জলে।'

যে ব্যক্তি মানীর মানহানি করে, সে আর কি সত্যিকারার্থে নবীর উম্মতী হতে পারে? মহানবী বলেছেন,
((لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرِنَا ، وَيَعْرِفْ شَرَفَ كَبيرنَا )).
"সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং আমাদের বড়দের সম্মান জানে না।" (তিরমিযী ১৯২০নং) আবু দাউদের বর্ণনায় আছেঃ "আমাদের বড়দের অধিকার জানে না।" (আবু দাউদ ৪৯৪৫নং)
তিনি আরো বলেছেন,
((لَيْسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَمْ يُجِلَّ كَبِيرَنَا وَيَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا حَقَّهُ)).
"সে ব্যক্তি আমার উম্মতের দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি আমাদের বড়দেরকে সম্মান দেয় না, ছোটদেরকে স্নেহ করে না এবং আলেমের অধিকার চেনে না।" (আহমাদ ২২৭৫৫, ত্বাবারানী, হাকেম, সহীহ তারগীব ৯৫ নং)

অজ্ঞতা ও আত্মমুগ্ধতা মানুষকে মানীর মানহানি করতে উদ্বুদ্ধ করে। আত্মসচেতন মানুষ প্রত্যেক সম্মানীকে তার যথার্থ সম্মান প্রদান করে। প্রস্তুত থাকে সেই দিনের জন্য, যেদিনে প্রত্যেক অন্যায়ের প্রতিশোধ দিতে হবে। মহানবী বলেছেন,
(( مَنْ كَانَتْ عِنْدَهُ مَظْلِمَةٌ لأخيه ، مِنْ عِرْضِهِ أَوْ مِنْ شَيْءٍ ، فَلْيَتَحَلَّلَهُ مِنْهُ اليَوْمَ قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارٍ وَلَا دِرْهَمْ ، إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِهِ ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ )). رواه البخاري
"যদি কোন ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি তার সম্ভ্রম বা অন্য কিছুতে কোন যুলুম ও অন্যায় করে থাকে, তাহলে সেদিন আসার পূর্বেই সে যেন আজই তার নিকট হতে (ক্ষমা চাওয়া অথবা প্রতিশোধ দেওয়ার মাধ্যমে) নিজেকে মুক্ত করে নেয়; যেদিন (ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য) না দীনার হবে না দিরহাম। (সেদিন) যালেমের নেক আমল থাকলে তার যুলুম অনুপাতে নেকী তার নিকট থেকে কেটে নিয়ে (মযলুমকে দেওয়া) হবে। পক্ষান্তরে যদি তার নেকী না থাকে (অথবা নিঃশেষ হয়ে যায়) তাহলে তার (মযলুম) প্রতিবাদীর গোনাহ নিয়ে তার ঘাড়ে চাপানো হবে।" (বুখারী ২৪৪৯, ৬৫৩৪, তিরমিযী ২৪১৯নং)

সম্ভ্রম বাঁচাতে সতর্কতাবলম্বন করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য। যে সন্দিগ্ধ কাজ করলে তার চরিত্রে দাগ লাগতে পারে, সে কাজ করা উচিত নয়। যে স্থানে গেলে তার সম্ভ্রম নষ্ট হতে পারে, সে স্থানে যাওয়া তার জন্য শোভনীয় নয়। যার সাথে পথ চললে তার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতে পারে, তার সাথে পথ চলা সঙ্গত নয়। এ ব্যাপারে ব্যাপক নির্দেশ দিয়ে মহানবী বলেছেন,
(( إِنَّ الحَلالَ بَيِّنُ ، وَإِنَّ الحَرامَ بَيِّنُ ، وَبَيْنَهُمَا مُشْتَبَهَاتٌ لَا يَعْلَمُهُنَّ كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ ، فَمَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ ، اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ ، وَمَنْ وَقَعَ فِي الشُّبُهَاتِ وَقَعَ فِي الحَرَامِ ، كَالرَّاعِي يَرْعَى حَوْلَ الحِمَى يُوشِكُ أَنْ يَرْتَعَ فِيهِ ، أَلاَ وَإِنَّ لِكُلِّ مَلِكٍ حِمَى ، أَلَا وَإِنَّ حِمَى اللَّهِ مَحَارِمُهُ ، أَلَا وَإِنَّ فِي الجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَت صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ ، أَلَا وَهِيَ القَلْبُ )) متفقٌ عَلَيْهِ
"অবশ্যই হালাল বিবৃত ও স্পষ্ট এবং হারাম বিবৃত ও স্পষ্ট, আর উভয়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দিহান বস্তু; যা অনেক লোকেই জানে না। অতএব যে ব্যক্তি এই সন্দিহান বস্তুসমূহ হতে দূরে থাকবে, সে তার দ্বীন ও ইজ্জতকে বাঁচিয়ে নেবে এবং যে ব্যক্তি সন্দিহানে পতিত হবে (সন্দিগ্ধ বস্তু ভক্ষণ করবে), সে হারামে পতিত হবে। (এর উদাহরণ সেই) রাখালের মত, যে নিষিদ্ধ চারণভূমির আশেপাশে পশু চরায়, তার পক্ষে নিষিদ্ধ সীমানায় পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শোন! প্রত্যেক বাদশাহরই সংরক্ষিত চারণভূমি থাকে। আর শোন! আল্লাহর সংরক্ষিত চারণভূমি হল তাঁর হারামকৃত বস্তুসমূহ। শোন! দেহের মধ্যে একটি মাংসপিন্ড রয়েছে; যখন তা সুস্থ থাকে, তখন গোটা দেহটাই সুস্থ হয়ে থাকে। আর যখন তা খারাপ হয়ে যায়, তখন গোটা দেহটাই খারাপ হয়ে যায়। শোন! তা হল হৃৎপিণ্ড (অন্তর)।" (বুখারী ৫২, ২০৫১, মুসলিম ৪১৭৮নং)

যেমন প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য, অপরের সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হলে প্রতিবাদ করা। সম্ভ্রম লুণ্ঠনের পথে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং লুণ্ঠন সম্পাদিত হলে তার প্রতিকার খোঁজা। এ ক্ষেত্রে কারো উচিত নয় মুচকি হাসি হাসা, কারণ সে তার মত-বিরোধী। উচিত নয় চুপ থাকা, কারণ সে তার আত্মীয় নয়। সঙ্গত নয় মৌন সমর্থন করা, কারণ সে তার পোলাও খেতে পায় না। উচিত নয় তোষামদ করা, কারণ সে তার সম্মুখে নেই। এই প্রতিবাদে তার সওয়াব আছে। মহান আল্লাহর কাছে প্রতিদান আছে। মহানবী বলেছেন,
(( مَنْ رَدَّ عَنْ عِرْضٍ أَخِيهِ ، رَدَّ اللهُ عَنْ وَجْهِهِ النَّارَ يَومَ القِيَامَةِ )) .
"যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের সম্ভ্রম রক্ষা করবে, কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের আগুন থেকে তার চেহারাকে রক্ষা করবেন।" (তিরমিযী ১৯৩ ১নং, হাসান)

مَنْ ذَبَّ عَنْ عِرْضِ أَخِيهِ بِالْمَغِيبِ كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ يَعْتِقَهُ مِنَ النَّاسِ).
"যে ব্যক্তি তার (মুসলিম) ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে (তার গীবত করা ও ইজ্জত লুটার সময় প্রতিবাদ করে) তার সম্ভ্রম রক্ষা করে, সেই ব্যক্তি আল্লাহর নিকট এই অধিকার পায় যে, তিনি তাকে দোযখ থেকে মুক্ত করে দেন।" (আহমাদ ২৭৬০৯-২৭৬১০, ত্বাবারানী ১৯৯১৬, সহীহুল জামে' ৬২৪০ নং)

পক্ষান্তরে যদি কেউ তার কোন মুসলিম ভাইয়ের সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হতে দেখে প্রতিবাদ ক'রে তার সাহায্য না করে, তাহলে তার সম্ভ্রম বাঁচাতেও মহান আল্লাহ সাহায্য করবেন না। মহানবী বলেছেন,
مَا مِنِ امْرِئٍ يَخْذُلُ امْرَأَ مُسْلِمًا فِي مَوْضِعِ تُنْتَهَكُ فِيهِ حُرْمَتُهُ وَيُنْتَقَصُّ فِيهِ مِنْ عِرْضِهِ إِلَّا خَدْلَهُ اللَّهُ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ فِيهِ نُصْرَتَهُ وَمَا مِنِ امْرِئٍ يَنْصُرُ مُسْلِمًا فِي مَوْضِعِ يُنْتَقَصُ فِيهِ مِنْ عِرْضِهِ وَيُنْتَهَكُ فِيهِ مِنْ حُرْمَتِهِ إِلَّا نَصَرَهُ اللَّهُ فِي مَوْطِن يُحِبُّ نُصْرَتَهُ ..
"যে কোনও ব্যক্তি কোন মুসলিম ব্যক্তিকে সেই জায়গায় সাহায্য না করে বর্জন করবে, যেখানে তার সম্ভ্রম লুটা হয় এবং তার ইজ্জত নষ্ট করা হয়, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ সেই জায়গায় সাহায্য না করে বর্জন করবেন, যেখানে সে তাঁর সাহায্য পেতে পছন্দ করে। আর যে কোনও ব্যক্তি কোন মুসলিম ব্যক্তিকে সেই জায়গায় সাহায্য করবে, যেখানে তার সম্ভ্রম লুটা হয় এবং তার ইজ্জত নষ্ট করা হয়, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ সেই জায়গায় সাহায্য করবেন, যেখানে সে তাঁর সাহায্য পেতে পছন্দ করে।" (আবু দাউদ ৪৮৮-৬, সহীহুল জামে' ৫৬৯০নং)

সুতরাং হে মুসলিম! তুমিই প্রকৃত মানুষ। নিজের সম্ভ্রম বাঁচাও এবং প্রকৃত মানুষ হও।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00