📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 ঈমানের উপর পাপের প্রভাব

📄 ঈমানের উপর পাপের প্রভাব


মানুষের ঈমান অমূল্য ধন। ঈমান হল, (যা বিশ্বাস করার তা) অন্তরে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা এবং কাজে পরিণত করা। কোন মানুষ প্রকৃত 'মানুষ' হতে পারে না, যতক্ষণ না সে পূর্ণ মু'মিন হতে পেরেছে। এমন অমূল্য ধন মহান আল্লাহর এক মহান দান। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
((إن الله قسم بينكم أخلاقكم كما قسم بينكم أرزاقكم وإن الله يؤتي المال من يحب ومن لا يحب ولا يؤتى الإيمان إلا من أحب فإذا أحب الله عبدا أعطاه الإيمان)).
"নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের মাঝে তোমাদের চরিত্র বন্টন ক'রে দিয়েছেন, যেমন তিনি তোমাদের মাঝে তোমাদের রুযী বন্টন ক'রে দিয়েছেন। নিশ্চয় তিনি তাকে দুনিয়া দান করেন, যাকে তিনি ভালোবাসেন এবং যাকে তিনি ভালোবাসেন না। কিন্তু তিনি ঈমান দান করেন কেবল তাকে, যাকে তিনি ভালোবাসেন।" (ত্বাবারানী ৮৮৯৭, প্রমুখ, সিঃ সহীহাহ ২৭১৪নং)

ঈমান দ্বারা মানুষ যেমন 'মানুষ' হবে, তেমনি ঈমান দ্বারা সে আল্লাহর জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। সুতরাং ঈমান মানুষের অতি প্রয়োজনীয় ও অতি মূল্যবান জিনিস। তাই ঈমান-চুরির চোর আছে, ঈমান লুঠের ডাকাত আছে। বড় ডাকাত শয়তান হলেও মনুষ্য-শয়তান ঈমান লুঠ করে। বহু আমলও ঈমানকে ধ্বংস ক'রে ফেলে। আমলগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড় ঈমান-বিনাশী আমল হল শির্ক। সির্কা যেমন মধুর সাথে মিশ্রিত হলে মধু নষ্ট হয়ে যায়, তেমনি শির্ক ঈমানের সাথে মিশ্রিত হলে ঈমান নষ্ট হয়ে যায়।

আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন,
الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَائهُم بِظُلْمٍ أُوْلَئِكَ لَهُمُ الأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ} (৮২) الأنعام
অর্থাৎ, যারা বিশ্বাস করেছে এবং তাদের বিশ্বাসকে যুলুম (শিক) দ্বারা কলুষিত করেনি, নিরাপত্তা তাদেরই জন্য এবং তারাই সৎপথপ্রাপ্ত। (আনআমঃ৮-২)
'এই আয়াত যখন অবতীর্ণ হল, তখন মুসলিমদের নিকট বিষয়টি কঠিন মনে হল। বলল, 'আমাদের মধ্যে কে আছে যে নিজের উপর যুগ্ম (অন্যায় বা পাপ) করে না?' তা শুনে রসূল বললেন, (তোমরা যে যুগ্ম মনে করছ) তা নয়। বরং তা (সবচেয়ে বড় যুল্ম) কেবলমাত্র শির্ক। তোমরা কি পুত্রকে সম্বোধন ক'রে লুকমানের উক্তি শ্রবণ করনি? (তিনি তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন),
يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشَّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ)
অর্থাৎ, হে বৎস্য! আল্লাহর সাথে শির্ক করো না, নিশ্চয় শির্ক বড় যুল্ম। (বুখারী ৬৯৩৭, মুসলিম ৩৪২নং)

সামান্য সন্দেহ, কপটতা ও অস্বীকার ঈমানকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। দ্বীন ও দ্বীনী ইল্ম থেকে বিমুখতা মানুষের বুক থেকে ঈমান কেড়ে নেয়।
আল্লাহ, তাঁর কুরআন ও রসূল নিয়ে ঠাট্টা-ব্যঙ্গ করলে ঈমানের পাখি হৃদয়ের বাসা ছেড়ে উড়ে পলায়ন করে। কিছু লোক উপহাস করলে মহান আল্লাহ কুরআন অবতীর্ণ ক'রে বলেন,
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِؤُونَ (٦٥) لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ إِن نَّعْفُ عَن طَائِفَةٍ مِّنكُمْ تُعَذِّبْ طَائِفَةً بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ} (৬৬) سورة التوبة
"যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, তাহলে তারা নিশ্চয় বলবে যে, 'আমরা তো শুধু আলাপ-আলোচনা ও হাসি-তামাশা করছিলাম।' তুমি বলে দাও, 'তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ এবং রসূলকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছিলে?' তোমরা এখন (বাজে) ওজর পেশ করো না, তোমরা তো নিজেদেরকে বিশ্বাসী প্রকাশ করার পর কুফরী করেছ, যদিও আমি তোমাদের মধ্য হতে কতককে ক্ষমা করে দিই, তবুও কতককে শাস্তি দিব, কারণ তারা অপরাধী। (তাওবাহঃ ৬৫-৬৬)

অনুরূপভাবে আল্লাহ বা তাঁর রসূলকে গালি দিলে ঈমান ধ্বংস হয়ে যায়। শরীয়তের কোন অংশকে অবিশ্বাস বা মিথ্যায়ন করলে ঈমান বিনষ্ট হয়। যাদু করলে বা গায়বী ইলমের দাবী করলে ঈমান বিনাশপ্রাপ্ত হয়। শরীয়তের কোন বিষয়কে ঘৃণা করলে ঈমান নিঃশেষ হয়ে যায়। হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল করলে ঈমান হারিয়ে যায়। অমুসলিম, মুশরিক বা কাফেরদের কাফের হওয়ার বিষয়ে সন্দেহ করলে অথবা তাদের বিকৃত ধর্মকে সঠিক মনে করলে অথবা সব ধর্ম সমান ধারণা করলে মুসলিমের বুক থেকে ঈমান বিলুপ্ত হয়ে যায়। অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব কায়েম ক'রে মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করলে ঈমান সর্বনাশগ্রস্ত হয়। মহান আল্লাহর বিধান পরিবর্তন করলে অথবা রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামী বিধানকে অচল ধারণা করলে ঈমান ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجاً مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيماً } [ النساء : ٦٥ ]
অর্থাৎ, কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা বিশ্বাসী (মু'মিন) হতে পারবে না; যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচারভার তোমার উপর অর্পণ না করে, অতঃপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেয়। (সূরা নিসা ৬৫ আয়াত)

মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ -কে 'রসূল' রূপে মানার পরেও তাঁকে সবার চাইতে বেশি ভালোবাসতে না পারলে ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বলেছেন,
لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَلَدِهِ وَوَالِدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ..
"তোমাদের মধ্যে কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তার নিকট তার পিতা, সন্তান এবং সকল মানুষ অপেক্ষা প্রিয়তম হয়েছি।" (বুখারী ১৫, মুসলিম ১৭৮নং)

কেবল সবার চাইতে বেশি নয়, নিজের জীবন অপেক্ষা বেশি ভালো না বাসলে ঈমান পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না।
একদা মহানবী উমার বিন খাত্তাব -এর হাত ধরে ছিলেন। উমার তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমার জীবন ছাড়া সকল জিনিস থেকে আমার নিকট প্রিয়তম। এ কথা শুনে মহানবী বললেন,
(( لا وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْكَ مِنْ نَفْسِكَ)).
"না। সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে। যতক্ষণ না আমি তোমার নিকট তোমার জীবন থেকেও প্রিয়তম হতে পেরেছি (ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি মুমিন হতে পারো না)।"
উমার বললেন, এক্ষণে আপনি আমার জীবন থেকেও প্রিয়তম। তখন তিনি বললেন, "এখন (তুমি মুমিন) হে উমার!" (বুখারী ৬৬৩২নং)

পাঁচ ওয়াক্তের নামায দ্বীনের খুঁটি। সেই খুঁটি নষ্ট করলে দ্বীন ও ঈমান নষ্ট হয়। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
(( إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالكُفْرِ ، تَرْكَ الصَّلاةِ )). رواه مسلم
"মানুষ ও কুফরীর মধ্যে (পর্দা) হল, নামায ত্যাগ করা।" (মুসলিম ২৫৬নং)

( العَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ الصَّلاةُ ، فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ )). رواه التَّرْمِذِيُّ
"যে চুক্তি আমাদের ও তাদের (কাফেরদের) মধ্যে বিদ্যমান, তা হচ্ছে নামায (পড়া)। অতএব যে নামায ত্যাগ করবে, সে নিশ্চয় কাফের হয়ে যাবে।" (আহমাদ ২২৯৩৭, তিরমিযী ২৬২ ১, নাসাঈ ৪৬৩, ইবনে মাজাহ ১০৭৯, ইবনে হিব্বান ১৪৫৪, হাকেম ১১, সহীহ তারগীব ৫৬১ নং)

আবু দারদা বলেছেন,
((لاَ إِيمَانَ لِمَن لا صَلَاةَ لَه وَلَا صَلَاةَ لِمَن لا وضُوءَ لَه)).
"যার নামায নেই তার ঈমানই নেই। আর যার উযূ নেই, তার নামায নেই।" (ইবনে আব্দুল বার, প্রমুখ, সহীহ তারগীব ৫৭৫নং)

ইবনে মাসউদ বলেছেন,
((مَن تَرَكَ الصَّلاةَ فَلَا دِينَ لَه)).
"যে ব্যক্তি নামায ত্যাগ করে, তার দ্বীনই নেই।" (ইবনে আবী শাইবাই ৭৬৩৭, ৩০৩৯৭, ত্বাবারানীর কাবীর ৮৮-৪৭-৮৮-৪৮, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৪৩, সহীহ তারগীব ৫৭৪নং)

শাক্বীক বিন আব্দুল্লাহ তাবেঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,
كَانَ أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ لَا يَرَوْنَ شَيْئاً مِنَ الأَعْمَال تَرْكُهُ كُفْرٌ غَيْرَ الصَّلاةِ .
'মুহাম্মাদ -এর সহচরবৃন্দ নামায ছাড়া অন্য কোন আমল ত্যাগ করাকে কুফরীমূলক কাজ বলে মনে করতেন না।' (তিরমিযী ২৬২২, হাকেম ১২, সহীহ তারগীব ৫৬৫নং)

যে ব্যক্তি আমানতে খিয়ানত করার অপরাধ করে, তার ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বস্ত হয়ে যে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তার কাছে রাখা গচ্ছিত ধন তসরুফ করে, তার ঈমান প্রভাবান্বিত হয়। আনাস রা. বলেন, আল্লাহর নবী সা. প্রায় খুতবাতে বলতেন,
(لَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا أَمَانَةَ لَهُ وَلَا دِينَ لِمَنْ لَا عَهْدَ لَهُ)).
"যার আমানতদারী নেই, তার ঈমান নেই। আর যে অঙ্গীকার পালন করে না, তার দ্বীন নেই।" (আহমাদ, বাইহাকী, সহীহুল জামে' ৭১৭৯নং)

বহু মানুষ আছে, যারা অন্যায় দেখে প্রতিবাদ করে না, করতে পারে না। মন্দ কাজে বাধা দেয় না, দিতে পারে না। অপরের পাপ দেখে চুপ থাকে। অপরাধ দেখেও কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না। অবশ্য তারা অন্তরে অন্তরে সেই পাপ ও অপরাধকে ঘৃণা করে। তাদের ঈমান হয় বড় দুর্বল। মহানবী সা. বলেছেন,
(( مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَراً فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَان )). رواه مسلم
"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন গর্হিত কাজ দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তন ক'রে দেয়। যদি (তাতে) ক্ষমতা না রাখে, তাহলে নিজ জিভ দ্বারা (উপদেশ দিয়ে পরিবর্তন করে)। যদি (তাতেও) সামর্থ্য না রাখে, তাহলে অন্তর দ্বারা (ঘৃণা করে)। আর এ হল সবচেয়ে দুর্বল ঈমান।" (আহমাদ ১১০৭৪, মুসলিম ১৮-৬নং, আসহাবে সুনান)

অন্যায় ও পাপ দেখতে দেখতে অভ্যাসী হয়ে পড়ে অনেক মানুষ। ফলে তাদের অন্তরে পাপের প্রতি ঘৃণাটুকুও অবশিষ্ট থাকে না। আর তার ফলে তাদের দুর্বলতম ঈমানও ক্ষীণ ও বিলীন হতে থাকে। মহানবী সা. বলেছেন,
((مَا مِنْ نَبِي بَعَثَهُ اللَّهُ فِي أُمَّةٍ قَبْلِي إِلَّا كَانَ لَهُ مِنْ أُمَّتِهِ حَوَارِيُّونَ وَأَصْحَابُ يَأْخُذُونَ بِسُنَّتِهِ وَيَقْتَدُونَ بِأَمْرِهِ ثُمَّ إِنَّهَا تَخْلُفُ مِنْ بَعْدِهِمْ خُلُوفٌ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ وَيَفْعَلُونَ مَا لَا يُؤْمَرُونَ فَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِيَدِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِلِسَانِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِقَلْبِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَيْسَ وَرَاءَ ذَلِكَ مِنَ الإِيمَان حَبَّةٌ خَرْدَل)). رواه مسلم
"আমার পূর্বে আল্লাহ যে কোন নবীকে যে কোন উম্মতের মাঝে পাঠিয়েছেন তাদের মধ্যে তাঁর (কিছু) সহযোগী ও সহচর হত। তারা তাঁর সুন্নতের উপর আমল করত এবং তাঁর আদেশের অনুসরণ করত। অতঃপর তাদের পরে এমন অপদার্থ লোক সৃষ্টি হয় যে, তারা যা বলে, তা করে না এবং তারা তা করে, যার আদেশ তাদেরকে দেওয়া হয় না। সুতরাং যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে নিজ হাত দ্বারা সংগ্রাম করবে সে মু'মিন, যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে নিজ জিভ দ্বারা সংগ্রাম করবে সে মু'মিন এবং যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে নিজ অন্তর দ্বারা জিহাদ করবে সে মু'মিন। আর এর পর সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান নেই।" (মুসলিম ১৮৮নং)

অনেক মানুষ হয় আত্মকেন্দ্রিক। অপরের মঙ্গল চায় না। নিজের যেমনটা আছে তেমনটা অপরের হোক, তা মোটেই চায় না। নিজের জন্য যা পছন্দনীয়, তা অপরের হোক, তা সে পছন্দ করে না। নিজের জন্য যা অপছন্দ করে, তা অপরের না হোক, এমন মনোভাব ও অনুভূতি রাখে না।
অনেক মানুষ আছে স্বার্থপর। পরার্থপরতা তারা চেনেই না। তাই তারা সর্বদা নিজের কোলে ঝোল টানে। তাদের আচরণে থাকে, 'আপন বেলায় চাপন-চোপন, পরের বেলায় ঝুরঝুরে মাপন।' 'আপনার বেলায় আঁটিসাঁটি, পরের বেলায় দাঁত কপাটি।' 'আপনারটা ঢাকা থাক, পরেরটা বিকিয়ে যাক।' 'আপনার বেলায় পাঁচ কড়ায় গন্ডা, পরের বেলায় তিন কড়ায় গন্ডা।'
তাদের মনোভাব হল, 'আপনি বাঁচলে বাপের নাম।' পরের যা হবে হোক, 'কাঙ্গলা, আপনা সামলা।' তাদের মন বলে, 'চাচা আপন জান বাঁচা।' এটা এমন এক অপরাধ, যার ফলে মু'মিনের ঈমানে অসম্পূর্ণতা আসে। মহানবী বলেছেন,
(( لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ )). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কেউ প্রকৃত ঈমানদার হবে না; যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করবে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।" (বুখারী ১৩, মুসলিম ৪৫, ইবনে হিব্বান ২৩৫নং)

وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يُؤْمِنُ عَبْدٌ حَتَّى يُحِبَّ لِجَارِهِ - أَوْ قَالَ لِأَخِيهِ - مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ ..
"সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! কোন বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত (পূর্ণ) মুমিন হতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার প্রতিবেশী অথবা (কোন মুসলিম) ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করেছে, যা সে নিজের জন্য করে।" (মুসলিম ১৮-০নং)

বহু মানুষ আছে, তারা অপরের খোঁজ নেয় না, নিতে চায় না। তারা নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। তারা যেন কেবল নিজেদের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে। অপরের দুঃখ-ব্যথার কোন অনুভূতি তাদের মনে করুণা সৃষ্টি করতে পারে না। দূরের মানুষ তো দূরের কথা, কাছের মানুষদের খবরও তারা রাখে না। নিজেদের প্রতিবেশীর অভাব-অভিযোগ তাদের কাছে পৌঁছে না, শুনতে-দেখতে চায় না। সামনের দরজার লোকটির অবস্থা কী? পাশের বাড়ির দশা-দুর্দশা কী? পাঁচ ইঞ্চি দেওয়ালের ও পাশের মানুষটির খবর কী? এসব জানার ইচ্ছা ও আগ্রহ তাদের মনে সৃষ্টি হয় না। কোন ঔৎসুক্য তাদের হৃদয়ে চাঞ্চল্য আনয়ন করে না। তারা নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিয়েই বিভোর। প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে, তাতে তাদের কী আসে-যায়? পাশের বাসার লোক অনাহারে কাটায়, তাতে তাদের কী বয়ে যায়? প্রতিবেশীর নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, তাতে তাদের কী করার আছে?
তারা নিজেদেরকে 'মু'মিন' বলে দাবী করলেও, তারা কি প্রকৃত মু'মিন। কক্ষনো না। মহানবী বলেছেন।
« لَيْسَ الْمُؤْمِنُ الَّذِي يَشْبَعُ وَجَارُهُ جَائِعٌ إِلَى جَنْبِهِ ».
"সে মুমিন নয়, যে ভরপেট খায় অথচ তার পাশে তার প্রতিবেশী অনাহারে থাকে।" (বুখারীর আদাব ১১২, ত্বাবারানী ১২৫৭৩, হাকেম, বাইহাকী ২০১৬০, সহীহুল জামে ৫৩৮২নং)

((مَا آمَنَ بِي مَنْ بَاتَ شَبْعَانًا وَجَارُهُ جَائِعٌ إِلَى جَنْبِهِ وَهُوَ يَعْلَمُ بِهِ)).
"সে আমার প্রতি ঈমান আনে নি, যে ব্যক্তি পরিতৃপ্ত হয়ে রাত্রিযাপন করে, অথচ তার পাশে তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে এবং এ কথা সে জানে।" (বাযযার, ত্বাবারানী ৭৫০, সহীহুল জামে ৫৫০৫নং)

এরা প্রতিবেশীর খোঁজ নেয় না, তাই তারা প্রকৃত মু'মিন হতে পারে না। তাহলে সেই প্রতিবেশীদের সম্বন্ধে কী বলবেন, যারা নিজেদের কোন আচরণ দ্বারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়? নিজেদের বাক্যবাণ দ্বারা প্রতিবেশীকে আঘাত করে? তাদের ঈমান কি দুরস্ত? মহানবী বলেছেন,
((لَا يَسْتَقِيمُ إِيمَانُ عَبْدٍ حَتَّى يَسْتَقِيمَ قَلْبُهُ وَلَا يَسْتَقِيمُ قَلْبُهُ حَتَّى يَسْتَقِيمَ لِسَانُهُ وَلَا يَدْخُلُ رَجُلُ الْجَنَّةَ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ)).
"কোন বান্দার ঈমান দুরস্ত হয় না; যতক্ষণ পর্যন্ত না তার হৃদয় দুরস্ত হয় এবং তার হৃদয়ও দুরস্ত হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত না তার জিহ্বা দুরস্ত হয়। আর সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা না পায়।" (আহমাদ ১৩০৪৮, ত্বাবারানী ১০৪০ ১নং)

তিনি কসম ক'রে বলেছেন,
(( وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ ! )) قِيلَ : مَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ ؟ قَالَ : (( الَّذِي لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ ! )). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ ،
وفي رواية لمسلم : (( لا يَدْخُلُ الجَنَّةَ مَنْ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ )) .
"আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু'মিন নয়।" জিজ্ঞেস করা হল, 'কোন্ ব্যক্তি? হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকে না।"
মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদে থাকে না। (বুখারী ৬০ ১৬, মুসলিম ১৮- ১নং)

একজন মু'মিনের প্রয়োজন আন্তরিকভাবে পবিত্র থাকা। তার উচিত, নিজ চরিত্রকে পবিত্র রাখা। অনুরূপ তার কর্তব্য, নিজ দেহ ও লেবাস-পোশাককে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখা। এ ছাড়া তার ঈমান পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না। বরং পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার মাঝে নিহিত থাকে তার অর্ধেক ঈমান! তার মানে পবিত্রতার বিধান না মেনে চলার অপরাধে তার অর্ধেক ঈমান অপূরণ থাকে। মহানবী বলেছেন,
( الطُّهُورُ شَطْرُ الإِيمَان )).
"(বাহ্যিক) পবিত্রতা অর্জন করা হল অর্ধেক ঈমান।" (মুসলিম ৫৫৬নং)

কোন যুবক যদি বিবাহ না করে, তাহলে তার চারিত্রিক পবিত্রতা অবলম্বন করা বড় কঠিন হয়ে যায়। তার জন্য তাকে রোযা রাখতে বলা হয়েছে। কিন্তু রোযার রাতে তার মন দিনের মতো সীমাবদ্ধ থাকে না। সর্বদা রোযা রাখাও যায় না। ফলে সে কোন না কোন বিকৃত যৌনাচারের দিকে ধাবিত হয়। শারীরিক ব্যভিচারে লিপ্ত না হলেও হাতের, মুখের, চোখের, পায়ের এবং মনের ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। অনেক সময় হস্তমৈথুন ইত্যাদি যৌনাচারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেকে পরিশেষে শারীরিক ব্যভিচারেও ছিটকে গিয়ে পড়ে। কিন্তু স্ত্রী থাকলে এ সকল পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
স্ত্রী থাকলে অবৈধ নারীপ্রেম থেকেও দূরে থাকা সম্ভব ও সহজ হয়।
একা না বোকা। একাকী সফর কল্যাণময় হয় না। জীবনের এ দীর্ঘ সফরে মনের মতো একটি সঙ্গিনী হলে সফর সফল ও কল্যাণময় হয়। কত কষ্ট লাঘব হয়।
পুরুষের জন্য মহান প্রতিপালকের একটি মহা উপহার পুণ্যময়ী স্ত্রী। প্রেমময়ীর সহযোগিতায় মহান আল্লাহর ইবাদত সহজ হয়। স্নেহময়ী হয় আয়নার মতো, জীবনের অনেক ত্রুটি ধরা পড়ে তারই মাধ্যমে।
একজন নারীর জন্যও তাই। তার জীবনে সবচেয়ে বড় চাওয়া-পাওয়া হল একজন দ্বীনদার স্বামী। তাহলেই সে বাঁচতে পারে উক্তরূপ বিবিধ পাপ-পঙ্কিলতা থেকে।
একটি গাছের অবলম্বন ছাড়া লতা যেমন ভূমিতে লুটাপুটি খায়, একটি মূল্যবান জিনিস যেমন হিফাযত ছাড়া চুরি হয়ে যায়, একটি ডিম যেমন তা ছেড়ে দূরে থাকলে ঘোলা হয়ে যায়, তেমনি সাধারণ একটি নারীর জীবনও স্বামী ছাড়া ভ্রষ্ট হতে পারে, নষ্ট হতে পারে, কষ্ট ও পাপময় হতে পারে।
তাছাড়া নারীর জীবনে স্বামীই তার জান্নাত। অতএব জান্নাত লাভের জন্য বিবাহ অত্যন্ত জরুরী জিনিস।
আরো কত হিকমত আছে এই পবিত্র ও চিরন্তন বন্ধন বিবাহের মাঝে। যার জন্য মহানবী বলেছেন, ((مَنْ تَزَوَّجَ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ نِصْفَ الإِيمَانِ فَلْيَتَّقِ اللَّهُ فِي النَّصْفِ الْبَاقِي)). "যে ব্যক্তি বিবাহ করে, সে তার অর্ধেক ঈমান পূর্ণ করে, অতএব বাকী অর্ধেকাংশে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।" (ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৭৬৪৭, ৮-৭৯৪, সঃ জামে' ৬১৪৮-নং)

কেউ হয়তো বলতে পারেন, পবিত্রতা অর্ধেক ঈমান, আর বিবাহ করাও অর্ধেক ঈমান। তাহলে কেউ পবিত্র থাকলে এবং বিবাহ করলে তার ঈমান পরিপূর্ণ ঈমান। তার অন্য আমল করার প্রয়োজন নেই।
না, উদ্দেশ্য তা নয়। ৩ বার সূরা ইখলাস পড়লে ১ বার কুরআন খতম করার সওয়াব হলেও কুরআনের অন্য সূরা পড়তে হবে না, তা নয়। কর্মের গুরুত্ব বর্ণনার জন্য বলা হয়েছে, তা অর্ধেক ঈমান। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, অন্য কোন আমলের গুরুত্ব হিসাবে তাকে অর্ধেক বলা হলে ঈমান পরিপূর্ণ হয়ে যাবে এবং ঈমানের অন্য কোন কাজ করতে হবে না। যেমন 'আরাফাতই হজ্জ' মানে এই নয়, কেবল আরাফাতে অবস্থান করলেই হজ্জ হয়ে যাবে। 'দুআই ইবাদত' মানে এই নয় যে, অন্য আমল ইবাদত নয়। 'দ্বীন হল হিতাকাঙ্ক্ষিতা'---এর মানে এই নয় যে, দ্বীনের অন্য কোন আমল করার প্রয়োজন নেই বা না করলেও দ্বীন পরিপূর্ণ।

চারিত্রিক পবিত্রতা ও সচ্চরিত্রতা ঈমানকে পরিপূর্ণতা দান করে। সুতরাং এর বিপরীত কর্ম ঈমানকে প্রভাবিত করে। মহানবী বলেছেন, (( أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَاناً أَحْسَنُهُمْ خُلْقاً ، وخِيَارُكُمْ خِيَارُكُم لِنِسَائِهِمْ )).
"মু'মিনদের মধ্যে সবার চেয়ে পূর্ণ মু'মিন ঐ ব্যক্তি যে চরিত্রে সবার চেয়ে সুন্দর, আর তাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি, যে নিজের স্ত্রীর জন্য সর্বোত্তম।" (তিরমিযী ১১৬২নং)

নির্লজ্জতা, চারিত্রিক অবক্ষয়, দ্বীনের জ্ঞানহীনতার পাপও মানুষের ঈমানকে প্রভাবিত করে। মহানবী বলেছেন, ((إِنَّ الْحَيَاءَ، وَالْعَفَافَ، وَالْعِيَّ، عِيُّ اللِّسَانِ لا عِيَّ الْقَلْبِ، وَالْعَمَلَ، مِنَ الإِيمَانِ، وَإِنَّهُنَّ يَزِدْنَ فِي الْآخِرَةِ، وَيُنْقِصْنَ مِنَ الدُّنْيَا، وَلَمَا يَزِدْنَ فِي الْآخِرَةِ، أَكْثَرُ مِمَّا يُنْقِصْنَ فِي الدُّنْيَا، فَإِنَّ الشُّحَّ، وَالْبَدَاءَ مِنَ النَّفَاقِ ، وَإِنَّهُنَّ يَزِدْنَ فِي الدُّنْيَا، وَيُنْقِصْنَ مِنَ الْآخِرَةِ، وَلَمَا يُنْقِصْنَ فِي الآخِرَةِ أَكْثَرُ مِمَّا يَزِدْنَ فِي الدُّنْيَا)).
"নিশ্চয় লজ্জাশীলতা, যৌন-পবিত্রতা, মুখচোরামি (হৃদয়ের অক্ষমতা নয়) ও আমল বা দ্বীনী জ্ঞান ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। এগুলি পরকালের সম্বল বৃদ্ধি করে এবং ইহকালের সম্বল হ্রাস করে। পক্ষান্তরে কার্পণ্য, অশ্লীলতা ও নোংরা ভাষা মুনাফিকীর অন্তর্ভুক্ত। এগুলি পরকালের সম্বল হ্রাস করে এবং ইহকালের সম্বল বৃদ্ধি করে। আর পরকালের যা হ্রাস পায়, তা ইহকালের যা বৃদ্ধি করে তা অপেক্ষা অধিক।" (ত্বাবারানী ১৫৪০৭, সিলসিলাহ সহীহাহ ৩৩৮ ১নং)

লজ্জাহীনতা এমন এক অপরাধ, যা মানুষের মাঝে থাকলে তার ঈমান প্রভাবিত হয়। সচ্চরিত্রতার অন্যতম আচরণই হল লজ্জাশীলতা। নারীর লজ্জাশীলতা তার রূপ-সৌন্দর্য অপেক্ষা বেশী আকর্ষণীয়। লজ্জা হল নারীর ভূষণ। লজ্জা না থাকলে নারী উলঙ্গ। লজ্জা না থাকলে কি ঈমান পরিপূর্ণ হয়? মহানবী বলেছেন,
الإِيمَانُ بِضْعُ وَسَبْعُونَ أَوْ بِضْعُ وَسِتُونَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذِى عَنِ الطَّرِيقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَان ».
"ঈমান সত্তরাধিক অথবা ষাঠাধিক শাখাবিশিষ্ট। তন্মধ্যে সর্বোচ্চ শাখা (কান্ড) হল 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা। আর সর্বনিম্ন শাখা হল পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করে দেওয়া। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের অন্যতম শাখা”। (বুখারী ৯নং সংক্ষিপ্ত, মুসলিম ১৬২নং)

ইবনে উমার হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ এক আনসার ব্যক্তির পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। যিনি তার ভাইকে লজ্জার ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন,
(( دَعْهُ ، فَإِنَّ الْحَيَاءَ مِنَ الإِيمَان )).
"ওকে ছেড়ে দাও। কেননা, লজ্জা ঈমানের অঙ্গ।" (বুখারী ২৪, ৬১১৮, মুসলিম ১৬৩নং)

তিনি আরো বলেছেন,
((إِنَّ الحَيَاء والإيمانَ قُرنا جميعاً فإِذا رُفِعَ أَحَدُهُمَا رُفِعَ الْآخَرُ).
"অবশ্যই লজ্জাশীলতা ও ঈমান একই সূত্রে গাঁথা। একটি চলে গেলে অপরটিও চলে যায়।" (হাকেম ৫৮, মিশকাত ৫০৯৪, সহীহুল জামে ১৬০৩নং)

((الْحَيَاءُ مِنْ الْإِيمَانِ وَالْإِيمَانُ فِي الْجَنَّةِ وَالْبَدَاء مِنْ الْجَفَاءِ وَالْجَفَاء فِي النَّارِ)).
“লজ্জাশীলতা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত এবং ঈমান হবে জান্নাতে। আর অশ্লীলতা রূঢ়তার অন্তর্ভুক্ত এবং রূঢ়তা হবে জাহান্নামে।" (আহমাদ ১০৫১২, তিরমিযী ২০০৯, ইবনে হিব্বান, হাকেম ১/৫২, সহীহুল জামে' ৩১৯৯নং)

কার্পণ্য করা এক অপরাধ। আল্লাহর পথে আল্লাহর দেওয়া ধন ব্যয় করতে যে কণ্ঠাবোধ করে, অনেক সময় সে কেবল সঞ্চয় করেই যায় এবং নিজেও ভোগ করে না, পরিবারের পশ্চাতেও প্রয়োজনীয় খরচ করতে সম্মত হয় না, সে কি পূর্ণ ঈমানদার হতে পারে? মোটেই না।
যে সিন্দুকের কাছে টাকা ধার করে, যার অবস্থা সেই শিকারী কুকুরের মতো, যে প্রভুর জন্য শিকার করে এবং নিজে খেতে পায় না। 'খায় না দেয় না পাপী সঞ্চয় করে, তার ধন খায় চোরে আর পরে।' সে কি প্রকৃত মু'মিন হতে পারে? কক্ষনোই নয়। দানবীর নবী বলেছেন,
((لَا يَجْتَمِعُ غُبَارٌ فِي سَبِيلِ الله وَدُخَانُ جَهَنَّمَ فِي جَوْفِ عَبْدٍ أَبَداً ، وَلَا يَجْتَمِعُ الشُّحُ والإِيمَانُ فِي قَلْبِ عَبْدٍ أَبَداً)).
"কোনও বান্দার পেটে আল্লাহর রাস্তায় ধুলো ও দোযখের ধুয়ো কখনই একত্রিত হবে না। আর কৃপণতা ও ঈমান কোন বান্দার অন্তরে কখনই জমা হতে পারে না।" (আহমাদ ৭৪৮০, নাসাঈ ৩১১০, ইবনে হিব্বান ৩২৫১, হাকেম ২৩৯৫, সহীহুল জামে' ৭৬১৬নং)

ইসলামে মদ্যপান নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধ প্রত্যেক জ্ঞানশূন্যকারী ও মাদকতা আনয়নকারী বস্তু; হেরোইন, সিদ্ধি, গাঁজা, তামাক, বিড়ি-সিগারেট, গুল-জর্দা ইত্যাদি। সুতরাং যার বুকে ঈমান আছে, সে কি এসব মাদকদ্রব্য সেবন করতে পারে? আদৌ না। উষমান বিন আফফান বলেছেন,
اجتنبو الخمر فإنها والله لا يجتمع الإيمان وإدمان الخمر إلا ويوشك أن يخرج أحدهما صاحبه.
"তোমরা মদপান থেকে দূরে থাকো। যেহেতু বান্দার মধ্যে মদপানের অভ্যাস ও ঈমান কখনই একত্র হতে পারে না। আর হলে অদূর ভবিষ্যতে একটি তার সঙ্গীকে বহিষ্কার ক'রে দেয়।" (নাসাঈ ৫৬৬৬, বাইহাক্বী ১৭১১৬নং)

হিংসা একটি কদর্যতা। পরশ্রীকাতরতা একটি নিকৃষ্ট আচরণ। পরের সম্পদে ধ্বংস-কামনা করা একটা হীন মানসিকতা। এই পাপের ফলেও ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঈমানের সাথে এর কোন প্রকার সখ্য নেই। কোনও হৃদয়ে একটি থাকলে অপরটি বিদায় নেয়। মহানবী বলেছেন,
(وَلَا يَجْتَمِعَانِ فِي جَوْفِ مُؤْمِن الإِيمَانُ وَالْحَسَدُ)).
"কোন বান্দার অন্তরে ঈমান ও হিংসা একত্রিত হতে পারে না।" (নাসাঈ ৩১০৯, ত্বাবারানীর কাবীর ১৪৪, স্বাগীর ৪১০, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৬৬০৯, ইবনে হিব্বান ৪৬০৬নং)

আপনি অনেক কিছু করেন। কিন্তু তা আল্লাহর ওয়াস্তে না করলে এমন এক অপরাধ হয়, যার ফলে আপনার ঈমানে অপরিপূর্ণতা আসে। আপনি অনেক কিছু দান করছেন, কিন্তু তা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য নয়। আপনি অনেক কিছু দিচ্ছেন না, কিন্তু তা আল্লাহর জন্য নয়। অনেককে ভালোবাসছেন, কিন্তু আল্লাহর উদ্দেশ্যে নয়। অনেকের সাথে বন্ধুত্ব করছেন, কিন্তু তা আল্লাহর নিমিত্তে নয়। অনেককে ঘৃণা করছেন, কিন্তু তা আল্লাহকে তুষ্ট করার জন্য নয়। অনেকের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছেন, কিন্তু তা আল্লাহকে রাজি করার জন্য নয়। অনেকের বিবাহ দিচ্ছেন, কিন্তু তাতে আল্লাহ খুশি হবেন বলে নয়। জামাই বা বউ পছন্দ করছেন, কিন্তু আল্লাহর পছন্দের ভিত্তিতে নয়। তাতে কি আপনার ঈমান পূর্ণাঙ্গ বলে দাবী করতে পারেন? মোটেই না। মহানবী বলেছেন,
مَنْ أَعْطَى لِلَّهِ وَمَنَعَ لِلَّهِ وَأَحَبَّ لِلَّهِ وَأَبْغَضَ لِلَّهِ وَأَنْكَحَ لِلَّهِ فَقَدْ اسْتَكْمَلَ إِيمَانَهُ)).
"যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে কিছু দান করে, কিছু দেওয়া হতে বিরত থাকে, কাউকে ভালোবাসে অথবা ঘৃণাবাসে এবং তাঁরই সন্তুষ্টিলাভের কথা খেয়াল ক'রে বিবাহ দেয়, তার ঈমান পূর্ণাঙ্গ ঈমান।" (আহমদ ১৫৬১৭, ১৫৬৩৮, তিরমিযী ২৫২১, হাকেম, বাইহাক্বী, সঃ তিরমিযী ২০৪৬ নং)

তিনি আরো বলেছেন,
أَوْثَقُ عُرَى الإِسْلامِ : وَالْحُبُّ فِي اللَّهِ ، وَالْبُغْضُ فِي اللَّهِ)).
"ইসলামের সবচেয়ে মজবুত হাতল এই যে, তুমি আল্লাহর ওয়াস্তে সম্প্রীতি স্থাপন করবে এবং আল্লাহর ওয়াস্তে বিদ্বেষ স্থাপন করবে।" (আহমাদ, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান, ইবনে আবী শাইবা ৩০৪২০, সঃ জামে' ২০০৯নং)

এইভাবে ঈমান পাপ-পুণ্য দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকে। পাপকাজ করলে তা কমে যায় এবং পুণ্যকাজ করলে বৃদ্ধি পেতে থাকে।

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 প্রাণের উপর পাপের প্রভাব

📄 প্রাণের উপর পাপের প্রভাব


এমন অনেক পাপ আছে, যার ফলে প্রাণহানি ঘটে। কেউ খুন করলে, খুনের বদলে তাকে সরকার খুন করবে।
কেউ বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও ব্যভিচার করলে, সরকার তাকে শিক্ষামূলক বিশেষ পদ্ধতিতে হত্যা করবে।
কেউ মুসলিম হওয়ার পর ইসলাম ত্যাগ করলে সরকার তাকে খুন করবে।
অনুরূপ কেউ মুসলিম সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলে, সরকার তাকে হত্যা করবে। এ ব্যাপারে ইসলামে বিধান রয়েছে। মহানবী বলেছেন,
لا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّى رَسُولُ اللَّهِ إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ الثَّيِّبُ الزَّانِ وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ وَالتَّارِكُ لِدِينِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ ..
"তিন ব্যক্তি ছাড়া 'আল্লাহ ব্যতীত কেউ সত্য উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর রসূল' এ কথায় সাক্ষ্যদাতা কোন মুসলিমের খুন (কারো জন্য) বৈধ নয়; বিবাহিত ব্যভিচারী, খুনের বদলে হত্যাযোগ্য খুনী এবং দ্বীন ও জামাআত ত্যাগী।" (বুখারী ৬৮-৭৮, মুসলিম ৪৪৬৮-৪৪৭০নং আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ)

مَا نَقَضَ قَوْمُ الْعَهْدَ قَطُّ إِلَّا كَانَ الْقَتْلُ بَيْنَهُمْ وَلَا ظَهَرَتِ الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ قَطُّ إِلَّا سَلَّطَ اللَّهُ عَلَيْهِمُ الْمَوْتَ وَلَا مَنْعَ قَوْمُ الزَّكَاةَ إِلَّا حَبَسَ اللَّهُ عَنْهُمُ الْقَطْرَ ..
"যখনই কোন জাতি তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তখনই তাদের মাঝে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যখনই কোন জাতির মাঝে অশ্লীলতা আত্মপ্রকাশ করে, তখনই সে জাতির জন্য আল্লাহ মৃত্যুকে আধিপত্য প্রদান করেন। (তাদের মধ্যে মৃত্যুর হার বেড়ে যায়।) আর যখনই কোন জাতি যাকাৎ-দানে বিরত হয়, তখনই তাদের জন্য (আকাশের) বৃষ্টি বন্ধ ক'রে দেওয়া হয়।" (হাকেম ২৫৭৭, বাইহাকী ৬৬২৫, ১৯৩২৩, বায্যার ৩২৯৯, সিলসিলাহ সহীহাহ ১০৭নং)

إِنَّهُ سَتَكُونُ هَنَّاتٌ وَهَنَاتٌ فَمَنْ أَرَادَ أَنْ يُفَرِّقَ أَمْرَ هَذِهِ الْأُمَّةِ وَهْيَ جَمِيعٌ فَاضْرِبُوهُ بالسَّيْفِ كَائِنَا مَنْ كَانَ ..
"অদূর ভবিষ্যতে বড় ফিতনা ও ফাসাদের প্রার্দুভাব ঘটবে। সুতরাং যে ব্যক্তি এই উম্মতের ঐক্য ও সংহতিকে (নষ্ট করে) বিচ্ছিন্নতা আনতে চাইবে সে ব্যক্তিকে তোমরা তরবারি দ্বারা হত্যা করে ফেলো; তাতে সে যেই হোক না কেন।" (মুসলিম ৪৯০২নং)

مَنْ أَتَاكُمْ وَأَمْرُكُمْ جَمِيعٌ عَلَى رَجُلٍ وَاحِدٍ يُرِيدُ أَنْ يَشُقَّ عَصَاكُمْ أَوْ يُفَرِّقَ جَمَاعَتَكُمْ فَاقْتُلُوهُ ..
"যখন তোমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি একই শাসকের শাসনাধীনে ঐক্যপূর্ণ, তখন যদি আর এক (শাসক) ব্যক্তি এসে তোমাদের সংহতি নষ্ট করতে চায় এবং জামাআতের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে তাকে হত্যা করো।" (মুসলিম ৪৯০৪নং)

((وَمَنْ بَايَعَ إِمَامًا فَأَعْطَاهُ صَفْقَةَ يَدِهِ وَثَمَرَةَ قَلْبِهِ فَلْيُطِعْهُ إِنِ اسْتَطَاعَ فَإِنْ جَاءَ آخَرُ يُنَازِعُهُ فَاضْرِبُوا عُنْقَ الآخر )).
"যে ব্যক্তি কোন রাষ্ট্রনায়কের হাতে বায়াত করল এবং এতে তাকে নিজ প্রতিশ্রুতি ও অন্তস্তল থেকে অঙ্গীকার প্রদান করল তার উচিত, যথাসাধ্য তার (সেই নায়কের সৎবিষয়ে) আনুগত্য করা। এরপর যদি অন্য এক (নায়ক) তার ক্ষমতা দখল করতে চায়, তাহলে ঐ দ্বিতীয় নায়কের গর্দান উড়িয়ে দাও।" (মুসলিম ৪৮৮-২নং প্রমুখ)

سَيَكُونُ فِي أُمَّتِي اخْتِلَافُ وَفُرْقَةٌ قَوْمٌ يُحْسِنُونَ الْقِيلَ وَيُسِيئُونَ الْفِعْلَ وَيَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ لا يُجَاوِزُ تَرَاقِيَهُمْ يَمْرُقُونَ مِنَ الدِّينِ مُرُوقَ السَّهْمِ مِنَ الرَّمِيَّةِ لَا يَرْجِعُونَ حَتَّى يَرْتَدَّ عَلَى فوقِهِ هُمْ شَرُّ الْخَلْقِ وَالْخَلِيقَةِ طُوبَى لِمَنْ قَتَلَهُمْ وَقَتَلُوهُ يَدْعُونَ إِلَى كِتَابِ اللَّهِ وَلَيْسُوا مِنْهُ فِي شَيْءٍ مَنْ قَاتَلَهُمْ كَانَ أَوْلَى بِاللَّهِ مِنْهُمْ .. قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا سِيمَاهُمْ قَالَ : « التَّحْلِيقُ ..
"আমার উম্মতের মাঝে মতবিরোধ ও বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হবে। একদল হবে যাদের কথাবার্তা সুন্দর হবে এবং কর্ম হবে অসুন্দর। তারা কুরআন পাঠ করবে, কিন্তু তা তাদের গলদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করবে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বের হয়ে যাবে, যেমন তীর শিকার ভেদ করে বের হয়ে যায়। তারা (সেইরূপ দ্বীনে) ফিরে আসবে না, যেরূপ তীর ধনুকে ফিরে আসে না। তারা সৃষ্টির সবচেয়ে নিকৃষ্ট জাতি। শুভ পরিণাম তার জন্য, যে তাদেরকে হত্যা করবে এবং যাকে তারা হত্যা করবে। তারা আল্লাহর কিতাবের দিকে মানুষকে আহবান করবে, অথচ তারা (সঠিকভাবে) তার উপরে প্রতিষ্ঠিত থাকবে না। যে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, সে হবে বাকী উম্মত অপেক্ষা আল্লাহর নিকটবর্তী। তাদের চিহ্ন হবে মাথা নেড়া।" (আহমাদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, হাকেম, সহীহুল জামে' ৩৬৬৮-নং)

সন্ত্রাস, ডাকাতি, রাহাজানি, লুঠতরাজ, ধর্ষণ ইত্যাদির শাস্তির ক্ষেত্রেও সরকার প্রাণদন্ডের সাজা দিতে পারে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّمَا جَزَاء الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ) (৩৩) سورة المائدة
"যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করে (অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়) তাদের শাস্তি এই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা বিপরীত দিক হতে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ হতে নির্বাসিত করা হবে। ইহকালে এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও পরকালে তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে।" (মায়িদাহঃ ৩৩)

অনুরূপ সমকামীর অপরাধ এমন গুরুতর যে, সরকার তাকে প্রাণদন্ড দেবে। মহানবী বলেছেন,
مَنْ وَجَدْتُمُوهُ يَعْمَلُ عَمَلَ قَوْمٍ لُوطٍ فَاقْتُلُوا الْفَاعِلَ وَالْمَفْعُولَ بِهِ ».
"তোমরা যে ব্যক্তিকে লুত নবীর উম্মতের মত সমকামে লিপ্ত পাবে, সে ব্যক্তি ও তার সহকর্মীকে হত্যা করে ফেলো।" (আহমাদ ২৭৩২, আবু দাউদ ৪৪৬৪, তিরমিযী ১৪৫৬, ইবনে মাজাহ ২৫৬১, বাইহাকী ১৭৪৭৫, সহীহুল জামে' ৬৫৮-৯নং)

অনুরূপ শাস্তি পশুগমনকারীরও। মহানবী বলেছেন,
مَنْ وَجَدْتُمُوهُ وَقَعَ عَلَى بَهِيمَةٍ فَاقْتُلُوهُ وَاقْتُلُوا الْبَهِيمَةَ مَعَهُ ».
"যে ব্যক্তিকে কোন পশু-সঙ্গমে লিপ্ত পাবে, সে ব্যক্তি ও একই সাথে সেই পশুকে তোমরা হত্যা করে ফেলবে।" (তিরমিযী ১৪৫৫, ইবনে মাজাহ ২৫৬৪, হাকেম ৮০৪৯, বাইহাক্বী ১৭৪৯১, ১৭৪৯২, সহীহুল জামে' ৬৫৮৮-নং)

বিবিধ আরো অন্য কারণে অপরাধী নিজেকে হত্যাযোগ্য ক'রে তোলে। যেমন অনেক কারণে অপরাধী নিজেই প্রাণ হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ হয়।
উক্ত বিধানসমূহ সরকার বহাল না করলে আবেগময় উগ্র যুবক তা নিজের হাতে নিয়ে প্রয়োগ করতে পারে, যদিও সে কাজ তার নয়, তার জন্য বৈধ নয়।
হিংসা মানুষকে প্রতিহিংসা ও হত্যাকান্ডে উৎসাহিত করতে পারে। যেমন হিংসায় অন্ধ হয়ে কাবীল নিজ ভাই হাবীলকে হত্যা করেছিল। মহান আল্লাহ সে কথা কুরআনে উল্লেখ করেছেন,
"আদমের দুই পুত্রের (হাবিল ও কাবিলের) বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শুনিয়ে দাও, যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল, তখন একজনের কুরবানী কবুল হল এবং অন্য জনের কুরবানী কবুল হল না। তাদের একজন বলল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন বলল, আল্লাহ তো সংযমীদের কুরবানীই কবুল ক'রে থাকেন। আমাকে হত্যা করার জন্য তুমি আমার প্রতি হাত তুললেও তোমাকে হত্যা করার জন্য আমি তোমার প্রতি হাত তুলব না, আমি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালককে ভয় করি। তুমি আমার ও তোমার পাপের ভার বহন কর এবং দোযখবাসী হও এই তো আমি চাই এবং এ হল যালেম (অনাচারী) দের কর্মফল। অতঃপর তার চিত্ত ভ্রাতৃ-হত্যায় তাকে উত্তেজিত করল, সুতরাং সে (কাবীল) তাকে (হাবীলকে) হত্যা করল, ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হল।" (মায়িদাহঃ ২৭-৩০)

হিংসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ইউসুফ নবী-এর ভাইগণ তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল।
হিংসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শরীক নিজ শরীককে খুন করে।
অর্থ ও সম্পদের লোভে পড়ে ওয়ারেস নিজ মুওয়ারিসকে হত্যা করে। মানুষের কাছে বিশ্বস্ত হয়ে অনুগ্রহকারী বা অন্নদাতাকে হত্যা করে।
মানুষ লোভে পড়ে অসদুপায়ে ধন উপার্জন করে। লোভ থাকার ফলে প্রয়োজনে ধন ব্যয় করতে কার্পণ্য করে। তার ফলে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন হয় এবং আপোসে মনোমালিন্য থেকে বিষয়টি রক্তারক্তিতে পৌঁছে যায়। মহানবী বলেছেন,
( اتَّقُوا الظُّلْمَ ، فَإِنَّ الظُّلْمَ ظُلُمَاتٌ يَوْمَ القِيَامَةِ ، وَاتَّقُوا الشُّحَّ ، فَإِنَّ الشُّحَّ أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ ، حَمَلَهُمْ عَلَى أَنْ سَفَكُوا دِمَاءَهُمْ وَاسْتَحَلُّوا مَحَارِمَهُمْ )). رواه مسلم
"অত্যাচার করা থেকে বাঁচ। কেননা, অত্যাচার কিয়ামতের দিনের অন্ধকার। আর কৃপণতা থেকে দূরে থাক। কেননা, কৃপণতা তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস ক'রে দিয়েছে। (এই কৃপণতাই) তাদেরকে প্ররোচিত করেছিল, ফলে তারা নিজেদের রক্তপাত ঘটিয়েছিল এবং তাদের উপর হারামকৃত বস্তুসমূহকে হালাল ক'রে নিয়েছিল।" (মুসলিম ৬৭৪১নং)

অবৈধ প্রেম এমন এক মহা অপরাধ, যার ফলে অনেক প্রাণহানি ঘটিয়ে থাকে মানুষ।
প্রেমে অসফল হয়ে প্রেমিক-প্রেমিকা আত্মহত্যা করে।
প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে প্রেমিক নিজ প্রেমিকাকে খুন করে।
প্রেমে বাধা পড়লে প্রেমিক অথবা প্রেমিকা তার পথের কাঁটা (মা-বাপ, ভাই, স্বামী বা স্ত্রী) কে সরিয়ে ফেলার জন্য হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ হয়।
প্রেমিক কখনই তার প্রেমের শরীক সহ্য করে না। তাই সে তাকে হত্যা ক'রে রাস্তা পরিষ্কার করে।
প্রেমে ঘনিষ্ঠ হয়ে ব্যভিচারে লিপ্ত হলে অবৈধ ও অযাচিত সন্তানকে হত্যা করা হয়।
খুনী নিজেকে বাঁচাতে আরো অধিক খুন করতে উদ্বুদ্ধ হয়। খুনের সাক্ষ্য লোপাটের উদ্দেশ্যে সাক্ষীকে খুন ক'রে আইনের চোখে ধূলা দেয়।
ধর্ষণ করার পর ধরা পড়ার ভয়ে ধর্ষিতাকে খুন করা হয়।
হাতুড়ে ডাক্তার ভুল চিকিৎসা ক'রে রোগীকে হত্যা করে।
শিশুখাদ্য, ঔষধ ইত্যাদির প্রস্তুতকারক অধিক মুনাফার আশায় ভেজাল মিশ্রিত ক্ষতিকর খাদ্য বা ঔষধ পরিবেশন ক'রে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।
মাদকদ্রব্য প্রস্তুতকারকরা তা মানুষের মাঝে পরিবেশন ক'রে মরণের পথ বাতলে দেয়।
এলাকা দখল বা গদি দখলের রাজনৈতিক লড়াইয়ে বহু মানুষের প্রাণহানি হয়।
এ সব এক একটি মহা অপরাধ। যার প্রভাব পড়ে মানুষের প্রাণের উপর। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ كَتَبْنَا عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنَّهُ مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الأرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا وَلَقَدْ جَاءَتْهُمْ رُسُلُنَا بِالبَيِّنَاتِ ثُمَّ إِنَّ كَثِيرًا مِّنْهُم بَعْدَ ذَلِكَ فِي الْأَرْضِ لَمُسْرِفُونَ} (۳۲) سورة المائدة
"এ কারনেই বনী ইস্রাঈলের প্রতি এ বিধান দিলাম যে, যে ব্যক্তি নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করার দন্ডদান উদ্দেশ্য ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষকেই হত্যা করল। আর কেউ কারো প্রাণরক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করল। তাদের নিকট তো আমার রসূলগণ স্পষ্ট প্রমাণ এনেছিল, কিন্তু এর পরও অনেকে পৃথিবীতে সীমালংঘনকারীই রয়ে গেল।" (মায়িদাহঃ ৩২)

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 শরীর ও স্বাস্থ্যে পাপের প্রভাব

📄 শরীর ও স্বাস্থ্যে পাপের প্রভাব


বহু পাপ আছে, শরীয়তের নিষেধাজ্ঞা অমান্য ক'রে পাপী তা করে এবং নিজের শরীর ও স্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি করে।
ব্যভিচার বা অবৈধ যৌনাচারের ফলে প্রাদুর্ভূত বিভিন্ন পুরনো রোগ তো আছেই। গনোরিয়া, সিফিলিস, শুক্রক্ষরণ প্রভৃতি যৌনরোগ ব্যভিচারীদের মাঝেই আধিপত্য বিস্তার করে। গনোরিয়া বা প্রমেহ রোগে জননাঙ্গে ঘা ও জ্বালা সৃষ্টি হয় এবং সেখান হতে পুঁজ নিঃসরণ হয়। মূত্রনালী জ্বালা করে, সুড়সুড় করে। মূত্রত্যাগে কষ্ট হয়। পানির মত প্রস্রাবের পর হলুদ পুঁজযুক্ত পদার্থ বের হয়। সে সঙ্গে মাথা ধরা ও ঘোরা, জ্বর এবং নিম্নগ্রন্থি-স্ফীতি তো আছেই।
সিফিলিস বা উপদংশ রোগ শরীরে প্রবেশ করার পর সপ্তাহ মধ্যে লাল দাগ ও ফুস্কুড়ি প্রকাশ পায়। এরপর হতে শরীর অনবরত চুলকায় ও তার চারধারে প্রদাহযুক্ত পানি-ভরা ফোস্কা দেখা দেয় এবং ঐ সব ফুস্কুড়ি হতে পরে গলে ঘা হয় ও পুঁজ বের হয়। রোগ পুরনো হলে নখ খসে যায়, চুল ওঠে এবং সর্বাঙ্গে উদ্ভেদ প্রকাশ পায়।
আর শুক্রক্ষরণ রোগে তরল বীর্য যখন-তখন ঝরতে থাকে। এর ফলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, বুক ধড়ফড় করে, মাথা ধরে ও ঘোরে ইত্যাদি।

অবৈধ যৌন-সংসর্গের কারণে আধুনিক এস রোগ হয়। আর এই নোংরামির ফলে ভবিষ্যতে আরো নতুন নতুন রোগ-ব্যাধির প্রাদুর্ভাব ঘটবে।
সত্য বলেছেন আল্লাহর নবী। সত্য তাঁর নবুওয়াতের অহীলব্ধ ভবিষ্যদ্বাণী। তিনি বলেছেন, “হে মুহাজিরদল! পাঁচটি কর্ম এমন রয়েছে যাতে তোমরা লিপ্ত হয়ে পড়লে (উপযুক্ত শাস্তি তোমাদেরকে গ্রাস করবে)। আমি আল্লাহর নিকট পানাহ চাই, যাতে তোমরা তা প্রত্যক্ষ না কর।
যখনই কোন জাতির মধ্যে অশ্লীলতা (ব্যভিচার) প্রকাশ্যভাবে ব্যাপক হবে, তখনই সেই জাতির মধ্যে প্লেগ এবং এমন মহামারী ব্যাপক হবে, যা তাদের পূর্বপুরুষদের মাঝে ছিল না----।" (বাইহাকী, ইবনে মাজাহ ৪০১৯নং, সহীহ তারগীব ৭৫৯নং)

নবী বলেন, "যখনই কোন জাতি তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তখনই তাদের মাঝে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যখনই কোন জাতির মাঝে অশ্লীলতা আত্মপ্রকাশ করে, তখনই সে জাতির জন্য আল্লাহ মৃত্যুকে আধিপত্য প্রদান করেন। (তাদের মধ্যে মৃতের হার বেড়ে যায়।) আর যখনই কোন জাতি যাকাৎ-দানে বিরত হয়, তখনই তাদের জন্য (আকাশের) বৃষ্টি বন্ধ ক'রে দেওয়া হয়।" (হাকেম ২/১২৬, বাইহাকী ৩/৩৪৬, বায্যার ৩২৯৯ নং, সিলসিলাহ সহীহাহ ১০৭নং)

আর কুরআন মানুষকে বলে,
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبِيلاً) (۳۲) سورة الإسراء
"তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।" (বানী ইস্রাঈল: ৩২)

অনেক যুবক হস্তমৈথুন ক'রে নিজের হাতে নিজের অমূল্য যৌবনকে ধ্বংস করে। এমনিতেই 'ধন-জন-যৌবন জোয়ারের পানি, আজ আছে কাল নেই, জানে সব জ্ঞানী।' তার উপর কৃত্রিম মৈথুনের মাধ্যমে বীর্যক্ষয় ক'রে যৌবন ফুরিয়ে যাওয়ার বহু পূর্বেই তা হারিয়ে ফেলে বহু নির্বোধ যুবক। আজ এসব কথায় হয়তো কেউ কর্ণপাত না করলেও কাল অবশ্যই বুঝতে পারবে, যখন বিবাহের পর বাসর রাতেই ফুলশয্যায় সুসজ্জিতা সুরভিতা দিলরুবা স্ত্রীর পাশে মাথায় হাত রেখে বসে পস্তাতে হবে! যখন ধ্বজভঙ্গ হয়ে পুরুষাঙ্গ শিথিল থাকলে অথবা সঞ্চালন মাত্র দ্রুতপতন ঘটলে ঐ অতিরিক্ত যৌন-পাগলামির জন্য বারবার আক্ষেপ করবে। কিন্তু তখন কি আর আক্ষেপ কাজে দেবে? সময়ে 'সোনা চেন নাই, খুঁটে বাঁধ নাই।' তখন 'সোনা ফেলে আঁচলে গিঁড়ে দিয়ে লাভ কী?'

হাত দ্বারা কৃত কৃত্রিম মৈথুনের ফলে পুরুষাঙ্গের কোষবৃদ্ধি (হাইড্রোসিল) রোগ হয়। শুক্রক্ষরণ রোগেরও সূত্রপাত হয় এই অতিরিক্ত হস্ত-সঙ্গমের ফলে। এতে বীর্য পাতলা হয়ে যায়। ফলে স্ত্রী-সহবাসের সময় দ্রুত বীর্যস্খলন ঘটে।
হস্তমৈথুনের ফলে কোষ্টবদ্ধতা রোগ সৃষ্টি হয়। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, অল্প কথায় রাগ ধরে বেশী, ধৈর্যশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, স্নায়বিক দুর্বলতা দেখা দেয়, দেহ-মন থেকে স্ফূর্তি চলে যায়, মন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়, শারীরিক দুর্বলতা প্রকাশ পায়, সুন্দর স্বাস্থ্য ধ্বংস হয়ে যায়, দৃষ্টিশক্তি লোপ পায়, পিঠ কুঁজিয়ে যায়, পিঠে এক প্রকার ব্যথা অনুভূত হয়।
হস্তমৈথুনের ফলে স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায়, পড়াশোনায় প্রচন্ড প্রভাব ফেলে এই গুপ্ত যৌনাচার।
হস্তমৈথুনের ফলে খাদ্য হজমে গোলযোগ দেখা দেয়। কর্তব্যে ত্রুটি প্রকাশ পায়, আল্লাহর ইবাদতে ঔদাস্য সৃষ্টি হয়, রোযা নষ্ট হয়ে যায়। আরো কত কি!

অনুরূপ নানা ক্ষতি আছে মাসিক অবস্থায় স্ত্রী-সহবাস করাতে, পায়খানাদ্বারে সঙ্গম করাতে এবং সমকাম করাতে। শরীয়ত সে বিষয়ে সতর্ক করেছে মানুষকে।
মদ, হেরোইন প্রভৃতি মাদকদ্রব্য সেবনে মানুষের যে শারীরিক ক্ষতি হয়, তা বলাই বাহুল্য। এ ছাড়া তামাক, গাঁজা, জর্দা, বিড়ি-সিগারেট প্রভৃতি দ্রব্য সেবনে রয়েছে স্বাস্থ্যগত নানা ক্ষতি।
ডাক্তারগণ উল্লেখ করেছেন যে, ধূমপান হার্ট, রক্তপ্রবাহ, বক্ষ এবং সারা দেহের জন্য ক্ষতিকর। রক্তনালী সংকীর্ণ ও বন্ধ করে ফেলে। শরীরে কফ জন্মায়। টিবি, ক্যান্সার প্রভৃতি রোগের সূত্রপাত হয় এই ধূমপান হতে।
চিকিৎসা-বিজ্ঞানের গবেষণা এ কথা প্রমাণ করেছে যে, ধূমপানের সাথে ফুসফুসের ক্যানসার, সিরোসিস, করান্যারি, অ্যানজাইনা, মুখগহ্বর, গলবিল, স্বরযন্ত্র ও শ্বাসনালীর ক্যানসার এবং আরো অনেক রোগের গভীর সম্পর্ক আছে।
পরিসংখ্যানের প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, এই ধূমপানজনিত রোগের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যুর শিকার হচ্ছে; যাদের বয়স ৩৪ থেকে ৬৫ বছর। ধূমপানের এই সর্বনাশী ক্ষতির হাত হতে মায়ের পেটের ভ্রূণ পর্যন্ত রক্ষা পায় না!

নোংরা ছবি দর্শনের নেশা একটি জঘন্য পাপ। মহান আল্লাহর নির্দেশ হল,
{قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ (۳۰) وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ}
"বিশ্বাসী পুরুষদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের যৌন অঙ্গকে সাবধানে সংযত রাখে; এটিই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। ওরা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত। বিশ্বাসী নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে।" (নূরঃ৩০-৩১)

একদা রাসূলুল্লাহ্ আলীকে বলেছেন,
يَا عَلِيُّ لَا تُتَّبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ فَإِنَّ لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ ».
"হে আলী! একবার নজর পড়ে গেলে আর দ্বিতীয়বার তাকিয়ে দেখো না। প্রথমবারের (অনিচ্ছাকৃত) নজর তোমার জন্য বৈধ। কিন্তু দ্বিতীয়বারের নজর বৈধ নয়। (আহমাদ, আবু দাউদ ২১৫১, তিরমিযী ২৭৭৭, হাকেম ২৭৮৮, বাইহাক্বী ১৩২৯৩, সহীহুল জামে' ৭৯৫৩ নং)

শরীয়তের উক্ত নির্দেশ অমান্য করার ফলে অপরাধীরা নিজেদের কী সর্বনাশ ডেকে আনে তা হয়তো অনেকে অনুমান করতে পারে না। বিশেষ ক'রে সেক্স ও সেক্সী দৃশ্য দেখতে দেখতে কত বড় পাপ ঘটিয়ে বসায় এর অপরাধীরা। মহা ক্ষতি করে ফেলে নিজেদের শরীরের।

* নগ্ন ছবি দেখার ফলে মস্তিষ্কের সম্মুখভাগ নষ্ট হয়ে যায়।
যৌন উত্তেজনামূলক নোংরা ফিল্ম দেখার অভ্যাস মাদকদ্রব্য সেবনের মতোই এক প্রকার ঘৃণ্য ক্ষতিকর অভ্যাস। এর ফলে মস্তিষ্কের সম্মুখভাগ Frontal Loob নষ্ট হয়ে যায়।
গবেষক Gordon S. Bruin বলেন, 'আমার ২০ বছর নোংরা ফিল্ম দর্শনের অভ্যাসীদের চিকিৎসা করতে গিয়ে লক্ষ্য করেছি, যৌন-মিলনের ফিল্ম দেখার অভ্যাস মাদকদ্রব্য সেবনে অভ্যাসের মতো একটি প্রকৃত ব্যাধি।
Cambridge University এর একটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে, pornography দর্শনের ফলে দর্শকের মস্তিষ্ক মাদকদ্রব্য সেবনকারীর মস্তিষ্কের মতো হয়ে যায়।
ফলে তার দর্শন মাদকদ্রব্য সেবনের নেশায় পরিণত হয়। মাদকদ্রব্য সেবন না ক'রে যেমন অভ্যাসীর স্বস্তি আসে না, শান্তি আসে না, ঠিক তেমনই অবস্থা ঘটে পর্ণগ্রাফী দর্শনে অভ্যাসীর।
বড় দুঃখের বিষয় যে, আধুনিক বিশ্বের বিশ্বায়নের যুগে আজ যত্রে-তত্রে নোংরা ছবির ছড়াছড়ি। ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে ২৮০০০ মানুষ নোংরা সাইটে প্রবেশ করছে এবং পশুবৎ যৌনমিলন দর্শন করছে। আরো দুঃখের বিষয় যে, এদের মধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশ হল মহিলা।
এর ফলে এত বৃহৎ সংখ্যক মানুষের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে নোংরা ও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যেহেতু যৌন-উত্তেজনা সৃষ্টিকারী দৃশ্য দেখামাত্র সাথে সাথে dopamine, oxytocin ও testosterone পদার্থ ক্ষরণ হতে থাকে এবং এমন তুফান সৃষ্টি করে, যা মস্তিষ্ককে তছনছ ক'রে ফেলে। ব্রেনের সিস্টেমকেই অস্বাভাবিক ক'রে তোলে এবং স্মৃতিশক্তি ও পড়াশোনার সর্বনাশ ঘটিয়ে ছাড়ে। তাতে ব্রেনের গুরুত্বপূর্ণ কোষ নষ্ট হতেও পারে।

নোংরা যৌনমিলনের ভিডিও দেখার সময় dopamine পদার্থ খুব বেশি আকারে বের হতে থাকে। আর তার ফলে মস্তিষ্কের সম্মুখস্থ অংশ দুর্বল হতে থাকে। আর এই অংশ কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বড় গুরুত্বপূর্ণ। বলা বাহুল্য, মস্তিষ্কের এই অংশটি গাড়ির ব্রেকের মতো। ভেবে দেখুন, আপনি যদি কোন ব্রেকহীন বা ব্রেক খারাপ হওয়া গাড়ি চালান, তাহলে যে কোন দুর্ঘনা ঘটতে বাধ্য। অনুরূপই অতিরিক্ত পর্ণগ্রাফী দর্শনের ফলে আপনি নিজের ব্যক্তিত্ব হারিয়ে ফেলতে পারেন। যেহেতু উক্ত পদার্থ অধিক ক্ষরণের ফলে আপনি আপনার নিজের আচরণের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবেন।
যেমন dopamine পদার্থটি মানুষের মানসিক সুখের জন্য অতীব জরুরী জিনিস। যখনই সুখের কোন বিষয় আসে, যেমন প্রচুর অর্থোপার্জন হয় অথবা কোন বিশাল সফলতা আসে, তখনই উক্ত পদার্থ ক্ষরণ হতে থাকে এবং তারই কারণে আমরা সুখ ও তৃপ্তি অনুভব করতে লাগি। কিন্তু যখনই কোন মানুষ পর্ণগ্রাফী দেখতে অভ্যাসী হয়ে পড়ে, তখনই dopamine পদার্থ বেশি বেশি ক্ষরণ হতে থাকে এবং তার ফলে ধীরে ধীরে সেই কোষগুলি দুর্বল হয়ে পড়ে, যেগুলি উক্ত পদার্থ ক্ষরণ করতে থাকে। আর ক্রমে ক্রমে পদার্থ হ্রাস পেতে থাকে এবং কোষগুলি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। যার ফলশ্রুতিতে মানুষের সুখানুভূতি লয়প্রাপ্ত হয়। সে কোন বিষয়ে আর তেমন সুখানুভব করে না, যেমন পূর্বে করত। তখন সে এমন কিছু অনুসন্ধান করে, যা আরো বেশি উত্তেজনা সৃষ্টি করে। ঠিক যেমনটি মাদকাসক্তির ফলে ঘটে থাকে। যা এক সময় এমন এক পরিস্থিতিতে এনে উপনীত করে, যখন মস্তিষ্কের বিশেষ কোষগুলি বিকল হয়ে যায়। আর এটা অবশ্যই প্রকৃত ধ্বংস।
মাদকাসক্তরা যতটা আসক্তি মাদকদ্রব্যের প্রতি রাখে, তার থেকে বেশি আসক্তি আসে নগ্ন নারীদেহ ও যৌন-মিলন দর্শনের প্রতি। মাদকদ্রব্য মাদকাসক্তদের যতটা ক্ষতি করে, তার থেকে বেশি ক্ষতি করে নগ্ন নারীদেহ ও যৌনমিলন দর্শনের মাধ্যমে উষ্ণ তৃপ্তি গ্রহণকারীদের। কিন্তু নেশার ঘোরে ক্ষতিগ্রস্তরা সে ক্ষতির কথা অনুভবও করতে পারে না। পরিশেষে সর্বনাশই তাদের ভাগ্য হয়।

* সেক্সী ফিল্ম দেখার অভ্যাস করার ফলে অপরাধীর দাম্পত্য জীবন ধ্বংস হয়ে যায়।
ব্রেনের মধ্যে oxytocin পদার্থ মানুষের মাঝে বিশ্বাস রক্ষার দায়িত্ব পালন করে থাকে। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যে বিশ্বস্ততা থাকে, তাও আসলে উক্ত পদার্থই সৃষ্টি করে থাকে।
অধিকাধিক পর্ণগ্রাফী দৃশ্য দেখার ফলে উক্ত পদার্থ প্রচুর পরিমাণে ক্ষরণ হয়। এর ফলে তার মনে সৃষ্টি হয় কাল্পনিক নারী-নেশা ও যৌনক্ষুধা। সুতরাং উক্ত পদার্থ ক্ষরণের স্বাভাবিক সিস্টেম বিগড়ে যায়, বিগড়ে যায় আরো কিছু হরমোন ক্ষরণের সিস্টেম। এরই ফলশ্রুতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার দাম্পত্য জীবন। অনেক ক্ষেত্রে ভেঙ্গে পড়ে আবেগ ও সম্প্রীতির জীবন।
বহু গবেষণা এ কথার তাকীদ করেছে যে, অশ্লীল ফিল্ম দর্শনই বহু দাম্পত্য সমস্যা ও পারিবারিক বিবাদের জন্য দায়ী।
পর্ণগ্রাফী দেখার ফলে যুবক হস্তমৈথুন বা অন্য কোন বিরল মৈথুনে আসক্ত হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে সে কাল্পনিক কোন যৌনময় জগতে বসবাস শুরু করে, যা স্বামী- স্ত্রীর বৈবাহিক যৌনজগৎ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। বিবাহ ও স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন তার কাছে যৌনক্ষুধা নিবারণের মাধ্যম বৈ অন্য কিছু মনে হয় না। এর ফলে বাস্তব দাম্পত্য সুখের কথা তার মন থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। অতঃপর বিবাহ করলেও সে তাতে অসফল ও অসুখী হয়। সাধারণতঃ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিশ্বাসঘাতকতার সন্দেহ জন্মে। পরিশেষে কাল্পনিক যৌনাচার অথবা ব্যভিচারের মাধ্যমে বাস্তব যৌনাচারের মাঝে সুখ অনুভব করতে চায়। আর এরই দরুন সে দম্পতির সংসারের শিশমহল ভেঙে চূর্ণ হয়ে যায়।

* সেক্সী ফিল্ম দেখার অভ্যাস করার ফলে অপরাধী ব্যভিচারের মতো বড় পাপ ঘটায়।
এ কথা স্বাভাবিক যে, অশ্লীল দৃশ্য দেখার ফলে দেহমন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ফলে হস্তমৈথুন বা অন্য কোন বিরল যৌনাচারে লিপ্ত হয়। তাতেও তৃপ্তি না পেলে এবং সহমতাবলম্বী সঙ্গী পেলে ব্যভিচার অথবা সমকামের মাধ্যমে মনের আগুন নির্বাপিত করে ও নিজের যৌনক্ষুধা নিবারণ করে এবং সেটা তার স্বাভাবিক চরিত্রে পরিণত হয়।

* সেক্সী ফিল্ম দেখার অভ্যাস করার ফলে অপরাধী ধর্ষণের মতো বড় পাপ ঘটায়।
অনেক দর্শকই বাস্তব সুখ ও তৃপ্তি অনুভব করতে গিয়ে ব্যভিচারী হয়ে যায়। পরন্তু অনেক সময় সহমতাবলম্বী সঙ্গী না পেলে ধর্ষণের মতো আরো বড় অপরাধ করতে উদ্বুদ্ধ হয়।
ডক্টর Victor B. Cline লিখেছেন, অশ্লীল ছবি দর্শকের চরিত্র বিরল প্রকৃতির হয়ে ওঠে। সুতরাং বলাৎকার, ইভটিজিং, শিশু অপহরণ ইত্যাদির মতো অপরাধ তার স্বাভাবিক আচরণ হয়ে যায়।

* সেক্সী ফিল্ম দেখার অভ্যাস করার ফলে অপরাধীর স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে থাকে।
গবেষণায় জানা গেছে যে, অশ্লীল সেক্সী চিত্রাবলী দর্শন অভ্যাসে পরিণত হওয়ার ফলে মানুষের স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। পড়ুয়াদের পড়াশোনায় বিশাল ক্ষতি হয়। মন বিক্ষিপ্ত ও উদাসীন হয়। মানসিক আরও অন্যান্য সমস্যা দেখা দেয়।

* সেক্সী ফিল্ম দেখার অভ্যাস করার ফলে নাবালক শিশুদের ভবিষ্যৎ বরবাদ হয়ে যায়।
যে সকল শিশুদের বয়স ১৪ বছরের নিম্নে, বিশেষ করে তাদের জীবন এই অশ্লীল চিত্রাবলী দর্শনের ফলে ভীষণভাবে প্রভাবান্বিত হয়। তাদের মস্তিষ্ক বিকৃত হতে থাকে। তারা অপরাধ জগতের দিকে ঢলে পড়ে। তারা ভাবে ফ্রি সেক্সই হল স্বাভাবিক জীবন। যৌবনের প্রথম পদক্ষেপেই যে সকল চিত্র দর্শন ক'রে বাস্তবে তা চরিতার্থ করতে চায়। ফলে নোংরা জীবনই তাদের আসল জীবন হয়ে দাঁড়ায়।

* সেক্সী ফিল্ম দেখার অভ্যাস করার ফলে অপরাধীর নানা রোগ সৃষ্টি হতে পারে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় জানা গেছে যে, অশ্লীল যৌনমিলনের ছবি দেখার ফলে মানুষের নানা রোগ দেখা দিতে পারে। যেমন হরমোন সমস্যা, হৃদরোগ, ব্লাডপ্রেসার, atherosclerosis ইত্যাদি।

স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের নগ্নদেহ দর্শন সে ক্ষতি করে না। গবেষণায় জানা গেছে যে, স্বামী-স্ত্রীর নগ্নদেহের বৈধ দর্শন ও যৌন-সংসর্গে উক্ত কোন ক্ষতির আশঙ্কাই নেই। বরং তা উভয়ের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ও বড় উপকারী। স্বামী-স্ত্রীর যৌনাচারের ফলে তাদের উভয়ের মধ্যে immunity system শক্তিশালী হয় এবং ব্রেনের সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।
স্বামী-স্ত্রীর যৌনাচারে dopamine, endorphins-oxytocin, serotonin এবং অন্যান্য পদার্থ স্বাভাবিক আকারে ক্ষরণের ফলে তাদের উভয়ের মনে অধিক প্রশান্তি ও ভালোবাসা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।
পক্ষান্তরে অন্য নারীদেহ নগ্ন দেখলে অথবা ব্যভিচারের মাধ্যমে উপভোগ করলে উক্ত পদার্থগুলি বেশি আকারে ক্ষরণ হতে থাকে। আর তা স্বভাবতই মস্তিষ্কের প্রভূত ক্ষতি সাধন করে, যেমন মাদকদ্রব্য মাদকাসক্তের ক'রে থাকে। বৈধ ও অবৈধ উভয় যৌনমিলনের মাঝে পার্থক্য করে প্রকৃত ও স্বাভাবিক প্রেমবন্ধনের অবর্তমানতা। তারই ফলে ব্রেন-ফাংশনে নানা ডিস্টার্ব সৃষ্টি হয়।
পূর্বেই বলা হয়েছে মস্তিষ্কের সম্মুখভাগ বা Frontal Loob গাড়ির ব্রেকের মতো। এই ভাগের কাজ হল পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু অবৈধ যৌনমিলন করা বা দেখার ফলে ধীরে ধীরে তার অনেকাংশ নষ্ট হয়ে যায়, ঠিক যেমন গাড়ি অস্বাভাবিক গতিতে চালালে ব্রেক নষ্ট হয়ে যায়। পক্ষান্তরে স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালালে তা সহজে নষ্ট হয় না। অনুরূপ স্বাভাবিক ও বৈধ সম্পর্কের যৌনমিলন করা ও দেখার ফলে উক্ত ক্ষতির আশঙ্কা থাকে না। বরং এর ফলে ব্রেনের উক্ত ভাগটি সতেজ, সক্রিয় ও মানব জীবনের বহু সাফল্যের সহযোগী হয়ে ওঠে। যেহেতু এ হল সুমহান স্রষ্টার সৃষ্টি। তিনিই স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই একে অন্যের পোশাক বানিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
{هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ} (۱۸۷) سورة البقرة
“তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।” (বাক্বারাহঃ ১৮৭)

বিবাহের বিধান দিয়ে তিনিই তাদের মাঝে ভালোবাসা ও স্নেহময় সম্পর্কের বাঁধনে উভয়কে বেঁধে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
{وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ} (۲۱) سورة الروم
“তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে আর একটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের সঙ্গিনীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা ওদের নিকট শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মায়া-মমতা সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।” (রুমঃ ২১)
কত সুন্দর মহান স্রষ্টা! কত সুন্দর তাঁর বিধান!! (সূত্র ইন্টারনেট)

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 জ্ঞানের উপর পাপের প্রভাব

📄 জ্ঞানের উপর পাপের প্রভাব


মহান প্রতিপালক মানুষকে জ্ঞান দ্বারা বহু জীবের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং সেই জ্ঞান যাতে বিলুপ্ত না হয়, তার জন্য মদকে হারাম করেছেন। যে জিনিস মাদকতা ও নেশা আনে, তাই মদ বা মাদকদ্রব্য; যা সেবন করলে জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ জ্ঞানশূন্য হয়ে যায়। আর জ্ঞানশূন্য হলে তার দ্বারা বহু কুকাম ঘটে যায়। এই জন্য কুরআনে মদকে অপবিত্র ও শয়তানী কর্ম বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (٩٠) سورة المائدة
“হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (মায়িদাহঃ ৯০)

আর মহানবী বলেছেন,
(الْخَمْرُ أُمُّ الْفَوَاحِشَ وَأَكْبَرُ الْكَبَائِرِ مَنْ شَرِبَهَا وَقَعَ عَلَى أُمِّهِ وَخَالَتِهِ وَعَمَّتِهِ)).
“মদ হল যাবতীয় অশ্লীলতার প্রধান এবং সবচেয়ে বড় পাপ। যে ব্যক্তি তা পান করল, সে যেন নিজ মা, খালা ও ফুফুর সাথে ব্যভিচার করল!” (ত্বাবারানী, সঃ জামে' ৩৩৪৫নং)

الْخَمْرُ أُمُّ الْخَبَائِثِ، فَمَنْ شَرِبَهَا لَمْ تُقْبَلْ مِنْهُ صَلَاتُهُ أَرْبَعِينَ يَوْمًا، فَإِنْ مَاتَ وَهِيَ فِي بَطْنِهِ مَاتَ مَيْتَةً جَاهِلِيَّةً)).
"মদ যাবতীয় নোংরামির মূল। যে কেউ তা পান করবে, তার ৪০ দিনের নামায কবুল হবে না। (যে ব্যক্তি তার মূত্রথলিতে ঐ মদের কিছু পরিমাণ রাখা অবস্থায় মারা যাবে, তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যাবে এবং) যে কেউ তা নিজ পেটে রেখে মারা যাবে, সে জাহেলী যুগের মরণ মরবে।" (ত্বাবারানী ১৫৪৩, দারাকুত্বনী ৪/২৪৭, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৬৯৫নং)

আবু দারদা বলেন, আমাকে আমার বন্ধু বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন যে,
((لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ شَيْئًا ، وَإِنْ قُطَّعْتَ وَحُرِّقْتَ ، وَلَا تَتْرُكْ صَلَاةً مَكْتُوبَةً مُتَعَمِّدًا ، فَمَنْ تَرَكَهَا مُتَعَمِّدًا ، فَقَدْ بَرنَتْ مِنْهُ الدَّمَّةُ ، وَلَا تَشْرَبِ الْخَمْرَ ، فَإِنَّهَا مِفْتَاحُ كُلَّ شَ).
"তুমি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না---যদিও (এ ব্যাপারে) তোমাকে হত্যা করা হয় অথবা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ইচ্ছাকৃত ফরয নামায ত্যাগ করো না। কারণ যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নামায ত্যাগ করে, তার উপর থেকে (আল্লাহর) দায়িত্ব উঠে যায়। আর মদ পান করো না, কারণ মদ হল প্রত্যেক অমঙ্গলের (পাপাচারের) চাবিকাঠি।" (ইবনে মাজাহ ৪০৩৪, সহীহ ইবনে মাজাহ ৩২৫৯নং)

বলা বাহুল্য, মদ্যপায়ী অপরাধী। আর তার অপরাধের ফলে প্রথম ক্ষতি হয় নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00