📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 স্থান-কাল-পাত্র ভেদে পাপের বিশালতা

📄 স্থান-কাল-পাত্র ভেদে পাপের বিশালতা


পাপ লঘু হোক, গুরু হোক অথবা অতি মহাপাপ হোক, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে তা অধিকতর ভয়ানক হতে পারে। যেমন যে পাপ ঘরে করা হয়, সে পাপ মসজিদে করা তুলনামূলক বেশি গুরুতর। সাধারণ দিনের তুলনায় রমযানের দিনে পাপ গুরুতর। সাধারণ লোকের তুলনায় আলেম-উলামার কৃত পাপ অধিক ভয়াবহ। মর্যাদাপূর্ণ স্থানে পাপ করা তুলনামূলক বেশি অপরাধ। মহান আল্লাহ মক্কা মুকারামার জন্য বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَيَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمَسْجِدِ الْحَرَامِ الَّذِي جَعَلْنَاهُ لِلنَّاسِ سَوَاء الْعَاكِفُ فِيهِ وَالْبَادِ وَمَن يُرِدْ فِيهِ بِإِلْحَادٍ بِظُلْمٍ نُذِقْهُ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ} (٢٥) الحج
"যারা অবিশ্বাস করে এবং মানুষকে নিবৃত্ত করে আল্লাহর পথ হতে ও 'মাসজিদুল হারাম' হতে; যাকে আমি করেছি স্থানীয় ও বহিরাগত সবারই জন্য সমান। আর যে ওতে সীমালংঘন ক'রে পাপকার্যের ইচ্ছা করে, তাকে আমি আস্বাদন করাবো মর্মন্তুদ শাস্তি।" (হাজ্জঃ ২৫)

মক্কার পবিত্র মসজিদের পৃথক বৈশিষ্ট্য রয়েছে মহান আল্লাহর কাছে। তাই তিনি সেটাকে 'হারাম' (নিষিদ্ধ ও পবিত্র) রূপে ঘোষণা করেছেন। তার মর্যাদা রক্ষা করার বিশেষ নির্দেশ দিয়ে বলেছেন,
{وَلَا تُقَاتِلُوهُمْ عِندَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ حَتَّى يُقَاتِلُوكُمْ فِيهِ} (۱۹۱) سورة البقرة
"মাসজিদুল হারামের (কা'বা শরীফের) নিকট তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করো না; যতক্ষণ না তারা সেখানে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে।" (বাক্বারাহঃ ১৯১)

মক্কার এ মাহাত্ম্য অনুধাবন করে অনেক সাহাবা মক্কায় বসবাস করেননি। তাঁদের মধ্যে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস ও আব্দুল্লাহ বিন আম্র অন্যতম। উমার বিন আব্দুল আযীযও মক্কায় বসবাস করতে ভয় করতেন।
আব্দুল্লাহ বিন আম্র বলতেন, 'সেখানকার অপরাধ সবার চাইতে বড়।' উমার বিন খাত্ত্বাব বলেছেন, 'মক্কায় একটি অপরাধ করার চাইতে অন্য স্থানে সত্তরটি অপরাধ করা আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়।' (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম।)
মুজাহিদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'মক্কার পাপ বহুগুণ হয়, যেমন তার পুণ্য বহুগুণ হয়।
ইবনে জুরাইজ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'আমার নিকট পৌঁছেছে যে, মক্কার একটা পাপ একশত পাপের সমান এবং তার পুণ্যও অনুরূপ।'

বুঝা গেল যে, মক্কার হারামের পাপ বেশি গুরুতর ও ভয়ঙ্কর। যেখানে পাপ তো দূরের কথা, পাপের সংকল্প করলে কঠিন শাস্তির আস্বাদন গ্রহণ করতে হবে। তাহলে পাপ সংঘটিত করলে আরো কত বড় শাস্তির উপযুক্ত হতে হবে, তা অনুমেয়।
কিন্তু প্রশ্ন হল, হাদীস থেকে জানা যায় যে, পাপের সংকল্প করলেই পাপ হয় না। যেমন মহানবী বলেছেন,
(( إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الحَسَنَاتِ والسَّيِّئَاتِ ثُمَّ بَيَّنَ ذلِكَ ، فَمَنْ هَمَّ بِحَسَنَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كَتَبَهَا اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى عِنْدَهُ حَسَنَةً كَامِلَةً ، وَإِنْ هَمَّ بِهَا فَعَمِلَهَا كَتَبَهَا اللَّهُ عَشْرَ حَسَنَاتٍ إِلى سبعمئة ضعف إلى أضعاف كثيرة ، وإِنْ هَمَّ بِسَيِّئَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كَتَبَهَا اللَّهُ تَعَالَى عِنْدَهُ حَسَنَةً كَامِلَةً ، وَإِنْ هَمَّ بِهَا فَعَمِلَهَا كَتَبَهَا اللَّهُ سَيِّئَةً وَاحِدَةً )) مُتَّفَقٌ عَلَيهِ
"নিশ্চয় আল্লাহ পুণ্যসমূহ ও পাপসমূহ লিখে দিয়েছেন। অতঃপর তিনি তার ব্যাখ্যাও করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি কোন নেকী করার সংকল্প করে; কিন্তু সে তা কর্মে বাস্তবায়িত করতে পারে না, আল্লাহ তাবারাকা অতাআলা তার জন্য (কেবল নিয়ত করার বিনিময়ে) একটি পূর্ণ নেকী লিখে দেন। আর সে যদি সংকল্প করার পর কাজটি করে ফেলে, তাহলে আল্লাহ তার বিনিময়ে দশ থেকে সাতশ গুণ, বরং তার চেয়েও অনেক গুণ নেকী লিখে দেন। পক্ষান্তরে যদি সে একটি পাপ করার সংকল্প করে; কিন্তু সে তা কর্মে বাস্তবায়িত না করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকট একটি পূর্ণ নেকী হিসাবে লিখে দেন। আর সে যদি সংকল্প করার পর ঐ পাপ কাজ করে ফেলে, তাহলে আল্লাহ মাত্র একটি পাপ লিপিবদ্ধ করেন।" (বুখারী ৭৫০১, মুসলিম ১২৮নং)

তিনি আরো বলেছেন,
يَقُولُ اللَّهُ إِذَا أَرَادَ عَبْدِي أَنْ يَعْمَلَ سَيِّئَةً فَلَا تَكْتُبُوهَا عَلَيْهِ حَتَّى يَعْمَلَهَا فَإِنْ عَمِلَهَا فَاكْتُبُوهَا بِمِثْلِهَا وَإِنْ تَرَكَهَا مِنْ أَجْلِي فَاكْتُبُوهَا لَهُ حَسَنَةً وَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَعْمَلَ حَسَنَةً فَلَمْ يَعْمَلْهَا فَاكْتُبُوهَا لَهُ حَسَنَةً فَإِنْ عَمِلَهَا فَاكْتُبُوهَا لَهُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ)).
"আল্লাহ (পাপ-পুণ্য লেখক ফিরিশতাকে) বলেন, 'আমার বান্দা যখন কোন পাপ করার ইচ্ছা করে, তখন তা কাজে পরিণত না করা পর্যন্ত তার আমলনামায় পাপ লিপিবদ্ধ করো না। অতঃপর যদি তা কাজে পরিণত করে, তাহলে অনুরূপ (১টি) পাপ লিপিবদ্ধ কর। আর যদি তা আমার কারণে ত্যাগ করে (কাজে পরিণত না করে), তাহলে তার জন্য ১টি নেকী লিপিবদ্ধ কর। পক্ষান্তরে যখন সে কোন নেকীর কাজ করার ইচ্ছা করে এবং তা কাজে পরিণত না করতে পারে, তাহলে তার জন্য ১টি নেকী লিপিবদ্ধ কর। আর যদি তা কাজে পরিণত করে ফেলে, তাহলে তার জন্য ১০ থেকে ৭০০ গুণ নেকী লিপিবদ্ধ কর।" (বুখারী ৭৫০ ১নং)

তিনি আরো বলেছেন,
((إِنَّ صَاحِبَ الشِّمَالِ لِيَرْفَعُ الْقَلَمَ سِتَ سَاعَاتِ عَنِ الْعَبْدِ الْمُسْلِمِ الْمُخْطِئِ أَوِ الْمُسِيءِ، فَإِنْ نَدِمَ وَاسْتَغْفَرَ اللَّهَ مِنْهَا أَلْقَاهَا، وَإِلَّا كُتِبَتْ وَاحِدَة)).
"নিশ্চয় বামের ফিরিস্তা পাপী বা অপরাধী মুসলিমের উপর থেকে ছয় ঘন্টা কলম তুলে রাখেন। অতঃপর সে যদি পাপে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয়, তাহলে তা উপেক্ষা করেন। নচেৎ একটি পাপ লেখা হয়।" (ত্বাবারানীর কাবীর ৭৬৬৭, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৭০৫১, সঃ জামে' ২০৯৭, সিঃ সহীহাহ ১২০৯নং)

((إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ)).
"নিশ্চয় মহান আল্লাহ আমার উম্মতের সে কথাকে অতিক্রম করেন, যা তারা মনের সাথে বলে; যতক্ষণ না তারা তা কাজে পরিণত করে অথবা মুখে প্রকাশ করে।" (বুখারী ২৫২৮, ৫২৬৯, মুসলিম ৩৪৬নং, সুনান আরবাআহ)

তাহলে মক্কার হারামের ক্ষেত্রে পাপের সংকল্প করলেই কঠিন শাস্তি কেন?
ইবনুল কাইয়েম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'মক্কী হারামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, সেখানে কেউ পাপের সংকল্প করলেই সে শাস্তিযোগ্য হয়, যদিও সে তা কাজে পরিণত না করে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَن يُرِدْ فِيهِ بِإِلْحَادِ بِظُلْمٍ نُذِقْهُ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ} (٢٥) سورة الحج
"যে ওতে সীমালংঘন ক'রে পাপকার্যের ইচ্ছা করে, তাকে আমি আস্বাদন করাবো মর্মন্তুদ শাস্তি।" (হাজ্জঃ ২৫, যাদুল মাআদ ১/৫১)

ইবনে মাসউদ বলেছেন, 'মক্কা ছাড়া অন্য কোন স্থানে পাপকাজের সংকল্প করলে বান্দাকে পাকড়াও করা হয় না।' (রাবীউল আবরার, যামাখশারী, ১/৪৫)

অবশ্য আয়াতে উল্লিখিত সংকল্প এই অর্থেও হতে পারে যে, যে ব্যক্তি দৃঢ় সংকল্প করার পর কোন বাধার কারণে সে তা কাজে পরিণত করতে না পারলে কঠিন শাস্তির উপযুক্ত হয়। যেমন হাদীসে মহানবী বলেছেন,
(( إِذا التَقَى المُسلِمَانِ بِسَيْفَيهِمَا فَالقَاتِلُ وَالمَقْتُولُ فِي النَّار (( قُلْتُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ! هذا القَاتِلُ فَمَا بَالُ المَقْتُول ؟ قَالَ : (( إِنَّهُ كَانَ حَريصاً عَلَى قتل صَاحِبِهِ )) . مُتَّفَقٌ عليه.
"যখন দু'জন মুসলমান তরবারি নিয়ে আপোসে লড়াই করে, তখন হত্যাকারী ও নিহত দু'জনই দোযখে যাবে।” আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! হত্যাকারীর দোযখে যাওয়া তো স্পষ্ট; কিন্তু নিহত ব্যক্তির ব্যাপার কী?' তিনি বললেন, “সেও তার সঙ্গীকে হত্যা করার জন্য লালায়িত ছিল।” (বুখারী ৬৮৭৫, মুসলিম ৭৪৩৪নং)

মর্যাদাপূর্ণ কাল বা সময়
রোযা অবস্থার ব্যাপারে মহানবী বলেছেন,
(( إِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمٍ أَحَدِكُمْ ، فَلَا يَرْفُتْ وَلَا يَصْخَبْ ، فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ ، فَلْيَقُلْ : إِنِّي صَائِمٌ )). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"যখন তোমাদের কারো রোযার দিন হবে, সে যেন অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ না করে ও হৈ-হট্টগোল না করে। আর যদি কেউ গালাগালি করে অথবা তার সাথে লড়াই ঝগড়া করে, তাহলে সে যেন বলে যে, 'আমি রোযাদার।" (বুখারী ১৯০৪, মুসলিম ২৭৬২নং)

(( مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ )).
"যখন কোন ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা ও তার উপর আমল করা পরিহার না করল, তখন আল্লাহর কোন দরকার নেই যে, সে তার পানাহার ত্যাগ করুক।" (বুখারী ১৯০৩, ৬০৫৭নং)

যুলকা'দাহ, যুলহাজ্জাহ, মুহারাম ও রজব; নিষিদ্ধ এই চারটি মাসের ব্যাপারে মহান আল্লাহর বিশেষ বিধান রয়েছে। সে ব্যাপারে তিনি বলেছেন,
{إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ} (٣٦) التوبة
"আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন হতেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট নিশ্চয়ই মাসসমূহের সংখ্যা হল বারো মাস। এর মধ্যে চারটি মাস হল নিষিদ্ধ (পবিত্র)। এটাই সরল বিধান। অতএব তোমরা এ মাসগুলোতে নিজেদের প্রতি যুলুম করো না।" (তাওবাহঃ ৩৬)

{يَسْأَلُونَكَ عَنِ الشَّهْرِ الْحَرَامِ قِتَالَ فِيهِ قُلْ قِتَالَ فِيهِ كَبِيرٌ} (۲۱۷) سورة البقرة
"পবিত্র (নিষিদ্ধ) মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে লোকে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে। বল, সে সময় যুদ্ধ করা ভীষণ অন্যায়।" (বাক্বারাহঃ ২১৭)

{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحِلُّوا شَعَائِرَ اللهِ وَلَا الشَّهْرَ الْحَرَامَ وَلَا الْهَدْيَ وَلَا الْقَلَائِدَ وَلَا آمِّينَ الْبَيْتَ الْحَرَامَ يَبْتَغُونَ فَضْلاً مِّن رَّبِّهِمْ وَرِضْوَانًا) (۲) سورة المائدة
"হে বিশ্বাসিগণ! আল্লাহর নিদর্শনের, পবিত্র মাসের, হজ্জে যবেহযোগ্য কুরবানীর পশু, গলদেশে কিছু বেঁধে চিহ্নিত করে কুরবানীর জন্য কা'বায় প্রেরিত পশুর এবং নিজ প্রতিপালকের অনুগ্রহ ও সন্তোষ লাভের আশায় পবিত্র গৃহ- অভিমুখীদের পবিত্রতার অবমাননা করো না।" (মায়িদাহঃ ২)

{فَإِذَا انسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدتُّمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَاحْصُرُوهُمْ وَاقْعُدُوا لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ فَإِن تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ} (5) سورة التوبة
"অতঃপর নিষিদ্ধ মাসগুলি অতিবাহিত হলে অংশীবাদীদেরকে যেখানে পাও হত্যা কর, তাদেরকে বন্দী কর, অবরোধ কর এবং প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের জন্য ওঁৎ পেতে থাক। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, যথাযথ নামায পড়ে ও যাকাত প্রদান করে, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (তাওবাহঃ ৫)

মহানবী এক ভাষণে বললেন, "নিশ্চয় যামানা (কাল) নিজের ঐ অবস্থায় ফিরে এল যেদিন আল্লাহ তাআলা আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। (অর্থাৎ, দুনিয়া সৃষ্টি করার সময় যেরূপ বছর ও মাসগুলো ছিল, এখন পুনর্বার সে পুরাতন অবস্থায় ফিরে এল এবং আরবের মুশরিকরা যে নিজেদের মন মত মাসগুলোকে আগে-পিছে করেছিল তা এখন থেকে শেষ ক'রে দেওয়া হল।) বছরে বারটি মাস; তার মধ্যে চারটি হারাম (সম্মানীয়) মাস। তিনটি পরস্পর: যুল ক্বা'দাহ, যুলহিজ্জাহ ও মুহারাম। আর (চতুর্থ হল) মুযার গোত্রের রজব; যা জুমাদা ও শা'বান এর মধ্যে রয়েছে। এটা কোন মাস?”
সাহাবী বলেন, আমরা বললাম, 'আল্লাহ ও তাঁর রসূল সর্বাধিক জ্ঞাত।' অতঃপর তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। এমনকি আমরা ধারণা করলাম যে, তিনি হয়তো তার নাম ব্যতীত অন্য নাম বলবেন। তিনি বললেন, "এটা যুল-হিজ্জাহ নয় কি?” আমরা বললাম, 'অবশ্যই।' অতঃপর তিনি বললেন, "এটা কোন্ শহর?” আমরা বললাম, 'আল্লাহ ও তাঁর রসূল সর্বাধিক জ্ঞাত।' অতঃপর তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। এমনকি আমরা ধারণা করলাম যে, তিনি হয়তো তার নাম ব্যতীত অন্য নাম বলবেন। তিনি বললেন, "এ শহর (মক্কা) নয় কি?” আমরা বললাম, 'অবশ্যই।' তিনি বললেন, "আজ কোন্ দিন?” আমরা বললাম, 'আল্লাহ ও তাঁর রসূল সর্বাধিক জ্ঞাত।' অতঃপর তিনি চুপ থাকলেন। আমরা ভাবলাম, তিনি হয়তো এর অন্য নাম বলবেন। অতঃপর তিনি বললেন, "এটা কি কুরবানীর দিন নয়?” আমরা বললাম, 'অবশ্যই।' অতঃপর তিনি বললেন, "নিশ্চয় তোমাদের রক্ত, তোমাদের মাল এবং তোমাদের সম্ভ্রম তোমাদের (আপসের মধ্যে) এ রকমই হারাম (ও সম্মানীয়) যেমন তোমাদের এ দিনের সম্মান তোমাদের এ শহরে এবং তোমাদের এ মাসে রয়েছে। শীঘ্রই তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সাথে মিলিত হবে। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তোমাদের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। সুতরাং তোমরা আমার পর এমন কাফের হয়ে যেও না যে, তোমরা এক অপরের গর্দান মারবে। শোনো! উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিতকে (এ সব কথা) পৌঁছে দেয়। কারণ, যাকে পৌঁছাবে সে শ্রোতার চেয়ে অধিক সস্মৃতিধর হতে পারে।” অবশেষে তিনি বললেন, “সতর্ক হয়ে যাও! আমি কি পৌঁছে দিলাম?” আমরা বললাম, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, “হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক।” (বুখারী ৪৪০৬, মুসলিম ৪৪৭৭নং)

হজ্জের মাসগুলির রয়েছে পৃথক মর্যাদা। সুতরাং হজ্জ করতে গিয়ে কৃত পাপ অন্য সময়ে কৃত পাপের মতো একাকার নয়। সে ব্যাপারে সতর্ক ক'রে মহান আল্লাহ বলেছেন,
{الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلَا رَفَتَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَقِّ} (۱۹۷) سورة البقرة
"সুবিদিত মাসে (যথাঃ শওয়াল, যিলক্বদ ও যিলহজ্জে) হজ্জ হয়। সুতরাং যে কেউ এই মাসগুলিতে হজ্জ করার সংকল্প করে, সে যেন হজ্জের সময় স্ত্রী-সহবাস (কোন প্রকার যৌনাচার), পাপ কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে।" (বাক্বারাহঃ ১৯৭)

পাত্র ও ব্যক্তি ভেদে পাপের ভার গুরু থেকে গুরুতর হয়। জনগণ ও জননেতার কৃত পাপ সমান নয়। এই জন্য নিষ্পাপ নবীগণের সামান্য ত্রুটি বিশাল ধরা হয়। সে ক্ষেত্রে মহান প্রতিপালকের কঠিন সতর্কতা আসে। যেমন তিনি শেষ নবী-এর এক ত্রুটির ব্যাপারে বলেছেন,
{وَلَوْلَا أَن تَبَّتْنَاكَ لَقَدْ كِدتَّ تَرْكَنُ إِلَيْهِمْ شَيْئًا قَلِيلاً (٧٤) إِذَا لَأَدْقْنَاكَ ضِعْفَ الْحَيَاةِ وَضِعْفَ الْمَمَاتِ ثُمَّ لَا تَجِدُ لَكَ عَلَيْنَا نَصِيرًا} (٧٥) سورة الإسراء
"আমি তোমাকে অবিচলিত না রাখলে, তুমি তাদের দিকে কিছুটা প্রায় ঝুঁকে পড়তে। তাহলে আমি অবশ্যই তোমাকে ইহজীবনে ও পরজীবনে দ্বিগুণ শাস্তি আস্বাদন করাতাম, আর তখন আমার বিরুদ্ধে তোমার জন্য কোন সাহায্যকারী পেতে না।" (বানী ইস্রাঈল: ৭৫)

নিশ্চয়ই সাধারণ লোকের স্ত্রী ও মাননীয় লোকের স্ত্রী সমান নয়। উম্মতের কোন মহিলা নবীর স্ত্রীদের মতো নয়। বলা বাহুল্য, উভয় শ্রেণীর অপরাধীদের অপরাধ একই শ্রেণীভুক্ত হলেও শাস্তি একই প্রকার নয়। মহান আল্লাহ মহানবী-এর স্ত্রীদেরকে সম্বোধন ক'রে বলেছেন,
{يَا نِسَاءِ النَّبِيِّ مَن يَأْتِ مِنكُنَّ بِفَاحِشَةٍ مُّبَيِّنَةٍ يُضَاعَفْ لَهَا الْعَذَابُ ضِعْفَيْنِ وَكَانَ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرًا (۳۰) وَمَن يَقْنُتْ مِنكُنَّ لِلَّهِ وَرَسُولِهِ وَتَعْمَلْ صَالِحًا نُّؤْتِهَا أَجْرَهَا مَرَّتَيْنِ وَأَعْتَدْنَا لَهَا رِزْقًا كَرِيمًا (۳۱) يَا نِسَاءِ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ} (۳۲)
"হে নবী-পত্নীগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ কোন প্রকাশ্য অশ্লীল কাজ করলে তাকে দ্বিগুণ শাস্তি দেওয়া হবে। আর আল্লাহর জন্য তা সহজ। তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের প্রতি অনুগতা হবে ও সৎকাজ করবে, তাকে আমি দ্বিগুণ পুরস্কার দান করব। আর তার জন্য আমি সম্মানজনক জীবিকা প্রস্তুত রেখেছি। হে নবী-পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মতো নও।" (আহযাবঃ ৩০-৩২)

অনুরূপ জাহেল ও আলেমের পাপ সমান নয়। নিশ্চয় জ্ঞানপাপীর অপরাধ বেশি। অনেক ক্ষেত্রে না জেনে অপরাধ করলে না জানার ফলে অপরাধীকে শাস্তি থেকে রেহাই দেওয়া হয়। কিন্তু জ্ঞানপাপীকে রেহাই দেওয়া হবে না। ভাইয়ের অবাধ্যাচরণ ও স্বামীর অবাধ্যাচরণ একাকার নয়। প্রজার কথা অমান্য করা ও রাজার কথা অমান্য করা এক সমান নয়। ব্যক্তি অনুসারে পাপের ভার বাড়তে থাকে।

মহানবী বলেছেন, إِنَّ كَذِبًا عَلَى لَيْسَ كَكَذِبٍ عَلَى أَحَدٍ فَمَنْ كَذَبَ عَلَى مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ». "নিশ্চয় আমার নামে মিথ্যা বলা অন্য কারো নামে মিথ্যা বলার মতো নয়। সুতরাং যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত আমার নামে মিথ্যা বলে, সে যেন নিজের বাসস্থান জাহান্নামে করে নেয়।" (বুখারী ১২৯১, মুসলিম ৫-৬নং)

মিকুদাদ বিন আসওয়াদ বলেন, একদা মহানবী সাহাবাগণের উদ্দেশ্যে বললেন, "তোমরা ব্যভিচার সম্বন্ধে কী বল?" সকলে বললেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রসূল হারাম করেছেন, অতএব তা হারাম।' তিনি বললেন, لَأَنْ يَزْنِيَ الرَّجُلُ بِعَشْرَةِ نِسْوَةٍ أَيْسَرُ عَلَيْهِ مِنْ أَنْ يَزْنِي بِامْرَأَةِ جَارِهِ. "প্রতিবেশীর নয় এমন ১০টি মহিলার সাথে ব্যভিচার করার চাইতে প্রতিবেশীর ১টি মহিলার সাথে ব্যভিচার অধিকতর নিকৃষ্ট।” অতঃপর বললেন, "তোমরা চুরি সম্বন্ধে কী বল?" সকলে বললেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রসূল হারাম করেছেন, অতএব তা হারাম।' তিনি বললেন, لَأَنْ يَسْرِقَ الرَّجُلُ مِنْ عَشْرَةِ أَبْيَاتٍ أَيْسَرُ عَلَيْهِ مِنْ أَنْ يَسْرِقَ مِنْ جَارِهِ). "প্রতিবেশীর নয় এমন ১০টি বাড়িতে চুরি করার চাইতে প্রতিবেশীর ১টি বাড়িতে চুরি করা অধিকতর নিকৃষ্ট।" (আহমাদ ২৩৮৫৪, বুখারীর আদাব ১০৩, ত্বাবারানী ১৬৯৯৩, সহীহুল জামে ৫০৪৩নং)

স্থান-কাল-পাত্র ভেদে পাপ বর্ধনের বিষয়টি কিন্তু পরিমাণের সাথে সম্পৃক্ত, সংখ্যার সাথে নয়। অর্থাৎ, পাপটি পরিমাণে বেশি বা বড় ধরনের হয়, সংখ্যায় একাধিক হয় না। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
مَن جَاء بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا وَمَن جَاء بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَى إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ} (١٦٠) سورة الأنعام
"কেউ সৎকাজ করলে, সে তার দশগুণ (প্রতিদান) পাবে এবং কেউ অসৎকাজ করলে, তাকে শুধু তার সমপরিমাণ প্রতিফলই দেওয়া হবে। আর তারা অত্যাচারিত হবে না।" (আনআমঃ ১৬০)

বলা বাহুল্য, কেউ মক্কা বা রমযানে একটি পাপকাজ করলে অথবা কোন বড় ব্যক্তিত্ব একটি পাপকাজ করলে, তা সংখ্যায় একটিই থাকে। কিন্তু আকার ও পরিমাণে তা হয় অনেক বড়। আর এ হল মানুষের প্রতি মহান করুণাময়ের অসীম করুণা।
সুতরাং মক্কার পাপ জিদ্দার পাপ অপেক্ষা অনেক বড়। রমযান ও যুলহজ্জের প্রথম দশ দিনে কৃত পাপ বছরের অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেক বিশাল। আলেমের পাপ জাহেলের পাপের তুলনায় অনেক বেশি। আর তা সংখায় নয়, বরং পরিমাণে ও আকার-প্রকারে।
পক্ষান্তরে মর্যাদাপূর্ণ স্থান ও কালের পুণ্য মহান আল্লাহর অনুগ্রহে বর্ধিত হয়, পরিমাণে ও সংখ্যায় উভয় ভাবে। ফালিল্লাহিল হামদ।

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 নগণ্য পাপ

📄 নগণ্য পাপ


অনেক এমন পাপ আছে, যাকে পাপী নগণ্য ভাবে, এমন অনেক অপরাধ আছে, যাকে অনেক মানুষই তুচ্ছজ্ঞান করে। হয়তো-বা তা আপতদৃষ্টিতে 'ছোট পাপ'ই। কিন্তু তার পরিণাম আদৌ ছোট নয়। অনেকে তা 'ছোট' জ্ঞান করেই পরোয়া করে না অথবা ভাবে যে, পুণ্যকাজ দ্বারা তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধৌত হয়ে যাবে, তাই কোন গুরুত্ব দেয় না। অথচ তার অজ্ঞাতসারে সেই নগণ্য অপরাধটি তাকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়ে খাড়া করে, যার কথা সে মনেও কল্পনা করেনি।

প্রিয় নবী সে ব্যাপারেও আমাদেরকে সতর্ক করেছেন। একদা তিনি আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) কে বলেছেন,
((يَا عَائِشَةُ إِيَّاكِ وَمُحَقِّرَاتِ الذُّنُوبِ فَإِنَّ لَهَا مِنْ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ طَالِبًا)).
"হে আয়েশা! তুমি ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র তুচ্ছ পাপ হতেও সাবধান থেকো। কারণ আল্লাহর তরফ হতে তাও (লিপিবদ্ধ করার জন্য ফিরিশ্তা) নিযুক্ত আছেন।" (আহমাদ ২৪৪১৫, ইবনে মাজাহ ৪২৪৩, ইবনে হিব্বান, সিলসিলাহ সহীহাহ ৫১৩, ২৭৩ ১নং)

অনেক সময় মানুষ 'ছোট' ধারণা ক'রে পাপ করে এবং তার অন্যান্য ইবাদতের ফলে তা মোচন হয়ে যাবে ভেবে বারবার তা করতে থাকে। কিন্তু কাবীরা গোনাহ থেকে বিরত না হওয়ার কারণে তার সে পাপ জমা হতে থাকে এবং পরিশেষে তা তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। মহানবী বলেন, ((إِيَّاكُمْ وَمُحَقَّرَاتِ الذُّنُوبِ ، فَإِنَّمَا مَثَلُ مُحَقَّرَاتِ الذُّنُوبِ كَمَثَلِ قَوْمٍ نَزَلُوا بَطْنَ وَادٍ، فَجَاءَ ذَا بِعُودٍ، وَجَاءَ ذَا بِعُودٍ، حَتَّى حَمَلُوا مَا أَنْضَجُوا بِهِ خُبْزَهُمْ، وَإِنَّ مُحَقَّرَاتِ الذُّنُوبِ مَتَى يَأْخُذُ بِهَا صَاحِبُهَا تُهْلِكُهُ)).
"তোমরা ছোট ছোট তুচ্ছ পাপ থেকেও দূরে থেকো। কেননা, ছোট ও তুচ্ছ গোনাহসমূহের উপমা হল এরূপ, যেরূপ একদল লোক (সফরে গিয়ে) এক উপত্যকার মাঝে (বিশ্রাম নিতে) নামল। অতঃপর এ একটা কাঠ, ও একটা কাঠ এনে জমা করল। এভাবে অবশেষে তারা এত কাঠ জমা করল, যদ্বারা তারা তাদের রুটি পাকিয়ে নিতে পারল। আর ছোট ছোট তুচ্ছ পাপের পাপীকে যখন পাকড়াও করা হবে, তখন তা তাকে ধ্বংস ক'রে ছাড়বে।" (আহমাদ ২২৮০৮, ত্বাবারানী ৫৭৩৯, বাইহাকীর শুআবুল ইমান, সহীহুল জামে' ২৬৮-৬নং)

ছোট-ছোট পাপকেও সাহাবাগণ ভয় করতেন। আনাস বলেন, إِنَّكُمْ لَتَعْمَلُونَ أَعْمَالًا هِيَ أَدَقُّ فِي أَعْيُنِكُمْ مِنْ الشَّعَرِ إِنْ كُنَّا لَنَعُدُّهَا عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ الْمُوبِقَاتِ.
"তোমরা এমন কতকগুলো কাজ করছ যা তোমাদের দৃষ্টিতে চুল হতেও তুচ্ছ। কিন্তু আল্লাহর রসূল -এর যুগে ঐ কাজগুলোকেই আমরা সর্বনাশী কার্যসমূহের শ্রেণীভুক্ত মনে করতাম।" (বুখারী ৬৪৯২নং)

সুতরাং নগণ্য বিষয়কেও তুচ্ছজ্ঞান করা উচিত নয়। কারণ সেই তুচ্ছজ্ঞান থেকেই সৃষ্টি হতে পারে মহা বিপদ। ছোটকে 'নগণ্য' ভাবার মনোভাবই হয়ে যেতে পারে 'বড়' পাপ।
ইবনুল কাইয়্যেম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এখানে একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য এই যে, মহাপাপের ব্যাপারে কখনো কখনো লজ্জাশীলতা, ভয় অথবা তা 'মহা' বলে অনুভব তাকে লঘুপাপের শ্রেণীতে মিলিত করতে পারে। আবার কখনো লঘুপাপের ব্যাপারে লজ্জাহীনতা, পরোয়াহীনতা, ভয়শূন্যতা অথবা অবজ্ঞা তাকে মহাপাপের মানে পৌঁছে দিতে পারে। বরং তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত করে।' (মাদারিজুস সালেকীন ১/৩২৮)
যেহেতু এখানে শুধু পাপকার্য নয়, কার্যের সাথে জড়িত থাকে মনের অতিরিক্ত কার্য। আর তাই সেই পাপকার্যকে 'মহা' ক'রে তোলে।

ফুযাইল বিন ইয়ায বলেছেন, 'পাপ যে পরিমাণে তোমার নিকট ছোট হবে, সেই পরিমাণে তা আল্লাহর নিকট বড় হবে এবং যে পরিমাণে তোমার নিকট বড় হবে, সেই পরিমাণে তা আল্লাহর নিকট ছোট হবে।'
আবু আইয়ুব আনসারী বলেছেন, 'মানুষ সৎকাজ করে এবং সে তার উপর নির্ভর ক'রে বসে। আর সেই সাথে নগণ্য অপরাধগুলিকে ভুলে যায়। ফলে সে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করে, যখন তার সেই নগণ্য পাপসমূহ তাকে পরিবেষ্টন ক'রে রাখে। পক্ষান্তরে আর এক মানুষ পাপকাজ করে। কিন্তু সে তার ব্যাপারে সদা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে। পরিশেষে সে নিরাপদে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করে।' (ফাতহুল বারী ১৮/৩২৬)

এই শ্রেণীর মানুষের জন্য মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَلَوْ أَنَّ لِلَّذِينَ ظَلَمُوا مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا وَمِثْلَهُ مَعَهُ لَافْتَدَوْا بِهِ مِن سُوءِ الْعَذَابِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَبَدَا لَهُم مِّنَ اللَّهِ مَا لَمْ يَكُونُوا يَحْتَسِبُونَ (٤٧) وَبَدَا لَهُمْ سَيِّئَاتُ مَا كَسَبُوا وَحَاقَ بهِم مَّا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ} (٤٨) سورة الزمر
"যারা সীমালংঘন করেছে; যদি তাদের পৃথিবীর সমস্ত কিছু এবং তার সাথে সমপরিমাণ আরও কিছু থাকত, তাহলে কিয়ামতের দিন নিকৃষ্ট শাস্তি হতে মুক্তির জন্য পণ স্বরূপ তা প্রদান করত। তাদের সামনে আল্লাহর নিকট হতে এমন কিছু প্রকাশ হবে, যা ওরা কল্পনাও করেনি। ওদের কৃতকর্মের মন্দ ফল ওদের নিকট প্রকাশ হয়ে পড়বে এবং ওরা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত তা ওদেরকে পরিবেষ্টন করবে। (যুমার: ৪৭-৪৮)

পরিষ্কার যে, নগণ্য পাপকে 'নগণ্য' ধারণা করার দুটো দিক রয়েছে:-
এক: নগণ্য ভেবে লাগাতার ক'রে যাওয়া।
দুইঃ বেপরোয়া হয়ে তুচ্ছজ্ঞান করা।
দুটো দিকেই থাকতে পারে ভয়ঙ্কর পরিণতি। আমরা একটা উদাহরণ নিয়ে বিষয়টিকে আরো পরিষ্কার করতে পারি।
অবৈধ রমণীর প্রতি সকাম দৃষ্টিপাত। বাহ্যতঃ তা একটি ছোট পাপ। কিন্তু তার পরিণাম উক্ত দুই পদ্ধতিতে ভয়ানক হতে পারে।
চক্ষু এমন এক অঙ্গ, যার দ্বারা বিপত্তির সূচনা হয়। চোখাচোখি থেকে শুরু হয়, কিন্তু শেষ হয় গলাগলিতে। এই ছোট্ট অঙ্গার টুকরা থেকেই সূত্রপাত হয় সর্বগ্রাসী বড় অগ্নিকান্ডের। আরবী কবি বলেছেন,
كل الحوادث مبدأها من النظر ... ومعظم النار من مستصغر الشرر
كم نظرة فتكت في قلب صاحبها ... فتك السهام بلا قوس ولا وتر
والمرء ما دام ذا عين يقلبها ... في أعين الغيد موقوف على الخطر
يسر مقلته ما ضر مهجته ... لا مرحباً بسرور عاد بالضرر

অর্থাৎ, সমস্ত (যৌন) দুর্ঘটনার সূত্রপাত দৃষ্টি থেকেই হয়। অধিকাংশ অগ্নিকান্ড ঘটে ছোট্ট অঙ্গার থেকেই।
কত দৃষ্টি তার কর্তার হৃদয়কে ধ্বংস করেছে, ধনুক ও তারহীন তীরের মতো।
চোখ-ওয়ালা মানুষ যতক্ষণ কামিনীদের চোখে চোখ রেখে বারবার দৃষ্টিপাত করে, ততক্ষণ সে বিপদের উপর দন্ডায়মান থাকে।
যে জিনিস তার আত্মার জন্য ক্ষতিকর, তাই দিয়ে নিজের চক্ষুকে খোশ করে। অথচ সেই খুশীকে কোন স্বাগতম নয়, যার পরিণাম হল ক্ষতি।
দৃষ্টিতে যে বিপত্তি সৃষ্টি হয়, তার বিভিন্ন পর্যায় বর্ণনা ক'রে আরবী কবি বলেছেন,
نظرة فابتسامة فسلام ... فكلام فموعد فلقاء
অর্থাৎ, প্রথমে দৃষ্টি, তারপর মুচকি হাসি, তারপর সালাম। তারপর বাক্যালাপ, তারপর সাক্ষাতের ওয়াদা, তারপর মিলন (ব্যভিচার)।

ক্ষুদ্র অপরাধকে কখনোই ক্ষুদ্রজ্ঞান করা উচিত নয়। কারণ চুল ক্ষুদ্র হলেও তা চোখে পড়লে পাহাড়তুল্য হয়।
বিছার কামড়ে সাপ মারা যায়! ক্ষুদ্র হুদহুদ বিলকীস রানীর সিংহাসন ধ্বংস করেছে। ছোট্ট ইঁদুর কত শত গ্রাম-শহর ভাসাতে পারে বন্যা এনে। বটের বীজ পাখীর বিষ্ঠার সাথে বের হয়ে বিশাল বৃক্ষ সৃষ্টি করে। ছোট ছোট ইট দিয়ে বিরাট অট্টালিকা তৈরী হয়। একটি ছোট্ট ছিদ্র মস্তবড় জাহাজকে ডুবিয়ে দিতে পারে। 'প্রত্যেক সামান্য ত্রুটি, ক্ষুদ্র অপরাধ, ক্রমে টানে পাপ পথে, ঘটায় প্রমাদ।'
একটুখানি ভুল, পাপ বা অপরাধকেও প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। কারণ, 'একটু খানি ভুলের তরে অনেক বিপদ ঘটে, ভুল করেছে যারা সবাই ভুক্তভোগী বটে। একটু খানি বিষের ছোঁয়া মরণ ডেকে আনে, এই দুনিয়ায় ভুক্তভোগী সকল মানুষ জানে।'

পরিশেষে বলি, পাপ যত নগণ্যই হোক, তবুও তা পাপ। অবাধ্যাচরণ যতই ছোট হোক, তবুও তা অবাধ্যাচরণ, মহান প্রতিপালকের অবাধ্যাচরণ। কেবল অবাধ্যাচরণ 'ছোট' দেখলেই হয় না, যার অবাধ্যাচরণ করা হয়, তার 'বড়ত্ব' দেখা প্রয়োজন।
বিলাল বিন সা'দ বলেছেন, 'তুমি যে পাপ করছ, তার ক্ষুদ্রতা দেখো না। বরং যার অবাধ্যতা করে পাপ করছ, তার বিশালতা দেখ!'

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 মুত্তাকী ও ফাসেক এর অবাধ্যচারণের মাঝে পার্থক্য

📄 মুত্তাকী ও ফাসেক এর অবাধ্যচারণের মাঝে পার্থক্য


খাঁটি মু'মিন মহান প্রতিপালকের অবাধ্যাচরণ করতে পারে না। অবশ্য তার দ্বারা অবাধ্যাচরণ ঘটে যেতে পারে, অতঃপর সে সাথে সাথে তওবা করে। পক্ষান্তরে ফাসেক তাঁর অবাধ্যাচরণ করে এবং তওবা করতে গয়ংগচ্ছ করে।
পাপ সংঘটন করার ক্ষেত্রে শয়তান কোন ত্রুটি করে না। প্রত্যেক মানুষের পশ্চাতে শয়তান আছে, যে তাকে পাপে লিপ্ত করতে নিরলস প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু তাতে মুত্তাকী ও ফাসেকের মাঝে পার্থক্য আছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِنْ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُمْ مُبْصِرُونَ (۲۰۱) وَإِخْوَانُهُمْ يَمُدُّونَهُمْ فِي الغَيِّ ثُمَّ لَا يُقْصِرُونَ} (۲۰۲) الأعراف
"নিশ্চয়ই যারা সাবধান হয়, যখন শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দেয়, তখন তারা আত্মসচেতন হয় এবং তৎক্ষণাৎ তাদের চক্ষু খুলে যায়। আর যারা শয়তানের ভাই শয়তানরা তাদেরকে ভ্রান্তির দিকে টেনে নেয় এবং এ বিষয়ে তারা কোন ত্রুটি করে না। (আ'রাফঃ ২০১-২০২)

মুত্তাকী যখন কোন অপরাধ ক'রে ফেলে, তখন আল্লাহর শরণাপন্ন হয়। নিজের উপরে অপরাধের বোঝাকে খুব ভারী মনে করে এবং বিবেকের দংশনে তার প্রায়শ্চিত্ত করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَن يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ} (١٣٥) سورة آل عمران
"যারা কোন অশ্লীল কাজ ক'রে ফেললে অথবা নিজেদের প্রতি যুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কে পাপ ক্ষমা করতে পারে? এবং তারা যা (অপরাধ) ক'রে ফেলে, তাতে জেনে-শুনে অটল থাকে না।" (আলে ইমরানঃ ১৩৫)

কৃত গোনাহর জন্য চিন্তিত থাকে। ফলে সে অপরাধ আর দ্বিতীয়বার করে না। পক্ষান্তরে ফাসেকের আচরণ হয় এর বিপরীত।
মুত্তাকী পাপ ক'রে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়। পক্ষান্তরে ফাসেক পাপ ক'রে আনন্দিত হয়।
মুত্তাকী পাপ ক'রে নিজেকে গোপন করে। পক্ষান্তরে ফাসেক পাপ ক'রে প্রচার ক'রে বেড়ায়।
মুত্তাকী পাপ ক'রে লাঞ্ছিত ও অনুতপ্ত হয়। পক্ষান্তরে ফাসেক পাপ ক'রে গর্ব ক'রে বেড়ায়।
মুত্তাকী দ্বারা পাপ ঘটে যায় গোপনে। পক্ষান্তরে ফাসেক প্রকাশ্যে লোকালয়ে পাপ ঘটায়। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ উভয় অপরাধীর অবস্থা বর্ণনা ক'রে বলেছেন, إِنَّ الْمُؤْمِنَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَأَنَّهُ قَاعِدٌ تَحْتَ جَبَل يَخَافُ أَنْ يَقَعَ عَلَيْهِ وَإِنَّ الْفَاجِرَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَذُّبَابٍ مَرَّ عَلَى أَنْفِهِ فَقَالَ بِهِ هَكَذَا.
অর্থাৎ, মু'মিন তার পাপসমূহকে এমন দেখে, যেন সে কোন পাহাড়ের নিচে বসে আছে, যা তার উপর ভেঙ্গে পড়বে বলে আশঙ্কা করে। পক্ষান্তরে ফাজের তার পাপসমূহকে নিজ নাকের উপর বসা মাছির মতো দেখে, যাকে সে হাত দিয়ে এইভাবে তাড়িয়ে দেয়। (বুখারী ৬৩০৮-নং)

পাপ করার সময়ে মুত্তাকীর মনে পাপবোধ থাকে। কিন্তু ফাসেক তাকে পাপই মনে করে না। যার ফলে মুত্তাকী তওবার তওফীক লাভ করে। কিন্তু ফাসেক অদম্য মনে পাপ ও অপরাধ করেই চলে।
বহু অপরাধ এমন আছে, লোকে যাকে ছোট ভাবে, নগণ্য ও স্বাভাবিক ভাবে। তার মধ্যে একটি অপরাধ হল মানুষের চরিত্র নিয়ে কথা বলা। সামান্য সন্দেহে অথবা ধারণা বশে অপরের চরিত্রে অপবাদ দিতে অথবা পরচর্চা করতে মানুষ ভয় পায় না। এ যেন সামান্য ব্যাপার। এ যেন পাপাচরণ নয়। তাই যেখানেই দুজন মানুষ থাকে, প্রায় সেখানেই তৃতীয় জনের চর্চা হয়। মাঠে-ঘাটে, ক্লাবে-মজলিসে, চায়ের দোকানে, আড্ডাখানায়, এমনকি মাদ্রাসায়-মসজিদেও এই শ্রেণীর পাপকে লঘুপাক খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা হয়।
পরের চরিত্রে না জেনে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কথা বলার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, {إِذْ تَلَقَّوْنَهُ بِأَلْسِنَتِكُمْ وَتَقُولُونَ بِأَفْوَاهِكُم مَّا لَيْسَ لَكُم بِهِ عِلْمٌ وَتَحْسَبُونَهُ هَيِّنًا وَهُوَ عِندَ اللَّهِ عَظِيمٌ} (١٥) سورة النور "যখন তোমরা মুখে মুখে এ (কথা) প্রচার করছিলে এবং এমন বিষয় মুখে উচ্চারণ করছিলে, যার কোন জ্ঞান তোমাদের ছিল না এবং তোমরা একে তুচ্ছ গণ্য করেছিলে; যদিও আল্লাহর দৃষ্টিতে এ ছিল গুরুতর বিষয়।" (নূর : ১৫)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00