📄 অবতরণিকা
بسم الله الرحمن الرحيم
অবতরণিকা
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على أشرف المرسلين نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين، وبعد:
পাপে-তাপে ভরা এই বসুন্ধরার পাপী মানুষদের নানা পাপ, তার শাস্তি এবং পাপমুক্তি বা তার শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় নিয়ে প্রত্যেকের পৃথক পৃথক ভাবনা। পাপ থেকে বাঁচা বড় কঠিন, তাই মুক্তির কথা সকলের আলোচ্য। সুমহান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে পাপের প্রকৃতি দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। তাই তিনি তা হতে মুক্তির উপায়ও বাতলে দিয়েছেন। পাপের শাস্তির কথা ঘোষণা করেছেন। প্রদর্শন করেছেন শাস্তি হতে নিষ্কৃতির পথও। যাতে মানুষ পাপ-পঙ্কিল পথে পা না বাড়ায়। পা পিছলে পড়ে গেলে যেন উঠে দাঁড়ায় এবং নিজেকে ধৌত ক'রে পরিচ্ছন্ন ক'রে নেয়। সে যেন ক্ষমাপ্রাপ্তির ব্যাপারে নিরাশ না হয়। সে যেন সুমহান প্রভুর কাছে অপরাধ স্বীকার ক'রে ক্ষমাপ্রার্থী হয়।
ইসলামের বিধানে এমন নেই যে, মুসলিমদের মহাপুরুষ সকল পাপভার বহন ক'রে নেবেন, ফলে তারা যা খুশী তাই করতে পারে। অথবা এমন নয় যে, কোন পানিতে গোসল করলে সব পাপ ধুয়ে-মুছে যাবে। ইসলামে আছে পাপ মাফ করাবার নানা বিধান।
তাই জানতে ও জানাতে আমার এই পুস্তকের অবতারণা। মহান আল্লাহ আমাদেরকে পাপ না করার ধৈর্য দান করুন, পাপ থেকে পবিত্র হওয়ার তওফীক দান করুন এবং তিনি নিজ গুণে আমাদেরকে পাপের শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি দান করুন। আমীন।
বিনীত----
আব্দুল হামীদ আল-ফাইযী আল-মাদানী
আল-মাজমাআহ, সউদী আরব
৯/২/১৪৩৭হিঃ
২১/১১/২০১৫খ্রিঃ
📄 পাপ কী?
পাপঃ মহান প্রতিপালকের নিয়ম লংঘন করলে যা হয়।
পাতক: অধর্ম করলে যা হয়।
প্রত্যেক অপকর্ম, হানিকর কর্ম, অনিষ্টকর কর্ম, ক্ষতিকর কর্ম: যাতে মানবের পঞ্চপ্রয়োজনীয় জিনিস (অর্থাৎ, ঈমান, প্রাণ, জ্ঞান, মান ও ধন) এর বিশেষ হানি, অনিষ্ট বা ক্ষতি হয়, তাই প্রত্যবায়।
যে কর্ম (গুপ্ত বা প্রকাশ্য কথা বা কাজ) 'সু' বা শোভনীয় নয়, তাই দুষ্কৃত, দুষ্কর্ম, কুকর্ম, দুষ্কার্য।
যে কাজ সৎ নয়, তাই অসৎকার্য।
যে আচার 'সু' বা সুন্দর নয়, তাই দুরাচার।
যে কাজ ঘৃণ্য ও নিন্দনীয়, তাই নিন্দিতকর্ম।
যে কর্ম ভালো নয়, তাই মন্দকর্ম। মানুষের কাছে নয়, মানুষের সৃষ্টিকর্তার কাছে যা নিন্দনীয়, তাই পাপকর্ম।
কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশের বিপরীত কিছু করলে গোনাহ হয়।
মানুষের গোনাহ-খাত্মা হয় শরীয়তের অন্যথাচরণ, অন্যথাকরণ, অবাধ্যাচরণ, বিরুদ্ধাচরণ বা অমান্যকরণ করলে।
অপরাধ: দন্ডনীয় কার্য, নিয়মলংঘন, আইনের বিরুদ্ধাচরণ।
পাপাচরণ: পাপকর্মের অনুষ্ঠান, দুষ্কার্যকরণ, পাপের আচরণ, ধর্মবিগর্হিত আচরণ।
যে কাজ করলে মানুষ শাস্তিযোগ্য হয়, তাকেই পাপ বলা হয়।
শরীয়ত ও সুস্থ প্রকৃতি মতে যা বর্জন করা আবশ্যক, তা সম্পাদন করার নাম পাপ।
শরীয়তে যে কাজের শাস্তি ইহকালে ও পরকালে নির্ধারিত হয়েছে, তা করাই পাপ।
যে কাজ মহান প্রতিপালক করতে নিষেধ করেছেন, তা করা এবং যা করতে আদেশ করেছেন, তা না করাই অপরাধ ও পাপ।
যে কাজ করার ফলে জাহান্নাম যেতে হবে অথবা আল্লাহর গযব ও শাস্তি নেমে আসে অথবা তাঁর অভিশাপ আসে অথবা তাঁর রসূল ﷺ বা মানুষে অভিশাপ দেয়, তাই গোনাহর কাজ।
যে কাজ সমাজবিরোধী অথবা দ্বীনবিরোধী, সে কাজ করাই অপরাধ ও পাপ।
শরীয়তে যা হারাম, তা করলেই পাপ ও গোনাহ হয়।
প্রত্যেক সেই কাজ, যা শালীনতা, ভদ্রতা ও সচ্চরিত্রতার বিপরীত, তাই পাপকাজ।
কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট উক্তিতে যে কাজের উপর শাস্তির হুমকি বা ধমক দেওয়া হয়েছে, সে কাজই পাপকাজ।
যে কাজ করার ফলে কাফফারা দিতে হয় অথবা প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়, সে কাজ পাপকাজ।
প্রতিপালকের আদেশ-নিষেধের বৈপরীত্য করার নাম পাপাচরণ। স্বেচ্ছায় অবাধ্যাচরণ করা অপরাধ ও পাপ। শরীয়তবিরোধী কিছু করার নামই হল পাপ।
যে কাজ করলে বা যে কথা বললে মানুষকে তার প্রতিপালক থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, সে কাজই পাপকাজ।
যে মানুষ জানে, এ কাজ পাপকাজ, অতঃপর জেনেশুনে কোন প্রলোভনে, স্বার্থে বা তৃপ্তিলাভের মানসে তা স্বেচ্ছায় করে, সে মানুষ পাপী।
এমন এক কাজ, যে কাজ করতে মনে সন্দেহ হয়, যে কাজ করতে পাপবোধ হয়, যে কাজ করতে গোপনীয়তা অবলম্বন করতে মন চায়, করা উচিত হচ্ছে না ভেবে মনে খটকা দেয়, সেই কাজ পাপকাজ।
মহানবী বলেছেন,
البر حُسْنُ الخلق، وَالإِثْمُ : مَا حَاكَ فِي نَفْسِكَ ، وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ)).
"পুণ্যবত্তা হল সচ্চরিত্রতার নাম এবং পাপ হল তাই, যা তোমার অন্তরে সন্দেহ সৃষ্টি করে এবং তা লোকে জেনে ফেলুক---এ কথা তুমি অপছন্দ কর।" (মুসলিম ৬৬৮-০-৬৬৮- ১নং)
এমনকি সন্দেহ জাগার পর কোন মুফতীকে জিজ্ঞাসা ক'রে জানা গেল, তা করা বৈধ। কিন্তু তার পরেও সে কাজ করতে মনে সায় দেয় না। সে কাজ করলে বিবেকে কামড় দেয়। সে কাজ ক'রে মনে শান্তি পায় না, বরং তাতে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়, সে কাজ পাপ কাজ।
ওয়াবেস্নাহ ইবনে মা'বাদ বলেন, আমি আল্লাহর রসূল -এর নিকট এলাম। অতঃপর তিনি বললেন, "তুমি পুণ্যের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে এসেছ?" আমি বললাম, 'জী হ্যাঁ।' তিনি বললেন,
(( اسْتَفْتِ قَلْبَكَ ، البَرُّ : مَا اطْمَأَنَّت إِلَيْهِ النَّفْسُ ، وَاطْمَأَنَّ إِلَيْهِ القَلْبُ ، وَالإِثْمُ : مَا حَاكَ فِي النَّفْسِ ، وَتَرَدَّدَ فِي الصَّدْرِ ، وَإِنْ أَفْتَاكَ النَّاسُ وَأَفْتَوكَ )).
"তুমি তোমার অন্তরকে (ফতোয়া) জিজ্ঞাসা কর। পুণ্য হল তা, যার প্রতি তোমার মন প্রশান্ত হয় এবং অন্তর পরিতৃপ্ত হয়। আর পাপ হল তা, যা মনে খটকা সৃষ্টি করে এবং অন্তর সন্দিহান হয়; যদিও লোকেরা তোমাকে (তার বৈধ হওয়ার) ফতোয়া দিয়ে থাকে।" (আহমাদ ১৮০০১, ১৮০০৬, দারেমী ২৫৩৩নং)
যে কাজে দোষ, ত্রুটি, কসুর বা ঘাট হয়, তাই পাপ। যে কাজে চরিত্রে কলঙ্ক, কলুষ বা কালিমা আসে, তাই পাপকাজ। যে কাজ করলে ভুল, ভ্রম বা ভ্রষ্টতা হয়, তাই পাপকাজ। অবশ্য অনিচ্ছাকৃত ভুল, বিচ্যুতি বা পদস্খলন ধর্তব্য নয়। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
{لَا يُؤَاخِدُكُمُ اللهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا كَسَبَتْ قُلُوبُكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ حَلِيمٌ} (٢٢٥) سورة البقرة
"তোমাদের অর্থহীন শপথের জন্য আল্লাহ তোমাদেরকে দায়ী করবেন না। কিন্তু তিনি তোমাদের অন্তরের সংকল্পের জন্য দায়ী করবেন। আর আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, বড় সহিষ্ণু।" (বাক্বারাহঃ ২২৫)
{لَا يُؤَاخِدُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا عَقَدتُمُ الْأَيْمَانَ} (۸۹)
"আল্লাহ তোমাদেরকে দায়ী করবেন না তোমাদের নিরর্থক শপথের জন্য, কিন্তু যে সব শপথ তোমরা ইচ্ছাকৃতভাবে কর, সেই সকলের জন্য তিনি তোমাদেরকে দায়ী করবেন।" (মায়িদাহঃ ৮৯)
অনেক ভুল এমন আছে, যা ঘটে গেলে কোন পাপ হয় না। অনেক ভুল এমনও আছে, তা করে বসলে একটা সওয়াব হয়, কোন পাপ তো হয়ই না। এ ব্যাপারে মহানবী বলেছেন,
إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ. وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَلَهُ أجر».
"বিচারক যদি সুবিচারের প্রয়াস রেখে বিচার করে অতঃপর তা সঠিক হয়, তবে তার জন্য রয়েছে দুটি সওয়াব। আর সুবিচারের প্রয়াস রেখে যদি বিচারে ভুল করেও বসে, তবে তার জন্যও রয়েছে একটি সওয়াব।" (বুখারী ৭৩৫২, মুসলিম ৪৫৮৪নং)
ভুল ক'রে কোন বেঠিক কাজ করলে মহান প্রতিপালকের অধিকার ক্ষমার্হ হয়, কিন্তু মানুষের অধিকার ক্ষমার্হ হয় না। ভুল ক'রে পরীক্ষায় সঠিকটা না লিখে বেঠিক উত্তর লিখলে কোন পরিক্ষকই পরীক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ করেন না।
ভুল ক'রে মানুষ হত্যা করলে পাপ হয় না ঠিকই, কিন্তু ভুলের মাসূল অবশ্যই গুনতে হয়। খুনের বদলে খুনীকে খুন করা হয় না ঠিকই, কিন্তু রক্তপণ অবশ্যই আদায় করতে হয়। যেমন শিকার করতে গিয়ে হরিণ মারতে গিয়ে মানুষ মেরে বসল, যোদ্ধা ধারণা ক'রে নিরপরাধ কোন অসামরিক লোক হত্যা ক'রে বসল, গাড়ির সামনে কেউ এসে পড়লে তাকে চাপা দিয়ে মেরে ফেলল, ঘুমের ঘোরে মা কচি শিশুকে নিজ দেহ চাপা দিয়ে মেরে ফেলল, এ সকল ক্ষেত্রে পাপ না হলেও খুনী বেকসুর খালাস পাবে না। মহান আল্লাহ তার বিধান দিয়ে বলেছেন,
{وَمَا كَانَ لِمُؤْمِن أَن يَقْتُلَ مُؤْمِنًا إِلَّا خَطَئًا وَمَن قَتَلَ مُؤْمِنًا خَطَئًا فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ وَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ إِلَّا أَن يَصَّدَّقُوا فَإِن كَانَ مِن قَوْمٍ عَدُوٌّ لَّكُمْ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ وَإِن كَانَ مِن قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ مِّيثَاقٌ فَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ وَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةً فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ تَوْبَةً مِّنَ اللَّهِ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا}
"কোন বিশ্বাসীকে হত্যা করা কোন বিশ্বাসীর জন্য সংগত নয়, তবে ভুলবশতঃ হত্যা ক'রে ফেললে সে কথা স্বতন্ত্র। কেউ কোন বিশ্বাসীকে ভুলবশতঃ হত্যা করলে এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা এবং তার (নিহতের) পরিজনবর্গকে রক্তপণ অর্পণ করা বিধেয়। তবে যদি তারা ক্ষমা ক'রে দেয়, তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু যদি সে তোমাদের শত্রু পক্ষের লোক হয় এবং বিশ্বাসী হয়, তবে এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা বিধেয়। আর যদি সে এমন এক সম্প্রদায়ভুক্ত হয়, যার সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ, তবে তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ অর্পণ এবং এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা বিধেয়। কেউ যদি (উক্ত দাস) না পায় (বা মুক্ত করার সামর্থ্য না রাখে), তাহলে সে একাদিক্রমে দু'মাস রোযা রাখবে। তওবার (সংশোধনের) জন্য এ আল্লাহর বিধান। বস্তুতঃ আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।" (নিসাঃ ৯২)
এ বিধান এ কথার প্রমাণ যে, মানুষ হত্যা মহাপাপ। যাতে ভুল ক'রেও কেউ মানুষ হত্যা না করে।
আরবীতে 'খাতা' শব্দের কাছাকাছি কিছু শব্দ আছে, যার অর্থ পাপ। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ نَّحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُم إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْنًا كَبِيرًا }
"তোমাদের সন্তানদেরকে তোমরা দারিদ্র্য-ভয়ে হত্যা করো না, আমিই তাদেরকে জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি এবং তোমাদেরকেও। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।" (বানী ইস্রাঈল: ৩১)
بَلَى مَن كَسَبَ سَيِّئَةً وَأَحَاطَتْ بِهِ خَطِيئَتُهُ فَأُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ}
"অবশ্যই, যে ব্যক্তি পাপ করেছে এবং যার পাপরাশি তাকে পরিবেষ্টন করেছে, তারাই হবে জাহান্নামের অধিবাসী; তারা সেখানে চিরকাল থাকবে।" (বাক্বারাহঃ ৮১)
কিছু আদেশ-নিষেধ আছে, যা মানুষ পালন করতে অপারগ, যা তার সাধ্যের বাইরে, সে আদেশ-নিষেধ লংঘন করলে মানুষ পাপী হয় না। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوا وَأَطِيعُوا} (١٦) سورة التغابن
"তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর এবং শোনো ও আনুগত্য কর।" (তাগাবুনঃ ১৬)
{لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا } (٢٨٦) سورة البقرة
"আল্লাহ কাউকেও তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না।" (বাকারাঃ ২৮৬)
{لِيُنفِقْ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ وَمَن قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا مَا آتَاهَا سَيَجْعَلُ اللَّهُ بَعْدَ عُسْرِ يُسْرًا} (۷) سورة الطلاق
"সামর্থ্যবান নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত, সে আল্লাহ তাকে যা দান করেছেন তা হতে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, তার চেয়ে গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না। আল্লাহ কষ্টের পর স্বস্তি দান করবেন।" (ত্বালাক্বঃ ৭)
{لَا تُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا} (١٥٢) سورة الأنعام
"আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত ভার অর্পণ করি না।" (আনআমঃ ১৫২)
{وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَا تُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا أُوْلَئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} (٤٢) سورة الأعراف
"আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত ভার অর্পণ করি না। যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তারাই হবে জান্নাতবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।" (আ'রাফ ৪২)
{وَلَا تُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا وَلَدَيْنَا كِتَابٌ يَنطِقُ بِالْحَقِّ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ} (٦٢)
"আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব অর্পণ করি না এবং আমার নিকট আছে এক গ্রন্থ; যা সত্য ব্যক্ত করে এবং তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না।" (মু'মিনুনঃ ৬২)
তদনুরূপ কেউ কোন পাপ করতে বাধ্য বা নিরুপায় হলে মহান প্রতিপালক তার জন্য তাকে পাকড়াও করবেন না। এ মর্মে তিনি বলেছেন,
{وَمَا لَكُمْ أَلا تَأْكُلُوا مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللهِ عَلَيْهِ وَقَدْ فَصَّلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلَّا مَا اضْطُرِرْتُمْ إِلَيْهِ} (۱۱۹) سورة الأنعام
"আর তোমাদের কী হয়েছে যে, যার যবেহকালে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে, তোমরা তা ভক্ষণ করবে না? অথচ তোমরা নিরুপায় না হলে যা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, তা তিনি বিশদভাবেই তোমাদের নিকট বিবৃত করেছেন।" (আনআম: ১১৯)
{إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ وَلَحْمَ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ بِهِ لِغَيْرِ اللَّهِ فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ} (۱۷۳) سورة البقرة، (١١٥) النحل
"নিশ্চয় (আল্লাহ) তোমাদের জন্য শুধু মৃত জীব, রক্ত, শূকরের মাংস এবং যে সব জন্তুর উপরে (যবেহ কালে) আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারণ করা হয়ে থাকে তা তোমাদের জন্য অবৈধ করেছেন। কিন্তু যে অনন্যোপায় অথচ অন্যায়কারী কিংবা সীমালংঘনকারী নয়, তার কোন পাপ হবে না। আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।" (বাক্বারাহঃ ১৭৩)
{قُل لا أَجِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا عَلَى طَاعِم يَطْعَمُهُ إِلَّا أَن يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَّسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنْزِيرٍ فَإِنَّهُ رِجْسٌ أَوْ فِسْقًا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغِ وَلَا عَادٍ فَإِنَّ رَبَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ} (١٤٥) سورة الأنعام
"বল, আমার প্রতি যে প্রত্যাদেশ হয়েছে, তাতে আহারকারী যা আহার করে, তার মধ্যে আমি কিছুই নিষিদ্ধ পাই না। তবে মৃতপ্রাণী, বহমান রক্ত ও শূকরের মাংস; কেননা তা অপবিত্র। অথবা (যবেহকালে) আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম নেওয়ার কারণে যা অবৈধ। তবে কেউ অবাধ্য না হয়ে এবং সীমালংঘন না করে তা গ্রহণে বাধ্য হলে, তোমার প্রতিপালক অবশ্যই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (আনআমঃ ১৪৫)
{ حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمَ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ وَأَن تَسْتَقْسِمُوا بِالْأَزْلَامِ ذَلِكُمْ فِسْقُ الْيَوْمَ يَئِسَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن دِينِكُمْ فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَاخْشَوْنِ الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلَامَ دِينًا فَمَنِ اضْطُرَّ فِي مَخْمَصَةٍ غَيْرَ مُتَجَائِفِ لِإِثْمِ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ} (۳) سورة المائدة
"তোমাদের জন্য হারাম (অবৈধ) করা হয়েছে মৃত পশু, রক্ত ও শূকর-মাংস, আল্লাহ ভিন্ন অন্যের নামে উৎসর্গীকৃত পশু, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত জন্তু, ধারবিহীন কিছু দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত জন্তু, পতনে মৃত জন্তু, শৃঙ্গাঘাতে মৃত জন্তু এবং হিংস্র পশুর খাওয়া জন্তু; তবে তোমরা যা যবেহ দ্বারা পবিত্র করেছ তা ছাড়া। আর যা মূর্তি পূজার বেদীর উপর বলি দেওয়া হয় তা এবং জুয়ার তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করা, এ সব পাপকার্য। আজ অবিশ্বাসিগণ তোমাদের ধর্মের বিরুদ্ধাচরণে হতাশ হয়েছে। সুতরাং তাদেরকে ভয় করো না, শুধু আমাকে ভয় কর। আজ তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম (ইসলাম) পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের ধর্ম হিসাবে মনোনীত করলাম। তবে যদি কেউ ক্ষুধার তাড়নায় (নিষিদ্ধ জিনিষ খেতে) বাধ্য হয়; কিন্তু ইচ্ছা ক'রে পাপের দিকে ঝুঁকে না, তাহলে (তার জন্য) আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (মায়িদাহঃ ৩)
কোন যালেমের পক্ষ থেকে কোন পাপ করতে বাধ্য করা হলে এবং মনে পাপ না থাকলে তাও ধর্তব্য নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
مَن كَفَرَ بِاللَّهِ مِن بَعْدِ إِيمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنُّ بِالإِيمَانِ وَلَكِن مَّن شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِّنَ اللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ} (١٠৬) سورة النحل
"কেউ ঈমান আনার পরে আল্লাহর সাথে কুফরী করলে এবং কুফরীর জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রাখলে তার উপর আপতিত হবে আল্লাহর ক্রোধ এবং তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি; তবে তার জন্য নয়, যাকে কুফরীতে বাধ্য করা হয়েছে, অথচ তার চিত্ত ঈমানে অবিচল।" (নাহল: ১০৬)
আর মহানবী ﷺ বলেছেন,
((إِنَّ الله عز وجل وَضَعَ عَن أُمَتِي الخطأ ، والنسيان ، وما استكرهوا عليه)).
"নিশ্চয় মহান আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং যার উপর তাকে নিরুপায় করা হয়, তার (পাপ) কে মার্জনা করেন।" (ইবনে মাজাহ ২০৪৫নং, বাইহাকী, ত্বাবারানী, ইবনে হিব্বান)
অনুরূপ মানুষ যদি জ্ঞানশূন্য অবস্থায় পাপ করে, তাহলে তা পাপ বলে ধর্তব্য নয়।
رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلاَثَةِ : عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ وَعَنِ الْمُبْتَلَى حَتَّى يَبْرَأَ وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَكْبَرَ ..
"তিন ব্যক্তির নিকট হতে (কিরামান কাতেবীনের পাপ-পুণ্য লেখার) কলম তুলে নেওয়া হয়েছে; ঘুমন্ত ব্যক্তি হতে যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয়েছে, পাগল ব্যক্তি হতে যতক্ষণ না সে সুস্থ হয়েছে এবং শিশু হতে, যতদিন না সে সাবালক হয়েছে।" (আহমাদ ১/১৪০, আবু দাউদ ৪৪০০নং, হাকেম ৪/৪৩0)
সুমহান প্রতিপালক "আল্লাহ কাউকেও তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না। যে ভাল উপার্জন করবে সে তার (প্রতিদান পাবে) এবং যে মন্দ উপার্জন করবে, সে তার (প্রতিফল পাবে)।" তিনিই দুর্বল মানুষকে শিখিয়েছেন, সে যেন প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনায় বলে,
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لاَ طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ} (٢٨٦) سورة البقرة
"হে আমাদের প্রতিপালক! যদি আমরা বিস্মৃত হই অথবা ভুল করি, তাহলে তুমি আমাদেরকে অপরাধী করো না। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পূর্ববর্তিগণের উপর যেমন গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছিলে, আমাদের উপর তেমন দায়িত্ব অর্পণ করো না। হে আমাদের প্রতিপালক! এমন ভার আমাদের উপর অর্পণ করো না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। তুমি আমাদেরকে ক্ষমা কর, আমাদের পাপ মোচন কর এবং আমাদের প্রতি দয়া কর। তুমি আমাদের অভিভাবক। অতএব সত্য প্রত্যাখ্যানকারী (কাফের) সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে (সাহায্য ও) জয়যুক্ত কর।" (বাক্বারাহঃ ২৮-৬)
📄 প্রত্যেক মানুষই পাপী
এ ধরাধামে কে পাপ করেনি? নবীগণ ছাড়া সকল মানুষই পাপী। কোন না কোন পাপ হয়েই থাকে ভুলে ভরা এই মানুষের দ্বারা। মানুষের প্রকৃতি মন্দপ্রবণ, তার মধ্যে প্রক্ষিপ্ত আছে ষড়রিপু। তার মন তাকে পাপকাজে প্রলুব্ধ করে। কারণ প্রত্যেক পাপে আছে এক প্রকার তৃপ্তি। তার উপর শয়তানকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, সে মানুষকে ভ্রষ্ট করতে পারবে। কোন কোন পাপে মানুষের মনের কোন তৃপ্তি না থাকলেও শয়তানের লাভ আছে। সে আপন দলভারী করার জন্য মানুষকে পাপে আলিপ্ত করে।
নিশ্চয় মহান প্রতিপালকের তাতে অনুমতি থাকে। তাঁর ইচ্ছা ব্যতিত কোন পাপ-পুণ্য ঘটতেই পারে না। এই জন্যই তো বান্দা বলে, 'লা হাউলা অলা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।' অর্থাৎ, আল্লাহর তওফীক ছাড়া মানুষ নড়াসরাও করতে পারে না। কোন পাপ কাজ বর্জন করতে পারে না, কোন পুণ্যকাজ সম্পাদন করতে পারে না।
সৃষ্টিকর্তার ইছায় ছিল, মানুষ পাপ করবে। এ জন্যই রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ)).
"প্রত্যেক আদম সন্তান ত্রুটিশীল ও অপরাধী, আর অপরাধীদের মধ্যে উত্তম লোক তারা যারা তওবা করে।" (আহমাদ ১৩০৪৯, তিরমিযী ২৪৯৯, ইবনে মাজাহ ৪২৫১, দারেমী ২৭২৭, আবু য়্যা'লা ২৯২২, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৭১২৭নং)
তাঁর সকল সৃষ্টি তাঁর গুণগান গায়। ফিরিস্তাকুল তাঁর ইবাদতে সদা মশগুল। তবুও তিনি চেয়েছেন এমন এক সৃষ্টি, যারা ভুল করবে, অতঃপর তারা তাঁর কাছে বিনয় সহকারে ভুল স্বীকার করবে এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। ক্ষমা প্রার্থনাও এক মহান ইবাদত। তাই মানুষের প্রকৃতিতে পাপ প্রক্ষিপ্ত হল। মানুষ পাপ না করলে সে সৃষ্টি তাঁর পছন্দনীয় ছিল না। মহানবী বলেছেন,
(( لَوْلَا أَنَّكُمْ تُذْنِبُونَ ، لَخَلَقَ اللهُ خَلْقاً يُذْنِبُونَ ، فَيَسْتَغْفِرُونَ ، فَيَغْفِرُ لَهُمْ )).
"তোমরা যদি গোনাহ না কর, তাহলে আল্লাহ তাআলা এমন জাতি সৃষ্টি করবেন, যারা গোনাহ করবে তারপর তারা (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা চাইবে। আর তিনি তাদেরকে ক্ষমা ক'রে দেবেন।" (মুসলিম ৭/১৩৯নং)
তিনি আরো বলেছেন,
(( وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ ، لَوْ لَمْ تُذْنِبُوا ، لَذَهَبَ اللَّهُ بِكُمْ ، وَجَاءَ بِقَومٍ يُذْنِبُونَ ، فَيَسْتَغْفِرُونَ اللَّهَ تَعَالَى ، فَيَغْفِرُ لَهُمْ )). رواه مسلم
"সেই মহান সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! যদি তোমরা পাপ না কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে অপসারিত করবেন এবং এমন জাতির আবির্ভাব ঘটাবেন যারা পাপ করবে, অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইবে। আর তিনি তাদেরকে ক্ষমা ক'রে দেবেন।" (মুসলিম ৭১৪১নং)
তার মানে এই নয় যে, পাপ করার অনুমতি আছে। সৃষ্টির শুরুতেই সুমহান স্রষ্টা পাপ-পুণ্য সৃষ্টি করেছেন। পাপ-পুণ্য মানুষের প্রকৃতিতে প্রক্ষিপ্ত করেছেন। পুণ্যের পুরস্কার স্বরূপ সৃষ্টি করেছেন জান্নাত। আর পাপের শাস্তি স্বরূপ তিনি প্রস্তুত করেছেন জাহান্নাম। মহানবী বলেছেন,
لَمَّا خَلَقَ اللَّهُ الْجَنَّةَ قَالَ لِجِبْرِيلَ : اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا. فَذَهَبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا ثُمَّ جَاءَ فَقَالَ : أَيْ رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَا يَسْمَعُ بِهَا أَحَدٌ إِلَّا دَخَلَهَا ثُمَّ حَقَّهَا بِالْمَكَارِهِ ثُمَّ قَالَ : يَا جِبْرِيلُ اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا فَذَهَبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا ثُمَّ جَاءَ فَقَالَ : أَيْ رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَقَدْ خَشِيتُ أَنْ لَا يَدْخُلَهَا أَحَدٌ ». قَالَ : ( فَلَمَّا خَلَقَ اللَّهُ النَّارَ قَالَ : يَا جِبْرِيلُ اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا. فَذَهَبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا ثُمَّ جَاءَ فَقَالَ : أَيْ رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَا يَسْمَعُ بِهَا أَحَدٌ فَيَدْخُلُهَا فَحَفَّهَا بِالشَّهَوَاتِ ثُمَّ قَالَ : يَا جِبْرِيلُ اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا. فَذَهَبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا ثُمَّ جَاءَ فَقَالَ : أَيْ رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَقَدْ خَشِيتُ أَنْ لَا يَبْقَى أَحَدٌ إِلَّا دَخَلَهَا ».
"আল্লাহ যখন জান্নাত-জাহান্নাম সৃষ্টি করলেন, তখন জিব্রাঈলকে জান্নাতের দিকে পাঠিয়ে বললেন, 'যাও, জান্নাত এবং তার অধিবাসীদের জন্য প্রস্তুতকৃত সামগ্রী দর্শন কর।' সুতরাং তিনি গেলেন এবং দর্শন ক'রে ফিরে এসে বললেন, 'আপনার সম্মানের কসম! যে কেউ এর কথা শুনবে, সে এতে প্রবেশ করতে চাইবে।' অতঃপর আল্লাহ জান্নাতকে কষ্টসাধ্য কর্মসমূহ দিয়ে ঘিরে দিতে আদেশ করলেন। তারপর আবার তাঁকে বললেন, 'যাও, জান্নাত এবং তার অধিবাসীদের জন্য প্রস্তুতকৃত সামগ্রী দর্শন কর।' সুতরাং তিনি গেলেন এবং দর্শন ক'রে ফিরে এসে বললেন, 'আপনার সম্মানের কসম! আমার আশঙ্কা হয় যে, কেউ তাতে প্রবেশ করতে পারবে না।'
অতঃপর আল্লাহ তাঁকে জাহান্নামের দিকে পাঠিয়ে বললেন, 'যাও, জাহান্নাম এবং তার অধিবাসীদের জন্য প্রস্তুতকৃত সামগ্রী দর্শন কর।' সুতরাং তিনি গেলেন এবং দেখলেন, তার আগুনের এক অংশ অপর অংশের উপর চেপে রয়েছে। অতঃপর তিনি ফিরে এসে বললেন, 'আপনার সম্মানের কসম! যে কেউ এর কথা শুনবে, সে এতে প্রবেশ করতে চাইবে না।' তারপর জাহান্নামকে মনোলোভা জিনিসসমূহ দিয়ে ঘিরে দিতে আদেশ করলেন এবং পুনরায় তাঁকে বললেন, 'যাও, জাহান্নাম এবং তার অধিবাসীদের জন্য প্রস্তুতকৃত সামগ্রী দর্শন কর।' সুতরাং তিনি গেলেন এবং দর্শন ক'রে ফিরে এসে বললেন, 'আপনার সম্মানের কসম! আমার আশঙ্কা হয় যে, কেউ পরিত্রাণ পাবে না, সবাই তাতে প্রবেশ করবে।' (আবু দাউদ ৪৭৪৬, তিরমিযী ২৫৬০, নাসাঈ ৩৭৬৩, সঃ তারগীব ৩৬৬৯নং)
বিশ্ব রচিত হল। পৃথিবীর সংসারকে সুসজ্জিত করা হল নানা প্রলুব্ধকারী বস্তু দিয়ে। মানুষ আবিষ্কার করল কত পাপ, কত পাপের উপকরণ। যত দিন যায়, তত আবিষ্কার হতে থাকে পাপের নানা উপায়, নানা আড্ডা, আখড়া ও বিনোদনস্থল। এই সেই পৃথিবী, যার একটি ছবি অঙ্কন করেছেন কবি নজরুল, 'ফুলে-ফুলে সেথা ভুলের বেদনা, নয়নে-অধরে শাপ, চন্দনে সেথা কামনার জ্বালা, চাঁদে চুম্বন-তাপ! সেথা কামিনীর নয়নে কাজল, শ্রোণীতে চন্দহার, চরণে লাক্ষা, ঠোঁটে তাম্বুল, দেখে মরে আছে মার! প্রহরী সেখানে চোখা চোখ নিয়ে সুন্দর শয়তান, বুকে-বুকে সেথা বাঁকা ফুল-ধনু, চোখে চোখে ফুল-বাণ।' তিনি আরো বলেছেন, 'পাপের পঙ্কে পুণ্য-পদ্ম, ফুলে ফুলে হেথা পাপ, সুন্দর এই ধরা-ভরা শুধু বঞ্চনা অভিশাপ।'
যে মানুষ পাপ করবে না মনে করে, সে মানুষও মনের অবচেতনে পা পিছলে পাপে গিয়ে পড়ে। পাপযন্ত্রের সাহায্যে পুণ্য দিয়ে পাপের মোকাবেলা করতে গিয়ে কোন না কোন পাপে পতিত হয়। যেহেতু পাপ দিয়ে এ পৃথিবী মোড়া, পাপ দিয়ে এ পরিবেশ ঘেরা, পাপ দিয়ে এ পরিমন্ডল পরিবেষ্টিত। তাই সুইচ টিপলেই পাপ, জানালা খুললে পাপ, দরজা খুললে পাপ, সামনে-পিছনে, ডানে-বামে দৃষ্টিপাত করলেই পাপ। পাপে পাপময় এ জগৎ।
ধর্ম না ক'রে পাপ, ধর্ম করতে গিয়েও পাপ। পরস্ত্রী নিয়ে পাপ, স্বস্ত্রীর সাথেও পাপ। ঘরের ভিতরে পাপ, ঘরের বাইরে পাপ। দেহাঙ্গ দিয়ে পাপ, মনের অভ্যন্তরে পাপ। সুগন্ধে পাপ, দুর্গন্ধে পাপ। ফুলে পাপ, কাঁটায় পাপ।
ঘরে বসে থাকলেও পাপ, পথ চললেও পাপ। পাপের কর্দমে যেন সারা পথ পিচ্ছিল্য। সংসারের এ পথের পথিকের জন্য সাপ এড়িয়ে পথ চলা সহজ, কিন্তু পাপ এড়িয়ে পথ চলা সুকঠিন।
অপরাধী জন্মায় না, তৈরি হয়। মানুষ পিতা-মাতার তরবিয়তে মীরাসসূত্রে অপরাধী হয়ে প্রতিপালিত হয়। অথবা বাইরের পরিবেশে প্রভাবিত হয়ে অপরাধ-প্রবণতা মনে পোষণ করে। দ্বীনদার হলেও তার মধ্যে পাপ স্থান পায়। মহাপাপ না করলেও উপপাপ থেকে বাঁচা কঠিন হয়। এমনকি যাদেরকে খুব ভালো লোক মনে করা হয়, তাদের ভিতরেও পাপ ঘটে থাকে। মানুষের সামনে প্রকাশ না পেলেও গোপনে থাকে সে পাপের ভান্ডার। বাহ্যতঃ অধিকাংশ ভালো মানুষই চাঁদের মতো, যাদের একটা অন্ধকার দিক আছে; যেই দিক তারা কাউকে দেখাতে চায় না। উজ্জ্বল তারকার পশ্চাতে থাকে অন্ধকার।
📄 পাপের প্রকারভেদ
অবশ্যই সকল পাপ সমান নয়। পাপের বিভিন্ন ধরন আছে, শ্রেণী আছে, প্রকার আছে। সকল পাপকে মোটামুটি ৩ ভাগে ভাগ করা হয়। কিন্তু সকল ভাগের সকল পাপও একই পর্যায়ের নয়। তারও বিভিন্ন স্তর আছে, তারতম্য আছে।
পাপের প্রথম ভাগ: অতি মহাপাপ, যাকে আরবীতে আকবারুল কাবায়ের বলা হয়।
যে অপরাধ করলে মানুষের কোন উপকার বা সুখলাভ হয় না, অথচ তার ফলে সে 'কাফের' হয়ে যায়। এটাকে আল-কুরআনে 'হিন্ েআযীম' (ঘোরতর অপরাধ) বলা হয়েছে। জাহান্নামবাসীদের অপরাধ বর্ণনা ক'রে মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ وَكَانُوا يُصِرُّونَ عَلَى الْحِنْثِ الْعَظِيمِ} (٤٦) سورة الواقعة
"তারা অবিরাম লিপ্ত ছিল ঘোরতর পাপকর্মে।" (ওয়াক্বিআহঃ ৪৬)
এই অপরাধকে 'যুল্মে আযীম' (চরম অন্যায়) ও বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ লুকমান হাকীমের কথা উল্লেখ ক'রে বলেছেন,
{وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ}
"(স্মরণ কর) যখন লুকুমান উপদেশচ্ছলে তার পুত্রকে বলেছিল, 'হে বৎস! আল্লাহর কোন অংশী করো না। আল্লাহর অংশী করা তো চরম অন্যায়।" (লুক্বমান : ১৩)
যে অতি মহা অপরাধ করলে মানুষ ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়। আর সেটা দুইভাবে হতে পারে:-
১। মৌলিক ঈমানের অন্তর্ভুক্ত কোন ওয়াজেব বর্জন করলে সে অপরাধ হয়। যেমন কালেমা মুখে উচ্চারণ না করা, নামায ত্যাগ করা, মনের অভ্যন্তরে সত্যায়ন না করা, সন্দেহ পোষণ করা, কপটতা করা ইত্যাদি।
২। এমন কাজ করা, যা মৌলিক ঈমানের পরিপন্থী। যেমন আল্লাহ বা তাঁর রসূলকে গালি দেওয়া, গায়রুল্লাহকে সিজদা করা, তাকে বিপদে আহবান করা, গায়রুল্লাহর জন্য যবেহ করা বা নযর মানা ইত্যাদি। অতিমহাপাপ (শিক) এর শাস্তি আল্লাহ মকুব করবেন না। এমন পাপীকে বিনা তওবায় আল্লাহ ক্ষমাও করবেন না। সে হবে চিরস্থায়ী জাহান্নামবাসী। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاء وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا } (৪৮) سورة النساء
"নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী (শিক) করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন। আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন (শিক) করে, সে এক মহাপাপ করে।" (নিসাঃ ৪৮)
{إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاء وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلالاً بَعِيدًا } (১১৬) سورة النساء
"নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী (শির্ক) করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা ক'রে দেন। আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন (শির্ক) করে, সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়।" (নিসাঃ ১১৬)
{إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ}
"অবশ্যই যে কেউ আল্লাহর অংশী করবে, নিশ্চয় আল্লাহ তার জন্য বেহেশু নিষিদ্ধ করবেন ও দোযখ তার বাসস্থান হবে এবং অত্যাচারীদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।" (মায়িদাহঃ ৭২)
পাপের দ্বিতীয় ভাগঃ মহাপাপ, যাকে আরবীতে 'কাবীরা' বা 'কাবায়ের' বলা হয়। এ অপরাধ করলে অপরাধী 'ফাসেক' রূপে চিহ্নিত হয়। এই শ্রেণীর অপরাধ, যার পৃথিবীতে নির্দিষ্ট দন্ডবিধি আছে, যেমন খুন করা, চুরি করা, ব্যভিচার করা, মদপান করা ইত্যাদি। অথবা সে অপরাধের জন্য পরকালে জাহান্নামে শাস্তি ও আযাবের হুমকি দেওয়া হয়েছে অথবা অপরাধীকে অভিশাপ দেওয়া হয়েছে অথবা তার প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করা হয়েছে। যেমন সুদ খাওয়া, গীবত করা, চুগলী করা, পিতামাতার অবাধ্যাচরণ করা ইত্যাদি।
অথবা আল্লাহ বা রসূল তার সাথে সম্পর্কহীন, অথবা তার ঈমান নেই, অথবা সে মুসলিমদের দলভুক্ত নয়---ইত্যাদি বলে ধমক দেওয়া হয়েছে।
এমন কাবীরা গোনাহ যে কত প্রকার তার কোন নির্দিষ্ট সংখ্যা ও সীমা নেই। তবে ইবনে আব্বাস কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, তা হল ৭০ প্রকার। সে যাই হোক, সকল কাবীরা একই পর্যায়ের নয়। যেমন হত্যা করা, ব্যভিচার করা ও গীবত করা কাবীরা গোনাহ। কিন্তু উক্ত তিনটি পাপের মধ্যে তারতম্য স্পষ্ট।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, আমি (অথবা অন্য এক ব্যক্তি) আল্লাহর রসূল-কে জিজ্ঞাসা করলাম, 'আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় পাপ কী?' উত্তরে তিনি বললেন, “এই যে, তুমি তাঁর কোন শরীক নির্ধারণ কর---অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।” আমি বললাম, 'এটা তো বিরাট! অতঃপর কোন্ পাপ?' তিনি বললেন, "এই যে, তোমার সাথে খাবে---এই ভয়ে তোমার নিজ সন্তানকে হত্যা করা।” আমি বললাম, 'অতঃপর কোন পাপ?' তিনি বললেন, "প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে তোমার ব্যভিচার করা।" আর এ ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে,
{وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا (٦٨) يُضَاعَفْ لَهُ الْعَذَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَخْلُدْ فِيهِ مُهَانًا} (٦٩)
অর্থাৎ, (আল্লাহর বান্দারা) আল্লাহর সঙ্গে কোন উপাস্যকে অংশী করে না, আল্লাহ যাকে যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে হত্যা নিষেধ করেছেন তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যারা এ সব করে তারা শাস্তি ভোগ করবে। কিয়ামতের দিন ওদের আযাব বর্ধিত করা হবে এবং সেখানে তারা হীন অবস্থায় স্থায়ী হবে। (সূরা ফুরকান ৬৮-৬৯ আয়াত) (বুখারী ৪৪৭৭,৭৫৩২ প্রভৃতি, মুসলিম ২৬৭-২৬৮নং, তিরমিযী, নাসাঈ)
রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ أَعْظَمَ الذُّنُوبِ عِنْدَ اللَّهِ رَجُلٌ تَزَوَّجَ امْرَأَةً فَلَمَّا قَضَى حَاجَتَهُ مِنْهَا طَلَّقَهَا وَذَهَبَ بِمَهْرِهَا وَرَجُلٌ اسْتَعْمَلَ رَجُلاً فَذَهَبَ بِأَجْرَتِهِ وَآخَرُ يَقْتُلُ دَابَّةً عَبَثًا ..
"আল্লাহর নিকট সব চাইতে বড় পাপিষ্ঠ সেই ব্যক্তি, যে কোন মহিলাকে বিবাহ করে, অতঃপর তার নিকট থেকে মজা লুটে নিয়ে তাকে তালাক দেয় এবং তার মোহরও আত্মসাৎ করে। (দ্বিতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে কোন লোককে মজুর খাটায়, অতঃপর তার মজুরী আত্মসাৎ করে এবং (তৃতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে খামোখা পশু হত্যা করে।" (হাকেম ২৭৪৩, বাইহাকী ১৪৭৮১, সহীহুল জামে' ১৫৬৭ নং)
বড় গোনাহ বা মহাপাপের পাপীকে বিনা তওবায় আল্লাহ ক্ষমা করেন না। (অবশ্য কোন কোন ওলামার মতে কোন কোন ইবাদতের বদৌলতে মহাপাপও মাফ হয়ে যায়।) তবে কিয়ামতে আল্লাহ তাআলা এমন (শির্কমুক্ত) পাপীকে ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দেবেন; নচেৎ জাহান্নামে দিয়ে উপযুক্ত আযাব ও শাস্তি ভোগ করাবেন। অতঃপর এমন মহাপাপীর হৃদয়ে ঈমান অবশিষ্ট থাকার (অর্থাৎ, কুফরী ও শির্ক না থাকার) কারণে দোযখ থেকে মুক্তি দিয়ে পরিশেষে আল্লাহ তাকে বেহেস্তে দেবেন।
মোট কথা: অতিমহাপাপী চিরস্থায়ী জাহান্নামে বাস করবে। কিন্তু মহাপাপী জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে না।
পাপের তৃতীয় ভাগ: উপপাপ, লঘু পাপ বা ছোট পাপ, যাকে আরবীতে 'সাগীরা' বা 'সাগায়ের' বলা হয়।
লঘু বা উপপাপ ক্ষমার্হ। বিভিন্ন মসীবত ও ইবাদতের বদৌলতে আল্লাহ এ পাপের পাপী বান্দাকে ক্ষমা করে অনুগ্রহ প্রদর্শন করেন।
মহান আল্লাহ বলেন, إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُمْ مُدْخَلاً كَرِيمًا ) অর্থাৎ, তোমাদেরকে যা করতে নিষেধ করা হয়েছে তার মধ্যে যা গুরুতর (কাবীরা গোনাহ) তা থেকে বিরত থাকলে তোমাদের লঘুতর পাপগুলিকে আমি মোচন করে দেব এবং তোমাদেরকে সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাব। (নিসা ৩১)
অবশ্য লঘুপাপ বেশী আকারে স্তূপীকৃত হলে অথবা বারবার করলে তা যে গুরুপাপে পরিণত হয়, তা বলাই বাহুল্য।
কিন্তু কোন মুমিন ব্যক্তির সাগীরা গোনাহ কি জমা হতে পারে?
মহান আল্লাহর ওয়াদা আছে, তিনি ছোট ছোট পাপগুলিকে মাফ ক'রে দেবেন। অবশ্য তিনি শর্তারোপ করেছেন, মহাপাপ থেকে বিরত থাকতে হবে, যেমন পূর্বোক্ত আয়াতে তা স্পষ্ট। তিনি আরো বলেছেন, الَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ إِلَّا اللَّمَمَ إِنَّ رَبَّكَ وَاسِعُ الْمَغْفِرَةِ} (۳۲) "যারা ছোট-খাট অপরাধ ছাড়া গুরুতর পাপ ও অশ্লীল কার্য হতে বিরত থাকে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক অপরিসীম ক্ষমাশীল।" (নাজমঃ ৩২)
আর মহানবী বলেছেন, (( الصَّلَوَاتُ الخَمْسُ ، وَالجُمُعَةُ إِلَى الجُمُعَةِ ، وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ مُكَفِّرَاتٌ لِمَا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنِبَ الكَبَائِرُ )). رواه مسلم "পাঁচ অক্ত নামায, এক জুমআহ থেকে আর এক জুমআহ এবং এক রমযান থেকে আর এক রমযান পর্যন্ত (সংঘটিত সাগীরা গোনাহ) মুছে ফেলে; যদি কাবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা যায় তাহলে (নতুবা নয়)।" (মুসলিম ৫৭৪নং) অনুরূপভাবে মুসলিম ওযু করলে গোনাহ ধোয়া যায়, হজ্জ করলে জন্মদিনের শিশুর মতো নিষ্পাপ হওয়া যায় ইত্যাদি। সুতরাং লঘুপাপ স্তূপীকৃত হয়ে গুরুপাপে পরিণত হওয়ার কোন পথ থাকারই কথা নয়। আর আল্লাহই ভালো জানেন।