📄 কেস স্টাডি ১: ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে
বৃষ্টি (ছদ্মনাম) ইউনিভার্সিটি তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। বয়ঃসন্ধিকালের শেষ দিকে অর্থাৎ বয়স যখন ষোলো কি সতেরো, তখন থেকেই বৃষ্টির অভিভাবক তার আচরণের পরিবর্তন লক্ষ করতে শুরু করেন। তারা প্রথমে মনে করে বয়সের কারণে এই পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু বৃষ্টি যখন নিজেই এসে বলে যে, সে আর সহ্য করতে পারছে না এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক, তখন তারা আমাদের শরণাপন্ন হন।
বৃষ্টির সঙ্গে কথা বলা বোঝা গেল, তার অনুভূতি ও আচরণের পরিবর্তনগুলো ঠিক বয়ঃসন্ধিকালের পরিবর্তন বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। তার ভেতরটা অস্বাভাবিক রকমের ফাঁকা ফাঁকা লাগে। স্বাভাবিক সব কাজই বৃষ্টির কষ্ট হলেও চালিয়ে যেতে পারে, কাজে তার আগ্রহও আছে, কিন্তু কোনো কাজেই আনন্দ পায় না! দুই-তিন বছর যাবৎ অধিকাংশ সময়ই তার কাছে মনে হয়, তার মাথার ওপর একটি কালো মেঘ নিয়ে সে সার্বক্ষণিক চলাচল করছে। এই তিন বছরের মধ্যে বৃষ্টির কয়েকটি সম্পর্ক হয়েছে, কিন্তু কোনো সম্পর্কই দীর্ঘমেয়াদি হয়নি। বৃষ্টি নিজেও জানে না কেন তার কোনো সম্পর্কই টিকে না, হোক তা ভালোবাসার বা বন্ধুত্বের! মাঝেমধ্যে তার কাছে মনে হয়, এই কষ্টগুলো নিয়ে চলা প্রায় অসম্ভব, কিন্তু সে মারা যেতে চায় না! বৃষ্টির জীবনে অনেক স্বপ্ন আছে পূরণ করার, কিন্তু তার কথা শুনেই বোঝা গেল, তার নিজের ওপর ভরসা নেই বললেই চলে।
‘স্যার, আমি আমার ক্যারিয়ারে অনেক কিছু করতে চাই, সবার সঙ্গে মিশতে চাই, কিন্তু জানি না কেন যেন আমার সঙ্গে কেউ বন্ধুত্ব করতে চায় না। আর কারণ কি আমার অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা না কি আমি তাদের বন্ধু হওয়ার যোগ্য নই? কেউ আমাকে দেখলে বুঝতে পারে না যে, আমার মনের ভেতর অনেক কষ্ট। আমি কষ্ট থেকে পরিত্রাণ পেতে চাই। আমি কি আর কখনো দশজনের মতো স্বাভাবিক হতে পারব?'
**চিকিৎসা**
অনেক সময় একজন ব্যক্তিকে বাইরে থেকে দেখতে যেমন মনে হয়, আভ্যন্তরীণ কষ্টের পরিমাণ আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি হয়। বৃষ্টিও এমনই একটি সময়ের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছিল, যাকে আমাদের ভাষায় বলি ডিসথাইমিয়া। আমাদের আলোচনা থেকে আমরা দেখেছি, প্রায় দুই বা ততোধিক বছরব্যাপী যে স্বল্পমাত্রার বিষণ্ণতা থাকে তাকে ডিসথাইমিয়া বলা হয়। বৃষ্টির মন খারাপ, কাজে আনন্দ না পাওয়া, কর্মদক্ষতা স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও আত্মবিশ্বাস না থাকা, এ সবকিছুই তার ডিসথাইমিয়ার উপসর্গ। কিন্তু এ সবকিছুর পাশাপাশি বৃষ্টির ব্যক্তিত্বজনিত বেশকিছু সমস্যা আছে। ডিসথাইমিয়ার চিকিৎসা করতে হলে অবশ্যই এই বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।
বৃষ্টির বর্তমান অবস্থা, বয়স এবং অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ারের কথা মাথায় রেখে আমরা তাকে অল্প মাত্রার অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট দিয়ে চিকিৎসা শুরু করি। পাশাপাশি চলতে থাকে তার সাইকোথেরাপি সেশন। যদিও বৃষ্টির প্রথম লাইনের চিকিৎসা সাইকোথেরাপি, তবুও এক্ষেত্রে ওষুধ দেওয়ার কারণ মূলত তার মানসিক স্বাস্থ্যোদ্ধারকে ত্বরান্বিত করা। তার সাইকোথেরাপি সেশন আমরা দু-সপ্তাহ অন্তর অন্তর করতে থাকি। বৃষ্টির রোগের চিকিৎসার অন্যতম মূল অংশ হলো তার ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যার সমাধান। তার ব্যক্তিত্বের সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বিষণ্ণতা বারবার ফিরে আসার সম্ভাবনা থেকে যায়। তার সেশনগুলোতে আমরা মূল যে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করেছি—
১. নিজের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করা ও স্বাস্থ্যকর উপায়ে প্রকাশ করা
২. কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপির মাধ্যমে ভুল চিন্তাভাবনাকে ঠিক পথে নিয়ে আসা
৩. বিহেভিওরাল অ্যাক্টিভেশন
৪. আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা
৫. নিজেকে সম্মান করা
৬. জীবনের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ঠিক করা এবং তা অর্জনের পথে চেষ্টা করা।
বৃষ্টি এখন আগের চেয়ে ভালো আছে। কিন্তু তার সেশন এখনো চলছে। মাঝেমধ্যে বৃষ্টি জীবনে এমন কিছু স্ট্রেসের মুখোমুখি হয়, যা সে নিজে সমাধান করতে পারে না। সে-সকল ক্ষেত্রে তার সাইকোথেরাপিস্টের সাহায্যের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বুদ্ধি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। সে নিজেও চেষ্টা করছে মানসিকভাবে সুস্থ থাকার।
📄 কেস স্টাডি ২: জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না
দুইজন প্রতিষ্ঠিত সন্তানের জনক রহিম সাহেব (ছদ্মনাম) এবার আঠাশের কোঠায় পা দিলেন। তিনি নিজেও অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল, পেশায় ব্যবসায়ী। তার ভাষামতে, সবকিছু ঠিকই চলছিল ১০ মাস আগপর্যন্ত। ১০ মাস পূর্বে করোনাজনিত জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে তার স্ত্রী পরলোকগমন করেন।
স্ত্রীর চলে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না রহিম সাহেব। সন্তানেরা নিজের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত, যদিও তাকে যথাসম্ভব সঙ্গ দেওয়ার চেষ্টা করে, তবুও স্ত্রীর অভাব তিনি কিছুতেই পূরণ করতে পারছেন না। রহিম সাহেবের ভাষায়, ‘হঠাৎ করে যেন আমার জীবনে একটা অসীম শূন্যতা চলে এসেছে।’ এই সমস্যার মধ্যেই তিন মাস আগে লকডাউনের কারণে তিনি ব্যবসায় বড়ো ক্ষতির সম্মুখীন হন, যার ফলে অনেক লোক ছাঁটাই করতে হয়। এই বিষয়টিও তাকে মানসিকভাবে বেশ পীড়া দিচ্ছে। গত দু’মাস যাবৎ তিনি সম্পূর্ণ বাসায় বন্দি, ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। তার ঘুম হচ্ছে না, সারাদিন শুয়েই থাকেন, কিছুই করতে ভালো লাগছে না।
রহিম সাহেব নামাজে ও আগের মতো শান্তি পাচ্ছেন না— যে বিষয়টি ওনাকে ভয়ঙ্কর অস্থির করে তুলেছে! আমাদের কাছে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসার মূল কারণ তার এটাই।
তার যে সন্তান আমাদের কাছে তাকে নিয়ে এসেছেন, তিনি বললেন, ‘আজকাল প্রায়ই আমরা লক্ষ করছি, বাবা দরজা বন্ধ করে দুপুরে ডুকরে কাঁদেন।’
প্রশ্ন করে জানা গেল, রহিম সাহেব জীবনের কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি নিজেই অনুভব করছেন, তার মধ্যে উঠে দাঁড়ানোর শক্তিতুকু অবশিষ্ট নেই। হতাশ গলায় বললেন, ‘আমার আগেও ব্যবসায় লস হয়েছে, কিন্তু এবার আমার এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মতো আত্মবিশ্বাস নেই! আর এসব করেই-বা কী হবে, আমার জীবন তো শেষই! স্ত্রী চলে গেছে, আমিও ওর কাছে চলে যাব। কিন্তু আল্লাহ আমাকে কবুল করছেন না, এটাই আমার মূল কষ্ট!’
**চিকিৎসা**
রহিম সাহেব নিঃসন্দেহে বিষণ্ণতায় ভুগছেন, কিন্তু তার সব সমস্যার মূল হলো তার স্ট্রেস। তাই আমরা যদি তাকে শুধু ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করি, তবে তার বিষণ্ণতা সম্পূর্ণ ভালো হবে না, বা আবার ফিরে আসবে। আমরা বিষণ্ণতার ক্ষেত্রে পরিমাপ করে দেখি যে, রহিম সাহেবের বিষণ্ণতা মৃদু পর্যায়ে। তার চিকিৎসার মূল লাইন তাই সাইকোথেরাপি।
আমাদের জীবনে স্ট্রেসগুলোকে আমরা মূলত তিনভাবে খাপ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে পারি: পরিবর্তন করে, পরিমার্জন করে, কিংবা মেনে নিয়ে। রহিম সাহেবের জীবনের মূল স্ট্রেস অর্থাৎ তার স্ত্রীর চলে যাওয়া, এটিকে কোনোভাবেই পরিবর্তন বা পরিমার্জন করা সম্ভব নয়। তাই সাইকোথেরাপির মাধ্যমে রহিম সাহেবকে বিষয়টি মেনে নিতে উৎসাহিত করা হয়। এর পাশাপাশি অবশ্যই তাকে জীবনযাপনের জন্য কয়েকটি মূল বিষয়ের ওপর মনোযোগী করা হয়—
* চিন্তার ত্রুটিগুলো নির্ণয় করে ঠিক করা
* আবার ব্যবসা শুরু করা
* ঘুমের স্বাস্থ্যবিধিগুলো মেনে চলা
* অবশ্যই প্রতিদিন শারীরিক ব্যায়াম করা
* আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা
* ডায়েরি লেখা
* রিলাক্সেশন ও মাইন্ডফুলনেস ব্যায়াম করা।
ছয় সেশন সাইকোথেরাপি নেওয়ার পরে রহিম সাহেব এখন আগের চেয়ে ভালো আছেন। তিনি আবার ব্যবসায় মনোনিবেশ করেছেন। চাকরি থেকে ছাঁটাই করা লোকদের অনেকেই আবার কাজে ফিরেছেন। তার ঘুম, খাওয়া-দাওয়া আগের চেয়ে রুটিনে এসেছে। তার সাইকোথেরাপির সেশন এখনো চলছে। গত সেশনে তিনি বলেছেন, 'নামাজে এখন আলহামদুলিল্লাহ ভালোই মন আনতে পারছি। আমি এখন বুঝতে পারছি, আমার এবং আমার স্ত্রীর মধ্যে একজনকে তো আগে চলে যেতেই হতো। আমি যদি এখন আমার স্ত্রীর জন্য দোয়া করি, সেটাই তার জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার হবে'।
রহিম সাহেবের কোনো ওষুধের প্রয়োজন হয়নি, তিনি শুধু সাইকোথেরাপিস্টের সহায়তায় এখন মানসিকভাবে সুস্থ আছেন।
📄 কেস স্টাডি ৩: মনোযোগ ধরে রাখা যাচ্ছে না
স্বপ্ন (ছদ্মনাম) আর বেলির (ছদ্মনাম) ভালোবাসার সম্পর্কটা প্রায় ছয় বছরের। যে সম্পর্কটা তাদের জীবনে আনন্দের কারণ হয়েছিল, স্বপন যখন আমার চেম্বারে আসে, তখন তার কষ্টের কারণও এই সম্পর্কটাই। ২৫ বছর বয়সি স্বপন সদ্য পড়াশোনা শেষ করে চাকরি খুঁজছে। কিন্তু এখনো তেমন কোনো চাকরি জোগাড় করতে পারেনি। তার স্বপ্ন বিসিএস। একবার পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে পারেনি। বেলির পরিবার থেকে বিয়ের জন্য চাপ আছে সে জানত। কিন্তু তাকে ফেলে বেলি এমন হুট করে আরেকজনকে বিয়ে করে ফেলবে, স্বপন সেটি কখনোই ভাবতে পারেনি।
আর্থিক সংকট, চাকরির জন্য পারিবারিক চাপ, আর সবকিছু মিলিয়ে স্বপন এমনিতেই অনেক মানসিক অশান্তিতে ছিল। তার মধ্যে যখন এত দিনের সম্পর্কটা ভেঙে গেল, ব্যাপারটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না স্বপন। সে ভেবেছিল, ধীরে ধীরে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দু’মাস পরেও যখন দেখল, তার মানসিক স্বাস্থ্য অবনতির দিকেই যাচ্ছে, তখন আর দেরি না করে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ দেখানোর সিদ্ধান্ত নিল। সম্পর্ক ভাঙনের পর থেকেই স্বপন খেয়াল করছিল, পড়াশোনায় একদমই মন বসছে না তার। জোর করে যতটুকু পড়ছে, ততটুকু মনে রাখতে পারছে না। এক মাস যাবৎ তার পর্নোগ্রাফি দেখার পরিমাণ প্রায় নেশার পর্যায়ে চলে গেছে। গত ১৫ দিন যাবৎ তার কিছুতেই ঘুম হচ্ছে না। মাঝেমধ্যে সে ঘুমের ওষুধ পর্যন্ত সেবন করেছে, তবু যেন যেন সকালবেলা উঠে আগের মতো ফ্রেশ লাগছে না। অল্পতেই সে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। বন্ধুবান্ধব আগে থেকেই তার কম, তাই কাউকে বলতেও পারেনি। হঠাৎ সেদিন ওজন মেপে দেখল, আগের চেয়ে ওজন প্রায় দুই কেজি কমে গেছে।
স্বপন জানে তার সঙ্গে বেলির আর কখনোই কিছু সম্ভব নয়। কিন্তু কিছুতেই তাকে ভুলতে পারছে না! বেলি কেন এমন করল — এই চিন্তা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সে নিজেও চায় তার ক্যারিয়ার এগিয়ে নিয়ে যেতে, কিন্তু কোনো কিছুতেই আগের মতো মনোযোগ রাখতে পারছে না। স্বপন তাই আমাদের কাছে এসেছিল এমনই সাহায্যের আশায়, যাতে আমরা অতীতকে ভুলতে এবং জীবনে ফিরতে সাহায্য করতে পারি।
**চিকিৎসা**
‘জীবনের শুভসূমহ’ অধ্যায়ে আমরা পড়েছি যে, জীবনে আমাদের ভালো থাকার জন্য কিছু বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ, যার মধ্যে অন্যতম হলো পেশা, জীবনের লক্ষ্য, আসক্তি দূরীকরণ এবং কিছু কাছের বন্ধু। উল্লিখিত সবগুলো বিষয়ই স্বপনের জীবনে অনুপস্থিত। তাই স্বপনের চিকিৎসা শুরু করার সময় আমাদের এই সবগুলো বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু সম্পর্ক নিঃসন্দেহে আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু হেলির সঙ্গে স্বপনের সম্পর্কটা আর সম্ভব নয়, আবার একটি ছয় বছরের সম্পর্কের স্মৃতি মন থেকে মুছে ফেলা যায় না। স্বপনের মূল সেশনে তাই আমরা পরামর্শ দিই — তার জীবনের লক্ষ্য অর্জনের প্রতি অধিক সময় ব্যয় করতে এবং সেই দিকে মনোযোগী হতে। পাশাপাশি অবশ্যই পর্নোগ্রাফি আসক্তি থেকে সরে আসার কৌশলও তাকে দেওয়া হয়। স্বপনের সঙ্গে আমাদের সাইকোথেরাপি সেশনগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল তিনটি—
১. স্বপনের জীবনের ও চরিত্রের ইতিবাচক দিকগুলোকে তার সামনে তুলে ধরা এবং তার দোষগুলোকে ধীরে ধীরে শোধরানোর জন্য উৎসাহিত করা।
২. ‘নির্দিষ্ট একটি জিনিস বা নির্দিষ্ট কোনো চাকরি না হলে জীবন শেষ’ — এই ধারণা থেকে তাকে বের করে নিয়ে আসা।
৩. আসক্তি দূর করে তার জীবনের রুটিন ঠিক করে তাকে স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত করা।
বিষয়টা পরিমাপ করে দেখা যায়, স্বপনের বিষণ্ণতা মাঝারি পর্যায়ের। তাই তাকে আমরা শুধু একটি অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট স্বল্প সময়ের জন্য, স্বল্প মাত্রায় প্রয়োগ করি। কিন্তু তার মূল চিকিৎসায়ই সাইকোথেরাপি, তাই পাশাপাশি সেশন চলতে থাকে। চারটি সেশনের পরে স্বপন এখন তার নিজের জীবনের জটগুলো অনেকটাই নিজেই খুলতে পারছে। আমরা ধীরে ধীরে তার ওষুধও বন্ধ করে দিয়েছি।
স্বপন এখন একটি চাকরি করে। সে গত বছর বিসিএস প্রিলিমিনারিতে টিকেছে, চাকরির পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষার জন্য পড়ছে। সেদিন হঠাৎ অনেক দিন পর তাকে চেম্বারে দেখে বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। একটু লজ্জা পেয়েই বলল, ‘বিয়ের কার্ড দিতে এসেছিলাম, স্যার। অবশ্যই আসবেন।’
📄 কেস স্টাডি ৪: সমস্যা হলো সমস্যা নেই
চম্পা-পরা নাসিমা আক্তার (ছদ্মনাম) যখন আমার চেম্বারে প্রবেশ করলেন, প্রথম দৃষ্টিতে তাকে দেখে মধ্যবয়স্ক মনে হলো। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে, প্রকৃত বয়সের চেয়ে অনেক বেশি বুড়িয়ে গেছেন। দুঃখী চেহারায় কোনো প্রাণের আভা নেই। খুবই ধীরগতিতে হাঁটছেন এবং বসতে বলার পরেও যেন অনেক প্রশ্নগতিতে বসলেন। সমস্যা কী জানতে চাইলে নিচু চোখে বললেন, 'ডাক্তার আমার বড়ো সমস্যা হলো, কোনো সমস্যাই নেই'।
প্রশ্ন করে জানা গেল, তিনি নিজেও বুঝতে পারছেন না, তার আসলে সমস্যা কোথায়। যখন পঞ্চাশের কোঠায়, দুই সন্তান ভালো ঘরে বিয়ে দিয়েছেন। বড়ো সন্তানের ঘরের নাতির মুখও দেখে ফেলেছেন। স্বামীর বয়স ৫৫ হলেও শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন এবং এখনো চাকরি করছেন। আর্থিক, পারিবারিক, শারীরিক সবদিক মিলিয়ে বাহ্যিকভাবে তিনি খুবই ভালো আছেন। তিনি নিজেও তাই মনে করেন। রোগ বলতে শুধু ডায়াবেটিস আছে, তাও সাত-আট বছর হতে চলল। কিন্তু এত দিন কোনো সমস্যাই হয়নি।
বিগত প্রায় দুই-তিন মাস যাবৎ নাসিমা আক্তারের কিছুই ভালো লাগছে না। সকালে ঘুম থেকে উঠতেই ইচ্ছা করে না; চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে মনটা এত খারাপ লাগে যে, সেই কথা বলতে গিয়ে চোখে পানি চলে এল।
'স্যার, আগে রান্না করতে এত ভালো লাগত, ইউটিউব দেখে নতুন রান্না শিখতাম, এখন তাও ভালো লাগে না।' চোখের পানি মুছতে মুছতেই আবার চোখ ভিজে গেল।
রাতে ঘুম হয় না, কিছু খেতেও ইচ্ছা করে না। স্বামী কথা বললেও ভালো লাগে না। নাতীটিকে কোলে নিতেও বিরক্ত লাগে। সারাদিন কিছুই করি না, তাও মনে হয়, এত টায়ার্ড!
'স্যার, আমার তো কোনো দুশ্চিন্তা নেই, সবাই আমাকে গুরুত্ব দেয়। আমার তো কোনো কষ্ট নেই। তাহলে আমার এমন কেন লাগে?' চোখের পানিতে নাসিমা আক্তারের কথা আটকে যাচ্ছে, 'এত সুন্দর সংসার আমার! তাও আমার মাঝেমধ্যে মনে হয়, মরেই যাই!'
'আমার কী হয়েছে? আমি কি ভালো হব স্যার?' জিজ্ঞাসু চোখে কষ্ট ছাড়া এই প্রথম অন্য কোনো অনুভূতি লক্ষ করলাম— যার নাম আশা!
**চিকিৎসা**
নাসিমা আক্তারের সমস্যাটির নাম এনডোজেনাস ডিপ্রেশন। ইতোমধ্যেই আমাদের পূর্বে আলোচনার মাধ্যমে আমরা জানি যে, এনডোজেনাস ডিপ্রেশনের কোনো দৃশ্যমান স্ট্রেস থাকে না, শরীরের নিউরোট্রান্সমিটারের ঘাটতি তার অন্যতম কারণ। নাসিমা আক্তারের ক্ষেত্রেও বিষয়টি এমনই। এ কারণেই তার স্ট্রেস না থাকা সত্ত্বেও বিষণ্ণতার প্রায় সকল উপসর্গ দেখা দিয়েছে। বাকিদের মতো, নাসিমা আক্তারের ক্ষেত্রেও, আমরা তার রোগ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিয়ে চিকিৎসা শুরু করি। তার রোগের যে চিকিৎসা আছে এবং ওষুধে তা প্রায় সম্পূর্ণ সেরে যাবে, তা শুনে নাসিমা আক্তারের চোখে-মুখে আশার আলো ফুটে ওঠে।
যেহেতু আমরা জানি এনডোজেনাস ডিপ্রেশনের মূল চিকিৎসা ওষুধ, তাই নাসিমা আক্তারকে আমরা গুরুত্ব সহমাত্রার একটি অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট দিয়ে চিকিৎসা আরম্ভ করি। তার সবকিছু মাথায় রেখে আমরা ওষুধ ব্যবহার করি। ধীরে ধীরে আমরা ওষুধের মাত্রা প্রয়োজন অনুসারে সামান্য বাড়াই। এরপর নিয়ম মোতাবেক তাকে আমরা নির্দিষ্ট সময় পরপর পর্যবেক্ষণ করতে থাকি।
যেহেতু দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস থাকলে বিষণ্ণতা হতে পারে এবং তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিষণ্ণতার চিকিৎসাও জরুরি, তাই আমরা তাকে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ পরীক্ষা করতে দিই। দেখা গেল, নাসিমা আক্তারের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই তাকে একজন হরমোন বিশেষজ্ঞের কাছেও রেফার করা হয়।
নাসিমা আক্তারের জীবনে কোনো স্ট্রেস নেই, তাই আমরা নিয়মিত সাইকোথেরাপির পরামর্শ দিইনি। কিন্তু একটি সেশনের মাধ্যমে তাকে ঘুমের সমস্যা সমাধানের কিছু কৌশল শিখিয়ে দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফেরত যাওয়ার জন্য নিজের শখগুলোকে আবার শুরু করতেও পরামর্শ দেওয়া হয়। ছয় মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর নাসিমা আক্তার এখন সুস্থ আছেন। তার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আছে, মন খারাপ নেই। তার ঘুমও ভালো হচ্ছে। আমরা ধীরে ধীরে এখন তার ওষুধ কমিয়ে আনছি। ওষুধ যেদিন বন্ধ করব, সেদিন আমাদের জন্য অনেক মজার খাবার রান্না করে এনেছিলেন তিনি।