📄 নেতিবাচক চিন্তা থেকে বের হয়ে আসার তিনটি উপায়
১. ডিরেক্ট এমপিরিক্যাল ডিসপিউট (Direct Empirical Dispute)
ডিরেক্ট এমপিরিক্যাল ডিসপিউট চিন্তা চ্যালেঞ্জ করার জন্য ব্যক্তিকে তার চিন্তার পেছনের যুক্তিকে খুঁজে বের করতে বলা হয়।
যেমন, মালিহা মনে করে, তাকে দিয়ে কিছুই হবে না। কারণ, সে পরীক্ষায় খারাপ করেছে। অথচ সে কিন্তু ভালো ছবি আঁকতে পারে, তার জন্য সে পুরস্কার জিতেছে। তাই তার পছন্দের কাজগুলো নিঃসন্দেহে সে ভালো করে এবং এসব ক্ষেত্রে সে পারদর্শী। তাহলে দেখা গেল, পড়াশোনায় খারাপ করলেই যে তাকে দিয়ে কিছুই হবে না— এই বিশ্বাসের আসলে কোনো ভিত্তি নেই। ধীরে ধীরে মালিহাও বুঝতে পারে আসলে সে অনেক কিছু পারে।
২. এভিডেনশাল ব্যালেন্স শিট (Evidential Balance Sheet)
চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করার দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে আমরা ব্যক্তিকে প্রশ্ন করি, যে চিন্তা আপনাকে সার্বক্ষণিক কষ্ট দিয়ে বেড়াচ্ছে, আসুন আমরা দেখি এর পক্ষে এবং বিপক্ষে কী কী যুক্তি থাকতে পারে। আমরা আগেই বলেছি, বিষণ্ণ ব্যক্তি বেশিরভাগ সময় তার নেতিবাচক দিকগুলোকে ফোকাস করে। এর ফলে ইতিবাচক দিকগুলো তার নজরের আড়ালেই রয়ে যায়। একটি কাগজে পক্ষে এবং বিপক্ষে সুবিধা ও অসুবিধা লিপিবদ্ধ করার মাধ্যমে তিনি ইতিবাচক দিকগুলো দেখতে সক্ষম হন। যেমন, আমরা যদি মালিহার উদাহরণটি নিয়ে কাজ করি, তাহলে দেখা যাবে মালিহা নিম্নোক্ত উপায়ে তার চিন্তাকে লিপিবদ্ধ করবে।
পক্ষে যুক্তি
* পরীক্ষায় খারাপ করেছি
* ছোটোবেলাতেও পরীক্ষায় খারাপ করেছিলাম
* পড়ায় মন দিতে পারছি না
বিপক্ষে যুক্তি
* খালাকে সময় দিই
* ভালো ছবি আঁকি
* মাকে ঘরের কাজে সাহায্য করি
* রান্না করতে পারি
* নিয়মিত ব্যায়াম করি
এভিডেনশাল ব্যালেন্স শিটের মাধ্যমে ব্যক্তিকে দেখানো যায় যে, তার নেতিবাচক চিন্তার পক্ষে প্রমাণ বরাবরই তার জীবনে প্রাপ্তি থেকে কম।
৩. ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ ফ্ল্যাট’ ডিসপিউট (‘The World is Flat’ Dispute)
আসুন, একটি কাল্পনিক কিন্তু বাস্তব কথোপকথন চিন্তা করি–
সাইকোথেরাপিস্ট: আমি যদি বলি পৃথিবী গোল বিশ্বাস করবেন?
মালিহা: না, তা কেন হবে?
সাইকোথেরাপিস্ট: কেন মানবেন না?
মালিহা: কারণ, বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন তথ্য ও গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, পৃথিবী সম্পূর্ণ গোল নয়।
সাইকোথেরাপিস্ট: তাহলে আপনি কেন প্রমাণ দেখার পরেও বিশ্বাস করছেন না যে, আপনি নানা ক্ষেত্রে অনেক পারদর্শী?
মালিহা: (কিছুক্ষণ চুপ থেকে) এভাবে তো আগে ভেবে দেখিনি।
📄 নিজেকে অর্থহীন মনে করার চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর উপায়
নিজেকে অর্থহীন, মূল্যহীন এবং নিষ্প্রয়োজন মনে করা বিষণ্ণ ব্যক্তির অন্যতম একটি মূল বিশ্বাস। এই বিশ্বাস থেকে ব্যক্তিকে বের না করতে পারলে বিষণ্ণতা থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে আসা খুবই কষ্টকর। ‘আমার জীবন অর্থহীন’ – এই বিশ্বাস থেকে উঠে আসার জন্য এই চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করা জরুরি। আমরা নিম্নোক্ত সাতটি উপায়ে আমাদের এই অসুস্থ মূল বিশ্বাসকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করতে পারি। যেমন—
১. ডিরেক্ট চ্যালেঞ্জ (Direct Challenge)
ডিরেক্ট চ্যালেঞ্জ সবচেয়ে বেসিক একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে আমরা ব্যক্তির বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে থাকি। তেমনি আমরা তার নেতিবাচক চিন্তার পেছনে যুক্তি খুঁজতে বলি। আবার এর বিপরীতেও কারণ খুঁজতে বলি। লিপিবদ্ধ করার শেষে দেখা যায়, ব্যক্তি নিজেই দেখতে পায় নিজেকে অর্থহীন মনে না করার পেছনে হাজারো কারণ আছে।
২. এক্সপ্লোরিং ডিসপিউট (Exploring Dispute)
এক্সপ্লোরিং ডিসপিউট অন্যতম মূল একটি কৌশল, যার মাধ্যমে আমরা একজন ব্যক্তির মূল বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে থাকি। যারা নিজেদেরকে নিষ্প্রয়োজন, মূল্যহীন মনে করেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তাদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক। যখনই আমরা ভেতরে ঢুকে এই বিশ্বাসের ভিত্তি দেখার চেষ্টা করি, তাদের কাছে সফল মানুষ পরিমাপের মাপকাঠি হলো কখনো ধন-দৌলত, সৌন্দর্য, শিক্ষা, কখনোবা অনাসক্তি। প্রতিটি মানুষ নিজে তার সত্তার কারণেই মূল্যবান তা আমরা অনেক সময় ভুলে যাই। এক্ষেত্রে আমরা চেষ্টা করি আয়নাতে তার চোখে বাকিদের মূল্য দেখানোর মাধ্যমে নিজের আত্মসম্মান ও বিশ্বাস বাড়ানোর। যেমন, সাইকোথেরাপিস্ট ও মালিহার কিছু ডিসপিউট এক্সপ্লোর করে দেখা যাক—
সাইকোথেরাপিস্ট: আপনার কাছে কেন মনে হয় জীবন অর্থহীন?
মালিহা: আমি পড়তে ভালোবাসি, কিন্তু এখন সেটাতেই মনোযোগ রাখতে পারছি না, তাহলে বেঁচে থেকে লাভ কী?
সাইকোথেরাপিস্ট: আচ্ছা আপনি জীবনের মূল্যকে কীভাবে মাপেন? আপনার মতে, কারা প্রকৃত সফল?
মালিহা: যারা পড়াশোনা করে জীবনে বড়ো কিছু অর্জন করতে পেরেছে তারা।
সাইকোথেরাপিস্ট: তাহলে যারা পড়েনি বা আপনার মতে জীবনে বড়ো কিছু হয়নি, তাদের কি মরে যাওয়া উচিত?
মালিহা: না, না তা কেন হবে?
সাইকোথেরাপিস্ট: ধরুন, একজন তার সন্তানের ক্ষুধার তাড়নায় চুরি করতে বাধ্য হয়েছে, তার কি মরে যাওয়া উচিত?
মালিহা: না।
সাইকোথেরাপিস্ট: আচ্ছা বলুন তো, একজন ব্যক্তি যার হাত-পা নেই বা দেখতে-বলতে পারেন না, তার কি মরে যাওয়া উচিত?
মালিহা: না, সবারই বেঁচে থাকার অধিকার আছে।
সাইকোথেরাপিস্ট: তাহলে আপনি কেন বলছেন, আপনার মরে যাওয়া উচিত?
মালিহা: (ভাবছেন) আসলে হয়তো আমার আরও চেষ্টা করা উচিত।
সাইকোথেরাপিস্ট: আমি আপনার সঙ্গে একমত। আসলে প্রতিটি মানুষ এই কারণেই মূল্যবান যে তারা মানুষ।
৩. পাই চার্ট ডিসপিউট (Pie Chart Dispute)
পাই চার্ট একটি গাণিতিক পদ্ধতি, যা ব্যবহারে আমরা একজন ব্যক্তিকে তার জীবনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক ঘটনা বা দিককে লিপিবদ্ধ করতে বলি। বিষণ্ণতা আমাদের বাধ্য করে জীবনকে টানেল ভিশনে দেখতে অর্থাৎ নেতিবাচক দিকগুলোকে অনেক কাছে থেকে বড়ো করে দেখতে। এভাবে যেকোনো সমস্যাই কাছে থেকে অনেক বড়ো লাগে। জীবনের অন্যান্য ইতিবাচক দিক চিন্তা করলে কিন্তু সমস্যাগুলো অনেক ছোটো। যেমন, মালিহার জীবনের পাই চার্ট করলে দেখা যায়—
স্বাস্থ্য খারাপ + পড়তে পারছি না
মাকে ঘরের কাজে সাহায্য করতে পারি + ভালো ছবি আঁকতে পারি ++
যে কোনো জিনিস আমাদের চোখের সামনে দেখলে আমাদের জন্য বিশ্বাস করতে সহজ হয়। তাই পাই চার্ট ডিসপিউটের মাধ্যমে ব্যক্তির নিজের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া সহজ হয়।
৪. ‘বোল অব ফ্রুট’ ডিসপিউট (‘Bowl of Fruit’ Dispute)
ধরুন, আপনার কাছে ঝুড়ি ভরা ২০টি ফল আছে। আপনি খেতে গিয়ে দেখলেন ঝুড়িতে দুটি ফল নষ্ট। তখন কি আপনি সম্পূর্ণ ঝুড়িটি ফেলে দেবেন? নাকি নষ্ট ফল দুইটি ফেলে বাকিগুলো রাখবেন? নিশ্চয়ই দ্বিতীয় কাজটি করবেন। তাহলে কেন আপনার জীবনে একটি-দুটি সমস্যার কারণে আপনি পুরো জীবনটাকে অর্থহীন মনে করছেন? কেন জীবনের বাকি ভালো কাজগুলো আপনার তখন চোখে পড়ে না? এই ফলের ঝুড়ির মতো জীবনের সমস্যাগুলো অপসারণ করে আমরা বাকি দিকগুলো নিয়ে ভালো থাকতে পারি।
৫. ফিলাসফিক্যাল ইনকনসিসটেন্সি (Philosophical Inconsistency)
ব্যক্তি যদি কোনো ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী হয়ে থাকেন, তবে সেই মূল্যবোধ তার বিষণ্নতা প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। সকল ধর্মেই বলা হয়েছে, সবাই সমান এবং বিপদের অবসান ঘটলে আলো আসবেই। কোনো ধর্মেই জীবনকে অর্থহীন বলা হয়নি। স্বেচ্ছামৃত্যুকে উৎসাহিত করা হয়নি। ধর্মে বিশ্বাসী ব্যক্তিকে তার মূল বিশ্বাস ও মূল্যবোধের মধ্যে দেখিয়ে দিলে সে অধিকাংশ সময় ফিরে আসার চেষ্টা করে।
৬. শ্রেষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা (Speaking to a Best Friend)
ধরুন, আজকে আপনার বন্ধু একটি পরীক্ষাতে খারাপ করেছে কিংবা তার জীবনে একটি বড়ো ধরনের সমস্যা চলছে। তাকে আপনি কী পরামর্শ দিতেন? আপনার বন্ধুকে কি আপনি বলবেন যে, তার জীবন অর্থহীন? বা বলবেন, তার বেঁচে থাকার কোনো মানে নেই? নিশ্চয়ই না, তাই না? তাহলে নিজেকে কেন আপনি প্রতিনিয়ত এ কথাগুলোই বলতে থাকেন? আমাদের বেশিরভাগ মানুষকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে, আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু কে? হয়তোবা আমরা অন্য কারও নাম নেব। কিন্তু আমাদের অনেক সমস্যাই সমাধান হয়ে যাবে যদি আমরা নিজেকে নিজের শ্রেষ্ঠ বন্ধু মনে করি। অর্থাৎ নিজেকে ভালোবাসতে শিখি। নিজেকে ভালোবাসা দোষের কিছু নয়, যতোক্ষণ না এর কারণে আমি অন্যকে ছোটো করছি। তাই আমরা কখনোই নিজেকে সে কথাগুলো বলব না, যে কথাগুলো আমি আমার প্রিয় বন্ধুকে বা কাছের মানুষকে বলি না।
৭. ডিরেক্ট প্রাগমাটিক ডিসপিউট (The Direct Pragmatic Dispute)
ডিরেক্ট প্রাগমাটিক ডিসপিউট ব্যক্তিকে প্রশ্ন করা হয়, তার নেতিবাচক চিন্তার ফলে আদৌ কি তার কোনো লাভ হচ্ছে? দেখা যায়, ব্যক্তি নিজেই উত্তর দেন যে, তার লাভ তো হচ্ছেই না, বরং দিন শুধু নষ্ট হচ্ছে, সমস্যা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে, উল্টো দিকে সে কোনো সমাধানও পাচ্ছে না। জীবনে সবাই আসলে সবকিছু পায় না। কিন্তু প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়েই বেঁচে থাকা।
সমুদ্রে পড়ে গেলে উঠে আসা যায়। কিন্তু কেউ চেহারার ডুবে যেতে থাকলে তাকে বাঁচানো কঠিন। একইভাবে সমস্যায় পড়া কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। কিন্তু কেউ যদি সমস্যা উত্তরণের চেষ্টা না করে এর আরও গভীরে যেতে থাকে, তাহলে দিন দিন সমস্যার সমাধান দুরূহ হয়ে পড়ে।