📄 চিন্তার ত্রুটি এবং প্যারেন্টিং (Parenting)
আমরা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার সময় অহরহ এমন মানুষ দেখি, যারা শিশুকাল থেকেই চিন্তার ত্রুটি বয়ে বেড়াচ্ছেন। এসব চিন্তার মূল খুঁজতে গেলে দেখা যায়, তাদের অভিভাবকত্বে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল, যা তাদের জন্য নেতিবাচক হিসেবে কাজ করেছে। নিঃসন্দেহে কোনো পিতা- মাতাই সন্তানের খারাপ চান না। কিন্তু অনেক সময় অভিভাবক হিসেবে আমাদের কথা বলার ভঙ্গিমা এবং আচরণের জন্য অথবা নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির জন্য সন্তানের মনে এমন কিছু ধারণা বাসা বাঁধে, যা তাদের সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়। এসব ধারণা বাধা হয়ে দাঁড়ায় সন্তানের আত্মবিশ্বাসের পথে। তাই সন্তানকে বর্তমান ও ভবিষ্যতের অসুস্থ চিন্তা থেকে রক্ষা করার জন্য আমরা অধ্যায়ের এই পর্যায়ে জানাব, অভিভাবক হিসেবে কোন চারটি কাজ কখনোই আমাদের করা উচিত নয়।
১. সন্তানকে ত্যাগ লাগাবেন না
অভিভাবক হিসেবে আমরা অনেকেই সন্তানের সঙ্গে কথা বলার সময়, ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন সব শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করে থাকি, যা অপমানজনক, অসম্মানজনক বা তাচ্ছিল্যকর। সব সময় মনে রাখতে হবে যে, বাবা-মা হিসেবে সেই সম্মানটুকু আমার সন্তানকে দিচ্ছি কি না। অনেক সময় দেখা যায়, ছোটোবেলায় বাবা-মার লাগানো ট্যাগ লাইন (যেমন: 'ছাগল', 'গর্দভ' ইত্যাদি) সারা জীবন সন্তান বয়ে নিয়ে চলে যা পরবর্তী সময়ে তার জন্য বিষণ্ণতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২. তুলনা করবেন না
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই আলাদা। ভিন্ন তাদের প্রতিভা, ক্ষমতা। এমনকি ভিন্নতা দেখা যায় সহসীমাতেও। আপনার একজন সন্তান যেমন পড়াশোনায় ভালো হতে পারে, তেমনি হতে পারে অন্য সন্তানের দায়িত্বশীলতা বেশি, হতে পারে অপরজনের মধ্যে সৃজনশীলতা বেশি। কখনোই সন্তানদের এক অপরের সঙ্গে তুলনা করবেন না। এটি তাদের মনে একটি দীর্ঘমেয়াদি ছাপ রেখে দেয়, যে দাগ থেকে তারা বড়ো হয়েও সব সময় মুক্তিলাভ করতে পারে না। মনে রাখবেন, সবাই সব কাজ পারবে না। কিন্তু প্রত্যেকের মধ্যে কিছু কাজ ভালো করার লুকায়িত প্রতিভা আছে। অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো— সেই লুকায়িত প্রতিভাকে বের করে নিয়ে আসা এবং ভালো কাজে অবশ্যই সন্তানকে প্রশংসিত করা। তুলনা করা কখনোই ভালো নয়। তুলনার মাধ্যমে বেড়ে ওঠা সন্তানরা অধিকাংশ সময়ই মানসিকভাবে দুর্বল থাকে।
৩. সন্তানের কাছ থেকে সবকিছু নিখুঁত আশা করবেন না
আমরা নিজেরা কেউই পারফেক্ট নই, তাই সন্তানের কাছ থেকে পারফেকশন আশা করাটা অমানবিক। বাচ্চারা কাজ করতে গেলে ছোটোখাটো ভুল হবেই; অনেক কিছু ভেঙে যাবে, হাত থেকে পড়ে যাবে, এমনও হতে পারে সে বারবার একই ভুল করবে। এটাই স্বাভাবিক। তাকে এটা বোঝাতে হবে, জীবনের সবকিছু কখনো নিখুঁতভাবে হবে না। অভিভাবক হিসেবে যারা সবকিছুতে পারফেকশন আশা করেন, তাদের সন্তান বড়ো হলে ব্যর্থতা মেনে নিতে পারে না। একবার হারের পর অধ্যবসায় ধরে রাখা কষ্টকর হয়।
৪. সন্তানের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবেন না
অনেক অভিভাবকই মনে করেন সন্তানের সব কাজ করে দেওয়ার মধ্যে, সব সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার মধ্যে একধরনের গর্ব করার ব্যাপার আছে। কিন্তু গবেষণা বলে বিষয়টি আসলে এরকম নয়। বরং যে সন্তানেরা ছোটোবেলা থেকেই নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে সক্ষম নয় তারা বড়ো হলেও সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যায় পড়ে থাকে। একইভাবে যারা নিজের কাজ নিজে করে অভ্যস্ত নয়, তারা বড়ো হলেও ছোটোখাটো কাজেই ঘাবড়ে যায়। তাই ছোটোবেলা থেকেই সন্তানকে তার বয়স অনুযায়ী কাজ করতে দিন। সে কোন দিন কোন জামাটি পরবে, কখন পড়াশোনা করবে, কখন কী করতে চায়, কোন বেলা কী দিয়ে ভাত খাবে—এমন ছোটোখাটো সিদ্ধান্ত তাকে নিতে দিন। এতে সন্তানের মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে, যা বড়ো হলে তাকে সাহায্য করে। আমাদের সন্তানের সঙ্গে আচরণের সময় সব সময় মনে রাখা উচিত—প্রতিটি শিশু একজন আলাদা মানুষ। একজনের ব্যক্তিত্ব কীভাবে গড়ে উঠবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে প্যারেন্টিংয়ের ওপর।