📘 ওভারকামিং ডিপ্রেশন > 📄 অ্যালবার্ট এলিসের ১২টি নীতি

📄 অ্যালবার্ট এলিসের ১২টি নীতি


অ্যালবার্ট এলিস ১২টি এমন নীতির কথা বলেন, যা মানুষের মানসিকতাকে ভালো থাকার জন্য কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপিতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

নীতিগুলোর মূলভাব হলো—

১. নিজ স্বার্থ (Self Interest)
জীবনে ভালো থাকতে হলে নিজেকে নিয়ে ভাবাও জরুরি। এর মানে কিন্তু স্বার্থপর হওয়া নয়; বরং ভালো থাকার জন্য নিজের যত্ন নেওয়া। অর্থাৎ সঠিক সময়ে খাওয়া, ঘুমানো, ব্যায়াম করা এবং নিয়মিত নিজের মনের যত্ন নেওয়া।

২. সামাজিক স্বার্থ (Social Interest)
আমরা একটা সমাজে বসবাস করি, সমাজে প্রত্যেকের যেমন একে অপরের সাহায্য দরকার, তেমনই ভালো থাকার জন্য বন্ধু এবং কাছের মানুষকে খুবই প্রয়োজন। দিনশেষে প্রতিটি মানুষকে মনে রাখতে হবে যে, এতখানি আত্মকেন্দ্রিক হওয়া যাবে না যে সমাজের পাশে নিজেকে একা মনে হয়। তাই নিজের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি অবশ্যই বাকিদের ক্ষতি হয় এমন কিছু করা যাবে না।

৩. নিজ লক্ষ্য (Self Direction)
আলবার্ট এলিস মনে করেন, মানুষের জীবনে লক্ষ্য থাকাটা জরুরি। আমাদের কারও জীবন সব সময় মসৃণ নয়। কিন্তু জীবনে আমার আল্টিমেট লক্ষ্য কী তা যদি আমি জেনে থাকি, তবে অনেক সমালোচনা, ভুলিং এবং ছোটাখাটো ব্যর্থতা মেনে নেওয়াটা অনেক সহজ হয়ে দাঁড়ায়। জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজেকে আমি কোথায় দেখতে চাই তার ওপর নির্ভর করবে আমার আচরণ।

৪. নিজেকে মেনে নেওয়া (Self Acceptance)
আমরা অধিকাংশ সময় নিজেকে যাচাই করি মানুষ আমাদের কতটুকু সুনাম করল তার ভিত্তিতে অথবা শুধুই নিজের অর্জনের ভিত্তিতে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি সুস্থ আছি, এটাও নিজেকে মেনে নেওয়ার মতো বা গ্রহণ করার মতো একটি বড়ো অর্জন, যেটাকে অনেক সময় আমরা কোনো অর্জনই মনে করি না। কিন্তু আমি যেমন আছি তেমনি নিজেকে গ্রহণ করা ভালো থাকার জন্য উপকারী। কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপিতে আমরা চেষ্টা করি প্রত্যেকের নিজের চোখে নিজের একটি শক্ত অবস্থান দেখানোর।

৫. হতাশা সহ্যের ক্ষমতা (High Frustration Tolerance)
দেখবেন কিছু মানুষ সব সময় সবকিছুর অ্যাডভেঞ্চার খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু আসলে জীবনে সব সময় এত উত্তেজনা থাকা সম্ভব নয়। অল্পতেই এরা হতাশ হয়ে পড়ে, মনোবল ভেঙে যায়। কাউন্সেলিংয়ের সময় আমরা এদের ক্ষেত্রে সহনক্ষমতা নিয়ে কাজ করি, মনোবল দৃঢ় করতে উৎসাহ দিয়ে থাকি।

৬. নমনীয়তা (Flexibility)
চিন্তা ও আচরণের নমনীয়তা ভালো থাকার জন্য খুবই প্রয়োজন। আমাদের ছোটোবেলায় খারাপ কিছু হয়েছে এর অর্থ কিন্তু এই না যে, জীবনে আর ভালো কিছু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। নিজের চিন্তাকে যদি গড়বাঁধা পদ্ধতিতে এগিয়ে নিয়ে যাই এবং ব্যবহার অনমনীয় রাখি তাহলে সুখী হওয়া কষ্টকর হয়ে পড়বে। কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপির মাধ্যমে আমরা চিন্তাকে শিথিল করানোর চেষ্টা করে থাকি এবং পৃথিবীকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখানোর চেষ্টা করে থাকি।

৭. বৈজ্ঞানিক চিন্তা (Scientific Thoughts)
কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপিতে আমরা সব সময়ই মানুষকে ধাবিত করি যুক্তিপ্রয়োগগত, বৈজ্ঞানিক এবং বাস্তবসম্মত চিন্তার দিকে। এজন্যেই আমরা সব সময়ই তার চিন্তাগুলোকে প্রশ্ন করি– আপনি যে এমন ভাবছেন, কেন ভাবছেন? এর পেছনে যুক্তি কী? যেগুলোর পেছনে আমরা যথাযথ প্রমাণ খুঁজে পাব না, সেই চিন্তাগুলোকে আমরা বিশ্বাস করতে নিরুৎসাহিত করি।

৮. ঝুঁকি গ্রহণ (Risk-taking)
কথায় আছে, ‘কষ্ট না করলে, কেষ্ট মেলে না’। অর্থাৎ জীবনে কোনো কিছু অর্জন করতে হলে আপনাকে অবশ্যই কিছু কষ্ট করতে হবে। অবশ্যই অহেতুক ঝুঁকি নয়, কিন্তু বাস্তবসম্মত কিছু ঝুঁকি না নিয়ে যদি আমরা সব সময় সবকিছুতে স্বস্তি ও আরাম খুঁজে বেড়াই, তাহলে জীবনে বড়ো কোনো কিছু অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। অনেকেই নতুন কিছু শিখতে বা নতুন পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে ভীতি অনুভব করে। কিন্তু এই ভীতি দূর না করা পর্যন্ত জীবন একই জায়গায় আটকে থাকবে এবং এগোনোও সম্ভব হবে না। এমন চিন্তা বা ধারণাই আমাদের পিছিয়ে পড়ার জন্য যথেষ্ট।

৯. অনিশ্চয়তা মেনে নেওয়া (Acceptance of Uncertainty)
আমরা অনেকেই খুব সুনিশ্চিত জীবন চাই, যেন সবকিছু ছকে বাঁধা থাকবে; আমি যেমনটা চাই, তেমনি হবে। কিন্তু আদৌ কি তা সম্ভব? আমাদের জীবনে আগামীকাল কী হবে তা আমরা জানি না। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই অনিশ্চয়তায় ভরা। এই অনিশ্চয়তাকে আমাদের মেনে নিতে হবে। আমাদের জীবনের সবটুকু আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। কিন্তু যতটুকু আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, ততটুকু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা কখনো ছাড়া যাবে না। কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপিতে এই বিশ্বাসের ওপর আমরা খুব জোর দিয়ে থাকি।

১০. দীর্ঘমেয়াদি হেডোনিজম (Long-term Hedonism)
যেকোনো কাজ করার সময় এর দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া চিন্তা করা উচিত। আমরা অনেক সময় ক্ষণস্থায়ী সুখের জন্য অনেক দীর্ঘস্থায়ী বিপদ, কষ্ট বা সমস্যা ডেকে আনি। যেমন, যারা সিগারেট সেবন করেন বা অধিক পরিমাণে খাদ্য গ্রহণ করেন, ভবিষ্যতে এর ফলাফল কী হতে পারে তা ভাবেন না। অবস্থার পরিবর্তন আনতে হলে অবশ্যই ভবিষ্যতের ফলাফলকে মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

১১. নন-ইউটোপিয়ানিজম (Non-Utopianism)
আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে যে, আমরা কেউই পারফেক্ট নই, তেমনি পারফেক্ট নয় আমাদের কারও জীবন। আমাদের কষ্ট লাগতে পারে, আমরা কাঁদতে পারি, আমরা কারও সঙ্গে আমাদের কষ্ট নিয়ে কথা বলতে পারি, আমাদের মাথায় নেতিবাচক চিন্তা আসতে পারে। সব সময় জীবন ভালো নাও কাটতে পারে। নিজেকে অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, মানসিক সুস্বাস্থ্যের জন্য সব সময় ইতিবাচক থাকা আসলে সম্ভব নয়।

১২. নিজ অনুভূতির দায়ভার (Responsibility for One's Own Emotional Response)
কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপির অন্যতম মূলভিত্তি হলো এই বিশ্বাস যে, অনুভূতির নিয়ন্ত্রণ আমার হাতে এবং অন্য কেউ আমার কষ্ট সুখ বা কোনো কিছুুর জন্য দায়ী হতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাকে আমি এই ক্ষমতা প্রদান করব। আমাদের রাগ, ঘৃণা, দুঃখের দায়ভার দিনের পর দিন অন্যের কাঁধে ঝুলিয়ে দেওয়াটা আসলে আমাদের কোনো উপকারে আসে না। নিজের চিন্তা ও মনোভাব বদলাতে হলে প্রথমেই নিজের অনুভূতিগুলোর দায়ভার নিজেকে নিতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00