📄 মনোযোগ ধরে রাখার আটটি কৌশল
১. বিমগ্নতার চিকিৎসা
খুব সহজভাবে বলতে গেলে, মনে করুন, আপনার জ্বর হয়েছে। জ্বরের কারণে মাথা ও ঘাড়ব্যথা করছে। এক্ষেত্রে মাথাঘষা কমাতে হলে আপনাকে অবশ্যই জ্বর কমাতে হবে অর্থাৎ জ্বরের চিকিৎসা করতে হবে। একইভাবে বিমগ্নতার একটি খুবই সাধারণ উপসর্গ হলো— কাজে মনোযোগ না থাকা, যা আমরা প্রথম অধ্যায়ে দেখে এসেছি। তাই, যদি আপনার মনোযোগের অভাবের কারণ হয় ‘বিমগ্নতা’, তবে এর চিকিৎসা হবে— বিমগ্নতারই চিকিৎসা। এক্ষেত্রে আপনি শুধু ওষুধ বা কাউন্সেলিং না নিয়ে অর্থাৎ বিমগ্নতাকে উপেক্ষা করে কিছুতেই আপনার মনোযোগ বাড়াতে সক্ষম হবেন না। উল্লেখ্য যে, বিমগ্নতা ছাড়াও দুশ্চিন্তাজনিত কারণে মানসিক রোগ অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার রোগসহ আরও কিছু মানসিক রোগ তীব্রভাবে মনোযোগ কমিয়ে যেতে দেখা যায়। এসব ক্ষেত্রে আগের রোগের চিকিৎসা করতে হবে। এতে অধিকাংশ সময়ই মনোযোগ আপনা-আপনি ঠিক হয়ে যাবে।
২. অধিকসংখ্যক ইন্দ্রিয়কে একসঙ্গে কাজে লাগানো
বলা হয়, আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মধ্যে আমরা যে ইন্দ্রিয়কে যত বেশি কোনো কাজে ব্যবহার করব, সেই তথ্য আমাদের মস্তিষ্কে তত দীর্ঘস্থায়ী হবে। যেমন ধরুন, আমরা যখন পড়তে বসি, তখন আমরা চোখ দিয়ে লেখাজোখে পড়ি অর্থাৎ এখানে আমরা চোখের ইন্দ্রিয়কে ব্যবহার করি। এখন একই সঙ্গে যদি আমরা সামান্য উচ্চারণ করে পড়ি। যাতে আমাদের কানে পড়ার কথাগুলো আসে এবং লিখে লিখে পড়ার অভ্যাস করি, তাহলে সেই একই জিনিস আমাদের মনে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে, যেন আমাদের মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হয়ে না যায়। যেমন, আমি পড়তে বসলাম, হঠাৎ ফোন বেজে উঠল অথবা কেউ আমাকে ডাক দিল। এক্ষেত্রে মনোযোগ থাকার সম্ভাবনা কমে যায়।
৩. স্ক্যানিং
স্ক্যানিং বলতে মূলত বোঝার কোনো কিছুকে খুঁটিয়ে দেখা। আপনি যদি যেকোনো বিষয়ে দুটি পৃষ্ঠা পড়তে চান, তবে খুব দ্রুত পৃষ্ঠা দুটির ওপর চোখ বুলিয়ে নিন এবং কোন জিনিসগুলো আপনাকে পড়ার সময় গুরুত্ব দিতে হবে, সেগুলোকে বেছে ফেলুন। গবেষণা বলে, এক বার ধীরে যেকোনো কিছু পড়ার চাইতে দুই বার দ্রুত স্ক্যানিং মস্তিষ্কে কোনো তথ্য ধারণ করার জন্য অধিক উপযোগী।
৪. দিনের শুরু ও শেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা
দিনের শুরুতে সব সময় আমাদের মস্তিষ্ক সতেজ থাকে, তাই যদি কোনো কিছুকে মনে রাখতে চান, সেটি আপনি যখন পড়া শুরু করবেন, তখন আয়ত্ত করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। এতে একই সঙ্গে যেমন আপনি কাজে এগিয়ে যাবেন, তেমনই আপনার আত্মবিশ্বাসও বাড়বে। একইভাবে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় ১০-১৫ মিনিট সারাদিন আপনি যা পড়েছেন তার সারমর্ম দেখে নেওয়া ঘুমাতে যাওয়ার সময়ে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলে। ফলে পরের দিন কাজ শুরু করার সময় আপনি এক ধাপ এগিয়ে থাকেন।
৫. সময় ধরে পড়া
আমাদের মস্তিষ্ক কখনোই ৪৫ মিনিটের বেশি একটানা মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। তাই গবেষণা বলে, আপনি যদি ৪৫ মিনিট পড়াশোনা করে পাঁচ মিনিটের বিরতি বা আগের ৪৫ মিনিটের পড়াটাকে একনজরে একবার দেখেন, তাহলে মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এরপর আবার ৪৫ মিনিটের জন্য পড়াশোনা করুন এবং পুনরায় পাঁচ মিনিটের জন্য বিষয়গুলো দেখে নিন। এই পদ্ধতি যেকোনো বিষয়কে তৎক্ষণাৎ স্মৃতি থেকে তুলনামূলক বেশি স্থায়ী স্মৃতিতে রূপান্তর করতে খুবই কার্যকর।
ঙ. একঘেয়েমির সময় পড়াশোনা না করা
আমরা প্রায়শই যেই ভুলটা করে থাকি তা হলো, ‘ঘুমভাব থাকলেও বা কোনো একটি বিষয় পড়তে ভালো না লাগলেও আজ এটি শেষ করতেই হবে— এমন ভাব নিয়ে ওই একই বিষয় পড়ার চেষ্টা করতে থাকি। কিন্তু এই মনোভাব আমাদের সাহায্য না করে বরং ক্ষতিই বেশি করে। যদি কখনো আপনি লক্ষ করেন আপনার এক ঘণ্টায় ১০ পৃষ্ঠার কম অথবা পাঁচ মিনিটে এক পৃষ্ঠার কম পড়া হচ্ছে তখন—
* ২০-৩০ মিনিটের একটি ‘পাওয়ার ন্যাপ’ নিয়ে নিতে পারেন।
* ভালো লাগে এমন একটি বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতে পারেন।
চ. আলোচনা করে পড়া
একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করে পড়াশোনা করা বেশির ভাগ সময় আমাদের মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতাকে বাড়ায়। এক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি—
* আলোচনা করার টিমে দুজন হলেই ভালো হয়।
* আলোচনার সময় কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে ফোকাস রাখার চেষ্টা করুন।
* সম্পূর্ণ আলোচনাতে ফোকাস করতে না পারলে নির্দিষ্ট সময় ধরে আকাদেমিক আলোচনা করাই শ্রেয়।
ছ. পড়াশোনা করার অনুপ্রেরণা
আপনি খেয়াল করলেই দেখতে পাবেন, আমরা ভেতর থেকে যে জিনিসটা চাই, তার প্রতি অনুপ্রাণিত বোধ করি। একইভাবে যা আসলে আমরা নিজে কখনো চাই না, সেই বিষয়ে আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করা বরাবরই কষ্টকর। তাই সব সময় জানতে চেষ্টা করতে হবে, যেকোনো কিছু আমি কেন করতে চাই। যেমন, আপনি কেন পড়তে চান? বা আপনি কেন ডাক্তার হচ্ছেন? আপনি কেন শিক্ষক হতে চান? যদি মন থেকে আপনি এটার উত্তর খুঁজে নিতে পারেন, তবে খুব সহজেই আপনি নিজেই কাজের প্রতি অনুপ্রাণিত থাকবেন। এক্ষেত্রে আমি সবাইকে বলি, নিজের জীবনের জন্য একটি ৩০ বছরের পরিকল্পনা করে সে অনুযায়ী ২০ বছর, ১০ বছর, পাঁচ বছর, তিন মাস এভাবে সাজিয়ে নিতে। আপনি যখন আপনার ঠিকানা জানবেন, তখন পথিপৃথ্বি খুঁজে নেওয়া অনেক সহজ। এই কৌশলগুলো মেনে চললে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আপনার মনোযোগের সমস্যা দূর হয়ে যাবে।