📄 দশমত, বিক্ষিপ্ত কিছু বিষয়ে অপরের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
১. যার কাছে আনন্দের কিছু এসেছে, তার আনন্দে শরিক হয়ে এবং তাকে অভিনন্দন জানিয়ে তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
যেমনটি ঘটেছিল কাব (রা)-এর ক্ষেত্রে। তিনি তাবুক যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে রয়েছিলেন। ফলে মুসলিমরা সবাই তাঁকে পঞ্চাশ রাত বর্জন করেছিল। তিনি কঠিন এক বিপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন। এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁদের তাওবা কবুল করে আয়াত নাজিল করেন। এই সংবাদে সাহাবিগণ অনেক অনেক আনন্দিত হয়েছিলেন। এই অবস্থার বিবরণ দিয়ে কাব (রা) বলেন :
‘যার শব্দ আমি শুনেছিলাম, সে যখন আমার কাছে সুসংবাদ প্রদান করতে আসলো, তখন আমাকে সুসংবাদ প্রদান করার শুকরিয়াস্বরূপ আমার নিজের পরনের কাপড়দুটো খুলে তাকে পরিয়ে দিলাম। আল্লাহর শপথ, সে সময় ওই দুটো কাপড় ব্যতীত আমার কাছে আর কোনো কাপড় ছিল না। ফলে আমি দুটো কাপড় ধার করে পরিধান করলাম। এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে রওনা হলাম। লোকেরা দলে দলে আমাকে ধন্যবাদ জানাতে আসতে লাগল। তাঁরা তাওবা কবুলের মুবারকবাদ জানাচ্ছিল। তাঁরা বলছিল, “তোমাকে মুবারকবাদ যে, আল্লাহ তাআলা তোমার তাওবা কবুল করেছেন।” অবশেষে আমি মসজিদে প্রবেশ করলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) সেখানে বসা ছিলেন এবং তাঁর চতুস্পার্শ্বে জনতার সমাবেশ ছিল। তালহা বিন উবাইদুল্লাহ (রা) দ্রুত উঠে এসে আমার সঙ্গে মুসাফাহা করলেন এবং মুবারকবাদ জানালেন। আল্লাহর কসম, তিনি ব্যতীত আর কোনো মুহাজির আমার জন্য দাঁড়াননি। আমি তালহার ব্যবহার ভুলতে পারব না।’
ইবনে হাজার (র) এই হাদিসের ফায়দা উল্লেখ করে বলেন :
‘কল্যাণের ব্যাপারে সুসংবাদ প্রদানে ছুটে যাওয়া এবং যে নতুন কোনো নিয়ামত অর্জন করেছে, তাকে অভিবাদন জানানো এবং যখন সে এগিয়ে আসে, তখন তার জন্য দাঁড়ানো (এই হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়)।’
২. নিকটজনকে কষ্ট দেয় এমন বিষয়ে মানুষের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
আত্মীয়তার বন্ধনের ফলে আপনার আত্মীয় যাতে আক্রান্ত হয়েছেন, আপনিও তাতে আক্রান্ত হয়েছেন। কেউ কষ্ট পেলে তার আত্মীয়ও সে কষ্ট অনুভব করে। ইসলাম এই অনুভূতির মূল্যায়ন করেছে; যতক্ষণ না তা আত্মীয়তার মহব্বত বা শরিয়তের বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হয়। এই ক্ষেত্রে মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করবে; যদিও অন্যরা তার প্রতি ক্রোধান্বিত হয়।
মুগিরাহ বিন শুবা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন :
لَا تَسُبُّوا الْأَمْوَاتَ فَتُؤْذُوا الْأَحْيَاءَ
‘তোমরা মৃতদের গালি দিয়ে জীবিতদের কষ্ট দিয়ো না।’
মিসওয়ার বিন মাখরামাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
‘আবু জাহেলের কন্যার কাছে আলি (রা) বিবাহের প্রস্তাব পাঠালেন। ফাতিমা (রা) এই খবর শুনতে পেয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট এসে বললেন, “আপনার গোত্রের লোকজন মনে করে যে, আপনি আপনার মেয়েদের সম্মানে রাগান্বিত হন না। আলি তো আবু জাহেলের কন্যাকে বিবাহ করতে প্রস্তুত।” রাসূলুল্লাহ (সা) তা শুনে খুতবা দিতে প্রস্তুত হলেন।’ মিসওয়ার বলেন, ‘তিনি যখন হামদ ও সানা পাঠ করেন, তখন আমি তাঁকে বলতে শুনেছি যে,
أَمَّا بَعْدُ أَنْكَحْتُ أَبَا الْعَاصِ بْنَ الرَّبِيعِ، فَحَدَّثَنِي وَصَدَقَنِي، وَإِنَّ فَاطِمَةَ بَضْعَةٌ مِنِّي وَإِنِّي أَكْرَهُ أَنْ يَسُوءَهَا، وَاللَّهِ لَا تَجْتَمِعُ بِنْتُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَبِنْتُ عَدُوِّ اللَّهِ، عِنْدَ رَجُلٍ وَاحِدٍ
“পর-সমাচার, আমি আবুল আস বিন রবির নিকট আমার মেয়েকে বিবাহ দিয়েছিলাম। সে আমার সঙ্গে যা বলেছে, সত্যই বলেছে। আর ফাতিমা আমার টুকরা; তাঁর কোনো কষ্ট হোক, তা আমি কখনো পছন্দ করি না। আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসূলের মেয়ে এবং আল্লাহর দুশমনের মেয়ে একই লোকের নিকট একত্রিত হতে পারে না।”
আলি (রা) তাঁর বিবাহের প্রস্তাব উঠিয়ে নিলেন।’ মুহাম্মাদ বিন আমর বিন হালহালা মিসওয়ারের সূত্রে অতিরিক্ত বর্ণনা করে বলেন, ‘আমি নবীজি (সা)-কে বনি আবদে শামস গোত্রে তাঁর এক জামাতার ব্যাপারে অত্যন্ত প্রশংসা করতে শুনেছি। নবিজি (সা) বলেন, (حَدَّثَنِي فَصَدَقَنِي، وَوَعَدَنِي فَوَفَى لِي) “সে আমাকে যা বলেছে, সত্য বলেছে। যা ওয়াদা করেছে, তা পূর্ণ করেছে।”
অন্য এক বর্ণনায় আছে :
وَإِنِّي لَسْتُ أُحَرِّمُ حَلَالًا، وَلَا أُحِلُّ حَرَامًا، وَلَكِنْ وَاللَّهِ لَا تَجْتَمِعُ بِنْتُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَبِنْتُ عَدُوِّ اللَّهِ أَبَدًا
‘আর নিশ্চয় আমি কোনো হালালকে হারাম করতে পারি না এবং কোনো হারামকে হালাল করতে পারি না। তবে আল্লাহর শপথ, আল্লাহর রাসূলের কন্যা এবং আল্লাহর শত্রুর কন্যা কখনো একত্রিত হতে পারে না।’
এর থেকে একাধিক বিয়ে হারাম হওয়া বা আল্লাহ যা হালাল করেছেন, তা হারাম হওয়ার বিষয় বোঝা যায় না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কন্যা ও আল্লাহর শত্রুর কন্যা সতীন হিসেবে একই পরিবারে একত্রিত হওয়া আত্মমর্যাদার বিরোধী। অনেক সময় তাদের শত্রুতার প্রভাব তাদের পিতাদের পর্যন্ত গড়াবে। কারণ, তাদের একজনের পিতা হলেন ইমানের সর্দার এবং অপরজনের পিতা হলো কুফরের সর্দার এবং আল্লাহর নবীর সবচেয়ে বড় শত্রু। সুতরাং তখন আবু জাহেলের কন্যার মাঝে স্বজনপ্রীতি ঢুকতে পারে বা অন্তরে আল্লাহর নবীর ব্যাপারে কোনো মন্দ ধারণা উদিত হতে পারে। ফলে বাবার সাথে জাহিলি স্বজনপ্রীতির কারণে শরিয়তের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে সে ধ্বংস হবে। সম্ভবত নবিজি (সা) এই কথার মাধ্যমে এদিকেই ইঙ্গিত করেছেন, ‘আল্লাহর শপথ, আল্লাহর রাসূলের কন্যা এবং আল্লাহর শত্রুর কন্যা একই লোকের কাছে একত্রিত হতে পারে না।’ আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞাত।
বর্ণিত আছে যে, নবিজি (সা)-এর কোনো মেয়েকে বিয়ে করার মতো মর্যাদা যে কেউ অর্জন করতে পারে না। সুতরাং যাকে আল্লাহর নবি (সা) এই মর্যাদায় বিশেষায়িত করেছেন, তার জন্য আবশ্যক হলো, সমমূল্যের জিনিসের মাধ্যমে এই অনুগ্রহ ও মর্যাদার মূল্যায়ন করা। সুতরাং সে এমন কোনো কাজ করবে না, যার কারণে নবিজি (সা)-এর কন্যা কষ্ট পায়। যেমনটি আবুল আস বিন রবির ক্ষেত্রে হয়েছে; যার প্রশংসা নবি (সা) এভাবে করেছেন :
‘আমি আবুল আস বিন রবির নিকট আমার মেয়েকে বিবাহ দিয়েছিলাম। সে আমার সঙ্গে যা বলেছে, সত্যই বলেছে।’
ইমাম নববি (র) বলেন :
‘আলিমগণ বলেছেন, এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, নবিজি (সা)-কে যেকোনো অবস্থায় এবং যেকোনো সুরতে কষ্ট দেওয়া হারাম। যদিও এ কষ্টটা তাঁর জীবিতাবস্থায় কোনো বৈধ বিষয়ে হয়ে থাকে। তাঁরা বলেন, নবিজি (সা) খুব ভালোভাবেই জানতেন যে, আলি (রা)-এর জন্য আবু জাহেলের মেয়েকে বিয়ে করা বৈধ। কারণ, তিনি বলেছেন, “আমি কোনো হালালকে হারাম করছি না।” কিন্তু তিনি নিম্নোক্ত দুটি কারণে এই দুই কন্যাকে একত্রিত করা নিষেধ করেছেন :
প্রথমত, এর ফলে ফাতিমা (রা)-এর কষ্ট হবে; আর তখন নবিজি (সা)-ও কষ্ট পাবেন। ফলে যে কষ্ট দেবে, সে ধ্বংস হবে। এ কারণেই নবিজি (সা) আলি ও ফাতিমা (রা)-এর প্রতি পরিপূর্ণ স্নেহের ফলে এ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন।
দ্বিতীয়ত, আত্মমর্যাদার কারণে ফাতিমা (রা) ওপর ফিতনার আশঙ্কা করেছেন। আরও বলা হয়ে থাকে যে, এখানে নিষেধ দ্বারা একত্রিত করা নিষেধ করা হয়নি। বরং এর অর্থ হলো, আমি আল্লাহর অনুগ্রহ ভালোভাবে জানি যে, তারা দুজন একত্রিত হবে না। আবার এর দ্বারা একত্রিত হওয়া হারামও উদ্দেশ্য হতে পারে। আর “আমি কোনো হালালকে হারাম করি না”—এর অর্থ হলো, আমি আল্লাহর হুকুমের বিপরীত কোনো কথা বলি না। তখন আমি তা যখন কোনো জিনিস হালাল করেছেন, তখন আমি তা হারাম করি না। আর যখন তিনি কোনো জিনিস হারাম করে দিয়েছেন, আমি তা হালাল করি না। আর আমি তার হারামের ব্যাপারে চুপও থাকি না; কারণ, আমার চুপ থাকা বৈধতার দলিল...’
ইবনুল কাইয়িম (র) বলেন, ‘এই হাদিসে যেকোনো দিক দিয়ে নবিজি (সা)-কে কষ্ট দেওয়াকে হারাম করা হয়েছে; যদিও কাজটি বৈধ কাজ হয়। যখন ওই বৈধ কাজের মাধ্যমে নবিজি (সা) কষ্ট পাবেন, তখন সেটি করা জায়েজ হবে না। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمَا كَانَ لَكُمْ أَنْ تُؤْذُوا رَسُولَ اللَّهِ
“এটি তোমাদের জন্য সংগত নয় যে, তোমরা আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেবে।”
এখানে এ বিষয়টিও বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পরিবার-পরিজনকে কষ্ট দেওয়া তাঁকে কষ্ট দেওয়ারই নামান্তর।’
আওনুল মাবুদ গ্রন্থে এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে :
“আর আমি কোনো হালালকে হারাম করি না এবং কোনো হারামকে হালাল করি না। কিন্তু আল্লাহর শপথ, তারা একত্রিত হবে না।” এখানে আলি (রা)-এর জন্য আবু জাহেলের কন্যাকে বিয়ে করার বৈধতার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। কিন্তু তার কন্যা ও নবিজি (সা)-এর কন্যা ফাতিমার মাঝে একত্রিত করতে নিষেধ করেছেন। কারণ, এতে ফাতিমা (রা) কষ্ট পাবেন এবং তাঁর কষ্টের কারণে নবিজি (সা) কষ্ট পাবেন। আর নবিজি (সা) ফাতিমার আত্মমর্যাদার কারণে তাঁর ওপর ফিতনার আশঙ্কা করেছিলেন।
৩. বিয়ের আকদের ক্ষেত্রে কুমারী মেয়ের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
লজ্জা নারীর স্বভাব, লজ্জা নারীর ভূষণ। আর কুমারী মেয়েরাই সবচেয়ে বেশি লজ্জাশীলা হয়ে থাকে। তাই ইসলাম বিবাহের আকদ বা চুক্তি সম্পন্নের সময় এ বিষয়টির প্রতি লক্ষ রেখেছে। যদিও বিয়ের আকদ সম্পন্ন হওয়ার জন্য স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা শর্ত এবং এ ছাড়া বিয়ে পূর্ণতা লাভ করবে না; কিন্তু ইসলাম কুমারী মেয়ের অনুভূতি ও তার লজ্জার প্রতি খেয়াল রেখেছে—যা তাকে মুখে বিয়ের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশে বাধা প্রদান করে। তাই বিয়ের অনুমতির ক্ষেত্রে তার চুপ থাকাই যথেষ্ট এবং তার এই চুপ থাকাকেই স্বীকার করে নেওয়া হিসেবে ধরা হয়েছে।
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন :
لَا تُنْكَحُ الأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ، وَلَا تُنْكَحُ البِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ» قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَكَيْفَ إِذْنُهَا؟ قَالَ: «أَنْ تَسْكُتَ»
‘কোনো বিধবা নারীকে তার সম্মতি ব্যতীত বিয়ে দেওয়া যাবে না এবং কুমারী মহিলাকে তাঁর অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।’ লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, ‘হে আল্লাহর রাসূল, কেমন করে তার অনুমতি নেওয়া হবে?’ তিনি বললেন, ‘তার চুপ থাকাটাই তার অনুমতি।’
৪. জাহিলিয়াত থেকে দ্বীনের পথে নতুন প্রত্যাবর্তনকারী ব্যক্তির অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
সত্যবাদী দায়ি আল্লাহর দ্বীনের প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সকল বৈধ মাধ্যম গ্রহণ করেন। এ ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) হলেন সর্বোত্তম আদর্শ। কারণ, তিনি বৈধ পদ্ধতিগুলো ওই সকল লোকের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন, যারা একসময় তাঁর ও মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল এবং যারা ইসলামের দাওয়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এবং এর বিকাশকে শুরুর সময়ই জ্যান্ত কবর দিতে চেষ্টা করেছিল। রাসূল (সা) তাদেরকে কাছে টেনে নিয়েছেন। হুনাইনের যুদ্ধের গনিমত তাদের মাঝে এমনভাবে বণ্টন করেছেন যে, যাতে তারা আর কোনো দরিদ্রতার ভয় না করে। যা আনসারদের মাঝে আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি করে দিয়েছিল। তখন নবিজি (সা) আনসারদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন :
إِنَّ قُرَيْشًا عَهْدٌ بِجَاهِلِيَّةٍ وَمُصِيبَةٍ، وَإِنِّي أَرَدْتُ أَنْ أَجْبُرَهُمْ وَأَتَأَلَّفَهُمْ، أَمَا تَرْضَوْنَ أَنْ يَرْجِعَ النَّاسُ بِالدُّنْيَا، وَتَرْجِعُونَ بِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى بُيُوتِكُمْ» قَالُوا: بَلَى، قَالَ: «لَوْ سَلَكَ النَّاسُ وَادِيًا، وَسَلَكَتِ الأَنْصَارُ شِعْبًا، لَسَلَكْتُ وَادِيَ الأَنْصَارِ، أَوْ شِعْبَ الأَنْصَارِ»
‘কুরাইশরা সবেমাত্র জাহিলিয়াত ছেড়েছে আর তারা দুর্দশাগ্রস্ত। তাই আমি তাদেরকে অনুদান দিয়ে তাদের মন জয় করার ইচ্ছা করেছি। তোমরা কি সন্তুষ্ট নও যে, লোকেরা পার্থিব সম্পদ নিয়ে ফিরে যাবে আর তোমরা তোমাদের ঘরে ফিরে যাবে আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে।’ তারা বলল, ‘অবশ্যই আমরা সন্তুষ্ট।’ তিনি আরও বললেন, ‘যদি লোকজন উপত্যকা দিয়ে চলে আর আনসাররা গিরিপথ দিয়ে চলে, তাহলে আনসারদের গিরিপথ—অথবা বলেছেন—আনসারদের উপত্যকা দিয়েই আমি চলব।’
৫. নিজের জন্মভূমি ছেড়ে আসা ব্যক্তির অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবিজি (সা) যখন মদিনায় আগমন করলেন, তখন আবু বকর (রা) ও বিলাল (রা) ভীষণ জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। আমি তাঁদের দেখতে গেলাম। বললাম, “আব্বাজান, কেমন আছেন? হে বিলাল, আপনি কেমন আছেন?”’ আয়িশা (রা) বলেন, আবু বকর (রা) জ্বরাক্রান্ত হলেই এ পঙক্তিগুলো আবৃত্তি করতেন :
كل امرئ مصبح في أهله *** والموت أدنى من شراك نعله
“প্রত্যেকেই স্বীয় পরিবারের মাঝে সকালে উপনীত হয়; অথচ মৃত্যু তার জুতোর ফিতা অপেক্ষা সন্নিকটে।”
আর বিলাল (রা) নিজের জ্বর থেকে সেরে উঠলে উচ্চস্বরে এই কবিতা আবৃত্তি করতেন :
ألا ليت شعري هل أبيتن ليلة *** بواد وحولي إذخر وجليل
وهل أردن يوما مياه مجنة *** وهل يبدون لي شامة وطفيل
“হায়, আমি যদি জানতাম আমি এ মক্কা উপত্যকায় আবার রাত কাটাতে পারব কি না! যেখানে আমার চারপাশে থাকত ইজখির ও জালিল ঘাস। মাজান্না ঝরনার পানি পানের সুযোগ আর হবে কি? আমার সামনে উদ্ভাসিত হবে কি শামা ও তাফিল পাহাড়?”
আয়িশা (রা) বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট এসে তাঁকে এ সংবাদ জানালাম। তিনি বললেন :
اللَّهُمَّ حَبِّبْ إِلَيْنَا المَدِينَةَ كَحُبِّنَا مَكَّةَ أَوْ أَشَدَّ وَصَحِّحْهَا وَبَارِكْ لَنَا فِي صَاعِهَا وَمُدِّهَا، وَانْقُلْ حُمَّاهَا فَاجْعَلْهَا بِالْجُحْفَةِ
“হে আল্লাহ, মদিনাকে আমাদের প্রিয় করে দিন, যেমন প্রিয় ছিল আমাদের মক্কা। আমাদের জন্য মদিনাকে স্বাস্থ্যকর করে দিন। মদিনার সা’ ও মুদের মধ্যে বরকত দান করুন। আর এখানকার জ্বরকে সরিয়ে জুহফায় নিয়ে যান।”
এই হলো নবিজি (সা)-এর পক্ষ থেকে দুআ। এতে তাঁর সাথিদের অনুভূতির মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং তাঁদের মুসিবতকে হালকা করা হয়েছে।
টিকাঃ
১২৬. সহিহুল বুখারি : ৫২৮৩।
১২৭. সহিহুল বুখারি : ৪৪১৮।
১২৮. ফাতহুল বারি : ৮/১২৪।
১২৯. সুনানুত তিরমিজি : ১৯৮২।
১৩০. সহিহুল বুখারি : ৩৭২৯।
১৩১. সহিহুল বুখারি : ৩১১০।
১৩২. শারহুন নববি আলা মুসলিম : ৩/১৬।
১৩৩. সুরা আল-আহজাব, ৩৩ : ৫৩।
১৩৪. হাশিয়াতু ইবনিল কাইয়িম আলা সুনানি আবি দাউদ : ৬/৫৫-৫৬।
১৩৫. আওনুল মাবুদ : ৬/৫৫।
১৩৬. সহিহুল বুখারি : ৫১৩৬, সহিহ মুসলিম : ১৪১৯।
১৩৭. সহিহুল বুখারি : ৪৩৩৪, সহিহ মুসলিম : ১০৫৯।
১৩৮. সহিহুল বুখারি : ৩৯২৬।
📄 পরিশিষ্ট
এগুলো কুরআন ও সুন্নাহ থেকে নেওয়া মৌখিক ও বাস্তব আমলি কিছু উদাহরণ। যা মানুষের সামাজিক আচার-আচরণ সুন্দর করা ও তাদের আত্মার পরিচর্যার গুরুত্বের বিষয়টি ফুটিয়ে তোলে। এগুলো তো কলমের অগ্রভাগে আসা কিছু উদাহরণ—হাদিসের ভাণ্ডার ও সিরাতের কিতাবসমূহ এমন বহু দৃষ্টান্তে ভরপুর।
এ উদাহরণগুলো তুলে ধরার উদ্দেশ্য হচ্ছে, মুসলিমদের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে অপরের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখার গুরুত্ব সম্পর্কে তাদের সতর্ক করা। এ কথা বোঝানো যে, শরিয়তে অপরের অনুভূতির প্রতি খেয়াল করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সুতরাং আমরা যেন একে অপরের অনুভূতির প্রতি খেয়াল রেখে চলি। আমাদের ভাইদের অনুভূতির মূল্যায়ন করি।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন :
وَقُلْ لِعِبَادِي يَقُولُوا الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْزَعُ بَيْنَهُمْ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلْإِنْسَانِ عَدُوًّا مُبِينًا
‘(হে নবি) আমার বান্দাদের বলে দিন, তারা যেন যা উত্তম এমন কথাই বলে। শয়তান তাদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধায়। নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।’
আল্লাহ তাআলার কাছে আমরা প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন, যারা মুসলিমদের অন্তরে আনন্দ সঞ্চার করে এবং তাদের অনুভূতির যথাযথ মূল্যায়ন করে চলে।
وصلى الله على نبينا محمد وآله وصحبه وسلم
- মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ
টিকাঃ
১৩৯. সুরা আল-ইসরা, ১৭ : ৫৩।