📘 অপরের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রেখো 📄 সপ্তমত, খাদিম ও ছোটদের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

📄 সপ্তমত, খাদিম ও ছোটদের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা


১. খেলতে ইচ্ছুক এমন ছোট স্ত্রীর অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

ইসলাম স্বামী-স্ত্রী উভয়কে সুন্দর আচরণ ও কোমল ব্যবহারের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। আমাদের জন্য রাসূল (সা)-এর মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ। এই উত্তম আদর্শের একটি হলো :

স্ত্রীর বয়স ও আগ্রহ অনুযায়ী তার সাথে উপযুক্ত আচরণ করা। সে যে বিষয়ে আগ্রহী, শরিয়তের নীতির ভেতরে থেকে তা তাকে প্রদান করা।

আয়িশা (রা)-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট পুতুল নিয়ে খেলা করতেন। তিনি বলেন, ‘তখন আমার নিকট আমার সঙ্গীরা আসত। তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে দেখে আড়ালে চলে যেত। আর রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে আমার নিকট পাঠিয়ে দিতেন।’

তিনি আরও বলেন :

‘আমি একদিন হাবশিদের খেলা দেখছিলাম। তারা মসজিদের আঙিনায় খেলছিলেন। আমি খেলা দেখে ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত দেখছিলাম। তখন নবীজি (সা) তাঁর চাদর দিয়ে আমাকে আড়াল করে রেখেছিলেন। তোমরা অনুমান করো যে, অল্পবয়সি মেয়েরা খেলাধুলা দেখতে কী পরিমাণ আগ্রহী।’

ইবনে হাজার (র) বলেন, ‘হাদিস থেকে বোঝা যায়, নবীজি (সা) তাঁর স্ত্রীদের সাথে সুন্দর আচরণ করতেন এবং আয়িশা (রা)-এর প্রতি অনেক উদার ছিলেন। হাদিস থেকে আয়িশা (রা)-এর শ্রেষ্ঠত্ব এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মহান মর্যাদার বিষয়টিও ফুটে উঠেছে।’

২. যে বালক বা খাদিম খেলতে চায়, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। একদা তিনি আমাকে একটি কাজে যাওয়ার আদেশ করলেন, তখন আমি বললাম, “আল্লাহর শপথ, আমি যাব না।” কিন্তু আমার মনে এক বিশ্বাস ছিল, যে কাজে আমাকে নবীজি (সা) নির্দেশ দিয়েছেন, আমি সে কাজে যাব। অতঃপর আমি বের হয়ে ছেলেদের নিকট যাচ্ছিলাম। তারা বাজারে খেলাধুলায় লিপ্ত ছিল। হঠাৎ রাসূলুল্লাহ (সা) পশ্চাৎ দিক হতে এসে আমার ঘাড় ধরলেন।’ আনাস (রা) বলেন, ‘আমি তাঁর প্রতি দৃষ্টি দিলাম, তখন তিনি হাসছিলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, (يَا أُنَيْسُ أَذَهَبْتَ حَيْثُ أَمَرْتُكَ؟) “আদরের আনাস, তুমি কি সেখানে গিয়েছিলে, যেখানে তোমাকে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলাম?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, আল্লাহর রাসূল, অবশ্যই আমি যাচ্ছি।”

আনাস (রা) বলেন :

وَاللَّهِ لَقَدْ خَدَمْتُهُ تِسْعَ سِنِينَ، مَا عَلِمْتُهُ قَالَ لِشَيْءٍ صَنَعْتُهُ: لِمَ فَعَلْتَ كَذَا وَكَذَا؟ أَوْ لِشَيْءٍ تَرَكْتُهُ: هَلَّا فَعَلْتَ كَذَا وَكَذَا

‘আল্লাহর শপথ, আমি নয় বছর তাঁর খিদমত করেছি। আমার জানা নেই যে, কোনো কাজ আমি করেছি আর সে ব্যাপারে তিনি বলেছেন, “এরূপ কেন করলে?” কিংবা কোনো কাজ আমি করিনি আর সে ব্যাপারে তিনি বলেছেন, “কেন তুমি এমনটি করলে না?”

এখানে খাদিমদের অধিকারের বিষয়টি ইসলাম খেয়াল করেছে। তাদেরকে তুচ্ছ বা হেয় করা এবং সাধ্যের বাইরে কিছু তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।

যেহেতু শৈশবে অন্যান্য যেকোনো সময়ের তুলনায় খেলাধুলা ও বিনোদনের প্রতি মন বেশি আকৃষ্ট থাকে, তাই ইসলাম এই বাস্তবতাকে ছেড়ে দেয়নি। ছোটদের সাথে নবীজি (সা) কেমন ব্যবহার করতেন, সেদিকে লক্ষ করুন। আব্দুল্লাহ বিন শাদ্দাদ (রা) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন :

خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي إِحْدَى صَلَاتَيِ الْعِشَاءِ وَهُوَ حَامِلٌ حَسَنًا أَوْ حُسَيْنًا، فَتَقَدَّمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَوَضَعَهُ، ثُمَّ كَبَّرَ لِلصَّلَاةِ فَصَلَّى فَسَجَدَ بَيْنَ ظَهْرَانَيْ صَلَاتِهِ سَجْدَةً أَطَالَهَا، قَالَ أَبِي: فَرَفَعْتُ رَأْسِي وَإِذَا الصَّبِيُّ عَلَى ظَهْرِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ سَاجِدٌ فَرَجَعْتُ إِلَى سُجُودِي، فَلَمَّا قَضَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الصَّلَاةَ قَالَ النَّاسُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّكَ سَجَدْتَ بَيْنَ ظَهْرَانَيْ صَلَاتِكَ سَجْدَةً أَطَلْتَهَا حَتَّى ظَنَنَّا أَنَّهُ قَدْ حَدَثَ أَمْرٌ أَوْ أَنَّهُ يُوحَى إِلَيْكَ، قَالَ: «كُلُّ ذَلِكَ لَمْ يَكُنْ وَلَكِنَّ ابْنِي ارْتَحَلَنِي فَكَرِهْتُ أَنْ أُعَجِّلَهُ حَتَّى يَقْضِيَ حَاجَتَهُ»

‘এক ইশার সালাতে রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের দিকে বেরিয়ে আসলেন। তখন তিনি হাসান অথবা হুসাইন (রা)-কে বহন করে আনছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) সামনে অগ্রসর হয়ে তাঁকে রেখে দিলেন। তারপর সালাতের জন্য তাকবির বললেন এবং সালাত আদায় করলেন। সালাতের মধ্যে একটি সিজদা লম্বা করলেন। আমি আমার মাথা উঠালাম এবং দেখলাম, ওই ছেলেটি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পিঠের ওপর রয়েছেন আর তিনি সিজদারত। তারপর আমি আমার সিজদায় গেলাম। রাসূলুল্লাহ (সা) সালাত শেষ করলে লোকেরা বলল, “ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি আপনার সালাতের মধ্যে একটি সিজদা এত লম্বা করলেন যে, আমরা ধারণা করলাম, হয়তো কোনো ব্যাপার ঘটে থাকবে বা আপনার ওপর ওহি নাজিল হচ্ছে।” তিনি বললেন, “এর কোনোটিই ঘটেনি; বরং আমার এ সন্তান আমাকে সওয়ারি বানিয়েছে। আমি তাড়াহুড়ি উঠতে অপছন্দ করলাম; যেন সে তার কাজ সমাধা করতে পারে।’

৩. খাদিম ও বাবুর্চির অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

এটি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি আদব। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেক মানুষ তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং স্বাধীন খাদিমদের সাথে কঠোরতা, অভদ্রতা, ঘৃণা বা অহংকার দেখিয়ে ব্যবহার করছে। অথচ এই খাদিমরাই তার গৃহের অনেক বড় বড় দায়িত্বগুলো পালন করছে। তারা তাদের ওপর আল্লাহ-প্রদত্ত নিয়ামতের কথা ভুলে গেছে যে, আল্লাহ তাআলা কিছু মানুষকে তাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যারা তাদের খিদমত করে। অথচ আল্লাহ তাআলা চাইলে তাদেরকেই খাদিম এবং খাদিমদেরকে কর্তা বানিয়ে দিতে পারতেন।

আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন :

إِذَا أَتَى أَحَدَكُمْ خَادِمُهُ بِطَعَامِهِ، فَإِنْ لَمْ يُجْلِسْهُ مَعَهُ، فَلْيُنَاوِلْهُ لُقْمَةً أَوْ لُقْمَتَيْنِ أَوْ أُكْلَةً أَوْ أُكْلَتَيْنِ، فَإِنَّهُ وَلِيَ عِلَاجَهُ

‘তোমাদের কারও খাদিম খাবার নিয়ে হাজির হলে তাকেও নিজের সাথে বসানো উচিত। তাকে সাথে না বসালেও দুই-এক লোকমা, কিংবা দুই-এক গ্রাস তাকে দেওয়া উচিত; কারণ, সে এর জন্য পরিশ্রম করেছে।’

এই হলো ক্রীতদাস খাদিমের ব্যাপারে বিধান। তাহলে ক্রীতদাস নয় এমন খাদিম বা কর্মচারীর সাথে কেমন ব্যবহার করা উচিত?

আবু মাসউদ আল-আনসারি (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি আমার এক গোলামকে প্রহার করছিলাম। এমন সময় পেছন থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম :

اعْلَمْ، أَبَا مَسْعُودٍ، لَلَّهُ أَقْدَرُ عَلَيْكَ مِنْكَ عَلَيْهِ

“হে আবু মাসউদ, তুমি জেনে রেখো! এই গোলামের ওপর তোমার ক্ষমতার চেয়ে আল্লাহ তোমার ওপর অধিক ক্ষমতাবান।”

হঠাৎ আমি তাকিয়ে দেখলাম রাসূলুল্লাহ (সা)। আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সে মুক্ত।” তখন তিনি বললেন :

أَمَا لَوْ لَمْ تَفْعَلْ لَلَفَحَتْكَ النَّارُ، أَوْ لَمَسَّتْكَ النَّارُ

“শোনো, যদি তুমি এমনটি না করতে, তাহলে আগুন তোমাকে জ্বালিয়ে দিত বা আগুন তোমাকে স্পর্শ করত।”

ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছি :

مَنْ ضَرَبَ عَبْدَهُ ظَالِمًا لَمْ يَكُنْ لَهُ كَفَّارَةٌ دُونَ عِتْقِهِ

“যে তার গোলামের প্রতি জুলুম করে প্রহার করে, তার জন্য এর কাফফারা শুধু তাকে মুক্ত করে দেওয়া।”

টিকাঃ
৯৬. সহিহ মুসলিম : ২৪৪০।
৯৭. সহিহুল বুখারি : ৫২৩৬।
৯৮. ফাতহুল বারি : ১/৫৪৯।
৯৯. সহিহ মুসলিম : ২৩১০।
১০০. সহিহ মুসলিম : ২৩০৯।
১০১. সুনানুন নাসায়ি : ১১৪১।
১০২. সহিহুল বুখারি : ২৫৫৭।
১০৩. সহিহ মুসলিম : ১৬৫৯।
১০৪. মুসনাদু আবি ইয়ালা : ৫৭৮২।

১. খেলতে ইচ্ছুক এমন ছোট স্ত্রীর অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

ইসলাম স্বামী-স্ত্রী উভয়কে সুন্দর আচরণ ও কোমল ব্যবহারের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। আমাদের জন্য রাসূল (সা)-এর মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ। এই উত্তম আদর্শের একটি হলো :

স্ত্রীর বয়স ও আগ্রহ অনুযায়ী তার সাথে উপযুক্ত আচরণ করা। সে যে বিষয়ে আগ্রহী, শরিয়তের নীতির ভেতরে থেকে তা তাকে প্রদান করা।

আয়িশা (রা)-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট পুতুল নিয়ে খেলা করতেন। তিনি বলেন, ‘তখন আমার নিকট আমার সঙ্গীরা আসত। তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে দেখে আড়ালে চলে যেত। আর রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে আমার নিকট পাঠিয়ে দিতেন।’

তিনি আরও বলেন :

‘আমি একদিন হাবশিদের খেলা দেখছিলাম। তারা মসজিদের আঙিনায় খেলছিলেন। আমি খেলা দেখে ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত দেখছিলাম। তখন নবীজি (সা) তাঁর চাদর দিয়ে আমাকে আড়াল করে রেখেছিলেন। তোমরা অনুমান করো যে, অল্পবয়সি মেয়েরা খেলাধুলা দেখতে কী পরিমাণ আগ্রহী।’

ইবনে হাজার (র) বলেন, ‘হাদিস থেকে বোঝা যায়, নবীজি (সা) তাঁর স্ত্রীদের সাথে সুন্দর আচরণ করতেন এবং আয়িশা (রা)-এর প্রতি অনেক উদার ছিলেন। হাদিস থেকে আয়িশা (রা)-এর শ্রেষ্ঠত্ব এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মহান মর্যাদার বিষয়টিও ফুটে উঠেছে।’

২. যে বালক বা খাদিম খেলতে চায়, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। একদা তিনি আমাকে একটি কাজে যাওয়ার আদেশ করলেন, তখন আমি বললাম, “আল্লাহর শপথ, আমি যাব না।” কিন্তু আমার মনে এক বিশ্বাস ছিল, যে কাজে আমাকে নবীজি (সা) নির্দেশ দিয়েছেন, আমি সে কাজে যাব। অতঃপর আমি বের হয়ে ছেলেদের নিকট যাচ্ছিলাম। তারা বাজারে খেলাধুলায় লিপ্ত ছিল। হঠাৎ রাসূলুল্লাহ (সা) পশ্চাৎ দিক হতে এসে আমার ঘাড় ধরলেন।’ আনাস (রা) বলেন, ‘আমি তাঁর প্রতি দৃষ্টি দিলাম, তখন তিনি হাসছিলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, (يَا أُنَيْسُ أَذَهَبْتَ حَيْثُ أَمَرْتُكَ؟) “আদরের আনাস, তুমি কি সেখানে গিয়েছিলে, যেখানে তোমাকে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলাম?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, আল্লাহর রাসূল, অবশ্যই আমি যাচ্ছি।”

আনাস (রা) বলেন :

وَاللَّهِ لَقَدْ خَدَمْتُهُ تِسْعَ سِنِينَ، مَا عَلِمْتُهُ قَالَ لِشَيْءٍ صَنَعْتُهُ: لِمَ فَعَلْتَ كَذَا وَكَذَا؟ أَوْ لِشَيْءٍ تَرَكْتُهُ: هَلَّا فَعَلْتَ كَذَا وَكَذَا

‘আল্লাহর শপথ, আমি নয় বছর তাঁর খিদমত করেছি। আমার জানা নেই যে, কোনো কাজ আমি করেছি আর সে ব্যাপারে তিনি বলেছেন, “এরূপ কেন করলে?” কিংবা কোনো কাজ আমি করিনি আর সে ব্যাপারে তিনি বলেছেন, “কেন তুমি এমনটি করলে না?”

এখানে খাদিমদের অধিকারের বিষয়টি ইসলাম খেয়াল করেছে। তাদেরকে তুচ্ছ বা হেয় করা এবং সাধ্যের বাইরে কিছু তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।

যেহেতু শৈশবে অন্যান্য যেকোনো সময়ের তুলনায় খেলাধুলা ও বিনোদনের প্রতি মন বেশি আকৃষ্ট থাকে, তাই ইসলাম এই বাস্তবতাকে ছেড়ে দেয়নি। ছোটদের সাথে নবীজি (সা) কেমন ব্যবহার করতেন, সেদিকে লক্ষ করুন। আব্দুল্লাহ বিন শাদ্দাদ (রা) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন :

خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي إِحْدَى صَلَاتَيِ الْعِشَاءِ وَهُوَ حَامِلٌ حَسَنًا أَوْ حُسَيْنًا، فَتَقَدَّمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَوَضَعَهُ، ثُمَّ كَبَّرَ لِلصَّلَاةِ فَصَلَّى فَسَجَدَ بَيْنَ ظَهْرَانَيْ صَلَاتِهِ سَجْدَةً أَطَالَهَا، قَالَ أَبِي: فَرَفَعْتُ رَأْسِي وَإِذَا الصَّبِيُّ عَلَى ظَهْرِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ سَاجِدٌ فَرَجَعْتُ إِلَى سُجُودِي، فَلَمَّا قَضَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الصَّلَاةَ قَالَ النَّاسُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّكَ سَجَدْتَ بَيْنَ ظَهْرَانَيْ صَلَاتِكَ سَجْدَةً أَطَلْتَهَا حَتَّى ظَنَنَّا أَنَّهُ قَدْ حَدَثَ أَمْرٌ أَوْ أَنَّهُ يُوحَى إِلَيْكَ، قَالَ: «كُلُّ ذَلِكَ لَمْ يَكُنْ وَلَكِنَّ ابْنِي ارْتَحَلَنِي فَكَرِهْتُ أَنْ أُعَجِّلَهُ حَتَّى يَقْضِيَ حَاجَتَهُ»

‘এক ইশার সালাতে রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের দিকে বেরিয়ে আসলেন। তখন তিনি হাসান অথবা হুসাইন (রা)-কে বহন করে আনছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) সামনে অগ্রসর হয়ে তাঁকে রেখে দিলেন। তারপর সালাতের জন্য তাকবির বললেন এবং সালাত আদায় করলেন। সালাতের মধ্যে একটি সিজদা লম্বা করলেন। আমি আমার মাথা উঠালাম এবং দেখলাম, ওই ছেলেটি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পিঠের ওপর রয়েছেন আর তিনি সিজদারত। তারপর আমি আমার সিজদায় গেলাম। রাসূলুল্লাহ (সা) সালাত শেষ করলে লোকেরা বলল, “ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি আপনার সালাতের মধ্যে একটি সিজদা এত লম্বা করলেন যে, আমরা ধারণা করলাম, হয়তো কোনো ব্যাপার ঘটে থাকবে বা আপনার ওপর ওহি নাজিল হচ্ছে।” তিনি বললেন, “এর কোনোটিই ঘটেনি; বরং আমার এ সন্তান আমাকে সওয়ারি বানিয়েছে। আমি তাড়াহুড়ি উঠতে অপছন্দ করলাম; যেন সে তার কাজ সমাধা করতে পারে।’

৩. খাদিম ও বাবুর্চির অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

এটি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি আদব। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেক মানুষ তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং স্বাধীন খাদিমদের সাথে কঠোরতা, অভদ্রতা, ঘৃণা বা অহংকার দেখিয়ে ব্যবহার করছে। অথচ এই খাদিমরাই তার গৃহের অনেক বড় বড় দায়িত্বগুলো পালন করছে। তারা তাদের ওপর আল্লাহ-প্রদত্ত নিয়ামতের কথা ভুলে গেছে যে, আল্লাহ তাআলা কিছু মানুষকে তাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যারা তাদের খিদমত করে। অথচ আল্লাহ তাআলা চাইলে তাদেরকেই খাদিম এবং খাদিমদেরকে কর্তা বানিয়ে দিতে পারতেন।

আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন :

إِذَا أَتَى أَحَدَكُمْ خَادِمُهُ بِطَعَامِهِ، فَإِنْ لَمْ يُجْلِسْهُ مَعَهُ، فَلْيُنَاوِلْهُ لُقْمَةً أَوْ لُقْمَتَيْنِ أَوْ أُكْلَةً أَوْ أُكْلَتَيْنِ، فَإِنَّهُ وَلِيَ عِلَاجَهُ

‘তোমাদের কারও খাদিম খাবার নিয়ে হাজির হলে তাকেও নিজের সাথে বসানো উচিত। তাকে সাথে না বসালেও দুই-এক লোকমা, কিংবা দুই-এক গ্রাস তাকে দেওয়া উচিত; কারণ, সে এর জন্য পরিশ্রম করেছে।’

এই হলো ক্রীতদাস খাদিমের ব্যাপারে বিধান। তাহলে ক্রীতদাস নয় এমন খাদিম বা কর্মচারীর সাথে কেমন ব্যবহার করা উচিত?

আবু মাসউদ আল-আনসারি (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি আমার এক গোলামকে প্রহার করছিলাম। এমন সময় পেছন থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম :

اعْلَمْ، أَبَا مَسْعُودٍ، لَلَّهُ أَقْدَرُ عَلَيْكَ مِنْكَ عَلَيْهِ

“হে আবু মাসউদ, তুমি জেনে রেখো! এই গোলামের ওপর তোমার ক্ষমতার চেয়ে আল্লাহ তোমার ওপর অধিক ক্ষমতাবান।”

হঠাৎ আমি তাকিয়ে দেখলাম রাসূলুল্লাহ (সা)। আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সে মুক্ত।” তখন তিনি বললেন :

أَمَا لَوْ لَمْ تَفْعَلْ لَلَفَحَتْكَ النَّارُ، أَوْ لَمَسَّتْكَ النَّارُ

“শোনো, যদি তুমি এমনটি না করতে, তাহলে আগুন তোমাকে জ্বালিয়ে দিত বা আগুন তোমাকে স্পর্শ করত।”

ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছি :

مَنْ ضَرَبَ عَبْدَهُ ظَالِمًا لَمْ يَكُنْ لَهُ كَفَّارَةٌ دُونَ عِتْقِهِ

“যে তার গোলামের প্রতি জুলুম করে প্রহার করে, তার জন্য এর কাফফারা শুধু তাকে মুক্ত করে দেওয়া।”

টিকাঃ
৯৬. সহিহ মুসলিম : ২৪৪০।
৯৭. সহিহুল বুখারি : ৫২৩৬।
৯৮. ফাতহুল বারি : ১/৫৪৯।
৯৯. সহিহ মুসলিম : ২৩১০।
১০০. সহিহ মুসলিম : ২৩০৯।
১০১. সুনানুন নাসায়ি : ১১৪১।
১০২. সহিহুল বুখারি : ২৫৫৭।
১০৩. সহিহ মুসলিম : ১৬৫৯।
১০৪. মুসনাদু আবি ইয়ালা : ৫৭৮২।

📘 অপরের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রেখো 📄 অষ্টমত, ভুলের ক্ষেত্রে মানুষের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

📄 অষ্টমত, ভুলের ক্ষেত্রে মানুষের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা


১. ভুলকারীকে নির্দিষ্ট না করে তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

নবিজি (সা) অনেক ক্ষেত্রে ভুলকারীকে নির্দিষ্ট না করে ভুলের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন; কেননা, উদ্দেশ্য হলো ভুলের ব্যাপারে তাদের অবগত হওয়া এবং তা থেকে সতর্ক থাকা।

আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একবার নবীজি (সা) নিজে কোনো কাজ করলেন এবং অন্যদেরকেও সে ব্যাপারে অনুমতি দিলেন। তা সত্ত্বেও একদল লোক তা থেকে বিরত রইল। এ সংবাদ নবীজি (সা)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি ভাষণ দিলেন। আল্লাহর প্রশংসার পর তিনি বললেন :

مَا بَالُ أَقْوَامٍ يَتَنَزَّهُونَ عَنِ الشَّيْءِ أَصْنَعُهُ، فَوَاللَّهِ إِنِّي لَأَعْلَمُهُمْ بِاللَّهِ، وَأَشَدُّهُمْ لَهُ خَشْيَةً

“কিছু লোকের কী হয়েছে, তারা এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে চায়, যা আমি নিজে করছি। আল্লাহর কসম, আমি আল্লাহর সম্পর্কে তাদের থেকে বেশি জানি এবং আমি আল্লাহর চেয়ে অনেক বেশি তাঁকে ভয় করি।”

বারিরাহ (রা)-এর ঘটনায় বর্ণিত আছে, নবীজি (সা) বলেন :

مَا بَالُ أَقْوَامٍ يَشْتَرِطُونَ شُرُوطًا، لَيْسَ فِي كِتَابِ اللَّهِ، مَنْ اشْتَرَطَ شَرْطًا لَيْسَ فِي كِتَابِ اللَّهِ، فَلَيْسَ لَهُ، وَإِنْ اشْتَرَطَ مِائَةَ مَرَّةٍ

‘লোকদের কী হলো? তারা এমন সব শর্ত করে, যা আল্লাহর কিতাবে নেই। কেউ যদি এমন শর্তারোপ করে, যা আল্লাহর কিতাবে নেই, তার সে শর্তের কোনো মূল্য নেই; এমনকি এরূপ শর্ত একশবার আরোপ করলেও।

২. যে ভুল করে লজ্জিত হয়েছে এবং শাস্তির অপেক্ষায় রয়েছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

মিকদাদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘প্রচুর খাদ্য-সংকটে আমার ও আমার দুই সাথির দৃষ্টিশক্তি ও শ্রুতিশক্তি কমে যায়। অতঃপর আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথিদের নিকট নিজেদের পেশ করতে লাগলাম। কিন্তু তাঁদের কেউ আমাদের কথা শুনলেন না। সবশেষে আমরা নবীজি (সা)-এর নিকট আগমন করলে তিনি আমাদের সাথে নিয়ে তাঁর পরিবারের নিকট গেলেন। সেখানে তিনটি বকরি ছিল। নবীজি (সা) বললেন, “তোমরা দুধ দোহন করবে। এ দুধ আমরা বণ্টন করে পান করব।” তিনি বলেন, ‘এরপর তা থেকে আমরা দুধ দোহন করতাম। আমাদের সবাই যার যার অংশ পান করত। আর আমরা নবীজি (সা)-এর জন্য তাঁর অংশ উঠিয়ে রাখতাম। তিনি রাত্রে এসে এমনভাবে সালাম দিতেন, যাতে নিদ্রারত লোক উঠে না যায় এবং জাগ্রত লোক শুনতে পায়। অতঃপর তিনি মসজিদে এসে সালাত আদায় করতেন। এবং সেখান থেকে ফিরে এসে দুধ পান করতেন। একদা রাতে আমার নিকট শয়তান আগমন করল। আমি তো আমার অংশ পান করে ফেলেছিলাম। সে বলল, “মুহাম্মাদ আনসারিদের নিকট গেলে তারা তাঁকে উপঢৌকন দেবে এবং তাদের নিকট তাঁর এ অল্প দুধের প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে যাবে।” অতঃপর আমি এসে সেটুক্ও পান করে ফেললাম। দুধ যখন উত্তমভাবে আমার পেটে ঢুকে গেল, তখন আমি বুঝতে পারলাম, এ দুধ বের করার আর কোনো উপায় নেই। তখন শয়তান আমার থেকে দূরে সরে গিয়ে বলল, “তোমার ধ্বংস হোক, তুমি এ কী করলে! তুমি মুহাম্মাদের জন্য রাখা দুধ পান করে ফেলেছ? তিনি জাগ্রত হয়ে যখন তা পাবেন না, তখন তোমার ওপর বদ-দুআ করবেন। এতে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।” আমার তোমার ইহকাল ও পরকাল নিঃশেষ হয়ে যাবে।” আমার শরীরে একটা চাদর ছিল। আমি যদি তা আমার পদদ্বয়ের ওপর রাখি, তাহলে আমার মাথা বের হয়ে পড়ে; আর যদি তা আমার মাথার ওপর রাখি, তাহলে আমার পদদ্বয় বেরিয়ে পড়ে। কিছুতেই আমার ঘুম আসছিল না। আমার সাথিদয় তো নিদ্রাচ্ছন্ন ছিলেন। তাঁরা তো আমার মতো কাজ করেননি। অতঃপর নবীজি (সা) আগমন করে যেভাবে কাজ করতেন, সেভাবেই সালাম করলেন। এরপর তিনি মসজিদে এসে সালাত আদায় করলেন। অতঃপর দুধের নিকটে এসে ঢাকনা খুলে সেখানে কিছুই পেলেন না। তখন তিনি নিজ মাথা আকাশের দিকে তুললেন। আমি তখন (মনে মনে) বললাম, এখনই হয়তো তিনি আমার ওপর বদ-দুআ করবেন, আর আমি ধ্বংস হয়ে যাব। তিনি বললেন :

اللَّهُمَّ، أَطْعَمْنُ مَنْ أَطْعَمَنِي، وَأَسْقِ مَنْ أَسْقَانِي

“হে আল্লাহ, যে আমার খাবারের ব্যবস্থা করে, আপনি তার খাবারের ব্যবস্থা করুন এবং যে আমাকে পান করায়, আপনি তাকে পান করান।”

৩. যার ওপর হদ ও শাস্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা) বলেন :

إِذَا زَنَتِ الأَمَةُ فَتَبَيَّنَ زِنَاهَا فَلْيَجْلِدْهَا وَلَا يُثَرِّبْ

‘যদি বাঁদি জিনা করে এবং তার জিনা প্রমাণিত হয়, তবে তাকে বেত্রাঘাত করবে। তবে তিরস্কার করবে না...। অর্থাৎ তাকে নিন্দা করবে না। যেমনটি ইউসুফ (আ) তাঁর ভাইদের বলেছেন :

لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ

‘তোমাদের বিরুদ্ধে আজ কোনো নিন্দা নেই’

সুতরাং কোনো অভিযোগ বা তিরস্কার নেই; কারণ, হদ হলো তার কৃতকর্মের কাফফারা এবং তা থেকে পবিত্রকারী।

উবাদাহ বিন সামিত (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা নবীজি (সা)-এর সাথে এক মজলিশে বসা ছিলাম। তিনি বললেন :

بَايِعُونِي عَلَى أَنْ لَا تُشْرِكُوا بِاللَّهِ شَيْئًا، وَلَا تَسْرِقُوا، وَلَا تَزْنُوا - وَقَرَأَ هَذِهِ الْآيَةَ كُلَّهَا - فَمَنْ وَفَى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ، وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَعُوقِبَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَتُهُ، وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَسَتَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ، إِنْ شَاءَ غَفَرَ لَهُ، وَإِنْ شَاءَ عَذَّبَهُ

“তোমরা আমার কাছে এ বাইআত করো যে, আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছু শরিক করবে না, চুরি করবে না এবং জিনা করবে না। এরপর তিনি এ আয়াত (সুরা আল-মুমতাহিনা : ১২) পুরো পাঠ করলেন। তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি (বাইআতের) শর্তাবলি পুরো করে, তার বিনিময় আল্লাহর কাছে। আর যে ব্যক্তি এ থেকে কিছু করে বসে আর তাকে শাস্তি দেওয়া হয়, তবে এটা তার জন্য কাফফারা হয়ে যায়। আর যদি কেউ এ থেকে কিছু করে বসে আর আল্লাহ তা গোপন রাখেন, তবে এটা তাঁর ইচ্ছাধীন। তিনি ইচ্ছে করলে তাকে ক্ষমা করবেন, ইচ্ছে করলে শাস্তি দেবেন।”

সুতরাং যার ওপর দণ্ডবিধি বাস্তবায়িত হয়েছে, তার জন্য অন্য কোনো শাস্তি নেই; কারণ, হদ তাকে পূর্বের মতো পরিষ্কার করে দিয়েছে। বরং যদি সে সঠিকভাবে তাওবা করে থাকে এবং লজ্জিত হয়, তাহলে হদ কায়েমের আগের অবস্থা থেকে হদ কায়েমের পরের অবস্থা আরও উত্তম হতে পারে। যেমনটি আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে :

أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «قَطَعَ يَدَ امْرَأَةٍ» قَالَتْ عَائِشَةُ: وَكَانَتْ تَأْتِي بَعْدَ ذَلِكَ، فَأَرْفَعُ حَاجَتَهَا إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَتَابَتْ، وَحَسُنَتْ تَوْبَتُهَا

‘নবিজি (সা) (শাস্তিস্বরূপ) জনৈক মহিলার হাত কেটেছেন।’ আয়িশা (রা) বলেন, ‘সে মহিলাটি এরপরেও নবীজি (সা)-এর কাছে আসত। আর আমি তার প্রয়োজন নবীজি (সা)-এর কাছে তুলে ধরতাম। মহিলাটি তাওবা করেছিল এবং সুন্দর হয়েছিল তার তাওবা।’

ইবনে হাজার (র) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন :
‘কাসিম বিন মুহাম্মাদ থেকে বর্ণিত যে, আয়িশা (রা) বলেছেন, “মহিলাটি সালিম গোত্রের জনৈক লোককে বিয়ে করেছিল এবং তাওবা করেছিল। তাদের সম্পর্ক অনেক সুন্দর ছিল। সে আমার কাছে আসলে আমি নবীজি (সা)-এর কাছে তার প্রয়োজন তুলে ধরতাম।” মুস্তাদরাকুল হাকিমে মাসউদ বিন হিকামের আরেকটি হাদিসের শেষে উল্লেখ হয়েছে, ইবনে ইসহাক বলেন, “আমার কাছে আব্দুল্লাহ বিন আবু বকর বর্ণনা করেন যে, নবীজি (সা) এরপর তার প্রতি দয়া করতেন এবং তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতেন।”

মুসনাদে আহমাদে আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা)-এর হাদিসে উল্লেখ আছে যে, “মহিলা (চুরির অপরাধে শাস্তিস্বরূপ যার ডান হাত কেটে ফেলা হয়েছে) বলল, (هَلْ لِي مِنْ تَوْبَةٍ يَا رَسُولَ اللهِ؟) “হে আল্লাহর রাসূল, আমার জন্য কি কোনো তাওবা আছে?” রাসূল (সা) বললেন, (نَعَمْ، أَنْتِ الْيَوْمَ مِنْ خَطِيئَتِكِ كَيَوْمِ وَلَدَتْكِ أُمُّكِ) “হ্যাঁ, আজ তুমি তোমার অপরাধ থেকে মুক্ত সেদিনের মতো, যেদিন তোমার মা তোমাকে জন্ম দিয়েছেন।”

৪. অপরাধের সাথে যার সম্পর্কহীনতা প্রকাশিত হয়েছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

সম্মানিত ব্যক্তিদের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তারা কোনো অপবাদে সন্তুষ্ট হতে পারে না এবং সব সময় তা থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে; যতক্ষণ না সাধ্যে থাকলে তা বাতিল করতে পারে।

এ কারণেই যখন অপবাদের সাথে তার সম্পর্কহীনতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়, তখন নিজের প্রতি তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় এবং সে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। জাইদ বিন আরকাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :

‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে যুদ্ধে গেলাম। কিছু সংখ্যক বেদুইনও আমাদের সঙ্গে ছিল। আমরা পানির উৎসের দিকে যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমাদের পূর্বেই বেদুইনরা পানির উৎসে গিয়ে পৌঁছায়। এক বেদুইন তার সঙ্গীদের পূর্বে পৌঁছে সে হাওজ (চৌবাচ্চা) সম্পূর্ণ করে তার চতুর্দিকে পাথর রেখে দিত এবং তার ওপর চামড়া বিছিয়ে দিয়ে তা ঢেকে দিত; যাতে তার সাথিরা এসে যায় এবং অন্যরা পানি নিতে না পারে। উক্ত বেদুইনের কাছে এক আনসারি লোক তার উটকে পানি পান করানোর জন্য এর লাগাম হালকা করে ছেড়ে দিল। কিন্তু বেদুইন তার উটকে পানি পান করতে বাধা দেয়। এতে আনসারি ব্যক্তি (ক্রুদ্ধ হয়ে) পানির উৎসগুলো সরিয়ে ফেলল। সে সময় একটি কাষ্ঠখণ্ড তুলে নিয়ে বেদুইন লোকটি আনসারির মাথায় জোরে আঘাত করে; এর ফলে তার মাথা ফেটে যায়। উক্ত আনসারি মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের নিকট গিয়ে তাকে ঘটনা সম্পর্কে জানায়। আনসারি তার দলেরই লোক ছিল। আব্দুল্লাহ বিন উবাই ক্ষিপ্ত হয়ে বলে, “যে বেদুইনরা আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে রয়েছে, তাদের সহায়তা দান বন্ধ করে দাও। তবেই তারা তাঁর চারপাশ থেকে আলাদা হয়ে যাবে।” রাসূল (সা)-এর আহার করার সময় বেদুইনরা তাঁর নিকট হাজির হতো এবং তাঁর সঙ্গে আহার করত। তাই আব্দুল্লাহ বিন উবাই বলল, “যে সময় বেদুইনরা মুহাম্মাদ-এর নিকট থেকে অন্যত্র চলে যাবে, তখন তাঁর নিকট খাবার উপস্থিত করবে; যাতে তিনি ও তাঁর নিকট উপস্থিত অন্যরা তা আহার করেন।” তারপর আব্দুল্লাহ বিন উবাই তার সাথিদের আরও বলল, “আমরা মদিনায় ফিরে গেলে সম্মানিতরা তোমাদের মাঝের হীনদের তাড়িয়ে দেবে।” জাইদ বিন আরকাম (রা) বলেন, ‘আমি রাসূল (সা)-এর পেছনে একই সওয়ারিতে ছিলাম। আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের কথা আমি শুনে ফেললাম এবং আমার চাচাকে তা জানালাম। আর তিনি রাসূল (সা)-এর কাছে গিয়ে তাঁকে তা অবহিত করলেন। রাসূল (সা) তাকে (আব্দুল্লাহ বিন উবাই) ডেকে পাঠান। সে শপথ করে তা অস্বীকার করে। রাসূল (সা) তার কথা বিশ্বাস করলেন এবং তাকে (জাইদের চাচাকে) অবিশ্বাস করলেন। আমার চাচা আমার নিকট এসে বললেন, “এটাই তো তুমি চেয়েছিলে যে, রাসূল (সা) তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট হন এবং তিনি ও মুসলিমগণ তোমাকে মিথ্যুক আখ্যায়িত করেন।” এতে আমি এতটাই ভারাক্রান্ত হলাম, যতটা কখনো কেউ হয়নি। তারপর আমি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মাথা নত করে রাসূল (সা)-এর সঙ্গে সফর অব্যাহত রাখলাম। এই পরিস্থিতিতে রাসূল (সা) আমার নিকট এসে আমার কান মললেন এবং আমার সম্মুখে হেসে দিলেন। যদি আমি চিরস্থায়ী জীবন বা জান্নাত লাভ করতাম; তবুও এতটা খুশি হতাম না। তারপর আবু বকর (রা) এসে আমার সঙ্গে দেখা করে জিজ্ঞাসা করলেন, “রাসূল (সা) তোমাকে কী বলেছেন?” আমি বললাম, “আমাকে তিনি কিছুই বলেননি, তিনি কেবল আমার কান মললেন এবং আমার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলেন।” আবু বকর (রা) বললেন, “তোমার জন্য সুসংবাদ!” অতঃপর আমাদের সঙ্গে উমর (রা) এসে দেখা করলেন। যে কথা আমি আবু বকর (রা)-কে বলেছিলাম, সে কথাই তাঁকে বললাম। অতঃপর আমরা ভোরে উপনীত হলে রাসূল (সা) সুরা আল-মুনাফিকুন পাঠ করলেন।

টিকাঃ
১০৫. সহিহুল বুখারি : ৬১০১।
১০৬. সহিহুল বুখারি : ৪৫৬।
১০৭. সহিহ মুসলিম : ২০৫৫।
১০৮. সহিহুল বুখারি : ২১৫২।
১০৯. সুরা ইউসুফ, ১২ : ৯২।
১১০. সহিহুল বুখারি : ৬৭৮৪।
১১১. সহিহুল বুখারি : ৬৮০০।
১১২. মুসনাদু আহমাদ : ৬৬৫৭।
১১৩. ফাতহুল বারি : ১২/৯৫-৯৬।
১১৪. সহিহুল বুখারি : ৪৯০০ (সংক্ষেপিত)।

📘 অপরের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রেখো 📄 নবমত, যে ব্যক্তি কোনো পেরেশানি, ক্রোধ বা দুশ্চিন্তার শিকার, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

📄 নবমত, যে ব্যক্তি কোনো পেরেশানি, ক্রোধ বা দুশ্চিন্তার শিকার, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা


১. কারও দুঃখ-কষ্টে সমব্যথী হয়ে তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

একজন মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের সুখে সুখী হওয়া এবং তার দুঃখ-কষ্টে সমব্যথী হওয়া আবশ্যক। এটিই মুসলিমরা এক দেহের মতো হওয়ার বিষয়টিকে শামিল করে।

ইবনে আব্বাস (রা) বদরের যুদ্ধের কাহিনি উল্লেখ করার পর বলেন :

‘যখন যুদ্ধবন্দীদের আটক করা হলো, তখন রাসূলুল্লাহ (সা) ওই সব যুদ্ধবন্দী সম্পর্কে আবু বকর ও উমর (রা)-এর সাথে কথা বললেন, “এ সকল যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে আপনারা কী মত দিচ্ছেন?” আবু বকর (রা) বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, তারা তো আমাদের চাচাতো ভাই এবং সমগোত্রীয়। আমি উচিত মনে করি যে, তাদের নিকট থেকে আপনি মুক্তিপণ গ্রহণ করুন। এতে কাফিরদের ওপর আমাদের শক্তি বৃদ্ধি পাবে। আশা করা যায়, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ইসলামের হিদায়াত দেবেন।” এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “হে ইবনুল খাত্তাব, এ ব্যাপারে আপনি কী বলেন?” উমর (রা) বললেন, “আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল, এ ব্যাপারে আবু বকর যা উচিত মনে করেন, আমি তা উচিত মনে করি না। আমি উচিত মনে করি যে, আপনি তাদেরকে আমাদের হস্তগত করুন; আমরা তাদের গর্দান উড়িয়ে দেবো। আর আকিলকে আলির হস্তগত করুন; তিনি তার শিরোচ্ছেদ করবেন। আর আমার বংশের অমুককে আমার কাছে অর্পণ করুন; আমি তার শিরোচ্ছেদ করব। কেননা, তারা হলো কাফিরদের মর্যাদাশালী নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ।” (উমর (রা) বলেন,) “অতঃপর আবু বকর (রা) যা বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা) সেটাই পছন্দ করলেন এবং আমি যা বললাম, তা তিনি পছন্দ করলেন না। পরের দিন যখন আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে এলাম, তখন দেখি, রাসূলুল্লাহ (সা) ও আবু বকর (রা) উভয়ে বসে কাঁদছেন। আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে বলুন, আপনি এবং আপনার সাথি কেন কাঁদছেন? আমার কান্না আসলে আমিও কাঁদব। আর যদি আমার কান্না না আসে, তবে আপনাদের কান্নার কারণে আমিও কান্নার ভান করব।” রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন :

أَبْكِي لِلَّذِي عَرَضَ عَلَيَّ أَصْحَابُكَ مِنْ أَخْذِهِمُ الْفِدَاءَ، لَقَدْ عُرِضَ عَلَيَّ عَذَابُهُمْ أَدْنَى مِنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ

“মুক্তিপণ গ্রহণের কারণে তোমার সাথিদের ওপর সমাগত বিপদের কথা স্মরণ করে আমি কাঁদছি। আমার নিকট তাঁদের শাস্তি পেশ করা হলো এ বৃক্ষ থেকেও নিকটে।”

বৃক্ষটি ছিল নবীজি (সা)-এর নিকটে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা নাজিল করলেন :

مَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

“জমিনে ব্যাপকভাবে শত্রুনিধন না করা পর্যন্ত যুদ্ধবন্দী রাখা (এবং মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া) কোনো নবির জন্য সংগত নয়। তোমরা দুনিয়ার সম্পদ চাও; আর আল্লাহ চান আখিরাত। আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।”

لَوْلَا كِتَابٌ مِنَ اللَّهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

“যদি বিষয়টি আল্লাহর পক্ষ থেকে আগেই নির্ধারিত না হতো, তাহলে তোমরা যা গ্রহণ করেছ, তার জন্য তোমাদেরকে বিরাট শাস্তি স্পর্শ করত।”

فَكُلُوا مِمَّا غَنِمْتُمْ حَلَالًا طَيِّبًا

“অতএব, তোমরা যে বৈধ ও উত্তম গনিমত পেয়েছ, তা খেতে পারো।”

এর ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁদের জন্য গনিমতের মাল হালাল করে দেন।

কঠিন এক পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে আয়িশা (রা) যখন অবিরত কাঁদছিলেন, সে সময় তাঁর সাথে কান্নায় জনৈক আনসারি নারীও শামিল হয়েছিল। যেমনটি আয়িশা (রা) ইফকের হাদিসে উল্লেখ করেছেন :

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَخْرُجَ سَفَرًا، أَقْرَعَ بَيْنَ نِسَائِهِ... وَبَكَيْتُ يَوْمِي ذَلِكَ لَا يَرْفَأُ لِي دَمْعٌ وَلَا أَكْتَحِلُ بِنَوْمٍ، ثُمَّ بَكَيْتُ لَيْلَتِي الْمُقْبِلَةَ لَا يَرْفَأُ لِي دَمْعٌ وَلَا أَكْتَحِلُ بِنَوْمٍ وَأَبَوَايَ يَظُنَّانِ أَنَّ الْبُكَاءَ فَالِقٌ كَبِدِي فَبَيْنَمَا هُمَا جَالِسَانِ عِنْدِي وَأَنَا أَبْكِي اسْتَأْذَنَتْ عَلَيَّ امْرَأَةٌ مِنَ الْأَنْصَارِ، فَأَذِنْتُ لَهَا فَجَلَسَتْ تَبْكِي

‘রাসূলুল্লাহ (সা) যখন কোনো সফরে বের হওয়ার ইচ্ছা করতেন, তখন নিজ স্ত্রীদের মাঝে লটারি করতেন... (আয়িশা (রা) সেই সফরের ঘটনা ও তাঁকে অপবাদ দেওয়ার এ পুরো কাহিনি বর্ণনা করে বলেন) সেদিন আমি সারাক্ষণ কান্নাকাটি করলাম। অবিরত ধারায় আমার অশ্রুপাত হচ্ছিল। রাতে একটুও আমার ঘুম আসেনি। অতঃপর সামনের রাতও আমি কেঁদে কাটালাম। এ রাতেও অবিরত ধারায় আমার অশ্রুপাত হলো; আমি একটুও ঘুমাতে পারিনি। এ দেখে আমার আব্বা-আম্মা মনে করছিলেন যে, কান্নায় আমার কলিজা টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। আমি কাঁদতে ছিলাম, আমার আব্বা-আম্মা আমার নিকট বসা ছিলেন। এমন সময় একজন আনসারি মহিলা আমার কাছে আসার অনুমতি চাইলে আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সে এসে বসে (আমার সাথে) কাঁদতে লাগল...’

২. সন্তানের জন্য মায়ের কষ্টের মূল্যায়ন

আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা) বলেন :

إِنِّي لَأَدْخُلُ فِي الصَّلَاةِ، فَأُرِيدُ إِطَالَتَهَا، فَأَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ، فَأَتَجَوَّزُ مِمَّا أَعْلَمُ مِنْ شِدَّةِ وَجْدِ أُمِّهِ مِنْ بُكَائِهِ

‘আমি দীর্ঘ করার ইচ্ছা নিয়ে সালাত শুরু করি; কিন্তু পরে শিশুর কান্না শুনে আমার সালাত সংক্ষেপ করে ফেলি। কেননা, শিশু কাঁদলে মায়ের মন যে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, তা আমি জানি।’

আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘হারিসা একজন নওজোয়ান লোক ছিলেন। বদর যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করার পর তাঁর মা নবীজি (সা)-এর কাছে এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, হারিসা আমার কত প্রিয় ছিল, আপনি তা অবশ্যই জানেন। সে যদি জান্নাতি হয়, তাহলে আমি সবর করব এবং আল্লাহর নিকট সাওয়াবের আশা পোষণ করব। আর যদি ব্যাপার অন্য কিছু হয়, তবে দেখবেন, আমি কী করি।” তখন তিনি বললেন :

وَيْحَكِ، أَوَهَبِلْتِ، أَوَجَنَّةٌ وَاحِدَةٌ هِيَ؟ إِنَّهَا جِنَانٌ كَثِيرَةٌ، وَإِنَّهُ لَفِي جَنَّةِ الْفِرْدَوْسِ

“তোমার জন্য আফসোস, তুমি কি নির্বোধ হয়ে গেলে? জান্নাত কি মাত্র একটি? জান্নাতের সংখ্যা তো অনেক। আর সে তো জান্নাতুল ফিরদাউসে রয়েছে।”

৩. চিন্তিত ব্যক্তির অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা এবং তার চিন্তা দূর করা

জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আবু বকর (রা) এসে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তিনি তাঁর দরজায় অনেক লোককে উপবিষ্ট দেখতে পেলেন। তবে তাদের কাউকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এরপর তিনি আবু বকর (রা)-কে প্রবেশের অনুমতি প্রদান করলে তিনি প্রবেশ করলেন। এরপর উমর (রা) এলেন এবং তিনি অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তখন তাঁকেও প্রবেশের অনুমতি প্রদান করা হলো। তিনি নবীজি (সা)-কে চিন্তিত এবং নীরব বসে থাকতে দেখলেন। আর তখন তাঁর চতুর্পার্শ্বে তাঁর সহধর্মিণীগণ উপবিষ্ট ছিলেন। উমর (রা) বললেন, “নিশ্চয় আমি নবীজি (সা)-এর নিকট এমন কথা বলব, যা তাঁকে হাসাবে।” এরপর তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি যদি খারিজাহর কন্যাকে (উমর (রা)-এর স্ত্রী) আমার কাছে খোরপোশ তলব করতে দেখতেন, তাহলে (তৎক্ষণাৎ) আপনি তার দিকে অগ্রসর হয়ে তার স্কন্ধে আঘাত করতেন।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা) হেসে উঠলেন এবং বললেন :

هُنَّ حَوْلِي كَمَا تَرَى، يَسْأَلْنَنِي النَّفَقَةَ

“আমার চারদিকে যাদের দেখতে পাচ্ছ, তারা আমার কাছে খোরপোশ দাবি করছে।”

এ রকমই একটি ঘটনা হলো, জাবির (রা)-এর ঘটনা, যখন তাঁর উটটি দুর্বলতার কারণে কাফেলা থেকে পিছিয়ে যায়। এতে তিনি পেরেশান হয়ে যান। তখন নবীজি (সা) তাঁর সাথে চমৎকার ভাষায় এই কথোপকথন করেছেন—

জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
‘এক যুদ্ধে আমি নবীজি (সা)-এর সঙ্গে ছিলাম। আমার উটটি অত্যন্ত ধীরে চলছিল; বরং চলতে অক্ষম হয়ে পড়েছিল। এমতাবস্থায় নবীজি (সা) আমার কাছে এলেন এবং বললেন, “জাবির!” আমি বললাম, “জি।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার অবস্থা কী?” আমি বললাম, “আমার উট আমাকে নিয়ে খুব ধীরে চলছে এবং অক্ষম হয়ে পড়েছে। ফলে আমি পেছনে পড়ে গেছি।” তখন তিনি নেমে চাবুক দিয়ে উটটিকে আঘাত করতে লাগলেন। তারপর বললেন, “এবার আরোহণ করো।” আমি আরোহণ করলাম। এবার অবশ্যই আমি উটটিকে এমন পেলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সা) হতে অগ্রসর হওয়ায় বাধা দিতে হয়েছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি বিয়ে করেছ?” আমি বললাম, “হ্যাঁ।” তিনি বললেন, “কুমারী না বিবাহিতা?” আমি বললাম, “বিবাহিতা।” তিনি বললেন, “তরুণী (কুমারী) বিয়ে করলে না কেন? তাহলে তুমি তার সাথে হাসি-তামাশা করতে এবং সে তোমার সাথে পূর্ণভাবে হাসি-তামাশা করত।” আমি বললাম, “আমার কয়েকটি বোন আছে, এ জন্য আমি এমন এক মহিলাকে বিয়ে করতে পছন্দ করলাম, যে তাদের মিল-মহব্বতে রাখতে, তাদের পরিচর্যা করতে এবং তাদের ওপর উত্তমরূপে কর্তৃত্ব করতে সক্ষম হবে।” তিনি বললেন, “শোনো, তুমি তো বাড়ি পৌঁছবে। যখন পৌঁছবে, তখন তুমি বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেবে।” তিনি বললেন, “তোমার উটটি বিক্রি করবে?” আমি বললাম, “হ্যাঁ।” তিনি এক উকিয়ার বিনিময়ে আমার থেকে উটটি কিনে নিলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সা) আমার আগে (মদিনায়) পৌঁছলেন এবং আমি (পরের দিন) ভোরে পৌঁছলাম। আমি মসজিদে নববিতে গিয়ে তাঁকে দরজার সামনে পেলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “এখন এলে?” আমি বললাম, “হ্যাঁ।” তিনি বললেন, “তোমার উটটি রাখো এবং মসজিদে প্রবেশ করে দুই রাকাত সালাত আদায় করে নাও।” আমি মসজিদে প্রবেশ করে সালাত আদায় করলাম। তারপর তিনি বিলাল (রা)-কে উকিয়া ওজন করে আমাকে দিতে বললেন। বিলাল (রা) তা ওজন করে দিলেন এবং আমার পক্ষে ঝুঁকিয়ে দিলেন। আমি রওনা হলাম। যখন আমি পেছনে ফিরেছি, তখন তিনি বললেন, “জাবিরকে আমার কাছে ডাকো।” আমি ভাবলাম, এখন হয়তো উটটি আমাকে ফিরিয়ে দেবেন। আর আমার নিকট এর চেয়ে অপছন্দনীয় আর কিছুই ছিল না। তিনি বললেন, “তোমার উটটি নিয়ে যাও এবং তার দামও তোমার।”

জাবির (রা)-এর পেরেশানির কারণ ছিল তাঁর উটের দুর্বলতার কারণে ধীরে চলা। এমনকি একসময় তিনি এটি ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর কোনো নাদিহ্ বা ক্ষেতে পানি সেচ দেওয়ার মতো অন্য কোনো উট ছিল না। এ কারণেই নবীজি (সা) তাঁর সাথে এই চমৎকার আলোচনা করেছেন। এরপর তাঁর প্রতি উদারতা দেখিয়েছেন।

ইবনুল জাওজি (র) বলেন, ‘এটি হলো সর্বোত্তম উদারতা; কারণ, যে কোনো জিনিস বিক্রি করেছে, সে অবশ্যই বিনিময়ের মুখাপেক্ষী। যখন সে বিনিময় গ্রহণ করে নিল, তখন তার হৃদয়ে বিক্রিত জিনিসের বিচ্ছেদের আফসোস থেকে যায়। এরপর যখন মূল্যসহ তাকে বিক্রিত জিনিস ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তখন তার পেরেশানি দূর হয়ে যায়। তার মাঝে আনন্দও দেখা যায় এবং তার প্রয়োজনও পূরণ হয়ে যায়। আর যে এসব পাওয়ার পর অতিরিক্ত মূল্য পায়, তার অবস্থা কেমন হবে?’

ইবনে হাজার (র) এই হাদিসের ফায়দা উল্লেখ করে বলেন, ‘ইমাম ও বড় ব্যক্তি তার সাথিদের খোঁজখবর রাখবেন এবং সাথিরা যে পরিস্থিতির শিকার হয়েছে, সে ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন। খোঁজখবর নেওয়া, সম্পদ বা দুআ যা কিছু দিয়ে তাকে সাহায্য করা সহজ হবে, তা করবেন।’

৪. প্রিয়জনের বিচ্ছেদে ব্যথিত ব্যক্তির অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা এবং সুপারিশ ইত্যাদির মাধ্যমে তাকে সহযোগিতা করা

ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘বারিরাহর স্বামী ক্রীতদাস ছিল। মুগিস নামে তাকে ডাকা হতো। আমি যেন এখনো তাকে দেখছি, সে বারিরাহর পেছনে কেঁদে কেঁদে ঘুরছে। আর তার দাড়ি বেয়ে অশ্রু ঝরছে। তখন নবীজি (সা) বললেন, (يَا عَبَّاسُ، أَلَا تَعْجَبُ مِنْ حُبِّ مُغِيثٍ بَرِيرَةَ، وَمِنْ بُغْضِ بَرِيرَةَ مُغِيثًا) “হে আব্বাস, বারিরাহর প্রতি মুগিসের ভালোবাসা এবং মুগিসের প্রতি বারিরাহর অনাসক্তি দেখে তুমি কি আশ্চর্যান্বিত হও না?” এরপর নবীজি (সা) বললেন, (لَوْ رَاجَعْتِيهِ) “(বারিরাহ) তুমি যদি তার কাছে ফিরে যেতে!” সে বলল, “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি আমাকে হুকুম দিচ্ছেন?” তিনি বললেন, (إِنَّمَا أَنَا أَشْفَعُ) “আমি কেবল সুপারিশ করছি।” সে বলল, “তাকে দিয়ে আমার কোনো প্রয়োজন নেই।”

টিকাঃ
১১৫. সুরা আল-আনফাল, ৮ : ৬৭।
১১৬. সুরা আল-আনফাল, ৮ : ৬৮।
১১৭. সুরা আল-আনফাল, ৮ : ৬৯।
১১৮. সহিহ মুসলিম : ১৭৬৩।
১১৯. সহিহুল বুখারি : ৪৭৫০, সহিহ মুসলিম : ২৭৭০।
১২০. সহিহুল বুখারি : ৭১০।
১২১. সহিহুল বুখারি : ৫৫৫০, ২৮০৯।
১২২. সহিহ মুসলিম : ১৪৭৮।
১২৩. সহিহুল বুখারি : ২০৯৭, সহিহ মুসলিম : ৭১৫, মুসনাদু আহমাদ : ১৫০২৬। (এখানে আমরা বুখারির বর্ণনাটি উল্লেখ করেছি। -অনুবাদক)
১২৪. ফাতহুল বারি : ৫/৩১৭।
১২৫. ফাতহুল বারি : ৫/৩২১।
১২৬. সহিহুল বুখারি : ৫২৮৩।

📘 অপরের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রেখো 📄 দশমত, বিক্ষিপ্ত কিছু বিষয়ে অপরের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

📄 দশমত, বিক্ষিপ্ত কিছু বিষয়ে অপরের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা


১. যার কাছে আনন্দের কিছু এসেছে, তার আনন্দে শরিক হয়ে এবং তাকে অভিনন্দন জানিয়ে তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

যেমনটি ঘটেছিল কাব (রা)-এর ক্ষেত্রে। তিনি তাবুক যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে রয়েছিলেন। ফলে মুসলিমরা সবাই তাঁকে পঞ্চাশ রাত বর্জন করেছিল। তিনি কঠিন এক বিপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন। এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁদের তাওবা কবুল করে আয়াত নাজিল করেন। এই সংবাদে সাহাবিগণ অনেক অনেক আনন্দিত হয়েছিলেন। এই অবস্থার বিবরণ দিয়ে কাব (রা) বলেন :

‘যার শব্দ আমি শুনেছিলাম, সে যখন আমার কাছে সুসংবাদ প্রদান করতে আসলো, তখন আমাকে সুসংবাদ প্রদান করার শুকরিয়াস্বরূপ আমার নিজের পরনের কাপড়দুটো খুলে তাকে পরিয়ে দিলাম। আল্লাহর শপথ, সে সময় ওই দুটো কাপড় ব্যতীত আমার কাছে আর কোনো কাপড় ছিল না। ফলে আমি দুটো কাপড় ধার করে পরিধান করলাম। এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে রওনা হলাম। লোকেরা দলে দলে আমাকে ধন্যবাদ জানাতে আসতে লাগল। তাঁরা তাওবা কবুলের মুবারকবাদ জানাচ্ছিল। তাঁরা বলছিল, “তোমাকে মুবারকবাদ যে, আল্লাহ তাআলা তোমার তাওবা কবুল করেছেন।” অবশেষে আমি মসজিদে প্রবেশ করলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) সেখানে বসা ছিলেন এবং তাঁর চতুস্পার্শ্বে জনতার সমাবেশ ছিল। তালহা বিন উবাইদুল্লাহ (রা) দ্রুত উঠে এসে আমার সঙ্গে মুসাফাহা করলেন এবং মুবারকবাদ জানালেন। আল্লাহর কসম, তিনি ব্যতীত আর কোনো মুহাজির আমার জন্য দাঁড়াননি। আমি তালহার ব্যবহার ভুলতে পারব না।’

ইবনে হাজার (র) এই হাদিসের ফায়দা উল্লেখ করে বলেন :

‘কল্যাণের ব্যাপারে সুসংবাদ প্রদানে ছুটে যাওয়া এবং যে নতুন কোনো নিয়ামত অর্জন করেছে, তাকে অভিবাদন জানানো এবং যখন সে এগিয়ে আসে, তখন তার জন্য দাঁড়ানো (এই হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়)।’

২. নিকটজনকে কষ্ট দেয় এমন বিষয়ে মানুষের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

আত্মীয়তার বন্ধনের ফলে আপনার আত্মীয় যাতে আক্রান্ত হয়েছেন, আপনিও তাতে আক্রান্ত হয়েছেন। কেউ কষ্ট পেলে তার আত্মীয়ও সে কষ্ট অনুভব করে। ইসলাম এই অনুভূতির মূল্যায়ন করেছে; যতক্ষণ না তা আত্মীয়তার মহব্বত বা শরিয়তের বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হয়। এই ক্ষেত্রে মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করবে; যদিও অন্যরা তার প্রতি ক্রোধান্বিত হয়।

মুগিরাহ বিন শুবা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন :

لَا تَسُبُّوا الْأَمْوَاتَ فَتُؤْذُوا الْأَحْيَاءَ

‘তোমরা মৃতদের গালি দিয়ে জীবিতদের কষ্ট দিয়ো না।’

মিসওয়ার বিন মাখরামাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :

‘আবু জাহেলের কন্যার কাছে আলি (রা) বিবাহের প্রস্তাব পাঠালেন। ফাতিমা (রা) এই খবর শুনতে পেয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট এসে বললেন, “আপনার গোত্রের লোকজন মনে করে যে, আপনি আপনার মেয়েদের সম্মানে রাগান্বিত হন না। আলি তো আবু জাহেলের কন্যাকে বিবাহ করতে প্রস্তুত।” রাসূলুল্লাহ (সা) তা শুনে খুতবা দিতে প্রস্তুত হলেন।’ মিসওয়ার বলেন, ‘তিনি যখন হামদ ও সানা পাঠ করেন, তখন আমি তাঁকে বলতে শুনেছি যে,

أَمَّا بَعْدُ أَنْكَحْتُ أَبَا الْعَاصِ بْنَ الرَّبِيعِ، فَحَدَّثَنِي وَصَدَقَنِي، وَإِنَّ فَاطِمَةَ بَضْعَةٌ مِنِّي وَإِنِّي أَكْرَهُ أَنْ يَسُوءَهَا، وَاللَّهِ لَا تَجْتَمِعُ بِنْتُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَبِنْتُ عَدُوِّ اللَّهِ، عِنْدَ رَجُلٍ وَاحِدٍ

“পর-সমাচার, আমি আবুল আস বিন রবির নিকট আমার মেয়েকে বিবাহ দিয়েছিলাম। সে আমার সঙ্গে যা বলেছে, সত্যই বলেছে। আর ফাতিমা আমার টুকরা; তাঁর কোনো কষ্ট হোক, তা আমি কখনো পছন্দ করি না। আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসূলের মেয়ে এবং আল্লাহর দুশমনের মেয়ে একই লোকের নিকট একত্রিত হতে পারে না।”

আলি (রা) তাঁর বিবাহের প্রস্তাব উঠিয়ে নিলেন।’ মুহাম্মাদ বিন আমর বিন হালহালা মিসওয়ারের সূত্রে অতিরিক্ত বর্ণনা করে বলেন, ‘আমি নবীজি (সা)-কে বনি আবদে শামস গোত্রে তাঁর এক জামাতার ব্যাপারে অত্যন্ত প্রশংসা করতে শুনেছি। নবিজি (সা) বলেন, (حَدَّثَنِي فَصَدَقَنِي، وَوَعَدَنِي فَوَفَى لِي) “সে আমাকে যা বলেছে, সত্য বলেছে। যা ওয়াদা করেছে, তা পূর্ণ করেছে।”

অন্য এক বর্ণনায় আছে :

وَإِنِّي لَسْتُ أُحَرِّمُ حَلَالًا، وَلَا أُحِلُّ حَرَامًا، وَلَكِنْ وَاللَّهِ لَا تَجْتَمِعُ بِنْتُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَبِنْتُ عَدُوِّ اللَّهِ أَبَدًا

‘আর নিশ্চয় আমি কোনো হালালকে হারাম করতে পারি না এবং কোনো হারামকে হালাল করতে পারি না। তবে আল্লাহর শপথ, আল্লাহর রাসূলের কন্যা এবং আল্লাহর শত্রুর কন্যা কখনো একত্রিত হতে পারে না।’

এর থেকে একাধিক বিয়ে হারাম হওয়া বা আল্লাহ যা হালাল করেছেন, তা হারাম হওয়ার বিষয় বোঝা যায় না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কন্যা ও আল্লাহর শত্রুর কন্যা সতীন হিসেবে একই পরিবারে একত্রিত হওয়া আত্মমর্যাদার বিরোধী। অনেক সময় তাদের শত্রুতার প্রভাব তাদের পিতাদের পর্যন্ত গড়াবে। কারণ, তাদের একজনের পিতা হলেন ইমানের সর্দার এবং অপরজনের পিতা হলো কুফরের সর্দার এবং আল্লাহর নবীর সবচেয়ে বড় শত্রু। সুতরাং তখন আবু জাহেলের কন্যার মাঝে স্বজনপ্রীতি ঢুকতে পারে বা অন্তরে আল্লাহর নবীর ব্যাপারে কোনো মন্দ ধারণা উদিত হতে পারে। ফলে বাবার সাথে জাহিলি স্বজনপ্রীতির কারণে শরিয়তের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে সে ধ্বংস হবে। সম্ভবত নবিজি (সা) এই কথার মাধ্যমে এদিকেই ইঙ্গিত করেছেন, ‘আল্লাহর শপথ, আল্লাহর রাসূলের কন্যা এবং আল্লাহর শত্রুর কন্যা একই লোকের কাছে একত্রিত হতে পারে না।’ আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞাত।

বর্ণিত আছে যে, নবিজি (সা)-এর কোনো মেয়েকে বিয়ে করার মতো মর্যাদা যে কেউ অর্জন করতে পারে না। সুতরাং যাকে আল্লাহর নবি (সা) এই মর্যাদায় বিশেষায়িত করেছেন, তার জন্য আবশ্যক হলো, সমমূল্যের জিনিসের মাধ্যমে এই অনুগ্রহ ও মর্যাদার মূল্যায়ন করা। সুতরাং সে এমন কোনো কাজ করবে না, যার কারণে নবিজি (সা)-এর কন্যা কষ্ট পায়। যেমনটি আবুল আস বিন রবির ক্ষেত্রে হয়েছে; যার প্রশংসা নবি (সা) এভাবে করেছেন :

‘আমি আবুল আস বিন রবির নিকট আমার মেয়েকে বিবাহ দিয়েছিলাম। সে আমার সঙ্গে যা বলেছে, সত্যই বলেছে।’

ইমাম নববি (র) বলেন :

‘আলিমগণ বলেছেন, এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, নবিজি (সা)-কে যেকোনো অবস্থায় এবং যেকোনো সুরতে কষ্ট দেওয়া হারাম। যদিও এ কষ্টটা তাঁর জীবিতাবস্থায় কোনো বৈধ বিষয়ে হয়ে থাকে। তাঁরা বলেন, নবিজি (সা) খুব ভালোভাবেই জানতেন যে, আলি (রা)-এর জন্য আবু জাহেলের মেয়েকে বিয়ে করা বৈধ। কারণ, তিনি বলেছেন, “আমি কোনো হালালকে হারাম করছি না।” কিন্তু তিনি নিম্নোক্ত দুটি কারণে এই দুই কন্যাকে একত্রিত করা নিষেধ করেছেন :

প্রথমত, এর ফলে ফাতিমা (রা)-এর কষ্ট হবে; আর তখন নবিজি (সা)-ও কষ্ট পাবেন। ফলে যে কষ্ট দেবে, সে ধ্বংস হবে। এ কারণেই নবিজি (সা) আলি ও ফাতিমা (রা)-এর প্রতি পরিপূর্ণ স্নেহের ফলে এ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন।

দ্বিতীয়ত, আত্মমর্যাদার কারণে ফাতিমা (রা) ওপর ফিতনার আশঙ্কা করেছেন। আরও বলা হয়ে থাকে যে, এখানে নিষেধ দ্বারা একত্রিত করা নিষেধ করা হয়নি। বরং এর অর্থ হলো, আমি আল্লাহর অনুগ্রহ ভালোভাবে জানি যে, তারা দুজন একত্রিত হবে না। আবার এর দ্বারা একত্রিত হওয়া হারামও উদ্দেশ্য হতে পারে। আর “আমি কোনো হালালকে হারাম করি না”—এর অর্থ হলো, আমি আল্লাহর হুকুমের বিপরীত কোনো কথা বলি না। তখন আমি তা যখন কোনো জিনিস হালাল করেছেন, তখন আমি তা হারাম করি না। আর যখন তিনি কোনো জিনিস হারাম করে দিয়েছেন, আমি তা হালাল করি না। আর আমি তার হারামের ব্যাপারে চুপও থাকি না; কারণ, আমার চুপ থাকা বৈধতার দলিল...’

ইবনুল কাইয়িম (র) বলেন, ‘এই হাদিসে যেকোনো দিক দিয়ে নবিজি (সা)-কে কষ্ট দেওয়াকে হারাম করা হয়েছে; যদিও কাজটি বৈধ কাজ হয়। যখন ওই বৈধ কাজের মাধ্যমে নবিজি (সা) কষ্ট পাবেন, তখন সেটি করা জায়েজ হবে না। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেন :

وَمَا كَانَ لَكُمْ أَنْ تُؤْذُوا رَسُولَ اللَّهِ

“এটি তোমাদের জন্য সংগত নয় যে, তোমরা আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেবে।”

এখানে এ বিষয়টিও বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পরিবার-পরিজনকে কষ্ট দেওয়া তাঁকে কষ্ট দেওয়ারই নামান্তর।’

আওনুল মাবুদ গ্রন্থে এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে :

“আর আমি কোনো হালালকে হারাম করি না এবং কোনো হারামকে হালাল করি না। কিন্তু আল্লাহর শপথ, তারা একত্রিত হবে না।” এখানে আলি (রা)-এর জন্য আবু জাহেলের কন্যাকে বিয়ে করার বৈধতার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। কিন্তু তার কন্যা ও নবিজি (সা)-এর কন্যা ফাতিমার মাঝে একত্রিত করতে নিষেধ করেছেন। কারণ, এতে ফাতিমা (রা) কষ্ট পাবেন এবং তাঁর কষ্টের কারণে নবিজি (সা) কষ্ট পাবেন। আর নবিজি (সা) ফাতিমার আত্মমর্যাদার কারণে তাঁর ওপর ফিতনার আশঙ্কা করেছিলেন।

৩. বিয়ের আকদের ক্ষেত্রে কুমারী মেয়ের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

লজ্জা নারীর স্বভাব, লজ্জা নারীর ভূষণ। আর কুমারী মেয়েরাই সবচেয়ে বেশি লজ্জাশীলা হয়ে থাকে। তাই ইসলাম বিবাহের আকদ বা চুক্তি সম্পন্নের সময় এ বিষয়টির প্রতি লক্ষ রেখেছে। যদিও বিয়ের আকদ সম্পন্ন হওয়ার জন্য স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা শর্ত এবং এ ছাড়া বিয়ে পূর্ণতা লাভ করবে না; কিন্তু ইসলাম কুমারী মেয়ের অনুভূতি ও তার লজ্জার প্রতি খেয়াল রেখেছে—যা তাকে মুখে বিয়ের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশে বাধা প্রদান করে। তাই বিয়ের অনুমতির ক্ষেত্রে তার চুপ থাকাই যথেষ্ট এবং তার এই চুপ থাকাকেই স্বীকার করে নেওয়া হিসেবে ধরা হয়েছে।

আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন :

لَا تُنْكَحُ الأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ، وَلَا تُنْكَحُ البِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ» قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَكَيْفَ إِذْنُهَا؟ قَالَ: «أَنْ تَسْكُتَ»

‘কোনো বিধবা নারীকে তার সম্মতি ব্যতীত বিয়ে দেওয়া যাবে না এবং কুমারী মহিলাকে তাঁর অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।’ লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, ‘হে আল্লাহর রাসূল, কেমন করে তার অনুমতি নেওয়া হবে?’ তিনি বললেন, ‘তার চুপ থাকাটাই তার অনুমতি।’

৪. জাহিলিয়াত থেকে দ্বীনের পথে নতুন প্রত্যাবর্তনকারী ব্যক্তির অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

সত্যবাদী দায়ি আল্লাহর দ্বীনের প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সকল বৈধ মাধ্যম গ্রহণ করেন। এ ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) হলেন সর্বোত্তম আদর্শ। কারণ, তিনি বৈধ পদ্ধতিগুলো ওই সকল লোকের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন, যারা একসময় তাঁর ও মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল এবং যারা ইসলামের দাওয়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এবং এর বিকাশকে শুরুর সময়ই জ্যান্ত কবর দিতে চেষ্টা করেছিল। রাসূল (সা) তাদেরকে কাছে টেনে নিয়েছেন। হুনাইনের যুদ্ধের গনিমত তাদের মাঝে এমনভাবে বণ্টন করেছেন যে, যাতে তারা আর কোনো দরিদ্রতার ভয় না করে। যা আনসারদের মাঝে আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি করে দিয়েছিল। তখন নবিজি (সা) আনসারদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন :

إِنَّ قُرَيْشًا عَهْدٌ بِجَاهِلِيَّةٍ وَمُصِيبَةٍ، وَإِنِّي أَرَدْتُ أَنْ أَجْبُرَهُمْ وَأَتَأَلَّفَهُمْ، أَمَا تَرْضَوْنَ أَنْ يَرْجِعَ النَّاسُ بِالدُّنْيَا، وَتَرْجِعُونَ بِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى بُيُوتِكُمْ» قَالُوا: بَلَى، قَالَ: «لَوْ سَلَكَ النَّاسُ وَادِيًا، وَسَلَكَتِ الأَنْصَارُ شِعْبًا، لَسَلَكْتُ وَادِيَ الأَنْصَارِ، أَوْ شِعْبَ الأَنْصَارِ»

‘কুরাইশরা সবেমাত্র জাহিলিয়াত ছেড়েছে আর তারা দুর্দশাগ্রস্ত। তাই আমি তাদেরকে অনুদান দিয়ে তাদের মন জয় করার ইচ্ছা করেছি। তোমরা কি সন্তুষ্ট নও যে, লোকেরা পার্থিব সম্পদ নিয়ে ফিরে যাবে আর তোমরা তোমাদের ঘরে ফিরে যাবে আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে।’ তারা বলল, ‘অবশ্যই আমরা সন্তুষ্ট।’ তিনি আরও বললেন, ‘যদি লোকজন উপত্যকা দিয়ে চলে আর আনসাররা গিরিপথ দিয়ে চলে, তাহলে আনসারদের গিরিপথ—অথবা বলেছেন—আনসারদের উপত্যকা দিয়েই আমি চলব।’

৫. নিজের জন্মভূমি ছেড়ে আসা ব্যক্তির অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবিজি (সা) যখন মদিনায় আগমন করলেন, তখন আবু বকর (রা) ও বিলাল (রা) ভীষণ জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। আমি তাঁদের দেখতে গেলাম। বললাম, “আব্বাজান, কেমন আছেন? হে বিলাল, আপনি কেমন আছেন?”’ আয়িশা (রা) বলেন, আবু বকর (রা) জ্বরাক্রান্ত হলেই এ পঙক্তিগুলো আবৃত্তি করতেন :

كل امرئ مصبح في أهله *** والموت أدنى من شراك نعله

“প্রত্যেকেই স্বীয় পরিবারের মাঝে সকালে উপনীত হয়; অথচ মৃত্যু তার জুতোর ফিতা অপেক্ষা সন্নিকটে।”

আর বিলাল (রা) নিজের জ্বর থেকে সেরে উঠলে উচ্চস্বরে এই কবিতা আবৃত্তি করতেন :

ألا ليت شعري هل أبيتن ليلة *** بواد وحولي إذخر وجليل
وهل أردن يوما مياه مجنة *** وهل يبدون لي شامة وطفيل

“হায়, আমি যদি জানতাম আমি এ মক্কা উপত্যকায় আবার রাত কাটাতে পারব কি না! যেখানে আমার চারপাশে থাকত ইজখির ও জালিল ঘাস। মাজান্না ঝরনার পানি পানের সুযোগ আর হবে কি? আমার সামনে উদ্ভাসিত হবে কি শামা ও তাফিল পাহাড়?”

আয়িশা (রা) বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট এসে তাঁকে এ সংবাদ জানালাম। তিনি বললেন :

اللَّهُمَّ حَبِّبْ إِلَيْنَا المَدِينَةَ كَحُبِّنَا مَكَّةَ أَوْ أَشَدَّ وَصَحِّحْهَا وَبَارِكْ لَنَا فِي صَاعِهَا وَمُدِّهَا، وَانْقُلْ حُمَّاهَا فَاجْعَلْهَا بِالْجُحْفَةِ

“হে আল্লাহ, মদিনাকে আমাদের প্রিয় করে দিন, যেমন প্রিয় ছিল আমাদের মক্কা। আমাদের জন্য মদিনাকে স্বাস্থ্যকর করে দিন। মদিনার সা’ ও মুদের মধ্যে বরকত দান করুন। আর এখানকার জ্বরকে সরিয়ে জুহফায় নিয়ে যান।”

এই হলো নবিজি (সা)-এর পক্ষ থেকে দুআ। এতে তাঁর সাথিদের অনুভূতির মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং তাঁদের মুসিবতকে হালকা করা হয়েছে।

টিকাঃ
১২৬. সহিহুল বুখারি : ৫২৮৩।
১২৭. সহিহুল বুখারি : ৪৪১৮।
১২৮. ফাতহুল বারি : ৮/১২৪।
১২৯. সুনানুত তিরমিজি : ১৯৮২।
১৩০. সহিহুল বুখারি : ৩৭২৯।
১৩১. সহিহুল বুখারি : ৩১১০।
১৩২. শারহুন নববি আলা মুসলিম : ৩/১৬।
১৩৩. সুরা আল-আহজাব, ৩৩ : ৫৩।
১৩৪. হাশিয়াতু ইবনিল কাইয়িম আলা সুনানি আবি দাউদ : ৬/৫৫-৫৬।
১৩৫. আওনুল মাবুদ : ৬/৫৫।
১৩৬. সহিহুল বুখারি : ৫১৩৬, সহিহ মুসলিম : ১৪১৯।
১৩৭. সহিহুল বুখারি : ৪৩৩৪, সহিহ মুসলিম : ১০৫৯।
১৩৮. সহিহুল বুখারি : ৩৯২৬।

ফন্ট সাইজ
15px
17px