📄 পঞ্চমত, যে কল্যাণকর কাজের ইচ্ছা করেছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
১. যারা কল্যাণকর কাজের ইচ্ছা করেছে; কিন্তু অক্ষমতা বা প্রতিবন্ধকতার কারণে তা করতে পারে না, তাদের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি নবীজি (সা) থেকে বর্ণনা করেন। নবীজি (সা) বলেন :
لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي مَا تَخَلَّفْتُ عَنْ سَرِيَّةٍ، وَلَكِنْ لَا أَجِدُ حَمُولَةً، وَلَا أَجِدُ مَا أَحْمِلُهُمْ عَلَيْهِ، وَيَشُقُّ عَلَيَّ أَنْ يَتَخَلَّفُوا عَنِّي...
‘আমার উম্মতের জন্য কষ্টসাধ্য হবে বলে যদি মনে না করতাম, তবে আমি কোনো যুদ্ধে গমন হতে বিরত থাকতাম না। কিন্তু আমি তো সওয়ারি সংগ্রহ করতে পারছি না এবং আমি এতগুলো সওয়ারি পাচ্ছি না, যার ওপর আমি তাদের আরোহণ করাতে পারি। আর আমার জন্য এটা কষ্টদায়ক হবে যে, তারা আমার থেকে পেছনে পড়ে থাকবে।...’
জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা এক যুদ্ধে রাসূল (সা)-এর সাথে ছিলাম। তিনি বললেন :
إِنَّ بِالْمَدِينَةِ لَرِجَالًا مَا سِرْتُمْ مَسِيرًا، وَلَا قَطَعْتُمْ وَادِيًا، إِلَّا كَانُوا مَعَكُمْ، حَبَسَهُمُ الْمَرْضُ
‘মদিনাতে এমন কিছু লোক রয়েছে যে, তোমরা এমন কোনো দূরপথ ভ্রমণ করোনি এবং এমন কোনো উপত্যকা অতিক্রম করোনি, যেখানে তারা তোমাদের সঙ্গে ছিল না। অসুস্থতা তাদের আটকিয়ে দিয়েছে।’
ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘উসমান (রা) বদর যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলেন। কারণ, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কন্যা ছিলেন উসমান (রা)-এর স্ত্রী আর তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। ফলে নবীজি (সা) তাঁকে বললেন, (إِنَّ لَكَ أَجْرَ رَجُلٍ مِمَّنْ شَهِدَ بَدْرًا وَسَهْمَهُ) “বদর যুদ্ধে যোগদানকারীর সমপরিমাণ সাওয়াব ও (গনিমতের) অংশ তুমি পাবে।”
২. যে কোনো কল্যাণ বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে; কিন্তু অন্যজন তা বাস্তবায়ন করেছে অথবা পরিপূর্ণতা দান করেছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
আব্দুর রহমান বিন আওফ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যখন আমি বদর যুদ্ধে সারিতে দাঁড়িয়ে আছি, আমি আমার ডানে বামে তাকিয়ে দেখলাম, অল্প বয়সি দুজন আনসার যুবকের মাঝখানে আছি। আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল, তাদের চেয়ে শক্তিশালীদেের মধ্যে থাকি। তখন তাঁদের একজন আমাকে খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “চাচা, আপনি কি আবু জাহেলকে চেনেন?” আমি বললাম, “হ্যাঁ। তবে ভাতিজা, তাতে তোমার দরকার কী?” সে বলল, “আমাকে জানানো হয়েছে যে, সে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে গালাগালি করে। সে মহান সত্তার শপথ—যাঁয় হাতে আমার প্রাণ, আমি যদি তাকে দেখতে পাই, তবে আমার দেহ তার দেহ হতে বিচ্ছিন্ন হবে না, যতক্ষণ না আমাদের মধ্যে যার মৃত্যু আগে নির্ধারিত, সে মারা যায়।” আমি তাঁর কথায় আশ্চর্য হলাম। তা শুনে দ্বিতীয়জন আমাকে খোঁচা দিয়ে ওই রকমই বলল। তৎক্ষণাৎ আমি আবু জাহেলকে দেখলাম, সে লোকজনের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তখন আমি বললাম, “এই যে তোমাদের সেই ব্যক্তি, যার সম্পর্কে তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে।” তাঁরা তৎক্ষণাৎ নিজের তরবারি নিয়ে তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তাকে আঘাত করে হত্যা করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে ফিরে এসে তাঁকে তা জানাল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “তোমাদের মধ্যে কে তাকে হত্যা করেছে?” তাঁরা উভয়ে দাবি করল, “আমি তাকে হত্যা করেছি।” রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “তোমাদের তরবারি তোমরা মুছে ফেলোনি তো?” তাঁরা উভয়ে বলল, “না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁদের উভয়ের তরবারি দেখলেন এবং বললেন, “তোমরা উভয়ে তাকে হত্যা করেছ। অবশ্য তার নিকট হতে প্রাপ্ত মালামাল মুআজ বিন আমর বিন জামুহের জন্য।” তাঁরা দুজন হলো, মুআজ বিন আফরা ও মুআজ বিন আমর বিন জামুহ (রা)।
আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক প্রেরিত কোনো এক সামরিক অভিযানকারী দলের সঙ্গে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সৈন্যরা (কৌশলগত কারণে) পলায়ন করলে আমিও তাদের সাথে আত্মগোপন করি। অতঃপর বিপদযুক্ত হয়ে বাইরে বের হয়ে এসে পরামর্শ করি, এখন কী করা যায়? আমরা তো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালানোর কারণে আল্লাহর অসন্তুষ্টির পাত্র হয়েছি। আমরা বললাম, “চলো আমরা মদিনায় গিয়ে আত্মগোপন করে থাকি; যেন কেউ আমাদের দেখতে না পায়। দ্বিতীয়বার জিহাদের সুযোগ হলে আমরা তাতে যোগদান করব।” ইবনে উমর (রা) বলেন, ‘অতঃপর আমরা মদিনায় প্রবেশ করে পরস্পর বলাবলি করলাম, “আমরা যদি নিজেদেরকে রাসূল (সা)-এর সামনে পেশ করি এবং আমাদের জন্য যদি তাওবার সুযোগ থাকে, তাহলে মদিনায় থেকে যাব। এর বিপরীত কিছু হলে মদিনা ছেড়ে চলে যাব।” তিনি বলেন, ‘আমরা ফজরের সালাতের পূর্বেই (মসজিদে) গিয়ে রাসূল (সা)-এর অপেক্ষায় বসে রইলাম। অতঃপর তিনি বেরিয়ে এলে আমরা দাঁড়িয়ে বললাম, “আমরা তো পলাতক সৈনিক।” তিনি আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, (لَا، بَلْ أَنْتُمُ الْعَكَّارُونَ) “না, বরং তোমরা পুনরায় যুদ্ধে যোগদানকারী।” ইবনে উমর (রা) বলেন, ‘অতঃপর আমরা তাঁর কাছে গিয়ে তাঁর হাতে চুমো দিলাম। তিনি বললেন, (إِنَّا فِئَةُ الْمُسْلِمِينَ) “আমিই মুসলিমদের পশ্চাতের দল।”
আওনুল মাবুদ নামক গ্রন্থে এসেছে, (بَلْ أَنْتُمُ الْعَكَّارُونَ) অর্থাৎ তোমরা যুদ্ধে প্রত্যাগমনকারী।
ইমাম আল-খাত্তাবি (র) নবীজি (সা)-এর বাণী (إِنَّا فِئَةُ الْمُسْلِمِينَ)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘নবিজি (সা) এর মাধ্যমে তাঁদের ওজরকে সহজ করে দিয়েছেন। আর এটি ছিল আল্লাহ তাআলার এই বাণীর ব্যাখ্যা :
أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ
“অথবা কোনো দলের কাছে আশ্রয় নিয়ে (যদি তাদের দিকে পিঠ ফেরায়)।”
৩. যে দরিদ্র লোকেরা কল্যাণের ইচ্ছা করেছে; কিন্তু চেষ্টা সত্ত্বেও তা করতে সক্ষম হয়নি, তাদের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন :
مَا مِنْ غَازِيَةٍ تَغْزُو فِي سَبِيلِ اللهِ فَيُصِيبُونَ الْغَنِيمَةَ، إِلَّا تَعَجَّلُوا ثُلُثَيْ أَجْرِهِمْ مِنَ الْآخِرَةِ، وَيَبْقَى لَهُمْ الثُّلُثُ، وَإِنْ لَمْ يُصِيبُوا غَنِيمَةً، تَمَّ لَهُمْ أَجْرُهُمْ
‘যে বাহিনী আল্লাহর পথে জিহাদ করল এবং তাতে গনিমত লাভ করল, তারা এ দুনিয়াতেই আখিরাতের দুই-তৃতীয়াংশ বিনিময় নগদ পেয়ে গেল। তাদের জন্য কেবল এক-তৃতীয়াংশ বিনিময় অবশিষ্ট রইল। আর যে বাহিনী কোনো গনিমত লাভ করল না, তাদের পূর্ণ বিনিময়ই পাওনা রয়ে গেল।
আমর বিন আবাসাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসূল (সা)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন :
أَيُّمَا رَجُلٍ مُسْلِمٍ رَمَى بِسَهْمٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فَبَلَغَ مُخْطِئًا أَوْ مُصِيبًا فَلَهُ مِنَ الْأَجْرِ كَرَقَبَةٍ أَعْتَقَهَا مِنْ وَلَدِ إِسْمَاعِيلَ
“যেকোনো মুসলিম আল্লাহর পথে তির নিক্ষেপ করে, সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে ভুলকারী হোক কিংবা সঠিক, তার জন্য ইসমাইল (আ)-এর বংশধর থেকে একজন গোলাম আজাদ করার প্রতিদান রয়েছে।”
সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা রাসূল (সা)-এর সাথে খাইবারে বের হলাম। তখন তাঁদের এক ব্যক্তি বলল, “হে আমির, তুমি আমাদেরকে উট চালনার কিছু গান শোনাও।” সে তাঁদের তা গেয়ে শোনাল। তখন নবীজি (সা) বললেন, “চালকটি কে?” তাঁরা বলল, “আমির।” তিনি বললেন, “আল্লাহ তাঁর ওপর রহম করুন!” লোকেরা বলল, “হে আল্লাহর রাসূল! আমাদেরেকে তাঁর থেকে দীর্ঘকাল উপকার লাভ করার সুযোগ করে দিন।” পরদিন সকালে আমির নিহত হলো। তখন লোকেরা বলল, “তাঁর আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে। সে নিজেকে হত্যা করেছে।” যখন আমি ফিরলাম, আর লোকেরা বলাবলি করছিল যে, “আমিরের আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে”, তখন আমি নবীজি (সা)-এর নিকটে এলাম। আমি বললাম, “হে আল্লাহর নবি, আপনার জন্য আমার পিতামাতা কুরবান হোক! তারা ধারণা করেছে যে, আমিরের আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে।” তিনি বললেন :
كَذَبَ مَنْ قَالَهَا، إِنَّ لَهُ لَأَجْرَيْنِ اثْنَيْنِ، إِنَّهُ لَجَاهِدٌ مُجَاهِدٌ
“যে এ কথা বলেছে, সে মিথ্যা বলেছে। নিশ্চয় তাঁর (আমিরের) জন্য দ্বিগুণ পুরস্কার রয়েছে। কারণ, সে আল্লাহর পথে সাধ্যমতো চেষ্টাকারী মুজাহিদ।”
টিকাঃ
৭৬. সহিহুল বুখারি : ২৯৭৫।
৭৭. সহিহুল বুখারি : ৪৪২৩, সহিহ মুসলিম : ১৯১১।
৭৮. সহিহুল বুখারি : ৩১৩০।
৭৯. সহিহুল বুখারি : ৩১৪১।
৮০. সুনানু আবি দাউদ : ২৬৪৭।
৮১. সুরা আল-আনফাল, ৮ : ১৬।
৮২. সহিহ মুসলিম : ১৯০৬।
৮৩. মুসনাদু আহমাদ : ১৭০২৩।
১. যারা কল্যাণকর কাজের ইচ্ছা করেছে; কিন্তু অক্ষমতা বা প্রতিবন্ধকতার কারণে তা করতে পারে না, তাদের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি নবীজি (সা) থেকে বর্ণনা করেন। নবীজি (সা) বলেন :
لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي مَا تَخَلَّفْتُ عَنْ سَرِيَّةٍ، وَلَكِنْ لَا أَجِدُ حَمُولَةً، وَلَا أَجِدُ مَا أَحْمِلُهُمْ عَلَيْهِ، وَيَشُقُّ عَلَيَّ أَنْ يَتَخَلَّفُوا عَنِّي...
‘আমার উম্মতের জন্য কষ্টসাধ্য হবে বলে যদি মনে না করতাম, তবে আমি কোনো যুদ্ধে গমন হতে বিরত থাকতাম না। কিন্তু আমি তো সওয়ারি সংগ্রহ করতে পারছি না এবং আমি এতগুলো সওয়ারি পাচ্ছি না, যার ওপর আমি তাদের আরোহণ করাতে পারি। আর আমার জন্য এটা কষ্টদায়ক হবে যে, তারা আমার থেকে পেছনে পড়ে থাকবে।...’
জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা এক যুদ্ধে রাসূল (সা)-এর সাথে ছিলাম। তিনি বললেন :
إِنَّ بِالْمَدِينَةِ لَرِجَالًا مَا سِرْتُمْ مَسِيرًا، وَلَا قَطَعْتُمْ وَادِيًا، إِلَّا كَانُوا مَعَكُمْ، حَبَسَهُمُ الْمَرْضُ
‘মদিনাতে এমন কিছু লোক রয়েছে যে, তোমরা এমন কোনো দূরপথ ভ্রমণ করোনি এবং এমন কোনো উপত্যকা অতিক্রম করোনি, যেখানে তারা তোমাদের সঙ্গে ছিল না। অসুস্থতা তাদের আটকিয়ে দিয়েছে।’
ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘উসমান (রা) বদর যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলেন। কারণ, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কন্যা ছিলেন উসমান (রা)-এর স্ত্রী আর তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। ফলে নবীজি (সা) তাঁকে বললেন, (إِنَّ لَكَ أَجْرَ رَجُلٍ مِمَّنْ شَهِدَ بَدْرًا وَسَهْمَهُ) “বদর যুদ্ধে যোগদানকারীর সমপরিমাণ সাওয়াব ও (গনিমতের) অংশ তুমি পাবে।”
২. যে কোনো কল্যাণ বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে; কিন্তু অন্যজন তা বাস্তবায়ন করেছে অথবা পরিপূর্ণতা দান করেছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
আব্দুর রহমান বিন আওফ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যখন আমি বদর যুদ্ধে সারিতে দাঁড়িয়ে আছি, আমি আমার ডানে বামে তাকিয়ে দেখলাম, অল্প বয়সি দুজন আনসার যুবকের মাঝখানে আছি। আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল, তাদের চেয়ে শক্তিশালীদেের মধ্যে থাকি। তখন তাঁদের একজন আমাকে খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “চাচা, আপনি কি আবু জাহেলকে চেনেন?” আমি বললাম, “হ্যাঁ। তবে ভাতিজা, তাতে তোমার দরকার কী?” সে বলল, “আমাকে জানানো হয়েছে যে, সে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে গালাগালি করে। সে মহান সত্তার শপথ—যাঁয় হাতে আমার প্রাণ, আমি যদি তাকে দেখতে পাই, তবে আমার দেহ তার দেহ হতে বিচ্ছিন্ন হবে না, যতক্ষণ না আমাদের মধ্যে যার মৃত্যু আগে নির্ধারিত, সে মারা যায়।” আমি তাঁর কথায় আশ্চর্য হলাম। তা শুনে দ্বিতীয়জন আমাকে খোঁচা দিয়ে ওই রকমই বলল। তৎক্ষণাৎ আমি আবু জাহেলকে দেখলাম, সে লোকজনের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তখন আমি বললাম, “এই যে তোমাদের সেই ব্যক্তি, যার সম্পর্কে তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে।” তাঁরা তৎক্ষণাৎ নিজের তরবারি নিয়ে তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তাকে আঘাত করে হত্যা করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে ফিরে এসে তাঁকে তা জানাল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “তোমাদের মধ্যে কে তাকে হত্যা করেছে?” তাঁরা উভয়ে দাবি করল, “আমি তাকে হত্যা করেছি।” রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “তোমাদের তরবারি তোমরা মুছে ফেলোনি তো?” তাঁরা উভয়ে বলল, “না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁদের উভয়ের তরবারি দেখলেন এবং বললেন, “তোমরা উভয়ে তাকে হত্যা করেছ। অবশ্য তার নিকট হতে প্রাপ্ত মালামাল মুআজ বিন আমর বিন জামুহের জন্য।” তাঁরা দুজন হলো, মুআজ বিন আফরা ও মুআজ বিন আমর বিন জামুহ (রা)।
আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক প্রেরিত কোনো এক সামরিক অভিযানকারী দলের সঙ্গে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সৈন্যরা (কৌশলগত কারণে) পলায়ন করলে আমিও তাদের সাথে আত্মগোপন করি। অতঃপর বিপদযুক্ত হয়ে বাইরে বের হয়ে এসে পরামর্শ করি, এখন কী করা যায়? আমরা তো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালানোর কারণে আল্লাহর অসন্তুষ্টির পাত্র হয়েছি। আমরা বললাম, “চলো আমরা মদিনায় গিয়ে আত্মগোপন করে থাকি; যেন কেউ আমাদের দেখতে না পায়। দ্বিতীয়বার জিহাদের সুযোগ হলে আমরা তাতে যোগদান করব।” ইবনে উমর (রা) বলেন, ‘অতঃপর আমরা মদিনায় প্রবেশ করে পরস্পর বলাবলি করলাম, “আমরা যদি নিজেদেরকে রাসূল (সা)-এর সামনে পেশ করি এবং আমাদের জন্য যদি তাওবার সুযোগ থাকে, তাহলে মদিনায় থেকে যাব। এর বিপরীত কিছু হলে মদিনা ছেড়ে চলে যাব।” তিনি বলেন, ‘আমরা ফজরের সালাতের পূর্বেই (মসজিদে) গিয়ে রাসূল (সা)-এর অপেক্ষায় বসে রইলাম। অতঃপর তিনি বেরিয়ে এলে আমরা দাঁড়িয়ে বললাম, “আমরা তো পলাতক সৈনিক।” তিনি আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, (لَا، بَلْ أَنْتُمُ الْعَكَّارُونَ) “না, বরং তোমরা পুনরায় যুদ্ধে যোগদানকারী।” ইবনে উমর (রা) বলেন, ‘অতঃপর আমরা তাঁর কাছে গিয়ে তাঁর হাতে চুমো দিলাম। তিনি বললেন, (إِنَّا فِئَةُ الْمُسْلِمِينَ) “আমিই মুসলিমদের পশ্চাতের দল।”
আওনুল মাবুদ নামক গ্রন্থে এসেছে, (بَلْ أَنْتُمُ الْعَكَّارُونَ) অর্থাৎ তোমরা যুদ্ধে প্রত্যাগমনকারী।
ইমাম আল-খাত্তাবি (র) নবীজি (সা)-এর বাণী (إِنَّا فِئَةُ الْمُسْلِمِينَ)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘নবিজি (সা) এর মাধ্যমে তাঁদের ওজরকে সহজ করে দিয়েছেন। আর এটি ছিল আল্লাহ তাআলার এই বাণীর ব্যাখ্যা :
أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ
“অথবা কোনো দলের কাছে আশ্রয় নিয়ে (যদি তাদের দিকে পিঠ ফেরায়)।”
৩. যে দরিদ্র লোকেরা কল্যাণের ইচ্ছা করেছে; কিন্তু চেষ্টা সত্ত্বেও তা করতে সক্ষম হয়নি, তাদের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন :
مَا مِنْ غَازِيَةٍ تَغْزُو فِي سَبِيلِ اللهِ فَيُصِيبُونَ الْغَنِيمَةَ، إِلَّا تَعَجَّلُوا ثُلُثَيْ أَجْرِهِمْ مِنَ الْآخِرَةِ، وَيَبْقَى لَهُمْ الثُّلُثُ، وَإِنْ لَمْ يُصِيبُوا غَنِيمَةً، تَمَّ لَهُمْ أَجْرُهُمْ
‘যে বাহিনী আল্লাহর পথে জিহাদ করল এবং তাতে গনিমত লাভ করল, তারা এ দুনিয়াতেই আখিরাতের দুই-তৃতীয়াংশ বিনিময় নগদ পেয়ে গেল। তাদের জন্য কেবল এক-তৃতীয়াংশ বিনিময় অবশিষ্ট রইল। আর যে বাহিনী কোনো গনিমত লাভ করল না, তাদের পূর্ণ বিনিময়ই পাওনা রয়ে গেল।
আমর বিন আবাসাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসূল (সা)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন :
أَيُّمَا رَجُلٍ مُسْلِمٍ رَمَى بِسَهْمٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فَبَلَغَ مُخْطِئًا أَوْ مُصِيبًا فَلَهُ مِنَ الْأَجْرِ كَرَقَبَةٍ أَعْتَقَهَا مِنْ وَلَدِ إِسْمَاعِيلَ
“যেকোনো মুসলিম আল্লাহর পথে তির নিক্ষেপ করে, সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে ভুলকারী হোক কিংবা সঠিক, তার জন্য ইসমাইল (আ)-এর বংশধর থেকে একজন গোলাম আজাদ করার প্রতিদান রয়েছে।”
সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা রাসূল (সা)-এর সাথে খাইবারে বের হলাম। তখন তাঁদের এক ব্যক্তি বলল, “হে আমির, তুমি আমাদেরকে উট চালনার কিছু গান শোনাও।” সে তাঁদের তা গেয়ে শোনাল। তখন নবীজি (সা) বললেন, “চালকটি কে?” তাঁরা বলল, “আমির।” তিনি বললেন, “আল্লাহ তাঁর ওপর রহম করুন!” লোকেরা বলল, “হে আল্লাহর রাসূল! আমাদেরেকে তাঁর থেকে দীর্ঘকাল উপকার লাভ করার সুযোগ করে দিন।” পরদিন সকালে আমির নিহত হলো। তখন লোকেরা বলল, “তাঁর আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে। সে নিজেকে হত্যা করেছে।” যখন আমি ফিরলাম, আর লোকেরা বলাবলি করছিল যে, “আমিরের আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে”, তখন আমি নবীজি (সা)-এর নিকটে এলাম। আমি বললাম, “হে আল্লাহর নবি, আপনার জন্য আমার পিতামাতা কুরবান হোক! তারা ধারণা করেছে যে, আমিরের আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে।” তিনি বললেন :
كَذَبَ مَنْ قَالَهَا، إِنَّ لَهُ لَأَجْرَيْنِ اثْنَيْنِ، إِنَّهُ لَجَاهِدٌ مُجَاهِدٌ
“যে এ কথা বলেছে, সে মিথ্যা বলেছে। নিশ্চয় তাঁর (আমিরের) জন্য দ্বিগুণ পুরস্কার রয়েছে। কারণ, সে আল্লাহর পথে সাধ্যমতো চেষ্টাকারী মুজাহিদ।”
টিকাঃ
৭৬. সহিহুল বুখারি : ২৯৭৫।
৭৭. সহিহুল বুখারি : ৪৪২৩, সহিহ মুসলিম : ১৯১১।
৭৮. সহিহুল বুখারি : ৩১৩০।
৭৯. সহিহুল বুখারি : ৩১৪১।
৮০. সুনানু আবি দাউদ : ২৬৪৭।
৮১. সুরা আল-আনফাল, ৮ : ১৬।
৮২. সহিহ মুসলিম : ১৯০৬।
৮৩. মুসনাদু আহমাদ : ১৭০২৩।
📄 ষষ্ঠত, রোগাক্রান্ত বা এ ধরনের লোকদের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
১. যার আকৃতিগত সমস্যা আছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
ইসলামি শরিয়তের নীতি হলো, যে রোগাক্রান্ত বা বিকলাঙ্গ অথবা যার দৈহিক খুঁত আছে, তাকে দেখার সময় আল্লাহর প্রশংসা করবে যে, আল্লাহ তাআলা তাকে সুস্থতা ও নিরাপত্তার নিয়ামতের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এই দুই নিয়ামত তার জন্য পরিপূর্ণ করেছেন। এবং আক্রান্ত মুসলিমের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে তাকে কষ্ট দেবে না; কেননা, এর ফলে সে নিজের ত্রুটি অনুভব করবে এবং তার মাঝে আফসোসের জন্ম নেবে। এর ফলে সে ধারণা করবে যে, মানুষ তাকে ঘৃণা করে; অন্যেরা তার চেয়ে উত্তম। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যার মাঝে কোনো ব্যাধি রয়েছে, এ ব্যাপারে সে মানুষের অবগতি অপছন্দ করে।
ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন :
لَا تُحِدُّوا النَّظَرَ إِلَيْهِمْ يَعْنِي الْمَجْذُومِينَ
‘তাদের তথা কুষ্ঠরোগীদের দিকে তোমরা গভীর দৃষ্টি দিয়ো না।’
তাঁর অন্য এক বর্ণনায় আছে, নবীজি (সা) বলেন :
لَا تُدِيمُوا النَّظَرَ إِلَى الْمَجْذُومِينَ
“তোমরা কুষ্ঠরোগীদের দিকে দীর্ঘ দৃষ্টি দিয়ো না।”
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা) বলেন :
مَنْ رَأَى مُبْتَلًى، فَقَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي عَافَانِي مِمَّا ابْتَلَاكَ بِهِ، وَفَضَّلَنِي عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقَ تَفْضِيلًا، لَمْ يُصِبْهُ ذَلِكَ الْبَلَاءُ
‘যে লোক কোনো রোগাক্রান্ত বা বিপদগ্রস্ত লোককে দেখে বলে, (اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي عَافَانِي مِمَّا ابْتَلَاكَ بِهِ، وَفَضَّلَنِي عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقَ تَفْضِيلًا) “সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি তোমাকে যে ব্যাধিতে আক্রান্ত করেছেন, তা হতে আমাকে নিরাপদ রেখেছেন এবং তার অসংখ্য সৃষ্টির ওপর আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।” সে উক্ত ব্যাধিতে কখনো আক্রান্ত হবে না।’
ইমাম নববি (র) বলেন, ‘আমাদের ইমামগণ ও অন্যান্য আলিমগণ বলেছেন, এই দুআ গোপনে বলবে; যেন পাঠকারী নিজে শুনতে পায়। আক্রান্ত ব্যক্তিকে তা শোনাবে না; কেননা, এতে সে মনে কষ্ট পাবে। কিন্তু যদি তার বিপদ গুনাহের কারণে হয়, তাহলে ভিন্ন কথা। এই সময় যদি তার থেকে কোনো বিশৃঙ্খলার ভয় না থাকে, তাহলে তাকে শুনিয়ে বলাতে কোনো অসুবিধা নেই। আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞাত।
২. কষ্টে পতিত ব্যক্তির অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
আব্দুল্লাহ বিন মাকিল (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
قَعَدْتُ إِلَى كَعْبِ بْنِ عُجْرَةَ فِي هَذَا الْمَسْجِدِ يَعْنِي مَسْجِدَ الْكُوفَةِ، فَسَأَلْتُهُ عَنْ صِيَامٍ، فَقَالَ: حُمِلْتُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالْقَمْلُ يَتَنَاثَرُ عَلَى وَجْهِي، فَقَالَ: «مَا كُنْتُ أَرَى أَنَّ الْجُهْدَ قَدْ بَلَغَ بِكَ هَذَا، أَمَا تَجِدُ شَاةً». قُلْتُ: لَا، قَالَ: «صُمْ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ، أَوْ أَطْعِمْ سِتَّةَ مَسَاكِينَ لِكُلِّ مِسْكِينٍ نِصْفَ صَاعٍ مِنْ طَعَامٍ، وَاحْلِقْ رَأْسَكَ» فَنَزَلَتْ فِيَّ خَاصَّةً وَهِيَ لَكُمْ عَامَّةً
‘আমি কাব বিন উজরা-এর নিকট কুফার এই মসজিদে বসা থাকাকালে সাওমের ফিদইয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, “আমার চেহারায় উকুন ছড়িয়ে পড়া অবস্থায় আমাকে নবীজি (সা)-এর নিকট নিয়ে আসা হলো। তিনি তখন বললেন, “আমি মনে করি যে, এতে তোমার কষ্ট হচ্ছে। তুমি কি একটি বকরি সংগ্রহ করতে পারবে?” আমি বললাম, “না।” তিনি বললেন, “তুমি তিন দিন সাওম পালন করো অথবা ছয়জন নিঃস্বকে খাদ্য দান করো। প্রত্যেক নিঃস্বকে অর্ধ সা’ খাদ্য দান করতে হবে এবং তোমার মাথার চুল কামিয়ে ফেলবে।” তখন আমার জন্য বিশেষভাবে আয়াত নাজিল হয়; অবশ্য তোমাদের সকলের জন্যও এই হুকুম।’
আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
خَرَجْنَا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا نَذْكُرُ إِلَّا الحَجَّ، فَلَمَّا جِئْنَا سَرِفَ طَمِثْتُ، فَدَخَلَ عَلَيَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا أَبْكِي، فَقَالَ: «مَا يُبْكِيكِ؟» قُلْتُ: لَوَدِدْتُ وَاللَّهِ أَنِّي لَمْ أَحُجَّ العَامَ، قَالَ: «لَعَلَّكِ نُفِسْتِ؟» قُلْتُ: نَعَمْ، قَالَ: «فَإِنَّ ذَلِكَ شَيْءٌ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَى بَنَاتِ آدَمَ، فَافْعَلِي مَا يَفْعَلُ الحَاجُّ، غَيْرَ أَنْ لَا تَطُوفِي بِالْبَيْتِ حَتَّى تَطْهُرِي»
‘আমরা কেবল হজের উদ্দেশ্যে রাসূল (সা)-এর সঙ্গে রওনা করলাম। আমরা যখন সারিফ নামক স্থানে পৌঁছলাম, আমার মাসিক ঋতু শুরু হয়ে গেল। রাসূল (সা) আমার কাছে এলেন, আমি তখন কাঁদছিলাম। তিনি বললেন, “তুমি কাঁদছ কেন?” আমি বললাম, “আল্লাহর কসম, এ বছর হজ না করাই আমার পছন্দনীয়!” তিনি বললেন, “সম্ভবত তুমি ঋতুবতী হয়েছ?” আমি বললাম, “হ্যাঁ।” তিনি বললেন, “এটি তো এমন একটি বিষয়, আল্লাহ তাআলা যা আদম (আ)-এর কন্যাদের জন্য নির্ধারিত করেছেন। তুমি হজ পালনকারীগণ যা করে, তা-ই করো; কিন্তু পবিত্র হওয়া পর্যন্ত বাইতুল্লাহ তাওয়াফ কোরো না।”
অন্য এক বর্ণনায় আছে, ‘নবিজি (সা) কোমল স্বভাবের অধিকারী ছিলেন। যখনই আয়িশা (রা) কোনো আবদার করতেন, তখন তা রক্ষা করতেন।’
৩. ব্যথিত বা পতিত ব্যক্তির অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
নুমান বিন বাশির (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন :
تَرَى الْمُؤْمِنِينَ فِي تَرَاحُمِهِمْ وَتَوَادِّهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ، كَمَثَلِ الْجَسَدِ، إِذَا اشْتَكَى عُضْوًا تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ جَسَدِهِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى
‘পারস্পরিক দয়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনে তুমি মুমিনদের একটি দেহের মতো দেখবে। যখন শরীরের একটি অঙ্গ রোগাক্রান্ত হয়, তখন তার বাকি সব অঙ্গ বিনিদ্রা ও জ্বরের শিকার হয়।’
মুসলিম উম্মাহ এক দেহের ন্যায়; যে দেহের একদম ছোট অঙ্গটি আক্রান্ত হলে বড় অঙ্গটিও তাতে প্রভাবিত হয়। যখন কোনো মুসলিম বিপদ বা মন্দ অবস্থায় পতিত হয়, তখন অন্য ভাইদের দায়িত্ব হলো, তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করা এবং তার অবস্থা দেখে ব্যথিত হওয়া। ঠাট্টা বা তামাশা করা নয়—এটা অমর্যাদাকর ও মন্দ স্বভাব।
আসওয়াদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘কয়েকজন কুরাইশি যুবক আয়িশা (রা)-এর নিকট আগমন করল। তখন তিনি মিনায় অবস্থান করছিলেন। সে সময় তারা হাসছিল। আয়িশা (রা) বললেন, “কোন বিষয় তোমাদের হাসাচ্ছে?” তারা বলল, “অমুক ব্যক্তি তাঁবুর রশির ওপর পড়ে গেছে। ফলে তার গর্দান কিংবা চোখ নিষ্পিষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়।” তিনি বললেন, “তোমরা হেসো না। কেননা, আমি রাসূল (সা)-কে বলতে শুনেছি :
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُشَاكُ شَوْكَةً، فَمَا فَوْقَهَا إِلَّا كُتِبَتْ لَهُ بِهَا دَرَجَةٌ، وَمُحِيَتْ عَنْهُ بِهَا خَطِيئَةٌ
“যেকোনো মুসলিমের গায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ হয় কিংবা তার চেয়েও অধিক ছোট কোনো আঘাত লাগে, তার বিনিময়ে তার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং তার একটি গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।”
৪. যার লজ্জাজনক কিছু ঘটে গেছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
ইসলাম হলো শিষ্টাচার ও উত্তম আদর্শের ধর্ম। ইসলাম সর্বাবস্থায় মুসলিমের কষ্ট ও সমস্যা দূর করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ যখন কোনো মুসলিম ইমাম বা মুক্তাদি হয়ে থাকে এবং সালাতের মাঝেই তার অজু ভেঙে যায়, তখন সে সমস্যায় পড়ে যায়। ইসলাম তার এই পরিস্থিতির বিষয়টি লক্ষ রেখেছে এবং এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় বলে দিয়েছে; যেন তার প্রবৃত্তি তাকে অজুবিহীন সালাত চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কুমন্ত্রণা না দেয়। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা) বলেছেন :
إِذَا أَحْدَثَ أَحَدُكُمْ فِي صَلَاتِهِ فَلْيَأْخُذْ بِأَنْفِهِ، ثُمَّ لِيَنْصَرِفْ
‘যখন সালাতে তোমাদের কারও অজু নষ্ট হয়ে যায়, তখন সে যেন নিজের নাক চেপে ধরে বেরিয়ে যায়।’
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, যে বিষয়টি সমস্যা সৃষ্টি করে, তা গোপন রাখতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে তাওরিয়াহ (দ্ব্যর্থবোধক উক্তি) গ্রহণ করতে হবে। আর এটিকে কপটতাও বলা যাবে না।
তেমনিভাবে ইসলাম ওই ব্যক্তির অনুভূতির প্রতিও লক্ষ করেছে, যার অনিচ্ছা সত্ত্বেও মজলিশে কোনো দূষণীয় বিষয় প্রকাশ হয়ে গেছে। আব্দুল্লাহ বিন জামআহ (রা) থেকে বর্ণিত, ‘নবিজি (সা) বায়ু নিঃসরণের পর হাসি দেওয়া সম্পর্কে বললেন :
لِمَ يَضْحَكُ أَحَدُكُمْ مِمَّا يَفْعَلُ
“তোমাদের কেউ কেউ সে কাজটির জন্য কেন হাসে, যা সে নিজেও করে।”
টিকাঃ
৮৪. সহিহুল বুখারি : ৬৮৯১।
৮৫. আস-সুনানুল কুবরা লিল-বাইহাকি : ১৪২৪৭।
৮৬. সুনানু ইবনি মাজাহ : ৩৫৪৩।
৮৭. সুনানুত তিরমিজি : ৩৪৩২।
৮৮. আল-আজকার : ২৫৮।
৮৯. সহিহুল বুখারি : ৪৫১৭, সহিহ মুসলিম : ১২০১।
৯০. সহিহুল বুখারি : ৩০৫।
৯১. সহিহ মুসলিম : ১২১৩।
৯২. সহিহুল বুখারি : ৬০১১।
৯৩. সহিহ মুসলিম : ২৫৭২।
৯৪. সুনানু আবি দাউদ : ১১১৪।
৯৫. সহিহুল বুখারি : ৪৯৪২, সহিহ মুসলিম : ২৮৫৫।
১. যার আকৃতিগত সমস্যা আছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
ইসলামি শরিয়তের নীতি হলো, যে রোগাক্রান্ত বা বিকলাঙ্গ অথবা যার দৈহিক খুঁত আছে, তাকে দেখার সময় আল্লাহর প্রশংসা করবে যে, আল্লাহ তাআলা তাকে সুস্থতা ও নিরাপত্তার নিয়ামতের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এই দুই নিয়ামত তার জন্য পরিপূর্ণ করেছেন। এবং আক্রান্ত মুসলিমের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে তাকে কষ্ট দেবে না; কেননা, এর ফলে সে নিজের ত্রুটি অনুভব করবে এবং তার মাঝে আফসোসের জন্ম নেবে। এর ফলে সে ধারণা করবে যে, মানুষ তাকে ঘৃণা করে; অন্যেরা তার চেয়ে উত্তম। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যার মাঝে কোনো ব্যাধি রয়েছে, এ ব্যাপারে সে মানুষের অবগতি অপছন্দ করে।
ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন :
لَا تُحِدُّوا النَّظَرَ إِلَيْهِمْ يَعْنِي الْمَجْذُومِينَ
‘তাদের তথা কুষ্ঠরোগীদের দিকে তোমরা গভীর দৃষ্টি দিয়ো না।’
তাঁর অন্য এক বর্ণনায় আছে, নবীজি (সা) বলেন :
لَا تُدِيمُوا النَّظَرَ إِلَى الْمَجْذُومِينَ
“তোমরা কুষ্ঠরোগীদের দিকে দীর্ঘ দৃষ্টি দিয়ো না।”
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা) বলেন :
مَنْ رَأَى مُبْتَلًى، فَقَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي عَافَانِي مِمَّا ابْتَلَاكَ بِهِ، وَفَضَّلَنِي عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقَ تَفْضِيلًا، لَمْ يُصِبْهُ ذَلِكَ الْبَلَاءُ
‘যে লোক কোনো রোগাক্রান্ত বা বিপদগ্রস্ত লোককে দেখে বলে, (اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي عَافَانِي مِمَّا ابْتَلَاكَ بِهِ، وَفَضَّلَنِي عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقَ تَفْضِيلًا) “সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি তোমাকে যে ব্যাধিতে আক্রান্ত করেছেন, তা হতে আমাকে নিরাপদ রেখেছেন এবং তার অসংখ্য সৃষ্টির ওপর আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।” সে উক্ত ব্যাধিতে কখনো আক্রান্ত হবে না।’
ইমাম নববি (র) বলেন, ‘আমাদের ইমামগণ ও অন্যান্য আলিমগণ বলেছেন, এই দুআ গোপনে বলবে; যেন পাঠকারী নিজে শুনতে পায়। আক্রান্ত ব্যক্তিকে তা শোনাবে না; কেননা, এতে সে মনে কষ্ট পাবে। কিন্তু যদি তার বিপদ গুনাহের কারণে হয়, তাহলে ভিন্ন কথা। এই সময় যদি তার থেকে কোনো বিশৃঙ্খলার ভয় না থাকে, তাহলে তাকে শুনিয়ে বলাতে কোনো অসুবিধা নেই। আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞাত।
২. কষ্টে পতিত ব্যক্তির অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
আব্দুল্লাহ বিন মাকিল (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
قَعَدْتُ إِلَى كَعْبِ بْنِ عُجْرَةَ فِي هَذَا الْمَسْجِدِ يَعْنِي مَسْجِدَ الْكُوفَةِ، فَسَأَلْتُهُ عَنْ صِيَامٍ، فَقَالَ: حُمِلْتُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالْقَمْلُ يَتَنَاثَرُ عَلَى وَجْهِي، فَقَالَ: «مَا كُنْتُ أَرَى أَنَّ الْجُهْدَ قَدْ بَلَغَ بِكَ هَذَا، أَمَا تَجِدُ شَاةً». قُلْتُ: لَا، قَالَ: «صُمْ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ، أَوْ أَطْعِمْ سِتَّةَ مَسَاكِينَ لِكُلِّ مِسْكِينٍ نِصْفَ صَاعٍ مِنْ طَعَامٍ، وَاحْلِقْ رَأْسَكَ» فَنَزَلَتْ فِيَّ خَاصَّةً وَهِيَ لَكُمْ عَامَّةً
‘আমি কাব বিন উজরা-এর নিকট কুফার এই মসজিদে বসা থাকাকালে সাওমের ফিদইয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, “আমার চেহারায় উকুন ছড়িয়ে পড়া অবস্থায় আমাকে নবীজি (সা)-এর নিকট নিয়ে আসা হলো। তিনি তখন বললেন, “আমি মনে করি যে, এতে তোমার কষ্ট হচ্ছে। তুমি কি একটি বকরি সংগ্রহ করতে পারবে?” আমি বললাম, “না।” তিনি বললেন, “তুমি তিন দিন সাওম পালন করো অথবা ছয়জন নিঃস্বকে খাদ্য দান করো। প্রত্যেক নিঃস্বকে অর্ধ সা’ খাদ্য দান করতে হবে এবং তোমার মাথার চুল কামিয়ে ফেলবে।” তখন আমার জন্য বিশেষভাবে আয়াত নাজিল হয়; অবশ্য তোমাদের সকলের জন্যও এই হুকুম।’
আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
خَرَجْنَا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا نَذْكُرُ إِلَّا الحَجَّ، فَلَمَّا جِئْنَا سَرِفَ طَمِثْتُ، فَدَخَلَ عَلَيَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا أَبْكِي، فَقَالَ: «مَا يُبْكِيكِ؟» قُلْتُ: لَوَدِدْتُ وَاللَّهِ أَنِّي لَمْ أَحُجَّ العَامَ، قَالَ: «لَعَلَّكِ نُفِسْتِ؟» قُلْتُ: نَعَمْ، قَالَ: «فَإِنَّ ذَلِكَ شَيْءٌ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَى بَنَاتِ آدَمَ، فَافْعَلِي مَا يَفْعَلُ الحَاجُّ، غَيْرَ أَنْ لَا تَطُوفِي بِالْبَيْتِ حَتَّى تَطْهُرِي»
‘আমরা কেবল হজের উদ্দেশ্যে রাসূল (সা)-এর সঙ্গে রওনা করলাম। আমরা যখন সারিফ নামক স্থানে পৌঁছলাম, আমার মাসিক ঋতু শুরু হয়ে গেল। রাসূল (সা) আমার কাছে এলেন, আমি তখন কাঁদছিলাম। তিনি বললেন, “তুমি কাঁদছ কেন?” আমি বললাম, “আল্লাহর কসম, এ বছর হজ না করাই আমার পছন্দনীয়!” তিনি বললেন, “সম্ভবত তুমি ঋতুবতী হয়েছ?” আমি বললাম, “হ্যাঁ।” তিনি বললেন, “এটি তো এমন একটি বিষয়, আল্লাহ তাআলা যা আদম (আ)-এর কন্যাদের জন্য নির্ধারিত করেছেন। তুমি হজ পালনকারীগণ যা করে, তা-ই করো; কিন্তু পবিত্র হওয়া পর্যন্ত বাইতুল্লাহ তাওয়াফ কোরো না।”
অন্য এক বর্ণনায় আছে, ‘নবিজি (সা) কোমল স্বভাবের অধিকারী ছিলেন। যখনই আয়িশা (রা) কোনো আবদার করতেন, তখন তা রক্ষা করতেন।’
৩. ব্যথিত বা পতিত ব্যক্তির অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
নুমান বিন বাশির (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন :
تَرَى الْمُؤْمِنِينَ فِي تَرَاحُمِهِمْ وَتَوَادِّهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ، كَمَثَلِ الْجَسَدِ، إِذَا اشْتَكَى عُضْوًا تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ جَسَدِهِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى
‘পারস্পরিক দয়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনে তুমি মুমিনদের একটি দেহের মতো দেখবে। যখন শরীরের একটি অঙ্গ রোগাক্রান্ত হয়, তখন তার বাকি সব অঙ্গ বিনিদ্রা ও জ্বরের শিকার হয়।’
মুসলিম উম্মাহ এক দেহের ন্যায়; যে দেহের একদম ছোট অঙ্গটি আক্রান্ত হলে বড় অঙ্গটিও তাতে প্রভাবিত হয়। যখন কোনো মুসলিম বিপদ বা মন্দ অবস্থায় পতিত হয়, তখন অন্য ভাইদের দায়িত্ব হলো, তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করা এবং তার অবস্থা দেখে ব্যথিত হওয়া। ঠাট্টা বা তামাশা করা নয়—এটা অমর্যাদাকর ও মন্দ স্বভাব।
আসওয়াদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘কয়েকজন কুরাইশি যুবক আয়িশা (রা)-এর নিকট আগমন করল। তখন তিনি মিনায় অবস্থান করছিলেন। সে সময় তারা হাসছিল। আয়িশা (রা) বললেন, “কোন বিষয় তোমাদের হাসাচ্ছে?” তারা বলল, “অমুক ব্যক্তি তাঁবুর রশির ওপর পড়ে গেছে। ফলে তার গর্দান কিংবা চোখ নিষ্পিষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়।” তিনি বললেন, “তোমরা হেসো না। কেননা, আমি রাসূল (সা)-কে বলতে শুনেছি :
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُشَاكُ شَوْكَةً، فَمَا فَوْقَهَا إِلَّا كُتِبَتْ لَهُ بِهَا دَرَجَةٌ، وَمُحِيَتْ عَنْهُ بِهَا خَطِيئَةٌ
“যেকোনো মুসলিমের গায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ হয় কিংবা তার চেয়েও অধিক ছোট কোনো আঘাত লাগে, তার বিনিময়ে তার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং তার একটি গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।”
৪. যার লজ্জাজনক কিছু ঘটে গেছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
ইসলাম হলো শিষ্টাচার ও উত্তম আদর্শের ধর্ম। ইসলাম সর্বাবস্থায় মুসলিমের কষ্ট ও সমস্যা দূর করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ যখন কোনো মুসলিম ইমাম বা মুক্তাদি হয়ে থাকে এবং সালাতের মাঝেই তার অজু ভেঙে যায়, তখন সে সমস্যায় পড়ে যায়। ইসলাম তার এই পরিস্থিতির বিষয়টি লক্ষ রেখেছে এবং এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় বলে দিয়েছে; যেন তার প্রবৃত্তি তাকে অজুবিহীন সালাত চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কুমন্ত্রণা না দেয়। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা) বলেছেন :
إِذَا أَحْدَثَ أَحَدُكُمْ فِي صَلَاتِهِ فَلْيَأْخُذْ بِأَنْفِهِ، ثُمَّ لِيَنْصَرِفْ
‘যখন সালাতে তোমাদের কারও অজু নষ্ট হয়ে যায়, তখন সে যেন নিজের নাক চেপে ধরে বেরিয়ে যায়।’
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, যে বিষয়টি সমস্যা সৃষ্টি করে, তা গোপন রাখতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে তাওরিয়াহ (দ্ব্যর্থবোধক উক্তি) গ্রহণ করতে হবে। আর এটিকে কপটতাও বলা যাবে না।
তেমনিভাবে ইসলাম ওই ব্যক্তির অনুভূতির প্রতিও লক্ষ করেছে, যার অনিচ্ছা সত্ত্বেও মজলিশে কোনো দূষণীয় বিষয় প্রকাশ হয়ে গেছে। আব্দুল্লাহ বিন জামআহ (রা) থেকে বর্ণিত, ‘নবিজি (সা) বায়ু নিঃসরণের পর হাসি দেওয়া সম্পর্কে বললেন :
لِمَ يَضْحَكُ أَحَدُكُمْ مِمَّا يَفْعَلُ
“তোমাদের কেউ কেউ সে কাজটির জন্য কেন হাসে, যা সে নিজেও করে।”
টিকাঃ
৮৪. সহিহুল বুখারি : ৬৮৯১।
৮৫. আস-সুনানুল কুবরা লিল-বাইহাকি : ১৪২৪৭।
৮৬. সুনানু ইবনি মাজাহ : ৩৫৪৩।
৮৭. সুনানুত তিরমিজি : ৩৪৩২।
৮৮. আল-আজকার : ২৫৮।
৮৯. সহিহুল বুখারি : ৪৫১৭, সহিহ মুসলিম : ১২০১।
৯০. সহিহুল বুখারি : ৩০৫।
৯১. সহিহ মুসলিম : ১২১৩।
৯২. সহিহুল বুখারি : ৬০১১।
৯৩. সহিহ মুসলিম : ২৫৭২।
৯৪. সুনানু আবি দাউদ : ১১১৪।
৯৫. সহিহুল বুখারি : ৪৯৪২, সহিহ মুসলিম : ২৮৫৫।
📄 সপ্তমত, খাদিম ও ছোটদের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
১. খেলতে ইচ্ছুক এমন ছোট স্ত্রীর অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
ইসলাম স্বামী-স্ত্রী উভয়কে সুন্দর আচরণ ও কোমল ব্যবহারের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। আমাদের জন্য রাসূল (সা)-এর মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ। এই উত্তম আদর্শের একটি হলো :
স্ত্রীর বয়স ও আগ্রহ অনুযায়ী তার সাথে উপযুক্ত আচরণ করা। সে যে বিষয়ে আগ্রহী, শরিয়তের নীতির ভেতরে থেকে তা তাকে প্রদান করা।
আয়িশা (রা)-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট পুতুল নিয়ে খেলা করতেন। তিনি বলেন, ‘তখন আমার নিকট আমার সঙ্গীরা আসত। তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে দেখে আড়ালে চলে যেত। আর রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে আমার নিকট পাঠিয়ে দিতেন।’
তিনি আরও বলেন :
‘আমি একদিন হাবশিদের খেলা দেখছিলাম। তারা মসজিদের আঙিনায় খেলছিলেন। আমি খেলা দেখে ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত দেখছিলাম। তখন নবীজি (সা) তাঁর চাদর দিয়ে আমাকে আড়াল করে রেখেছিলেন। তোমরা অনুমান করো যে, অল্পবয়সি মেয়েরা খেলাধুলা দেখতে কী পরিমাণ আগ্রহী।’
ইবনে হাজার (র) বলেন, ‘হাদিস থেকে বোঝা যায়, নবীজি (সা) তাঁর স্ত্রীদের সাথে সুন্দর আচরণ করতেন এবং আয়িশা (রা)-এর প্রতি অনেক উদার ছিলেন। হাদিস থেকে আয়িশা (রা)-এর শ্রেষ্ঠত্ব এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মহান মর্যাদার বিষয়টিও ফুটে উঠেছে।’
২. যে বালক বা খাদিম খেলতে চায়, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। একদা তিনি আমাকে একটি কাজে যাওয়ার আদেশ করলেন, তখন আমি বললাম, “আল্লাহর শপথ, আমি যাব না।” কিন্তু আমার মনে এক বিশ্বাস ছিল, যে কাজে আমাকে নবীজি (সা) নির্দেশ দিয়েছেন, আমি সে কাজে যাব। অতঃপর আমি বের হয়ে ছেলেদের নিকট যাচ্ছিলাম। তারা বাজারে খেলাধুলায় লিপ্ত ছিল। হঠাৎ রাসূলুল্লাহ (সা) পশ্চাৎ দিক হতে এসে আমার ঘাড় ধরলেন।’ আনাস (রা) বলেন, ‘আমি তাঁর প্রতি দৃষ্টি দিলাম, তখন তিনি হাসছিলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, (يَا أُنَيْسُ أَذَهَبْتَ حَيْثُ أَمَرْتُكَ؟) “আদরের আনাস, তুমি কি সেখানে গিয়েছিলে, যেখানে তোমাকে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলাম?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, আল্লাহর রাসূল, অবশ্যই আমি যাচ্ছি।”
আনাস (রা) বলেন :
وَاللَّهِ لَقَدْ خَدَمْتُهُ تِسْعَ سِنِينَ، مَا عَلِمْتُهُ قَالَ لِشَيْءٍ صَنَعْتُهُ: لِمَ فَعَلْتَ كَذَا وَكَذَا؟ أَوْ لِشَيْءٍ تَرَكْتُهُ: هَلَّا فَعَلْتَ كَذَا وَكَذَا
‘আল্লাহর শপথ, আমি নয় বছর তাঁর খিদমত করেছি। আমার জানা নেই যে, কোনো কাজ আমি করেছি আর সে ব্যাপারে তিনি বলেছেন, “এরূপ কেন করলে?” কিংবা কোনো কাজ আমি করিনি আর সে ব্যাপারে তিনি বলেছেন, “কেন তুমি এমনটি করলে না?”
এখানে খাদিমদের অধিকারের বিষয়টি ইসলাম খেয়াল করেছে। তাদেরকে তুচ্ছ বা হেয় করা এবং সাধ্যের বাইরে কিছু তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।
যেহেতু শৈশবে অন্যান্য যেকোনো সময়ের তুলনায় খেলাধুলা ও বিনোদনের প্রতি মন বেশি আকৃষ্ট থাকে, তাই ইসলাম এই বাস্তবতাকে ছেড়ে দেয়নি। ছোটদের সাথে নবীজি (সা) কেমন ব্যবহার করতেন, সেদিকে লক্ষ করুন। আব্দুল্লাহ বিন শাদ্দাদ (রা) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন :
خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي إِحْدَى صَلَاتَيِ الْعِشَاءِ وَهُوَ حَامِلٌ حَسَنًا أَوْ حُسَيْنًا، فَتَقَدَّمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَوَضَعَهُ، ثُمَّ كَبَّرَ لِلصَّلَاةِ فَصَلَّى فَسَجَدَ بَيْنَ ظَهْرَانَيْ صَلَاتِهِ سَجْدَةً أَطَالَهَا، قَالَ أَبِي: فَرَفَعْتُ رَأْسِي وَإِذَا الصَّبِيُّ عَلَى ظَهْرِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ سَاجِدٌ فَرَجَعْتُ إِلَى سُجُودِي، فَلَمَّا قَضَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الصَّلَاةَ قَالَ النَّاسُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّكَ سَجَدْتَ بَيْنَ ظَهْرَانَيْ صَلَاتِكَ سَجْدَةً أَطَلْتَهَا حَتَّى ظَنَنَّا أَنَّهُ قَدْ حَدَثَ أَمْرٌ أَوْ أَنَّهُ يُوحَى إِلَيْكَ، قَالَ: «كُلُّ ذَلِكَ لَمْ يَكُنْ وَلَكِنَّ ابْنِي ارْتَحَلَنِي فَكَرِهْتُ أَنْ أُعَجِّلَهُ حَتَّى يَقْضِيَ حَاجَتَهُ»
‘এক ইশার সালাতে রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের দিকে বেরিয়ে আসলেন। তখন তিনি হাসান অথবা হুসাইন (রা)-কে বহন করে আনছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) সামনে অগ্রসর হয়ে তাঁকে রেখে দিলেন। তারপর সালাতের জন্য তাকবির বললেন এবং সালাত আদায় করলেন। সালাতের মধ্যে একটি সিজদা লম্বা করলেন। আমি আমার মাথা উঠালাম এবং দেখলাম, ওই ছেলেটি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পিঠের ওপর রয়েছেন আর তিনি সিজদারত। তারপর আমি আমার সিজদায় গেলাম। রাসূলুল্লাহ (সা) সালাত শেষ করলে লোকেরা বলল, “ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি আপনার সালাতের মধ্যে একটি সিজদা এত লম্বা করলেন যে, আমরা ধারণা করলাম, হয়তো কোনো ব্যাপার ঘটে থাকবে বা আপনার ওপর ওহি নাজিল হচ্ছে।” তিনি বললেন, “এর কোনোটিই ঘটেনি; বরং আমার এ সন্তান আমাকে সওয়ারি বানিয়েছে। আমি তাড়াহুড়ি উঠতে অপছন্দ করলাম; যেন সে তার কাজ সমাধা করতে পারে।’
৩. খাদিম ও বাবুর্চির অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
এটি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি আদব। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেক মানুষ তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং স্বাধীন খাদিমদের সাথে কঠোরতা, অভদ্রতা, ঘৃণা বা অহংকার দেখিয়ে ব্যবহার করছে। অথচ এই খাদিমরাই তার গৃহের অনেক বড় বড় দায়িত্বগুলো পালন করছে। তারা তাদের ওপর আল্লাহ-প্রদত্ত নিয়ামতের কথা ভুলে গেছে যে, আল্লাহ তাআলা কিছু মানুষকে তাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যারা তাদের খিদমত করে। অথচ আল্লাহ তাআলা চাইলে তাদেরকেই খাদিম এবং খাদিমদেরকে কর্তা বানিয়ে দিতে পারতেন।
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন :
إِذَا أَتَى أَحَدَكُمْ خَادِمُهُ بِطَعَامِهِ، فَإِنْ لَمْ يُجْلِسْهُ مَعَهُ، فَلْيُنَاوِلْهُ لُقْمَةً أَوْ لُقْمَتَيْنِ أَوْ أُكْلَةً أَوْ أُكْلَتَيْنِ، فَإِنَّهُ وَلِيَ عِلَاجَهُ
‘তোমাদের কারও খাদিম খাবার নিয়ে হাজির হলে তাকেও নিজের সাথে বসানো উচিত। তাকে সাথে না বসালেও দুই-এক লোকমা, কিংবা দুই-এক গ্রাস তাকে দেওয়া উচিত; কারণ, সে এর জন্য পরিশ্রম করেছে।’
এই হলো ক্রীতদাস খাদিমের ব্যাপারে বিধান। তাহলে ক্রীতদাস নয় এমন খাদিম বা কর্মচারীর সাথে কেমন ব্যবহার করা উচিত?
আবু মাসউদ আল-আনসারি (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি আমার এক গোলামকে প্রহার করছিলাম। এমন সময় পেছন থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম :
اعْلَمْ، أَبَا مَسْعُودٍ، لَلَّهُ أَقْدَرُ عَلَيْكَ مِنْكَ عَلَيْهِ
“হে আবু মাসউদ, তুমি জেনে রেখো! এই গোলামের ওপর তোমার ক্ষমতার চেয়ে আল্লাহ তোমার ওপর অধিক ক্ষমতাবান।”
হঠাৎ আমি তাকিয়ে দেখলাম রাসূলুল্লাহ (সা)। আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সে মুক্ত।” তখন তিনি বললেন :
أَمَا لَوْ لَمْ تَفْعَلْ لَلَفَحَتْكَ النَّارُ، أَوْ لَمَسَّتْكَ النَّارُ
“শোনো, যদি তুমি এমনটি না করতে, তাহলে আগুন তোমাকে জ্বালিয়ে দিত বা আগুন তোমাকে স্পর্শ করত।”
ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছি :
مَنْ ضَرَبَ عَبْدَهُ ظَالِمًا لَمْ يَكُنْ لَهُ كَفَّارَةٌ دُونَ عِتْقِهِ
“যে তার গোলামের প্রতি জুলুম করে প্রহার করে, তার জন্য এর কাফফারা শুধু তাকে মুক্ত করে দেওয়া।”
টিকাঃ
৯৬. সহিহ মুসলিম : ২৪৪০।
৯৭. সহিহুল বুখারি : ৫২৩৬।
৯৮. ফাতহুল বারি : ১/৫৪৯।
৯৯. সহিহ মুসলিম : ২৩১০।
১০০. সহিহ মুসলিম : ২৩০৯।
১০১. সুনানুন নাসায়ি : ১১৪১।
১০২. সহিহুল বুখারি : ২৫৫৭।
১০৩. সহিহ মুসলিম : ১৬৫৯।
১০৪. মুসনাদু আবি ইয়ালা : ৫৭৮২।
১. খেলতে ইচ্ছুক এমন ছোট স্ত্রীর অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
ইসলাম স্বামী-স্ত্রী উভয়কে সুন্দর আচরণ ও কোমল ব্যবহারের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। আমাদের জন্য রাসূল (সা)-এর মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ। এই উত্তম আদর্শের একটি হলো :
স্ত্রীর বয়স ও আগ্রহ অনুযায়ী তার সাথে উপযুক্ত আচরণ করা। সে যে বিষয়ে আগ্রহী, শরিয়তের নীতির ভেতরে থেকে তা তাকে প্রদান করা।
আয়িশা (রা)-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট পুতুল নিয়ে খেলা করতেন। তিনি বলেন, ‘তখন আমার নিকট আমার সঙ্গীরা আসত। তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে দেখে আড়ালে চলে যেত। আর রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে আমার নিকট পাঠিয়ে দিতেন।’
তিনি আরও বলেন :
‘আমি একদিন হাবশিদের খেলা দেখছিলাম। তারা মসজিদের আঙিনায় খেলছিলেন। আমি খেলা দেখে ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত দেখছিলাম। তখন নবীজি (সা) তাঁর চাদর দিয়ে আমাকে আড়াল করে রেখেছিলেন। তোমরা অনুমান করো যে, অল্পবয়সি মেয়েরা খেলাধুলা দেখতে কী পরিমাণ আগ্রহী।’
ইবনে হাজার (র) বলেন, ‘হাদিস থেকে বোঝা যায়, নবীজি (সা) তাঁর স্ত্রীদের সাথে সুন্দর আচরণ করতেন এবং আয়িশা (রা)-এর প্রতি অনেক উদার ছিলেন। হাদিস থেকে আয়িশা (রা)-এর শ্রেষ্ঠত্ব এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মহান মর্যাদার বিষয়টিও ফুটে উঠেছে।’
২. যে বালক বা খাদিম খেলতে চায়, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। একদা তিনি আমাকে একটি কাজে যাওয়ার আদেশ করলেন, তখন আমি বললাম, “আল্লাহর শপথ, আমি যাব না।” কিন্তু আমার মনে এক বিশ্বাস ছিল, যে কাজে আমাকে নবীজি (সা) নির্দেশ দিয়েছেন, আমি সে কাজে যাব। অতঃপর আমি বের হয়ে ছেলেদের নিকট যাচ্ছিলাম। তারা বাজারে খেলাধুলায় লিপ্ত ছিল। হঠাৎ রাসূলুল্লাহ (সা) পশ্চাৎ দিক হতে এসে আমার ঘাড় ধরলেন।’ আনাস (রা) বলেন, ‘আমি তাঁর প্রতি দৃষ্টি দিলাম, তখন তিনি হাসছিলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, (يَا أُنَيْسُ أَذَهَبْتَ حَيْثُ أَمَرْتُكَ؟) “আদরের আনাস, তুমি কি সেখানে গিয়েছিলে, যেখানে তোমাকে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলাম?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, আল্লাহর রাসূল, অবশ্যই আমি যাচ্ছি।”
আনাস (রা) বলেন :
وَاللَّهِ لَقَدْ خَدَمْتُهُ تِسْعَ سِنِينَ، مَا عَلِمْتُهُ قَالَ لِشَيْءٍ صَنَعْتُهُ: لِمَ فَعَلْتَ كَذَا وَكَذَا؟ أَوْ لِشَيْءٍ تَرَكْتُهُ: هَلَّا فَعَلْتَ كَذَا وَكَذَا
‘আল্লাহর শপথ, আমি নয় বছর তাঁর খিদমত করেছি। আমার জানা নেই যে, কোনো কাজ আমি করেছি আর সে ব্যাপারে তিনি বলেছেন, “এরূপ কেন করলে?” কিংবা কোনো কাজ আমি করিনি আর সে ব্যাপারে তিনি বলেছেন, “কেন তুমি এমনটি করলে না?”
এখানে খাদিমদের অধিকারের বিষয়টি ইসলাম খেয়াল করেছে। তাদেরকে তুচ্ছ বা হেয় করা এবং সাধ্যের বাইরে কিছু তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।
যেহেতু শৈশবে অন্যান্য যেকোনো সময়ের তুলনায় খেলাধুলা ও বিনোদনের প্রতি মন বেশি আকৃষ্ট থাকে, তাই ইসলাম এই বাস্তবতাকে ছেড়ে দেয়নি। ছোটদের সাথে নবীজি (সা) কেমন ব্যবহার করতেন, সেদিকে লক্ষ করুন। আব্দুল্লাহ বিন শাদ্দাদ (রা) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন :
خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي إِحْدَى صَلَاتَيِ الْعِشَاءِ وَهُوَ حَامِلٌ حَسَنًا أَوْ حُسَيْنًا، فَتَقَدَّمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَوَضَعَهُ، ثُمَّ كَبَّرَ لِلصَّلَاةِ فَصَلَّى فَسَجَدَ بَيْنَ ظَهْرَانَيْ صَلَاتِهِ سَجْدَةً أَطَالَهَا، قَالَ أَبِي: فَرَفَعْتُ رَأْسِي وَإِذَا الصَّبِيُّ عَلَى ظَهْرِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ سَاجِدٌ فَرَجَعْتُ إِلَى سُجُودِي، فَلَمَّا قَضَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الصَّلَاةَ قَالَ النَّاسُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّكَ سَجَدْتَ بَيْنَ ظَهْرَانَيْ صَلَاتِكَ سَجْدَةً أَطَلْتَهَا حَتَّى ظَنَنَّا أَنَّهُ قَدْ حَدَثَ أَمْرٌ أَوْ أَنَّهُ يُوحَى إِلَيْكَ، قَالَ: «كُلُّ ذَلِكَ لَمْ يَكُنْ وَلَكِنَّ ابْنِي ارْتَحَلَنِي فَكَرِهْتُ أَنْ أُعَجِّلَهُ حَتَّى يَقْضِيَ حَاجَتَهُ»
‘এক ইশার সালাতে রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের দিকে বেরিয়ে আসলেন। তখন তিনি হাসান অথবা হুসাইন (রা)-কে বহন করে আনছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) সামনে অগ্রসর হয়ে তাঁকে রেখে দিলেন। তারপর সালাতের জন্য তাকবির বললেন এবং সালাত আদায় করলেন। সালাতের মধ্যে একটি সিজদা লম্বা করলেন। আমি আমার মাথা উঠালাম এবং দেখলাম, ওই ছেলেটি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পিঠের ওপর রয়েছেন আর তিনি সিজদারত। তারপর আমি আমার সিজদায় গেলাম। রাসূলুল্লাহ (সা) সালাত শেষ করলে লোকেরা বলল, “ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি আপনার সালাতের মধ্যে একটি সিজদা এত লম্বা করলেন যে, আমরা ধারণা করলাম, হয়তো কোনো ব্যাপার ঘটে থাকবে বা আপনার ওপর ওহি নাজিল হচ্ছে।” তিনি বললেন, “এর কোনোটিই ঘটেনি; বরং আমার এ সন্তান আমাকে সওয়ারি বানিয়েছে। আমি তাড়াহুড়ি উঠতে অপছন্দ করলাম; যেন সে তার কাজ সমাধা করতে পারে।’
৩. খাদিম ও বাবুর্চির অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
এটি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি আদব। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেক মানুষ তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং স্বাধীন খাদিমদের সাথে কঠোরতা, অভদ্রতা, ঘৃণা বা অহংকার দেখিয়ে ব্যবহার করছে। অথচ এই খাদিমরাই তার গৃহের অনেক বড় বড় দায়িত্বগুলো পালন করছে। তারা তাদের ওপর আল্লাহ-প্রদত্ত নিয়ামতের কথা ভুলে গেছে যে, আল্লাহ তাআলা কিছু মানুষকে তাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যারা তাদের খিদমত করে। অথচ আল্লাহ তাআলা চাইলে তাদেরকেই খাদিম এবং খাদিমদেরকে কর্তা বানিয়ে দিতে পারতেন।
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন :
إِذَا أَتَى أَحَدَكُمْ خَادِمُهُ بِطَعَامِهِ، فَإِنْ لَمْ يُجْلِسْهُ مَعَهُ، فَلْيُنَاوِلْهُ لُقْمَةً أَوْ لُقْمَتَيْنِ أَوْ أُكْلَةً أَوْ أُكْلَتَيْنِ، فَإِنَّهُ وَلِيَ عِلَاجَهُ
‘তোমাদের কারও খাদিম খাবার নিয়ে হাজির হলে তাকেও নিজের সাথে বসানো উচিত। তাকে সাথে না বসালেও দুই-এক লোকমা, কিংবা দুই-এক গ্রাস তাকে দেওয়া উচিত; কারণ, সে এর জন্য পরিশ্রম করেছে।’
এই হলো ক্রীতদাস খাদিমের ব্যাপারে বিধান। তাহলে ক্রীতদাস নয় এমন খাদিম বা কর্মচারীর সাথে কেমন ব্যবহার করা উচিত?
আবু মাসউদ আল-আনসারি (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি আমার এক গোলামকে প্রহার করছিলাম। এমন সময় পেছন থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম :
اعْلَمْ، أَبَا مَسْعُودٍ، لَلَّهُ أَقْدَرُ عَلَيْكَ مِنْكَ عَلَيْهِ
“হে আবু মাসউদ, তুমি জেনে রেখো! এই গোলামের ওপর তোমার ক্ষমতার চেয়ে আল্লাহ তোমার ওপর অধিক ক্ষমতাবান।”
হঠাৎ আমি তাকিয়ে দেখলাম রাসূলুল্লাহ (সা)। আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সে মুক্ত।” তখন তিনি বললেন :
أَمَا لَوْ لَمْ تَفْعَلْ لَلَفَحَتْكَ النَّارُ، أَوْ لَمَسَّتْكَ النَّارُ
“শোনো, যদি তুমি এমনটি না করতে, তাহলে আগুন তোমাকে জ্বালিয়ে দিত বা আগুন তোমাকে স্পর্শ করত।”
ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছি :
مَنْ ضَرَبَ عَبْدَهُ ظَالِمًا لَمْ يَكُنْ لَهُ كَفَّارَةٌ دُونَ عِتْقِهِ
“যে তার গোলামের প্রতি জুলুম করে প্রহার করে, তার জন্য এর কাফফারা শুধু তাকে মুক্ত করে দেওয়া।”
টিকাঃ
৯৬. সহিহ মুসলিম : ২৪৪০।
৯৭. সহিহুল বুখারি : ৫২৩৬।
৯৮. ফাতহুল বারি : ১/৫৪৯।
৯৯. সহিহ মুসলিম : ২৩১০।
১০০. সহিহ মুসলিম : ২৩০৯।
১০১. সুনানুন নাসায়ি : ১১৪১।
১০২. সহিহুল বুখারি : ২৫৫৭।
১০৩. সহিহ মুসলিম : ১৬৫৯।
১০৪. মুসনাদু আবি ইয়ালা : ৫৭৮২।
📄 অষ্টমত, ভুলের ক্ষেত্রে মানুষের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
১. ভুলকারীকে নির্দিষ্ট না করে তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
নবিজি (সা) অনেক ক্ষেত্রে ভুলকারীকে নির্দিষ্ট না করে ভুলের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন; কেননা, উদ্দেশ্য হলো ভুলের ব্যাপারে তাদের অবগত হওয়া এবং তা থেকে সতর্ক থাকা।
আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একবার নবীজি (সা) নিজে কোনো কাজ করলেন এবং অন্যদেরকেও সে ব্যাপারে অনুমতি দিলেন। তা সত্ত্বেও একদল লোক তা থেকে বিরত রইল। এ সংবাদ নবীজি (সা)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি ভাষণ দিলেন। আল্লাহর প্রশংসার পর তিনি বললেন :
مَا بَالُ أَقْوَامٍ يَتَنَزَّهُونَ عَنِ الشَّيْءِ أَصْنَعُهُ، فَوَاللَّهِ إِنِّي لَأَعْلَمُهُمْ بِاللَّهِ، وَأَشَدُّهُمْ لَهُ خَشْيَةً
“কিছু লোকের কী হয়েছে, তারা এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে চায়, যা আমি নিজে করছি। আল্লাহর কসম, আমি আল্লাহর সম্পর্কে তাদের থেকে বেশি জানি এবং আমি আল্লাহর চেয়ে অনেক বেশি তাঁকে ভয় করি।”
বারিরাহ (রা)-এর ঘটনায় বর্ণিত আছে, নবীজি (সা) বলেন :
مَا بَالُ أَقْوَامٍ يَشْتَرِطُونَ شُرُوطًا، لَيْسَ فِي كِتَابِ اللَّهِ، مَنْ اشْتَرَطَ شَرْطًا لَيْسَ فِي كِتَابِ اللَّهِ، فَلَيْسَ لَهُ، وَإِنْ اشْتَرَطَ مِائَةَ مَرَّةٍ
‘লোকদের কী হলো? তারা এমন সব শর্ত করে, যা আল্লাহর কিতাবে নেই। কেউ যদি এমন শর্তারোপ করে, যা আল্লাহর কিতাবে নেই, তার সে শর্তের কোনো মূল্য নেই; এমনকি এরূপ শর্ত একশবার আরোপ করলেও।
২. যে ভুল করে লজ্জিত হয়েছে এবং শাস্তির অপেক্ষায় রয়েছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
মিকদাদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘প্রচুর খাদ্য-সংকটে আমার ও আমার দুই সাথির দৃষ্টিশক্তি ও শ্রুতিশক্তি কমে যায়। অতঃপর আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথিদের নিকট নিজেদের পেশ করতে লাগলাম। কিন্তু তাঁদের কেউ আমাদের কথা শুনলেন না। সবশেষে আমরা নবীজি (সা)-এর নিকট আগমন করলে তিনি আমাদের সাথে নিয়ে তাঁর পরিবারের নিকট গেলেন। সেখানে তিনটি বকরি ছিল। নবীজি (সা) বললেন, “তোমরা দুধ দোহন করবে। এ দুধ আমরা বণ্টন করে পান করব।” তিনি বলেন, ‘এরপর তা থেকে আমরা দুধ দোহন করতাম। আমাদের সবাই যার যার অংশ পান করত। আর আমরা নবীজি (সা)-এর জন্য তাঁর অংশ উঠিয়ে রাখতাম। তিনি রাত্রে এসে এমনভাবে সালাম দিতেন, যাতে নিদ্রারত লোক উঠে না যায় এবং জাগ্রত লোক শুনতে পায়। অতঃপর তিনি মসজিদে এসে সালাত আদায় করতেন। এবং সেখান থেকে ফিরে এসে দুধ পান করতেন। একদা রাতে আমার নিকট শয়তান আগমন করল। আমি তো আমার অংশ পান করে ফেলেছিলাম। সে বলল, “মুহাম্মাদ আনসারিদের নিকট গেলে তারা তাঁকে উপঢৌকন দেবে এবং তাদের নিকট তাঁর এ অল্প দুধের প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে যাবে।” অতঃপর আমি এসে সেটুক্ও পান করে ফেললাম। দুধ যখন উত্তমভাবে আমার পেটে ঢুকে গেল, তখন আমি বুঝতে পারলাম, এ দুধ বের করার আর কোনো উপায় নেই। তখন শয়তান আমার থেকে দূরে সরে গিয়ে বলল, “তোমার ধ্বংস হোক, তুমি এ কী করলে! তুমি মুহাম্মাদের জন্য রাখা দুধ পান করে ফেলেছ? তিনি জাগ্রত হয়ে যখন তা পাবেন না, তখন তোমার ওপর বদ-দুআ করবেন। এতে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।” আমার তোমার ইহকাল ও পরকাল নিঃশেষ হয়ে যাবে।” আমার শরীরে একটা চাদর ছিল। আমি যদি তা আমার পদদ্বয়ের ওপর রাখি, তাহলে আমার মাথা বের হয়ে পড়ে; আর যদি তা আমার মাথার ওপর রাখি, তাহলে আমার পদদ্বয় বেরিয়ে পড়ে। কিছুতেই আমার ঘুম আসছিল না। আমার সাথিদয় তো নিদ্রাচ্ছন্ন ছিলেন। তাঁরা তো আমার মতো কাজ করেননি। অতঃপর নবীজি (সা) আগমন করে যেভাবে কাজ করতেন, সেভাবেই সালাম করলেন। এরপর তিনি মসজিদে এসে সালাত আদায় করলেন। অতঃপর দুধের নিকটে এসে ঢাকনা খুলে সেখানে কিছুই পেলেন না। তখন তিনি নিজ মাথা আকাশের দিকে তুললেন। আমি তখন (মনে মনে) বললাম, এখনই হয়তো তিনি আমার ওপর বদ-দুআ করবেন, আর আমি ধ্বংস হয়ে যাব। তিনি বললেন :
اللَّهُمَّ، أَطْعَمْنُ مَنْ أَطْعَمَنِي، وَأَسْقِ مَنْ أَسْقَانِي
“হে আল্লাহ, যে আমার খাবারের ব্যবস্থা করে, আপনি তার খাবারের ব্যবস্থা করুন এবং যে আমাকে পান করায়, আপনি তাকে পান করান।”
৩. যার ওপর হদ ও শাস্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা) বলেন :
إِذَا زَنَتِ الأَمَةُ فَتَبَيَّنَ زِنَاهَا فَلْيَجْلِدْهَا وَلَا يُثَرِّبْ
‘যদি বাঁদি জিনা করে এবং তার জিনা প্রমাণিত হয়, তবে তাকে বেত্রাঘাত করবে। তবে তিরস্কার করবে না...। অর্থাৎ তাকে নিন্দা করবে না। যেমনটি ইউসুফ (আ) তাঁর ভাইদের বলেছেন :
لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ
‘তোমাদের বিরুদ্ধে আজ কোনো নিন্দা নেই’
সুতরাং কোনো অভিযোগ বা তিরস্কার নেই; কারণ, হদ হলো তার কৃতকর্মের কাফফারা এবং তা থেকে পবিত্রকারী।
উবাদাহ বিন সামিত (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা নবীজি (সা)-এর সাথে এক মজলিশে বসা ছিলাম। তিনি বললেন :
بَايِعُونِي عَلَى أَنْ لَا تُشْرِكُوا بِاللَّهِ شَيْئًا، وَلَا تَسْرِقُوا، وَلَا تَزْنُوا - وَقَرَأَ هَذِهِ الْآيَةَ كُلَّهَا - فَمَنْ وَفَى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ، وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَعُوقِبَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَتُهُ، وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَسَتَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ، إِنْ شَاءَ غَفَرَ لَهُ، وَإِنْ شَاءَ عَذَّبَهُ
“তোমরা আমার কাছে এ বাইআত করো যে, আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছু শরিক করবে না, চুরি করবে না এবং জিনা করবে না। এরপর তিনি এ আয়াত (সুরা আল-মুমতাহিনা : ১২) পুরো পাঠ করলেন। তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি (বাইআতের) শর্তাবলি পুরো করে, তার বিনিময় আল্লাহর কাছে। আর যে ব্যক্তি এ থেকে কিছু করে বসে আর তাকে শাস্তি দেওয়া হয়, তবে এটা তার জন্য কাফফারা হয়ে যায়। আর যদি কেউ এ থেকে কিছু করে বসে আর আল্লাহ তা গোপন রাখেন, তবে এটা তাঁর ইচ্ছাধীন। তিনি ইচ্ছে করলে তাকে ক্ষমা করবেন, ইচ্ছে করলে শাস্তি দেবেন।”
সুতরাং যার ওপর দণ্ডবিধি বাস্তবায়িত হয়েছে, তার জন্য অন্য কোনো শাস্তি নেই; কারণ, হদ তাকে পূর্বের মতো পরিষ্কার করে দিয়েছে। বরং যদি সে সঠিকভাবে তাওবা করে থাকে এবং লজ্জিত হয়, তাহলে হদ কায়েমের আগের অবস্থা থেকে হদ কায়েমের পরের অবস্থা আরও উত্তম হতে পারে। যেমনটি আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে :
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «قَطَعَ يَدَ امْرَأَةٍ» قَالَتْ عَائِشَةُ: وَكَانَتْ تَأْتِي بَعْدَ ذَلِكَ، فَأَرْفَعُ حَاجَتَهَا إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَتَابَتْ، وَحَسُنَتْ تَوْبَتُهَا
‘নবিজি (সা) (শাস্তিস্বরূপ) জনৈক মহিলার হাত কেটেছেন।’ আয়িশা (রা) বলেন, ‘সে মহিলাটি এরপরেও নবীজি (সা)-এর কাছে আসত। আর আমি তার প্রয়োজন নবীজি (সা)-এর কাছে তুলে ধরতাম। মহিলাটি তাওবা করেছিল এবং সুন্দর হয়েছিল তার তাওবা।’
ইবনে হাজার (র) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন :
‘কাসিম বিন মুহাম্মাদ থেকে বর্ণিত যে, আয়িশা (রা) বলেছেন, “মহিলাটি সালিম গোত্রের জনৈক লোককে বিয়ে করেছিল এবং তাওবা করেছিল। তাদের সম্পর্ক অনেক সুন্দর ছিল। সে আমার কাছে আসলে আমি নবীজি (সা)-এর কাছে তার প্রয়োজন তুলে ধরতাম।” মুস্তাদরাকুল হাকিমে মাসউদ বিন হিকামের আরেকটি হাদিসের শেষে উল্লেখ হয়েছে, ইবনে ইসহাক বলেন, “আমার কাছে আব্দুল্লাহ বিন আবু বকর বর্ণনা করেন যে, নবীজি (সা) এরপর তার প্রতি দয়া করতেন এবং তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতেন।”
মুসনাদে আহমাদে আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা)-এর হাদিসে উল্লেখ আছে যে, “মহিলা (চুরির অপরাধে শাস্তিস্বরূপ যার ডান হাত কেটে ফেলা হয়েছে) বলল, (هَلْ لِي مِنْ تَوْبَةٍ يَا رَسُولَ اللهِ؟) “হে আল্লাহর রাসূল, আমার জন্য কি কোনো তাওবা আছে?” রাসূল (সা) বললেন, (نَعَمْ، أَنْتِ الْيَوْمَ مِنْ خَطِيئَتِكِ كَيَوْمِ وَلَدَتْكِ أُمُّكِ) “হ্যাঁ, আজ তুমি তোমার অপরাধ থেকে মুক্ত সেদিনের মতো, যেদিন তোমার মা তোমাকে জন্ম দিয়েছেন।”
৪. অপরাধের সাথে যার সম্পর্কহীনতা প্রকাশিত হয়েছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
সম্মানিত ব্যক্তিদের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তারা কোনো অপবাদে সন্তুষ্ট হতে পারে না এবং সব সময় তা থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে; যতক্ষণ না সাধ্যে থাকলে তা বাতিল করতে পারে।
এ কারণেই যখন অপবাদের সাথে তার সম্পর্কহীনতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়, তখন নিজের প্রতি তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় এবং সে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। জাইদ বিন আরকাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে যুদ্ধে গেলাম। কিছু সংখ্যক বেদুইনও আমাদের সঙ্গে ছিল। আমরা পানির উৎসের দিকে যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমাদের পূর্বেই বেদুইনরা পানির উৎসে গিয়ে পৌঁছায়। এক বেদুইন তার সঙ্গীদের পূর্বে পৌঁছে সে হাওজ (চৌবাচ্চা) সম্পূর্ণ করে তার চতুর্দিকে পাথর রেখে দিত এবং তার ওপর চামড়া বিছিয়ে দিয়ে তা ঢেকে দিত; যাতে তার সাথিরা এসে যায় এবং অন্যরা পানি নিতে না পারে। উক্ত বেদুইনের কাছে এক আনসারি লোক তার উটকে পানি পান করানোর জন্য এর লাগাম হালকা করে ছেড়ে দিল। কিন্তু বেদুইন তার উটকে পানি পান করতে বাধা দেয়। এতে আনসারি ব্যক্তি (ক্রুদ্ধ হয়ে) পানির উৎসগুলো সরিয়ে ফেলল। সে সময় একটি কাষ্ঠখণ্ড তুলে নিয়ে বেদুইন লোকটি আনসারির মাথায় জোরে আঘাত করে; এর ফলে তার মাথা ফেটে যায়। উক্ত আনসারি মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের নিকট গিয়ে তাকে ঘটনা সম্পর্কে জানায়। আনসারি তার দলেরই লোক ছিল। আব্দুল্লাহ বিন উবাই ক্ষিপ্ত হয়ে বলে, “যে বেদুইনরা আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে রয়েছে, তাদের সহায়তা দান বন্ধ করে দাও। তবেই তারা তাঁর চারপাশ থেকে আলাদা হয়ে যাবে।” রাসূল (সা)-এর আহার করার সময় বেদুইনরা তাঁর নিকট হাজির হতো এবং তাঁর সঙ্গে আহার করত। তাই আব্দুল্লাহ বিন উবাই বলল, “যে সময় বেদুইনরা মুহাম্মাদ-এর নিকট থেকে অন্যত্র চলে যাবে, তখন তাঁর নিকট খাবার উপস্থিত করবে; যাতে তিনি ও তাঁর নিকট উপস্থিত অন্যরা তা আহার করেন।” তারপর আব্দুল্লাহ বিন উবাই তার সাথিদের আরও বলল, “আমরা মদিনায় ফিরে গেলে সম্মানিতরা তোমাদের মাঝের হীনদের তাড়িয়ে দেবে।” জাইদ বিন আরকাম (রা) বলেন, ‘আমি রাসূল (সা)-এর পেছনে একই সওয়ারিতে ছিলাম। আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের কথা আমি শুনে ফেললাম এবং আমার চাচাকে তা জানালাম। আর তিনি রাসূল (সা)-এর কাছে গিয়ে তাঁকে তা অবহিত করলেন। রাসূল (সা) তাকে (আব্দুল্লাহ বিন উবাই) ডেকে পাঠান। সে শপথ করে তা অস্বীকার করে। রাসূল (সা) তার কথা বিশ্বাস করলেন এবং তাকে (জাইদের চাচাকে) অবিশ্বাস করলেন। আমার চাচা আমার নিকট এসে বললেন, “এটাই তো তুমি চেয়েছিলে যে, রাসূল (সা) তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট হন এবং তিনি ও মুসলিমগণ তোমাকে মিথ্যুক আখ্যায়িত করেন।” এতে আমি এতটাই ভারাক্রান্ত হলাম, যতটা কখনো কেউ হয়নি। তারপর আমি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মাথা নত করে রাসূল (সা)-এর সঙ্গে সফর অব্যাহত রাখলাম। এই পরিস্থিতিতে রাসূল (সা) আমার নিকট এসে আমার কান মললেন এবং আমার সম্মুখে হেসে দিলেন। যদি আমি চিরস্থায়ী জীবন বা জান্নাত লাভ করতাম; তবুও এতটা খুশি হতাম না। তারপর আবু বকর (রা) এসে আমার সঙ্গে দেখা করে জিজ্ঞাসা করলেন, “রাসূল (সা) তোমাকে কী বলেছেন?” আমি বললাম, “আমাকে তিনি কিছুই বলেননি, তিনি কেবল আমার কান মললেন এবং আমার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলেন।” আবু বকর (রা) বললেন, “তোমার জন্য সুসংবাদ!” অতঃপর আমাদের সঙ্গে উমর (রা) এসে দেখা করলেন। যে কথা আমি আবু বকর (রা)-কে বলেছিলাম, সে কথাই তাঁকে বললাম। অতঃপর আমরা ভোরে উপনীত হলে রাসূল (সা) সুরা আল-মুনাফিকুন পাঠ করলেন।
টিকাঃ
১০৫. সহিহুল বুখারি : ৬১০১।
১০৬. সহিহুল বুখারি : ৪৫৬।
১০৭. সহিহ মুসলিম : ২০৫৫।
১০৮. সহিহুল বুখারি : ২১৫২।
১০৯. সুরা ইউসুফ, ১২ : ৯২।
১১০. সহিহুল বুখারি : ৬৭৮৪।
১১১. সহিহুল বুখারি : ৬৮০০।
১১২. মুসনাদু আহমাদ : ৬৬৫৭।
১১৩. ফাতহুল বারি : ১২/৯৫-৯৬।
১১৪. সহিহুল বুখারি : ৪৯০০ (সংক্ষেপিত)।