📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 তা’যীর কয়েক প্রকারের

📄 তা’যীর কয়েক প্রকারের


তা'যীর কয়েক প্রকারের। প্রথম দিকে রয়েছে কঠোর সরকারী ভর্ৎসনা (Reprimand), ভীত-সন্ত্রস্তকরণ (Threatening), আধুনিক ভাষায় মুচলেকা আর শেষের দিকে রয়েছে বড় বড় অপরাধে হত্যা। দোরা, আটক, আর্থিক জরিমানা, চাকুরী বিচ্যুতি, দেশ থেকে বিতাড়ন এবং অপরাধী সম্পর্কে ঢোল-শহরত করে লোকদের জানিয়ে দেওয়া প্রভৃতি তা'যীরেরই বিভিন্ন শাস্তি। এগুলো অনির্দিষ্ট শাস্তি। অপরাধের বড়ত্ব-ক্ষুদ্রত্বের বিচারে অপরাধের বিভিন্ন মাত্রা এবং অপরাধীর অবস্থা ও পূর্বাপর পরিস্থিতি এবং অপরাধের বৈচিত্র্য-বিপুলতা প্রভৃতি দৃষ্টিতে উপরিউদ্ধৃত শাস্তিসমূহের মাত্রা ও রকম বিভিন্ন হতে বাধ্য। আর তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের উপর ন্যস্ত। অন্য কথায় ইসলামী আইন পরিষদ অপরাধীর অবস্থা, তার মনস্তত্ত্ব ও অপরাধের পরিমাণ বিভিন্নতার দিকে লক্ষ্য রেখে শাস্তি নির্ধারণ করে আইন প্রণয়ন করবে এবং বিচার বিভাগ বিভিন্ন অবস্থায় উপযোগী শাস্তি প্রয়োগ করবে। তাতে পরিমাণ ও প্রকারের দিক দিয়ে অপরাধীর অবস্থার সহিত মাধুর্যপূর্ণ শাস্তি নির্ধারিত করতে হবে।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 তা’যীরের মৃত্যুদণ্ড

📄 তা’যীরের মৃত্যুদণ্ড


কতিপয় বড় বড় ও ভয়াবহ অপরাধে তা'যীর স্বরূপ অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দান করা বৈধ হবে বলে বিপুল সংখ্যক শরীয়ত বিশেষজ্ঞ মত প্রকাশ করেছেন। যেসব ব্যক্তি উক্ত পর্যায়ের অপরাধ বারবার করেছে, তাদের জন্যও এই শাস্তি প্রযোজ্য হতে পারে বলে তাঁরা মত দিয়েছেন। যেমন কোন মুসলিম ব্যক্তি যদি ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের জন্য গোয়েন্দাগিরি করে কিংবা কেউ যদি কুরআন ও সুন্নাহ পরিপন্থী বিদআতের আহ্বান জানায় বা তার প্রচলনের উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে তাকে অনুরূপ দণ্ডে দণ্ডিত করা যেতে পারে।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া লিখেছেন: হানাফী মযহাবের একটি মৌলনীতি হলো, যেসব অপরাধে তাঁদের মতে হত্যা শাস্তি হয় না—যেমন ভারী জিনিস দ্বারা হত্যা বা কোন মেয়েলোকের সহিত স্ত্রী অঙ্গের পরিবর্তে অন্যত্র যৌন সঙ্গম করলে কিন্তু তা যখন বারবার করা হয়, তখন সে অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দান করা যেতে পারে। অনুরূপভাবে কোন নির্দিষ্ট শাস্তি বা 'হদ্দ'-এর পরিমাণ বৃদ্ধি করার প্রয়োজন দেখা দিলে বা তাতে কল্যাণ নিহিত মনে করা হলে তাও করা সঙ্গত। নবী করীম (সা) ও সাহাবায়ে কিরাম (রা) কর্তৃক এই ধরনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার যে বর্ণনা পাওয়া গেছে, তাকে তাঁদের উক্ত মতের সমর্থনে দলীল হিসাবে পেশ করেছেন। এরূপ হত্যার নাম দিয়েছেন রাজনৈতিক হত্যা বা রাজনৈতিক কারণে মৃত্যুদণ্ড দান।

উক্ত পর্যায়ের কতিপয় বর্ণনা এখানে উদ্ধৃত করা যাচ্ছে:
১. আরফাজাতা আল-আজ্জাঈ বলেছেন: আমি নবী করীম (সা)-কে বলতে শুনেছি: مَنْ آتَاكُمْ وَ أَمْرُكُمْ جَمِيعٌ عَلَى رَجُلٍ وَاحِدٍ يُرِيدُ أَن يَشُقَ عَصَاكُمْ أَوْ يُفَرِّقَ جَمَاعَتَكُمْ فَاقْتُلُوهُ (তোমরা যখন এক ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন ঐক্যবদ্ধ, তখন কেউ যদি তোমাদের ঐক্য ভঙ্গ করতে ও তোমাদের ঐক্যবদ্ধতাকে ছিন্নভিন্ন করতে সচেষ্ট হয়, তাহলে তাকে হত্যা কর)। অপর একটি বর্ণনার ভাষা এইরূপ: খুব শীঘ্রই খুব খারাপ অবস্থা দেখা দিবে। অতএব কেউ যদি এই উম্মতের ঐক্যবদ্ধ থাকা অবস্থায় তা ছিন্নভিন্ন করতে সচেষ্ট হয়, তাহলে তার উপর তরবারির আঘাত কর—সে যে-ই হোক-না কেন।
২. দায়লাম আল-হিময়ারী (রা) বলেছেন: আমি রাসূলে করীম (সা)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, বললাম, হে রাসূল! আমরা এমন একটি দেশের অধিবাসী, যেখানে আমরা কঠোর কষ্টদায়ক কাজের সম্মুখীন হই এবং শক্তি অর্জনের লক্ষ্যে আমরা গম থেকে এক প্রকারের পানীয় তৈরি করে থাকি। তার ফলে আমাদের দেশের শৈত্য ও শীতলতা থেকে রক্ষা পাই। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তাতে কি নেশা হয়? বললাম হ্যাঁ। বললেন, তাহলে তোমরা তা পরিহার কর। বললাম, লোকেরা তো তা পরিহার করবে না। তখন বললেন: তারা তা ত্যাগ না করলে তোমরা তাদের হত্যা কর।
৩. ইমাম ইবনে তাইমিয়া লিখেছেন: الْمُفْسِدُ كَالصَّائِلِ إِذَا لَمْ يَنْدَفِعُ الصَّائِلُ إِلَّا بِالقَتْلِ قُتِلَ (বিপর্যয় বিশৃঙ্খলাকারী আক্রমণকারীর মতই। আর আক্রমণকারীকে হত্যা না করা হলে সে যদি বিরত বা দমন না-ই হয়, তাহলে তাকে হত্যা করা হবে)।

তা'যীর হিসাবে মারধর করার ব্যাপারে ইসলামী আইন পারদর্শীদের মধ্যে কোন মতপার্থক্য নেই। তবে তার মাত্রা বা পরিমাণ সম্পর্কে তিনটি কথা বলা হয়েছে।
প্রথম কথা, মারধর দশ দোররার বেশি হতে পারবে না। কেননা নবী (সা) বলেছেন: তোমরা দশটির অধিক চাবুক মারবে না। তবে আল্লাহ্ 'হদ্দ' হলে অন্য কথা।
দ্বিতীয় কথা, শরীয়ত সম্মত কম-সে-কম পরিমাণের 'হদ্দ' পর্যন্ত তা পৌঁছবে না। ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফিয়ী ও ইমাম আহমাদের শিষ্যদের অধিকাংশেরই এই মত। এই পর্যায়ের হাদীস হচ্ছে: মَنْ بَلَغَ حَدًّا فِي غَيْرِ حَدٍ فَهُوَ مِنَ الْمُعْتَدِينَ (যে অপরাধে 'হদ্দ' নেই, তাতে সেই 'হদ্দ' পরিমাণ শাস্তি দিলে সে সীমালংঘনকারী হবে)।
তৃতীয় কথা, তা'যীর হিসাবে মারধরের কোন পরিমাণ নির্দিষ্ট নয়। প্রয়োজন হলে 'হদ্দ'-শাস্তিরও অধিক শাস্তি দেওয়া যাবে। ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদ থেকে প্রাপ্ত একটি বর্ণনা এই মতের সমর্থক। কিন্তু যে অপরাধে শাস্তির পরিমাণ নির্দিষ্ট, তা'যীরের শাস্তি সেই পরিমাণের হতে পারবে না। যেমন, নিসাব পরিমাণের কম মূল্যের সম্পদ চুরি করলে হাত কাটা তার তা'যীরী শাস্তি হবে না।

এই মতের দলীল হচ্ছে:
১. যে ব্যক্তির স্ত্রী তার নিজের ক্রীতদাসীকে তার স্বামীর জন্য 'হালাল' করে দিয়েছে, সেই স্বামীকে একশটি দোরা মারার জন্য নবী করীম (সা) আদেশ করেছেন। আবার সন্দেহের কারণে সেই 'হদ্দ' থেকে তাকে নিষ্কৃতিও দিয়েছেন।
২. হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) ও হযরত উমর ফারুক (রা) দু'জন-ই এমন অবিবাহিত দুই পুরুষ-নারীকে একশ'টি করে দোরা মারার আদেশ দিয়েছিলেন, যাদের একই চাদরের তলায় নিদ্রিত পাওয়া গিয়েছিল।
৩. এক ব্যক্তি তার অঙ্গুরীয়র উপর নকশা অঙ্কন করেছিল এবং বায়তুল মাল থেকে অর্থ চুরি করেছিল। হযরত উমর (রা) তাকে প্রথম দিন একশ'টি, দ্বিতীয় দিনও একশ'টি এবং তৃতীয় দিনও একশ'টি দোরা মারার আদেশ করেছিলেন।

এখানে যে কয়টি দলীলের উল্লেখ হয়েছে, তন্মধ্যে শেষেরটি অপর দুইটি অপেক্ষা অধিক অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। এখানে অবশ্য একটি প্রশ্ন উঠে। তা হচ্ছে, এই শেষোক্ত কথাটিই যদি অধিক অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য হয়, তাহলে রাসূলে করীম (সা) থেকে পাওয়া সহীহ হাদীস: "আল্লাহর নির্দিষ্ট 'হদ্দ' ছাড়া অন্য কোন অপরাধের শাস্তিতে দশটির অধিক চাবুক মারবে না"—এর কি জওয়াব হতে পারে? জওয়াবে বলা যেতে পারে, হাদীসটিতে উদ্ধৃত 'হদ্দ' অর্থ গুনাহ্ বা অপরাধ, কেননা সব গুনাহ্ই আল্লাহর 'হদ্দ'। এখানে আবার প্রশ্ন উঠে, 'হদ্দ' অর্থ যদি গুনাহ্ বা অপরাধ হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে 'দশ বা তার চাইতে কম' এই কথার মিল কোথায়? এর জওয়াব হচ্ছে, তা শিক্ষামূলক শাস্তির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত, যা ঠিক কোন গুনাহর সহিত সংশ্লিষ্ট নয়। যেমন স্বামী তার স্ত্রীকে বা তার সন্তানকে মারে শিক্ষাদানের লক্ষ্যে। এগুলি নিশ্চয়ই দশটি চাবুকের বেশি হওয়া জায়েয নয়।

টিকাঃ
১. আস-সিয়াসাতুশ শারইয়্যাহ পৃ. ১১৪
২. আস-সিয়াসাতুশ শারইয়্যাহ পৃ. ৬২-৬৪
১. আস-সিয়াসাতুশ শারইয়্যাহ পৃ. ১১৬
১. আল-হাসানাহ ও আস-সিয়াসাতুশ শারইয়্যাহ পৃ. ১১১৪
১. আ'লামুল মুয়াক্কিঈন জ. ২ পৃ. ৩০; ফতহুল বারী জ. ১২ পৃ. ১৭৮

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 তা’যীর হিসাবে আর্থিক দণ্ড

📄 তা’যীর হিসাবে আর্থিক দণ্ড


ইসলামী শরীয়ত-বিশেষজ্ঞগণ তা'যীরী শাস্তি হিসাবে আর্থিক দণ্ডে দণ্ডিত করাকে সঙ্গত বলে ঘোষণা করেছেন। তার কয়েকটি দলীল এখানে উদ্ধৃত করা যাচ্ছে:
১. বহজ ইবনে হুকায়ম বর্ণনা করেছেন, রাসূলে করীম (সা) ইরশাদ করেছেন: প্রত্যেক মুক্ত ভাবে মাঠে গিয়ে আহার গ্রহণকারী উটেরই যাকাত দিতে হবে। যে তা সওয়াবের আশায় দিবে, সে তার সওয়াব পাবে। আর যে তা দিতে অস্বীকার করবে, আমি তা অবশ্যই আদায় করব এবং তার সাথে উটের একটি অংশও; এটি আমাদের মহান আল্লাহর নির্দেশ।
২. হযরত আবূ তালহা (রা) বলেন: হে আল্লাহর নবী! মদ্য আমার নিকট রক্ষিত ইয়াতীমদের সম্পদে রয়েছে। তিনি বলেন: তুমি তা প্রবাহিত করে দাও ও পাত্রগুলো ভেঙে ফেল।
৩. গাছে ঝুলন্ত ফল সম্পর্কে নবী করীম (সা)-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: যে অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি তা মুখের কাছে পেয়ে যায়, কোন উপায়ে তা পাড়ে না, তা খেলে তাতে কোন অপরাধ হবে না। আর যে ব্যক্তি সেখান থেকে কিছু নিয়ে বের হবে, তাকে তার দ্বিগুণ জরিমানা স্বরূপ দিতে হবে এবং তাকে শাস্তিও ভোগ করতে হবে।

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম লিখেছেন: যারা বলেন, অর্থ জরিমানার শাস্তি নাকচ হয়ে গেছে—তারা ভুল বলেন। এই পর্যায়ে নবী করীম (সা) থেকে কোন কথা পাওয়া যায়নি যে এটি নিষিদ্ধ। বরং সত্য কথা এই যে, তাঁর ইন্তেকালের পরও খুলাফায়ে রাশেদিন এবং বড় বড় সাহাবায়ে কিরাম আর্থিক দণ্ডের শাস্তি প্রয়োগ করেছেন। তাঁদের এই কাজ এই ব্যবস্থার পক্ষে অকাট্য দলীল, তা বাতিল হয়ে যায়নি।

পূর্বোদ্ধৃত আলোচনা থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, তা'যীর পর্যায়ের শাস্তি সমূহের বিশাল ক্ষেত্র রয়েছে। প্রশাসক এই পন্থায় অপরাধীদের যেকোনো শাস্তি দেওয়ার অধিকারী। অবশ্য তা অপরাধের স্বরূপের সহিত সামঞ্জস্য সম্পন্ন হতে হবে এবং স্বয়ং অপরাধীর অবস্থার সহিতও তা হতে হবে সংগতি সম্পন্ন। কোন বিশেষ ধরনের শাস্তি দানের জন্য তাকে বেঁধে দেয়া হয়নি, তার মাত্রা ও স্বরূপও নির্দিষ্ট নয়। তবে তার লক্ষ্য হতে হবে সামষ্টিক কল্যাণ, সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা, সুবিচার ও ন্যায়পরতা কায়েম করা এবং সর্বপ্রকারের যুলুম প্রতিহত করা।

টিকাঃ
১. আ'লামুল মুয়াক্কিঈন জ. ২ পৃ. ৩০; ফতহুল বারী জ. ১২ পৃ. ১৭৮
১. আল-হিসবাহ্ পৃ. ৫০

ফন্ট সাইজ
15px
17px