📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 রজম-এর পরবর্তী কার্যক্রম

📄 রজম-এর পরবর্তী কার্যক্রম


‘রজম’ দণ্ড কার্যকর করায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যু সংঘটিত হলে তার সাথে একজন মৃত মুসলিমের ন্যায় আচরণ করতে হবে। তাকে গোসল করাতে হবে, কাফন পরাতে হবে ও যথারীতি মুসলমানদের কবরস্থানে দাফন করতে হবে। তার মাগফিরাতের জন্য আল্লাহ্র নিকট দোয়াও করতে হবে। অধিকাংশ শরীয়তাভিজ্ঞাদের মতে তার জানাযাও পড়তে হবে। মুসলিম শরীফে নবী করীম (সা)-এর উক্তি উদ্ধৃত হয়েছে। তিনি বলেছেন: তোমরা সকলে মায়েযের জন্য মাগফিরাতের দোয়া কর।

পরে তিনি বললেন:

لَقَدْ تَابَ تَوْبَةً لَوْ قُسَمَتْ بَيْنَ أُمَّةٍ لَوَ سَعَتْهُمْ

মায়েজ এমন তওবা করেছে যে, তা যদি গোটা মুসলিম উম্মতের মধ্যে বন্টন করে দেয়া যায়, তাহলে তা তাদের সকলকে পরিব্যাপ্ত করবে।

হাদীসে আরও বলা হয়েছে: নবী করীম (সা) গামেদীয়াকে 'রজম' করার নির্দেশ দিলে তারা তা সম্পন্ন করল। এই সময় হযরত খালিদ ইবনে অলীদ (রা) একখণ্ড পাথর নিয়ে অগ্রসর হয়ে এসে তার প্রতি লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করলেন। ফলে পাথরটির আঘাতে রক্তের ছিঁটা এসে তাঁর মুখে লেগে গেল। তখন তিনি গামেদীয়াকে গাল দিলেন। রাসূলে করীম (সা) তা শুনতে পেয়ে বললেন:

থামো হে খালিদ! যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর নামের শপথ। গামেদীয়া এমন তওবা করেছে যা জোরপূর্বক কর আদায়কারীরা করলে নিশ্চয়ই তাদের মাফ করা হতো। অতপর 'রজম' কাজ সম্পন্ন করতে বললেন এবং শেষে তার জানাযা নামায পড়লেন।

অপর একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, নবী করীম (সা) 'রজম'-এ মৃত জুহানীয়ার জানাযা পড়লেন, তখন হযরত উমর (রা) বললেনঃ হে রাসূল (সা)! আপনি একজন ব্যভিচারিণীর জানাযা পড়লেন? জওয়াবে তিনি বললেন: জুহানীয়া এমন তওবা করেছে যে, তা মদীনার সত্তর জনের মধ্যে ভাগ করে দিলেও তাদের পরিব্যাপ্ত করত।

tটিকাঃ
৫. সুনান আবু দাউদ জ ২ পৃ ৪৫৯
১. বুখারী মাআ শারহিল ফতহুল বারী জ ১২ পৃ ১২৯

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 যিনার মিথ্যা দোষারোপের অপরাধ

📄 যিনার মিথ্যা দোষারোপের অপরাধ


কোন লোককে যিনা ও পূংমৈথুনের মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করাকে আরবী পারিভাষিক নাম দেয়া হয়েছে 'আল-কাযাফ' (القذف)। সাধারণভাবে ঠাট্টা বা বিদ্রুপছলে একজন অপরজনকে বলে 'হে যিনাকার'। অথবা বলে, 'আমি অমুককে যিনা করতে দেখেছি'। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে এই কথাগুলি 'কাযাফ' পর্যায়ে গণ্য। বস্তুত ইসলামী সমাজে চরিত্রবান মু'মিন পুরুষ বা মহিলাদের নামে এইরূপ উক্তি খুব সাধারণ এবং নগণ্য ব্যাপার নয়। এর ফলে জনসমাজে জঘন্য ও কুৎসিত চরিত্রের কালো ছায়াপাত ঘটে। সন্দেহ-সংশয়, অবিশ্বাস-অনাস্থা, অভক্তি এবং দ্বিধা-দ্বন্দ্বের বিষস্রোত গোটা সমাজ মানসকে পংকিল ও বিষ জর্জর করে তোলে। এই কারণে ইসলাম এই ধরনের দায়িত্বহীন কথা-বার্তা বলাকে চিরদিনের জন্য অকাট্য হারাম ঘোষণা করেছে। শুধু তা-ই নয়, যে তা করে, তার উপর অভিশাপও বর্ষণ করা হয়েছে। তাকে বিশ্বাস-অযোগ্য বলে চিহ্নিত করেছে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে তার কঠিনতম আযাবে পরিবেষ্টিত হওয়ার ভয়-ও দেখানো হয়েছে। এই পর্যায়ে আল্লাহ্ ঘোষণা অত্যন্ত ভীতিপ্রদ: যেসব লোক সুরক্ষিত-সচ্চরিত্র, অসতর্ক-ঈমানদার মহিলাদের উপর যিনার মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করে, তারা ইহকাল ও পরকালে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য অতিবড় আযাব নির্দিষ্ট রয়েছে। নবী করীম (সা) বলেছেন: তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী কাজ থেকে দূরে সরে থাকবে—তন্মধ্যে একটি হলো মু'মিন-অসতর্ক-চরিত্রবতী মেয়েলোকদের উপর যিনার মিথ্যা দোষারোপ করা।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 যিনার মিথ্যা দোষারোপের শাস্তি

📄 যিনার মিথ্যা দোষারোপের শাস্তি


যে লোক কোন পুরুষ বা মেয়েলোককে যিনা বা পুংমৈথুনের মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করবে, এই অভিযোগ রাষ্ট্র প্রধান—তথা প্রশাসন কতৃপক্ষের নিকট দায়ের হবে, তাকে আশি দোরার শাস্তি দেয়া হবে। এভাবেই জনগণের মান-মর্যাদা রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে অভিযোগকারী যদি তার অভিযোগের সমর্থনে চারজন প্রত্যক্ষ দর্শীর সাক্ষ্য পেশ করতে পারে, তাহলে তা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য হবে। কুরআন মজীদে এই পর্যায়ে বলা হয়েছে: আর যেসব লোক সুরক্ষিত চরিত্রবান মেয়েলোকদের উপর যিনার অভিযোগ আনে, পরে সেজন্য চারজন সাক্ষী উপস্থাপিত করে না, তাদের আশিটি দোরা মার। তাদের সাক্ষ্য কখনই কবুল করবে না। ওরা ফাসিক। তবে যারা এই অপরাধ থেকে অতঃপর তওবা করবে ও নিজেদের সংশোধন করে নেবে, আল্লাহ্ (তাদের জন্য) নিশ্চয়ই ক্ষমাশীল, অতীব দয়াবান।

অভিযোগকারী যদি স্বাধীন ও শরীয়ত পালনে বাধ্য হওয়ার উপযোগী হয় এবং অভিযোগটা হয় যিনা করার—এবং তা মিথ্যা হয় বা প্রমাণিত না হয়, তাহলে উপরোক্ত শাস্তি তাদের উপর কার্যকর করা একান্তই কর্তব্য। আর অভিযোগ যদি যিনা বা পুংমৈথুন ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে হয় (আর তা অপ্রমাণিত হয়) তাহলে তার উপর তা'যীর ধার্য হবে।

যিনার মিথ্যা অভিযোগে 'হদ্দ' ধার্য হচ্ছে, অথচ কাউকে কুফর বা মুনাফিকীর অভিযোগে মিথ্যা-মিথ্যিভাবে 'অভিযুক্ত করা হলে তাতে 'হদ্দ' ধার্য হয় না। তার কারণ কারোর বিরুদ্ধে মিথ্যা-মিথ্যিভাবে যিনার অভিযোগ তোলা অত্যন্ত মারাত্মক ধরনের অপরাধ। এর পরিণতি ও প্রতিক্রিয়া সমাজে খুব ভয়াবহ হয়ে দেখা দেয়। তাতে সমাজে নির্লজ্জতা, অশ্লীলতা ও চরিত্রহীনতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযুক্ত ব্যক্তি জনগণের আস্থা থেকে চিরদিনের তরে বঞ্চিত হয়ে যায়। তাকে সারাটা জীবন মিথ্যা কলংকের বোঝা বহন করে অতিবাহিত করতে হবে।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 মদপানের অপরাধ

📄 মদপানের অপরাধ


ইসলামে সকল প্রকার মাদক দ্রব্য ও মদ্যপান সম্পূর্ণ স্থায়ীভাবে হারাম। কুরআন ও সুন্নাহ—ইসলামের এই দুইটি উৎসই এ বিষয়ে অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে এই কথা ঘোষণা করেছে। কুরআন মজীদে আল্লাহর ঘোষণা হচ্ছেঃ হে ঈমানদার লোকেরা! এই মদ্য, জুয়া, বলিদান স্থান ও পাশা—এই সবই জঘন্য শয়তানি কাজ। এইগুলি পরিহার কর। আশা করা হচ্ছে যে, তোমরা কল্যাণ লাভ করতে পারবে। শয়তান তো এই মদ্য ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে সংকল্পবদ্ধ, তোমাদের আল্লাহ্র স্মরণ ও সালাত (নামায) থেকে বিরত রাখতে সচেষ্ট। তা'হলে তোমরা কি এসব থেকে বিরত থাকবে?

মাদক দ্রব্য মাত্রই যে ইসলামে হারাম, তা কুরআন ও হাদীসের স্পষ্ট ঘোষণা থেকেই প্রমাণিত। আর কারণও সাথে সাথেই বিবৃত হয়েছে। তা হচ্ছে, এই নেশাকারী জিনিস মানুষের পরস্পরে চরম শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষের সৃষ্টি করে, আল্লাহ্র স্মরণ ও সালাত থেকেও মানুষকে বিরত রাখে।

মদ্যপান করলে ঈমান থাকে না, শুধু এতটুকুই নয়, মদ্যপানে মত্ত ব্যক্তি শত্রুর নিকট নিজেদের গোপন তত্ত্ব ও তথ্য অকপটে প্রকাশ করে দেয়। সে বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। মানুষ হারিয়ে ফেলে মনুষ্যত্ববোধ ও চেতনা। আর মানুষ যখন বিবেক-বুদ্ধিই হারিয়ে ফেলে, তখন তার ভাল-মন্দ জ্ঞানও সম্পূর্ণরূপে লোপ পায়। এ জন্যেই হযরত উসমান (রা) বলেছিলেন: তোমরা সকলে সর্বপ্রকারের মাদক পরিহার কর। কেননা তা হচ্ছে সর্বপ্রকারের পাপ কাজের উৎস।

টিকাঃ
১. সুনানু নাসায়ী জ ৮ পৃ ২৯৭
২. আবু দাউদ জ ৩ পৃ ২৯৫
১. সুনানু নাসায়ী জ ৮ পৃ ৩১৫
১. আল জামে' লা-আহকামিল কুরআন আল কুরতুবী জ ৩ পৃ ৫২
২. আল হালাল ওয়াল হারাম ফিল ইসলাম ইউসুফ আল কারযাভী পৃ ৬২

ফন্ট সাইজ
15px
17px