📄 বিবাহিতের যিনার শাস্তি
আমরা কুরআন মজীদে ব্যবহৃত যে শব্দটির অর্থ বলেছি 'বিবাহিত', তা হচ্ছে: المحصنت الا الا حصان কুরআন মজীদে এই শব্দটির অর্থ হলো, যে লোক এ অবস্থায় যে, সে স্বাধীন, শরীয়ত পালনে যোগ্য-বাধ্য, যথার্থভাবে ও বিশুদ্ধ নিয়মে বিয়ে করল এবং একবার হ'লেও স্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গম করল। এরূপ একজন مُحْصَن ব্যক্তি—সে পুরুষ হোক বা স্ত্রীলোক—যিনা করলে তার শাস্তি হচ্ছে 'রজম'—প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করা। কেননা নবী করীম (সা) থেকে এই শাস্তির বর্ণনা অকাট্য ও সন্দেহাতীতভাবে পাওয়া গেছে তাঁর কথা ও কাজ—উভয় দিক দিয়েই।
বিবাহিত, সংরক্ষিত, চরিত্রবান নারী কিংবা পুরুষ যিনা করলে তার শাস্তি যে 'রজম', এ বিষয়ে ইসলামের সকল কালের সকল দেশের সকল মনীষীই সম্পূর্ণ একমত। কেননা খাওয়ারিজরা ছাড়া এই বিষয়ে আর কেউই ভিন্ন মত প্রকাশ করেনি। খাওয়ারিজদের বক্তব্য শুধু এতটুকু যে, 'রজম'-এর কথা যেহেতু কুরআনে নেই এবং তা খুবই কঠোর নিমর্ম শাস্তি, তা যদি বাস্তবিকই শরীয়তের বিধান হতো, তাহলে তার উল্লেখ কুরআনে না হয়ে কিছুতেই পারতো না।
কিন্তু খাওয়ারিজদের এই মত দলীলভিত্তিক নয়, গ্রহণযোগ্যও নয়। সুন্নাতে-ই অকাট্য স্পষ্টভাবে 'রজম'-এর উল্লেখ রয়েছে। তাতে একবিন্দু সন্দেহের অবকাশ নেই। রাসূলে করীম (সা)-এর পর খুলাফায়ে রাশেদিন এই আইন কার্যকর করেছেন। দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রা) একদা ভাষণ দান প্রসঙ্গে বলেছিলেন: আল্লাহ্ তা'আলা মুহাম্মদ (সা)-কে পরম সত্যতা সহকারে পাঠিয়েছেন, তাঁর প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন। সেই অবতীর্ণ বিষয়াবলীর মধ্যে 'রজম'-এর আয়াতও ছিল। আমরা তা পড়েছি ও তার সংরক্ষণও করেছি। স্বয়ং রাসূলে করীম (সা) 'রজম' করিয়েছেন, তাঁর পরে আমরাও তা করিয়েছি। আমি ভয় পাচ্ছি, সময়ের দীর্ঘতায় লোকেরা হয়ত বলবে, আল্লাহ্ কিতাবে আমরা 'রজম'-এর আয়াত পাচ্ছি না। তাতে তারা আল্লাহ্র ধার্য করা ফরয পরিত্যাগ করার কারণে গুমরাহ্ হয়ে যাবে।
বিবাহিত নারী বা পুরুষ যিনা করলে তার শাস্তি 'রজম' কিন্তু তার পূর্বে তাকে দোৱা মারা হবে কিনা, এ বিষয়ে বিভিন্ন বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে। অধিকাংশ ফিকাহবিদরা একমত যে, বিবাহিত ব্যভিচারীকে 'রজম' করা হবে, দোৱা মারা হবে না। হানাফী মতের বিশেষজ্ঞরাও এই রায়ই দিয়েছেন। তাঁদের সকলেরই ভিত্তি হচ্ছে হযরত জাবির (রা) বর্ণিত হাদীস। হাদীসটি হচ্ছে: নবী করীম (সা) মায়েযকে 'রজম'-এর দণ্ড দিয়েছেন, দোরা মারেন নি। গামেদীয়াকে 'রজম' দিয়েছেন, দোরা মারেননি। অথচ এ দু'জনই ছিল বিবাহিত।
tটিকাঃ
১. আসসিয়াতুস শরইয়্যাহ্ সং ১০
২. বহু কয়খানা হাদীস গ্রন্থেই এই হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে। দেখুন: ২৯৭ جامع الاصول
১. সহীহ মুসলিম বিশরহুন্নবী জ ১১ পৃ ১৯১
২. সুনানু আবী দাউদ ৩ পৃ ৪০
১. আল-বাহরুল মুহীত ৬ পৃ ৪২৮
১. সহীহ মুসলিম বিশরহুন্নবী জ ১১ পৃ ১৯৮; সুনান আবু দাউদ জ ২ পৃ ৪২০
📄 রজম দণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়া
'রজম' দণ্ডে যে দণ্ডিত হবে, তাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করতে হবে। তাকে কোনো কূপ খুঁড়ে তার মধ্যে দাঁড় করাতে হবে না, শক্ত করে বাঁধতেও হবে না তাকে। জমহুর আলিমগণ এই মতই দিয়েছেন। তার দলীল হচ্ছে হযরত আবূ সায়ীদ খুদরী (রা) বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেছেন: রাসূলে করীম (সা) যখন মায়েয ইবনে মালিককে 'রজম' করার জন্য আমাদের নির্দেশ দিলেন, তখন আমরা তাকে নিয়ে বকীর দিকে বের হয়ে গেলাম। তার জন্য আমরা কূপ খুড়লাম না, তাকে বাঁধলামও না। সে দাঁড়িয়ে গেল, আমরা তার উপর পাথর, হাড় ও চাড়া ইত্যাদি নিক্ষেপ করতে লাগলাম। প্রস্তরের আঘাতে সে শক্ত হয়ে গেল। পরিশেষে সে স্তব্ধ হয়ে গেল।
কারোর উপর অকাট্য দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে 'রজম' শাস্তি সাব্যস্ত হওয়ার পর যদি কেউ লোকদের থেকে পালিয়ে যেত, তাহলে তারা তার পশ্চাদ্ধাবন করে তাকে হত্যা করত। আর যদি শুধু স্বীকারোক্তির উপর অবিচল থাকত, তাহলে তার পশ্চাদ্ধাবন করতো না। মায়েয আসলামী প্রস্তরঘাতে জর্জরিত হয়ে মৃত্যুভয়ে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করেছিল; কিন্তু লোকেরা তাকে ধরে ফেলে ও প্রস্তরাঘাতে শেষ পর্যন্ত সে মৃত্যুবরণ করে। রাসূলে করীম (সা)-এর নিকট এই সংবাদ পৌছালে তিনি তাদের বলেছিলেন: তোমরা তাকে যেতে দিলে না কেন? সম্ভবত সে তওবা করত এবং আল্লাহ্-ও তার তওবা কবুল করতেন।
মেয়ে অপরাধীকে 'রজম' করা কালে তার জন্য কূপ খনন করা হবে কিনা, তা নিয়ে শরীয়ত বিশেষজ্ঞগণ বিভিন্ন মত দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, 'রজম' কালে তাকে কূপের মধ্যে দাঁড় করানো ভালো। তবে ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদ কূপ না খোড়ার কথাই বলেছেন। তাঁদের দলীল হচ্ছে, নবী করীম (সা) গামেদীয়াকে 'রজম' করার নির্দেশ দিয়েছিলেন; কিন্তু তার জন্য কূপ খনন করতে বলেন নি। তবে তার দেহ আবৃত রাখার জন্য শক্ত করে কাপড় বেঁধে দেয়া হয়েছিল। 'রজম' পাথর দ্বারাই সম্পন্ন করতে হবে। মধ্যম আকারের পাথর খণ্ড হতে হবে। এই দণ্ডদান অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক মু'মিনের উপস্থিত থাকা একান্ত জরুরী। ফাসিক ফাজের লোকগুলি যেন এই অনুষ্ঠান দর্শনে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠে।
tটিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম বিশরহুন্নবী জ ১১ পৃ ১৯৮; সুনান আবু দাউদ জ ২ পৃ ৪২০
২. আবু দাউদ জ ২
১. আল মুগনী ও আশ-শারহুল কবীর জ ১০ পৃ ১২৩
২. আল মুগনী ও আশ-শারহুল কবীর জ ১০ পৃ ১২২
📄 রজম-এর পরবর্তী কার্যক্রম
‘রজম’ দণ্ড কার্যকর করায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যু সংঘটিত হলে তার সাথে একজন মৃত মুসলিমের ন্যায় আচরণ করতে হবে। তাকে গোসল করাতে হবে, কাফন পরাতে হবে ও যথারীতি মুসলমানদের কবরস্থানে দাফন করতে হবে। তার মাগফিরাতের জন্য আল্লাহ্র নিকট দোয়াও করতে হবে। অধিকাংশ শরীয়তাভিজ্ঞাদের মতে তার জানাযাও পড়তে হবে। মুসলিম শরীফে নবী করীম (সা)-এর উক্তি উদ্ধৃত হয়েছে। তিনি বলেছেন: তোমরা সকলে মায়েযের জন্য মাগফিরাতের দোয়া কর।
পরে তিনি বললেন:
لَقَدْ تَابَ تَوْبَةً لَوْ قُسَمَتْ بَيْنَ أُمَّةٍ لَوَ سَعَتْهُمْ
মায়েজ এমন তওবা করেছে যে, তা যদি গোটা মুসলিম উম্মতের মধ্যে বন্টন করে দেয়া যায়, তাহলে তা তাদের সকলকে পরিব্যাপ্ত করবে।
হাদীসে আরও বলা হয়েছে: নবী করীম (সা) গামেদীয়াকে 'রজম' করার নির্দেশ দিলে তারা তা সম্পন্ন করল। এই সময় হযরত খালিদ ইবনে অলীদ (রা) একখণ্ড পাথর নিয়ে অগ্রসর হয়ে এসে তার প্রতি লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করলেন। ফলে পাথরটির আঘাতে রক্তের ছিঁটা এসে তাঁর মুখে লেগে গেল। তখন তিনি গামেদীয়াকে গাল দিলেন। রাসূলে করীম (সা) তা শুনতে পেয়ে বললেন:
থামো হে খালিদ! যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর নামের শপথ। গামেদীয়া এমন তওবা করেছে যা জোরপূর্বক কর আদায়কারীরা করলে নিশ্চয়ই তাদের মাফ করা হতো। অতপর 'রজম' কাজ সম্পন্ন করতে বললেন এবং শেষে তার জানাযা নামায পড়লেন।
অপর একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, নবী করীম (সা) 'রজম'-এ মৃত জুহানীয়ার জানাযা পড়লেন, তখন হযরত উমর (রা) বললেনঃ হে রাসূল (সা)! আপনি একজন ব্যভিচারিণীর জানাযা পড়লেন? জওয়াবে তিনি বললেন: জুহানীয়া এমন তওবা করেছে যে, তা মদীনার সত্তর জনের মধ্যে ভাগ করে দিলেও তাদের পরিব্যাপ্ত করত।
tটিকাঃ
৫. সুনান আবু দাউদ জ ২ পৃ ৪৫৯
১. বুখারী মাআ শারহিল ফতহুল বারী জ ১২ পৃ ১২৯
📄 যিনার মিথ্যা দোষারোপের অপরাধ
কোন লোককে যিনা ও পূংমৈথুনের মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করাকে আরবী পারিভাষিক নাম দেয়া হয়েছে 'আল-কাযাফ' (القذف)। সাধারণভাবে ঠাট্টা বা বিদ্রুপছলে একজন অপরজনকে বলে 'হে যিনাকার'। অথবা বলে, 'আমি অমুককে যিনা করতে দেখেছি'। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে এই কথাগুলি 'কাযাফ' পর্যায়ে গণ্য। বস্তুত ইসলামী সমাজে চরিত্রবান মু'মিন পুরুষ বা মহিলাদের নামে এইরূপ উক্তি খুব সাধারণ এবং নগণ্য ব্যাপার নয়। এর ফলে জনসমাজে জঘন্য ও কুৎসিত চরিত্রের কালো ছায়াপাত ঘটে। সন্দেহ-সংশয়, অবিশ্বাস-অনাস্থা, অভক্তি এবং দ্বিধা-দ্বন্দ্বের বিষস্রোত গোটা সমাজ মানসকে পংকিল ও বিষ জর্জর করে তোলে। এই কারণে ইসলাম এই ধরনের দায়িত্বহীন কথা-বার্তা বলাকে চিরদিনের জন্য অকাট্য হারাম ঘোষণা করেছে। শুধু তা-ই নয়, যে তা করে, তার উপর অভিশাপও বর্ষণ করা হয়েছে। তাকে বিশ্বাস-অযোগ্য বলে চিহ্নিত করেছে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে তার কঠিনতম আযাবে পরিবেষ্টিত হওয়ার ভয়-ও দেখানো হয়েছে। এই পর্যায়ে আল্লাহ্ ঘোষণা অত্যন্ত ভীতিপ্রদ: যেসব লোক সুরক্ষিত-সচ্চরিত্র, অসতর্ক-ঈমানদার মহিলাদের উপর যিনার মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করে, তারা ইহকাল ও পরকালে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য অতিবড় আযাব নির্দিষ্ট রয়েছে। নবী করীম (সা) বলেছেন: তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী কাজ থেকে দূরে সরে থাকবে—তন্মধ্যে একটি হলো মু'মিন-অসতর্ক-চরিত্রবতী মেয়েলোকদের উপর যিনার মিথ্যা দোষারোপ করা।