📄 যিনায় ইসলামী শাস্তি অভিনব নয়
ইসলামে বিবাহিত নর-নারীর যিনা অপরাধের শাস্তি হচ্ছে 'রজম'—প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা। কিন্তু এই শাস্তি ইসলামের নবপ্রবর্তিত কিছু নয়; বরং 'তওরাত' গ্রন্থেও এই শাস্তিই লিপিবদ্ধ ছিল, যদিও ইয়াহুদীরা আল্লাহ্ দেয়া বিধানের একটা অংশ বিস্তৃত হয়ে গিয়েছিল। হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত: কতিপয় ইয়াহুদী রাসূলে করীমের নিকট উপস্থিত হয়ে তাদের একজন পুরুষ ও একজন নারীর যিনা করার অপরাধের শাস্তির কথা জানতে চাইল। রাসূলে করীম (সা) জিজ্ঞাসা করলেন: তোমাদের তওরাত কিতাবে 'রজম' শাস্তি পর্যায়ে কিছু দেখতে পাও কি? জওয়াবে তারা বললো: এরূপ অপরাধে আমরা তো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরকে লাঞ্ছিত করি এবং তাদের দোৱাও মারা হয়।
এই সময় হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রা) বললেনঃ তোমরা মিথ্যা বলছো। তাওরাত কিতাবে তো বিবাহিত নারী-পুরুষের যিনা অপরাধে 'রজম' শাস্তির কথা লিখিত রয়েছে। অতঃপর তওরাত কিতাব আনা হলো ও খুলে ধরা হলো। একজন 'রজম'- এর আয়াতটি হাত দিয়ে ঢেকে রাখল ও তার পূর্বের ও পরের অংশ পাঠ করল। তখন আবুদল্লাহ্ ইবনে সালাম বললেন: তোমরা হাত তুলে ফেল। হাত তুলে নিতেই আয়াতটি সকলে দেখতে পেলেন। তখন ইয়াহুদীরা স্বীকার করল যে, তওরাত কিতাবে 'রজম'-এর নির্দেশ স্পষ্ট ভাষায়ই লিখিত রয়েছে। অতঃপর তদানুযায়ী 'রজম' করার নির্দেশ জারী করা হলো।
আর ইসলামের আইন-নীতি অনুযায়ী তওরাত কিতাবের আইন-মনসুখ না হলে স্বতঃই তার পরে অবতীর্ণ ইনজীল কিতাবেরও আইনরূপে গণ্য হবে। আল্লাহ্ তা'আলাই ঘোষণা করেছেন:
وَ قَفَّيْنَا عَلَى آثَارِهِمْ بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَآتَيْنَاهُ الإِنْجِيلَ فِيْهِ هُدًى وَ نُورٌ وَ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَ هُدًى وَ مَوْعِظَةٌ لِّلْمُتَّقِينَ
তাদের পিছনে পিছনে আমরা নিয়ে এলাম ঈসা ইবনে মরিয়মকে তার সম্মুখবর্তী তওরাতের সত্যতা ঘোষণকারীরূপে এবং তাকে দিলাম ইনজীল। তাতে হিদায়তের বিধান রয়েছে, আছে নূর। এবং তা তার সম্মুখবর্তী তওরাতের সত্যতা ঘোষণাকারী ও মুত্তাকীদের জন্য হিদায়ত ও উপদেশ।
বস্তুত তওরাত, ইনজীল এবং কুরআন—এই তিনখানি আসমানী গ্রন্থ প্রায় পর পর নাযিল হয়েছে এবং প্রত্যেকখানির অপর প্রত্যেকখানির মৌলিকতার সত্যতা ঘোষণা করে। তওরাত কিতাবে অনেক রদ-বদল হয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও আজকের তওরাতে সেই 'রজমে'র কথা স্পষ্ট ভাষায় উদ্ধৃত রয়েছে।
'তওরাত' বাংলা ভাষ্য 'পুরাতন নিয়ম' বা old testament নামে পরিচিত। তার দ্বিতীয় বিবরণ 'নানা বিষয়ে আদেশ' শিরোনামাধীন ক্ষেত্রগুলি আমি এখানে হুবহু তুলে দিচ্ছি:
কিন্তু সেই কথা যদি সত্য হয়, কন্যার কুকার্যের চিহ্ন যদি না পাওয়া যায়, তবে তাহারা সেই কন্যাকে বাহির করিয়া তাহার পিতৃগৃহের দ্বার সমীপে আনিবে এবং সেই কন্যার নগরের পুরুষেরা 'প্রস্তুরাঘাতে' তাহাকে 'বধ' করিবে।
কোন পুরুষ যদি পরস্ত্রীর সহিত শয়নকালে ধরা পড়ে, তবে পরস্ত্রীর সহিত শয়নকারী সেই পুরুষ সেই স্ত্রী উভয়ে হত হইবে, এইরূপে তুমি এ স্রায়েলের মধ্য হইতে দুষ্টাচার লোপ করিবে।
যদি কেহ পুরুষের প্রতি বাগদত্তা কোন কুমারীকে নগর মধ্যে পাইয়া তাহার সহিত শয়ন করে, তবে তোমরা সেই দুইজনকে বাহির করিয়া নগরদ্বারের নিকটে আনিয়া প্রস্তরঘাতে বধ করিবে, সেই কন্যাকে বধ করিবে, কেননা নগরের মধ্যে থাকিলেও সে চিৎকার করে নাই এবং সেই পুরুষকে বধ করিবে, কেননা সে আপন প্রতিবেশীর স্ত্রীকে মন ভ্রষ্টা করিয়াছে। এইরূপে তুমি আপনার মধ্য হইতে দুষ্টাচার লোপ করিবে।
কিন্তু ইয়াহুদ ও খৃস্টানরা এই দণ্ড কার্যকর করে না। তাতে অবশ্য এর অস্তিত্ব বা বর্তমানতা বিলুপ্ত হয় না। এখানে এই শরীয়তী দণ্ড যদি ইসলামেও গৃহীত হয়ে থাকে, তাহলে সে জন্য ইসলামী আইনকে দোষ দেয়া অন্তত এই দুই ধর্মাবলম্বী লোকদের শোভা পায় না। বরং তারা তাদের ধর্মগ্রন্থে প্রস্তরাঘাতে 'বধ' করার বিধান থাকা সত্ত্বেও তা প্রত্যাখ্যান করে চলছে বলে তারাই দোষী সাব্যস্ত হচ্ছে আল্লাহ্র নিকট যেমন, দুনিয়ার মানুষের নিকটও তেমনি।
tটিকাঃ
৫. সহিহ বুখারী জ ৪ স ১৪৩ কিন্তু ইমাম কুরতুবী এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন ভিন্নভাবে। তা এই: ইয়াহুদ একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রীলোক রাসূলে করীম (সা)-এর নিকট নিয়ে এল। বলল, এরা দুইজন যিনা করেছে। নবী করীম (সা) বললেনঃ তোমাদের মধ্য থেকে দুইজন বড় আলিমকে নিয়ে এসো, তারা ছরিয়ার দুই পুত্রকে নিয়ে এলো। জিজ্ঞেস করলেন: এই দুই জনের ব্যাপারে তওরাতে কি বিধান দেখতে পাও? তারা দুইজন বলল: তওরাতে আমরা পাচ্ছি যে, চারজন লোক যদি সাক্ষ্য দেয় যে, তারা পুরুষটি লিঙ্গ স্ত্রীলোকটি যৌনাঙ্গের ভিতরে দেখতে পেয়েছে যেমন সুর্মাদানীর মধ্যে শলাকা প্রবেশ করে, তাহলে দু'জনকেই 'রজম' করতে হবে। জিজ্ঞেস করলেন: তাহলে তোমরা এই দুইজনকে 'রজম' করছ না কেন, বাধা কোথায়? সে দুইজন বলল: আমাদের শাসক চলে গিয়েছিল। তখন হত্যা করাটা আমরা অপছন্দ করলাম। অতঃপর চারজন সাক্ষ্য পেশ করা হলেও উক্ত রূপ সাক্ষ্য দিলে রাসূলে করীম (সা) তাদের 'রজম' করার নির্দেশ দিলেন।
📄 যিনার শাস্তির বিবর্তন
তদানীন্তন আরব সমাজে যখন ইসলাম প্রচারিত হতে শুরু হয়, তখন যিনা-ব্যভিচার ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। সেদিকে লক্ষ্য রেখে হঠাৎ করে তার শাস্তি বিধিবদ্ধ হওয়ার নীতি অবলম্বিত হয়নি। তা ক্রমশ বিধিবদ্ধ হয়েছে, যেন সমাজকে সংশোধন করার কাজ সফল হতে পারে, জনগণের পক্ষে তা গ্রহণ করা সহজ হয়।
এই কারণে এ পর্যায়ের সর্বপ্রথম যে বিধান নাযিল হয়, তা হচ্ছে সূরা আন-নিসা'র এই আয়াত: وَ الَّتِى يَأْتِينَ الْفَاحِشَةَ مِنْ نِّسَائِكُمْ فَاسْتَشْهِدُوا عَلَيْهِنَّ أَرْبَعَةً مِّنْكُمْ فَإِنْ شَهدُوا فَأَمْسِكُوهُنَّ فِى الْبُيُوتِ حَتَّى يَتَوَفَّاهُنَّ الْمَوْتُ أَوْ يَجْعَلُ اللهُ لَهُنَّ سَبِيلاً ، وَ اللَّذن يَأْتِيَانِهَا مِنْكُمْ فَادُوْهُمَا ، فَإِنْ تَابَا وَ أَصْلَحَا فَأَعْرِضُوا عَنْهُمَا طَ إِنَّ اللهَ كَانَ تَوَّابًا رَّحِيمًا .
তোমাদের যেসব স্ত্রীলোক নির্লজ্জতার কাজ (যিনা) করবে, তাদের উপর তোমাদের মধ্য থেকে চারজন সাক্ষী পেশ কর। তারা সেকাজের পক্ষে সাক্ষ্য দিলে তাদেরকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখ, যতক্ষণ না মৃত্যু তাদের জীবন সাঙ্গ করে অথবা আল্লাহ্ তাদের জন্য অন্য কোন উপায় বার করেন। আর তোমাদের যে দুইজন পুরুষ-নারী এই নির্লজ্জতার কাজ করে, তাদের নির্যাতন কর। তারা দুইজনই যদি তওবা করে ও নিজেদের সংশোধন করে নেয়, তাহলে ওদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ বড়ই তওবা কবুলকারী, অতিশয় দয়াবান।
এ আয়াত অনুযায়ী প্রথম দিকে বিবাহিতের যিনার শাস্তি ছিল কয়েদ। আর অবিবাহিতের ছিল কথা ও ভীতির সাহায্যে কষ্টদান। ইবনে কুদামার বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেছেন, আয়াতে 'স্ত্রীলোক' বলতে বিয়ে করা স্ত্রীলোক বুঝিয়েছে কেননা আল্লাহ্ তা'আলা দু'ধরনের শাস্তির উল্লেখ করেছেন—তার একটি অপরটির তুলনায় অত্যন্ত কঠোর। কঠোর শাস্তিটি বিবাহিতের জন্য, আর অন্যটি কুমারীদের জন্য। পরে এই শাস্তি মনসুখ হয়ে যায়। হযরত উবাদাতা ইবনুস সামিত (রা) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা) বলেছেন: خُذُوا عَنِّى خُذُوا عَنِّى قَدْ جَعَلَ اللهُ لَهُنَّ سَبِيلاً الْيَكْرُ بِالْبَكْرِ جِلْدُ مِائَةٍ وَ تَغْرِيبُ عَامِ وَ الثَّيِّبُ بِالثَّيِّبِ جِلْدُ মِائَةٍ وَ الرَّحْمُ -
নাও, আমার নিকট থেকে জেনে নাও। আল্লাহ্ তা'আলা ওদের জন্য পথ বের করে দিয়েছেন। কুমার-কুমারীর সহিত ব্যভিচার করলে তার শাস্তি হবে একশত দোরা এবং বছরের জন্য নির্বাসন আর বিবাহিত-বিবাহিতার সহিত ব্যভিচার করলে একশত দোরা ও 'সঙ্গেসার'।
টিকাঃ
১. কোন কোন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, শুরুতে 'তোমাদের যেসব স্ত্রীলোক' বলে বিবাহিতাদেরই বোঝানো হয়েছে। 'স্ত্রীলোক' অর্থ বিবাহিতা স্ত্রী। অন্যথায় এরূপ বলার কোন কারণ নেই। বিশেষত উক্ত আয়াতে দু'ধরনের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এক ধরনের শাস্তি অন্য ধরনের শাস্তির তুলনায় অধিকতর কড়া ও তীব্র। আর তা বিবাহিতের জন্য নির্দিষ্ট এবং অন্য ধরনের শাস্তি হচ্ছে হালকা, আর তা অবিবাহিতের জন্য। ঠিক যেমন রজম ও দোরা প্রথমটি কঠিন, দ্বিতীয়টি তার তুলনায় হালকা।
📄 অবিবাহিতের যিনার শাস্তি
যে নারী বা পুরুষ বিবাহিত নয়, সে যদি যিনার অপরাধ করে, তাহলে তার শাস্তি হচ্ছে একশ'টি দোরা। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন: الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلِّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ ব্যভিচারী পুরুষ ও ব্যভিচারী নারী—এদের প্রত্যেককে একশ'টি করে দোরা। এ বিষয়ে শরীয়ত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কোনই মতভেদ নেই, এ ব্যাপারে তাঁরা সম্পূর্ণ একমত। অবশ্য এরপরও শাস্তির অংশ হিসাবে অপরাধীকে এক বছরের জন্য নির্বাসিত করা হবে কিনা, এ বিষয়ে বিরাট মতদ্বৈততা লক্ষ্য করা যায়।
এ পর্যায়ে তিনটি মতের সন্ধান পাওয়া যায়:
প্রথম মত: ব্যভিচারী পুরুষ হোক কি নারী, একশ'টি দোরা মারার পর-ও তাকে এক বছরের জন্য নির্বাসিত করতে হবে। তা করা ওয়াজিব। জমহুর আলিমগণ এই মত প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমদ ও ইমাম ইস্হাক ইবনে রাহওয়াইহ্। তাঁরা তাঁদের এই মতের সমর্থনে তিনটি দলীল পেশ করেছেন। প্রথম হচ্ছে হযরত উবাদাহ্ ইবনুস্ সামিত (রা) বর্ণিত, নবী করীম (সা) বলেছেন: خُذُوا عَلَى قَدْ جَعَلَ اللهُ لَهُنَّ سَبِيلاً الْبَكْرُ بِالْبَكْرِ جِلْدُ مِائَةٍ وَ نَفِي سَنَةٍ (মুসলিম আবু দাউদ তিরমিযী)। তোমরা আমার নিকট থেকে গ্রহণ কর, নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা'আলা ওদের জন্য ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। অবিবাহিত-অবিবাহিতার যিনার একশ' দোরা এবং এক বছরের নির্বাসন দণ্ড দিতে হবে।
দ্বিতীয়, হযরত আবূ হুরায়রা (রা) ও যায়দ ইবনে খালিদ (রা) বলেছেন, এক বেদুইন রাসূলে করীম (সা)-এর খেদমতে হাযির হয়ে বলল, আমি আপনার নিকট প্রার্থনা করছি, আপনি আমার জন্য আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফয়সালা করবেন। তখন অপর পক্ষ বলে উঠল—সে তার চাইতে অধিক সমঝদার—হ্যা, আপনি আমাদের দুইজনের মধ্যে আল্লাহ্ কিতাব অনুযায়ী ফয়সালা করে দিন এবং আমাকে ঘটনা বলার অনুমতি দিন। রাসূলে করীম (সা) বললেনঃ হ্যা, বল। তখন সে বলল: আমার পুত্র এই ব্যক্তির ঘরে মজুর হিসাবে কাজে নিয়োজিত ছিল। পরে সে এই ব্যক্তির স্ত্রীর সহিত যিনা করেছে। আমাকে জানানো হয়েছে যে, এই অপরাধের দরুন আমার পুত্রের শাস্তি হচ্ছে 'রজম'। তখন আমি এই শাস্তির বিনিময়ে এই লোকটিকে একশ'টি ছাগল ও একটি বাচ্চা দিয়েছি। পরে আমি শরীয়ত বিজ্ঞ লোকদের নিকট জিজ্ঞাসা করলাম। তাঁরা আমাকে জানালেন যে, আমার পুত্রের শাস্তির একশ'টি দোররা ও এক বছরের নির্বাসন। আর এই ব্যক্তির স্ত্রীর উপর 'রজম'-এর শাস্তি। এই কথা শ্রবণের পর নবী করীম (সা) বললেন: وَ الَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَأَقْضِيَنَّ بَيْنَكُما بِكِتَابِ اللهِ الوَلِيدَةُ وَ الْغَنَمُ رَدُّ عَلَيْكَ وَ عَلَى ابْنِكَ جُلْدُ مِائَةً وَ تَغْرِيبُ عَامٍ وَاعْدُ يَا أَنَيْسُ لِرَجُلٍ مِنْ أَسْلَمَ إِلَى امْرَأَةِ هَذَا فَإِنْ اعْتَرَفَتْ فَارْجِمْهَا। হ্যা, আল্লাহ্র কসম—যাঁর মুষ্টিতে আমার প্রাণ, আমি অবশ্যই তোমাদের দুই জনের মধ্যে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী বিচার করব। তোমার ছাগল ও বাচ্চা তোমাকে ফেরত দেয়া হলো। তোমার পুত্রের শাস্তি হচ্ছে একশটি দোররা ও এক বছর কালের জন্য নির্বাসন। আর হে উনাইস, তুমি কাল সকালেই এই ব্যক্তির স্ত্রীর নিকট যাবে। সে যিনার অপরাধ স্বীকার করলে তাকে 'রজম' করবে।
তৃতীয়: একথা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, হযরত আবূ বকর (রা) দোৱা মারার সাথে সাথে মদীনা থেকে সিরিয়ায় নির্বাসনের দণ্ডও দিয়েছেন। কখনও কখনও অপরাধীকে দোরা মেরে ফিদাক-এর দিকেও নির্বাসিত করেছেন।
দ্বিতীয় মত: দোরার সাথে নির্বাসনের দণ্ড দিতে হবে কেবল পুরুষ যিনাকারীকে, স্ত্রীলোককে নয়। ইমাম মালিক ও ইমাম আওযাঈ এই মত দিয়েছেন। তাঁদের যুক্তি হচ্ছে, স্ত্রীলোককে বিদেশে নির্বাসন দেয়া হলে সে সম্পূর্ণরূপে অরক্ষিত হয়ে যাবে। সে কোথায় থাকবে, কিভাবে দিন কাটাবে, তা একটি কঠিন প্রশ্ন বা সমস্যা হয়ে দেখা দেবে। আর শরীয়তের বিধান মত নির্বাসন দেয়া হলে একজন মুহরিম পুরুষ তার সঙ্গে দিতে হবে। তা না হলে কোন অ-মুহরিম পুরুষের সঙ্গেই তাকে পাঠাতে হবে। তাকে একাকিনী পাঠানোর তো কোন প্রশ্নই উঠে না। কেননা নবী করীম (সা) বলেছেন: রক্তীয় আত্মীয় সঙ্গী ছাড়া কোন মেয়েলোকের পক্ষে একদিন একরাত্রির দূরত্বের বিদেশ সফরে যাওয়া হালাল নয়। এমতাবস্থায় কোন মহিলাকে যদি ব্যভিচারের শাস্তির অংশ হিসাবে নির্বাসন দণ্ডে দণ্ডিত করা হয়, তাহলে এ হাদীস অনুযায়ী তার সাথে এমন এক পুরুষ ব্যক্তিকেও নির্বাসিত করতে হবে, যে ব্যভিচারের অপরাধ করেনি।
তৃতীয় মত: নির্বাসনের দণ্ড দেওয়া ওয়াজিব নয়। না পুরুষকে, না মেয়েলোককে। তবে বিচারক যদি তা প্রয়োজনীয় ও কল্যাণকর মনে করেন, তাহলে তা দেয়া যেতে পারে। এরূপ অবস্থায় নির্বাসনটা হবে তা'যীরী শাস্তি, কোন 'হদ্দ' নয়। ইমাম আবু হানীফা (র) এই মত দিয়েছেন।
tটিকাঃ
১. ইমাম আবূ হায়ান লিখেছেন الزاني والزانية এই শব্দদ্বয়ের শুরুতে 'আলিফ' ও 'লাম' রয়েছে তা নির্দিষ্টকারী যদিও এই দু'টি অক্ষর সাধারণত অনির্দিষ্টকারী অর্থেই ব্যবহৃত হয়।
১. হাদীসটি প্রায় সব কয়খানি হাদীস গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে। দেখুন: ২৯৭ جامع الاصول
১. الترغيب ج ٤
১. জামে'উল উসূল জ ৪ পৃ ২৭৭
২. আল-মুগনী ও আশ-শারহুল কবীর জ ১০ পৃ ১৩৪
📄 যিনার অপরাধ প্রমাণের পদ্ধতি
ইসলামে যিনার অপরাধটি অত্যন্ত কদর্য জঘন্য ও বীভৎসরূপে চিহ্নিত। এই কারণে এ অপরাধের শাস্তিও ভয়াবহ। আর ঠিক এ কারণেই এ অপরাধ প্রমাণের জন্য কঠিনতর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। দুইটির যে কোন একটি ছাড়া এই অপরাধ কোনক্রমেই প্রমাণিত হতে পারে না।
১. অপরাধী নিজেই স্বীয় অপরাধ স্বীকার করবে এবং এই স্বীকৃতি বা স্বীকারোক্তি হতে হবে স্পষ্ট ভাষায় চারবার। বিপুল সংখ্যক শরীয়ত বিশেষজ্ঞই এই মত প্রকাশ করেছেন। তার এই স্বীকারোক্তি হতে হবে মূল কাজটি করার, যেন এ পর্যায়ে এক বিন্দু শোবাহ-সন্দেহের অবকাশ না থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা) মায়েজকে বলেছিলেন, সম্ভবত তুমি শুধু চুম্বন করেছ কিংবা হয়ত ইশারা-ইঙ্গিত করেছ মাত্র অথবা দৃষ্টি বিনিময় করেছ, চেয়ে চেয়ে দেখেছ মাত্র। সে বলল, না, শুধু তা নয়। বললেন, তুমি তাকে ব্যবহার করেছ। বললো, 'হ্যাঁ'। অতপর তাকে 'রজম' করার নির্দেশ দেয়া হয়।
অপর একটি বর্ণনায় হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেছেন, বাক্যের শেষ অংশ ছিল এই ইঙ্গিতপূর্ণ কথাটি: তোমার লিঙ্গ তার যৌনাঙ্গের ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেছে কি? বলল, হ্যাঁ, ঠিক যেমন শলাকা সুর্মাদানীর মধ্যে প্রবেশ করে এবং যেমন বালতির রশি কূপের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায়। জিজ্ঞাসা করলেন, যিনা কাকে বলে, তুমি কি তা জান? বলল, হ্যাঁ আমি স্ত্রীলোকটির সাথে হারামভাবে সেই কাজই করেছি, যা স্বামী তার স্ত্রীর সাথে করে হালালভাবে।
২. যিনার ঘটনার উপর চারজন সাক্ষী প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে সাক্ষ্য দেবে এবং সে সাক্ষ্যদাতাদের বিশ্বাসী ও সত্যবাদী হতে হবে। কুরআন মজীদে বলা হয়েছে: আর যেসব লোক নির্দোষ-সুরক্ষিত চরিত্রবান মহিলাদের উপর মিথ্যা ব্যভিচারের দোষারোপ করে, কিন্তু পরে তা প্রমাণের জন্য তারা চারজন সাক্ষী উপস্থাপিত করে না, তাদের আশিটি দোরা মার। সাক্ষীদের স্পষ্ট ভাষায় বলতে হবে যে, আমরা তার পুরুষাঙ্গকে মেয়েলোকটির স্ত্রী-অঙ্গে প্রবিষ্ট দেখতে পেয়েছি, ঠিক তেমনিভাবে, যেমন করে শলাকা সুর্মাদানীর অভ্যন্তরে এবং রশি কূপের ভেতরে প্রবিষ্ট হয়। উভয়কে শুধু শৃঙ্গাররত, উলঙ্গ, জড়াজড়ি অবস্থায় দেখতে পাওয়াই 'যিনা' প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়।
অন্য কথায়, যিনার জন্য নির্দিষ্ট শাস্তি কার্যকর হতে পারে কেবলমাত্র তখন, যদি নিম্নোক্ত দুইটি ব্যাপারের কোন একটি ঘটে:
প্রথম, যিনাকার ব্যক্তি এতটা নির্লজ্জ, বে-পরোয়া ও অকুণ্ঠ হয়ে এই পাপ কাজে লিপ্ত হবে যে, সে নৈতিকতা ও মানবিকতার নিম্নতম মূল্যমানকেও বিনষ্ট করবে, নিম্নস্তরের নিতান্ত পশুর পর্যায়ে পৌঁছে যাবে এবং জনতার সম্মুখে, পথে-ঘাটে পার্কে এই কাজ করতে শুরু করে দিবে।
দ্বিতীয়, যিনাকারী ব্যক্তি নিজেই উদ্যোগী হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের এই কাজের স্বীকারোক্তি করবে ও সেজন্য নির্দিষ্ট শাস্তি গ্রহণে আগ্রহী হবে নিজকে গুনাহ্ কলুষতা থেকে পবিত্র করা এবং আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা পাওয়ার লক্ষ্যে।
tটিকাঃ
১. বুখারী।
২. আবূ দাউদ।
১. আল মুগনী ও আশ-শারহুল কবীর পৃ ১৭৫