📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 ইমাম গাযালীর ভাষ্য

📄 ইমাম গাযালীর ভাষ্য


‘কল্যাণ আহরণ ও ক্ষতি প্রতিরোধই গোটা সৃষ্টিকর্মের উদ্দেশ্য। সৃষ্টিকর্মের কল্যাণ নিহিত রয়েছে তার উদ্দেশ্য পরিপূরণ ও বাস্তবায়নে। কিন্তু আমরা 'কল্যাণ' বলতে বুঝি শরীয়তের উদ্দেশ্য সংরক্ষণ। আর সৃষ্টিকর্মে শরীয়তের লক্ষ্য হচ্ছে পাঁচটি: মানুষের দীন রক্ষা, তাদের জান-প্রাণ রক্ষা, তাদের বিবেক-বুদ্ধি রক্ষা, তাদের বংশ ও ধন-মাল রক্ষা। অতএব এই পাঁচটি বিষয়ের সংরক্ষণে যে ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হবে, তাই হচ্ছে প্রকৃত কল্যাণ। আর এই পাঁচটি মৌল জিনিস যে কারণেই বিনষ্ট বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাই হচ্ছে বিপর্যয়কারী। এই বিপর্যয় রোধ করা কল্যাণের জন্য অপরিহার্য। এই পাঁচটি মৌল বিষয়ের সংরক্ষণ প্রয়োজন পর্যায়ের বাস্তবতা। কল্যাণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অধিকতর শক্তিশালী হচ্ছে এই পাঁচটি। তার দৃষ্টান্ত, পথ ভ্রষ্টকারী কাফিরকে হত্যা করা শরীয়তের বিচারের ফয়সালা। 'বিদ'আত' প্রচলনের আহ্বানকারী বিদ'আতপন্থীকে শাস্তি দান—ও অনুরূপ। কেননা কুফরী ও বিদ'আত মানুষের দীন বিনষ্টকারী। এ জন্য কিসাস ফরয করা হয়েছে। এই কিসাস কার্যকর করা হলেই মানুষ ধর্মীয় দিক দিয়ে পুরাপুরি সংরক্ষিত হতে পারে। মদ্যপান অপরাধের শাস্তিস্বরূপ 'হদ্দ' বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। কেননা যে বিবেক-বুদ্ধি শরীয়ত পালনের বাধ্যবাধকতার ভিত্তি, তা রক্ষার জন্য এই 'হদ্দ' অপরিহার্য, 'যিনার' 'হদ্দ' ফরয করা হয়েছে মানুষের বংশধারা ও জন্মের বৈধতা-পবিত্রতা রক্ষা এছাড়া সম্ভব নয়। অপহরণকারী ডাকাত ও চোরের জন্যও শাস্তি নির্ধারিত। কেননা মানুষের ধন-মাল জীবিকার মৌল উৎস। তার সংরক্ষণের জন্য এই শাস্তি অপরিহার্য। মানুষ জীবনকাল ব্যাপীই ধন-মালের মুখাপেক্ষী, তার উপর একান্ত ভাবে নির্ভরশীল। এই পাঁচটি বিষয়ের ধ্বংস সাধন হারাম করা হয়েছে। তার প্রতিরোধ ব্যবস্থা তা অসম্ভব বা কঠিন করে তোলে। যেসব শরীয়তের লক্ষ্য মানবতার সার্বিক কল্যাণ, উপরোক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থায় তার প্রত্যেকটি শরীক ও অভিন্ন। আর এই কারণেই তাতে কুফর, মানুষ হত্যা, ব্যভিচার, চুরি-ডাকাতি ও মাদক দ্রব্য পান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 ইসলামের দণ্ড বিধান রহমত বিশেষ

📄 ইসলামের দণ্ড বিধান রহমত বিশেষ


ইসলামে অপরাধের যে শাস্তি বিধান করা হয়েছে, তা বস্তুতই বিশ্ব মানবতার প্রতি অসীম-অশেষ রহমতের প্রতীক। ইসলামের সিরাতুল মুস্তাকীম বর্জনকারীর জন্য এই শাস্তি একান্তই জরুরীরূপে নির্ধারিত। যদি এই ব্যবস্থা করা না হতো, তাহলে অপরাধীরা শরীয়তের সীমালংঘনকারী ফাসিক-ফাযির লোকেরা ভয়ানকভাবে দুঃসাহসী হয়ে উঠত। কেননা এই লোকদের মনে ঈমান স্থান লাভ করেনি। নির্লজ্জতা ও পাপকার্য সম্পাদন ও হারাম করা জিনিসগুলির মর্যাদা বিনষ্টকরণ থেকে তাদের বিরত রাখার মত কোন শক্তিই তাদের ভিতরে বর্তমান নেই। এমতাবস্থায় অপরাধের শাস্তির ব্যবস্থা না থাকলে তারা তো পৃথিবীতে চরম বিপর্যয় সৃষ্টি করত। মানুষ পরস্পরকে ধ্বংস করত, বিশ্ব ব্যবস্থা ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে দিত। তখন দুনিয়ার পশু ও জন্তু-জানোয়ারের তুলনায়ও অধিক খারাপ হয়ে পড়ত মানুষের অবস্থা। এই কথার সত্যতা স্বাভাবিকভাবেই সর্বজনজ্ঞাত ও স্বীকৃত।

আল্লাহ্ তা'আলা যেসব শাস্তি বিধিবদ্ধ করেছেন এবং বিভিন্ন অপরাধের জন্য সাব্যস্ত করেছেন, বাহ্যত তাতে যদিও অপরাধীকে কষ্টদান করা হয়; কিন্তু আসলে কষ্ট বা পীড়াদানই তার প্রকৃত বা চরম লক্ষ্য নয়। আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে এই শাস্তি কার্যকরকরণের ফলে ইসলামী সমাজে যে সার্বিক কল্যাণ বাস্তবায়িত হয় তা। এই কল্যাণের বড় দিক হচ্ছে অন্যায় যুলুম ও বিপর্যয়ের বিস্তার ও ব্যাপকতা প্রতিরোধ এবং আল্লাহ্ হারাম ঘোষিত জিনিসগুলির মর্যাদা বিনষ্ট করার প্রবণতার নির্মূল সাধন। কারোর প্রতি নির্মমতা প্রদর্শন বা কারোর উপর থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ কিন্তু তার লক্ষ্য নয় আদৌ। বস্তুত এই শাস্তি হচ্ছে রোগ প্রতিরোধক ও প্রতিষেধক ঔষধ বিশেষ। জীবন রক্ষার জন্য যেমন পচে যাওয়া অঙ্গ কেটে ফেলা অপরিহার্য হয়ে পড়ে এ-ও ঠিক তেমনি।

টিকাঃ
১. اختيارات ان تيميه ص ۲৮৮
২. القواعد الكبرى ج ১ ص - ১২; فلسفة العقوبة الفقه الاسلامي

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 শাস্তি যার হয়, তার জন্য তা কাফফারা

📄 শাস্তি যার হয়, তার জন্য তা কাফফারা


ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধের যে শাস্তি দেওয়া হয়, তা অপরাধীকে পবিত্র পরিশুদ্ধ করে, তার গুনাহ্ ধুয়ে-মুছে ফেলে এবং তাকে পরকালীন আযাব থেকে রক্ষা করে। ইমাম বুখারী তাঁর হাদীসগ্রন্থে একটি শিরোনাম দিয়েছেন:

بابُ الْحُدُودِ كَفَّارَةُ لَمَنْ أَقِيمَتْ عَلَيْهِ

'হদ্দ' যার উপর কার্যকর হয়, তার জন্য তা কাফ্ফারার কাজ করে—এই সংক্রান্ত হাদীসের অধ্যায়।

এই অধ্যায়েরই একটি হাদীস হযরত ইবাদাহ্ ইবনুস সামেত (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমরা একদা রাসূলে করীম (সা)-এর নিকট এক বৈঠকে বসা ছিলাম। তখন তিনি বললেন: 'তোমরা আমার নিকট 'বায়'আত কর এই কথায় যে, তোমরা আল্লাহ্র সহিত এক বিন্দু শির্ক করবে না, তোমরা চুরি করবে না, তোমরা ব্যভিচার করবে না—এই আয়াতটি সম্পূর্ণ পাঠ করলেন। অতঃপর বললেন: তোমাদের যে লোকই এই 'বায়'আত পূর্ণ কার্যকর করবে, তার শুভ প্রতিফল দেওয়া আল্লাহ্র দায়িত্ব। আর যে লোক এর কোন একটা লংঘন করবে এবং সেজন্য সে শাস্তিপ্রাপ্ত হবে, তার জন্য এই শাস্তি কাফ্ফারাস্বরূপ হবে।' আর যদি কেউ এর কোন দিক লংঘন করা সত্ত্বেও আল্লাহ্ তা গোপন করে রাখেন, তাহলে তার এই ব্যাপারটি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্র নিকট সোপর্দ থাকবে। তিনি ইচ্ছা করলে মাফ করে দিবেন, আর ইচ্ছা করলে সে জন্য আযাব দিবেন। হযরত আলী (রা) নবী করীম (সা)-এর এই কথাটি বর্ণনা করেছেন:

مَنْ أَصَابَ حَدًّا فَعُجِّلَ عُقُوْبَتَهُ فِي الدُّنْيَا فَاللَّهُ أَعْدَلُ مِنْ أَنْ يُثْنِيَ عَلَى عَبْدِهِ الْعَقُوبَةَ فِي الآخِرَةِ وَ مَنْ أَصَابَ حَدًّا فَسَتَرَهُ اللهُ عَلَيْهِ وَعَفَا عَنْهُ فَاللَّهُ أَكْرَمُ مِنْ أَنْ يَعُودَنِي شَيْءٍ قَدْ عَفَا عَنْهُ -

যে লোক 'হদ্দ' হওয়ার কোন অপরাধ করল, পরে দুনিয়ায়ই তার শাস্তি কার্যকর হলো, আল্লাহ্ পরকালেও দ্বিতীয়বার তাঁর বান্দাকে আযাব দিবেন—তার চাইতে অনেক বেশি সুবিচারক তিনি। আর যে লোক 'হদ্দ' হওয়ার মত কোন অপরাধ করলেন, কিন্তু আল্লাহ্ তা গোপন করে রাখলেন, তাকে তা ক্ষমা করে দিলেন, ফলে এই ক্ষমা করা অপরাধের শাস্তির পুনরাবৃত্তি করবে—তার চাইতে তিনি অনেক বেশি মেহেরবান।

মায়েয ও গামেদীয়ার ঘটনার ভিত্তিতে কোন কোন মুসলিম মনীষী উপরোক্ত মত প্রকাশ করেছেন। তাঁরা আল্লাহ্র অসন্তুষ্টির ভয় এবং দুনিয়ার আযাব পরকালীন আযাবের তুলনায় অনেক হাল্কা ও সহজ—এই বিবেচনার কারণে যিনার অপরাধ করে নিজেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছিলেন এবং তাদের উপর 'হদ্দ' কার্যকর করা হোক বলে দাবি জানিয়েছিলেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, মায়েয আসলামী রাসূলে করীম (সা)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে যিনা করার অপরাধ চারবার স্বীকার করেন। প্রত্যেকবারই তিনি (নবী করীম) মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নেন। পঞ্চমবার তিনি তার দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করলেন: ঠিক যেমন কলম কালির দোয়াতে প্রবেশ করেন, বালতির রশি যেমন করে কূপের মধ্যে নেমে যায় ঠিক সেই রকমেরই ঘটনা ঘটেছে কি? মায়েয বললেন, হ্যাঁ। জিজ্ঞাসা করলেন: যিনা কাকে বলে তা তুমি বোঝ কি? বললেন, হ্যাঁ, আমি তা করেছি হারামভাবে, যেমন অন্য লোকেরা নিজ স্ত্রীর সাথে করে হালালভাবে! জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি এই খবর দিচ্ছ কেন, কি চাও? বললেন, আমি চাই, আমাকে এই নাপাকি থেকে মুক্ত ও পবিত্র করা হোক।' অতঃপর তাকে 'রজম' করা হয়। তখন নবী করীম (সা) নিজে শুনতে পেলেন, তাঁর দুইজন সাহাবী বলাবলি করছেন; এই লোকটির তামাসা দেখ, আল্লাহ্ তো তার পাপ গোপন রেখেছিলেন; কিন্তু সে নিজেকে ক্ষমা করল না, রজম করা হলো, যেমন 'রজম' করা হয় কুত্তাকে। তখন রাসূলে করীম (সা) নির্বাক থাকলেন, পরে একটি গাধার পা উঠানো লাশ দেখতে পেয়ে বললেন, সেই লোক দুইজন কোথায়? তাঁরা বললেন, আমরাই সেই দুইজন লোক। বললেন; 'তোমরা এই গাধার লাশ ভক্ষণ কর, যাও।' তাঁরা বললেন, 'হে রাসূল! গাধার লাশ কে খাবে?' বললেন, 'তাহলে তোমরা দুইজন কিছুক্ষণ পূর্বে যে তোমাদের ভাইয়ের ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করলে, তা তো মরা গাধার গোস্ত খাওয়া থেকেও নিকৃষ্ট। অতঃপর তিনি বললেন:

وَ الَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّهُ الآنَ كَفِي انْهَارِ الْجَنَّةِ يَنْغَمِسُ فِيهَا .

আল্লাহ্র কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, সে (মায়েয) তখন নিশ্চয়ই জান্নাতের ঝর্ণায় সাঁতার কাটছে।

টিকাঃ
১. কাফ্ফারা হওয়ার অর্থ, এই শাস্তি ভোগের কারণে আল্লাহ্র নিকট তার গুনাহ্ মাফ হয়ে যাবে। পরকালে সেজন্য কোন আযাব ভোগ করতে হবে না।
২. ফতহুল বারী জ ১২ পৃঃ ৮৪
৩. জামে'উল উসূল জ ১ পৃঃ ৩৪৯, তিরমিযী।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 ‘হদ্দ’ কার্যকর হওয়া অপরিহার্য কর্তব্য

📄 ‘হদ্দ’ কার্যকর হওয়া অপরিহার্য কর্তব্য


যে অপরাধের 'হদ্দ' রয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হওয়ার পর অপরাধীর উপর তা অবশ্যই কার্যকর করতে হবে। সে শক্তিমান হোক, কি দুর্বল, উঁচু বংশজাত—সম্ভ্রান্ত হোক, কি নীচ জাত অসম্ভ্রান্ত এবং পুরুষ হোক, কি নারী। এই ব্যাপারে কোনরূপ দুর্বলতা দেখানো বা তা বিলম্বিতকরণ অথবা আল্লাহ্র আইন কার্যকরকরণে কোনরূপ দয়া নম্রতার কারণে 'হদ্দ' প্রত্যাহার করার অধিকার কারোর নেই। কেননা 'হদ্দ' কার্যকর করা ইবাদতের মধ্যে গণ্য কাজ। আল্লাহর বান্দাদের প্রতি তাঁর বিশেষ অনুগ্রহও বটে। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা) বলেছেনঃ

حَدٌّ يَعْمَلُ بِهِ فِي الْأَرْضِ خَيْرٌ لَأَهْلِ الْأَرْضِ مِنْ أَنْ يُمْطَرُوا ارْبَعِينَ صَبَاحًا

যে দেশে শরীয়তের 'হদ্দ' কার্যকর হয়, সে দেশের জনগণের জন্য তা ক্রমাগত চল্লিশ দিনের সকাল বেলায় বৃষ্টির তুলনায় অনেক কল্যাণকর। হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন:

مَا خُيِّرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَসَلَّمَ بَيْنَ أَمْرَيْنِ إِلَّا اخْتَارَ أَيْسَرَهُمَا مَا لَمْ يَأْثِمْ فَإِذَا كَانَ الإِثْمُ كَانَ أَبْعَدَهُمَا مِنْهُ وَ اللهُ مَا انْتَقَمَ لِنَفْسِهِ فِي شَيْءٍ يُؤْتَى إِلَيْهِ قَطُّ حَتَّى تُنْتَهَكَ حُرُمَاتِ اللهِ فَيَنْتَقِمُ لِلَّهِ .

নবী করীম (সা)-কে যখনই কোন দুইটি ব্যাপারের মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণের ইখতিয়ার দেওয়া হয়েছে, তিনি তন্মধ্যে সহজতম জিনিসটি গ্রহণ করেছেন যদি তাতে গুনাহ্ হওয়ার আশংকা না থাকে। যদি সেটিতে গুনাহ্ হওয়ার আশংকা দেখা দিত, তাহলে তা থেকে অনেক দূরে সরে থাকতেন। আল্লাহ্ নামের শপথ, রাসূলে করীম (সা) নিজের জন্য কোন বিষয়েরই প্রতিশোধ গ্রহণ করেন নি, যা তাঁর সম্মুখবর্তী হয়েছে। তবে আল্লাহ্র মর্যাদা বিনষ্টকারী কিছু হলে তিনি তার প্রতিশোধ অবশ্যই নিয়েছেন।

হযরত নু'মান ইবনে বশীর (রা) নবী করীম (সা)-এর এই কথাটি বর্ণনা করেছেন:

مَثَلُ الْقَائِمِ فِي حُدُودِ اللَّهِ وَ الْوَاقِعِ فِيْهَا كَمَثَلِ قَوْمٍ اسْتَهَمُوا عَلَى سَفِينَةٍ فَصَارَ بَعْضُهُمْ أَعْلَاهَا وَ بَعْضُهُمْ أَسْفَلَهَا فَكَانَ الَّذِينَ فِي اسْفَلِهَا إِذَا اسْتَقَوْا مِنَ الْمَاءِ مَرُّوا مِنْ فَوْقِهِمْ فَقَالُوا : لَوْ أَنَّا خَرَقْنَا فِي نَصِيبِنَا خَرَقًا وَ لَمْ نُؤْذِ مَنْ فَوْقَنَا فَإِنْ تَرَكُوْهُمْ وَ مَا أَرَدُوا هَلَكُوا وَ إِنْ أَخَذُوا عَلَى أَيْدِيهِمْ نَجُوا وَ نَجَوْا جَمِيعًا .

আল্লাহর চিহ্নিত সীমার মধ্যে স্থিতিশীল এবং সীমালংঘনকারীদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমন কিছু লোকের মত। যারা একটি নৌকায় আরোহী হয়েছে। তাদের কিছু লোক উপর তলায় এবং অপর কিছু লোক নিচের তলায় অবস্থান নিল। যারা নিচের তলায় অবস্থান নিয়েছিল তারা পানির সন্ধানে উপরে উপবিষ্ট লোকদের মধ্যে যাতায়াত শুরু করে দিল। তাতে উপরের লোকেরা বিরক্তি বোধ করল। তখন নিচে অবস্থানকারী লোকেরা বলল, আমরা যদি আমাদের অংশে নৌকার তলা দীর্ণ করে প্রয়োজনীয় পানি নেই, তাহলে উপরের লোকদের কষ্ট দেওয়ার আর কোনই প্রয়োজন থাকবে না। এইরূপ অবস্থায় যদি তাদেরকে ছেড়ে দেয় ও তারা তাদের ইচ্ছামত কাজ করতে থাকে, তাহলে তারা সকলেই ধ্বংস হবে আর তাদের যদি পাকড়াও করে তা থেকে বিরত রাখে, তাহলে তারা নিজেরাও বাঁচবে এবং অন্য সকলকেও বাঁচাবে।

এ হাদীসের আলোকে এ নীতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, শরীয়ত লংঘনকারীদের সীমার মধ্যে ঠেকিয়ে রাখা, তাদের বিদ্রোহ দমন করা ও পাপ-নাফরমানী প্রতিরোধ করা একান্তই আবশ্যক। অবশ্য পাপ-নাফরমানী যদি গোপন থাকে, তাহলে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু তা যদি ব্যাপক প্রকাশ লাভ করে ও তা প্রতিরোধ করা না হয়, তাহলে তা একটা সাধারণ ব্যাধি হয়ে দেখা দেয়। এই কারণেই আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেনঃ وَ اتَّقُوْا فِتْنَةً لَا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْكُمْ خَاصَّةً (তোমরা সেই বিপদকে অবশ্যই ভয় করবে, যা তোমাদের মধ্যকার শুধু জালিমদেরই বিপন্ন করবে না বরং সাধারণভাবে সমস্ত মানুষই বিপন্ন হয়ে পড়বে।) -সূরা আনফালঃ ২৫

বস্তুত আল্লাহ্ নির্ধারিত শাস্তি (হদ্দ) কার্যকর করার ক্ষেত্রে তা মামলারূপে কর্তৃপক্ষের গোচরীভূত হওয়ার পর কোনরূপ শাফা'আত বা সুপারিশ করা এবং সেই সুপারিশ গ্রহণ সম্পূর্ণ হারাম বলে সমস্ত শরীয়ত বিশেষজ্ঞ একমত হয়েছেন। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর ইবনুল আ'স (রা) বর্ণনা করেছেন: রাসূলে করীম (সা) ইরশাদ করেছেনঃ

تَعَافُوا الْحُدُودَ فِيْمَا بَيْنَكُمْ فَمَا بَلَغَنِي مِنْ حَدٌ فَقَدْ وَجَبَ

তোমরা হদ্দ কার্যকর হওয়ার যোগ্য অপরাধ পারস্পরিক পর্যায়ে ক্ষমা করতে পার। কিন্তু এই ধরনের অপরাধের অভিযোগ আমার নিকট পেশ করা হলে তা অবশ্যই কার্যকর হবে।

কিন্তু এই আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর (রা) রাসূলে করীম (সা)-এর এই হাদীসটিও বর্ণনা করেছেন:

مَنْ حَالَتْ شَفَاعَتُهُ دُونَ حَدُ مِنْ حُدُودِ اللهِ فَقَدْ ضَادَّ اللَّهُ فِي أَمْرِهِ

আল্লাহ্ নির্ধারিত শাস্তিসমূহরে মধ্যে কোন একটি শাস্তির পথে যদি কারোর সুপারিশ বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সে আল্লাহ্ বিধান কার্যকর হওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল।

হযরত উসমান (রা) বলেছেন:

إِذَا بَلَغَتِ الْحُدُودُ السُّلْطَانَ فَلَعَنَ اللَّهُ الشَّافِعَ وَ الْمُشَفْعَ

'হদ্দ' যোগ্য অপরাধের অভিযোগ কর্তৃপক্ষের গোচরীভূত হওয়ার পর তাতে সুপারিশকারী ও যার জন্য সুপারিশ করা হয় উভয়ের উপর আল্লাহ্র অভিশাপ। মাখযুমীয়ার ব্যাপারে হযরত উসামা সুপারিশ করলে নবী করীম (সা) তা প্রত্যাখান করলেন। হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেছেন: মাখযুমীয়া নারীটি চুরি করে ধরা পড়লে কুরায়শরা খুব চিন্তিত হয়ে পড়লো। রাসূলের নিকট এই ব্যাপারে কে সুপারিশ করবে তা নিয়ে আলোচনায় স্পষ্ট হলো যে, রাসূলের প্রিয় ব্যক্তি উসামা ছাড়া এই কাজ আর কারোর দ্বারা সম্ভব নয়। তিনি এই ব্যাপারে রাসূলে করীম (সা)-এর সাথে কথা বলায় তিনি ধমকের সুরে বললেন:

اتَشْفَعُ فِي حَدٌ مِّنْ حُدُودِ اللَّهِ ؟

আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি কার্যকরকণের ব্যাপারে 'তুমি সুপারিশ করছ?' পরে তিনি ভাষণ দান প্রসঙ্গে বললেন:

أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّمَا ضَلَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ إِذَا سَرَقَ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ وَ إِذَا سَرَقَ الضَّعِيفُ فِيهِمْ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ وَ ايْمُ اللهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتُ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَّعَ مُحَمَّدٌ يدها

হে জনগণ! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এই নীতির অনুসারী ছিল যে, তাদের মধ্য থেকে কোন ভদ্র ব্যক্তি চুরি করলে এমনিই তাকে নিষ্কৃতি দিত। আর কোন হীন, দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তারা তার হাত কেটে দিত। (এই নীতি ন্যায়বাদ পরিপন্থী) আল্লাহ্র কসম! মুহাম্মদ-তনয়া ফাতিমাও যদি চুরি করে, তাহলে মুহাম্মদ তার হাত অবশ্যই কেটে ফেলবে।

হযরত সফওয়ান ইবনে উমাইয়া চাদরমুড়ি দিয়ে মসজিদে নববীতে ঘুমিয়েছিলেন। চোর এসে তাঁর চাদরখানি চুরি করে নিয়ে যায়। পরে সে ধরা পড়লে রাসূলে করীম (সা)-এর দরবারে নীত হয়। তিনি এই অপরাধে তার হাত কাটার হুকুম দেন। তখন সফওয়ান বললেন, ইয়া রাসূল! আমি তো তা চাইনি। আমি চাদরখানি চোরকে দান করে দিলাম। তখন রাসূলে করীম (সা) বললেনঃ

فَهَلَا قَبْلَ لَنْ تَأْتِيْنِي بِهِ

অপরাধীকে আমার নিকট পেশ করার পূর্বে তুমি কেন তাকে ক্ষমা করলে না? আল্লাহ্ বিধিবদ্ধ করা 'হদ্দ' কার্যকর করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যে তা করে না, সে তো আল্লাহ্ ও রাসূলের সহিত লড়াই করে। কুরআন মজীদের আয়াতে এই কথা অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে বলা হয়েছে:

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا .

না, তোমার প্রভু-প্রতিপালকের কসম! ওরা কেউই ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না ওরা তোমাকে নিজেদের পারস্পরিক ব্যাপারে চূড়ান্ত ফয়সালাকারী হিসাবে মেনে নেবে এবং পরে তোমার ফয়সালার ব্যাপারে তাদের মনে কোনরূপ দ্বিধা পাবে না ও তোমার ফয়সালাকে অকুণ্ঠিত চিত্তে মেনে নেবে।

টিকাঃ
১. 'রজম' দণ্ডটির উল্লেখ কুরআনের পরিবর্তে 'মুতাওয়াতির' হাদীসে বিধৃত। রাসূলে করীম (সা) ও গোটা মুসলিম উম্মাত এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত-ইজমা।

ফন্ট সাইজ
15px
17px