📄 শাস্তিদানের চূড়ান্ত লক্ষ্য
আল্লাহ্ তা'আলা অপরাধের শাস্তিদানের চূড়ান্ত বিধান করেছেন অপরাধ প্রবণতা, হীনতা-নীচতা ও দুষ্কৃতি প্রতিরোধ, সমাজকে সকল প্রকার বিপর্যয় গুনাহ্-নাফরমানী থেকে রক্ষা এবং মানুষের মৌলিক কল্যাণে প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে। আল্লাহ্র নিকট থেকে অবতীর্ণ সকল কালের সকল শরীয়ত যে পাঁচটি বিষয়ের সংরক্ষণে সম্পূর্ণ একমত, ইসলামী শরীয়তেরও লক্ষ্য সেই পাঁচটি জিনিসের সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান। সে পাঁচটি বিষয় হচ্ছে, দীন সংরক্ষণ, জান-প্রাণ রক্ষা, বিবেক-বুদ্ধি সংরক্ষণ, বংশ রক্ষা ও ধন-মান রক্ষা। এই পাঁচটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজনরূপেও চিহিত। কেননা এই কয়টি বিষয়ের যথাযথ বর্তমানতা ছাড়া মানুষের জীবন ও কল্যাণ অচিন্তনীয়। এই কয়টি বিষয় যাতে সম্পূর্ণ সংরক্ষিত থাকে, এর কোন একটি ক্ষেত্রেও সীমালংঘন না হয়—যে তার সীমালংঘন করতে উদ্যত হবে বা তা স্পর্শও করবে, কাউকে একবিন্দু ক্ষতিগ্রস্ত করবে তাকে অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে—যাতে ভবিষ্যতে আর এমন কাজ না করে। আল্লাহ্ তা'আলা এই পর্যায়ের অপরাধে শাস্তির বিধান করার লক্ষ্য হিসাবে এই প্রতিরোধক কারণেরই উল্লেখ করেছেন এবং উপযুক্ত ও কার্যকর প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিয়েছেন। যিনার 'হদ্দ' নির্দিষ্ট করা হয়েছে মানুষের বংশ বিকৃত বা বিনষ্ট করার পদক্ষেপ থেকে মানুষকে বিরত রাখার লক্ষ্যে, চুরি ও ডাকাতি অপরাধের শাস্তি বিধান করা হয়েছে জনগণের জান-মালের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যে। মানুষের মান-সম্মান ও ইজ্জত-আবরু সংরক্ষণের জন্য কযফের 'হদ্দ' ঘোষিত হয়েছে এবং মানুষের বিবেক-বুদ্ধির সুস্থতা রক্ষার লক্ষ্যে মদ্যপান অপরাধেরও শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
📄 ইমাম গাযালীর ভাষ্য
‘কল্যাণ আহরণ ও ক্ষতি প্রতিরোধই গোটা সৃষ্টিকর্মের উদ্দেশ্য। সৃষ্টিকর্মের কল্যাণ নিহিত রয়েছে তার উদ্দেশ্য পরিপূরণ ও বাস্তবায়নে। কিন্তু আমরা 'কল্যাণ' বলতে বুঝি শরীয়তের উদ্দেশ্য সংরক্ষণ। আর সৃষ্টিকর্মে শরীয়তের লক্ষ্য হচ্ছে পাঁচটি: মানুষের দীন রক্ষা, তাদের জান-প্রাণ রক্ষা, তাদের বিবেক-বুদ্ধি রক্ষা, তাদের বংশ ও ধন-মাল রক্ষা। অতএব এই পাঁচটি বিষয়ের সংরক্ষণে যে ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হবে, তাই হচ্ছে প্রকৃত কল্যাণ। আর এই পাঁচটি মৌল জিনিস যে কারণেই বিনষ্ট বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাই হচ্ছে বিপর্যয়কারী। এই বিপর্যয় রোধ করা কল্যাণের জন্য অপরিহার্য। এই পাঁচটি মৌল বিষয়ের সংরক্ষণ প্রয়োজন পর্যায়ের বাস্তবতা। কল্যাণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অধিকতর শক্তিশালী হচ্ছে এই পাঁচটি। তার দৃষ্টান্ত, পথ ভ্রষ্টকারী কাফিরকে হত্যা করা শরীয়তের বিচারের ফয়সালা। 'বিদ'আত' প্রচলনের আহ্বানকারী বিদ'আতপন্থীকে শাস্তি দান—ও অনুরূপ। কেননা কুফরী ও বিদ'আত মানুষের দীন বিনষ্টকারী। এ জন্য কিসাস ফরয করা হয়েছে। এই কিসাস কার্যকর করা হলেই মানুষ ধর্মীয় দিক দিয়ে পুরাপুরি সংরক্ষিত হতে পারে। মদ্যপান অপরাধের শাস্তিস্বরূপ 'হদ্দ' বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। কেননা যে বিবেক-বুদ্ধি শরীয়ত পালনের বাধ্যবাধকতার ভিত্তি, তা রক্ষার জন্য এই 'হদ্দ' অপরিহার্য, 'যিনার' 'হদ্দ' ফরয করা হয়েছে মানুষের বংশধারা ও জন্মের বৈধতা-পবিত্রতা রক্ষা এছাড়া সম্ভব নয়। অপহরণকারী ডাকাত ও চোরের জন্যও শাস্তি নির্ধারিত। কেননা মানুষের ধন-মাল জীবিকার মৌল উৎস। তার সংরক্ষণের জন্য এই শাস্তি অপরিহার্য। মানুষ জীবনকাল ব্যাপীই ধন-মালের মুখাপেক্ষী, তার উপর একান্ত ভাবে নির্ভরশীল। এই পাঁচটি বিষয়ের ধ্বংস সাধন হারাম করা হয়েছে। তার প্রতিরোধ ব্যবস্থা তা অসম্ভব বা কঠিন করে তোলে। যেসব শরীয়তের লক্ষ্য মানবতার সার্বিক কল্যাণ, উপরোক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থায় তার প্রত্যেকটি শরীক ও অভিন্ন। আর এই কারণেই তাতে কুফর, মানুষ হত্যা, ব্যভিচার, চুরি-ডাকাতি ও মাদক দ্রব্য পান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে।
📄 ইসলামের দণ্ড বিধান রহমত বিশেষ
ইসলামে অপরাধের যে শাস্তি বিধান করা হয়েছে, তা বস্তুতই বিশ্ব মানবতার প্রতি অসীম-অশেষ রহমতের প্রতীক। ইসলামের সিরাতুল মুস্তাকীম বর্জনকারীর জন্য এই শাস্তি একান্তই জরুরীরূপে নির্ধারিত। যদি এই ব্যবস্থা করা না হতো, তাহলে অপরাধীরা শরীয়তের সীমালংঘনকারী ফাসিক-ফাযির লোকেরা ভয়ানকভাবে দুঃসাহসী হয়ে উঠত। কেননা এই লোকদের মনে ঈমান স্থান লাভ করেনি। নির্লজ্জতা ও পাপকার্য সম্পাদন ও হারাম করা জিনিসগুলির মর্যাদা বিনষ্টকরণ থেকে তাদের বিরত রাখার মত কোন শক্তিই তাদের ভিতরে বর্তমান নেই। এমতাবস্থায় অপরাধের শাস্তির ব্যবস্থা না থাকলে তারা তো পৃথিবীতে চরম বিপর্যয় সৃষ্টি করত। মানুষ পরস্পরকে ধ্বংস করত, বিশ্ব ব্যবস্থা ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে দিত। তখন দুনিয়ার পশু ও জন্তু-জানোয়ারের তুলনায়ও অধিক খারাপ হয়ে পড়ত মানুষের অবস্থা। এই কথার সত্যতা স্বাভাবিকভাবেই সর্বজনজ্ঞাত ও স্বীকৃত।
আল্লাহ্ তা'আলা যেসব শাস্তি বিধিবদ্ধ করেছেন এবং বিভিন্ন অপরাধের জন্য সাব্যস্ত করেছেন, বাহ্যত তাতে যদিও অপরাধীকে কষ্টদান করা হয়; কিন্তু আসলে কষ্ট বা পীড়াদানই তার প্রকৃত বা চরম লক্ষ্য নয়। আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে এই শাস্তি কার্যকরকরণের ফলে ইসলামী সমাজে যে সার্বিক কল্যাণ বাস্তবায়িত হয় তা। এই কল্যাণের বড় দিক হচ্ছে অন্যায় যুলুম ও বিপর্যয়ের বিস্তার ও ব্যাপকতা প্রতিরোধ এবং আল্লাহ্ হারাম ঘোষিত জিনিসগুলির মর্যাদা বিনষ্ট করার প্রবণতার নির্মূল সাধন। কারোর প্রতি নির্মমতা প্রদর্শন বা কারোর উপর থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ কিন্তু তার লক্ষ্য নয় আদৌ। বস্তুত এই শাস্তি হচ্ছে রোগ প্রতিরোধক ও প্রতিষেধক ঔষধ বিশেষ। জীবন রক্ষার জন্য যেমন পচে যাওয়া অঙ্গ কেটে ফেলা অপরিহার্য হয়ে পড়ে এ-ও ঠিক তেমনি।
টিকাঃ
১. اختيارات ان تيميه ص ۲৮৮
২. القواعد الكبرى ج ১ ص - ১২; فلسفة العقوبة الفقه الاسلامي
📄 শাস্তি যার হয়, তার জন্য তা কাফফারা
ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধের যে শাস্তি দেওয়া হয়, তা অপরাধীকে পবিত্র পরিশুদ্ধ করে, তার গুনাহ্ ধুয়ে-মুছে ফেলে এবং তাকে পরকালীন আযাব থেকে রক্ষা করে। ইমাম বুখারী তাঁর হাদীসগ্রন্থে একটি শিরোনাম দিয়েছেন:
بابُ الْحُدُودِ كَفَّارَةُ لَمَنْ أَقِيمَتْ عَلَيْهِ
'হদ্দ' যার উপর কার্যকর হয়, তার জন্য তা কাফ্ফারার কাজ করে—এই সংক্রান্ত হাদীসের অধ্যায়।
এই অধ্যায়েরই একটি হাদীস হযরত ইবাদাহ্ ইবনুস সামেত (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমরা একদা রাসূলে করীম (সা)-এর নিকট এক বৈঠকে বসা ছিলাম। তখন তিনি বললেন: 'তোমরা আমার নিকট 'বায়'আত কর এই কথায় যে, তোমরা আল্লাহ্র সহিত এক বিন্দু শির্ক করবে না, তোমরা চুরি করবে না, তোমরা ব্যভিচার করবে না—এই আয়াতটি সম্পূর্ণ পাঠ করলেন। অতঃপর বললেন: তোমাদের যে লোকই এই 'বায়'আত পূর্ণ কার্যকর করবে, তার শুভ প্রতিফল দেওয়া আল্লাহ্র দায়িত্ব। আর যে লোক এর কোন একটা লংঘন করবে এবং সেজন্য সে শাস্তিপ্রাপ্ত হবে, তার জন্য এই শাস্তি কাফ্ফারাস্বরূপ হবে।' আর যদি কেউ এর কোন দিক লংঘন করা সত্ত্বেও আল্লাহ্ তা গোপন করে রাখেন, তাহলে তার এই ব্যাপারটি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্র নিকট সোপর্দ থাকবে। তিনি ইচ্ছা করলে মাফ করে দিবেন, আর ইচ্ছা করলে সে জন্য আযাব দিবেন। হযরত আলী (রা) নবী করীম (সা)-এর এই কথাটি বর্ণনা করেছেন:
مَنْ أَصَابَ حَدًّا فَعُجِّلَ عُقُوْبَتَهُ فِي الدُّنْيَا فَاللَّهُ أَعْدَلُ مِنْ أَنْ يُثْنِيَ عَلَى عَبْدِهِ الْعَقُوبَةَ فِي الآخِرَةِ وَ مَنْ أَصَابَ حَدًّا فَسَتَرَهُ اللهُ عَلَيْهِ وَعَفَا عَنْهُ فَاللَّهُ أَكْرَمُ مِنْ أَنْ يَعُودَنِي شَيْءٍ قَدْ عَفَا عَنْهُ -
যে লোক 'হদ্দ' হওয়ার কোন অপরাধ করল, পরে দুনিয়ায়ই তার শাস্তি কার্যকর হলো, আল্লাহ্ পরকালেও দ্বিতীয়বার তাঁর বান্দাকে আযাব দিবেন—তার চাইতে অনেক বেশি সুবিচারক তিনি। আর যে লোক 'হদ্দ' হওয়ার মত কোন অপরাধ করলেন, কিন্তু আল্লাহ্ তা গোপন করে রাখলেন, তাকে তা ক্ষমা করে দিলেন, ফলে এই ক্ষমা করা অপরাধের শাস্তির পুনরাবৃত্তি করবে—তার চাইতে তিনি অনেক বেশি মেহেরবান।
মায়েয ও গামেদীয়ার ঘটনার ভিত্তিতে কোন কোন মুসলিম মনীষী উপরোক্ত মত প্রকাশ করেছেন। তাঁরা আল্লাহ্র অসন্তুষ্টির ভয় এবং দুনিয়ার আযাব পরকালীন আযাবের তুলনায় অনেক হাল্কা ও সহজ—এই বিবেচনার কারণে যিনার অপরাধ করে নিজেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছিলেন এবং তাদের উপর 'হদ্দ' কার্যকর করা হোক বলে দাবি জানিয়েছিলেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, মায়েয আসলামী রাসূলে করীম (সা)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে যিনা করার অপরাধ চারবার স্বীকার করেন। প্রত্যেকবারই তিনি (নবী করীম) মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নেন। পঞ্চমবার তিনি তার দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করলেন: ঠিক যেমন কলম কালির দোয়াতে প্রবেশ করেন, বালতির রশি যেমন করে কূপের মধ্যে নেমে যায় ঠিক সেই রকমেরই ঘটনা ঘটেছে কি? মায়েয বললেন, হ্যাঁ। জিজ্ঞাসা করলেন: যিনা কাকে বলে তা তুমি বোঝ কি? বললেন, হ্যাঁ, আমি তা করেছি হারামভাবে, যেমন অন্য লোকেরা নিজ স্ত্রীর সাথে করে হালালভাবে! জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি এই খবর দিচ্ছ কেন, কি চাও? বললেন, আমি চাই, আমাকে এই নাপাকি থেকে মুক্ত ও পবিত্র করা হোক।' অতঃপর তাকে 'রজম' করা হয়। তখন নবী করীম (সা) নিজে শুনতে পেলেন, তাঁর দুইজন সাহাবী বলাবলি করছেন; এই লোকটির তামাসা দেখ, আল্লাহ্ তো তার পাপ গোপন রেখেছিলেন; কিন্তু সে নিজেকে ক্ষমা করল না, রজম করা হলো, যেমন 'রজম' করা হয় কুত্তাকে। তখন রাসূলে করীম (সা) নির্বাক থাকলেন, পরে একটি গাধার পা উঠানো লাশ দেখতে পেয়ে বললেন, সেই লোক দুইজন কোথায়? তাঁরা বললেন, আমরাই সেই দুইজন লোক। বললেন; 'তোমরা এই গাধার লাশ ভক্ষণ কর, যাও।' তাঁরা বললেন, 'হে রাসূল! গাধার লাশ কে খাবে?' বললেন, 'তাহলে তোমরা দুইজন কিছুক্ষণ পূর্বে যে তোমাদের ভাইয়ের ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করলে, তা তো মরা গাধার গোস্ত খাওয়া থেকেও নিকৃষ্ট। অতঃপর তিনি বললেন:
وَ الَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّهُ الآنَ كَفِي انْهَارِ الْجَنَّةِ يَنْغَمِسُ فِيهَا .
আল্লাহ্র কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, সে (মায়েয) তখন নিশ্চয়ই জান্নাতের ঝর্ণায় সাঁতার কাটছে।
টিকাঃ
১. কাফ্ফারা হওয়ার অর্থ, এই শাস্তি ভোগের কারণে আল্লাহ্র নিকট তার গুনাহ্ মাফ হয়ে যাবে। পরকালে সেজন্য কোন আযাব ভোগ করতে হবে না।
২. ফতহুল বারী জ ১২ পৃঃ ৮৪
৩. জামে'উল উসূল জ ১ পৃঃ ৩৪৯, তিরমিযী।