📄 ‘হজ্জ’ ও তা’যীরের মধ্যে পার্থক্য
উপরোদ্ধৃত আলোচনা থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, তা'যীর এক হিসাবে 'হদ্দ'-এর সহিত সঙ্গতিসম্পন্ন। 'তা'যীর' উপযুক্ত শিক্ষাদান, চরিত্র সংশোধন এবং অপরাধ রোধকারী ব্যবস্থা। অপরাধের প্রকৃতি ও মাত্রার পার্থক্যের কারণে তা অবশ্যই বিভিন্ন হতে বাধ্য। কিন্তু কয়েকটি দিক দিয়ে তা 'হদ্দ'-এর বিপরীতও। তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক এই:
প্রথম: লোকদের পর্যায়ানুপাতে তা'যীরও বিভিন্ন হয়ে থাকে। মানসিক প্রস্তুতি ও সতর্কতা সম্পন্ন লোকদের সুশিক্ষাদান কুৎসাকারী ও নির্বোধ লোকদের শিক্ষাদানের তুলনায় অনেক সহজ। এই কারণে নবী করীম (সা) বলেছেন: اَقِيْلُوا ذَوِي الْهَيْئَاتِ عَتَرَاتِهُمْ إِلَّا الْجُدُودَ (প্রতিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের পদস্খলনে শাস্তির মাত্রা কম কর। তবে 'হদ্দ' এর ব্যাপারে কোন রেয়াত থাকতে পারে না)। স্পষ্ট যে, 'হদ্দ'-এর ব্যাপারটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তা সব মানুষের ক্ষেত্রেই পুরাপুরি ও যথাযথ কার্যকর করা কর্তব্য।
দ্বিতীয়: 'তা'যীর' যদি আল্লাহর হকসমূহের মধ্যে কোন একটি হকের ব্যাপারে হয়, তাহলে তা অবশ্যই কার্যকর করতে হবে। এটাই সাধারণ নিয়ম। কিন্তু তা ক্ষমা করা যদি সার্বিক দৃষ্টিতে অধিক মঙ্গলজনক বিবেচিত হয়, তাহলে তা জায়েয হবে এবং সেজন্য সুপারিশও করা যাবে। নবী করীম (সা) বলেছেন: اِفْضَعُوا إِلَى لِتُؤْজَرُوا وَ لِيَقْضِ اللَّهُ عَلَى لِسَانِ نَبِيِّهِ مَا يَشَاءُ (সুবুলুস সালাম জ. ৪, পৃ. ২৮) (তোমরা আমার নিকট সুপারিশ কর, তাতে তোমরা সওয়াব পাবে। আর আল্লাহ তাঁর নবীর জবানীতে যা ইচ্ছা বিচার করিয়ে নিবেন)। আর তা'যীর যদি কোন ব্যক্তির অধিকারের ব্যাপারে হয়, তাহলে সেই ব্যক্তির ক্ষমা করে দেয়ারও অধিকার আছে। কিন্তু 'হদ্দ' পর্যায়ের অপরাধে তা প্রত্যাহার করার অধিকার কারোর নেই। তাতে কোনরূপ সুপারিশ করারও অনুমতি দেয়া হয়নি যদি তার মামলা রাষ্ট্রপ্রধানের—অর্থাৎ বিচার বিভাগের নিকট পেশ করা হয়ে থাকে। তবে কোন কোন শরীয়ত বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে, 'কযফ' বা যিনার মিথ্যা দোষারোপে তা করা যেতে পারে। প্রথম কথাটির দলীল হচ্ছে—নবী করীম (সা) বলেছেন: يَا أَسَامَةُ اتَشْفَعُ فِي حَدٌ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلٌ (নীলুল আওতার জ. ৭, পৃ. ১৪৩) (হে উসামা! আল্লাহ নির্ধারিত ‘হদ্দে’ তুমি সুপারিশ করতে এসেছো?)। অবশ্য ‘কিসাস’ পর্যায়ের অপরাধে সুপারিশ জায়েয। কেননা তা মানুষের অধিকারের ব্যাপার।
তৃতীয়: অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহের সৃষ্টি হলে 'হদ্দ'ও মওকুফ হয়ে যাবে। কেননা নবী করীম (সা) তাই বলেছেন। কিন্তু তা'যীরের দণ্ড অপরাধ প্রমাণে সন্দেহ সৃষ্টি হলেও কার্যকর করা যাবে।
চতুর্থ: তা'যীরের দণ্ড অল্প বয়স্ক বালক ও সেই পাগলের উপরও কার্যকর করা যাবে, যার সামান্যও হুঁশ-জ্ঞান আছে অর্থাৎ যে পুরাপুরি পাগল নয়। কেননা তা'যীরের লক্ষ্য হচ্ছে আদব-কায়দা শিক্ষা দান। আর এদের আদব-কায়দা শিক্ষাদানের জন্য যে কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করায় কোন নিষেধ নেই। কিন্তু 'হদ্দ' কার্যকর করা যাবে কেবলমাত্র পূর্ণবয়স্ক সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তির উপর।
টিকাঃ
১. بدائع الصنائع ٩ ص ٤٢٠٦
১. الاشباه والنظائر للسيوطي ص ۱۳৭
📄 শাস্তিদানের চূড়ান্ত লক্ষ্য
আল্লাহ্ তা'আলা অপরাধের শাস্তিদানের চূড়ান্ত বিধান করেছেন অপরাধ প্রবণতা, হীনতা-নীচতা ও দুষ্কৃতি প্রতিরোধ, সমাজকে সকল প্রকার বিপর্যয় গুনাহ্-নাফরমানী থেকে রক্ষা এবং মানুষের মৌলিক কল্যাণে প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে। আল্লাহ্র নিকট থেকে অবতীর্ণ সকল কালের সকল শরীয়ত যে পাঁচটি বিষয়ের সংরক্ষণে সম্পূর্ণ একমত, ইসলামী শরীয়তেরও লক্ষ্য সেই পাঁচটি জিনিসের সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান। সে পাঁচটি বিষয় হচ্ছে, দীন সংরক্ষণ, জান-প্রাণ রক্ষা, বিবেক-বুদ্ধি সংরক্ষণ, বংশ রক্ষা ও ধন-মান রক্ষা। এই পাঁচটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজনরূপেও চিহিত। কেননা এই কয়টি বিষয়ের যথাযথ বর্তমানতা ছাড়া মানুষের জীবন ও কল্যাণ অচিন্তনীয়। এই কয়টি বিষয় যাতে সম্পূর্ণ সংরক্ষিত থাকে, এর কোন একটি ক্ষেত্রেও সীমালংঘন না হয়—যে তার সীমালংঘন করতে উদ্যত হবে বা তা স্পর্শও করবে, কাউকে একবিন্দু ক্ষতিগ্রস্ত করবে তাকে অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে—যাতে ভবিষ্যতে আর এমন কাজ না করে। আল্লাহ্ তা'আলা এই পর্যায়ের অপরাধে শাস্তির বিধান করার লক্ষ্য হিসাবে এই প্রতিরোধক কারণেরই উল্লেখ করেছেন এবং উপযুক্ত ও কার্যকর প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিয়েছেন। যিনার 'হদ্দ' নির্দিষ্ট করা হয়েছে মানুষের বংশ বিকৃত বা বিনষ্ট করার পদক্ষেপ থেকে মানুষকে বিরত রাখার লক্ষ্যে, চুরি ও ডাকাতি অপরাধের শাস্তি বিধান করা হয়েছে জনগণের জান-মালের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যে। মানুষের মান-সম্মান ও ইজ্জত-আবরু সংরক্ষণের জন্য কযফের 'হদ্দ' ঘোষিত হয়েছে এবং মানুষের বিবেক-বুদ্ধির সুস্থতা রক্ষার লক্ষ্যে মদ্যপান অপরাধেরও শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
📄 ইমাম গাযালীর ভাষ্য
‘কল্যাণ আহরণ ও ক্ষতি প্রতিরোধই গোটা সৃষ্টিকর্মের উদ্দেশ্য। সৃষ্টিকর্মের কল্যাণ নিহিত রয়েছে তার উদ্দেশ্য পরিপূরণ ও বাস্তবায়নে। কিন্তু আমরা 'কল্যাণ' বলতে বুঝি শরীয়তের উদ্দেশ্য সংরক্ষণ। আর সৃষ্টিকর্মে শরীয়তের লক্ষ্য হচ্ছে পাঁচটি: মানুষের দীন রক্ষা, তাদের জান-প্রাণ রক্ষা, তাদের বিবেক-বুদ্ধি রক্ষা, তাদের বংশ ও ধন-মাল রক্ষা। অতএব এই পাঁচটি বিষয়ের সংরক্ষণে যে ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হবে, তাই হচ্ছে প্রকৃত কল্যাণ। আর এই পাঁচটি মৌল জিনিস যে কারণেই বিনষ্ট বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাই হচ্ছে বিপর্যয়কারী। এই বিপর্যয় রোধ করা কল্যাণের জন্য অপরিহার্য। এই পাঁচটি মৌল বিষয়ের সংরক্ষণ প্রয়োজন পর্যায়ের বাস্তবতা। কল্যাণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অধিকতর শক্তিশালী হচ্ছে এই পাঁচটি। তার দৃষ্টান্ত, পথ ভ্রষ্টকারী কাফিরকে হত্যা করা শরীয়তের বিচারের ফয়সালা। 'বিদ'আত' প্রচলনের আহ্বানকারী বিদ'আতপন্থীকে শাস্তি দান—ও অনুরূপ। কেননা কুফরী ও বিদ'আত মানুষের দীন বিনষ্টকারী। এ জন্য কিসাস ফরয করা হয়েছে। এই কিসাস কার্যকর করা হলেই মানুষ ধর্মীয় দিক দিয়ে পুরাপুরি সংরক্ষিত হতে পারে। মদ্যপান অপরাধের শাস্তিস্বরূপ 'হদ্দ' বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। কেননা যে বিবেক-বুদ্ধি শরীয়ত পালনের বাধ্যবাধকতার ভিত্তি, তা রক্ষার জন্য এই 'হদ্দ' অপরিহার্য, 'যিনার' 'হদ্দ' ফরয করা হয়েছে মানুষের বংশধারা ও জন্মের বৈধতা-পবিত্রতা রক্ষা এছাড়া সম্ভব নয়। অপহরণকারী ডাকাত ও চোরের জন্যও শাস্তি নির্ধারিত। কেননা মানুষের ধন-মাল জীবিকার মৌল উৎস। তার সংরক্ষণের জন্য এই শাস্তি অপরিহার্য। মানুষ জীবনকাল ব্যাপীই ধন-মালের মুখাপেক্ষী, তার উপর একান্ত ভাবে নির্ভরশীল। এই পাঁচটি বিষয়ের ধ্বংস সাধন হারাম করা হয়েছে। তার প্রতিরোধ ব্যবস্থা তা অসম্ভব বা কঠিন করে তোলে। যেসব শরীয়তের লক্ষ্য মানবতার সার্বিক কল্যাণ, উপরোক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থায় তার প্রত্যেকটি শরীক ও অভিন্ন। আর এই কারণেই তাতে কুফর, মানুষ হত্যা, ব্যভিচার, চুরি-ডাকাতি ও মাদক দ্রব্য পান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে।
📄 ইসলামের দণ্ড বিধান রহমত বিশেষ
ইসলামে অপরাধের যে শাস্তি বিধান করা হয়েছে, তা বস্তুতই বিশ্ব মানবতার প্রতি অসীম-অশেষ রহমতের প্রতীক। ইসলামের সিরাতুল মুস্তাকীম বর্জনকারীর জন্য এই শাস্তি একান্তই জরুরীরূপে নির্ধারিত। যদি এই ব্যবস্থা করা না হতো, তাহলে অপরাধীরা শরীয়তের সীমালংঘনকারী ফাসিক-ফাযির লোকেরা ভয়ানকভাবে দুঃসাহসী হয়ে উঠত। কেননা এই লোকদের মনে ঈমান স্থান লাভ করেনি। নির্লজ্জতা ও পাপকার্য সম্পাদন ও হারাম করা জিনিসগুলির মর্যাদা বিনষ্টকরণ থেকে তাদের বিরত রাখার মত কোন শক্তিই তাদের ভিতরে বর্তমান নেই। এমতাবস্থায় অপরাধের শাস্তির ব্যবস্থা না থাকলে তারা তো পৃথিবীতে চরম বিপর্যয় সৃষ্টি করত। মানুষ পরস্পরকে ধ্বংস করত, বিশ্ব ব্যবস্থা ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে দিত। তখন দুনিয়ার পশু ও জন্তু-জানোয়ারের তুলনায়ও অধিক খারাপ হয়ে পড়ত মানুষের অবস্থা। এই কথার সত্যতা স্বাভাবিকভাবেই সর্বজনজ্ঞাত ও স্বীকৃত।
আল্লাহ্ তা'আলা যেসব শাস্তি বিধিবদ্ধ করেছেন এবং বিভিন্ন অপরাধের জন্য সাব্যস্ত করেছেন, বাহ্যত তাতে যদিও অপরাধীকে কষ্টদান করা হয়; কিন্তু আসলে কষ্ট বা পীড়াদানই তার প্রকৃত বা চরম লক্ষ্য নয়। আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে এই শাস্তি কার্যকরকরণের ফলে ইসলামী সমাজে যে সার্বিক কল্যাণ বাস্তবায়িত হয় তা। এই কল্যাণের বড় দিক হচ্ছে অন্যায় যুলুম ও বিপর্যয়ের বিস্তার ও ব্যাপকতা প্রতিরোধ এবং আল্লাহ্ হারাম ঘোষিত জিনিসগুলির মর্যাদা বিনষ্ট করার প্রবণতার নির্মূল সাধন। কারোর প্রতি নির্মমতা প্রদর্শন বা কারোর উপর থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ কিন্তু তার লক্ষ্য নয় আদৌ। বস্তুত এই শাস্তি হচ্ছে রোগ প্রতিরোধক ও প্রতিষেধক ঔষধ বিশেষ। জীবন রক্ষার জন্য যেমন পচে যাওয়া অঙ্গ কেটে ফেলা অপরিহার্য হয়ে পড়ে এ-ও ঠিক তেমনি।
টিকাঃ
১. اختيارات ان تيميه ص ۲৮৮
২. القواعد الكبرى ج ১ ص - ১২; فلسفة العقوبة الفقه الاسلامي