📄 হত্যাকাণ্ডের কম মানের অপরাধে কিসাস
ইসলামী শরীয়ত সুবিচার ও ন্যায়পরতা এবং সাম্য ও শান্তি-নিরাপত্তা রক্ষার লক্ষ্যে প্রাণ-সংহারের কম মানের অপরাধেও কিসাস বিধিবদ্ধ করেছে। 'হত্যার কম মানের অপরাধ' বলতে হাত, পা, চক্ষু, কান, নাক, জিহ্বা, চক্ষুর পাতা, ওষ্ঠ ও অঙ্গলি ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে যে অপরাধ হয়, তা-ই বোঝানো হয়েছে। কেউ যদি অন্য কোন ব্যক্তির এই সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর আঘাত হানে ও তা কেটে ফেলে বা চূর্ণ-বিচূর্ণ কিংবা অকেজো করে দেয়, তাহলে তার অঙ্গের এই ক্ষতির অনুরূপ আক্রমণকারীর অঙ্গের ক্ষতি সাধনের অধিকার লাভ করে শরীয়ত ঘোষিত 'কিসাস' হিসাবে।
কিন্তু এই কিসাস পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য নিম্নোত তিনটি শর্ত জরুরীভাবে উপস্থিত থাকা একান্তই আবশ্যক:
১. কিসাস কার্যকর করার সময় অবিচার ও অসম পদক্ষেপ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ।
২. অপরাধ স্থানের অনুরূপতা অর্থাৎ প্রথমে যদি একজনের ডান হাতের উপর এই অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে অপরাধীর ঠিক ডান হাতের উপরই তার কিসাস কার্যকর হতে হবে, অন্যত্র নয়।
৩. উভয়ের সুস্থতা ও পূর্ণাঙ্গতায় সমান হতে হবে অর্থাৎ কারোর অবশ হাতের বিনিময়ে অপরাধীর সুস্থ হাত, কারোর অপূর্ণ অঙ্গুলির বদলে অপরাধীর পূর্ণ অঙ্গুলি, কারোর অস্বচ্ছ দৃষ্টিমান চক্ষুর বিনিময়ে সুস্থ স্পষ্ট দৃষ্টিমান চক্ষু এবং কারোর কথা উচ্চারণে অক্ষম জিহ্বার বিনিময়ে অপরাধীর স্পষ্ট উচ্চারণক্ষম জিহ্বার উপর কিসাস কার্যকর করা যাবে না।
📄 ইসলামী শরীয়তে ‘দীয়াত’ ব্যবস্থা
ইসলামী শরীয়তে কিসাসের সাথে সাথে ‘দীয়াতে’র বিধান এই উম্মতের প্রতি একটি অন্যতম দয়াপূর্ণ ব্যবস্থা হিসাবে বিধিবদ্ধ হয়েছে। পূর্ববর্তী উম্মত ইয়াহুদী শরীয়তে হত্যাকারীর উপর শুধু কিসাসের বিধান দেওয়া হয়েছিল। আর খৃস্টানদের শরীয়তে ছিল শুধু 'দীয়াতের' ব্যবস্থা। কিন্তু ইসলামী শরীয়ত মধ্যমপন্থী দণ্ড বিধান উপস্থাপিত করেছে। আর এই মধ্যম পন্থা অবলম্বনই ইসলামী শরীয়তের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য।
ইসলাম একদিকে পূর্ণমাত্রার সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কিসাসের বিধান দিয়েছে। তা পাওয়ার ও দাবি করার অধিকার দিয়েছে নিহত ব্যক্তির অভিভাবকদের। সেই সাথে হত্যা অপরাধের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মনে একটা প্রচণ্ড প্রতিরোধকারী ভীতি সৃষ্টির লক্ষ্যে। অবশ্য সেই সাথেই অভিভাবকদের এই স্বাধীনতাও দেয়া হয়েছে যে, তারা ইচ্ছা করলে কিসাস বাস্তবায়নের পরিবর্তে হত্যাকারীর নিকট থেকে রক্তমূল্য বাবদ প্রচুর পরিমাণের অর্থ নিয়ে তাকে ক্ষমা করে দিতেও পারে। কোন নিহত ব্যক্তির অভিভাবকরা তা করলে অবশ্য আল্লাহর নিকট থেকে তাকে বিপুল সওয়াব দেয়ারও সুসংবাদ দেয়া হয়েছে।
তার কারণ হচ্ছে, ইসলামের দৃষ্টিতে নিহত ব্যক্তির রক্তের প্রতিশোধ নেয়ার বাদী বা দাবিদার হচ্ছে তার অভিভাবকরা। আর তাদের জন্যই শরীয়তে এই ইখতিয়ার প্রদান করা হয়েছে।
📄 কিসাসের বদলে দীয়াত গ্রহণের বৈধতার দলীল
আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
"যার জন্য তার ভাইয়ের নিকট থেকে কিছু ক্ষমা করা হবে, তার কতব্য হবে সুনীতির অনুসরণ করা এবং তা যথাযথভাবে তার নিকট আদায় করে দেয়া। এ হচ্ছে তোমাদের প্রভু-প্রতিপালকের নিকট থেকে বোঝা হ্রাসকরণ এবং বিশেষ অনুগ্রহ।" -সূরা বাকারা: ১৭৮
"আর যদি তোমরা ক্ষমা করে দাও, তবে এই ক্ষমা তাকওয়ার নিকটবর্তী কাজ।" -সূরা বাকারা: ২৩৭
"যে লোক তা সাদকা স্বরূপ দান করে দেবে, তা তার জন্য কাফ্ফারা হয়ে দাঁড়াবে।" -সূরা মায়িদা: ৪৫
"এবং ক্রোধ হজমকারী ও লোকদের ক্ষমাদানকারী মুত্তাকী লোক।" -সূরা ইমরানঃ ১৩৪
রাসূলে করীম (সা) বলেছেন:
"কোন লোক যদি কারুর যুলুম ক্ষমা করে দেয়, তা'হলে আল্লাহ্ তার ইজ্জত বৃদ্ধি করে দেবেন।"
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) বলেছেন:
"রাসূলে করীম (সা)-এর নিকট কিসাসের কোন মামলা উত্থাপিত হলেই আমি দেখেছি, তিনি তা ক্ষমা করে দিয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।"
রাসূলে করীম (সা) বলেছেন:
"কেউ যদি তার দেহে কোন আঘাত পায় কারুর দ্বারা এবং সে তা ক্ষমা করে দেয়, তা'হলে আল্লাহ্ তার মর্যাদা উঁচু করে দিবেন এবং তার ভুল খসিয়ে দিবেন।"
📄 নিহতের অভিভাবকদের নিকট সুপারিশ
কিসাসে দীয়াতের ব্যবস্থা ইসলামী শরীয়তের একটা বিশেষ ব্যবস্থা। কাজেই কিসাস ক্ষমা করে দীয়াত গ্রহণে নিহতের অভিভাবকদের নিকট সুপারিশ করাও একটা বড় সওয়াবের কাজ, সন্দেহ নেই।