📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 কিসাস কার্যকর করবে কে?

📄 কিসাস কার্যকর করবে কে?


কিসাস কার্যকর করবে কে, এ একটি আনুসঙ্গিক এবং জরুরী প্রশ্ন। এই পর্যায়ে কুরআন মজীদের এ আয়াতটি প্রণিধানযোগ্য:

"আর যে লোক অন্যায়ভাবে নিহত হয়েছে, তার অভিভাবককে আমরা কিসাস দাবি করার অধিকার দিয়েছি। তবে সে যেন প্রতিহত্যা কাজে সীমালংঘন না করে। অবশ্যই তার সাহায্য করা হবে।" -সূরা ইসরা: ৩৩

আয়াত থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, অন্যায়ভাবে নিহত ব্যক্তির রক্তের 'কিসাস' লওয়ার ও পাওয়ার অধিকার তার অভিভাবকের রয়েছে। এই অধিকার আল্লাহর দান। কিন্তু এই অধিকার কিভাবে বাস্তবায়িত করা হবে, যেহেতু এই অধিকার ব্যক্তিগতভাবে কাউকেই দেয়া যায় না? মুসলমানদের রাষ্ট্র-সরকারই এই অধিকার বাস্তবায়নে প্রধান পৃষ্ঠপোষক। অথচ এ আয়াত মক্কা শরীফে নাযিল হয়েছিল এবং তখন পর্যন্ত ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকার কায়েম হয়নি। তাই নিহতের অভিভাবককে কিসাস বাস্তবায়নে সাহায্য করা হবে বলেই ক্ষান্ত থাকা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম হয়ে গেল, তখন এই সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়েছিল যে, নিহতের অভিভাবককে কিসাস বাস্তবায়নে সাহায্য করার দায়িত্ব তার গোত্র বা মিত্রদের নয়, সে দায়িত্ব ইসলামী রাষ্ট্র-সরকার ও তার অধীন কায়েম হওয়া ইসলামী বিচার ব্যবস্থার উপর অর্পিত। কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজস্বভাবে হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকারী নয়। এই কর্তব্য ইসলামী হুকুমাতের। অতএব কিসাস দাবি করার অধিকার অভিভাবকের হলেও তার বাস্তবায়নের জন্য তাকে ইসলামী রাষ্ট্র সরকারের সাহায্যের মুখাপেক্ষী হতে হবে এবং ইসলামী রাষ্ট্র-সরকার মহান আল্লাহ্র অর্পিত দায়িত্ব হিসাবে নিহতের অভিভাবকের দাবি অনুযায়ী কিসাস কার্যকর করবে। যদিও কেউ কেউ এই মতও দিয়েছেন যে, নিহতের অভিভাবক কিসাস কার্যকর করার কাজটি সুষ্ঠুরূপে সম্পন্ন করতে সক্ষম হলে সে নিজ হস্তেই তা সম্পন্ন করবে। অন্যথায় সে অন্য কাউকে-যে তা যথাযথরূপে আঞ্জাম দিতে পারবে বলে মনে হবে, তাকে এজন্য প্রতিনিধিরূপে দায়িত্ব দিবে। তবে এই কাজটি করতে হবে সরকার কর্তৃপক্ষীয় লোকের উপস্থিতিতে।

কিন্তু মূলত এই কাজটি সরকারীভাবে সম্পন্ন হওয়া উচিত বলেই মনে হয়।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 হত্যাকাণ্ডের কম মানের অপরাধে কিসাস

📄 হত্যাকাণ্ডের কম মানের অপরাধে কিসাস


ইসলামী শরীয়ত সুবিচার ও ন্যায়পরতা এবং সাম্য ও শান্তি-নিরাপত্তা রক্ষার লক্ষ্যে প্রাণ-সংহারের কম মানের অপরাধেও কিসাস বিধিবদ্ধ করেছে। 'হত্যার কম মানের অপরাধ' বলতে হাত, পা, চক্ষু, কান, নাক, জিহ্বা, চক্ষুর পাতা, ওষ্ঠ ও অঙ্গলি ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে যে অপরাধ হয়, তা-ই বোঝানো হয়েছে। কেউ যদি অন্য কোন ব্যক্তির এই সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর আঘাত হানে ও তা কেটে ফেলে বা চূর্ণ-বিচূর্ণ কিংবা অকেজো করে দেয়, তাহলে তার অঙ্গের এই ক্ষতির অনুরূপ আক্রমণকারীর অঙ্গের ক্ষতি সাধনের অধিকার লাভ করে শরীয়ত ঘোষিত 'কিসাস' হিসাবে।

কিন্তু এই কিসাস পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য নিম্নোত তিনটি শর্ত জরুরীভাবে উপস্থিত থাকা একান্তই আবশ্যক:
১. কিসাস কার্যকর করার সময় অবিচার ও অসম পদক্ষেপ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ।
২. অপরাধ স্থানের অনুরূপতা অর্থাৎ প্রথমে যদি একজনের ডান হাতের উপর এই অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে অপরাধীর ঠিক ডান হাতের উপরই তার কিসাস কার্যকর হতে হবে, অন্যত্র নয়।
৩. উভয়ের সুস্থতা ও পূর্ণাঙ্গতায় সমান হতে হবে অর্থাৎ কারোর অবশ হাতের বিনিময়ে অপরাধীর সুস্থ হাত, কারোর অপূর্ণ অঙ্গুলির বদলে অপরাধীর পূর্ণ অঙ্গুলি, কারোর অস্বচ্ছ দৃষ্টিমান চক্ষুর বিনিময়ে সুস্থ স্পষ্ট দৃষ্টিমান চক্ষু এবং কারোর কথা উচ্চারণে অক্ষম জিহ্বার বিনিময়ে অপরাধীর স্পষ্ট উচ্চারণক্ষম জিহ্বার উপর কিসাস কার্যকর করা যাবে না।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 ইসলামী শরীয়তে ‘দীয়াত’ ব্যবস্থা

📄 ইসলামী শরীয়তে ‘দীয়াত’ ব্যবস্থা


ইসলামী শরীয়তে কিসাসের সাথে সাথে ‘দীয়াতে’র বিধান এই উম্মতের প্রতি একটি অন্যতম দয়াপূর্ণ ব্যবস্থা হিসাবে বিধিবদ্ধ হয়েছে। পূর্ববর্তী উম্মত ইয়াহুদী শরীয়তে হত্যাকারীর উপর শুধু কিসাসের বিধান দেওয়া হয়েছিল। আর খৃস্টানদের শরীয়তে ছিল শুধু 'দীয়াতের' ব্যবস্থা। কিন্তু ইসলামী শরীয়ত মধ্যমপন্থী দণ্ড বিধান উপস্থাপিত করেছে। আর এই মধ্যম পন্থা অবলম্বনই ইসলামী শরীয়তের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য।

ইসলাম একদিকে পূর্ণমাত্রার সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কিসাসের বিধান দিয়েছে। তা পাওয়ার ও দাবি করার অধিকার দিয়েছে নিহত ব্যক্তির অভিভাবকদের। সেই সাথে হত্যা অপরাধের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মনে একটা প্রচণ্ড প্রতিরোধকারী ভীতি সৃষ্টির লক্ষ্যে। অবশ্য সেই সাথেই অভিভাবকদের এই স্বাধীনতাও দেয়া হয়েছে যে, তারা ইচ্ছা করলে কিসাস বাস্তবায়নের পরিবর্তে হত্যাকারীর নিকট থেকে রক্তমূল্য বাবদ প্রচুর পরিমাণের অর্থ নিয়ে তাকে ক্ষমা করে দিতেও পারে। কোন নিহত ব্যক্তির অভিভাবকরা তা করলে অবশ্য আল্লাহর নিকট থেকে তাকে বিপুল সওয়াব দেয়ারও সুসংবাদ দেয়া হয়েছে।

তার কারণ হচ্ছে, ইসলামের দৃষ্টিতে নিহত ব্যক্তির রক্তের প্রতিশোধ নেয়ার বাদী বা দাবিদার হচ্ছে তার অভিভাবকরা। আর তাদের জন্যই শরীয়তে এই ইখতিয়ার প্রদান করা হয়েছে।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 কিসাসের বদলে দীয়াত গ্রহণের বৈধতার দলীল

📄 কিসাসের বদলে দীয়াত গ্রহণের বৈধতার দলীল


আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:

"যার জন্য তার ভাইয়ের নিকট থেকে কিছু ক্ষমা করা হবে, তার কতব্য হবে সুনীতির অনুসরণ করা এবং তা যথাযথভাবে তার নিকট আদায় করে দেয়া। এ হচ্ছে তোমাদের প্রভু-প্রতিপালকের নিকট থেকে বোঝা হ্রাসকরণ এবং বিশেষ অনুগ্রহ।" -সূরা বাকারা: ১৭৮

"আর যদি তোমরা ক্ষমা করে দাও, তবে এই ক্ষমা তাকওয়ার নিকটবর্তী কাজ।" -সূরা বাকারা: ২৩৭

"যে লোক তা সাদকা স্বরূপ দান করে দেবে, তা তার জন্য কাফ্ফারা হয়ে দাঁড়াবে।" -সূরা মায়িদা: ৪৫

"এবং ক্রোধ হজমকারী ও লোকদের ক্ষমাদানকারী মুত্তাকী লোক।" -সূরা ইমরানঃ ১৩৪

রাসূলে করীম (সা) বলেছেন:

"কোন লোক যদি কারুর যুলুম ক্ষমা করে দেয়, তা'হলে আল্লাহ্ তার ইজ্জত বৃদ্ধি করে দেবেন।"

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) বলেছেন:

"রাসূলে করীম (সা)-এর নিকট কিসাসের কোন মামলা উত্থাপিত হলেই আমি দেখেছি, তিনি তা ক্ষমা করে দিয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।"

রাসূলে করীম (সা) বলেছেন:

"কেউ যদি তার দেহে কোন আঘাত পায় কারুর দ্বারা এবং সে তা ক্ষমা করে দেয়, তা'হলে আল্লাহ্ তার মর্যাদা উঁচু করে দিবেন এবং তার ভুল খসিয়ে দিবেন।"

ফন্ট সাইজ
15px
17px