📄 বালক ও পাগলের হত্যাকাণ্ড
বালক বলতে বোঝায় যার বয়স পনেরোয় পৌছিনি। কেননা এই বয়সের লোকেরাই শরীয়ত পালনে বাধ্য হয়। আর পাগল বলতে বোঝায় যার বুদ্ধি-বিবেক লোপ পেয়েছে এবং কখনই হুঁশ-জ্ঞান ফিরে আসে না। এই বালক ও পাগল যদি কোন নিরপরাধ মানুষকে রক্তপাত ও প্রাণ সংহারে সক্ষম অস্ত্র দ্বারা কাউকে হত্যা করে, তা হলে এই হত্যাকাণ্ডকে 'ভুলবশত হত্যা' গণ্য করা হবে এবং এর দণ্ড হচ্ছে, নিহত ব্যক্তির অভিভাবকদের নিকট 'দীয়াত' আদায় করা। কেননা হত্যাকাণ্ড প্রমাণের তৃতীয় শর্ত-হত্যা করার ইচ্ছা ও সংকল্প-এখানে অনুপস্থিত।
📄 কিসাস লওয়ার হাতিয়ার
শরীয়তে কিসাসের হাতিয়ার হচ্ছে তরবারি। কেননা নবী করীম (সা) বলেছেন:
তরবারি ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে প্রতিকার হয় না।
তাছাড়া তরবারি খুবই তীক্ষ্ম শানিত হয়ে থাকে। যার উপর তা চালানো হবে তাকে খুব দ্রুত ঠাণ্ডা করে দেবে। সে অন্যভাবে কষ্ট পাবে না। উপরন্ত লোকেরা তরবারিকে খুব বেশি ভয় পায়। ফলে তা জীবন্ত লোকদের জন্য একটা ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং নিহত ব্যক্তির অভিভাবকদের ক্রোধাগ্নিও নির্বাপিত করে। শরীয়ত হত্যাকারীর উপর 'কিসাস' কার্যকর করার পূর্বে ও পরে তাকে কোনরূপ অপমানিত বা লাঞ্ছিত করার অনুমতি দেয় না। কিসাসের বিধান করা হয়েছে সুবিচার ও ন্যায়পরতার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। তাই বলে কিসাস কার্যকর করার পূর্বে তাকে কোনরূপ মারধর করা, তার উপর নির্যাতন-নিষ্পেষণ চালানো, জেলের মধ্যে কষ্ট দেওয়া বা ক্ষুৎ-পিপাসায় ছটফট করতে বাধ্য করা এবং কিসাস কার্যকর হওয়ার পর তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ টুকরা টুকরা করা, দেহ বিকলাঙ্গ বা বিকৃত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বরং কিসাস কার্যকর হওয়ার পর তার জানাযা পড়া ও মুসলমানদের কবরস্থানে তাকে দাফন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি কোন ভোঁতা অস্ত্র দ্বারা হত্যা করতেও নিষেধ করা হয়েছে।
রাসূলে করীম (সা) বলেছেন:
"আল্লাহ্ তা'আলা সব জিনিসের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ প্রদর্শন লিখে দিয়েছেন। অতএব তোমরা যখন হত্যা করবে (দণ্ডস্বরূপ), তখন এই হত্যাকার্য উত্তমভাবে সম্পন্ন করবে, আবার যখন যবেহ করবে তখনও খুব ভালোভাবে যবেহ কার্য সম্পন্ন করবে। (হত্যা বা যবেহর কাজ) তোমাদের যে-ই করবে, সে যেন তার ছুরি খুব শানিত করে লয় এবং যবেহ করার পর যবেহকৃত প্রাণীটি সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা হওয়ার সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।"
কোন কোন শরীয়ত বিশেষজ্ঞ এই মত প্রকাশ করেছেন যে, হত্যার দণ্ডস্বরূপ যে হত্যা কার্য হবে, তা ঠিক সেইভাবেই হতে হবে যেভাবে প্রথম হত্যাকাণ্ডটি হয়েছিল। দলীল হিসাবে তাঁরা উল্লেখ করেছেন কুরআন মজীদের নিম্নোদ্ধৃত আয়াত দুইটি:
"তোমরা যখন প্রতিশোধস্বরূপ শাস্তি দেবে, তখন তোমরা তা করবে ঠিক সেইভাবে, যেভাবে তোমরা নিজেরা (ইতিপূর্বে) শাস্তি পেয়েছ।" -সূরা নাহল: ১২৬
"অতএব যে লোক তোমাদের উপর সীমালংঘনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করল, তোমরাও ঠিক সেইরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ কর যেমন তোমাদের উপর সীমালংঘন করা হয়েছে।" -সূরা বাকারা: ১৯৪
রাসূলে করীম (সা) এসব আয়াতের আলোকেই একজন ইয়াহুদীর মস্তক দুইটি প্রস্তরের মাঝে রেখে ছেঁচে দিয়েছিলেন। কেননা সে দুইটি প্রস্তরের মাঝখানে রেখে একটি মেয়ের মস্তক চূর্ণ করেছিল।
📄 কিসাস সম্পূর্ণ করার শর্ত
কিসাস কার্যকরকরণের জন্য নিম্নোত শর্ত তিনটির পূর্ণভাবে পাওয়া যাওয়া একান্তই জরুরী।
-কিসাস যোগ্য ব্যক্তিকে অবশ্যই পূর্ণ বয়স্ক-শরীয়ত পালনে বাধ্য হওয়ার যোগ্য হতে হবে। যদি সে বালক বা পাগল হয়, তাহলে তার উপর কিসাস করা যাবে না। বরং তা বিলম্বিত করতে হবে। হত্যাকারীকে আটক করে রাখতে হবে যদ্দিন না বালক পূর্ণ বয়স্ক এবং পাগল পূর্ণরূপে সুস্থ মন-মগজ ও বিবেক-বুদ্ধির অধিকারী হচ্ছে।
-দণ্ড দেওয়ার যোগ্য সকল অধিকারীই দণ্ড কার্যকরকরণে সম্পূর্ণ একমত হবে। যোগ্য অধিকারী বলতে বোঝানো হয়েছে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী সব পুরুষ ও মেয়েলোক-বড় বয়সের ও ছোট বয়সের সব লোক। শরীয়তের জমহুর আলিমগণ এই মত প্রকাশ করেছেন। তবে তাঁদের মধ্য থেকে কেউ কেউ কেবল পুরুষ উত্তরাধিকারীদের কথাই বলেছেন। কেননা দণ্ডিতব্য ব্যক্তি তাদের সম্মুখেই লজ্জা পাবে।
-কিসাস পূর্ণরূপে কার্যকর হওয়ায় হত্যাকারী নয়-এমন ব্যক্তিদের পূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। 'কিসাস' যদি গর্ভধারিণীর উপর কার্যকর করতে হয় অথবা কিসাস ফরয হওয়ার পর সে গর্ভধারিণী হয়ে পড়ে, তাহলে গর্ভপ্রসব হওয়ার ও প্রসূতের দুগ্ধ সেবন সম্পূর্ণ হওয়ার পূর্বে তা কার্যকর করা যাবে না।
📄 কিসাস কার্যকর করবে কে?
কিসাস কার্যকর করবে কে, এ একটি আনুসঙ্গিক এবং জরুরী প্রশ্ন। এই পর্যায়ে কুরআন মজীদের এ আয়াতটি প্রণিধানযোগ্য:
"আর যে লোক অন্যায়ভাবে নিহত হয়েছে, তার অভিভাবককে আমরা কিসাস দাবি করার অধিকার দিয়েছি। তবে সে যেন প্রতিহত্যা কাজে সীমালংঘন না করে। অবশ্যই তার সাহায্য করা হবে।" -সূরা ইসরা: ৩৩
আয়াত থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, অন্যায়ভাবে নিহত ব্যক্তির রক্তের 'কিসাস' লওয়ার ও পাওয়ার অধিকার তার অভিভাবকের রয়েছে। এই অধিকার আল্লাহর দান। কিন্তু এই অধিকার কিভাবে বাস্তবায়িত করা হবে, যেহেতু এই অধিকার ব্যক্তিগতভাবে কাউকেই দেয়া যায় না? মুসলমানদের রাষ্ট্র-সরকারই এই অধিকার বাস্তবায়নে প্রধান পৃষ্ঠপোষক। অথচ এ আয়াত মক্কা শরীফে নাযিল হয়েছিল এবং তখন পর্যন্ত ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকার কায়েম হয়নি। তাই নিহতের অভিভাবককে কিসাস বাস্তবায়নে সাহায্য করা হবে বলেই ক্ষান্ত থাকা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম হয়ে গেল, তখন এই সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়েছিল যে, নিহতের অভিভাবককে কিসাস বাস্তবায়নে সাহায্য করার দায়িত্ব তার গোত্র বা মিত্রদের নয়, সে দায়িত্ব ইসলামী রাষ্ট্র-সরকার ও তার অধীন কায়েম হওয়া ইসলামী বিচার ব্যবস্থার উপর অর্পিত। কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজস্বভাবে হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকারী নয়। এই কর্তব্য ইসলামী হুকুমাতের। অতএব কিসাস দাবি করার অধিকার অভিভাবকের হলেও তার বাস্তবায়নের জন্য তাকে ইসলামী রাষ্ট্র সরকারের সাহায্যের মুখাপেক্ষী হতে হবে এবং ইসলামী রাষ্ট্র-সরকার মহান আল্লাহ্র অর্পিত দায়িত্ব হিসাবে নিহতের অভিভাবকের দাবি অনুযায়ী কিসাস কার্যকর করবে। যদিও কেউ কেউ এই মতও দিয়েছেন যে, নিহতের অভিভাবক কিসাস কার্যকর করার কাজটি সুষ্ঠুরূপে সম্পন্ন করতে সক্ষম হলে সে নিজ হস্তেই তা সম্পন্ন করবে। অন্যথায় সে অন্য কাউকে-যে তা যথাযথরূপে আঞ্জাম দিতে পারবে বলে মনে হবে, তাকে এজন্য প্রতিনিধিরূপে দায়িত্ব দিবে। তবে এই কাজটি করতে হবে সরকার কর্তৃপক্ষীয় লোকের উপস্থিতিতে।
কিন্তু মূলত এই কাজটি সরকারীভাবে সম্পন্ন হওয়া উচিত বলেই মনে হয়।