📄 এই কথার দলীল
আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
"কোন মু'মিনের জন্য জায়েয নয় কোন মু'মিনকে হত্যা করা। তবে ভুলবশত হয়ে যেতে পারে। তাই যে লোক কোন মু'মিনকে ভুলবশত হত্যা করবে, তার কাফ্ফারা হচ্ছে একটি মু'মিন ক্রীতদাস মুক্ত করা এবং নিহতের অভিভাবকের নিকট সমর্পিত দীয়াত। তবে তারা যদি সাদকা করে দেয়, তাহলে স্বতন্ত্র কথা।"
আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেছেন:
"যদি নিহত ব্যক্তিটি এমন জনগোষ্ঠীর লোক হয়, যাদের সহিত তোমাদের অনাক্রমণের চুক্তি সম্পাদিত আছে, তা'হলে নিহতের অভিভাবকদের নিকট দীয়াত হস্তান্তর করতে হবে ও একজন মু'মিন ক্রীতদাস মুক্ত করতে হবে।" -সূরা নিসা: ৯২
হযরত ওরওয়া ইবনয যুবায়র বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, হযরত হুযায়ফা ইবনুল য়ামান (রা) রাসূলে করীম (সা)-এর সঙ্গে ওহোদ যুদ্ধে শরীক হয়েছিলেন। মুসলমানরা তাঁর পিতাকে শত্রু পক্ষের লোক মনে করে তার উপর তরবারির আঘাত হানলেন। হযরত হুযায়ফা বললেন, ইনি তো আমার পিতা। কিন্তু লোকেরা তাঁর কথা বুঝতে না পেরে তাঁরা তাকে হত্যা করে ফেললেন। তখন তিনি বলে উঠলেন: আল্লাহ্ তোমাদের ক্ষমা করুন, তিনিই সকল দয়াশীলের চাইতেও অধিক দয়াবান। পরে নবী করীম (সা) এই সংবাদ পেলেন। তাতে তাঁর নিকট হযরত হুযায়ফার মর্যাদা অনেক বেড়ে গেল।
📄 বালক ও পাগলের হত্যাকাণ্ড
বালক বলতে বোঝায় যার বয়স পনেরোয় পৌছিনি। কেননা এই বয়সের লোকেরাই শরীয়ত পালনে বাধ্য হয়। আর পাগল বলতে বোঝায় যার বুদ্ধি-বিবেক লোপ পেয়েছে এবং কখনই হুঁশ-জ্ঞান ফিরে আসে না। এই বালক ও পাগল যদি কোন নিরপরাধ মানুষকে রক্তপাত ও প্রাণ সংহারে সক্ষম অস্ত্র দ্বারা কাউকে হত্যা করে, তা হলে এই হত্যাকাণ্ডকে 'ভুলবশত হত্যা' গণ্য করা হবে এবং এর দণ্ড হচ্ছে, নিহত ব্যক্তির অভিভাবকদের নিকট 'দীয়াত' আদায় করা। কেননা হত্যাকাণ্ড প্রমাণের তৃতীয় শর্ত-হত্যা করার ইচ্ছা ও সংকল্প-এখানে অনুপস্থিত।
📄 কিসাস লওয়ার হাতিয়ার
শরীয়তে কিসাসের হাতিয়ার হচ্ছে তরবারি। কেননা নবী করীম (সা) বলেছেন:
তরবারি ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে প্রতিকার হয় না।
তাছাড়া তরবারি খুবই তীক্ষ্ম শানিত হয়ে থাকে। যার উপর তা চালানো হবে তাকে খুব দ্রুত ঠাণ্ডা করে দেবে। সে অন্যভাবে কষ্ট পাবে না। উপরন্ত লোকেরা তরবারিকে খুব বেশি ভয় পায়। ফলে তা জীবন্ত লোকদের জন্য একটা ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং নিহত ব্যক্তির অভিভাবকদের ক্রোধাগ্নিও নির্বাপিত করে। শরীয়ত হত্যাকারীর উপর 'কিসাস' কার্যকর করার পূর্বে ও পরে তাকে কোনরূপ অপমানিত বা লাঞ্ছিত করার অনুমতি দেয় না। কিসাসের বিধান করা হয়েছে সুবিচার ও ন্যায়পরতার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। তাই বলে কিসাস কার্যকর করার পূর্বে তাকে কোনরূপ মারধর করা, তার উপর নির্যাতন-নিষ্পেষণ চালানো, জেলের মধ্যে কষ্ট দেওয়া বা ক্ষুৎ-পিপাসায় ছটফট করতে বাধ্য করা এবং কিসাস কার্যকর হওয়ার পর তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ টুকরা টুকরা করা, দেহ বিকলাঙ্গ বা বিকৃত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বরং কিসাস কার্যকর হওয়ার পর তার জানাযা পড়া ও মুসলমানদের কবরস্থানে তাকে দাফন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি কোন ভোঁতা অস্ত্র দ্বারা হত্যা করতেও নিষেধ করা হয়েছে।
রাসূলে করীম (সা) বলেছেন:
"আল্লাহ্ তা'আলা সব জিনিসের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ প্রদর্শন লিখে দিয়েছেন। অতএব তোমরা যখন হত্যা করবে (দণ্ডস্বরূপ), তখন এই হত্যাকার্য উত্তমভাবে সম্পন্ন করবে, আবার যখন যবেহ করবে তখনও খুব ভালোভাবে যবেহ কার্য সম্পন্ন করবে। (হত্যা বা যবেহর কাজ) তোমাদের যে-ই করবে, সে যেন তার ছুরি খুব শানিত করে লয় এবং যবেহ করার পর যবেহকৃত প্রাণীটি সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা হওয়ার সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।"
কোন কোন শরীয়ত বিশেষজ্ঞ এই মত প্রকাশ করেছেন যে, হত্যার দণ্ডস্বরূপ যে হত্যা কার্য হবে, তা ঠিক সেইভাবেই হতে হবে যেভাবে প্রথম হত্যাকাণ্ডটি হয়েছিল। দলীল হিসাবে তাঁরা উল্লেখ করেছেন কুরআন মজীদের নিম্নোদ্ধৃত আয়াত দুইটি:
"তোমরা যখন প্রতিশোধস্বরূপ শাস্তি দেবে, তখন তোমরা তা করবে ঠিক সেইভাবে, যেভাবে তোমরা নিজেরা (ইতিপূর্বে) শাস্তি পেয়েছ।" -সূরা নাহল: ১২৬
"অতএব যে লোক তোমাদের উপর সীমালংঘনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করল, তোমরাও ঠিক সেইরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ কর যেমন তোমাদের উপর সীমালংঘন করা হয়েছে।" -সূরা বাকারা: ১৯৪
রাসূলে করীম (সা) এসব আয়াতের আলোকেই একজন ইয়াহুদীর মস্তক দুইটি প্রস্তরের মাঝে রেখে ছেঁচে দিয়েছিলেন। কেননা সে দুইটি প্রস্তরের মাঝখানে রেখে একটি মেয়ের মস্তক চূর্ণ করেছিল।
📄 কিসাস সম্পূর্ণ করার শর্ত
কিসাস কার্যকরকরণের জন্য নিম্নোত শর্ত তিনটির পূর্ণভাবে পাওয়া যাওয়া একান্তই জরুরী।
-কিসাস যোগ্য ব্যক্তিকে অবশ্যই পূর্ণ বয়স্ক-শরীয়ত পালনে বাধ্য হওয়ার যোগ্য হতে হবে। যদি সে বালক বা পাগল হয়, তাহলে তার উপর কিসাস করা যাবে না। বরং তা বিলম্বিত করতে হবে। হত্যাকারীকে আটক করে রাখতে হবে যদ্দিন না বালক পূর্ণ বয়স্ক এবং পাগল পূর্ণরূপে সুস্থ মন-মগজ ও বিবেক-বুদ্ধির অধিকারী হচ্ছে।
-দণ্ড দেওয়ার যোগ্য সকল অধিকারীই দণ্ড কার্যকরকরণে সম্পূর্ণ একমত হবে। যোগ্য অধিকারী বলতে বোঝানো হয়েছে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী সব পুরুষ ও মেয়েলোক-বড় বয়সের ও ছোট বয়সের সব লোক। শরীয়তের জমহুর আলিমগণ এই মত প্রকাশ করেছেন। তবে তাঁদের মধ্য থেকে কেউ কেউ কেবল পুরুষ উত্তরাধিকারীদের কথাই বলেছেন। কেননা দণ্ডিতব্য ব্যক্তি তাদের সম্মুখেই লজ্জা পাবে।
-কিসাস পূর্ণরূপে কার্যকর হওয়ায় হত্যাকারী নয়-এমন ব্যক্তিদের পূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। 'কিসাস' যদি গর্ভধারিণীর উপর কার্যকর করতে হয় অথবা কিসাস ফরয হওয়ার পর সে গর্ভধারিণী হয়ে পড়ে, তাহলে গর্ভপ্রসব হওয়ার ও প্রসূতের দুগ্ধ সেবন সম্পূর্ণ হওয়ার পূর্বে তা কার্যকর করা যাবে না।