📄 হত্যা অপরাধ সাব্যস্ত হওয়ার জরুরী দিক
হত্যাকাণ্ডকে অপরাধরূপে চিহ্নিত ও নির্ণীত করার জন্য নিম্নোক্ত দিকগুলির উপস্থিতি ও বর্তমানতা অপরিহার্য:
১. হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার নির্দিষ্ট পাত্র।
২. হত্যাকার্যে ব্যবহৃত হাতিয়ার বা অস্ত্র।
৩. হত্যকাণ্ডের মূল কারণ-উদ্দেশ্য কি?
হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পাত্র হচ্ছে নিহত ব্যক্তি। একজন জীবন্ত ব্যক্তি সেই জীবন্ত ব্যক্তির প্রাণ সংহার করেছে। হত্যাকাণ্ডের হাতিয়াররূপে গণ্য হবে তা, যদ্বারা একজন জীবন্ত মানুষের প্রাণ সংহার করা কার্যত সম্ভব। আর উদ্দেশ্য বলতে এখানে ধর্তব্য হচ্ছে, হত্যাকারী তাকে হত্যা করতেই চেয়েছিল, হত্যা করার উদ্দেশ্যেই সে অস্ত্র দ্বারা আঘাত হেনেছিল এবং হত্যা করা ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য তার ছিল না- একথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হওয়া আবশ্যক।
টিকাঃ
১. আব্দুল কাদের আউদাহ শহীদ লিখেছেন : (১) শরীয়তের অকাট্য দলীলে যা অপরাধরূপে চিহ্নিত, কেবল তা-ই অপরাধ। এছাড়া অপরাধ বলে কোন কাজকে চিহ্নিত করা যাবে না। (২) যে লোক ব্যক্তিগতভাবে অপরাধ কাজে জড়িত, কেবল সে-ই অপরাধীরূপে চিহ্নিত হবে, অন্য কেউ নয় এবং (৩) কাজটির মূলে নিহিত থাকতে হবে হত্যা করার উদ্দেশ্য। হত্যা প্রমাণের জন্য তাঁর মতে অস্ত্রের কোন গুরুত্ব নেই। কেননা তা কখনো থাকে, কখনো থাকে না।
📄 ইচ্ছামূলক হত্যা-অপরাধ প্রমাণের শর্তাবলী
ইচ্ছামূলকভাবে হত্যা করেছে, অতএব তার কিসাস অনিবার্য-এই কথা প্রমাণের জন্য কতিপয় শর্ত রয়েছে। শর্তসমূহ পুরামাত্রায় পাওয়া গেলেই ইচ্ছামূলক হত্যা প্রমাণিত হবে এবং হত্যাকারীকে কিসাসের দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। এই শর্তসমূহের কয়েকটি হত্যাকারীর সহিত সংশ্লিষ্ট, আর কয়েকটিকে পেতে হবে নিহত ব্যক্তির মধ্যে।
হত্যাকারী হওয়ার জন্য জরুরী শর্ত হচ্ছে, তাকে শরীয়ত পালনে বাধ্য হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে। নিরাপত্তাপ্রাপ্ত হতে হবে এবং নিহত ব্যক্তির পিতা নয়- এমন হতে হবে। শরীয়ত পালনে বাধ্য হওয়ার যোগ্যতা হয় তখন যখন কোন লোক পূর্ণ বয়স্ক হয়, সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন হয়-পুরুষ-মহিলা যে-ই হোক-না কেন, হত্যাকারী সাব্যস্ত হতে কোন অসুবিধা নেই। আর নিরাপত্তাপ্রাপ্ত হওয়ার অর্থ, সে ইসলামী রাষ্ট্রের বৈধ নাগরিক হবে, অথবা ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাস করার স্বাধীনতা বা অধিকার প্রাপ্ত হবে ইসলামী রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত অধিকারে।
আর নিহত ব্যক্তিকে এরূপ রাষ্ট্রের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত ব্যক্তি হতে হবে।
📄 ভুলবশত অথবা প্রায়-ইচ্ছামূলক হত্যার অপরাধ
ইচ্ছামূলক হত্যার যে কয়টি শর্তের উল্লেখ রয়েছে, তার কোন একটিও যদি যথাযথ উপস্থিত না পাওয়া যায়, তাহলে সে হত্যাকে ইচ্ছামূলক হত্যা বলা যাবে না। বিশেষ করে দ্বিতীয় শর্তটির অনুপস্থিতিতে হত্যাটিকে বলতে হবে 'প্রায় ইচ্ছামূলক' অথবা 'পূর্ণ মাত্রায় ইচ্ছামূলক নয়', 'ইচ্ছামূলক হত্যা সদৃশ'। আর তৃতীয় শর্ত 'হত্যার উদ্দেশ্যে' অস্ত্র চালানো না হলে সে হত্যাকে 'ভুলবশত হত্যা' বলতে হবে।
শরীয়ত বিশেষজ্ঞগণ হত্যাকাণ্ডের এইরূপ শ্রেণীবিন্যাসই করেছেন। তবে কেউ কেউ বলেছেন, হত্যা দু'প্রকার, হয় তা ইচ্ছামূলক হবে, না হয় 'ভুলবশত হত্যা' হবে। তৃতীয় কোন প্রকারের হত্যা অকল্পনীয়।
হত্যার এরূপ শ্রেণীবিন্যাসের প্রয়োজন রয়েছে। কেননা শরীয়ত অনুযায়ী কেবলমাত্র ইচ্ছামূলক হত্যার শাস্তি হচ্ছে 'কিসাস'। যে হত্যা পুরাপুরি ইচ্ছামূলক নয়-প্রায় ইচ্ছামূলক বা ইচ্ছামূলক সদৃশ, কিংবা যা ভুলবশত সংঘটিত হয়েছে, তাতে 'কিসাস' হবে না, 'দীয়াত' দিতে হবে। তবে নিহত ব্যক্তির অভিভাবকরা যদি ক্ষমা করে দেয়, তাহলে কিছুই দিতে হবে না।
📄 এই কথার দলীল
আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
"কোন মু'মিনের জন্য জায়েয নয় কোন মু'মিনকে হত্যা করা। তবে ভুলবশত হয়ে যেতে পারে। তাই যে লোক কোন মু'মিনকে ভুলবশত হত্যা করবে, তার কাফ্ফারা হচ্ছে একটি মু'মিন ক্রীতদাস মুক্ত করা এবং নিহতের অভিভাবকের নিকট সমর্পিত দীয়াত। তবে তারা যদি সাদকা করে দেয়, তাহলে স্বতন্ত্র কথা।"
আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেছেন:
"যদি নিহত ব্যক্তিটি এমন জনগোষ্ঠীর লোক হয়, যাদের সহিত তোমাদের অনাক্রমণের চুক্তি সম্পাদিত আছে, তা'হলে নিহতের অভিভাবকদের নিকট দীয়াত হস্তান্তর করতে হবে ও একজন মু'মিন ক্রীতদাস মুক্ত করতে হবে।" -সূরা নিসা: ৯২
হযরত ওরওয়া ইবনয যুবায়র বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, হযরত হুযায়ফা ইবনুল য়ামান (রা) রাসূলে করীম (সা)-এর সঙ্গে ওহোদ যুদ্ধে শরীক হয়েছিলেন। মুসলমানরা তাঁর পিতাকে শত্রু পক্ষের লোক মনে করে তার উপর তরবারির আঘাত হানলেন। হযরত হুযায়ফা বললেন, ইনি তো আমার পিতা। কিন্তু লোকেরা তাঁর কথা বুঝতে না পেরে তাঁরা তাকে হত্যা করে ফেললেন। তখন তিনি বলে উঠলেন: আল্লাহ্ তোমাদের ক্ষমা করুন, তিনিই সকল দয়াশীলের চাইতেও অধিক দয়াবান। পরে নবী করীম (সা) এই সংবাদ পেলেন। তাতে তাঁর নিকট হযরত হুযায়ফার মর্যাদা অনেক বেড়ে গেল।