📄 কিসাসে নিহিত জীবন-এর তাৎপর্য
আল্লাহ্ তা'আলা বিবেক-বুদ্ধিমান লোকদের লক্ষ্য করে বলেছেন: "হে বুদ্ধিমান লোকেরা, কিসাসে তোমাদের জন্য জীবন নিহিত রয়েছে। এর ফলে তোমরা রক্ষা পাবে বলে আশা করা যায়।"
'কিসাসে নিহিত জীবন' বলতে আল্লাহ্ তা'আলা কি বোঝাতে চেয়েছেন? অথচ কিসাসেও তো রক্তপাত ও প্রাণ সংহার সংঘটিত হয়ে থাকে?
জওয়াবে বলা যায়, ইসলাম হচ্ছে সুবিচার ও ন্যায়পরতা প্রতিষ্ঠাকারী জীবন বিধান। মুসলিম ব্যক্তির বিবেক-বুদ্ধি ও মন-মানসিকতাকে সঠিক ও সুষ্ঠুরূপে লালন করে, ক্রমবৃদ্ধি ও বিকাশ দান করে। মানুষের প্রকৃতিতে নিহিত স্বাভাবিক ভাবধারা ও প্রবণতার প্রতি ইসলাম কোনরূপ উপেক্ষা প্রদর্শন করেনি বা তা করতে বলেওনি। কেননা তা করা হলে মানুষকে সেই কাজের দায়িত্ব দেয়া হতো, যা তার সাধ্যায়ত্ত নয়। ইসলামী শরীয়তও মানুষের সাধ্যাতীত কোন কাজের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়নি মানুষের উপর। বরং শরীয়ত সহজতা ও কষ্ট লাঘবের বিধান নিয়ে এসেছে। অতএব যে কাজ মানুষের প্রতি কেবল সেই কাজ করারই নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যা সে করবার সাধ্য রাখে। যদি অসাধ্য সাধনের নির্দেশ দেয়া হতো, তা হলে সে নির্দেশ এবং তার বাস্তবায়নের মাঝে বিরাট প্রতিবন্ধকতা মাথাচাড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। সে নির্দেশ কখনই বাস্তবায়িত হতে পারতো না এবং শরীয়ত কখনই কার্যকর হতো না। ইসলামী শরীয়ত কি করে মানুষকে অসাধ্য সাধনের নির্দেশ দিতে পারে! এ শরীয়ত তো অসম্পূর্ণ বিবেক-বুদ্ধির মানুষের রচিত নয়। এ শরীয়ত হচ্ছে মহান দয়াময় ও চূড়ান্ত বিধানদাতা আল্লাহ্ তা'আলা রচিত ও উপস্থাপিত। তিনি তো মুসলমানদের সার্বিক কল্যাণই কামনা করেন এবং তাদের শান্তি ও নিরাপত্তার পথ প্রদর্শন করেন ও সেই দিকে পরিচালিত-ও করেন।
বস্তুত নিহত ব্যক্তির অভিভাবক ও নিকটাত্মীয়দের মনে সে জন্য যে ক্রোধের সঞ্চার হয়, পাষাণ মন-মানসিকতায় যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, তারা স্পষ্ট দেখতে পায় ও অনুভব করে যে, তাদের উপর অকারণ অবর্ণনীয় যুলুম করা হয়েছে, ইসলামী শরীয়ত তার গুরুত্বপূর্ণ মাত্রায় স্বীকার করছে। তাদের হৃদয় মনে যে ক্রোধ আক্রোশ ও প্রতিশোধ স্পৃহার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে, যা অন্যায়ভাবে হত্যাকারীর রক্তপাত করা ছাড়া কিছুতেই নির্বাপিত হবে না, ইসলাম তার গুরুত্বও অস্বীকার করেনি; বরং অত্যন্ত স্বাভাবিক বলেই গণ্য করেছে। কেননা জীবনের উপর অকারণ হামলা মূলতই প্রতিকারহীন। প্রাণ সংহারের পর তাকে দেহে পুনরায় ফিরিয়ে আনা তো কারুর পক্ষেই সম্ভব নয়। দেহ ও প্রাণের বিচ্ছেদ চিরন্তন চিরকালের জন্যই। এই দুনিয়ায় এ দুয়ের পুনর্মিলন আর কখনই সম্ভব হতে পারে না। আর প্রাণ ও দেহের মধ্যকার এই বিচ্ছেদ সৃষ্টিকারী হচ্ছে তার হত্যাকারী। সে-ই তো তাকে অকারণ-বরঞ্চ যুলুমস্বরূপ হত্যা করে এই অবস্থার সৃষ্টি করেছে।
ফলে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত ভয়াবহ হওয়াই স্বাভাবিক। ইসলাম পূর্বকালে-সর্বকালের সকল দেশের সকল জাহিলী সমাজেই এর ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। তখন নিহতের পক্ষের লোকেরা এক ব্যক্তির জীবন নাশের প্রতিফলস্বরূপ একাধিক মানুষকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করত না-এখনও করে না। তাতে আসল হত্যাকারীর বদলে নিহত হতো এক বা একাধিক এমন লোক, যারা প্রথম হত্যাকাণ্ড করেনি বা তার সহিত জড়িতও ছিল না। এর পরিণতিতে এমন ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়ে যেত, যা বংশানুক্রমে চলতে থাকত। কেননা হত্যাকারী নয় এমন লোককে হত্যা করলে সেই নিহতের পক্ষের লোকদের মনে ক্রোধের সঞ্চার হওয়া খুবই স্বাভাবিক। প্রতিশোধ গ্রহণের এ আক্রোশ খুবই ভয়াবহ হয়ে দেখা দিত। ফলে গোটা সমাজ পরিবেশই মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়াত। মানুষের জীবনের কোন নিরাপত্তা পাওয়ার কোন আশাই করা যায় না এইরূপ অবস্থায়। মানব বিধ্বংসী চক্র তখন তীব্র গতিতে আবর্তিত হতে শুরু করে, যার আঘাতে অসংখ্য মানুষের জীবন নাশ হয়। সে চক্র কিছুতেই থাকতে চায় না।
এই প্রেক্ষিতেই আল্লাহ্ ঘোষণা- 'কিসাসে' তোমাদের জন্য জীবন নিহিত' কথাটির গভীর ও ব্যাপক তাৎপর্য অনুধাবননীয়। অকারণ ও জুলুম স্বরূপ নিহত ব্যক্তির আপনজনের মনে যে ক্রোধ ও প্রতিশোধ গ্রহণের আগুন জ্বলে ওঠে, ইসলামের বিধান অনুযায়ী 'কিসাস' কার্যকর হলেই সে আগুন নির্বাপিত হতে পারে এবং যারা হত্যাকারী নয়, তাদের জীবনের নিরাপত্তা বিধান করাও সম্ভবপর। তখন অকারণ আর কারোর জীবন নাশ হওয়ারও আশংকা থাকে না। কেউ কাউকে হত্যা করতে উদ্যত হবে না। কেননা সে নিঃসন্দেহে জানবে যে, অকারণ কাউকে হত্যা করলে তাঁকেও প্রাণ দিতে হবে সেই হত্যার শাস্তিস্বরূপ। আর এ-ই হচ্ছে চূড়ান্ত মাত্রার ইনসাফ ও সুবিচার।
📄 হত্যা অপরাধ সাব্যস্ত হওয়ার জরুরী দিক
হত্যাকাণ্ডকে অপরাধরূপে চিহ্নিত ও নির্ণীত করার জন্য নিম্নোক্ত দিকগুলির উপস্থিতি ও বর্তমানতা অপরিহার্য:
১. হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার নির্দিষ্ট পাত্র।
২. হত্যাকার্যে ব্যবহৃত হাতিয়ার বা অস্ত্র।
৩. হত্যকাণ্ডের মূল কারণ-উদ্দেশ্য কি?
হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পাত্র হচ্ছে নিহত ব্যক্তি। একজন জীবন্ত ব্যক্তি সেই জীবন্ত ব্যক্তির প্রাণ সংহার করেছে। হত্যাকাণ্ডের হাতিয়াররূপে গণ্য হবে তা, যদ্বারা একজন জীবন্ত মানুষের প্রাণ সংহার করা কার্যত সম্ভব। আর উদ্দেশ্য বলতে এখানে ধর্তব্য হচ্ছে, হত্যাকারী তাকে হত্যা করতেই চেয়েছিল, হত্যা করার উদ্দেশ্যেই সে অস্ত্র দ্বারা আঘাত হেনেছিল এবং হত্যা করা ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য তার ছিল না- একথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হওয়া আবশ্যক।
টিকাঃ
১. আব্দুল কাদের আউদাহ শহীদ লিখেছেন : (১) শরীয়তের অকাট্য দলীলে যা অপরাধরূপে চিহ্নিত, কেবল তা-ই অপরাধ। এছাড়া অপরাধ বলে কোন কাজকে চিহ্নিত করা যাবে না। (২) যে লোক ব্যক্তিগতভাবে অপরাধ কাজে জড়িত, কেবল সে-ই অপরাধীরূপে চিহ্নিত হবে, অন্য কেউ নয় এবং (৩) কাজটির মূলে নিহিত থাকতে হবে হত্যা করার উদ্দেশ্য। হত্যা প্রমাণের জন্য তাঁর মতে অস্ত্রের কোন গুরুত্ব নেই। কেননা তা কখনো থাকে, কখনো থাকে না।
📄 ইচ্ছামূলক হত্যা-অপরাধ প্রমাণের শর্তাবলী
ইচ্ছামূলকভাবে হত্যা করেছে, অতএব তার কিসাস অনিবার্য-এই কথা প্রমাণের জন্য কতিপয় শর্ত রয়েছে। শর্তসমূহ পুরামাত্রায় পাওয়া গেলেই ইচ্ছামূলক হত্যা প্রমাণিত হবে এবং হত্যাকারীকে কিসাসের দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। এই শর্তসমূহের কয়েকটি হত্যাকারীর সহিত সংশ্লিষ্ট, আর কয়েকটিকে পেতে হবে নিহত ব্যক্তির মধ্যে।
হত্যাকারী হওয়ার জন্য জরুরী শর্ত হচ্ছে, তাকে শরীয়ত পালনে বাধ্য হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে। নিরাপত্তাপ্রাপ্ত হতে হবে এবং নিহত ব্যক্তির পিতা নয়- এমন হতে হবে। শরীয়ত পালনে বাধ্য হওয়ার যোগ্যতা হয় তখন যখন কোন লোক পূর্ণ বয়স্ক হয়, সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন হয়-পুরুষ-মহিলা যে-ই হোক-না কেন, হত্যাকারী সাব্যস্ত হতে কোন অসুবিধা নেই। আর নিরাপত্তাপ্রাপ্ত হওয়ার অর্থ, সে ইসলামী রাষ্ট্রের বৈধ নাগরিক হবে, অথবা ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাস করার স্বাধীনতা বা অধিকার প্রাপ্ত হবে ইসলামী রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত অধিকারে।
আর নিহত ব্যক্তিকে এরূপ রাষ্ট্রের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত ব্যক্তি হতে হবে।
📄 ভুলবশত অথবা প্রায়-ইচ্ছামূলক হত্যার অপরাধ
ইচ্ছামূলক হত্যার যে কয়টি শর্তের উল্লেখ রয়েছে, তার কোন একটিও যদি যথাযথ উপস্থিত না পাওয়া যায়, তাহলে সে হত্যাকে ইচ্ছামূলক হত্যা বলা যাবে না। বিশেষ করে দ্বিতীয় শর্তটির অনুপস্থিতিতে হত্যাটিকে বলতে হবে 'প্রায় ইচ্ছামূলক' অথবা 'পূর্ণ মাত্রায় ইচ্ছামূলক নয়', 'ইচ্ছামূলক হত্যা সদৃশ'। আর তৃতীয় শর্ত 'হত্যার উদ্দেশ্যে' অস্ত্র চালানো না হলে সে হত্যাকে 'ভুলবশত হত্যা' বলতে হবে।
শরীয়ত বিশেষজ্ঞগণ হত্যাকাণ্ডের এইরূপ শ্রেণীবিন্যাসই করেছেন। তবে কেউ কেউ বলেছেন, হত্যা দু'প্রকার, হয় তা ইচ্ছামূলক হবে, না হয় 'ভুলবশত হত্যা' হবে। তৃতীয় কোন প্রকারের হত্যা অকল্পনীয়।
হত্যার এরূপ শ্রেণীবিন্যাসের প্রয়োজন রয়েছে। কেননা শরীয়ত অনুযায়ী কেবলমাত্র ইচ্ছামূলক হত্যার শাস্তি হচ্ছে 'কিসাস'। যে হত্যা পুরাপুরি ইচ্ছামূলক নয়-প্রায় ইচ্ছামূলক বা ইচ্ছামূলক সদৃশ, কিংবা যা ভুলবশত সংঘটিত হয়েছে, তাতে 'কিসাস' হবে না, 'দীয়াত' দিতে হবে। তবে নিহত ব্যক্তির অভিভাবকরা যদি ক্ষমা করে দেয়, তাহলে কিছুই দিতে হবে না।