📄 এই পর্যায়ে আমাদের অভিমত
আমরা হত্যাকারীর তওবা কবুল না হওয়া সম্পর্কিত মতটি গ্রহণ করতে পারিনি। আমরা মনে করি সকল প্রকার অপরাধীর জন্যই তওবার দুয়ার চির উন্মুক্ত। তা কখনই বন্ধ হয় না জীবনে বেঁচে থাকা পর্যন্ত। তবে যদি কেউ মু'মিন ব্যক্তিকে হত্যা করাকে হারাম মনে না করে হালাল মনে করে, তাহলে তার তওবা কবুল না হওয়া সম্পর্কে আমাদের কোন দ্বিমত নেই। আর আসলে তওবা কবুল হওয়া না হওয়ার ব্যাপারটি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্র ইচ্ছাধীন। ইচ্ছা হলে তিনি তা কবুল করবেন, হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিবেন, নতুবা প্রত্যাখান করবেন ও আযাব দিবেন।
আমাদের দৃষ্টিতে এই মতটিই অকাট্য দলীলসমূহ দ্বারা সমর্থিত এবং শরীয়তের মৌল ভাবধারার সহিত অধিকতর সামঞ্জস্যশীল। এই মতের দলীল:
"আর যাদের অবস্থা এমন যে, তাদের দ্বারা যদি কোন অশ্লীল কাজ সংঘটিত হয় কিংবা তারা কোন গুনাহ্ করে নিজেদের উপর যুলুম করে সে, তবে সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহ্ কথা তাদের স্মরণ হয় এবং তাঁর নিকট তারা তাদের পাপের ক্ষমা চায়। কেননা আল্লাহ্ ছাড়া গুনাহ্ মাফ করতে পারে এমন আর কে আছে? এই লোকেরা শুনিয়া-বুঝিয়া নিজেদের অন্যায় কাজ পৌনপুনিকভাবে করে না। এই ধরনের লোকদের প্রতিফল তাদের আল্লাহর নিকট এই রয়েছে যে, তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন এবং এমন বাগিচায় তাদের দাখিল করবেন, যার নিম্নদেশ থেকে স্রোতধারা সদা প্রবাহিত এবং তথায় তারা চিরদিন থাকবে। বস্তুত আমলকারীদের জন্য কতই না কর্মফল রয়েছে।" -সূরা আল-ইমরান: ১৩৫-১৩৬
আল্লাহ্ বলেছেনঃ
"সে আল্লাহ্ তিনিই, যিনি তাঁর বান্দাগণের পক্ষ থেকে তওবা কবুল করেন এবং তার খারাপ কার্যসমূহ ক্ষমা করে দেন।" -সূরা শূরা: ২৫
"এই লোকেরা কি জানে না যে, মহান আল্লাহ্ তাঁর বান্দাগণের তওবা কবুল করেন ও তাদের সাদৃশসমূহ গ্রহণ করেন এবং সব চাইতে বড় কথা আল্লাহ্ তো চিরন্তন তওবা কবুলকারী অতিশয় দয়াবান।" -সূরা তাওবা: ১০৪
"আল্লাহ্র সহিত শিরক্ করা হলে তিনি তা ক্ষমা করেন না। আর তার চাইতে কম মাত্রার গুণাহ্ যাকে ইচ্ছা মাফ করে দেন।" -সূরা নিসা: ১১৬
রাসূলে করীম (সা) বলেছেন:
"হিজরত বন্ধ হবে না যতক্ষণ না, তওবা বন্ধ হচ্ছে এবং তওবাও বন্ধ হবে না যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হচ্ছে।"
"তোমরা আমার হাতে এই কথার উপর বায়'আত কর যে, তোমরা আল্লাহ্র সহিত একবিন্দু শিরক্ করবে না, ব্যভিচার করবে না, সুবিচার ভিত্তিক ছাড়া আল্লাহ্ হারাম করা মানুষ হত্যার অপরাধ করবে না। কোন লোক যদি এইসব অপরাধের কোন একটা করে বসে এবং সে জন্য সে দুনিয়ায় শাস্তিপ্রাপ্ত হয়, তাহলে তা তার জন্য কাফ্ফারা গণ্য হবে। আর কেউ যদি অনুরূপ কোন অপরাধ করে এবং আল্লাহ্ তা গোপন করেন, তাহলে আল্লাহ্ চাইলে তাকে ক্ষমা করে দেবেন, আর চাইলে তাকে আযাব দিবেন-এটা সম্পূর্ণ তাঁরই ইখতিয়ার।"
হাদীসে আমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের এক ব্যক্তির ঘটনা এভাবে বিবৃত হয়েছে যে, সে নিরানব্বইজন ব্যক্তিকে হত্যা করেছিল। সে তার সময়কার একজন আলিমকে জিজ্ঞাসা করেছিল যে, তার এই অপরাধের জন্য তার তওবা করার দুয়ার খোলা আছে কি-না? সে বলেছিল, না তার এ অপরাধের কোন তওবা নেই। এই কথা শুনে সে ক্রুদ্ধ হয়ে সেই আলিমকেও হত্যা করে। এতে তার হত্যার সংখ্যা একশটি পূর্ণ হয়। পরে সে আর একজন আলিমের নিকট গিয়ে ফতোয়া চাইল। তিনি জওয়াবে বলেছিলেন, তার ও তওবা'র মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে এমন কিছুই কোথাও নেই এবং তিনি তাকে কয়েকটি দেশের নাম করে সে সব দেশে চলে যেতে বললেন। কেননা এইসব দেশের লোক আল্লাহ্ ইবাদত করে এবং সে যেন তাদের সাথে একত্র হয়ে এক আল্লাহর ইবাদতে আত্মনিয়োগ করে।
এই পর্যায়ে কুরআন মজীদের নিম্নোদ্ধৃত আয়াতটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ:
"বল হে আমার সেসব বান্দা। যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘনমূলক আচরণ করেছ, তোমরা আল্লাহ্র রহমত থেকে নিরাশ হবে না, আল্লাহ্ নিশ্চয়ই সমস্ত গুনাহ্ মাফ করে দেবেন। কেননা তিনিই অতিশয় ক্ষমাশীল ও অশেষ দয়াবান।" -সূরা যুমার: ৫৩
📄 প্রথমোক্ত মতের প্রমাণাদির পর্যালোচনা
প্রথমোক্ত মতের বড় দলীল হচ্ছে এই আয়াত (যার অর্থ) যে লোক কোন মু'মিন ব্যক্তিকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করবে, তার প্রতিফল হচ্ছে জাহান্নাম। তথায় চিরদিন থাকবে, আল্লাহ্ তার প্রতি ক্রুদ্ধ অসন্তুষ্ট হয়েছেন, তার উপর অভিশাপ বর্ষণ করেছেন এবং তার জন্য বড় ধরনের আযাব প্রস্তুত করে রেখেছেন।
এ সম্পর্কে বলা যেতে পারে যে, এই আয়াতটি একটি নির্দিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছিল বলে এই আয়াতের প্রতিপাদ্য সেই নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তার উপর কিয়াস করে কোন সাধারণ নিয়ম গ্রহণ করা যাবে না এবং তা থেকে সরে গিয়ে অনুরূপ অন্যান্য ঘটনাবলী সম্পর্কে অনুরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত হবে না।
আর সে ঘটনাটি ছিল এই যে, চারাবা পুত্র মকীম তার ভাই হিশামকে বনী নাজ্জার গোত্রের বসতির নিকট নিহত অবস্থায় পেল। এ দুই ভাই মুসলিম ছিলেন। পরে রাসূলে করীম (সা)-কে এই বিষয়ে খবর পাঠানো হলো। তখন নবী করীম (সা) বনু ফহরের একটি লোক তার সঙ্গে করে বনু নাজ্জারের নিকট পাঠালেন। তাদের নির্দেশ দিলেন যে, মকীমের ভাইর হত্যাকারীকে তার হাতে অর্পণ করে দাও। বনু নাজ্জারের লোকেরা বললো, হত্যাকারী কে, তা আমরা জানি না। তবুও আমরা এই রক্তের বিনিময়ে 'দীয়াত' দিতে প্রস্তুত আছি। তারা একশ'টি উট-ও তাকে দিয়ে দিল। লোকটি তা সঙ্গে নিয়ে মদীনায় রওয়ানা হলো। কিন্তু পরে পথিমধ্যে চারাবা বনু ফহরের ব্যক্তিটিকে হত্যা করল ও তার নিহত ভাইর রক্তের বিনিময়ে উটগুলি নিয়ে মক্কার দিকে চলে গেল মুরতাদ ও কাফির হয়ে। তখন এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল। তখন নবী করীম (সা) বলেছিলেন: এই ব্যক্তিকে আমি ইহ্রাম বা অ-ইহ্রাম যে অবস্থায়ই পাব, তাকে শেষ করে দেব। পরে মক্কা বিজয়কালে যখন সে কা'বার স্তম্ভ ধরে পানাহ চাচ্ছিল, রাসূলে করীম (সা) তাকে ধরে নিয়ে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
📄 কুরআনে কিসাস শব্দের প্রয়োগ
আল্লাহ্ কথা : "তোমাদের জন্য 'কিসাস' বা শান্তি দানে (Punishment) জীবন নিহিত।"
'হত্যার শাস্তিস্বরূপ হত্যাকারীকে হত্যা করাকে' কুরআন বলেছে কিসাস (قصاص)। 'কিসাস' শব্দ ব্যবহারের কারণ হচ্ছে, এই শব্দটি সুবিচার (Justice), সমান সমান (Sameness) ও অনুরূপতা (Similarity) বোঝায়। বস্তুত এই শব্দটি মূল বিষয়টিকে পুরোপুরি ব্যক্ত করে, তাতে তাকিদ বোঝায় এবং তার সব কয়টি দিককে রক্ষা করতে সক্ষম করে তোলে। বিশেষ করে হত্যাকারীর 'কিসাস' অর্থ এই দাঁড়ায় যে, হত্যাকারী প্রমাণের জন্য যতগুলি শর্ত রয়েছে এবং তার আনুসঙ্গিক যে জরুরী বিষয়াদি রয়েছে তা সবই পূর্ণমাত্রায় তাতে বর্তমান পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত 'কিসাস' হচ্ছে সমাজ-সমষ্টির বিধি। কুরআন এই কারণে এই শব্দটি ব্যবহার করেছে قصاص। শব্দটির ব্যবহার করা হয়নি। কেননা এই শব্দটি ব্যক্তিগত আইন বোঝায়।
এ ছাড়াও এই পর্যায়ে এ শব্দগুলিও রয়েছে, যেমন: প্রতিশোধ (To revenge), হত্যা (To kill) ও নিহতের বদলে হত্যাকারীকে হত্যা করা। কিন্তু কুরআন মজীদ এই শব্দগুলির কোন একটিও তার বক্তব্য বোঝাবার জন্য ব্যবহার করেনি। তার কারণ হচ্ছে, প্রথম শব্দটিতে শত্রুতা, প্রতিহিংসা (ill will), অসংবৃত ক্রোধ, রক্তপাতের অত্যুৎসাহ এবং তাতে অন্যদেরও শরীক হওয়ার জন্য উত্তেজিত করা বোঝায়। জাহিলিয়তের যুগে এই শব্দটি এ অর্থেই ব্যবহার হতো।
দ্বিতীয় শব্দটি 'হত্যা' বললে প্রথমটাও হত্যা আর তার দণ্ডস্বরূপ যা করা হলো সেটাও 'হত্যা' হয়ে যায়। ইচ্ছাপূর্বক বা সীমালংঘনমূলকভাবে হত্যা ও বিচারস্বরূপ হত্যা-এর মধ্যে কোন পার্থক্য বোঝায় না।
আর তৃতীয় শব্দ লাঞ্ছনা ও অপমান বোঝায়; ঠিক যেমন গরু বা ছাগল-ভেড়া হত্যা করার জন্য টেনে নিয়ে যাওয়া হয়, এ-ও যেন তেমনি। কিন্তু ইসলামী শরীয়ত ইচ্ছামূলক হত্যার শাস্তিস্বরূপ হত্যাকারীকে হত্যা করার যে বিধান দিয়েছে, তাতে উপরোক্ত ধরনের কোন ভাবধারাই খুঁজে পাওয়া যাবে না। বরং শরীয়তী ভাবধারা হচ্ছে সুবিচার ও ন্যায়পরতার প্রতিষ্ঠা এবং শান্তি ও নিরাপত্তার বাস্তবায়ন।
📄 কিসাসে নিহিত জীবন-এর তাৎপর্য
আল্লাহ্ তা'আলা বিবেক-বুদ্ধিমান লোকদের লক্ষ্য করে বলেছেন: "হে বুদ্ধিমান লোকেরা, কিসাসে তোমাদের জন্য জীবন নিহিত রয়েছে। এর ফলে তোমরা রক্ষা পাবে বলে আশা করা যায়।"
'কিসাসে নিহিত জীবন' বলতে আল্লাহ্ তা'আলা কি বোঝাতে চেয়েছেন? অথচ কিসাসেও তো রক্তপাত ও প্রাণ সংহার সংঘটিত হয়ে থাকে?
জওয়াবে বলা যায়, ইসলাম হচ্ছে সুবিচার ও ন্যায়পরতা প্রতিষ্ঠাকারী জীবন বিধান। মুসলিম ব্যক্তির বিবেক-বুদ্ধি ও মন-মানসিকতাকে সঠিক ও সুষ্ঠুরূপে লালন করে, ক্রমবৃদ্ধি ও বিকাশ দান করে। মানুষের প্রকৃতিতে নিহিত স্বাভাবিক ভাবধারা ও প্রবণতার প্রতি ইসলাম কোনরূপ উপেক্ষা প্রদর্শন করেনি বা তা করতে বলেওনি। কেননা তা করা হলে মানুষকে সেই কাজের দায়িত্ব দেয়া হতো, যা তার সাধ্যায়ত্ত নয়। ইসলামী শরীয়তও মানুষের সাধ্যাতীত কোন কাজের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়নি মানুষের উপর। বরং শরীয়ত সহজতা ও কষ্ট লাঘবের বিধান নিয়ে এসেছে। অতএব যে কাজ মানুষের প্রতি কেবল সেই কাজ করারই নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যা সে করবার সাধ্য রাখে। যদি অসাধ্য সাধনের নির্দেশ দেয়া হতো, তা হলে সে নির্দেশ এবং তার বাস্তবায়নের মাঝে বিরাট প্রতিবন্ধকতা মাথাচাড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। সে নির্দেশ কখনই বাস্তবায়িত হতে পারতো না এবং শরীয়ত কখনই কার্যকর হতো না। ইসলামী শরীয়ত কি করে মানুষকে অসাধ্য সাধনের নির্দেশ দিতে পারে! এ শরীয়ত তো অসম্পূর্ণ বিবেক-বুদ্ধির মানুষের রচিত নয়। এ শরীয়ত হচ্ছে মহান দয়াময় ও চূড়ান্ত বিধানদাতা আল্লাহ্ তা'আলা রচিত ও উপস্থাপিত। তিনি তো মুসলমানদের সার্বিক কল্যাণই কামনা করেন এবং তাদের শান্তি ও নিরাপত্তার পথ প্রদর্শন করেন ও সেই দিকে পরিচালিত-ও করেন।
বস্তুত নিহত ব্যক্তির অভিভাবক ও নিকটাত্মীয়দের মনে সে জন্য যে ক্রোধের সঞ্চার হয়, পাষাণ মন-মানসিকতায় যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, তারা স্পষ্ট দেখতে পায় ও অনুভব করে যে, তাদের উপর অকারণ অবর্ণনীয় যুলুম করা হয়েছে, ইসলামী শরীয়ত তার গুরুত্বপূর্ণ মাত্রায় স্বীকার করছে। তাদের হৃদয় মনে যে ক্রোধ আক্রোশ ও প্রতিশোধ স্পৃহার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে, যা অন্যায়ভাবে হত্যাকারীর রক্তপাত করা ছাড়া কিছুতেই নির্বাপিত হবে না, ইসলাম তার গুরুত্বও অস্বীকার করেনি; বরং অত্যন্ত স্বাভাবিক বলেই গণ্য করেছে। কেননা জীবনের উপর অকারণ হামলা মূলতই প্রতিকারহীন। প্রাণ সংহারের পর তাকে দেহে পুনরায় ফিরিয়ে আনা তো কারুর পক্ষেই সম্ভব নয়। দেহ ও প্রাণের বিচ্ছেদ চিরন্তন চিরকালের জন্যই। এই দুনিয়ায় এ দুয়ের পুনর্মিলন আর কখনই সম্ভব হতে পারে না। আর প্রাণ ও দেহের মধ্যকার এই বিচ্ছেদ সৃষ্টিকারী হচ্ছে তার হত্যাকারী। সে-ই তো তাকে অকারণ-বরঞ্চ যুলুমস্বরূপ হত্যা করে এই অবস্থার সৃষ্টি করেছে।
ফলে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত ভয়াবহ হওয়াই স্বাভাবিক। ইসলাম পূর্বকালে-সর্বকালের সকল দেশের সকল জাহিলী সমাজেই এর ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। তখন নিহতের পক্ষের লোকেরা এক ব্যক্তির জীবন নাশের প্রতিফলস্বরূপ একাধিক মানুষকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করত না-এখনও করে না। তাতে আসল হত্যাকারীর বদলে নিহত হতো এক বা একাধিক এমন লোক, যারা প্রথম হত্যাকাণ্ড করেনি বা তার সহিত জড়িতও ছিল না। এর পরিণতিতে এমন ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়ে যেত, যা বংশানুক্রমে চলতে থাকত। কেননা হত্যাকারী নয় এমন লোককে হত্যা করলে সেই নিহতের পক্ষের লোকদের মনে ক্রোধের সঞ্চার হওয়া খুবই স্বাভাবিক। প্রতিশোধ গ্রহণের এ আক্রোশ খুবই ভয়াবহ হয়ে দেখা দিত। ফলে গোটা সমাজ পরিবেশই মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়াত। মানুষের জীবনের কোন নিরাপত্তা পাওয়ার কোন আশাই করা যায় না এইরূপ অবস্থায়। মানব বিধ্বংসী চক্র তখন তীব্র গতিতে আবর্তিত হতে শুরু করে, যার আঘাতে অসংখ্য মানুষের জীবন নাশ হয়। সে চক্র কিছুতেই থাকতে চায় না।
এই প্রেক্ষিতেই আল্লাহ্ ঘোষণা- 'কিসাসে' তোমাদের জন্য জীবন নিহিত' কথাটির গভীর ও ব্যাপক তাৎপর্য অনুধাবননীয়। অকারণ ও জুলুম স্বরূপ নিহত ব্যক্তির আপনজনের মনে যে ক্রোধ ও প্রতিশোধ গ্রহণের আগুন জ্বলে ওঠে, ইসলামের বিধান অনুযায়ী 'কিসাস' কার্যকর হলেই সে আগুন নির্বাপিত হতে পারে এবং যারা হত্যাকারী নয়, তাদের জীবনের নিরাপত্তা বিধান করাও সম্ভবপর। তখন অকারণ আর কারোর জীবন নাশ হওয়ারও আশংকা থাকে না। কেউ কাউকে হত্যা করতে উদ্যত হবে না। কেননা সে নিঃসন্দেহে জানবে যে, অকারণ কাউকে হত্যা করলে তাঁকেও প্রাণ দিতে হবে সেই হত্যার শাস্তিস্বরূপ। আর এ-ই হচ্ছে চূড়ান্ত মাত্রার ইনসাফ ও সুবিচার।