📄 এই অপরাধের কারণ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার স্বরূপ
মানবেতিহাসের প্রথম হত্যাকাণ্ডটির সূচনা হয়েছিল হিংসা থেকে এবং পরিণতি লাভ করেছিল পরিপূর্ণ আল্লাদ্রোহিতায়। আল্লাহ্র নাফরমানী করা হলো, পিতা-মাতার সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করা হলো, ভাইর সহিত ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক চূর্ণ করা হলো এবং হারামভাবে রক্তপাত করা হলো। আর তা-ই হলো পৃথিবীর বুকে আল্লাহ্র সৃষ্ট মানুষের প্রথম রক্তপাত। অবশ্য তা-ই শেষ রক্তপাত নয়। তারপর মানুষের রক্তপাতের ধারা অব্যাহতভাবে চলতে লাগল। পৃথিবী যদ্দিন আছে এবং তার বুকে মানুষের বসবাস যদ্দিন অব্যাহত থাকবে, তদ্দিন মানুষের এই রক্তপাত বন্ধ হবে না। তাই ইসলামী শরীয়তের এ অপরাধের দণ্ড অকাট্য, স্থায়ী অপরিবর্তিত। এ অপরাধের নতুন কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। অবশ্য এই অপরাধের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া কি দেখা দিতে পারে, তা অবস্থার প্রেক্ষিতে অবশ্যই বিশ্লেষণ সাপেক্ষ।
আগেই বলেছি, পৃথিবীর বুকে প্রথম অনুষ্ঠিত এই নরহত্যার মূলীভূত কারণ ছিল হিংসা-দুই ভাই-ই কুরবানী করল; কিন্তু আল্লাহ্ কেন একজনের কুরবানী কবুল করলেন, অপরজনের কুরবানী কবুল করলেন না। হাবীলের কুরবানী কবুল করা হলো বলে তাকে হত্যা করা হলো, আর কাবীলের কুরবানী কবুল করা হলো না বলে সে হলো হত্যাকারী। কাবীলের মনে তীব্রভাবে জেগে উঠা হিংসাই তার মুখে সর্বপ্রথম প্রকাশিত হলো এই শব্দে—আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। পরে সে এই হিংসার বশবর্তী হয়েই কার্যত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল, আর তার ফলে সে হলো প্রথম মানুষ হত্যাকারী বিশ্ব মানবতার চিরন্তন দুশমন।
অবশ্য পরিণতিতে তাকে হতে হলো লজ্জিত, লাঞ্ছিত। আর আপন ভাইয়ের নিষ্প্রাণ লাশটা সম্মুখে দেখে সে সীমাহীন দুঃসহ মর্মপীড়ায় ছটফট করতে লাগল। অপরাধের তীক্ষ্ম অনুভূতি, ভুলের লাঞ্ছনা ও ক্ষতির ভয়াবহতা তাকে আকুল করে তুললো। সে দিশা পাচ্ছিল না, এই লাশ নিয়ে সে এখন কি করবে! কেমন করে কোথায় এ লাশকে লুকানো যায়, তা-ই ছিল তার সেই মুহূর্তের একমাত্র চিন্তা।
শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্ তা'আলা একটি কাককে সেখানে পাঠিয়েছিলেন এবং এই প্রথম হত্যাকারী তার অপরাধের শিকার তারই ভাইয়ের নিষ্প্রাণ দেহটিকে কি করে লুকানো যায়, তার পন্থা ও পদ্ধতির জন্য অপরাধীর শিক্ষা গুরু হলো সেই কাকটি। এই সময় তার কণ্ঠে যে অনুশোচনার বাণী ধ্বনিত ও উচ্চারিত হয়েছিল, তা ছিল : 'হায়, আমি এতই অক্ষম ও অসমর্থ হয়ে গেছি যে, এই কাকটির মত বুদ্ধিও আমার হলো না এবং আমার ভাইর লাশ গোপন করার পন্থাও উদ্ভাবন করতে পারলাম না।' হত্যাকাণ্ডের পর হত্যাকারীর মনে-মগজে যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় অতিদ্রুত এবং খুবই স্বাভাবিকভাবে, এ তারই প্রকাশ। বস্তুত কুরআন তার উন্নত ভাষা, সাহিত্যালংকার এবং তুলনাহীন প্রকাশ ক্ষমতার বলে এই মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার বর্ণনা উপস্থাপিত করেছে। পরে সে এই মানসিক যন্ত্রণানয়ে তিল তিল করে দগ্ধ হতে থাকে তার সমগ্র জীবনব্যাপী।
বস্তুত কুরআন মজীদ উপরোক্ত কাহিনীর মাধ্যমে যে দুইজন মানুষের প্রকৃত নিদর্শন উপস্থাপিত করেছে, এই পৃথিবী ধ্বংস না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত তারই পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে বারবার অব্যাহতভাবে।
১. উপরে যে দুইটি মানবীয় নিদর্শনের উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে একটি নিদর্শনের তাৎপর্য হচ্ছে, তার আল্লাহর সহিত তার স্বাভাবিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে সে আল্লাহ্র প্রতি ভয়ও পোষণ করে না, তাঁর নিকট থেকে ক্ষমা পাওয়ার কোন আশাও পোষণ করে না। ফলে তার অক্ষমতা প্রকট হয়ে পড়ে, তার দুঃখ যন্ত্রণা অসহনীয় হয়ে উঠে। এই কারণে এই লোভী বিদ্রোহী হিংসুটে মানুটির সব সুস্থ সব বুঝ হারিয়ে ফেলে তার মনুষ্যত্ব চরমভাবে পতিত হয়। তখন সে বন্যা রীতি-নীতির আচরণ গ্রহণ করে অন্য লোকদের সাথে। তাতে সব মানবীয় মূল্যমান উপেক্ষিত ও পদদলিত হয়। তখন কোন আদর্শ বা উচ্চতর নৈতিকতা তার হিংসার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে না। কেননা মূলতই সে আল্লাহ্ ভয় হারিয়ে ফেলেছে, কোন মানুষকেও সে সমীহ করে চলার প্রয়োজন বোধ করে না।
২. দ্বিতীয় নিদর্শনটি ছিল এমন একজন মানুষের, যার আল্লাহ্র সহিত সম্পর্ক ছিল দৃঢ়তর, তাঁর নাযিল করা দীন-ই ছিল তার একমাত্র অবলম্বন, সেই দীন থেকেই সে পথ নির্দেশ লাভ করেছিল। হিদায়ত পেতে সচেষ্ট ছিল সেই দীন থেকেই। সেই দীন থেকে যে পথ নির্দেশ সে পাচ্ছিল, তা-ই তার দৃষ্টিকে উজ্জ্বলতর করছিল, তার বিবেক-বুদ্ধিকে চালিত করছিল, তার অনুভূতি শক্তিকে সতেজ ও সক্রিয় বানিয়ে দিচ্ছিল, উন্নততর তাৎপর্যের ধারক বানিয়ে দিচ্ছিল।
বস্তুত মানুষের এই উন্নত আদর্শিক নিদর্শনই ইসলামের লক্ষ্য ও কাম্য এবং এই নিদর্শনের মানুষ তৈরি করার জন্যই দুনিয়ায় ইসলামের আগমন। এই কারণেই ইসলামী সমাজ সংস্থায় শরীয়তী আইন বিধান পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত করা ইসলামের প্রবল তাগীদ। ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলিম ব্যক্তি মাত্রই অপরাধ করবেন। এমন কথা নয়, তবে অপরাধ করলেও তার শাস্তি গ্রহণ করে অপরাধের কুপ্রভাব থেকে আত্মরক্ষা করাও তার পক্ষে সম্ভব। অথবা এই শাস্তির কথা জানতে পেরে সে হয়ত আর অপরাধ করবেও না, চিরদিনই তা থেকে পূর্ণ সতর্কতার সাথে দূরে সরে থাকবে, এই আশাটাও বিশ্ব মানবতার জন্য খুবই কল্যাণকর।
এই কারণে ইসলামী শরীয়তের উৎস কুরআন মজীদে ঘোষিত হয়েছে:
"যে লোক কোন মু'মিন ব্যক্তিকে ইচ্ছা ও সংকল্প গ্রহণ পূর্বক হত্যা করবে, তার প্রতিফল হচ্ছে জাহান্নাম। সে চিরদিনই তথায় থাকবে। আল্লাহ্ তার প্রতি ক্রুদ্ধ, তার উপর অভিশাপ করেছেন এবং তার জন্য কঠিন আযাব প্রস্তুত করে রেখেছেন।" -সূরা নিসা : ৯৩
আল্লাহ্ আরও বলেছেন :
"আর যারা আল্লাহর সহিত অপর কোন ইলাহকে শরীক করে না, আল্লাহ্ হারাম করা জান হত্যা করে না-সুবিচারের হত্যা ছাড়া এবং যিনা করে না, যে লোক তা করবে সে জাহান্নাম পাবে। কিয়ামতের দিন তার আযাব কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা হবে এবং নিতান্ত অপমানকর অবস্থায় সে চিরদিনই সেখানে থাকবে।" -সূরা ফুরকান : ৬৮-৬৯
"আর তোমরা সেই মানুষের প্রাণ হত্যা করো না, যা আল্লাহ্ হারাম করেছেন- নিতান্ত সুবিচারমূলক হত্যা ছাড়া; আল্লাহ্ তোমাদের এই উপদেশই দিয়েছেন, আশা করা যায় যে, তোমরা এর গুরুত্ব অনুধাবক করবে।" -সূরা আন'আম : ১৫১
"আর তোমরা সেই মানুষের প্রাণ সংহার করো না, যা তিনি হারাম করেছেন- নিতান্ত সুবিচারভিত্তিক হত্যা ব্যতীত। আর যে লোক যুলুম স্বরূপ নিহত হবে, তার অভিভাবকের জন্য আমরা একটি ক্ষমতা বানিয়ে দিলাম, অতএব সে যেন প্রতি হত্যায় সীমালংঘন না করে। সে অবশ্যই সাহায্যপ্রাপ্ত হবে।" -সূরা ইসরা : ৩৩
📄 এই পর্যায়ে আমাদের অভিমত
আমরা হত্যাকারীর তওবা কবুল না হওয়া সম্পর্কিত মতটি গ্রহণ করতে পারিনি। আমরা মনে করি সকল প্রকার অপরাধীর জন্যই তওবার দুয়ার চির উন্মুক্ত। তা কখনই বন্ধ হয় না জীবনে বেঁচে থাকা পর্যন্ত। তবে যদি কেউ মু'মিন ব্যক্তিকে হত্যা করাকে হারাম মনে না করে হালাল মনে করে, তাহলে তার তওবা কবুল না হওয়া সম্পর্কে আমাদের কোন দ্বিমত নেই। আর আসলে তওবা কবুল হওয়া না হওয়ার ব্যাপারটি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্র ইচ্ছাধীন। ইচ্ছা হলে তিনি তা কবুল করবেন, হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিবেন, নতুবা প্রত্যাখান করবেন ও আযাব দিবেন।
আমাদের দৃষ্টিতে এই মতটিই অকাট্য দলীলসমূহ দ্বারা সমর্থিত এবং শরীয়তের মৌল ভাবধারার সহিত অধিকতর সামঞ্জস্যশীল। এই মতের দলীল:
"আর যাদের অবস্থা এমন যে, তাদের দ্বারা যদি কোন অশ্লীল কাজ সংঘটিত হয় কিংবা তারা কোন গুনাহ্ করে নিজেদের উপর যুলুম করে সে, তবে সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহ্ কথা তাদের স্মরণ হয় এবং তাঁর নিকট তারা তাদের পাপের ক্ষমা চায়। কেননা আল্লাহ্ ছাড়া গুনাহ্ মাফ করতে পারে এমন আর কে আছে? এই লোকেরা শুনিয়া-বুঝিয়া নিজেদের অন্যায় কাজ পৌনপুনিকভাবে করে না। এই ধরনের লোকদের প্রতিফল তাদের আল্লাহর নিকট এই রয়েছে যে, তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন এবং এমন বাগিচায় তাদের দাখিল করবেন, যার নিম্নদেশ থেকে স্রোতধারা সদা প্রবাহিত এবং তথায় তারা চিরদিন থাকবে। বস্তুত আমলকারীদের জন্য কতই না কর্মফল রয়েছে।" -সূরা আল-ইমরান: ১৩৫-১৩৬
আল্লাহ্ বলেছেনঃ
"সে আল্লাহ্ তিনিই, যিনি তাঁর বান্দাগণের পক্ষ থেকে তওবা কবুল করেন এবং তার খারাপ কার্যসমূহ ক্ষমা করে দেন।" -সূরা শূরা: ২৫
"এই লোকেরা কি জানে না যে, মহান আল্লাহ্ তাঁর বান্দাগণের তওবা কবুল করেন ও তাদের সাদৃশসমূহ গ্রহণ করেন এবং সব চাইতে বড় কথা আল্লাহ্ তো চিরন্তন তওবা কবুলকারী অতিশয় দয়াবান।" -সূরা তাওবা: ১০৪
"আল্লাহ্র সহিত শিরক্ করা হলে তিনি তা ক্ষমা করেন না। আর তার চাইতে কম মাত্রার গুণাহ্ যাকে ইচ্ছা মাফ করে দেন।" -সূরা নিসা: ১১৬
রাসূলে করীম (সা) বলেছেন:
"হিজরত বন্ধ হবে না যতক্ষণ না, তওবা বন্ধ হচ্ছে এবং তওবাও বন্ধ হবে না যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হচ্ছে।"
"তোমরা আমার হাতে এই কথার উপর বায়'আত কর যে, তোমরা আল্লাহ্র সহিত একবিন্দু শিরক্ করবে না, ব্যভিচার করবে না, সুবিচার ভিত্তিক ছাড়া আল্লাহ্ হারাম করা মানুষ হত্যার অপরাধ করবে না। কোন লোক যদি এইসব অপরাধের কোন একটা করে বসে এবং সে জন্য সে দুনিয়ায় শাস্তিপ্রাপ্ত হয়, তাহলে তা তার জন্য কাফ্ফারা গণ্য হবে। আর কেউ যদি অনুরূপ কোন অপরাধ করে এবং আল্লাহ্ তা গোপন করেন, তাহলে আল্লাহ্ চাইলে তাকে ক্ষমা করে দেবেন, আর চাইলে তাকে আযাব দিবেন-এটা সম্পূর্ণ তাঁরই ইখতিয়ার।"
হাদীসে আমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের এক ব্যক্তির ঘটনা এভাবে বিবৃত হয়েছে যে, সে নিরানব্বইজন ব্যক্তিকে হত্যা করেছিল। সে তার সময়কার একজন আলিমকে জিজ্ঞাসা করেছিল যে, তার এই অপরাধের জন্য তার তওবা করার দুয়ার খোলা আছে কি-না? সে বলেছিল, না তার এ অপরাধের কোন তওবা নেই। এই কথা শুনে সে ক্রুদ্ধ হয়ে সেই আলিমকেও হত্যা করে। এতে তার হত্যার সংখ্যা একশটি পূর্ণ হয়। পরে সে আর একজন আলিমের নিকট গিয়ে ফতোয়া চাইল। তিনি জওয়াবে বলেছিলেন, তার ও তওবা'র মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে এমন কিছুই কোথাও নেই এবং তিনি তাকে কয়েকটি দেশের নাম করে সে সব দেশে চলে যেতে বললেন। কেননা এইসব দেশের লোক আল্লাহ্ ইবাদত করে এবং সে যেন তাদের সাথে একত্র হয়ে এক আল্লাহর ইবাদতে আত্মনিয়োগ করে।
এই পর্যায়ে কুরআন মজীদের নিম্নোদ্ধৃত আয়াতটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ:
"বল হে আমার সেসব বান্দা। যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘনমূলক আচরণ করেছ, তোমরা আল্লাহ্র রহমত থেকে নিরাশ হবে না, আল্লাহ্ নিশ্চয়ই সমস্ত গুনাহ্ মাফ করে দেবেন। কেননা তিনিই অতিশয় ক্ষমাশীল ও অশেষ দয়াবান।" -সূরা যুমার: ৫৩
📄 প্রথমোক্ত মতের প্রমাণাদির পর্যালোচনা
প্রথমোক্ত মতের বড় দলীল হচ্ছে এই আয়াত (যার অর্থ) যে লোক কোন মু'মিন ব্যক্তিকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করবে, তার প্রতিফল হচ্ছে জাহান্নাম। তথায় চিরদিন থাকবে, আল্লাহ্ তার প্রতি ক্রুদ্ধ অসন্তুষ্ট হয়েছেন, তার উপর অভিশাপ বর্ষণ করেছেন এবং তার জন্য বড় ধরনের আযাব প্রস্তুত করে রেখেছেন।
এ সম্পর্কে বলা যেতে পারে যে, এই আয়াতটি একটি নির্দিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছিল বলে এই আয়াতের প্রতিপাদ্য সেই নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তার উপর কিয়াস করে কোন সাধারণ নিয়ম গ্রহণ করা যাবে না এবং তা থেকে সরে গিয়ে অনুরূপ অন্যান্য ঘটনাবলী সম্পর্কে অনুরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত হবে না।
আর সে ঘটনাটি ছিল এই যে, চারাবা পুত্র মকীম তার ভাই হিশামকে বনী নাজ্জার গোত্রের বসতির নিকট নিহত অবস্থায় পেল। এ দুই ভাই মুসলিম ছিলেন। পরে রাসূলে করীম (সা)-কে এই বিষয়ে খবর পাঠানো হলো। তখন নবী করীম (সা) বনু ফহরের একটি লোক তার সঙ্গে করে বনু নাজ্জারের নিকট পাঠালেন। তাদের নির্দেশ দিলেন যে, মকীমের ভাইর হত্যাকারীকে তার হাতে অর্পণ করে দাও। বনু নাজ্জারের লোকেরা বললো, হত্যাকারী কে, তা আমরা জানি না। তবুও আমরা এই রক্তের বিনিময়ে 'দীয়াত' দিতে প্রস্তুত আছি। তারা একশ'টি উট-ও তাকে দিয়ে দিল। লোকটি তা সঙ্গে নিয়ে মদীনায় রওয়ানা হলো। কিন্তু পরে পথিমধ্যে চারাবা বনু ফহরের ব্যক্তিটিকে হত্যা করল ও তার নিহত ভাইর রক্তের বিনিময়ে উটগুলি নিয়ে মক্কার দিকে চলে গেল মুরতাদ ও কাফির হয়ে। তখন এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল। তখন নবী করীম (সা) বলেছিলেন: এই ব্যক্তিকে আমি ইহ্রাম বা অ-ইহ্রাম যে অবস্থায়ই পাব, তাকে শেষ করে দেব। পরে মক্কা বিজয়কালে যখন সে কা'বার স্তম্ভ ধরে পানাহ চাচ্ছিল, রাসূলে করীম (সা) তাকে ধরে নিয়ে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
📄 কুরআনে কিসাস শব্দের প্রয়োগ
আল্লাহ্ কথা : "তোমাদের জন্য 'কিসাস' বা শান্তি দানে (Punishment) জীবন নিহিত।"
'হত্যার শাস্তিস্বরূপ হত্যাকারীকে হত্যা করাকে' কুরআন বলেছে কিসাস (قصاص)। 'কিসাস' শব্দ ব্যবহারের কারণ হচ্ছে, এই শব্দটি সুবিচার (Justice), সমান সমান (Sameness) ও অনুরূপতা (Similarity) বোঝায়। বস্তুত এই শব্দটি মূল বিষয়টিকে পুরোপুরি ব্যক্ত করে, তাতে তাকিদ বোঝায় এবং তার সব কয়টি দিককে রক্ষা করতে সক্ষম করে তোলে। বিশেষ করে হত্যাকারীর 'কিসাস' অর্থ এই দাঁড়ায় যে, হত্যাকারী প্রমাণের জন্য যতগুলি শর্ত রয়েছে এবং তার আনুসঙ্গিক যে জরুরী বিষয়াদি রয়েছে তা সবই পূর্ণমাত্রায় তাতে বর্তমান পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত 'কিসাস' হচ্ছে সমাজ-সমষ্টির বিধি। কুরআন এই কারণে এই শব্দটি ব্যবহার করেছে قصاص। শব্দটির ব্যবহার করা হয়নি। কেননা এই শব্দটি ব্যক্তিগত আইন বোঝায়।
এ ছাড়াও এই পর্যায়ে এ শব্দগুলিও রয়েছে, যেমন: প্রতিশোধ (To revenge), হত্যা (To kill) ও নিহতের বদলে হত্যাকারীকে হত্যা করা। কিন্তু কুরআন মজীদ এই শব্দগুলির কোন একটিও তার বক্তব্য বোঝাবার জন্য ব্যবহার করেনি। তার কারণ হচ্ছে, প্রথম শব্দটিতে শত্রুতা, প্রতিহিংসা (ill will), অসংবৃত ক্রোধ, রক্তপাতের অত্যুৎসাহ এবং তাতে অন্যদেরও শরীক হওয়ার জন্য উত্তেজিত করা বোঝায়। জাহিলিয়তের যুগে এই শব্দটি এ অর্থেই ব্যবহার হতো।
দ্বিতীয় শব্দটি 'হত্যা' বললে প্রথমটাও হত্যা আর তার দণ্ডস্বরূপ যা করা হলো সেটাও 'হত্যা' হয়ে যায়। ইচ্ছাপূর্বক বা সীমালংঘনমূলকভাবে হত্যা ও বিচারস্বরূপ হত্যা-এর মধ্যে কোন পার্থক্য বোঝায় না।
আর তৃতীয় শব্দ লাঞ্ছনা ও অপমান বোঝায়; ঠিক যেমন গরু বা ছাগল-ভেড়া হত্যা করার জন্য টেনে নিয়ে যাওয়া হয়, এ-ও যেন তেমনি। কিন্তু ইসলামী শরীয়ত ইচ্ছামূলক হত্যার শাস্তিস্বরূপ হত্যাকারীকে হত্যা করার যে বিধান দিয়েছে, তাতে উপরোক্ত ধরনের কোন ভাবধারাই খুঁজে পাওয়া যাবে না। বরং শরীয়তী ভাবধারা হচ্ছে সুবিচার ও ন্যায়পরতার প্রতিষ্ঠা এবং শান্তি ও নিরাপত্তার বাস্তবায়ন।