📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম > 📄 মুসলিম অপরাধ করে কেন

📄 মুসলিম অপরাধ করে কেন


মুসলিম ব্যক্তির ঈমান অত্যন্ত সুদৃঢ় ভিত্তির উপর গড়ে উঠে। আল্লাহ্, ফেরেশতা, কিতাব, নবী-রাসূল, পরকাল ও তাব্দীরের ভালো-মন্দের প্রতি যে ঈমান মুসলিমের হৃদয় মনে সঞ্চারিত থাকে তা যেমন অবিচল হয়, তেমনি অনড়, অপরিবর্তনীয়। আল্লাহর প্রতি ঈমানের অর্থ, আল্লাহই গোটা বিশ্বলোককে নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিটি বিন্দুর উপর অমোঘ। গোটা সৃষ্টিলোকের স্রষ্টা তিনি-ই, তিনি-ই তার সংরক্ষক।
পরকালের প্রতি ঈমানের অর্থ, জীবনের শেষে যে-মৃত্যু তা চূড়ান্ত ধ্বংস ও বিলয় নয়, পরে পুনরুজ্জীবিত হতে হবে এবং আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে স্বীয় জীবনের কার্যাবলীর পুঙ্খানুপঙ্খ হিসাবের পর জান্নাত অথবা জাহান্নাম প্রাপ্তি অনিবার্য ব্যাপার হয়ে আসবে।
يَوْمَ تَجِدُ كُلُّ نَفْسٍ مَّا عَمِلَتْ مِنْ خَيْرٍ مُّحْضَرًا وَ مَا عَمِلَتْ مِنْ سُوْءٍ تَوَدُّ لَوْ أَنَّ بَيْنَهَا وَ بَيْنَه أَمَدًا بَعِيدًا
সেইদিন যেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃত ভাল কাজসমূহ সম্মুখে উপস্থিত পাবে এবং যা কিছু খারাপ করেছে তা-ও। সে তখন কামনা করবে, তার খারাপ কাজ-সমূহ ও তার মধ্যে যদি সুদীর্ঘ দূরত্ব হতো (তাহলে কতই না ভালো হতো)। -সূরা আল-ইমরান: ৩০
কিন্তু যে মুসলিম উপরোক্ত আকীদায় বিশ্বাসী তার অন্তরে তার দৃঢ় ও প্রভাবশালী হওয়ার ব্যাপারটি বিভিন্ন রকম হয়ে যাবে। উপরোক্ত ঈমান বিভিন্ন মানুষের মনে বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে থাকে। যদি কারুর অন্তরটিতে উক্তরূপ ঈমান মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় এবং তাতে নিহিত ভাবধারাসমূহ পূর্ণ মাত্রায় তা আয়ত্তাধীন হয়ে গিয়ে থাকে তা'হলে তার সে অন্তর এমনভাবে সুরক্ষিত হয়ে থাকে যে, ফিতনা বিপর্যয়ের বিভ্রান্তির কোন আঘাত তার ভিতরের দিক দিয়ে আসতে পারে না, আসতে পারে না বাইরের দিক থেকে। কিন্তু এই ঈমান যদি কারুর অন্তরে দুর্বল হয়ে পড়ে, তা'হলে তাতে বিভ্রান্তি-ভিতর ও বাইর-উভয় দিক দিয়েই অনুপ্রবেশ করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নানাবিধ ভুল-ভ্রান্তির মধ্যে নিক্ষেপ করে। তখন তার দ্বারা বিভিন্ন প্রকারের অপরাধ সংঘটিত হওয়া খুবই সহজ বা একান্তই অনিবার্য হয়ে পড়ে।
তা'হলে বোঝা গেল, মুসলিম ব্যক্তির আকীদা ও বিশ্বাসের দুর্বলতা বা ক্ষীণতাই বিভ্রান্তির মৌল কারণ এবং এই বিভ্রান্তিই ব্যক্তি কর্তৃক অপরাধ সংঘটিত হওয়ার নিমিত্ত। এই কারণেই ইসলামী শরীয়ত সর্বপ্রথম মানুষের অন্তরে এই ঈমানকে গাঢ় সুদৃঢ় করে এবং তাতে কোনরূপ দুর্বলতা দেখা দিক, তা চায় না।
এই প্রেক্ষিতেই বলতে পারি, আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমানই ইসলামী সমাজে অপরাধ প্রবণতা দূরীভূত করে এবং দুষ্কৃতি তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম করে আনে।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম > 📄 শরীয়ত অবিভাজ্য

📄 শরীয়ত অবিভাজ্য


ইসলামী শরীয়ত অবিভাজ্য, বিভিন্ন ভাগে তাকে বিভক্ত করা যায় না-তাকে এমনভাবে খণ্ডাকারে গ্রহণ করা যায় না যে, প্রত্যেকটি খণ্ড অন্যান্য খণ্ডসমূহ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে দাঁড়াবে। আসলে ইসলাম ও ইসলামী শরীয়ত একটি সমগ্র, একটা সমষ্টি। তাকে এই সমগ্র বা সমষ্টি হিসাবেই অনুধাবন, গ্রহণ ও অনুসরণ করতে হবে। যারা ইসলামী শরীয়তকে বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত করে এবং তার ফলে তার কোন কোনটি পালন ও অনুসরণ করে, আর বাকি অংশসমূহকে প্রত্যাখ্যান বা অগ্রাহ্য করে, তাদের এই আচরণটা ঠিক সেই ব্যক্তির মত, যে এক ব্যক্তির একখানি হাত বা একটি পা কেটে বিচ্ছিন্ন করে লোকদের সামনে দাঁড় করে প্রচার ও দাবি করে যে, এই একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ তোমাদের সম্মুখে উপস্থিত। এই কাজটি যে কতটা হাস্যকর- অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক, তা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে বোঝাবার প্রয়োজন হয়না। বস্তুত ইসলামী শরীয়ত একটি পূর্ণাঙ্গ মানব সত্তার মতই অবিভাজ্য, অবিচ্ছিন্ন। তার মৌলনীতি ভাবধারা থেকে শুরু করে দূরতম নিয়ম ও বিধি-বিধান পর্যন্ত কোন একটিকেও অন্যান্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে বলা যেতে পারে না যে, এটাই হচ্ছে ইসলামী শরীয়ত। মানব-দেহের দূরবর্তী কোন প্রত্যঙ্গে ব্যথা অনুভূত হলে গোটা দেহ সত্তায়ই যেমন সে ব্যথায় সংক্রমিত হয়ে পড়ে-সে ব্যথায় জর্জরিত হয়ে উঠে দেহের প্রতিটি অঙ্গ ও অনু-পরমাণু, তেমন মানুষের পূর্ণাঙ্গ দেহের কোন একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রত্যঙ্গ অনুপস্থিত বা বিচ্ছিন্ন ও পরিত্যক্ত হলেও সে দেহকে পূর্ণাঙ্গ বলা যাবে না কখনও। ইসলামী শরীয়তের এই সামগ্রিকতা এমন একটি বিশেষত্ব; যার দৃষ্টান্ত আদর্শ বা আইন বিধানের জগতে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
এই শরীয়তই ইসলামী সমাজ গড়ে তুলে এবং তাকে সুসংগঠিত করে। শরীয়তই প্রথমে ব্যক্তিদের আদর্শবাদী ব্যক্তিরূপে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করে। এই আদর্শের প্রেরণা প্রথমে ব্যক্তিগণের মনে-মগজে জেগে উঠে। পর সম আদর্শিক প্রেরণাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পরস্পরের সহিত একাত্ম বানিয়ে সংঘটিত ও সুসংবদ্ধ করে একটি অখণ্ড সমাজের ব্যক্তিরূপে। তখন কোন ব্যক্তিই অন্য কোন ব্যক্তি থেকে একটুও বিচ্ছিন্ন নয়, তাদের পরস্পরের মধ্যেও থাকতে পারে না কোন মতদ্বৈততা বা পার্থক্য বিরোধ। চিন্তা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিকোণ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বাস্তব আইন-বিধান পর্যন্ত সবই একাকার। এই সমাজের প্রত্যেকটি ব্যক্তিই হয় অভিন্ন আদর্শে বিশ্বাসী, আদর্শের বাস্তব অনুসারী। ফলে সে সমাজের প্রত্যেকটি ব্যক্তি হয় স্বভাবতই অপরাধবিমুখ, অপরাধ-বিরোধ এবং অপরাধের মুলোৎপাটনকারী। তাদের কেউ-ই অপরাধ করতে প্রস্তুত নয়। ইচ্ছা করে কেউ অপরাধ করবে তা অকল্পনীয়। কেননা ইসলামী সমাজ সংঘঠিত হওয়ার সাথে সাথেই তা একটি আদর্শবাদী জাতির রূপ পরিগ্রহ করতে শুরু করে। এই জাতি বা জনসমষ্টির অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিগণের সহিত সে সংগঠনের আত্মিক সম্পর্কের সাথে সাথে দানা বেঁধে উঠে আদর্শিক ও বাস্তব সম্পর্ক। ফলে কর্তৃত্ব বা সার্বভৌমত্বের বিচ্ছিন্নতা কিংবা বিভিন্নতার কারণে সেই লোকগুলি কখনই ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ও পরস্পর সম্পর্কহীন হয়ে যেতে পারে না। তখন তা এক বিশ্বজাতি (Universal nation)-তে পরিণত হয়। কিন্তু মানব রচিত আইন বিধান কখনই এইরূপ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে পারে না। এই আইন দ্বারা ব্যক্তিগণের পরস্পরে শুধুমাত্র বাহ্যিক ও স্থূল সম্পর্কই গড়তে পারে, আত্মিক বা আদর্শিক সেতু বন্ধন রচনা করতে পারে না। এইরূপ সমাজে পর্যবেক্ষণ বা সংরক্ষণ প্রক্রিয়া যখনই দুর্বল হইয়া পড়ে এবং ব্যক্তি মনে করে যে, এখন অপরাধ করলে ধরা পড়ে যাওয়ার কোন আশংকা বা সম্ভাবনা নেই, ঠিক তখনই সে আইন-লংঘন বা সোজা কথায় অপরাধ করতে একটুও দ্বিধা করে না।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম > 📄 শরীয়ত মহান

📄 শরীয়ত মহান


ইসলামী শরীয়ত সমাজ ও জাতি গঠনে একটা অনন্য অবদান রাখতে পারে। এই শরীয়তের একটা উন্নত ও উচ্চতর লক্ষ্য রয়েছে। সেই লক্ষ্যকে বাস্তবায়িত করার জন্য তার চেষ্টা ও তৎপরতা চির অব্যাহত। মহান দৃষ্টান্ত, উচ্চতর মূল্যমান ও উন্নত চরিত্র স্থাপনই হচ্ছে তার লক্ষ্য। শরীয়ত সেই লক্ষ্য সম্মুখে রেখেই সমাজ ও জনসমষ্টি অর্থাৎ জাতিকে ক্রমাগতভাবে গড়ে তুলতে থাকবে।
এ শরীয়ত চিরন্তন ও শাশ্বত। কেননা তা বিশেষ জাতি, শ্রেণী, বর্ণ, বংশ বা কোন ভৌগোলিক অঞ্চলের সহিত সম্পৃক্ত নয়। এ শরীয়ত নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের জন্য- বিশেষ একটা সময়ের, দেশের মানুষের সহিত তা সম্পর্কিত নয়, সকল কালের সকল যুগের সকল সময়ের ও সকল দেশের মানুষের সহিতই তার সম্পর্ক এবং তাদেরকে সেই লক্ষ্যের পানে পরিচালিত করতে সর্বতোভাবে সক্ষম। এই শরীয়ত কাল-বর্ণ- বংশ-ভাষা ও স্থানের সংকীর্ণতার অনেক ঊর্ধ্বে, সম্পূর্ণভাবে বিশ্বজনীন।
এ শরীয়ত পূর্ণাঙ্গ। কোনরূপ অসম্পূর্ণতা বা কমতি তাকে স্পর্শ করেনি। তা পূর্ণাঙ্গ তার লক্ষ্যে, তার সামগ্রিক নিয়ম-বিধান ও আইনে। তাই তা কখনই কোন পরিবর্তন বা পরিবর্ধন অথবা সংযোজন গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। কেননা তা মানুষের রচিত নয়, রচিত স্বয়ং বিশ্ব মালিক মহান আল্লাহ্ কর্তৃক। আর আল্লাহ্ তো শাশ্বত ও চিরন্তন, তাই তাঁর রচিত এই শরীয়তও চিরন্তন এবং শাশ্বত। মানুষ যে বর্ণের, যে বংশের, যে জাতির, যে স্থানের ও দেশের-কালের হোক-না-কেন, যে ভাষা-ভাষীই হোক-না-কেন, তাকেই তা এমন এক উন্নত মানের তুলতে পারে, যেখানে তার ভূমিকা হবে মহান, তার দায়িত্ব-কর্তব্য হবে উচ্চতর। তথায় শান্তি, শৃঙ্খলা, সুবিচার ও ন্যায়পরতা, সাম্য ও অভিন্নতা এবং তারই ফলশ্রুতিতে পারস্পরিক প্রীতি-ভালোবাসা, স্থিতিশীলতা ও পরম সৌভাগ্য প্রত্যেকটি নাগরিকের জন্য সাধারণ লভ্য করে দিতে সক্ষম।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম > 📄 তওবার দরজা সদা উন্মুক্ত

📄 তওবার দরজা সদা উন্মুক্ত


শরীয়ত অপরাধীকে তার কৃত অপরাধের জন্য-অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শাস্তিদানের ব্যবস্থা করেছে। সেই সাথে তওবা'র দ্বারও সদা উন্মুক্ত করে রাখা হয়েছে খুব প্রশস্ত করে। তা কখনই বন্ধ হয়ে যায় না। এমনকি জান-কান্দানী শুরু হয়ে যাওয়া বা পশ্চিম থেকে সূর্যোদয় হওয়া পর্যন্ত উন্মুক্তই থাকবে।
এভাবে শরীয়ত মুসলিমকে আত্ম সংশোধনের সুযোগ দিচ্ছে। তা সত্ত্বেও যদি কেউ তার ভুল পৌনপুনিকতার সহিত করতেই থাকে, তা'হলে তার অর্থ এই দাঁড়াবে যে, সে এই ভুল বা পাপকে হালাল মনে করে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এটাই শির্ক। কেননা হালাল-হারাম নির্ধারণের নিরংকুশ অধিকার একমাত্র আল্লাহ্। কিন্তু উপরোক্ত অবস্থায় সে অধিকার সে নিজের জন্য নির্দিষ্ট করে রাখছে বলে মনে হয় এবং তার মাধ্যমে সে আল্লাহ্র কর্তৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব করছে এবং নিজেকে সেই অধিকারের অংশীদার বানিয়ে দিচ্ছে। এ কারণে তার জন্য অপেক্ষা করছে প্রথমে দুনিয়ার শান্তি এবং পরে পরকালীন চিরকালীন কঠিন শাস্তি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00