📄 দণ্ড ইসলামী সমাজ গঠনের একটি উপায়
বস্তুত ইসলামী রাষ্ট্রের উদ্যোগে যখন এভাবে ইসলামী শরীয়তকে বাস্তবায়িত করা হয়, তখন দণ্ড খালিস ও নির্ভেজাল তওবার একটি পন্থা হয়ে দাঁড়ায় এবং তার ফলে সঠিক দৃঢ়তা আসে সমাজ কাঠামোর মধ্যে। কেননা অপরাধীর উপর দণ্ড কার্যকর করার পর মুহূর্তেই সে এমন এক পরিবেশের মধ্যে এসে যায়, যেখানে সে ভয়ে নয়-আত্মতৃপ্তির দরুন এক আদর্শ নীতির অনুসারী হয়ে যায় এবং তাতে তার দীনের প্রকৃত শিক্ষা এবং তার আকীদা-ভিত্তিক আইন-বিধান বাস্তব ও জীবন্ত রূপ পরিগ্রহ করে।
📄 ইসলামী সমাজ গঠনের ইসলামী প্রক্রিয়া
ইসলাম সে সব মতবাদের মত কোন বিধান নয়, যা বাস্তব রূপায়িত (Practical application) করতে চাইলে তা আদৌ সম্ভবপর হয় না, যা বাস্তবায়িত হওয়ার যোগ্যই নয়।
মূলত ইসলামী শরীয়ত ও আইন-বিধান অত্যন্ত সহজসাধ্য, মানব প্রকৃতির সহিত পূর্ণমাত্রায় সামঞ্জস্যশীল। তা মানব প্রকৃতি নিহিত স্বাভাবিক প্রবণতা ও ভাবধারার পূর্ণ সংরক্ষণ করে। তাকে এমন সব কাজের দায়িত্ব দেয়, যাতে অন্যদের কোনরূপ ক্ষতি না করেও তার নিজের তৎপরতার ধারাবাহিকতা রক্ষা করার এক উন্মুক্ত পরিবেশ সে লাভ করে। সে যতই শরীয়তকে অনুসরণ করে চলে, ততই তার মনে এই অনুভূতি জেগে উঠে যে, সে এক ইসলামী সমাজ গড়ে তুলছে, যেখানে পারস্পরিক ভালোবাসাই প্রাধান্য পাচ্ছে, আত্মদানের পরিচ্ছন্ন স্রোতধারা প্রবাহিত হচ্ছে এবং উচ্চতর মান-মর্যাদার সুমিষ্ট ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে চতুর্দিকে।
যে সমাজে ইসলামের আদর্শ বাস্তবায়িত হয়েছে একটি সমগ্র হিসাবে, আইন বিধানসমূহ একটা স্পষ্ট রূপ পরিগ্রহ করেছে, তথায় পারস্পরিক মতবিরোধ ও দ্বন্দ্ব-কলহের কোন স্থান থাকতে পারে না, পরশ্রীকাতরতা ও হিংসা-বিদ্বেষ সেখান থেকে কর্পূরের মত উড়ে যাবে, শত্রুতা করার কোন সুযোগ তথায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। আসলে ইসলামের সমগ্র বিধি-বিধানই-তা ইবাদত সংশ্লিষ্ট হোক, কি মুয়ামালাত পর্যায়ের, ইসলামী রীতি-নীতি পর্যায়ের হোক, কি ব্যক্তি পর্যায়ের, প্রশাসনমূলক হোক বা রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক, তা সবই একই উচ্চতর মহত্ত্বর লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয় এবং সে লক্ষ্য হচ্ছে মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক গভীর ও সুদৃঢ় করে তোলা।
দৈহিক ইবাদতসমূহ মানুষের সাম্য ও পরিপূর্ণ সমতা প্রকট হয়ে উঠে অতি উন্নতমানে। তাতে সকলের মা'বুদ এক, রাসূল এক, কেবলা এক, কুরআন (জীবন-বিধান) এক এবং যে অবস্থার মধ্যে ও ব্যবস্থার মাধ্যমে ইবাদাত অনুষ্ঠিত হয় তা অভিন্ন। যে স্থানে এই ইবাদত অনুষ্ঠিত হয়, তা সকলের জন্য সমান অধিকারের ক্ষেত্র, সকলেরই উপর সমানভাবে তা পালন করা ফরয। এখানে ধনী-দরিদ্র, বড়-ছোট, নারী-পুরুষ ও শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গের কোন প্রভেদ নেই।
অর্থনৈতিক ইবাদত হিসাবে ইসলামী বিধানে ফরয করা হয়েছে মুসলিমের ধন-সম্পদের যাকাত। তা বিশেষভাবে নির্দিষ্ট হয়েছে আটটি খাতে ব্যয় করার জন্য। এছাড়াও রয়েছে অর্থব্যয়ের দায়িত্ব-পিতা, দাদা, চাচা, ভাই, বোন, স্ত্রী-পুত্র প্রভৃতি নিকটাত্মীয়দের জন্য। এছাড়া রয়েছে কাফ্ফারা। শরীয়তের কোন কোন বিধান লংঘন করা হলে তা অবশ্য কর্তব্য হয়ে পড়ে। আর সবই দরিদ্র মুসলিমের প্রাপ্য।
পারস্পরিক কাজ-কর্মে ইসলামী শরীয়ত মুসলমানের পরস্পরে বিরোধ সৃষ্টিকারী ও অহিতেচ্ছা বা বিদ্বেষ উদ্রেককারী ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
অত্যধিক চড়ামূল্যে ও ধোঁকাবাজিপূর্ণ ক্রয়-বিক্রয় এর মধ্যে গণ্য। পরস্পরের প্রতি নম্রতা, দয়ার্দ্রতা, অপরের দুঃখ ও কষ্ট বিদূরণ এবং প্রয়োজনে বিনা সুদে ঋণদান ও ঠেকায় সময় ঋণগ্রস্তকে সময়ের রেয়াত দানের বিধান দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক আচার-আচরণের ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়ত মুসলমানদের পরস্পরে সালাম আদান-প্রদান, হাঁচি দিলে আল্হামদুলিল্লাহ্ বলার পর 'আল্লাহ্ তোমাকে রহমত দিন' বলে প্রত্যুত্তর দানের রেওয়াজ করেছে। রোগাক্রান্তকে দেখার, মৃতের লাশ বহন ও দাফনের জন্য কবরস্থান পর্যন্ত যাওয়ার, মৃতের সম্পর্কে শুভ উল্লেখের ও তার লাশের মর্যাদা রক্ষার জন্য বলিষ্ঠ ভাষায় উৎসাহ দিয়েছে। তার কবরকে নষ্ট বা অপমান না করার এবং তার সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সহানুভূতিমূলক কথাবার্তা বলার, ভালো কাজের সহযোগিতা, দুর্বলের আনুকূল্য, বড়কে সম্মান, ছোটকে স্নেহ, দরিদ্রের প্রতি আন্তরিকতা, আলেমকে মর্যাদা দান, ছেলায়ে রেহমী, মজলুমের সাহায্য ও যালেমকে প্রতিরোধ করার জন্য স্পষ্ট আদেশ করা হয়েছে।
অনুরূপভাবে ইসলামী শরীয়ত নিষেধ করেছে মুসলিম ভাইয়ের প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করতে, তাকে হীন জ্ঞান করতে, তাকে লাঞ্ছিত অবমানিত করতে, তার প্রতি হিংসা পোষণ করতে, তাকে গালাগাল করতে, তাকে মিথ্যা দোষে অভিযুক্ত করতে, তাকে ভর্ৎসনা করতে, তার গীবত করতে।
ব্যক্তি পর্যায়ের আইন হিসাবে মুসলমানদের পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ করতে, মীরাস বণ্টন, ভরণ-পোষণ বহন এবং স্বামী-স্ত্রীর একত্রে থাকা অসম্ভব হলে বিচ্ছেদ গ্রহণ, ওসিয়ত ও ওয়াক্ফ ইত্যাদি কাজে যথাসম্ভব নম্রতা বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজনীতি, রাষ্ট্রশাসন ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ইসলামী শরীয়ত প্রবর্তিত বিধি-বিধান পালন করে চলার নির্দেশ দিয়েছে এবং জনগণকে নির্দেশ দিয়েছে তা যথাযথভাব পালন ও অনুসরণ করতে।
মোটকথা ইসলাম একটা আদর্শ সমাজ রূপেই ইসলামী সমাজ গড়ে তুলেছে, ফলে তাতে অপরাধ সংঘটনের অবকাশ বা সুযোগ খুব কমই থাকতে পারে। তথায় অপরাধ না করার মানসিকতাই প্রবল হয়ে উঠে, কেননা প্রত্যেক ব্যক্তিই তথায় পূর্ণ নিরাপত্তা, সুবিচার ও ন্যায়পরতা, প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করে থাকে। লোকেরা পারস্পরিক আন্তরিকতা, ভক্তি-শ্রদ্ধা, ভালোবাসার বন্ধনে বন্দী হয়ে থাকে। প্রত্যেকটি মুসলিম হয় অপর প্রত্যেকটি মুসলিমের দরদী ভাই।
এরূপ অবস্থায় কোন মুসলিম যদি অপরাধ করে তাহলে তা গোটা সমাজ পরিবেশের মধ্যে বিস্ময়ের উদ্রেক করে, এক অপ্রত্যাশিত ও অচিন্তনীয় ঘটনারূপে তীব্র ভাষায় সমালোচিত হয়। এটা তার চরিত্রের পতনরূপে চিহ্নিত হয়। মুসলিম জনগণের মনে তার প্রতিক্রিয়া হয় অত্যন্ত পীড়াদায়ক।
📄 মুসলিম অপরাধ করে কেন
মুসলিম ব্যক্তির ঈমান অত্যন্ত সুদৃঢ় ভিত্তির উপর গড়ে উঠে। আল্লাহ্, ফেরেশতা, কিতাব, নবী-রাসূল, পরকাল ও তাব্দীরের ভালো-মন্দের প্রতি যে ঈমান মুসলিমের হৃদয় মনে সঞ্চারিত থাকে তা যেমন অবিচল হয়, তেমনি অনড়, অপরিবর্তনীয়। আল্লাহর প্রতি ঈমানের অর্থ, আল্লাহই গোটা বিশ্বলোককে নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিটি বিন্দুর উপর অমোঘ। গোটা সৃষ্টিলোকের স্রষ্টা তিনি-ই, তিনি-ই তার সংরক্ষক।
পরকালের প্রতি ঈমানের অর্থ, জীবনের শেষে যে-মৃত্যু তা চূড়ান্ত ধ্বংস ও বিলয় নয়, পরে পুনরুজ্জীবিত হতে হবে এবং আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে স্বীয় জীবনের কার্যাবলীর পুঙ্খানুপঙ্খ হিসাবের পর জান্নাত অথবা জাহান্নাম প্রাপ্তি অনিবার্য ব্যাপার হয়ে আসবে।
يَوْمَ تَجِدُ كُلُّ نَفْسٍ مَّا عَمِلَتْ مِنْ خَيْرٍ مُّحْضَرًا وَ مَا عَمِلَتْ مِنْ سُوْءٍ تَوَدُّ لَوْ أَنَّ بَيْنَهَا وَ بَيْنَه أَمَدًا بَعِيدًا
সেইদিন যেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃত ভাল কাজসমূহ সম্মুখে উপস্থিত পাবে এবং যা কিছু খারাপ করেছে তা-ও। সে তখন কামনা করবে, তার খারাপ কাজ-সমূহ ও তার মধ্যে যদি সুদীর্ঘ দূরত্ব হতো (তাহলে কতই না ভালো হতো)। -সূরা আল-ইমরান: ৩০
কিন্তু যে মুসলিম উপরোক্ত আকীদায় বিশ্বাসী তার অন্তরে তার দৃঢ় ও প্রভাবশালী হওয়ার ব্যাপারটি বিভিন্ন রকম হয়ে যাবে। উপরোক্ত ঈমান বিভিন্ন মানুষের মনে বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে থাকে। যদি কারুর অন্তরটিতে উক্তরূপ ঈমান মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় এবং তাতে নিহিত ভাবধারাসমূহ পূর্ণ মাত্রায় তা আয়ত্তাধীন হয়ে গিয়ে থাকে তা'হলে তার সে অন্তর এমনভাবে সুরক্ষিত হয়ে থাকে যে, ফিতনা বিপর্যয়ের বিভ্রান্তির কোন আঘাত তার ভিতরের দিক দিয়ে আসতে পারে না, আসতে পারে না বাইরের দিক থেকে। কিন্তু এই ঈমান যদি কারুর অন্তরে দুর্বল হয়ে পড়ে, তা'হলে তাতে বিভ্রান্তি-ভিতর ও বাইর-উভয় দিক দিয়েই অনুপ্রবেশ করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নানাবিধ ভুল-ভ্রান্তির মধ্যে নিক্ষেপ করে। তখন তার দ্বারা বিভিন্ন প্রকারের অপরাধ সংঘটিত হওয়া খুবই সহজ বা একান্তই অনিবার্য হয়ে পড়ে।
তা'হলে বোঝা গেল, মুসলিম ব্যক্তির আকীদা ও বিশ্বাসের দুর্বলতা বা ক্ষীণতাই বিভ্রান্তির মৌল কারণ এবং এই বিভ্রান্তিই ব্যক্তি কর্তৃক অপরাধ সংঘটিত হওয়ার নিমিত্ত। এই কারণেই ইসলামী শরীয়ত সর্বপ্রথম মানুষের অন্তরে এই ঈমানকে গাঢ় সুদৃঢ় করে এবং তাতে কোনরূপ দুর্বলতা দেখা দিক, তা চায় না।
এই প্রেক্ষিতেই বলতে পারি, আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমানই ইসলামী সমাজে অপরাধ প্রবণতা দূরীভূত করে এবং দুষ্কৃতি তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম করে আনে।
📄 শরীয়ত অবিভাজ্য
ইসলামী শরীয়ত অবিভাজ্য, বিভিন্ন ভাগে তাকে বিভক্ত করা যায় না-তাকে এমনভাবে খণ্ডাকারে গ্রহণ করা যায় না যে, প্রত্যেকটি খণ্ড অন্যান্য খণ্ডসমূহ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে দাঁড়াবে। আসলে ইসলাম ও ইসলামী শরীয়ত একটি সমগ্র, একটা সমষ্টি। তাকে এই সমগ্র বা সমষ্টি হিসাবেই অনুধাবন, গ্রহণ ও অনুসরণ করতে হবে। যারা ইসলামী শরীয়তকে বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত করে এবং তার ফলে তার কোন কোনটি পালন ও অনুসরণ করে, আর বাকি অংশসমূহকে প্রত্যাখ্যান বা অগ্রাহ্য করে, তাদের এই আচরণটা ঠিক সেই ব্যক্তির মত, যে এক ব্যক্তির একখানি হাত বা একটি পা কেটে বিচ্ছিন্ন করে লোকদের সামনে দাঁড় করে প্রচার ও দাবি করে যে, এই একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ তোমাদের সম্মুখে উপস্থিত। এই কাজটি যে কতটা হাস্যকর- অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক, তা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে বোঝাবার প্রয়োজন হয়না। বস্তুত ইসলামী শরীয়ত একটি পূর্ণাঙ্গ মানব সত্তার মতই অবিভাজ্য, অবিচ্ছিন্ন। তার মৌলনীতি ভাবধারা থেকে শুরু করে দূরতম নিয়ম ও বিধি-বিধান পর্যন্ত কোন একটিকেও অন্যান্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে বলা যেতে পারে না যে, এটাই হচ্ছে ইসলামী শরীয়ত। মানব-দেহের দূরবর্তী কোন প্রত্যঙ্গে ব্যথা অনুভূত হলে গোটা দেহ সত্তায়ই যেমন সে ব্যথায় সংক্রমিত হয়ে পড়ে-সে ব্যথায় জর্জরিত হয়ে উঠে দেহের প্রতিটি অঙ্গ ও অনু-পরমাণু, তেমন মানুষের পূর্ণাঙ্গ দেহের কোন একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রত্যঙ্গ অনুপস্থিত বা বিচ্ছিন্ন ও পরিত্যক্ত হলেও সে দেহকে পূর্ণাঙ্গ বলা যাবে না কখনও। ইসলামী শরীয়তের এই সামগ্রিকতা এমন একটি বিশেষত্ব; যার দৃষ্টান্ত আদর্শ বা আইন বিধানের জগতে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
এই শরীয়তই ইসলামী সমাজ গড়ে তুলে এবং তাকে সুসংগঠিত করে। শরীয়তই প্রথমে ব্যক্তিদের আদর্শবাদী ব্যক্তিরূপে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করে। এই আদর্শের প্রেরণা প্রথমে ব্যক্তিগণের মনে-মগজে জেগে উঠে। পর সম আদর্শিক প্রেরণাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পরস্পরের সহিত একাত্ম বানিয়ে সংঘটিত ও সুসংবদ্ধ করে একটি অখণ্ড সমাজের ব্যক্তিরূপে। তখন কোন ব্যক্তিই অন্য কোন ব্যক্তি থেকে একটুও বিচ্ছিন্ন নয়, তাদের পরস্পরের মধ্যেও থাকতে পারে না কোন মতদ্বৈততা বা পার্থক্য বিরোধ। চিন্তা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিকোণ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বাস্তব আইন-বিধান পর্যন্ত সবই একাকার। এই সমাজের প্রত্যেকটি ব্যক্তিই হয় অভিন্ন আদর্শে বিশ্বাসী, আদর্শের বাস্তব অনুসারী। ফলে সে সমাজের প্রত্যেকটি ব্যক্তি হয় স্বভাবতই অপরাধবিমুখ, অপরাধ-বিরোধ এবং অপরাধের মুলোৎপাটনকারী। তাদের কেউ-ই অপরাধ করতে প্রস্তুত নয়। ইচ্ছা করে কেউ অপরাধ করবে তা অকল্পনীয়। কেননা ইসলামী সমাজ সংঘঠিত হওয়ার সাথে সাথেই তা একটি আদর্শবাদী জাতির রূপ পরিগ্রহ করতে শুরু করে। এই জাতি বা জনসমষ্টির অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিগণের সহিত সে সংগঠনের আত্মিক সম্পর্কের সাথে সাথে দানা বেঁধে উঠে আদর্শিক ও বাস্তব সম্পর্ক। ফলে কর্তৃত্ব বা সার্বভৌমত্বের বিচ্ছিন্নতা কিংবা বিভিন্নতার কারণে সেই লোকগুলি কখনই ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ও পরস্পর সম্পর্কহীন হয়ে যেতে পারে না। তখন তা এক বিশ্বজাতি (Universal nation)-তে পরিণত হয়। কিন্তু মানব রচিত আইন বিধান কখনই এইরূপ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে পারে না। এই আইন দ্বারা ব্যক্তিগণের পরস্পরে শুধুমাত্র বাহ্যিক ও স্থূল সম্পর্কই গড়তে পারে, আত্মিক বা আদর্শিক সেতু বন্ধন রচনা করতে পারে না। এইরূপ সমাজে পর্যবেক্ষণ বা সংরক্ষণ প্রক্রিয়া যখনই দুর্বল হইয়া পড়ে এবং ব্যক্তি মনে করে যে, এখন অপরাধ করলে ধরা পড়ে যাওয়ার কোন আশংকা বা সম্ভাবনা নেই, ঠিক তখনই সে আইন-লংঘন বা সোজা কথায় অপরাধ করতে একটুও দ্বিধা করে না।