📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম > 📄 শরীয়ত আত্মার লালন ও মন-মানসিকতা সুদৃঢ় করে

📄 শরীয়ত আত্মার লালন ও মন-মানসিকতা সুদৃঢ় করে


অপরাধীর উপর দণ্ড কার্যকর করার পর তাকে অপরাধের দোষ থেকে মুক্ত মনে করে ইসলামী শরীয়ত তাকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে-যে পরিবেশের মধ্যে পড়ে সে অপরাধ করেছিল সেখান থেকে বের করে সেই পরিবেশের মধ্যে নিয়ে যেতে চায়, যেখানে সে স্বীয় মর্যাদার ব্যাপারে সচেতন হতে পারবে, মনে করতে পারবে যে, সে মনুষ্যত্বের মান থেকে নীচে নেমে যায়নি, সে সাময়িকভাবে ভুল করেছিল মাত্র এবং সে ভুলটা নিতান্তই মানবিক কারণে। কেননা মানুষ মাত্রই ভুল-ভ্রান্তির অধীন, তা থেকে মুক্ত নয়। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে সে এই চেতনার অধিকারী হবে যে, সে তার নিজের সমাজেরই একজন, সেখানে অন্য আরও শত-হাজার-লক্ষ মানুষ রয়েছে। তার উপর যে 'হদ্দ' বা তা'যীর কার্যকর হয়েছে, তাতে বরং সেই সমাজেরই মান-মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে, তার কোন মর্যাদা হানি ঘটেনি। এই সমাজ তার সাময়িক পদস্খলনকে ক্ষমা করে দিয়েছে, যে পতিত হয়েছিল, তাকে হাত ধরে উপরে তোলা হয়েছে। সমাজ থেকে সে দণ্ড হিসেবে যা কিছুই পেয়েছে তা তাকে ভুলমুক্ত করার লক্ষ্যেই দেয়া হয়েছে, তার এবং তার সমাজেরই সার্বিক কল্যাণের জন্য-পিতা যেমন সন্তানের প্রতি করে, ঠিক তেমনি। রোগ হলে যেমন তার চিকিৎসা করা হয়, রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হয়, গোটা সমাজের জন্য এও ঠিক তেমনি। এতে করে সমাজ এক উচ্চতর দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এবং সমাজ গঠনের উন্নত পদ্ধতিকে সর্বসমক্ষে প্রতিভাত করে তোলে। যে ব্যক্তি বাঁকা পথ ধরেছে তাকে এর দ্বারা সোজা করা হয়। যে চেতনা ও মূল্যবোধ সে হারিয়ে ফেলেছে তা এক সুষ্ঠু, পরিশীলিত ও বাস্তব কর্মব্যবস্থার মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করা হয়।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম > 📄 দণ্ড ইসলামী সমাজ গঠনের একটি উপায়

📄 দণ্ড ইসলামী সমাজ গঠনের একটি উপায়


বস্তুত ইসলামী রাষ্ট্রের উদ্যোগে যখন এভাবে ইসলামী শরীয়তকে বাস্তবায়িত করা হয়, তখন দণ্ড খালিস ও নির্ভেজাল তওবার একটি পন্থা হয়ে দাঁড়ায় এবং তার ফলে সঠিক দৃঢ়তা আসে সমাজ কাঠামোর মধ্যে। কেননা অপরাধীর উপর দণ্ড কার্যকর করার পর মুহূর্তেই সে এমন এক পরিবেশের মধ্যে এসে যায়, যেখানে সে ভয়ে নয়-আত্মতৃপ্তির দরুন এক আদর্শ নীতির অনুসারী হয়ে যায় এবং তাতে তার দীনের প্রকৃত শিক্ষা এবং তার আকীদা-ভিত্তিক আইন-বিধান বাস্তব ও জীবন্ত রূপ পরিগ্রহ করে।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম > 📄 ইসলামী সমাজ গঠনের ইসলামী প্রক্রিয়া

📄 ইসলামী সমাজ গঠনের ইসলামী প্রক্রিয়া


ইসলাম সে সব মতবাদের মত কোন বিধান নয়, যা বাস্তব রূপায়িত (Practical application) করতে চাইলে তা আদৌ সম্ভবপর হয় না, যা বাস্তবায়িত হওয়ার যোগ্যই নয়।
মূলত ইসলামী শরীয়ত ও আইন-বিধান অত্যন্ত সহজসাধ্য, মানব প্রকৃতির সহিত পূর্ণমাত্রায় সামঞ্জস্যশীল। তা মানব প্রকৃতি নিহিত স্বাভাবিক প্রবণতা ও ভাবধারার পূর্ণ সংরক্ষণ করে। তাকে এমন সব কাজের দায়িত্ব দেয়, যাতে অন্যদের কোনরূপ ক্ষতি না করেও তার নিজের তৎপরতার ধারাবাহিকতা রক্ষা করার এক উন্মুক্ত পরিবেশ সে লাভ করে। সে যতই শরীয়তকে অনুসরণ করে চলে, ততই তার মনে এই অনুভূতি জেগে উঠে যে, সে এক ইসলামী সমাজ গড়ে তুলছে, যেখানে পারস্পরিক ভালোবাসাই প্রাধান্য পাচ্ছে, আত্মদানের পরিচ্ছন্ন স্রোতধারা প্রবাহিত হচ্ছে এবং উচ্চতর মান-মর্যাদার সুমিষ্ট ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে চতুর্দিকে।
যে সমাজে ইসলামের আদর্শ বাস্তবায়িত হয়েছে একটি সমগ্র হিসাবে, আইন বিধানসমূহ একটা স্পষ্ট রূপ পরিগ্রহ করেছে, তথায় পারস্পরিক মতবিরোধ ও দ্বন্দ্ব-কলহের কোন স্থান থাকতে পারে না, পরশ্রীকাতরতা ও হিংসা-বিদ্বেষ সেখান থেকে কর্পূরের মত উড়ে যাবে, শত্রুতা করার কোন সুযোগ তথায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। আসলে ইসলামের সমগ্র বিধি-বিধানই-তা ইবাদত সংশ্লিষ্ট হোক, কি মুয়ামালাত পর্যায়ের, ইসলামী রীতি-নীতি পর্যায়ের হোক, কি ব্যক্তি পর্যায়ের, প্রশাসনমূলক হোক বা রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক, তা সবই একই উচ্চতর মহত্ত্বর লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয় এবং সে লক্ষ্য হচ্ছে মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক গভীর ও সুদৃঢ় করে তোলা।
দৈহিক ইবাদতসমূহ মানুষের সাম্য ও পরিপূর্ণ সমতা প্রকট হয়ে উঠে অতি উন্নতমানে। তাতে সকলের মা'বুদ এক, রাসূল এক, কেবলা এক, কুরআন (জীবন-বিধান) এক এবং যে অবস্থার মধ্যে ও ব্যবস্থার মাধ্যমে ইবাদাত অনুষ্ঠিত হয় তা অভিন্ন। যে স্থানে এই ইবাদত অনুষ্ঠিত হয়, তা সকলের জন্য সমান অধিকারের ক্ষেত্র, সকলেরই উপর সমানভাবে তা পালন করা ফরয। এখানে ধনী-দরিদ্র, বড়-ছোট, নারী-পুরুষ ও শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গের কোন প্রভেদ নেই।
অর্থনৈতিক ইবাদত হিসাবে ইসলামী বিধানে ফরয করা হয়েছে মুসলিমের ধন-সম্পদের যাকাত। তা বিশেষভাবে নির্দিষ্ট হয়েছে আটটি খাতে ব্যয় করার জন্য। এছাড়াও রয়েছে অর্থব্যয়ের দায়িত্ব-পিতা, দাদা, চাচা, ভাই, বোন, স্ত্রী-পুত্র প্রভৃতি নিকটাত্মীয়দের জন্য। এছাড়া রয়েছে কাফ্ফারা। শরীয়তের কোন কোন বিধান লংঘন করা হলে তা অবশ্য কর্তব্য হয়ে পড়ে। আর সবই দরিদ্র মুসলিমের প্রাপ্য।
পারস্পরিক কাজ-কর্মে ইসলামী শরীয়ত মুসলমানের পরস্পরে বিরোধ সৃষ্টিকারী ও অহিতেচ্ছা বা বিদ্বেষ উদ্রেককারী ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
অত্যধিক চড়ামূল্যে ও ধোঁকাবাজিপূর্ণ ক্রয়-বিক্রয় এর মধ্যে গণ্য। পরস্পরের প্রতি নম্রতা, দয়ার্দ্রতা, অপরের দুঃখ ও কষ্ট বিদূরণ এবং প্রয়োজনে বিনা সুদে ঋণদান ও ঠেকায় সময় ঋণগ্রস্তকে সময়ের রেয়াত দানের বিধান দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক আচার-আচরণের ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়ত মুসলমানদের পরস্পরে সালাম আদান-প্রদান, হাঁচি দিলে আল্হামদুলিল্লাহ্ বলার পর 'আল্লাহ্ তোমাকে রহমত দিন' বলে প্রত্যুত্তর দানের রেওয়াজ করেছে। রোগাক্রান্তকে দেখার, মৃতের লাশ বহন ও দাফনের জন্য কবরস্থান পর্যন্ত যাওয়ার, মৃতের সম্পর্কে শুভ উল্লেখের ও তার লাশের মর্যাদা রক্ষার জন্য বলিষ্ঠ ভাষায় উৎসাহ দিয়েছে। তার কবরকে নষ্ট বা অপমান না করার এবং তার সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সহানুভূতিমূলক কথাবার্তা বলার, ভালো কাজের সহযোগিতা, দুর্বলের আনুকূল্য, বড়কে সম্মান, ছোটকে স্নেহ, দরিদ্রের প্রতি আন্তরিকতা, আলেমকে মর্যাদা দান, ছেলায়ে রেহমী, মজলুমের সাহায্য ও যালেমকে প্রতিরোধ করার জন্য স্পষ্ট আদেশ করা হয়েছে।
অনুরূপভাবে ইসলামী শরীয়ত নিষেধ করেছে মুসলিম ভাইয়ের প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করতে, তাকে হীন জ্ঞান করতে, তাকে লাঞ্ছিত অবমানিত করতে, তার প্রতি হিংসা পোষণ করতে, তাকে গালাগাল করতে, তাকে মিথ্যা দোষে অভিযুক্ত করতে, তাকে ভর্ৎসনা করতে, তার গীবত করতে।
ব্যক্তি পর্যায়ের আইন হিসাবে মুসলমানদের পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ করতে, মীরাস বণ্টন, ভরণ-পোষণ বহন এবং স্বামী-স্ত্রীর একত্রে থাকা অসম্ভব হলে বিচ্ছেদ গ্রহণ, ওসিয়ত ও ওয়াক্ফ ইত্যাদি কাজে যথাসম্ভব নম্রতা বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজনীতি, রাষ্ট্রশাসন ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ইসলামী শরীয়ত প্রবর্তিত বিধি-বিধান পালন করে চলার নির্দেশ দিয়েছে এবং জনগণকে নির্দেশ দিয়েছে তা যথাযথভাব পালন ও অনুসরণ করতে।
মোটকথা ইসলাম একটা আদর্শ সমাজ রূপেই ইসলামী সমাজ গড়ে তুলেছে, ফলে তাতে অপরাধ সংঘটনের অবকাশ বা সুযোগ খুব কমই থাকতে পারে। তথায় অপরাধ না করার মানসিকতাই প্রবল হয়ে উঠে, কেননা প্রত্যেক ব্যক্তিই তথায় পূর্ণ নিরাপত্তা, সুবিচার ও ন্যায়পরতা, প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করে থাকে। লোকেরা পারস্পরিক আন্তরিকতা, ভক্তি-শ্রদ্ধা, ভালোবাসার বন্ধনে বন্দী হয়ে থাকে। প্রত্যেকটি মুসলিম হয় অপর প্রত্যেকটি মুসলিমের দরদী ভাই।
এরূপ অবস্থায় কোন মুসলিম যদি অপরাধ করে তাহলে তা গোটা সমাজ পরিবেশের মধ্যে বিস্ময়ের উদ্রেক করে, এক অপ্রত্যাশিত ও অচিন্তনীয় ঘটনারূপে তীব্র ভাষায় সমালোচিত হয়। এটা তার চরিত্রের পতনরূপে চিহ্নিত হয়। মুসলিম জনগণের মনে তার প্রতিক্রিয়া হয় অত্যন্ত পীড়াদায়ক।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম > 📄 মুসলিম অপরাধ করে কেন

📄 মুসলিম অপরাধ করে কেন


মুসলিম ব্যক্তির ঈমান অত্যন্ত সুদৃঢ় ভিত্তির উপর গড়ে উঠে। আল্লাহ্, ফেরেশতা, কিতাব, নবী-রাসূল, পরকাল ও তাব্দীরের ভালো-মন্দের প্রতি যে ঈমান মুসলিমের হৃদয় মনে সঞ্চারিত থাকে তা যেমন অবিচল হয়, তেমনি অনড়, অপরিবর্তনীয়। আল্লাহর প্রতি ঈমানের অর্থ, আল্লাহই গোটা বিশ্বলোককে নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিটি বিন্দুর উপর অমোঘ। গোটা সৃষ্টিলোকের স্রষ্টা তিনি-ই, তিনি-ই তার সংরক্ষক।
পরকালের প্রতি ঈমানের অর্থ, জীবনের শেষে যে-মৃত্যু তা চূড়ান্ত ধ্বংস ও বিলয় নয়, পরে পুনরুজ্জীবিত হতে হবে এবং আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে স্বীয় জীবনের কার্যাবলীর পুঙ্খানুপঙ্খ হিসাবের পর জান্নাত অথবা জাহান্নাম প্রাপ্তি অনিবার্য ব্যাপার হয়ে আসবে।
يَوْمَ تَجِدُ كُلُّ نَفْسٍ مَّا عَمِلَتْ مِنْ خَيْرٍ مُّحْضَرًا وَ مَا عَمِلَتْ مِنْ سُوْءٍ تَوَدُّ لَوْ أَنَّ بَيْنَهَا وَ بَيْنَه أَمَدًا بَعِيدًا
সেইদিন যেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃত ভাল কাজসমূহ সম্মুখে উপস্থিত পাবে এবং যা কিছু খারাপ করেছে তা-ও। সে তখন কামনা করবে, তার খারাপ কাজ-সমূহ ও তার মধ্যে যদি সুদীর্ঘ দূরত্ব হতো (তাহলে কতই না ভালো হতো)। -সূরা আল-ইমরান: ৩০
কিন্তু যে মুসলিম উপরোক্ত আকীদায় বিশ্বাসী তার অন্তরে তার দৃঢ় ও প্রভাবশালী হওয়ার ব্যাপারটি বিভিন্ন রকম হয়ে যাবে। উপরোক্ত ঈমান বিভিন্ন মানুষের মনে বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে থাকে। যদি কারুর অন্তরটিতে উক্তরূপ ঈমান মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় এবং তাতে নিহিত ভাবধারাসমূহ পূর্ণ মাত্রায় তা আয়ত্তাধীন হয়ে গিয়ে থাকে তা'হলে তার সে অন্তর এমনভাবে সুরক্ষিত হয়ে থাকে যে, ফিতনা বিপর্যয়ের বিভ্রান্তির কোন আঘাত তার ভিতরের দিক দিয়ে আসতে পারে না, আসতে পারে না বাইরের দিক থেকে। কিন্তু এই ঈমান যদি কারুর অন্তরে দুর্বল হয়ে পড়ে, তা'হলে তাতে বিভ্রান্তি-ভিতর ও বাইর-উভয় দিক দিয়েই অনুপ্রবেশ করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নানাবিধ ভুল-ভ্রান্তির মধ্যে নিক্ষেপ করে। তখন তার দ্বারা বিভিন্ন প্রকারের অপরাধ সংঘটিত হওয়া খুবই সহজ বা একান্তই অনিবার্য হয়ে পড়ে।
তা'হলে বোঝা গেল, মুসলিম ব্যক্তির আকীদা ও বিশ্বাসের দুর্বলতা বা ক্ষীণতাই বিভ্রান্তির মৌল কারণ এবং এই বিভ্রান্তিই ব্যক্তি কর্তৃক অপরাধ সংঘটিত হওয়ার নিমিত্ত। এই কারণেই ইসলামী শরীয়ত সর্বপ্রথম মানুষের অন্তরে এই ঈমানকে গাঢ় সুদৃঢ় করে এবং তাতে কোনরূপ দুর্বলতা দেখা দিক, তা চায় না।
এই প্রেক্ষিতেই বলতে পারি, আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমানই ইসলামী সমাজে অপরাধ প্রবণতা দূরীভূত করে এবং দুষ্কৃতি তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম করে আনে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00